Categories
editorial

Editorial-July-2022

সম্পাদকীয়

রবিবার, ২৫শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 10th July 2022

যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা আগেই জানিয়েছি, কিন্তু ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’র পাতায় সরাসরি এই সুখবরটি আবারও ভাগ করে নিতে চাই। এই প্রথম আমাদের, আপনাদের এই প্রিয় আন্তর্জাল পত্রিকা মুদ্রিত সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ হতে চলেছে। অজস্র বিভাগ ও মনোগ্রাহী কিছু রচনা নিয়ে আমরা পুজো সংখ্যাটিকেই পত্রিকার প্রথম মুদ্রিত সংখ্যা করতে চলেছি। আমাদের অনেকগুলি পরিকল্পনার মধ্যে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা আরো এক ধাপ এগোবার চেষ্টা করলাম।

তবে মন খারাপ হয়ে যায় যখন দেখি দলাদলি, পিছন থেকে টেনে ধরা এসব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লেখালিখির আসল জায়গাটুকু বাদ দিয়ে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেকেই এই কাজে শামিল হয়ে উঠছেন। দিনের শেষে, জীবনের শেষে সব চলে গিয়ে আমাদের প্রত্যেকের কাজগুলোই রয়ে যাবে। মানুষ মনে রাখবেন যাবতীয় উল্লেখযোগ্য লেখনী, মনে দাগ কেটে যাওয়া পত্রিকাসমূহকেই। আমরাও এই কাজের যজ্ঞে শামিল বরাবর। পাশে আপনাদেরও চাই, যেন পাইও সব সময়।

‘আমাদের অভ্যন্তরে স্রোতস্বিনী আছে, সেতু নেই’

– পূর্ণেন্দু পত্রী

সত্যিই আমাদের মধ্যে সেতুর বড্ড অভাব। যে যার মতো করে অন্যের সেতু ভাঙতেই আমরা আগ্রহী। সেতুবন্ধন করে আরো অনেক দূরের রাস্তা হাঁটতে আমরা কেউই চাই না। কিন্তু ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ সব সময় চেষ্টা করে চলবে প্রত্যেককে সঙ্গে নিয়ে এই সেতু গড়ে তোলার। তারই ফল হলো আমাদের জুলাই মাসের এই সংখ্যা। এই বিশেষ কবিতা সংখ্যায় আমরা খুঁজে পেয়েছি এমন সব কবিদের, যাঁরা আমাদের কাছে হয়তো ততো পরিচিত নন, কিন্তু বলিষ্ঠ তাঁদের কলম। এই পত্রিকা বরাবর চেষ্টা করে যাবে এমন সব শক্তিশালী অথচ অন্তরালে থাকা কবিদের তুলে আনার। বাকি দায়িত্ব, পাঠক আপনাদের।

Categories
2022_july golpo

শ্রীকান্ত অধিকারী

গ ল্প

শ্রী কা ন্ত  অ ধি কা রী

srikanta

বাঁক বদল

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি কালো করগেট টিনের চালার সেই বাড়িটার সামনে। চারুদের বাড়ি। টিনের দরজায় ভেতর থেকে শেকল দেওয়া। দরজায় একটা ফুটো। অনায়াসে ফুটোতে আঙুল চালিয়ে দরজা খুলে আস্তে করে ডাকলাম— চারু…। সামান্য কয়েক পা সরু উঠোন পেরিয়ে চারুর এক খোপ ঘরের বারান্দার সামনে।

চারু কাঠের উনুনের ধারে। আগুনে মুখ লাল। এলোমেলো চুল। খোলায় চাল ফট ফট করে ফুটছে। চারু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ঠোটের কোণ ফাঁক। বললাম—চারু, আমাদের বাড়ি যাওনা কেন?

চারু নিরুত্তর। মাঝে মাঝে চ্যালাকাঠ আগুনের দিকে ঠেলে দিয়ে তুষের ছিটে দিচ্ছে। লক লক করে আগুনের শিখা নেচে উঠছে। ভাজা খোলায় গরম কালো বালিগুলোকে কুঁচি কাঠি দিয়ে নাড়তে থাকে। সেই অবসরে ওর মুড়ি ভাজার উনুনশালটা আবার অতি পরিচিতের মত আলাপ জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কালো দেয়ালগুলো আরো কালো হয়ে গেছে। থেবড়ানো মাটির দেয়ালে এখানে ওখানে খোলাঙ্কুচিগুলো আরও স্পষ্ট। টিনের চালে বহুদিনের পুরনো লম্বা ঝুলগুলো ছড়ানো চুলের মত আগুনের আঁচে তিরতির করে কাঁপছে। একদিকে গাদ হয়ে পড়ে রয়েছে ব্যবহৃত পলিথিনের ক্যারিব্যাগের বান্ডিল। আর এক কোণে স্তুপাকারে ঝুড়ি ঝুড়ি ঘুঁটে, চ্যালাকাঠ, শুকনো ডালের তাড়া। বস্তাখানেক তুষ। বাইরে বাথরুমের ভাঙা টিনের দরজাটা হাট করে খোলা। ঘরের মেঝেতে একটা থালা, তার চারদিকে ভেজা মুড়ি ছড়িয়ে। দেখলেই বোঝা যায় কেউ খেয়ে এঁটো গুটিয়ে নেয়নি।

—বোসো। চারু চাল নাড়া থামিয়ে বলল— ঐখানটায়।

কোনো ভণিতা না করেই বললাম, আমার মুড়ি চাই চারু। তোমার হাতের মুড়ি।

চারু খানিকক্ষণের জন্য চমকে উঠে বলল— অ্যাঁ!

— আমার পেটে ঐসব ছাইপাঁশ সহ্য হচ্ছে না চারু। আমার বাড়িতে তুমি মুড়ি দিয়ে এসো।

মনে হলো চারু এবার হেসে উঠল। বলল— বেশ। আজকে হবে না। এ মুড়ি অন্যদের বরাদ্দ। কাল বিকেলে।

ওকে থামিয়ে বললাম– না না, বিকেল হলে হবে না। অফিসের টিফিনে নিয়ে যাবো। তুমি সকালেই আমাকে দেবে।

চারু মাথা নেড়ে জানাল– তাহলে খুব ভোরে উঠতে হবে।

আগে লৌতুনিমাসির কাছে শুনেছি বেশি চাপ থাকলে ভোরে উঠে চাল ওলাতে হয়, তারপর মুড়ি ভাজলে বেশ ফুল ফোটার মত নরম খাস্তা মুড়ি ফোটে। খেতেও বেশ সুস্বাদু।

সেই সুস্বাদু মুড়ির প্রসঙ্গ মনে করেই বললাম– তাই করো।

জ্ঞানত জলখাবারে মুড়ি ছাড়া কিছুই খাইনি। ছোটবেলা থেকেই সকালে চা—মুড়ি। বড় স্টিলের গ্লাসে হাফগ্লাস র’চা। তাতে চারুর আনা কুড়কুড়ে মুড়ি যেন মোগলাই সরবতে মিছরির দানা। তারপর চামচ দিয়ে ঠুসে ঠুসে যতটা ঢোকানো যায় তার চেয়েও বেশি ঠোসানো মুড়ি। ততক্ষণে মুড়ি আর চায়ে মাখামাখি– আহা অপূর্ব! 

তখন এদিকটা অতটা শহুরে হয়ে যায় নি। বিকেলে গামছার কোঁচড়ে মা’র মাখানো তেলমুড়ি, হাতে আস্ত একটা পিঁয়াজ কিংবা মুলো। কিংবা কাঁচা বিলেতিবেগুন দিয়ে খাবলা খাবলা মুড়ি মুখে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গী সেই চারু। দু’দিকে লাল ফিতে বাঁধা ঝুটি নিয়ে একসময় পথ চলতে চলতে শুকনো মুড়ি চিবোনোর শব্দে পথেই হারিয়ে যাওয়া।  

সেই পথ এখন পাকা  হয়েছে। আমার জীবনে রমা এসেছে। তবু চারু ওর মা লৌতুনিমাসির অর্ধেক মাটি আর অর্ধেক ইটের ঘরে  থেকে গেল। আর আমার ঘরে মুড়ির জোগান দিয়ে গেল।

দেশি চালের মুড়ি, বিস্কুটের টিনে বাড়ি বয়ে দিয়ে যেত চারু। একদিন চারু আমার স্ত্রী রমাকে বলে, বেশ ক‘দিন আসতে পারব না গো। মা তো চলে গেল, আমি একা।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। যা! তাহলে খাবো কী? হাজার রকমের অসুখের ভয়ে আমার কলজে সেঁধিয়ে গেল। চারু কি আর আসবে না!

রমা বলল, ডোন্ট ওরি। পাড়ার মোড়ে ভজা মুড়ি ভাজার মেসিন বসিয়েছে। বস্তা নিয়ে গেলেই হলো।

মুড়ি তো এলো, মুখে রোচে না। কোনটাতে নোনতা লাগে, কোনটা আবার ফ্যানা কাটে। ইউরিয়া ভিজে জল না সোডা দেয় শুনেছি। কেউ কেউ আবার কেরোসিনের ছিটেও দেয় ভিজে চালে। বেজার মুখ দেখে রমা বলল, তোমার মুড়ি খেয়ে কাজ নেই। এই দ্যাখো আমাদের মতো দুধ—ডিম—পাঁউরুটি খাও। মুখে লাগবে, শরীরও ভালো থাকবে।

এদিকে চারুর পাত্তা নেই। শুনেছিলাম ওর বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যায় না। বরকে নিয়ে মায়ের উনুনশালে আবার মুড়ি ভাজতে শুরু করেছে। তবে যোগাযোগ ছিলই না একেবারে। ফোন নাম্বারও রাখা হয়নি। অগত্যা রমার কথামতো ডিমের সাদা অংশ দিয়ে ডিমটোস্ট খেতে শুরু করলাম। একসময়ে ডিমের সাদা অংশে হলুদ অংশ মাখামাখি হয়ে গেল।

এভাবে বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই বিকেল দিকে পেটে চাপ চাপ লাগছে মনে হলো। রমাকে বলাতে রমা বলল— ধুর! এমনিতেই তুমি বাতিকগ্রস্ত। ওরকম ছোটোখাটো ব্যাপার মাথায় এনো না। আনলাম না।                                                  

তার দু’দিন পরে অফিসের শেষবেলায় কেমন ধিকধিক করে বুকে ব্যথা শুরু হলো। অফিসের সুভাষদা সব শুনে বললেন— বদহজম থেকে অ্যাসিড। তারপর গ্যাস। মুড়ি খান বুঝলেন।

মুখ কুঁচকিয়ে বললাম—ঐ মুড়িই তো সর্বনাশ করলো।

—কিন্তু বাঙালির মুড়ি মানে চিনেদের চাউমিন, তামিল—তেলেগুর ইডলি—ধোসা। সহজাত বলে একটা কথা আছে। যে যেমন অভ্যাসে বড়ো হয় আর কি! আমরা বাঙালি, মুড়ি ছাড়া চলে? মুড়ি খান। আপনি বাঁচুন বাঙালির শিল্পকেও বাঁচান।

আর কোনো রিস্ক না নিয়ে ছুটলাম চারুর বাড়ির দিকে।

                                 

চারুর প্রতিশ্রুতি আমাকে অনেক ফুরফুরে করে তুলল।

পরদিন যথারীতি টিনভর্তি মুড়ি এলো। একটা কচি মুখের মেয়ে দু’দিকে লাল ফিতে দিয়ে মাথার মাঝে সিঁথি করে চুল বাঁধা।

রমা তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বলে, মুড়ি! কে পাঠাল?

— মা। কিশোরী সঙ্কুচিত।

বললাম, তুমি কে?

— আমি শিলা। আপনি কালকে আমাদের বাড়ি গেছিলেন।

রমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বলে, তুমি মুড়ি খাবে! তোমার না অ্যাসিডের সমস্যা? 

বললাম– টিনটা নিয়ে নাও।

— আর ঘরে আনা হেলদি ফুড!

রমার মুখ ভার। সেটা দূর করতেই বললাম, হেলদি ফুডও চলবে। মাঝে মাঝে মুখ পালটাতে মুড়ি।

কিন্তু সেটা কথার কথা। সকালে একবার, অফিসে একবার, অফিস ফেরত একবার। সাত দিন পেরল না টিন ফাঁকা।

রমা বলল, চারুকে খবর দাও।

বললাম, ফোন করে দিলেই তো হতো। আবার যাবো?

— ওর কি আদৌ ফোন আছে?

যখন থেকে বলা তখন থেকেই মনের মধ্যে সেই শান্ত নিরীহ মুখটা তোলপাড় করতে লাগল। একটা মেয়ে সারাজীবন উনুনে হাতা–কুঁচি—বালি—খোলা—খাপুড়ি—মুড়ি এই সব নিয়েই কাটিয়ে দিল। অন্যদিন হলে আটটায়—ও সকাল হতো না। আজ সূর্য ওঠার আগেই আমি বিছানা ছেড়ে দিয়েছি। ছাতে উঠে দু’একবার হাত—পা স্ট্রেচও করেছি। এমনকি প্রতিবেশী রামু সদগোল, যে কিনা দশ বছর ধরে আমার পাশেই রয়েছে। চোখে—চোখে কিংবা ঘাড় কাত করে ভাল থাকার রিহার্সাল দিয়েছি মাত্র, তাকে পর্যন্ত আমার গুমোর ভেঙে হাত নেড়ে ডেকে শুধিয়েছি – ভালো আছেন তো?

সারা সকাল এক অজানা উৎফুল্লতা সারা শরীরে ছড়িয়ে রইল।

মুড়ির বস্তাতে টিনের মুখটা উপুড় করে মুড়ি ঢালে চারু। ওর কচি লাউয়ের মতো মুখটা আমার অনেক কাছে। পলিথিনের বস্তায় মুড়ি পড়ার সরসর শব্দ। চারুর কানের কাছে আস্তে আস্তে বললাম– কেমন আছো চারু?

চারু মুখ তুলে ধরল। খানিকক্ষণ আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে রইল আমি লজ্জা পেলাম। বললাম— তোমার মেয়েটা কোথায়?

আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কোত্থেকে একটা দড়ি এনে বস্তাটা বেঁধে দিলো। তখনই দেখলাম ওর ব্লাউজটা ফাটা। খানিকটা তেলচিটেও বটে।

মুড়ির বস্তা হাতে নিয়ে বাইরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল চারু। বললাম– একটা ফোন নাও চারু।

চারু মাথা নাড়ে।

                                   

দিন পাল্টেছে। সাধারণ ঘরে আগে সকালে—বিকেলে জলখাবার বলতে শুধু মুড়িই থাকতো। চা—মুড়ি, গুড়—মুড়ি, দুধ—মুড়ি ,চপ—ঘুগনি—মুড়ি ছাড়া ভাবাই যেত না। এখন প্যাকেটবন্দি নানান খাবার। রুটি—পাঁউরুটি—বিস্কুট পাওয়া যায় পাড়ার দোকানগুলোতে। হাত বাড়ালেই ফাস্ট—ফুড। মনের মধ্যে কু ডাকে— চারু কি এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?    

দেশি মুড়ি ভাজা এমনিতেই অনেক ভজকট। শুনেছিলাম মুড়ি ভাজার হ্যাপা। একবার মুড়ি আনতে দেরি করেছিল বলে বিনা টিফিনে স্কুল গেছিলাম। রাগ হয়েছিল খুব। পরদিন যখন লৌতুনিমাসির সঙ্গে চারু মুড়ি নিয়ে এলো, দুম করে বলে ফেললাম— কী এমন করছিলে চাট্টি মুড়ি আনতে পারোনি। অমনি চারুও কোমরের দু’দিকে হাত রেখে তড়বড়িয়ে বলেছিল– তুমি জানো মুড়ি ভাজতে কত ঝামেলা! একজনকে চাল ধুয়ে নুনাতে হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে   দাঁতে কেটে দেখতে হয় খরা করে শুকিয়েছে কিনা। যদি কটাঙ না করে, তাহলে মুড়ি ভালো হবে না। তারপর আরেক জনকে বড়ো খোলাতে সব চাল উলাতে হবে। মানে বড়ো হাতা দিয়ে নেড়ে চেড়ে কষতে হবে মাংস কষার মতো। যতক্ষণ না তেঁতুলের বীজের মত রঙ না আসে। তারপর…

আমি বললাম, তারও পর?

—তারপর খাপুড়ির গরম বালিতে এক খাবল করে চাল দিলেই… উঁ, জানে না যেন! 

যাবার সময় বললাম— মুড়ি ভাজার বিজনেসটা বাড়াতে পারো। এখনো দেশি মুড়ি অনেকের পছন্দ।                                                          

আবারও কোনো উত্তর করল না। শুধু ক্লিশে হাসি হাসল।

বললাম— ব্যাঙ্ক—ট্যাঙ্ক থেকে সাহায্য নিতে পারো। বলো তো আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তো নানান প্রকল্প রয়েছে।

এবার সে কথা বলল— ভাববো। 

                                   

আমাকে নিয়ে রমার আর কোনো সমস্যা নেই। সময়ে মুড়ি ঘরে চলে আসে। সবসময় চারু না এলেও মেয়েকে দিয়ে মুড়ি ঠিক পাঠিয়ে দেয়। কখনো কখনো শিলাকে ডেকে বাড়ির ছোটোখাটো কাজ— তরকারি কাটা, পাশের মুদি দোকান থেকে নুন, সাবান কিংবা বিস্কুট এনে দিতে বলে। কখনো বা চারুকে রান্নাঘরের ভেতর ঢুকিয়ে ছ্যাঁচড়া, টক কিংবা কচি লাউয়ের পায়েস রান্নাটাও শিখে ফেলে।

সেদিন রমা বলল— পুজোতে চারুকে আর ওর মেয়েকে কাপড়জামা দিতে

হবে। একদিন দিয়ে এসো।

বললাম— আবার বাড়ি কেন? এখানেই তো ওরা আসবে, তখন না হয় দিও।

— বাড়ির কাছে পেয়ে উপহার দেওয়া ঠিক শোভা পায় না। ছুটির দিন দেখে

এক সময় দিয়ে এসো। রমা বলে, ওর বরটা আবার পালিয়েছে, জানো?   

বললাম– লটারির টিকিট বিক্রি—বাটা করত না?

—সে আর ক’দিন। উড়ে—আদিরে ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। লৌতুনিমাসি চারুর বিয়েটা ঠিকঠাক দিতে পারেনি। রমা গজগজ করে।

                                   

অনেকদিন পর আবার চারুর বাড়ি। সেই অভ্যাসবশে হাত ঢুকিয়ে বাইরের দরজা খোলা। তারপর হঠাৎ মনে হলো এভাবে দরজায় টোকা না দিয়ে দরজা না খুললেই হতো। তাই অকারণে টিনের দরজাতে লোহার শিকলের আওয়াজ করি। কিন্তু তাতেও কেউ এলো না দেখে কয়েক পা ভেতরে ঢুকতেই চমকে উঠি। চারুর উনুনশাল ভাঙা। আধপোড়া।  

মাথার ওপর চাল নেই। বাজপড়া গাছের মত খাঁকড়া চারটে পোড়া দেওয়াল নির্বাক দাঁড়িয়ে। উনুনশালের ভেতর দু’খানা ঝিকভাঙা উনুন ফাঁকা আকাশের দিকে তাকিয়ে হা—হুতাশ করছে। দেওয়ালের কোণে আধপোড়া দলা পাকানো সেই প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের গাদ। উপুড় করা ভাঙা খোলা খাপুড়ি। এক চটক দেখলেই মনে হবে এখানে একটা ঝড় বয়ে গেছে।

আঁতকে উঠি, চারুর কিছু হয়নি তো! চারু কোথায়? এদিক—ওদিক তাকিয়ে দেখি, ভেতরে মাটির মেঝেতে চারু শুয়ে। আমাকে দেখেই ওর চোখ ছলছল করে ওঠে। ইশারায় ডাকে। এক মুহূর্তে মনে হলো লৌতুনিমাসি শুয়ে। পরক্ষণেই ভুল শুধরে কাছে গিয়ে শুধোলাম– শিলা কোথায়?              

—আসছে। মুদিখানা গেছে।

হাতের প্যাকেটটা ওর পাশে নামিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করি— শরীর খারাপ বুঝি?

চারু নিস্পৃহ চোখে প্যাকেটের দিকে চাইল।

বললাম— তোমাদের জন্য দিদি পাঠিয়েছে।

শুকনো মুখে মরিয়া হাসি এনে বলে— দিদি আমাকে খুব ভালবাসে।

আমি মাথা নাড়ি। এবারে আসল কথাটা জিজ্ঞেস করি— উনুনশালটার ওরকম হাল হলো কী করে?

— দিদিকে বলো মাস দুয়েক অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে চালিয়ে নিতে। এখন মুড়ি ভাজা বন্ধ।

— কিন্তু কেন?

এর কোনো উত্তর সে দেয় না। শুধু চোখের কোণ বেয়ে কানের পাশে জল গড়িয়ে পড়ে। আমি ঠিক কী করব বুঝে উঠতে পারি না, এই মুহূর্তে আমি থাকব ওর পাশে, না উঠে চলে যাবো।   

তখনই শিলা আসে। হাতে থলে। বলে— বাবা পুড়িয়ে দিয়েছে। খোলা খাপুড়িও লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছে।

বললাম— বাবা কোথায়?    

— পালিয়েছে। শিলার নির্বিকার উত্তর।

চারু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে। শিলা পরম যত্নে একটা একটা করে মুদির দোকান থেকে আনা নুন তেল আলুর হিসেব দিচ্ছে— দু’টাকার নুন, পাঁচ টাকার আলু, আট টাকার সরষের তেল। চারুর সেদিকে আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না।

ঘরের এক কোণে কতগুলো স্টিল–অ্যালুমিনিয়মের বাসন—কোসন। একটা ছোটো গ্যাস সিলিন্ডার। মাথায় ওভেন। স্টিলের আলনা, কিন্তু ফাঁকা। কাপড়—চোপড় ছড়ানো ছিটানো।

বললাম— চিন্তা কোরো না চারু, ব্যাঙ্কে ফরটি পার্সেন্ট সাবসিডিতে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দেবো। আবার নতুন করে শুরু করবে। আর তা যদি পছন্দ না হয় সেল্ফ হেল্প গ্রুপে নাম লেখাও। দেখো তোমার মতো অনেকেই আছে। কোনো অসুবিধা হবে না। আমি তো আছি। চারুর মুখের প্রতিক্রিয়া দেখার বহু কসরৎ করলাম, কিন্তু মুখটা এমনভাবে গুঁজে রইল দেখতে পেলাম না।  

আমি উঠে এলাম, তখনো চারু কোনও কথা বলল না। শুধু কাপড়ের প্যাকেটটা আঁকড়ে ধরে রইল।

বুকের মাঝে একটা চাপ নিয়ে কোনো রকমে চারু—শিলার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই মনে হলো, বাইরের আকাশটা এত সুন্দর! আগে কখনো দেখিনি তো!

কিন্তু দু’পা এগোতেই আমাকে আগলে ধরল চারুর আদরের উনুনশাল। সেই মুখপোড়া দু’খানা ভাঙা ঝিক, খাঁ খাঁ করা মাথা আর রক্ত জমাটে কালোর মত পোড়া ফাটা দেয়ালগুলো অদ্ভুত ভাবে দাঁত বের করে আমাকে যেন ব্যঙ্গ করতে  লাগল… — আমাদের তাড়ানো অত সহজ না। আমরা এ ভাবেই থাকি। তোমাদের মধ্যে, মানুষের মধ্যে। আজীবনকাল! সে কী কিম্ভূত হাসি। ভীষণ ভয়ে যখন প্রায় দৌড়ে উঠোনটুকু পেরিয়ে দরজার ওপারে, মনে হলো কে যেন ডাকছে— শিলা। হয়তো কিছু বলবে। হয়তো আরো কিছু দরকার। মা—মেয়ের একার সংসারে একটা শক্ত কাঁধ।

মনে পড়ে গেল, আমাকে অফিস বেরতে হবে। দ্রুত রাস্তার বাঁকটা ধরে ফেললাম।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

অরিত্র সোম

গু চ্ছ ক বি তা

অ রি ত্র  সো ম

মিছিল ১

বাইরে খটখটে রাত। মরাগাড়ি, ধুয়ে মুছে

অবিকল বেরিয়ে গেল

এখন সেখানে সংসার গড়ে নিয়েছে সারমেয়

 

বস্তির আগুনের ছিটে এদিকেও আসে

দেখে, মানুষের দল হেঁটে হেঁটে

রাস্তা ডিঙোচ্ছে 

খাল পেরোল

        হেঁটে

                  হেঁটে 

                             হেঁটে

pujo_16_sketch2

মিছিল ২

মাটির ওপর যাতায়াত শামুকের, মাতৃসম

যে ছোঁড়া এতক্ষণ ধরে দেখেছিল এসব

বাবার কোটর থেকে

বীজটুকু তুলে

বসিয়ে দিচ্ছে শামুকের পিঠে 

 

ভুলে যাচ্ছি কবিতার কথা 

pujo_16_sketch2

পরমান্ন

ঘন চাদরের ভেতর দুটো কাক ডেকে উঠলে

অজিতেশ মাছ ধরতে যায়

নিজের পরমান্ন বড়শিতে গাঁথে— ফাতনা ডোবে

এই অবস্থায় গর্ভবতী মাছ, 

একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে

পুরুষেরা এগিয়ে যায়

মানুষের স্বাদ এই আকালেও, চিনে গেছে তারা

 

ঘোলা জলে, সাঁতরে ওঠে অজিতেশ

বুকে ক্ষরণ আসে— বুঝতে পেরে, দূর থেকে 

কাঁঠাল পাতা নিয়ে আসে ভোলা সন্ন্যাসী

নিজের নুনপোড়া মাংসের সাথে সেসব খেতে খেতে

অজিতেশ বাবা হয়;

প্রসব বেদনায়, গাছের গা থেকে

                                    পাতা গড়িয়ে পড়ে

 

ফাতনা ডুবে আছে জলের ভেতর

ভেতরে, পোড়া গন্ধ লেগেছে

pujo_16_sketch2

আঠেরো নম্বর বেড

এখানে ভেসে আসে সবই; সধবার গা থেকে

খুলে পড়ে সন্তানস্পর্শ— একেকটা জন্মদাগ

কবিতার পাতার মতো মনে হয়

এসব মুহূর্তে কারা যেন ঢুকে পড়ে প্রতিবার

তাদের রোঁয়া-ওঠা হাত, অনর্গল তাকিয়ে থাকে

আমার অস্বস্তি হয়, আমার নাভিপথ ভরে ওঠে

                                             অনন্ত ক্লান্ত জলে

 

বেমালুম মুখিয়ে থাকি আকাশে—

কীভাবে ফিরে যায় স্বাধীন পাখি, তাদেরও তো

ফিরে যেতে হয় জীবনের নিয়মে

তবে কেন আবডাল প্রত্যাশা নীহারিকা? 

যারা ডুবে থাকে একগলা জলে, তাদেরও কি

হারিয়েছে জন্ম? অভিশাপ বিলোও শ্মশানে, আদরে? 

আপাতত এই আঠেরো নম্বর বেড থেকে

আরও দূরে এক অশ্বত্থ চাতালের পাশে

দেখা যায় পাগলের সংসার

পাতা পড়ে, পাতা আসে

পাগল ফেরে না আর, গাছের দিকে তাকিয়ে

কেবল মুখিয়ে ওঠে, খিস্তি খায়। হাসে… 

 

আর কড়া আলো

যন্ত্রপাতির ভিড়ে— কেবল ভুলে যাই

                              আমাদেরও নাকি গ্রাম ছিল

pujo_16_sketch2

গরাদ থেকে বলছি

যারা কাঁদে, খুব বিড়ি খায়, আর বাজি হেরে ফিরে যায় খালি ঘেমো ঘরে — হিংসা হয়। ওদের কাঁচাপাকা চুল দেখলে নাভি অবধি জ্বলে ওঠে। মনে হয় — দারুণ কিছু বমি করি। ভাসিয়ে দিই রাতের থালা; সান্দ্র আবর্তে কিছু সস্তা চটি জেগে উঠুক। মাঝরাতে কেঁপে উঠলে, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ওড়না থাকবে না — এই সহজ সত্য স্বীকার করে 

আমি ডাকবাক্স খুলে ফেলি 

 

                          আয়না দেখেননি এখনও? 

 

তবুও ওই ঠোঁট চেটে শুয়ে পড়া লোকগুলোকে ঘেন্না করি। ঘুমের মধ্যেই ওরা নাভি চুলকোয়। আলো ঘেঁটে যায় স্বপ্ন ঘেঁটে যায়। মাঝেমধ্যে মাথার ওপর উঠে বসে অবসন্ন মথ — এদিকে ডাকবাক্স ভেঙে আছে বিছানায়। পরের দিন, পেচ্ছাপের রঙ হলুদ — খদ্দেরের থুতু লেগে থাকে পান মশলার প্যাকেটে — বাসি চাট আর নোনা বিড়ির গন্ধে — মহামারী বলাৎকার। কাঁচাপাকা মুখ ঘষে দশ টাকা বাজি, অতঃপর

দেশ হেরে যায়

দশ হেরে যায়

সানশেডে গুঁজে থাকে আপদের চিঠি, পোড়া ছবি, জাহান্নাম… 

 

বটুয়া থেকে সাবলীল ঝরে পড়া চিতার ক্ষত, দগদগে

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

শৌনক দত্ত

গু চ্ছ ক বি তা

শৌ ন ক  দ ত্ত

আমরা যারা হেসেছিলাম

আমাদের গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো–

টুকে রাখা ইতিহাস, কবিতার খাতা, হাট-বাজার,

ক্লাসরুম, চায়ের কাপ,

রাজনৈতিক শ্লোগান, জুয়ার আড্ডা, টিভির পর্দা আর–

সোনালী ফ্রেম থেকে। বহুযুগ নিরুদ্দেশ–

 

আমরা যারা হেসে উঠেছিলাম।

 

দিনের দেয়ালগুলো হতভম্ব, নগরে সন্ধে ঢুকে পড়ে

স্তব্ধতায়

ছুরির দিকে হাত বাড়িয়েছে প্রেম

আর রক্তের লোভে ছুটছে ছুরি

স্তব্ধতায়… আর তারপর

অন্ধের স্তুতি আর শ্যাওলা গজাচ্ছিল ফুলের টবে

শব্দের গুঁড়ো বিলাপমুখর দেওয়ালে বোবা

স্তব্ধতায়। শুধু স্তব্ধতা।

আমরা সেইজন্যই হেসে উঠেছিলাম।

pujo_16_sketch2

সম্মিলিত গৃহস্থালি

উদাসীন অন্ধকার নিয়ে আসে প্রতিধ্বনি

সব বাড়িঘর থেকে,

সব শহরতলি থেকে,

সব কবর থেকে।

 

আর তুমি পড়ে গেলে তার মধ্যে। কয়েক হাজার বছর।

 

আমার চোখের কিনারে আমি দেখে ফেলি

রোদের টুকরোর মধ্যে হতবাক প্রজাপতির খেলা

তোমার প্রতিবিম্ব পুরনো লিভিংরুমে

অ্যালবামের পাতায় মিলিয়ে যাচ্ছে!

pujo_16_sketch2

সিন্ধু লিপি

আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম অনেক বছর আগে

চমৎকার রূপালী বুলডোজারের মতো—

থুবড়ে পড়া অন্ধকারে।

অনেক রাত তখন

বাইরে ধোঁয়ার শহর, হিমজমাট আর

প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ধর্মান্ধ নতুন আচরণবিধি,

খাড়াই বেয়ে উঠে গিয়েছিলাম তারাদের দিকে!

 

স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় ভোগা কোনো সময় ধরে—

হাজার বছর আমরা হেঁটে চলেছি

সন্ধের সব ফাটল থেকে

ইতিহাস ক্লাস পেরিয়ে নীল জিভের ওপর।

 

ভূগোল পাঠের আসকারা পেয়ে

দেশভাগের শরীর থেকে আমরা নিয়ে এসেছিলাম

আমাদের ক্ষয়ক্ষতির ফিসফিস আর ছেঁড়াফাটা জামা,

গেলাসে দাঁতের পাটি।

 

এইভাবেই আমরা একা, ল্যান্ডস্কেপহারা

হয়তো অন্ধকারের দানবীয় দেবদূতের

চেপে রাখা কান্নার সিন্ধু লিপি।

pujo_16_sketch2

ভিড়ের নির্জনে দেখা

পৃথিবীর পথে—

ঘোড়ায় ছুটছেন রবি ঠাকুরের বীরপুরুষ

সামনে পা দাপাচ্ছে পিকাসোর ষাঁড়

ব্যাবিলনে মাকড়সা’র পায়ে কুচকাওয়াজ করছে দালির হাতি!

সিন্ধুতীরে গিয়ে মনে হলো

অনার্য বালিতে হ্যামলেটকে নিয়ে বসে আছে কারামাজোভ ভাইয়েরা

তারা পেরিয়ে এসেছে চান্দ্র-অভিযানের মিথ

মশালহীন যে অন্ধকার প্রস্তরযুগে মিশে গেছে

ইতিহাস লুকিয়ে সেই মশাল ছুটছে ইতিহাস ছাড়াই। কেননা—

মানুষ যেখানে শেষ, সেখানেই শিখা জ্বলে ওঠে।

গত জন্মের গভীরে যাও, আরো গহীনে

স্তব্ধতায় শোনো ভস্মকীটের অনুবাদ

শতকোটি মানুষ তাদের মুখ বুজে বোবা হয়ে গেছে। 

pujo_16_sketch2

শৈশব বিষয়ক

শৈশবের নীচু আকাশের প্রান্তরগুলিতে শৈশব ছাড়া আর কিছুই নেই! জেনকিন্স স্কুল ফেরতা

পদচিহ্ন ও ধুলোয় শূন্য মরিচা পড়া, রাসমেলা মাঠের অবসরে কিছু নেই, জং ধরা অবসরের ওপাশেও কিছু নেই, সরল বন্ধুতাতেও কিছু নেই, বন্ধুতার পাশেও কিছু নেই, কিছু নেই ছুটির দিনের ছুটিছুটিতে, কিছু নেই মোগলি-তে, কিছু নেই আয়নায়, কিংবা আয়নার ওপাশে লেডিবার্ড সাইকেলে।

শুধু শৈশব ছাড়া।

কেননা

শৈশব হলো আকাশ আর দিগন্তের মাঝখানের নিঃসঙ্গতা, নামহীন যার কোনো গন্তব্য নেই। 

 

ভবঘুরে মেঘের মতন আসলে আমরা খুঁজতে ভালবাসি আমাদের শৈশবকেই।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

রূপসা সাহা

ক বি তা

রূ প সা   সা হা

সূক্ষ্ম

কুসুমের ক্ষেতে তোমায় পেলে

হেঁচকির মতো অসম্ভবের স্বপ্ন দেখি।

এ সব ছবি সত‍্যির চেয়েও সুন্দর!

তখন ম‍্যাগির মতো জট পাকানো জীবন 

স্পাঘেটি হয়ে যায়।

সিল্করুট হয়ে যায় শব-জটিলতা।

একাকিত্ব ছোট্ট টিপের মতো দেখতে লাগে।

সবুজ ব-দ্বীপে ধুনোর গন্ধ ভাসে।

ঘামের গায়ে ন‍্যাপথলিন চুমু খেয়ে যায়।

মায়ার স্টীমে শোক ভেসে ওঠে।

শোকের গায়ে সাম‍্যবাদের ছন্দ খুঁজে পাই।

যেখানে বিষাদ ও বেয়নেট রুমমেট যেন।

তুঁতগাছের নীলচে সভ‍্যতা রেশমি মাফলার হয়ে ওঠে।

লুকানো অনুতাপে ভাঙা মনের টুকরো মিশে যায়।

প্রেমের কবিতা কবর দেওয়ার বেদীতেও করবী ঝরে।

এ কবরস্থানের পাশেই ছিল শঙ্খিনী নদী।

আসলে শালিনী তোমার সামনে সব দুঃখই 

শালিখ পাখি কিংবা শালীনতা মেনে সূক্ষ্ম

হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

সোনালী চক্রবর্তী

ক বি তা

সো না লী  চ ক্র ব র্তী

মুখাগ্নি

প্রাগৈতিহাসিক ক্লান্তি নিয়ে নীলকণ্ঠ পেরিয়ে চলা কাছিমের খোলটিকে দেখছিলেন বজ্রযানী। সহসা দর্পণ জ্ঞানে বিসর্জনে উড়াল দিতে গিয়ে তাকালেন গঙ্গাতীরে। অযুত সমুদ্র পেরিয়েছেন যাঁর আঙ্গুল সম্বল করে প্রথম ও শেষ নশ্বর বিশ্বাসে, তিনি শুয়ে অদ্ভুত রাজবেশে। মোহনা ছাপিয়ে অভিষেক উপচার সিক্ত করছে পট্টবস্ত্র, যেমত আদরে গড়িয়ে নামে হেম হইতে মাধব। মায়াসমুদয় গোপীবৎ অনাহুত দাঁড়িয়ে দূরে, স্মৃতিরাস। চক্রমুদ্রায় অমোঘ জ্বাললেন প্রাকাম্য শোক। ভষ্ম হাতে স্মরণ করলেন যেহেতু যে কোনো নাভি নিরঙ্কুশ অন্ধ অতএব প্রতিটি জন্ম মূলত ঘোষণা করে ব্রহ্মের ব্যর্থ প্রসব। অনন্ত অন্ধকার এখন আচমনকাল, থির আলোয় প্রকট হচ্ছে রথ, আসন নেবেন মহাগুরুনিপাতযোগ। 

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

রঙ্গীত মিত্র

ক বি তা

র ঙ্গী ত   মি ত্র

প্রাণী-জন্ম

জল নেই বলে শুকনো নদীতে

মাথা পেতে আছি।

ক্লাউড বার্স্টের মেঘ ,

আমাকে, ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ভাসিয়ে নিয়ে যাও।

আমি পাহাড়ের ও-প্রান্তের ঢাল

যেখানে বৃষ্টি হয় না।

আমি শুধু অনুভব করি,

সম্পর্ক নামক দরজায়

আমার লেডি লাক নেই।

 

একা। একা। বংশবিস্তার করা প্রাণী-জন্ম

ধারণ করেছে, মহাকাল।

 

আটলান্টিস

তোমার স্তন। যৌনী। নাভি-চিহ্ন।

তোমার ঠোঁটের থেকে সিগারেট আর

হাতের নেল পালিশ থেকে উঁকি মারা গ্লাস।

হিলের জুতো। সর্ট ড্রেস।

আকাশেরও গায়ে কালো দাগ আসে

আমার মধ্যরাতে;

শান্তির ঘুমে

অতীত থেকে ধার করে  আনা পোকা

বেগন স্প্রেতে ভাসছে

যেন নিয়ম আর নিষেধের নাৎজি ফলকে

অনলাইনে মেপে নেওয়া কার্বন।

 

আমি লাল রঙ, আর দেখেছি

সবুজ, গেরুয়া, কালো, সাদা, নীল;

 

গড়মিল থেকে আবার ভেসে উঠুক আটলান্টিস।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

পৃথা চট্টোপাধ্যায়

ক বি তা

পৃ থা   চ ট্টো পা ধ্যা য়

নীরব সংলাপ 

আমি তো গাছের মত নিজেকে সংযত করে রাখি নীরবে একাকী, কথাহীন। তবুও  ভিতরে তুমি বারবার ভেঙে যাও আয়নার মত। তুমুল আঙুলে খুঁজে তোমাকে কুড়াই, বুকের ভিতরে রাখি পাখি আঁকা ছবি। শিখে গেছি কীভাবে লুকাতে হয় গোপনের ঢেউ। তোমার বুদ্ধির কাছে যতবার হারি তার চেয়ে ঢের বেশি পরাজিত তোমার হৃদয়ে। তুমিও তো জড়িয়েছো কাঞ্চনের জালে। শরীরে আকন্দ আঁঠা, দোলে মুক্তাফল, বিশল্যকরণী বুনি বুকের জমিতে। বর্ষা ঋতু নষ্ট করে চোখ  তাই এত আবছায়া দেখি। মনে মনে ডাক তুমি ‘গোলাপ, গোলাপ’, পড়ে থাকে কাজ, চলে নীরব সংলাপ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

অতনু টিকাইৎ

ক বি তা

অ ত নু   টি কা ই ৎ

যাদু 

আমাদের আটপৌরে জীবন-যাপনে ভালোলাগা-খারাপলাগার বেশিরভাগটুকুই পাঠ্যপুস্তকের দল আমাদের জানাতে পারেনি।

 

কোদাল কাটা মেঘ দেখলে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় অনেকটা কিংবা সূর্যাস্তের স্নিগ্ধ লাল টুকটুকে যে আলো তার দিকে তাকালে রাগ ঘৃণা আর কাজ করে না কিছুই; পাঠ্যপুস্তকে এ কথা কোথাও লেখা ছিল না।

 

রেগে গেলে প্রেমিকার সাথে কথা বলবো কেমন ক’রে,  তারও কোন সদুত্তর সিলেবাসের বই ঘেঁটে পাইনি কখনো।

 

যাপনের বেশিরভাগটুকুই সার্টিফিকেটগুলো দিতে পারে না বলেই, পাথরকাটা, মাঝি মাল্লা, কাঠুরিয়া, ট্রেনের হকার… যে কেউ… যে কেউ যখন তখন চমৎকার কিছু করে বসবে, বিশ্বাস হয়।

 

কানাগলি

চওড়া রাস্তার চেয়ে কানাগলি আমায় বরাবর বেশি আকর্ষণ করে এসেছে। দু’পাশে গৃহস্থালী থাকে বলেই হয়তো। দাঁড়ালে কানে আসে আটপৌরে কথোপকথন।

 

পৃথিবীতে যত রকমের ভালোবাসা হয়, এই ছোটো ছোটো গলিরাই উৎসমুখ। এখান থেকেই বেরিয়ে তারা বড় রাস্তায় গিয়ে মিশেছে। ভীড়ে কিছু পথ হারায় তো কিছু বেঁচে থাকার চালাকি শিখে নিয়েছে।

 

এই টান তীব্র হয়েছিল কলকাতা থাকাকালীন। মায়ের বিছানো সংসার গন্ধের থেকে দূরে থাকছি তখন। ক্লান্ত বিকেলে বিষন্নতা গায়ে মেখে কতবার গিয়ে দাঁড়িয়েছি অচেনা অজানা সব গলিমুখে। ভেবেছি এই বুঝি একজন মধ্যবয়স্ক, ঠিক বাবারই মতো, কোন একটা ঘর থেকে বেরিয়ে কাছে এসে বলবে, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july kobita

অভিরূপ দাস

ক বি তা

অ ভি রূ প   দা স

ডায়েরি ১০.০৬.২০২২

খুব গোপনে আমিও নেশা করতে ভালোবাসি,

ব্যাগে জমিয়ে  রাখতে ভালোবাসি অচেনা অজানা ওষুধ,

তুমিও কি চাওনা এমন একটা ঘুম,

যেদিন স্বপ্নের ভিতরে তোমাকে তাড়া করবে না কোনো ভুল—

মোবাইলে অ্যালার্ম  বাজার আগেই ধরমড়িয়ে  

বিছানায় বেজে উঠবে না তোমার শরীর…

 

আমি তাই একের পর এক ওষুধ খেয়ে যাই,

খালি স্ট্রিপ ছড়িয়ে রাখি মেঝেতে…

খুব গোপনে আমিও রোগের নেশা করি…

 

ওষুধের জন্য রোগ তৈরি করা তো একান্ত জরুরী তাই না!

 

ডায়েরি ১৩.০৬.২০২২

আমি এক বৃষ্টির দেশ থেকে এসেছি,

যেখানে জল জমে থাকে মানুষের বুকে বুকে,

শুকিয়ে যাওয়া চোখ, আমার পছন্দ ছিল না কোনও দিন–

অথচ গল্প বলতে বলতে রাস্তার বাঁক গুনতে গুনতে–

পছন্দগুলো এভাবেই বদলে যায়।

 

এসবই তুমি জানতে… শুধু বলে দাও নি।

 

বলে দাও নি একদিন কবিতা শুকিয়ে যাবে,

 

শুধু ফাটা জমির তাকিয়ে কেটে যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা,

চারিদিকে ঘটনা, চারপাশ থেকে এসে ধাক্কা মারবে শব্দ…

 

অথচ আমার কোন নরম তপতপে বুক থাকবেনা…

চাষের দেশের মানুষ হয়েও আমি রোপন ভুলে যাব।

 

তুমিতো সত্যিই জানতে… জানতে না?

আরও পড়ুন...