Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 4th Issue

বুধবার, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Wednesday, 6th October, 2021

শারদ অর্ঘ্য ১৪২৮ ।  আমার পুজো

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

sankar

এক ভবঘুরের উৎসব-কাহিনি

সে তখন ক্লাস থ্রি। সি আর জেড্ মিশনারি স্কুল। তখনও রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে ভর্তি হয়নি। উদ্বাস্তু হয়ে এসে ভাড়া-বাড়ির ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দেখে, সামনে অরোরা স্টুডিয়োর পাঁচিল। আর বাঁ দিকে, বড়ো রাস্তার ওপারে ফ্রেন্ডস ইউনিয়ান ক্লাবের পুজো-প্যান্ডেল। পঞ্চমীর মণ্ডপে তখন ডেকোরেটার্স-এর কর্মীরা খুব ব্যস্ত। ক্লাবের দাদারা ছুটোছুটি করছেন। বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। রাস্তার রঙিন আলোগুলো জ্বালাবার প্রাকমুহূর্তে সে দেখল, নীচে, বাড়ির সর্বক্ষণের সহযোগী হারুদা তার থেকে দেড় বছরের ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে মণ্ডপের দিকে যাচ্ছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে না যাওয়ার অধিকার কে দিল হারুদাকে? সে দ্রুত একতলায় নেমে হারুদাকে লক্ষ্য করে রাস্তার দিয়ে প্রাণপণ ছুট লাগালো। আর উল্টোদিক থেকে দুরন্ত বেগে ধেয়ে আসা একটা সাইকেল সরাসরি তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সে চোখের সামনে সামনে বিদ্যুৎ ঝলকের আলোটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। রক্তে ভিজে গিয়েছিল সৎচাষী পাড়ার পিচের রাস্তা। তার জ্ঞান ফিরল নর্থ সুবারবন হাসপাতালের বিছানায়। অনেকটা জায়গা জুড়ে সেলাই করতে হয়েছিল বাঁ দিকের ঠোঁটের নীচে। দাঁতগুলো লন্ডভন্ড। বাবা অফিস থেকে খবর পেয়ে সোজা হাসপাতালে। তার মা সমস্ত আড়াল সরিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায়। ত্রাতা হিসাবে পুজো মণ্ডপ থেকে ছুটে আসে ক্লাবের দাদারা। দু’জন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান আর বাকিরা ওই সাইকেল আরোহীর উপর মারমুখী হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত তার মাই তাঁদের কাছে আকুতিমিনতি করে ওই আক্রান্ত ব্যক্তিকে মুক্ত করেন। অনেক রাতে সে অবশ্য তার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে এবং পুজোর পাঁচটা দিন বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকাটাই তার ভবিতব্য ছিল সে বছর। একধরনের লজেন্স ও তরল খাবার খেয়েই কাটে তার পুজোর দিনগুলি। ১৯৫৩ সালের সেই ক্ষতচিহ্ন এখনও সে তার বাঁ দিকের ঠোঁটের নীচ থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

                         সে ছিল তার ছোটবেলার দিন। এবার আসি মাঝবেলার দিনগুলিতে। ১৯৬৯ সাল থেকেই সে বাড়ির বাইরে, প্রায় অর্ধেক জীবন কেটেছে তার শিলং পাহাড়ে। সেই পাহাড়ি আকাশে শরতের মেঘ এসে জমতো না কখনো। তবুও শরৎ আসতো। নিয়মিত। পাহাড়ের আনাচে কানাচে প্রায় হাজার খানেক পুজো হত। এখনও হয় নিশ্চয়ই। মণ্ডপের চারপাশে মেলা জমে মেলা বসে যেত। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকিরা এসে পৌঁছাত কয়েকদিন আগেই। ঢাকের শব্দ পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে তার ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকত সকালে। সারাদিন সে কলকাতার কথা, বাড়ির কথা ভুলে থাকতে পারত। সত্তরের শেষভাগে একবার ভাসানের সময় আগুন জ্বলল। সেই আগুন শান্ত পাহাড়কে খুব দ্রুত অশান্ত করে তুলল। সেসবও দেখল সে। তারপর থেকেই প্রতি পুজো মরশুমের আগে শহরবাসীদের মধ্যে শুরু হত অজানা আশঙ্কার দিন। সমস্ত পুজো কমিটিগুলোকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘সেন্ট্রাল পুজো কমিটি’। সেই কমিটি শারদীয় উৎসব ও উৎসবের সময় সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিত খুব। সে নিজেও এই দুরূহ কাজে শামিল হতে পেরে দারুণ খুশি হল। কমিটি থেকে পুজোর মণ্ডপ, মূর্তি-প্রতিমা, আলোকসজ্জা ও বিভিন্নজাতির পুজো মণ্ডপের শৃঙ্খলিত পরিবেশের ওপর পুরস্কার ঘোষণা করা হল।  সেই শহরের শিল্পী, নাট্য পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে নিজেও একজন বিচারক হয়ে পুজোর ক’টা দিন কাটাত মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে। কখনো একশো সাতাশটি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামার পর দেখা গেল খুবই সাধারণ এক শামিয়ানার নীচে-রাখা প্রতিমা মূর্তির বাঁ দিকে ভাঙা সিঁড়ির ওপর বসে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক, গায়ে শতচ্ছিন্ন গরম কোট, মাথায় কাউ-বয়ের মতো হ্যাট, গিটার বাজিয়ে ইংরেজি গান গাইতে গাইতে ভিক্ষা করছেন। কখনো আবার অনেকটা ওপরে উঠে দেখা গেল, কোনো এক বাজারের পাশে কপালে তিলক-কাটা নেপালি আয়োজকরা পুজোয় বলির হাড়িকাঠ সাজিয়ে রাখছে। বা কখনো অসমীয়া নামঘরের পুজোয় অন্য ধরনের বাদ্যযন্ত্রের গম্ভীর আওয়াজে সে পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে।

                         এই রঙিন ছবিগুলো তার স্মৃতির মণিকোটায় সযত্নে সাজিয়ে রাখতে রাখতেই পুজো কেটে যেত। কোন পুজো মণ্ডপ বা প্রতিমা মূর্তি প্রথম-দ্বিতীয় বা বাতিল হল তা কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না তার কাছে। বরং ওই ভিন্ন ভিন্ন রঙিন ছবিগুলোই মুক্ত ভাবনায় ডুবিয়ে রাখতে এখনও সাহায্য করছে তাকে।

আরও পড়ুন...