Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

আ ফ জ ল  আ লি

যৌন, যৌনতা এবং কবিতা

যৌন, যৌনতা- এই শব্দগুলো শুনলেই ভিতরে কীরকম একটা সুড়সুড়ি বা গোপনীয়তার ভাব আসে, আমরা ভিতর থেকেই কেমন অপ্রস্তুত ইতস্তত লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ি। মনে হয় এ সব থেকে দূরে থাকলেই ভালো। বিষয়টা আদপে তেমন কিন্তু নয়। যৌন এবং যৌনতা শব্দের বিস্তৃতি অনেকটা, অনেক কিছু আছে এর মধ্যে। আমরা বিষয়টিকে শুধুমাত্র কাম-উদ্দীপনা বা শারীরিক মিলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিই কেবলমাত্র না জানার কারণে।

এখন sex বলতে বিষয়টি কী বোঝায় সংক্ষেপে একটু দেখে নেওয়া যাক। Sex বলতে একজন ব্যক্তি male অথবা female কিনা মূলত তা দেখা হয়। স্কুলের কোনো ফর্মে বা ডাক্তার বা হসপিটালের কোনো নির্দিষ্ট ফর্মে fill up করার সময় যে question থাকে, whether male or female, এটার উত্তরে যা লেখা হয়। এছাড়া sex করা বোঝাতে sexual intercourse এর কথা বোঝানো হয় বা শারীরিক মিলন।

অন্যদিকে যৌনতা বা sexuality বলতে মূলত কী বোঝানো হয় দেখে নেওয়া যাক। যৌনতা বা sexuality বলতে একজন মানুষের সামগ্রিক expression বা ভাবভঙ্গি একজন পুরুষ বা একজন নারী হিসেবে। Sexuality শুরু হয় জন্মানোর সময় এবং মৃত্যুতে শেষ হয়। প্রতিটা মানুষই হল এক একটা sexual অস্তিত্ব। যৌনতার বিষয়টি অত্যন্ত বৃহৎ পরিসর। একটা মানুষের sexuality বা যৌনতা হল শারীরিক ভাব, লিঙ্গ পরিচয় এবং ভূমিকা, সামগ্রিক যৌন বিন্যাস, যৌনতার প্রগাঢ়তা, ইচ্ছা বা যৌন প্রবৃত্তি, যৌন সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং টান। এছাড়া একজন পুরুষ বা নারীর যৌনতার মধ্যে পড়ে তার ভাবভঙ্গি, মূল্যবোধ, জ্ঞান এবং ব্যবহার। একজন পুরুষ বা নারী কীভাবে তার যৌনতা প্রকাশ করবে এ বিষয়ে তার family, culture, সমাজ, বিশ্বাস, নম্রতা এবং যৌন শিক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এবং এই শিক্ষা আসে পিতা, মাতা, বন্ধু, ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিবেশ, মিডিয়া, স্কুল, শিক্ষক এবং পুস্তক সমূহ থেকে।

অর্থাৎ যৌনতা শব্দটির প্রয়োগ এবং অবকাশ অবশ্যই অনেক ব্যপক। একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ থেকে আরম্ভ করে তার চিন্তা ভাবনার মধ্যে sexuality কাজ করে। প্রতিদিনের জীবন যাত্রার সাথে জড়িয়ে থাকে যৌনতা নামক এই ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ ও প্রকাশ। ফ্রয়েডের তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা দেখেছি বাচ্চাদের প্রথম যৌন চেতনা শুরু হয় তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা অনুধাবন শুরু। উনি বলেছেন আমাদের জীবনের বেশির ভাগ সমস্যাই হল যৌনতা কেন্দ্রিক। এবং যৌন প্রবণতা অবদমন বা suppress করে রেখে দেওয়ার মধ্যেই জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক জটিলতা। তাই যৌনতা নিয়ে আলোচনা এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের মধ্যে তিনি সমাজের বা মানুষের মানসিক বা শারীরিক সুস্থ হওয়ার উপায় দেখেছিলেন। ফ্রয়েড সাহেব মনোবিদ ছিলেন এবং তিনি psycho analysis নিয়ে কাজ করেছেন, স্বপ্নের বিবরণ এবং তৎসহ মনের ইচ্ছা নিয়েও বলেছেন। পরবর্তীতে ফ্রয়েডের যৌনতা তত্ত্ব অনেকাংশে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হলেও এখনও আলোচনা কম হচ্ছে না তাঁকে নিয়ে।

প্রাথমিকভাবে আমি যৌন, যৌনতা নিয়ে কিছু কথা বললাম একটা বিষয় কিছুটা আলোচনা করব বলে- তা হল যৌনতার সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক। কবিদের শরীরে যৌনতার প্রভাব এবং বিশেষ করে যৌন উদ্দীপনা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

কবিতার ক্ষেত্রে দু’ধরনের বিষয় আসে। প্রথম হল সরাসরি যৌনতা বিষয়ক কবিতা লেখা, যেখানে নানান প্রকাশ থাকে, যৌন অঙ্গ নিয়ে হোক বা সহবাস সম্পর্কিত বা শারীরিক বিভঙ্গের বা মিলনের অথবা শৃঙ্গারের শব্দগত বহিঃপ্রকাশ থাকে। দ্বিতীয় হল কবিতার মধ্যে যৌন উদ্দীপনা বা যৌনতার প্রকাশ সেভাবে নেই বরং রোমান্টিসিজম আছে, logocentrism বা logocentrism-এর বাইরে, অথবা বেশির ভাগ কবিতা যেভাবে লেখা হচ্ছে। প্রথমটির মধ্যে তো যৌনতা সরাসরি প্রকাশ হচ্ছে যা ফ্রয়েডের তাত্ত্বিক দিকের প্রয়োগ হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে যৌনতা কতটা প্রভাব ফেলছে কবির মানসিক এবং শারীরিক ক্রিয়ার মধ্যে যার উদ্দীপনায় কবিতা লিখতে পারেন একজন কবি। যৌন যাপন করা অর্থাৎ sexual intercourse এর ফলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারীর শরীরের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী সুস্থ ও সতেজ অবস্থায় থাকে। সুস্থ এবং সম্মতিযুক্ত সহবাস প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের মানসিক চিন্তাধারা বিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সদর্থক ভূমিকা পালন করে। শরীরে hormonal secretion এর প্রভাব সামগ্রিক শারীরিক ব্যবস্থাপনার ভিতর কাজ করতে থাকে এবং তা মানসিক ও শারীরিকভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বা বয়স্কাকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখে। এই সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থা অবশ্যই কবির কবিতা লেখার ক্ষেত্রে positive এবং romantic পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। সহবাস কার সঙ্গে কীভাবে আনন্দপূর্ণ হবে সে বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু সুস্থ সহবাস বা sexual intercourse অবশ্যই কবিতা লেখার জন্য উপযুক্ত মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এবং করে। তাই বলে কি অবিবাহিত বা অবিবাহিতারা ভালো কবিতা লিখতে পারেন না । এর উত্তরে অবশ্যই বলব হ্যাঁ পারেন। কিন্তু এখানে যৌনতা অন্য ভাবে কাজ করে। অথবা যাঁরা যৌন জীবন যাপন করেন না তাঁদের মধ্যেও কাজ করে, যদি না কেউ তাঁর মনকে সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে নিয়ে যান অন্যত্র, অন্য মার্গে।

রোমান্টিসিজম অর্থাৎ কল্পনাপ্রবণতার সঙ্গে যৌনতার একটা সম্পর্ক আছে। যৌনতার আধারে রোমান্টিকতা ভিন্ন রূপ ধারণ করে, ভিতরে উত্তাপ ছড়ানোর মতো। মনকে রোমান্টিকতার অঙ্গনে ধাবমান রাখে, মনের ভিতর শক্তি প্রবাহিত হয় এবং সেই শক্তি সৃষ্টিশীলতার বৈভবকে প্রখররূপে বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কবিরা তো সাধারণত রোমান্টিক হয়। এই রোমান্টিকতার রেণুতে যৌনতার অভিঘাত এসে যখন মেশে তখন দুইয়ের মিশ্রণে কবির মধ্যে একপ্রকার power generate হয়, সেই power বা energy শব্দের মধ্যে transfer হয়ে কবিতা লেখার ইচ্ছা ক্ষমতা এবং লেখার ধরণকে করে তোলে আরো শক্তিশালী । এর মধ্যে যেমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে তেমনি আছে psychological কারণ। যৌনতা মানে কাউকে ধর্ষণ করা নয়, যৌনতা মানে পৈশাচিক উল্লাস নয়, নয় নির্যাতন, নয় বলপ্রয়োগ করা। যৌনতার মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিকতা, রুচিশীলতা লুকিয়ে থাকে, থাকে একজন নারী বা পুরুষের সুন্দর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী। যৌনতা এবং রোমান্টিকতা এরা পারস্পরিক একে অপরের catalist . হয়তো বাইরে থেকে এসব মনে হয় না, কিন্তু সূক্ষ্ম পর্যবক্ষেণে তা ধরা পড়বেই। কবিতা তো কল্পনার পটভূমিতে তৈরি শব্দের প্রক্ষেপ। এই কল্পনার পটভূমিতে মিশে থাকে যৌনতা থেকে আগত অতিসূক্ষ্ম রশ্মির আঘাত যা মিশতে থাকে কবির শব্দের কারিগরিতে, শব্দের ঊর্ণজালে। Sexual urge এর একটা অভিঘাত থাকে। এই অভিঘাত মস্তিষ্ক এবং শরীরের উপর যুগপৎ কাজ করে। এই sexual urge বা যৌন ক্রিয়ার ইচ্ছা, সুস্থ এবং কল্পনাবিলাসী বা কল্পনাশ্রয়ী শরীরের এবং মনের একটা অংশ। যে মানুষ সৃজনশীল সেই মানুষের মধ্যে এই প্রভাব এবং প্রক্রিয়া খুব বেশি কাজ করতে থাকে। কেন খুব বেশি কাজ করতে থাকে এর উত্তর বেশির ভাগটাই psychological. তবে তা অনেকটা balanced অবস্থায় থাকলেও, কখনো কখনো তা অতিক্রমও করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক উদাহরণ তো আছেই। অনেক শিল্পী এবং কবিদের অধিক নারী সঙ্গ কি তার প্রমাণ নয়! নারীসঙ্গ বলতে আমি নারী সম্ভোগের কথা সরাসরি বলতে চাইছি না, তা প্রেম পর্যায়েরও হতে পারে। বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে polygamy চরিত্র খুব সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ধর্ম, সমাজ, সংস্কার, লজ্জা বা system-এর চাপে তা অবদমিত হয়। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর কল্পনায় এই চাপ বা অবদমনকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর নিজের জগত তৈরি করে নেন। সেই জগত তাঁর কাছে সুন্দর, সেই সুন্দর জগতে তাঁর যে বিচরণভূমি এবং বিচরণশক্তি, এর পিছনে অন্যতম ভূমিকা বা কলকাঠি নাড়ানোর ক্ষমতা থাকে সেই যৌনতা ধর্ম বা যৌনশক্তি। যৌনতা এক্ষেত্রে মানসিক বিন্যাসের উপর দারুণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং এই mental এবং sexual power এবং sexuality মিলে মিশে যে wave তৈরি হয় তা সৃজনী কাজে এবং সৃজনী মেধাকে সতেজ শক্তিশালী রাখে। তৈরি হয় এক দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা ও পরিকল্পনা। আবার এমনটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হতে পারে যে অত্যাধিক রোমান্টিকতা বা কল্পনাবিলাসিতার মধ্যে থেকে কবির মধ্যে যে ঘোর তৈরি হয় তা শরীরের যৌনক্ষমতা বা ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। তবে এটা নার্ভের উপর অতিরিক্ত চাপ থেকে তৈরি হতে পারে। এর অবশ্যই চিকিৎসা আছে, আবার automatic recover হতে পারে। আমি আমার দু’এক জন কবি বন্ধুকে এরকম ব্যবহার করতে দেখেছি। তবে বেশির ভাগ কবির ক্ষেত্রেই এই যৌনতা এবং যৌনক্ষমতা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে সরাসরি influence খাটায়। এই প্রভাবের ফলে কবি কীরকম কবিতা লিখবেন তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা অভিপ্রায়, তাঁর পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা পরিবেশ পরিস্থিতি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। হাংরি কবি মলয় রায়চৌধুরীর বেশির ভাগ কবিতার মধ্যেই সরাসরি যৌন কেন্দ্রিক শব্দসহ যৌনতা প্রভাবিত চিন্তা থাকে। এটা কবিতার জন্য, জীবনের জন্য অনেকটা মুক্তাঞ্চল তৈরি করতে ওই সময়ে সচেষ্ট ছিলেন হাংরির কবিরা। কারণ, প্রচলিত ধারাকে এই ভাবে খুল্লমখুল্লা যৌনতার প্রকাশের মাধ্যমে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। এটির এক ধারে যেমন আছে ফ্রয়েডিয় চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি ছিল সমাজতাত্ত্বিক ওসওয়াল্ড স্পেংলারের- The decline of the west – গ্রন্থটির দর্শন। স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সে কারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। এবং এর সঙ্গে ছিল হাংরিদের নিজস্ব কিছু চিন্তা চেতনা। সব মিলিয়ে তাঁরা প্রচলিত স্থবির অবস্থানকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। এবং এটির জন্য অন্যতম মাধ্যম ছিল খুল্লমখুল্লা যৌনতাকে ব্যবহার। অর্থাৎ যৌনতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভেঙে দেওয়া শক্তির বহিঃপ্রকাশে। নিচে মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার কিছুটা অংশ তুলে ধরলাম।

সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও

এখানে তো যৌনতাকে সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে সাহিত্যে নতুন কিছু করার জন্য অথবা সব কিছু ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য। আসলে যৌনতা একটা শক্তি। বিভিন্ন ধর্মে এই যৌনতাকে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন নিয়ম আছে তা সেই সম্প্রদায়ের জন্য। ইউরোপে যেমন যৌন যাপন অনেকটা খোলামেলা, আবার ইসলামে তা আইনসিদ্ধকরণের মধ্যে গিয়ে যাপন করতে বলা আছে, অর্থাৎ আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়ে যৌন যাপন করার অনুমতি। হিন্দু মতে তা আবার আঁটোসাঁটো, কেবলমাত্র একটি বিবাহের বাইরে রাখা নিষিদ্ধ। এবং আইনেও সিদ্ধ নেই দ্বিতীয় গ্রহণ করার যতক্ষণ না প্রথমটির সাথে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। অনেক আরব দেশে চুক্তি ভিত্তিক বিবাহ হয় কিছু সময়ের জন্য। মিশরে যেমন গ্রীষ্মকালীন বিবাহ হয়। এই যে যৌনতাকে ব্যবহার করার বিভিন্ন পন্থা বা ছাড়পত্র, আসলে তা এই শক্তিটাকে সুসংহত রাখার প্রয়াস।

কবিতা লেখার শুরুই হয় জীবনে আগত প্রাথমিক প্রেম থেকে। এই প্রেমের মধ্যেই ঢুকে থাকে শারীরিক আকর্ষণের প্রাথমিক দশা বা পর্যায় যার মধ্যে কামস্বরূপ যৌনতা থাকে। Platonic love-এর ব্যাপারটি আমার মনে হয় এক্কেবারে অবাস্তবধর্মী এক প্রয়াস যার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে মীরাবাইয়ের ভালোবাসা এই পর্যায়ের ছিল, সেটা এক্কেবারেই ভক্তিনির্ভর। সেদিকে আলোচনা নিয়ে যাচ্ছি না। প্রেমের মধ্যে দিয়ে কবিতা লেখার যে প্রয়াস শুরু হয়, সেই প্রেমের মধ্যেই তো যৌনতা থাকে লুকিয়ে। কাজেই যৌনতা থেকে উদগত প্রেম-ভাবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার বীজ। যদিও এটি প্রাথমিক পর্যায়ে, কিন্তু এই বীজ থেকেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের কবি এবং কবিতার গাছ।

প্রেম, পূর্বরাগ, অভিসার বা বিরহ ইত্যাদি পর্বের মধ্যে তো লুকিয়ে আছে সেই যৌন উত্তেজনা এবং বিক্রিয়াজনিত মানসিক অবস্থান। পূর্বরাগের পর অভিসারের টান কীসের জন্য হয়, এই টান কি শারীরিক মিলনের জন্য নয়, তীব্র টান এবং কাছাকাছি হওয়ার বাসনা থেকেই জন্মায় অভিসারে যাওয়া।

শুদ্ধ প্রেম সাধলি যদি
কামগতিরে রাখলি কোথা—
আগে উদয় কামের গতি
প্রেম আগমন তারই সাথি
বিদ্যাপতি

আসলে ভালোবাসা হল একপ্রকার রসায়ন যার মধ্যে শরীর মস্তিষ্ক আবেগ হৃদয় জুড়ে থাকে এবং থাকে গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়া এবং জারণ বিজারণ প্রক্রিয়া, অনুভবের শিহরণ। ঠিক কবিতার মতোই। কবিতার মধ্যে যেমন জড়িয়ে থাকে মস্তিষ্ক আবেগ হৃদয় এবং জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রেম বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সামান্য হলেও কাজে লাগাতে পারে। ভালোবাসার ক্ষেত্রে মেধা প্রয়োজন হয় কারণ মেধার frequency মিললেই তবে প্রেম হয়, না হলে হয় না সাধারণত। তবে মনের frequency তো মিলতেই হয়।

যৌনতা হল এক সুস্থ এবং স্বচ্ছ ধারণা যার মধ্যে আছে শক্তি, আবেগ এবং স্বপ্নময়তা এবং অবশ্যই শারীরিক স্থিতি এবং স্বাস্থ্য। একজন কবি বা শিল্পীর সৃজনীর ক্ষেত্রে তাঁর শব্দের মধ্যে, মুডের মধ্যে, শৈল্পিক ছোঁয়ার টানের মধ্যে যৌনতা এমনভাবে মিশে থাকে এবং ভিতর থেকে support জোগায় যে এই সূক্ষ্ম ক্রিয়াটি হয়তো কবির অজান্তেই ঘটে, সবাই বুঝতে, জানতে না পারলেও কেউ কেউ তো জানে বোঝে। আগেই বলেছি ব্যাপারটা এমনটা নয় যে যৌনতার আবেশে সবাই রগরগে যৌন কবিতা লিখবেন, আসলে এটি কবিকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করার এক মাধ্যম। কবির চরিত্র এবং যৌনতা এই দুটো সেই সুতোর মতো জড়িয়ে থাকে, কাজেই যৌনতার বাইরে থাকা যায় না বললেই চলে। উচ্ছৃঙ্খল চরিত্র বা লজ্জাহীন যৌন আচরণ আসলে ব্যতিক্রমী এবং পরিহারযোগ্য, সেই নিয়ে এখানে আলোচনার নয়, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবনা এবং আচরণ। কাজেই এখানে সেই বিষয়টি বিস্তারিত বললাম না।

ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। আবীর মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিলাম এখানে। একটু পড়ুন। একটু বড়ো হলেও পড়ুন। আমার কাজ একটু লাঘব হল আর কি।

নিত্য ভাঙা-গড়ার খেলায় তাঁর সহজিয়া জীবন নিয়ে ক্রমশই জলঘোলা হল শান্তিনিকেতনে। তাঁর দরাজ গলার রবীন্দ্রনাথের গান শুনল না কেউ! বরং শান্তিনিকেতনী তর্ক তুলল তাঁর জীবনচর্যা নিয়ে। কিঙ্করের তখন ঘরে-বাইরে ‘জীবন্ত মানুষের নেশা’।
একবার, দিল্লি যাওয়ার পথে এক আদিবাসী রমণীর যৌবনের দুর্মর আহ্বানের কাছে নতজানু হয়ে তাঁর সঙ্গে নেমে গেলেন অজানা স্টেশনে। হারিয়ে গেলেন যেন। খবর নেই বহুকাল! হঠাৎ করে শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছল ঠিকানাবিহীন এক টেলিগ্রাম। তাতে কিঙ্কর জানালেন, ‘I lost myself, search myself.’
জীবনে অনেক মেয়ে এসেছে, এটা সত্যি। কেউ এসেছে দেহ নিয়ে, কেউ এসেছে মানসিক তীব্র আকর্ষণ নিয়ে। কিন্তু ছাড়িনি কাউকে। ধরেছি, আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছি। হজম করে ছিবড়ে করে ছেড়েছি। হজম করার মানে জানো? ও মন্ত্রটা আমার গুরুদেবের কাছে শেখা। তাঁর থেকে জন্ম নিয়েছে আমার অনেক ছবি, মূর্তি, অনেক কল্পনা, আর অনুভব।… আমার মডেলরা আমার বহু স্কেচে, ছবিতে, মূর্তিতে, বেঁচে আছে। মডেলরা তো এভাবেই বেঁচে থাকে।

নিজের সম্পর্কে নির্দ্বিধায়ায় এমন করে আর কবে, কোন ভাস্করই বা অকপট হতে পেরেছেন! মডেলদের সঙ্গে রামকিঙ্করের সম্পর্ক নিয়ে নিত্য হাওয়ায় ছড়িয়েছে গসিপ।

তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘‘সব কিছুর মধ্যে যৌনতা আছে, যৌনতা ছাড়া সব কিছুই প্রাণহীন, ঊষর!’’

সে সবের প্রসঙ্গ তুললে কখনও এড়িয়ে যাননি কিঙ্কর। কাল্পনিক নয়, মডেলদের সম্পর্কে তাঁর সে-সব সত্য-স্বীকার আর উক্তি সাতসেলাইয়ে জোড়া-তালি দিয়ে দেখে নেব এই পর্বে।

এক বার তাঁকে প্রশ্ন করা হল তাঁর মডেল বিনোদকে নিয়ে। তিনি উত্তর দেন, ‘‘বিনোদ, মানে বিনোদিনী? সে আমার ছাত্রী, মণিপুরী মেয়ে। একটু একটু করে শরীরের বাঁক, উপবাঁকের ভুবন চিনিয়েছিল ও-ই। আলো-অন্ধকারে ওকে ঘুরিয়েফিরিয়ে এঁকেছিলাম অনেক। এক দিন চলে গেল, মণিপুরি ভাষায় একটি নাটকও লিখেছে আমাকে নিয়ে।’’

অসমের মেয়ে নীলিমা?

‘‘নীলিমা বড়ুয়া। নষ্ট হয়ে গেল ওর পোর্ট্রেট। আঁকতে আঁকতে কত বার যে রঙ লেগেছে শরীর থেকে শরীরে… সে সব কোথায় গেল! ভুল করেছি, তখন টাকার অভাবে ভাল রঙ কাজে লাগাতে পারিনি।’’

মনে আছে এসথার জয়ন্তী জয়াপ্পাস্বামীর কথা?

‘‘মনে থাকবে না কেন? সে তো দক্ষিণী ছাত্রী জয়া। খুব ছিপছিপে ছিল। জয়া নামটা আমারই দেওয়া। সুজাতা করেছিলাম ওকে মডেল করে।’’

ভুবনডাঙার খাঁদু?

‘‘দীর্ঘাঙ্গী খাঁদু ফিরে ফিরে এসেছে আমার ভাঙা ঘরে। সুন্দর ছিল ওর ফিগার। প্রায়ই দুপুর দুপুর আমার একলা ঘরে এসে দাঁড়িয়ে থাকত দরজার চৌকাঠ ধরে। এক কাঁখে থাকত ছেলে। সে দুধ খেত মায়ের বুকের। যে ভাবেই দাঁড়াত শরীরে নৃত্যের ভঙ্গি। অজস্র স্কেচ করেছি ওর।’’

আর রাধি?

‘‘ওই তো রইল শেষ পর্যন্ত আমার কাছে। ওর সঙ্গে মেশা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছিল। ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর কর্তারাও। তাও ওকে ছাড়িনি। ও ছাড়েনি আমাকেও। আসলে রাধারানীর সঙ্গে আমার জড়ামড়ি সম্পর্ক!’’

‘‘রিয়ালিটির সবটাই কপি করতে নেই।’’

সম্মাননীয় পাঠক এবার তো বুঝতে পারছেন বিষয়টা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিল্পীকে প্রশ্রয় দিয়ে বলেছিলেন, “রামকিঙ্কর, তুমি তোমার ভাস্কর্য দিয়ে সমগ্র শান্তিনিকেতন ভরিয়ে দাও।”

আমার এটা বিশ্বাস যে, কবি শিল্পীদের যৌন চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকে অনেকের থেকে। এটা আসে মূলত তাদের রোমান্টিক attitude থেকে, আর রোমান্টিকতার মূলে থাকে প্রবল (কখনো সুপ্ত) যৌনতার ছোঁয়া যা কবিদের ভিতরে ইলেকট্রিকের মতো প্রবাহিত হয়। এটাকে আমরা দমিয়ে রাখতে পারি বটে, কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না। যৌনতার ইলেকট্রিক প্রবাহ কবির শব্দ অভিধানে ক্যারাম খেলার স্ট্রাইকারের মতো আঘাত করে, শব্দের নানান বিন্যাস ঘটিয়ে দেয়। অদেখা সুপ্ত এই প্রক্রিয়াটি হয়তো কবি নিজেও জানেন না বা বুঝতে পারেন না। এই যে আমি বললাম, এর পর নিশ্চয় কবিরা টের পাবেন যে যৌনতা সত্যি করেই তাঁদের লেখার উপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। কবি জীবনের নানান অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখনীর উপর প্রভাব ফেলে, সেগুলো বেশির ভাগ বাহ্যিক, কিন্তু যৌনতা যা করে তার শরীরের ভিতর থেকে, মনের বারান্দা থেকে, মস্তিষ্কের অনুধাবন থেকে এবং গ্রন্থিসমূহ থেকে। অর্থাৎ শরীরের এক্কেবারে ভিতর থেকে। কাজেই যৌনতাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, মেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই। মন খুলে কবিতা লিখুন, জীবনকে ভালোবাসুন আর মনে করুন যৌনতা একটি স্বাভাবিক সহায়ক প্রক্রিয়া, জীবনের জন্য, কবিতা লেখার জন্য।

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার