Categories
2022_feb goddyo

শ্রদ্ধা জ্ঞাপন । কমলেশ রাহারায়

শ্র দ্ধা  জ্ঞা প ন

ক ম লে শ  রা হা রা য়

কবির মৃত্যু নেই

১৯৪৬ - ২০২১

কবি কমলেশ রাহারায়ের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের রংপুর জেলার উলিপুর গ্রামে, ১৯৪৬ সালের ৬ই মার্চ। দেশভাগের পর পিতার হাত ধরে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন আলিপুরদুয়ারে। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ১৯৭১ সালে আলিপুরদুয়ার কলেজ থেকে বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতক হন ও স্বাস্থ্যবিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর লেখালিখির শুরু ষাটের দশকে। সম্পাদনা করেছেন ‘মাদল’, ‘সাগ্নিক’, ‘শিলালিপি’ পত্রিকা । পেয়েছেন অনেক স্মারক সম্মান। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলি হল ‘বিপরীত বসন্ত’, ‘লিনোকাটে তাপ নিচ্ছি’।

 

তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন ২০০৬ সালে। যৌবনকালে তাঁর বাড়ি ছিল স্থানীয় কবিদের এক পরম আড্ডার স্থল। তাঁর সুযোগ্য পুত্র অরুণাভ রাহারায় ইতিমধ্যে বাংলা কবিতার তরুণ প্রজন্মের একটি উজ্জ্বল মুখ। অরুণাভকে আমাদের সমবেদনা। কবি কমলেশ রাহারায়কে আমাদের শ্রদ্ধা। কবির মৃত্যু নেই। তিনি অমরত্ব পান তাঁর রচনায়।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

শ্রদ্ধা জ্ঞাপন । প্রভাত চৌধুরী

শ্র দ্ধা  জ্ঞা প ন

প্র ভা ত   চৌ ধু রী

“আমার মৃত্যুতে কাঁদবে না গীতবিতান পড়বে।”

১৯৪৪ - ২০২২

বাংলা কবিতায় ‘উত্তরাধুনিক কবিতা’-র পুরোধা কবি প্রভাত চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৪ সালে বাঁকুড়া জেলার হাটকেষ্টনগরে। ষাটের দশকে কৃত্তিবাস পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের ভিতর দিয়ে তাঁর লেখালিখি শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শুধু প্রেমিকার জন্য’। প্রায় ১০ বছর সাহিত্যের জগত থেকে দূরে সরে থাকার পর ১৯৯৩ সালে শুরু করেন তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘কবিতা পাক্ষিক’ পত্রিকা। এবং অচিরেই তা হয়ে ওঠে তরুণ কবিদের একটি পরম ভরসাস্থল, বাংলা কবিতা নিয়ে পরীক্ষার নিরীক্ষার একটি নির্ভরযোগ্য স্থান। মৃত্যুর আগে অবধি তরুণ কবিরাই ছিল তাঁর পরম বন্ধুজন।

 

পত্রিকার সাথে সাথে ‘কবিতা পাক্ষিক’ প্রকাশনীরও যাত্রা শুরু হয়। কত যে তরুণ কবির কবিতার বই ‘কবিতা পাক্ষিক’ থেকে প্রকাশ পায় তার ঠিক নেই। সেই সাথে একে একে প্রকাশিত হতে থাকে অনবদ্য বইগুলি। ১৯৯৪ সালে ‘সাদা খাতা’, ১৯৯৭ সালে ‘সাক্ষাৎকার’, ১৯৯৮-এ ‘আবার সাক্ষাৎকার’। অন্যান্য বইগুলির মধ্যে ‘নোটবই’, ‘উত্তরপর্বের কবিতা’, ‘এইসব হল্লাগুল্লা’, ‘সুসমাচার’ উল্লেখযোগ্য।

 

একটা কথা তিনি খুব জোরের সঙ্গে বলতেন, “আমি রবীন্দ্রনাথের হয়ে কবিতা লিখি, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে যা লিখতেন আমি তা-ই লিখি।” তিনিই বলেছিলেন “আমার মৃত্যুতে কাঁদবে না গীতবিতান পড়বে।” আদ্যন্ত রবীন্দ্রনাথপ্রেমী কোনো কিছুর সাথে আপোষহীন তরুণ কবিদের পরম আপনজন এই মানুষটি বাংলা কবিতায় অজেয় অমর হয়ে থাকবেনই এই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ৬

উ দা সী ন  তাঁ ত ঘ র পর্ব ৬

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

pankaj

সৌজন্যসংখ্যা নেই, স্তাবকতা আছে

ছোটো পত্রিকার লেখকের সম্মানের ব্যাপারে আজ আর সম্পাদকের মাথাব্যথা নেই। লেখা জোগাড়ের তৎপরতা ছাড়া কোনো বাড়তি কর্তব্য অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। সম্পাদক চান লেখকের তরফে কৃতজ্ঞতার ওম, ধন্যতার তৃষ্ণার্ত চাহনি। আত্মগৌরবের বশে যেকোনো সম্মানহানি নিয়েও একজন লেখক নীরব থাকেন। ছোটো পত্রিকার সমস্ত মৌলবাদ মনে মনে মেনে নেন। তিনি জানেন বড়ো পত্রিকার বিরুদ্ধাচরণ বাজারে খায় বেশি। ছোটো পত্রিকার বিপক্ষে গেলে তাঁকে ভিটেমাটি ছাড়তে হবে। অতএব নমনীয় নীরবতা। শুধুমাত্র দু-একটি মুদ্রিত অক্ষরের জন্য আজীবন আত্মসমর্পণ।

সমস্ত বিরুদ্ধতা বাদ দিয়ে আপাতত বলা যাক সৌজন্যসংখ্যার কথা। যেকোনো পত্রিকায় একটি অক্ষর লিখলেও একজন লেখকের সৌজন্যসংখ্যা পাওয়ার অধিকার আছে। রুচিশীল সম্পাদকমাত্রই তা জানেন। এবং সেই কাজে দীর্ঘদিন তাঁরা কোনো কার্পণ্য করেননি। অথচ গত কুড়ি বছরে এই বিষয়টি দ্রুত পাল্টে গেছে। লেখককে,প্রধানত তরুণ লেখককে সৌজন্যসংখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বেশির ভাগ সম্পাদক অস্বীকার করে চলেছেন। লেখকের সাম্মানিক দেওয়ার ব্যাপারে সমস্ত সম্পাদকই আর্থিক সামর্থ্যের কথা তোলেন এবং তা একপ্রকার স্বীকৃত রীতি কিন্তু সৌজন্যসংখ্যার কার্পণ্য দেখে সন্দেহ হয় এরা আদৌ সম্পাদক কিনা! ছোটো পত্রিকার ‘ছোটো’ সম্পাদককে অতঃপর কী বলা যায় যখন চতুর্দিকে আত্মপ্রত্যয়হীন, আত্মসম্মানহীন লেখক সরবরাহ।

ঠিক কবে থেকে এই অসংগতির সূত্রপাত? কবে থেকে এই দীনতা? খুব মোটাদাগে বলা যায় ১৯৯৯ সাল থেকে। অর্থাৎ জীবনানন্দের জন্মশতবর্ষ। সেই প্রথম বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন প্রত্যক্ষ করল স্পেশাল ইস্যুর বাজারমূল্য আছে। স্পেশাল ইস‌্যু ঘরের টাকা ঘরে ফিরিয়ে আনে। পাঁচশো পাতার ঢাউস ম্যাগাজিন নিমেষে ফুরোয়। ফলত মৌলিক গল্প কবিতার দিন সঙ্কুচিত হয়ে গেল। ভালো কবিতা পাওয়া গেলেও ভালো প্রবন্ধ, গল্প অনিশ্চিত এবং সময়সাপেক্ষ। অতএব নিয়মিত পত্রিকার জন্য প্রয়োজন হল স্পেশাল ইস্যুর। ‘গবেষণা’ এবং ‘সংরক্ষণযোগ্য’ এই দুটি প্রতারক শব্দের বানিজ্য বিস্তার ঘটল। লিটল ম্যাগাজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসপ্রেমী হয়ে উঠল। যেকোনো লেখকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অজস্র মোচ্ছব, দরিদ্র নরনারায়ণ সেবা। ঝুঁকি কম, সাফল্য বেশি। সম্পাদক শুধু প্রাথমিক ছক কষে নেন। তারপর দুএকজন মান্য সমালোচক, অজস্র প্রস্তুতিহীন অধ্যাপক এবং গবেষককে বই বা বিষয় ভাগ বাটোয়ারা করে দেন। ভাবনাহীন, উদ্ধৃতিসম্বল রাশি রাশি লেখায় সংকলিত পত্রিকা গায়ে গতরে ফুলে ওঠে। পাঠক আকৃতি দেখেই ভাবে সংগ্রহযোগ্য। আসন্ন গবেষক কিনে নেন ভবিষ্যতের  রেফারেন্স হিসেবে। অধ্যাপক কেনেন সামান্য আপডেট থাকার লজ্জা নিয়ে কিংবা তাঁর গবেষকের গবেষণার গ্রন্থপঞ্জী সমৃদ্ধ করতে। সবই আগামীর জন্য।কেউ পড়েন না। শুধু পাঁচশত পাতার  দৃশ্যসুখ। এতেই খুশি তাবৎ ছোটো পত্রিকার সম্পাদক।

এর সামগ্রিক ক্ষতির দিকে আমাদের লক্ষ্য নেই। শুধু বিস্মৃতির পুনরুদ্ধার আর চর্বিতচর্বণ। নতুন সৃষ্টির জন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে এইসব বৃহৎ সংখ্যার লেখককুল মূলত অপ্রস্তুত অধ্যাপক অথবা গবেষক। তাঁদের সৌজন্য সংখ্যা না দিলেও চলে। প্রমোশন অথবা ইন্টারভিউ বোর্ডে নম্বরের জন্য লেখা ছাপলেই তাঁরা ধন্য হয়ে যান। নিজেরাই সংগ্রহ করে নেন। এমনকী পয়সা দিয়ে লেখা ছাপতেও দ্বিধাবোধ করেন না। আর এই পথেই ‘ সংগ্রহযোগ্য’ অপরিণামদর্শী লিটল ম্যাগাজিনের সাফল্য আসে। দু-একটি পুরস্কার জুটে যায়। লিটল ম্যাগাজিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে অ্যাকাডেমিক পরিসরে। এই তো চেয়েছিলাম আমরা। প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে পাল্টা এক দুর্ভেদ্য প্রতিষ্ঠান। এখন অপেক্ষায় আছি ‘ মেমসাহেব’ গ্রন্থের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের।

যেসব সম্পাদক সৌজন্যসংখ্যা দিতে চান না তাঁদের তরফে আর্থিক সামর্থ্যের কথা ওঠে। একটি পাঁচশো পাতার লিটল ম্যাগাজিন করতে যে প্রচুর খরচ হয় সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিজ্ঞাপনের সৌভাগ্য সকলের থাকে না। কিন্তু সম্পাদক কাগজ,প্রেস, বাঁধাই সব ব্যাপারে যখন খরচ করতে প্রস্তুত তখন সৌজন্যসংখ্যা দিতে কার্পণ্য কেন? লেখকের সাম্মানিক তো কবেই বাতিল হয়ে গেছে! একজন সম্পাদক যখন বাজেট করেন তখন লেখক কপি তার অন্তর্ভুক্ত হবে না কেন? যাঁর আর্থিক সামর্থ্য নেই তাঁকে পাঁচশো পাতার স্পেশাল ইস‌্যু করার দিব্যি কে দিয়েছে? কী প্রয়োজন যদি লেখকের সম্মানটুকু না থাকে? লেখককে যে সম্পাদক করুণা করেন তাঁর কি আদৌ সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা আছে? রুচিহীন এইসব মানুষ পথ ছেড়ে দাঁড়াবেন আমরা প্রত্যাশা করি। যাঁরা ‘ সৌজন্যসংখ্যা নেই জেনেই লেখা পাঠাবেন’ এই মর্মে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেন তাদের রুচিহীন ঔদ্ধত্যের কাছে বাংলা সাহিত্য কিছু প্রত্যাশা করে না। যাঁরা সাতশো কবির শারদীয়া সম্মেলন করেন তাঁরাও নিশ্চিন্ত থাকুন খ্যাতিপ্রত্যাশী কাঙাল কবির অভাব হবে না। নিজের কবিতাটি মুহুর্তে ফেসবুকে তুলে দেবার দ্বিধাটুকু আজ আর কোথাও অবশিষ্ট নেই। এসব জেনেই তরুণ কবির সামনে তাঁরা মেলে ধরেন স্বপ্নের চাষযোগ্য জমি। কেউই ভরসা রাখেন না এত কবিতার ভীড়ে তাঁর কবিতা কেউ পড়বে। শুধু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে লটকে দেওয়া মুহুর্তের অপেক্ষা।

মনে পড়ে নব্বইয়ের মফস্সলের দিনগুলির কথা। ছোটো পত্রিকার অভাব নেই। কবিসম্মেলনের অভাব নেই। অজস্র পত্রিকা, সস্তার কাগজ, সাধারণ প্রচ্ছদ, বাজে ছাপা এবং ক্ষীণকায় আয়তন। কোনো সংখ্যা চার ফর্মা হলে রীতিমতো মুগ্ধতা আর ঈর্ষা তৈরি হত। রবিবারের কবিসম্মেলনে দেখা হলে লেখক কপি তুলে দেওয়া হত। যাদের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ নেই পত্রিকা দুভাঁজ করে সাদা কাগজে ঠিকানা লিখে বুক পোস্ট করা হত। তখন অবশ্য ভারতীয় ডাক এত উদাসীন এবং অকর্মণ্য ছিল না। আজ প্রযুক্তির দৌলতে মুদ্রণ,প্রচ্ছদ এমনকী যত্ন নিয়ে লেখা ছাপার ব্যাপারে আমরা অনেক অগ্রসর। অথচ দেহে ক্যানসার। মাথায় মুদ্রাদোষ। মনে রুচিহীনতা। আজ বেশিরভাগ লিটল ম্যাগাজিন যোগাযোগের সিঁড়ি। সম্পাদকের যশ, খ্যাতি, গোপন যোগাযোগের  বিড়ম্বনার সঙ্গে তার ভাগ্য জড়িত। রাজনৈতিক অভিসার তার নিয়তি।

এবার খুলে যাক ছদ্মবেশ। গবেষণার নামে মেদবৃদ্ধির নির্লজ্জ বেহায়াপনা বন্ধ হোক। পত্রিকার বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হোক লেখকের জন্য সামান্য সাম্মানিক এবং যথানিয়মে লেখককপি দেবার সৌজন্য। শুধু সংকলন লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম নয়। স্পেশাল ইস্যুকে অস্বীকার করছি না। কিন্তু তাঁর দৃষ্টান্ত হতে পারে সুদূর এক্ষণ,ধ্রুবপদ বা এখনও জীবিত দাহপত্র,আচমন পত্রিকার কাজগুলি। হে বৃহৎ  লিটল ম্যাগাজিনের অপ্রতিরোধ্য সম্পাদক, আপনি আর্থিক সামর্থ্যের দোহাই দিয়ে ক্ষমতাহীন অথবা তরুণ লেখককে সৌজন্যসংখ্যা দেন না জানি কিন্তু গোপনে শঙ্খ ঘোষ বা কিংবদন্তি কোনো বিদ্বজ্জনের পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা অর্ঘ্যের খোঁজ আমরা রাখি। প্রত্যাখ্যান জরুরি অথচ উপায় নেই। তবু গোপন প্রতিরোধ কখনও কখনও দেখা যায়। তাই লেখা চাইবার আগে মনে রাখবেন মনীন্দ্র গুপ্ত বা দেবেশ রায়ের মেধা আমাদের নাও থাকতে পারে কিন্তু সুবোধ সরকার বা জয় গোস্বামীর পাদটীকা হওয়ার জন্য আমরা জন্মাইনি।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
editorial

Editorial-February

সম্পাদকীয়

রবিবার, ৩০শে মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th February 2022

ফেব্রুয়ারি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মাস, আবার এই মাস বসন্তের মাসও, ভালোবাসাবাসির মাস, সঙ্গে থাকার মাস কিংবা হয়তো ছেড়ে চলে যাবারও! বাংলা ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই আজ অবহেলিত, অনেকে বাংলা বলতে লজ্জা পান। সন্তান বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে বেশি স্বচ্ছন্দ, সেটা জানাতেই আজকের পিতামাতা-রা গর্ব বোধ করেন। রফিক, জব্বার, শফিউল, বরকত-সহ সেদিনের সহযোদ্ধারা আজকের দিনের এই চিত্র দেখলে সম্ভবত আবারও অন্য এক আন্দোলন শুরু করতেন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন সব মানুষের খুব অভাব টের পাওয়া যায় চারিদিকে তাকালে। তবু ভরসার কথা, বাংলা ভাষাকেই অবলম্বন করে এখনো লেখা হয় সাহিত্য। এই ভাষাকেই কেন্দ্র করে চলে নানা মেলা, সম্মেলন, পাঠ। এই ভাষার যত্নে আরো অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে আমাদের, এ আমাদের আদরের ভাষা, গর্বের ভাষা, আমাদের প্রেমের ভাষা।

এই মাসের হাওয়ায় অন্য গন্ধ আছে, মন এলোমেলো করা দিন ভেসে আসে রোজ। ঘন রোদের দুপুরে আচমকা পৃথিবীটা শূন্য মনে হয়, ভিড় করে আসে অজস্র মুহূর্তের বাহার। বাড়ি ফিরে কেউ কলম টেনে নেয়, অথবা কেউ ঘুমের ওষুধ… এই মাস দূরে ঠেলে দেয়, কিংবা কাউকে আশ্রয় দেয় কাছে।

দশজন বিশিষ্ট কবির প্রেমের কবিতার পুনর্মুদ্রণে সাজানো আমাদের এবারের ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’র আয়োজন। সঙ্গে রয়েছে বাকি নিয়মিত বিভাগগুলিও। নতুনভাবে শুরু হচ্ছে কিছু বিভাগ। সব মিলিয়ে ভালোবাসা জমে উঠুক কবিতা, গল্প, গদ্য নিয়ে। ভাষা তৈরি হোক বেঁচে থাকার, অধিকার বজায় রাখার।

কবি জয়দেব বসু’র একটি কবিতা এই ভালোবাসার মাসে, এই ভাষার মাসে পড়ে ফেলা যাক-

২১ শে ফেব্রুয়ারি বা ১৯শে মার্চ : তোমাকে

 

তুমি দেবী চৌধুরানী, আমি ব্রজেশ্বর

আমি তোমার আশকারাতে চণ্ডাল, বর্বর

 

তুমি আমার গোসল-পানি, আমি কানের দুল

তুমি আমার বেগুন দিয়া ইলশা মাছের ঝুল

 

তুমি আমার নারায়ণগঞ্জ, আমি রমনার মাঠ

আমি সারেং, অপেক্ষাতে তুমি স্টিমার-ঘাট

 

তুমি আমার কুণ্ডলিনী, আমি তোমার পীর

তুমি হইলে জয়নাব আর আমি যুধিষ্ঠির 

 

ভালোবাসবো সুফি মতে, বিয়ে করবো কন্ঠী

বদল করে, যদি আমায় পুরুষ ভাবো অন্তিম

 

কে ঈশ্বর? পাত্তা দিই না, অন্ন আজো ভূমা

ফজর কালে সোহাগ করি, আহ্নিকে দিই চুমা

 

তোমায় দেখে অন্ধ ভোলা, উন্মাদ অ্যান্টনি

ঈশ্বরেরও অধিক তুমি, ঈশ্বরী পাটনী

Categories
2022_feb kobita

১০টি প্রেমের কবিতা

১০টি প্রেমের কবিতা

জীবনানন্দ দাশ

শঙ্খমালা

কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে

সে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,

বলিল, তোমারে চাই:

বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ

খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি— কুয়াশার পাখনায়—

সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক

জোনাকির দেহ হতে— খুঁজেছি তোমারে সেইখানে—

ধূসর পেঁচার মতো ডানা মেলে অঘ্রানের অন্ধকারে

ধানসিড়ি বেয়ে বেয়ে

সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে  

তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।

 

দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা;

সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে যেই পাখি দেয় ধরা—

বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর,

শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ শোনে যার স্বর।

 

কড়ির মতন শাদা মুখ তার,

দুইখানা হাত তার হিম;

চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম

চিতা জ্বলে: দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়

সে আগুনে হায়।

 

চোখে তার

যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!

স্তন তার

করুণ শঙ্খের মতো— দুধে আর্দ্র— কবেকার শঙ্খিনীমালার!

এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।

আল মাহমুদ

সোনালি কাবিন

 

সোনার দিনার নেই,  দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনহীন হাত দু’টি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রূকুটি;
ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,
ছলনা জানি না বলে আর কোনো ব‍্যবসা শিখিনি;
দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন
আমার তো নেই সখী, যেই পণ‍্যে অলংকার কিনি।
বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল
পৌরুষ আবৃত করে জলপাই’র পাতাও থাকবে না;
তুমি যদি খাও তবে আমাকে দিও সেই ফল
জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা
পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;
দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।

 

 

ঘুরিয়ে গলায় বাঁক ওঠো বুনো হংসিনী আমার
পালক উদাম করে দাও উষ্ণ অঙ্গের আরাম,
নিসর্গ নমিত করে যায় দিন, পুলকের দ্বার
মুক্ত করে দেবে এই শব্দবিদ কোবিদের নাম।
কক্কার শব্দের শর আরণ‍্যক আত্মার আদেশ
আঠারোটি ডাক দেয় কান পেতে শোনো অষ্টাদশী ,
আঙুলে লুলিত করো বন্ধবেণী, সাপিনী বিশেষ
সুনীল চাদরে এসো দুই তৃষ্ণা নগ্ন হয়ে বসি।
ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দু’টি জলের আওয়াজ–
তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত‍্যকায়
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ
উগোল মাছের মাংস তৃপ্তি হোক তোমার কাদায়,
ঠোঁটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করে নর্ম কারুকাজ
দ্রুত ডুবে যাই এসো ঘূর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।

শঙ্খ ঘোষ

মিলের জন্য ব‍্যক্তিগত

 

ওই হাতে হাত মুক্তি পেলে জেগে ওঠেন ব‍্যক্তিগত

তখন আমি সবার মুখের উৎস দেখি তোমার মতো।

শিরায় শিরায় মহীরুহ ছড়িয়ে দেয় আপন বূ্্যহ

প্রগলভতার উজ্জ্বলতা তখনই হয় লজ্জানত

আনন্দে চোখ কাঁপতে থাকে,  বুকের নীচে পূর্ণ ক্ষত।

 

 

এখন লেগেছে গায়ে বড়ো বেশি ব‍্যক্তিগত হাওয়া

এখন উড়েছে সব ধুলো

আকাশের দিকে আর পথেরও ধমনী  দেয় সাড়া

ভুলে যেয়ো সব কিছু ভুলো

এখন সমস্ত চোখে লুকোনো দেখেছি দূর ফেরি

হয়তো-বা এও খুব দেরি

এখন শহর থেকে শহরের স্মৃতিমুখে যাওয়া

এখন লেগেছে গায়ে বড়ো বেশি ব‍্যক্তিগত হাওয়া

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রেম বিষয়ক কিছু কথা

কবি, এবার সত্যি করে বলুন তো, মধ্য গগন পেরিয়ে সূর্য এখন

                         চলে যাচ্ছে মধ্য বয়েসে,  যেমন আপনার বয়েস,

প্রথম ফুল ফোটার মতন যৌবন উদগমে এবং বাতাসে বন‍্যার জলের মতন

                                         আরও অনেক বছর

আপনি  যে সব প্রেমের কবিতা লিখেছেন, ঠিক যেন

নেশাগ্রস্তের মতন প্রেম,

এই প্রেমের দাপট কি আপনার এই বয়েসেও থাকে? প্রেম কি

                           সত্যিই কখনো পুরনো হয় না, হারিয়ে যায় না?

প্রশ্ন শুনে কবি স্মিতহাস‍্যে বললেন, তুমি সেই গল্পটা

                             জানো না বুঝি?

একজন রবীন্দ্রনাথকে প্ল‍্যানচেটে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল, গুরুদেব,

                              মৃত্যুর পর সত্যিই কি স্বর্গটর্গ…

তরুণ প্রশ্নকারীটি ঈষৎ বিদ্রূপের সুরে বলল, আপনি আমার

                  উত্তর এড়িয়ে গিয়ে নিজেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করলেন?

                  বুড়ো বয়েসে বুঝি এরকম হয়?

                  আমি পরকাল কিংবা স্বর্গ-নরক নিয়ে…

                  কিন্তু প্রেম,  সে কি ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু, কিংবা

                  চোখ খোলা স্বপ্ন, কিংবা চার দেয়ালে বন্দির একটিমাত্র জানলা?

কবি হাসলেন, রবীন্দ্রনাথের কৌতুকটি তুমি বলতেই দিলে না

তা হলে প্রথম থেকেই এত উপমা দিচ্ছিলে কেন?

এসব প্রশ্ন করতে হয় সোজাসুজি!

তরুণটি বলল ঠিক আছে, স্পষ্টাস্পষ্টিই জিজ্ঞেস করছি, প্রেম

                   কতদিন টেকে বলুন তো? ক’ মাস?  ক’ বছর?

                   একজনের সঙ্গে আজীবন প্রেম কি সম্ভব?

কবি মুচকি হেসে বললেন, আমার সোজাসুজি উত্তর, তোমায় বলব কেন?

তরুণটি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ব‍্যাস, ভয় পেয়ে গেলেন, ভাবলেন

                   বুঝি আপনার ওসব মাখো মাখো প্রেমের কবিতাগুলো

                                                      আর কেউ পড়বে না?

কবি বললেন, তুমি এবার চাঁছাছোলা ভাষায় কথা বলছ

                                  তবে আমি উপমা শুরু করি?

প্রেম একটা নদী। আসলে নদী বলে কিছু নেই অথচ

                              পৃথিবী ভর্তি নদীর কত নাম। কত কাব‍্য।

আজ তুমি একটা নদীতে স্নান করতে গেলে, কী সম্ভোগের দাপাদাপি

এক বছর পরে যাও, সেই নদীর অন্য জল,  তুমিও অন্য মানুষ

ফুল আর ভ্রমরকে কতবার মেলানো হয়েছে, ফুল দু’একদিনে ঝরে যায়

                                ভ্রমরেরই বা কতটুকু আয়ু?

তবু ফুল ফুটতেই থাকে, ভ্রমরও আসে গুন গুনিয়ে

                                যেন একই ফুল, একই ভ্রমর 

 

তরুণটি বলল, আপনি কিন্তু এখনো উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন

কবি বললেন, উপমা মাত্রই তো এড়িয়ে যাওয়া, তুমি

                                  মধ্য গগনের কথা বলছিলে

কেন জানতে চাওনি, এই বয়সেও আমার সেই অঙ্গটি চাঙ্গা থাকে কিনা?

তরুণটি খানিকটা থতোমতো খেয়ে বলল, তার মানে, তার মানে

                              প্রেম শুধু শরীর, মানে এতকাল যে…

কবি তাকে বাধা দিয়ে বললেন, শরীরও এক শরীর নয়,

                              নদীর মতন, হৃদয়ও এক হৃদয় নয়, নদীর

                              মতন। অথচ সবই আছে।

যাও, সন্ধেবেলা একটা নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকো

তোমার সঙ্গিনীর কানে কানে সুমধুর শাশ্বত মিথ্যেগুলো বলো

                                  তাকে দুঃখ দিও না,

সে-ও তোমাকে যা-দেবে, তুমি তার মানেই বুঝবে না।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ব্লীডিং হার্ট

কৃষ্ণচূড়ায় এখনো ফোটেনি ফুল

হৃদয় ছিলো কি অকাট্য নির্ভুল

পায়ে পায়ে ভাঙে যেখানে পাতার রাশি

শব্দ সেখানে ওঠেনি কি ‘ভালোবাসি’?

 

কে তার খবর রেখেছে শহরে-গ্রামে

ডিসেম্বরের বৃষ্টিও যদি নামে

অকালে সকাল হয় যদি কোনোদিন

ভাঁড়ারে মানুষ খুঁজে মরে দূরবীন!

 

সহসার বাঁশি এখানে পশে না কানে

গর্জন, জানি সমুদ্রে-শাম্পানে

স্বাভাবিক—  তবু অপরাজিতার কাছে

বিদেশি মানুষ বারবার ফিরে আসে!

 

সোনার খাঁচার পাখি কি সোনায় খুশি?

দ্বার খোলো, কিবা মারো তাকে আলকুশি

মুক্তির দূত, বুকে রেখো স্মৃতি তারই

জলের কলস কোন জলে হলো ভারী?

 

কৃষ্ণচূড়ায় এখনো ফোটেনি ফুল

সময় হয়নি, তাই এত নির্ভুল

এ-দেশের গাড়ি—  দুঃখ পেয়েছি কত

স্টেশন ছেড়েছি স্বদেশ ছাড়ার মতো।।

ভাস্কর চক্রবর্তী

আরো প্রেমের কবিতা

কলকাতা থেকে লিখি— পুরোনো হাতের লেখা— চিনবে নিশ্চয়।

তোমাদের শহরে এখন বাতাস কি?— বৃষ্টি কি?

আমার খেলাধুলায় মন নেই আর।

কেন লিখে জানাও না কার সঙ্গে ফেঁসেছ বিকেলবেলা

কাকে তুমি হরদম মিথ‍্যে বলছ—

মস্করার মধ‍্যে আর রেখো না গীতবিতান

ছাড়ো ওই খেলা, শুধু ছেড়ো না আমাকে মরে যাব।

আলোক সরকার

পরিণয়

আগেকার মতো অতো দৌড়ে হেঁটো না। এখন তো আর

জামা-পরা বালিকা নও। এখন শাড়িতে

পা আটকে যেতে পারে। তোমাকে দেখবার

জন্যে যে দীঘল স্রোত পাড়ে আছড়ে পড়ে তাকে দেখতে দাও। দেখো

চারিদিকে বড়ো-বড়ো চোখ সব তোমাকে দেখতে চায়

তুমি অতো দ্রুত গেলে হবে না তো।

 

আমিও সমস্ত ধেনু প্রথম দিনের মার কাছে

ফিরিয়ে দিয়েছি। আমি সোনার মুকুট প‍রে এবার এসেছি।

এসো আমরা দুইজনে পাশাপাশি মগ্ন অবকাশে

আবছা নদীর তীরে কথা বলি।

 

সেদিন তো নদীর ভাষা বুঝতে পারোনি। কিংবা সেদিন

একবারও নদীর দিকে ফিরেও চাওনি।

অবশ‍্য নদীর ভাষা সেইদিন এমন প্রেমিক

ছিল না। চারিদিকে কী রকম আলো দেখো

আম কুড়োবার গন্ধ একেবারে নয়। বৈশাখী ঝড়ের

মধ‍্যে যেন ফুলে-ওঠা সংহতির অশথ কি আম জাম গাছ।

মণীন্দ্র গুপ্ত

এখন ওসব কথা থাক

এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা।

ওসব কথা এখন থাক।

এখন চলো মিকির পাহাড়ে বুনো কুল পেকেছে,

                                চলো খেয়ে আসি।

লাল রুখু চুল

     সূর্যাস্তের মধ্যে…

             অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো উড়ছে।

      –দেখি দেখি, তোমার তামাটে মুখখানা দেখি!

 

সূর্য এখনি অস্ত যাবে। পশুর মতো ক্ষীণ শরীরে

আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোত পেরিয়ে চলেছি–

                      জলস্রোত ক্রমশ তীব্র… কনকনে…

গীতা চট্টোপাধ‍্যায়

বৃষ্টি, বাসনালোক

অবোধপূর্ব স্মৃতি- স্মৃতি আছে, কিন্তু কীসের স্মৃতি, জানি না— কালিদাস

 

আরও বহু জন্ম ছিল আরও বহু মৃত্যু পেছনেই

তুমি সব ভুলে গেছ মনে আছে সমস্ত আমার

নষ্ট মাধ্যমের মত ফেলে এলে সরল বাঁশরি

স্বরমালা ভুলে যাও শিল্প কর-মাধ্যমে বেজেছে।

আমার জন‍্যেই সব ফেলে এলে পুরোনো নগরী

চিহ্ন-ছাড়া ভবিতব্য নিয়ে যাবে কোথায় এবার

আহীর পল্লীর মেয়ে আমাকে কি শেখাবে দোহন

তপ্ত দুঃখ অঙ্গুলীতে বেদনায় আপাত্র ভরেছে।

এত বৃষ্টি হয়ে যাবে একজন্মে কে দেখেছে আগে

কেমন হৃদয় করে পথ চেয়ে আছি সারাক্ষণ

পরাজিত এই বোধ প্রতীক্ষার দুঃখে অভিমানী

বহু বৃষ্টি পার হয়ে তুমি আসছ দেখতে তো আমাকে?

এ যেন অনেকবার ঘটে যাবে আরও জন্ম নিলে

বাদল সন্ধ্যাকে ঘিরে অসীম নির্জন দুটি প্রাণী।

 

সেদিন বৃষ্টির শেষে কেনো যে কেঁদেছি মনে নেই

বহু জন্ম আগে তুমি এমন দিনে কী করছিলে!

মল্লিকা সেনগুপ্ত

ভালোবাসব

ভালোবাসব আদর দেব

যৌনকাতরতা

 

তোমার দিকে গড়িয়ে দেব

আদিম রূপকথা

 

মুগ্ধ হয়ে বলবে তুমি

বকবকম বক

 

পুরুষ চায় চিরনতুন

মুগ্ধতার ছক

 

আমিও কত হাজার যুগ

মুগ্ধতার শেষে

 

নতুন প্রতিরোধের দেশে

পৌঁছলাম এসে

 

এ দেশে সব পাখি ও ফুল

তেজ ও বিদ‍্যুৎ

 

ওদের দেখে বুঝেছি

সেই প্রণয়ে ছিল খুঁত

 

প্রভু সাজার ইচ্ছে হলে

প্রেমিক তুমি নও

 

ভালোবাসব আদর দেব

বন্ধু যদি হও

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

কারাবাসের কবিতা । পর্ব ১

বি শে ষ র চ না । পর্ব ১

ডঃ রূপক বর্ধন রায়

rupak2

কারাবাসের কবিতা: বাংলা অনুবাদে কবি ব্রায়টেন ব্রায়টেনবাখ

২০১৯ সালে চাকরী নিয়ে এই ফরাসী দেশে আসা ইস্তক নিজের কর্ম, সামাজিক জীবন অবশেষে খানিকটা স্থিতিশীল হয়েছে। কাজেই বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার কাজ সেরে যা সময় বাঁচে, তাতে নিজের সাহিত্যপ্রীতির দিকটাও খানিক পরিতৃপ্ত করতে পারি। ইতিহাসের কাজ আর্কাইভিং, সময়ের আর্কাইভিং। সাহিত্যেরও তো ওই একই কাজ। তাই আমার মতে সাহিত্য আর ইতিহাসে বিশেষ পার্থক্য নেই। আরেকটু বড় করে ভাবলে, অভিনেতা জন-রাইস ডেভিসের কথাটাই ঠিক মনে হয়- ‘পৃথিবীর সমস্ত বিষয়কেই ইতিহাসের চোখ দিয়ে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব।’ বর্তমান কাজটাকেও, পাঠক তেমন এক আর্কাইভিং-এর কাজ হিসাবেই দেখতে পারেন। 

আমরা এখন যে সময়ে ও যে রাজনৈতিক পৃথিবীতে বসবাস করি, সেখানে করোনার মতোই ফ্যাসিবাদ নামক ভাইরাসের এক অদ্ভুত মিউটেশান রাজনীতির নামে বিশ্ব-মানবিকতাকে গিলে খেতে বসেছে। বিগত এক দশকে, দুনিয়ার প্রায় সর্বত্র, ক্ষমতার এই অশ্লীল দলন-চক্র স্বাধীন মেধার কলম রোধে উন্মত্ত হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৮, এই ছয় বছরে তুরস্কের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় আমার নিজের চোখে দেখা। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি কীভাবে নোবেল পুরষ্কার প্রাপক স্বাধীনচেতা (আমার কলেজ জীবনের নায়কদের মধ্যে অন্যতম একজন) এক লেখক, ক্ষমতার দালালে রূপান্তরিত হয়েছেন। সেদিন লজ্জায়-ঘেন্নায় আমরা অনেকেই সভা ছেড়ে উঠে এসেছিলাম – পরে অবশ্য বুঝেছি তেমনটা না করলে তাঁর অবস্থা বর্তমান ভারতবর্ষের ভারভারা রাও এবং তাঁর সহকবিদের মতোই হত।

এখন ব্যাপার হল, বিজ্ঞানের মতোই একটা নির্দিষ্ট সামাজিক তথা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানও ইতিহাসের পাতার কোনো এক অজানা অপঠিত কোণে চাপা পড়ে থাকে। আসলে মানব বিবর্তনের সাইনুসয়েড এতই দীর্ঘায়িত যে, সমসাময়িক সভ্যতার উজ্জ্বল শিখর অথবা আধার-বর্ণ খাতের কোনোটির পদাঙ্কই বিশেষ নতুন কিছু নয়। একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই তেমন ধারার একাধিক উদাহরণ মেলে। হ্যাঁ, অবশ্যই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব ধারার পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। কাজেই বিজ্ঞানের মতোই সে ধাঁধার সমাধান সাধারণত হারানো বা অজানা ইতিহাসেই পাওয়া যায়। ভারতবর্ষ তথা বর্তমান বিশ্বের সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতের সিমিলি খুঁজতে বসে, বিগত বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা শুরু করি আমি। সে সূত্রেই সাহিত্যিক, কবি ও চিত্রকর Breyten Breytenbach- নামটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে।

ব্রায়টেন ব্রায়টেনবাখের জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে, কেপটাউন থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ আফ্রিকার বোনিভাল গ্রামে। বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে তাঁর বিরোধিতা ও সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে আপার্থাইড সরকার তাঁর নামে সমন জারি করে এবং ফলত ষাটের দশকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে প্যারিসে চলে যেতে বাধ্য হন ব্রায়টেনবাখ।  সেখানে তিনি ভিয়েতনামের বংশোদ্ভূত এক ফরাসি মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন এবং মিশ্র বিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইনের কারণেও সে সময়ে দেশে ফিরে যেতেও পারেননি। 

১৯৭৫ সালের ১৯শে আগস্ট, Christian Marc Galaska এই ছদ্মনামে প্যারিস থেকে লুকিয়ে দেশে যাওয়ার পথে Jan Smuts বিমানবন্দরে ধরা পড়েন ব্রায়টেনবাখ, এবং উচ্চতর দেশদ্রোহিতার দায়ে নয় বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে শেষ অবধি তাকে সাড়ে সাত বছরের কারাজীবন কাটাতে হয়েছিল, যার প্রথম দু’টি বছর ছিল Pretoria Maximum Security জেলের ফাঁসি কক্ষের সামনের একটি বদ্ধ ঘরে একাকি নির্জন কারাবাস। সে সম্বন্ধে ব্রায়টেনবাখ নিজেই বলেছেন-

‘Beverly Hills the place is called in prison parlance.  It’s a prison for Blacks essentially though a few Whites are kept there too.  I sensed that first night, and it was confirmed later on, that this was the place of death; this is the shameful place to which people are brought to be killed legally and in cold blood by representatives of the State.  I saw so much.  With the ears only, since the eyes are confined by bars and walls and steel partitions never more than seven yards away.  The whole place is impregnated by this one overriding function:  this is the reality of Maximum Security Terminus. Death House.  (1984:31)

১৯৭৭ সালে আরো কিছু অপরাধের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালায় সরকার- কিন্তু বিশেষ কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। অবশেষে, আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের ফলস্বরূপ ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে ব্রায়টেনবাখ প্যারিসে ফিরে আসেন এবং ফরাসী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টির পতন ঘটে এবং বর্ণবাদ সমাপ্ত হয়। ব্রায়টেনবাখ ২০০০ সালের জানুয়ারিতে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হন। তাছাড়া তাঁর চিত্রকর্ম এবং প্রিন্টের প্রদর্শনী জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, হংকং, আমস্টারডাম, স্টকহোম, প্যারিস, ব্রাসেলস, এডিনবার্গ এবং নিউইয়র্ক সিটি সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের ক্রিয়েটিভ রাইটিং শেখানোর সঙ্গেও জড়িত। 

পুরস্কার: জিবিগিনিউ হারবার্ট আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭।

কারাবাসের প্রলম্বিত বছরগুলিতে কবি প্রায় ৪০০ কবিতা রচনা করেছিলেন। সে সময়ের প্রায় সমস্ত কবিতাই আফ্রিকানাস ভাষায় রচিত। তাই আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে আরো বেশি করে পৌছনোর সুবিধার্থে Denis Hirson এবং ব্রায়টেনবাখ নিজে, ১৯৮৮ সালে ‘Judas Eye and Selfportrait/Deathwatch’ নামে তেষট্টিটি কবিতার একটি সংকলন প্রকাশ করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য সে বই এখন আর ছাপা হয় না। তাছাড়াও সে কাজে কবি ও অনুবাদক সাময়িক ধারার মোটেই খেয়াল রাখেননি- কবির খেয়াল, আমি আপনি বলার কে! কাজেই ব্রায়টেনবাখকে নিয়ে আমার পড়াশোনা থমকেই যেত যদি না ‘POETRY IN PRISON. A STUDY OF BREYTEN BREYTENBACH’S FIVE VOLUMES OF PRISON POETRY IN TRANSLATION’ নামক একটি থিসিস আমার হাতে না এসে পৌছতো। সে থিসিসে কারাবাসকালীন সাময়িক ধারায় লেখা বেশ কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদের খোঁজ পাই। সে কবিতাগুচ্ছের কয়েকটি কবিতার অনুবাদ দু’টি পত্রিকায় প্রকাশ করার সুযোগ ঘটেছে। 

সেই অনুষঙ্গই “কারাবাসের কবিতাঃ বাংলা অনুবাদে কবি ব্রায়টেন ব্রায়টেনবাখ“ নামক এই ধারাবাহিক। ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’র অনুপ্রেরণায় সেই থিসিসে প্রকাশিত আরো বেশ কিছু কবিতার বঙ্গানুবাদ আপামর বাঙালি পাঠকের কাছে পৌছে দেওয়ার সুযোগ ঘটছে, আমি বড়ই কৃতজ্ঞ।

ব্রায়টেনবাখের লেখনির যে নিজস্ব ধারা রয়েছে তার অনেক জায়গাতে স্বভাবতই আফ্রিকানাসের নিজস্ব শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। তাছাড়াও রয়েছে নিওলজিজমের (Neologism) অবাধ প্রয়োগ, যা আক্ষরিক অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি করে। সময়ে অসময়ে তেমন সমস্যার সম্মুখীন হলেও, লেখাগুলোর যথাযথ কাব্যিক ও অর্থবহ ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। তাই সবশেষে এ কাজের তুল্যমূল্য বিচার আপনারা, আমার পাঠকরাই করবেন। এই রাজনৈতিক অরাজকতার পৃথিবীতে ব্রায়টেনবাখ সাহেব আমাদের পথ দেখাবেন সেই কামনাই করি।

১৯৭৫ সালে কারাবাসের সময় রচিত কবিতা থেকে (১৯৭৬ ভয়েটস্ক্রিফ সংকলন)

শীতে আমার দেশ

২. অন্তরীপে সামুদ্রিক ঝড়

তোমার অপরিমেয় গভীরতায় ডুবে যাওয়া হাজার জাহাজ

দশ হাজার বিকৃত মুখ-গহ্বর চিৎকাররত

যাতে সাদা ফেনাগুলো বুদবুদ করে

আর আমার হোটেলের জানলায় থুতুর স্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দেয়

যতক্ষণ উঁচু পাহাড়ি ঢালের গায়ে জরুরি সংকেতগুলো পতপত করে ওড়ে

টেবিল-কাপড়ের টুকরোগুলো শুষে নেয় অতলেরা

সিগালেরা এক বিদ্রোহী ভয়ে কম্পিত ও অসাড় হয়

সমুদ্রটা এক আদিম যন্ত্রণায় বমন ও চিৎকার করে

 

পিঁপড়েগুলো মহাসাগরকে ফাঁপা করে ফেলেছে-

স্থলভাগের দাঁতের ধাক্কায়

কাঠের মান্দাসগুলো বিচূর্ণ হচ্ছে

 

(আমি পরিমাপের এককে রাত্রি-স্বপ্ন দেখি

অন্ধকারে আমি 

শূন্যহীন শূন্যতার মনিব

সাদা পিঁপড়েদের তমসাচ্ছন্ন আশা

 

(আমি আমার স্বপ্নগুলোর নৌসেনাপতি

যে জল-পিঁপড়ের নৌবাহিনীকে জীবন্ত ফল খাওয়ার জন্য

স্থাপন ও আদেশ করে

যতক্ষণ না শিরদাঁড়া মটকায়

আর সকাল হয়

 

(যাতে পরিচ্ছন্ন কয়েক ঘন্টার সাময়িক বিশ্রামে

আমিই বিজেতা

ওয়েলিংটনের নেপোলিয়ান

গরাদের অভ্যন্তরে এক অন্ধ পুরুষের মতো মুক্ত

 

(এবং অস্পষ্টভাবে নিরীক্ষারত)

১৯৭৬ সালের মে মাসে লেখা কবিতা থেকে (১৯৮৫ সালের লেওয়েনডূড সংকলন)

এটা গুজবের মত

ফয়সালার সফেদ সূর্য

এটা গরাদ দিয়ে অবরুদ্ধ

নীল আকাশের এক উঠোন

এবং একাকি মোহিনী উড়ানে একটা পাখি ঘোরে-

এটুকুই

 

এটা মহাসাগরের উপর দিয়ে 

আসা এক নির্বাসন

এটা হৃদপিণ্ডের ছাইয়ে হিমশীতল 

পাখিটার লাশ

এবং একটা খুপরিতে স্থবির যে সময়-

এটুকুই।

এখানে দেখো! শূন্যতাটাই কবিতা

একজন মানুষের ফাঁসি

আদিম ভারতীয় দড়ি খেলার

একপ্রকার সরলীকৃত চিত্রণ মাত্র

 

মনোনীত-জন আকাশের গায়ে অনমনীয় খাড়া দড়ি

বরাবর ইঁদুরের নমনীয়তায় আরোহণ করে

এবং অদৃশ্য হয়

তৃতীয়দল; একটা যুগলবন্দী

নিজের সংসর্গে ও অনুনাদকের সাথে

আবদ্ধঃ এক অসুস্থ চোখ রক্ত শিরার মতো

রোগাক্রান্ত শরীরের নজরদারী করে, মাংসল বাগানের উপর

সমাধি প্রস্তর আর ইঁদুর ও ম্যারো-দের

জন্য সুড়ঙ্গ ও খাদ-সমেত ভূগর্ভে মাংসের

মতো পাহারা। তার পোকা 

সহ সেই চোখ পোকাটাই 

চোখ; আমি সর্পিল 

কালো ধ্বনির পিয়ানো বাজাই

 

কিছু একটা, কিছু একটা, আমাদের দু’জনের বাইরে অবস্থিত

ছুঁয়ে দেখার মত কোনো কিছু, বন্ধুত্বের এক 

ইঙ্গিত – প্রেম তো সম্পন্নঃ আর আমরা

দুই বেশ্যার মত বন্ধ্যাত্বে একত্রে শায়িত-

শরৎ পাতার একটা গাছ, এমনকি গতির স্পষ্ট

রেখা সমেত একটা নৌকা,

হাত-পা সহ এই ঘড়ি ছাড়িয়ে আর 

যা কিছু, আর এই সাইক্লপের মত

দুর্গন্ধময় টিকটাক (tictac) গর্ত

 

গরাদগুলো বুকের পাঁজর, পোকাটা

বেশ্যার গলা টিপে ধরে, গম্বুজের সাদা নরকে

ক্ষুদ্র ধমনীরা রক্ত নির্গত করে;

যা আমি নই তা আমার দৃশ্যগোচর নয়,

যা আমার কাছে অদৃশ্য তা আমি হতে পারি না

কিন্তু আমিটা ও সমুদ্রটা ইতিমধ্যেই ব্যর্থতায়

বিভক্ত; এবং তারপর কাব্যিক গতিবিধি 

সম্বন্ধে ঘোষণা হবে? সেই গভীর দোষী অবস্থান?

আমরা কি এরপর মাপে-মাপ কষে ধ্বনির সৃষ্টি করবো?

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা । পর্ব ১

ধা রা বা হি ক । পর্ব ১

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

Surréalisme-এর ফরাসি উচ্চারণ স্যুররেয়ালিসম। আমরা অনেকদিন ধরে শব্দটিকে করে নিয়েছি স্যুররিয়ালিজম, কারণ ফরাসিতে ‘রেয়াল’ হলেও আমরা ইংরেজি উচ্চারণ অনুসারে ‘রিয়াল’ করি। কিন্তু ফরাসি স্যুররেয়ালিসম কী করে কারো কারো কাছে সাররিয়ালিজম হয়ে ওঠে, তা বিস্ময়ের। স্যুররেয়ালিসম-এর বাংলা আমরা করেছি পরাবাস্তববাদ, এবং শব্দটি সাধারণভাবে স্বীকৃত হয়েছে বাংলা ভাষায়। ‘স্যুররেয়ালিসম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করতে দেখি কবি গিয়োম আপোলিনেরকে। জীবনের শেষদিকে রচিত তাঁর নাটক , যা ১৯১৭ সালে অভিনীত হয়েছিল, ‘লে মামেল দ্য টাইটেরিয়াস’-এ আপোলিনের এই নামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন দ্বিতীয় শিরোনাম—‘স্যুররেয়ালিস্ত’ নাটক। আর আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো সাত বছর যখন স্যুররেয়ালিসম একটি আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং শুধু ফরাসি শিল্প-সাহিত্য নয়, গোটা বিশ্বের শিল্প-সাহিত্যকে প্রভাবিত করবে।

আঁদ্রে ব্রতঁ ১৯২৪-এর হেমন্তে স্যুরলেয়ালিসমকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করলেন তাঁর ‘মানিফেস্ত দ্যু স্যুররেয়ালিসম’-এ: স্যুররেয়ালিসম, বিশেষ্য, পুংলিঙ্গ। বিশুদ্ধমানসিক স্বয়ংক্রিয়তা (automatismepsychiquepur), যার সাহায্যে মৌখিক বা লিখিতভাবে চিন্তার প্রক্রিয়াকে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়। এ হল নন্দনতাত্ত্বিক বা নৈতিক বিষয়ের বাইরে, যুক্তির সমস্ত নিয়ন্ত্রণমুক্ত অবস্থায় চিন্তার কর্তৃত্ব (dictée de la pensée)।

দার্শনিক অর্থ : স্যুররেয়ালিসম বিশ্বাস করে- নানা ধরনের অনুষঙ্গে প্রকাশিত, যা এতকাল অবহেলিত, এক উচ্চ বাস্তবে (réalitésupérieure), স্বপ্নের সার্বভৌমত্বে এবং চিন্তার নিস্পৃহতায়। এর উদ্দেশ্য অন্য সমস্ত মানসিক কলকব্জাগুলোর চিরতরে বিনাশ (ruinerdéfinitivementtous les autresmécanismespsychiques) এবং জীবনের প্রধান সমস্যাজাত সিদ্ধান্তের মধ্যে নিজেকে প্রতিস্থাপন।

যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে ব্রতঁ-র জেহাদ ছিল এই রকম :

আমরা এখনো যুক্তির শাসনাধীনে বাস করি; এর মানে আপনারা বুঝবেন যে তার দিকেই আমি আসতে চাইছি। কিন্তু যুক্তির পদ্ধতিকে এখন প্রয়োগ করা হয় গৌণ সমস্যাগুলোর সমাধানের ক্ষেত্রে। নিরঙ্কুশ যুক্তিবাদ যা এখন চলছে, তা কোনো সত্যকে বিবেচনার জন্য গ্রাহ্য করে না, অথচ সেগুলো আমাদের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে, যৌক্তিক উদ্দেশ্যগুলো আমাদের হাতের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে অভিজ্ঞতারও সীমাবদ্ধতা আছে। খাঁচার ভিতরে তা পাক খাচ্ছে আর সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া ক্রমে ক্রমে আরো জটিল হয়ে উঠছে। অভিজ্ঞতাও তাৎক্ষণিক ঐক্যের ওপর নির্ভর করে থাকে, আর তাকে রক্ষা করে সাধারণ ধারণা। সভ্যতার রঙে, উন্নতির অজুহাতে সবকিছু, ঠিকভাবে বা বেঠিকভাবে যা সব কল্পনা বা সংস্কার হিসেবে গণ্য হতে পারে, মন থেকে নির্বাসিত করে দেওয়া হয়েছে, সব অ-প্রথাগত সত্যানুসন্ধানকে নির্বাসিত করা হয়েছে। তবে বলা যেতে পারে, সৌভাগ্যক্রমে মনোজগতের একটি দিকের প্রতি সম্প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে— আমার মতে এটা খুবই জরুরি—আর যে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা ভান করেছি যে এ একটা গ্রাহ্য করার ব্যাপার নয়। আবিষ্কারগুলোর জন্য সব কৃতিত্বপ্রাপ্য ফ্রয়েডের। আবিষ্কারগুলোর ওপর ভিত্তি করে জনমতের একটা ধারা তৈরি হচ্ছে যার সাহায্যে মানবমনের সন্ধানের জগৎকে আরো প্রসারিত করতে পারবে, নিজেকে শুধু মৌল বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। কল্পনা সম্ভবত তার অধিকার দাবি করার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মনের গভীর তলদেশে যদি বিস্ময়কর শক্তিগুলোকে লালন করা হয়, যে শক্তিগুলো উপরিতলের শক্তিগুলোর সামর্থ্য বাড়াতে সক্ষম কিংবা তাদের সঙ্গে সফলভাবেব প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারে, তাহলে আমাদের স্বার্থেই তাদেরকে করায়ত্ত করা উচিত এবং পরে প্রয়োজন হলে তাদেরকে যুক্তির নিয়ন্ত্রণের কাছে সঁপে দেওয়া দরকার। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষকদের নিজেদের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু এটা লক্ষ করা যাবে, যে কোনো পদ্ধতিকেই এই কাজের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি এবং মেনে নেওয়া হচ্ছে যে কোনো নতুন ব্যবস্থা তৈরি হওয়া পর্যন্ত এটা কবি ও বিজ্ঞানীদের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে, আর এর সাফল্য পরবর্তীসময়ে প্রয়োগ করা কম বেশি কোনো খেয়ালিপনার ওপর নির্ভর  করবে না।

(মানিফেস্ত দ্যু স্যুররেয়ালিসম)

স্যুররেয়ালিসম যে কোনো দার্শনিক প্রস্তাবনা নয়, সাহিত্যশিল্পের এ এক নিরীক্ষামাত্র, তা স্পষ্ট করে দেন ব্রতঁ যখন তিনি বলেন, ‘কবিতা চর্চা করতে হবে’। ব্রতঁ স্যুরলেয়ালিস্ট হিসেবে যাঁদের নাম উচ্চারণ করেছেন, তাঁরা সবাই একসুরে কথা বলেছেন তা নয়। এঁদের প্রত্যেকেরই পূর্বলব্ধ নিজস্ব ধারণা ছিল, স্বীকার করেছেন ব্রতঁ। তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন :

১) আমাদের কোনো প্রতিভা নেই; উৎপাদনের স্বয়ংক্রিয় দ্রব্য এবং নিম্ন আয়ের বসবাস লম্বা শহরগুলোকে ধ্বংস করবে (ফিলিপ সুপো)

২) আমি যে গল্প বলছি তা বহুবার বলা, একটি কবিতা যা আমি পুনর্বার পড়ছি : আমার শ্যামলকান ও পুড়ে খাস্তা হয়ে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে আমি ঝুঁকে পড়ছি দেওয়ালের দিকে। (পল এলুয়ার)

৩)পার্টির বিরতি হলে সব খেলোয়াড়রা যখন পানপাত্রের সামনে জড়ো হয় তখন আমি গাছটিকে জিজ্ঞেস করি সে কি সবসময় লাল রিবন পরে থাকে! ( লুই আরাগঁ)

স্যুররেয়ালিস্ট ভাষার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—“মানুষকে ভাষা প্রদান করা হয়েছে যাতে সে তার স্যুরেয়ালিস্ত ব্যবহার করতে পারে”। একজনের প্রশ্নের উত্তরে সঙ্গতিহীন কথা বলা, এমনই তার ভাষারীতি। কবিতার চিত্রকল্পের ক্ষেত্রে পূর্বভাবনাহীন এমন চিত্র পাই—“সাদা কাপড়ের মতো ভাঁজ করা দিন” (রভের্দি)। উদ্দেশ্য একটাই—দুই দূরবর্তী বাস্তবের মিলন। যেমন লোত্রেয়ামঁ-র বহুব্যবহৃত এই চিত্রকল্প—“কাটাছেঁড়ার টেবিলে হঠাৎ সাক্ষাৎ একটা সেলাইকলের সঙ্গে একটা ছাতার”। আপাত সংযোগহীন সেলাইকল ও ছাতার এই ব্যবহার স্যুররেয়ালিস্ট ভাবনার পরিচয় দেয়। কোলাজ কবিতা বলতে যা বোঝানো হয়েছিল তা হল খবরের কাগজের কর্তিকা থেকে উদ্দেশহীনভাবে তুলে নেওয়া সঙ্গতিহীন শব্দ বা বাক্যের সমাহার।

ম্যানিফেস্টোর শেষ অংশে আঁদ্রে ব্রতঁ তাঁদের ইস্তাহার শেষ করেছেন এইভাবে :

স্যুররেয়ালিসম বলতে আমি যা বুঝি তা প্রকাশ করে নিয়মনীতির প্রতি এত স্পষ্ট এক বিরোধিতা যে বাস্তব পৃথিবী কাঠগড়ায় উঠলে তার সাক্ষ্য দেবারও প্রশ্ন নেই। বরং, তা একসম্পূর্ণ চিত্তবিক্ষেপের সাক্ষ্য দেয়। কান্টেটা চিত্তবিক্ষেপের কারণ নারীরা, পাস্তুর মনোযোগ বিচ্যুত হয়েছিলেন ‘আঙুর’ দ্বারা, যানবাহন ক্যুরির চিত্তবিক্ষেপের কারণ। সবই এই বিষয়ের গভীর লক্ষণযুক্ত। চিন্তার সঙ্গে আপেক্ষিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই বিশ্ব; আর এই ধরনের ঘটনাগুলি হল স্বাধীনতা যুদ্ধের উজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে অংশ নিতে পেরে আমি গৌরব বোধ করি। স্যুররেয়ালিসম এক ‘অদৃশ্য রশ্মি’ (rayon invisible) যা একদিন আমাদের শত্রুদের জয় করতে সামর্থ্য জোগাবে। “তুমি আর কেঁপে উঠো না, শবদেহ”। এই গ্রীষ্মে গোলাপেরা নীল। কাচ দিয়ে তৈরি হয়েছে কাঠ। পৃথিবী তার ডালপালা জড়িয়ে ভূতের মতোই আমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। বেঁচে থাকা এবং বেঁচে থাকার বিরতি হল কাল্পনিক সমাধান। অস্তিত্ব অন্য জায়গায়।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb kobita

তৃণা চক্রবর্তী

কা ব্য  না ট ক

তৃ ণা   চ ক্র ব র্তী

সূত্র খুঁজতে খুঁজতে

ঝাউপাতার মধ্যে দিয়ে দ্রুত বয়ে যাওয়া অবিরল হাওয়ার শব্দ। আকাশে অল্প মেঘ। ঠিক বিকেল নয়, তবে বিকেলের মতো যেন সবকিছু। এখানে এই একটাই সময়, একটাই ঋতু, একইরকম হাওয়া ও তাপমাত্রা। একটু দূরে কিছু শব্দতরঙ্গ ধরা যাচ্ছে। হয়ত ওরা নারী এবং পুরুষ, অথবা দু’জন পুরুষ অথবা দু’জন নারী। আবার এমন হতে পারে যে ওরা দু’জন দুটো ফ্যাক্টর, ‘শূন্য’ এবং ‘এক’ অথবা হয়ত ওরা দুটো অবস্থান। এই নির্জন জায়গায় কী কথা বলছে ওরা? আসুন, শোনা যাক… কিন্তু পরিচয়হীন দুটো কণ্ঠস্বরকে কীভাবে চিহ্নিত করব! ধরা যাক, একটি কণ্ঠস্বরের নাম সংকেত আর অন্য কণ্ঠস্বরের নাম দূরত্ব…

সংকেতঃ      আচ্ছা, এই জায়গাটায় কি আগে এসেছি? আমরা কি সত্যিই কথা বলছি আবার!

 

দুরত্বঃ        উঁহু… নাহ্‌!

 

সংকেতঃ      তাহলে কম্যুনিকেশন হচ্ছে কীভাবে!

 

দূরত্বঃ        যেভাবে আসলে হওয়া সম্ভব…

 

সংকেতঃ      কী জানি, আমার সবকিছু কেমন দুর্বোধ্য লাগছে

 

দূরত্বঃ        কিন্তু তুমিই তো বারবার যোগাযোগ করতে চেয়েছিলে

              বিচ্ছিন্ন যা কিছু, জোড়া দেওয়া যায় না

              তারই সূত্র খুঁজতে চেয়েছিলে

 

সংকেতঃ      নিশ্চয়ই চেয়েছিলাম

              আন্তরিকভাবে চেয়েছিলাম বন্ধুত্ব

              বারবার তাই ধাক্কা দিয়েছি বন্ধ দরজায়

              কিন্তু আজ কি সত্যিই খুলে গিয়েছে তা

              সেই অসম্ভব বাধার প্রাচীর কি সত্যিই ভেঙেছে তবে

              কিন্তু যাকে দেখছি, সেই তোমাকে, আমার অচেনা মনে হচ্ছে কেন!

 

দূরত্বঃ        সত্যিই, এত দিন চাঁদে থাকার পরেও তোমার ভাবনা চিন্তা খুব একটা বিস্তৃত

              হতে পারে নি

 

সংকেতঃ      চাঁদে সবকিছু সুন্দর, সহজ, ফেয়ারি টেইলস্‌-এর মতো

              রঙিন ফোয়ারার মতো জীবন সেখানে

 

দূরত্বঃ        সেই সুন্দরের মধ্যে, সহজের মধ্যে থেকেও এই জটিল দরজায় ধাক্কা দিতে

              কেন বারবার ভেবে দেখেছ কখনো?

 

সংকেতঃ      ঠিক জানি না

              থেকে থেকেই একটা তীব্র কিছু তছনছ করত আমাকে ভেতরে ভেতরে

 

দূরত্বঃ        কী মনে হয় তোমার

              এই তীব্র কিছুর আকার বা বিন্যাস সম্বন্ধে কোন ধারণা?

 

সংকেতঃ      তাগিদ, পৌঁছনোর তাগিদ

 

দূরত্বঃ        কোথায় পৌঁছবে

              মানুষ কোথায় যে পৌঁছতে চায় শেষমেশ!

 

সংকেতঃ      তোমার কাছে পৌঁছনোর তাগিদ

              আমি জানতাম একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে আমাদের

 

দূরত্বঃ        তুমি কি ঠিক জানো?

              এই যে বিকেলের আলো এসে পড়েছে আমাদের মাঝে

              তাতে একটা দরজা খুলে গেছে

              আমরা কম্যুনিকেট করতে পারছি

              কিন্তু এটা সাময়িক

              তোমার সেই তাগিদটাও আসলে তাগিদ নয় হয়ত

              সাময়িক অনুভূতি

 

সংকেতঃ      অনেকদিন পরে এলে বোধহয় এমন হয়

              এখানকার রোদ, জল, কথা, চাতুর্য

              কোন কিছুই সঠিকভাবে ধরতে পারছি না

 

দূরত্বঃ        সেটা তোমার সীমাবদ্ধতা

              আগেও ছিল

              এই শান্ত হাওয়ার ভিতর

              আর যাই থাকুক, চাতুর্য নেই

              আগেও ছিল না

 

সংকেতঃ      আমি কেন মেনে নেব, তুমি যা বলছ তাই ঠিক!

              আমরা কি আবার সেই আগের অবস্থানে ফিরে যাব

              দোষারোপ করব একে অপরকে?

 

দূরত্বঃ        একেবারেই নয়

              খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাকে ফিরে যেতে হবে

              আগেই বলেছি, এই হঠাৎ খুলে যাওয়া দরজা কিন্তু সাময়িক

              হাতে সময় খুব কম

 

সংকেতঃ      চাঁদে চলে যাওয়ার সময় ভেবেছিলাম, আর ফিরব না

              কিন্তু ওখানে থেকেও বারবার মনে হয়েছে তোমার কথা

              আর ফিরে আসবার পর মনে হয়েছে

              অন্তত একবার, দেখা হোক তোমার সঙ্গে

 

দূরত্বঃ        সেইজন্যই আজকের এই বিকেল, পূর্ব পরিকল্পনা মতো

 

সংকেতঃ      কিন্তু তুমি আলাদা, যেন অন্য কেউ

              তীব্রতার দিনে যাকে পেয়েছি, সে অন্য আর একজন

 

দূরত্বঃ        চাঁদে কীরকম কাটত সময়?

              তোমার সঙ্গিনী সেখানে বেশি খুশি ছিল

              নাকি ফিরে এসে?

 

সংকেতঃ      আমি তো কখনো গোপন করি নি

              তুমি তো জানতে

              এখন কি অস্বীকার করবে সে কথা?

 

দূরত্বঃ        চাঁদের দিনগুলো কীভাবে প্রভাবিত করত তোমাদের?

              সমূহ আনন্দ কীভাবে উজ্জ্বল করে দিত সময়

              নাকি একমাত্রিক মনে হত?

 

সংকেতঃ      একমাত্রিক নয়, তবে দূরের…

 

দূরত্বঃ        কীসের থেকে দূরে!

              আমরা তো দূরেই যেতে চেয়েছিলাম!

 

সংকেতঃ      আমি দূর থেকেও বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম

              কাছ থেকেও তাই চাইছি

              সামান্য বুঝে নেওয়া, সম্ভব নয় কি?

 

দূরত্বঃ        তোমরা আসলে বন্ধুত্ব শব্দটাকে হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছ

              নিজেদের ইচ্ছেমত বদলে নিয়ে কখনো বিঁধিয়ে দিচ্ছ ঘাড়ে, বুকে, পিঠে

              এবং অতর্কিতে

              বন্ধুত্ব এখন এক রাজনৈতিক শব্দ

              ঘোরালো, জটিল, অস্পষ্ট

              যেন দাবার ছকের রহস্য

 

সংকেতঃ      তুমি কি আগেও এভাবেই ভাবতে!

              আশ্চর্য হচ্ছি খুব!

 

দূরত্বঃ        আমার মনে হয়, তুমি শুরু থেকেই একটা জিনিস ভুল করছ

              আগের আর এই মুহূর্তের কথাবার্তার তুলনা করার চেষ্টা

              সেটা আসলে ভুলই

              এতে আমারা মূল বিষয়ের থেকে সরে যাচ্ছি বারবার

              সময় কিন্তু ফুরিয়ে আসছে দ্রুত

 

সংকেতঃ      এই সময়ের বিষয়টা সন্ত্রস্ত করে দিচ্ছে

              অথচ কী নিবিড় বিকেল

              এসো, আমরা সব ছক বদলে দিই, আবার সহজ হয়ে উঠি

 

দূরত্বঃ        তারপর?

 

সংকেতঃ      তারপর স্রোত ফিরে আসবে

              ফিরে আসবে জলের নিজস্ব ভঙ্গি

              খুব কি অসম্ভব?

 

দূরত্বঃ        আসলে, এই যে পারছ না অতিক্রম করতে

              এতে তুমি পরাজিত বোধ করছ

 

সংকেতঃ      কী পারছি না!

 

দূরত্বঃ        এই নৈঃশব্দকে অতিক্রম করতে

              যা একসময় ছিল অধিগত

              যে উচ্ছাসের নির্জন ছিল তোমারই জন্য

              যাকে ইচ্ছেমত চেয়েছ এবং উপেক্ষা করে গেছ

              সেই সময় পেরিয়ে গিয়েছে তোমাকে

              উপরন্তু এই নৈঃশব্দের প্রাচীর

              সব মিলিয়ে, পরাজয় ও কৌতূহল

              আর কিছু নয়

 

সংকেতঃ      না তা নয়

              আমি চেয়েছি অবিনশ্বর বন্ধুত্ব

 

দূরত্বঃ        এ চাওয়া উদ্বৃত্ত

              এমন কিছু নয়, যা শ্বাসরোধকারী, যা না হলেই নয়

              বরং এমন এক অভাব, যা থাকলে পূর্ণতা আরও সম্পূর্ণ হয়

              এই চাওয়াটুকুই স্বয়ংসম্পূর্ণ

 

সংকেতঃ      এতো তোমার বিশ্লেষণ

              অথচ জীবন, সে তো আমার

 

দূরত্বঃ        তাই তুমি বেছে নিয়েছ

              আমার পথ কক্ষান্তরে

              এই দুই বিপ্রতীপকে মেলানো যায় না

 

সংকেতঃ      তাহলে আজই বা এই বিকেলের আয়োজন কেন?

              কিছুটা না হয় অজানাই থাকত

 

দূরত্বঃ        আমি চাইলেই প্রাচীরের ওপারেই থাকতে পারতাম

              তোমাকে রাখতে পারতাম নৈঃশব্দের অন্ধকারে

 

সংকেতঃ      রাখলে না কেন!

              তাহলে তো অন্তত একটা সম্ভাবনা থেকে যেত

              ভাবতাম অন্য কিছু ঘটবে একদিন

 

দূরত্বঃ        ঘটেনি কি?

              এই যে ইল্যুশন ভেঙে গেল তোমার

 

সংকেতঃ      ইল্যুশন ছাড়া মানুষ বাঁচবে কী নিয়ে !

              এই জীবন, সেটা ইল্যুশন ছাড়া আর কী !

 

দূরত্বঃ        বাঁচবে , যে ভাবে এক একটা অবস্থান বেঁচে থাকে

              দাঁড়িয়ে থাকে স্থির

              একটা বিস্তৃত আয়নার সামনে

              যে সমগ্রে কোনও ইল্যুশন নেই

 

সংকেতঃ      খুব কি প্রয়োজন ছিল তার

              সম্ভাবনা হারিয়ে গেলে কী পড়ে থাকে

              অবস্থান কি স্থির কোনও বিন্দু !

              আসলে অবস্থানও বদলে বদলে যায় আমাদের

              প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে সময়ের পরিভাষা

              এই বদল প্রয়োজনীয়, মনে কর না কি তুমিও !

              তুমি কি শুনতে পাচ্ছ ? পাচ্ছ কি ?

শুধু একজনেরই কণ্ঠস্বর শোনা যায় কিছুক্ষণ, তাও থেমে যায় একসময়। এক অন্ধ সময় পড়ে থাকে শুধু, যার কথাগুলো বলা হয়ে গেছে।  

 

[ঝড় উঠছে, ঝড় থেমে যাচ্ছে এক সময়। আমাদের ইল্যুশন ভেঙে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, আবার পরক্ষণেই গড়ে উঠছে অন্য কোনও ইল্যুশন। অবস্থান বদলে যাচ্ছে আমাদের। যোগাযোগের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কোথাও, আবার খুলে যাচ্ছে নতুন কোনও দিক। কিন্তু সেটা এখানে বিষয় নয়, এখানে ধরা থাক এক অব্যর্থ মুহূর্তের সত্যি, দূরত্বের ধ্রুবক, শুধু এখানে থেমে থাক এক অনন্ত বিকেল আর ঝাউয়ের পাতার আড়ালে সমুদ্র-হাওয়ার শব্দ।]

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

সোনালী ঘোষ

প ছ ন্দে র  ব ই

সো না লী   ঘো ষ

sonali2

বিশ্বরূপদর্শন

সম্ভবামি

বিনায়ক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

সিগনেট প্রেস 

ব‍্যস্ততা আর মনখারাপের মধ‍্যে ডুবে যাচ্ছিলাম ওষুধের খোঁজ করতে গিয়ে পেলাম একটি বই। “সম্ভবামি”, কবি বিনায়ক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় । পড়তে পড়তে জলের নীচে থিতু হওয়া কাদার মত মনখারাপ রইল পড়ে। কবির হাত ধরে খানিক মানস ভ্রমণ হলো। এই লেখায় সত‍্যিই “একলক্ষ আণবিক বোমা”।কাকে ভয় পাব “মা ফলেষু কদাচন”। কবি বলছেন –


“ওরে পাগল
ভগবান এই দুনিয়ার
সবচেয়ে বড় ছিনাথ বহুরূপী
তাকে বাঘ ভেবে পরীক্ষার পড়া নষ্ট কোরো না”(পৃ:৫৪)

 

আবার তিনি বলছেন,


“তুমি যুদ্ধ করো না করো সে তোমার ব‍্যাপার
আমি নির্দেশ দিতে দিতে বিধ্বস্ত…
বরং তুমিই বলে দাও-না আমি কীভাবে থাকি ওই গ্ৰামে
যার আলুগুলো সব কোল্ডস্টোরেজে
অথচ
মানুষগুলো তাওয়ায় ফুটছে;
কী করি এই শহরে
যেখানে
বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর ছোঁয়ায়
শূন‍্যে উঠে যাচ্ছে একটার কয়েন
ফিরে আসছে ম‍্যাডোনা হয়ে…”(পৃ:৭৪)

 

আধুনিক জীবনকে ব‍্যাখ‍্যা করতে তিনি কয়েকটি শব্দকে হাতিয়ার করেছেন কেবল। আর ঠিক তখনই-


“মুশকিল হল যখন
রাধার বদলে রিসার্চররা ঘিরে ফেলল আমায়;
ওরা মানতেই চাইল না,
হৃদয়কে নগ্ন আর
ভালোবাসাকে অন্ধ হতেই হবে
নাচতে নাচতে পাগল হয়ে গেছে যে ময়ূর
তাকে দিতেই হবে দৃষ্টি…”


এর পর আর কী বলার থাকে।

 

ধর্মতত্ত্ব রাজনীতি ধারণ করে তিনি যেন শ্রীকৃষ্ণের অবতার ধরেছেন। হ‍্যাঁ ঠিক শুনেছেন।বিশ্বরূপদর্শন করিয়েছেন। যখন বলছেন-


“মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্রুতা মৃত‍্যুতে ফুরিয়ে যায়

ভালোবাসা ফুরোয় না কেন?”


আরো ক’বার পড়তে চাই। চিকিৎসার প্রয়োজনে ওষুধ দীর্ঘ হওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb goddyo

অমিত সরকার

প ছ ন্দে র  ব ই

অ মি ত   স র কা র

amit2

হেঁটে যাচ্ছি কবিতা লেখার পথে পথে

অভয়মুদ্রা

অরিজিৎ চক্রবর্তী

আবহমান

‘কবিতা লেখার পথে

বাবার বাড়ি ফেরা মিশে থাকে…

 

মা আমার ধরে ফেলে সুর !

কবিতার মাথুর মাথুর !’  (অভিকর্ষ)

 

কিছু কিছু উচ্চারণ কখনো কখনো কবির অজ্ঞাতেই একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। আমরা তো জানিই, জীবনবৃত্তগুলি তাদের দীর্ঘ দীর্ঘতম ছায়া মেলে ঢেকে রাখে আমাদের শাশ্বত, ভাষালিপি, প্রেম, শোক, বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা ও অন্যান্য অনেক পাতা ঝরা। জানি এই  ইন্টারপ্রিটেশনের কোনও শুশ্রূষা হয় না, হয় না উজ্জ্বল সমাধান। তাই একজন অরিজিৎ চক্রবর্তীকে তাঁরনিজস্ব ‘অভয়মুদ্রা’ উৎসর্গ করতে হয় বাবা ও মাকে। যিনি ‘পৃথিবীর উপরে ফেলে আসা জন্ম খুঁজে পিতৃত্ব  লাভ’ করেন (গুটিপোকা)। তিনিই আবার সহজিয়া অবলোকনে ‘কবিতার অভিশাপ আমাকে যতটা আচ্ছন্ন করেছে তাকে চুম্বনের সাথে তুলনা করা ছাড়া উপায় ছিল না’ (দেখা) এই দৃশ্যে জিনগত অভ্যাস খুঁজে পান।

 

তাঁর সাম্প্রতিকতম কবিতাবই ‘অভয়মুদ্রা’ এই মুহূর্তে আমার মুগ্ধ টেবিলে। আমি আত্মীকরণ করার চেষ্টা করছি তাঁর পরাজয় ও উল্লাসের পরাববৃত্তক, তাঁর প্রতিহিংসা ও হাপুগান, তাঁর সার্কাস ও আততায়ী।তাঁর এই কবিতাবইটি মোট চুয়ান্নটি ব্যক্তিগত কবিতার সমাহার, যেখানে কবিতাগুলিকে তিনি কোনও নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স বা অভিমুখে সাজিয়ে তোলেন নি। একটি কবিতাবইকে যদি আমরা কোনও নির্দিষ্ট রাগের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে তার আরোহ অবরোহ আমাদের অবশ্যই একটি পথরেখার স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। এখানে সেটি সচেতনভাবেই অনুপস্থিত। তার সপক্ষে কবির যুক্তি, ‘যেকোনো ভাবনাই কবিতা হতে পারতো। তুমি দেখা করবে বলেও দেখা করতে না। আমি মিথ্যে বলবো না ভেবেও মিথ্যে বলতাম’ ( বিবাহ)। অভিজ্ঞতা জেনেছে কবিতাকে সত্যের আলোয় পৌঁছে দেবার জন্যে একজন কবিকে অনেককিছুকেই ভাঙতে হয়।সবচেয়ে বেশি যেটা ভাঙতে হয় সেটা হল সমাজেরপরিচিত ও আরোপিত কোড আরনির্মিত ভাষার সিগনিফায়ার।তাই একজন সৎ কবির কোনোভাবেই সমাজনির্দিষ্ট স্রোতের অনুকূলে ভাসা উচিৎ নয়, তাঁকে সাঁতরাতে হয় উল্টোস্রোতে। তাঁকে বিনির্মাণ করতে হয় নিজস্ব উচ্চারণ ও ভাষা বিনিময়।অরিজিৎ এই কবিতাবইটিতে সেই নির্মাণে অনিবার্য ও সিদ্ধ। তাঁর কিছু কিছু উচ্চারণ অতি গভীর ও ধ্রুপদী। (ব্যক্তিগতভাবে জানাই ধ্রুপদী শব্দ ব্যবহার আমার সাহিত্যরুচিকে আরাম দেয়। কিন্তুকয়জন পাঠক এই মুহূর্তে আমার এই বিনির্মাণে একমত হবেন, তা নিয়ে নিজেরই ঘোর সন্দেহ আছে। ‘গেহপথ’, ‘নিরূপধিক’, ‘অবিমৃশ্য’, ‘বীক্ষণ’ ইত্যাদি বেশ কিছু প্রয়োগ বাংলা কবিতায় তাঁর হাত ধরে ফিরে আসতে দেখছি। আর লুই আরাঁগ তো সেই কবেই বলে গেছেন, ‘কবিতার ইতিহাস আসলে তার টেকনিকের ইতিহাস মাত্র’।আমি শ্রেয় বোধ করব এই স্থানাংক বিন্দুতেই তাঁর রিয়েল টাইম পারসোনা বা সমকালীন অস্তিত্বের কেন্দ্রকে বোঝাতে।)

 

তেমনই বেশ কিছু কবিতা আছে যাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর ভাবনাবিশ্বের জার্নাল বলে নির্দ্বিধায় চিহ্নিত করা যেতেই পারে। অধিক উদাহরণ স্পয়লার বিবেচিত হতে পারে। এই টানা ও পোড়েন নিয়েই অভয়মুদ্রার মুগ্ধ হেঁটে চলা, বাংলা কবিতার   পথে পথে। প্রবেশক যাকে বলছে, ‘পথটি পরমাগতি।/ পথটি তো শিরোমণিপুর।’  

 

অরিজিৎ এই  টানা ও পোড়েনের পথে নিজেকে বিনির্মিত করুন বারবার। বাংলা কবিতা তাঁর সঙ্গে হেঁটে যাবার অপেক্ষায়… ।

আরও পড়ুন...