Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 2nd Issue

রবিবার, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th July 2021

অ নু বা দ

অ মি তা ভ   মৈ ত্র

জেরোম রথেনবার্গের কবিতা

রিয়েল থিয়েটার

মঞ্চ

খোলা একটা জায়গা— চার্চ বা অন্য কোনো ধর্মস্থানের চত্বর হতে পারে। লম্বা কাঠের বেঞ্চে চারদিক ঘেরা। দর্শকরা বসে। মাঝখানে গভীর যাতে কোনো মানুষ দাঁড়াতে পারে। খসখসে চওড়া কাঠের পাটাতনে সেটা ঢাকা। পাশের টেবিলে কাঁচি, ছুরি, ফিতে, কসাইয়ের ছুরি, কাগজের ফুল রাখা। মঞ্চ সাজাতে বড়ো কিছু গাছ কেটে চারপাশে শক্ত করে পুঁতে দিতে হবে। ছাগল  ভেড়ার মতো গৃহপালিত পশু জীবন্ত ঝোলানো রয়েছে গাছের ডালে। এছাড়াও পাখি, নানা রঙের ফিতে, সোনা আর রুপোর অলঙ্কারে গাছগুলোকে সাজানো যায়।

 

প্রথম পর্যায়

সাদা ছোটো গাউন পরা চাকরদের হাত থেকে শ্রোতারা লম্বা ঝলমলে রঙের গাউন নেয়। রাস্তার পোশাক বদলে তারা পড়ে নেয় লম্বা গাউন।

 

দ্বিতীয় পর্যায়

চাকররা আগুন ধরিয়ে দেয় গাছগুলোয়।

 

তৃতীয় পর্যায়

গাছগুলো জ্বলে উঠলে পাঁচজনের একটা দল ভিতরে আসে। চাকরের মতো সাদা পোশাক তাদেরও, যা তাদের বুকে শক্ত করে বাঁধা আর ঝুলে আছে পা পর্যন্ত। একজন ছাড়া বাকিদের মাথা খোলা, কামানো। যিনি নেতা তার মাথাই শুধু জমকালো পাগড়িতে ঢাকা। তার ডানহাতে বাচ্চাদের ঝুমঝুমি আর বাঁ হাতে পুরনো দিনের লন্ঠন। বাকি চারজনের হাতে, যথাক্রমে— ১। ধাতুর রান্নাপাত্র ২। প্লাস্টিকের ছোট্ট ক্রিসমাস ট্রি ৩। একটা বড়সড় মেয়েদের হাতপাখা ৪। দোকানের কোনো ম্যানিকিনের বাঁহাত। নেতার ইঙ্গিতে সেই চারজন দর্শকদের থেকে কোনো পুরুষ (নারী)-কে নির্বাচিত করে মঞ্চের কাছে তাকে নিয়ে আসে। সেই পাঁচজন এবার টেবিলের সামনের মাটিতে তাদের জিনিসপত্র রাখে আর নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবী লোকটিকে ফিতে, কাগজের ফুল, ছুরি দিয়ে সাজিয়ে দেয়। তার সাজ শেষ হলে নেতা তাকে গর্তে নেমে যেতে সাহায্য করে। অন্য চারজন চওড়া কাঠের পাটাতনে গর্তের মুখ ঢেকে দেয়। নেতা গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে। চারজন তখন শুরু করে স্তোত্রের গান— “আনন্দে আমি বহন করব ক্রুশ”। শ্রোতারাও অংশ নেয় সেই গানে।

 

চতুর্থ পর্যায়

সত্যিকারের ফুলপাতা দিয়ে ঢাকা একটা ষাঁড়কে আনা হয় অনুষ্ঠানের জায়গায়। সহকারী চারজন কাঠের পাটাতনের ওপর দাঁড় করায় ষাঁড়কে। কসাইয়ের ছুরি তুলে নিয়ে দীর্ঘ আর গভীর আঘাত করে, যাতে সেই রক্তস্রোত কাঠের পাটাতনে আর গর্তে পড়ে, সেখানে নির্বাচিত লোকটি মুখ ওপরে তুলে সেই রক্ত মুখে, মাথায়, সারা শরীরে আর পোশাকে গহণ করে। শরীর পিছনে হেলিয়ে তাকে গাল চোখ ঠোঁট নাক ভালো করে ভিজিয়ে নিতে হয়। তার হাঁ মুখের মধ্যে যেন রক্ত পড়ে আর সেই রক্ত সে যেন উৎসুকভাবে পান করে। প্রধান যখন মনে করেন তখন ষাঁড়টির কন্ঠনালী ছিন্ন করেন তিনি, যাতে গর্তের মানুষটি রক্তের প্রবল স্রোতে ডুবে যায়। ষাঁড়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হলে এই অঙ্কও শেষ হয়ে যায়।

 

পঞ্চম পর্যায়

মৃত ষাঁড় সরিয়ে এবার পাটাতন সরিয়ে নাও গর্তের মুখ থেকে আর রক্তে স্নান করা শরীর নিয়ে উঠে আসবে স্বেচ্ছাসেবী লোকটি। পাঁচজনের সেই দল তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে দর্শকদের মধ্যে আর মন্ত্রের মতো বলে যাচ্ছে, “আনন্দে থাকো, ঈশ্বর রক্ষা পেয়েছেন।  এত কষ্টের পর এবার মুক্তি পাব আমরাও।”

 

ষষ্ঠ পর্যায়

অন্য সব শ্রোতাদের জন্যও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সবাই রক্তে না ভিজে যায়। যদি আগুন নিভে যায় গাছ আর পশুগুলোর শরীরে, নাটক বন্ধ করতে হবে তখনই, এবং পরের দিন নতুন করে শুরু করতে হবে। ষাঁড় যদি যথেষ্ট না পাওয়া যায় পরিবর্তে ভেড়া বা ছাগল ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো শিশু, পুরুষ হলেই ভালো, ব্যবহার করতেও অসুবিধা নেই। কিন্তু শুধু সেইসব ক্ষেত্রেই যেখানে পুলিশের বিপদ নেই।

১৯৬০ সালে বেরিয়েছিল জেরোম রথেনবার্গের ( জন্ম-১৯৩১) প্রথম কবিতার বই ‘White Sun Black Sun’. সেই বইয়ের শুরুতেই টেলিগ্রামের মতো মিতকথনে তাঁর কবিতাভাবনা জোরালোভাবে জানিয়েছেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর একা রাস্তার শুরু। আগের এবং সমসময়ের সমস্ত চিহ্ন ও লক্ষণ আত্মস্থ করেছেন তাঁর এই যাত্রাপথে। বিভিন্ন জনজাতির verbal এবং non-verbal poetics এর বিপুল বৈচিত্র্য, তার সঙ্গে উত্তর-মার্কিনি ভারতীয় সংস্কৃতি, জাপানি সাহিত্য, দাদাইজম, ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রত্নপরিচ­­­­­­­­­য়- সব মিলিয়ে ‘Ethnopoetics’ নামে একটি অখণ্ড ভাবনা তিনিই প্রথম এনেছিলেন, যার সাহায্যে সারা বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া লিখিত ও অলিখিত সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে তুলে এনে তাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে বেরিয়েছিল ‘Technicians of the Sacred’ নামের একটি সংকলন যেখানে আফ্রিকান, আমেরিকান, এশিয়ান ও ওশিয়ানিক কাব্যতত্ত্ব ছাড়াও সেইসব দেশের ধর্মীয় আচার ও প্রথার মূল পাঠ, চিত্রনাট্য, দৃশ্য ও শ্রাব্য সাহিত্য তুলে এনেছিলেন তিনি। ‘Alcheringa’ নামের প্রথম Ethnopoetics পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শে উজ্জ্বীবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে আরো পত্রিকা বেরোতে থাকে এবং Ethnopoetics নিয়ে চিন্তায় এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জার্মানিতে, একজন মার্কিন সৈনিক হিসেবে। নিউইয়র্কে ফিরে তিনি অনুবাদ করতে শুরু করলেন দু’হাতে। পাউল সেলান এবং গুণ্টার গ্রাসের প্রথম ইংরেজি অনুবাদক তিনিই।

লেখালেখির প্রথম দিকে তিনি এবং রবার্ট কেলি স্প্যানিশ শব্দ ‘Cante Todo’- এর ছায়ায় লোরকাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে সামনে রেখে শুরু করেছিলেন ‘Deep Image’ আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে ‘Sound Poetry’ বা ধ্বনি কবিতা তাঁর অন্বেষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থহীন শব্দাংশ (syllable), ধ্বনি, সুর, বিকৃত উচ্চারণ সবকিছু নিয়ে এমন কবিতা তিনি ভেবেছিলেন যেখানে কবিতা, গান, অর্থহীন জড়ানো শব্দ সবকিছুই একসঙ্গে চলেছে। এই কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ভাষার নয়। একে লিখে বোঝানো যায় না, লেখাও যায় না সেই অর্থে। অর্থ খুঁজে পাওয়ার কোনো দায়িত্ব নেই। অর্থের বেড়া ডিঙিয়েই এখানে পৌঁছানো যায়।

অমিতাভ মৈত্র

অনুবাদক

আরও পড়ুন...