Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

বি শে ষ  র চ না

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি 

পর্ব ৫

বিদ্বিষ্ট কবি

১৯৭৫ সালের কথা। আমি তখন শিলং থেকে চাকরির একটা বিশেষ ট্রেনিং-এর জন্য পাটনা গিয়েছিলাম। প্রায় বছরখানেকের জন্য। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে হোস্টেলেই থাকতাম। এর আগে আমার পত্রিকা ‘শতাব্দী’-র বেশ কয়েকটি সংখ্যা শিলং থেকে বেরিয়েছে। তো পাটনায় পৌঁছেই পত্রিকাটির ২৫শে বৈশাখের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অথচ শহরের কাউকেই চিনি না। প্রতিদিন ট্রেনিং ক্লাসের পর একা একা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখতে থাকি। আমি এটুকু জানতাম যে সমীর রায়চৌধুরী চাইবাসায় থাকলেও পাটনাতেও তাঁদের বাড়ি আছে। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক জুতোর দোকানে ঢুকে পড়ি চপ্পল কেনার জন্য। কেননা অফিস বা ট্রেনিং সেন্টারে জুতো ছাড়া গতি নেই। কিন্তু এই গ্রীষ্মে ঘোরাঘুরির জন্য আরামদায়ক এই বস্তুটির প্রয়োজন খুব। সেদিন জুতোর দোকানের মালিক দাম নেবার সময় আমার উন্নতমানের হিন্দি উচ্চারণে মুগ্ধ হয়ে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এই শহরে নতুন?’ আমি তৎক্ষণাৎ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেই বাংলা সহযোগে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছোবার চেষ্টা করি। পরবর্তী সময়ে এই বিরল কেশের বাঙালি ভদ্রলোককে ‘পালদা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তাঁর কাছে সেদিন সমীর রায়চৌধুরীর ঠিকানা জানতে চাইলে সামান্য দূরের একটি অ্যাকোয়ারিয়ামের দোকানের খোঁজ দিয়েছিলেন। যেখানে নাকি প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে। পরের দিনই ওই দোকান খুঁজে পৌঁছে যাই আমি। কবিতা লিখি জানতে পেরে ওই দোকানের মালিক রঞ্জুদা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেদিন থেকে প্রতি সন্ধ্যায় ওখানে বসার জন্য আমিও একটা স্থায়ী চেয়ার পেয়ে গেলাম। একদিন সমীরদা এলেন। চাইবাসায় তখন সমীরদার বাড়িতে শক্তি-সুনীলের নিত্য যাতায়াত। সে এক অন্য কাহিনি। তো সমীরদার কাছে আমার পত্রিকা ‘শতাব্দী’-র একটি ‘২৫শে বৈশাখ সংখ্যা’ বের করার ইচ্ছে প্রকাশ করলাম। সমীরদা উত্তেজিত। লেখা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গেল।

একদিন বিখ্যাত হিন্দি উপন্যাস ‘ময়লা আঁচল’-এর লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণুর বাড়ি গেলাম সমীরদার সঙ্গে। বাসু চ্যাটার্জির পরিচালনায় তাঁর কাহিনির চিত্ররূপে তৈরি ‘তিসরী কসম’ তখন বেশ কিছু পুরস্কার সংগ্রহ করে নিয়েছে। সেই সন্ধ্যায় নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা জমে উঠেছিল আমাদের। পরে সমীরদা চাইবাসা ফিরে গেলেও আমি প্রায় নিয়মিত তাঁর বাড়ি যেতাম। পূর্ণিয়ায় তাঁর ছেলেবেলা কেটেছিল। তিনি বাংলা ভালোই জানতেন। কিন্তু বাংলায় লেখেননি কোনোদিন। অনেক অনুরোধের পর তিনি আমার কাগজে বাংলায় একটি গদ্য লিখতে রাজি হলেন। তার কিছুদিন আগে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন, ফলে তাঁর লেখায় প্রাধান্য পেল সুনীল-শক্তি-সন্দীপন-পূর্ণেন্দু-শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়দের সঙ্গে সুদীর্ঘ আড্ডার এক বিবরণী। তাঁর সঙ্গে গিয়ে পরিচিত হলাম ‘কটকী কবিতা’ আন্দোলনের পুরোধা হংসরাজ তিওয়ারীর সঙ্গে। ওই আন্দোলন বিষয়ক একটি সাক্ষাৎকারও নিলাম তাঁর। ঠিক তখনই দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়েছে। জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ফণীশ্বরনাথ রেণু গ্রেপ্তারি এড়াতে আত্মগোপন করলেন। তাঁর বাড়ি যাই, বৌদির সঙ্গে কথা হয়, কিন্তু তাঁর সন্ধান আর পাইনি। নানা অসুবিধার মধ্যেও ফণীশ্বরনাথ রেণুর গদ্যসমেত পত্রিকার ওই বিশেষ সংখ্যা ২৫শে বৈশাখের দিন সকালে বের করলাম। মনে আছে বিকেলে পাটনার রবীন্দ্র ভবনে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছিল। পত্রিকা হাতে নিয়ে কলকাতার রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণের ভোরের মতন সেখানেও উপস্থিত ওই বিশিষ্ট বাঙালি সমাজের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেছে আমার সঙ্গে আসা অবাঙালি সহকর্মীরাও। কিন্তু ট্যাবলয়েড পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ফণীশ্বরনাথ রেণুর নাম ও লেখা দেখে জরুরি অবস্থার আতঙ্কে দূরে দূরে সরে থাকলেন সেখানকার অধিকাংশ বাঙালি দর্শক।

