Hello Testing Bangla Kobita

গ ল্প

ম ন্দা ক্রা ন্তা   সে ন

পাশে থাকা

করোনার এই বিপর্যস্ত দিনকালে মীর্ণা বেঁচে আছে তার ফোনে। লকডাউনে আর পাঁচজনের মতো, হয়তো বা নিজের মতো করে আরও বেশি একাকিত্বে ভুগছে সে। তথাকথিত ‘সামাজিক’ দুরত্বে সে আগে থাকতেই অভ্যস্ত ও সুখী। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। ফোনাফুনির সম্পর্কও নেই। পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সে তেমন মিশ খায়নি। কিছু সমমনস্ক বন্ধুবান্ধব অবশ্য আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গেও বেশিক্ষণ কথা বলতে ভালো লাগে না আজকাল। তাই ইদানীংকার এই খাঁ খাঁ একাকিত্বে, সে একের পর এক হোয়াটসঅ্যাপ করে যায় গভীর রাতে বা নিস্তব্ধ দুপুরে।          

তেমনই এক প্রেমিক নৈতিক। নৈতিকের সঙ্গে এককালে সে প্রবল প্রেম করেছে। না, ভুল হলো, সে-ই নৈতিকের প্রবল প্রেমে পড়েছিল, এখনো পড়ে আছে। মনে আছে সি সি ডি-তে নরম আলোয় হাল্কা এসি-তে বসে নৈতিক তাকে বলেছিল– তোমাকে আমার ভালো লাগে, খুবই ভালো লাগে, কিন্তু প্রেম-টেম আমার দ্বারা হবে না। তবে বন্ধুত্বের হাত চিরদিন বাড়ানো রইল। 

ভালোবাসা নয়, ভালো লাগা। প্রেম-টেম নয়, বন্ধুত্ব। তাই সই। তার মী নামটা নৈতিকেরই দেওয়া। ঠিক দেওয়া নয়, একটু ছোট করে দেওয়া। মীর্ণা থেকে মী। নামটা মীর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল। ইংরেজিতে আত্মপরিচয়। সে কোনও আপত্তি করেনি। নৈতিকের সঙ্গে যখন প্রথম কথা হয়, সে স্বচ্ছন্দ হেসে বলেছিল, –নমস্কার। আমি নৈতিক। 

মীর্ণা উত্তরে আলগা হেসে বলেছিল — নমস্কার। আমি মীর্ণা।

– মীর্ণা? মানে কী? 

মীর্ণা মনে মনে চটছিল। নামের সবসময় মানে থাকে নাকি? থাকতেই হবে বুঝি? সে উদাসীন স্বরে বলেছিল – একটা নদীর নাম। এখন যদি আপনি জানতে চান নদীটার নাম কেন মীর্ণা, সেটা আমি বলতে পারব না। নদীটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। 

– আমি তো নদীর কাছেই জানতে চাইছি। 

মীর্ণার এবার হাসি পেয়ে গেল। যুবকটি কি তার সঙ্গে ফ্লার্ট করতে চাইছে? তা ভালো। ছেলেটি সুঠাম যুবক। সুদর্শন। বেশ লম্বা, শ্যামলা গায়ের রঙ, চেরা চেরা চোখ। চোখা নাক। ধারালো চোয়াল ও চিবুকের গড়ন। পুরু ঠোঁট। ফ্লার্ট করলে মন্দ হয় না।   

কিন্তু সেই হালকা হাসির ফ্লার্ট যে কীভাবে প্রেমের চোরাস্রোতে তাকে টেনে নিয়ে গেল, মীর্ণা নিজেও জানে না। সে এক উথাল পাথাল জোয়ার। নৈতিক তখন তাকে প্রায়ই ফোন করত। বলত –হ্যালো, আমার মী কেমন আছে? মীর্ণা জানত এটা মজার কথা। কিন্তু সে সত্যিই নৈতিকের মী হয়ে গেছে। সে বলত – তুমি জানো, আমি সত্যিই তোমার মী হয়ে গেছি? 

– জানি তো! আমিও তোমার নৈতিক।

– বলো আমি তোমার ‘নই’?

– হা হা। ওয়েল সেড, বাট নট ট্রু।

– তাই নাকি? বেশ?

– তুমি কীভাবে জানতে চাও, ভাবতে চাও, বুঝতে চাও বলো। আমি বোঝাতে রাজি। আমি বোঝাতে চাই। 

– শুধু বন্ধুত্বে তা হয় না। 

– হয়, কেন হবে না?

– আচ্ছা থাক, অন্য কথা বলো। 

– কী বলব?

– বলো যা খুশি। 

– কোনটা বলি! আমার যে তোমাকে অনেক কথা বলার আছে!

– তাই? আমার কিন্তু তোমাকে একটাই কথা বলার আছে।

– কী?

–জানো তো, জানো না?

– ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌… জানি।

– জানো?

– জানি, চলো দেখা করি।

তারপর সেই সান্ধ্য সি সি ডি। শান্ত সন্ধ্যা। আর নৈতিকের সেই কথা – আরে ওসব প্রেম টেম ছাড়ো না। অবসোলিট ব্যাপার। ওতে আমি বিশ্বাস করি না। তবে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো রইল।

মীর্ণা সেদিন বাড়ি এসে খুব কেঁদেছিল। নৈতিকের কাছে সে মী, মীর্ণা, এক নদী। এ সবই বন্ধুত্ব। প্রেম নয়। ভালো কথা। বেশ কথা। ন্যাকার মতো কান্নার কী আছে? নৈতিকের বন্ধুত্বের যোগ্য হয়ে ওঠার মতো স্মার্ট সপ্রতিভ হয়ে উঠতে হবে। সে পারে না নাকি!

এ কথা সত্যিই যে মীর্ণার জীবনেও প্রেম কম আসে নি। কিন্তু নৈতিকের প্রতিই সে সবচাইতে বেশি আকৃষ্ট যে, মানতেই হবে। কাজেই নৈতিককেই সে বেশি ফোন করে, হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠায়। নৈতিক আগে আলগা উত্তর দিত। মজা করত। এখন ক্রমশ সাড়া কমে এসেছে। কখনও ফোনে সাড়া দিলে মীর্ণা একথা সেকথার  পর ভয়ে ভয়ে বলে, – নৈতিক? 

– বলো মী।

–একটা কথা জানো তো? 

– ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌… জানি তো।

নৈতিক পাছে হা হা করে হেসে ওঠে, সে দ্রুত বলে – আচ্ছা, রাখছি, ভালো থেকো। 

– তুমিও ভালো থেকো মী আমার।

এই রকমই যখন চলছে, একদিন রাত সাড়ে বারোটার মধ্যরাত্রে মীর্ণা নৈতিককে লাইনে পেল।

– ঘুমোচ্ছিলে? ঘুম ভাঙালাম?

– আরে না, আজই মা’কে নার্সিংহোম থেকে বাড়ি নিয়ে এলাম।

– সে কী! কি হয়েছে মাসিমার?

– চেস্ট কনজেশন। ক্রিটিকাল কন্ডিশন হয়েছিল।

– আমাকে কিছু জানালে না!

– জানালে কী করতে? এই লকডাউনের সময়ে?

– ও, তাইতো। আমার তো কিছুই করার নেই। জেনে কী হবে!

– কিছু মনে কোরো না এভাবে বললাম বলে। চিন্তা করবে বলে জানাইনি। কী আর করার আছে বলো। এই করোনার জন্য কত হসপিটালে নার্সিংহোমে ঘুরে ঘুরে মা’কে ভর্তি করাতে পেরেছি ভাবতে পারবে না। এদিকে মায়ের সাঙ্ঘাতিক ব্রিদিং ট্রাব্‌ল্‌। নার্সিংহোমে অ্যাডমিশন আর রিলিজ- দু’বারেই করোনা টেস্টিং হয়েছে। নেগেটিভ এসেছে অবশ্য। সেটা একটা শান্তি।

– ওহ্‌ থ্যাঙ্ক গড!

– হ্যাঁ। পরে কথা বলব, কেমন? রাখছি।

– শোনো… বলতে বলতেই নৈতিক লাইন কেটে দিয়েছে। মীর্ণা শুধু বলতে চেয়েছিল – মাসিমার খবর নিতে কালকে একবার ফোন করতে পারি? প্রশ্নটা করা হল না। 

এই করোনা মহামারীতে দেশে একটা অভূতপূর্ব অদ্ভুত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। না-করোনা মহামারী। করোনা ছাড়া অন্য কোনও অসুস্থতায় স্বাস্থ্য-পরিষেবা প্রায় বন্ধ। সরকারি হাসপাতাল তো ভর্তি নিচ্ছেই না, এক বেসরকারি নার্সিংহোম ভরসা। কিন্তু নির্ভরযোগ্য নার্সিংহোমে খরচ-খরচা অনেকেরই নাগালের বাইরে। অনেক রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। মীর্ণা জিজ্ঞেস করতে পারল না নৈতিকের মা কোথায় ভর্তি ছিলেন।    

যদিও মীর্ণা জিজ্ঞেস করতে পারেনি সে কাল নৈতিককে ফোন করতে পারে কিনা, সে কথাটাও, তবুও সে হোয়াটসঅ্যাপ করল – মাসিমা কেমন আছেন? মিনিট পনেরো পর উত্তর এল, — মা ঠিক আছে। থ্যাঙ্কিউ। মেসেজটা পেয়েই মীর্ণা আবার তুরন্ত টাইপ করল – তুমি কেমন আছ? উত্তরে সাড়া এল না।

মীর্ণা কেমন মরিয়া হয়ে উঠল। মাসিমার খবর নিতে সে রোজই একবার হোয়াটসঅ্যাপ করে। 

– মাসিমা কেমন আছেন? তুমি কেমন আছ?

কখনো উত্তর আসে, কখনও আসে না। তবু মীর্ণা জিজ্ঞেস করে যায়। নৈতিককে কি খুব বিরক্ত করে ফেলে সে? তার মনে হয় নিশ্চয়ই তাই। নিশ্চয়ই মায়ের পরিচর্যা করতে হয় সারাদিন, অকারণ এস এম এস-এর উত্তর দেওয়ার সময় কই। সে খুব কম কথা বলতে চেয়ে, যেন এভাবেই কম বিরক্ত করা হবে ভেবে তার বার্তা ক্রমশ আরও সংক্ষিপ্ত হয়। – মাসিমা? তুমি?

ওদিক থেকেও মাঝেমধ্যে সংক্ষিপ্ততর বার্তা আসে – ঠিকঠাক।

একদিন উত্তর একটু বড় হলো – মায়ের কাশি হয়েছে। আমারও শরীরটা ঠিক ভালো নেই। 

মীর্ণা দ্রুত টাইপ করল – ডাক্তারের পরামর্শ নাও। তোমার কী হয়েছে?

– হ্যাঁ। মায়ের বিষয়টা ডাক্তারকে জানানো হয়েছে। আমার সেজ জেঠু ডাক্তার। আর আমি ক্লান্ত, খুব ক্লান্ত। 

– খুব খাটনি যাচ্ছে, বুঝতে পারছি।

– হ্যাঁ, মা’র সম্পূর্ণ দেখভাল একাই করছি তো। তারপর রাত্তিরেও ঘুম হয়না।

– কেন? দুশ্চিন্তায়? ভেবো না, মা তো আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠছেন। কাশিটাও সেরে যাবে।

– হ্যাঁ, দুশ্চিন্তা তো বটেই। সেটা মানসিক। আর শারীরিক ভাবেও ক্লান্ত গো। মা রাতে তিন চার বার ওঠে, টয়লেটে যায়। মানে আমি নিয়ে যাই আর কি। তাই ঘুমোতে পারি না।    

কথাটা সমস্যার, চাপের, কিন্তু মীর্ণার বড় ভালো লাগল। আজকালে ছেলেরা মায়ের জন্য কতটুকু আর করে। নৈতিক জানপ্রান দিয়ে লড়ছে। মায়ের সমস্ত প্রয়োজন ও চাহিদা মেটানোর জন্য সদা প্রস্তুত। এমন ছেলেকে ভালো না বেসে পারা যায়!  

এমনই এখন প্রায় রোজই বার্তা চালাচালি হয়। নৈতিকের মা ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন। একদিন নৈতিক বলল – মা অনেকটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে। আজ আমি বারান্দায় নিয়ে গিয়েছিলাম। মায়ের খুব ভালো লেগেছে। আমারও।    

– আমারও! আমারও!

উত্তরে হাসিমুখের ইমোজি। 

তারপর মীর্ণার আর্ত বার্তা প্রেরণ একটু বাড়ল। হয়তো একটু বাড়ল নৈতিকের প্রত্যুত্তরও। মীর্ণা একদিন লিখল – আচ্ছা এই যে বারবার তোমাকে মেসেজ করি, তুমি বিরক্ত হও, না? 

– তোমার কি তাই মনে হয়? হলে কি উত্তর দিতাম?

–না। তাই বলছি আর কি। মাসিমার খবর নেবার জন্য মেসেজ করি, সেই অজুহাতে তোমার সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। আর কীভাবেই বা পাশে দাঁড়াতে পারি এই লকডাউনের পরিস্থিতিতে। খুব খারাপ লাগছে। 

– খারাপ কেন লাগবে। তুমি তো অনবরত আমার পাশে আছো মী। অনেকেই এভাবে পাশে নেই।

মী ডাকটা, হোক হোয়াটসঅ্যাপে, মীর্ণার কানে বড় মধুর হয়ে বাজল। এ নামে কে তাকে কোনদিন শেষবার ডেকেছিল!   

এরপর বেশ কিছুদিন যোগাযোগে ভাটার টান। মীর্ণা বার্তা পাঠায়। উত্তর আসে কি আসে না। একদিন হঠাৎ ফোন এল। তখন রাত এগারোটা হবে। স্ক্রিনে বহু-আকাঙ্ক্ষিত নামটি দেখে মীর্ণা সেটা খপ করে তুলে নিয়েই কানে লাগাল – হ্যাঁ! বলো!

– মী, মা’কে আবার হসপিটালাইজ্‌ড করতে হল। ডাব্‌ল নিউমোনিয়া। খুব শ্বাসকষ্ট। কাল রাত্রেই ভর্তি করেছি, ভাবলাম খবরটা তোমাকে দিই। আমার খুব ভয় করছে, মী, খুব একা লাগছে। মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। 

– না না ভয়ের কোনও কারণ নেই। মাসিমা ঠিক হয়ে যাবেন। দু’তিন দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসবেন দেখো। এত প্যানিক কোরো না, প্লিজ। ডোন্ট বি সো আপসেট। এভরিথিং উইল বি অলরাইট।

– ঠিক আছে। রাখছি। নৈতিক ফোনটা কেটে দিলো।       

মীর্ণা ঠিক বুঝতে পারছিল না, তার ভাল লাগবে না খারাপ লাগবে। নৈতিক তাকে ফোন করল, মায়ের শরীর খারাপের কথা জানালো, এটা কি কোথাও একটু ভালো লাগার অনুভব জাগাতে পারে? না কি ওর মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, সেটাই খারাপ খবর, উদ্বেগের খবর, দুশ্চিন্তার খবর! 

এবার নৈতিকের মা সপ্তাহখানেক পর বাড়ি ফিরলেন। লকডাউনের জন্য যাওয়া আসা করা যাচ্ছে না। নৈতিকের বাড়িটাও বেশ দূরে। ফোনেই যাবতীয় যোগাযোগ। বেশ অনেকদিন হয়ে গেল এই পরিস্থিতি। আজকাল একটা ব্যাপার হয়েছে। আগে মীর্ণাই মেসেজ করত, ফোন করত। এখন নৈতিক নিজে থেকেই ফোন করে। মূলত মায়ের বিষয়েই কথা হয়। নৈতিকের ভাইবোন নেই। বাবাও প্রয়াত। যা করার নৈতিককে একাই করতে হচ্ছে। মীর্ণা আকুল হয়ে বলে – তুমি নিজের দিকেও একটু খেয়াল রেখো, বুঝলে? তুমি ঠিক না থাকলে মাসিমাকে দেখবে কে? তুমি তো সম্পূর্ণ একা।

– হ্যাঁ, আমি একা। একদম একা।

নৈতিক ফোন কেটে দিলো। মীর্ণার ভালো লাগছিল না, কিছু ভালো লাগছিল না। নৈতিক কি আর টানতে পারবে না? 

ব্যাপারটা সেরকমই দাঁড়ালো। অন্তত নৈতিক তাকে যা জানালো। বেশ অনেকদিন হয়ে গেল এই অবস্থা। মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে লকডাউনের পেটে। মীর্ণার মনে হচ্ছিল নৈতিক আর পারছে না। মা নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেলেন বটে, কিন্তু ঘরেও তো শুশ্রূষার প্রয়োজন। অথচ বাড়িতে আয়া রাখার জো নেই, মায়ের তাতে দারুণ আপত্তি। নার্সিংহোম তো নার্সিংহোম, বাড়িতে অজানা অচেনা লোকের হাতে তিনি সেবা নিতে নারাজ। কাজেই নৈতিকের কাঁধে সব দায়দায়িত্ব। রান্না করে খাইয়ে দেওয়া থেকে বেডপ্যান ধরা অবধি। মায়ের খাইখাই বাই বেড়েছে। হাই ব্লাডসুগার, তবু মিষ্টির জন্য কখনও ঘ্যানঘ্যান করেন, কখনও জেদ করেন। ঘুমের ওষুধ চলা সত্ত্বেও সারা রাতই প্রায় জেগে থাকেন, আর তাঁর সঙ্গে নৈতিককেও জাগতে হয়। নৈতিক আজকাল মীর্ণাকে প্রায়ই ফোন করে, ক্লিষ্ট স্বরে হাসতে হাসতে বলে – আর পারা যাচ্ছে না বুঝলে? এবার আমিও বিছানা নেব। পনেরো কেজি ওয়েট কমেছে এই ক’দিনে। আমি পড়লে দেখবে কে?

মীর্ণার মনে হয় তার বলা উচিত – আমি দেখব। কিন্তু অসার অসম্ভব এই কথার চাইতে চুপ করে থাকাই সে ভালো মনে করে। কিন্তু সত্যি ছেলেটা যা করছে, ও অনতিবিলম্বে ভেঙে পড়বে। এখনও শুধু মনের জোরে চলছে। মনে যদি অবসাদ আসে, বিষাদ আসে, বিরাগ আসে, তখন কী হবে! 

বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হলে অনেকক্ষেত্রেই তারা শিশু হয়ে যায়। জেদি অভিমানী ঘ্যানঘ্যানে অবুঝ শিশু। যা করা বারণ সেটাই করবে, যা করা দরকার কিছুতেই করবে না। হয় কিছু খেতে চাইবে না, নয় লোভ বেড়ে যাবে। নৈতিকের কথাবার্তাতেও মীর্ণা সেই আঁচ পায়। সে বলে –আজ পটল পোস্ত রাঁধলাম। মিষ্টি দিইনি বলে মুখ থেকে থু থু করে ফেলে দিলো। কাল ভাবছি বেগুন পোড়া করব। তেল নুন লঙ্কা দিয়ে মেখে খাইয়ে দেব। ওতে মিষ্টি চাইবে না সম্ভবত, বলো?

মীর্ণা রন্ধন শিল্পে ডাহা ফেল, সে বলে – না মনে হয়। দ্যাখো।

– আমাকে কিছু রেসিপি বলবে? রোজ সকালে কী রান্না করব কী খাওয়াব মাথায় আসে না। যা পারি করি। মা’র যে কী অদ্ভুত জেদ, রান্নার লোক রাখা যাবে না, আয়া রাখা যাবে না। অবশ্য এই সময় বাইরের কাজের লোক ঢোকানোটাও বিপজ্জনক। আমি আর কী করব বলো? আপ্রাণ চেষ্টা করছি মা’কে একটু ভালো রাখার। ভালো করে তোলার। বাট শি উড্‌ন্‌ট কো-অপারেট। কী যে করি!

নৈতিক এত কথা এর আগে কবে শেষ বলেছিল, মীর্ণা মনে করতে পারে না। তার মন খারাপ হয়। তার কি ভালোও লাগে? ছি !

কিন্তু যা হওয়ার ছিল তাই হল। এক গুমোট থমথমে রাতে নৈতিকের ফোন এল – হ্যালো, মী! 

– হ্যাঁ বলো, মাসিমা কেমন আছেন? ঠিক আছেন তো?

– আমি জানিনা, সত্যি জানিনা।      

– মানে!

– আমি এখন মায়ের পাশে নেই। ভাল্লাগছে না। আমি অন্য ঘরে। আমি আর অনেক ওষুধ। অনেএএএএএএক ওষুধ। ঘুমের ওষুধ। মায়ের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে সংগ্রহ করেছি। সেগুলো স্ট্রিপ থেকে খুলছি। সব খোলা হলে টা টা বাই বাই। আবার যেন দেখা পাই। 

– সে কী! কী করছ তুমি! কেন! আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না! এই! এইইইই! শোনো!  ওগুলো রাখো প্লিজ। আমার কথা শোনো!

– বলো।

– ওরকম করে না, প্লিজ। তোমার কিছু হলে আমিও কিন্তু… আমার তো প্রেসক্রিপশন নেই, সিলিং ফ্যান আছে অবশ্য। তার আগে ভাবো কেন এমন করতে চাও?

– আমি আর পারছিনা যে! এই প্রতিমুহূর্তে নিজেকে মোটিভেট করা। আর পারছি না। দিস লকডাউন উইদিন লকডাউন। আসলে মা’কে নার্সিংহোমে রাখতে চাইছে না। বাড়ি ফিরিয়ে দিচ্ছে। বাট শি ইজ নট অ্যাট অল ফাইন। কিন্তু আমিও আর… রাখি?

– না শোনো, যা বললাম, তুমি কিছু করলে আমিও করব। তবে আমারটা আরও যন্ত্রণার। এই, বুঝতে পারছ? শুনছ? এইইই!

ওপাশ থেকে ক্ষীণ সাড়া এল – বলো, শুনছি!

– শোনো, আমি কি তোমার পাশে একটুও দাঁড়াতে পেরেছি?

– অবশ্যই। কারও সঙ্গে এত কথা শেয়ার করিনি তুমি ছাড়া। আজও করছি। কিন্তু আমার কেউ নেই। বিশ্বাস করো।

– এখনও তো মা আছেন।

– হোপলেস। আর কিছু হওয়ার নেই। কমপ্লিট নো নো সিচুয়েশন। এখন শ্বাসকষ্টটা ইনহেলার নিয়ে ঠিক আছে। কিন্তু ডাক্তার বলেছে অক্সিজেন রেডি রাখতে। সেটা কি সম্ভব, বলো! রাতের দিকে শ্বাসকষ্টটা বাড়ে। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও ভর্তি করা যাচ্ছে না। আমি কী করব? হসপিটালাইজ্‌ড করা ছাড়া কিছু করার নেই। সেটাই তো পারছি না। সেজ জেঠু বলে গেছেন টাইম ইজ আপ। আমার উপর মায়ের যে কী রাগ ভাবতে পারবে না। আমি নাকি মা’কে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলছি। আর কত শুনব? আর কত শুনতে হবে? আমার চেষ্টা, আমার শ্রম, ভালোবাসা, সব বৃথা। আমি আর পারছি না। এমনিতে দুর্বল, তবু কাল আমার হাত খিমচে আঁচড়ে দিয়েছে। মানসিক সমস্যাও হয়েছে মনে হয়। সব মিলিয়ে একা একা… কত আর সম্ভব!    

– শোনো শোনো, বিষয়টা এভাবে নিও না। মাসিমার শারীরিক কষ্টের কথাটা ভাবো। কষ্ট পাচ্ছেন তাই রেগে যাচ্ছেন। এখন সমস্ত সহ্য করে পাশে থাকো। মাসিমার শরীরটা সেরে গেলেই উনি বুঝবেন আসলে তুমিই ওঁকে বাঁচিয়ে তুলেছ।

– সে আর হওয়ার নয়। আমি বুঝতে পারছি। তুমি দূর থেকে তার কী বুঝবে? 

মীর্ণা খানিকক্ষণ একটু চুপ করে থেকে কথাটা হজম করল। তারপর বলল – মনে আছে তুমি বলেছিলে, বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো রইল। সেই হাত ছুঁয়ে বলছি, আমি যদি তোমার পাশে দাঁড়াতে পেরে থাকি, তুমিও আমার পাশে দাঁড়াও। 

– কীভাবে?

– নিজেকে শেষ কোরো না। জীবন থেকে পালিয়ে যেও না। শোনো, দ্যাখো আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। থাকব চিরকাল। ট্রাস্ট মি! প্লিজ!

ওপাশ থেকে ক্লান্ত স্বর ভেসে এল – কিন্তু আমি নিজেই আমার পাশে দাঁড়াতে পারছি না গো। আমি যে নিজেই নিজের পাশে দাঁড়াতে পারছি না!      

আরও পড়ুন...