Categories
2022-nov uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ৫

উ প ন্যা স । পর্ব ৫

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

হাত ঝাঁকিয়ে স্লোগানচুড়ি বাজিয়ে বললি, তোমাকে লোকেট করা ছিল বেশ সিম্পল। প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে বলেছিলুম, আঙ্কলবাপির অ্যাকাউন্টের ফিনানশিয়াল ট্রেইল ফলো করতে, কোথা থেকে টাকা আসত ওনার অ্যাকাউন্টে আর যেত আমার স্কুলে, এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায়, যাদের আজও সাহায্য করে চলেছ। আর যিনি ফানডিং করতেন তাঁর নাম কি, এখন কোথায় থাকেন।  বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, বড্ড বদভ্যাস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অহরহ বন্ধ করা আর খোলা।  প্রতিটি অ্যাকাউন্ট নম্বর জানি।

               গত রবিবার তোমার লোকেশান জানতে পেরেছি, সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট নিয়ে চলে এসেছি।

               তারপর তুই যা বললি, তা আরও আক্রমণাত্মক, বললি, তোমার বেডরুমটা কোথায়, জিনিসগুলো রাখি।

              বললুম, ওদিকে নয়, ওই রুমটা জিম, এক্সারসাইজ করি।

              ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, জিম, রিয়ালি ? তাই এমন পেটা মাসকুলার বডি রেখেছ, ব্রোঞ্জপুরুষ, হি-ম্যান। ভালো, ট্রেডমিলও রেখেছ দেখছি, কাজে দেবে। ঘুষের টাকায় নয়তো ?

              জিমঘরটা আমার আগে যিনি এই বাংলোয় ছিলেন, তাঁর।

              জানি, তুমি ঘুষ নাও না, তবু জিগ্যেস করতে ভালো লাগল। তুমি তো জ্ঞানবৃক্ষ, বোধিবৃক্ষ, তাই না ? ফাঁসিবৃক্ষ বলা যাবে কি ? ঘুষ নিতে ভয় পাও ? না এথিকসে বাধে ? ঘুষ ছাড়া দিল্লি শহরে সৎ থাকা শুনেছি অলমোস্ট ইমপসিবল, টিকে আছ কেমন করে ? মন্ত্রীদের প্লিজ করতে হলে তো ঘুষ ছাড়া উপায় নেই ! ঘুষ নেয়া হল এ ফর্ম অফ আর্ট, দুর্বলহৃদয় মানুষ রপ্ত করতে পারে না, বিশেষ করে ডুগুডাররা। দিল্লিতে কতদিন আছো ? ট্রান্সফার অর্ডার এলো বলে, ঘুষ না খেলে আর তা শেয়ার না করলে ট্রান্সফার অনিবার্য, তাও তুমি আবার এজিএমইউ ক্যাডারের, পাঠাবে সিলভাসা, পোর্ট ব্লেয়ার বা পুডুচেরি ; অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমেও পাঠিয়ে দিতে পারে।

##

              শিশিরে কেউটের গন্ধ।  উতরোল কোলাহল।

              স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি। চাউনির অতিশয়োক্তি।

              এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

##

               আমি সুটকেসটা তুলে নিচ্ছিলাম, তুই নিজেই তুলে নিয়ে বললি, যথেষ্ট শক্তি আছে গায়ে, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট, আই নিউ, সামওয়ান ওনস মি, অ্যান্ড ওয়াজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।

              এক পলকে দেখলাম, তোর সোনালি আর রুপালি স্লোগান-চুড়িগুলোতে গোলাপি রঙে লেখা লাভ ইউ, কিস ইউ, ইউ আর মাইন, ইংরেজিতে। দু-হাতে কনুই পর্যন্ত মেহেন্দির নকশা। আমেরিকায় মেহেন্দির ব্যবসা পৌঁছে গেছে, আশ্চর্য লাগল দেখে।

              বললাম, কি মাথামুণ্ডু বকছিস ! আমার গলায় শ্লেষ্মার বদলে অবাক হওয়ার শেষে অতিপরিচিতির স্ফূর্তি।

              এই তো, এই তো, তুমি থেকে তুইতে এলে তো ? তুই বললি।

              আমার কাছে এসে, নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে দাঁড়িয়ে বললি, প্রায় ফিসফিস করে বললি, ফ্রম টুডে অনওয়ার্ডস, আই ওন ইউ ইন দ্য সেম ওয়ে অ্যাজ ইউ ওনড মি ওয়ান্স আপঅন এ টাইম। হ্যাঁ, তুমি আমার অস্তিত্বের মালিক ছিলে এতকাল, এখন আমি তোমার অস্তিত্বের মালিক, বা মালকিনি, হোয়াটএভার। অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল এবার আমার মুঠোয়।

##

              এগোলুম বেডরুমের দিকে, তোর হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিয়ে, পেছন-পেছন তুই। আবৃত্তি করতে লাগলি, খোশমেজাজি কন্ঠস্বরে, কোনো পরিচিত গায়িকার মতন গলা, কার গলা যেন, কার গলা যেন :

               You do not do, you do not do

               Any more, black shoe

               In which I lived like a foot

               For thirty years, poor and white,

               Barely daring to breathe or Achoo

               #

                Daddy, I have had to kill you

                You died before I had time

                Marble-heavy, a bag full of God

                Ghastly statue with one gray toe

                Big as Frisco seal

                 #

                And a head in the freakish Atlantic

                Where it pours bean green over blue

                In the water of beautiful Nauset.

                I used to pray to recover you

                Ach, du

                #

                পেছন ফিরে জিগ্যেস করলাম, কার কবিতা ।

                তোর মুখেচোখে কেমন যেন পরিতৃপ্ত ব্যঙ্গের ছায়া।

                তুই বললি, জাস্ট দ্যাট ? কবিতাটা সম্পূর্ণ মুখস্হ ; আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিতা। যিনি লিখেছেন তিনি বলেননি কি যে কবিতাটা একজন মেয়ের এলেকট্রা কমপ্লেক্স ? আর হলোকস্টের মেটাফরগুলো ? ভয় পাচ্ছ কেন?  শোনো না পুরোটা। তোমাকে তো আউশউইৎসে পাঠাচ্ছি না। আর হ্যাঁ, বইগুলো তুমিই বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, ঠিকানায় আমার জন্য পাঠিয়েছিলে। মনে করো, মনে করো, মনে করো।

                ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছি, কবিতাটা কার লেখা মনে করতে পারলাম না ; সিলেবাসে ছিল না, বোধহয়। এমিলি ডিকিনসন কি ? নাহ, অন্য কারোর। ক্রিস্টিনা রসেটি, এলিজাবেথ বিশপ, এডিথ সিটওয়েল? মনে আসছে না। এই কবির বই তো পাঠাইনি বলেই মনে হয়, কে জানে হয়তো ভুলে গিয়ে থাকব, আমি নিজে তো পাঠাইনি, জুনিয়ার অফিসারদের দিয়ে কিনিয়ে পাঠিয়ে দিতাম।

               অফিসের ফাইলের জগতে ঢুকে গিয়ে সাহিত্য উধাও হয়ে গেছে মগজ থেকে ; সরকারি ফাইলের আঁকশি হয়, অক্টোপাসের মতন।

##

                বাবলগাম ফুলিয়ে ফাটালি, বললি, নিও-ফ্রয়েড মনস্তত্ব, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, মনে পড়ছে? তুমি তো ইংরেজিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস এম এ ! কবির নাম মনে পড়ছে না ? তোমার স্নাতকস্তরে সাইকোলজি ছিল, তাও জানি।  না, আমি পেনিস এনভির প্রসঙ্গ তুলছি না, ন্যাটালি অ্যানজিয়ার তো বলেই দিয়েছেন, পেনিস এনভি আবার কি, শটগান নিয়ে কী হবে, যখন মেয়েদের রয়েছে অটোম্যাটিক অস্ত্র।

                কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, বোধহয় আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করে, জবাব না পেয়ে, বললি, লিবিডোও নয়, জাস্ট ফ্যাসিস্ট ড্যাডি আর মহাকাব্যের এলেকট্রার সম্পর্কের প্রসঙ্গ, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট।

               পেনিস শব্দটা এমনভাবে বললি, যেন প্রায়ই বলিস ; হতে পারে, আমেরিকানদের তো কথার আড় নেই। আর ইনসেস্ট ? রক্তচাপে শিবের তাণ্ডবনাচ শুনতে পাচ্ছি ; হলোকস্ট ? আউশউইৎস ? রগের দপদপ কানের ইয়ারড্রামে।

