Categories
editorial

Editorial-December

পর্ব ১
পর্ব ৪
গত সংখ্যার পর

সম্পাদকীয়

রবিবার, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 12th December 2021

‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’র এই বছরের শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হলো। নতুন বছরে আরো কিছু আকর্ষণ নিয়ে আসা যায় কীভাবে, সেই চেষ্টা আমাদের নিরন্তর চলছে। কবিতা ও কবিতা সংক্রান্ত লেখালিখিকে ঘিরে আমাদের এই সামান্য আয়োজনে আপনাদের প্রত্যেকের ভালোবাসা আমরা আজও পেয়ে চলেছি ক্রমাগত।

কবিতা লিখে কী হয়? এর স্পষ্ট কোনো উত্তর আজ অবধি নেই। মনের আরাম, ভালো লাগার অনুভূতি… সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন-

“আমি চাই স্কচ, সাদা ঘোড়া, নির্ভেজাল ঘৃতে পক্কমুর্গীর দু ঠ্যাং শুধু, আর মাংস নয়- কবিতা লিখেছি তাই আমার সহস্র ক্রীতদাসী চাই- অথবা একটি নারী অগোপন, যাকে আমি প্রকাশ্য রাস্তায় জানু ধরে দয়া চাইতে পারি।”…

অকপট স্বীকারোক্তি। অনেকেই মনে মনে হয়তো এরকমই ভাবেন, চেয়েও থাকেন। তাছাড়া খ্যাতির মোহ তো থাকেই। তবু… শীতের বিকেলে আলগা হাওয়া দিলে, দুপুরের নির্জন রোদে কিংবা পরস্পরের হাত ধরে কুয়াশা নেমে আসা মাঠের দিকে মিলিয়ে যেতে যেতে কবিতার লাইন আচমকা মাথায় চলে আসে। অনেকে নিজেরাই কবিতা হয়ে ওঠেন… এইসব মায়া, সম্পর্কের ভেঙে যাওয়া পংক্তিগুলো আস্তে আস্তে জমে ওঠে সাদা পাতায়। এই দায়, এই বয়ে চলায় সামিল আমরা প্রত্যেকে।

“শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা ভুবন পেরিয়ে আসা,”…

Categories
2021_dec

প্রচ্ছদ কাহিনী | ডিসেম্বর সংখ্যা

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

সং হি তা  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

sanhita2

একটি অভিমানী প্রাসাদের গল্প

কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম কে জানে ! 

 ডিসেম্বরের এক অমোঘ সন্ধ্যায় , আমাদের প্রথম  দেখা ।  অন্ধকার তখন সবে দানা বাঁধতে শুরু করেছে আমাদের চারদিকে । দূরে গাঢ় নীল পাহাড়ের সিল্যুটে জ্বলে উঠছে একটি দুটি মায়াবী স্মৃতির মতো  আলো ! আমি পায়ে পায়ে,  প্রায় হারিয়ে যাওয়া পথ বেয়ে ,  নেমে এসে দাঁড়ালাম তার সামনে ! , কি এক অব্যক্ত ইশারায় সে আমায় কাছে ডাকলো ! আধো অন্ধকারে ,  তার ছ্যাতলা পরা জীর্ণ দেয়ালের ভাঙাচোরা  ক্রমবিবর্তনের ছায়া অহংকার থেকে অভিমানের  !  আমাকে মুহূর্তে গ্রাস করলো  সুদূর অতীতের প্রবল সংক্রমণ । অনায়াসে আমাদের মাঝখানের দীর্ঘ  সময়ের ব্যবধান মুছে দিয়ে ,   সে ,  পরিত্যক্ত  অবহেলিত শ্লাঘায় , মাথা উঁচু করে  দাঁড়িয়ে আমার সামনে ! রঙীন কাঁচের জানালায় , তখন শেষ বিকেলের শীর্ণ আলোর আর্তি লেগে আছে । আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম ,  দোতলার ভাঙ্গা  বারান্দায়  ধীর দৃঢ় পদক্ষেপে এক দীর্ঘ আর্ষ অবয়ব ,  হেঁটে চলেছেন বাঁদিকের উত্তরমুখী ঘর টির দিকে। 

“বাবামশায় আজকাল বিকেলের চায়ের পর , গৌরিপুর ভবনের লম্বা বারান্ডায় , আমার হাত ধরে বেড়ান , বলেন “ বৌমা , আমার একটু বেড়ানো দরকার , বসে থেকে থেকে আমার পা গুলো কেমন অসাড় হয়ে এসেছে !” প্রতিমা দেবীর “ নির্বাণ” পড়ছিলাম । সেই মহান সান্নিধ্যে ও স্নেহ বন্ধনে যাঁর আহৃদয় অস্তিত্ব সমৃদ্ধ হয়েছিল । শেষবেলায় তিনিই ছিলেন কবির পরম নির্ভরতার কেন্দ্রস্হল! আর গৌরিপুর ভবন! 

চাকরিসূত্রে কালিম্পং এ পোস্টিং , হঠাৎ ,  দীর্ঘ নগরজীবনের কোলাহল থেকে আমার শিকড় বাকড় ধরে হেঁচকা টান দিল ।   আমার ড্রাইভার সঞ্জয় রাজ গুরুং  শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান । বাঙালীর আত্ম  অভিমানের টলটলে দীঘিটার নাম যে রবীন্দ্রনাথ তা সে জানে । প্রসঙ্গত মংপু , সুরেল বাংলো আর চিত্রভানুর স্মৃতিকথায় মশগুল আমাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলে উঠলো ,” there is one house of Tagore in kalimpong too madam ! Have seen Gouripur bunglow   ?  “ সেই প্রথম ,  তার  নাম  শুনি । একটু খটকা ছিল মনে । সিটং , রেলিখোলা , মংপং ইত্যাদি ধন্বাত্মক নামের মাঝখানে শব্দটা কেমন বেসুরো বাজছিল । এখানে এমন নাম ! অতঃপর কাজ ফেরত এক সন্ধ্যেবেলা সেই অবিস্মরনীয় অভিযান । ফেরার পথে  প্রায় আচ্ছন্ন আমি তখনো ভাবছিলাম “গৌরিপুর “ নাম আর   অনস্তিত্বের প্রান্তে দাঁড়ানো সেই প্রাসাদের গায়ে ফলকটির নীরব ঘোষণার কথা ! “ এই ভবনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাস করিতেন , এবং পঁচিশে’  বৈশাখ 1343 সনে  ,জন্মদিন কবিতা , আকাশবাণীর মাধ্যমে আবৃত্তি করিয়াছিলেন ।“ ভগ্নহৃদয় প্রাসাদের তুলনায় তরুণতর ফলকটির সময়কাল বা প্রতিষ্ঠাতার কথা আজও জানিনা , তবে  যখন   বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ আশু প্রয়োজন  বিষয়ে   সঞ্জয়  গুরুং এর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত  হয়ে অপরাধী মনে ঘরে  ফিরলাম , তখনো গৌরিপুর আমাকে ভাবাচ্ছে । জানা গেল , গৌরিপুর , তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায়  ময়মনসিংহ জেলার    একটি তালুকের নাম । উক্ত তালুক বা এস্টেটের  জমিদার  ছিলেন ব্রজেন্দ্রকিশোর চৌধুরি । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1926 সালে ময়মনসিংহের  মহারাজা  শশীকান্ত আচার্য চৌধুরির আতিথ্য গ্রহণ করেন । এই সময় রায়চৌধুরি পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় ।প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য , জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক  এঁর পুত্র বীরেন্দ্রকিশোর চৌধুরি, ছিলেন প্রবাদপ্রতিম সেতার বাদক । রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা।

এই সাংষ্কৃতিক পরিমন্ডলের কারণেই হয়তো , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই জমিদার পরিবারের বিশেষ হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। কালিম্পং এর গৌরিপুর হাউস নামক এই বাড়িটি ছিল  তাঁদের গ্রীষ্মকালীন  শৈলাবাস ।  বীরেন্দ্র কিশোরের উল্লেখ পাওয়া যায় , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  মৈত্রেয়ী দেবীকে লেখা  একটি চিঠিতে । উনিশশো আটত্রিশ সালের চৌঠা এপ্রিল , রবীন্দ্রনাথ  লিখেছেন , 

কল্যাণীয়াসু , 

বীরেন্দ্রকিশোরের কাছ থেকে তাদের কালিম্পংএর বাড়ি চাবা মাত্র , তারা উৎসাহপূর্বক দিয়েছে , এমনকি , একজন মাতব্বর লোককে দিয়েছে সরিয়ে । মৈত্রেয়ী দেবী এই সময়  তাঁর স্বামী ডঃ মনমোহন সেনের চাকরি সূত্রে থাকতেন মংপুতে । এই জায়গাটিও অধুনা কালিম্পং জেলার অন্তর্গত। পাহাড়ে অতিবাহিত সময়  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে  সামগ্রিকভাবে নেহাত কম ছিলনা । বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তিনি শুধু ভারতবর্ষেই থেকেছেন   শিলং , আলমোড়া , তিনধারিয়া , দার্জিলিং , কালিম্পং প্রভৃতি জায়গায় । অথচ , প্রতিমা দেবী“নির্বাণ” এ লিখেছেন , “বাবামশায় পাহাড় পছন্দ করতেননা । বলতেন ,  পাহাড় আবধ্য সীমার মধ্যে মনকে সংকীর্ণ করে রাখে , তাই পাহাড়ে বেশীদিন ভালো লাগেনা । “ একই চিন্তার অনুরণন  দেখি  মৈত্রেয়ী দেবীকে লেখা চিঠিতে , “ মাথা উঁচু পাহাড়ের নজরবন্দী আমার বেশীদিন সয় না ,তা ছাড়া সারাদিন শীতবস্ত্রের আবেষ্টনকে আমি দৌরাত্ম্য বলেই মনে  করি । জীবন সায়ান্নে কবি পাহাড়েই আশ্রয় খুঁজেছেন। সেই  সময় কালিম্পং এর গৌরিপুর হাউস ছিল তাঁর বাসস্হান।

কালিম্পং এ এই নিভৃতচারি, প্রকৃতি উন্মুখ, কবি মন, প্রথম আশ্রয় খুঁজতে আসে 1938 সনের পঁচিশে এপ্রিল। শান্তিনিকেতন থেকে  যাত্রার আগে,  সে সময়ে কন্যা মীরাকে লিখেছেন “ মীরু আমরা দু চার দিনের মধ্যে কালিম্পং যাচ্ছি । শুনেছি জায়গাটি ভালো। বাড়িটি খুবই ভালো। “শিলিগুড়ি থেকে পঞ্চাশ মাইল পথ , কবির বয়স তখন আটাত্তর বছর।  

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই যাত্রার আগের বছর কবি ভয়ংকর এরিসিপেলাস নামক এক জীবানু সংক্রমণে আক্রান্ত হন। তাঁর শরীর তখনো দুর্বল। এসে পৌঁছলেন কালিম্পং। সেই সময় বৈকন্ঠপুর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছিল তিস্তা ভ্যালি এক্সটেনশান রেলওয়ে, যার স্টেশানের নাম কালিম্পং রোড বা গেলেখোলা। এই গেলেখোলা থেকে পর্যটকদের গরুর গাড়ি বা পদব্রজে কালিম্পং যেতে হতো।  শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পংএর সড়ক যোগাযোগ তখনো ছিল। কবি অবশ্য প্রথমবার শিলিগুড়ি থেকে মোটরে এসেছিলেন । 

২৬ শে এপ্রিল ১৯৩৮ সাল । বেলা সাড়ে এগারোটা  নাগাদ  তিনি শহরে পৌঁছান । সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব অনিলকুমার  চন্দ ,  এটর্নি হীরেন দত্ত ।  রবীন্দ্রনাথ আসার খবরে কালিম্পং এর স্হানীয় মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা করতে কালিম্পং থানার সামনে  পাইন আর ওক গাছের পাতা ও ফুলে সজ্জিত একটি তোরণ নির্মাণ  করেন।  কবির গাড়ি এখানে পৌঁছলে,  তাঁকে  স্হানীয় মানুষ মালা দেন । তিনি নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে পৌঁছে যান । ফলে অপেক্ষারত  জনসাধারণ অনেকেই ফিরে যান ।

অবশেষে গৌরিপুর হাউস । পাথরের ধাপ কেটে চৌষট্টিটি সিঁড়ি ,  ফুলের বাগান , বড় বড় গাছ  পরিবৃত প্রাসাদোপম বাড়িটির রঙীন কাঁচের লম্বা জানালা , অনেকগুলি ঘর , ঝুল বারান্দা , ঘর থেকে পাহাড়, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর আকাশ দেখে যায় ! সে   তখন  অপেক্ষমাণ সেই বিশাল ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে পুণ্যভূমি হয়ে ওঠার জন্য ! রবীন্দ্রনাথের মন কেড়েছিল  নিশ্চই ।তাইতো বারবার এসেছেন এই নিভৃত ছায়ায় নিজস্ব সময় অতিবাহিত করতে । কালিম্পং এসে কবি ভেবেছিলেন আসন্ন পঁচিশে বৈশাখ তিনি নিরিবিলিতে কাটাবেন ,  কিন্তু তা হয়নি প্রথম দিনের বিফল মনোরথ জনতাকে নিরাশ না করার উদ্দেশ্যে গৌরিপুর ভবনে আসার অনুমতি দেওয়া হয় । ফলতঃ প্রায় তিনশ লোক সমাগম ঘটে তাঁকে দেখার জন্য । সে সময়কার বাঙালী পর্যটকরাও সেই সমাবেশে সামিল হন ।  কালিম্পং এ থাকাকালীন কবিও শহরের কিছু অনুষ্ঠানে যোগ দেন ।  এখানে সাধারণ মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতো । তিনি তাঁদের হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিতেন । তাঁরা তাঁকে ডাক্তার বলেও জানত। পয়লা মে,  গৌরিপুর চত্তরে, প্রাকৃতিক  মুক্তাঙ্গনে এক সুন্দর সভা আয়োজিত হয় । বিভিন্ন ভাষা ও বর্গের মানুষ তাতে সামিল ছিলেন । কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ।

এর কয়েকদিন পর , কবির সঙ্গে কালিম্পং নিবাসী লব্ধ প্রতিষ্ঠ ডঃ গোপাল দাশগুপ্ত সপরিবারে দেখা করতে আসেন গৌরিপুরে । কবি বসেছিলেন লম্বা বারান্দার মতো কাঁচ ঢাকা সুন্দর ঘরে ইজি চেয়ারে ।  বাইরে অপেক্ষমাণ কয়েকজন ব্যক্তির জন্য কবি কবিতা  পাঠ করেন , সুধাকান্ত চৌধুরি যার হিন্দী তর্জমা করে মূলতঃ অবাঙালী সেই অভ্যাগতদের বুঝিয়ে দেন ।

