Categories
editorial

Editorial-November

সম্পাদকীয়

রবিবার, ২৮শে কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 14th November 2021

পুজো সংখ্যার পর আবার ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ ফিরে এলো সাধারণ সংখ্যার সম্ভার নিয়ে। আর, এরই মাঝে ভেসে এলো আরেক সুখবর। বইমেলা। অতিমারী এই বছর বন্ধ করিয়ে দিয়েছিল বইয়ের মিলনোৎসব। আবার তা ফিরে আসছে আগামী বছরের শুরুতেই। নতুন বই প্রকাশ, লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার, বহুদিন পর দু’দণ্ড সাক্ষাৎ-আড্ডা… আবার এই সব কিছুর সম্মেলন ফিরে আসতে চলেছে কবিতা-গল্প-ম্যাগাজিন নিয়ে মেতে থাকা আমাদের প্রত্যেকের জীবনে।

আরো একটি বিষয় আবারও সবার কাছে বিনীতভাবে তুলে ধরতে চাই। অনেকেই লেখা পাঠাচ্ছেন ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ ওয়েব ম্যাগাজিনে, প্রচুর লেখা মেইল-এ এসে পৌঁছোয় প্রতিদিনই। তাই লেখা পাঠানোর পরের মাসেই কিংবা দু’এক মাস পরেই তা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। অনুরোধ করব, অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করুন। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের এতোটা পথ অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে, সেই ভালোবাসার কারণেই আমাদের এটুকু অনুরোধ।

 ১৯০০ সালে স্বামী বিবেকানন্দ সান ফ্রান্সিসকো শহরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ‘গীতা’য় শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন যে, কাজ বন্ধ করে রাখা এ জীবনে মুহূর্তমাত্র সম্ভব নয়। প্রকৃতির গুণগুলিই মানুষকে কাজ করে যেতে বাধ্য করে। নিজের প্রকৃতিগত পথে চলা উচিত। এভাবেই ক্রমোন্নতি সম্ভব।

আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলি এই কথাগুলি সব সময় স্মরণে রাখতে। তাই হয়তো আপনারা সবাই-ই আমাদের সঙ্গে এতদিন ধরে রয়েছেন। আগামীতেও এভাবেই আপনাদের নিয়ে আরো পথ পেরোতে চাই। সেই আশা নিয়েই আপনাদের কাছে আমরা পৌঁছে দিলাম নভেম্বর সংখ্যা। আপনাদের মতামতের প্রত্যাশী রইলাম। 

Categories
2021-nov

একলা খেলা অন্ধকারে

ব ই ক থা

ধী মা ন   ব্র হ্ম চা রী

dhiman2

কাব্যগ্রন্থ : একলা খেলা অন্ধকারে

একলা খেলা অন্ধকারে

তারা ভট্টাচার্য

প্রকাশক । মানবজমিন

প্রচ্ছদ । সুদীপ্ত ভট্টাচার্য

১৩০ টাকা

আমরা কেন কবিতার সঙ্গে এতো একাত্ম হয়ে থাকি? কেন আমরা এভাবে কবিতার ঘরে বাস করি? এসব অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় নিরন্তর ঘুরে বেরায়। সন্ধান চলে সেইসব প্রশ্নের।সম্প্রতি মানবজমিন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বই ‘একলা থাকা অন্ধকারে’।কবি তারা ভট্টাচার্য। চার ফর্মার বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে তাঁর যাপন কথা। একজন কবির যে কোন বয়স থাকে না, তা যেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই ধরা পড়ে অর্থাৎ চোখে দেখা যায়,বোঝা যায়। ধরা পড়ে চির যৌবনের কথা। বইটার প্রথম কবিতায় আমাদের বাকি কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কবিতার নামই ‘কবিতা’, নীচে কবিতাটা একটু উল্লেখ করি—

 

কবিতা

 

‘সব পথ বন্ধ হলে কবিতা দুয়ার খুলে দেয়

সর্বহারার জন্য অন্নজল সযত্নে সাজায়

শয্যা পাতে দুঃখের গভীরে

প্রেমের জাজিম বোনে নিরাময় এনে দেবে বলে’

 

কি অদ্ভুত একটা ঘোর।কি অদ্ভুত নেশা এই কবিতার মধ্যে দিয়ে।কবি কবিতার পথ দিয়ে মুক্তি আনার পক্ষপাতী।ঠিকই,এই বই পড়তে পড়তে আমার বার বার মনে হয়েছে, কবিতা দিয়ে যাঁরা অস্ত্র বা ঢাল নির্মাণ করেছেন,ঠিক তাঁদের থেকে একটু অন্য পথে হেঁটে তারা ভট্টাচার্য লিখছেন,মুক্তি।আসলে এই মুক্তি কী?সত্যিই এই মুক্তির স্বাদ আমি নিজেও অনেকটা বুঝে উঠতে পারি।এ প্রসঙ্গে,জয় গোস্বামীর একটা বহু পঠিত বই,’জয়ের সুভাষ’বইটির কথা মনে পরছে।দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত।সারা বইয়ে কবি জয় তাঁর সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জানা-অজানা,চেনা-অচেনা নানা কাহিনি বর্ণনা করছেন।সারা বইয়ের আলোচনায় কবি সুভাষে’র অনেক গুলো কবিতার কথা উল্লেখ করেছেন।এমনকি এই কবি সুভাষের উদ্দেশ্যে তিনি বইয়ের শুরুতেই একটা ‘কাশফুল’ নিয়ে কবিতা লিখেছেন –

 

কাশফুল

 

রেললাইনের ধারে মানুষের পিঠসমান কাশফুলের বন

 

টাইপরাইটার নিয়ে তার মধ্যে একজন বসে

 

একটা শালিক নামল টাইপরাইটারে

পুজোর আকাশ থেকে সাদা রং এক ঝাঁক মেঘও

নেমে এল তাঁর মাথায়।

                              দূর দিয়ে চলে গেল ট্রেন…

 

ট্রেনে যেতে যেতে আমি স্বচক্ষে দেখলাম

কাশবনের মধ্যে বসে সুভাষদা কবিতা লিখছেন।

 

কেন এই আলোচনায় এই কবিতার কথা বা এই আলোচনার কথা তুলে আনলাম,তার কারণ-কবি সুভাষকে তাঁর উত্তরসূরি কবি জয় দেখছেন কাশবনে কবিতা লিখছেন।এটাই কি একজন কবির সবচেয়ে বড় সীমাহীন মুক্তির পরিচয় নয় ?পথের পাঁচালি’ সেই কালজয়ী চিত্রনাট্য,মাঠের দূরের প্রান্তে  ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়িয়ে ঝিক ঝিক শব্দে যাচ্ছে রেল,আর অপু দিদি দুর্গাকে নিয়ে অনাবিল আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই লাইনের দিকে রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে।এই ছোটায় আমাদের সবার আনন্দ।ঠিক যেমন করে এইরকম এক কাশবন।যেখানে ইচ্ছা করলেই এদিক ওদিক ছুটে যাওয়া যায়।মন সব সীমানা ছাড়িয়ে সীমারেখা পেরিয়ে যেতে চায়।সেই সীমাহীন কাশবনে এক আনন্দ উপভোগ করছেন কবি সুভাষ কবিতা লিখে।

 

আসলে আনন্দ একরকমের সুন্দর।এই সুন্দর অনুভব করার।উপলব্ধি করার।আনন্দ উপভোগ করতে আমাদের জৈবিক ও শারীরিক উপাদানের গুরুত্ব থাকলেও,অনেক অংশে সেটা সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে আমাদের দৃশ্য উপভোগের নির্দেশ করে।আসলে এই সুন্দর আমাদের চোখ দিয়ে দৃশ্যমান হয়।আর আমরা মন দিয়ে উপভোগ করি।অর্থাৎ মন আমাদের এই পঞ্চইন্দ্রিয়র মধ্যে চোখকে দৃশ্য ধরে রাখার নির্দেশ দেয়।চোখ সে কাজ করে মহানন্দে।এই আনন্দ উপভোগের জন্যই কবি জয় ওইরকম একটা কাশবনের পরিবেশ তৈরি করেছেন।তানাহলে,আনুষঙ্গিক উপাদান বেমেনান হলে,প্রকৃত মূর্তটা যথা যোগ্যতা পায়না।তাই কবির মতোই আরও পরবর্তী কবিদের সেই পরিবেশ তৈরি।এ প্রসঙ্গে কবি তারা ভট্টাচার্য’এর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে কিছুটা মৌখিক পরিচয় আমার হয়েছে।শুনেছি আজকের দিনে তিনি আমাদের মতো অত্যাধুনিক স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন না।চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ।প্রায় দেখতে পাননা বললেই চলে।আমাদের আদিমকালের ছোট্ট ডিসপ্লে ওয়ালা ফোনের মধ্যেই তিনি কবিতা লেখেন।কবিতার বীজ বপন করেন দিন-রাত।মনের মধ্যে আসা একের পর এক ছবি কবি নিজের অন্তর দিয়ে উপলদ্ধি করেন।তারপর যেন এক অদ্ভুত ভাবেই আমাদের দেখান।বিরাট অন্ধকারে আলো দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান।

 

আরও একটা বইয়ের কথা এই আলোচনায় মনে পড়ছে।’প্রসঙ্গ শিল্প, সাহিত্য’।পূর্ণেন্দু পত্রী।বইটির প্রকাশনা ‘প্রতিক্ষণ’।সেখানে নানা প্রসঙ্গে নানা সাহিত্য ও শিল্পের কথা উঠে এসেছে।’মার্ক স্যাগল স্বপ্ন-বাস্তবের চিত্রকর’ শীর্ষক প্রবন্ধে এক জাগায় লিখছেন,’স্যাগলের জগৎ হল আসলে সেটাই,যা তিনি আঁকেন; বর্ণবিন্যাসের,শরীরবিন্যাসের,মাধ্যাকর্ষনের,আনাটমির প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নির্দেশককে ভ্রুকুটি হেনে,এবং সর্বোপরি, শিল্পের জগতে থেকে থেকে দুন্দুভির মতো বেজে ওঠা সর্বপ্রকার’ইজম’কে উপেক্ষা করে।পৃথিবীর যা কিছু,টা হতে পারে বস্তু,অথবা দৃশ্য, অথবা অনুভব, অথবা দর্শন; সবই রয়েছে তার ছবিতে কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম নেই,আছে শিল্পীর নিজস্ব নিয়মে।’…তারা ভট্টাচার্য এর বেশ কিছু কবিতা আগে বলা কথা গুলোর সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে খুব সহজেই দেখা যায়।এখানে আরও একটা কবিতার কথা বলি,’অবেলায়’-

 

‘একলা মানুষ, একলা থাকো

ঘরের মধ্যে ঘর–

হলুদ শাড়ি বলল কথা

কী হল তারপর!

