Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 2nd Issue

রবিবার, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th July 2021

বি শে ষ  র চ না

শু দ্ধে ন্দু   চ ক্র ব র্তী

কবিমনের ব্যবচ্ছেদ 

ঠিক যেন পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনের নন্দিনীর মতো বলে ওঠা, “ভারি কথা শুনতে ভয় করে/অন্য কিছু বলো বা শোনাও/ইদানিং লেখা কবিতার/একটা দুটো,যা ইচ্ছা তোমার।” কবির মনের চলন আর তার গঠনের যোগসাজশে মানুষের মস্তিষ্কের যে ব্যবচ্ছেদ এখন আমরা করতে চলেছি, তার মধ্যে যে বেশ কিছু ভারি শব্দ এসে পড়বেই এতে আশ্চর্যের কী! সৃষ্টিশীল কবিমন সহজ প্রক্রিয়া নয়। যে মানুষ প্রকৃতই কবি, তার মস্তিষ্কের জটিল রসায়ন ভেদ করতে মনোবিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে চলেছেন বছরের পর বছর। তার মনকে ঘিরে ঘুরতে থাকা নানান বিতর্কের তালিকাও তো নেহাত কম নয়।

                ঠিক যেমন অনেকদিন অবধি মনোবৈজ্ঞানিকরা মনে করতেন মানুষের মস্তিষ্কের বামদিক হলো যুক্তির, আর ডানদিক সৃষ্টির। সেই ধারণা আধুনিক প্রযুক্তির নিরীক্ষণে অনেকটাই বিতর্কিত হয়ে পড়ছে। বরং আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে মস্তিষ্কের দুই দিকের পারস্পরিক আদানপ্রদান। ঠিক তেমনই সৃষ্টিশীল মনকে ঘিরে ঘুরতে থাকা আরেকটি ধারণা হলো- যুক্তিপূর্ণ চিন্তা আদতে কবিত্বের বিরোধী। অথচ সমীক্ষা দেখাচ্ছে সৃষ্টিশীল মনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক মনের কোনও বিরোধ নেই। এর অর্থ একজন বিজ্ঞানের ছাত্র অনায়াসে হতে পারেন একজন কবি। আবার একজন কবি হতেই পারেন এক বিজ্ঞানী। এমনটি না হলে কী একজন গণিতজ্ঞ লিখে ফেলতে পারতেন বাংলাসাহিত্যের অন্যতম মাইলফলক,যার নাম “ফিরে এসো চাকা”। কবিমনকে নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা হলো এই যে, মনোরোগ আর কবিত্ব পরস্পরের পরিপূরক। এই যুক্তির পক্ষে সমালোচকেরা তুলে আনবেন সিলভিয়া প্লাথ, জীবনানন্দ দাশ, রাইনে মারিয়া রিলকের মতো নাম। যাকে তাঁরা মনোরোগ পরিপন্থী বলবেন, আমি তাকে বলবো মনের অবস্থান। অবসাদ,উৎফুল্লতা,আবেগ,আগ্রাসন কবিতা লেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার মানেই কবিকে পাকাপাকিভাবে মনোরোগী হতে হবে, এ কথা মানতে আমি নারাজ। কবিতা সিংহ,বিষ্ণু দে,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,রবার্ট ফ্রস্ট যে মনোরোগী ছিলেন না একথা প্রমাণের দাবি রাখে না। এক কথায় অবচেতনেই কবিমনের ব্যবচ্ছেদ করতে থাকি আমরা। তাই এবার দেখা যাক কবির মনের গঠন বৈজ্ঞানিকভাবে কেমন হতে পারে।

                  আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে তার ব্যবহারিক যোগ সম্ভব করে তুলেছে। সেই গবেষণা থেকে উঠে আসছে যে জটিল মানচিত্র, তা প্রমাণ করে সৃষ্টিশীল কবিমনের মস্তিষ্কের ব্লুপ্রিন্ট মোটেই সহজ নয়। কবিতাসৃষ্টির বেশ কিছু ধাপ অবচেতনেই মেনে চলে মানুষের মন। কবিতা সৃষ্টির প্রাথমিক শর্ত হলো যোগ। একটি দৃশ্য থেকে একটি দর্শনের যোগ, একটি অভিজ্ঞতার থেকে অনুভূতি ও কল্পনার যোগ। মানুষের ঘিলুর যে অঞ্চল এটি সম্ভব করে তোলে, তার অবস্থান মাথার একদম ত্রিনয়নের জায়গায় লুকিয়ে থাকা ছোট একটি অঞ্চল, যার নাম ফ্রন্টাল করটেক্স। সেই সংশ্লেষের সেই প্রথম ধাপ প্রস্তুতির। এই প্রস্তুতিপর্বে কবি তাঁর কবিতার রূপরেখা,ভাবনাচয়ন,দৃশ্যকল্প  বেছে নেন তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির সঙ্গে নিজস্ব কল্পনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে। এরপরের ধাপ অন্তরসংশ্লেষ বা ইনক্যুবেশন। এই সময়ে কবি কবিতা লেখেন। কিন্তু তা লেখা হয় তার মনে। এই সময় কারো ক্ষেত্রে এগারো দিন,কারো এগারো মাস,কারো বা এগারো বছর। রিলকে যেমন ড্যুইনো এলিজি লেখার আগে নিয়ে নিয়েছিলেন এগারো বছর। এই সময়ে কবির মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যামপাস কিন্তু প্রবল সক্রিয়তার সঙ্গে কাজ করতে থাকে। মস্তিষ্কের উপরিভাগের প্রিফ্রন্টাল করটেক্স, পাশের টেম্পোরাল করটেক্স থেকে আসতে থাকে তথ্য। কল্পনা আসে লিম্বিক প্রক্রিয়া থেকেও। লিম্বিক অঞ্চল হলো আবেগপ্রবণতার স্থান। কবি লিখে চলেন পাতার পর পাতা। কিন্তু কলম পড়ে থাকে একপাশে। সাদা হয়ে থাকে পাতা।যিনি কবিতা লেখেন,তিনি জানেন,প্রকৃত কবিতা নির্মাণ করা যায় না। তা হয় স্বতঃস্ফূর্ত। আরকিমিডিসের মতো হঠাৎই চলে আসে ‘ইউরেকা’ হয়ে!

                  এরপরের ধাপ আলোকপাতের। মস্তিষ্কের সেই সংশ্লেষ ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেবার চেষ্টা। সক্রিয় হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের ভাষার কলকারখানা। কোন ছন্দ,কোন শব্দ,কোন গঠন ব্যবহৃত হবে কবিতায়, কবিমন ভাবতে থাকে। এই সময়ে সক্রিয় থাকা মস্তিষ্কাঞ্চল হলো বেসাল গ্যাঙলিয়া। তৈরি হয় চিরকুট। পছন্দ হয় না। ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আবার নতুন কাগজ। আবার ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। হঠাৎ ঘটে যায় আলোকপাত। ইউরেকা!

               শেষমেশ যাচাই করে নেওয়ার স্তর। যিনি প্রকৃত কবি,তিনি কখনোই এই স্তরে না পা রেখে কবিতাকে চুড়ান্ত করেন না। এই স্তর পর্যবেক্ষণের। নিজের কবিতাকে অপরিচিতের মতো করে পড়বার চেষ্টা করা। বিশ্লেষকের চোখে কাটাছেঁড়া করা। প্রয়োজনীয় শব্দ রেখে অপ্রয়োজনীয় শব্দ বাদ দিয়ে দেওয়া। এই প্রক্রিয়াতে শুধু কল্পনা বা আবেগ নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক যুক্তিগ্রাহ্যতার। কবিমনের এই প্রক্রিয়া সম্ভব করে তোলে মস্তিষ্কের সাদা অংশ বা হোয়াইট ম্যাটার। সেখানে যতো পারস্পরিক যোগাযোগ, কবিতা ততোটাই উৎকৃষ্ট।

             কবির কবিমন যে জটিল একথা অজানা নয়।কিন্তু তার যে পদক্ষেপ আছে,সংশ্লেষ আছে,বিন্যাস আছে,উত্তরণ আছে তার মস্তিষ্কের ভিতরেই,তা আধুনিক মনোবিজ্ঞান ক্রমশ প্রমাণ করছে। এই বিষয়ে আরও আলোকপাত করলে কে বলতে পারে একদিন সুপারকম্প্যুটার আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যন্ত্রও লিখতে পারবে কবিতা। কিন্তু সত্যিই কী পারবে? “চিরসখা হে, ছেড়ো না মোরে” লিখতে পারবে কি? তাই সমাপ্তিতে ফিরে আসি আবার প্রবেশকেই। সহজ কথা যায় না বলা সহজে।

আরও পড়ুন...