Hello Testing Bangla Kobita

গ ল্প

সৌ ভি ক   ব ন্দ্যো পা ধ্যাা য়

এপিটাফ

মেঘলা হয়ে আসছে ভীষণ। বিকেল চারটেতেই ঘন অন্ধকার, খুব হাওয়া দিচ্ছে, উড়ছে শুকনো পাতা। আজ শনিবার, অফিস ছুটি, তাই উজান শ্রাবন্তীকে নিয়ে বেরিয়েছিল দুপুরে। পার্ক স্ট্রিটের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে , এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েছে এই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে । উজান আর শ্রাবন্তীর এই কবরখানায় আসতে বেশ ভালো লাগে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ যেন , কোনও হই-হট্টগোল নেই , লোকজন প্রায় নেই ভেতরে , শুধু এপিটাফ চারিদিকে , আর ঘাসে মোড়া নির্জন ছায়াপথ । এখানে সময় যেন থমকে আছে । ডিরোজিও, উইলিয়াম জোন্স-সহ আরও অনেক বিখ‍্যাত মানুষদের কবর আছে এই সিমেট্রিতে। শোনা যায়, বহুকাল আগে এখানে ঘন জঙ্গল ছিল , বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সেই জঙ্গলে বাঘ শিকার করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক অফিসার ও তাদের পরিবারের লোকজন এখানে চিরঘুমে শায়িত । বেশিভাগেরই মৃত্যু ঘটেছে অকালে, কলেরা বা অন্য কোনও রোগে । একটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে উজান – লেখা আছে উইলিয়াম বার্লো। উজান স্মৃতি ফলকের ওপর জন্মসাল আর মৃত্যুসালের মধ্যে ব‍্যবধান হিসেব করে বুঝলো উইলিয়াম মারা গেছিল মাত্র সতেরো বছর বয়েসে।

ভারতবর্ষ শাসন করতে এসে অনেক ব্রিটিশ অফিসারই তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছিলেন এ দেশের মহামারী-জল হাওয়ায় । হাঁটতে হাঁটতে উজান আর শ্রাবন্তী এসে পড়ে একটা খোলা প্রান্তরের সামনে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা আকৃতির কবর । বিত্তবানদের কবরের ওপর বড় বড় স্মৃতিসৌধ , অনেক ছোট ছোট কবরের ওপর নাম পড়া যাচ্ছে না , মুছে গেছে নাম ও পরিচয়। হঠাৎ বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা শুরু হয়ে গেল। সঙ্গে ছাতা নেই , শ্রাবন্তী নিজের ও উজানের মাথা কোনোরকমে তার নীল ওড়না দিয়ে ঢেকে , উজানের হাত ধরে ছুটে এসে দাঁড়াল একটা বিশাল গাছের তলায় । ততক্ষণে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে , চারিদিকে অন্ধকার , মেঘ ডাকছে , একটা ছমছমে পরিবেশ। উজান একটা সিগারেট ধরালো , শ্রাবন্তী কোনো কথা বলছে না , এমনিতেই কথা কম বলে , এখন বোধহয় বাড়ি ফেরার টেনশনে পড়ে গেছে । উজান দেখলো শ্রাবন্তী একমনে বৃষ্টি দেখছে , ওর চুল উড়ছে হাওয়ায় , উজান আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল । এই শেষ বিকেলের বৃষ্টিতে কবরখানায় এভাবে আটকে পড়াটা উজানের খুব রোম্যান্টিক মনে হচ্ছিল – ওর হঠাৎ খুব ইচ্ছে হল শ্রাবন্তীকে একটা চুমু খায়। বিদ‍্যু‍তের আলো সহসা আকাশ চিরে দিল , ভীষণ জোরে বাজ পড়ল কোথাও আর আচমকা শ্রাবন্তী জড়িয়ে ধরল উজানকে। শ্রাবন্তীর ভিজে শরীরের গন্ধ , ওর নরম উষ্ণতায় ডুবে গেল উজান। বললো, “ভয় নেই, আমি আছি…”

উজান তাকিয়ে দেখলো পাঁচটা বাজে, মানে গেট বন্ধ হয়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। বৃষ্টি কমে এসেছে , থেমেই গেছে প্রায়, ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভরে গেছে চারিদিক। হঠাৎ খেয়াল হল, সে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছের তলায়, শ্রাবন্তী পাশে নেই। শ্রাবন্তী কোথায় গেল? উজান অবাক হয় খুব। পাশাপাশি দু’জনে দাঁড়িয়ে ছিল, শ্রাবন্তী কখন সরে গেছে, বুঝতেও পারেনি উজান। এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্রাবন্তীকে কোথাও দেখতে না পেয়ে উজান হাঁটতে থাকে ভেজা রাস্তা দিয়ে , শ্রাবন্তীর নাম ধরে ডাকে দু’বার, ওর কন্ঠস্বর যেন স্মৃতিসৌধের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে নিজের কাছেই । মোবাইল হাতড়ে শ্রাবন্তীর নাম্বার ডায়াল করে উজান – সুইচড অফ। এবার উজানের সত‍্যিই টেনশন শুরু হয়ে যায়। শ্রাবন্তী তো এরকম করবার মেয়ে নয়। কিছু না বলে কেন সে উজানের পাশ থেকে সরে গেল! আর কখনই বা গেল তা উজান টেরই বা পেল না কেন ? হাঁটতে হাঁটতে উজান চলে আসে এক নির্জন কোণে , যেখানে পাশাপাশি দুটো কবর , আর তাদের মাথায় উপর নেমে এসেছে একটি প্রাচীন গাছ। আলো-আঁধারিতে উজান দেখলো ডানদিকের কবরের উপর চুপচাপ একা একা বসে আছে শ্রাবন্তী , মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে । “শ্রাবন্তী” বলে উজান ডাকতেই সে মুখ তুললো। উজান দেখলো শ্রাবন্তীর মুখ আকাশের মতই মেঘলা , আর কোথা থেকে যেন এলোমেলো উড়ে আসছে হাজার হাজার গাছের পাতা। দেখতে দেখতে শ্রাবন্তীর মুখ, ঠোঁট , সারা শরীর ঢেকে গেল পাতায় , আর ধীরে ধীরে সে ডুবে যেতে থাকলো, দুই কবরের মাঝখানে কালচে ঘাসজমির মধ‍্যে মিলিয়ে গেল শ্রাবন্তী, পড়ে থাকলো কিছু বিবর্ণ পাতা।

“দাদা , ক্লোজিং টাইম হয়ে গেছে” – সিমেট্রির কেয়ারটেকারের কণ্ঠস্বরে ঘোর কাটলো উজানের। সে এখন কী করবে ? শ্রাবন্তী আর নেই , তার চোখের সামনেই মাটির তলায় সে মিলিয়ে গেছে একটু আগেই । মাথায় মহাকাশ শূন্যতা নিয়ে উজান বেরিয়ে এলো গেটের বাইরে। সন্ধ‍ের আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিট যেন অন্য জগৎ । রঙচঙে যুবক-যুবতীদের পাশ কাটিয়ে উজান অন‍্যমনস্ক হেঁটে যেতে থাকলো । কোথাও যাবার নেই , একা একা ঠিকানাবিহীন উজান।

উজান আজ শ্রাবন্তীর সঙ্গে বেরিয়েছিল । সেই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি , সেই আলোছায়া পথ। উজানের মনে হয় , শ্রাবন্তী ঠিক ফোন করবে রাত্রে , যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে , আর তারাদের আলো এসে পড়বে জানলায়।

ঠিক এক বছর আগে শ্রাবন্তীদের গাড়িটা দুমড়ে মুচড়ে পড়ে ছিল কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে। অফিসের কলিগদের সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিল শ্রাবন্তী। ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টি , ব্রেক ফেল করে যায়।

ধীরে ধীরে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের পুরনো ট্রামলাইনের দিকে চলে যেতে থাকে উজান। হঠাৎ খেয়াল হয় আজ ১২ই জুলাই, পরশু শ্রাবন্তীর জন্মদিন। তাড়াতাড়ি পার্কস্ট্রিটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একটা গিফট শপ খুঁজতে থাকে উজান।

সন্ধে‍র আলো পেরিয়ে একটা ছায়া মূর্তি ভেসে যায় অজানার দিকে।

আরও পড়ুন...