Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

3rd Year | 3rd Issue

রবিবার, ২৫শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 10th July 2022

গ ল্প

শ্রী কা ন্ত  অ ধি কা রী

srikanta

বাঁক বদল

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি কালো করগেট টিনের চালার সেই বাড়িটার সামনে। চারুদের বাড়ি। টিনের দরজায় ভেতর থেকে শেকল দেওয়া। দরজায় একটা ফুটো। অনায়াসে ফুটোতে আঙুল চালিয়ে দরজা খুলে আস্তে করে ডাকলাম— চারু…। সামান্য কয়েক পা সরু উঠোন পেরিয়ে চারুর এক খোপ ঘরের বারান্দার সামনে।

চারু কাঠের উনুনের ধারে। আগুনে মুখ লাল। এলোমেলো চুল। খোলায় চাল ফট ফট করে ফুটছে। চারু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ঠোটের কোণ ফাঁক। বললাম—চারু, আমাদের বাড়ি যাওনা কেন?

চারু নিরুত্তর। মাঝে মাঝে চ্যালাকাঠ আগুনের দিকে ঠেলে দিয়ে তুষের ছিটে দিচ্ছে। লক লক করে আগুনের শিখা নেচে উঠছে। ভাজা খোলায় গরম কালো বালিগুলোকে কুঁচি কাঠি দিয়ে নাড়তে থাকে। সেই অবসরে ওর মুড়ি ভাজার উনুনশালটা আবার অতি পরিচিতের মত আলাপ জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কালো দেয়ালগুলো আরো কালো হয়ে গেছে। থেবড়ানো মাটির দেয়ালে এখানে ওখানে খোলাঙ্কুচিগুলো আরও স্পষ্ট। টিনের চালে বহুদিনের পুরনো লম্বা ঝুলগুলো ছড়ানো চুলের মত আগুনের আঁচে তিরতির করে কাঁপছে। একদিকে গাদ হয়ে পড়ে রয়েছে ব্যবহৃত পলিথিনের ক্যারিব্যাগের বান্ডিল। আর এক কোণে স্তুপাকারে ঝুড়ি ঝুড়ি ঘুঁটে, চ্যালাকাঠ, শুকনো ডালের তাড়া। বস্তাখানেক তুষ। বাইরে বাথরুমের ভাঙা টিনের দরজাটা হাট করে খোলা। ঘরের মেঝেতে একটা থালা, তার চারদিকে ভেজা মুড়ি ছড়িয়ে। দেখলেই বোঝা যায় কেউ খেয়ে এঁটো গুটিয়ে নেয়নি।

—বোসো। চারু চাল নাড়া থামিয়ে বলল— ঐখানটায়।

কোনো ভণিতা না করেই বললাম, আমার মুড়ি চাই চারু। তোমার হাতের মুড়ি।

চারু খানিকক্ষণের জন্য চমকে উঠে বলল— অ্যাঁ!

— আমার পেটে ঐসব ছাইপাঁশ সহ্য হচ্ছে না চারু। আমার বাড়িতে তুমি মুড়ি দিয়ে এসো।

মনে হলো চারু এবার হেসে উঠল। বলল— বেশ। আজকে হবে না। এ মুড়ি অন্যদের বরাদ্দ। কাল বিকেলে।

ওকে থামিয়ে বললাম– না না, বিকেল হলে হবে না। অফিসের টিফিনে নিয়ে যাবো। তুমি সকালেই আমাকে দেবে।

চারু মাথা নেড়ে জানাল– তাহলে খুব ভোরে উঠতে হবে।

আগে লৌতুনিমাসির কাছে শুনেছি বেশি চাপ থাকলে ভোরে উঠে চাল ওলাতে হয়, তারপর মুড়ি ভাজলে বেশ ফুল ফোটার মত নরম খাস্তা মুড়ি ফোটে। খেতেও বেশ সুস্বাদু।

সেই সুস্বাদু মুড়ির প্রসঙ্গ মনে করেই বললাম– তাই করো।

জ্ঞানত জলখাবারে মুড়ি ছাড়া কিছুই খাইনি। ছোটবেলা থেকেই সকালে চা—মুড়ি। বড় স্টিলের গ্লাসে হাফগ্লাস র’চা। তাতে চারুর আনা কুড়কুড়ে মুড়ি যেন মোগলাই সরবতে মিছরির দানা। তারপর চামচ দিয়ে ঠুসে ঠুসে যতটা ঢোকানো যায় তার চেয়েও বেশি ঠোসানো মুড়ি। ততক্ষণে মুড়ি আর চায়ে মাখামাখি– আহা অপূর্ব! 

তখন এদিকটা অতটা শহুরে হয়ে যায় নি। বিকেলে গামছার কোঁচড়ে মা’র মাখানো তেলমুড়ি, হাতে আস্ত একটা পিঁয়াজ কিংবা মুলো। কিংবা কাঁচা বিলেতিবেগুন দিয়ে খাবলা খাবলা মুড়ি মুখে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গী সেই চারু। দু’দিকে লাল ফিতে বাঁধা ঝুটি নিয়ে একসময় পথ চলতে চলতে শুকনো মুড়ি চিবোনোর শব্দে পথেই হারিয়ে যাওয়া।  

সেই পথ এখন পাকা  হয়েছে। আমার জীবনে রমা এসেছে। তবু চারু ওর মা লৌতুনিমাসির অর্ধেক মাটি আর অর্ধেক ইটের ঘরে  থেকে গেল। আর আমার ঘরে মুড়ির জোগান দিয়ে গেল।

দেশি চালের মুড়ি, বিস্কুটের টিনে বাড়ি বয়ে দিয়ে যেত চারু। একদিন চারু আমার স্ত্রী রমাকে বলে, বেশ ক‘দিন আসতে পারব না গো। মা তো চলে গেল, আমি একা।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। যা! তাহলে খাবো কী? হাজার রকমের অসুখের ভয়ে আমার কলজে সেঁধিয়ে গেল। চারু কি আর আসবে না!

রমা বলল, ডোন্ট ওরি। পাড়ার মোড়ে ভজা মুড়ি ভাজার মেসিন বসিয়েছে। বস্তা নিয়ে গেলেই হলো।

মুড়ি তো এলো, মুখে রোচে না। কোনটাতে নোনতা লাগে, কোনটা আবার ফ্যানা কাটে। ইউরিয়া ভিজে জল না সোডা দেয় শুনেছি। কেউ কেউ আবার কেরোসিনের ছিটেও দেয় ভিজে চালে। বেজার মুখ দেখে রমা বলল, তোমার মুড়ি খেয়ে কাজ নেই। এই দ্যাখো আমাদের মতো দুধ—ডিম—পাঁউরুটি খাও। মুখে লাগবে, শরীরও ভালো থাকবে।

এদিকে চারুর পাত্তা নেই। শুনেছিলাম ওর বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যায় না। বরকে নিয়ে মায়ের উনুনশালে আবার মুড়ি ভাজতে শুরু করেছে। তবে যোগাযোগ ছিলই না একেবারে। ফোন নাম্বারও রাখা হয়নি। অগত্যা রমার কথামতো ডিমের সাদা অংশ দিয়ে ডিমটোস্ট খেতে শুরু করলাম। একসময়ে ডিমের সাদা অংশে হলুদ অংশ মাখামাখি হয়ে গেল।

এভাবে বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই বিকেল দিকে পেটে চাপ চাপ লাগছে মনে হলো। রমাকে বলাতে রমা বলল— ধুর! এমনিতেই তুমি বাতিকগ্রস্ত। ওরকম ছোটোখাটো ব্যাপার মাথায় এনো না। আনলাম না।                                                  

তার দু’দিন পরে অফিসের শেষবেলায় কেমন ধিকধিক করে বুকে ব্যথা শুরু হলো। অফিসের সুভাষদা সব শুনে বললেন— বদহজম থেকে অ্যাসিড। তারপর গ্যাস। মুড়ি খান বুঝলেন।

মুখ কুঁচকিয়ে বললাম—ঐ মুড়িই তো সর্বনাশ করলো।

—কিন্তু বাঙালির মুড়ি মানে চিনেদের চাউমিন, তামিল—তেলেগুর ইডলি—ধোসা। সহজাত বলে একটা কথা আছে। যে যেমন অভ্যাসে বড়ো হয় আর কি! আমরা বাঙালি, মুড়ি ছাড়া চলে? মুড়ি খান। আপনি বাঁচুন বাঙালির শিল্পকেও বাঁচান।

আর কোনো রিস্ক না নিয়ে ছুটলাম চারুর বাড়ির দিকে।

                                 

চারুর প্রতিশ্রুতি আমাকে অনেক ফুরফুরে করে তুলল।

পরদিন যথারীতি টিনভর্তি মুড়ি এলো। একটা কচি মুখের মেয়ে দু’দিকে লাল ফিতে দিয়ে মাথার মাঝে সিঁথি করে চুল বাঁধা।

রমা তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বলে, মুড়ি! কে পাঠাল?

— মা। কিশোরী সঙ্কুচিত।

বললাম, তুমি কে?

— আমি শিলা। আপনি কালকে আমাদের বাড়ি গেছিলেন।

রমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বলে, তুমি মুড়ি খাবে! তোমার না অ্যাসিডের সমস্যা? 

বললাম– টিনটা নিয়ে নাও।

— আর ঘরে আনা হেলদি ফুড!

রমার মুখ ভার। সেটা দূর করতেই বললাম, হেলদি ফুডও চলবে। মাঝে মাঝে মুখ পালটাতে মুড়ি।

কিন্তু সেটা কথার কথা। সকালে একবার, অফিসে একবার, অফিস ফেরত একবার। সাত দিন পেরল না টিন ফাঁকা।

রমা বলল, চারুকে খবর দাও।

বললাম, ফোন করে দিলেই তো হতো। আবার যাবো?

— ওর কি আদৌ ফোন আছে?

যখন থেকে বলা তখন থেকেই মনের মধ্যে সেই শান্ত নিরীহ মুখটা তোলপাড় করতে লাগল। একটা মেয়ে সারাজীবন উনুনে হাতা–কুঁচি—বালি—খোলা—খাপুড়ি—মুড়ি এই সব নিয়েই কাটিয়ে দিল। অন্যদিন হলে আটটায়—ও সকাল হতো না। আজ সূর্য ওঠার আগেই আমি বিছানা ছেড়ে দিয়েছি। ছাতে উঠে দু’একবার হাত—পা স্ট্রেচও করেছি। এমনকি প্রতিবেশী রামু সদগোল, যে কিনা দশ বছর ধরে আমার পাশেই রয়েছে। চোখে—চোখে কিংবা ঘাড় কাত করে ভাল থাকার রিহার্সাল দিয়েছি মাত্র, তাকে পর্যন্ত আমার গুমোর ভেঙে হাত নেড়ে ডেকে শুধিয়েছি – ভালো আছেন তো?

সারা সকাল এক অজানা উৎফুল্লতা সারা শরীরে ছড়িয়ে রইল।

মুড়ির বস্তাতে টিনের মুখটা উপুড় করে মুড়ি ঢালে চারু। ওর কচি লাউয়ের মতো মুখটা আমার অনেক কাছে। পলিথিনের বস্তায় মুড়ি পড়ার সরসর শব্দ। চারুর কানের কাছে আস্তে আস্তে বললাম– কেমন আছো চারু?

চারু মুখ তুলে ধরল। খানিকক্ষণ আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে রইল আমি লজ্জা পেলাম। বললাম— তোমার মেয়েটা কোথায়?

আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কোত্থেকে একটা দড়ি এনে বস্তাটা বেঁধে দিলো। তখনই দেখলাম ওর ব্লাউজটা ফাটা। খানিকটা তেলচিটেও বটে।

মুড়ির বস্তা হাতে নিয়ে বাইরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল চারু। বললাম– একটা ফোন নাও চারু।

চারু মাথা নাড়ে।

                                   

দিন পাল্টেছে। সাধারণ ঘরে আগে সকালে—বিকেলে জলখাবার বলতে শুধু মুড়িই থাকতো। চা—মুড়ি, গুড়—মুড়ি, দুধ—মুড়ি ,চপ—ঘুগনি—মুড়ি ছাড়া ভাবাই যেত না। এখন প্যাকেটবন্দি নানান খাবার। রুটি—পাঁউরুটি—বিস্কুট পাওয়া যায় পাড়ার দোকানগুলোতে। হাত বাড়ালেই ফাস্ট—ফুড। মনের মধ্যে কু ডাকে— চারু কি এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?    

দেশি মুড়ি ভাজা এমনিতেই অনেক ভজকট। শুনেছিলাম মুড়ি ভাজার হ্যাপা। একবার মুড়ি আনতে দেরি করেছিল বলে বিনা টিফিনে স্কুল গেছিলাম। রাগ হয়েছিল খুব। পরদিন যখন লৌতুনিমাসির সঙ্গে চারু মুড়ি নিয়ে এলো, দুম করে বলে ফেললাম— কী এমন করছিলে চাট্টি মুড়ি আনতে পারোনি। অমনি চারুও কোমরের দু’দিকে হাত রেখে তড়বড়িয়ে বলেছিল– তুমি জানো মুড়ি ভাজতে কত ঝামেলা! একজনকে চাল ধুয়ে নুনাতে হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে   দাঁতে কেটে দেখতে হয় খরা করে শুকিয়েছে কিনা। যদি কটাঙ না করে, তাহলে মুড়ি ভালো হবে না। তারপর আরেক জনকে বড়ো খোলাতে সব চাল উলাতে হবে। মানে বড়ো হাতা দিয়ে নেড়ে চেড়ে কষতে হবে মাংস কষার মতো। যতক্ষণ না তেঁতুলের বীজের মত রঙ না আসে। তারপর…

আমি বললাম, তারও পর?

—তারপর খাপুড়ির গরম বালিতে এক খাবল করে চাল দিলেই… উঁ, জানে না যেন! 

যাবার সময় বললাম— মুড়ি ভাজার বিজনেসটা বাড়াতে পারো। এখনো দেশি মুড়ি অনেকের পছন্দ।                                                          

আবারও কোনো উত্তর করল না। শুধু ক্লিশে হাসি হাসল।

বললাম— ব্যাঙ্ক—ট্যাঙ্ক থেকে সাহায্য নিতে পারো। বলো তো আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তো নানান প্রকল্প রয়েছে।

এবার সে কথা বলল— ভাববো। 

                                   

আমাকে নিয়ে রমার আর কোনো সমস্যা নেই। সময়ে মুড়ি ঘরে চলে আসে। সবসময় চারু না এলেও মেয়েকে দিয়ে মুড়ি ঠিক পাঠিয়ে দেয়। কখনো কখনো শিলাকে ডেকে বাড়ির ছোটোখাটো কাজ— তরকারি কাটা, পাশের মুদি দোকান থেকে নুন, সাবান কিংবা বিস্কুট এনে দিতে বলে। কখনো বা চারুকে রান্নাঘরের ভেতর ঢুকিয়ে ছ্যাঁচড়া, টক কিংবা কচি লাউয়ের পায়েস রান্নাটাও শিখে ফেলে।

সেদিন রমা বলল— পুজোতে চারুকে আর ওর মেয়েকে কাপড়জামা দিতে

হবে। একদিন দিয়ে এসো।

বললাম— আবার বাড়ি কেন? এখানেই তো ওরা আসবে, তখন না হয় দিও।

— বাড়ির কাছে পেয়ে উপহার দেওয়া ঠিক শোভা পায় না। ছুটির দিন দেখে

এক সময় দিয়ে এসো। রমা বলে, ওর বরটা আবার পালিয়েছে, জানো?   

বললাম– লটারির টিকিট বিক্রি—বাটা করত না?

—সে আর ক’দিন। উড়ে—আদিরে ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। লৌতুনিমাসি চারুর বিয়েটা ঠিকঠাক দিতে পারেনি। রমা গজগজ করে।

                                   

অনেকদিন পর আবার চারুর বাড়ি। সেই অভ্যাসবশে হাত ঢুকিয়ে বাইরের দরজা খোলা। তারপর হঠাৎ মনে হলো এভাবে দরজায় টোকা না দিয়ে দরজা না খুললেই হতো। তাই অকারণে টিনের দরজাতে লোহার শিকলের আওয়াজ করি। কিন্তু তাতেও কেউ এলো না দেখে কয়েক পা ভেতরে ঢুকতেই চমকে উঠি। চারুর উনুনশাল ভাঙা। আধপোড়া।  

মাথার ওপর চাল নেই। বাজপড়া গাছের মত খাঁকড়া চারটে পোড়া দেওয়াল নির্বাক দাঁড়িয়ে। উনুনশালের ভেতর দু’খানা ঝিকভাঙা উনুন ফাঁকা আকাশের দিকে তাকিয়ে হা—হুতাশ করছে। দেওয়ালের কোণে আধপোড়া দলা পাকানো সেই প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের গাদ। উপুড় করা ভাঙা খোলা খাপুড়ি। এক চটক দেখলেই মনে হবে এখানে একটা ঝড় বয়ে গেছে।

আঁতকে উঠি, চারুর কিছু হয়নি তো! চারু কোথায়? এদিক—ওদিক তাকিয়ে দেখি, ভেতরে মাটির মেঝেতে চারু শুয়ে। আমাকে দেখেই ওর চোখ ছলছল করে ওঠে। ইশারায় ডাকে। এক মুহূর্তে মনে হলো লৌতুনিমাসি শুয়ে। পরক্ষণেই ভুল শুধরে কাছে গিয়ে শুধোলাম– শিলা কোথায়?              

—আসছে। মুদিখানা গেছে।

হাতের প্যাকেটটা ওর পাশে নামিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করি— শরীর খারাপ বুঝি?

চারু নিস্পৃহ চোখে প্যাকেটের দিকে চাইল।

বললাম— তোমাদের জন্য দিদি পাঠিয়েছে।

শুকনো মুখে মরিয়া হাসি এনে বলে— দিদি আমাকে খুব ভালবাসে।

আমি মাথা নাড়ি। এবারে আসল কথাটা জিজ্ঞেস করি— উনুনশালটার ওরকম হাল হলো কী করে?

— দিদিকে বলো মাস দুয়েক অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে চালিয়ে নিতে। এখন মুড়ি ভাজা বন্ধ।

— কিন্তু কেন?

এর কোনো উত্তর সে দেয় না। শুধু চোখের কোণ বেয়ে কানের পাশে জল গড়িয়ে পড়ে। আমি ঠিক কী করব বুঝে উঠতে পারি না, এই মুহূর্তে আমি থাকব ওর পাশে, না উঠে চলে যাবো।   

তখনই শিলা আসে। হাতে থলে। বলে— বাবা পুড়িয়ে দিয়েছে। খোলা খাপুড়িও লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছে।

বললাম— বাবা কোথায়?    

— পালিয়েছে। শিলার নির্বিকার উত্তর।

চারু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে। শিলা পরম যত্নে একটা একটা করে মুদির দোকান থেকে আনা নুন তেল আলুর হিসেব দিচ্ছে— দু’টাকার নুন, পাঁচ টাকার আলু, আট টাকার সরষের তেল। চারুর সেদিকে আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না।

ঘরের এক কোণে কতগুলো স্টিল–অ্যালুমিনিয়মের বাসন—কোসন। একটা ছোটো গ্যাস সিলিন্ডার। মাথায় ওভেন। স্টিলের আলনা, কিন্তু ফাঁকা। কাপড়—চোপড় ছড়ানো ছিটানো।

বললাম— চিন্তা কোরো না চারু, ব্যাঙ্কে ফরটি পার্সেন্ট সাবসিডিতে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দেবো। আবার নতুন করে শুরু করবে। আর তা যদি পছন্দ না হয় সেল্ফ হেল্প গ্রুপে নাম লেখাও। দেখো তোমার মতো অনেকেই আছে। কোনো অসুবিধা হবে না। আমি তো আছি। চারুর মুখের প্রতিক্রিয়া দেখার বহু কসরৎ করলাম, কিন্তু মুখটা এমনভাবে গুঁজে রইল দেখতে পেলাম না।  

আমি উঠে এলাম, তখনো চারু কোনও কথা বলল না। শুধু কাপড়ের প্যাকেটটা আঁকড়ে ধরে রইল।

বুকের মাঝে একটা চাপ নিয়ে কোনো রকমে চারু—শিলার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই মনে হলো, বাইরের আকাশটা এত সুন্দর! আগে কখনো দেখিনি তো!

কিন্তু দু’পা এগোতেই আমাকে আগলে ধরল চারুর আদরের উনুনশাল। সেই মুখপোড়া দু’খানা ভাঙা ঝিক, খাঁ খাঁ করা মাথা আর রক্ত জমাটে কালোর মত পোড়া ফাটা দেয়ালগুলো অদ্ভুত ভাবে দাঁত বের করে আমাকে যেন ব্যঙ্গ করতে  লাগল… — আমাদের তাড়ানো অত সহজ না। আমরা এ ভাবেই থাকি। তোমাদের মধ্যে, মানুষের মধ্যে। আজীবনকাল! সে কী কিম্ভূত হাসি। ভীষণ ভয়ে যখন প্রায় দৌড়ে উঠোনটুকু পেরিয়ে দরজার ওপারে, মনে হলো কে যেন ডাকছে— শিলা। হয়তো কিছু বলবে। হয়তো আরো কিছু দরকার। মা—মেয়ের একার সংসারে একটা শক্ত কাঁধ।

মনে পড়ে গেল, আমাকে অফিস বেরতে হবে। দ্রুত রাস্তার বাঁকটা ধরে ফেললাম।

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার