Categories
2021-aug

ইন্দু মুখোপাধ্যায়

ক বি তা

ই ন্দু   মু খো পা ধ্যা য়

পালক

ডুবু ডুবু সিঁড়ির উপর পা ফেলতেই
একটু পিছলে যাই
চেনা বন্ধুর নরম করতলের কথা মনে পড়ে
দুপুরগুলো পেরিয়ে গেলেই কেমন শীত শীত
আমি সেরে নেই
স্নান
মুহূর্ত এড়িয়ে
কয়েকটি চড়ুই চোখের নাগাল পেরিয়ে যায়

 

নরম রোদ মেনে নিতে শেখায়
ফুল ফোটে,
আবার কেমন ঝরে যায়।

 

শ্রাবণ

অভিমানের দিগন্তে এখন জল ঢালা হচ্ছে

জল এসে ভাসছে পেয়ালার আলোয়—

ঘরের পাশেই ছোটনদী আমাদের

তার জলে অনেক অনেক নৌকো

বাঁকানো ঘোরানো দাগ
আর
ছায়াচিহ্নের ঢেউ


মেঘ করে এলো

এলোমেলো বাতাসে
একটা দুটো হৃদয় ভিজে যাচ্ছে….

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

সাইকো

ব ই ক থা  

অ র্ঘ্য ক ম ল  পা ত্র

arghya

কাব্যগ্রন্থ : সাইকো

সাইকো

বুদ্ধদেব হালদার

প্রকাশক । প্ল্যাটফর্ম প্রকাশন

প্রচ্ছদ । সুপ্রসন্ন কুন্ডু

১৫০ টাকা

আত্মদহনের অন্তিম পর্যায় থেকে উঠে আসা ছাই

 

“একটা কবিতা লেখার পর দোতলায় ঘর বন্ধ করে চেঁচাতে থাকি। হয়তো সেদিন সারাক্ষণ বৃষ্টি হচ্ছে দারুণ। এবং টিভির খবরে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলিতেও মেঘলা থাকবে আকাশ। পাড়ার অঙ্কের স্যার হকচকিয়ে বাবাকে বলে ফেলেন, ‘আপনার ছেলেটা কি পাগল?’ আমি জানি, নিভা আর কোনোদিনও ফিরে আসবে না। এবং আমাকে নিয়ে বাবা সারাজীবন অসম্ভব বিরক্ত ও লজ্জিত ছিলেন। তাঁর এই দুরবস্থা কাটাবার জন্য আমি বাবার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ফোন করে জিগেস করি, ‘বলুন তো, আমার কি নিজেকে পুড়িয়ে ফেলা উচিত?’ আমার এই ব্যঙ্গাত্মক বেঁচে থাকাকে মানুষ পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশংসা জানিয়েছেন। আর উত্তেজিত কিছু বাঙালি কবি আমাকে অযোগ্য মনে করে দারুণ খিস্তিখাস্তা করেছেন। অবশ্য এসব নিয়ে আমার কোনো বিরূপ মতামত নেই। আমি আমার দুঃখিত পাকস্থলীর পক্ষ থেকে আপনাদের সকলকেই ধন্যবাদ জানাতে চাই।”

 

লেখাটি পড়ে একটু অদ্ভুত মনে হল না? এটা কি কবিতা নাকি? এ তো স্বগতোক্তির ঢঙে বলে চলা এক আত্মকথন। ভারী বিভ্রান্ত লাগল! আরেকটি অংশ দেখা যাক—

 

“হে প্রভু, বাংলা কবিতা যেন হাজারবছর এই বিষণ্ণতা মনে রাখে। যেন কখনোই না ভোলে কবিদের হাতে আমি বহুবার খুন হয়েছিলাম এই পশ্চিমবাংলায়”…

 

আবার থমকে গেলাম। চমকে গেলাম। ভাবনা অন্য খাত থেকে বয়ে এল। এটা কি কবিতা নয়? এই তীব্র প্যাশন যদি কবিতা না হয়, তাহলে কবিতা কি কেবল নির্মাণসর্বস্ব? উঁহু! এই উচ্চকিত প্যাশন, চূড়ান্ত একাকী ও হতাশাই তো কবিতাসৃষ্টির করে! ওহ্ ইয়েস! এটাই কবিতা৷ সজীব বাংলা কবিতা।

 

এমনই ৫৮ টি তীব্র লাভা ও ম্রিয়মান বকুল দিয়ে তৈরি কবি বুদ্ধদেব হালদারের ‘সাইকো’ কাব্যগ্রন্থটি। বুদ্ধদেব হালদার। কবি বুদ্ধদেব হালদার। বরাবরই এক অন্য ধাঁচে নিজের লেখাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিকতার চেয়েও তাঁর কাছে অধিক ঘৃণিত হল প্রাতিষ্ঠানিক লেজ নাড়ানো—

 

“বিগত দশকের রুগ্‌ণ পঙক্তি বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে যারা পেয়ে গেছেন একাধিক সরকারি পুরস্কার, তাদের কাব্যসাধনার প্রতি আমি ভীষণই শ্রদ্ধাশীল। এবং প্রকৃতই লজ্জা পাচ্ছি নিজের লেখালিখি নিয়ে। হাসুন কবিগণ, হাসুন…”

 

অথবা,

 

“প্রিয় কবি, আপনারা কেন বোঝেন না, আপনাদের কাটা আঙুল বাংলাসাহিত্যে আর কোনো কাজে লাগে না এখন”

 

এবং কবি বুদ্ধদেব হালদারের কবিতার কথা এলে, যাঁর কথা আসতে বাধ্য, তিনি হলেন নিভা চৌধুরী। কবির প্রথম প্রেমিকা—

 

“তুমি বরং এক হপ্তার ছুটি নিয়ে ফিরে এসো শ্বশুরবাড়ি থেকে। আংশিক কৃতার্থ থাকা উচিত আমার প্রতিও। আমি তোমার প্রথম প্রেমিক। এজন্মের ঋণ শোধ করো। এসো, আমার যৌনাঙ্গে আগুন ধরিয়ে দাও”

 

শুধু প্রথম প্রেমিকা নয়। হয়তো শেষ প্রেমিকাই। কবি স্পষ্টতই লিখছেন—

“শোনো, ফাহিমা ভীষণ ভালো একটি মেয়ে এবং সে আমার কবিতা সম্পর্কে মোটেই আগ্রহী নয়, সবকিছু ঠিক থাকলে তাকে আমি বিয়ে করব আগামী ডিসেম্বর।

তুমি খুশি হবে?”

 

এভাবেই নিভা-র প্রতি আপোষহীন একতরফা টান, বেকারত্ব, কবিতা লেখার জন্য বেকারত্ব, অসুখ, একাকিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঁওতাবাজদের প্রতি ক্ষোভ কবিকে নিয়ে গেছেন এই পর্যায়ে। কবি বুঝতে পারছেন, তিনি আর পাঁচজনের চেয়ে পৃথকভাবে পুড়ছেন। কবি নিজের কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করছেন— সাইকো…

 

“আমি এক ডাক্তারের কাছে গিয়ে বসে থাকি সারাদিন। পায়রা উড়ে এসে বসে আমাদের সজনে গাছে। অন্ধকারে স্থির জেগে থাকি আমি। আমার ওষধু কেনা বাকি। দুটো ভিক্ষে দেবে কি তুমি? শুনেছি কী দারুণ সংসার পেতেছ; ঝকঝকে তকতকে একটা আকাশ কিনে ফেলেছ। দেখতে পাচ্ছি তোমায়, এই তো, এই যে তুমি- তোমার হাতে বোনা সোয়েটার গান গায়, ভেলকি দেখায়। এই শীত আমার হাড় চিরে শাস্তি দিচ্ছে। ভীষণ ভয়ে কাঁপছি আমি। অন্যদের মতো তুমিও কি বলবে, আমি সাইকো?”

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

জগন্নাথদেব মণ্ডল

উ ই ন্ডো  সি ট

জ গ ন্না থ দে ব   ম ণ্ড ল

jagannath

ক্রিং ক্রিং

বাবার একটা পুরোনো ঢ্যাঙা সাইকেল ছিল। অল্প জং ধরা কিন্তু মজবুত, রঙ বোঝা যেত না। সামনের রডে একটা গামছা কয়েক ভাঁজ করে জড়ানো। দুপুরের পর দু’জনে বেরিয়ে পড়তাম। থলেয় রাখা থাকত টর্চ।

একেকদিন একেক জায়গায় বেড়ানো। পুরনো পুরনো মন্দির বা গঙ্গার কিনারাতেই বেশি সময় কাটত। বয়েস হয়ে গেছে, চলতে পারে না এমন সমস্ত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুমানুষদের বাড়িও বাবা নিয়ে যেত। বসে বসে কতোদিনের কতো কথা শুনতাম। মারি বিস্কুট খেতে দিলে একটু জল চেয়ে নিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেতাম।

ফেরার পথে সন্ধে ঘোর হয়ে গেছে। আকাশে কতো চিকচিকে তারা। ছমছম করছে কালপুরুষ। সাইকেলে যাতে ঘুমিয়ে না পড়ি তাই বাবা গল্প বলত – নৃসিংহ অবতার, গ্যালেলিও, হার্জ বালক, দাদুর গান, ফরিদপুরের ভিটের।

মন্দিরে নিয়ে গিয়ে চিনিয়েছে – এই দ্যাখ বাবু, পাথরের গরুড় পাখি, এটা কালিয়নাগ দমন, আর এই হাতিটার পা কামড়ে ধরেছে কুমির, মুখে দ্যাখ পদ্মফুল চেপে ধরা, ফুলটাও কেমন পাথরের… 

বিকেলের নদীতীরে ডুবন্ত সূর্য দেখিয়ে বলেছে- আকাশের হাতিরা সূর্যকে নিয়ে শুঁড়ে করে লোফালুফি খেলছে দ্যাখ… বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়ে ওরা এবার পড়তে বসবে… চল আমরাও উঠি…

বাবা একবার ঘোড়ানাশ গ্রামে কীর্তনগানের আসরে নিয়ে গেল। বাবার বন্ধুর বাড়ি। রামায়ণ গান হচ্ছিল। সীতা মাটিতে ঢুকে যাবে রাম দৌড়ে এসে হাতের মুঠিতে চেপে ধরেছে সীতার মাথার চুল। তবু সীতা পাতালে চলে যাচ্ছে। 

সেই আসরে এক বুড়ির বলা কথা আমার মনে এখনো জ্বলজ্বল করে। আমার ঠাকুমার বয়সিনী সে। পানদোক্তা খাওয়া মুখে ধীর গলায় বলছিল পাশের একজনকে  –  আউ আউ আউ! রাম ড্যাকরাডার কম্মো দ্যাহো, নিজের বৌডারে মাটির নীচে পাডাইলো… এইয়্যা হুনলে কান্দন আসে দিদি…

আবার যেদিন মিলন হইব হেই দিন কাঁচা সন্দেশ কিন্যা নিয়্যা আসুম। আইজ যাই গিয়া…

গান শেষে প্রসাদ খেতে দিল কলাপাতায়। তারপর রাতে যখন ফিরছি জগদানন্দপুর গ্রামের কাছ দিয়ে, বড়ো বড়ো আমবাগান পেরোচ্ছি তেজিবাবুর, টর্চ জ্বালা হয়েছে, অল্প আলোয় সাইকেল চলেছে আস্তে আস্তে। 

বাবা বলছে – লুচি খেয়ে তোর পেট ভরেছিল তো রে?  

আমি বলছি – হ্যাঁ বাবা। ও বাবা, সেই কেটে গেলে ব্যথায় লাগায় সাদা দুধের মতো রস বেরোয় তুমি গল্পো বলছিলে, বনতুলসী গাছের ওইগুলোয় কি সেইগুলো? 

বাবা তাকিয়ে দেখে মাথা নেড়ে বলে – হ্যাঁ, কেমন একটা গন্ধ দ্যাখ, আর পাশের ঝোপটা হাতিশুঁড় গাছের, টর্চ মারছি দ্যাখ, নড়িস না…

তারপর আবার সব চুপচাপ। অল্প অল্প হাওয়া।

– ও বাবা, আজ সাইকেলটা একটু ভারি লাগছে না? তোমার চালাতে একটু একটু কষ্ট হচ্ছে না?

বাবা হাসতে হাসতে বলছে – হ্যাঁ রে, ঠিকই তো, তুই একরাতেই লুচি খেয়ে কুমড়ো হয়েছিস তো তাই খুউউউব কষ্ট হচ্ছে…  হা হা হা…

আমি বলি – না গো, লবদাদা আর কুশদাদা মাঝরাস্তা থেকে ওই বনতুলসী ঝোপের কাছ থেকে ছোট্ট ছোট্ট তীরধনুক নিয়ে আমাদের সাইকেলে চেপেছে… তুমি পিছনে তাকিও না… ওরা লজ্জা পাবে…

বাবা আর হাসছে না। কোনো কথাও বলে না। কেবল ক্রিং ক্রিং মানে সাইকেলঘন্টির পাশে রাখা আমার ছোট্ট হাতে হাত রেখে মৃদু চাপ দেয়। সেই হাতের ছোঁয়া আমার হাতে এখনো লেগে আছে…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

রাহুল দাশগুপ্ত

গ ল্প

রা হু ল   দা শ গু প্ত

rahul

সুন্দর মেয়েরা আজও আছে

সুন্দর মেয়েরা আজও আছে। নাঃ, আজ আর এ নিয়ে আমার মনে কোনও সংশয় নেই। অথচ একসময় আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গোটা দুনিয়ায় কোথাও তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটির সঙ্গে আমার একদিন দেখা হয়ে গেল। আর তাও খুব আকস্মিকভাবে। সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। একটা পার্কের বেঞ্চে সে একা একাই বসেছিল। আমি সেই পার্কে মর্নিং ওয়াক করতে এসেছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম গাছপালার আড়ালে ছায়ায় একটি মেয়ে মুখে রুমাল চেপে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সামনেই একটা পুকুর। সেখানে সাঁতার কাটছে অনেক রাজহাঁস। বিচিত্র সব পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে গোটা জায়গাটা সরব হয়ে উঠেছে।

একটু ইতস্তত করে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। সে-ও আমাকে লক্ষ্য করেছিল আর দু’চোখে অভিমান নিয়ে তাকিয়েছিল আমার দিকে। আমি কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? কাঁদছো কেন? 

কিছু হয়নি। সে সপাটে জবাব দিলো।

অমন ঝাঁঝালো উত্তরের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। একটু বেসামাল হয়ে গিয়েও আবার জানতে চাইলাম, তোমাকে দেখেই বুঝেছি অভিমান হয়েছে। কিন্তু কেন এত অভিমান করো? এই পৃথিবীটা কি সুন্দর নয়?

মেয়েটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। তারপর চোখের জল মুছে আবার ঝাঁঝিয়ে উঠলো, না, সুন্দর নয়, কুৎসিত, খুবই কুৎসিত। নইলে কেউ আমাকে বোঝে না কেন? কেন, এমনকি কুট্টুসও আমার কাছে আসতে চায় না? 

আমি জানতাম, পৃথিবীটা সুন্দর নয়। কিন্তু এই মেয়েটির তাতে কিছু যায় আসে না বলেই মনে হয়, এত নিষ্পাপ, পবিত্র, শান্ত, গভীর এর চোখের চাউনি, বসে থাকার ভঙ্গি, গলার স্বর! অন্তত এ যেখানে থাকবে, দুনিয়ার সেই জায়গাটাই সুন্দর হয়ে উঠবে, এরকমই মনে হলো আমার। এও বুঝতে পারলাম, কোনও কারণে তার খুব অভিমান হয়েছে এবং সেটা হয়তো ওই কুট্টুসকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু কুট্টুসটি কে?

হঠাৎ সামনের একটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো একটা কুকুর, হিংস্রভাবে ডেকে উঠলো। মেয়েটি আঁতকে চেঁচিয়ে উঠলো, আমাকে বাঁচান, আমার ভয় করছে। আমার হাত খিমচে ধরলো সে। আমি কুকুরটার দিকে তেড়ে যেতেই সে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। মেয়েটি এতক্ষণে সকৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকালো।

আমি আবার জানতে চাইলাম, এবার বলো, কি হয়েছে তোমার… 

মেয়েটি যা বললো তার মর্মার্থ এই, কুট্টুস তার প্রতিবেশী। বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। মেয়েটি তাকে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু কুট্টুস মেয়েটিকে পাত্তাই দিতে চায় না। কুট্টুস শুধু ওর বাবা-মা ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসে না। তাছাড়া স্কুল, খেলার মাঠ, টিভি, এইসব নিয়েও সে খুব ব্যস্ত। মেয়েটির সঙ্গে সে যে ব্যবহার করে, তাকে হেঁয়ালি ছাড়া কিছুই বলা যায় না। কারণ মেয়েটি তাকে মুক্ত হস্তে দান-ধ্যান করলে সে-ও অকাতরে তা গ্রহণ করে।

কিন্তু ওইটুকু সময় ছাড়া সে সর্বদাই মেয়েটির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, মুখে যা আসে তাই বলে, আর তখন লুকিয়ে অশ্রুপাত করা ছাড়া মেয়েটির সামনে আর কোনও পথ খোলা থাকে না। 

কিন্তু কেঁদে কী হয়? আমি জানতে চাইলাম। 

বুকটা হালকা হয়। না কাঁদলে আমি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারি না।। 

মেয়েটির নাম স্রোতস্বিনী। চোদ্দ বছর বয়েস। জোর করে ওদের বাড়ি সেদিন নিয়ে গেছিল সে। আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম, সাড়ে তিন বছরের জন্য চোদ্দ বছরের এই বিরহ, দুনিয়ায় কত আশ্চর্য ঘটনাই ঘটে! কিন্তু স্রোতস্বিনীর কাছে ব্যাপারটা যে খুবই স্বাভাবিক, তা বুঝলাম ওদের বাড়ি গিয়ে। ওর বাবা রিটায়ার করেছেন, মাথার সব চুল পেকে গেছে, সহৃদয় মানুষ, আমাকে দেখেও খুব খুশি হলেন। স্রোতস্বিনী ফলাও করে যখন জানালো, আমি ওকে হিংস্র কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করেছি, বলা যায়, পুনর্জন্ম দিয়েছি, তখন তিনি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠলেন, ও, তাই, এ তো খুবই ভালো কথা। স্রোতস্বিনীর মা নেই। সাড়ে তিন বছর আগে তিনি মারা গেছেন। মায়ের ছবি দেখিয়ে সে উচ্ছ্বসিতভাবে বলে উঠলো, এই দেখুন আমার মা, অনেকটা আমারই মতন দেখতে, তাই না? 

হ্যাঁ, তোমারই মতো… 

মা’র মৃত্যুর পরই কুট্টুসের জন্ম। খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগতো তখন। ও না জন্মালে কী যে হতো… 

এবার বুঝলাম সাড়ে তিন বছরেই স্রোতস্বিনীর জীবনে কুট্টুস কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্রোতস্বিনী সবদিক থেকেই একটু অন্য ধরনের মেয়ে। সে খবরের কাগজ পড়ে না। খেয়াল করে সময় মনে রাখতে পারে না। পথ চিনতে পারে না। সাংসারিক ব্যাপারের খুঁটিনাটি দিকেও তার কোনও নজর নেই। সবসময়ই কেমন যেন বিভ্রান্ত। তার মন জুড়ে আছে শুধু শিশুরা। শিশুদের সান্নিধ্যেই একমাত্র সে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। টিভিতে শিশুদের নিয়ে যেসব প্রোগ্রাম হয়, একমাত্র সেগুলিই মন দিয়ে দেখে। আর সবসময়ই কুট্টুস আর তার বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে চিন্তা করে। তাদের প্রতিটা বাক্য, স্বভাবের খুঁটিনাটি, অতি তুচ্ছ সব ঘটনা, সমস্ত তার মুখস্ত। এইসব চিন্তাই তাকে প্রাণশক্তি যোগায়, উত্তেজিত করে তোলে, কখনও সে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, কখনও বিষাদে ডুবে যায়, তখন স্বগতোক্তি করে ওঠে, যতোই হোক, ওরা তো আমার নিজের কেউ নয়! 

স্রোতস্বিনীর বাবাও সবসময় কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকেন। তিনি বললেন, আমার বয়েস হয়েছে, নিজের অনেক রকম কাজ থাকে, ওকে সময় দিতে পারি না। তুমি মাঝেমধ্যে এসো, ওর সঙ্গে গল্প করে যেও, স্রোতস্বিনী বড় একা… 

আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।

স্রোতস্বিনীর সঙ্গে প্রথম যেদিন বেরোলাম, সেদিনই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। 

সেই পার্কের বেঞ্চের কাছে ওকে আসতে বলেছিলাম। আমি এসে গেছিলাম বেশ কিছুটা আগেই। হঠাৎ চাদ্দিক অন্ধকার করে প্রবল ঝড় শুরু হলো। একটু পরেই নামলো বৃষ্টি। আমি একটা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, এই দুর্যোগে স্রোতস্বিনীর পক্ষে আসা সম্ভব নয়। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, হঠাৎ হঠাৎ বজ্রপাতে বুক কেঁপে যাচ্ছে। প্রকৃতির তাণ্ডবের মধ্যে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, বিপন্ন মনে হচ্ছিলো আমার।

এই দুর্যোগ কিন্তু বেশিক্ষণ চললো না। চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আবার সব শান্ত হয়ে গেলো। আর তখনই দেখলাম, স্রোতস্বিনী আসছে। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, তুমি? 

সে হাসতে হাসতে বললো, আমি তো অনেকক্ষণ বেরিয়েছি… 

তাহলে কোথায় ছিলে এতক্ষণ? 

সে দূরের একটা গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, ওই যে, ওর তলায়। 

হায় ভগবান! এই দুর্যোগে বেরোতে গেলে কেন? 

তোমাকে কথা দিয়েছিলাম না? 

আমি চমকে গেলাম। কথা দিয়েছিলো বলে স্রোতস্বিনী এসেছে! যে পৃথিবীতে কেউ কারও কাছে কথা দিয়ে রাখে না, শুধু নিজের স্বার্থে সম্পর্ক গড়ে তোলে, আবার স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ভেঙে দিয়ে অন্যত্র চলে যায়, সেখানে স্রোতস্বিনী কোন পৃথিবীর মূল্যবোধ বহন করে চলেছে? 

আমরা একটা সিনেমা হলে ঢুকেছিলাম। সিনেমাটা হাসির। আমি আড়চোখে মাঝেমধ্যে স্রোতস্বিনীর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। তুচ্ছ তুচ্ছ ঘটনায় সে হাসিতে ফেটে পড়ছে। সারা মুখ ঝলমল করে উঠছে তার। কী অনাবিল, অম্লান সারল্যমাখা সেই মুখ। কী স্বর্গীয় সেই হাসি। কোনও পাপ কখনও স্পর্শ করতে পারে নি ওদের। আমি একেবারে অভিভূত হয়ে গেছিলাম। মনে মনে বলছিলাম, স্রোতস্বিনী, হাসো, তুমি হাসলে আমিও পবিত্র হয়ে যাই… 

সিনেমা দেখে আমরা একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। আর সেখানেই সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটলো। আমি দেখতে পেলাম আমার এক বান্ধবীকে। মেয়েটিকে দেখে আমি একটুও খুশি হলাম না। একসময় ওকে আমি ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। মেয়েটি রাজি হয় নি। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। জরুরি কথাটা হলো, আমাকে বিদায় করার জন্য সে রোজই কিছু না কিছু মিথ্যে গল্প ফাঁদতো। আর আমি সরলভাবে তার প্রতিটি কথা বিশ্বাস করতাম। পরে যখন জানতে পারলাম, মেয়েটি আদ্যন্ত মিথ্যেবাদী, তখন সেইসব মিথ্যে আর মিথ্যেবাদী মেয়েটিকে চিনতে না পারার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলাম। এরকম একটি নৈতিকতা-বর্জিত মেয়ের সংস্পর্শে স্রোতস্বিনী আসুক, আমি চাইছিলাম না। মেয়েটিকে দেখতে না পাওয়ার ভান করে দূরের একটা কেবিনে গিয়ে বসলাম। মেয়েটি কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই কেবিনে এসে হাজির হলো। আমার বিরক্তি সে গ্রাহ্যই করলো না।

একটু পরেই দীপা মানে সেই মেয়েটির সঙ্গে স্রোতস্বিনীর গল্প জমে গেলো। প্রথম দিকে দীপাই কথা বলছিল, স্রোতস্বিনী চুপ করে ছিল। অচেনা মানুষের সামনে সহজে ও মুখ খোলে না। কিন্তু দীপা যখন জানতে চাইলো, স্রোতস্বিনী স্বপ্ন দেখে কি না, তখন আর ও চুপ করে থাকতে পারলো না। স্রোতস্বিনী রোজ রাতে কিছু না কিছু স্বপ্ন দেখে, আর আমাকে তার বিশদ বিবরণ শুনতে হয়। স্বপ্নের কথায় ও উত্তেজিত হয়ে উঠলো আর এভাবেই ওদের মধ্যে গল্প জমে উঠলো।

কিছুক্ষণ পরেই দীপার চোখ-মুখ পাল্টে গেলো। কেমন যেন সম্মোহিতভাবে ও আমাদের দিকে তাকাতে শুরু করলো। স্রোতস্বিনী আমাকে দেখিয়ে বললো, আদিত্য একসময় তোমাকে ভালোবাসতো, তাই না?

আমি আর দীপা দু’জনেই চমকে উঠলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীপা বললো, হ্যাঁ, কিন্তু আমি আদিত্যকে ভালোবাসতাম না। ওকে আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।

দীপার এই অকপট স্বীকারোক্তি শুনে আমি চমকে গেলাম। বিভ্রান্তের মতো বললাম, সেকথা কিন্তু আগে কখনও স্বীকার করো নি। তুমি বরং বরাবরই বলে এসেছো…

আমি সত্যি-মিথ্যার ফারাক বুঝতাম না, তাই অমন করতাম। কিন্তু এখন আমি সত্যি কথাই বলছি… তাই বলে ঠকাবে আমাকে? 

আমি ঠকাই নি, বন্ধুত্ব রাখতে চেয়েছিলাম, তুমিই শুনতে না… 

আর সেই দুপুরগুলো… 

তুমি চেয়েছিলে বলেই হয়েছিলো, আমি তখন অন্য একজনকে ভালোবাসতাম… 

অথচ সেকথা একবারও আমাকে জানাও নি…

আমি তো বলছিই, সত্যি-মিথ্যার ফারাক তখন বুঝতাম না, যেটা হাতের কাছে পেতাম সেটাকেই বেছে নিতাম, কিন্তু এখন আমি সত্যি কথাই বলছি…

হ্যাঁ, ও সত্যি কথাই বলছে। স্বগতোক্তি করে উঠলো স্রোতস্বিনী।। 

আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, না, ও সত্যি কথা বলতে পারে না, ও কখনও আমার কাছে সত্যি কথা বলে নি…। 

দীপা মর্মাহত হয়ে বললো, হ্যাঁ, একসময় আমি মিথ্যা ছাড়া কিছুই বলতাম না, কিন্তু আজ আমি যা কিছু বলেছি তার প্রতিটি কথাই সত্যি, সত্যি ছাড়া অন্য কিছু বলার ক্ষমতাই আমার নেই… তুমি আমাকে পরীক্ষা করে দেখতে পারো… 

ঠিক আছে, তুমি বলতে চাইছো তোমার অফিসের ঠিকানাটা সত্যি? 

হ্যাঁ, তুমি চেক করে দেখতে পারো… কার্ডটা বের করে দেখালো দীপা। 

তোমাদের নতুন বাড়ি বেহালায়? 

হ্যাঁ, তাই… দীপা সেদিনই ক্যুরিয়রে পাওয়া একটি চিঠিতে ওদের বাড়ির ঠিকানা দেখালো। 

তোমার প্রেমিকের নাম ঋত্বিক? আর সে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ? 

হ্যাঁ, হ্যাঁ… দীপা ঋত্বিকের ছবি আর কার্ড বার করে দেখিয়ে দিলো। 

আর তাকেও তুমি ঠকাচ্ছো? তোমার মা-বাবা আসলে চান…

হ্যাঁ, রোজগারটা আরও বেশি না হলে… দীপা একটা ছোট্ট টেপরেকর্ডার চালিয়ে দিলো। একটা গান শেষ হতেই ওর বাবার হুঙ্কার শোনা গেল, এ আমি মেনে নিতে পারি না, ছেলেটি প্রতিষ্ঠিত নয়… গলাটা আমার পরিচিত। 

তার মানে, ওই কারণেই আমার দিকে তুমি এগোওনি… 

হ্যাঁ, বাবা-মা’ই চাননি… 

তাহলে আজ কেন ছুটে এলে আমাদের টেবিলে? 

হঠাৎ এই সুন্দর মেয়েটার দিকে চোখ পড়ে গেল। স্রোতস্বিনীকে সে আঙুল দিয়ে দেখালো। তারপর বললো, তারপরই মনে হলো, আজই সেই দিন। আজ না হলে আর কোনওদিনই তোমাকে সত্যি কথাটা নিজের মুখে জানাতে পারবো না…। 

আমি চমকে উঠলাম। তারপর বললাম, স্রোতস্বিনীকে দেখে? 

হ্যাঁ, আমি জানি তুমি ভালো করেই জানো, তোমাকে আমি কোনওদিনই ভালোবাসিনি। তোমাকে যেসব কথা বলেছিলাম, তার সবই মিথ্যা। কিন্তু আমি একথাও জানি, তুমি কখনই এই সত্যকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে পারোনি নিজেকে। কারণ আমাকে তুমি ভালোবাসতে। তাই এখনও তোমার মনে সংশয় রয়ে গেছে। এখনও মাঝেমাঝেই তোমার মনে হয়, ‘দীপা আমাকে ঠকিয়েছে? হয়তো আমারই ভুল হচ্ছে। হয়তো আমাকে ও ভালোই বাসতো! আসলে ওর বাবা-মা চাননি বলেই।‘… না, এই সংশয় আর রেখো না তুমি। আমি তোমাকে কোনওদিনই ভালোবাসিনি। আর আমার মুখ থেকে একথা না শুনলে চিরদিনই তোমার মনে সংশয় থেকে যেতো। আমি নিজের মুখে জানিয়ে গেলাম তাই… 

কিন্তু কেন? ক্রুদ্ধ হয়ে জানতে চাইলাম, আমি কী তোমার কাছে জানতে চেয়েছি? 

নিশ্চয়ই চেয়েছো! 

মানে? 

তুমি এই মেয়েটিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ। এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, তুমি চেয়েছো… 

কী যা-তা বলছো? স্রোতস্বিনীর সঙ্গে তোমার এই স্বীকারোক্তির সম্পর্ক কী? 

সেটা তুমি স্রোতস্বিনীকেই জিগ্যেস করো। তাছাড়া, প্রসঙ্গটা ওই তুলেছে। ও জানলো কী করে, তুমি নিশ্চয়ই বলো নি… তাহলে, ভাবো, ভাবো…

কী বলতে চাইছো তুমি? 

সুন্দর মেয়েরা আজও আছে পৃথিবীতে, আদিত্য… আমি সুন্দর নই, কিন্তু কোনও সুন্দর মেয়ের সামনে কেউ কখনও নিজেকে লুকোতে পারে নি, পারে না… তাই আমি ছুটে এসেছিলাম সেই কথা বলতে যাকে তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য বলে ভেবে এসেছো এতদিন… অথচ যা একটা মামুলি সত্য ছাড়া কিছুই নয়… 

দীপা উঠে সোজা দরজার দিকে চলে গেল, তার হাতের ধাক্কায় একটা টেবিলের জলভর্তি কাচের গ্লাস উল্টে পড়ে গেল, সে একবারও পিছনে তাকালো না।

স্রোতস্বিনীকে নিয়ে আমি এক নতুন সঙ্কটে পড়লাম। ও আমার জীবনে আসার পর থেকে একের পর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। যেসব মেয়েরা আমাকে ত্যাগ করেছিল, আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই রাখতো না, তাদের কারও না কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেতে লাগলো। আর মজার ব্যাপার হলো, এরা কেউ-ই আর আগের মতো ছিল না। আমার প্রতি ঔদাসিন্য তাদের পুরোপুরি কেটে গেছিল। তারা গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল আমার প্রতি। আমার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলার জন্য কেউ কেউ লাগামছাড়া ঔৎসুক্য দেখাতে শুরু করলো।

এরকমই একটি মেয়ে তাপসী। তার বিয়ে হয়ে গেছিল। স্রোতস্বিনীকে নিয়ে একটা নাটক দেখতে গেছিলাম। সেখানেই হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। আমাকে দেখে তাপসীর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মাখো মাখো কণ্ঠস্বরে সে প্রায়ই আমাকে ফোন করতে শুরু করলো। তারপর একদিন আমন্ত্রণই জানিয়ে বসলো রাতে খাবার জন্য। 

তাপসীর বর চেন্নাইতে বড়সড় চাকরি করে। সে নিঃসন্তান। একাই একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকে। নিজেও একটা কোম্পানিতে কাজ করে, বিস্তর মাইনে পায়। আমাকে দেখে সে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। খেতে বসে দেখা গেল, অঢেল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন একার হাতেই করে ফেলেছে সে।

আমার দিকে মাঝেমাঝেই সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকছিল। আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। হঠাৎ সে বলে উঠলো, কত সুন্দর হয়ে উঠেছিস তুই। আর কী একঘেয়ে জীবন আমার! 

মানে? আমি অবাক হয়ে তাকালাম। তারপর জানতে চাইলাম, কিন্তু তোর জীবন তো বেশ ব্যস্ত এবং নিরাপদ। 

ব্যস্ত, কোথায় ব্যস্ত, যত সব মামুলি কাজ। আর নিরাপত্তা জীবনকে ক্লান্ত করে দেয়। জীবনে কোনও চ্যালেঞ্জ না থাকলে…

ও আমার লেখা কিছু কবিতা শুনতে চাইলো। একইসঙ্গে যৌনতা ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আলোচনা চালালো। নিজে বেশ কয়েকটা গান গেয়ে শোনালো। ওর বরের আঁকা বেশ কিছু ছবি দেখালো। তারপর আমি চলে আসার সময় আমাকে গাড়িতে করে বেশ কিছুটা এগিয়ে দিলো। আর যেতে যেতে বললো, আজকের সন্ধেটা অনেকদিন মনে থাকবে। এত ভালো আমার যে কতদিন কাটেনি… তোর কাছে আমি ঋণী, আমি কৃতজ্ঞ… 

কিসের ঋণ? ওর কথাগুলো দুর্বোধ্য মনে হলো আমার কাছে। 

আমার বর একদম কেজো লোক, জানিস! আহার, নিদ্রা, মৈথুন ছাড়া আর যা বোঝে, তা হলো কাজ। ঠিক যেন একটা যন্ত্র, ক্রিয়েটিভ নয়। একসময় ভেবেছিলাম, গোটা জীবনটা নানা অ্যাডভেঞ্চার করে কাটাবো। কিন্তু অর্থের জোর ছিল না। তুই তো আর নিরাপত্তা দিতে পারতি না। এখন আমার যথেষ্ট নিরাপত্তা আছে। কিন্তু আমি অসুখী। আমি তোর মতো কাউকে খুঁজছিলাম, যে খুব ক্রিয়েটিভ, যে আমাকে জীবনে ফিরিয়ে দেবে, আমার ঘুমন্ত প্যাশনগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলবে, তাই ঋণ… 

কিন্তু তুই তো কখনও আমাকে বলিসনি, স্রেফ নিরাপত্তা পাবি না বলে… 

তোর প্রতি আমি বরাবরই আকর্ষণ বোধ করতাম, তোর সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগতো, কিন্তু এসব কথা না বললেই হতো, হয়তো বলতাম না, কিন্তু সেদিন তোর সঙ্গে ওই মেয়েটিকে দেখার পর…

হ্যাঁ, ওর নাম স্রোতস্বিনী… 

সত্যি, ভারি সুন্দর মেয়ে। (সুন্দর মেয়েরা আজও আছে তাহলে, কী বলিস?)… তা যা বলছিলাম, ওকে দেখার পর মনে হলো, তোকে সত্যি কথাটা বলা উচিত… 

কিন্তু এ যে আমি আশাই করিনি। তাছাড়া তুই বিবাহিত… 

আমি তোর কাছ থেকে বেশি কিছু চাই না। শুধু একটু ফোনে কথা বলিস, কোথাও দেখা করে দু-এক ঘন্টা সময় কাটিয়ে যাস, তাহলেই হবে। আমার বরকে তো বলতে পারি না, তুমি আরেকটু ক্রিয়েটিভ হও… একেবারে তেড়ে আসবে তাহলে।… একটু থেমে সে আবার বলে, সত্যি কথাই বলছি, একমাত্র তুই-ই আমাকে বাঁচাতে পারিস…

তাহলে আমি যখন তোর সঙ্গে সময় কাটাতে চাইতাম, তখন এড়িয়ে যেতিস কেন? এতদিন আমাকে ভুলেই বা ছিলি কী করে?

হ্যাঁ, ঠিকই, এড়িয়ে যেতাম। ভুলেও গেছিলাম তোকে। আসলে নিজের কাছেও কোনওদিন এসব কথা স্বীকার করিনি। কিন্তু ওই মেয়েটা… ওকে দেখেই কী যে হলো… মনে হলো, আর লুকোনো ঠিক হবে না, এবার সব সত্যি কথা বলা উচিত… নইলে একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবো…

স্রোতস্বিনী কুটুসের খাতায় একটা ছবি এঁকে দিচ্ছিলো। কুটুস একের পর এক আব্দার করে চলছিল। আর স্রোতস্বিনী হাসি মুখে সেইসব আব্দার মিটিয়ে চলছিল। আমি অধৈর্য বোধ করছিলাম। কিন্তু স্রোতস্বিনী আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিলো না। কিন্তু শেষপর্যন্ত কুট্টুসের আঁকার স্যার এসে গেলো। আমিও একা পেলাম স্রোতস্বিনীকে। 

স্রোতস্বিনী আমাকে দেখেই চমকে উঠলো। তারপর বললো, কী হয়েছে তোমার? অসুখ করেছে নাকি?

আমি দু’হাতে মুখ ঢেকে বললাম, স্রোতস্বিনী, আমি তোমাকে ঠকিয়েছি। 

স্রোতস্বিনী একটুও বিব্রত না হয়ে বললো, কী যা-তা বলছো তুমি! আমি তো কিছুই জানতে পারিনি…

তোমার জানতে পারার কথাও নয়, কিন্তু তুমি আছো বলেই আমি বদলে গেছি, আমিও সুন্দর হয়ে উঠেছি, আর যেসব মেয়েরা আমাকে এড়িয়ে চলতো, আমাকে ঠকাতো, নানা মিথ্যা কথায় ভুলিয়ে রাখতো, তারা সবাই একে একে আমার জীবনে ফিরে এসেছে, আর আমিও তাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি…

কিন্তু একথা তো ঠিক, আমি আছি বলেই ওরা আছে… 

হ্যাঁ, তা ঠিক। আমি মেনে নিলাম। 

আর আমি যখন থাকবো না, ওরাও থাকবে না… 

হ্যাঁ, সে কথাও ঠিক। 

তাহলে তুমি ওদের সঙ্গে জড়াওনি। ওরাই আসলে আমার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে… 

আর আমি? ওরা আর তোমার মধ্যে আমার স্থান কোথায়? 

তুমি একটি শিশু। হি হি করে হেসে উঠলো স্রোতস্বিনী। তারপর বললো, তোমাকে, একমাত্র তোমাকেই ভেবেছিলাম হয়তো কোনওদিন বড় হবে না। আর সত্যিই, বয়সটাই বেড়েছে তোমার। মনের দিক থেকে তুমি কুট্টুসের চেয়েও ছোট রয়ে গেছো… 

কী বলতে চাইছো তুমি স্রোতস্বিনী? 

তুমি ঠিক আমার ছেলের মতো, আমার মা যেমন আমার কাছে ছিল! তুমি আমাকে ঠকাবে কী করে?… আর তাছাড়া মা’র কাছে ছেলে তো সবসময়ই ক্ষমার যোগ্য!

স্রোতস্বিনী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। সে এখন একটা পাহাড়ি শহরে নির্জন আশ্রমে অনাথ শিশুদের দেখভাল করে। বলা বাহুল্য, যেসব মেয়েরা আমার জীবনে ফিরে এসেছিল, তারা সবাই একে একে উধাও হয়ে গেছে। স্রোতস্বিনী চলে যাওয়ার পরই তারা মিথ্যে কথা বলতে বা আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল। আমি আবার একদম একা হয়ে গেছি। মাঝেমাঝেই সেই পার্কের বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকি। আর অপেক্ষা করি কোনও চঞ্চল পায়ের শব্দের। যদি সে ফিরে আসে! আসতেও তো পারে। 

সুন্দর মেয়েরা আজও আছে পৃথিবীতে। তারা হারিয়ে যায় নি…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

সুমন সাধু

গু চ্ছ ক বি তা

সু ম ন   সা ধু

অন্ত্যেষ্টি

 

এসবই গাছেদের রহস্য। মর্মর শব্দটি থেকে দুটো পাতা খসে পড়ে। শুষ্ক ত্বক৷ আর সকালের রোদ লাজে রাঙা। এক্ষুনি দূরের কোনও মাদলের শব্দে আমরা যে যার মতো চুম্বনে মিলিত হব। আর সমস্ত দাগ রেখে ধুলো উড়ে যাবে গাছ থেকে গাছেদের দলে।

pujo_16_sketch2

 

এইভাবে আমার বছর শেষের কাব্যে খানিক বিষাদ আসে। প্রিয়েরা একে একে বাসা ছাড়েন। বনেদি বাসা। তেতলার ছাদে দুপুর দুপুর আসর বসেছে। আমার প্রিয়েরা ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছেন। আয়োজন সামান্য। এই সামান্যের ভিতর কত ঢেউ। কুল-কিনারা নেই। কেউ কাব্যি করে বলেন, এ সময় বড্ড নরম, স্বভাবে ঘি ঢালো।

pujo_16_sketch2

 

ঘি ঢালা শেষ হলেই ষাটের দশকের ওপার হতে আমার প্রতিমা ব্যানার্জী গেয়ে উঠবেন, একটা গান লিখো আমার জন্য। কণ্ঠে আদর। আর গতরে সোহাগ। গান শেষে প্রিয়তম পরিচালক পাত্তরে খানিক সুরা ঢেলে বলবেন, আহা গো! অতঃপর এক ঝাঁক পাখি উড়ে যাবে পুব আকাশ দিয়ে। অবশিষ্ট খসে যাওয়া পালক ফেলে যাবে আমাদের কোলে, শরীরে।

pujo_16_sketch2

 

এমনই কিছু দৃশ্যের জন্ম হয়ে যায় বছর শেষে। একদিকে গান, আরেকদিকে স্লোগান। যুগলবন্দিতে ফেটে যায় আমাদের বহু যুগের রোদ। রান্নাঘরে মা ছুটে যায়। ভাতের ফ্যানার টগবগ শব্দে আর ঘুম আসে না মায়ের। কৃষকদের সমস্ত স্লোগান তখন মায়ের চোখে, মুখে, নিঃশ্বাসে৷ মা মনোযোগ-সহ মাড় গালা শেষ করে। ওদিকে রেডিওতে আহ্লাদি একটা সুর বেজেই চলেছে একঘেয়ে৷

pic333

 

এ অসম্ভবের ওম থেকে বেরিয়ে আসছে সরু চালের ভাত। বাড়ন্ত দুপুরে পাতে তখন ধোঁয়ার নিশান৷ কতজন মরলেন, বাঁচলেনই বা কতজন! ভাতে গণ্ডি কাটতে কাটতে আমি হুব্বার মতো গতরখাকি হয়ে গেলাম৷ বহু দূর থেকে ভেসে আসা বিরহী সানাই কত কত ভাত নষ্ট করল। কিছু বেড়ালে খেল। কিছু নেড়ি কুকুরে৷ আমার সংসার বেড়াল-কুকুর নিয়ে৷ আমি খাই, ওরা মাথা নাড়ে। ওরা খায়, আমি লাথি মারি। বছর শেষে হিসাব মিলিয়ে নিই। দেখি কী ভীষণ প্রগতিশীল এই সভ্যযুগ। এই আমি।

pujo_16_sketch2

 

তারপর… তারপর… নগর জুড়ে শীত পড়ে৷ হিম পড়ে৷ আর বিনীতা কাকিমাদের ঘর পুড়ে যায়৷ উড়ে যায়। দু-চারখানি মিডিয়া খবর করে। বিনীতা কাকিমা কল থেকে জল তোলার ভঙ্গিতে পায়রা ওড়ায়৷ মিডিয়ার ক্যামেরায় আসে রক্ত আর উল্লাস। বিনীতার চোখে শুধু জ্বর। আর ভোর পাঁচটার ট্যাপ কল। আর বরের পেটানো। আর আগুন। আগুন। আর পায়রা। পায়রার রং। আর একঘরে পোড়া কমিউনিস্ট জেদি বিনীতা। পাঁচদিন ভাত খাননি।

pujo_16_sketch2

 

প্রিয়েরা চলে যাচ্ছেন, না বলে। বনেদি বাড়ির শূন্য চাতালে বসে বসে ভাবি চলে যাওয়ার কথা। পিছুডাকের টুংটাং। বংশীদা, পল্টুকাকা, হরিপদর জামাই, আব্দুলের চাচি, সান ফ্রান্সিস্কোর আলেকজান্ড্রু, ল্যাটিন আমেরিকার সাইমন। হিসাবের ফর্দ বাড়তে থাকে। আমার ঘুম আসে। জ্বর আসে৷ এত কিছুর মধ্যে কেটে যায় দীর্ঘমেয়াদি বছর৷

pujo_16_sketch2

 

ওঁ গঙ্গা

দূর থেকে দেখি লাল মরচে পড়া অতিকায় দেওয়াল, দেখি চাঁদসারি আর সারিবদ্ধ গাছ

 

ওঁ গঙ্গা

মানুষের অহংকার ঝরে পড়ছে যে নদীকূলে, দেখি চাঁদ থেকে তার দূরত্ব কতটা

 

ওঁ গঙ্গা

কতটা ডানা মেললে যোগফল শূন্য হয়

 

ওঁ গঙ্গা

এইসব ভেবে ভেবে তোমায় পেরোচ্ছি

 

ওঁ গঙ্গা

মাথা, কাঁধ, কোমর পেরোতে পেরোতে আমার অবেলার ভাত ফুটে যায়

 

ওঁ গঙ্গা

দিনেদুপুরে তোমার গন্ধ ঝরে পড়ে

.

.

.

এইখানে তাহাদের বিরতি। আর । আর । আর । অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সুসম্পন্ন হয় একদল গাছের মেজাজে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

শুক্লা গাঙ্গুলি

বাং লা দে শে র  ক বি তা

শু ক্লা   গা ঙ্গু লি

অগ্নি সংকেত

কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরি দরজায়
গ্যাস লাইন জানালা আকাশ সবই ছুঁয়ে দেখি
চাবির গোছায় সংসার দুলে দুলে-
স্থির প্রাণন এখন

 

বড় রাস্তায় উড়ো খই আর খুচরো পয়সার ছয়লাপ
সংকেতের আগুন শরীর মাপে- অদৃশ্য মায়ায়
ফুলকি চলে বাতাসে

 

চিদানন্দ মন হিসেবের জ্বালানি যানে ঢেলে
শূণ্য শতকে চোখ রাখে
টায়ারের সুতো কেটে হাইড্রোপ্ল্যানিং-
রাস্তা ছেড়ে এবারে সে উড়তে চায়

 

পুরোনো হাতঘড়িটা সংসার আঁকরে
জরায়ুর দেয়ালে রাখে- মাতৃঋণ

 

সমস্ত মন জুড়ে ক্রমাগত ভাসতে থাকে-
কিছু উড়ো খই আর সিকি- আধুলির

চিল্লার…

 

রণ-পা

দুপুরের মেঝেতে এক টুকরো রোদ-
কিছুটা তুলে রাখি কাউন্টার টপে
সময় মত সেঁকে নেব রুটি না হয়-

 

ধানক্ষেতে পঙ্গপাল তাড়ায় কিছু বাঁশের রণপা-
মানুষ খোঁজে তারা, ঝাঁক ঝাঁক পোকার দল
সবটা খায় কৃষকের ভাঙ্গা মন আর
চোখের তাবৎ আলো রসিয়ে রসিয়ে-

 

কয়েক জোড়া ক্ষুধার্ত পেট হঠাৎ টিপে ধরে
টুটি আপ্রাণ- সমস্ত সংসার দাঁড়ায় রণ পায়ে
বাঁচার লড়াই- ঝাপিয়ে জোড়দার

 

রোদে ফুলতে থাকে-
ক্ষিদের রুটি
সময়মত

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

জহির খান

বাং লা দে শে র  ক বি তা

জ হি র   খা ন

বিগলিত দৃশ্যপট

বুক পকেটে নিয়ে হাঁটি চৈত্রের দুপুর
দৃশ্যত এক কবিতা হবে প্রিয় সময়
তাহারা যাত্রার বিকেল হয়ে ফিরবে
বা নাই ফিরে আসুক আর এই তল্লাটে

দুপুরের সুমিষ্ট ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ুক পাড়ায়
গলির মুখ থেকে বেরিয়ে আসুক কবি
টিউব টাইপ সন্ধ্যায় নেমে আসুক পাহাড়

এখন
পাতারা ভুলে বসুক দীর্ঘ এক ছায়াশরীর
ফেকহী কিতাবাদী আলোর মুখ-

ধরে রাখি খাঁ খাঁ রোদ পরস্পরে

 

ফানুস উৎসব থেকে বলছি

শাদা কালো ফ্রেমে আমরা পাতাদের গান করি
দেখি শৈশবের দৈত্যদের বেভুল অসতর্ক প্রেম
দেখছি তুই তুমি আপনি সময় সতর্কে কৌশল
ভাবছি পাখাঝাপটায় সম্পর্ক কতোটা অসহায়
দেখছি সোনালী ফুল রোদ বৃষ্টি হচ্ছে অনবরত
দেখি শরীরের আড়মোড়া ভাঙন গতিবিধি স্বর
শুনছি হাওয়াদের কামছলা অতীত কথার গল্পে

অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে
সহবাস বসবাস চাষবাস করছেন
প্রাগৈতিহাসিক সময় ধরে

এখন
দেখি এইসব মৃত ফানুস উৎসব অনুষ্ঠান

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

ক বি তা

অ নি ন্দ্য সু ন্দ র   পা ল

অনুরাগ

মৃদু শব্দ শোনা যায়, আস্তে আস্তে

ভেসে আসে প্রবাসী প্রবাহমান

 

স্বীকারোক্তির পরোয়া নেই কোনো

যে যেমন পারে, পোশাক রাখে

ঝরে পড়ে, এমনই ঘনিষ্ঠ আঙুলে

 

এই তো যথার্থ প্রেম, সহসা স্পন্দন

যাকে মৃদু ভাষায় অনুরাগ বলে।।

 

সনেট

কেউ জানে না কে আগে এসেছিল

 

সম্পূর্ণ পথ এঁকেবেঁকে গেছে

দূরে দূরে ইতস্তত আগামী

হাঁটতে হাঁটতে কয়েকজন ক্লান্ত

 

কেউ জানে না, কেউ দেখেও নি

 

শূন্য, সংসার ও দংশন 

এসবের থেকেও অনেক দূরে

 

কখনও বৃষ্টি এলে, দেখতে পান ঈষৎ দেবতারা

যখন তুমি সরে যাও, সনেট থেকে অন্ধকারে।।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

রাজর্ষি দে

ক বি তা

রা জ র্ষি   দে

দু হাত রেখেছি মাটিতে

বিষ শুষে নিই কানা চোখে

বিশ-আঙুল শিকড় বুনি

চতুষ্পদ কুকুরের ধারা

জ্বর পেটে চাঁদ খেয়ে নিই

 

চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়

হাড়মাস খেয়েছিস শালী

আমিও ছিঁড়েছি নাভিডোর

কে কাকে খেয়েছি আগে পিছে

মাংসের গুণ মাপা হোক

 

পোয়াতী ঘাসের দুধ

পোয়াতী ঘাসের বুক বেয়ে

শিশিরের দুধ ঝরে পড়ে

শুষে নিলে মা-হারা যুবক

প্রেমিকার নাভিমূল পড়ে

আরও পড়ুন...

Categories
2021-aug

আমিনুল ইসলাম

ক বি তা

আ মি নু ল   ই স লা ম

ছায়া

বাঁশি আঁকতেই কান্নায় ভেসে ওঠে নৌকা
মাঝি নেই চরাচরে

 

যতদূর উধাও আকাশ
বিবমিষা বিষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে

 

অনেকটা যেতে হবে কথা ছিল এমন
বাঁশি ও নৌকা ভুলে ছিল ওরা সৈন্য নয়
কিংবা এগুলো হয়তো স্বপ্ন ছিল

 

যেটা রং তুলিরও মনেই ছিল না

 

কবিতায় পর্ণোগ্রাফ

জানালা খোলা মাঠ
আকাশ, বাতাস, আলো হঠাৎ প্রবেশ করে
আবার বেরিয়ে আসে

 

দরজায় সশস্ত্র প্রহরী
আমি নিদ্রাহীন করোটিগুলোকে ছড়িয়ে রাখলাম
তারা পদবিন্যাস শুঁকে নেবে

 

কিছুটা বাতাসের ভলিউম হ্রাস করুন
বুকে তীব্র তাপ; ব্যথাটাও তেমন

 

নিরলস ছায়ার ছুটি যখন ঘোষণা করা হয়

আরও পড়ুন...