Hello Testing Bangla Kobita

গ ল্প

ক ম লে শ   কু মা র

ক্যানভাস

দিগন্তর কথা

সেদিনও তো এরকমই সন্ধ্যা ছিল মহুল। ভিজে গুঁড়ি-গুঁড়ি গোলাপি মেঘেরা ঝুপ করে নেমে আসত পৃথিবীতে। তোমার আর আমার মধ্যে খেলা করে বেড়াত কত নিশ্চুপ সংলাপ। আমি থমকে যেতাম জ্যাম আর অট্টালিকা ঘেরা তোমার আস্ত শহরে। নিয়ন রঙের আলোয় ঘেরা তোমার শহর! সে কোন প্রাচীন যুগের কথা ভাবো। তখন আজকের মতো তির বেগে পৃথিবীতে নেমে আসত না মহাজাগতিক রশ্মি। এত উত্তাপ ছিল না পৃথিবীর গায়ে। নিঝুম স্টেশনঘেরা কত মাধবীলতার গাছ! গোলাপি ফুলের আভা ছড়িয়ে পড়ত তোমার চোখে-মুখে। একটা কবিতা রঙের ছেলে গোটা বিকেল কাটিয়ে দিত ওই আলো গায়ে মেখে। তারপর যেমন করে সব পাখি ঘরে ফেরে, ছেলেটাও ফিরে যেত তার একচিলতে নির্জনতায়। যাবার আগে আলতো করে ছুঁয়ে দিত তোমার দুটো আঙুল, শুধু। ক্ষীণ শব্দে তোমার কাছ থেকে ভেসে আসত দুটো শব্দ, তুমি আমারই।

তারপর আকাশ জুড়ে নেমে আসত আনন্দময় এক শূন্যতা। মৃদু মৃদু নক্ষত্রের আলোয় ভরে যেত বিশ্বচরাচর। 

কত কত আশ্বাসে বেঁচেছি আমরা, ভাবো মহুল! দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ইউনিভার্সিটির কতগুলো দামাল দুপুর। শুধুমাত্র আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য মিথ্যে-মিথ্যে তৈরি করে নিতে কত রকমের অছিলা! ট্রেন ধরার জন্য ছুটে আসতে তুমি।  আজ তোমার আর আমার জীবনের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে গিয়েছে কত শতাব্দীপ্রাচীন ট্রেন।  নির্জন স্টেশনটা আজও একটা সাক্ষীর ইতিহাস বুকে আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে নিরন্তর। আজও অপেক্ষাতুর ভাঙাচোরা সেই নীল সাইকেল। 

জানো মহুল, আজও আমার মফসসল তোমার জন্য সাজিয়ে রেখেছে রামধনু রঙের একটা নিঃসঙ্গ মায়াকানন। যেখানে শিশির আর শিমুল ফুলের পাপড়ির উপর দিয়ে পেরিয়ে যেতে হয় বিস্তীর্ণ পথ। অপরাজিতার নীল পাপড়িগুলো আলো ছড়িয়ে দেয় স্টেশনের বেদিটাতে। এখানে বসন্ত নামলে একটা মায়াবি ছেলে কবিতার ছন্দের মতো অপেক্ষায় থাকে প্রতিদিন। মহুল, লাল পলাশের আলোয় যখন ভরে ওঠে উন্মাদ ছেলেটার গোটা শরীর, সে প্রস্তুত হয় নিদারুণ একটা ধুলোময় জীবনের জন্য, আবার। মেঘলা রঙের ছেলেটা গাছেদের কাছে নিঃস্ব এসে দাঁড়ায়, পাখিদের সুরে আজও বলে ওঠে, আমি তোমারই!

মহুলের কথা

দিগন্তদা, এক ছায়াময় চরাচর জুড়ে বেড়ে উঠেছিলাম আমরা। আমাদের সভ্যতায় ভালবাসা ছিল, আলো ছিল, হারিয়ে যাওয়ার উন্মনা বাতাস ছিল। কাশের জঙ্গল দেখলে কেমন আনন্দে লুটোপুটি খেতে তুমি! জোর করে ধরে নিয়ে যেতে আমায়।  তোমার সাইকেলে চেপে পাড়ি দিতাম কত নির্জন রাস্তা, মনে পড়ে তোমার? পুজো আসছে। গোটা আকাশ হলুদ আলোয় মাখামাখি।  নিউ জার্সির এই সাতাশ তলায় বসেও আমি দেখতে  পাই তোমাকে। হাজার হাজার মাইল দূরত্ব পেরিয়ে ইচ্ছে করে তোমার কাছে ছুটে যেতে। তুমি কি এখনও সকাল হলেই ঘাসের উপর দিয়ে খালি পায়ে যেতে যেতে মেখে নাও ভোরের শিশির, দিগন্তদা? 

আমাদের পৃথিবীতে কত না-পাওয়ার কষ্ট ছিল, লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারার তীব্র জ্বালা ছিল, কিন্তু কোনওদিন শূন্যতার হাহাকার ছিল না। নির্জনতার অভিশাপ নিয়ে বসে আছি এই সাতাশ তলায়। রাহুলের অফিস, টাপুরের স্কুল, আর তারপরই আমার অখণ্ড অবসর। সব সাঁকো জোড়া দিয়ে নিজেই এক ভগ্নপ্রায় সেতু হয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি বছরের পর বছর। দিগন্তদা, ভাসা-ভাসা মেঘগুলো যখন জমাট বাঁধে দুপুরের খোলা আকাশে, তখনও আমার কথা মনে পড়ে তোমার? 

সেই কিশোরীবেলা, তোমার শরীরের উষ্ণ স্পর্শ, বাঁধনহীন উল্লাস কোথায় হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে! এভাবেই কি হারিয়ে যায় প্রতিটি মেয়ের সোনালি স্বপ্নগুলো? নাকি স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেললেই বাস্তবতা এসে কড়া নাড়ে তার দরজায়? তার চেয়ে বোধহয় এই ভাল! দূরত্বের সমুদ্র পেরিয়ে আমি আবছা একটি অবয়ব হয়ে বেঁচে থাকি তোমার জীবনে। পাখিদের মতো মনোরম জীবন কাটাও তুমি। তোমাকে বন্দি করবে এমন সাধ্য কার? শুধু যখন নিউ জার্সির ঝাঁ চকচকে রাস্তায় একটা-দুটো করে নক্ষত্রের মতো ফুটে ওঠে রঙিন আলো, ভিড় আর আভিজাত্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে স্বপ্নাবিষ্ট এই দেশ, আমি ভিতরে-ভিতরে কুঁকড়ে যাই দিগন্তদা, মনে হয় কাদা-মাটি-ঘাসে ঘেরা নির্জন রেলস্টেশনটাতে একছুটে চলে যাই, নীল অপরাজিতা ফুলগুলো যেমন করে আলো ছড়িয়ে দিত সিমেন্টের বেদিটার উপর, ঠিক তেমনি করে তোমার কাছে গিয়ে রঙিন হয়ে উঠি আমি। তোমার নিঃসঙ্গতাকে ঢেকে দিই আমার আলোআঁধারি দিয়ে। আমি ভাল নেই। জানি তুমিও ভাল নেই। এই রাক্ষুসে শতাব্দী যতই চাকচিক্য দিয়ে মুড়ে দিক আমাদের, আমি জানি, দিগন্তের আঙিনায় জমে আছে রাশিরাশি বাদলমেঘ। প্রজন্মের পর প্রজন্মের আস্তিন জুড়ে জমছে ধূসর মনখারাপ। ভেঙেচুরে যাওয়ার কষ্ট।  

দূর দেশে মহুল ঝরে না আর। আমি নেই, অপরাজিতার আলোও কি কমে গিয়েছে? জানি না। শুধু কবিতায় বাঁচো তুমি। ব্যর্থতার আকাশ ঢেকে যাক কবিতার ক্যানভাসে। তোমার গল্পে-উপন্যাসে বেড়ে চলুক আমাদের নির্জন মায়াবি সময়ের কথা। যে-অতীত ফেলে রেখে এসেছি কালের গর্ভে, তুমি রং দিয়ে রাঙিয়ে তোলো তাদের। আমি জানি, কবিতা-রঙের ছেলেটা ছন্দের বন্ধন আর মুক্তিতে একদিন অমর করবেই আমাদের মজাদার খুনসুটিগুলো। তোমার মায়াময় চিত্রাঙ্কনে আমি যেন ক্যানভাস হয়ে কাটিয়ে দিতে পারি সারাটা জীবন, এটুকুই কামনা আমার। ভাল থেকো। খুব ভাল থেকো দিগন্তদা!

আরও পড়ুন...