Hello Testing

3rd Year | 8th Issue

১লা মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | 15th January, 2023

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

বি শে ষ  র চ না

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

rajib2

'ড্রাফট অফ দা শ্যাডোস': একটি ভিন্নমাত্রার স্বল্প দৈর্ঘ্যের কাব্য-চলচ্চিত্র

কবি অমিতাভ মৈত্র লিখেছিলেন- ‘তেতো মন্তব্যের মতো এই জানালা তুমি এড়াতে পারবে না মায়েস্ত্রো/ এক ধাপ নেমে দাঁড়ালেই দেখবে ব্লেড তোমার বোতামের দিকে এগোচ্ছে…’। ভাষার ইন্দ্রজাল যা নিছক স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের সম্মিলিত দার্ঢ্য থেকে তিলে তিলে তৈরি হওয়া তিলোত্তমা মায়া, কিম্বা ক্রোধের ধারাপাত। এই শাব্দিক বোধ কবিতার ন্যারেটিভকে পাঠকের স্থানিক ও কালগত অবস্থান ভেদে এক পরম  আশ্রয় দান করে… যাকে তার্কোভস্কি বলেন ভাষার বর্ম;  তা বাস্তব অথবা সেলুলয়েডের মৌলিক মাধ্যমে, যেখানেই হোক না কেন। সেই কাব্যচলৎযানচিত্রকেই নির্মম ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ড্রাফট অফ দা শ্যাডোস’ নাতিদীর্ঘ সিনেমাটিতে। মৌসুমী চ্যাটার্জী পরিচালিত কবি অগ্নি রায়ের কবিতা নির্ভর এই কাব্য–চলচ্চিত্রটিতে আবহ রচনা করেছেন অনুপম রায়। অনুপম রায়ের আবহ রচনা এক অন্য মাত্রা সংযোগ করেছে ছবিটিতে। আমরা একবার পড়ে নি কবি অগ্নি রায়ের যে কবিতাটি ভিত্তি করে নির্মাণ হয়েছে এই ছবিটি—

“কারশেডের ছায়াকে পিঠে নিয়ে বসে থাকা ঘাট, বহু হত্যার অমনিবাস উল্টে দেখে ভাসিয়ে দিয়েছে পরীদের কাছে। তামাদি সাক্ষ্য প্রমাণ আর ঘেঁটে যাওয়া কাজলের ব্যবহার তাদের পাতায় কয়লার মত নির্ঘাৎ। জলজ তদন্তের শব্দ আছড়ে এসে পড়ে শৈশব দূরত্বে। আততায়ী দূরের ব্রিজে হেলান দিয়ে বাতাস খতিয়ে দেখে। আলগোছে ধরিয়ে নেয় পরবর্তী সিগারের বিশ্বস্ত আগুন। এবার সে মুছে দেবে হত্যার চিহ্ন ও বিভা। খবর জানাজানি হওয়ার আগে খাপে রাখা পেন্সিল খুলে শেষ নৌকাটা অন্তত এঁকে ফেলতে হবে তাকে”

‘সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়’– এই শব্দগুলিই যেন আছড়ে পড়ছে এখানে মুহুর্মুহু। ঋত্বিকের ভাষায় “random triggering”। ইতিহাস থেকে সমকাল জুড়ে মহাকালের রাজপথে যে ছায়া তা বঞ্চনার, ক্ষয়ের, লোহিতাশ্রুর, হত্যার, মৃত্যুর, ক্ষোভের। এক অদ্ভুত আঁধারের নির্দেশক এই ছবি যার স্তরে স্তরে যে যন্ত্রণার চিহ্ন আঁকা হয়েছে তা দেখে কেউ বলতেই পারেন “এখনও পৃথিবীর শিকারপর্ব চলছে।” মহাকাল উল্টে চলেছেন এক ‘হত্যার অমনিবাস’।

হ্যাঁ, এই হত্যার রেশ বয়ে চলেছে আমাদের পার্শস্থ মানুষজনের হত্যায়– প্রতিবাদের গলা টিপে শেষ করে ফেলার দর্পিত হুঙ্কারে, যেখানে আমাদের পৈশাচিক আহ্লাদ মুখ বেঁধে দেয় — নিয়ে যায়  আনন্দসাগরে। সেইসব স্বর এই বায়বীয় পৃথিবীর নেশার জাল ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলে, যখন আমরা দেখি লক্ষ্য চেষ্টা সত্ত্বেও মৃত্যুর হাতছানি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় — বিচ্ছিন্ন করে, আর সেই ভয়কেই ফুটিয়ে তুলেছে সাদা ক্যানভাসে সোজা নেমে আসা রক্তের দাগ। ধর্ষণের জন্য উদ্ধতলিঙ্গ নিছকই একটা কায়েমি ক্ষমতার আনুগত্যকামী হুঙ্কার, “All dark fibres of power  and hatred from time immemorial blended with each other and smuggled like charcoal in the eyes of the rape survivor.”

ক্ষমতার শান্ত চোখ বাস্তবেই এক বিকৃতির ইঙ্গিত। তার প্রকাশ ঘটে মুহুর্মুহু। ঘটে জলে -স্থলে- অন্তরীক্ষে -নাগরিক ‘সুসভ্যতায়’। ঘটনার কোলাজে, প্রযুক্তির আধুনিকতম প্রস্বরেও সেই সুসভ্য-বর্বরতাকে, হিমশীতল হত্যার হুমকিকে এড়ানো যায় না — তবে এখানেও কি  সেই যক্ষপুরী — সেই রাজকীয় দম্ভের পানসে হুঙ্কার! বর্তমান চলচ্চিত্র সেই ‘বিশ্বস্ত আগুন’, সেই ‘smell of ashes’-ই আমাদের উপহার দেয়।

সব গল্পেরই একটা শেষ থাকে…. সেই শেষ যেন এক অনন্তযাত্রার ইঙ্গিতবাহী। জীর্ণতাকে ছাপিয়ে সেই যাত্রা এক শূন্যতা থেকে আর এক অসীমের পথে প্রবহমান। তাই গল্পের শেষে এক নির্মল শৈশব তার কাগজের পানসি নৌকা বানিয়ে ফেলে, যাতে রঙ কেবল দুটি। আর মাথার ভিতরে বেজে ওঠে “…. only two colours are enough to express the whole story”।

কবিতায় ভেসে থাকা এই কাব্য – চলচ্চিত্র যে শূন্যতাকে আমাদের উপহার দিয়েছে তা কি তবে সত্যিই শূন্য, নাকি এক দৃঢ় মৃত্যুঞ্জয়ী উচ্চারণ “Death is finished. It is no more”-এর নিশান! হয়তো এই আপ্তবাক্যই আমাদের আশ্রয় দিয়েছে মৌসুমী চ্যাটার্জী পরিচালিত এই কাব্য-চলচ্চিত্রটি ‘ড্রাফট অফ দা শ্যাডোস’…. যেখানে কবিতা বিমূর্ত নয় আর বরং তা আমাদের প্রতিবেশী দুর্দশার এক মৌলিক সাক্ষ্য হয়ে উঠেছে। মৌসুমী চ্যাটার্জীকে অসংখ্য ধন্যবাদ সারা পৃথিবীর কাব্যপ্রেমীদের এমন একটি অসাধারণ কাজ উপহার দেওয়ার জন্যে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তাঁর পরবর্তী কাজগুলির দিকে। কবিতা নিয়ে তাঁর এমন পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

index

ছবিটি দেখতে ক্লিক করুন নিচের আইকন-এ…

আরও পড়ুন...