Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 3rd Issue

রবিবার, ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 8th August 2021

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

অ মৃ তা   ভ ট্টা চা র্য

amrita2

‘তীব্র’ ‘কোমল’ খাতে: স্কিৎজোফ্রেনিয়া ও কবিতা

নরম অন্ধকারের সবুজ থাকে একটা। সে প্রতিবিম্বময়। কালচে সবুজ পাতা, ভাঙা পাথরের গায়ে থকথকে সবুজ শ্যাওলা পেরিয়ে এক একটা শুদ্ধস্বর এগিয়ে যায় কোমল মাত্রার দিকে। সুষুম্নাকাণ্ডের মূলে টনটন করে ওঠে ঋষভ। আমৃত্যু শুদ্ধ থাকার দায় নেই কারো। আলোর উন্মুক্ত ঘূর্ণিতে বনবন ঘুরতে থাকে পাপড়ি, নদী, চেনা-অচেনা মুখ। অন্ধকার ছত্রাক চেতনা। তবু প্রবাহে বাধা থাকে কই? অলীক আলস্যে ষড়জ গড়িয়ে নামে ঋষভে। চমকে ওঠে কান। কেমন যেন কম সুর লাগলো মনে হয়! তবু এই ঋষভ বেসুরো নয়। যেন অন্যমাত্রার কোন সুর। এ যেন অন্যসকাল। গুরু বলেন, “চেনা শুদ্ধ স্বরে কি সকাল হয়? নতুন আর অচেনা বলেই তো সে সকাল!” প্রতিটা সকালে তাই অচেনা ঋষভ আসে। কোমল ঋষভ। আহির ভৈরব ছুঁয়ে ঘোরাফেরা করে গান্ধারটাও প্রয়োজনের তুলনায় কেমন যেন কোমল হয়ে যায়! বেলা বাড়তে থাকে চেনা ভৈরবীর হাত ধরে। চেনা শুদ্ধ সব একে একে অন্যমাত্রার হয়ে আসে। সেইসব অন্যমাত্রারা বেসুরো নয় তবু। বারান্দায় একফালি রোদ এসে পড়ে। হাওয়ায় স্বর্ণচাঁপার আড়মোড়া ভাঙা গন্ধ। মানবমনের চিন্তা— মাত্রা-মাত্রাহীনতা, চেনা-অচেনা, শুদ্ধ-কোমল, সুর-বেসুর— এসব পরোয়া করেছে কবে? চিন্তা কোন মাত্রায় থাকলে ‘সুস্থ’, আর কতটা মাত্রাছাড়া হলে ‘অসুস্থ’— সে হিসেব বড় গোলমেলে। বিশেষত, কবিতার প্রসঙ্গে সুস্থ-অসুস্থের মাপজোক হলে হিসেবটা আরো গোলমেলে হয়! তাই বোধহয় উইলিয়াম শেক্সপিয়ার প্রেমিক, পাগল আর কবিকে এক বাক্যে একই মঞ্চে রেখেছিলেন!

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সি লম্ব্রোসো (C. Lombroso) ‘হেরেডিটারি টেইন্ট’-এর (hereditary taint) ধারণাকে অবলম্বন করে পাগলামি এবং সৃষ্টিশীলতার মধ্যে একটি সংযোগ দেখিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে স্কিৎজোফ্রেনিয়া এবং সৃষ্টিশীলতার মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক দেখিয়েছেন। স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগীদের যেটা সবথেকে বড় লক্ষণ হয় সেটা হলো, তারা ‘সেলফ’ আর ‘নন-সেলফ’ এর মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে পারেনা। সেলফ আর নন-সেলফ এর মধ্যে পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেলার অর্থ হলো আমাদের ‘ইগো বাউন্ডারি’ বা ‘আমি’র কাঠামোটা হারিয়ে ফেলা। অর্থাৎ, এই ‘আমি’র অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য ‘আমি’র চারপাশে একটা শক্তপোক্ত পাঁচিল দেওয়া প্রয়োজন। এই পাঁচিলটাই ‘আমি’কে অন্য সবকিছু থেকে আলাদা করে রাখে। যদি না আমি এই পাঁচিলটা চিনতে পারি, ‘আমি’কে অন্য বাকি সব কিছুর থেকে আলাদা করতে না পারি, তাহলে আমি’র অস্তিত্ব আলাদা করে অনুভূত হবে না। পাঁচিলের বাইরে এই ‘আমি’ ভীষণ ছড়ানো— এত বেশি ছড়ানো যে সব কিছুর সঙ্গেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলার প্রবণতা থাকে। এই ভীষণভাবে ছড়িয়ে যাওয়া ‘আমি’র টুকরোগুলোর ওপরে আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না তখন। মনোবিজ্ঞানী রুস্ত (Rust) বেশ কিছু সহকর্মীর সঙ্গে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগীর মস্তিস্কের প্রকৃতির সাদৃশ্য দেখিয়েছিলেন। মনোবিজ্ঞানী বাক (Buck) এবং ক্র্যামার (Kramer) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিছু স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীর কবিতা লেখার প্রতিভার কথা বলেছিলেন। Split selves অর্থাৎ ছড়িয়ে পড়া ‘আমি’রা শুদ্ধ, কোমল বা তীব্রের পার্থক্য নিয়ে মাথা ঘামায় না। প্রতিটা স্তর, প্রতি মাত্রা, চেনা-অচেনা সব একাকার তখন। কবিতাও কি তাই?

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলো ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় সব শুদ্ধ পর্দা। সাদা-কালো, ওপর নিচ, সত্যি-মিথ্যে, শুদ্ধ-কোমল-তীব্র অনেকটা ছাড়াছাড়ি – আলাদা আলাদা সব। সেই সব পর্দার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে বুঝতে ক্লান্ত ডেভিড ১৬ বছর বয়সে নেশাপান শুরু করে আকণ্ঠ। ডেভিড হলওয়ে। বাবা ছিল ডেভিডের কাছের বন্ধু। সেই বাবার মৃত্যুর পরে নিজের কথা কাউকে বলতে না পেরে, নিজের চিন্তা কাউকে বোঝাতে না পেরে সে প্রতিদিন আরো আরো একা হয়। অদ্ভুত ভাবে বুঝতে পারে প্রত্যেকটা মানুষ বেঁচে আছে তার নিজস্ব একটা বাস্তবকে আঁকড়ে। অথচ তার নিজের বাস্তব এক নয়, বহু— কখনও দ্বিখণ্ডিত। বাবার অশরীরী অস্তিত্ব সে সবসময় চারপাশ অনুভব করতো। সেই অনভুতি এতটাই আশ্চর্য রকম জীবন্ত ছিল ডেভিডের কাছে, যে সে মনে করত তার ঘরের সমস্ত ফার্নিচার— চেয়ার, টেবিল তার বাবা সবসময় সরিয়ে দিচ্ছে তার সুবিধার জন্য। বাবার স্মৃতিজনিত শোক থেকে বাঁচার জন্য ডেভিড নিজেকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে বাইবেলের মধ্যে। তাতে পিতৃশোক খানিকটা লাঘব হলেও, তখনই শুরু হয় তার নিজের সঙ্গে নিজের দ্বিতীয় যুদ্ধের মহড়া। নিজেকে সে মনে করে বাইবেলের সেই যুদার সিংহ যাকে স্বয়ং জিসাসের প্রতীক বলে মানা হয়। শুধু তাই নয়, নিজের জীবনকে তার মনে হয় কিং ডেভিডের পুনর্জন্ম। সারা পৃথিবী যখন তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে, বেডফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে তার বান্ধবী তার কাছে এসে তাকে নতুন করে লেখার কথা বলে। হাসপাতালের বিছানায় বসে ডেভিড তার সমস্ত চিকিৎসকদের জানায় তার অতিপ্রাকৃতিকশক্তির কথা। আশেপাশের সমস্ত মানুষকে সে তার কাল্পনিক অস্তিত্বের অংশ মনে করে।

তেত্রিশ বছর বয়সী ডেভিড তার চিকিৎসক এবং বান্ধবীর অনুপ্রেরণায় তার চিকিৎসার পাশাপাশি কবিতাকে নিজের নিরাময়ের অস্ত্র হিসেবে নেয়। মস্তিষ্কের মধ্যে অসংখ্য ঢেউয়ের মিলেমিশে যাওয়া, অসংখ্য চিন্তার তরঙ্গের একে অন্যের ওপর আছড়ে পড়ার প্রকাশ যখন অন্যের কাছে মনে হতে লাগলো পাগলামি, তখন ডেভিড তার বিখ্যাত কবিতা “সাবকনসাস” (Subconscious)-এ লিখলেন মুক্তি-বন্ধন তোলপাড় করে দেওয়া সেই বহুমাত্রিক যাপনের শব্দ:

অবচেতন মানুষের সম্ভাবনার এক উন্মত্ত রূপ।
তেজশক্তির সে বিপুল ঢেউ আর তরঙ্গ উচ্ছ্বাস
মুক্ত করো, আমাকে মুক্ত করো অতীতের লাঞ্ছনা থেকে।
ওই আয়নার ভেতর দিয়ে দেখো আমাকে, বারবার।

(“Subconscious”)

ডেভিড তাঁর ব্লগে লিখেছেন যে ওই আয়না আসলে লুইস ক্যারোলের অ্যালিসের সেই আয়না, যার ভেতর দিয়ে অ্যালিস তার নতুন পৃথিবীতে গিয়েছিল।

মজার কথা হল, ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের এক বিশিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এটা প্রমাণ করেছেন যে সৃষ্টিশীল মানুষ এবং স্কিৎজোফ্রেনিক মানুষেরা কখনো কখনো একই রকমের ব্রেইন ক্যানালস দ্বারা প্রভাবিত। সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এক রিসার্চে দেখিয়েছে যে, ভীষণভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ দিক স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগীর মস্তিষ্কের কিছু বৈশিষ্ট্যের খুব কাছাকাছি। দুটো ক্ষেত্রেই ডোপামিন সিস্টেম একটা খুব স্বাভাবিক ফ্যাক্টর। মস্তিষ্কে ডোপামিন 2 এর ঘনত্ব যে কোন ধরনের শিক্ষা বা বোধ জাগরণের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক একটি উপাদান। বিজ্ঞানীরা এ প্রসঙ্গে বলেন, যে মানুষ যত বেশি সৃষ্টিশীল হয় তার মস্তিষ্কের মধ্যে ডোপামিন ২ এর ঘনত্ব ততটাই কম হয় এবং এই তত্ত্ব একই ভাবে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের ক্ষেত্রেও সত্যি। বিশ্বজুড়ে অনেক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডাক্তার দেখিয়েছেন, কবিতা কীভাবে একজন স্কিৎজোফ্রেনিক রোগীর কাছে নিরাময়ের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্কের ভেতরের অবিন্যস্ত পৃথিবীর অসংখ্য স্তর সামলাতে না পেরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেভিডের মনে হয়েছিল যে জীবনের সমস্ত বন্দি-মুক্ত, দৃশ্য-অদৃশ্য, অন্ত-অনন্ত স্তর কবিতার ছত্রে ছত্রে উন্মুক্ত হয়ে আছে। মেরিল্যান্ড সাইকিয়াট্রিক রিসার্চ সেন্টার থেকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের উদ্যোগে প্রকাশিত জার্নাল “দ্য স্কিৎজোফ্রেনিয়া বুলেটিন” শুধুমাত্র স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের অভিজ্ঞতার কথায় সমৃদ্ধ একটি জার্নাল। আনিকা ম্যাল্মকভিস্তর “পোয়েট্রি ইন ইয়ার্ন” (“Poetry in Yarn”) সিরিজের কবিতা তার সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা বলে যখন পরিবারের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার আনিকা তার যন্ত্রণার প্রকাশ ও নিরাময়ের অস্ত্র হিসেবে কবিতার ভাষা তুলে নেয়। হাসপাতালের কঠিন চিকিৎসার মধ্যে থাকতে থাকতে তার কলমের মুখে আসে অবদমনের সেই তীব্র ঘোষণা:

মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ছে হিংস্র, আদিম চাওয়া
সুন্দর উপহার হয়ে, পায়ের পাতায়
গোছানো প্রেম, মাধুর্য, ফুটফুটে সন্তান, নরম বুকের দুধ,
এক সাদা পালকের মাথায় রূপকথার উড়ে আসা বন্ধুত্ব
হলুদ আলো যাকে খুঁজে যায়, সেই পারস্পরিক
সমস্ত মুদ্রা নিজের জায়গায় বসানো, সব গোছালো, ঠিকঠাক।
এ সবকিছু সামনে গুছিয়ে রেখে আমি সম্পূর্ণ অন্য একটা জীবন যাপন করে গেলাম!

(“Personal Particulars”)

ইংরেজ কবি বায়রন-এর এক প্রেমিকার মতে, কবি বায়রন ছিলেন পাগল এবং বিপজ্জনকভাবে অপরিচিত (“mad and dangerously unknown”)। আরেকটা মজার তথ্য হল, সাইকোলজিস্ট রেডফিল্ড জেমিসন তাঁর এক পরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছিলেন যে ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডে 1600 থেকে 1800 শতাব্দীর মধ্যের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের তুলনায় কবিদের মধ্যে প্রায় কুড়ি গুণ বেশি আত্মহত্যা-প্রবণতা এবং খন্ডিত ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক বিকার (split selves) দেখা গেছে। শুধু এমিলি ডিকিনসনের “March madness is divinest sense”, সিল্ভিয়া প্লাথের “দ্য বেল জার”-এর সেই মেয়েটির স্নায়ু বিপর্যয় বা এডগার অ্যালান পো-এর সেই চিরন্তন প্রশ্ন “whether madness is or is not the loftiest intelligence?” নয় । বিখ্যাত কবি লুক রাইট বলেছেন, কবিতায় প্রত্যেকটা শব্দের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের মস্তিষ্কের বহুস্তরীয় এবং বিপরীতমুখী স্তরের খুব কাছাকাছি আসতে পারে। শুধু এক ডেভিড বা এক আনিকা নন, সারা পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য বহুখণ্ডিত ব্যক্তিত্বের নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার আশ্রয় হল কবিতা। কবিতাই সেই একমাত্র অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের আয়না যেখানে ‘শুদ্ধ’, ‘তীব্র’ আর ‘কোমল’ খাতের মাঝে পাঁচিলগুলো স্থির নয় কোথাও। এখানে প্রতি শব্দের বহুমাত্রিকতায় ‘তীব্র’ ‘কোমল’ খাতে এই অসহনীয় প্রবাহই হয়ত বেঁচে থাকার একমাত্র চিহ্ন!

আরও পড়ুন...