               কবিতাটা আবৃত্তি করে কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না, তবে তোর কন্ঠস্বর বেশ মধুর, বললাম, শুকনো গলায় খাঁকারি দিতে না হয়, তাই ঢোঁক গিলে।

               বেডরুমে ঢুকে তোর সুটকেস নামিয়ে রাখতে, তুই দেখলি সেন্টার টেবিলের ওপর ব্ল্যাক ডগ স্কচ আর একটা গেলাসে সামান্য মদ, কাল রাতে অর্ধেক খাইনি, কাজে মশগুল ছিলাম, বেঁচে গেছে কিছুটা।

               তুলে খেয়ে নিলি, এক চুমুকে, বললি, বড়ো ক্লান্ত হয়ে গেছি, জেট ল্যাগ, এত দীর্ঘ ফ্লাইট, কই আরেকটু দাও তো, গিলে বাকি অংশ শোনাই তোমায়। ভাবছ নাকি, যে ইলেকট্রনিক্স ইনজিনিয়ার কি করে কবিতা শোনাচ্ছে? তোমার দেয়া লিরিকাল ব্যধি। হ্যাঁ, তোমারই দেয়া, থরে-থরে বই, তাক-তাক বই, এনজয় করতুম, স্যাডনেস এনজয় করতুম, গ্রিফ এনজয় করতুম, তোমার অদৃশ্য বন্দিত্ব এনজয় করতুম, আর প্যাঁচ কষতুম, কে লোকটা, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আমার হাঁটবার রাস্তায় অ্যাসফাল্ট পেতে সুগম করে দিচ্ছে, জীবনে একবারও হুঁচট খেয়ে পড়তে দিল না।

               এক পেগ মতন ঢালার পর সোডার বোতল খুলতে যাচ্ছিলুম, বললি, নো, নো, মাতন লাগতে দাও, খাবো তবে তো মনের কথা বলতে পারব, কতকাল যাবত চেপে গুমরে উঠেছে কথাগুলো।

               এক চোঁয়ে খেয়ে, ফ্ল্যাপার ছুড়ে ফেলে দিলি দীর্ঘ ঢ্যাঙ নাচিয়ে, বিছানায় চিৎ শুয়ে-শুয়েই আবৃত্তি করতে লাগলি, চোখ বুজে :

               In the German tongue, in the Polish town

               Scraped flat by the roller

               Of wars, wars, wars.

               But the name of the town is common

               My Polack friend

               #

               Says there are a dozen or two

               So I never tell where you

               Put your foot, your root,

               I never could talk to you.

               The tongue stuck in my jaw.

               আবৃত্তি থামিয়ে, আরও বারোটা স্তবক আছে, বললি,  মনে রেখো আই ওন ইউ, আমি তোমার অস্তিত্বের সত্বাধিকারিণী। কবির নাম জানো না ? খুঁজো , খুঁজো, খুঁজো।

               আমি : ঘুমিয়ে পড়, ক্লান্ত হয়ে গেছিস, দেখাই যাচ্ছে, রেস্ট নিয়ে স্নান করে, লাঞ্চ সেরে তারপর কথা হবে।

               তুই : না, না, না, না, পালিও না, বসে থাকো, আমি ঘুমোবো আর তুমি এদিক ওদিক টেলিফোন ঘোরাবে, সেটি হচ্ছে না, মোবাইল কোথায়, অফ করে দাও বা সাইলেন্ট মোডে করে দাও। বসে থাকো, চুপটি করে বসে থাকো, আমি ঘুমোবার চেষ্টা করছি, ঘুম ভেঙে যেন তোমাকে বসে থাকতে দেখি। নয়তো, এতক্ষণে জেনে গিয়ে থাকবে আমার বিহেভিয়ার কেমন রাফ, আনকালচারড, মোটেই ভদ্রজনোচিত নয় , জাস্ট রিক্লাইন অন দ্যাট সোফা।

               বিছানা থেকে উঠে, সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা মোবাইল তুলে সুইচ অফ করে দিলি, ল্যাণ্ডলাইনের রিসিভারটা নামিয়ে রাখলি , আর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি আবার, চোখ বুজলি।

              তুই চোখ বুজতেই খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম তোকে।  তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোর সঙ্গে যৎসামান্য মিল আছে, ভরাট হয়ে উঠেছিস, ডেলিবারেটলি সেক্সি।

               তোর আদেশ শুনে আশ্রয়ের ভালোলাগায় পেয়ে বসল আমায়, অথচ অতিথি তো তুই। আমার শরীর থেকে ব্যুরোক্র্যাটের পার্সোনা ছিঁড়ে ফেলে দিলি যেন।

##

               প্রজাপতিদের ফ্রিল-দেয়া শালুকের কোঁচকানো ঢেউ। আমি ? পাগলের ওড়ানো ঘুড়ি।

               বুকে, বিজয়ের আহ্লাদে মিশেছে জয়ের আছাড়, স্বপ্ন দেখার জন্য গড়ে-নেয়া দ্যুতিময় অন্ধকার।

##

               এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

               যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

                প্রায় দুঘণ্টা বসেছিলাম সোফায় হেলান দিয়ে, চোখ লেগে গিয়ে গিয়েছিল। চোখ খুলতে দেখি তুই পাশে বসে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে, ল্যাভেণ্ডার আইসক্রিমের গন্ধের দূরত্বে, গভীর কালো চোখ মেলে, আমাকে তারিয়ে দেখছিস,  হাতে স্মার্টফোন। এত কাছে একজন যুবতীর মুখ, সুগন্ধ পাচ্ছি হাঁ-মুখের, ল্যাভেণ্ডার মাউথ ফ্রেশেনার ইনহেল করে থাকবি।

                কি গভীর চোখজোড়া, আমার ভেতর পর্যন্ত তিরতিরিয়ে সেঁদিয়ে গেল। কোথা থেকে পেলি এরকম চোখ, চোখের পাতা? তোর মা তোকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবার সময়ে জানত কি যে  তুই এরকম সুশ্রী আর স্মার্ট যুবতী হয়ে উঠবি, সেক্সি অ্যাটিট্যুড ঝলকাবে !

                বললি, দেখছি, তোমার ভেতরের সোকল্ড ঈশ্বরের চেহারাটা কেমনতর, কত পার্সেন্ট হিউমান আর কত পার্সেন্ট গডলি, কিংবা কোনো গডজিলা বা কিংকং লুকিয়ে রয়েছে কিনা।

                গম্ভির হবার অভিনয় করলাম।

                তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দুচারগাছা পাকাচুলে রোমের গ্ল্যাডিয়েটারদের মতন দেখাচ্ছে তোমায় ; হেয়ার ডাই করা আমি একেবারে পছন্দ করতে পারি না। তোমার ঘুমন্ত পোজের গোটা দশেক ফোটো তুলে নিয়েছি, ইন্সটাগ্রাম, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস আর আমার ফেসবুক পাতায় পোস্ট করে দিয়েছি, যাতে ফোটো তুলছি দেখে ডিলিট করার চেষ্টা না করো। একটা সেলফি তুলি, কি বলো, বলে আমার গলা বাঁহাতে জড়িয়ে সেলফি তুলে নিলি, বললি, এটা আপলোড করছি না, আপাতত করছি না, কখনও করব।

               তোকে প্রশ্রয় দিতে আমার ভালো লাগছিল। আর স্পর্শ ? অবর্ণনীয়। নবীকরণ, নবীকরণ, নবীকরণ।

                নারীশরীর, নারীশরীর, নারীশরীর। সুগন্ধ সুগন্ধ সুগন্ধ।

##

                স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

                শিশিরে কেউটের গন্ধ। উতরোল কোলাহল।

##

                তুই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিলি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, পারফিউম মেখেছিস, সিল্কের নাইটগাউন পরে নিয়েছিস, হালকা গোলাপি লিপ্সটিক লাগিয়েছিস, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুলে হয়ে উঠেছিস আকর্ষক, বললুম, ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছিস ?

