Categories
2020_june kobita

অরিন্দম রায়

ক বি তা

অ রি ন্দ ম   রা য়

সহাবস্থান

কোকিল যেমন আছে

কারখানাও আছে

দৃঢ় বিশ্বাসের পাশে

অহেতুক অবিশ্বাস আছে

শান্ত ডাহুক আর

শিকারি চিলের ঝাঁপ আছে

যত্নের গোলাপ আর

অযত্নে বেড়ে ওঠা

বুনোফুল আছে

বলির বাজনা থামলে

আগমনী, ভাটিয়ালি আছে

তছনছ থেমে গেলে

ভোরের নরম আলোর

প্রত্যাশা আছে

ত্রস্ত পৃথিবীর বুকে

জিয়নকাঠির মতো

আশাতীত সংকল্প আছে

বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র জীবন

এইটুকু অহংকার আমাদেরও আছে

ভাতের থালার পাশে

সামান্য নুনের মতো

চিরকাল থেকে যাবো—

এমনই তো কথা ছিল

কথা হয়ে আছে

দায়

ঘাতকের নাম ক্লান্তি

ঘাতকের নাম খিদে

রেললাইন ধরে হেঁটে চলে ওরা

ভর করে শুধু জিদে

দিন থেকে রাত ভোর হয়ে যায়

পৌঁছতে হবে বাড়ি

এতসব কথা জানত না সেই

ধেয়ে আসা মালগাড়ি

হাঁটতে হাঁটতে চোখ লেগে আসে

লাইনেই রেখে মাথা

জনগণমন ঘুমিয়ে পড়েছে

ঘুমোয় গাছের পাতা

ঘাতকের নাম খিদে

ঘাতকের নাম রুটি

মরে গেলে তারা সাহায্য পায়

গণতন্ত্রের ঘুঁটি

আজকে মরেছে, মরবে কালকে

জানবে না কারা দায়ী

মানুষের মতো দুই পায়ে হাঁটে

ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june kobita

সৌম্যজিৎ আচার্য

ক বি তা

সৌ ম্য জি ৎ   আ চা র্য

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো ৩

তারে তারে ঝুলিয়ে এসেছি বন্দুক

ক্লিপে এঁটে এসেছি ছোট ছোট গুলিকেও

কিছু একটা ঘটলেই

আবার নেমে পড়ব মাঠে

তেমন কিছু দেখলে

আবার ছুঁড়ব পেটো

কিন্তু কিছুই ঘটছে না

ফুল ফোটা ছাড়া…

ঝুলে থাকা তারে অল্প অল্প

শুকিয়ে যাচ্ছে

পৃথিবীর যত ক্রোধ… ঘৃণা

 

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো ৪

আমরা একটা অলৌকিক জাহাজের সামনে বসে আছি

আমাদের পায়ের কাছে নীল রঙের ঢেউ

গোড়ালি ভিজিয়ে দিচ্ছে

এক এক করে আমরা সবাই গান শুরু করছি

আমরা গান গাইছি জোরে

সে গানে  জাহাজও সরে  যাচ্ছে দূরে

আমরা একটা অলৌকিক জাহাজের সামনে বসে আছি

আমাদের পায়ের কাছে সাদা রঙের ফেনা

ভিজিয়ে দিচ্ছে হাঁটু

জাহাজে ভরা আছে এক মজে যাওয়া পুকুর

হলদেটে তার রঙ

না জানি কে তাকে অর্ডার দিয়ে কিনেছে

জাহাজে করে একটা মজা পুকুর চলে যাচ্ছে ওপারে

এক  অলৌকিক গর্জনের সামনে বসে

আমরা শিখে নিচ্ছি অসীম নিস্তব্ধতা…

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june kobita

সমরেশ মুখোপাধ্যায়

ক বি তা

স ম রে শ  মু খো পা ধ্যা য়

গুজব

ফুলের বাগান দেখে ভয় করে
ঈশ্বরের সাথে কথা বলি
ফিসফিস ফিসফিস করে
হাওয়া ওঠে হাওয়ারা ছড়ায়…

 

গোপন রাস্তা খুঁজি
অন্ধকার সরু হয়ে আসে
আমাকে পেঁচিয়ে ধরে
সরীসৃপ তারা ফুটে ওঠে…

 

গুহার মধ্যে ঢুকি
ভেজা ও গভীর শূন্যে গর্ত নেমে যায়
ঈশ্বরের কানে কানে বলি
হাওয়া ওঠে হাওয়ারা ছড়ায়…

 

অন্তরীণ: ২

দূরত্ব গভীর হচ্ছে…

কথা বলতে ভয় করছে তাই

ঠোঁট নাক চাপা দিয়ে আছি…

দূরত্ব মৃত্যু মাপছে

ছিপখানি তের ফুট দূরে…

এইমাত্র ধুয়ে ফেলি সব

                     শ্মশান পোড়ার গন্ধ

মৃতদেহ উড়ছে হাওয়ায়…

দূরত্ব সময় মাপছে

ক্রমশ কী সরীসৃপ হয়ে যাচ্ছি নিজে

                সুড়ঙ্গ গভীর হচ্ছে

ঢুকে যাচ্ছে মন মুখ মাথা

আকৃতি পাল্টে যাচ্ছে রোজ

গিরগিটির লেজ অধিক

                    স্পষ্ট হচ্ছে

 র‍্যাটেল স্নেক

হ্যান্ড ওয়াশের নীচে একটু পাল্টে যাওয়া যামিনী রায়ের

                                                    ছবিগুলি…

ফোস্কা পড়া,গরম জলের ধোঁয়া

                           এর ওর গলা নিয়ে

                                          ছুটে যাচ্ছে রোজ…

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june kobita

রাজদীপ রায়

ক বি তা

রা জ দী প   রা য়

চুক্তিচাষ

সেলুনে, ক্ষুরের চাপে ঘাড় থেকে নেমে যায় চুল…

 

এতদিন যে মাটিতে ছিল পুষ্ট জলহাওয়ায়

শেকড় হারালো তার

 

দুপুর গড়িয়ে ক্রমশ বিকেল নামে

স্তূপ স্তূপ ফসলের গায়ে

              ভারী বুট নেমে আসে…

 

ঝাঁট পড়ে। চাপ চাপ চুলের পাহাড়

নিমেষে তলিয়ে যায় সরু নর্দমায়

 

সমবেত আত্মহননের ঠিক আগে

কারা যেন কৃষিকাজ শেষ করে নেয়…

 

ক্যাডার

গলা কেটে দিয়ে গেছে।

সেই থেকে রক্ত পড়ে–

 

রাস্তা ভিজে যায়…

 

ছেলেটির জন্যে কাঁদবার কেউ নেই।

 

শুধু পূর্ণিমার চাঁদ

জ্যোৎস্নার শাঁখাদুটি ভাঙে…

 

আরও পড়ুন...

Categories
kobita_may path_protikriya

পাঠ প্রতিক্রিয়া

পা ঠ প্র তি ক্রি য়া

শ তা নী ক  রা য়

‘লোচনদাস কারিগর’: এক অনন্ত অর্থহীনতার প্রতীক

আজকাল আর নিছক আনন্দ বা তাৎক্ষণিক সুখ উদ্রেকের জন্য কবিতা পড়ি না। আমি এমন কবিতা পড়তে চাই যার সামনে দীর্ঘদিন দীর্ঘ বছর আমি বিস্মিত হয়ে বসে থাকতে পারব। কোনো অর্থপূর্ণ প্রতিক্রিয়া নয়, শুধু কবিতার রেশটুকু থাকুক। গভীর নিদ্রা ভেঙে যাওয়ার পরও যেমন ঘুম থেকে যায়। ঘুমের জন্য শুধু নয়, সেই গভীরতার রেশটুকু থাকুক এটাই চাই। উৎপলকুমার বসুর ‘লোচনদাস কারিগর’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ছিলাম বেশ কিছুদিন হল। ওই বইয়ের ‘সপ্তর্ষি’ কবিতাটি আমার খুব প্রিয় কবিতা। উৎপলকুমার বসুর কবিতা আমার কাছে বড়ো একটা উদ্যানের মতো। এখানে সবরকম আশ্চর্যের বস্তু আছে, লোভের বস্তু আছে, প্রলোভন আছে, আবার এই সবকিছু থেকে দূরে একটা ফাঁকা নির্জন কোণ আছে যেখানে গিয়ে পাঠক একবারটি বসলে অনন্তের অনুভূতি পায়। যেন কোনো কিছুর ভেতর প্রবেশ করছি আমি, যে-জগৎটাকে বিশেষ জানি না আমি। যে-কবিতাটি উল্লেখ করেছি সেটার মধ্যে ‘সুষুপ্তি’ বলে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এই শব্দটা আমি প্রথম জানতে পারি প্রশ্ন উপনিষদ পড়ার সময়। তখন শুধু জানতাম তার অন্তর্গত উদ্দেশ্য সাধনা। একটা মানসিক নিবৃত্তির স্তর। 

‘সপ্তর্ষি’ কবিতায় ‘ভয়াবহ’ আর ‘সুষুপ্তি’ পাশাপাশি অবস্থানরত। হ্যাঁ, ওখানেই আবার ‘সাতখানি ঘুম’-এর উল্লেখ আমরা পাই। ‘উদ্বেগ’ শব্দটা কবিতাটিকে দিশা দেওয়া শুরু করে। আর আবিষ্কার করি তিনটি অদ্ভুত শব্দ ‘শূকরবাহিতা’, ‘খগবিলাসিনী’ আর ‘ডিগবাজিপ্রিয়’। পুরো কবিতাটি শ্লেষ এবং ব্যঙ্গ প্রবণতায় সিক্ত। অবক্ষয়ের কবিতা হতে গিয়েও কবিতাটি নিজ মহিমায় এই সবকিছু থেকে সুষুপ্তির দিকে ভয়াবহ হয়ে উঠল। এই জন্য শুধু নয় তার মধ্যেকার উত্তরণ প্রবণতা বাক্য গঠিত করল এমনভাবে যে, এখানে সুষুপ্তির হয়তো নতুন বিভঙ্গ তৈরি হল। অর্থহীন করে দিল সব। কবিতাটি উদ্ধৃত করছি: 

“গভীর উদ্বেগ নিয়ে শুয়ে পড়ি বিছানায়

                 সাতখানি ঘুম

                 আমাকে রয়েছে ঘিরে—

কেউ শূকরবাহিতা, কেউ খগবিলাসিনী, কেউ 

                   ডিগবাজিপ্রিয়

বয়স্য ক্লাউন, তার কুষ্ঠের সঙ যেন, ঐ পেটায় ঢোলক

                                    মাথায় কাগজটুপি

                                      পরনে ইজের

টানে শিল্কী ধরে সাধের ছাগলে—

                                      ওরা 

                         সাতখানি ঘুম আমাকে রয়েছে ঘিরে, বলে

                এখনি সঙ্গে চলো,

বলে—আয়

                গভীর উদ্বেগ থেকে

                          ভয়াবহ সুষুপ্তির দিকে।”

ওলোট-পালোট করে দেওয়া ভূখণ্ড মনে হয়। মনে হয় বহু বছর কোনো মানুষ এমন বোধের কাছে ঋণী হয়ে থাকতে পারে। সে পাঠক হতে পারে কিংবা স্বয়ং কবি। স্রষ্টাকেও অপেক্ষা করতে হয় জীবন তাঁকে কবিতা কীভাবে ফিরিয়ে দেবে। উৎপলকুমার বসুর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘হাঁস চলার পথ’ যেটা জয় গোস্বামী ও প্রশান্ত মাজীর উদ্যোগে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রথম কবিতাটি ‘হাঁস চলার পথ’ শিরোনামে কবি জীবিতকালে অনেকগুলো পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। আর প্রতিটি নতুন প্রকাশকালে কবিতাটি বদলে গিয়েছিল নানাভাবে। প্রতিটি কবিতাই একই শিরোনামে প্রকাশিত হলেও সেগুলো আলাদা আলাদা অস্তিত্বের মর্যাদা দাবি করে বলে আমার মনে হয়। সেই কবিতায় ‘হাঁস চলার পথ’ বোঝাতে গিয়ে যেভাবে আস্তে আস্তে মন্থর পদে স্মৃতিকে রোমন্থন করা আর তা নিয়ে আবিষ্কার আছে সেটা বড়ো আশ্চর্যের। সেখানে কবি বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাওয়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। যদি যুক্তি-বুদ্ধি সহকারে ভাবি তাহলে কবি তাঁর বাড়ির ঠিকানা ভুলে যেতে পারেন না। যতক্ষণ না তিনি ভোলার আপ্রাণ অভিপ্রায় নিয়ে নতুন কোনো ঠিকানার আশ্রয় চাইছেন। অতীত হাতড়ে হাতড়ে একটি হাঁস পরাবর্ত ক্রিয়া যেন। যেখান দিয়ে এসেছিলেন তারই অলিগলি, বিপুল টান আর মিশে যাওয়া— এটাকে গভীরভাবে চাইছেন। তারপর একটা ঘুম। তাঁর বহু কবিতায় ঘুমের প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসে। একে কোনো সংজ্ঞায় বাঁধার চেষ্টা আমি করব না। বরং কোনো অভিপ্রায়হীন মিলিত হওয়া মনে করি। নিজের সঙ্গে নিজেরই মিলিত হওয়া। সেরকই ওই ‘সাতখানি ঘুম’-এর প্রসঙ্গ। ঘুরে ফিরে আসে। যেখানে সময়ের যোগাযোগ কিংবা যোগসূত্র কেবল সময়হীনতার অন্ধকারে। ‘সপ্তর্ষি’ কবিতাটি অনেকবার পড়ে আমি দেখেছি সেখান থেকে সরাসরি কোনো অর্থ কেউ খুঁজে পাবে না। কবি সেখানে ঘুমের তারে বেঁধেছেন জীবনকে। সাতখানি ঘুম আর ভয়াবহ সুষুপ্তির এই অখণ্ড যোগাযোগ যেন চিরকালের বিচ্ছেদ আর সংযোগের কথা বলে। ছিঁড়ে যেতে যেতে ক্রমাগত যে-মানুষ চরম নেয় বিরতির পর আরও একবার ছিঁড়ে যেতে হবে তাকে। অদ্ভুত এই পৃথিবীর নিয়ম। অদ্ভুত যোগসূত্র আমাদের। সবকিছুর সঙ্গে এক বিপুল টান।                                      

এর আগের কবিতাটিই হল ‘তীর্থ’। যেন কবি তীর্থই করছেন। যাত্রা করছেন আবার কোনো সূক্ষ্ম জগতে। আলোহীনতার উদ্দেশে। এখানে কোনো নির্ণায়ক নেই। যে-কোনো পাঠক যেভাবে ইচ্ছে কবিতার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে পারেন। মানুষের সবার আগে মানস ভ্রমণ। বিচরণ করতে করতে সে শেখে। উৎপলকুমার বসুর কবিতায় বারবার নিত্যদিনের স্মৃতির টুকরো টুকরো মানচিত্র জুড়ে কবিতা হয়ে ওঠে। সেখানে যে-বৃহৎ চিত্রটির খোঁজ আমরা রাখি তার খানিকটাই আমরা পাই। কবি নিজেই ভালোবাসেন তীর্থ করতে। নানা অভিজ্ঞতার মিলিত ফসল তাঁর কবিতা। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা সরাসরি লুপ্ত হয়ে কোনো নিরাময় হয়ে আসে নয়তো নির্ণায়ক হয়ে দেখা দেয়। আর বাক্যের ভেতর শাব্দিক গঠনের সূক্ষ্মতা সেই তীব্র বাসনারই প্রতীক। কবি যেভাবে তীব্রভাবে যুক্ত এবং বিযুক্ত হতে চাইছেন। ‘তীর্থ’ কবিতাটির দুই নম্বর কবিতাটি পড়া যাক: 

“যাই সুখের ভিতরে নেমে, সিঁড়ি আছে, আলোও জ্বলছে, অনেক

অনেক বছর পর এই পথে কুয়াশায় দৌড়ে নামছি, বৃষ্টি পড়ছিল,

মহাবীর মন্দির-গুহায় রুপোর টুকরো, ভুল নয় নামার মুহূর্তে

ঠিক এ-ভাবেই দৌড়ে থাকি, সোনার ভিতরে নামি ধাতু ও তামার

উজ্জ্বল দণ্ড কাঁধে, সুখের ভিতরে নামি, হয়ত এমন

জটিল নামার জন্য মনগড়া শর্ত আছে, কেন বা পুরুষ

সুখের সন্ধানে যায় একা একা তারো কানুন রয়েছে, আমরা জানি না,

দৌড়তে ব্যস্ত থাকি, পাথরে পিছলে পড়ি, যাই গাছের শিকড়ে বেঁধে, 

                                             সেখানে ভোরের

আলোর ভিতরে জ্বলছে রাস্তার বাতিগুলি। আজো আমরাই প্রথম এসেছি।”             

‘লোচনদাস কারিগর’ বইয়ের প্রথম কবিতাটি ‘প্রকৃতি’ পড়তে গিয়েই লক্ষ করি একটা সুপ্ত তেজ সুপ্ত কারণ। কেন বেঁচে আছি তারই সুপ্ত কারণ লুকিয়ে আছে। ‘আগুন’ শব্দটি কবিতায় অনেকবার এসেছে। নিজেকে গোপন করে রাখার কবিতা এটি। নিজের গোপন থেকে বেরিয়ে আসার কবিতাও এটি। শূন্যে ভাসমান থাকার প্রসঙ্গ থেকে বহু জটিল আবর্তে কবি ফিরে এসেছেন ভ্রূণরূপী হয়ে। সেখানে নানা চিত্র বারবার ফিরে আসে। নানা আবর্ত নানা অবস্থানের কথা। সহাবস্থানের কথাও আসে। শ্বেত মেষরেখা আর শ্বেত শকুনের ডানা আসে। বুনো হাঁস। ভুলের কথা আসে। এটাই তো চিরন্তন বিভ্রম আমাদের। জড়িয়ে থেকেও কোথায় আবার লুপ্ত হয়ে যাই। শেষে পথের ফাটলের উল্লেখ তো এই আত্মগোপনকেই নির্দেশ করে। আর এই সবকিছুর কোনো যুক্তি কোনোদিন হয় না।                      

‘শীতকাতর ঘুমের ভিতর গভীরতর শীতের ঘুম আছে’ কবিতায় ‘অবরোহিতেশ্বর’-কে সম্বোধন করা হয়েছে। এই কবিতাকে কোন মাপকাঠিতে মাপব? এর কোনো সুরাহা করতে পারব না। ক্রমশ নানা ধরনের ইঙ্গিত কবিতাকে লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার গতি করেও কোথাও কোনো অন্ধকার বিজনে পাঠককে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আর অনিশ্চয়তার যাত্রা। অনেক কিছু। অবরোহন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে বারবার ভাবতে থাকা। পুনরায় সবকিছু হারানোর আশ্বাস আর ধ্বনি। একটু পরই লুপ্ত হওয়া। আর ঘুমের প্রসঙ্গে আবার বলতে ইচ্ছে হয় সেই পুরোনোকে আদিমকে আটপৌরে করে বেঁধে রাখা আরকী। এখান থেকে ভ্রমের উৎপাদন। ভ্রমনাশও এখানেই। 

‘সুখের কথা আর বোলো না’ কবিতাটি টানা গদ্যে লেখা। এখানেও জীবন আছে। গল্প আছে। কোনো বোধের কথা নেই। ইঙ্গিত নেই। শুধুই গল্প। এই বইয়ের অন্য কবিতাগুলো যেমন ‘বিজলীবালা’, ‘তদন্ত’, ‘রক্ষাকবচ’, ‘রণনিমিত্ত হৃদয় আমার’ সবেতেই এই ডায়ালেক্ট লক্ষ করি না। এই নিপাট গল্পের মধ্যে ভীন ভাষার উচ্চারণ প্রবণতাও লক্ষ করি। আরেকটি খুবই উল্লেখযোগ্য দিক হল এই কবিতারই দুই নম্বর কবিতাটি কিন্তু প্রথমটা থেকে অনেকটাই আলাদা। এই হল জীবন যা কবিতায় প্রতিবার খোঁজ করি। এই খোঁজের তীব্র অনন্য প্রয়াস কিন্তু লুকিয়ে থাকে কবি কীরকম ভ্রমের উৎপাদন করেন কিংবা কবিতাকেই জীবনের উপায় বলে বেছে নেন কিনা এর মধ্যে। চলতে চলতে যার ভেতর অসংখ্য অনুপুঙ্খ স্মৃতি উপার্জন করে কবিতা হয়ে ওঠে স্মৃতির দলিল। ইতিহাসচেতনা আমি একেই বলব তাই নয় কি!

      এই কাব্যগ্রন্থের ‘রাক্ষস’ কবিতাটি খুব আলোচিত কবিতা। এর মধ্যে একটা সহজ ইঙ্গিত আর ভাষার আবহে আস্তিত্বিক কথা বলার প্রবণতা লক্ষ করি। কবিতাটি একটু পড়া যাক:

“যেদিন সুরেন ব্যানার্জি রোডে নির্জনতার সঙ্গে দেখা হল।

তাকে বলি : এই তো তোমারই ঠিকানালেখা চিঠি, ডাকে দেব,

তুমি মনপড়া জানো নাকি? এলে কোন্‌ ট্রেনে?

আসলে ও নির্জনতা নয়। ফুটপাথে কেনা শান্ত, নতুন চিরুনি।

দাঁতে এক স্ত্রীলোকের দীর্ঘ, কালো চুল লেগে আছে।”

একেই কি আমি অন্ধকারের কবিতা বলব? চিরুনির দাঁতে লেগে থাকা দীর্ঘ কালো চুল আসলে কিসের প্রতীক হিসেবে ধরব? এখানে কোন উত্তরই পর্যাপ্ত নয়। তাই উত্তরের অপর্যাপ্ত রেশ কাটিয়ে উঠে এই বিভ্রমে মজে থাকার কথাই বারবার মনে হয়। পুনরায় আবার ‘সংসার’ নামক কবিতায় ফিরে আসে ঘুম। এই অবচেতন বারবার মুগ্ধ করে। আর এই মুগ্ধ করার থেকে বেশি বিভ্রম সৃষ্টি করে। এরকম একটি মহৎ বই সম্পর্কে খুব বেশি বলতে ইচ্ছে হয় না। আর এই বইয়ের শেষ কবিতাও সেই পূর্বাপর অনন্তের ইঙ্গিত রাখে।

 

প্রকাশ কাল । ১৯৮২, প্রকাশক । প্রতিবিম্ব

আরও পড়ুন...

Categories
goddyo

উজ্জ্বল পাঠ । পর্ব ১

উ জ্জ্ব ল পা ঠ । পর্ব ১

এই সংখ্যায় ষাটের দশকের কবি সুশীল ভৌমিকের কবিতা পাঠ করেছেন তরুণ কবি সেলিম মণ্ডল। প্রতি পর্বে  আমরা তাঁর কাছ থেকে শুনব এমনই আরও  উজ্জ্বল মানুষদের কবিতার কথা। ধন্যবাদ সেলিম।

সে লি ম   ম ন্ড ল

ভাষাহীন বেদনার ভাষা: সুশীল ভৌমিক

ভাষা ভুলে গেলে
গলগণ্ড দিয়ে কবিতা লিখব, তোমরা
পড়বে আর হাসবে সবসময়, যখনই মনে পড়বে
এভাবে ক্রমশ জুড়ে ফেলবে বন—

রাস্তা, পার্ক থেকে মাছের বাজার

তোমাদের গ্রন্থিতে ঘুম, সে-ঘুমও
হাসবে আমার কবিতার কথা মনে করে

—সুশীল ভৌমিক

আমাদের অন্ধকার কি কখনো কাটে? আলোর রক্তাক্ত দিনগুলোতে নাও ভাসিয়ে বহুদূর চলে যায় যে ঘরবাড়ি, সেখানে কেউ কি

পেতেছিল মাথা? শাদা তুলোর ব্যান্ডেজ নিরাময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে নিল বালিশের যৌনযাপন। ঘুম হল। গভীর ঘুম হলো কাদার মতো। তবুও আমরা কেঁদে উঠলাম না। আমরা পারলাম না, নক্ষত্রের দিনগুলোতে তারাগোনায় ব্যস্ত হতে। সাজানো আলোয় টুনি বালবের গার্হস্থ্যতা— আমাদের চোখকে করে দিল আরও অন্ধ। এই বোধহয় কবির নিয়তি। কবিতার জোছনা এতটাই অলৌকিক!

ষাটের দশকের প্রচারবিমুখ শক্তিশালী কবি সুশীল ভৌমিক। সম্ভবত ফেসবুকেই কারো পোস্ট থেকে নজরে এসেছিল তাঁর কবিতা। কিন্তু এই কবির বই কোথায় পাব? খোঁজ করে জানতে পারি কবিতা ক্যাম্পাসের অলোকদা, মানে অলোক বিশ্বাস সুশীল ভৌমিকের নির্বাচিত কবিতার বই করেছেন। তখন প্রভাতদার সঙ্গে আলাপ ছিল না। উনি আশ্চর্য হয়েছিল। আমার বয়স কত, কী করি, কেন সুশীল ভৌমিক পড়তে চাই— নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকেন। সালটা সম্ভবত ২০১৬। তারপর একদিন কফি হাউসের সামনে সাক্ষাৎ করে বইটি সংগ্রহ করি…

‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থে কবি লিখেছেন— “আমি কবিতা লিখে কখনও তৃপ্তি পেতাম না। ছিঁড়ে ফেলে দিতাম। এমন একটি কবিতাই প্রথম ছাপা হয় কলকাতার একটি পত্রিকায়। পরবর্তীকালে অসংখ্য পত্র পত্রিকা, যাদের প্রচ্ছদ ও লেখাগুলো এখনো উঁকি মারে— আমার প্রকাশিত বহু কবিতা সমেত সেগুলো ঝাঁকামুটের মাথায় তুলে দিয়েছি।  না কোনো পাণ্ডুলিপি নকল করার অভ্যেস আমার কোনোদিন ছিল না।”

একজন কবিকে বোধহয় জীবদ্দশায় এমনই সন্ন্যাসী হতে হয়। না হলে মোহ, ধ্যানভঙ্গ করে। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি, তবু’ প্রকাশিত হয় ১৯৯১ তে। তারপর ২০০৪ সালে নির্বাচিত কবিতা। কবির আর কোনো কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর পর পাওয়া যায়নি কোনো অপ্রকাশিত বা অগ্রন্থির কবিতা। হয়ত কোনো মুটের মাথায় সেই তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিত যাত্রায় গেছেন। 

বইটি খুলে প্রথম কবিতার প্রথম তিনলাইন পড়ি—

“স্ট্যাম্প সাইজের হরনাথবাবু যাচ্ছেন—

তার সাথে কথা হয় আমার সরষে সাইজের সব—

প্রতিবন্ধী রকমের কথাবার্তা”

এরপর সঙ্গে সঙ্গে বইটা বন্ধ করে দিই। এ কী আশ্চর্য রকমের উপমা ব্যাবহার? বাংলা কবিতা পিছিয়ে আছে? একজন ষাটের কবি যখন তাঁর কবিতাকে এভাবে ভাঙতে ভাঙতে নিজস্ব বাড়ি তৈরী করছেন, তখন আমাদের আফসোস কীসের?

বাড়িঘর ভাবতে গিয়ে ঘুম পায়, গভীরতা পায়

বাড়ি মানে…

মাঠে আমি, দূরে সব লোকজন

নেকড়ের দাঁতে তখন সরোদ বাজছিল

বাড়ি মানে মাথায় স্মৃতিশূন্য খুলি, রোদা অনুভব

যা কিনা বেজে ওঠে অতিসূক্ষ্ম অতলের

                                  কাছে…

আয়নাগুলো কথা বলে জল কথা বলে, আমি

থাকি একা শূন্য আমার গভীরে

                                      (বাড়ি)  

কবিতাটি পড়তে গিয়ে আরও চমকে উঠলাম। আমরা কেন বাড়িকে এভাবে ভাবতে পারি না। বাড়ি মানেই কি সংসার, মানুষজন, স্বাচ্ছন্দ্য দিনযাপন? বাড়ি মানে তো সত্যিই ‘মাথায় স্মৃতি শূন্য খুলি’। আমাদের পাওয়া। না-পাওয়ার একটা নীরব মাঠ, দূর থেকে যা সকলে দেখে। আর নেকড়ের দাঁতে বাজে সরোদ। আমরা শস্যভর্তি মাঠ নিয়ে এখানেই পারি শূন্যে, নিজের গভীরে। এখানেই একমাত্র আমরা হারিয়ে যেতে পারি। সুশীল ভৌমিকের এই বাড়িটি কি কখনো আমাদের বাড়ি হয়ে উঠেছে? হয়ত, হয়নি। হওয়ানোর চেষ্টা করিনি। ইঁট-বালি-সিমেন্টের বাড়ি আমাদের আশ্চর্য বাড়ি হয়ে উঠেছে। আর সেজন্যই হয়ত আমরা ছুঁতে পারিনি তাঁর কবিতার অন্তর…  

কবিতায় তাঁর এই উপমা ব্যাবহার অত্যাশ্চর্য লাগে। একজায়গায় তিনি লেখেন, “তবলার মতো বড়ো বড়ো ফোসকা পড়েছে গালে”। এই লাইনটির কথা ভাবুন। যেন চোখের সামনে ফোসকা আর তবলা একসঙ্গে ভেসে উঠছে। আর তার সাদৃশ্যতার চিত্রকল্প আমাদের ভিতর গান হয়ে বাজছে। কবিতায় উপমা যথাযথ ব্যাবহার হলে তার সুর আমাদের ভিতর দ্রিমি দ্রিমি বাজে। আরও কয়েকটি উপমার ব্যাবহার দেখুন—

“নখ ও ঘুষির বিয়েবাড়ি আমার বাহুদ্বয় জড়িয়ে ধরেছে”

বা

“এক হিজড়ে আবহাওয়ায় অদ্ভুত মানুষ হাঁটি”

বা  

“তুমি হাত দিয়ে ছেঁড়া অন্ধকারের চামড়া—/ ভেতরে গল্‌গলে ভেতো কুমড়োর ঢিবি/ যাচ্ছে— এই তোমার অদৃষ্ট—”

বা

“কমলালেবু ভেবে ধরলাম দুই ঠগের দু-হাত—/ জানি কমলালেবু স্বাস্থ্য ভালো রাখে/ খেতেও সুস্বাদু—”

কবিতায় এমন অজস্র লাইন তিনি ব্যাবহার করেছেন। মনে হয়— তিনি একজন পেন্টার। দালি, পিকাসো, নন্দলাল বসু একত্রে। সুরিয়্যালিজমকে এনেছেন মাটির সোঁদা গন্ধের ভিতর। ওখানেই যেন অঙ্কুরোদগম হয়ে গাছ হয়েছে। ফুল ফুটছে। পাখি বসছে। আর প্রসারিত হচ্ছে ছায়া। 

সুশীল ভৌমিকের কবিতায় প্রেম-বিষাদ ধরা দিয়েছে প্রকটভাবে। কিন্তু তিনি তার পরিধিটাকে এতটাই বিস্তৃত করেছেন আমাদের প্রবেশ করতে গেলে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। তিনিই বলতে পারেন “শান্তিপুরের লোকালে চলে যাচ্ছে, তাপসী/ একগাদা গোলাপ দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে আমার ভালোবাসা” অথবা “প্রতিদিন সোনার দুঃখ পড়ে থাকে ঘরের চৌকাঠে”। যে বিষাদ, প্রেম আমাদের অস্থির করে তোলে, তাকে তিনি থিত করে রেখেছেন। যা বুদবুদ করে চুইয়ে পড়লেও গড়িয়ে পড়ে না। ভিতরে আবার জমাট বাঁধে।  

এই আত্মানুভবের কবি থাকতেন বহরমপুরের খুব কাছেই সারগাছি রামকৃষ্ণ আশ্রমের আগেই ৭৭/১ নম্বর একতলা বাড়িতে। পেশায় শিক্ষক ছিলেন। ‘পোয়েট্রি ইন্টারন্যাশানাল’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। অমিতাভ মৈত্রের সাপলুডো থেকে জেনেছি, তিনি লিখতেন ঘোরের মধ্যে। একটু ব্যঘাত হলে অসমাপ্ত কবিতার পাতাটি ছিঁড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলে দিতেন জানালার বাইরে। কখনোই লেখার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতেন না।

কবি সুশীল ভৌমিকের কবিতার মূল্যায়ন হয়নি। আমরা এখন কবিতার নির্মাণ নির্মাণ করে নিজের বানানো লাল বলটা আকাশে ছুঁড়ে নিজেই ক্যাচ ধরি। আর সফলতার আত্মপ্রচারের মিছিলে বড়ো বড়ো ট্রফি নিয়ে আসি। কিন্তু নির্মাণকে যদি যাপনে আত্মস্থ না করা যায়, তাহলে একজন কবির মুন্সিয়ানা কোথায়? সাদা কাগজে বাঘ এঁকে হালুম হালুম করার জন্য কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাগে না। সুশীল ভৌমিক শব্দ ব্যবহার থেকে নতুন শব্দ তৈরী, নতুন বাক্যের সিনট্যাক্স তারপর ভাবনার পারদে তাকে চুবিয়ে নেওয়ার উত্তাপটুকু আস্বাদন করতে পারতেন বলেই ৬৪ পাতার কালো অক্ষরে চোখ নিজেই দূরবীন হয়ে আবার একটা স্বচ্ছ ক্যামেরার প্রতিলিপি হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় এই নিজস্ব সিগনেচার রয়েছে বলেন হয়ত, দু-একজন পাঠক এখনো তাঁর খোঁজ করেন। বই না পেয়ে সযত্নে রেখে দেন জেরক্স কপি।

তিনি কোন ‘রবারের কৃত্রিম আকাশে’ আমাদের শোনাতে চেয়েছিলেন, “ঝরবার জন্য একটা/ বোঁটার দরকার”। কিন্তু যার গাছই নেই সে কীভাবে পাতায় বোঁটার সন্ধান করবে?

একজন কবির কাছে নিরাময় কী? ডাক্তার, ওষুধ? নাহ্‌… শুধুই কবিতা। তিনি কবিতাতেই বেঁচে থাকতে পারবেন বলেই, মৃত্যুর ভয়ার্ত অন্ধকারকে আলোর মতো ভাবতে পারেন। দেখতে পারেন— হাসপাতালের ছাদে ঝরে পড়া ফুল।

হাসপাতালের ছাদে ঝরে পড়ো ফুল।

উঠে দাঁড়াক, শায়িত স্ট্রেচার;

ইসিজি মেশিন, হেসে ওঠো, যেন করকরে

                কোনও চলচ্চিত্র দেখতে গিয়েছে—

আর এখানে ঝরে-পড়া ফুলের বাগান উদ্বোধন করো;

ওই শাদা গম্ভীর মাকড়শা—

মায়া মুখার্জির মতো রবিবারে এই ঘর আলো করে দাও,

হাত ধরো;

ঘুরে-ঘুরে দ্যাখো, কী সুন্দর ভাল থাকা যায়;

বিছানার চাদরগুলি শান্তিপুরী— কী শোভন রুচিতে সাজানো।

লিফটে্‌ ছ-তলায় উঠতে-উঠতে কার না বাড়ির কথা মনে হয়!

                                                (হাসপাতাল)

ঋণ: সমীরণ ঘোষ

আরও পড়ুন...

Categories
kobita kobita_may

অরিন্দম বারিক

ক বি তা

অ রি ন্দ ম  বা রি ক

সংসার

কথা হয়েছিল প্রথম যে ফুল সূর্যের দিকে তাকাবে

তাতে আমার নাম লেখা হবে,

অথচ সে গাছে কোনোদিন ফুলই ফুটলো না

যে প্রজাপতি প্রথম  সাক্ষাতে  আমাকে

তার মনের কথা বলেছিল

সেও দেখলাম উড়তে উড়তে মেঘের দেশে হারিয়ে গেল

চোখ খুলে যে গ্রামে লালিত হয়েছি

তাকেই নিজের ঘর ভেবেছিলাম

কিন্তু সেটাও  শ্মশান হয়ে গেল মহামারীতে

এখন গঙ্গার পাড়ে বসে ছড় টানি দোতারায়

একটা আধটা  আধুলিতে  রচিত হয় দারিদ্র্য সংসার।

 

কৃষ্ণনাম

তোমার আঙ্গুল জুড়ে লাল চন্দন

বর্ষার ঘন মেঘ, মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি

শুনেছিলাম ব্রতকথা গুরু পূর্ণিমাতে

ঘাসের ওপর রাখা হাত, স্পর্শকাতর

দিনদিন রাতদিন  টিমটিমে আলো,

উড়ে আসে লোম ওঠা বুড়ো শালিকের পালক…

কতদিন, কতদিন আসনি তুমি

শুনিনি কৃষ্ণকথা, কৃষ্ণচূড়ার বদনাম

ধীরে ধীরে পুড়ে যায় জন্মের  ঋণ

তোমার খাতায় লেখা হয় কৃষ্ণের শতনাম!

আরও পড়ুন...

Categories
kobita kobita_may

সৈকত ঘোষ

ক বি তা

সৈ ক ত  ঘো ষ

অহংকারী সাক্ষাৎকার শেষে

অতিবেগুনি স্বপ্নেরা ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে। আসলে একটা সময় পর আমাদেরকে একা হয়ে যেতে হয়। রঙের চালাকি শেষে নিভে যায় রংমশাল। এরপর চেনা রাত্রি শব্দ সাজিয়ে দেবে অন্ধকার প্লেটে। গোধূলি ভুলে যাবে ভূমিকা। আমরা সম্পর্ক দিয়ে রচনা করবো অন্ধকার। অন্ধকার দিয়ে ভালো থাকার জ্যামিতিবক্স। ক্ষমতা আর অস্তিত্ব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে নিজেকে নির্মাণ করবে অবলীলায়। আরব্যরজনী থেকে বেরিয়ে আসবে শান্ত সিংহ। তার পায়ের তলায় জ্যোৎস্না, কপালে চৈত্রমাস। আমরা একে অন্যের দিকে ভয়ঙ্কর ভাবে তাকিয়ে থাকবো। ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে আসবে প্রিয় শহর। হে মাহেন্দ্রক্ষণ, অতীতের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে ট্রাপিজের খেলা।

আবহাওয়া দপ্তর বলছে আজ রাত থেকেই বজ্র বিদ্যুৎ সহ ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা…

অ্যাসাইলাম

তুমি জীবনমুখী হয়ে ওঠার বাহানায় নরকগামী হয়ে গেলে যেদিন

সেদিন প্রথম শর্টসার্কিট হয়েছিল মস্তিষ্কে।

তারপর থেকে আমি নষ্ট দুধে স্নান করি

প্রতিদিন।

ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে কুকুরের মতো ছিঁড়ে নিতে চাই জিভ।

শহরের নিকোটিনে জ্বলে ওঠে তোমার স্বচ্ছতোয়া চোখ।

আমি অন্ধকারকে এপিঠ ওপিঠ করে স্থাপন করি প্রেমের কবিতায়।

তারপর সূর্য নিভে যায়,

সমস্ত অপরাধবোধ ধুয়ে আমি আচমন করি অনিবার্য মৃত্যুকে…

আরও পড়ুন...

Categories
bangladesher_kobita kobita_may

মাসুদার রহমান

ক বি তা

মা সু দা র  র হ মা ন

মহামারির পরে 

সে ঘর ছেড়ে যাবার পর আবারও বিবাহের প্রস্তাব আসে।

এক মহামারির পর এক দুর্ভিক্ষ

 

দ্বিতীয় পক্ষকে বলি, ঘরে খবার কী আছে!

 

সীমানা ছড়ানো প্রান্তরে ছাউনিহীন এক পাকশালা। ঠা ঠা দুপুর।

জলভর্তি হাঁড়ি চাপানো রয়েছে উনুনে।

উকিঁ দিয়ে দেখি, হাড়িতে আস্ত এক সূর্য!

ঝলসিয়ে তাকেই এবার খাব

 

গেরিলা

বৃষ্টির পর ভেজে মাটির উপর পা ফেলবার চিহ্ন রেখে

একটি খরগোস জঙ্গলের গভীরে চলে গেল

 

তার যাওয়ার পথে দিকে মুগ্ধ তাকিয়ে আছি

 

রাত এলো

 

অগনন তারা ফুটেছে আকাশে। ওই যে মিল্কওয়ে গ্ল্যাক্সি, সেখানেও এক গেরিলা

আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত পা ফেলে হেঁটে গেছে

 

দূর দিগন্তের জঙ্গলের ওদের গোপন আস্তানা

 

প্রিয় নিম গাছ

নিমগাছটির ছায়া বিকেলে বারান্দা পর্যন্ত চলে আসে

 

চা-মুড়ি খেতে খেতে দেখি—

 

আদুরে বিড়াল ছানার মতো নিমগাছটি ছায়া হয়ে উঠে বসেছে

আমার কোলের উপর

আরও পড়ুন...

Categories
anubad

কাহলিল জিব্রানের কবিতা

অ নু বা দ

প্রতি সংখ্যায় কবি অমিতাভ মৈত্র হাজির থাকবেন কিছু বিদেশী কবিতার বাংলা  অনুবাদ নিয়ে। এই সংখ্যায় কাহলিল জিব্রানের কবিতা।

উত্তর লেবাননের বিকারিতে ১৮৮৩সালে জিব্রানের জন্ম। বাবা ও মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর বারো বছরের জিব্রান মায়ের সাথে আমেরিকায় চলে যান আর বস্টনের এক বস্তিতে থাকতে শুরু করেন। জিব্রানের অসাধারণ চিত্রাঙ্কণ দক্ষতা আর গুরুগম্ভীর বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ঐ বয়সেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ছয় বছর হাই স্কুলে পড়াশোনার জন্য লেবাননে ফিরে যান। তারপর বস্টনে ফিরে আরবি সংবাদপত্রে নিয়মিত গল্প ও কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯০৪সালে বস্টনে তাঁর ছবির প্রথম প্রদর্শনী। এর ক বছর পরেই তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘অল মিউজিকা’ প্রকাশিত হয়।

অ মি তা ভ  মৈ ত্র

কাহলিল জিব্রানের কবিতা

গারদ হিসাবে জায়গাটা হয়ত খারাপ নয়, কিন্তু আমার আর পাশের বন্দীর মধ্যে এই দেয়াল আমার ভাল লাগেনি। তবে এটাও বলি যে, আমি কিন্তু কোনোভাবেই নিন্দে করছি না ওয়ার্ডারের। এই গারদ যে বানিয়েছে তারও নয়।

কাকতাড়ুয়াকে একদিন বলেছিলাম— “একা মাঠে সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকতে তোমার নিশ্চয়ই খারাপ লাগে, ক্লান্ত লাগে।” হেসে বলল সে— “অন্যকে ভয় দেখানোর আনন্দ তুমি হয়তো জানো না। আমি উপভোগ করি আমার অস্তিত্ব।” একটু ভেবে বললাম— “এই তৃপ্তি হয়তো মাঝে মাঝে পেয়েছি আমিও।” হাসল সে— “পাওনি। যারা শুধু খড়ে ঠাসা, এই তৃপ্তি কেবল তাদের।” আমাকে তাচ্ছিল্য না প্রশংসা করছে সে, স্পষ্ট হল না। সরে গেলাম।

এক বছর পর আবার যখন দেখলাম সেই কাকতাড়ুয়াকে, সে তখন দার্শনিক হয়ে গেছে। দুটো কাক তাঁর টুপির নিচে বাসা বানাচ্ছে।

মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করতে আসেন দেবদূত আর শয়তান। দেবদূত এলে পুরনো একঘেয়ে একটা প্রার্থনা সঙ্গীত গাই, যাতে তিনি বিরক্ত হয়ে চলে যান। আর যখন শয়তান আসে আমি খুব প্রচলিত আর পুরনো একটা অপরাধ করার চেষ্টা করি। বিরক্ত মুখে চলে যায় শয়তানও।

দুটো খাঁচা আছে বাগানে। একটায় থাকে নিনাভা থেকে আনা সিংহ। আর অন্যটায় গান ভুলে যাওয়া এক ময়না।

প্রতিদিন সকালে ময়না সিংহকে বলে, “সুপ্রভাত, আমার বন্দী ভাই!”

একজন প্রাচুর্যে থাকা মানুষ আর একজন সর্বস্বান্তের মধ্যে পার্থক্য শুধু একদিনের অনাহার বা কয়েক ঘন্টা তৃষ্ণার।

এমনকি জীবনের মুখোশও একই রকম গভীর রহস্যময়।

দয়া আসলে অর্ধেক বিচার।

মায়ের হৃদয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে যে গান, শিশুর ঠোঁটে সুর হয়ে আসে সে।

আরও পড়ুন...