Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 7th Issue

রবিবার, ২৪শে পৌষ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 9th January 2022

স্ম র ণ ।  পি না কী  ঠা কু র

সু দী প   চ ক্র ব র্তী

sudipchakrabarty2

রক্তে ভেজা প্রুফ

বাংলা কবিতার আবহমান ধারায় পিনাকী ঠাকুর একটি অনন‍্য নাম।তাঁর সমস্ত প্রাণ শক্তি দিয়ে সারাটা জীবন দিয়ে তিনি শুধু কবিতার কথাই ভেবেছেন।আঠাশটি কাব‍্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন আমাদের। একদিন,অশরীরী,আমরা রইলাম,অঙ্কে যত শূন্য পেলে,হ‍্যাঁ রে,শাশ্বত,রূপ লাগি আঁখি ঝুরে,বিপজ্জনক,সাত মিনিট ঝড়,জীবন বেঁধেছি হাত বোমায়,কালো রঙের আগুন,বসন্ত মস্তান,মৌসম,শরীর কাচের টুকরো,চুম্বনের ক্ষত,নিষিদ্ধ এক গানের মতো থেকে সর্বশেষ কাব‍্যগ্রন্থ ন‍্যুড স্টাডি পর্যন্ত বাংলা কবিতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন কবি।এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ওঁকে নিয়ে আলোচনা অসম্ভব।আমি কেবলমাত্র একটি কাব‍্যগ্রন্থ নিয়ে আমার অনুভূতি জানাব এই লেখায়।

সময়টা জানুয়ারি ২০০৭,কলকাতা বইমেলায় আনন্দ পাবলিশার্স থেকে একটি কাব‍্যগ্রন্থ প্রকাশিত হল,এরকম নয় যে এর আগে এই কবির আর কোনও কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি।এই সেই ২০০৭ সাল যখন পারিবারিক ও মানসিক এক বিপর্যয়ের মধ‍্যে দিয়ে যাচ্ছি আমি।কিছুদিন আগে বাবা মারা গেছেন,একবার ড্রপ দিয়ে কোনও মতে পাশ করেছি এম এ,যা রেজাল্ট বাজারে করে খাওয়া অসম্ভব।ব‍্যান্ড ভেঙে গেছে প্রেম ও তাই।

একবার পাড়ার পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিলাম,সেদিনের সেই অনুভূতি চারপাশে প্রবল অন্ধকার নিয়ে ক্রমশ আরও নীচের দিকে এইবার দম বন্ধ হয়ে যাবে!তখন দরকার একটা বন্ধুর হাত আর সজোরে একটা টান।এখন আরও বছর দশেক পৃথিবীতে কাটাবার পর বুঝছি প্রেম-পয়সা না থাকার থেকেও আরও মর্মান্তিক হল দর্শন না থাকা যুক্তি না থাকা।আসলে দরকার একটা হাত,বাইরের কারও নয়,তোমার নিজের মধ‍্যেই সে আছে যে তোমাকে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার মধ‍্যে মধ‍্যে হঠাৎই যুক্তির সুর শোনাবে।এটা সেই ২০০৭সাল।এবছরই ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে গুলি চলবে।তার আগেই জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হচ্ছে ‘বিপজ্জনক’।এই ২০০৭ সালেই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় পিনাকী ঠাকুরের শ্রেষ্ঠ কবিতা,যে বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেন-“পিনাকী ঠাকুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য,অতি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।বেকার জীবন,রেল স্টেশন,সিনেমা হলের সামনে সাইকেল রিক্সা,মফঃস্বলী ট্রেনের যাত্রী-এইসব কিছুই এসে পড়তে পারে তার কবিতায়।কখনও এসে যায় চকিত সংলাপ।কৌতুকের সঙ্গে কাব‍্যময়তার কঠিন সংমিশ্রণ একালে একমাত্র পিনাকী ঠাকুরের পক্ষেই সম্ভব।আপাতসহজ ও লঘু চালের পঙক্তিগুলির মধ‍্যে মিশে থাকে গভীর জীবনবোধ।

পিনাকীর কাব‍্যগ্রন্থগুলি পরপর যেন উত্তরণের ছবি এনে দেয়।সময়কে বিধৃত করে ছোট ছোট পংক্তিতে।একালের এক যুবা হৃদয়ের অনেক হাহাকার ও আশা-আকাঙ্ক্ষা এক নতুন কাব‍্যভাষা পেয়েছে তাঁর রচনায়।তাঁর বেশকিছু কবিতা একবার পাঠ করলেই স্মৃতিতে গেঁথে যায় পাঠকের।”-পিনাকী ঠাকুরের কবিতাগুলির পাশে যতবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কাব‍্য বিশ্লেষণকে রাখি,স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মুখ থেকে উচ্চারণ হয়-বাঃ।আমি শুধু বলতে পারি,অন্ধকারে নিমজ্জিত সেই ২০০৭সালে একটা বলবার মতো ভাষা খুঁজে পেলাম ‘বিপজ্জনক’-এর মধ‍্যে।বহু অপমান ও যন্ত্রণার যখন কোনও প্রতি উত্তর দেওয়া যায় না তখন গলার কাছে যেভাবে দলা পাকিয়ে ওঠে কষ্ঠ সেই এক-একটা কষ্টকে ভাষায় রূপ দিলেন পিনাকী ঠাকুর।এই বইয়ের একচল্লিশটি কবিতার সঙ্গে আমি অনায়াসে সেদিন যোগ করতে পেরেছিলাম আজ দশ বছর পার করেও দেখছি একইভাবে স্পর্শ করতে পারছি,প্রবেশ করতে পারছি লেখাগুলির মধ‍্যে।

বাংলার প্রথম ‘বিপজ্জনক’ কবি মধুসূদন দত্ত-কে পিনাকী ঠাকুর ওঁর ‘বিপজ্জনক’ কাব‍্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন।মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে পিনাকী ঠাকুর উৎসর্গপত্রে এই শব্দবন্ধগুলি ব‍্যবহার করেছেন।যা আমাকে প্রথমত ভাবিয়েছে–বাংলার প্রথম বিপজ্জনক কবি মধুসূদন!কিন্তু কেন?মাত্র উনপঞ্চাশ বছর বেঁচেছিলেন মধুসূদন(১৮২৪-১৮৭৩)।পুরোটা জীবন জুড়ে যার কেবল অস্থির পদচারণা,সেই মধুসূদন কে কেন ‘বিপজ্জনক’ বলছেন পিনাকী ঠাকুর ভাবতে শুরু করলাম।সুকুমার সেন ওঁর ‘বাঙ্গালা সাহিত‍্যের ইতিহাস ‘গ্রন্থে বলেছেন-‘আত্মচেতনতা মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিভার গুণ ও দোষ দুইই।’আর অ‍্যালেন গিনসবার্গ লিখছেন’আই স দ‍্যা বেস্ট মাইন্ড অফ মাই জেনারেশন ডেস্ট্রয়েট বাই ম‍্যাডনেস’।তাহলে সুকুমার সেন যাকে ‘আত্মচেতনতা’ বলেছেন, গিনসবার্গ  তাকেই ‘ম‍্যাডনেস’ বলছেন। নাম যাই হোক আমরা জানি মধুসূদন সেই বিপণ্ণ অসুখে আক্রান্ত ছিলেন,তাই সমুদ্র পার হয়ে ওদেশের সাহিত্যে নিজের স্থান প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন,নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন,সবকিছু ভাঙচুর করতে চেয়েছিলেন তাই কি পিনাকী ঠাকুর মধু কবিকে ‘বিপজ্জনক’বলেছেন নাকি,যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে বাজি ধরে একের পর এক অমিত্রাক্ষরের বন‍্যা,বাংলা কবিতার এক নতুন যুগ তাই কি ‘বিপজ্জনক’মধুসূদন!সুকুমার সেন লিখছেন-‘চৌদ্দ-অক্ষরের বিরাম-যতি এবং অন্ত‍্য মিল উপেক্ষা করিয়া মধুসূদন পয়ারকে ছত্র হইতে ছত্রন্তরে গড়াইয়া যাইবার স্বাধীনতা দিয়া গদ‍্যের কিছু ক্ষমতা পদ‍্যে আনিয়া দিলেন।’ছন্দ ও ভাষা ব‍্যবহারে শুধু নয় বিষয়ের দিক থেকেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন মধুসূদন।বিশেষত গৌরদাস বসাকের সঙ্গে যে পত্র বিনিময় হত কিংবা রাবণকে গ্র‍্যান্ড ফেলো বলা বা রাম ও তার বানর বাহিনীকে আমি ঘৃণা করি এধরনের বক্তব্য থাকলে এই ২০২০-তেও কেস খাবার প্রভূত সম্ভাবনা।মধুসূদন ‘বিপজ্জনক’তো বটেই।

উৎসর্গপত্র থেকে মধুসূদনকে মাথায় নিয়ে পাতা ওলটালেই দেখতে পাই ‘বিপজ্জনক’ভাগ হয়েছে দুটি পর্বে।প্রথমটির নাম ‘ইস্তেহার’ দ্বিতীয়টি ‘নিষ্ঠুরতম ইস্পাত’।সেই অসহনীয় ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ঠিক দুই মাস বাদেই গুলি চলবে নন্দীগ্রামে,কবি কী ক্রান্তিকাল দ্রষ্টা,কবিতা কী ভবিষ্যৎকে দেখতে পায়?নাহলে ভালবাসার এই গোপন ইস্তেহার কীভাবে উঠে এল কবিতায়? ইস্তেহার এর প্রথম কবিতা ‘বসন্তের উত্তর’শীতের প্রার্থনার পরে কী উত্তর দিচ্ছে বসন্ত–প্রথম ফাল্গুন কোথাও নেই আজ/গ্রীষ্ম দাউদাউ শীতের পর!আমরা বুঝতে পারছি একটা ঋতু উধাও হয়ে গেছে।বেকারত্ব,প্রেমহীনতা আর চাকুরিরত মেশোমশাইদের অ‍্যাটাচির ধাক্কায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।কবেকার দেওয়ালে চক দিয়ে ‘রন্টু প্লাস তৃণা’লেখাতে লেগেছে ধূসর রঙ।আর এই দশ বছর পর এসেও জীবন দিয়ে বুঝতে পারছি-‘গুটিবসন্তের মড়ক নেই,আছে না-খেয়ে মরবার মৃত‍্যভয় যে দেশ ছেয়ে আছে কর্মহীনতায়,কোটি-কোটি বেকার ছেলে,যে দেশে নূন‍্যতম খাদ‍্যের অধিকারটুকুও নেই সে দেশে বসে লতানো লিরিক লিখবে কবিতা,তাহলে সেটা আমার লেখা হয়ে উঠবে কী করে?যতবারই পিনাকী ঠাকুর পড়ি নিজের কথা শুনতে পাই।বলতে পারি-‘গরীবের তুমি হোমিওপ্যাথি ‘।

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার