Hello Testing Bangla Kobita

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

দী প্তি প্র কা শ   দে

যা-কিছু অতীত, যা-কিছু অপস্রিয়মাণ...

চাকরি এমন এক আতরের শিশি, যার মুখে আজন্ম বাধ্যতার ছিপি গোঁজা। ফলে সে অনেক কিছুকেই গিলে নেয়। অন্তত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। পুজোও তেমনই একটা বিষয়, যা সে নিঃশব্দে গিলে নিয়েছে কখন। টের পাইনি। পেলে এ-লেখা আর একটু দীর্ঘ হতে পারত। স্মৃতিতে বেশি চাপ দিলে রক্তক্ষরণ হয়। তবু বিষয় যখন পুজো, তখন সে-রক্তকে দেবীর নৈবেদ্য ভেবে নেওয়া যেতে পারে। তাই চাপ দিলাম একটু। স্মৃতির বেলুন ফেটে বেরিয়ে পড়ল বিসর্জিত প্রতিমার মুখ। 

আসলে, ছেলেবেলায় আমার পুজো শুরু হত বিসর্জন থেকেই। বাড়ির পাশেই ছিল মস্ত এক পুকুর। পাড়ার জেঠু-কাকুরা নাচতে নাচতে সেখানে প্রতিমা ভাসিয়ে দিয়ে যেত। সকলের মনখারাপ। আমার আনন্দ! পুকুর থেকে তুলে আনতাম বিসর্জন হয়ে যাওয়া দেব-দেবীর ভেজা কাঠামো, জল ছপছপে কাপড়চোপড়। তাই নিয়ে শুরু হত রি-কনস্ট্রাকশন। এমন একটা নেশা কীভাবে যে কেটে গেল! নিজেকেই ধিক্কার দিই। এখন আমার ছেলে পেয়েছে সে-নেশা। আমি ওর কচি কচি আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। নিজের ছেলেবেলাকে দেখতে পাই।    

আমরা যারা ল্যান্ডলাইন আর মোবাইল ফোনের মধ্যবর্তী সময়ে বড় হয়েছি, তাদের চোখে নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়েছে পুজোর চরিত্রগত একটা বিশাল পরিবর্তন। বিশেষত দুর্গাপুজোর। হয়তো সেই কারণেই ‘পুজো’ শব্দটা এখন আর তেমনভাবে টানে না, অন্তত আমাকে। ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে থাকি। শেষ কবে ঠাকুর দেখতে গেছি, মনে পড়ে না। আসলে ইচ্ছেও করে না। পুজো মানে এখন স্পেশাল পেজ, আর চারদিনের নিরবচ্ছিন্ন ছুটি। 

একসময় অবশ্য ‘পুজো’ শব্দটা বিশেষ অর্থবহন করত। বিশেষত সর্বজনীন পুজো। ছেলেবেলায় দেখেছি, গ্রামাঞ্চলে কিংবা মফস্‌সলে হাতে গোনা কয়েকটা পুজো হচ্ছে। স্থানীয় কোনও শিল্পীই প্রতিমা গড়ে দিতেন। আর মণ্ডপ ছিল সমবেত প্রচেষ্টার ফসল। গর্ত খুঁড়ে বাঁশ গাড়া থেকে ডেকরেশন, সবই হত হাতে হাতে। বিলবই ছাপিয়ে বাড়ি বাড়ি চাঁদা তোলা হত, তারপর ভাঁড়ারে যেটুকু টান পড়ত, উঠে আসত সুভেনির থেকে। পার্টি ছিল না, পঞ্চাশ হাজারি বদান্যতা ছিল না। ফলে মণ্ডপ হত সাদামাটা। পুজো-প্রাঙ্গণের পরিচিত সনাতন আবহটুকু মুছে যায়নি তখনও। ভাগাভাগি হয়নি দর্শনার্থীও। এক প্রতিমা আর একই মণ্ডপ বারবার দেখেও আশ মিটত না। নব্বইয়ের শুরু থেকে ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। ক্লাব-সংস্কৃতি আর মিডিয়ার হাত ধরে আমরা ক্রমশ পরিচিত হলাম থিম, বিগবাজেট, স্পনসর, এসব শব্দবন্ধের সঙ্গে। সমাজজীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ায় পুজোতেও তার প্রভাব পড়ল। দর্শক টানতে অভিনবত্বের খেলায় মাতলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, বাঁশ-কাপড়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। এলো প্লাই, থার্মোকল সহ ব্যবহারিক জীবনের যাবতীয় সম্ভার। যদিও নব্বইয়ের গোড়ায় এ-পরিবর্তনটা ছিল মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক। তখনও দেব-দেবীর গায়ে সেভাবে হাত পড়েনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাও পড়ল। থিমের জোয়ারে দেবী তাঁর মৃন্ময়ী সত্তা বিসর্জন দিলেন। উৎসবের পালে ঢুকে পড়ল কর্পোরেট বাতাস। শুরু হল থিম, পাল্টা থিম। চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমাদের। 

কিন্তু মণ্ডপকে দর্শনযোগ্য করলেই তো হবে না, খরচ জোগাবে কে? উদ্যোক্তাদের এই অসহায় অবস্থা জন্ম দিল নতুন এক অবতারের, যার নাম স্পনসর। ভক্তিগদগদ বাঙালির আবেগকে মূলধন করে ব্যবসা বাড়াতে মাঠে নেমে পড়ল বহুজাতিক সংস্থাগুলো। এতে উদ্যোক্তাদের মুখেও হাসি ফুটল, মধ্যবিত্ত বাঙালিও চাঁদা-কেন্দ্রিক জুলুমবাজি থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল! 

কিন্তু আমি বাঁচলাম না। পুজোর মোহ কেটে গেল আমার! হয়তো সারা জীবনের জন্যই। পুজো এলেই পালিয়ে বেড়াতে শুরু করলাম আমি। পেশাগত তাগিদে থিম সংস্কৃতির মৌতাতে অন্যকে মজিয়ে রাখাই কাজ, কিন্তু নিজে সর্বদাই মিইয়ে থাকি। আর মনখারাপ হয়। মনে হয় চলমান সময়টা আসলে আমার শত্রু। মাথার উপর মোহময় একটা আকাশ দিয়েছে, কিন্তু তাতে ধ্রুবতারা-সপ্তর্ষিমণ্ডলের দেখা মেলে না। যা-কিছু অতীত, যা-কিছু অপস্রিয়মাণ, তাকেই মনে হয় সুন্দর। 

মণ্ডপে মণ্ডপে আজ জনজোয়ার। মায়াবি আলোর নিচে কত অসংখ্য মানুষ। কিন্তু এত মানুষের মাঝেও গ্রামীণ প্রশান্তিমাখা মুখগুলো খুঁজে পাই না আর। চড়া ডিওড্রেন্ট আর ব্রাইডাল মেকাপের গন্ধে ধূপ-ধুনোর পবিত্র সুবাসটাই কোথায় যেন উবে গিয়েছে। বছর পনেরো আগেও বিসর্জনের বাজনা বাজলে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত। জলে যাওয়ার আগে দেবীর চোখেও জল দেখেছি কতবার! এখন আর দেখি না। 

আসলে ভাসানের সঙ্গে মিশে আছে যে চিরকালীন বিচ্ছেদ, সেটা অনুভবের জন্যও তো একটা নরম মন দরকার। সেই মন কি আর আছে!

আরও পড়ুন...