ঘরের মধ্যে ঘর খুলেছে

পুরোনো ধূলিজাল–

হলুদ শাড়ি, কালকে এসো,

কালকে এসো, কাল।’…

 

আলোচনার শুরুতেই একটা কথা বলেছিলাম,তা হল বিরাট একটা চিন্তা।অবেলার এই সন্ধিক্ষনেই এই ‘একলা মানুষ, একলা থাকো’ এই কবিতার মধ্যে দিয়েই জীবনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।’অভিলাষ’ নামক একটা কবিতায় –

 

‘আমার নিজস্ব কোনো অরণ্য ছিল না,

ছিল না নদী;

প্রেমিকের নিজস্ব চোখের মুকুর দেখিনি আমি,

তবে কার বা কীসের জন্য প্রবাহমান প্রতীক্ষা!

অস্তগামী সোনালি আলোর গাথা

রাত-পরী ডানায় মেখেছে–

গল্প তার রূপকথা।’

 

কবিতায় কবি বলছেন প্রেমিকের মুখ দেখেননি।অথচ সবটুকু স্মৃতি তাঁর চোখে ভাসে।সেই ভাসা ভাসা স্মৃতি নিয়েই কবি অন্তরের ছবি নির্মাণ করেন।কবিতার আঙিনায় তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র দিক খুব সহজেই চোখে পড়ে।তাছাড়াও আরও বেশ কিছু কবিতা,যেমন -‘মৃত্যু-১’, ‘মৃত্যু-২’, ‘গাছ-১/২/৩’, – ‘গাছ-৩’ কবিতায় লিখছেন–

 

‘যে সব গাছেরা একা,

হীম শীতে শূন্য প্রান্তরে নিরুপায় কাল গোনে;

প্রিয় পাখিদের আনাগোনা নেই আর রিক্ততার দিনে;’-এভাবেই কবিতার বার বার জন্ম হয়।কত কাল ও সময় পেরিয়ে কবি তাঁর নিজের অন্তর দিয়ে সবটা উপলব্ধি করা যায়।আসলে তারা ভট্টাচার্য’নিজেই তার সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী।তিনি নিজেই কবিতার রূপক আড়ালে কোথাও সৌন্দর্য, কোথাও মূর্ততাকে আঁকার চেষ্টা করেছেন,যা কবিতার পাঠক হয়ে খুব সহজেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।কবি তারা ভট্টাচার্য’এর এই বইয়ের ভেতরের প্রবাহ যেন সবাই একই সুরে কথা বলে।একজন কবিতার পাঠক হয়ে এর থেকে পাওয়ার আর কি আছে?

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

প্রচ্ছদ কাহিনী | নভেম্বর সংখ্যা

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

বা প্পা দি ত্য  রা য়   বি শ্বা স

bappa

মিথ মিথ্যে ধ্রুব সত্য

অদ্বৈত। অদ্বৈতাচার্য গোস্বামী। জীবত্‍কাল একশ পঁচিশ বছর( ১৪৩৪ – ১৫৫৯)। পূর্বাশ্রমে পরিচিত ছিলেন কমলাক্ষ মিশ্র নামে। ইনিই আধুনিক বাঙালির প্রথম মনীষা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পুরীর রথযাত্রায় লক্ষ মানুষের সমাবেশে অবতার ঘোষণা করেন।

           অদ্বৈত। জন্ম আনুমানিক ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দের আগে পরে। মৃত্যু ২০০৬ সালে। অর্থাৎ মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল দুশো ছাপ্পান্ন বছর। অথচ কিভাবে যেন পূর্বপাড়ের গাঙ্গেয় বাতাসে পল্লবিত হয়ে আমাদের ছোটবেলার কানে তথ্যটা পৌঁছলো যে আলিপুর চিড়িয়াখানায় যে দৈত্যাকৃতি কূর্মরাজ শীতের পড়ন্ত বেলায় ভেজা পাথরের উপর বসে রোদ পোহান তাঁর বয়স পাঁচটি শতাব্দী পার করেছে। অনেক পরে জেনেছি তাঁর নামটিও অদ্বৈত।

           কী আশ্চর্য! একদিন চিড়িয়াখানা ভ্রমণকালে দুপুর দুপুর আমার এই দ্বিতীয় অদ্বৈত’র চোখে চোখ পড়ে গিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত নির্জনতার সুযোগে হঠাৎ দেখেছিলাম নবদ্বীপের রাস্তায় মশাল হাতে জনজোয়ার নেমেছে, যার পুরোভাগে আছেন পাণ্ডিত্য আর সৌন্দর্যে ভাস্বর অনিন্দ্যকান্তি মহাপ্রভু। এই চকিত উল্লম্ফন ক্রিয়ায় যেটা ঘটল তাতে রূপ পেল অনুভবের গভীরতা — অবচেতনের ইমেজারিতে ভর ক’রে মন ব্যস্ত হয়ে উঠল এমন এক সমান্তরালের নির্মাণে যা কোনো উইলফুল সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ নয়, বরং এক সচেতন নির্মাণ যা-তে অজান্তেই গড়িয়ে আসা চোখের জলের মোলাকাত ঘটে যায় মহাসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে। ঘটিয়ে দেন সেই অজানা ব্যক্তি যিনি কচ্ছপটির নামকরণ করেছিলেন অদ্বৈত।

           “আমরা তো তোর মত কবি নই।” পরিচিত বন্ধুবৃত্তে এরকম ছদ্ম-অনুযোগ বা নিষ্পাপ শ্লেষের মুখোমুখি হননি এমন কবিতালেখক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখন প্রশ্ন হল যতই হালকা চালে কথাটা বলা হোক না কেন, আমাদের বুঝতে হবে বোধের কোন শেকড়  থেকে বক্তার মুখে এই শব্দগুলো উঠে আসে। বক্তা কি বলতে চাইছেন তিনি গদ্যকার হলেও হতে পারেন — ছোটগল্প বা প্রবন্ধ তিনি বা তাঁরা  লিখলেও লিখে ফেলতে পারেন, কিন্তু কবিতাটা তার চেনা কাপের চা হয়ে উঠবে না কোনোদিন? আসলে ব্যাপারটা তা নয়। একটু গভীরে ঢুকলেই আমরা বুঝতে পারব যে এই অনুযোগটি যাঁকে কেন্দ্র ক’রে বক্তা মোটেও বলতে চাইছেন না যে তিনি ছন্দ এবং অন্ত্যমিল  সহযোগে লিরিক্যালি বাক্যালাপ করেন! বরং অজান্তেই তিনি তাঁর অনুযোগের পাত্রটিকে একটি শ্রদ্ধামিশ্রিত সম্মানের আসন দিয়ে ফেলেছেন এই ভেবে যে তাঁর বন্ধুটি কথা বলার সময় যে ধরনের শব্দ প্রয়োগ করে বা যে সব শব্দছবির ব্যবহারে তার বক্তব্যটি নান্দনিক উৎকর্ষে ঋদ্ধ হয়ে উঠে সুরে বাজতে থাকে, সে ভাষা দৈনন্দিনের নয়, সে ভাষা প্রাত্যহিকতার বাইরে এবং সেই কায়দাটি সবার পক্ষে আয়ত্ত করাও সহজ নয়। অজান্তেই জন্ম হয় সমান্তরাল এক মিথের — কবি হয়ে ওঠেন সাধারণের থেকে উচ্চতর এক সত্ত্বা, ক্রমে ঋষিতুল্য এবং অবশেষে হাজির হয় সেই অমোঘ বিশেষণ — ক্রান্তদর্শী!

           প্রশ্নটা ওঠেই। এই যে একটু আগে আড়াইশো বছরের কূর্মকে পাঁচশো বছরের বলে চালানো — এর দায় কি আদৌ গঙ্গার পুবপাড়ের হাওয়ার? ভাবের ঘরে রীতিমতো ডাকাতি হয়ে যাবে যদি সেটাকেই মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা করি। অবচেতন বলে উঠবে শাস্ত্রে (নাকি বিবর্তনবাদে?) কথিত স্থিতির ধারক দেবতা বিষ্ণুর দশাবতারের দ্বিতীয়জন এই কূর্ম-ই। জীবজগতে মানুষের গড়পড়তা চেনা সদস্যদের মধ্যে  সে অন্যতম অথচ সে-ই একমাত্র বহুলপরিচিত প্রাণী যার একটি শাখার সদ্বংশজাত সদস্যদের আয়ু যেকোনো দীর্ঘায়ু মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেকটা বাইরে। যা পরিচিত অথচ নাগালের বাইরে তাকে ঘিরেই বেড়ে ওঠে মানুষের মুগ্ধতা, দানা বাঁধে কল্পনার যা অনায়াসে আড়াইশো বছরকে সম্প্রসারিত করে পাঁচশোয়, তারপর অদ্বৈত নামের বৈতরণীতে সাঁতার কেটে পৌঁছে যায় বাংলার প্রথম নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে। এই সম্প্রসারণ মিথ্যে নয়, মিথস্ক্রিয়া। আর মিথের সঙ্গে কবিতার পারানিমুদ্রার নাম, পাঠক মাত্রই জানেন, ইঙ্গিত। এই ইঙ্গিতই ঘটমান আর চিরকালীন সময়ের মধ্যে পারাপার ঘটিয়ে দেয়, হাতের কুপির মিটমিটে আলোটাকে পাল্টে দেয় স্টারি নাইটস-এর হাজার তারায় ঝলমল করে ওঠা ভিনসেন্ট আকাশে। “যে পক্ষের পরাজয় সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না  আহ্বান। জয়ী হোক রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান — আমি রব নিষ্ফলের  হতাশের দলে!” মহাকাব্যের পাতা থেকে নেমে এসে রবীন্দ্রনাথের কর্ণ হঠাৎ যোগ্য অথচ ব্রাত্য প্রতিটি মানুষের কাঁধে হাত রাখেন। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির সিঁড়ি, পুরস্কার-উৎসবের মঞ্চ বা ঋদ্ধ সংকলনের সূচি নির্বিশেষে আহত মানুষটিকে বোঝান যে তিনিও তাঁর মতোই rank outsider — গডফাদারহীন, ‘কৌলীন্য’-বর্জিত সূতপুত্র। ঝড়ের তাণ্ডব ক’মে এলে মানুষটি বুঝতে পারেন শত চক্রান্ত সত্বেও কালের কষ্টিপাথরে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ বীরের শিরোপাটি রাধেয়’র মাথায়ই উঠেছে। আর বাসুদেব কৃষ্ণের পরেই দ্রৌপদী এবং তদপরবর্তী প্রত্যেক তেজস্বিনী পাঁচ হাজার বছর ধরে যাঁকে প্রার্থনীয় সিংহাসনের বাদবাকি অংশটুকু দিয়ে নিঃস্ব হয়ে থাকেন, তিনি কোনো ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়সন্তান নন, তিনি এই ‘সূতপুত্র’। সামান্য কুপির মিটমিটে আলোটা আগলে ধরে, হাতের চেটোটা চোখের কোণায় একবার ব্যবহার ক’রে, মানুষটা হাঁটতে থাকেন, ভাবতে থাকেন ওই শব্দগুলোয় আসলে হতাশার উচ্চারণ নেই, রয়েছে এক অন্তর্লীন আত্মবিশ্বাস যা, চূড়ান্ত সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতা মহাকালের ক্যানভাসে নিশ্চিত হয়ে আছে জেনে, আপাত সাফল্যকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে স্পর্ধা যোগায়। বীরগাথার মাইকেল নয়, সার্থক মিথের উৎসারে রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন। এই মিথ না থাকলে কত কুপির আগুন যে শুধুমাত্র দীর্ঘশ্বাসের বদ্ধবাতাসে নিভে যেত তার ইয়ত্তা নেই।

          অবাক করা ব্যাপার! সংস্কৃত ভাষায় ইতিহাস শব্দটা কিন্তু আমাদের পরিচিত হিস্ট্রি অর্থে ব্যবহৃত হয় না। তার আত্মীয়তা বেশি ‘কিংবদন্তী’র সঙ্গে, ইতি-হ-আস — ‘এমনই ছিল, এমনই হয়েছিল বলে প্রচলিত।’ এই সংজ্ঞার হাত ধরে যদি একবার আদিকাব্যগুলোর দিকে তাকাই, দেখতে পাবো যে দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে তাদের মধ্যে একমাত্র মহাভারত আধুনিক অর্থে ইতিহাস না হলেও, ইতিহাসের এমন এক ভাঁড়ার যাতে তথ্য-উদ্ভাবনা-স্মৃতির কল্পনারঞ্জিত ও উপাখ্যান আশ্রিত মিশেল (যাকে বলা যায় heady concoction) আমাদের সৃষ্টির বোধে প্রায় কামার্ত শিহরণ জাগিয়ে বার করে আনছে ভাস্বর সব চিত্রকল্প যা ইউরোপীয় ডায়লেক্ট-এ পরিচিতি পায় মিথ রূপে আর হিন্দুরা (হিন্দুকুশ পর্বতের দিনের-প্রথম-রোদে-স্নান-সারা ঢাল ও সমতলের অধিবাসী অর্থে বললাম, পাঠকরা দয়া করে অন্য মানে করবেন না) নাম দেন পুরাণ — সাহিত্য ও সংস্কৃতির আদিম অথচ চিরন্তন শস্যভাণ্ডার। কাজী নজরুল ইসলামের আইকনিক ‘বিদ্রোহী’র (যা আবৃত্তিশিল্পীদেরও অত্যন্ত প্রিয় একটি কবিতা) প্রসঙ্গে আসা যাক :

‘ধরি বাসুকির ফণা জাপটি/ ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি!’

আবার

‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী/ মহা সিন্ধু উতলা ঘুম-ঘুম ঘুমচুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্ব নিঝ্ঝুম/ মম বাঁশরীর তানে পাশরি/ আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।’

ইউরোপীয় ও দেশীয় মিথ-উপাদানের সংযুক্ত উচ্চারণে পাঠকের স্মৃতি, মনন ও বীক্ষা জুড়ে ঘটতে থাকে একের পর এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণ, কবিতাটিকে চকিতে করে তোলে brighter than a thousand suns.

           মিথাশ্রয়ী কবিতা? নাকি কবিতাও জন্ম দিতে পারে মিথের? চলে আসি পঞ্চাশের দশকে কৃত্তিবাস আন্দোলনের পুরোধা কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কালি ও কলমে:

‘নীরা, তুমি নিরন্নকে মুষ্টিভিক্ষা দিলে এইমাত্র/ আমাকে দেবে না?/ শ্মশানে ঘুমিয়ে থাকি, ছাই-ভস্ম খাই, গায়ে মাখি/ নদী সহবাসে কাটে দিন/ এই নদী গৌতম বুদ্ধকে দেখেছিল/ পরবর্তী বারুদের আস্তরণও গায়ে মেখে ছিল/ এই নদী তুমি!’

 কে এই নীরা? কে এই আলোকপর্ণা নারী, এই নিম অন্নপূর্ণা যাঁর সামনে নতজানু হয়ে প্রসাদ ভিক্ষা করতে সহজ সত্যব্রত কবি দুবার ভাবেন না? আদৌ কি ইনি কোনো নারী, নাকি বহমানা  সময় — নদীমাতৃক ভারতবর্ষের বুক চিরে বয়ে চলা মহাকাল? সুরঙ্গমা, বনলতা সেন আকাশলীনা, সুলোচনা, অরুণিমা সান্যালের যোগ্য উত্তরসূরী এই নীরা — যেন সবার প্রতিভূ রূপে একা দাঁড়িয়ে মিথে ভর করে নিজেই হয়ে উঠেছে এক অনির্বচনীয় মিথ — যাকে ঘিরে অবিরাম প্রশ্নবাণ ধেয়ে এসেছে কবির দিকে — আজীবন।

          মিথ থেকেই স্পর্ধা সঞ্চয় করে জন্ম হয় দিনবদলের স্বপ্নের। কিন্তু স্বপ্ন ভুল পথে ছুটলে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষের পরেও বর্ষা নামে না, শীতের ঠাণ্ডা হাত গলায় চেপে বসে প্রাণবায়ুর অন্তিম ফুৎকারটুকুও নিংড়ে বের করে নেয়। বাংলা কবিতায় কবি শঙ্খ ঘোষের ক্রান্তদর্শী স্বরটি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া বাৎসল্যের হাহাকার ফুটিয়ে তোলে মিথের আশ্রয়ে — ‘বাবরের প্রার্থনা’য় :

এই তো জানু পেতে বসেছি পশ্চিম

 আজ বসন্তের শূন্য হাত —

 ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

 আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

 কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন

 কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয় !

 চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব

 বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা !

 মৃত্যুই (সে অপমৃত্যু বা স্বাভাবিক মৃত্যু যা-ই হোক না কেন) স্বপ্নের নিয়তি। ‘আত্মজীবনীর অংশ’ কবিতায় জয় গোস্বামী সভ্যতা পেরিয়ে সংযোগ ঘটিয়ে ফেলেন নিয়ান্ডার্থালের সঙ্গে :

‘সে যখন আমাকে খাতা দিয়ে পিটোয় আর বের করে দেয় বাড়ি থেকে আর পাথরের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে গুহা থেকে আমি শিকার খুঁজতে বেরোই তখন আমার বেরিয়ে যাওয়াটা কোনো পথ হতে পারে না’

মিথ, সময়ের মতোই, থেমে থাকেনি। উত্তরাধুনিকতার হাত ধরে হেঁটে গেছে জাদুবাস্তবতার দিকে। মিথ থেকে কবিতা নয়। মিথ হয়ে যাওয়া কবিতা, মিথ হয়ে ওঠা সার্থক চরিত্র, এমনকি বাঙালির জীবনদেবতা কবির মিথ হয়ে ওঠা জন্মদিনের তারিখসংখ্যাটাও কবির অবচেতন থেকে নেমে কবিতার শরীরে এসে বসে যায়। জয় গোস্বামী ‘এখানে তোমার মাটির দেশ’ কবিতায় লেখেন :

‘কে মেয়েটা? একহাতে টিফিন কৌটো, একহাতে ভাইয়ের হাত ধরে, ঢালু দিয়ে ক্ষেতে নামছে, বাবাকে খাবার পৌঁছে দেবে। এই মেয়ে দুর্গা বুঝি? কোঁচড়ে আমের কুসি নিয়ে সালোয়ার-কামিজ পরা নীলমূর্তি দাওয়ায় দাঁড়াবে? কিংবা এ-ই অন্য মাঠে ময়নাপাড়ার মাঠে গিয়ে আকাশে যুগলভুরু হানলো কিনা, দেখল কিনা চেয়ে সেকথা কবির সঙ্গে মনে-মনে জেনে সেই মেয়ে এতদূর চলে এল? অথবা সে আমাদেরই পাশের বাড়িতে পঁচিশ বছর আগে ভাড়া থাকত’

অনতিবিলম্বে আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি সচেতনভাবে কবি এই মিথের বিনির্মাণ ঘটাচ্ছেন একই কবিতায় — ঘনিয়ে তুলেছেন ডিসটোপিয়া:

‘রাস্তার দুধারে এত কাশফুল দাঁড় করালো কে? বন থেকে উঁকি দিচ্ছে একটি বালক, অপু নয়।…. রামায়ণ যাত্রা নয়, রাত রাত জেগে A মার্কা  ভিডিও দেখছে গ্রামে গ্রামে অপুদের পাড়া! ‘

 মিথ, জাদু আর বাস্তবতা একাকার হয়ে যায় কবি শ্যামলকান্তি দাশের কলমে :

‘যিনি কুঠার লিখতে গিয়ে লেখেন কূর্ম এবং কূর্ম কেটে অনায়াসে বসিয়ে দেন পরশুরাম

স্ত্রী ঐশ্বর্যের উপমা দিতে গিয়ে যিনি কবিতায় টেনে আনেন দ্বৈপায়ন হ্রদের ছায়া

 চিরজীবী শব্দটির ভিতর-বাহির বোঝাতে যাকে আঁকতে হয় কখনো কৃপ কখনো ব্যাস কখনো মার্কণ্ডেয়

 তাঁকে আজ একী অদ্ভুত শব্দজব্দের ছল্লিবল্লিতে  পেয়ে বসেছে!

 এই তিনি জলপথ কাঁপিয়ে দিলেন, তো উনি ছিঁড়ে খামচে তছনছ করে দিলেন স্থলভাগ

 এই তিনি লেলিয়ে দিলেন টর্নেডো, তো অন্য দিক থেকে ধেয়ে এল মিগ-টোয়েন্টি নাইন

 এই তিনি স্কাড নিক্ষেপ করলেন তো অন্যপক্ষ ছুড়ে মারলেন পেট্রিয়ট।’

 শ্যামলকান্তির গড়ে তোলা আইকনিক ‘রাক্ষস’ হয়ত বাংলা কবিতার পথ হাঁটবে বহুকাল :

‘এমন দিন যদি আসে কখনো

 তুমি এই দাঁত দিয়েই ছিঁড়ে কামড়ে

 ভেঙে ফেলতে পারবে পাথর!

 নাকে হাওয়া নেই বুকে বাতাস নেই

 শরীরে মনে নেই মলয়পবন

 রেগে কাঁই হয়ে যাচ্ছ, তেতে আঙরা হয়ে যাচ্ছে মাথা,

 তবু কেউ তোমাকে সাজাতে ভোলেনি

 যার যেমন আছে বল্লম টাঙ্গি সাঁড়াশি

 সে ঠিক সেইভাবেই তোমাকে নিবেদন করছে তার উপচার!

           সুবোধ সরকারের মেধা-ই পারে mythical elements গুলোকে juxtapose করতে ঘোর নাগরিকতায়। মিথকে ব্লু ডেনিমস আর লেদার জ্যাকেটে সজ্জিত ক’রে, imparting a heady whiff of musk around 5 o’clock shades, কবি ‘দোয়েল’কে সঙ্গ দেন কল্লোলিনী তিলোত্তমার  হ্যাপেনিং প্রাণকেন্দ্রে :

“ক্যালিফোর্নিয়া থেকে যখন এল দোয়েল

 আমি তখনও জানতাম না তার বাবার নাম রবিনসন।

 মায়ের নাম বনলতা সেন।

 তুমি বনলতা সেনের মেয়ে ? ভাবা যায়,

 আমি কার সঙ্গে বসে বিয়ার খাচ্ছি?

……

 পার্ক স্ট্রিটের ফ্লোরিয়ানা থেকে আমরা চললাম কলেজ স্ট্রিটের দিকে

 পিঠ উপচে নেমেছে তার খোলা চুল

 আমি বললাম, এই, তোমার বিদিশায়  একটু হাত দেব?

 সে বলল শিট, আবার বনলতা সেন?

 কবির আন্তর্জাতিকতা তাঁকে মিথ আহরণ করিয়েছে ভূমধ্যসাগরের বেলাভূমি থেকেও। তাঁর ‘ক্রীতদাস’ কবিতার উচ্চারণ :

 আমার দুই দাদা

হেক্টর আর অ্যাকিলিস

 কোন কাশবনের ভেতর এখনও মারামারি করছে 

 প্রতিবছর কাশ আরও লম্বা হচ্ছে লোকে যাতে দেখতে না পায়

 একজনের হাতে শাবল একজনের হাতে বল্লম

 ওরা কি কোনোদিন থামবে না? কেউ ওদের থামাতে পারবে না?

           ওঁরা কোথায়? পাঠক হয়তো লক্ষ্য করেছেন দুটি নাম — জীবনানন্দ দাশ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই প্রবন্ধে  আলোচিত হয়নি। কারণ একটাই — এই দুই কবি নিজেরাই সশরীরে মিথ হয়ে উঠেছেন। প্রথমজন শুধু বনলতা সেন বা অরুণিমা সান্যালকে নয়, কলকাতায় ঢিমেতালে ছুটে চলা একটি পরিবহন মাধ্যমকেও মিথে পর্যবসিত করেছেন। বেশকিছু সাহিত্যপত্রিকার ট্রাম সংখ্যা তার সতেজ উদাহরণ। দ্বিতীয়জন মিথ হয়ে উঠেছেন তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভায় এবং বোহেমিয়ান যাপনে — দেয়ালে দেয়ালে কার্নিশে কার্নিশে। এঁদের জন্য মিথ প্রসঙ্গটির আলোচনা এই প্রবন্ধকারের মননে আলাদা পরিসরের দাবি রাখে। পরে নিশ্চয়ই করে ওঠা যাবে। লিখতে লিখতে মনে পড়ে গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে এক টুকরো মিথযাপন, তাঁর পরম সুহৃদকে নিয়ে লেখা ‘শক্তি’ কবিতায় :

“দুনিয়ার সমস্ত পুলিশ তাকে কুর্নিশ করে,

 রিকশাওয়ালারা ঠুং ঠুং শব্দে হুল্লোড় তোলে

 গ্যারাজমুখী ফাঁকা দোতলা বাসের ড্রাইভার তার সঙ্গে এক বোতল থেকে চুমুক দেয়।”

           এই মিথ প্রসঙ্গে আপাতত কলমটা নামিয়ে রাখার আগে লোভ সামলাতে পারছিনা কবি সুবোধ সরকারের কাছে আর একবার ফিরে যাওয়ার :

“কবিতা যেহেতু ইতিহাসের বেসমেন্ট

 সেই তলভূমি পৌঁছনোর আগে এবং পরে একটা হাহাকার লাগে

 আমি সেই হাহাকারের জন্য দারুণ একটা জর্জেট কিনি

 গলায়, কানে, কব্জিতে পড়াই নীল কারুবাসনা”

 মিথ আমাদের সেই কারুবাসনা। আমাদের mundane dreariness যখন ইথারীয় largesse এর কৃপাদৃষ্টি পায়, বেঁচে থাকাটাই উদযাপন হয়ে ওঠে। নয় বা বারো নিদেনপক্ষে আঠেরো ওয়াটের এলইডি দিয়ে জীবনযাপন চলে যায়। কিন্তু দীপাবলি উদযাপনের সময় কারো কারো প্রয়োজন হয় তেলের প্রদীপের, সুগন্ধি মোমবাতির। পরমপুরুষধন্য গঙ্গাতীরের বিখ্যাত কালীমন্দিরের আলোকসজ্জা এমনভাবে করা হয়, যেন সেই কিংবদন্তি চাতাল জুড়ে নেমে এসেছে গ্যাসবাতির পেলবতা! ঋতবান মাত্রই জানেন এই পেলবতা মিথ বটে, তবে মিথ্যে নয়, ধ্রুব। আর যাহা ধ্রুব, পোয়েট্রি আভাসে ইঙ্গিতে তাহারই স্বীকারমূর্চ্ছনা…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

নারী শহরের সম্পদ | পর্ব ৮

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ৮

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ বিজ্ঞানী…

রূ প ক   ব র্ধ ন   রা য়

rupak

নারী শহরের সম্পদ

Marie Etienne

Marie Etienne বর্তমান যুগের একজন সুবিখ্যাত ফরাসী কবি ও ঔপন্যাসিক। এতিয়েন ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিখ্যাত ফরাসী নাট্য পরিচালক Antoine Vitez- এর সহকারী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। আন্তোয়ানের কাজ তাঁকে তাঁর নিজের ডক্টরাল থিসিসের পড়াশোনার সময়েই মুগ্ধ করেছিল। এতগুলো বছরের একত্রিত কোল্যাবোরেশানের ফলশ্রুতি – এতিয়েনের বিশ্বখ্যাত বই “Antoine Vitez: le roman du theatre”। এরপর অবশ্য কবি ও লেখিকা এতিয়েনকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এর পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ২০০২ সালে রচিত “Roi des cent cavaliers” বইটিকে Marylin Hacker ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যার নাম হয় “King of a Hundred Horsemen”। ২০০৯ সালে বইটি “PEN Award of Poetry in Translation” পুরষ্কার পায়। বইটির গুরত্ব সম্পর্কে হ্যাকারের নিজের উক্তি-  “… could be variously classed as fiction, memoir, and cultural history, some partaking of all three.” PEN ছাড়াও এতিয়েন পেয়েছেন ১৯৯৭ সালের “Mallarme Prize”।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ-

  • Blancs Clos,  1977
  • Le Point d’Aveugement, 1978
  • Le Sang du Guetteur, 1985
  • Anatolie, 1997
  • Senso, la guerre, 2002  ইত্যাদি।

কবিতা

সেই নারীর মতো…

রাত্রি নামার পরেই

সেই নারীর মতো

 

লোকে বলে যাকে সোনালী ক্রসের কাছে বিরাট কাঠ-ব্রীজের উপর

দেখা গেছে, যা দৈর্ঘ্যে বেশ বড়। একটা দেওয়ালের উপর রাখা যেটা মূল আর্কওয়ের থেকে মুখ উঁচিয়ে আছে,

দ্বিতীয়টা

দুটো প্যারিশের মাঝে সীমান্ত চিহ্নিত করে আর শুল্ক দপ্তরও

 

জল কত শান্ত আর আমি কত প্রায়শই ঘোলাটে হয়ে পড়ি

বলেছিল নারী

আমি এখানে কত একা বোধ করি, কত পরিত্যক্ত

ক’টাই বা নৌকো আমার উপর দিয়ে বয়ে যায়

 

সত্য…

সত্য, এটা অথবা ওটা, তবে অন্তঃসার নয়। একটা পেঁয়াজ কাটো, তুমি দেখবে

ওটা গলে যাবে।

 

গণনা সঠিক হওয়ার জন্য সমস্তটা বলতে হবে; একের সাথে আরেক সংযুক্ত প্রাচীন

পাথরের ফাটল ধরা, আশাহীন উদয়, একটা দিন আর

তারপর আরেকটা এবং আরেকটা

 

কি ক্লান্তি। বালতিদের আসা যাওয়া ক্লান্তিকর।

বলছি কি। একটা স্মৃতিচিহ্ন অবধি নয়। কখনও সখনও পটকা-বাজি

 

আত্মহারা হয়ে আমি কখনও কোথাও যাই না।

 

উলটো পালটা হয়ে…

নিজের অভ্যন্তরীন সুতো দেখানো দস্তানার মত উলটো পালটা হয়ে, শীঘ্রই আমি

আমার প্রয়াত শব্দরা, এবং আমায় মোড়ানো প্রণয়ী চাদর

ছাড়া কিছুই থাকবো না

 

ওর পুরুষাঙ্গ এখনও বেশ শক্ত, এ যেন ওর বিয়ের দিন। কেবল

একটা কাঁধ ছায়া ছুঁয়ে ফেলে। পুরুষেরা আশেপাশে বসে আছে। ওদের

হাত টেবিল চাপড়াচ্ছে

 

গলিটা বড়-রাস্তায় পেকে ওঠে। এক একাকী পরিত্যক্ত পাখি।

আঁখি-পল্লবের কমলাভাব

 

ওরা বলে এক নারী…

ওরা বলে এক নারী বিলীন হয়েছিল

এক উলটো-পথগামী পুরুষ

তাকে বদ্ধ রাখে

তাকে ধাক্কা দেয়

 

লয়ার নদী তার বালুকাবৃত সৈকত

অনাবৃত করে যেখানে পাখিরা

ডালপালার মত

অন্ধকার আকাশটা

বাসারই সংযুক্তি

 

ইতিমধ্যে উৎসব নিজের ছন্দে চলেছে পদমর্যাদা ও প্রত্যেকের দায়িত্ব অনুযায়ী

তৈরি আইনের মতে প্রতিষ্ঠিত অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত প্রতিনিধি বা বিশ্বস্ত

শিক্ষক কর্মীসভার সকল সদস্য উচ্চ-পদস্থ সভ্যদের সামনে

হিপোক্রাস সুরা কেক এইসব স্তূপাকৃত ছিল

 

ঈশ্বরের নামে…

ঈশ্বরের নামে

এবং সেই সম্প্রতি মৃতা

মাননীয়ার স্মৃতিতে

যার নাম রাসিন

বুদ্ধিদীপ্ত ও যার খোঁজ করে জল

যিনি সম্প্রতি চলে গেলেন

সতেরোই জুলাই সন এক হাজার…

তাঁর কাজের মাঝে

রেখে গেলেন এক

সাধারণ নারীর দৈনন্দিন

চিরন্তন প্রতিচ্ছবি

নদীর তীরে ব্রীজের পাশে যার

খোঁজ মেলে অথবা অন্য কোনো লোডিং ডকে

যাকে শুল্কগ্রাহকেরা চিরস্থায়ী করে রাখবে

যা অনুচ্চারিত

অথচ পরিচিত

সত্য ঘটনা অথবা শ্রুতি

* ক্রমশ  

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

রাজদীপ রায়

উ ই ন্ডো  সি ট

রা জ দী প   রা য়

raj2

সম্ভাবনার ব-দ্বীপ

‘a poet is one who writes verses

 and one who does not write verses’

//

অসাড়-অনন্ত সময়; কিছু করবার নেই। কবিতা—চুপ। একটা মেল-ট্রেন, দ্রুতগতিতে ফাঁকা স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা বাড়ি পরেই আড়ষ্ট শরীর নিয়ে কেশে উঠছে কেউ। খুব মনে হয়, আর যদি নাই লেখা হয়; কোনও ক্ষতি হবে কি? এই লেখা না-জন্মানোর জন্যে কি কোনও মানুষের অসুখী ফুসফুস কেঁপে উঠবে? সরে যাবে নক্ষত্রগুলো একে-অন্যের অবস্থান থেকে? রাতের কুকুরগুলো আশ্চর্য কোলাহল করছে। যেন একে-অপরের মাংস খুবলে নেবে। লেখালিখি তো করতে আসিনি। এসেছিলাম কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে মাঠে বসে গল্প করতে। যে-মাঠের ধারে একটা নদী থাকবে। কিন্তু এত ভিড় সেই গল্প আর করা হল না! কারণ, মাঠটাই আর রইল না। তামাশার মধ্যে দিয়ে চলতে-চলতে মনে হয়, সেই হাঁটা কবে হবে? আগুনের মধ্যে দিয়ে হাঁটা? এই হাওড়া শহরতলি থেকে জেগে ওঠা উত্‍ ক্ষেপক আমাকে টেনে এনেছিল অন্য এক জানলার কাছে। সেই জানলা দিয়ে তাকিয়ে আমি, এমনকি হারিয়ে ফেলব আমার অন্যতম প্রিয় মানুষকে, এ-কথাও কি ভেবেছিলাম? কবিতার কাছে যাওয়া মানে সময়ের মেরুদণ্ডে দাঁড়ানো। বিপন্নতার মুখোমুখি দাঁড়ানো। কবিতা-রচনার সততা তার মূল্য দাবি করবে লিখিয়ের কাছে। এই অসাড়-অনন্ত সময়ে; মেরুব্যাপ্ত লক-ডাউনের অন্ধতায়। হতে পারে যে-মাঠে বসে গল্প করা শুরু হয়েছিল, রাতজাগা শুরু হয়েছিল, তার অনুভূতিপ্রবণ ঘাসগুলো একদিন সূর্যালোক পেয়ে পুড়ে গেল। সফল কবিতা-লিখিয়ে তুমি; কিন্তু সেই বিদ্বেষের আগুন তুমি বুঝতে পারোনি।  শুধু ওই রাতজাগা পাগল জানে, জেগে থাকবার প্রকৃত আনন্দ হল—একা থাকা। কুকুরের ডাকে অখণ্ড নীরবতায় ছেদ পড়ে। চলমান রূপকল্প নিয়ে ভেসে যায় মধ্যরাত। ভাবি, কবে ওই কুকুরের ল্যাজের মতো অগ্নিজেদ পাব।

কাব্যভাবনা যখন অর্থ হারিয়ে ফেলা জীবনের কোণ থেকে উঠে আসে, তখন তাকে কেমন লাগে পড়তে? কোনও পাঠক কি সংযোগ স্থাপন করতে পারেন তার সঙ্গে? ভিন্ন প্রতিবেশ হলেও কি মনে করতে পারেন একবারও, এ-আমার কথাই লিখেছে? কবিতার ভাবনা-চিন্তার কথা অনেক লেখা হয়ে গেছে। পূর্বজ্ঞানের পাহাড় অতিক্রম করে আত্মসন্দেহকারী কোনও আনকোরা মন ভেতরে-ভেতরে সংকল্প গ্রহণ করেছে। অনুভুতি জন্মাচ্ছে, চেতনাপ্রদেশ থেকে সাড়া পাচ্ছে তার মন। মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের নিবিড় স্নায়ুতন্ত্রের গুঞ্জনে, উত্তেজনা-প্রশমনের দ্বন্দ্বে, শৈশবের গ্রন্থি ছুঁয়ে মৌলিকতা খুঁজতে চাইছে তার ভাবনা। কিন্তু কী ভাববে সে? এতদিনের ঐশ্বর্যময় পূর্বজ্ঞানের পরিশীলিত ধারনাকে অতিক্রম করবার মন সে অধিকার করবে কোন কাব্যভাবনার শক্তিতে? কবিতা তো কেমন হয়, তার ধাঁচা তৈরি করে গেছে এতদিনে। তার বাইরে গিয়েও লেখবার চেষ্টা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কবিতা লেখবার আততি নয়; বরং একটি প্রকৃত-স্থানিক-আত্মবিশ্লেষণধর্মী উচ্চারণই ভবিষ্যতের কবিতা হবার যোগ্য। হতে পারে, নিজের কথা না-বলে লেখায় উঠে এল অন্যের প্রসঙ্গ। তাকেও বুঝতে হবে নিজেরই ভাষ্যে। অনুভুতি, প্রজ্ঞা, ধী-শক্তির প্রয়োগে জন্মাবে আগামীর কাব্যচেতনা। জনমুখী রাজনৈতিক আদর্শের স্বস্তা খাতেও এসে দাঁড়াতে পারে ভাষা। সমাজ-অনুসারী না হলেও কবির প্রখর অনুভূতি সমাজ ও সময়কে বাদ দিয়ে ঘনীভূত হতে পারে না। সময়ের মধ্যেই যদি ফাঁপা দর্শনের প্রমিতি সর্বস্ব হয়ে উঠতে থাকে, যদি মনে হয় চিরায়ত ভাষার থেকে এই আপদকালীন ভাষাতেই উতরে যাবে কাব্যচেতনার গন্ডি, তাহলে সেটা নিজের সঙ্গেই নিজের প্রতারণা। ভাষাটা মুখ্য নয়, চিন্তা, অনুভূতির মর্মন্তুদ অনুশীলন, যা লেখা হবার সময়েও চলতে থাকে। কিংবা যখন লেখা চুপ, সেই মুহূর্তে হাতচক্ষু অন্ধপ্রায়, তখনও অনুভূতির মর্মন্তুদ অনুশীলনের খামতি পড়লে চলে না। দায়বদ্ধতা জরুরি। নিজেকে উত্সর্গ করা জরুরি। কিন্তু কীভাবে সর্বক্ষণের এই প্রস্তুতি গড়ে তুলবে একজন লিখিয়ের প্রতিদিনকে? শুধুমাত্র লেখাকে সম্বল করে জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব হয় ক-জনের পক্ষে? পূর্বপুরুষের ধিকিধিকি পুড়তে থাকা মৃতদেহর কাছে সে-শুধু দু-মুঠো নিরবচ্ছিন্ন সময় প্রার্থনা করে। কে দেবে তাকে এই সময়? মহাকালের ইশারা? তার তো দিনানুদিন কেটে যায় চারাপোনা কেনবার দরদামে, ব্যাঙ্কের দাঁড়ানো দীর্ঘ লাইনের ক্লান্তিতে, পারিবারিক অশান্তিতে, বন্ধুর তীক্ষ্ণ অপমানে। আর এইসব আরো-আরো জীবনধারণের পাহাড়ের মধ্যে দিয়েই তাকে জাগিয়ে রাখতে হয় সেই অনুভূতির অনুশীলনকে। বুঝে নিতে হয় তার জন্যে নির্ধারিত বাস্তবকে এবং বহু-আকাঙ্ক্ষিত অ-বাস্তবকে। কী পেয়েছে সে—কী পায়নি…এর সঙ্গেই সংযুক্ত আক্ষেপে, জন্ম নেয় মনের ভেতর দমবন্ধ হয়ে থাকা অন্তর্দীপ্তি। সাধারণ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই ভাষা নিয়ে হারাকিরি করতে চাওয়া এই মানুষটি তখন চরম বিপন্ন। সে আদ্যন্ত নিয়ন্ত্রিত, নজরবন্দী। কোনও অবস্থাতেই তার শিল্পের স্বেচ্ছাচার সম্পন্ন হবে না। ভাল কবি হতে পারে সে। নরম-শরম লিখিয়ে। বই-মঞ্চ-পুরস্কার-সিঁড়ি তাকে আরো আরো বেশি জননেতা করে তোলে; আরো বেশি সুনিয়ন্ত্রিত। তখন যদি মনের আঁচ না নিভে গিয়ে থাকে, যদি তখনও সত্যের আগ্নেয় বার্তা সেই অন্তর্গত রক্তপাতকে সৃষ্টিশীল রাখে– কবিতা লেখা হয়। সমাজের সংসর্গে, জনমানসের দিকে প্রবল ঝাঁকুনিতে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের বেপরোয়া রেলায়—কবিতা লেখা হয়। শান্তভাবে জীবনে ওঠবার পিচ্ছিল সিঁড়িগুলো হাসিমুখে মুছে ফেলতে-ফেলতে—কবিতা লেখা হয়। এবং সেই আততায়ী লেখাগুলো ঘনসংবদ্ধ হতে-হতে তৈরি করে নিজস্ব এক কাব্যচেতনা; তৈরি করে নতুন এক সম্ভাবনার ব-দ্বীপ।

যার কিছু নেই তার মৃত্যু আছে। কিংবা যার মৃত্যু আছে, তার আর কিছুর প্রয়োজন নেই। চোখের সামনে দিয়ে অনবরত একশো-দুই অ্যাম্বুলেন্স চলতে দেখে মৃত্যুকে অভ্যেস করে ফেলেছে মানুষ। তাহলে কি পৃথিবী ছেড়ে যাবার অনুভূতি, আশঙ্কা তাকে আর নাড়া দেয় না! যে মৃত্যুভয়ের চেতনা তার মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, ভালবাসতে শিখিয়েছিল নিকটজনকে, পরিপার্শ্বকে; সেই ভালবাসা নিদারুণ অভ্যেসে করুণ, অসহায়? পৃথিবীর নিঃস্বতম মানুষের কাছেও মৃত্যুকে গ্রহণ করবার ঐশ্বর্য থাকে। জীবনের এক-একটা ঘটনা এক-একটা পাহাড়। তাকে পেরিয়ে যেতে হয় হাসিমুখে। প্রাত্যহিকতার আবর্ত আসে; কখনো সামান্য দেয়, কখনো সামান্য কেড়ে নেয়। বাস্তবতা তৈরি করে, আবার কত সহজেই ভেঙে দেয়। এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে হতশ্রী, দ্বিধাবিভক্ত, নাছোড়বান্দা, জেদ শব্দ খুঁজে ফেরে। যে অগ্নিজেদ প্রতিদিনে ক্ষয় হয়ে যায়, তার ওমে আবার শব্দগুলোকে জড়ো করে। উপহাস-উপেক্ষার পাহাড় সরিয়ে সে-তখন অন্য কোনও সমভূমির সন্ধানে। কোন পর্যায়ে পৌঁছে কবিতা আর জীবন এক হয়ে যায়? যখন বিস্তর কবিতা ভিড় করে, মনে জেগে ওঠে আপোশের অনুভূতি। এইভাবে কিংবা অইভাবে লিখতে হবে। তবেই ছাপা, তবেই শৌখিন হাততালি। প্রশংসার অবিচল অর্ধসত্য নিয়ে পথ হাঁটি। মৃত্যুকে ভয় পাই। মুহূর্তের আশঙ্কা আমাকে সরিয়ে নেয়—জীবনের থেকে। গভীর শব্দবীজ তখন অন্য কোনও গ্রহ; যাকে রাতজাগা চোখে আমি আর চিনতে পারি না। পিতৃপুরুষের দিকে, ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে বলি: শৈশবে যে-একাগ্রতা শিখিয়েছ, তাকে কখনো না ভুলি। বালকের বিস্ময়বোধ যেন প্রৌঢ়-দার্শনিকতায় আছন্ন না-হয়ে যায়। হতে পারে, এইমাত্র আমি যে কবিতাটি লিখে ফেললাম, এর জন্যে আমাকে একা হয়ে যেতে হবে। তখনও সেই নিঃসীম শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেন প্রাণ খুলে হেসে-উঠতে পারি। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে যে অপমানিত, পর্যুদস্ত, তার একরোখা, জেদি; অনিশ্চিতের দিকে তার ধাবমানতাই তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করা জীবনের তাগিদেই। সেই দুঃসহ স্পর্ধাকে ছুঁতে চাওয়ার তাড়না, যাকে সহজে পাওয়া যায় না। যাকে পেতে গেলে জীবনকে উত্‍সর্গ করতে হয়। কবিতা তো তেমনই সম্ভাবনার শুঁড়িপথ, যার পরিশেষে সত্যের আগুন চিরঅপেক্ষায় পুড়ে যেতে থাকে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

শুভ চক্রবর্তী

বি শে ষ র চ না

শু ভ   চ ক্র ব র্তী

shuvo

খুতুত-এ-গালিব

মির্জা গালিব

‘ও মেরী  চিন-এ-জঁবি সে গম এ পিন্ হাঁ সমঝা

রাজ-এ-মকতুব  বা বেরবতি-এ-উনওঁয়া সমঝা।’

 

মির্জা গালিবের কবিতার মতোই তাঁর চিঠি ভিন্ন ভিন্ন ইশারায় বিস্তারিত। পাঠকের মনের অন্দরমহলে গিয়ে সেইসব ইশারাই গালিবের মনের দোর গোড়ায় পৌঁছে নিয়ে যায় পাঠককে। আর এমনভাবেই আরও বেশি করে পাঠক খুঁজে পান তার প্রিয় কবিকে।

কিন্তু সত্যি কি তাঁর মনকে স্পর্শ করতে পারি আমরা? খুব চেনা অথচ কোথাও এক নিরুদ্দেশ ভিন্নতার সঙ্গ পায় পাঠকের মন, যখন গালিবের কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন চেতনার বোধকে তাঁরা একত্রিত করেন। কাছে এসেও যেন হারিয়ে যান প্রিয় গালিব তাঁর পাঠকের কাছে থেকে। বরং তাঁর চিঠি তাঁকে কিছুটা স্পষ্ট করে। কিন্তু সত্যিই কি তা করে? আমরা কি আদৌ পেরেছি তাঁর কবিতার সামনে হাঁটু মুড়ে বসতে?  আমরা কতটা খুঁজে নিতে পেরেছি নিজেকে তাঁর চিঠির সামনে? প্রশ্নগুলো থেকেই যায় কারণ গালিবের কবিতার সঙ্গে তাঁর সময়ের একইরকম ভিন্নতা ছিল। ভিন্নতা ছিল এই কারণে যে তিনি সামগ্রিক বোধের আধারে তাঁর জীবনের প্রবাহকে ধরতে চেয়েছিলেন। আমরা যদি তাঁর কবিতা লেখার সূচনা পর্বের প্রবাহ লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো সেখানে এই ভিন্নতা তাঁর ভাষার থেকে জীবনের দিকে নয়, বরং জীবনের দিক থেকে ভাষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা বোধ কাজ করত। এই বোধ ছিল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়ার নয়, বরং আলোর দিক থেকে অন্ধকারের দিকে যাওয়ার। এই অন্ধকার গালিবের নিজস্ব এক অন্ধকার। যে অন্ধকার নির্মাণ থেকে সৃষ্টির দিকে যাওয়ার এক সামগ্রিক বোধ।

 

‘অ্যাইসা ভী কোই হোগা কেঃ গালিব কো না জানে’

 

আমাদের মনে পড়বে মৌলানা আলতাফ হুসেন হালির লেখা ‘ইয়াদগার-এ-গালিব’-এর কথা। কিন্তু হালি সেখানে ধরতে চেয়েছিলেন গালিবের বাইরের ভিন্ন ভিন্ন মূর্তিকে আর তাই গালিবের ভেতরের ‘আমি’ আমাদের কাছে অপরিচিতই থেকে গেছে। কিন্তু আমরা যদি তাঁর চিঠিপত্রের দিকে নজর দিই তাহলে গালিবের ভেতরের ‘আমি’-র খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারি হয়তো, আর গালিবের চিঠির ভিন্নতা এখানেই যে তাঁর চিঠিতে আমরা একজন কবির মন চলাচলের প্রবাহকে স্পর্শ করতে পারি। কেননা তাঁর চিঠি কখনও তাঁর ব্যক্তিগত ‘আমি’র তাপে বিস্তার পায়নি, বরং তাতে বিস্তারিত হয়েছে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি।

এখানে রইল গালিবের লেখা দুটি চিঠির অনুবাদ…

(মীর মেহেদী মজরুহকে লেখা একটি চিঠি)

সাহেব,

         ইউসুফ মির্জা আপনাকে কোনো চিঠি লেখেনি বলে আপনি চিন্তিত কেন?  তিনি সেখানে ভালো আছেন। অফিসারদের সঙ্গে দেখা করা এবং চাকরির সন্ধান করা তাঁকে পুরোপুরি ব্যস্ত রেখেছে।  হোসেন মির্জাও সেখানে আছেন।  এছাড়াও তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চাইছেন এবং পেনশন মঞ্জুর করার জন্য আবেদন করছেন। আমি প্রতি সপ্তাহে দু’জনের কাছ থেকেই কয়েকটি চিঠি পাই, যার উত্তর আমি যথাযথভাবে দিই। ঠিক আছে, ভাই, লখনউ এমন একটি শান্তি ও শৃঙ্খলার সময় উপভোগ করছে যা ভারতীয় প্রশাসনের অধীনে বা বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে দেখা যায়নি।  দিল্লির আভিজাত্য ও ভদ্রতাকে প্রশাসকরা দয়ার সঙ্গে দেখে, প্রত্যেকের সঙ্গে তার পদমর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা হয়, পেনশনগুলি একটি রুটিন নিয়মের হিসাবে দেওয়া হয়, এবং পুনর্বাসনের আদেশ জারি করা হয়।  জনগণের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আচরণ ভদ্র ও সভ্য। এবার আরেকটি মজার ঘটনা শুনুন।  প্রধান কমিশনার যখন জানতে পারলেন যে তাঁর বিভাগ প্রধানত হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তিনি তাদের কয়েকজনকে বদলি করে অন্য জায়গায় নিয়োগ করেন। মুসলমানরা তাঁদের জায়গায় এলেন।  সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত একমাত্র দিল্লি।  লখনউ ব্যতীত অন্য সব জায়গার পরিস্থিতি অশান্তির, আগে যেমন ছিল। প্রবেশের অনুমতিপত্র ছাপা  হয়েছে।  আমি নিজে এই অনুমতিপত্র দেখেছি যেগুলি ফার্সি ভাষায় এইভাবে লেখা- “জরিমানা পরিশোধের পরে দিল্লি শহরে বসবাসের অনুমতি”। জরিমানার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দ্বারা নির্ধারিত হয়। আগামীকাল রবিবার, ছুটির দিন।  সোমবার থেকে অনুমতিপত্র বিতরণ শুরু হবে। দেখা যাক কীভাবে চলে এই সব, এ সবই সাধারণত দিল্লি শহরের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এবার আমার নিজের একটি গল্প শুনুন। বাইশ মাস চুপচাপ থাকার পর, কোতোয়াল উচ্চপদস্থদের কাছ থেকে একটি নির্দেশনামা পেয়েছেন, তাঁকে আসাদুল্লাহ খানের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাঠাতে বলেছেন। আসলে কি খারাপ অবস্থা?  কোতোয়াল, নিয়মানুযায়ী, আমাকে তাঁর সামনে চারজন সাক্ষী হাজির করতে বলেছেন, যাতে আমি আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারি । সেই অনুযায়ী আগামীকাল চারজন সাক্ষী কোতোয়ালের সামনে হাজিরা দেবেন। এর মানে এই নয় যে এই চারজন সাক্ষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর, আমি বকেয়া পাব, এবং পেনশন আবার নিয়মিত হবে।  না সাহেব, এটা সম্ভব নয়। আমার আর্থিক দেউলিয়া হবার প্রমাণ কেবলমাত্র আমাকে ‘আশাবাদীদের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার দেবে, আবেদনকারীরা এক বছর বা ছয় মাসের জন্য পেনশন পাওয়ার যোগ্য৷

—গালিব

 ফেব্রুয়ারি ১৮৫৯

গালিবের চিঠির সামনে দাঁড়ালে মনে হবে গালিব মুখোমুখি বসে কথা বলছেন। কেননা গালিব নিজেই সে কথা একদিন মুনশি তফতাকে লিখলেন: ‘ভাই আমার তোমার মধ্যে চিঠি লেখা কোথায়, এ তো হলো নিজেদের মধ্যে কথা বলা।’ গালিবের আগে এমন করে কেউ চিঠি লেখার আঙ্গিক ব্যবহার করেননি। আসলে গালিব নিজেই চেয়েছিলেন তাঁর সমগ্র লেখার একটা আলাদা ধারা তৈরি করতে। আর তাই তাঁকে একটি চিঠিতে মুনশি শিউনারায়নকে লিখতে হয়েছিল— ‘ভাই আমি আমার মেজাজের কাছে অসহায়’। কেননা তিনি জানতেন তাঁর কবিতা ভিন্ন ঐতিহ্যের প্রবাহ। যখন উর্দুতে চিঠি লেখা শুরু করলেন সেই চিঠিও আগের সমস্ত বিশ্বাস ও আঙ্গিক তিনি বদলে দিলেন।

গালিবের চিঠি তাই কথা বলবার একটা ধরণ যা নিবিড় হয়ে গালিবের ভিন্নতাকে প্রকাশ করে। আরও একটি চিঠিতে প্রায় একই কথা মুনশি মন্ডলকিশোরকে লিখলেন: ‘আমি একটা সহজ পথ বেছে নিয়েছি। যা কিছু লিখি উর্দুতে লিখি। না কবিতা, না আত্মদর্শন। চিঠিকে কথাবার্তায় পরিণত করে নিয়েছি।’ যেমন লিখলেন…

(মুনশি নবী বখশ হকীরকে লেখা একটি চিঠি)

ভাই সাহেব,

           বলুন কেমন গরম পড়েছে, আর কীভাবে যে কেটে যাচ্ছে দিন। খুব ভালো করেছেন বেগমকে রোজা করতে দেননি, ঈশ্বর করুন জ্বর যেন আর না আসে। আমাকে খবর পাঠাবেন, মুনশি আব্দুল লতিফ সাহেব-এর খেয়াল রাখবেন, আর রোজা রাখবেন না, তাহলে ঈশ্বরই জানেন শরীরের অবস্থা কেমন হবে। এটা সত্যিই যে মিঞা তফতা কাব্য সংকলনের নকল করছেন এবং তা লাহোরে পাঠাবেন। আমার উপর প্রচন্ড রেগে আছেন, কেননা নির্দেশ ছিল এই কাব্যসংকলনের ভূমিকা যেন আমি লিখে দিই। আমি বলেছি সাহেব তুমি প্রতিবছর একটি করে কাব্য সংকলন করবে আর আমি কতবার ভূমিকা লিখব? এরপর তিনি আর চিঠি লেখেননি। আমিও তাঁকে চিঠি লিখব না, দেখি কতদিন আমাকে না মনে রাখতে পারেন। ভূমিকা লেখা কি খুব সহজ? হৃদয় খুঁড়ে লিখতে হয়, কোনো কবিতার থেকে কম কিছু নয়, এই গরমে কোথায় আর লিখব, কী যে লিখব? একবার ওঁর সম্মানে একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছি এবং তখনও এর জন্য উপহার স্বরূপ আমি এটাই শুনেছিলাম যে ‘আপনি খুশি হতে পারেননি’ আর আমাকে লিখেছিলেন ‘তুমি আমার ক্ষতিই করেছ’। যখন আমি লিখলাম- ভাই তুমি আমার প্রতিপক্ষ নও, বন্ধু তুমি, শিষ্য মনে কর, ঘৃণা সেই বন্ধুত্বকে যে বন্ধুর ক্ষতি করে, আরও ঘৃণা সেই গুরুর প্রতি যে নিজের শিষ্যের চোখে পর্দা দিয়ে রাখে আর তার ক্ষতি করে, তখন সে লজ্জা পেয়ে সেসময় চুপ করে। তোমার দিব্বি দিয়ে বলছি ভূমিকা লেখার ব্যাপারে এই একমাত্র বিষয় নয়, বরং আমার এখন আর সে ক্ষমতা নেই, ঈশ্বরই জানেন আমি কেমনভাবে বেঁচে আছি।

—আসাদুল্লাহ

মুন্সি হরগোপাল তাফতা

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

সুকান্ত দাস

মু ক্ত গ দ্য

সু কা ন্ত   দা স

sukanta

ম্যানিকুইন

আহত হওয়ার পর আমাকে বলা হল আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন? কেউ বললেন আপনি পড়ে গিয়েও স্যানিটাইজার নিতে ভোলেননি, বড্ড শিক্ষিত। কুকুরটা মাংস খুঁজতে এসেছিল। দোকানী হাড় ছাড়ানো চামড়া গোটাচ্ছিল। রৈ রৈ করে একটা টেম্পো জানান দিল ওরা বাগান কাপ জিতেছে। ধুয়োর ভেতর জমে আছে সংলাপ আর ধুলোর মতো অহংবোধ। আজ তারা আমাকে জানায়নি। কাল আমিও জানাব না। ট্র্যাডিশন নিয়ে হাঁটব কানা পাশ তলা। গান গাইতে থাকবে ওরা। বাজবে তবলা। আমার ভ্রূক্ষেপ নেই। সামাজিক পাখির মতো নেশা করি না। বিরক্তিকর উল্লাস করি না। তবুও মাতি। নিজের হৃদয়কে মলম দেবার উৎসবে, কাঁধে রাখি হাত গোপন বিস্ময়ের―

খুব পুরনো একটা পথে চলছি। হাতের রেখা থেকে সব ময়লা মুছে গেছে। আমার ভুল হচ্ছে খুব। আমাকে দাঁড় করানো হল শহরের অন্ধ গলিটায়। দুটো কুকুর আমাকে স্বাগত জানায়। একটা শেয়াল আজও খুঁজে যাচ্ছে হারানো জন্মভিটা। নতুন বাজার থেকে ভেসে আসছে বরফ কাটার ঘরঘর ধ্বনি। পথ চলছি। চোখ বন্ধ নেই। তবুও ভুল হচ্ছে। গলি গুনতে ভুল হচ্ছে। এ তো আমার অহং ছিল। আমার দরজায় তালা। পাখির বদলে ভৃত্য পালিয়ে যাক। ডানার কী বা দোষ? পরিধি জুড়ে ছায়া। এই ছায়ার ভেতর নির্লেপ লেগে ছিল। কবেকার অমনিবাস গ্রন্থ। গ্রন্থ নিয়ে আসছে বারবনিতার স্বামী। সে স্বাক্ষরের পাঠ নেবে। ভদ্র ভাষায় বলবে আপনারা আমার বউকে নগ্ন করে সেঁকবেন…

পাখি ফুড়ুৎ বলে। কথাকলি শিখে এসেছে পাড়ার মেয়েরা। আজ সমবেত চড়ুইভাতি। বন্ধু বলেছিল নোনতা জিনিসের খুব টেস্ট। মদিরার নেশা কেটে যাবে। ত্রিভুজ জীবন। প্রত্যেকের ত্রিভুজ চেতনা আছে। সাপ পালাতে গেলে ছোবল সঙ্গ নেয়। ছায়া মারানি দুপুর আমাকে অভিশাপ দেয়। দেবতার ঘরে ঢুকে সঙ্গম। সঙ্গম ঠিক হয় না। ওলটপালট করে দেওয়া দৃশ্যরা ভিড় করে। এরপর কবির প্রবেশ। কবিতার দুধ খাওয়া। কিশোরী মাই টিপে ঝোলা ব্যাগ কাঁধে বাড়ি ফেরা। আত্মস্বাদ রোদ্দুর উপুড় করে দেয়―

দোকানী এসে মিষ্টি হাসে যেভাবে দেবরাজ বলেছিল। বলেছিল জীবিকা নির্বাহের নানা কু-অভ্যাস। সভামঞ্চে নেমে আসতে দেখেছিলাম। অভ্যাস। অভ্যাস ঝুঁকে দেখার। স্যান্ডেল কি মোলায়েম! চুমু খেতে ইচ্ছে করছে! শরীর মানেই তো কবিতা। ফ্রয়েড আমার ন্যাঙটা কালের দোস্ত! আমার ভাষা ওকে শিখিয়ে পরিয়ে রেখেছি। মাতালের কোনো জাত নাই। ওদের স্বভাব ভুল হয়। উগরে দেয়। রাতের ভূমিকায় দেখা যায় জ্ঞানের দস্তুর। কবি তো কামুক-ই! বিক্রয়ের সন্ধানী। খবর শনাক্ত হচ্ছে না। বিচারপতি বলছেন আপনারা ভুল ভাবছেন। তিনি তো পিতা!

মাদী বিড়াল এসে গুনে গেল ঠিক কোন কোন বিষয়ে সে প্রসব করতে পারে! গুনিতক ভিড় হতে পারে আপনার স্বল্প ইশারা। পাহাড়ের গায়ে যেভাবে অযুৎ বিযুৎ রং গন্ধ দেখি। আশ্চর্য মানুষেরা গাঁদা ফুল জড়ো করে পড়ে। এদিকে আমি পাঁচবার আহত হলাম। ঠিকানাটা পর্যন্ত ফেরত দিতে চায়নি। না, রঞ্জনাকে সেই ভিড়ে রাখবেন না। সে তো প্রসাদ চেয়েছিল। গরম গরম খিচুড়ি। আমি বলছিলাম আমি আহত হচ্ছিলাম। আমাকে কুকুর লেলিয়ে ফেলে দেওয়া হল। আমি মাংস কাটা বঁটিতে পড়তে নিচ্ছিলাম। আমি ভুলে যাচ্ছিলাম নিজের দোষারোপকে স্যানিটাইজ করতে আর ভুলের ভেতর যে বিস্ফোরকগুলো আতাঁত দেখতে জেগে থাকে…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

তন্ময় বসাক

মু ক্ত গ দ্য

ত ন্ম য়   ব সা ক

tanmay

মস্তিষ্ক

আমি সে ভাবে প্রতিহিংসায় জড়াইনি কখনো। আসলে ইচ্ছেটা বড়ো কথা। প্রত্যেকের নিজস্ব খান পাঁচেক রাজনৈতিক জিহ্বা থাকে। তা দিয়ে মুত্র বিসর্জন থেকে অখাদ্য সেবন সবটাই চলে। বাদামি ফুলদানিগুলি্র টকটকে বেহিসাবি রং হয়ে যাচ্ছে। অবাক হবারই কথা, দিন দিন গাঢ় হচ্ছে পেটের অভাবের সঙ্গে মনের ও মস্তিষ্কের অভাব। কিন্তু আমরা রাজ্য চালাই। আমরা পতাকার মেশিন দিই। আমরা রাতে বউকে সাতের বদলে আটের কথা ভাবি। একটু স্পষ্ট করে দেখলে বুঝব আমরাই দুরন্ত, সময় কিন্তু স্থির।

ঘুম আসছে। পালাবদল। ঠিক কতক্ষণ চামড়া আঁচড়ে দেখা হয়নি জন্তু আর মানুষে রূপান্তর হয়েছে কিনা। ভারি ভারি বস্তা আদর্শের রূপক ছিনিয়ে নেয়। সমাজ কি এখনও রন্ধনে আছে? আঙুলগুলি আর নেই। মাথা গেছে সরায়ের দপ্তরে। বর্তমানটা আমার ছাপোষা রক্তে ভরা। নর্দমা বয়ে টানছি। টানছি। তুমি বলে সম্বোধন সমানুপাতিক। 

ফ্যান চলছে মাথার ওপরে। দূরত্বটা ঘনত্বে পরিণত।  চোখগুলি খেয়ে ফেলছে আস্ত একটা সামাজিক বাঘ। ভাবনার পেশাদারিত্ব ক্ষীণ। আসছে বছর ভবিতব্যগুলো অ্যালবামে পরিবর্তন হবে কিনা! ইঞ্চির মাপ কেমন যেন খাটো হয়ে যাচ্ছে। খাটো হয়ে যাচ্ছে একটা থেকে আরেকটা ঠোঁটের পৌনঃপুনিক মাপকাঠি। কিন্তু ঈশ্বর জাতিদের স্থগিত রাখছেন, ঈশ্বর গলা কেটে নিচ্ছেন। ঈশ্বর পাথর থেকে কমিকসের জিভে। ভারসাম্যহীন পকেট সম্পর্ক নিয়ে ছুটছে। দেওয়াল পিছিয়ে চলছে পিঠের থেকে কিলোমিটার কিলোমিটার ফাঁক রেখে। তবু দায়ী। দায় আমার। চিন্তা আমার। দাঁত আমার। জীবগুলি মূল্যবান ক্রমিক নম্বরের।

সৌন্দর্য ফিরিয়ে নিচ্ছিল বাস্তবায়ন উর্বর জমি। ঘরের পর্দাগুলি পার্শ্ববর্তী গন্ধ পৌঁছে দিচ্ছিল অকাল আবদারে। বেকারত্বের পা, পাঁজর এবং তুলতুলে বাম দিক থাকলেও ব্রহ্মতালু অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। না শেখায়নি কখনো রাষ্ট্র। জল ডাইনি হত্যার অপরূপ। আমার বীর্যের মৃত্যুহীন শোক চাইছি। জবাবী টেবিলগুলি রোমাঞ্চকর স্ট্রীট লাইট। বালিশে জন্মায় দুধ আর গোরুগুলো দেশটাকে মুতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এ রোগের কোনো গন্ধ নেই। এদেশের বাজারি ধর্ষণ ছাড়া কি বা সম্ভব রাজ্য বা রাজার থেকে? কিন্তু সেই ফুলদানিগুলি…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

সুদীপ ঘোষাল

গ ল্প

সু দী প   ঘো ষা ল

sudip2

সুখদেবের মাধু

সুখদেব বাউড়ি বগলে একটা লাঠি আর হাতে একটা হেঁসো নিয়ে ঘোরে রাতদিন। ধারালো হেঁসো দিয়ে শুকনো ডালপালা কাটতে কাটতে বলে- এই হেঁসো তোর গলায় যেদিন বসিয়ে দোবো, সেদিন আমার শান্তি হবে। জঙ্গলে তার পাশেই ছিপ হাতে বসেছিল নাড়ু বাউড়ি। সুখদেবের একথা শুনে ভয় পেয়ে বলে ওঠে- কেনে কী করলাম আমি! সুখদেব ওকে দেখেনি, এখন তাকে দেখে লাঠি বগলে হেঁসো আর জঙ্গলের শুকনো ডালপালা নিয়ে হনহন করে হাঁটা লাগাল।

সুখদেব এই শুকনো ডালপালা বাড়ির উঠোনে রাখে। তারপর তার ছেলের বউ রান্নাশালে বসে উনুনে গোঁজে শুকনো ডালপালা।

বাউড়ি হল হিন্দু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এই বাউড়িরা ভারতের কোনো বহিরাগত জাতি নয়। এরা আমাদের দেশের আদিম অধিবাসী। বাঁকুড়া জেলায় বর্তমানে আনুমানিক বাউড়ি জাতির সংখ্যা প্রায় চার লক্ষের কাছাকাছি। পূর্ব বর্ধমান জেলার নবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতে  বংশক্রমে বাউড়িদের বাস আছে। 

গ্রামের প্রধান সাহেব বলেন- সমগ্র জেলাব্যাপী প্রত্যেক থানাতেই এদের বসবাস রয়েছে। তবুও একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, পুরুলিয়া জেলার পূর্বাংশ ও বাঁকুড়া জেলার পশ্চিমাংশের যে এলাকাটিকে পশ্চিম রাঢ়ের কেন্দ্রভূমি বলা যেতে পারে, সেই এলাকাতেই বাউড়িদের ঘনবসতি গড়ে উঠেছে। 

নবগ্রামে বাউড়িদের প্রাধান্য বেশি। প্রধান সাহেব তাদের খোঁজখবর নেন। এবার বন্যায় বাড়ি ভেঙে গেলে সুখদেব পাকা বাড়ি পায়।

সুখদেব নিজের মনে বিড়বিড় করে আর বলে- দোবো শালাকে গলায় হেঁসো বসিয়ে। পাশে কেউ থাকলে জিজ্ঞেস করে- কাকে বসাবি রে, সুখদেব?

সুখদেব উত্তর দেয় না। একবার মুখ তুলে তাকিয়ে হাঁটা লাগায়। তার এই পাগলামির জন্য অনেকে তাকে এড়িয়ে চলে। বলা তো যায় না, কখন বেটার বিগার চাপে, একথা বলে তার পাশের বাড়ির মাধু।

সুখদেব বসে থাকার লোক নয়। সারাদিন সে টো টো করে ঘোরে। বাড়িতে সে খালি হাতে ঢোকে না। কখনও গামছায় বাঁধা চুনোমাছ বা কখনও শুকনো ডালপালা নিয়ে ঢোকে বাড়ি।

তার ছেলে আর ছেলের বউ রোজগার করে। সুখদেবের বউটা বড় বন্যায় ভেসে গিয়েছে জলে। এখন ওরা তিনজন।

সুখদেবের মনে পড়ে, সেবার বানে ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে বটগাছের ডালে তারা ওঠে সবাই। একই ডালে সবাই থাকায় ডালটা মট করে ভেঙে পড়ে জলে। সুখদেব ছেলেকে বাঁচায় ভীষণ স্রোত থেকে, কিন্তু বউটাকে বাঁচাতে পারেনি। সেই থেকে সুখদেবের মাথাটা কেমন পাক খেয়ে শুধু বানের জলের স্রোতের মতো ঘুরপাক খায়। কোনও কিছু সাজাতে পারে না। ঘুমোবার সময় বলে ওঠে- দোবো শালার গলায় পেঁচিয়ে।

আসলে বাড়ি ভাঙার কারণ অতিরিক্ত ছাড়া জল। পঞ্চায়েতের বড়বাবু বলেন- ম্যানমেড ফ্লাড। বুঝিয়ে বলাতে সুখদেব বুঝতে পারে। সে বড়বাবুকে বলে- লিয়ে আসতে পারেন ওকে আমার সামনে। একটা লাঠির ঘা ওর পিঠে বসালে বউ মরার দুঃখটা কমত একটুখানি।

বড়বাবু বলে- ওসব বলতে নাই সুখদেব। তোমার দুঃখ গ্রামের সবাই বোঝে।

সুখদেব ভাবে, কই বাউড়িদের ছেলেমেয়েগোলা নেকাপড়া শেখে না কেনে। সারা জেবন শালা আমাদের মতো হয়ে থাকলে হবে! মাধু বলে ছেলেমেয়েরা তার কথা শুনে গ্রামের স্কুলে পড়ে। সকলে সুখদেবকে বুঝতে লারে। ওর মনে একটা সোনার পাথর আছে।

মাধুর কথা শুনে বড়বাবু বলে- তুই তো সুখদেবকে বিয়ে করতে পারিস। তু তো বাঁজা বলে শ্বশুরঘর থেকে চলে এলি। এখন ওকে বিয়ে করে সুখে থাক।

মাধু বলে- এ কথাটা মনে আসে নাই ত লয়, তবে পাগলাটা যদি মারে? 

বড়বাবু বলেন- ও মারবে না। মুখে বড়াই করে।

তারপর মাধু ঝাঁট দিয়ে বড়বাবুর ঘর পরিষ্কার করে। বড়বাবু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। তারপর পাঁচশ টাকা গুঁজে দেয় মাধুর গতরে।

সুখদেব বাড়িতে ভাত থেকে মদ তৈরি করে। বাউড়িপাড়ার পাশ দিয়ে গেলে এই পচাভাতের গন্ধ ভুরভুর করে।

মাধু বলে- কী করে হয় গো মদ?

সুখদেব বলে- তোর কী দরকার! তবে জানতে যখন চাইছিস, শোন। ভাত পচে গেলে একটা বড় হাঁড়িতে বসিয়ে তা ফের ফোটানো হয় উনুনে। ওই হাঁড়ির উপরে বসানো হয় আরও একটি হাঁড়ি। পচা ভাতের বাষ্প পাইপের মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয় জারিকেনে বা বোতলে। 

মাধু বলে- এটাই হচ্ছে চোলাই মদ বা ইথাইল অ্যালকোহল।

সুখদেব বলে- তু তো একটু নেকাপড়া জানিস। তুই বলতি পারবি, আমি বুঝি না। ভালো লাগে খাই, বউটার মায়া গুলে খাই, ব্যস।

মদ খেয়ে নেশার চোখে,  মাধুকে আড়চোখে দেখে সুখদেব। সে বলে- আমার কাছে চালাকি লয়, দোবো শালা গলায় পেঁচিয়ে।

মাধু ধরা পড়ার ভয়ে ঘরে ঢোকে আর ঘরের ফুটো দিয়ে দেখে মাধু, সুখদেব ওর বউকে খোঁজে তার বাড়ির চারপাশে। বড় মায়া হয় মাধুর। আকার ধোঁয়ার মত ভালোবাসটা গভীরে গিয়ে জলে ভেজে। সুখদেবের মনটা কখন যে মাধু ধরে ফেলে, সে জানে না।

বাউড়ি পাড়ায় উনুনকে আকা বলে। ওদের কিছু কিছু ভাষা নিজস্ব। তাদের সমাজে প্রচলিত ভাষা। আর তাদের কথায় কথা বলে আনন্দ পায় মাধুর মতো মেয়েরা। বন্যাকে ওরা বান বলে, কেন কে বলে কেনে। 

একদিন রাতে মাধু স্বপ্ন দেখে, সুখদেব তার ওপরে চেপে সুখের বানে ভেসে চলেছে দেহবানের জলে। মাধু ধড়ফড় করে উঠে দেখে না স্বপ্ন নয়, তার পাশে সুখদেব হাঁপাইছে। তার  ঘরের চাল খড়ের। খড়ের চাল ফুটো করে সুখদেব ঢুকে তাকে সুখের বানে ভাসিয়েছে। মাধু মনের আনন্দে সুখদেবকে জড়িয়ে ধরে। ভোরবেলায় আবার সুখদেব ঘর থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে যায়, তালপাতার খোঁজে। সে ভাবে, ঘরের চালটা ফুটো হইছে, তালপাতা দিয়ে বেঁধে দিলেই হবে। তা না হলি বর্ষার জল ঢুকে মাধুকে ভেজাবে। বড়বাবুকে অফিসে যেতে দেখে, বানের জলের মতো সাহসে সে  বলে ওঠে- দোবো শালাকে গলায় পেঁচিয়ে।

বড়বাবু ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

মাহবুবা করিম

বাং লা দে শে র  ক বি তা

মা হ বু বা   ক রি ম

মৃদুমন্দ

দেখবো— দেখাবো কামুক অপরাজিতা;

তোমার বুকে ঢালবো বিয়ারের বুদবুদ

ঠোঁটের ওপর— কাফফারা দিব একত্রিশ চুম্বন!

 

এইভাবে ভালোবাসা ছুঁড়বো।

যতদিন আমার সমুদ্রে তুমি ডুবে না মরো।

 

চোখ

চোখের কলসিতে ক্রমশ ঢিল ছুঁড়ছে—

                                    একটি দাঁড়কাক।

তার খুব জলের তেষ্টা

জলের নেশায় তার যমজ পকেট ভর্তি নুড়ি ;

 

আমি চাই—

বুকের ক্ষততে ড্রেসিং করে, তাকে— পত্রে লিখি

আমি ভালো নেই,

নেই ভালো আমার এই দুটো চোখ।

আরও পড়ুন...