Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 4th Issue

বুধবার, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Wednesday, 6th October, 2021

শারদ অর্ঘ্য ১৪২৮ ।  গল্প

সে লি ম  ম ণ্ড ল

কবির নৌকা

pic5

সকাল আসুক কোনো ঘাসের শরীরে

এই মাড়িয়ে যাওয়া জীবনে

চপ্পলের দাগটুকু যেন আলোর সান্নিধ্য আনে

রাত নেভে

রাত একটা কাটা শরীর নিয়ে ছটফট করে

 বাতাসে শব্দ ঝন ঝন করে: মর, মর

 

রাত নেভে। রাত নিভিয়েই কি আলোর কাছে পৌঁছাতে চায় সকলে? পতঙ্গের ফিসফিস ভেঙে জ্যোৎস্না গাওয়া চাঁদ যে শব্দের মধ্যে নীরবতা পালন করে, সেই শব্দের মধ্যে রোজ নিজেকে খুঁজতে থাকে অরি। অরিন্দম বাগচী। শব্দ তাকে যৌনতা দিলেও আলো দেয় না। হাঁউমাউ করে অরির কাঁদতে ইচ্ছে করে। পারে না। বউ বাচ্চা-জেগে উঠতে পারে। চটা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যখন ঘুম আসে তখন স্নানে যাওয়ার সময়। ভোরবেলা সে স্নান করে। আধাভাঙা বাথরুমে নিজেকে উলঙ্গ করে স্নান করে। স্নানের পর মেঝেতে বসে নিজের হাতের ওপর শক্ত করে রাখে হাত। বউ মেরি বিস্কুট আর লিকার চা দিয়ে যায়। দশটার দিকে অরি বেরিয়ে যায় অফিসে। এখন অফিস নেই। লকডাউন। প্রুফরিডারের কাজ করে সে। বই এখন মানুষের কাছে বিলাসিতা… তবুও স্বপ্ন দেখে। এই শব্দ নিয়েই একদিন যে তরী ভাসাবে। জলের কাছে তার সাম্রাজ্য হবে আয়নাঘর। সে মাছের পিচ্ছিলতা নেবে। শামুকের স্থিরতা নেবে। কালোনৌকায় গলিয়ে দেবে বাকি অর্ধজীবন।

তুমুল বৃষ্টি। অরি যে নৌকা ভাসাতে চায়, সেই নৌকা ভাসিয়ে দেয় তার ছেলে। অরি দেখে। তার রাগ হয়। কিছু বলতে পারে না। কীই-বা বলবে! সন্তানের ইচ্ছেজলে মাটি ফেলে কাদা করেছে তার এই অনিশ্চিত জীবন… ছেলের নৌকা ভাসছে ঘরে। নৌকার গায়ে তার শব্দের শরীর। দেওয়াল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে, তো পড়ছে। সে কি ফাটা আকাশের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে? এই তুচ্ছজীবন সে কেন চেয়ে নিয়েছে? নৌকাটা কতদূর যাবে? চার দেওয়ালের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে যখন জলে গলে যাবে তার শরীর, তখন সে নিজেকে কী কৈফিয়ৎ দেবে?

অরি চুপচাপ থাকে। সে তার কবিতার কাছে ক্ষমা চায়—

যে জীবন তোমাকে দিতে পারিনি

তা ডুবে যাওয়াই ভালো

সাঁতরাতে সাঁতরাতে পাড়ে এসে দেখছি—

নোনাজল, বাঘের গর্জন

মাছ-কাঠ-মধুর লোভ জীবনকে ব্যর্থ করে

জীবনকে গলে যেতে বলে— শব্দহীন!

ঘরে খাবার নেই। কাজ বন্ধ। বউয়ের খিঁচুনি শুনতে শুনতে অরির পৌরুষে আঘাত লাগে। ছেলেটা খাবারের জন্য কাঁদে। সন্তান খাওয়ার জন্য কাঁদলে মায়ের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। খাবার দিতে না-পারলে সেই রক্তে তার ইচ্ছে হয়— ডুবে মরার। নীলু কি এখন ডুবে মরবে? ক্রমাগত তার রক্তক্ষরণ চলছে। হৃদয় ভেসে একূল-ওকূল। “ওই অকর্মা, দেখতে পাওনা! বাবা হয়ে শুনতে পাও না ছেলের কান্না? আমার বুক চিরে দেখো। আমরা না হয় না-খেয়ে কাটালাম, ছোটো ছেলেটা! তিনদিন ধরে বলছি, ঘরে কোনো খাবার নেই। পাথরের মতো বসে আছ!! কবিরা পাথর হতে পারে জানতাম না। তুমি না পারলে কবি হতে। না পারলে বাবা হতে। নিজের জন্য ঘেন্না হয়। মা হয়ে ছেলের কান্না দেখছি। বাবা-মা কত বারণ করেছিল। কেন যে তোমার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলাম… সারাজীবন এই ভুলের মাশুল আমায় দিতে হবে। কবিতা দিয়ে যে পেট চলে না, মর্মে মর্মে টের পাচ্ছি। ওসব সুখের দিনের পায়রা। আকাশে ওড়াতে ভালো লাগে। মেঘ করলে আকাশের চেয়ে ঘরের চিন্তা বেশি হয় মানুষের। যার ভাঙা ঘর, তার অবকাশটুকুও নেই। খালি ছলাৎছল শব্দ শোনাটুকু ছাড়া।” অরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় না। চুপচাপ শোনে।

অরি কী করবে? সে কি তার পাথরের শরীরে খোদাই করে নেবে নতুন কারুকাজ? না নিজের থুতু মাখিয়ে পাথরকে গড়িয়ে দেবে খাদ্যসন্ধানে? কবিতা লেখা ছাড়া জীবনে সে কিছুই করেনি। কবিতা লিখতে লিখতে প্রুফ দেখা শিখেছিল। ওটুকুই ওর উপার্জনের মূল আশ্রয়।

অরি তার পাথর শরীরকে পরের ভোরে গড়িয়ে দেয়। ছেলে সারাদিন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে উঠে আবার সে কাঁদবে। বউ খিচ খিচ করবে।

অরি বেরিয়ে পড়ে। রাস্তা সুনসান। লোকজন নেই বললেই চলে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই রেলস্টেশন। চার নং প্ল্যাটফর্ম অনেকের মনখারাপের ঠিকানা। অরিরও। এই লকডাউনে এক, দুই, তিন, চার আর আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। জনশূন্য। মাঝেমাঝে দু-একটা মালগাড়ি হুইসেল বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। চলে যাওয়ার মধ্যে কোনো বিরহ নেই। ক্লান্তি নেই। আনন্দ নেই। যেতে হবে, তাই যাচ্ছে। বেলা গড়িয়ে যায়। সূর্য তার লাল মুখখানি ব্যাজার করে ফিরে যেতে থাকে। অরির ইচ্ছে করে ফিরে যেতে। কিন্তু কোন মুখ নিয়ে ফিরবে? তার ক্ষুধাবিষ্ট ক্লান্ত শরীরে কোনো শক্তি নেই। আরেকটি মালগাড়ি যাওয়ার জন্য অরি প্রতীক্ষা করে। দূর থেকে শোনা যায় হুইসেলের শব্দ। সে এগিয়ে যায়। লাইনের দিকে এগিয়ে। ফাঁকা স্টেশনে তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই… 

অরি আত্মহত্যা করেনি। অরি জীবনের কাছে ফিরেছে। তার ফেরার পথে হাত ধরেছিল পুরোনো এক বন্ধু। সেই বন্ধুর পরামর্শে, একটা মাস্ক-স্যানিটাইজারের দোকান দেয়। ফুটপাতে। অল্প বিনিয়োগে, এর থেকে ভালো ব্যবসা কিছু নেই। প্রথমে নিজের মনকে সায় দিতে পারেনি। সায় না দিয়ে উপায় কী? ছেলের মুখটা মনে পড়তেই, তার ভিতরের পাহাড় ভেঙে পড়ছিল ক্রমশ… জীবনের কাছে সে কেবল একজন ট্যুরিস্ট না, যোদ্ধাও। লড়তে হবে। এই ভাঙা পাহাড়ের চূড়ায় তাকে স্থিত হতে হবে।

একটা দুটো করে লোক বাইরে বেরোনো শুরু করেছে। কমেছে করোনার প্রকোপ৷ অরি ধারের টাকা পরিশোধ করেছে৷ এখন সে ডালভাতের সঙ্গে মাঝেমাঝে ছেলের পাতে এক পিস মাছ তুলে দিতে পারে। ভুলে গেছে তার পুরোনো পেশা। বইয়ের জগতটা এখনো কোমায় পড়ে থাকা এক নিথর প্রাণ। যে প্রাণ ছটফট করে বেরিয়ে যায়, সে প্রাণের নিথর পড়ে থাকা, অরি মেনে নেয়।

সংসারে বউ খুশি। ছেলে খুশি। অরি কি খুশি? অরি ফুটপাতে বসে দেখে সময়ের বিবর্তন। সে দূরে মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে… অপেক্ষার ঢেউ তার বুকে এসে আছড়ে পড়ে। পাড়ভাঙা মানুষের বুকে জল জমে না। জল গড়িয়ে যায়। গড়িয়ে যাওয়া জলে ভেজে। ভেজা শরীর নিয়েও সে তাকিয়ে থাকে…  তার তাকিয়ে থাকার মধ্যে লোভ আছে… এ লোভ, কীসের লোভ? মৃত্যুর? মানুষের আরও বিচ্ছিন্নতার?

সময় বদলে যায়। নিস্তব্ধতা ভেঙে ভাতরুটির অন্বেষণ মানুষকে ক্ষুধার্ত করে। একটু একটু করে আলো পড়ছে। আলোয় অন্ধকার হয়ে পড়ছে অরির মুখ। মানুষ মাস্ক, স্যানিটাইজারের প্রয়োজনীয়তা ভুলতে শুরু করছে। জীবনজীবিকায় আবার ভাটার রেশ আসতে শুরু করে। খবরে আরও এক ঢেউ আসার কথা বলা হচ্ছে। অরি কী চায়? মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক, না তার মাস্ক-স্যানিটাইজারের কাছে স্বীকার করুক বশ্যতা? পুরোনো অফিসও শীঘ্র খুলবে তার। ডালভাতের দুনিয়ার আবার কি ফিরবে? না, ছেলের পাতে সপ্তাহান্তে দু-এক পিস মাছ তুলে দিয়ে বাবার ভূমিকা পালন করবে? আবার যদি ঢেউ আসে কোন ঘাটে সে তরী নিয়ে যাবে? মাঝদরিয়ায় সে তার তরি নিয়ে ভাসে… তার নিজের শব্দ, জলে ঢেউ খেলে… ঢেউয়ে দেখে পিচ্ছিল মাছ… জীবনের মতো… ধরতে পারা যায় না… অজস্র নৌকা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে পাড়ে অভিমান করে ফিরে গেছে… সব ফেরার মধ্যে অরি ফেরি খোঁজে… শব্দ আসে… খালি শব্দ…

এই জীবন চাইনি

মাছের মুখে মুখোশ দিয়ে আমি হই কবি

জল ফিরে যাক 

ডালভাতের দুর্দিনে কেমন বঁড়শিভাঙা পিতা

এক পিস, দু-পিস করে আলাদা করতে হয় জীবন!!! 

আরও পড়ুন...