যাই হোক, এক সহৃদয় ব্যক্তির সঙ্গে পরের দিনই বেশিরভাগ কপি কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বন্ধুদের কাছে। তারা কিছু স্টলে বিক্রির জন্য রেখে বাকিগুলো বিভিন্নজনের কাছে পৌঁছে দেয়। তখন মাসিক কৃত্তিবাস বেরোচ্ছে অক্রুর দত্ত লেন থেকে। সুনীলদা পত্রিকাটি পেয়েই চিঠি লিখলেন-

index
index2

এর কিছুদিন পরেই ফণীশ্বরনাথ রেণু প্রয়াত হলেন। আমি তখন আবার শিলং ফিরে গিয়েছি। সুনীলদা রেণুজীকে স্মরণ করে আমাকে কৃত্তিবাস-এ একটি গদ্য লিখতে বললেন। সেটি বেরোবার দু’এক সংখ্যা পর ফণীশ্বরনাথ রেণুকে নিয়ে কৃত্তিবাসের একটি বিশেষ সংখ্যা বের করার পরিকল্পনা হয়। অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় সমীর রায়চৌধুরীকে। সমীরদা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টেলিগ্রাম পাঠালেন শিলঙে। রেণুজীর বাংলা লেখার পাণ্ডুলিপি, চিঠি, যা কিছু আমার কাছে আছে সব নিয়ে দ্রুত কলকাতায় যেতে বলেছিলেন সম্পাদনার কাজে সহায়তার জন্য।

তখনই পরপর দুটো বঞ্চনার গল্প জমে উঠল আমার জীবনে। মাসিক কৃত্তিবাসের সেই সংখ্যাটি প্রকাশের ব্যাপারে কলকাতায় দপ্তরে বসে আমার সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছিলাম সমীরদাকে। সংখ্যাটি বেরোয়। এবং প্রায় সেরকম সময়েই ‘অমৃত’ পত্রিকা, তখন সম্পাদক ছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘শতাব্দী’তে প্রকাশিত ফণীশ্বরনাথ রেণুর বাংলা লেখাটি হুবহু ছেপে দেয়। কোথাও কোনো পুনর্মুদ্রণের কথা উল্লেখও ছিল না। একটি ছোটো পত্রিকার যাবতীয় পরিশ্রমের ফসলটুকু কীভাবে যে একটি বড়ো পত্রিকা অনায়াসে তুলে নেয়- সেই অভিজ্ঞতাও আমার প্রথম নয়।

‘কৃত্তিবাস’-এর ৫০ বছর উপলক্ষে যে উৎসব হয়েছিল, তাতে একদিন শিশির মঞ্চে কবিতা পড়লাম অনেকের সঙ্গে। যদিও অপ্রাসঙ্গিক, তবুও জানিয়ে রাখি, মঞ্চে সেদিন আমার সঙ্গে কবিতা পড়েছিলেন সদ্য প্রয়াত কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যাই হোক, কবিতা পড়ার পর নিচে নেমে ৫০ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত ‘কৃত্তিবাস’-এর একটি স্যুভেনির নজরে পড়ল। তাতে অনেকের লেখার সঙ্গে সমীর রায়চৌধুরীরও একটি লেখা ছিল। তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’-এর ‘ফণীশ্বরনাথ রেণু সংখ্যা’টি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। এবং বলা বাহুল্য, সেখানে আমার নামের কোনো উল্লেখ নেই। ফণীশ্বরনাথ রেণু সম্পর্কিত আমার যাবতীয় ব্যক্তিগত সংগ্রহের জিনিস কিছুই দপ্তর থেকে খুঁজে পাইনি পরে। সামান্য মনখারাপ হলেও আমি সমীরদার উপর রাগ করতে পারিনি। কেননা সমীরদা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমিও সমীরদাকে। কিছুদিন পরেই এক ঘরোয়া আড্ডায় সমীরদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ওই লেখায় আমার নামটি উল্লেখ না-করার প্রকৃত কারণ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় জিভ কেটে চমকে উঠে বলেছিলেন, ‘সে কী! তোমার কথা লিখিনি? তুমি না থাকলে তো ওই সংখ্যা বের করতে অসুবিধা হত খুব। আমার এমন ভুল কীভাবে হল বুঝতে পারছি না। আমায় ক্ষমা করে দিও তুমি।’

সমীরদার এ কথা শুনে আমিও লজ্জা পেলাম। আর আমি তো সত্যি কথা বলতে, ক্ষমা ছাড়া কিছুই করতে পারিনি। এখনও কতজনকে যে মনে মনে ক্ষমা করে যেতে হচ্ছে!

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার