Hello Testing Bangla Kobita

Advertisement

1st Year | 10th Issue

রবিবার, ২৮শে চৈত্র ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th April 2021

ছো ট  গ ল্প

পৌ ল মী   গু হ

ভয়ের গল্প

ঘটাং ঘটাং করে কলের শব্দ হচ্ছে। দোতলার বারান্দায় এতোক্ষণ অনেকটা রোদ ছিল। এবার সরু একটা দাগের মতো হয়ে আসবে। তারপরই সন্ধে নেমে আসবে। মুনিয়ার মুখস্থ সব। লক্ষ্মীপিসি খাবারের এঁটো থালা ধুয়ে রান্নাঘর বন্ধ করে ওপরে এসে ঠামির ঘরে বসবে। তারপর ঠামি উঠলে সন্ধে দেবে, মুনিয়ার খোঁজ পড়বে তখন। রোজ স্কুল থেকে ফিরে এক রুটিন। না, রোজ ঠিক নয়। মা কোনো কোনো দিন মুনিয়াকে খাইয়ে দেয়। সেদিন লক্ষ্মীপিসির ছুটি। মা-ই সন্ধেবেলা চুল বেঁধে দেবে। সেইদিনগুলো মুনিয়ার ভালো লাগে।

আপাতত মুনিয়া দোতলার বারান্দা থেকে রেলিং-এর ফাঁকে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তার আদরের মিউ ঠাণ্ডা মেঝেতে পেট চেপে শুয়ে আছে। মা’র ঘর থেকে ফ্যান চলার শব্দ আসছে। দরজাটা বন্ধ। আজ মা চুল বেঁধে দেবে না। সন্ধে হলে মুনিয়াকে ঠামি নিজের ঘরে বসিয়ে রাখে। বইখাতা নিয়ে ওখানেই পড়ো। ঠামির ঘরে টিভি নেই, ঠামি চোখে ভালো দেখতে পায় না। লক্ষ্মীপিসি খাওয়ার সময় হলে থালা এনে খাইয়ে দেয়। রাতে নীচে নামা বারণ, কেন মুনিয়া জানে। যদিও ঠামি ভাবে যে ও কিছুই বোঝে না!

মুনিয়া মনে মনে হাসে। বড়োরা নিজেদের কীইই চালাকটাই না ভাবে। এই তো স্কুলেই সুদীপা ম্যাম টিফিনের সময় ফোন নিয়ে টীচার্স রুমের পাশে স্টোর রুমে চলে আসে। তারপর গল্প চলে ফিসফিস করে। ওরা সবাই দেখেছে, কী হাসি তখন ম্যামের মুখে। অথচ ক্লাসে আসলেই মনে হয় রেগে আছে! ওদের মধ্যে আলোচনাও হয় কার বাড়িতে কার দিদি বা দাদা টিউশন ফাঁকি দিয়ে প্রেম করতে যায়। তমালীটা এত্তো বোকা, একদিন বলে ফেলেছিল, “আমার বাবা না থাকলে জানিস দুপুরে ডাক্তারকাকু আসে। আর মা দরজা বন্ধ করে সারা দুপুর প্রেম করে!” এই শুনে অতনুকা, প্রজ্ঞার কী হাসি! রিমিল তো বলেই ফেলল, “ছিঃ! তোর মা এখন প্রেম করে? তোর সঙ্গে মিশবো না তাহলে!” মুনিয়ার মনে আছে তমালীর মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল। মনে হচ্ছিল কেঁদেই ফেলবে। প্রজ্ঞা তাড়াতাড়ি করে বলেছিল, “এই রিমিল, বেশি পাকামি মারিস না তো। বড়োদের কথা নিয়ে এতো আলোচনাই বা কীসের? অন্য গল্প কর!” প্রজ্ঞা ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল, তার ওপরে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। মুনিয়া অবশ্য তমালীর মতো বোকা নয়। বাড়ির কথা বাইরে বললে নিন্দে হয়, এটা ঠামি বারবার বলে। আর ঠামি লুকোলেই বা কী? মুনিয়া জানে তার বাড়ির কথা শুনলে প্রজ্ঞাও তার সঙ্গে মিশবে না। কাজ কী ওইসব আলোচনা করে!

তাই সে মিউকেই বলে সব। মিউ তো কাউকে বলতে যাবে না আর। বললেও কেউ বুঝবে না। অবশ্য মিউয়ের যায় আসে না এসবে। ও খালি মাছ খেতে পেলেই খুশি! বসে বসে ঢুলুনি আসছে। কিন্তু এখন ঘুমোলেই রাতে ঘুমোতে দেরি হবে। আর জেগে থাকতে একটুও ভালো লাগে না। তাই কষ্ট হলেও বসে থাকে মুনিয়া। আড়ে আড়ে চায় রোদটা সরু হয়ে আসছে কিনা। ঠামি তো আরামে ঘুমোচ্ছে, পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লেই হল। শুধু রাতে দেরি করে ঘুমোবে না বলে কষ্ট করতে হয়।

এই বাড়িতে সন্ধে নামে যেন হুট করে। রোদ চলে গেলেই কেমন ছায়া ছায়া সোঁদা একটা ভাব। কী যে অস্বস্তি লাগে তখন। এতো বড়ো বাড়িতে লোক মাত্র পাঁচটা। তারা তিনজন আর কাজের লোক। গোটা বাড়িটা কেমন থম মেরে থাকে। কেউ আসেও না তেমন। আসার মধ্যে ওই ছোটোপিসি, তাও বছরে একবার। মুনিয়ার তো মামারবাড়িও নেই যে ওরা কেউ আসবে। সত্যি ভগবান যে কেন ওকেই মামাবাড়ি দিলো না! এই শেষ বিকেলটা ওর একদম ভালো লাগে না। মনে হয় অন্ধকার নামলেই যতো খারাপ ঘটনা ঘটবে। যতোক্ষণ দিনের আলো থাকে ততোক্ষণই শান্তি। তারপরেই সব খারাপ হয়ে যায়। ওর পৃথিবীটা আর পাঁচটা মেয়ের মতো না তো, ও বোঝে। তবে ও এও দেখেছে অনেকেই ওর মতো ভোগে, তারা মুখে স্বীকার করে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ওর তুলনা হয় না। তাদের কারও এতো বড়ো বাড়ি নেই, গাড়িতে করে স্কুল যায় না তারা। কাজের লোক নেই তাদের। বরং তাদের মা’রাই লোকের বাড়ি কাজ করে। তারা ওর মতো অতো গুটিয়েও থাকে না, কিছু লুকোতেও হয় না। ওরা সামনেই বলে সব, ওদের তার মতো ভয় করে না। ও ওদের মতো হতে পারবে না ও জানে। ঠামি ওকে কিছু না বললেও ও যে সব টের পায় তা বোঝে নিশ্চয়ই। নইলে রাতের খাওয়াটা ওপরে সারতে বলে কেন? কিন্তু ঠামিও তো কিছু করতে পারবে না। মা-ও দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে। ঠামি মা-কেও তো কিছু বলতে পারে না! মুনিয়া ভাবে, বড়ো হলেই ও এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু বড়ো হতে ঠিক কতোটা দেরি ও জানে না। অগত্যা সন্ধে নামলেই ভয় এড়াতে ঠামির ঘর। রাতেও ঠামিকে জাপটে শুয়ে থাকে ও। ঠামি বোঝে সব, ওকে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

আগে বুঝতো না, জেদ করতো। কান্নাকাটি করতো, মা’র কাছে যাবে বলে বায়না করতো। ঠামি রোজই “আমার সোনা দিদি, কাল তোমায় আমি রসোগোল্লা খাওয়াবো। এমন করে না…” এসব বলে চুপ করাতো। একদিন ঠামি জপ করতে করতে বুঝি ঝিমিয়ে পড়েছিল। ও তরতর করে নেমে এসেছিল নীচে। নামার সময় যদিও ভয় লেগেছিল খুবই। সিঁড়িটা অন্ধকার মতো। উঠোনে একটা কম পাওয়ারের হলুদ আলো, তাতে যতো না আলো তার চেয়ে বেশি আলো-আঁধারি হয়ে আছে। তার মধ্যেই দেখেছিল সে, একটা লোক রান্নাঘরের সামনেটায় দাঁড়িয়ে একজনকে জাপটে ধরে রেখেছে। আবছা আলোয় বুঝতে অসুবিধা হয়নি ওই দু’জন কে। আর কেমন একটা অদ্ভুত কারণেই দোতলার বারান্দায় চোখ চলে গিয়েছিল। দেখেছিল, মা দাঁড়িয়ে আছে রেলিং-এর পাশে। চুল খোলা, মা’র চোখ-মুখ ও দেখতে পায়নি।

কতোক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়েছিল কে জানে, লক্ষ্মীপিসির হি হি হাসির শব্দেই সংবিৎ ফিরে পেয়ে নিঃশব্দেই উঠে এসেছিল আবার। ঠামি জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, “হিসু গেছিলাম।” ওপরেই বাথরুম আছে, তাই ঠামি সন্দেহ করেনি কিছু। সেদিন থেকে লক্ষ্মীপিসির কাছে ওর খেতেও ইচ্ছে করে না। দেখতেও ইচ্ছে করে না ওর মুখটা। ঠামিকে বলতেও পারেনি ও। তবে সুযোগ পেলেই ও লক্ষ্মীপিসিকে কিল-লাথি মারে। ও ঠামিকে অভিযোগ করে, মুনিয়াকে দু’একবার মারতেও গেছিল। ঠামি দেখে ফেলে এমন সব কথা শুনিয়েছিল যে আর সাহস পায়নি! ও তো তমালীর মতো বোকা নয় যে বন্ধুদের কাছে বলে ফেলবে লক্ষ্মীপিসির কথা। তাই ওকে মনের রাগ মনেই চেপে যেতে হয়েছে। আর তারপর থেকেই ও মা-কে বিশেষ নজরে দেখতেও শুরু করেছে। মা কেমন রোগা, চোখের কোলে কালি, কেন মা দরজা বন্ধ করে বসে থাকে, ঠামির সঙ্গেও ভালো করে কথা বলে না, মুনিয়াকেও আদর করে না, এসবের একটা মানে ও খুঁজে পেয়েছে। আগে মা’র ওপর রাগ হতো, এখন হয় না আর।

কিন্তু ভয়টা তো থেকেই গেছে। মা’র বন্ধ দরজা, লক্ষ্মীপিসির হি হি হাসি, ওই লোকটার মাঝে মাঝে এসে ‘মুনিয়া মা’ বলে আদর দেখানো, ঠামির চোখ-কান বুজে রোজ সন্ধে থেকে রাত অবধি জপ… ভয়টা তো থেকেই গেছে। মুনিয়া একদিন বড়ো হয়ে এই ভয়টাকে এখানে ফেলেই চলে যাবে। ওর ক্লাসের ওই সাহসী মেয়েগুলোর মতো হবে যারা নিজের মুখেই বলে, “বাড়িতে আর পড়ার টাইম কই? বাপ মদ খেয়ে এসে মা-কে পেটাচ্ছে। ভাইবোনগুলোর খোয়ার। আমাকেই সব দেখে রাখতে হয়। পড়া গেছে গিয়ে!” সেসব শুনে ক্লাসের ‘ভালো’ মেয়েরা শিউরে ওঠে, ওদের শুনিয়েই বলে, “আমাদের বাবা-মা ভাগ্যিস ওরম করে না!” ওরা ওর মতো ভয়ে ভয়ে গুটিয়ে থাকে না। এই বাড়িটা, এই লোকগুলো, ওর উদাসীন দুঃখী মা, লম্পট বাবা, অসহায় ঠামি সবাই-ই তো লুকিয়ে লুকিয়েই থাকে। ও এদের মতো থাকবে না। এই জঘন্য বাড়িটা, যেটা সন্ধে হলেই ওকে ভয় পাইয়ে দেয় আজকাল, সেই বাড়িটায় ও থাকবে না।

মুনিয়া খেয়াল করে রোদের দাগটা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে…

আরও পড়ুন...