কবি কালিম্পংএ আসার অল্পদিনের মধ্যেই  তাঁর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে  দেখা করতে আসেন , ডঃ জন গ্রাহাম । কালিম্পং এর প্রবাদপ্রতীম পুরুষটির জন্ম হয়েছিল সুদূর স্কটল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের বছরেই । একদা ক্রিশ্চান ধর্ম প্রচারক ডঃ গ্রাহাম ততদিনে শিক্ষাবিদ , বিখ্যাত গ্রাহামস হোমস স্কুলের প্রণেতা ও প্রাণপুরুষ । গৌরিপুরের বাড়িতে , কবি ও ডঃ গ্রাহাম , দুই ব্যক্তিত্বের নিভৃত আদান প্রদান ঘটে । স্কটিশ জন ছিলেন ভারতে বৃটিশ উপনিবেশ নীতির বিরোধী ।  রবীন্দ্রনাথকেও তিনি গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যান তাঁর স্কুলে । 

পঁচিশে বৈশাখের উপলক্ষ্যে মৈত্রেয়ী সপরিবারে কালিম্পংএ এলেন ।  এলেন , পরিব্রাজক ও সাহিত্যিক প্রবোধ কুমার সান্যাল ।   আর এলেন শশাঙ্ক চৌধুরি ।  শ্রী অমল হোম কোলকাতা থেকে তাঁদের হাতে পাঠিয়েছিলেন এক ঝাড় রজনীগন্ধা আর একটি কলম  , কবির জন্য” নৈবেদ্য” স্বরূপ ! যে দুর্যোগের উল্লেখ আছে প্রবোধ সান্যালের লেখায় , তার ফলেই রাস্তায় কয়েকদিন আগে পোঁতা টেলিফোনের খুঁটি উপড়ে গিয়েছিল । সেই খুঁটি পুনস্হাপন করে , সেই বিশেষ দিনে কার্শিয়াং দূরভাষ কেন্দ্রের উদ্বোধনের পরিকল্পনা করে ,  অল ইন্ডিয়া রেডিও । ট্রাঙ্ক টেলিফোন  যোগে জুড়ে দেওয়া হবে কোলকাতা  ও কালিম্পংকে । এই উপলক্ষ্যে অল ইন্ডিয়া রেডিও কোলকাতা শাখার অধ্যক্ষ , সম্ভবতঃ সি সি ওয়ালিক , এবং বেতার বিশেষজ্ঞ নৃপেন্দ্র মজুমদার , তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিওর ভারতীয় অনুষ্ঠানগুলির প্রযোজক , উপস্হিত ছিলেন গৌরিপুরের বাড়িতে ।  প্রবোধ সান্যাল লিখেছেন , “ মহা কবি মাঝে মাঝে  একবার ভীষণ শব্দে গলা ঝাড়া দেন , একথা সকলেরই মনে আছে । কিন্তু আজ কাব্য পাঠকালে , সেই  আওয়াজটির দাপটে সূক্ষ্ম যন্ত্রটা বিদীর্ণ হয়ে যাবে কিনা , এই আশঙ্কা ছিল রথীন্দ্রনাথ প্রমুখের মনে ।  কবি তার অল্পদিন আগে “জন্মদিন “ কবিতাটি লিখেছেন । সেই কবিতাই পাঠ করবেন বেতারে , এই পরিকল্পনা । মৈত্রেয়ী দেবীর  ভাষায়, “এইসময় ডাক এল । সে এক প্রকান্ড বোঝা , সবাই পাঠিয়েছে,  জন্মদিন সংখ্যার পত্রিকা , জন্মদিনের প্রণামের চিঠি , কবিতা , কাগজ ইত্যাদি। “তুমি একটা কবিতা লিখলে না যে ? কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি তোমার ভক্তি অসম্ভব দ্রুত কমে যাচ্ছে। ওইতো, কাগজ কলম রয়েছে, চট্ করে “হে রবীন্দ্র কবীন্দ্র বলে একটা লিখে ফেলনা। আমার নামটা ভারি সুবিধের , কবিদের খুব সুবিধে হয়ে গেছে । মিলের জন্য হাহাকার করে বেড়াতে হয়না। রবীন্দ্রের পর কবীন্দ্র লাগিয়ে দিলেই হলো। “ কবির বক্তব্য মৈত্রেয়ী দেবীর উদ্দেশ্যে ! সেদিন অজস্র ফুল এসেছিল। কালিম্পংএর অধিবাসীরা মালা পরিয়ে গেল। চিত্রিতা আর নন্দিনী,  (প্রতিমা দেবীর পালিতা কন্যা , কবির স্নেহের বুড়ি বা পুপে) তাঁর  শোবার খাট ফুল দিয়ে সাজিয়েছিল – “দাদামশায় , দেখবে এস তোমার ঘর কি করেছি। এই দ্যাখ কান্ড ! এসব দেখলে যে মন খারাপ হয়ে যায় , সঙ্গিনীহীন ফুলশয্যা !” আটাত্তর বছরের রবীন্দ্রনাথ সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন হাস্য পরিহাসে ! 

অতঃপর এলো , সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ । সূর্যাস্তের পর রাত প্রায় সাতটা বা আটটা নাগাদ , বেল বাজলো ।কবি আসনে বসলেন । সকলে বেরিয়ে গিয়ে ঘরটির সমস্ত দরজা জানালা  বন্ধ করে দেওয়া হল  , অবাঞ্ছিত শব্দ দূর করতে । রেডিও সেট বাইরে রাখা । স্হানীয়দের মধ্যে জন গ্রাহামও ছিলেন সেদিন । বাড়ির বাইরে চারিদিকে টেলিফোনের তার । “আজ মম জন্মদিন –“ তাঁর কন্ঠ ধ্বনিত হলো । “ সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে ডুব দিয়ে উঠেছে সে , বিলুপ্তির অন্ধকার হতে / মরণের ছারপত্র নিয়ে” পনেরো মিনিট । পাঠ ছড়িয়ে পড়লো স্বকন্ঠে কোলকাতা , দিল্লী , মুম্বাই , লখনৌ , পেশোয়ার , লাহোর ! 

প্রবোধকুমারের লেখনীতে সেই মুহূর্ত অবিনশ্বর “ আমাদের পায়ের নিচে কালিম্পং থর্ থর্ করতে লাগলো কিনা , সেকথা তখন আর কারো মনে রইলোনা । জ্যোৎস্না ছিল সেদিন বাইরে । একটা মায়াচ্ছন্ন স্বপ্নলোকের মধ্যে আমরা যেন হারিয়ে যাচ্ছিলুম । ভুলে গিয়েছিলুম পরস্পরের অস্তিত্ব।” প্রথম লাইভ ব্রডকাস্ট। 

জন্মদিনের কয়েকদিন পর , ২১শে মে রবীন্দ্রনাথ মংপু চলে যান, আবার কুড়ি দিন পরে কালিম্পং-এ ফেরেন । দুই পর্যায়ে এ যাত্রা বাহান্ন দিন কালিম্পং এ ছিলেন । ৯ই জুন ১৯৩৮ কালিম্পং এ প্রত্যাবর্তন  এই সময় “যক্ষ”  কবিতাটি লেখা, গৌরিপুর হাউসে। 

অবশেষে ফেরার পালা ।  এই সময় গৌরিপুর থেকে ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির পুত্র বীরেন্দ্রকিশোরকে একটি চিঠি লেখেন তিনি। চিঠিতে লিখেছিলেন –“এখানে শরীর অনেকটাই ভালো , মনও আছে আরামে , তার প্রধান কারণ এখানকার নির্জনতা । তোমাদের বাড়িটিরও গুণ আছে । দ্বিধা হচ্ছিল , দীর্ঘকাল থাকলে পাছে তোমাদের কিছুমাত্র অসুবিধা ঘটাই । তোমার চিঠিখানি পেয়ে আস্বস্ত হয়েছি ।আমাকে কিছু কারণে একবার যেতে হচ্ছে শান্তিনিকেতনে । বউমা এখানে রইলেন ।  আবার ফিরবো । তোমার সাদর আমন্ত্রন অনুসারে এইখানেই শরতকাল যাপন করবো । সকলেই বলছে , সেই সময়টা মনোরম এবং স্বাস্হ্যের পক্ষে বিশেষ অনুকুল । তোমরা আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করো । ” 

এক অপরাহ্ন বেলায় আবার দাঁড়ালাম তার মুখোমুখি । শ্বেত ফলকটি পড়তে পড়তে ভাবছিলাম দিনটির কথা । কোন ঘরে ঘটেছিল সেই বিপ্লব ? নিচের তলার কোন ঘর তেমন অবশিষ্ট নেই । ফাটল ধরা , ভূমিকম্পে ধ্বংস প্রায় বারান্দার থামে বটের শিকড় । মাঝখানের সিঁড়ি দিয়ে এখনো ওঠা যায় । সে বাধা দেয়না ।শুধু দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় অনুভবের অতলে । ওপরে বাঁদিকের ঘরগুলিতে এলো মেলো মলিন সংসার একটি নেপালী পরিবারের । প্রাচীন মাটির উনুনে রান্না বসানো । শিশুদের দৌড়াত্ম । সংসারের কর্ত্রী , বেরিয়ে এসে আমাকে অবাক করে দিয়ে ভাঙ্গা বাংলায়  আলাপ জমালেন । নাম সঞ্জিতা শর্মা । বললেন ,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্হিতি ধন্য   এই তীর্থের  ইতিহাস , তাঁর মতো করে । গৌরিপুরের জমিদার বংশের নামও তাঁর জানা । সিঁড়ির কোণায় থামের ওপর একটি মলিন খাতা আর কলম দিয়ে নাম ঠিকানাও লিখতে বললেন ।এ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ । বহু মানুষের সই আছে সেখানে । না ।  জবরদখল নয় । তাঁরা এখানে চার পুরুষের অধিবাসী । তাঁর মাতামহ ছিলেন এই বাড়ির চৌকিদার । তাঁর মা কৃষ্ণা তখন বালিকা ।রবীন্দ্রনাথ এসে তাঁকে কাছে ডাকতেন । বলতেন “বেটি মিঠাই লে জা “ কি একটা সবুজ লজেন্স দিতেন ! দীর্ঘদেহী শ্বেত শশ্রু  গুম্ফ  কেশ সমন্বিত জোব্বা পরিহিত কবিকে সে ভয় পেত । মাঝে মাঝে সামনের বাগানেও বসে লিখতেন তিনি । পরবর্তীকালে সঞ্জিতার বাবা পদমলাল চৌকিদার হন । দাদু  বিষ্ণু শর্মার নাম রতন বিশ্বাসের লেখায় আছে । মা বাবা গত হলেও সঞ্জিতা স্বামী পুত্র নিয়ে এই পরিত্যক্ত প্রাসাদেই থাকেন  এখনো । তালা খুলে ডান দিকের ঘর গুলিতে নিয়ে গেলেন । আসবাব কিছু নেই । জানালায় ভাঙ্গা রঙীন  কাঁচ , আনমনা ঝুল বারান্দা , ফায়ার প্লেস  এখনো বাঙ্ময় । বর্ণনা ও কল্পনা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল । তার মতে , এই ঘরে কবি থাকতেন ও বসে লিখতেন । সামনের বারান্দা  অভিমুখী খোলা জানালা দিয়ে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা আর নাথু লা পাস পর্যন্ত দেখা যেত । বর্তমানে সামনে নবনির্মিত পলিটেকনিকের ছাদ । নিচতলা তালা এঁটে ঠোঁটে আঙুল চুপ । ঘরগুলি নাকি বিপজ্জনক  ভগ্নপ্রায় । পিছনে খেলা করছিল ছোট ছেলেমেয়েরা ।ওরাও টেগোরকে জানে । তবে পড়েনি । পিছনে আউট হাউসের অবশেষে জলের কলে ,  কেউ কাপড় কাচছিল । সঞ্জিতা বললেন সামনের বকুল গাছ দুটি কবির লাগানো ।বারবার অনুরোধ করলেন , সরকারী আধিকারিক হিসেবে , বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবস্হা  করার  । 

১৯৪০সালে, কবি  আবার  কালিম্পংএ এসেছিলেন।  ছিলেন 7ই মে থেকে ২৯ শে জুন। এবার কবির সঙ্গী ছিল , তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ও সহকর্মী চার্লস ফ্রেয়র এন্ড্রুজের মৃত্যুশোক। ঐ বছর ৫ ই এপ্রিল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কালিম্পং যাত্রার আগে শেষবার দেখতে যান সন্তানাধিক  ভ্রাতুষ্পুত্র  মৃত্যুপথযাত্রী সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে । পরবর্তীকালে  সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়  5 ই মে ।  রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী তখন কালিম্পং-এ।  কবি গৌরিপুর হাউসে আসার  পাঁচদিনের মাথায় এল কালী মোহন ঘোষের মৃত্যু সংবাদ । ইনি ছিলেন শ্রীনিকেতন ইনস্টিটিউট অফ রুরাল রিকন্স্ট্রাকশান এ এলামহার্স্ট সাহেবের ডান হাত । তাঁর পরবর্তীকালে স্বনামধন্য দুই পুত্র শান্তিদেব ঘোষ ও সাগরময় ঘোষ । শুধু মৃত্যু নয় , কালিম্পং এ এই বাড়িতে  বসে , কবি তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির বেদনাদায়ক পরিস্হিতির খবর পেতেন । জার্মানি তখন অনেকটা দখল করেছে ফ্রান্স ।গৌরিপুর হাউসে মৈত্রেয়ী দেবীরাও এসেছেন । সবাই রেডিওতে যুদ্ধের খবর শুনছেন। মাদামোজেল বসনেক নামে এক ফরাসী মহিলা তাঁদের সঙ্গে থাকতেন । একদিন হঠাৎ তিনি “গুরুদেব “বলে বিশ্রামরত গুরুদেবের ঘরে ঢুকে তাঁর বিছানার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে জানালেন প্যারিসে ওরা তাঁর “ডাকঘর “ অভিনয় করছে তখন ! উনি উঠে বসে অনেকক্ষণ পর বলেছিলেন, “সেবারও রাশিয়াতে ওদের দুঃখের দিনে ওরা বার বার অভিনয় করেছে king of the dark chamber !” ১৪ই জুন নাৎসীদের হাতে প্যারিসের পতন হয় । ঠিক তার অব্যবহিত পূর্বে ,  আত্মসমর্পনের আগের রাতে , শেষ রেডিও ব্রডকাস্ট হলো the post office এর ফরাসী অনুবাদের নাট্যাভিনয় ।  অনুবাদক আন্দ্রে জিদ পরে ৪৭ এ সাহিত্যে নোবেল পান । এই সময় কবির অস্হির ব্যথিত অনুভূতির সাক্ষী ছিল গৌরিপুর ভবন। এখানে বসে ১৫ই জুন নাগাদ মৈত্রেয়ী দেবীকে লেখা চিঠিতে জানা যায় এইসময়  তিনি “ছেলেবেলা “ লিখছিলেন। 

প্যারিসের পতনের পরদিন গৌরিপুর বাড়ি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে টেলিগ্রাফ করেন তিনি । আমেরিকা তখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামিল হয়নি । কিন্তু রসদ ও সেনা  যোগান দিচ্ছে মিত্র শক্তিকে । কবি লিখেছিলেন “all our individual problems of politics today have merged into one supreme world politics , which I believe is seeking the help.of united states of America as the last refuge of the spiritual.man , and these few liines of mine merely convey my hope even if unnecessary that she will not fail her mission to stand against the universal disaster that appears imminent .” ভাবনা যাই থাক , আমেরিকা সম্পর্কে তাঁর তৎকালীন ধারণা ভ্রান্ত হলেও , তখনো পার্ল হারবার আক্রমণ ও আমেরিকার যুদ্ধ ঘোষণা ঘটেনি । তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য , হত্যালীলার ও মানবতার অবমাননার অবসান চেয়ে এই আবেদন করেছিলেন মরিয়া হয়ে । বলা বাহুল্য রাজনৈতিক দুনিয়া সে আবেদনে কর্ণপাত করেনি । গৌরিপুর ভবন সেই সব মুহূর্তের স্মৃতি বহন করে চলেছে । 

এ বছর অগাস্টে প্রতিমা দেবী অসুস্হ হয়ে গৌরিপুরে বসবাস করতে এলে, রবীন্দ্রনাথ তার তিন সপ্তাহ পর আবার কালিম্পং আসেন। রথীন্দ্রনাথ তখন পাতিসরে জমিদারীর কাজে ব্যস্ত ।  

এ যাত্রা সম্পর্কে তাঁর নিজের অমঙ্গল আশঙ্কা প্রশান্ত মহলানবীশকে লেখা চিঠিতে পাওয়া যায় । কবির চিকিৎসক,  ডঃ নীলরতন সরকার ও বিধানচন্দ্র রায় উভয়েই তাঁকে কোলকাতা ছাড়তে বারণ করেন । আশি বছরের রবীন্দ্রনাথ শোনেননি ।  ১৯ শে সেপ্টেম্বর শেষবার দার্জিলিং মেলে যাত্রা করেন তিনি । “নির্বাণে “ প্রতিমা দেবী লিখেছেন  ২০ তারিখে প্রকান্ড মোটর থেকে নামার সময় কবিকে বেশ অসুস্হ লাগছিল । গাড়ি এসে গৌরিপুর ভবনের  দরজায় দাঁড়াতে সুধাকান্তবাবু তাঁকে হাত ধরে নামান ।  প্রথম কদিন ভালো ছিলেন । কিন্তু  গৌরিপুর ভবনের বৈশিষ্ট হলো , পাহাড়ি অঞ্চলের বাড়ির মতো নয় । তার নির্মাণে কাঠের বদলে কংক্রিট ব্যবহৃত ছিল । ফলে তাতে ঠান্ডা হতো বেশি। রবীন্দ্রনাথ জানালা খোলার জন্যও জেদ করতেন খুব । ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলো । ঐ দিন দুপুরে ,  চেয়ার থেকে পড়ে যান তিনি । প্রতিমা ও মৈত্রেয়ী দেবী স্বভাবতই অচৈতন্য তাঁকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন । সুধাকান্তবাবুকে তিনি আগেই তাঁর ছেলের অসুখের জন্য জোর করে কোলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । ২৬ তারিখে , কালিম্পংএর বাঙালী ডাক্তার গোপালচন্দ্র দাশগুপ্ত এই বাড়িতে  এসে তাঁকে দেখেন ও স্কটিশ ডাক্তার ক্রেগকে নিয়ে আসেন । এই ক্রেগ ছিলেন তৎকালীন  কালিম্পং চার্টারিস হাসপাতালের অধ্যক্ষ ।তিনি কুষ্ঠ রোগের  চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ছিলেন।

যাই হোক ত, উভয়েই, কবির এই অচৈতন্য অবস্হার কারণ স্বরূপ প্রস্ট্রেট গ্ল্যান্ডের বৃদ্ধি জনিত ইউরেমিয়া নামক জটিলতার কথা বলেন। ২৭ শে সেপ্টেম্বর অসুস্হতা র অবনতি  হলে মৈত্রেয়ী দেবী  গৌরিপুরের পাশের বাড়ির টেলিফোন থেকে  কোলকাতা ও মংপুতে যোগাযোগ করেন।  ডঃ দাশগুপ্ত দিশেহারা  এবং ক্রেগ অস্ত্রোপোচারে  আত্মবিশ্বাসী ছিলেননা ।অথচ অস্ত্রপোচারের প্রয়োজন  ছিল। জানা যায়,  ক্রেগ সম্পূর্ণ পেশাদারী  কারণে  রবীন্দ্রনাথকে দেখতেও আসতে চাননি। মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছেন সব মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে “সেই উদ্ধত বিমুখ বিজাতীয় পরপুরুষের পায়ের কাছে বসে অশ্রুপাত করতে লাগলাম “oh ! Beg you on my knees !” সাহেব উঠে পায়চারি করতে লাগল । “ অবশেষে ক্রেগ  দার্জিলিংএর সিভিল সার্জেনকে খবর দিয়ে ,  আসতে বলেন । ইনি ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ এসে রোগশয্যায় শায়িত কবিকে দেখে  তিনি অপারেশান  করতে চান এবং নচেৎ কবির প্রাণসংশয় হতে পারে জানান । কিন্তু দুই নারী এই সিদ্ধান্ত নিতে পিছিয়ে গেলেন । কোলকাতা থেকে ডাক্তারদের নিয়ে প্রশান্ত মহলানবীশ ততক্ষণে রওনা দিয়েছেন । পরদিন মীরাদেবী ডাক্তারদের নিয়ে পৌঁছলে কবি মেয়েকে দেখে আনন্দিত হন । সকলে অর্ধচেতন রোগীকে নিয়ে ধ্বস কবলিত রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে রওনা দেন । একটি স্টেশান ওয়াগানের সিট  খুলে তাঁকে শোয়ানো হয়েছিল । একশোজন শ্রমিক ডঃ  মনমোহন সেনের নেতৃত্বে রাস্তা সারাই করে গাড়ি এগোচ্ছিলেন । ২৮ শে সেপ্টেম্বর ১৯৪০ কালিম্পংএর  গৌরিপুর হাউস নীরবে বিদায় দিয়েছিল কবিকে ।   তার চৌষট্টিটা সিঁড়ির বর্ণনা এখন ততটাই  বেমানান যতটা তার একটেরে বিষন্ন অস্তিত্ব  এই সব ঘটনা বহুলতার প্রেক্ষিতে ।  খোঁজ নিতে গিয়ে, পি ডবলিউ ডির সিভিল কনস্ট্রাকশানের রিজিওনাল হেড জানালেন, হেরিটেজ কমিশন এই বাড়ি অধিগ্রহণ করার পর তার সংরক্ষণের ডি পি আর এখন  কমিশনের প্রধানের এপ্রুভালের অপেক্ষায় আছে।  হয়তো আবার সেজে উঠবে সেই  অভিমানী প্রাসাদ । সেদিন  কি গল্প বলবে সে সব দিনের আধো অন্ধকারে ? হৃদয়ের অন্তস্হলে  তির তির করে  কাঁপবে  তার  চোখের পাতা মুখোমুখি দাঁড়ালে ? ততদিন অপেক্ষায় থাকবে কি সে? গৌরিপুরের নিচে কবির ইচ্ছায় তাঁর মৃত্যুর পর তৈরি “চিত্রভানু” ছিল প্রতিমা দেবীর বাসস্হান। বর্তমানে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের নারী শিক্ষা কেন্দ্র। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমাদেবীর আঁকা ছবিতে ভরা। গৌরিপুর কি এমনি করেই বেঁচে উঠবে কখনো? 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার 

মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, স্বর্গের কাছাকাছি– মৈত্রেয়ী দেবী 

নির্বাণ– প্রতিমা দেবী 

পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথ– রতন বিশ্বাস 

রবির  মংপবী– সোহম দাস

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ৪

উ দা সী ন  তাঁ ত ঘ র পর্ব ৪

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

pankaj

রাত্রিশাসন অথবা মরীচিকা অন্বেষণে

কবিতা লিখতে এসে পিছনের দিকে তাকালে কোনো কিংবদন্তি কবির মুখ নয়, কয়েকটি আড্ডার কথা মনে পড়ে। নিছক আড্ডা অথবা নিছক কবিতা নিয়ে পাগলামি। বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। নতুন কবিতার প্রশংসায় মন ভরে থাকে। কোনো কোনো কবিতার ব্যর্থতা আরও মনমরা বা সতর্ক করে দেয়। সদ্য প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকায় নিজের নাম দেখতে ইচ্ছে করে। কখনও কখনও বিষাদভরা মন নিয়ে প্রেরণা খুঁজতে যাই লোকাল কবির কাছে। সেখানেও জমে ওঠে আরেকপ্রস্থ আড্ডা। আড্ডা ছাড়া কবিতা নেই। তখনও মফস্সলের অনেক অঞ্চলে একটি ছোটো পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সান্ধ্য আড্ডা বসত। কোথাও শনিবার, কোথাও রবিবার। সারা সপ্তাহের লেখা উজাড় করে পড়া হত। ভালোমন্দ বিচার হত। থাকত গোপন অনেক ঈর্ষারও আয়োজন। সেইসব আড্ডায় প্রশংসিত কবিতা গোপনে খামবন্দি হয়ে চলে যেত ‘দেশ’ পত্রিকার দপ্তরে। ঘরের আড্ডা গড়াত রাস্তায়। তর্কবিতর্কে রাত বারোটা পেরিয়ে যায় কোনো কোনো দিন। শ্মশানের পাশে গঙ্গার ঘাটে,কোনো পার্কে অথবা চায়ের দোকানে জমে উঠত কবিতার নেশা। কবিতার আসরে অতর্কিতে হানা দিতে থাকে সন্দীপন অথবা সদ্য প্রকাশিত সুবিমল মিশ্র। তখনও বইমেলায় সুবিমল মিশ্র নিজেই নিজের বই বিক্রি করতেন। জেলায় জেলায় লিটল ম্যাগাজিন মেলা আর নৈশ আড্ডার সুযোগ আসেনি।

আমাদের মাঝে মাঝে মনে পড়ে কিংবদন্তি কিছু আড্ডার মুহুর্ত। পঞ্চাশের দিনগুলিতে রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করত চারজন যুবক। কখনও কখনও বদলে যেত যুবকের নাম। এদের বাইরেও ছিলেন আরও কয়েকজন তরুণ কবি। কখনও কফি হাউসে কিংবা খালাসিটোলায় জমে উঠত আড্ডা। সেই অফুরন্ত আড্ডা গড়িয়ে আসত মধ্যরাতের ফুটপাতে। আড্ডা চলত মধ্যমণি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বৃন্দাবন পাল  লেনের বাড়িতেও। এই আড্ডার ফসল ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা।

আলফা কাফে নয়, শতভিষা পত্রিকার প্রথম পরিকল্পনা হয়েছিল রাসবিহারী আর মহীশূর রোডের মোড়ের এক ছোট্ট চায়ের দোকানে। সেই চায়ের দোকানটি পরে হয় ঘড়ি মেরামতের দোকান। সেখানে দুই অতি তরুণ যুবক আলোক সরকার এবং দীপংকর দাশগুপ্ত পরিকল্পনা করেন পত্রিকাটির এবং তা পূর্ণ রূপ পায় আলফা কাফের আড্ডায়। সরি গলির সেই চায়ের দোকান আলফা কাফেতে তখন সাহিত্যের নিমগ্ন আড্ডা। ‘সেইখানে কবি আছে, গল্পকার আছে, চিত্রশিল্পী আছে,সঙ্গীতজ্ঞ আছে,রাজনীতিজ্ঞ আছে, আছে এমনকি খুন- জখম- ওস্তাদ গুণ্ডা।’ তবু শেষপর্যন্ত এই আড্ডার ব্রত ছিল কবিতাই।

এই তো সেদিনও কবিসম্মেলনের শেষে মধ্যরাতে শান্তিপুর থেকে কৃষ্ণনগর দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে ফিরলেন একদল তরুণ কবি। এই উত্তেজনার সঙ্গে কবিতার যোগ হয়তো সামান্য কিন্তু জীবনে জীবন যোগ করার এমন একটা সুযোগ তৈরি হয় কবিতার হাত ধরেই। যদিও কথাটি সুন্দর কিন্তু তা আদ্যোপান্ত সত্য নয়। বরং পিছনেই রয়েছে অনিবার্য লুপ্তপ্রায় এক ছুরি। অগোচরে হিংস্র দাঁতের মতোই মেধাবী এবং অক্ষম। প্রতারক স্মৃতির হাত ধরলেই মনে পড়ে যায় নব্বইয়ের এক কবিতাপ্রাণ  আড্ডার কথা। একটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই জড়ো হয়েছিলেন একদল তরুণ কবি। মধ্যমণি কখনও এক স্বপ্নাতুর মায়াবী জনপ্রিয় কবি। আড্ডার শেষে তিনি চোখে এঁকে দেন এক অলৌকিক স্বপ্ন। নিজের ছায়ায় বিখ্যাত হবার সাধনা। পকেটে করে নিয়ে আসেন তরুণ কবিদের কবিতা একটি বিখ্যাত পাক্ষিকে প্রকাশের জন্য। তারপর চতুর এক উদাসীনতায় হারিয়ে ফেলেন সেসব লেখা। এভাবেই কবিতার আড্ডায় ঢুকে পড়ে চাপা সন্ত্রাস। শুরু হয় পারস্পরিক ঈর্ষা। এক দশকে সংঘ ভেঙে যায়। অথচ আমরা জানি শরৎচন্দ্র বা বিভূতিভূষণ, মানিক বা সুবোধ ঘোষ অনেকেই অতর্কিত আড্ডার সন্তান। খালাসিটোলার আড্ডায় রীতিমতো আবির্ভূত হতেন কমলকুমার মজুমদার। আমাদের অনেক কবিতা আড্ডা আর মধ্যরাতের সন্তান। এমনকী একদিন সংগোপনে পঞ্চাশের দুরন্ত ও দামাল কৃত্তিবাসী কবিদের নৈশ আড্ডার শরিক হতে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুও। তিরিশের অনেক কবির বাড়িতেই বসত আড্ডা , ছিল তরুণ কবিদের উষ্ণ আমন্ত্রণ। মনে পড়ে বিচ্ছিন্ন এবং টুকরো কিছু পারিবারিক সাহিত্য আড্ডার মুহুর্ত যার অভিঘাত শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে বিষোদগার, এমনকী প্রচ্ছন্ন হুমকি অথবা হাতাহাতি। যে নৈশ আড্ডার জন্য বিখ্যাত পঞ্চাশের কয়েকজন কবি ও গল্পকার, যা দুর্দমনীয় এক বন্ধুত্বের উদযাপন তার পেছনেও আছে সিংহাসন দখলের গোপন রাজনীতি।ক্ষমতার  মিঠে আস্ফালন।

মোটামুটি আশির দশক থেকেই এইসব অনেক আড্ডা ঢুকে পড়ে কোনো কোনো কবির বৈঠকখানায়। ব্যক্তিগত রবিবাসরীয় বৈঠকে। কোথাও কবিতা বা ছন্দ নিয়ে সৃজনশীল পরামর্শ, কোথাও আর্থিক দীনতামোচন এবং পুরস্কারের সুযোগ, কখনও কোথাও ব্যক্তিগত বিষাদ উদযাপন। তরুণ কবির আশ্রয় আর প্রবীণ কবির প্রশ্রয়। সুযোগমতো টুনটুনির ছানা ডানা মেলে উড়ে যায়। এর পাশাপাশি মফস্সলে রয়েছে পত্রিকাকে কেন্দ্র করে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে আড্ডা। কবিতা নিয়ে সুযোগসন্ধানী স্বপ্নের পাশাপাশি পরনিন্দা, পরচর্চা।  মনোমালিন্য থেকে গোষ্ঠীবদল, আবার একটি নতুন পত্রিকার জন্ম। ষোলোআনা বিদ্রোহ আছে অথচ নিজের লেখাটির দেখা নেই। আত্মমুগ্ধ কবির দল নিজের লেখার বাইরে বাংলা কবিতা পড়ে না। জন্ম থেকেই কাফকার আত্মীয় , যতীন্দ্রমোহন বাগচীর  লেখা পড়তে লজ্জা পায়। এইসব বেশিরভাগ আড্ডা হয়তো আমাদের স্মৃতিময় জীবনকে অনেক আত্মমুগ্ধতা উপহার দিয়েছে কিন্তু বা়ংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করে নি।

মাঝে মাঝে ছাত্রদের বলি ন্যাশনাল লাইব্রেরী নয়, জীবনে ঠিকঠাক একটি চায়ের দোকানের সন্ধান পেলে আমাদের যেকোনো গবেষণা সার্থক হতে পারে।  আমাদের কবিতা সর্বব্যাপী এবং সার্থক  হতে পারে এমন একটি চায়ের দোকান পেলে। কবিতাহীন হাজার হাটুরে মানুষে ভরা নির্জন একটি চায়ের দোকান। মানুষের দৈনন্দিন সংলাপে প্রানবন্ত। কিছুদিন আগেই চায়ের দোকানের পাশে একজন মাতাল গলা ছেড়ে গাইছিল – ‘ দয়াল তোমার বাড়ি, তোমার গাড়ি, আমরা সবাই প্যাসেঞ্জার।’ এই উত্তরাধিকারের আমাদের বড়ো প্রয়োজন ছিল। এই তো সেদিন একজন রাজমিস্ত্রি কাজের ফাঁকে স্টিলের গ্লাস হাতে চা নিতে ঢুকলেন। মুখে মুখে বলে চলেছেন- এতক্ষনে অরিন্দম কহিলা বিষাদে,জানিনু কেমনে’ ইত্যাদি। ‘মেঘনাদবধকাব্যে’র কয়েকপাতা রীতিমতো মুখস্থ। তিনি কী বলছেন শোনা যাক:

” আমার পড়াশোনা যা কিছু বুঝলেন বাংলাদেশে। গ্রামের নাম গন্ধর্ব। কাউখালি থানা। পড়তাম জানকীনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রথম থিকাই কবিতায় আমি ফার্স্ট। সব কবিতা মুখস্থ বলতে পারতাম। মাইকেল, নজরুল, জসীমউদ্দীন, সুকান্ত,বন্দে আলী মিঞা। এদের কবিতা এখনও মনে আছে। তখন কবিতায় একটা ছন্দ ছিল। এখনের কবিতা তেমন না। এখনের পাইঠ্য বইগুলি যেন ক্যামন। কোনো ছন্দ নাই। সেইসব কবিও নাই। জানি নিউ জেনারেশনকে চান্স দিতে হচ্ছে…”
অতঃপর তিনি চুপচাপ বসে থাকেন। এই বিলাপের উত্তরাধিকার আমাদের প্রয়োজন ছিল। অথচ আমরা তাকে কোনো কবিতার আড্ডায় ডাকিনি। এইসব রাত্রিশাসন  বা আড্ডার সাধনাকে আজও আমরা উচ্ছিষ্ট ঘোষণা করতে পারিনি।

আমাদের কবিতাকেন্দ্রিক সমস্ত আড্ডা আমাদেরই আত্মমুগ্ধতার  ইতিহাস। শেষপর্যন্ত কবিতা লিখতে যথাযথ শব্দ লাগে, চিত্রকল্প লাগে কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হয়, কোনো আড্ডাই আমাদের শেখায়নি।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

আবার রাণার কথা । পর্ব ১

ধা রা বা হি ক । পর্ব ১

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

rana2

আবার রাণার কথা

|| ১ ||

আমার এই বাল্যের স্মৃতি আমি একবার খাটের এইপাশে রাখি, একবার ওইপাশে। একবার বইয়ের তাকে, একবার বুকপকেটে, একবার চিরুনির পাশে, একবার মায়ের স্মৃতির পাশে ফুলে ঢেকে রাখি। এ বড়ো সুখের, এ বড়ো বিড়ম্বনার।

বাল্যের স্মৃতিই আমায় মানুষ করেছে। মানুষ করেছে না অমানুষ করেছে তা তিনিই জানেন। এই যে মায়া, মায়াকে পাশ কাটানো, আমার ভিতরের যাবতীয় নিষ্ঠুর ফার্নিচার সবই ওই বাল্যের হাতুড়ি-ছেনির কারসাজি, কেরামতি।

বাল্য থেকেই একটি চিতা সাজানো জ্বালানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। বুঝি আমি, টের পাই। আমার চিতা, চিতা বাঘের ন্যায় সরল নরম তীক্ষ্ণ ও দুঃখিত দাবানলে জ্বলবে একদিন। শিশুরা তাকিয়ে থাকবে, ভাববে এও এক খেলা।

 

|| ২ ||

দিনের প্রতিটা ক্ষণ ভালো করে দেখলে খুব সুন্দর।

রাত্রিকে আমার বেশি ভালো লাগে। বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে, আমি জানলা দিয়ে দেখি, রাত দুটোর পাড়া, স্তব্ধতারও একটা শব্দ আছে, রাস্তায় গাছের পাতা চুঁইয়ে স্ট্রিট লাইটের আলো একা পড়ে আছে। সেই আলো মাড়িয়ে গভীর রাতের অগভীর ‌নাইটগার্ড তার দুঃখ ভরা জীবনের বাঁশি বাজাতে বাজাতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকায়, দেখে ভোর আসছে, মানে তার ছুটি, ছুটি মানে আনন্দ।

বর্ধমানের গভীর রাত আর ব্যারাকপুরের গভীর রাতে তফাত আছে। মিলও আছে। পুরুলিয়ার আলোছায়াময় গভীর রাতের যে স্তব্ধতা, তা কেমন আবেগমাখা‌ ভিজে ভিজে।

কিশোর বয়েসে, তারুণ্যে বিকেলকে আমার খুব ভালো লাগতো। বিকেলের মধ্যে অনেক মনখারাপ শোক বিচ্ছেদ থাকা সত্ত্বেও তাকে আমার ভালো লাগতো এই জন্য, কারণ বিকেলবেলার ছাদে তরুদি আর তার স্নিগ্ধ মা পায়চারি করতো, তরুদি ছিল সুন্দর, তরুদি ছিল মূক ও বধির, তরুদি চোখে কাজল পরতো, বিকেল হলে তরুদির মা তরুদির জন্য অপূর্ব বেণী বাঁধতো।

আর দুপুরবেলার সৌন্দর্যকে বুঝতে গেলে আমাদের মিন্টুর মতো সাহসী হতে হবে। মিন্টু দুপুরবেলার নারকেল গাছে উঠতে উঠতে একবার প্রায় সূর্যকে ছুঁয়ে ফেলেছিল। আমরা কম সাহসী নারকেল-লোভীর দল, নিচ থেকে তাকে উৎসাহ দিচ্ছিলাম…

দুপুরকে বুঝতো মিন্টু, সারা দুপুর সে এ-বাগান ও-বাগানের ভূত-পেত্নীদের সঙ্গে কথা বলতো, অনেক ভূত-পেত্নী-বম্মদত্যির সঙ্গে তার আলাপ-পরিচয় ছিল।

মিন্টু কথা দিয়েছিল, একটা নিরহংকারী বম্মদত্যির সঙ্গে… একটা জাঁদরেল ভূতের সঙ্গে আলাপ করাবে, বাড়ি নিয়ে যাবে তাদের। কিন্তু ‘নিয়ে যাবো নিয়ে যাবো’ করে সে বিয়াল্লিশ হাজার দুপুর পার করেও নিয়ে যায়নি আমাদের।

মিন্টু পরে ‘দুপুর বিশেষজ্ঞের’ চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে যায়। আমরা পড়ে থাকি এই বাংলার নিত্য-অনিত্য দুপুর রাত্রি সকাল ভোর আর অনেক বিষণ্ণ বিকেলের পারে, ধারে, তীরে…

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

শুভ চক্রবর্তী

বি শে ষ র চ না

শু ভ   চ ক্র ব র্তী

shuvo

খুতুত-এ-গালিব

গত সংখ্যা পর

কোই দিন গর জিন্দগানী ঔর হ্যায়
অপনে কী মে হমনে ঠানী ঔর যায়।

জীবনের শেষ দিকে এসে গালিব কী এমন ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকতেন ? কেন তিনি আর কবিতা লিখছেন না, আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত একজন কবি, যাঁর সর্বক্ষণ কবিতায় একটা ঘোর জড়িয়ে রয়েছে, কথায় কথায় যাঁর উচ্চারিত শব্দে কবিতার পংক্তি বাতাসে ভালোবাসার গন্ধ ভরে দেয়! তাহলে কেন তাঁর মনে হচ্ছে কবিতার বোধটুকই তাঁর এই মুহূর্তের সম্বল ? মধ্য বয়সের অস্থিরতা একটু একটু করে কমে আসছিল যখন, মৃত্যুর এগারো বছর আগে মির্জা গালিব তাঁর প্রিয় তফতাকে লিখছেন “তুমি কবিতা পাঠাবে এতে জিজ্ঞাসা করার কী আছে!” কেননা কবিতা পড়তে তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু কবিতা লেখেন না আর। কেন? তফতাকে তো লিখছেন সেই কথাই- “আমি আর এখন কবিতা লেখক কবি নই, কবিতার বোধটুকুই রয়ে গেছে।” আর সবথেকে বড়ো কথা- “কবিতা আর আমি লিখতেই পারি না।” তাঁর নিজের কবিতা দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান এখন, যে তিনি কী করে সে কবিতাগুলো লিখেছিলেন একসময়। এ-কথা যে কথার কথা নয় তাও তফতাকে জানিয়ে দিচ্ছেন ওই একই চিঠিতে। ভেবো না যে এটা বাড়িয়ে বলা কিছু, অর্থাৎ এটা আমার ভেতরের কথা। আমাদের মনে পড়বে গালিবের দীবান ছাপার আগে কত কবিতা তাঁকে ছিঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছে! কেন? কেন এরকম তাঁর মনের মধ্যে এলো যে কবিতাগুলো তাঁর তখন আর দীবানে দেওয়ার মতো মনে হচ্ছে না? এবং তা ছিঁড়ে ফেলতে হলো? এর উত্তর পেতে গেলে আমাদের তাঁর কবিতার লেখার সূচনা পর্বে যেতে হবে, যখন কবি নিজেকে প্রস্তুত করছেন, ভেঙে ফেলছেন নিজের ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি, আর কবিতাকে এক সহজ করে বলবার একটা উপায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর এই জীবনবোধ তখন অন্যদের কাছে অস্পষ্ট। কেননা উনিশ বছর বয়সের আগেই গালিবকে লিখতে হলো তাঁর ফেলে দেওয়া কবিতাগুলোর ভিন্নতা নিয়ে ‘গঞ্জিনা-এ-মাঅনী কা তিলিষ্ম উস কো সমঝিয়ে/গালিব মীরে অশওয়া মে আওবে’… শব্দের মধ্যে এমন এক প্রবাহকে তিনি ধরতে চাইছেন যখন, সমসায়িক বিপন্নতাও তাঁর জীবনবোধের ভিন্নতাকে আরও বিস্তারিত করছে, যেন এই বোধই হয়ে উঠতে চাইছে গালিবের সঞ্চয়। বলতে ইচ্ছে করে নূর-এ-গালিব ইয়ে মঞ্জর, এক সহজ সন্তুর জীবন যাঁর, আর গালিব এটা বুঝতে পেরে লিখে রাখেন ‘হরচন্দ সুবুকদস্ত হুয়ে বুতশিকানী মে/হম হ্যাঁ তো অভী রাহ মে হ্যায় সঙ্গ-এ-গিযা ঔর’… এই যে তিনি নিজের আমি-কে ভেঙে ফেলছেন, এ তো আমরা পাই ভারতীয় দর্শনের আধারেই। তাহলে নতুন কী এমন বোধ আরও বিস্তারিত হলো তাঁর মনের ধর্মে? কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন তাঁর ভিন্নতা কি সুফীর আত্মদর্শন নয়? এ-প্রশ্নের উত্তরে গালিব নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন রেখে লিখেছেন :

‘জাম-এ-হর জররে, হ্যায় সর্শার-এ-তমন্না মুঝসে
কিসকা দিল হুঁ, কি দো আলম সে লাগায়া মুঝে।’

গালিব নিজেই যখন জীবনের এই দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন ভিন্ন এক আত্মদর্শন, যেখানে সমস্ত কিছু এসে একটি বিন্দুতে মিশে আছে, তাহলে কি গালিব সমগ্র সত্তার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার কথা বলছেন ? এই কি তাহলে তাঁর ভিন্নতা? এইখানে তিনি আমীর খুশরু-র থেকে যেন কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। দূরে রইলেন এই কারণে যে তাঁর চেতনায় জড়িয়ে আছে সামগ্রিক ‘আমি’র বিস্তার। হালি, গালিবের প্রথম দিকের অস্বীকৃতি কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখেছেন যে, এমন কবিদের কবিতাই সাধারণ মানুষ শুনতে পছন্দ করতেন যেখানে কবিতা আলাদা করে আর ভাবতে হয় না, অনুভবের দরজাটা তাঁদের কাছে অচেনা একটা জগৎ ছিল, যে কথোপকথন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সহজভাবে মিশে ছিল তেমন কবিতাই তাঁদের মন ছুঁয়ে যেত, যেমন মীর, সওদা, মীর হাসান, জুড়াত এবং ইনশা। কারণ তাঁরা তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের ভাষা ব্যবহার করেছেন, যেটা আমাদের মুখোমুখি কথা বলার মতো একটা প্রবাহ। এমন একটা বিশ্বাস ছিল যে কবিতা কবির হৃদয় থেকে এসে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে শ্রোতার হৃদয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু গালিবের কবিতায় এমন কোনো পথই নেই যেখানে শ্রোতা খুব সহজেই সেই পথে তাঁকে স্পর্শ করতে পারবেন। তাই পাঠকের কাছে মনে হবে তাঁর কবিতা জটিল দ্বন্দ্বে ভরে আছে, সহজে সেই প্রবাহকে আমরা স্পর্শ করতে পারি না। গালিবের বাক্য গঠন ছিল ভিন্ন এক বিস্তার। হালি সে বিষয়ে বলবার আগে একটি উদাহরণ দিয়েছেন-

‘কুমরি কাফ-ই খাকাস্তার ও বুলবুল কাফস-ই রং
এয় নালা নিশান-ই জিগার-ই সখতা কেয়া হ্যায়।’

গালিব এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করবেন, যা আগে কখনও এমন করে পাওয়া যায়নি এবং শুধু যে শব্দ তাই নয়, গালিবের কবিতার বাইরের যেমন একটা আঙ্গিক আছে তেমনই তার ভেতরের একটা আঙ্গিক সবসময়ই ওই কবিতাকে ভিন্নতা দিয়েছে। হালি মনে করতেন তাঁর কবিতার লাইন থেকে যদি একটি শব্দ সরিয়ে নেওয়া যায় তাহলে কবিতাটি সমসাময়িক কাব্যভাষা থেকে সরে যাবে, বিশেষ করে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় আমরা সেইরকমই একটা আবরণকে সামনে পাই যা পাঠকের কাছে দুর্গম, বিপন্ন এক বোধের প্রবাহ, কেননা গালিবের কবিতায় ব্যক্তিসত্তার চেয়ে সামগ্রিক সত্তার প্রকাশ অনেক বড়, আর তাই তাঁর কবিতাকে কখনও কখনও মনে হতে পারে ব্যক্তি সঙ্কটের প্রকাশ। কিন্তু আমরা যদি তাঁর কবিতায় নিবিড় হতে পারি তাহলে দেখতে পাবো যে, ওই যে সেই ভিন্নতার কথা উঠল একটু আগে, মনে হবে তখন গালিব শুধু কবিতার অন্তরই সৃষ্টি করেননি, তিনি কবিতায় নতুন শব্দের নির্মাণ করেছেন এবং আরও বিস্ময় লাগবে আমাদের যে তিনি একটি রচনার মধ্যে ফারসি, তুর্কি ও উর্দু এই তিন ভাষার একটা সমন্বয় করেছেন, এবং তাঁর রচনার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ গড়ে ওঠে তখন। কিন্তু এই লেখার শুরুতেই যে প্রশ্ন আমাদের ছিল, তার কিছুটা দ্বন্দ্বের ছায়া আমরা পাবো তাঁর প্রথম দিকের লেখার মধ্যে, যখন গালিবের বয়স উনিশ বছর তখনই তিনি উর্দু কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। এবং প্রথম দীবান প্রকাশিত হয় ১৮১৬ সালে এবং দ্বিতীয় দীবান প্রকাশিত হয় ১৮২১ সালে যখন তাঁর বয়স চব্বিশ, আর ‘তারপর আমি আমার চোখ খুললাম এবং একটা দীবানের ধারণাকে একপাশে রেখে পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেললাম’ এবং ওই একই চিঠিতে জানতে পারলাম ‘আমার আগের কবিতার একটি স্মৃতি হিসেবে দশ পনেরোটা কবিতা রেখে দিলাম।’ কিন্তু এই তথ্য পাঠকের মনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করতে পারে কেননা তাঁর অনেক কবিতাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর ‘দিবান-এ-গালিব’-এ, যা তাঁর প্রথম দিকের কবিতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। গালিব নিজেই সে কথা ভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন চিঠিতে :
‘বেদিলের চেতনার প্রতি গভীর আনুগত্যের কারণেই আমার নিজের কাজ একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক গুণ প্রদর্শন করে৷ বেদিল যেহেতু খিজিরের মতো আমার পথপ্রদর্শক, আমি অজানা পথে হাঁটতে এবং পথভ্রষ্ট হতে ভয় পাই না৷’ গালিবের এই বলবার ভিন্নতাই তাঁর কবিতাকে আর সবার আলাদা করে দিয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনই তাঁর এই বলবার একটা ধরণ তিনি পেয়েছেন বেদিলের রচনার আভা থেকে। একটি চিঠিতে তিনি সে কথাই তো জানিয়ে দিলেন আমাদের : ‘সম্মাননীয় সাহেব, শুরুতে বেদিল, আছির বা শওকতের কাব্যিক কায়দায় রেখতা গজল লিখতাম। তাই নিম্নোক্ত স্বীকারোক্তি দিয়ে আমার একটি গজল শেষ করলাম:
‘তারজ-ই বেদিল মে রেখতা লিখনা
আসাদুল্লাহ খান কেয়ামত হ্যায়!’

যদিও ‘আমি পনের থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে রহস্যময় এবং বিমূর্ত কবিতা লিখেছি। সেই সময়গুলোতে আমার অল্প বয়সের কয়েক বছর, আমি একটি দীবানের জন্য যথেষ্ট কবিতা সংগ্রহ করেছি।’

আর এটা আমরা দেখতে পাই তাঁর প্রথম দিকের কবিতায়-
‘আসাদ হার জা সুখ নে তারহ-ই বাঘ-ই তাজা ডালি হ্যায়/মুঝে রং-ই বাহার আইজাদি-ই বেদিল পসন্দ আয়া’…

একটি চিঠি,

মুনশি হরগোপাল তফতাকে লেখা-

সাহেব, তোমার ভুলে যাওয়াটা বিরক্তিকর। আমি কখন বললাম যে তোমার কবিতা ভালো নয়, বা তোমার কবিতা কেউ বুঝবে না বা প্রশংসা করবে না? কিন্তু কথা হল যখন তুমি কাব্যচর্চায় নিমগ্ন, আমি ভাবছি মৃত্যু ও অনন্তকালের কথা।
আমি আবু আলি সেনার জ্ঞান এবং নাজিরির কবিতা নিরর্থক এবং অর্থহীন বলে মনে করি। নিজের জীবন যাপনের জন্য একটু স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজন; জ্ঞান, দর্শন, শক্তি এবং কবিতা সবই অপ্রয়োজনীয় জিনিস। হিন্দুদের যদি অবতার থাকত, আর মুসলমানদের নবী থাকত! একজন, যদি একজন বিখ্যাত মানুষ, বা একজন অসাম্প্রদায়িক হন? তোমার জীবনে যা প্রয়োজন তা হলো সুস্বাস্থ্য এবং জীবিকার উপায়। বাকিটা, প্রিয় আমার সবই কল্পনা। এমনকি এই দুটি জিনিস—স্বাস্থ্য এবং জীবিকা নির্বাহের উপায়গুলি — নিছক বিভ্রম, কিন্তু এই পর্যায়ে আমি এই দু’টি সরঞ্জাম ধরে রাখছি। হতে পারে, আমি যতই এগিয়ে যাব, এবং আরও আলোকিত হব, আমি স্বাস্থ্য এবং অর্থের প্রয়োজনকেও অতিক্রম করতে পারব এবং সম্পূর্ণ শান্ত অবস্থায় থাকতে শিখব।
আমার চারপাশে যে নীরবতা, আমি এই পৃথিবীর এবং বাইরের জগতের কারণে অসুবিধায় আছি।
আমি প্রত্যেকের সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক মানসিক গঠন অনুসারে মোকাবিলা করি এবং আমাকে যে প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করা হয় তার উত্তর দিই। কিন্তু আমি সবকিছুকে মায়া বলে মনে করি। এ নদী নয়, মরীচিকা, এ জীবন নয়, অসারতা। তুমি আর আমি দু’জনেই মোটামুটি ভালো কবি। হতে পারে, পরবর্তী সময়ে আমরা সাদী ও হাফিজের মতো উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারি। কিন্তু তাঁদের খ্যাতি থেকে তাঁরা কী লাভ করেছিলেন এবং আমরা কী করব?

– গালিব
১৮৫৯

আরও পড়ুন...

Categories
2021-nov

নারী শহরের সম্পদ | পর্ব ৯

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ৯

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ বিজ্ঞানী…

রূ প ক   ব র্ধ ন   রা য়

rupak

নারী শহরের সম্পদ

মোনিক উইটিগ (Monique Wittig) ও লে গেহ্রিয়ের (Les Guérillères)

ফ্রান্সের নারীবাদি আন্দোলনের (দ্বিতীয় তরঙ্গ) ইতিহাসে সিমোন দ্য বাভোয়ার  সঙ্গে যে কয়েকজন বিপ্লবী তথা তাত্ত্বিক তথা অ্যাক্টিভিস্ট তথা আভাঁ গার্দ সাহিত্যিকের নাম একই গুরুত্বে উচ্চারিত হয়ে থাকে, মোনিক উইটিগ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মোনিকের জন্ম ফ্রান্সের আলসেস অঞ্চলের Haut Khin কমিউনে। ১৯৫০ সালে মোনিক পড়াশোনার জন্য প্যারিস শহরে চলে আসেন। ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস “L’Opoponax” প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই “Prix Medicis” পুরস্কার পাওয়ায় দেশজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলন ও নারীবাদি আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন মোনিক। এমনই উথাল পাতাল রাজনৈতিক সময়ে, ১৯৬৯ সালে, প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস “Les Guérillères”।

১৯৭০ সালের মে মাসে মোনিক অন্যান্য তাত্ত্বিকদের সঙ্গে প্রায় আনুষ্ঠানিকভাবেই ফরাসী নারীবাদি আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন। সত্তরের দশকের প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি বছর ফরাসী লেসবিয়ান ও নারীবাদি আন্দোলনের মধ্যমণি হিসাবে কাজ করেছেন উইটিগ, নিজের হাতে তৈরি করেছেন Petites Marguerites, Gouignes rouges ও Feministes revolutionnaires -এর মতো সংগঠন। এরপর একই দশকে পর পর প্রকাশিত হয়ঃ

1973 – Le Corps lesbien 

1976 – Brouillon pour un dictionnaire des amantes  (Sande Zeig এর সঙ্গে).  

১৯৭৬ সালে উইটিগ ও জাইগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর প্রায় ১০ বছর মোনিক মূলত তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে লেখালেখি করেন, যার ফল লেসবিয়ান নারীবাদ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধের বই- The Straight Mind এবং Les Tchiches et les Tchouches। এছাড়াও ফরাসী ও মার্কিন নারীবাদি পত্রিকা Questions féministes, ও Feminist Issues এর সম্পাদনা করেছেন একাধিক বছর। মোনিকের যাবতীয় কাজের লিস্ট এই লিংকে দেখা যেতে পারে। 

যেহেতু বর্তমান কাজটিতে Les Guérillères উপন্যাস থেকে অংশবিশেষ অনুবাদ করা হয়েছে, তাই এই নির্দিষ্ট কাব্য উপন্যাস সম্পর্কে কিছু কথা এখানে বলা আবশ্যক। ফরাসী তথা আন্তর্জাতিক নারীবাদি সাহিত্যের ইতিহাসে এই নির্দিষ্ট উপন্যাসটি যে একটি মাইল ফলক সে কথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। Les Guérillères প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পর ১০ই অক্টোবর ১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস কাগজে Sally Beauman একটি পাঠ পত্রিকা লেখেন, যেখানে বলা হয়ঃ

 “… With “Les Guérillères,” Monique Wittig achieves another revolution in our understanding this time, of women rather than of childhood. What she has almost miraculously achieved, at one throw, is the first novel (or hymn, for this book is close to epic poetry) of Women’s Liberation. … Her women are les guérillères, a strange, fierce warrior tribe. They live in fortified camps; they fight with knives, rifles, machine guns, rocket launchers. They worship the sun‐goddess, the circle, the vulva. … In short, we are pretty much in the (traditionally masculine) world of the Epic, the world of “The Iliad,” “The Odyssey” and “The Aeneid.””

এই জাদু বাস্তবতা ও বাস্তবিক লিঙ্গ রাজনীতির মিলন এই বইয়ের নিজস্বতা। বইটি জুড়ে একটি কাল্পনিক নারী সমাজের ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনী, এবং রাজনৈতিক লড়াই গদ্য-কবিতার আকারে অনুচ্ছেদ হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসে পুরুষদের পরিচয় এবং তাদের সঙ্গে নায়িকাদের লড়াই ও যুদ্ধপরবর্তী বন্ধুত্বের কথা এসেছে একেবারে শেষের দিকে।

উপন্যাসের কাঠামোটিও অত্যন্ত আকর্ষনীয়। কয়েকটি পৃষ্ঠার পর একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় ক্যাপিটাল হরফে লেখা হয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নায়িকার নাম।  অনুবাদের শুরুতে এই ভাঙনকে অনুসরণ করে আমরা বইটিকে অধ্যায় হিসাবে ভাগ করে দেখবো। তাই বেশ কিছু অধ্যায়ের থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিচ্ছেদকে সম্পূর্ণ অথবা অংশ হিসাবে অনুবাদ করার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে বইটি সম্পর্কে পাঠকের অল্প হলেও আগ্রহ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখার কন্টিনিউটি নষ্ট না হয়।  
আমরা দেখতে পাই বইটির একটি প্রধান বিষয়বস্তু “O” অথবা শূন্য বা ভালভাল রিং, যা থেকেই এই কাল্পনিক মিথলজিক নারী রাষ্ট্রের সুত্রপাত বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে- অবশ্য তা এক-এক মানুষের কল্পনায় অন্যভাবেও ধরা দিতে পারে।

এছাড়াও চোখে পড়ে “ফেমিনারিজ” নামক এক ধরণের বই, যার সঙ্গে পাঠক পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানান ধর্ম গ্রন্থের মিল পেলেও পেতে পারেন। মজার ব্যাপার হল বইটিতে লেখিকা ফেমিনারিজের গঠন যেনভাবে উল্লেখ করেছেন, মূল উপন্যাসের গঠনটিও অনেকটা তারই মত। বইটির শেষ পরিচ্ছেদে দেখা যায় বর্তমান সময়ে কিছু নারী যুদ্ধ ও যুদ্ধে প্রাণ হারানো  মিথিকাল নারীদের স্মরণ করছে।

আরেকটি গুরুত্বিপূর্ণ তথ্য- মোনিক সর্বত্র-  Elles- ব্যাবহার করেছেন  Elle নয়। ইংরেজি অনুবাদটির ক্ষেত্রে “”The women” ব্যবহার সে কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে বেশ খানিকটা বিতর্কের সুচনা করেছিল। আমরা এই ক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গাতেই খুব দরকার না পড়লে নারী বা মহিলা কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার না করার চেষ্টা করেছি।
সবশেষে বলা যেতে পারে, Les Guérillères একটি জেনেসিসের কাহিনী, সমাজ ও সভ্যতার মৌলিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নারী-ঐক্যের পুনঃকল্পনা, একটি বিভাজন ও যাতনামুক্ত সমাজের স্বপ্ন- যেখানে মোনিক বলেনঃ
“…ওরা বলে যে এই সমস্ত গঠন এক সেকেলে ভাষাকে চিহ্নিত করে। ওরা বলে সমস্ত কিছুকেই আবার শুরু হতে হবে। ওরা বলে যে এক প্রচন্ড বাতাস পৃথিবী জুড়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ওরা বলে যে সূর্যের অভ্যুত্থান আসন্ন।”

 

কবিতা

অধ্যায় ১ – পরিচ্ছেদ ১

বৃষ্টি হলে ওরা সামারহাউজে বাসা বাঁধে। ছাদের টালির উপর জলের স্পন্দন আর ঢাল বেয়ে নেমে আসা প্লাবনের শব্দ শোনে ওরা। সামারহাউজ ঘিরে রাখে বৃষ্টির আঁচল, বাড়ির কোণগুলো দিয়ে বেশি জোরে জল ঝরে, ঠিক যেমন লাফিয়ে পড়া স্প্রিং যেখানে মাটি ছোঁয় সেখানকার নুড়ি সরিয়ে কিছুটা জায়গা ফাঁকা করে দেয় তেমন। শেষমেশ একজন বলে শব্দটা পেচ্ছাপ করার মতো, যে ও আর অপেক্ষা করতে পারে না, আর উবু হয়ে বসে পড়ে। এরপর ল্যাবিয়া থেকে পেচ্ছাপের নিষ্কাশন দেখবে বলে কয়েকজন ওর চারধারে একটা বৃত্ত তৈরি করে।

অধ্যায় ২ – পরিচ্ছেদ ১

কোথাও একটা সাইরেন বাজচ্ছে। ওর সবুজ শরীর আঁশে আবৃত। ওর মুখ অনাবৃত। হাত দুটোর নীচের অংশগুলোর গোলাপী রঙ। মাঝেমধ্যে ও গান শুরু করে। ওরা বলে ওর গানে শোনার মত কিছু নেই তবে একটা অবিচ্ছিন্ন O। সে কারণেই, এই গানের আবির্ভাব তাঁর থেকেই, অন্য সমস্ত কিছু্র মত যা Oকে, শূন্যকে অথবা বৃত্তকে, ভালভার কঙ্কনকে স্মরণ করায়। 

অধ্যায় ২ – পরিচ্ছেদ ৩

ওদের ছোট ছোট বই হাতে দেখা যায় যাকে ওরা বলে ফেমিনারিজ। ওগুলো হয় মূলটির একাধিক অনুকরণ অথবা নানানরকম আছে। তেমনই একটায় একজন এমন লিপি লিখেছে যা ওরা একে অপরের কানে বিড়বিড় করে আর যা ওদের অট্টহাস্যে প্ররোচিত করে। পাতাভর্তি অবস্থা হলে ফেমিনারি একাধিক খালি পৃষ্ঠা উপহার দেয় যাতে ওরা কখনও সখনও লেখালেখি করে। মূলত, বিভিন্ন সংখ্যার বড় হাতের অক্ষরে ছাপা শব্দে ঠাসা পাতা দিয়ে ওটা তৈরি। মাত্র একটাও থাকতে পারে বা পাতাগুলো তা দিয়ে ভরাট হতে পারে। সাধারণত ওগুলো পৃষ্ঠার মাঝামাঝি বিচ্ছিন্ন থাকে, ভালো ব্যবধানে সাদা পটভূমিতে কালো অথবা কালোর প্রেক্ষাপটে সাদা।

অধ্যায় ৩ – পরিচ্ছেদ ৩ (অংশ)

ওরা বলে যে যাতে আয়নার মত সূর্য তাঁর মধ্যে প্রতিফলিত হতে পারে তাই ওরা ওদের যৌনাঙ্গ উন্মুক্ত রাখে। ওরা বলে যে ওরা তাঁর প্রভা বজায় রাখে। ওরা বলে যে গুপ্তলোম একটা মাকড়সার জালের মত যা সূর্যালোক গ্রহণ করে। ওদের লম্বা লম্বা পদক্ষেপে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়। …

অধ্যায় ৪ – পরিচ্ছেদ ৫

ওরা বলে যে দেবী এরিস্টিকোসের একটা পিনের মতো মাথা আর হলুদ চোখ আছে। ওরা বলে যে দেবী এরিস্টিকোস আতর ভালবাসেন। ওঁর সম্মানে এরপর ওরা সুগন্ধী গাছড়া দিয়ে তৈরি গাত্র পোশাক পরিধান করে। রাত্রি এলে প্রত্যেকটা পাতায় শিখা ছুঁইয়ে ওরা ওগুলোয় আগুন ধরায়। ওরা বৃত্তাকারে দলবদ্ধ, ওদের পোশাক অন্ধকারে দ্যুতিময়। ওদের শরীর থেকে হাত দুটো দুই দিকে প্রসারিত করে, ওরা নিশ্চল হয়ে দাঁড়ায়। জ্বলন্ত গাছড়া চড়চড় আওয়াজ করে আর একরকমের গন্ধ ছড়ায়। ধোঁয়ার মেঘ বিচ্ছুরিত হয়। তাপ চামড়া অবধি পৌঁছলে ওরা নির্মমভাবে টিউনিকগুলো ছিঁড়ে ফেলে ও ঢিবির মত জড়ো করে। সে কারণেই ওদের ক্রমাগত নতুন নির্মান চালিয়ে যেতে হবে।

অধ্যায় ১১ – পরিচ্ছেদ ২

ওরা বলে যে ফেমিনারিজ ছাড়াও ওরা সেই সময়ের কথা মনে করতে পারে যখন, সাধারণত ওদের যেমন হয়, ওরা যুদ্ধ করেছিল। ওরা বলে যে ওদের যা করতে হবে তা হল গাছগাছড়া বা জন্তুজানোয়ার নিয়ে তৈরি কথামালার প্রচলিত তথ্যসূত্র ছাড়াই নিজেদের বর্ণনা করার শর্তাবলী আবিষ্কার করতে হবে। ওরা বলে এটা ভণ্ডামি ছাড়াই করা যায়। ওরা বলে যে ওদের যে জিনিসের উপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে তা হল ওদের শক্তি আর ওদের সাহস।

অধ্যায় ১২ – পরিচ্ছেদ ৩

ওরা বলে যে ওরা নিজেদের শরীরকে তাঁর সম্পূর্ণতায় উপলব্ধি করতে পারে। ওরা বলে যে দেহের কোনো অংশ নীচু যে তা আগে অবৈধ সামগ্রী ছিল ওরা তাঁর পক্ষপাতী নয়। ওরা বলে যে ওরা নিজস্ব আদর্শের কয়েদি হতে চায় না। ওরা বলে যে পূর্ব সময়ে তাদের শক্তি প্রদর্শন করার জন্য প্রয়োজনীয় সঙ্কেত ওরা সংগ্রহ বা তৈরি করেনি। উদাহরণস্বরূপ ওরা ভালভাদের সূর্য চাঁদ তারার সঙ্গে তুলনা করে না। ভালভাদের দীপ্ত রাতের মাঝে কালো সূর্যের মত বলে না ওরা।

অধ্যায় ১৪ – পরিচ্ছেদ ৫ (অংশ)

…ওরা বলে যে এই সমস্ত গঠন এক সেকেলে ভাষাকে চিহ্নিত করে। ওরা বলে সমস্ত কিছুকেই আবার শুরু হতেই হবে। ওরা বলে যে এক প্রচন্ড বাতাস পৃথিবী জুড়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ওরা বলে যে সূর্যের অভ্যুত্থান আসন্ন।

অধ্যায় ১৭ – পরিচ্ছেদ ৩ 

যারা বিরোধী সৈন্যবাহিনীর কাছে প্রতিনিধি হিসাবে গেছে কোনো একজন তাদের কথা বলে। এরা যুবতী যারা সিদ্ধান্তমূলকভাবে আলোচনায় বসে। যারা শান্তির পক্ষে দাঁড়ায় তারা সাদা পোশাক পরে। মুহুর্তের বিশ্রাম ছাড়াই ওরা ওদের বরাদ্দ গন্তব্যের পথে যায়। যাত্রার ধুলোয় ওদের জিভের লালা থকথকে। সেনাবাহিনীরা অদৃশ্য। এক পথের সিদ্ধান্ত হলে অভিযান কতদিন নেবে তাঁর উপর কোনো মনোযোগ দেওয়া হয় না। ওরা মার্চ করে। সূর্য দৃশ্যমান হলে ওরা তার উপর নিজের দৃষ্টি স্থির রাখে। অথবা ওরা চাঁদ বা তারাদের দিকে তাকায়। ওরা জানে না কবে ওরা ওদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশ্রাম দিতে পারবে আর চোখ বন্ধ করে আলোর থেকে আত্মরক্ষা করে, পারবে ঘুমোতে।

অধ্যায় ১৯ – পরিচ্ছেদ ৩ 

ওরা বলে যে ওরা নিজেদের নিজস্ব শক্তির উপর নির্ভর করতে শিখে গেছে। ওরা বলে যে ওরা নিজেদের ঐক্য-শক্তির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। ওরা বলে, যারা এক নতুন ভাষা আবহবান করে প্রথমে হিংস্রতা শিখুক। ওরা বলে, যারা দুনিয়া পালটাতে চায় প্রথমে সমস্ত রাইফেল কেড়ে নিক। ওরা বলে যে ওরা শূন্য থেকে শুরু করছে। ওরা বলে যে এক নতুন পৃথিবীর প্রারম্ভ হচ্ছে।

অধ্যায় ২১ – পরিচ্ছেদ ৪

ওরা বলে যে ওরা বিশৃঙ্খলাকে তাঁর সমস্ত আকারে ধারণ করে। ধন্দ, ঝামেলা, হিংসা, বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা, মন-খারাপ, ব্যাঘাত, অসঙ্গতি, অনিয়ম, ভিন্নতা, জটিলতা, মতভেদ, বিরোধ, সংঘর্ষ, তর্কযুদ্ধ, আলোচনা, বিবাদ, ঝগড়া, বিসংবাদ, দ্বন্দ্ব, হল্লাবাজি, বিপর্যয়, প্রলয়, ব্যাঘাত,  কলহ, আন্দোলন, হাঙ্গামা, উদ্দীপনা, নৈরাজ্য, অরাজকতা।

অধ্যায় ২২ – পরিচ্ছেদ ২

ওরা বলে যে ওরা খরগোশ, বাছুর বা মুরগী খেতে পারে না, ওরা বলে যে ওরা পশু খেতে পারে না, তবে পুরুষ, হ্যাঁ, ওরা পারে। গর্বে মাথাটা পিছনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পুরুষ ওদের বলে, দরিদ্র হতভাগা নারী, তুমি যদি পুরুষের মতো খাও তবে মাঠেময়দানে কে খাটতে যাবে, কে উৎপাদন করবে খাবার ভোগ্যপণ্য, উড়োজাহাজ বানাবে কে, তাদের ওড়াবে কে, কে সরবরাহ করবে শুক্রাণু, বইগুলো লিখবে কে, প্রকৃতপক্ষে শাসন করবে কে? এরপর ওরা সম্পূর্ণভাবে দাঁত বের করে, মেয়েরা হাসে।

অধ্যায় ২৩ – পরিচ্ছেদ ১

ওরা ওদের পোষ্য ঘোড়ায় ক্রমাগত টগবগ করে চলেছে। শত্রু সেনার সঙ্গে সমরে শৃঙ্খলহীন হয়েই এগোয় ওরা। ওদের মুখে আর পায়ে উজ্জ্বল রঙ মেখেছে ওরা। ওদের উচ্চারিত চিৎকার এতই তীব্র যে বহু প্রতিপক্ষ কান চেপে সোজাসুজি ওদের দিকে ছুটতে ছুটতে, অস্ত্র ফেলে দেয়। যে কেদার থেকে গিরিপথ শাসন করা যায় ওরা তার উপর দাঁড়িয়ে। এই কৌশলগত অবস্থান থেকে যা ওদের জন্য সম্পূর্ণ সুবিধাজনক ওরা ধনুকে টান দেয় আর হাজারে হাজারে তীর ছোড়ে। এরপর সৈন্য তাদের ক্রম ভঙ্গ করে।

অধ্যায় ২৩ – পরিচ্ছেদ ২ (অংশ)

পুরুষরা মহা বিভ্রান্তিতে ছুটোছুটি শুরু করে, কেউ গিরিপথ থেকে বাইরের দিকে যায়, অন্যরা ওদের প্রত্যনুসরণ করে। পালাতে গিয়ে ওদের একে অপরের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি আর সংঘর্ষ বাঁধে, মৃত ও আহতদের শরীরের উপর ওরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। …

অধ্যায় ২৩ – পরিচ্ছেদ ৪ (অংশ)

ছোট্টো মেয়েরা ওদের রাইফেল নামিয়ে রেখেছে। ওরা সমুদ্রের দিকে যায় আর তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওদের গ্রীবা থেকে নিম্নগামী, বাহুমূলের তলায়, ওদের পিঠ বরাবর ঘাম। অথবা, রোদে হাত পা ছড়িয়ে, ওরা তারস্বরে কথা বলে। কেউ কেউ, স্থির না থাকতে পেরে, বালিতে লাফালাফি করে আর একে অপরের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করে। … ওরা করতালি দেয়।

অধ্যায় ২৬ – পরিচ্ছেদ ৪ 

ওরা বলে যে ওরা এতোই চূড়ান্ত ক্ষোভের সঙ্গে গান গায় যে ওদের সম্মুখে বয়ে নিয়ে যাওয়া আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য। ওরা বলে নির্যাতন ঘৃণার জন্ম দেয়। সব দিক থেকে ওদের ঘৃণা ঘৃণা বলে চিৎকার করতে শোনা যায়।

অধ্যায় ২৮ – পরিচ্ছেদ ৪ 

মৃতদের কবর দিয়ে যুবকরা ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। লাশগুলো একে একে পাশাপাশি সাজানো, কপালে একটা করে কালো কালির বৃত্ত ধারণ করছে। ওদের অনমনীয় হাতগুলো ওদের শরীরের সঙ্গে আবদ্ধ, ওদের পা দুটো বাঁধা। সমস্ত দেহগুলো মমিকৃত করা হয়েছে আর দীর্ঘকালীন সংরক্ষণের জন্য যত্ন নেওয়া হয়েছে। কবরগুলো মাটি দিয়ে ভর্তি নয়। যে কোনো সময়ে যাতে তুলে আনা যায় তেমন ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে পাথরের ফলক দিয়ে বদ্ধ করা হয়েছে। ওরা কবরগুলোর পাশে দাঁড়ায়, ওদের মতই শান্তির পোশাক গায়ে যা গোড়া্লির কাছে ফ্লেয়ার দেওয়া কালো ট্রাউজার এবং বুক জাপটানো সাদা টিউনিক দিয়ে তৈরি, যে পুরুষরা ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তাদের পাশে নিয়ে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওরা ওদের পদ্ধতি বন্ধ করে এবং যুবকদের দিকে তাকিয়ে তাদের হাত ধরে। এরপর একে অপরের হাত ধরে, উন্মুক্ত কবরগুলোর দিকে সোজাসুজি সামনের দিকে তাকিয়ে, ওরা এভাবে নিঃশব্দে অবস্থান করে। 

অধ্যায় ৩১ – পরিচ্ছেদ ১ (অংশ)

…ওরা বলে যে ওদের ধারণায় সমস্ত কিছু আবার মূল উৎস থেকে শুরু করতে হবে। …

অধ্যায় ৩১ – পরিচ্ছেদ ৬ 

ওরা যুবকদের সঙ্গে দেখা করতে যায়, ওদের গোষ্ঠীরা লম্বা শৃঙ্খল তৈরি করে মেলামেশা করে। ওরা ওদের হাত ধরে আর ওদের প্রশ্ন করে। ওরা ওদের পাহাড়ের উপর সরিয়ে নিয়ে যায়। ওদের সঙ্গে ওরা উঁচু সোপানের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে। সোপানের উপর ওরা ওদের নিজের পাশে বসায়। দগ্ধ দুপুরগুলোয় পুরুষরা ওদের গান শেখে। প্রথমবার ওরা ওদের কর্ষিত ফলের স্বাদ নেয়।

অধ্যায় ৩১ – পরিচ্ছেদ ৯ 

যুবকরা ওদের দূর থেকে ইশারা করে। ওদের অভিন্ন নীল পোশাক। ওদের মুখগুলো মোলায়েম ও গোলচে। সান্নিধ্যে এলে ওদের মধ্যে কয়েকজন যুবকদের সম্মানে ওদের সঙ্গে একটা গান জুড়ে দেয়।

অধ্যায় ৩৩ (অংশ)

… যুদ্ধ শেষ, যুদ্ধ শেষ, বলে ওঠে আমার পাশে দাঁড়ানো এক কর্মঠ নারী। ওর মুখ চকচক করে। যখন সব থামে আর আমরা এক প্রকার লজ্জিত নৈঃশব্দে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকি, হলের শেষপ্রান্তে থাকা এক নারী চেঁচিয়ে ওঠে, কমরেডরা, আসুন মুক্তির জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের আমরা স্মরণ করি। আর তারপর আমরা সকলে ফিউনারেল মার্চ গেয়ে উঠি, এক ধীর, বিষাদময়, এবং তবুও সফলকাম বাতাস।

সমাপ্ত

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

প্রতাপ দাস

উ ই ন্ডো  সি ট

প্র তা প   দা স

pratap2

বাথরুম ও খাজুরাহোর গল্প

বাথরুমের মতো ছাপাখানার নজির খুবই কম দেখা যায়। স্কুলের বাথরুমের দেয়ালে বীজগণিতের ফর্মুলা, ত্রিকোণমিতির মান ও ইতিহাসের সাল-তারিখ-যুদ্ধ-সন্ধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখা না থাকলে বহু পড়ুয়াই ফেল করে যেতো। গোটা গোটা হরফে লেখা ছিল বলেই নতুন ক্লাসে উঠতে পেরেছে। ফের নতুন বইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা হয়েছে। সেইসব গল্প বুকে হাত রেখে অনেকেই স্বীকার করে নেবে।

তারপর বাথরুমের দেয়ালে ক্লাসের সবচেয়ে জাঁদরেল-বদরাগী-বদমেজাজী স্যারের কিম্ভূতকিমাকার ছবিও আঁকা হয়েছিল। এই কাজের জন্যে আঁকিয়ে হয়তো বড়ো হয়ে মনে মনে স্যারের কাছে অসংখ্যবার ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। আর স্যার তো অনেক আগেই নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন জীবনবিজ্ঞানের ক্লাসে নতুন নতুন বিষয় রেচনতন্ত্র-জননতন্ত্র-প্রজনন-বংশবৃদ্ধি, তাতে কৌতূহল ও উৎসাহ তো বাড়বেই। সেই কারণেই বাথরুমের দেয়ালে খোলামেলা মেয়েলি অবয়ব কিম্বা সঙ্গমের প্রতিকৃতি থুড়ি খাজুরাহো চিত্রকলা ফুটে উঠেছে। যা দেখলে বিশিষ্ট আঁকিয়ে শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যিও চমকে যেতেন।

এখানেই কিন্তু শেষ নয়। এই বাথরুম রোমান্সেরও লিপিঘর বটে। দেয়ালে গায়ে বড়ো বড়ো হরফে লেখা A + P, যা থেকে বোঝা যায়- কোনও অর্পিতা কিম্বা অপরাজিতার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, কোনও পিন্টু অথবা পরাগ। এ বড়ো সাংঘাতিক বিষয়। টিকে গেলে ভালো, অথচ শতকরা নব্বইভাগ প্রেমের আর্শিই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সেই কাচের টুকরো ফুঁটে গিয়ে দিনকয়েক বিজনে কান্নাকাটি, খাবারে অনীহা ও বিরহের গানে রুচি বেড়ে যায়। এইরকম ছেলেমানুষির গল্প মনের সংগ্রহশালায় বেশিরভাগ জনেরই আছে। তাই না? অন্যদিকে বাথরুমের দেয়ালে অক্ষর-মুদ্রণের ক্ষেত্রে দারুণ মুশকিল আছে। বিচ্ছেদের পরে ‘P’ ঘষেমেজে তো সহজেই ‘B’ বানিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ‘A’ তো অপরিবর্তিত। কেটেকুটে অন্য আকার দেয়া যায় না। তখন ‘A’-কে রগড়ে মুছে ফেলে দফারফা করতেই হয়। আর কোনও উপায় থাকে না।

এই ব্যাপারটা ঠিক যতটা সহজে বলে ফেললাম, আসলে ততটাও সহজ নয়। আসলে কেঁচো খুঁড়তে গেলে কেউটে বেরিয়ে আসবে। তাই চেপে যাওয়াই ভালো। মোদ্দাকথা বাথরুম ভালবাসার আনন্দ যেমন বুক পেতে নেয়, তেমন ভালবাসার যন্ত্রণার সাক্ষী হয়েও থেকে যায়। আচ্ছা, বাথরুমের দেয়ালে নতুন ধবধবে সাদা পেন্ট করালেও এমন ডানপিটে ও মিঠেকড়া অনুভূতিগুলো কি সত্যিই মুছে ফেলা যায়?

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েথের কবিতা

অ নু বা দ  ক বি তা

অ নি ন্দ্য সু ন্দ র   পা ল

anindya2

জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েথের কবিতা

প্রমিথিউস (Prometheus)


আপনার প্রশস্ত স্বর্গ ঢেকে দিন, জিউস,
ঘন কুয়াশার বাষ্পে!
এবং বজ্রপাত আনুন, ওক আর পর্বতের
উচ্চ শিখরে; ওই ছেলেটির মতো
যেভাবে কেটেছিল থিসলের মস্তক,
তবুও, আপনাকে চলে যেতে হবে
আমার পৃথিবীকে একাকী করে,
যদিও আমার গৃহ, যা আপনার নির্মাণ নয়;
এবং, আমার উনুনও, যার গৃহময় দয়াময় দীপ্তি
কেননা তা আপনার দ্বারাও ঈর্ষান্বিত হয় ।


 

আমি জানি কোনোকিছুই এত তুচ্ছ নয়
এই সূর্যের নীচে আপনার চেয়ে, প্রভু।
আপনার মহিমা নিবারণ বড়ই বেদনাদায়ক,
বৈতানিক, এবং ব্রতনিষ্ঠ প্রার্থণাপ্রবণ।
আপনিও ক্ষুধায় মারা যেতেই পারেন
যদিও ভিক্ষুক এবং শিশু কেউই
বোকাদের প্রতি আশাবাদী নয়।

 


যখন আমি ছোট ছিলাম তখন,
জানা ছিল না ‘বাহির’ থেকে ‘অন্তর’,
আমার বিভ্রান্ত দৃষ্টি ঘুরে বেড়াত সূর্যের কাছে,
যেন তারই ঠিক উপরে ছিল একটা কান
শোনার জন্য আমার সমস্ত অভিযোগ,
এমনকি হৃদয়ও ছিল ঠিক আমার মতোই
যাঁরা কষ্টপীড়িত তাদের করুণা করবার জন্য।



কে আমাকে সাহায্য করেছিল
বিত্ত ও প্রতিপত্তিশালী অহঙ্কারের বিরুদ্ধে লড়তে?
কে আমাকে উদ্ধার করেছে মৃত্যু থেকে, দাসত্ব থেকে?
আপনি কি নিজে এইসব অর্জন করেন নি,
আমার পবিত্র ও প্রদীপ্ত হৃদয়?
এবং উজ্জ্বল, অজাতশত্রু এবং প্রগাঢ়,
ধন্যবাদ সহ প্রতারিত, ওইখানে কোনো এক
ঘুমন্তের কাছে?



আমি- আপনাকে সমীহ করি? কিসের জন্য?
আপনি কি কখনও তাঁদের প্রশমিত করেছেন ব্যাথা
যাঁরা ন্যুব্জ, ভারাক্রান্ত?
আপনি কি কখনও তাঁদের মুছিয়ে দিয়েছেন দুই চোখ
যারা দুঃস্থ,নিপীড়িত?
সেটাই কি প্রবল-সর্বশক্তিমান সময় নয়, যা
আমাকে সত্য মানুষ গড়েছে
এবং তাই নয় কি চিরন্তন ভবিতব্য,
আমার প্রভুর এবং আপনার?



আপনি কি সত্যি বিশ্বাস করেন
এই জীবন আমার ঘৃণার যোগ্য
এবং উড়ে যান মরুভূমির গভীরে,
কেননা আমার কোনো শিশুসুলভ
সকালগুলো স্বপ্ন হয়ে ফোটে নি তাই?

 


এখানে আমি বসি, মানুষ আঁকি
নিজেই নিজের কল্পনায়,
একটা জাতি যে আমার মতো হবে,
সংগ্রাম করবে, কাঁদবে,
আনন্দ করবে, নিজেরাই নিজেদের খুশি করবে,
আর সর্বোপরি আপনাকে অসম্মান করবে
ঠিক আমার মতোই।।

জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েথে (Johan Wolfgang von Goethe)

জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েথে (Johan Wolfgang von Goethe) (২৮ আগস্ট ১৭৪৯ – ২২মার্চ ১৮৩২) – একাধারে একজন জার্মান কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক, থিয়েটার পরিচালক এবং সমালোচক। নাটক, কবিতা, সাহিত্য, এবং নান্দনিক সমালোচনার পাশাপাশি উদ্ভিদবিদ্যা, শারীরস্থান এবং রঙের বিষয়েও গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। তাঁকে আধুনিক
যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জার্মান সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

‘প্রমিথিউস’ হলো জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েথের এমন একটি কবিতা, যেটিতে পৌরাণিক প্রমিথিউসের চরিত্রটি ঈশ্বরকে(জিউস হিসাবে) সম্বোধন করে দুর্বৃত্তবাদী অভিযোগ ও অবজ্ঞায়। কবিতাটি ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সালের মধ্যে রচিত এবং ১৭৮৫ সালে ফ্রেডরিখ হেনরিখ জ্যাকবির
দ্বারা একটি বেনামী ও অননুমোদিত প্রকাশনার পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে প্রথম যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়। এটি স্টর্ম আন্ড ড্রং (Strum Und Drang) আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

অনুভা নাথ

গ ল্প

অ নু ভা  না থ

tanuva2

অব্যক্ত

-একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

-স্বচ্ছন্দে করুন।

-আমায় ক্যানসেল করলেন কেন?

ফোনে মেঘমনের প্রশ্নের সূত্র ধরে দীঘলের মনে পড়ে গেল সাতমাস আগের একটি মজার ঘটনা।

সাধারণত ওয়ার্ক ফ্রম হোম করার সময় সে অচেনা নম্বর থেকে আসা কোনও ফোন রিসিভ করে না। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় একটা নম্বর থেকে বারদুয়েক ফোন আসার পরে তৃতীয় বারের বার ফোনটি দীঘল ধরেছিল।

ফোনের ওপারে সে প্রচুর ব্যস্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল। তারপরই একটি মেয়ে ফোনে বলল,

-শুনুন, আপনার সঙ্গে প্রথম আলাপেই যদি আমার গাদা গুচ্ছের ছবি আপনাকে পাঠাতে বলেন, তাহলে আমার আপত্তি রয়েছে।

তারপর একটু থেমে দীঘলকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই আবার বলে উঠল,

-নিজেরা একটু কথা না বলে কী করে একদম অপরিচিত কাউকেক ছবি দিই বলুন তো?

এবার দীঘল উত্তর দিল,

-ম্যাডাম, আপনি বোধহয় ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।

ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড ব্যস্ত কণ্ঠস্বরের কোলাজ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। তারপরই মেয়েটি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

-ওহ্! প্লিজ কিছু মনে করবেন না, রং নাম্বার।

তারপরই খুট শব্দে ফোনটা কেটে গেল।

দীঘল ট্রু কলারে দেখল, অপরিচিতার নাম মেঘমন সেন, অদ্ভুত নাম তো! দীঘল মনে মনে হাসল তারপর আবার ল্যাপটপের পর্দায় মনোনিবেশ করল।

দুদিন পরে, দীঘল যখন নিজের ম্যাট্রিমনি অ্যাকাউন্ট খুলল তখন তো সে অবাক।

সেই মেঘমন সেন তাকে ইন্টারেস্ট পাঠিয়েছে।

অর্থাৎ, মেয়েটি অন্য কোনও পাত্রকে ফোন করে নিজের ছবির কথা বলতে গিয়ে ভুল করে তাকে ফোন করেছিল।

দীঘল মেঘমনের অ্যাকাউন্টে গিয়ে ওর ছবি দেখল। বেশ মিষ্টি মেয়ে, মেঘের মতোই কোঁকড়া চুলে যেন ছেয়ে আছে বারিশের তীব্র আবেশ। চোখদুটোয় মেখে রয়েছে কোনও কিশোরী মেয়ের চপল ছন্দ। যে মেয়ের চোখদুটো এত বাঙ্ময় তার তো একটা ছবিই যথেষ্ট হওয়া উচিত, পাত্রটি কেন এই মেয়ের অন্য ছবি চাইল তা দীঘল বুঝে পেল না।

দীঘল মেয়েটির আগের করা ফোন নম্বরে হোয়াটস্ অ্যাপ করে নিজের পরিচয় দিল। তারপর বেশ কিছুক্ষণের দীর্ঘ অপেক্ষা। মেঘমনের ডিপি-টি ভারি সুন্দর, ওই চোখদুটোর মধ্যের অজানা নেশা মাতাল করতে চায়, অরণ্যের মধ্যে তিরতির করে বয়ে চলা বাতাসের মতো হাল্কা পরশে আচ্ছন্ন করে ফেলে মনের কিনার। দীঘল ছবিটির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর নিজের কাজে চলে গেল।

একটা ঝাঁকি খেয়ে দীঘল বর্তমানে ফিরে এলো। মেঘমনের ফোন, মেয়েটার সঙ্গে সেই প্রথমে রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর একবারই কথা হয়েছিল। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ সাতটা মাস। এই ক’মাসে ওর সঙ্গে দীঘলের কোনও কথা হয়নি। আজ দীঘল বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল, একটু বিয়ার খেয়েছে, ফেরার সময় মেঘেমনের মেসেজ ঢুকল মোবাইলে। তার একটু পরেই মেঘমন ওকে ফোন করল। দীঘল গাড়ি চালাতে চালাতে ফোন রিসিভ করল, তারপর বেশ কিছুক্ষণ মেঘমনের সঙ্গে ওর ফোনে কথা হল।

বাড়ি ফিরে দীঘল কিছুক্ষণ গাড়ির মধ্যেই বসে রইল। ঝিমধরা মেজাজে সন্ধের অন্ধকারে বর্তমানের ভালোলাগা ও প্রাক্তনের টানাপোড়েনে দীঘলের চোখদুটো হঠাৎই জলে ভরে উঠল। সে মনে মনে পিছিয়ে গেল পাঁচ বছর।

-না দীঘল, আমি যদিও তোমায় কয়েকদিন আগে বলেছি, তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না। কিন্তু এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি আর আমি সম্পূর্ণ একটা আলাদা জগতের মানুষ। আমরা আলাদা আলাদাভাবে ভালো, তবে একসঙ্গে আমাদের কিছুই মেলে না। ডিভোর্সের কাগজ পাঠালাম, দেখে নিও।

ওই মুহুর্তটার কথা মনে পড়লে দীঘলের বুকের মধ্যে এখনও একটা তোলপাড় ওঠে, পাঁচবছর আগের ঠিক সেই দিনের মতো। দীঘল গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর থেকে বাইরে তাকিয়ে দেখল, দূরে গাছগুলোর নীচে আসন্ন রাতের চাপ চাপ অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। ওর মনে হল, ওর জীবনটাও ঠিক ওই অন্ধকারের মতোই। বুকের মধ্যে চারিয়ে থাকে, অনুভবে ও অস্তিত্বে বারে বারে নিজেদের জানান দেয়। মেঘমনকে আজ সে বলেছে, সে নিজেই আদৌ জানে না যে সে আবার সংসার করতে পারবে কিনা, মনের এই দোলাচল দীঘলকে চেতনে অবচেতনে ক্ষতবিক্ষত করে। তবুও দীর্ঘ পাঁচবছরে সে এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারল কই?

এতকিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎই জোরে বৃষ্টি নামলো। আর ঠিক তখনই দীঘলের মোবাইলে মেঘের মেসেজ এলো।

“কিছু মনে জমে কথারা আছে

শুধু তুমি আমি জানি

সেদিনও তো ছিল এমনই শ্রাবণ

স্মৃতিদের সিম্ফনি।”

কবিতাটা পড়ে এক অদ্ভুত মন খারাপি বেদনায় আক্রান্ত হল দীঘল। মেয়েটা কী করে জানতে পারল ওর মনের কথা?

আজ বিকেলে ফোনে মেঘ বলছিল,

-আচ্ছা, না হয় বন্ধুত্বই হলো, তবুও তো দু’জনে দু’জনকে চিনতে পারব। এইটুকুই বা কম কী?

মেঘের সঙ্গে যতবার আলাপ হয়েছে সেই প্রথম দিন থেকে, প্রতি বারই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনা ঘটেছে। দীঘল গাড়ি থেকে বৃষ্টি বাঁচিয়ে বাড়ি ঢোকে। তারপর বাড়িতে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে, মেঘ আজ কেন ওকে ফোন করল?

মেয়েটার মধ্যে কী এমন আছে, যে বারবার দূরে গিয়েও ওর কথা অতর্কিতে মনে পড়ে যায়? ছিন্ন স্রোতের চোরা টানের মতো দীঘলকে আকর্ষণ করে। সেই আকর্ষণে কী আছে তা দীঘল বুঝতে পারে না, নিছকই বন্ধুত্ব?

।। ২।।

দীঘল আজ নিউটাউনে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে। গত দু’বছর ধরে সে এখানেই থাকছে। মা বাবা আর ভাই থাকেন সল্টলেকের বাড়িতে। সে ইচ্ছা করেই এখানে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছে। মনে মনে একা থাকতে থাকতে এই একলা অভ্যাসে দীঘল অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়ির চেনা মানুষদের থেকে এটুকু আড়াল তার কাঙ্ক্ষিত। নিউটাউনের ফ্ল্যাটে সে একটা ছোট খাট রেখেছে, আসবাবপত্র প্রায় নেই বললেই চলে। বড় বিছানায় শুতে বড় একা লাগে, পাশে হাত ছড়িয়ে অভ্যস্ত মানুষটাকে না পেলে বেদনা আরও বেশি করে অনুভূত হয়।

এই তো সেদিন মেঘের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল, কি সহজ মেয়েটি, কত সুন্দর করে জীবনের শক্ত কথাগুলো বলতে পারে।

দীঘল অবসরে ভাবে, মেঘ কেমন করে এমন আনন্দে থাকে? ওর কি মনখারাপ নেই? অপ্রাপ্তি নেই? ওর মতো অতীত তো মেঘেরও আছে…। মেয়েটা যেন একটা পাহাড়ি ঝর্ণা, জীবনে এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরও কি অসম্ভব জীবনীশক্তিতে ভরপুর। কোনও দোটানা নেই, কোনও পিছুটান নেই।

মেঘের ছবির দিকে তাকিয়ে দীঘল মাঝে মাঝে বেখেয়ালে ওর দীর্ঘ আঁখিপল্লব ঘেরা চোখদুটোয় হারিয়ে যায়। কী অপূর্ব মনকেমন করা মায়া আছে, মনে হয় যেন ওই দুটো চোখ পৃথিবীর নয়, স্বর্গের সৌন্দর্য জড়ানো এক অনাবিল স্বপ্ন।

নাঃ, এমন করে মেয়েটাকে নিয়ে ভাবা ঠিক হচ্ছে না।

দীঘল মেঘের ছবি থেকে চোখ সরিয়ে নেয়।

-বাবু, তোর এত জ্বর, আমরা তো কিছুই করতে পারব না। তখন কত করে বললাম আমাদের সঙ্গে চল। রাজি হলি না। এখন পুরী থেকে কীভাবে ফিরব বুঝতে পারছি না।

-মা, তোমাদের চিন্তা করতে হবে না, কাছেই হসপিটাল রয়েছে, তেমন মনে হলে ভর্তি হয়ে যাব।

-তোর নিজেকে নিয়ে এমন নিস্পৃহতা আমি যে আর নিতে পারি না রে।

শেষের কথাগুলো বলতে বলতে দীঘলের মায়ের গলা কান্নায় বুজে আসে।

দীঘল ফোন নামিয়ে দেয়। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। দীঘলের ভীষণ জ্বর আসছে।

-তোমায় ওই সব ভাবতে হবে না, আমি জানি তুমি আমার কোনও ক্ষতি করবে না। এখন লক্ষ্মী ছেলের মতো নিজের লোকেশন শেয়ার করো।

-আরে, মেঘমন এটা সাধারণ জ্বর, দু’দিন হয়ে গেছে, আরও দিন দুয়েক থেকে সেরে যাবে। তুমি কিন্তু বৃথাই ব্যস্ত হচ্ছ।

-তোমার জন্য আমি কী হবো সেটা আমাকেই ভাবতে দাও দীঘল, এখন ফোনে লোকেশন শেয়ার করো, তোমার সঙ্গে দেখা করে আমায় আবার বাড়ি ফিরতে হবে তো…

অগত্যা দীঘল নিজের লোকেশন শেয়ার করল। নিজেকে ভীষণ সংকুচিত মনে হচ্ছে ওর। এক অর্ধপরিচিতা ওর ফ্ল্যাটে আসছে। ও জ্বর গায়ে ফ্ল্যাটের চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, কী অগোছালো সবকিছু। উলোঝুলো সংসার…

সংসারই বটে! দীঘল নিজের মনেই হাসল।

একশো তিন ডিগ্রি জ্বর নিয়ে আর যা হোক ঘর গোছানো সম্ভব নয়। তাও বাড়িতে করোনা পরীক্ষার কিট আনিয়ে দেখে নিয়েছে নেগেটিভ, ডাক্তার ফোনে জানিয়েছেন জ্বরটি সম্পূর্ণ ভাইরাল, সেই মতো ওষুধও দিয়েছেন। কিন্তু জ্বর এখনও সেভাবে কমল না।

এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দীঘল ঘুমিয়ে পড়ল।

আচমকা ঘুম ভাঙল কলিং বেলের শব্দে।

মেঘমন…

দীঘল জ্বরের ঘোরে কোনও রকমে টলতে টলতে দরজা খুলল, তারপর নিজের বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। তারপর কী হয়েছে তা সে জানে না। জ্বর কমলে দেখল মেঘ ওর মাথার কাছে বসে জলপটি দিচ্ছে। ভীষণ লজ্জিত হয়ে বিছানায় উঠে বসতে গেল কিন্তু পারল না। ভীষণ মাথা যন্ত্রণা, মেঘ ওকে জোর করে শুইয়ে দিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,

-জ্বর কমেছে এখন। তোমার জন্য খাবার এনেছিলাম। একটু কিছু মুখে দিও। এখন উঠি, পরে ফোন করব।

মেঘ আজ শাড়ি পরেছে, টার্কিস ব্লু রঙের শাড়িতে ওকে দেখে যেন মনে হচ্ছে যেন একটুকরো স্বপ্ন। দীঘলের হঠাৎই মাথায় মধ্যে কী ওলটপালট হল তা সে নিজেই জানে না। আচমকাই দীঘল মেঘের মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে নিজের তপ্ত ঠোঁট ছুঁয়ে দিল ওর মাখনের মতো নরম ঠোঁটে। মুহূর্তের নীরবতা… তারপরই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মেঘ উঠে পড়ল। দীঘলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।

ক্যাবে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মেঘের চোখদুটো জলে ভরে উঠল। নিজেকে প্রশ্ন করল, দীঘলকে কেন এত ভালোবাসে সে?

দীঘল তো প্রথমেই বলেছে সে শুধু বন্ধুত্ব করতে চায়, কোনও বন্ধনে জড়াতে চায় না।

তবুও কেন বার বার দীঘলের চশমা পরা মায়াবি মুখের কাছে নতজানু হতে চায় মেঘের মন?

দীঘল ওর অতীতের আবর্তে এখনও জড়িয়ে রয়েছে, সেই গভীর অথচ আপাতশূন্য স্মৃতিকে ছেড়ে সে বেরোতে পারবে না কখনও। সবকিছুই তো মেঘ জানে। তবু কেন?

বাইরে তখন বৃষ্টিতে রাজপথ ধুয়ে যাচ্ছে, এই শহরের আনাচ কানাচ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি জীবনকে যেন এই বৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে বলে মেঘের মনে হল। মেঘ ওর ঠোঁটে হাত রাখল, সেখানে এখন আর লিপস্টিকের লেশমাত্র নেই। একটু আগে দীঘলের উষ্ণ আর্দ্র ঠোঁটের স্পর্শে তার ঠোঁট দুটো যেন এখনও আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। মেঘ মনে সিদ্ধান্ত নিল দীঘলের সঙ্গে সে আর যোগাযোগ রাখবে না।

।। ৩।।

-এতগুলো মেসেজ করলাম, ফোন করলাম। ক্ষমা চাইছি মেঘ, সেদিন কী হয়েছিল আমি জানি না। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না কী করছি। পরে নিজেকে আয়নায় দেখতে পারিনি আমি, আমি এতটা নীচ, যে মেয়ে আমাকে বিশ্বাস করে ছুটে এল তাকে আমি এমন করলাম?

গত তিনদিন ধরে দীঘল মেঘকে অনেক ফোন করেছে, মেসেজ করেছে, মেঘ কোনও উত্তর দেয়নি। ওর কিছু বলার ছিল না। দীঘলের জন্য ওর দুর্বলতা ও কিছুতেই দীঘলকে বুঝতে দিতে চায় না।

এই তিনদিনে ওর চেহারা হয়েছে যোগিনীর মতো। এই ক’দিনে এত টান? বারবার দীঘলের ছবি দেখেছে। অফিসে গিয়ে সহজ কাজের খেই হারিয়ে ফেলেছে বারবার।

শেষ পর্যন্ত সেদিন সন্ধেয় মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে ক্লান্ত মেঘমন একটা ছোট্ট কথা দীঘলকে লিখল,

-যোগাযোগ কোরো না আর, ভালো থেকো।

দীঘল মেসেজটি পেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে, তারপর সেইক্ষণেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, মেঘের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

আর ঠিক তখনই আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামে। দীঘল গাড়ির কাচ তোলে না, বৃষ্টির ছাঁটে সে ভিজতে থাকে মননে ও শরীরে। স্লেট রঙা সন্ধের নরম নিভতে থাকা আলো দীঘলের ভালো লাগতে শুরু করে। মনের মধ্যে সন্ধের অন্ধকারের মতো জমে থাকা কষ্টগুলো হঠাৎ করেই কমে যায়। বৃষ্টির জলের অবিরত ধারায় তার সমস্ত দ্বিধা ধুয়ে যেতে থাকে, দীঘলের ওই ঠোঁটদুটো, ওই চোখদুটো আবারও উদগ্রীব হয়, মেঘের স্পর্শের ডুবন্ত আবেশকে ছুঁয়ে দেখতে চায় আবারও। সে বুঝতে পারে অবচেতনে সে মেঘকে বরাবর চেয়েছে, সে নিজে বোঝেনি, কিন্তু তার শরীর সেদিন বুঝেছিল।

দীঘল নিজের বুকের লাবডুবের শব্দ শুনতে পায়, মনে পড়ে যায় মেঘের সাবধান বাণী,

-আর কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজো না।

দীঘল স্বগতোক্তি করে,

-মেঘের কাছে যেতে গেলে তো বৃষ্টিতে ভিজতেই হয়।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_dec

নীপবীথি ‌ভৌমিক

গু চ্ছ ক বি তা

নী প বী থি ‌   ভৌ মি ক

বসন্ত

বসন্ত আসলে রং বদলে যায় ঘরের। 

চুন পলেস্তারা ছেঁড়া জামা পরা দেওয়ালরা জেনে যায় মাটি আর আকাশের তফাৎ।

 

  ‌ক্ষীণ হয়ে আসে ক্রমশ 

     সন্ধ্যাদীপের ‌আলাপ

খোলা ছাদ জানে জীবন মানেই

   খইফুল আর চন্দনের গান

 

     বসন্ত আসলে

       আমাকে আমার চাইতে

চোখে হারায় না কেউ।

pujo_16_sketch2

দৃশ্য

ছায়াকে হারিয়ে হারিয়ে আবারও সেই ছায়া খুঁজে নিচ্ছি ক্রমশ

 

   মৃত সাপ উঁকি মারে আকাশের একোণ 

     ও- কোণ থেকে

   কৌণিক দূরত্ব বরাবর যে সমস্ত নীল পাখিরা

      ডানা ঝাপটিয়ে ভেঙে দিয়েছিল শিকল

        ভাঙার খেলা,

 

    দূরে, খুব দূরে

       সরে যাচ্ছে আজ 

         ধীরে ধীরে মৃত্যু আর জীবনের উপসংহার; 

 

 

আলো ক্রমশ এদিকে ফিকে হয়ে এসেছে এখন 

     

     বাতি জ্বালাই। নিভে যাক বরং

       আলো আর আগুনের তফাৎ।

pujo_16_sketch2

সেই সব জীবনবৃত্তান্ত

 

প্রতিটি ভুলের শেষে নতুন

করে ঘরবাড়ি গড়ে ওঠে আবার

 

গাছ লাগাই দরজার পাশে,

জানালা বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে মাধবীলতার জীবন!

 

ঘুম ভাঙলে স্বপ্ন দেখি আবার,

প্রাতঃভ্রমণ সারি মৃত্যু আর জীবনের সন্ধিক্ষণে।

pujo_16_sketch2

 

প্রাচীন শহর কেঁদে ওঠে আজ

নিঃশব্দের অঙ্গীকারে

 

গুমরে ওঠে ছায়া। গুমরে কাঁদে

নিজস্ব প্রলাপ…

 

বাক্যালাপের পরে যে বৃক্ষের জন্ম

হয়েছিল নিজের ভিতর,

শূন্য হয়ে গিয়েছে তার ছায়া

 

আমি হাঁটছি। হেঁটে চলেছি আরো,

আরও দীর্ঘায়িত ছায়ামানুষ হয়ে।

pic333

 

পুড়ে যায় সব। খুব পুড়ে যায়।

 

ছাই ভস্মের অহংকার আজ

নিভে যায় আজ জল- যমুনার স্রোতে

 

তেজ চিনতে চিনতে নিজেকেই

যে মিথ্যা বলে চিনতে শিখল আজ !

 

আগুন, মৃত্যু আসার আগে

সুখ চিনে নিও তুমি, যমুনা আর বাঁশির কাছে।

pujo_16_sketch2

আরও পড়ুন...