Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

বি শে ষ র চ না

শু ভ   চ ক্র ব র্তী

shuvo

খুতুত-এ-গালিব

গত সংখ্যা পর

কোই দিন গর জিন্দগানী ঔর হ্যায়
অপনে কী মে হমনে ঠানী ঔর যায়।

জীবনের শেষ দিকে এসে গালিব কী এমন ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকতেন ? কেন তিনি আর কবিতা লিখছেন না, আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত একজন কবি, যাঁর সর্বক্ষণ কবিতায় একটা ঘোর জড়িয়ে রয়েছে, কথায় কথায় যাঁর উচ্চারিত শব্দে কবিতার পংক্তি বাতাসে ভালোবাসার গন্ধ ভরে দেয়! তাহলে কেন তাঁর মনে হচ্ছে কবিতার বোধটুকই তাঁর এই মুহূর্তের সম্বল ? মধ্য বয়সের অস্থিরতা একটু একটু করে কমে আসছিল যখন, মৃত্যুর এগারো বছর আগে মির্জা গালিব তাঁর প্রিয় তফতাকে লিখছেন “তুমি কবিতা পাঠাবে এতে জিজ্ঞাসা করার কী আছে!” কেননা কবিতা পড়তে তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু কবিতা লেখেন না আর। কেন? তফতাকে তো লিখছেন সেই কথাই- “আমি আর এখন কবিতা লেখক কবি নই, কবিতার বোধটুকুই রয়ে গেছে।” আর সবথেকে বড়ো কথা- “কবিতা আর আমি লিখতেই পারি না।” তাঁর নিজের কবিতা দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান এখন, যে তিনি কী করে সে কবিতাগুলো লিখেছিলেন একসময়। এ-কথা যে কথার কথা নয় তাও তফতাকে জানিয়ে দিচ্ছেন ওই একই চিঠিতে। ভেবো না যে এটা বাড়িয়ে বলা কিছু, অর্থাৎ এটা আমার ভেতরের কথা। আমাদের মনে পড়বে গালিবের দীবান ছাপার আগে কত কবিতা তাঁকে ছিঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছে! কেন? কেন এরকম তাঁর মনের মধ্যে এলো যে কবিতাগুলো তাঁর তখন আর দীবানে দেওয়ার মতো মনে হচ্ছে না? এবং তা ছিঁড়ে ফেলতে হলো? এর উত্তর পেতে গেলে আমাদের তাঁর কবিতার লেখার সূচনা পর্বে যেতে হবে, যখন কবি নিজেকে প্রস্তুত করছেন, ভেঙে ফেলছেন নিজের ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি, আর কবিতাকে এক সহজ করে বলবার একটা উপায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর এই জীবনবোধ তখন অন্যদের কাছে অস্পষ্ট। কেননা উনিশ বছর বয়সের আগেই গালিবকে লিখতে হলো তাঁর ফেলে দেওয়া কবিতাগুলোর ভিন্নতা নিয়ে ‘গঞ্জিনা-এ-মাঅনী কা তিলিষ্ম উস কো সমঝিয়ে/গালিব মীরে অশওয়া মে আওবে’… শব্দের মধ্যে এমন এক প্রবাহকে তিনি ধরতে চাইছেন যখন, সমসায়িক বিপন্নতাও তাঁর জীবনবোধের ভিন্নতাকে আরও বিস্তারিত করছে, যেন এই বোধই হয়ে উঠতে চাইছে গালিবের সঞ্চয়। বলতে ইচ্ছে করে নূর-এ-গালিব ইয়ে মঞ্জর, এক সহজ সন্তুর জীবন যাঁর, আর গালিব এটা বুঝতে পেরে লিখে রাখেন ‘হরচন্দ সুবুকদস্ত হুয়ে বুতশিকানী মে/হম হ্যাঁ তো অভী রাহ মে হ্যায় সঙ্গ-এ-গিযা ঔর’… এই যে তিনি নিজের আমি-কে ভেঙে ফেলছেন, এ তো আমরা পাই ভারতীয় দর্শনের আধারেই। তাহলে নতুন কী এমন বোধ আরও বিস্তারিত হলো তাঁর মনের ধর্মে? কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন তাঁর ভিন্নতা কি সুফীর আত্মদর্শন নয়? এ-প্রশ্নের উত্তরে গালিব নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন রেখে লিখেছেন :

‘জাম-এ-হর জররে, হ্যায় সর্শার-এ-তমন্না মুঝসে
কিসকা দিল হুঁ, কি দো আলম সে লাগায়া মুঝে।’

গালিব নিজেই যখন জীবনের এই দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন ভিন্ন এক আত্মদর্শন, যেখানে সমস্ত কিছু এসে একটি বিন্দুতে মিশে আছে, তাহলে কি গালিব সমগ্র সত্তার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার কথা বলছেন ? এই কি তাহলে তাঁর ভিন্নতা? এইখানে তিনি আমীর খুশরু-র থেকে যেন কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। দূরে রইলেন এই কারণে যে তাঁর চেতনায় জড়িয়ে আছে সামগ্রিক ‘আমি’র বিস্তার। হালি, গালিবের প্রথম দিকের অস্বীকৃতি কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখেছেন যে, এমন কবিদের কবিতাই সাধারণ মানুষ শুনতে পছন্দ করতেন যেখানে কবিতা আলাদা করে আর ভাবতে হয় না, অনুভবের দরজাটা তাঁদের কাছে অচেনা একটা জগৎ ছিল, যে কথোপকথন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সহজভাবে মিশে ছিল তেমন কবিতাই তাঁদের মন ছুঁয়ে যেত, যেমন মীর, সওদা, মীর হাসান, জুড়াত এবং ইনশা। কারণ তাঁরা তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের ভাষা ব্যবহার করেছেন, যেটা আমাদের মুখোমুখি কথা বলার মতো একটা প্রবাহ। এমন একটা বিশ্বাস ছিল যে কবিতা কবির হৃদয় থেকে এসে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে শ্রোতার হৃদয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু গালিবের কবিতায় এমন কোনো পথই নেই যেখানে শ্রোতা খুব সহজেই সেই পথে তাঁকে স্পর্শ করতে পারবেন। তাই পাঠকের কাছে মনে হবে তাঁর কবিতা জটিল দ্বন্দ্বে ভরে আছে, সহজে সেই প্রবাহকে আমরা স্পর্শ করতে পারি না। গালিবের বাক্য গঠন ছিল ভিন্ন এক বিস্তার। হালি সে বিষয়ে বলবার আগে একটি উদাহরণ দিয়েছেন-

‘কুমরি কাফ-ই খাকাস্তার ও বুলবুল কাফস-ই রং
এয় নালা নিশান-ই জিগার-ই সখতা কেয়া হ্যায়।’

গালিব এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করবেন, যা আগে কখনও এমন করে পাওয়া যায়নি এবং শুধু যে শব্দ তাই নয়, গালিবের কবিতার বাইরের যেমন একটা আঙ্গিক আছে তেমনই তার ভেতরের একটা আঙ্গিক সবসময়ই ওই কবিতাকে ভিন্নতা দিয়েছে। হালি মনে করতেন তাঁর কবিতার লাইন থেকে যদি একটি শব্দ সরিয়ে নেওয়া যায় তাহলে কবিতাটি সমসাময়িক কাব্যভাষা থেকে সরে যাবে, বিশেষ করে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় আমরা সেইরকমই একটা আবরণকে সামনে পাই যা পাঠকের কাছে দুর্গম, বিপন্ন এক বোধের প্রবাহ, কেননা গালিবের কবিতায় ব্যক্তিসত্তার চেয়ে সামগ্রিক সত্তার প্রকাশ অনেক বড়, আর তাই তাঁর কবিতাকে কখনও কখনও মনে হতে পারে ব্যক্তি সঙ্কটের প্রকাশ। কিন্তু আমরা যদি তাঁর কবিতায় নিবিড় হতে পারি তাহলে দেখতে পাবো যে, ওই যে সেই ভিন্নতার কথা উঠল একটু আগে, মনে হবে তখন গালিব শুধু কবিতার অন্তরই সৃষ্টি করেননি, তিনি কবিতায় নতুন শব্দের নির্মাণ করেছেন এবং আরও বিস্ময় লাগবে আমাদের যে তিনি একটি রচনার মধ্যে ফারসি, তুর্কি ও উর্দু এই তিন ভাষার একটা সমন্বয় করেছেন, এবং তাঁর রচনার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ গড়ে ওঠে তখন। কিন্তু এই লেখার শুরুতেই যে প্রশ্ন আমাদের ছিল, তার কিছুটা দ্বন্দ্বের ছায়া আমরা পাবো তাঁর প্রথম দিকের লেখার মধ্যে, যখন গালিবের বয়স উনিশ বছর তখনই তিনি উর্দু কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। এবং প্রথম দীবান প্রকাশিত হয় ১৮১৬ সালে এবং দ্বিতীয় দীবান প্রকাশিত হয় ১৮২১ সালে যখন তাঁর বয়স চব্বিশ, আর ‘তারপর আমি আমার চোখ খুললাম এবং একটা দীবানের ধারণাকে একপাশে রেখে পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেললাম’ এবং ওই একই চিঠিতে জানতে পারলাম ‘আমার আগের কবিতার একটি স্মৃতি হিসেবে দশ পনেরোটা কবিতা রেখে দিলাম।’ কিন্তু এই তথ্য পাঠকের মনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করতে পারে কেননা তাঁর অনেক কবিতাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর ‘দিবান-এ-গালিব’-এ, যা তাঁর প্রথম দিকের কবিতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। গালিব নিজেই সে কথা ভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন চিঠিতে :
‘বেদিলের চেতনার প্রতি গভীর আনুগত্যের কারণেই আমার নিজের কাজ একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক গুণ প্রদর্শন করে৷ বেদিল যেহেতু খিজিরের মতো আমার পথপ্রদর্শক, আমি অজানা পথে হাঁটতে এবং পথভ্রষ্ট হতে ভয় পাই না৷’ গালিবের এই বলবার ভিন্নতাই তাঁর কবিতাকে আর সবার আলাদা করে দিয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনই তাঁর এই বলবার একটা ধরণ তিনি পেয়েছেন বেদিলের রচনার আভা থেকে। একটি চিঠিতে তিনি সে কথাই তো জানিয়ে দিলেন আমাদের : ‘সম্মাননীয় সাহেব, শুরুতে বেদিল, আছির বা শওকতের কাব্যিক কায়দায় রেখতা গজল লিখতাম। তাই নিম্নোক্ত স্বীকারোক্তি দিয়ে আমার একটি গজল শেষ করলাম:
‘তারজ-ই বেদিল মে রেখতা লিখনা
আসাদুল্লাহ খান কেয়ামত হ্যায়!’

যদিও ‘আমি পনের থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে রহস্যময় এবং বিমূর্ত কবিতা লিখেছি। সেই সময়গুলোতে আমার অল্প বয়সের কয়েক বছর, আমি একটি দীবানের জন্য যথেষ্ট কবিতা সংগ্রহ করেছি।’

আর এটা আমরা দেখতে পাই তাঁর প্রথম দিকের কবিতায়-
‘আসাদ হার জা সুখ নে তারহ-ই বাঘ-ই তাজা ডালি হ্যায়/মুঝে রং-ই বাহার আইজাদি-ই বেদিল পসন্দ আয়া’…

একটি চিঠি,

মুনশি হরগোপাল তফতাকে লেখা-

সাহেব, তোমার ভুলে যাওয়াটা বিরক্তিকর। আমি কখন বললাম যে তোমার কবিতা ভালো নয়, বা তোমার কবিতা কেউ বুঝবে না বা প্রশংসা করবে না? কিন্তু কথা হল যখন তুমি কাব্যচর্চায় নিমগ্ন, আমি ভাবছি মৃত্যু ও অনন্তকালের কথা।
আমি আবু আলি সেনার জ্ঞান এবং নাজিরির কবিতা নিরর্থক এবং অর্থহীন বলে মনে করি। নিজের জীবন যাপনের জন্য একটু স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজন; জ্ঞান, দর্শন, শক্তি এবং কবিতা সবই অপ্রয়োজনীয় জিনিস। হিন্দুদের যদি অবতার থাকত, আর মুসলমানদের নবী থাকত! একজন, যদি একজন বিখ্যাত মানুষ, বা একজন অসাম্প্রদায়িক হন? তোমার জীবনে যা প্রয়োজন তা হলো সুস্বাস্থ্য এবং জীবিকার উপায়। বাকিটা, প্রিয় আমার সবই কল্পনা। এমনকি এই দুটি জিনিস—স্বাস্থ্য এবং জীবিকা নির্বাহের উপায়গুলি — নিছক বিভ্রম, কিন্তু এই পর্যায়ে আমি এই দু’টি সরঞ্জাম ধরে রাখছি। হতে পারে, আমি যতই এগিয়ে যাব, এবং আরও আলোকিত হব, আমি স্বাস্থ্য এবং অর্থের প্রয়োজনকেও অতিক্রম করতে পারব এবং সম্পূর্ণ শান্ত অবস্থায় থাকতে শিখব।
আমার চারপাশে যে নীরবতা, আমি এই পৃথিবীর এবং বাইরের জগতের কারণে অসুবিধায় আছি।
আমি প্রত্যেকের সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক মানসিক গঠন অনুসারে মোকাবিলা করি এবং আমাকে যে প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করা হয় তার উত্তর দিই। কিন্তু আমি সবকিছুকে মায়া বলে মনে করি। এ নদী নয়, মরীচিকা, এ জীবন নয়, অসারতা। তুমি আর আমি দু’জনেই মোটামুটি ভালো কবি। হতে পারে, পরবর্তী সময়ে আমরা সাদী ও হাফিজের মতো উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারি। কিন্তু তাঁদের খ্যাতি থেকে তাঁরা কী লাভ করেছিলেন এবং আমরা কী করব?

– গালিব
১৮৫৯

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার