Hello Testing Bangla Kobita

গ ল্প

সৌ ভি ক   গু হ স র কা র

লছমিয়া

রাত তখন প্রায় ন’টা। দক্ষিণগামিনী গঙ্গার কিনার ঘেঁষে, পাটনা শহরের উল্টো পারে অকিলপুর গ্ৰামে তখন ঘন শ্রাবণের রাত বিরহব‍্যথাতুরা নারীর মতো গোঙাচ্ছে। ঝুপঝুপ বৃষ্টির শব্দে গেঁহু আর চানার খেত ভিজছে; খেতের অন্দরমহল থেকে ব্যাঙ আর ঝিঙুরের অবিশ্রান্ত ডাক ভেসে আসছে। কোথাও সাপে ব‍্যাঙ ধরেছে; কোথাও ব‍্যাঙ পোকা ধরেছে; কোথাও পোকা গেঁহুর দানা খাচ্ছে। ইঁদুরও কি এইসব রাতে কাদা আর খড় মেখে ফসলের গোলায় হামাগুড়ি দিচ্ছে না? রাত্রি কি জানে এত শত কথা? সে কি জানে যে তার আগমনে সমাজ পালটে যায়; স্বভাব পালটে যায়; নীতি পালটে যায়? সে কি বোঝে যে বাইরে থেকে সে যে অন্ধকার বয়ে আনে, মানুষের মনের ভেতরে তার চেয়ে আরও গভীর অন্ধকার বাস করে? রাত্রি কি জানে এতসব? রাত্রি কি মানুষ? 

হরকিষণ স্তিমিত বাল্বের আলোয় হিসেবের কাগজ দেখছিল। এমন সময় ধনিয়া এসে সেলাম ঠুকে বলল, হজুর, লছমিয়া এসেছে! কথা শুনে চমকে উঠল হরকিষণ। লছমিয়া এসেছে? তার হাভেলিতে? রাতে? সে মোবাইলে দেখল রাত ন’টা বেজে গেছে। এই সময়ে চিনা রোগের দাপটে এমনিতেই মেলামেশা কমে গেছে মানুষের মধ‍্যে, তাই সন্ধ‍ের পরেই গ্ৰামের পথ ফাঁকা হয়ে যায়। আর এখন তো চারপাশে শ্মশানের নীরবতা। এইসবের মধ‍্যেই লছমিয়া এসেছে! কেন? কী কথা তার সাথে? এতদিন পর? সে ধনিয়াকে বলল, ওকে মেহমান-খানায় বসাও। পাঁপড় আর সরবৎ দাও, আমি আসছি। ধনিয়া সেলাম ঠুকে চলে গেল। 

হরকিষণ উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালে হাত বোলালো। খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়িতে ভ’রে গেছে গাল। দু’দিন দাড়ি কামায়নি সে। সে আমকাঠের চিরুনি দিয়ে কাঁচাপাকা চুল বাগিয়ে নিল। গায়ে গোলাপি ফতুয়া চাপিয়ে, সাদাটে গোঁফের ধারদুটো মুচড়ে নিল। আয়নায় সে নিজের চোখদুটোর দিকে তাকাল। এই চোখদুটো সব দেখেছে। লছমিয়ার জন‍্যে জল ফেলেছে একসময়ে। আজও লছমিয়ার জন‍্য থর মরুভূমির মতো অপরিশ্রান্ত তৃষ্ণা পুষে রেখেছে এই চোখ, পুষে রেখেছে ছত্তিশগড়ের ভোরামদেব অরণ্যের আহত বাঘের মতো ক্ষুধা। আজও এই চোখ ভুলতে পারে নি, কীভাবে তাকে প্রত‍্যাখ্যান করে, গেঁয়ো চাষি বিরজুর গলায় মালা দিয়েছিল লছমিয়া। বিরজুর অওকাত কী! ওর বাপ শালা দু’টাকার ভাগচাষি। ওর দাদু ছিল চারআনার মুটে। ঠাকুর গঙ্গারামের পায়ের তলায় বসে থাকত! ঠাকুরসাহাবের কৃপায় চার-বিঘা জমিতে খেতিবাড়ি করার সুযোগ পেয়েছিল। সেই বাড়ির ছেলে বিরজু। চাষ করার ফাঁকে ফাঁকে মাদার গাছের ছায়ায় বাঁশি বাজাত। বড় বৃষ্টি ছিল সেই বাঁশিতে; সেই বাঁশিই হল কাল। সেই বাঁশির কোটাল স্রোতে লছমিয়ার শরীর যৌবন পদ্ম জ্যোৎস্না অশ্রু চন্দ্রমল্লিকা ভেসে গেল শালপাতায় রাখা মোমের প্রদীপের মতো। 

লছমিয়ার বাপ-দাদা রইস চাষি। কুড়ি-পঁচিশ বিঘা খেত আছে। তারা দশ ভাইবোন। সে বাপের নয়নের মণি। স্বর্গের আগুন। সোনার ভুট্টা। গরম লিঠ্যি। হরকিষণ এত যুবতী দেখেছে, তবু লছমিয়ার মতো এমনটি সে দেখে নি। লছমিয়া যেন বনপরি। ওর চোখজোড়া শরীর আর শরীরজোড়া চোখ। এ মেয়েকে সে দিনরাত কামনা করেছে পাগলের মতো। কিন্তু কী করল সেই মেয়ে? বিরজুর সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করল। তাও তাকে প্রত‍্যাখ্যান করে! অকিলপুর গ্ৰামে খাপ-পঞ্চায়েত নির্দেশ দিল, একঘরে করে দাও। লছমিয়ার বাপ পর্যন্ত তাকে পরিত‍্যাগ করল। পাশের গ্রাম, দৌলতপুরের কিনারে উঠে গেল তারা। শুধু জমিতে চাষ করার অধিকার রয়ে গেল। তাই বিরজু-লছমিয়ার জীবন প্রথম থেকেই ডুবে রইল কঠিন দারিদ্র‍্যে। কিন্তু এ কথা হরকিষণ জানত যে, ভালবাসা থাকলে জীবন থেমে থাকে না; রাতে খড়ের চালের ভেতর দিয়ে জ‍্যোৎস্না এসে ভাঙা কুঁড়ে ঘরে সাদা হাঁসের মতো খেলা করে যায়; দারিদ্র‍্য ছাপিয়ে ঠোঁটের কোণায় হাসির ঝিলিক লেগে থাকে নিশাশেষে ঊষাকালের নরম শিশিরের মতো। বিরজু আর লছমিয়ার সংসারে অভাব থাকলেও শ্রী ছিল। কিছুই থামে নি, কিছুই থামে না। তবে আজ? কেন এল লছমিয়া? গত পনেরো বছরে যার সঙ্গে চোখাচোখি পর্যন্ত হয় নি, আজ সে নিজে এসেছে কীসের জন‍্য? কোন মতলবে? শুধু দেখা করার জন্য সে আসেনি, তার কিছু একটা চাই। কী চাই তার?

হরকিষণকে বড়ঘরে ঢুকতে দেখে লছমিয়া উঠে দাঁড়াল। লছমিয়াকে এতদিন পরে হঠাৎ দেখে মুহূর্তের জন‍্য হরকিষণের শিরায় রক্ত উঠল ছলকে। কপাল অবধি গাঢ় হলুদ রঙের ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে সে। লছমিয়ার শরীরে এখনও জোয়ারের জল উছলে পড়ছে! কোথাও কোনও খামতি নেই! সেই চোখ, সেই ঠোঁট, সেই তাকানোর ভঙ্গিমা। কত বয়স হবে এখন তার? চল্লিশ! তবু, সে এই বয়সেও পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে। হরকিষণের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝল যে তার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। অন‍্য কাউকে বিয়ে করলে সে সুখী হত না; তার চেয়ে বরং সারাবছর ধরে নতুন নতুন মেয়েরা আসে; কেউ কানপুর, কেউ লক্ষ্ণৌ, কেউ বিলাসপুর। টাকা নেয়, পাট-ভাঙা শরীর খুলে দিয়ে যায়। যে যাই বলুক, নতুন শরীরের একটা টান থাকে; চেখে দেখলে মন ভালো থাকে―না হলে এতদিনে একজন নারীকে নিয়ে পড়ে থাকলে সে পাগল হয়ে যেত। শুধু লছমিয়াকে বাদ দিয়ে, কারণ লছমিয়া কেবলমাত্র ‘একজন’ নারী নয়, লছমিয়ার শরীরে একশো নারীর যৌবন।

হরকিষণ ইশারা করে বসতে বলল লছমিয়াকে। 

―কী হয়েছে? হঠাৎ? এতদিন পর? 

―রুপিয়ার জরুরত, লছমিয়া ভনিতা না করেই বলল।

― কত? 

― বিশ হাজার।

― বিশ? এত টাকা? কাহে? 

― লাগবে।

― কেন লাগবে? 

লছমিয়া চুপ করে রইল, কথার উত্তর দিল না। সে যেন জানত যে এই প্রশ্নটা উঠবে; সে প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল, কিন্তু এখন সে যেন তার মুখ খুলতে চাইছে না। নিজের সরবতে চুমুক দেবার ফাঁকে হরকিষণ আড় চোখে দেখে নিল তাকে। গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল,

― প্রশ্নটা কি বহুত শক্ত হল? 

লছমিয়া মাথা নাড়ল। তার মাথা থেকে ঘোমটা ঝ’রে পড়ে গেল, কিন্তু সে টেনে ঠিক করল না। সে যেন এক গভীর চিন্তায় মগ্ন। হরকিষণ বহুদিন পর আকণ্ঠ পান করতে লাগল লছমিয়ার রূপ। তার গলার ডানদিকের উল্কিটা এখনও রয়েছে। সেবার চাঁচরের মেলায় লছমিয়াকে বাইকে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল হরকিষণ। মেলাতেই এক বেদেনীকে দিয়ে নিজের গলায় উল্কি করিয়েছিল সে। তারপরেই বৃষ্টি এসেছিল। তারা ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরেছিল। তখনও তাদের জীবনে বিরজু আসে নি। তখনও হরকিষণ ভাবতে পারে নি যে একদিন লছমিয়া তার হবে না। 

― আমি যে রুপিয়াটা নিয়েছি কেউ যাতে জানতে না পারে। বিরজু যেন জানতে না পারে। আমি হাতজোড় করছি― কেঁপে গেল লছমিয়ার দৃপ্ত কন্ঠস্বর। 

হরকিষণ তাকিয়ে রইল লছমিয়ার দিকে। ঔদ্ধত‍্য থেকে মিনতিতে নেমে এল লছমিয়া! 

― আমি এখনও বুঝতে পারছি না যে তোমার দরকারটা কীসের? 

― মোবাইল কিনব গৌরীর জন‍্য।

― গৌরী? কে গৌরী? 

― আমার মেয়ে।

― তোমার মেয়ে আছে? 

― চোদ্দো বছর বয়স। ছেলেও আছে, কানহাইয়া। সাত বছর বয়স। 

হরকিষণ অবাক হয়। এত বছর কেটে গেল! সে রাগে, অপমানে লছমিয়ার কোনও খোঁজও নেয় নি। তবু এই তথ‍্যগুলো জানতে পেরে তার ভাল লাগে। সে জিজ্ঞেস করে, 

― হঠাৎ মোবাইল কেন লাগবে?

― এই যে চিনা রোগটার জন‍্য সব স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ইস্কুলে এখন সব মোবাইলে পড়াচ্ছে। আমি অতসব বুঝি না, কিন্তু এটা বুঝেছি যে মোবাইল না থাকলে হবে না। কানেকশন ভি লাগবে। পড়ায় গৌরীর মাথা আছে। ও পড়াশোনা করতে চায়। কিন্তু মোবাইল কেনার পয়সা আমার নেই। তাই টাকা লাগবে। এ গ্ৰামে কার কাছে হাত পাতব? তুমি ছাড়া!

‘তুমি ছাড়া’― এ দুটো শব্দ যেন ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল হরকিষণের কানে। তার শরীর কে যেন জল ঢেলে ঠাণ্ডা করে দিল। তার এতদিনের আক্রোশে কে যেন চুন-হলুদ লাগিয়ে দিল। সে গলা ঝেড়ে বলল, 

―কেন, তোমার বাবুজি? তিনি তো এখনও―

―মরে গেলেও দেবেন না। একসময়ে তাঁর আদর পেয়েছি, আজ তাঁর নফরৎ। 

সিগারেট ধরাল হরকিষণ। আড়চোখে দেখল লছমিয়ার দিকে। বাইরে বৃষ্টি নামল। মেঘের মৃদু গর্জন ছড়িয়ে গেল অকিলপুরের আকাশে। 

―তুমি আমার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছ, এটা বিরজুকে না জানানোর কী আছে? 

―জানানো যাবে না। তকলিফ আছে। 

―কী তকলিফ? 

―আমাদের ঘরে একটা গাই আছে। ওর নাম খুশি। শোনপুরের মেলা থেকে পাঁচবছর আগে নিয়ে এসেছিলাম। তখন সে ছোট্ট বাছুর। সে আর কানহাইয়া একেবারে একরকম ছিল। দুটোই বাচ্চা। বিরজু মজা করে বলত, লছমিয়ার জুড়োয়া হয়েছে। একটা লড়কা একটা গাই। খুশিকে আমি কত যত্নে বড় করেছি। একদম মেয়ের মতো। গতমাসে খুশি একটা বাছুর দিয়েছে। সারাক্ষণ খুশির গায়ে গায়ে থাকে। ওর নাম দিয়েছি পোপটলাল। বিরজু বলে, পোপটলাল নাকি আমার নাতি! আমি ওর দাদি। কানহাইয়া ওর সঙ্গে ছোটাছুটি করে। আমার বুক ভ’রে যায়। কিন্তু বিরজু এখন বলছে, খুশিকে বেচে দিয়ে মোবাইলের টাকা জোগাড় করবে। কিন্তু বাছুরের কাছ থেকে গাই নিয়ে গেলে, বাছুর কেমন কাঁদে, তা তো আমরা জানি। তোমার মনে আছে?

হরকিষণ চুপ করে রইল। লছমিয়া বলল, তোমার পিহুরানির কথা মনে আছে?

মাথা নাড়ল হরকিষণ। মনে আছে তার। সব মনে আছে। কৈশোরের সেই স্মৃতি সে কী করে ভুলবে? তাদের গোয়ালের গরু পিহুরানি। তার দুধের দই ছিল যেন অমৃত। সে নিজে পিহুরানির পিঠে চেপে খেলা করত। তখন লছমিয়া বালিকামাত্র—অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত তার দিকে! সেই পিহুরানির একটা বাছুর হল। তার নাম দেওয়া হল, গঙ্গারানি। কিন্তু গঙ্গারানির যখন মাত্র তিন মাস বয়স, ঠিক সেবার তুমুল তুফান এল গাঁয়ে। একরাতে গোয়ালের একদিকের দেওয়াল ভেঙে পড়ল। পিহুরানি মারা গেল। এরপর সাতদিন ধরে তার মাকে খুঁজে খুঁজে ডেকে বেড়িয়েছিল গঙ্গারানি। ডাকের মধ্যে সে কী বুকফাটা কান্না তার! সে তো কথা বলতে পারে না। ঠিকমতো কাঁদতেও পারে না। শুধু ডেকে বেড়াতে পারে! কোথায় গেল তার মা? একদিন মাঝরাতে তার কান্না সহ্য করতে না পেরে হরকিষণের মা নেমে এসেছিলেন গোয়াল ঘরে। সারারাত গঙ্গারানিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন। তার গায়ে হাত বুলিয়েছিলেন। সব মনে আছে হরকিষণের। শৈশবের কথা মনে পড়লে মানুষের বুকের ভেতরে সরোবর জন্মায়, তাতে পদ্ম ফোটে, তাতে ভ্রমর আসে; জীবন সুর হয়। 

লছমিয়া বলল, গত চারদিন ধরে আমাদের বহুত অনবন হচ্ছে। আমি বেচতে দেব না, আর ও বেচবেই। আমায় যে করে হোক খুশিকে বাঁচাতে হবে। আমি যদি সচ্‌ মে ওর মা হই, তাহলে এ তো হতে দিতে পারি না। আমার কাছে গৌরী-খুশি-কানহাইয়া এক। কোনও ফরক নেই। পোপটলাল একটা মোবাইলের জন্যে তার মায়ের থেকে অলগ হয়ে যাবে? আমরা কি ইনসান? আমরা কি… আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে ডুকরে উঠল লছমিয়া। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে নিজেকে সংযত করল। হরকিষণ বলল, 

― বিরজুকে কী বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছ? 

― বলেছি, সরিতা সহেলীর ঘরে যাচ্ছি। দৌলতপুরে একমাত্র ওর কাছে আমি দু’একবার যাই। কিন্তু সরিতার বর ট্রাক চালায়। সে এত টাকা পাবে কোথায়? আর তাছাড়া… আমাদের এমন কীই বা আছে, যার জন‍্যে কেউ এত টাকা দেবে? 

― কুছু নেই? অবাক হল হরকিষণ― সোনার গয়না? দুল? চুড়িয়া? নথনি? টিকলি? পায়েল? 

― তাহলে গৌরীকে শাদির সময় কী দেব? ওর দহেজের রুপিয়া পাব কোথায়? 

দুম করে মাথা গরম হয়ে গেল হরকিষণের― ও, তাহলে এই মতলব! তাই সে হরকিষণের কাছে এসেছে! তাই সে কানে মধু ঢেলেছে, বলেছে― এই গ্ৰামে কে আছে তুমি ছাড়া! তাই এত নাটক! এত ন‍্যাকামি। লছমিয়া এখন এতদূর নেমে গেল? ফোকটে টাকা আদায় করবে ব’লে নাকিকান্না কাঁদতে এসেছে। লছমিয়া খুব ভাল করে তার মুগ্ধতার কথা জানে, আর সেটাতেই সুড়সুড়ি দিচ্ছে হারামজাদি। হরকিষণ খানিকটা কর্কশ গলায় বলে উঠল, 

― আরে সোনাদানা কুছু নেই যখন, কেন এসেছ আমার কাছে? কী ভেবেছিলে, এতদিন পরে তোমার চোখের জল দেখে তোমায় কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে দেব? আজ থেকে পনেরো বছর আগে আমার চোখের জল দেখে তোমার কিচ্ছু যায় আসেনি। আমি যে রাতগুলোয় নিঁদের দাওয়াই খেয়ে ঘুমিয়েছি, সেইসব রাতগুলো তুমি বিরজুকে দিয়েছ! এতবছর দরকার লাগেনি, আজ লেগেছে, তাই এসেছ! তোমার লড়কি, তোমার গাই, তোমার ঘর― তুমি বোঝো! আমি এক রুপিয়াভি দেব না। তুমি যেতে পার। 

হরকিষণের এইরকম উচ্চকিত কর্কশ ব‍্যবহারে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল লছমিয়া। তার চোখের কোণা থেকে জলের বিন্দু মুছে ফেলল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে আহত বাঘিনীর মতো তীব্র দৃষ্টিতে হরকিষণের দিকে তাকিয়ে বলল, 

―আমি কিন্তু তোমার কাছে ভিখ মাংতে আসি নি। 

―আরে, বোলো পবনপুত্র কী জয়! কী দেমাক রে বাবুয়া! খাবার বর্তন নেই, তবু ভিখিরির ঘমণ্ড্‌ যায় না। ভিক্ষেই করছ অথচ বলছ ভিখ মাংতে আসোনি? কী আছে তোমার? জমি বেচলে তো খেতেও পাবে না আর। না খেয়ে মরবে। বড় বড় কথা খালি! কী দেবে তুমি? কী দিতে পার? 

― আমার শরীরটা, শান্ত গলায় বলল লছমিয়া

চমকে উঠল হরকিষণ। এ কী শুনল সে? সে তাকিয়ে রইল লছমিয়ার দিকে। লছমিয়ার মুখে অদ্ভুত এক হাসি, যেন ভাঙা কুঁড়ে ঘরে জ্বলে ওঠা প্রদীপ; যেন পোড়োবাড়িতে উছলে ওঠা হ‍্যারিকেনের আলো; যেন অন্ধকার গোয়ালঘরে কেঁপে ওঠা সাঁঝবাতি। গলায় বিষণ্ণ কৌতুক এনে সে বলল, 

―দাদি হয়েছি, নাতির জন‍্য এটুকু করব না? আমার শরীরের জন‍্য কুড়ি হাজার। খুব বেশি বলা হল? 

হরকিষণের সমস্ত চেতনা অবশ হয়ে আসতে লাগল। তার দু’চোখে হু-হু করে নেমে আসতে লাগল সারাজীবনের ঘুম। তার মনে হল, তার চোখের জলের রাতগুলো মাথা থেকে ক্রমশ উবে যাচ্ছে। তার হাল্কা লাগছে। ভীষণ হাল্কা। কোথাও গিয়ে যেন জীবনের প্রত‍্যেকটি জটিল অঙ্ক মিলে যাচ্ছে। এতদিন পর। সে লছমিয়ার দিকে আবার তাকাল। কানায় কানায় ভরে ওঠা এই শরীর আজও তার স্বপ্ন, তার কামনা, তার অশ্রু। হরকিষণ অনুভব করল, তার শরীর ফেটে বেরতে চাইতে তার অবরুদ্ধ সমস্ত নখ, সমস্ত পদ্ম, সমস্ত ধাতু। রাত্রি, নারী আর বৃষ্টি― এক বিন্দুতে এসে মিশেছে। এই বৃষ্টির রাতে আজ তার পরিপূর্ণতার উৎসব, তার প্রাপ্তির উৎসব, তার অপেক্ষা-শেষের উৎসব। 

একটি অন্ধকার ঘরে সেজের বাতি জ্বলছে। সেগুন কাঠের নক্সা-করা-ছত্রী ধরে দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন লছমিয়া। তার ঘন চুলে ঢেকেছে তার অনাবৃত তামাটে কাঁধ। তার শঙ্খের চেয়ে সুন্দর স্তনের চারপাশে মধুবনী উল্কি; হিঙ্গলপুরার লীলা তালাও-এর চেয়েও গভীর তার নাভির নিচে তীরচিহ্ন আঁকা; তার পিঠ শেরপুরা গ্রামের গেঁহুর খেতের চেয়েও ভরা, তার কোমরের বাঁকে থমকে আছে পৃথিবীর সমস্ত নদী। লছমিয়া তাকে ইশারায় ডাকল। কত রাত সে এই ডাকের জন্য অপেক্ষা করেছে, কত রাত সে এই ডাক পাবে না জেনে অন্য নারীদের ছিঁড়ে খেয়েছে, কত রাত সে এই রাতের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আজ এসেছে, সেই রাত— সেই জ্যোৎস্নামাখা কুসুম তলোয়ার। হরকিষণ লছমিয়াকে পাগলের মতো আদর করতে লাগল; নিংড়ে নিতে লাগল। যেভাবে কল নিংড়ে নেয় আখ; যেভাবে মানুষ নিংড়ে নেয় কাপড়; যেভাবে সময় নিংড়ে নেয় জীবন। হরকিষণের শরীরের ভেতরে বহুজন্ম বন্দি হয়ে থাকা কোনও আদিম ক্ষুধার্ত বিদ্যুৎ যেন মুক্তি পেল। সে বিদ্যুৎ যেন তার শিরায় উপশিরায় কোষে কণিকায় গেয়ে বেড়াতে লাগল স্বাধীনতার গান। সে গান যেন পাখি, সে গান যেন নক্ষত্র, সে গান যেন বাতাসে দুলতে থাকা তামাটে গেঁহুর শিস! 

হরকিষণের সর্বশরীর ঘেমে উঠল। সে লছমিয়ার দিকে তাকাল। লছমিয়ার চোখ একটা উত্তরের জন্য উদগ্রীব। গাঢ় কল্পনার জগৎ থেকে পরিতৃপ্ত শরীরে নেমে এসে হরকিষণ অকস্মাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ধনিয়া! ধনিয়া এসে সেলাম ঠুকে বলল, জী হজুর! হরকিষণ বলল, মুহুরীবাবুর কাছ থেকে পঁচ্চিশ হাজার রুপিয়া নিয়ে আয়। বাত্তি নিয়ে ভাভিজিকে ছোট শোলহাপুরের মাঠ পার করে দিয়ে আসবি। ধনিয়া সেলাম করে বেরিয়ে গেল। 

আর কোনও বাক্যব্যয় না করে, হরকিষণ ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল—লছমিয়া বলে উঠল, আমি কিন্তু ভিখ্‌ নেব না। হরকিষণ দাঁড়িয়ে গেল। পেছনে ফিরে গোঁফ মুচড়ে কৌতুকময় অথচ শান্ত চোখে বলল, এটা ভিখ্‌ নয়, এই রুপিয়াটা উধার দিচ্ছি। আর পাঁচ হাজার আমার তরফ থেকে গৌরী, কানহাইয়া আর পোপটলালের জন্যে। তবে, এই বিশ হাজার রুপিয়া পরে সুদে আসলে ফেরত নেব। পাব তো? 

শরীরের পালকের ভেতর থেকে একটা তিমিরবিনাশী হাসি উঠে এল লছমিয়ার ঠোঁটে। তার রূপ গ্রহণলাগা চাঁদের মতো রহস‍্যময়, জটিল ও অস্পষ্ট। চোখের কোণা থেকে চলকে পড়া জল মুছে সে অস্ফুটে বলল, পাবে।

রাত্রি কখন গান হয়, হরকিষণ জানত না; এখন জানে। সে জানে, কত কিছু না হয়ে, কত কিছু হয়! এমনই বর্ষার রাতে আলের ওপর সাপ আর ব‍্যাঙ মখোমুখি হলেও, সাপ ব‍্যাঙ ধরে না। মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে যে যার ঘরে রহস্যময় বন্ধুত্ব নিয়ে চলে যায়। রাত্রি কি বোঝে এত কথা? রাত্রি কি মানুষ? 

আরও পড়ুন...