Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

বি শে ষ  র চ না

উ মা প দ   ক র

একপাক্ষিক ভালোবাসা

আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, বুড়ো হতে চললাম। কিন্তু বয়স বাড়ল না তার। কবিতার। কচিটিই থেকে গেল। সেই যে সতের বছর বয়সে এক-আধটু দেখেছিলাম, এক ঝলক, তখন যেমনটি, এখন পঁয়ষট্টিতে এসেও যখন ঝলক কখনো-সখনো দেখতে পাই, তাতে একই রূপ আর রস যেন উথলে উঠছে। কৈশোরোত্তীর্ণ যন্ত্রণার মধ্যে তাকে দেখার ইচ্ছে হতো প্রেমিকা হিসেবে, হাতে মলম, লাগিয়ে দেবে ক্ষতগুলোতে। রহস্যময়ীর প্রেমিকা সাজার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। কল্পনাকে বাড়োয়া দিতে আলেয়া হতো। খোঁজো তারে খোঁজো। কচিৎ হয়তো কোনো বিদ্যুতচমকের সুযোগে তার চিকন চিবুক দেখে থাকব। সেটুকু দেখাতেই প্রেমিকা সাধা। মানেনি সে। কারণ, সে হয়তো টের পেয়েছিল, আমাতে প্রেম জাগেনি, তাকে ভালোবাসার মতো প্রেম। স্ব-আরোপিত একপাক্ষিক প্রেম থেকে কিছুদিন সরেই থাকলাম। ঠিক আছে, যদি প্রেম জেগে নাই থাকে, তাহলে প্রেম জাগানোর অনুশীলনে মত্ত হই। এইসময়টায় তাকে ঝলকের জন্যও দেখতে পাইনি। কেমন বদলেছে তার চোখ-কান-নাক-ওষ্ঠ-চিবুক, কোনো ধারণাই ছিল না। বয়স বাড়ল, কৈশোরোত্তীর্ণ যন্ত্রণা যৌবনের রোমান্টিসিজমে এসে মিশল। চব্বিশ-পঁচিশ। আবারও প্রেম জেগে উঠল, এবারে যেন পরীক্ষা দেওয়ার পালা ‘আমাতে প্রেম জেগেছে কিনা দ্যাখো গো’? তাকে ভালোবাসতে গেলে কী কী গুণাবলীর অধিকারী হতে হয়, কী ধরনের হিরোইজম দেখাতে হয়, তার চাহিদাই বা কী, আমিই বা তার কাছে কী চাই, চাইতে পারি, ধারণা স্পষ্ট নয়। শুধু প্রেম করব বললেই হয় না, তাকে একান্তে পেতে পটাতেও জানতে হবে। পটানোর কৌশলই বা কী? এতসব জানাজানির বাইরে থেকেই ভালোবাসার ফের শুরু। একপাক্ষিকই। ছাব্বিশে এসে এমনকি লিখেও ফেললাম— “কবিতা যে মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম, অনন্যা!” লাও ঠ্যালা। মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম কবিতা! যেন একটু বেশিই তোয়াজ করা হয়ে গেল, যৌবনের যা সিম্পটম। এবার বিষয়টা দাঁড়িয়ে গেল— ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না!’ যতটুকু যা দেখি তাতে একইরকম, তার ওপর বয়সের কোনো ছাপ নেই, নিত্য-নয়া। তার চিবুকের তিল-টা পর্যন্ত একই জায়গায়, এমনকি লিপস্টিকের রঙের ভিন্নতা থাকলেও লিপ-দুটো একই। আর সেই আলেয়া ভাব। থাকে তো, অলকগুচ্ছ দেখিয়ে কেটে পড়ে। প্রেমের বিনিময়ে প্রেম দেবার কোনো নামগন্ধই নেই। এভাবেই চলে, একপাক্ষিক। পঁচিশ বছর পর একবার দেখতে ইচ্ছে হল, আচ্ছা বহুদিন তো গেল, পঞ্চাশে পা, কল্পপ্রেমিকার অবস্থানটা একটু দেখাই যাক রূপ-রঙ-তামাশা-রসে এখন কেমন সে! ওয়াজেদ আলি-র মতো আবিষ্কার করলাম, ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে’। না-পাওয়ার বেদনায় একটা ফাঁকাকে ভরতে হাজার হাজার ফাঁকা মুখিয়ে থাকে।

এখন পঁয়ষট্টি, যে কথায় শুরু করেছিলাম। ভাবি, কম দিন তো হল না। সেই দেমাক নিয়েই থেকে গেল আলেয়াশ্রী। এক রূপ এক লালিত্য। কেবল পোশাকে কিছু হেরফের দেখেছি। কখনো শাড়ি, ব্লাউজে ব্রোচ লাগানো, কখনো ঘাগরা-চোলি, কখনো প্লেন একটা সালোয়ার-কামিজ আর একটা উড়ু-উড়ু ওড়না। আবার কখনো জিনস্‌ আর টপ, একটু উঠে গেলেই তৃতীয়ার চাঁদের মতো নাভি দেখা যায়। কিন্তু বয়স বাড়েনি। আর আমাকে তার প্রেমিক হিসেবে মান্যতা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। আমিও বহু আগেই বুঝে গেছি, তাকে ভালোবাসা শর্তহীন, দেওয়া-নেওয়া সূত্রে সে আবদ্ধ হওয়ার নয়, কোনোদিন কারও কাছে হয়ওনি। বুঝে গেছি, কবিতাকে আমার কিছু দেওয়ার থাকলেও থাকতে পারে, তার কাছে পাওয়ার কিছু থাকতে পারে না। আর পাওয়ার যদি কিছু নাই থাকে, তাহলে চাওয়ার কোনো মানেই হয় না। কাঙাল তবু চায়, হয়তো অর্থ, পুরস্কার, সম্মাননা, নাম-যশ-প্রতিষ্ঠা। কিন্তু অনেক ভেবে দেখেছি, সেই প্রায় তিরিশ বছর আগে থেকেই, প্রকৃত কাঙালের চাওয়ার কিছু থাকতে পারে না। সে মাধুকরী করে খায়, সঞ্চয় কিছু রাখে না। স্বাভাবিকভাবেই আমার মাধুকরী শুধুই পাঠকপ্রিয়তা। তার বেশি কিছু নয়। ভালোবাসলে নিঃশর্ত ভালোবাসাই শ্রেয়, এবং একমাত্র পন্থা। তাই কবিতার বয়স বাড়ে না, কবিতাকারীর বয়স বাড়তেই থাকে, পুরোনো হয়, জীর্ণ হয়। কিন্তু সে যাকে ভালোবাসে তার বয়স বাড়ে না, সে নিত্য নতুন, নতুনত্বের পূজারী হওয়ায় সে কচিটিই থেকে যায়, কোনোদিন সমস্ত রহস্যের বীজ উন্মোচন করে সে এসে দাঁড়ায় না জীর্ণতার রূপে-রঙে-রসে। তাতে, তার যে প্রেমিকসকল, তাকে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেলেও তার কিছু করার থাকে না। 

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার