Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

ত ন্ম য়  ভ ট্টা চা র্য

tanamy

বলিউড ও বাংলা কবিতা

‘পর্দার তারকাদের মুঠোয় পেয়ে এ কী করলেন কবিরা!’ কিংবা ‘বলিউডের সঙ্গে বাঙালি কবিদের গোপন আঁতাত, ফাঁস হল কুকীর্তি’— এ-জাতীয় হেডলাইন দিতে হাত নিশপিশ করছিল। বদলে দিয়ে বসলাম নিরামিষ্যি এক শিরোনাম। আর, লেখার উত্তেজনা অর্ধেক হয়ে গেল নিমেষেই। গোমড়ামুখো এক প্রবন্ধের দিকে এগিয়ে চলেছি আমি— না-আছে নিষিদ্ধ ইঙ্গিত, না-আছে গসিপের সুযোগ। কোথায় সেই স্ক্রিন-ঝলমলে হিন্দি সিনেমার তারকা-সমাবেশ, আর কোথায় আমাদের ‘দীন-দুঃখী ‘বাংলা কবিতা! এ-দুয়ের মধ্যে সিনেমার প্রোমোশন ছাড়া মোলাকাত হতে পারে, ভাবা শিবেরও অসাধ্য। কিন্তু, ঘটনাচক্রে, হয়েছে। আর সেইসব লুকিয়ে-থাকা তুরুপ চোখে যখন পড়েই গেছে, লেখার সুযোগ ছাড়ি কেন!

বলিউডের সঙ্গে বাংলা কবিতার সম্পর্ক! প্রথমেই ঠেক খেতে হয় এমন কথা ভেবে। কোনো হিন্দি সিনেমায় বাংলা কবিতার প্রয়োগ বা উল্লেখ আমার অন্তত চোখে পড়েনি। কিন্তু উল্টোদিকে উদাহরণের কমতি নেই। অর্থাৎ, বাংলা কবিতায় বারবার বেড়া ভেঙে ঢুকে পড়েছে বলিউড। কখনও সিনেমা, কখনও গান। অবশ্য নায়ক-নায়িকাদের প্রসঙ্গই বেশি। এ-লেখাও সেই নায়ক-নায়িকাদের ঝলমলে হাজিরা নিয়েই। তবে একটা খামতি স্বীকার করে নেওয়া ভালো। বুক ফুলিয়ে ‘বাংলা কবিতা’ বললেও, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতাই উদাহরণ হিসেবে এসেছে এখানে। আসাম, ত্রিপুরা ধরা পড়েনি। নেই বাংলাদেশও। অবশ্য বাংলাদেশের কিছু কবিতায় বলিউডি নায়কদের উল্লেখ উঁকি দিচ্ছে স্মৃতিতে। সে-যাইহোক। এই লেখার ডেটাবেসও যে আহামরি, তা নয়। আমার সংগ্রহে থাকা কবিতাবইয়ের একটা অংশ একবেলায় নেড়েঘেঁটে যা-যা খুঁজে পেয়েছি, তা-ই সম্বল। এর বাইরেও নির্ঘাত রয়ে গেছে প্রচুর। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে বাংলা কবিতার সম্পর্কচরিত্র বুঝতে, এই লেখা-মানচিত্র নেহাত ফেলনা হবে না আশা করি।

শিল্পমাধ্যমগুলির পরস্পরের মধ্যে আদানপ্রদান কোনো নতুন কথা নয়। সিনেমা, নাটক, থিয়েটার বারবার পুষ্ট হয়েছে সাহিত্য থেকে। আবার, সাহিত্যও বিভিন্ন সময়ে উপাদান নিয়েছে অন্য মাধ্যমগুলো থেকে। আজও, কোনো সুন্দর সিনেমা-থিয়েটার-ছবি-ফটোগ্রাফি দেখে উচ্চারিত হয়— ‘কবিতার মতো!’ কী সেই ‘কবিতার মতো’-র ধর্ম? যাকে গদ্যে বা সহজবোধ্যতায় ব্যাখ্যা করা যায় না, গতানুগতিকের বাইরে রহস্যের আলোছায়া খেলে-যাওয়ার মুহূর্তগুলোই কি কবিতার মতো হয়ে ওঠে? মনে পড়ছে ‘হারানো সুর’-এর শেষ দৃশ্য। উত্তমকুমার কুয়াশাঘেরা পথ দিয়ে চিৎকার করে ছুটে চলেছেন— ‘রমা! রমা!’, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই ডাক, বিষণ্ন সুচিত্রা ঘাড় ফেরালেন একবার— ওই দৃশ্যসমষ্টি কি কবিতার মতো নয়? দেশ-বিদেশের সিনেমায় দৃশ্যায়নে কাব্যিক সৌন্দর্যের কমতি নেই। এ-আলোচনাও তা নিয়ে নয়। বরং মূল বিষয়ে ঢুকি।

বাংলা কবিতায় সিনেমার উপস্থিতি কীরকম? নেহাত নগণ্য নয়, বলাই বাহুল্য। শুধু সিনেমা নয়, যাত্রা, নাটক থিয়েটার ইত্যাদি প্রসঙ্গ, অভিনেতাদের নাম বারবার ফিরে-ফিরে এসেছে। গিরিশ ঘোষ, বিনোদিনীর ‘থ্যাটার’ থেকে শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্র পর্যন্ত উঁকি দিয়ে গেছেন বাংলা কবিতায়। মঞ্চ, মঞ্চায়ন, মঞ্চের আলো— সবই বিষয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন কবির লেখায়। আর সিনেমার ক্ষেত্রে? পর্দা, সিনেমা হল, হলের ভেতরের অভিজ্ঞতা, নায়ক-নায়িকা, গান— সর্বোপরি, নস্টালজিয়া। বাংলা কবিতা সিনেমা দেখার স্মৃতিকে ধারণ করেছে সযত্নে। কত কবিতা গড়ে উঠেছে সিনেমাঋণ স্বীকার করেই। সিনেমার কোনো দৃশ্য বা ভাব কবির মনে অনুরণন তৈরি করেছে, সেই আবহ ঠেলে দিয়েছে কবিতা লেখার দিকে। হয়তো কোনো সিনেমার নামোল্লেখই নেই, অথচ কবিতার সর্বাঙ্গে গমগম করছে সিনেমা-অনুভূতি— এমন কবিতা চোখে পড়েছে প্রচুর। সিনেমা প্রচ্ছন্নে আরও কী কী কারুকার্য ঘটিয়েছে, তা বিস্তর গবেষণার বিষয়। আপাতত প্রত্যক্ষ উদাহরণগুলো দিয়েই শো শুরু করা যাক।

তবে, হিন্দি সিনেমায় যাওয়ার আগে, বঙ্গীয় সিনেমাজলে আচমন সারা কর্তব্য। আর, এ-কথা বলে না দিলেও চলে, বাংলা কবিতাতেও সিনেজগতের ‘গুরু’ একজনই— উত্তমকুমার। নায়ক-নায়িকাদের নামতালিকা করতে বসলে, সবচেয়ে বেশিবার উঠে আসবেন উত্তমই। মনে করুন অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের অসামান্য একফর্মাটির কথা— ‘ছায়াপুরুষের রক্তমাংস’— যে-বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতাই গড়ে উঠেছে উত্তম-আবহে। নায়ক উত্তম ও সিনেমার প্রেক্ষিত বারবার অঙ্গাঙ্গী হয়ে যায় কবিতার সঙ্গে। ‘ল্যান্ডমার্ক গম্বুজকল, সামনে সুচিত্রা সেলুন/—এখানে উত্তমরূপে চুল কাটা হয়’, ‘টেবিল চাপড়ে লোকটা বলছিল/টু দা টপ… টপ… টপ…,/অথচ আমরা শুধু টপ-টপ-টপ করে/কী যেন পতনের শব্দ শুনলাম সারাজীবন?’, ‘আমাদের সপ্তপদী ছিল,/আমাদের জতুগৃহ নেই’— উত্তমে জারিত এইসব কবিতা আমাদের ভাষার সম্পদ। প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতী দেবী, সুপ্রিয়া চৌধুরী প্রমুখের নামও। উঠে এসেছে কলকাতার সিনেমা হলগুলি। বাংলা কবিতার সঙ্গে সিনেমার সম্পর্ক নিয়ে বলতে গেলে, আমি সবার প্রথমে রাখব এই ক্ষীণতনু পুস্তিকাটিকেই।

আর দ্বিতীয়ে? সে-ও এক আস্ত কবিতার বই, তবে শুধু উত্তমকে নিয়ে নয়। কৌশিক বাজারীর ‘ম্যাটিনিতে, রূপকথা টকীজে’। ‘পথের পাঁচালী’-র অপু-দুর্গার প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দু-রীনা ব্রাউন, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, চিন্ময় রায়, সন্ধ্যা রায়, অপর্ণা সেন, কঙ্কনা সেনশর্মা— একের পর এক কবিতায় ঢুকে পড়েছে এই নামগুলো। সিনেমার ডায়লগও হয়ে উঠেছে কবিতাপঙক্তি। ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’, ‘একবার বলো, উত্তমকুমার!’, ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’— কিংবদন্তি হয়ে-যাওয়া ডায়লগ ঠাঁই পাচ্ছে কবিতায়। কৌশিক লিখছেন, ‘প্রজাপতি চোর সেই পাহাড়ী সান্যালের গল্প মনে পড়ে?’ লিখছেন, ‘সন্ধ্যা রায়ের মতো চোখ তুলে কেঁদে ফেলচ বিরতির আগে’। তবে গুরু সেই একজনই, উত্তমকুমার। গোটা বইয়েই ফিরে-ফিরে এসেছেন বারবার।

উত্তম-সৌমিত্রের আবহমান তর্ক ধরা পড়ে সম্বিত বসুর এই ছোট্ট কবিতায়— ‘একরকমভাবে সিগারেট না খেয়ে/নানারকমভাবে খেলে বোঝা যায়/উত্তমকুমার আর সৌমিত্র/দুজনের মধ্যে তুলনা চলে না’। শিবাশিস মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ‘এন্টনী ফিরিঙ্গি-তে আমি উত্তমকুমার’-এর তিনটে টুকরোতেই মহানায়কের সগৌরব উপস্থিতি। শিবাশিস লিখেছেন— ‘আমি উত্তমকুমার আর পাশের মেয়েটি তনুজা,/তারপর শেষদিকে এসে যখন চোখে জল এসে গেছে আমাদের/তখন কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মনে হয়েছিল/আমি এন্টনী আর মেয়েটি বুঝি নিরুপমা।’ অন্যদিকে, পিনাকী ঠাকুর লেখেন— ‘বেকারের ভালোবাসা উত্তম সুচিত্রা শেষে/ফিরিবার গাড়িভাড়া চায়!’ পিনাকীরই আরেকটি কবিতার লাইন— ‘চুরুট টানেন নাকি? কমল মিত্রের মতো ড্রেসিং গাউনও…?/—মানে সিনেমার মতো? বেশ লাগে সুচিত্রা-উত্তম!’ রণজিৎ দাশের কলমেও বাদ পড়েননি তাঁরা। ‘শুধু আকাশের দুটি দীপ-জ্বলা তারা/উত্তম যুবকটিকে নীরবে পাহারা দেয়/সুচিত্রা সেনের দুটি চোখের মায়ায়!’ অন্য একটি বইয়ে, অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় লিখছেন— ‘সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে এল/উত্তমকুমারের মতো একফালি চাঁদ।’ সেই কবিতার শেষে উঁকি দিয়ে যাচ্ছেন জীবেন বসুও।

উত্তম-ঘোর থেকে বেরোই। বাংলা কবিতা ও বাংলা সিনেমার বন্ধুত্বে উঁকি মারলে, পথের পাঁচালী ফিরে-ফিরে আসবে বারবার। আসবেন ঋত্বিক ঘটকও। এই দুয়েরই উদাহরণ রয়েছে কৌশিক বাজারীর পূর্বোল্লেখিত বইটিতে। এছাড়াও, দেশভাগের ইঙ্গিতবাহী কবিতায় ঋত্বিক-প্রসঙ্গ ও তাঁর সিনেমায় অভিনীত চরিত্রদের নাম দেখা যায়। রাণা রায়চৌধুরী লিখছেন— ‘বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর চরাচর দেখে যখন বেরলাম/তখন আমার গা ভর্তি পাখি’। সুজিত দাসের কবিতায় দেখি “মৃণাল সেনের কোরাস সিনেমা থেকে উঠে আসবে জনগণ, খিদেপেটে চিৎকার করবে ‘তিরিশ হাজার’, ‘তিরিশ হাজার’।” আঙ্গিক পত্রিকার ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ সংখ্যা’য় ঋতুপর্ণকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন কবিতার উপস্থিতি। এইসব ক্ষেত্রে সিনেমা বা নায়ক নয়, পরিচালকই হয়ে উঠেছেন কবিতার মুখ্য চরিত্র।

তবে, হেঁহেঁ, অন্যান্য উদাহরণ যতই উঠে আসুক, বাংলা কবিতা ও বাংলা সিনেজগতের সম্পর্ক প্রবলভাবে উত্তম-নিয়ন্ত্রিত। বাকিরাও আছেন, কিন্তু গুরুর সামনে ফিকে সকলেই।

বলিউডে ঢোকার আগে, বিদেশের সিনেমায় একবার উঁকি দেব নাকি? সংখ্যায় কম হলেও, কিছু চিহ্ন খুঁজে তো পেয়েইছি! এই যেমন কৌশিক বাজারীর বইতেই, ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’, ‘দ্য টিনড্রাম’, ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ শীর্ষক কবিতা দেখতে পাচ্ছি। সিনেমা দেখার পরের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে লেখা কবিতাগুলো। আরেক কবিতায় দেখা যায় ইরানিয়ান পরিচালক মজিদ মজিদির নাম। তবে, এই জাতীয় কবিতার শিকড় সিনেমায় প্রোথিত হলেও, নিজস্ব গুণ নিয়েই বেড়ে উঠেছে কবিতাগুলি। যেমন অরিত্র চ্যাটার্জির বই ‘সার্কিস পারজানিয়ার ডাইরি’। সার্কিস পারজানিয়া একজন রাশিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক। অরিত্র-র কবিতার প্রচ্ছন্নে বারবার ছায়া ফেলেছে সার্কিসের সিনেমার প্রভাব। বইয়ের নামকরণেও সেহেতু ঠাঁই পেয়েছেন পরিচালক।

অন্যদিকে হলিউডের সিনেমার নায়িকারা রীতিমতো রাজত্ব করেছেন কবিমনে। রণজিৎ দাশ লেখেন— ‘মেরিলিন মনরো-র উড়ন্ত স্কার্টের মতো জ্যোৎস্না ছড়ায়/নির্জন চৌরঙ্গি জুড়ে, মধ্যরাতে, গঙ্গার ঘূর্ণি হাওয়ায়’। সুদীপ চক্রবর্তীর ‘সোফিয়া লরেনের আয়না’ শীর্ষক কবিতায় দেখতে পাই— ‘পর্দায় ভাসছে জেমস বন্ড, এই বন্দুক ছুঁড়ছে/পরক্ষণেই নায়িকা-কে নিয়ে শুচ্ছে’। শিবাশিস মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় ঢুকে পড়ছে জুরাসিক পার্ক— ‘ডায়নোসরের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল সিনেমার হলে।’ ‘বেসিক ইনস্টিংক্ট’ শীর্ষক কবিতায় শিবাশিস লেখেন— ‘শ্যারন স্টোন যখন ঝরিয়ে ফেললেন তাঁর মেঘমালা তখন তাঁর শরীর একটা ঝকঝকে আকাশ।’ আবার অন্য একটি কবিতায় শিবাশিসই লিখছেন— ‘রঙবেরঙের স্টিমার বলল যাত্রী হোন/নীল যমুনায় ঝাঁপ দিয়েছেন শ্যারন স্টোন!’ সুজিত সরকারের কবিতায় পাই “স্টিভ ম্যাকুইনস আর ডাস্টিন হফম্যানের ‘প্যাপিলন’-এর কথা।” অংশুমান করের একটি কবিতার নাম ‘জেনিফার লোপেজ’— ‘আমি জানি, জেনিফার, আপনিই শ্বাসকষ্ট—/মধ্যরাত, পাহাড়ের খাত।’ জুলিয়া রবার্টস অংশুমানের কবিতায় ধরা দেন এভাবে— ‘স্বপ্নে আজ জুলিয়া রবার্টস্‌/বহুদিন পড়ে তাই প্রেম হল ভীষণ শরীরী।’ দীপংকর দাশগুপ্তের কাছে অবশ্য হলিউডের নায়িকাদের চেয়ে প্রাধান্য পান নিজের ঘরের মানুষটিই। ‘বোকা বলেই অসংকোচে বলতে পারি/মনরো কিংবা টেইলরের চেয়ে/ঘরের গিন্নি সহজপাচ্য/এবং ভারি উপকারী।’

বিদেশি সিনেমার প্রসঙ্গে যখন কথা হচ্ছেই, অন্য ‘সিনেমা’র দিকে কি একবার উঁকিও দেব না? ব্লু ফিল্ম? তার নায়িকাদের উল্লেখও বাংলা কবিতায় বিরল নয়। মেসবাড়ির অভিজ্ঞতা-প্রসঙ্গে মনোজ দে— ‘সেসব অদ্ভুত দিন/ওহ্‌ ইয়েস লবি, পাওলি দাম, সানি লিওন কলোনি ইত্যাদি ইত্যাদি।’ প্রসঙ্গত, পাওলি দামের যে-ক্লিপিংসের প্রেক্ষিত এই কবিতায়, তা কিন্তু মোটেই নীলছবি নয়, একটি সিনেমারই দৃশ্য। মনোজ যেখানে পর্নস্টার হিসেবে সানি লিওনের পক্ষে, সেখানে সুস্নাত চৌধুরী আবার ঝুঁকছেন মিয়া খলিফার দিকে। ‘মিয়া খলিফা ও একটি আনফিট বালক’ শীর্ষক কবিতা তিনি শুরু করছেন এভাবে— ‘একটি পাতলা, আনফিট বালক আর কীই-বা করতে পারে,/যদি ভারাক্রান্ত স্তন দুলিয়ে তুমি রবীন্দ্রসংগীত শুরু কর!’

দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভণিতার পর, এবার বলিউডে প্রবেশের পালা। মুম্বাইয়ের ঝাঁ-চকচকে সিনেমা ও নায়ক-নায়িকাদের লার্জার-দ্যান-লাইফ ইমেজ বাঙালি কবিদের টেনেছে বারবার। কখনও নিজের কথা প্রসঙ্গে, কখনো-বা চরিত্রের মুখ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সেসব। শুধু নায়ক-নায়িকাই কেন! সিনেমার গায়করাও উঁকি দিয়েছেন বারবার। বাংলার ক্ষেত্রে যেমন পাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে-র নাম, বলিউডে তেমনই কিশোরকুমার, মহম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ, শচীন দেববর্মণ, আরডি বর্মণের নাম ধরা পড়েছে বাংলা কবিতায়। কখনও আবার গানের লাইনও উঠে এসেছে পঙক্তি হয়ে। ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’, ‘সাথী রে তেরে বিনা ভি কেয়া জিনা’, ‘মেরা গীত অমর কর্‌ দো’— এইসব গানের লাইন আশ্রয় পেয়েছে বাংলা কবিতায়। পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল ঘোরতামস দৃশ্যের প্রেক্ষিতে নিয়ে আসেন জনপ্রিয় হিন্দি গানের লাইন— ‘বাচ্চার চিতার কাছে/রুপোর খাঁড়ারা ওঠে, গর্ভগর্ত, নড়ে জিহ্মজিভ,/উরুব্যাদানের পল্লী, কঁহি ধুঁয়া য়ঁহা নাচেনাচে//আউয়া আউয়া।” আবার, দুজন কবির কবিতায় একই লাইন দুভাবে ধরা পড়েছে— উদাহরণ আছে এমনও। শ্রীজাত যেখানে সরাসরি গানের লাইনই উদ্ধৃত করেছেন— ‘এক অকেলি ছত্রি মেঁ যব আধে-আধে ভিগ রহে থে’, কস্তুরী সেন সেখানে এই লাইনই হাজির করেছেন কিঞ্চিৎ অন্যভাবে— ‘এক আকেলি ছতরি মেঁ/সব আধে আধে ভেজাই গোড়ার কথা!’ কবিতার ভেতরেই শুধু নয়, কবিতার শিরোনাম হিসেবেও উঠে এসেছে গানের লাইন বা সিনেমার নাম— বাংলা বা হিন্দি সব ক্ষেত্রেই।

কবিতাগুলো পড়তে-পড়তে ভাবছিলাম, বাংলা কবিতায় হিন্দি চলচ্চিত্রজগতের এত রমরমা কেন। সামাজিক ইতিহাসই দিয়ে দিল উত্তর। মোটামুটি সাতের দশক থেকেই পশ্চিমবঙ্গের জনমানসে হিন্দি সিনেমার প্রভাব বাড়তে শুরু করে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিন্দি ভাষার। কবিতাতেও দেখতে পাব, যে-যে নায়ক-নায়িকার নাম উঠে আসছে, তাঁদের অনেকেরই উত্থান সাতের দশকে। মোটামুটি সাত থেকে নয়ের দশক পর্যন্ত হিন্দি সিনেমা দাপিয়ে রাজত্ব করেছে বাংলা কবিতাজগতে। নয়ের দশকের বিশ্বায়ন ও সেইসঙ্গে ঘরে-ঘরে টেলিভিশনের ঢুকে-পড়ার প্রভাব এক্ষেত্রে অসীম। একদিকে যেমন সিনেমাহলে গিয়ে নায়ক-নায়িকাদের রংচঙে জীবনের স্বাদ নেওয়া, অন্যদিকে ঘরে টিভির সামনে আরও নিবিড়ভাবে পাওয়া তাঁদের। আর, কে না জানে, বিনোদনমাধ্যম হিসেবে বাণিজ্যিক সিনেমার গুরুত্ব কতটা! দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা থেকে পালিয়ে সিনেমার রানিং টাইম দর্শকদের সামনে হাজির করে এক মায়াজগত। দর্শকরা তাতে হাসেন, কাঁদেন, হল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরেন নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে নিয়েই। রাতে ঘুমের মধ্যে পান সেলিব্রিটি-স্পর্শ। এই দর্শকদের মধ্যে রয়েছেন কবিরাও। ফলে, তাঁদের লেখাতেও যে সেই স্বপ্নপুরীর বাসিন্দারা হানা দেবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী! কখনও আবার অবদমিত যৌনতাও প্রকাশ পেয়েছে বইকি! পর্দার নায়ক-নায়িকাদের মনে-মনে কামনা করেন অনেকেই। ‘বামন হয়ে চাঁদ ধরা’র চেষ্টা স্বপ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে মনে। প্রকাশ পায় কবিতা হিসেবে। বাস্তবের না-মেটা যৌন খিদে সিনেমার অভিনেতাদের দিয়ে যদি তৃপ্ত হয়, তাতেই শান্তি। অন্তত মন ভুলিয়ে রাখা তো যায়!

আমার পড়া কবিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র নায়ক দিলীপকুমার। অন্যদিকে, কবি যিনি, আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়, দিলীপকুমারের রাজপাটের অনেক পরের সময়ের। তারপরও আকাশের কবিতায় মুদির দোকানে সেঁটে থাকে দিলীপসাবের পোস্টার, বা হয়তো টিভিতে চলতে থাকে সিনেমা। আকাশ লেখেন— ‘মুদির দোকান থেকে উঁকি মারে দিলীপকুমার’। পাণ্ডুলিপি পড়ার সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে জানি, দিলীপসাবের জায়গায় আগে ওই পঙক্তিতে ছিলেন ‘বুড়ো দেবানন্দ’। প্রোডিউসাররা যেমন এক নায়ককে কাঁচি করে অন্য নায়ককে সিনেমায় নিয়ে আসে, আকাশও তেমনি দেবানন্দকে সরিয়ে দিলীপকুমারকে এনেছেন কবিতায়। কেন, কে জানে!

হিন্দি সিনেমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত কিছু প্রেক্ষিতও চোখ এড়ায় না। পিনাকী ঠাকুর লিখছেন— “আড়াই ঘণ্টায় রঙিন মিথ্যের/’বলাকা’ গরিবের সস্তা বোম্বাই!” ‘বলাকা’ একটি সিনেমাহলের নাম। রণজিৎ দাশের একটি কবিতা, নাম ‘প্রথম ম্যাটিনি শো’, ধরে রেখেছে দুই যুবক-যুবতীর সিনেমাহলের অন্ধকারে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি। সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় দেখা দেয় সিনেমাকে কেন্দ্র করে বাস্তব ও পরাবাস্তবের সেই যাতায়াতই— ‘আমরা মেলায় যাব, আমরা দেখব সব লালনীল হিন্দি সিনেমা/আমাদের জারজ মহব্বত পথে পথে সাদা খইয়ের মতো ওড়ে’। ‘মহব্বত’ কি এখানে শুধুই ভালোবাসার হিন্দি অনুবাদ? অমিতাভ-শাহরুখ অভিনীত সিনেমাটিও কি উঁকি দিচ্ছে না?

এরপর যে কবিতাগুলোয় আসব, সেগুলো পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, কবিরা বুঝি কাস্টিং ডিরেক্টর। কাকে কোন কবিতায় পার্ট দেবেন, তা একান্ত তাঁদেরই সিদ্ধান্ত। আগে থেকে অনুমান করা মুশকিল। এই যেমন যশোধরা রায়চৌধুরী লিখছেন— ‘দিদি আর আমি চুপি চুপি স্কুল পালিয়ে/নুন-শো মেরেছি সিনেমা পাড়ায়: দুজনেই/নানা পাটেকারে মজেছি একটা সময়ে/একটা সময়ে সানি দেওলেও মজেছি’। এখানে নানা পাটেকর আর সানি দেওলের জায়গায় অন্য-কেউও হতে পারতেন। কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সূত্রে রোল পেয়ে গেলেন এই দুজন। শিবাশিস মুখোপাধ্যায় আবার সলমন খান ও মাধুরী দীক্ষিতের পক্ষপাতী। ‘ছেলেটি অ-মাধ্যমিক, কয়লা দেয়, মেয়েটির ইংরেজি অনার্স,/হয়তো তারা প্রেমই করে কিংবা স্রেফ সলমন-মাধুরী’। এই অসম প্রেমের প্লট কতশত সিনেমার ভিত্তি, তার ইয়ত্তা নেই। এবার ভিত্তি হয়ে উঠল বাংলা কবিতারও। মহরতে সলমন-মাধুরী।

সুজিত সরকারের কবিতায় দেখতে পাই জেনারেশন গ্যাপের চিহ্ন। মেয়ে যখন হাল আমলের নায়ক-নায়িকাদের কথা বলছে, কবি ফিরে যাচ্ছেন ছয়-সাতের দশকে। “বাড়ি ফিরে রাত্তিরে/মেয়ের সঙ্গে গল্প করি।/ও আমাকে বলে/হৃত্বিক রোশনের নতুন ছবির কথা,/ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের নতুন ছবির কথা,/টিভি সিরিয়ালের কথা।/আমি ওকে বলি/ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে/বাড়িতে কাউকে না বলে/বন্ধুদের সঙ্গে/উত্তম-অপর্ণার ‘এখানে পিঞ্জর’ দেখার কথা”।

যশোধরা রায়চৌধুরীর সানি দেওল খানিক অন্যভাবে উঠে আসছেন অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতায়। ‘তার বৃদ্ধা মা-কে বলে গেছ/জরুর আসবে ফির্‌, আগলে টাইম/সানি দেওলের মত… মেঘমুক্ত, পরিবারসহ’। এক লরিচালকের কথা বোঝাতে, তার ফিরে আসা বোঝাতে ব্যবহৃত হল সানি দেওলের ‘পৌরুষ’-এর ইমেজারি। ফেরা যদি হয়ই, সানি দেওলের মতো হোক! এদিকে, সঞ্জয় মৌলিক জীবনের নায়ক-নায়িকাদের কথা বলতে গিয়ে নস্যাৎ করছেন বড়োপর্দার জাদুকরদের— ‘না, মাধুরী দীক্ষিত আমার কাছে সত্যিকারের নায়িকা নন।/কেট উইন্সলেট কিংবা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আরও আরও নন।’ একই ফর্মুলায় তাঁর কাছে নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছেন প্রসেনজিৎ, শাহরুখ খান।

সেলিম মণ্ডল বাবার মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন সলমন খান-কে। কেন-না, চোখের সমস্যায় বাবা কালো চশমা পরেছেন চোখে। সেলিম লিখছেন— “সানগ্লাস পরে বাবাকে মনে হচ্ছে সালমান খান/ছোটবেলায় নিজেকে বহুবার সালমান খান করে তোলার চেষ্টা করেছি…/খুব ইচ্ছে করছে বাবাকে আজ সল্লুভাই বলে ডাকতে/কিন্তু বাবাকে কি ‘ভাই’ ডাকা যায়?” কবিতার নাম ‘সল্লুভাই’। এই সলমনের কিন্তু বয়স নেই। তিনি নয়ের দশকের হতে পারেন, আবার এখনকারও। সানগ্লাস পরে নিজেদের নায়ক ভাবার হাস্যকর দিন কাটিয়েছি কমবেশি আমরা সবাই। কেউ সলমন খান, কেউ শাহরুখ। পর্দার নায়কদের কেন্দ্র করে সেই ছোটো-ছোটো অনুভূতিগুলোই ধরা পড়ছে বাংলা কবিতায়।

আর-সব নায়িকাকে ছেড়ে, প্রশান্ত মল্ল বেছে নিচ্ছেন বঙ্গতনয়া বিপাশা বসুকে। ‘হাঁস যেমন হাঁসির গলা চুলকে প্রস্তাব দেয়/ঠিক সেইভাবে বিপাশা বসুকে প্রস্তাব দিলাম/এক দাম্পত্য বছর সাঁতার কেটে/তুমি আমি সুখঃসুখের ভারতবর্ষ দেখব।’ ওঁদের নিভৃতে ছেড়ে আমরা বরং আরেক নায়িকার প্রতি নজর দিই। সুস্মিতা সেন। বাঙালি কবিদের এত কেন প্রিয় তিনি? আভিজাত্যের জন্য, চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য নাকি বাঙালি হওয়ার জন্য? তিন-চারজনের কবিতায় ঘুরে-ফিরে আসতে দেখেছি সুস্মিতাকে। গদ্যকার স্মরণজিৎ চক্রবর্তী অনিয়মিত হলেও কবিতা লেখেন। তাঁর একটি কবিতাতেই দেখি— ‘ভেজা পোস্টারে সুস্মিতা সেন অফিসের থেকে দিদি ফিরছেন’। একটি দৃশ্য। একটিই দৃশ্য। আর তাতেই সুস্মিতা কেমন ঘরের মেয়ে হয়ে গেলেন। আর এ-জন্যেই বুঝি আপন মনে করে অভাব-অভিযোগ-নালিশও সুস্মিতার কাছেই জানাচ্ছেন কবিরা। সোহেল ইসলামের বক্তব্য— ‘সুস্মিতা সেন আমি কখনও কোনো ন্যাংটো শ্বেতাঙ্গ দেখিনি’। এরপরে অভিযোগ ও যৌন-অবদমনের আলোছায়া খেলা করছে কবিতায়। ‘শুনেছি আপনার নাভিতে অনেক বকুল, বকুলের গন্ধ/ওখানে একটা জায়গা করে দেবেন? ভালোবাসার নামে ব্যবহার করব না’। সুবোধ সরকারের কণ্ঠে আবার সুস্মিতার প্রতি অভিমান— ‘যে দিন ম্যানিলায় সুস্মিতা সেন মিস ইউনিভার্স হল/সুস্মিতা, অভিনন্দন আপনাকে/আপনার পরিবারের সবার জন্য শুভেচ্ছা/এত নিষ্পাপ আপনার হাসি, এই দুঃখের/এত নিষ্পাপ হল কী করে?/কিন্তু আপনি এ কী বললেন?/একটা মেয়ের পূর্ণতা মাতৃত্বে? সে তার সন্তানকে অন্যদের ভালোবাসতে শেখায়।’ ঘরোয়া দৃশ্য হোক, কামনা বা নালিশ— সুস্মিতা সেন সবদিক দিয়েই আশ্রয় হয়ে উঠেছেন বাঙালি কবিদের।

কৌশিক বাজারী আবার স্মিতা পাতিলের মধ্যে আবহমানের আশ্রয় খোঁজেন। ‘স্মিতা পাতিলের ভূমিকায় বৌটির মুখ/জলজ আঁধারের দিকে ডুবে যায়’ কিংবা ‘স্মিতা পাতিলের মুখ জেগে ওঠে গ্রামীণভারতে’ তারই প্রমাণ। শ্রীজাত জুটি হিসেবে উল্লেখ করেন জিতেন্দ্র-রিনা রায় আর নাসির-শাবানার। এদিকে স্মরণজিৎ টুইঙ্কল খান্নার অনুরাগী। ‘টুইঙ্কেল খান্নাকে দেখতে খুব ভালো লাগত আমার।/তবু দেখতাম রাস্তায় পোস্টারে/কে জানে তার ঠোঁটের কাছের কাগজ ছিঁড়ে নিয়েছে/কালো কালি দিয়ে এঁকে রেখেছে গোঁফ’। ঠোঁটের কাছের কাগজ ছেঁড়া কেন? হতে পারে কোনো বিকৃতকাম মানুষের কীর্তি। আর ছবিতে কালি দিয়ে গোঁফ আঁকা— নায়িকাদের পুরুষালি করে মনে-মনে হাসা— ছেলেবেলায় এমন কে না করেছে! তবে স্মরণজিতের আফশোস কবিতা বেয়ে শেষ হয় এখানে— ‘অক্ষয়কুমারকে বিয়ে করে টুইঙ্কেল খান্না সিনেমা করাই ছেড়ে দিল।’ স্মরণজিৎ যা-ই বলুন, এক সাক্ষাৎকারে টুইঙ্কল নিজেই পরবর্তীকালে বলেছেন, অভিনয় করতে পারেন না তিনি। সিনেমা ছেড়ে বেঁচেছেন। স্মরণজিতের আফশোস, না আমাদের স্বস্তি— কাকে প্রাধান্য দেব!

ওয়েব সিরিজের বয়স এক দশকও পেরোয়নি। ফলে, কবিতায় তার হাজিরা খুঁজতে যাওয়া খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতোই। তবে, ইতিমধ্যেই জনমানসে ওয়েব সিরিজ যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে ওয়েব সিরিজ বাংলা কবিতায় ঠাঁই পেলে আশ্চর্য হব না। এই তো, অলৌকিকভাবেই, সম্প্রতি-প্রকাশিত এক পত্রিকায় পেয়ে গেলাম ‘মির্জাপুর’-এর একটি চরিত্র নিয়ে কবিতাপঙক্তি। কবি সুজিত দাস। তিনি লিখছেন— ‘এখনও পঙ্কজ ত্রিপাঠির ভালো দাঁড়ায় না বলে মির্জাপুরে কাট্টার রমরমা। পাইপগান, পাইপগান।’ বাংলা কবিতায় ওয়েব সিরিজের অনুপ্রবেশ বোধহয় এই প্রথম।

আবার বড়োপর্দায় ফিরি। হিন্দি সিনেমার কথা চলছে, আর বিগ-বি আসবেন না, তা কি হয়! বাংলা কবিতাতেও পড়েছে তাঁর দীর্ঘ ছায়া। ‘জামাই আদর’ বলা যেতে পারে কি? জয় গোস্বামী তাঁর ছোটোদের জন্য লেখা একটি কবিতায় লিখেছেন— ‘ইতিমধ্যেই দরজায় বেল/খুলতেই দেখি, কী কাণ্ড! আরে!/মুম্বই থেকে আমারই জন্য/বিগ-বি স্বয়ং এসেছেন দ্বারে!/কাবেরী বলল, কী সৌভাগ্য/আমি আপনার নিদারুণ ফ্যান!/বিগ-বি বলেন, আমাকে দেখিয়ে—/এঁর সামনে যে কী লজ্জা দেন!’ তবে জয়ের কবিতা ছোটোদের জন্যে হলেও, অন্যদের প্রেমের কবিতাতেও শাহেনশার উদার সহাবস্থান। মিলন চট্টোপাধ্যায় লেখেন— ‘নই রাজ-নার্গিস, হলাম না অমিতাভ-রেখা/তবু এই প্রেমটুকু/সিলসিলা থেকে টুকে শেখা’। সিনেমার পর্দা কীভাবে ব্যক্তিগত প্রেমসম্পর্কেও ছাপ ফেলছে, এর উদাহরণ আমরা দেখেছি আগেও। মিলনের কবিতা সেই ধারারই সংযোজন। এবং অবশ্যই জুটি হিসেবে রাজ কাপুরের সঙ্গে নার্গিস ও অমিতাভের সঙ্গে রেখার উপস্থিতি। জুটি ছাড়া কি প্রেম জমে! সুচিত্রাকে ছাড়া উত্তম-প্রেমই বা কই!

শ্রীজাত-র কবিতাতেও উঠে এসেছে ‘সিলসিলা’ সিনেমার প্রসঙ্গ। ‘নিজেকে যে আজ বড় সিলসিলার অমিতাভ লাগে/তোমার হাতযশ চোপড়া চলেছে সবার আগে আগে/কে রেখা কে জয়া তাও বুঝতে পারছি না…’। এই কবিতাতেই উল্লেখ পাই সঞ্জীবকুমারেরও। তবে, অমিতাভ বচ্চন কি এখানেই ফুরিয়ে যাবেন? তাহলে কীসের শাহেনশা তিনি! এই তো, কৌশিক বাজারী এক পথশিশুর কথা লিখছেন— ‘দুরন্ত পোস্টার দেখে নিজেকে বচ্চনের ছোটোবেলা ভাবে’, ‘পোস্টারে দুঃখী দুঃখী বচ্চনের মুখ/সেলিমের সংলাপ বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে—/মেরে পাশ মা হ্যায়— মেরে পাশ মা হ্যায়’। সিনেমাকে কেন্দ্র করে আসমুদ্রহিমাচলের এক অলঙ্ঘ্যনীয় ঘটনা উঠে এসেছে কৌশিকের এই কবিতায়, তা হল— অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিশমা। তিনি যেন কলিযুগে ঈশ্বরের প্রতিভূ, সমস্ত দুরাত্মাকে খতম করে, অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, প্রেমে বিজয়ী হয়ে, নীতির সঙ্গে আপোস না করে সদাবিরাজমান। বচ্চনের ক্ষয় নেই, বচ্চন অবিনাশী। বড়োপর্দার সম্মোহনের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ অমিতাভ বচ্চন। দশকের পর দশক ধরে কত লোক যে শুধুমাত্র তাঁকে দেখবে বলে মুম্বইয়ে ভিড় করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সর্বস্তরের মানুষের কাছে যে একজন মানুষ আশাবাদের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, অমিতাভ বচ্চন প্রমাণ করে দিয়েছেন তা।

সর্বস্তরের এবং সব বয়সের। নইলে দু-হাজার সালের জাতক, অতিতরুণ কবি পল্লবের কবিতাতেও বচ্চন-ক্যারিশমা এমন উজ্জ্বল থাকত না। পল্লব লেখেন— ‘তুমি দোমড়ানো এক কিতাব/আমি মৃত্যুপথেই যুদ্ধরত, শোলের অমিতাভ।’ বাংলা কবিতা অমিতাভ বচ্চনকে যেভাবে জায়গা দিয়েছে, তাতে তাঁর জনপ্রিয়তাই প্রমাণিত হয় আবারও। কবিরাও এড়িয়ে যেতে পারেননি তাঁকে।

তবে হ্যাঁ, বচ্চন একা নন। আরেকজন আছেন, যিনি বাংলা কবিতার আঙিনায় তাঁকে টক্কর দিতে পারেন। অবশ্য অমিতাভের মতো ‘ত্রাতা’র ইমেজ তাঁর নেই। তবে যা আছে, তা হয়তো অমিতাভ বচ্চনও তৈরি করতে পারেননি। ‘প্রেমিক’। কে এই মানুষটি?

শাহরুখ খান। তিনিও হাসান, তিনিও কাঁদান। সেইসঙ্গে, ভালোবাসায় ভাসান। যে-কারণে ‘প্রেম শিখতে হলে শাহরুখ খানের কাছ থেকে’— এমন একটা মিথও ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। তাঁর সেই সম্মোহনী শক্তিকে এড়াতে পারেনি বাংলা কবিতাও। নব্বইয়ের দশক থেকে এখন পর্যন্ত তিনি হাসি দিয়ে মাত করে চলেছেন দর্শকদের, কবিদেরও। আর, ঘরের লোক ভেবে কবিরাও দিল-উজাড় ভালোবেসেছে তাঁকে। যে-কারণে মিতুল দত্ত লিখে ফেলেন— ‘শারুখখানের সঙ্গে বোঝাপড়া বাকি আছে/ও কেন আমার মুখে মুতে দিয়ে আনবাড়ি গেল!’ মনে পড়ে যায় রাধার অভিমান— ‘আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া’। শাহরুখ কি ‘কলির কেষ্ট’? পর্দার নায়কের ওপর এমন মান করতে পারে কেউ? নিজের মান ভাঙতে উদ্যোগী হয় নিজেই? এই তো, মিতুল লিখছেন, ওই কবিতাতেই— ‘শারুখের সঙ্গে আমি পাবলিক টয়লেটে ঢুকে পড়ি/রাগটাগ জল হয়ে যায়’। যেখানেই তুমি যাও হে সখা, আমি যাব পিছে-পিছে। ভালো যখন বাসিয়েছ, ছাড়ান নেই আর।

এই শাহরুখ-সম্মোহনের আরেক নজির পাই রূপক চক্রবর্তীর ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ শীর্ষক কবিতায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ইভিনিং শো-এ তিন বোন হলে গেছে সিনেমা দেখতে। ব্ল্যাকে কেটেছে টিকিট। দেখতে দেখতে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় দমবন্ধ হয়ে আসছে তিনজনেরই। কেন? ‘কখন কাজলকে ছেড়ে আমাদের দিকে হাত বাড়াবে শাহরুখ খান।’ পর্দার নায়ককে নিজের সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করা, কিংবা নিজেকেই পর্দার নায়িকা ভাবা— সিনেমা যুগে-যুগে এ-কাজ করেই চলেছে। কিন্তু ঘোর ও ঈর্ষা কোন পর্যায়ে গেলে কাজলকে ছেড়ে দর্শক নিজের দিকে হাত বাড়ানোর কথা বলে? আমি নিশ্চিত, ওই তিন বোন বাড়ি ফিরে রাতে নিজের-নিজের মতো করে শাহরুখকে পেয়েছিলেন। পরদিন সকালে চুলোচুলি হয়নি তাঁদের?

আবার, কখনও কবিতায় নামোল্লেখ না-হলেও, ঘোরতর উপস্থিত শাহরুখ। কেন-না কবিতার নাম, ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’। কবি জয়াশিস ঘোষ। “পৃথিবীর শেষ স্টেশনে বসে আছে মেয়েটা/ট্রেনের প্রতীক্ষায়/বাবা মুঠো খুলে দিয়েছে/’যা, জি লে আপনি জিন্দেগি’।” পাঠক, এই কবিতার ভেতরে কি কিংবদন্তি-হয়ে-যাওয়া ম্যান্ডোলিনের সুর শুনতে পাচ্ছেন? সর্ষেক্ষেত? ছেড়ে-যাওয়া ট্রেন ও ছুটন্ত নায়িকার দিকে নায়কের হাত বাড়িয়ে দেওয়া? ওই বাড়িয়ে-দেওয়া হাত ধরেছে বাংলা কবিতাও। উঠে পড়েছে ট্রেনে। কেন-না, ‘কিং খান’কে ফেরানো যায় না।

জয় গোস্বামীর কবিতায়, এক যুবক, পরিচিত একটি মেয়েকে বলছে— ‘চল নবীনা হলে/সন্দেবেলা শারুক খানের বই দেখতে যাই!’ কবিতার নাম ‘বাজিগর’। মেয়েটি নিম্নমধ্যবিত্ত, রিফিউজি পরিবারের। বাড়ি-বাড়ি কর্মসহায়িকার কাজ করে উপার্জন। সেদিন বিকেলে কাজ নেই। অতএব প্রস্তাব, দেখতে চল্‌ শাহরুখের সিনেমা। প্রচ্ছন্নে প্রেম ঘনীভূত হওয়ার দুরুদুরু-আকাঙ্ক্ষা। কেন-না পর্দায় যিনি থাকবেন, তিনি পাষাণেরও মন গলিয়ে দেন। মেয়েটির মন গলবে না! আবার, এর ঠিক বিপরীতে, পৌরুষের প্রতীক হয়ে আসছেন শাহরুখ। অবদমিত যৌনতার প্রতীক। প্রিয় মানুষটি যেন শাহরুখের মতো হয়। পঙ্কজ চক্রবর্তীর কবিতায় সেই আভাস। ‘হলুদ বই পড়ে না দাঁড়ালে তুমি বল শাহরুখ হতে। হবে না থ্রি-এক্স, হার্ডকোর চাই।’

গত পাঁচ দশকের হিন্দি সিনেমার দুই স্তম্ভ অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খান। বাংলা কবিতায় দুজনেই দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। নিজের-নিজের মতো করে প্রভাব ফেলেছেন কবিদের মনে। কবিরা, সেই প্রভাব সঞ্চালিত করে দিয়েছেন পাঠকের মনে। এই বাস্তুতন্ত্রের মূলে কী?

বিনোদন, বিনোদন আর বিনোদন। সুপারহিট সিনেমার প্রভাব কখন চুঁইয়ে-চুঁইয়ে এসে পড়েছে বাংলা কবিতাতেও। আর আমি ভাবছি, সিনেমার মতো কবিতাও তো এক শিল্পমাধ্যম, এর গতি তাহলে এত শ্লথ কেন! উত্তরও সেই একই— ‘বিনোদন’। কবিতা অন্যকে বিনোদন দেওয়ার জন্য জন্ম নেয় না। এই সততাই কবিতার পুঁজি। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাব, যে-সব কবিতায় বলিউডি প্রসঙ্গ এসেছে, সেগুলির অধিকাংশই উঁচু-তারে বাঁধা। সিনেমার লাউডনেস খানিক ছাপ ফেলেছে কবিতাতেও। তা অবশ্য হতেই হত, কেন-না অন্তর্মুখী বা সংকেত-নির্ভর কবিতায় নায়ক-নায়িকাদের নাম খাপ খাওয়ানো খানিক কঠিনই। যা লার্জার দ্যান লাইফ, তা ধরার জন্য কবিতাকেও লার্জ না-হোক, কয়েক চুমুক অন্তত দিতেই হত।

এসব তত্ত্বকথা অবশ্য লিখতে হয় বলে লেখা। আমি আসলে মনে-মনে ভাবছি, ঐশ্বর্য রাই-এর নাম খুঁজে পেলাম না একবারও! গুরু দত্ত কিংবা রাজেশ খান্নার না-থাকা তাও আমসি-মুখে মেনে নিতে রাজি, কিন্তু ঐশ্বর্য রাই! এ-ব্যথা কারেই-বা বোঝাব আর! (দীর্ঘশ্বাস)

গ্রন্থঋণ

আবার প্রথম থেকে পড়ো – যশোধরা রায়চৌধুরী, প্রেমের সাইজ বত্রিশ – সুদীপ চক্রবর্তী, বিয়োগ শেখার স্কুল – সম্বিত বসু, ধুলোয় ঢাকা প্রচ্ছদ – সঞ্জয় মৌলিক, এখানে নিয়ম তৈরি করে প্রলেতারিয়েত – মনোজ দে, ন্যুড স্টাডি – পিনাকী ঠাকুর, ধানখেতে বৃষ্টির কবিতা – রণজিৎ দাশ, শ্রেষ্ঠ কবিতা – শিবাশিস মুখোপাধ্যায়, শ্রেষ্ঠ কবিতা – পিনাকী ঠাকুর, অজানায় শুরু, না-জানায় শেষ – সুজিত সরকার, একটি অল্পবয়সী ঘুম – রাণা রায়চচৌধুরী, জিনসেং অরণ্যের গাথা – অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়, গুজবে কান দেবেন – সুজিত দাস, আহারলিপি – সুদীপ চট্টোপাধ্যায়, সরে দাঁড়ালেন লেন্ডল – অংশুমান কর, ধীরে, বলো অকস্মাৎ – কস্তুরী সেন, তথ্যচিত্র – কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়, ছোটোগল্প – সুস্নাত চৌধুরী, রাত্রি চতুর্দশী – পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, শীত তারা বিভূষিতা – দীপ্তপ্রকাশ চক্রবর্তী, বাচস্পতিপাড়া রোড – অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়, মায়াজন্ম – সেলিম মণ্ডল, মাকাল ঠাকুর – প্রশান্ত মল্ল, রাজনীতি করবেন না – সুবোধ সরকার, আব্বাচরিত – সোহেল ইসলাম, পরিগন্ধের শহর – স্মরণজিৎ চক্রবর্তী, হুলোরা টুলের পাশে – জয় গোস্বামী, দোয়াতে যুবতী চাঁদ – মিলন চট্টোপাধ্যায়, সেই কালো ছেলেটা – দীপংকর দাশগুপ্ত, ছোটদের চিড়িয়াখানা – শ্রীজাত, কবিতা ও একটি মেয়ে – পল্লব, অকালবৈশাখী – শ্রীজাত, ম্যাটিনিতে রূপকথা টকীজে – কৌশিক বাজারী, পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে – আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়, ছায়াপুরুষের রক্তমাংস – অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়, আমাদের কালোসাম্যগান – মিতুল দত্ত, যখন মহাভারত লিখছিলাম – রূপক চক্রবর্তী, নির্বাচিত কবিতা – জয়াশিস ঘোষ, জগৎবাড়ি – জয় গোস্বামী, লালার বিগ্রহ – পঙ্কজ চক্রবর্তী, ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ শারদ সংখ্যা ১৪২৯

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার