Hello Testing Bangla Kobita

Advertisement

1st Year | 10th Issue

রবিবার, ২৮শে চৈত্র ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th April 2021

পা ঠ  প্র তি ক্রি য়া 

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’ : শঙ্খ ঘোষ

এক জায়গায় কবি অরুণ কুমার সরকার বলেছেন যে, কবি মাত্রেই এক হিসেবে সমাজ সচেতন, তবে কেউ সরাসরি বা কেউ অন্যভাবে। কারোর লেখায় যেমন থাকে অদ্ভুত ঋজুতা, কেউ বা সেখানে এক আপাত ক্ষিণ্ণ প্রবাহ বহন করে চলেন। জয় গোস্বামী লিখেছেন, কবিতা এক আকস্মিকের খেলা। কিন্তু কী থাকে সেই আকস্মিকতায়? কবি বা স্রষ্টা (উপনিষদ) কী পান তাঁর সৃষ্টি থেকে? কী পরিচয়ই বা রাখেন কবি? নেহাতই কিছু শব্দ, যাতে ছন্দ-লয়ের রজ্জুপাশ দিয়ে বেঁধেই কি কবিতা হয়! আর হলেই বা কী? তাই কি কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা পাবে? কতজন শ্রোতা বা পাঠকের প্রয়োজন একজন কবির? কত মানুষ শুনলে তাকে কবিতা বলা যায়? এতসব অযুত নিযুত প্রশ্ন কবির মাথায় নিয়ত‌ই ঘোরাটা স্বাভাবিক; কারণ সাধারণ তেল নুন লকড়ির গল্প থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর কালি-কলম নতুন কিছু সৃষ্টি করে ফেলতে চাওয়ার এক স্ফুট বা অস্ফুট বাসনার কারখানাই তো কবির মগজ। তাঁর সামাজিক অবস্থান সেখানে এক দ্যোতনা সৃষ্টি করেই।

 

        এইসব রাশি রাশি প্রশ্নের বাণ ফেলে যে প্রশ্নটি চির বিতর্কিত এক শাশ্বত অবয়ব পেতে চায় তা হলো নিঃসন্দেহে হলো ‘কলাকৈবল্যবাদ’‌।  কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উদ্ভাবিত এই শব্দবন্ধটিকে কেউই এড়িয়ে যেতে পারেন না। শিল্প কি শুধুই শিল্পের স্বার্থে , তার কি কোনো সামাজিক দায়িত্ব নেই! অর্থাৎ আমরা আবার ফিরে গেলাম এই লেখার একেবারে প্রথম কথাটিতে – কবি অরুণ কুমার সরকারের চেতনায়। আমাদের বর্তমান পাঠ চর্চায় এইসব প্রশ্নের‌ই এক বিন্যস্ত উত্তর আমরা যে গ্রন্থে ফিরে পাবো তাকে নিয়েই বর্তমান চর্যা। ব‌ইটির নাম ‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’ এবং রচয়িতা শ্রী শঙ্খ ঘোষ।

 

         যে লেখকের নাম আমরা একেবারে শেষে উল্লেখ করলাম তাঁর কৃতিত্বের বিবরণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। কৃতবিদ্য এই মানুষটি আজীবন কবিতার সঙ্গে অধ্যাপনা, প্রতিবাদের সঙ্গে গবেষণার এক ঋজু অক্ষরমালা হয়ে শুধু ছাত্রছাত্রী বা পাঠক সমাজেই নয়, বরং বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্য অঙ্গনের ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেয়েছেন। তাই চরিত্রপূজার বদলে তাঁর এই সৃষ্টিকে আমরা একটা পাথেয় করে আমাদের কাব্য ব্যাকরণ স্বরূপ গ্রন্থের মর্মবাণীকে তুলে আনতে চাই।

 

          কবি পরিচিতিতে তাঁর যে সত্ত্বাটি অনুল্লেখ্য রয়ে গেলো তা হলো তাঁর প্রাবন্ধিক ধারা, যার বৈশিষ্ট্যটি শুরুতেই একেবারে বলে নেওয়া ভালো। তাঁর গদ্যের সারল্য ও গতিময়তা পাঠককে পাঠ ও তন্ময়তায় আকৃষ্ট করে রাখবে। ফলত, পাঠ সরল ও‌ সাধু হলে যেকোনো স্তরের পাঠকের ক্ষেত্রেই বিষয়ের মূল রস অনুধাবনে বাধা থাকে না ; গদ্যের সাবলীলতায় তাঁর বৈদগ্ধ্য ও ভাষাজ্ঞান অবশ্যই প্রতিফলিত হয়। লেখক তাঁর অন্যান্য গদ্যের মতোই বর্তমান রচনাটিকেও সেই উচ্চতর স্থান থেকে বিচ্যুত করেন নি।

 

          যেকোনো কবির‌ই কবিতা চর্চার সঙ্গে সঙ্গে দায় বর্তায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কবিতার সংজ্ঞা নিরূপণ, যা কাব্যধারাকে সদা প্রবহমান রাখবে। জর্জ অর‌ওয়েল এই রচনার ক্ষেত্রে যে চারটি কারণ তুলে এনেছেন তাঁর ‘হোয়াই আই রাইট’ প্রবন্ধে, সেগুলি হলো – প্রথম, লেখকের বিশুদ্ধ অহংভাব। দ্বিতীয়, নান্দনিক আগ্রহ। তৃতীয়, ঐতিহাসিক প্রণোদনা। চতুর্থ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আবার অন্যদিকে গুস্তাভ প্লবেয়র বলেন “Writing is a dog’s life, but the only life worth living”। হ্যাঁ, কবিতা রচনা কবিকে তাড়িত করে তাঁর জীবনবোধের প্রকাশ ঘটাতে। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি কবিতাকে তাঁর লড়াইয়ের অস্ত্র শানের পাথর করে তুলতে চেয়েছিলেন। শঙ্খ ঘোষের বর্তমান রচনাটি পাঠ করলে সেই বোধকেই শাণিত করা যায়, আর পাওয়া যায় এক প্রত্যয়ী মানুষ যা কবিকে করবে দর্পিত ও উদাসীন। তবে সেই দর্প কখনোই অন্যকে ছোটো করার জন্য নয়, বরং নিজস্বতা তৈরির ভাবনা আর উদাসীনতা, মানে তুচ্ছতার থেকে বৃহতে মিশে যাওয়ার চিহ্ন।

 

          আলোচ্য গ্রন্থটিকে বিষয়বস্তু ও আলোচনার পরিধি অনুযায়ী লেখক সাতটি প্রবন্ধে বিভক্ত করেছেন। একেবারে প্রথম প্রবন্ধের নাম বিশেষণহীন কবিতা যেখানে এক স্বতন্ত্র দ্রাঘিমা নির্মাণ করে আমাদের দেখানো হয়েছে কবির কোনো দশক বা কালের ব্যাপ্তিতে সীমায়িত থাকার বা গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছে তাঁর মৌলিকতাকে ক্ষুণ্ণ করে। কেন কবির বিশেষ কালের (পড়ুন সদম্ভ অমুক দশকের) বলে নিজেকে দেগে দেওয়ার তাগিদ থাকবে? উপনিষদ কবিকে কালের ঊর্দ্ধে তুলে ধরেছে। সেখানে যখন‌ই কোনো বিশেষ দশকে কবি নিজেকে বাঁধেন, লেখকের কথায় তখন‌ই তো তিনি খাটো করেন কবিতার বক্তব্যকে। বর্তমানে সামাজিক বিন্যাস-আর্থিক দুর্দশার যে ভয়াবহ ছবি উঠে আসে, কবিরা নিজেদের কোনো বিশেষ গোষ্ঠী অর্থাৎ আধুনিক, উত্তর আধুনিক ইত্যাদিতে ভাগ করে ‘কবিতাকে আপডেট’ করার মহতী যজ্ঞে সামিল হয়ে এই সবকিছু এলোমেলো করে দিতে চাইছেন। এর‌ই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখক এই সীমায়নের সমালোচনা করেন। কবিতা কোনো কিছুকে ভেবে নিয়ে নির্মিত হয় না, সেই চেষ্টা করলে তাকে আদৌ সার্থকতা দেওয়া যায় কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই। কবির দৃষ্টি যেন সেদিকে সতর্ক থাকে। অর্থাৎ যা লিখছি তারপরও যেন কোনো বিশেষ ঘরানাকে নেতৃত্বের পদে তুলে আনার বাতুল প্রচেষ্টা না হয়। কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর ভাষাকে ব্যবহার করে বলা যায় “… কোনো কবি যদি এক‌ই বিষয় সারাজীবন পুনরুক্তি করেন, তাঁর যদি কোনো উত্তরণ না হয়, তা যেমন দূষনীয়, আবার কবি যদি ‘চরিত্রবান’ না হন, তাঁর যদি নিজস্ব কোনো পৃথিবী তৈরি না হয়ে ওঠে, তাঁর গলার স্বর যদি সহজেই না চেনা যায়, তা-ও এক‌ইভাবে সমালোচনার যোগ্য”। এই অনুভূতির প্রকাশ নিজস্বতা সৃষ্টি, একমাত্র বৃত্তহীনভাবে নিজেকে তুলে ধরা। নিজের কলমের দাগকে প্রকাশ করার মাধ্যমেই তা সম্ভব, তাই লেখক আমাদের জানান। তৃতীয় যে বিষয়টি তা হলো গোষ্ঠীর বাইরে নিজস্বতা তবে কী, কীই বা সেই মহামন্ত্র যা কবিতায় ধ্বনিত হলেই তার সার্থকতা? উত্তর দিয়েছেন তিনি নিজেই। কবির মহামন্ত্র হলো বেঁচে থাকা, ‘‘জীবন ছাড়িয়া যাসনে মোরে” — এই হলো জীবনবোধ এবং এই জীবনবোধ বা জীবনীশক্তি আসে কেবলমাত্র লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে, যে কথা আমরা পাই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত কবি এজেকিয়েল মার্তিনেথ এস্ত্রাদার বোধে “All his work is a battle against oppression, against the privileges and rivalries that separate human being of whatever condition”. অর্থাৎ নৈরাজ্য নয়, শিকলভাঙা হাতের খোঁজ করেছেন লেখক কবিতায়। এই তত্ত্ববিন্যাসে কোনো নির্মোক বৈরাগ্য নেই, যেমন নেই জোর করে মিলিয়ে দেবার চালিয়াতি। সত্যের খোঁজ চলুক কবিতায়। এই তার আলয়। তাই সহজেই তিনি বলতে পেরেছেন, “… কবিতার হয়তো তত্ত্ব হতে পারে, কিন্তু তত্ত্ব দিয়ে কবিতা হয় না”।

 

          দ্বিতীয় অধ্যায়টিকে তিনি সংযোগের কবিতা হিসেবে নামকরণ করেছেন। এখানে তিনি তুলে এনেছেন অন্য এক বাস্তবতাকে, তা হলো কবির সমাজবোধ অর্থাৎ কবিকে তিনি নানান অভিজ্ঞানে দেখলেও কবিতার সঙ্গে তারুণ্যের সাধারণ সম্পর্ক যে ক্ষয়িষ্ণুতা ও বীতস্পৃহা, সেটি তাঁর চোখে অবলীলায় ধরা পড়েছে। কবিকে তিনি ‘সিসমোগ্রাফ’ যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, যেকোনো সমস্যার মাত্রা পরিমাপ করেন কবি, তার প্রকাশ হয় তাঁর লেখনীতে। বিভাজিত সমাজের মৌল হলো অসাম্য ও অপ্রাপ্তি। ক্ষয়িষ্ণু সমাজ আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের জায়গায় তুলে ধরে বিচ্ছিন্নতা, যার বহু উল্লেখ পাই বর্তমান লেখকের লেখায়। এখানেই বিদগ্ধ লেখক রশি ধরেছেন। অর্থাৎ যে ক্ষয় হতাশ করেছে তারুণ্যকে, তিনি হাতে কলম নিয়েছেন নিজের ঘৃণা ও অতুষ্টিকে পাথেয় করে সেই হতাশার কারণ অনুসন্ধানে। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন কবির বিচ্ছিন্নতাকে। যেমন লিখেছেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ঋত্বিক যখন মর্গে শুয়েছিলেন’ কবিতায়–

 

“আত্মহত্যার নিয়ম, তারা শিখেছে এই সময়

জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার…

এই তো সময়

ডাকিনীদের খেয়াপারের…”

 

        এই বিচ্ছিন্নতাকেই দূর করে জীবনের কাছে ফিরে যেতে বলেছেন গ্রন্থকার। তিনি বলেন “এক‌ই মানুষ এক‌ই সঙ্গে ব্যক্তিগত আর সামাজিক হতে পারেন, হ‌ওয়া ভালো। কিন্তু একজন মানুষ এক‌ই সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিক আর সামাজিক হতে পারে না”। অর্থাৎ কিনা কবির ভবিতব্য হবে সামাজিক বোধবিত্ত ও আত্মবোধ — স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁকে বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংসের মুখোমুখি করে, আর তা সম্ভব কবি যদি দৃষ্টান্ত হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেন, খুঁজে নেন তাঁর আত্মশক্তি। প্রশ্ন জাগে, কলম নিজে দার্ঢ্যকে কি দীর্ঘ যোজন পথ এগিয়ে দিতে পারে? শুধু রবীন্দ্রনাথেই কি সব উত্তর মিলবে? পাশাপাশি তিনি আমাদের গুরুজনের মতোই যে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আধুনিকতা বিচ্ছিন্নতার নামান্তর নয়, বরং বিচ্ছিন্নতা বিনাশের অন্য নাম। তাঁর নিজের কাব্যগ্রন্থ ‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’-তে এই ধারণাই স্পষ্ট।

 

       গত শতকের‌ই আটের দশকে লেখা বর্তমান গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের নাম থেকেই স্পষ্ট হয় তাঁর বিষয় — ছন্দকথা। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কবিতার ক্লাস’- এ ছন্দ নিয়ে যে নরম ও স্বকীয় রচনা করে তরুণ বাঙালি কবিকুলকে ছান্দসিক করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করেই বর্তমান লেখক বলেছেন যে, সমস্ত কবিতাতেই ছন্দের বাস। কথোপকথনের ঢঙে রচিত এই অধ্যায়টি তিনি নিগূঢ় নিয়মের বাইরে গিয়ে বিগত দেড়শো বছরের কবিতা প্রবাহে ছন্দের অবস্থান বলতে গিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে তুলে এনেছেন- “কিন্তু কথা বলবার চালের মধ্যেই ছন্দ লুকানো আছে, চলমান সেই ধ্বনি-স্রোতের মধ্যেই যে প্যাটার্ন করা যায় এইটেই তো আধুনিকতার একটা বড় শিক্ষা। আপনারা লক্ষ্য করেন নি যে মাইকেল থেকে বস্তুত সেই চেষ্টাই হয় একাল পর্যন্ত। মাইকেল, গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ”। লেখক আমাদের আরো জানান সুধীন্দ্রনাথ তাঁর ‘অর্কেষ্ট্রা’ নামক সুদীর্ঘ কবিতায় নিজেই কিভাবে ছন্দপতন ঘটিয়ে আমাদের সামনে উদাহরণ তুলে দিয়েছেন। মনে পড়ে কবি ভাস্কর চক্রবর্তী এক জায়গায় ছদ্ম ছন্দপ্রেমের বিরুদ্ধে জবানী দেন, কবিতার জন্য ছন্দ। ছন্দের জন্য কবিতা নয়।

 

         পরবর্তী পর্যায়ের নাম লেখক দিয়েছেন হাল্কা একটা আলাপ। পূর্ববর্তী ঢঙেই নেহাত সরল কথোপকথনের মাধ্যমে কবিতার মূল বা ধ্রুবপদকে তিনি এখানে তুলে এনেছেন। তাঁর প্রত্যয় কবিতায়; কেবল কবিতায়। অর্থাৎ, কবি কোনো বাহ্যিকতায়, যেমন প্রকাশক, সমালোচক বা পাঠকের তৎপরতায় কিংবা পৃষ্ঠপোষকতায় কাব্যিক ধারায় তার মোহনা খুঁজে পাবেনা, তাঁকে হতে হবে নির্মোহ। কিন্তু আমরা যদি কালান্তরে দেখি, যে কবিতা রাজানুগ্রহ পায় তা কিভাবে নির্মম হতে পারে! বিপ্রতীপে ছোটো পত্রিকা বা স্ব-উদ্যোগে প্রকাশিত লেখা যেহেতু দ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, তাই সে পড়ে থাকে আড়ালে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি (কবি বা স্রষ্টা) এই একাকিত্বকে কতদিন ও কিভাবে সামাজিক সমস্যার সঙ্গে জুড়ে নিয়ে লিখে যেতে পারেন? এখানেই বোধহয় মায়াকোভস্কির লেখনী নির্দেশকে নজরে আনতে হবে। ‘সূত্র তৈরি করার প্রণালী কিংবা কবিতা সম্পর্কিত নিয়মাবলীর লক্ষ্য নির্ধারিত হয় শ্রেণী অবস্থান এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনের ভিত্তি থেকে’। অর্থাৎ কবিতাকে তিনি সরাসরি শ্রেণীর লড়াইয়ের হাতিয়ার বা মাধ্যম করতে চাইলেন, যেমন চেয়েছেন ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু এই ‘বাহিরানা’ কি কবিতার বর্ম হিসাবে আদৌ সার্থকতা পেতে পারে সে তর্ক‌ও কিন্তু উঠবে।

 

         পরবর্তী পর্বটি বিনীত অহংকার নামে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ যার রচনাকাল  সবচেয়ে অর্বাচীন ; নয়ের দশকের একেবারে শেষ লগ্নে। পর্বটি তাঁর নিজগুণে অভিনবত্ব ও দর্শনে অনন্যতা পেয়েছে। সংকলককে এখানে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ পূর্ববর্তী প্রবন্ধের এই নৈপুণ্যময় বাঁধন সৃষ্টি করতেই হয়তো পরবর্তী এই প্রবন্ধটির এখানে সার্থক অবতারণা করা হলো। ঋজু উচ্চারণে আত্মশক্তিকে জাগরণের নিদান দিলেন এখানে লেখক কাব্য অনুগামীকে। নিজের ওপর আস্থা রাখতে লেখক বারবার রবীন্দ্রনাথকেই আশ্রয় করেছেন। তাঁর কথনীতেও তাই যেন তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন অসচেতনভাবে এবং ‘অংশত রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি’ হিসেবেই।

 

        তিনি ‘অহং’ কে ‘নঙ্’ অর্থে নয় বরং তাকে চরিত্রের সম্পদ করে ‘বিনয়’-এর আহ্বান করেছেন। আর বাংলা সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছোটো কাগজ ও তার কলমচিদের জন্য নিদান রেখেছেন- ভ্রষ্টের প্রতি আত্মতা ও ঔদাসীন্য। এর মধ্যেকার আমিত্ব যেন চিত্তকে ভয়শূন্য করে, বায়বীয় নয়। এই ধারণা নিঃসন্দেহে পাঠককে বাধ্য করবে লেখকের দর্শনে শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার আশ্রয় খোঁজার তাড়নাকে উৎসাহ দিতে।

 

        কবিতা লেখার জন্য যা প্রয়োজন তা হলো কবিতা পাঠ। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন, বড় চুল, ঢোলা জামা কবিতা লেখার শর্ত হতে পারে না। তাহলে শর্ত কী? কবিতা পাঠ; আরও আরও বেশি কবিতাকে বোঝা আর বোঝার সঙ্গে সঙ্গে পড়া। বর্তমান গ্রন্থের শিরোনাম‌ই হলো তাই ‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’। অর্থাৎ এই অধ্যায়টি নির্মিত হয়েছে কবিতা পাঠের আলেখ্যে। ক্ষীণ কলেবর এই প্রবন্ধে আরও কিছু মৌলিক সমস্যা ও তার অপসারণের রাস্তা দেখিয়েছেন লেখক। ইতিহাস চর্চার মুখ্য কারণ হলো অতীতের আয়না ও ভবিষ্যতের দ্রষ্টাকে বর্তমানের ভিত্তিতে পথ দেখানো। এই অংশে লেখক কবিতার উদ্দেশ্যকেও সেখানেই তুলে এনেছেন। ফলে কবিতাকে ইতিহাস ও সামাজিক অক্ষের অক্ষরবৃত্তে আনতেই লেখকের প্রয়াস। এখানে দ্বিতীয় যে বিষয়টি দেখানো হয়েছে তা হলো কবিতা পাঠে সাধারণের অনীহা, যার কারণ স্পষ্টত‌ই কবিতার প্রতীকধর্মিতা বা শব্দের গূঢ় নির্দেশ। এই প্রজন্মের শিক্ষিত আধুনিক-আধুনিকাদের একাংশের মুখে প্রায়শ‌ই শোনা যায় “অত ভাবার সময় নেই”। এই “অত ভাবা” মানেই হলো চিন্তার দৈন্য, তবে তার দায় সেই মানুষ বা মানুষীর নয়। এই দায় অবশ্যই আমাদের জীবনযাত্রার। বেঁচে থাকার জটিল গলিপথের গোলকধাঁধায় সেনাপতি ক্লান্ত। সে ভাবে না, ভাবতে শিখবেও না। আপাত সহজ‌ই তার আশ্রয়। কবিতা কিন্তু চেতনায় ধার আনে অর্থাৎ চৈতন্য ও সমবেদনাই কাব্যের অক্ষরে ঝলসে ওঠে। কবিতা প্রচলিতকে প্রশ্ন করতে শেখায়, তাকে গভীরে নিয়ে যায় কিন্তু ‘যে মেয়েটি ইংরেজি ভাষা শিখে শপিং মলের কাজে যোগ দেয়/ তার জন্য প্রেমিকের বড় প্রয়োজন’, এ কবিতার পংক্তিতে এক রূঢ় বাস্তব ধরা দিলে তাকে ধাবন করতে, তার দুর্বোধ্যতাকে নিজের পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে মেলাতে সব কালেই সমকালীন সমাজের একটা বড়ো অংশ ব্যর্থ হয়েছে। তাই শুধুমাত্র আধুনিক যুগেই নয় রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ বা বিনয়, সকলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দুর্বোধ্যতার। প্রসঙ্গত দুটি কথা আসে, প্রথম, যেকোনো চর্চার গভীরত্ব‌ই তো কাটতে পারে জটিলতার তন্তুজাল। সেখানে কবিতা কেন তার পাঠকের কাছে নিজস্ব অবস্থানের গৎ অনুযায়ী নিজস্ব অর্থ হিসেবে একক হয়ে দাঁড়াবে না, কেন পাঠক চিরন্তন একটি অর্থ অনুসরণ করেই মূল পাঠটিকে নিয়ে ক্ষান্ত থাকবেন? বনলতা সেন কেন জীবনানন্দেই আবদ্ধ থাকবেন? সে পাঠকের স্বপ্নচারিণী অথবা তার চেতনা কেন হবে না? এটা না ধরতে পারলেই তো কবিতা সুদূরের হাতছানি। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সমস্ত সচেতন (সমাজ ও আত্ম) মানুষ কি কবিতা পাঠ বা লেখালিখি করেন? বিপরীতে যারাই লিখছেন বা লেখেন তাদের সবার রচনাই কি কবিতা হয় — তারা সকলেই কি ভাবেন? তাহলে কবি আব্দুল ওয়াহাব আল-বায়তিকে কেন বলতে হয় স্বক্ষোভে- “নির্বাসন আমার স্বদেশ/ শব্দরাই আমার নির্বাসন”?  পাঠক এখানে ভাবনার খোরাক পাবেন নিঃসন্দেহে।

 

        একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আমরা স্মরণ করবো বাংলা সাহিত্যের অনন্য পুরুষ কমলকুমার মজুমদারকে। তিনি তাঁর পাঠক সংখ্যা চেয়েছিলেন মাত্র পঁচিশ (মতান্তরে সতেরো জন)। অর্থাৎ অধিক সন্ন্যাসীতে যে গাজন নষ্ট করে সেই ধারণা সাহিত্যেও সত্য। এই বক্রতায় কিন্তু তলিয়ে দেখলে বাজারী মনোভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও সাহিত্যমূল্যের মূল্যায়নের তাগিদ স্পষ্ট। বর্তমান প্রবন্ধে অনেকটা এই মন্তব্যের‌ই ছায়া পড়েছে, যার নামকরণ লেখক করেছেন কবি, পাঠক ও শ্রোতা।

 

        আধিক্য, খ্যাতির প্রতি দুর্মর লোভ তাৎক্ষণিকতার সঙ্গে ব্যাকুলতার বশবর্তী করে কবিকে। এই খ্যাতির দাসত্ব করতে গিয়ে মনোরঞ্জকে পরিণত হন। মনে পড়ে বাংলাদেশের এক খ্যাতনামা কবির উক্তি, যিনি সুদীর্ঘ প্রায় এক দশক কাল কোনো গ্রন্থ প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে বলেছিলেন পূর্ববর্তী গ্রন্থের পর্যায়ে যদি তা না পৌঁছায় তবে তা কবি মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করবে। এই সংকোচের বিহ্বলতাকেই ধিক্কার জানান বর্তমান লেখক। বৃহতের সঙ্গে মিলিত হ‌ওয়ার অভিমন্ত্র হলো জীবনবোধ আর এই অভিজ্ঞান‌ই যেন আমাদের একেবারে প্রথম অধ্যায়ের মর্মকথায় পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। গোটা গ্রন্থটিকে একটি নিপুণ বাঁধনে বেঁধে পাঠক তথা সম্ভাব্য কবিকে সূত্রবদ্ধ করে সরল‌ ও সুদীর্ঘ মননের পথ দেখান লেখক।

 

        একেবারে শেষ পর্বে জানানো উচিত এই দীর্ঘ আলোচনা যে গ্রন্থকে উপাত্ত করে, তার রসদ হলো ‘কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ কমিটি’ আয়োজিত সভায় এক বক্তৃতার পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ, যা লেখক আমাদের জানিয়েছেন গ্রন্থের ভূমিকাতেই। আর এই প্রসঙ্গেই জানিয়ে রাখা উচিত কাকতালীয়ভাবে হলেও বর্তমান গ্রন্থটি পাঠ ও আলোচনার সৌভাগ্য হলো কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষে পৌঁছে। রচনাটি নিঃসন্দেহে পাঠকের অভীপ্সা পূর্ণ করে কবিতার আঙিনাকে কুসুমিত করবে ও সুস্পষ্ট কুয়াশামুক্ত কাব্যপথ রচনা করবে। এখানেই গ্রন্থটির সার্থকতা।

 

কবিতা লেখা কবিতা পড়া  শঙ্খ ঘোষ  |  সপ্তর্ষি প্রকাশন

আরও পড়ুন...