                 তুই জানালি ফ্রিজ থেকে ব্রেড নিয়ে টোস্টারে টোস্ট করে খেয়েছিস, কিচেনে গিয়ে দুমুঠো অ্যাসর্টেড বাদাম খেয়েছিস।

                 তুই : হ্যাজেলনাট দেখলুম, ইনডিয়ায় আজকাল সবই পাওয়া যায় দেখছি, বললি।

                 আবার ব্যঙ্গের পরিতৃপ্তি তোর কথায় ঝরল, বললি, তোমার প্যানিকড হবার প্রয়োজন নেই, ওয়াচম্যান না কি সেন্ট্রি, তাকে বলে দিয়েছি কেউ এলে বলে দিতে যে আজ সাহেব কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, ওনার এক আত্মীয় এসেছেন বিদেশ থেকে, সদর দরোজা বন্ধ করে এসেছি, এই ঘরের পর্দাও টেনে দিয়েছি, আর তুমি যা চাইছিলে, আমাকে অন্য ঘরে স্হানান্তরিত করতে, পাশের ঘরে আমার বিলংগিংস রেখে এসেছি, দেখলুম ঘরটাতে অ্যাটাচড বাথ রয়েছে, টিশ্যু পেপারের রোলও রয়েছে, আমার এখন রোল ইউজ করার অভ্যাস হয়ে গেছে। ডেস্কটপটা ইউজ করে নিলুম, বেশ কয়েকটা ই-মেল লেখা জরুরি ছিল। একটা শাঁখ দেখে ভাবলুম বাজাই জোরে আর তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাই, তারপর মনে হল, নাঃ, বেচারা ব্যুরোক্র্যাট, সরকারি চেস্টিটি বেল্ট পরে বসে আরাম করছে।

##

                স্মার্টফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে , তুই আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললি, আই লাভ ইউ, আমি তোমায় ভালোবাসি, ইউ আর মাই লাভার, আই অ্যাম ইওর বিলাভেড, ওই ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো, আর স্বচরিত্রে এসো।

                আমি : কী বলছিস কি, আবোল তাবোল, বললুম।

                তুই : ডোন্ট ট্রাই টু বিহেভ লাইক অ্যান ওল্ড বাবা। বাবা সাজার চেষ্টা কোরো না, আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি বাবা অভিনয়কারীদের।

                আমি : আবার মদ খেলি ?

                তুই : হ্যাঁ, মেরে দিলুম এক পেগ তুমি ঘুমোচ্ছ দেখে, কিছু করার নেই, মদের খোঁয়ারিতে তোমাকেই দেখছি কতক্ষণ হয়ে গেল, তোমাকে দেখার মাদকতার সঙ্গে ব্ল্যাক ডগের নেশা, আইডিয়াল। কতকাল তোমাকে দেখার কথা ভেবেছি, কেমন দেখতে ভেবেছি, দেখা পেলে কতগুলো টুকরো করব ভেবেছি, কোন টুকরোটা আগে খাবো ভেবেছি। বিছানায় রুবিক কিউব রয়েছে দেখলুম, ও আমি চেষ্টা করেও পারি না, আমার বোন অবশ্য এক মিনিটে করে ফেলতে পারে।

                আমি : ছাড় দিকি, গলা ছাড়।

                তুই : আবার অ্যান ওল্ড বাবা সাজার চেষ্টা করছ, ভুলে যেওনা মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, আমার নাম ইতি প্রধান নয়, আমার নাম নেতি ব্যানার্জি। তারপর নাকে নাক ঠেকিয়ে, চোখে চোখ রেখে বললি, বলিউডি ফিল্মে যেমন দেখায়, সেই কাঁথাটা রাখোনি, যেটায় আমাকে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল আমার রেপিস্ট বাবা আর ভিতু মা। রেপিস্ট ছিল নিশ্চয়ই, দেখছ তো আমি কতো ওয়েল বিল্ট লম্বা চওড়া, বায়োলজিকাল বাবা গায়ের জোর খাটিয়ে রেপ করেছিল বায়োলজিকাল মাকে, মা হয়ত কাজের বউ ছিল কিংবা চাষি বউ বা পরিচারিকা বা হোয়াটএভার, হু কেয়ার্স।

                আমি : ঠিক আছে, গলা ছাড়।

                তুই : মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, গলা ছাড়ব বলে অত দূর থেকে উড়ে আসিনি। থাকব এখন, একমাস, দুমাস, তিনমাস, যত দিন না আমার উদ্দেশ্যপূরণ হয়। ছাড়াবার চেষ্টা কোরো না, আমার গায়ে তোমার চেয়ে বেশি জোর আছে বলে মনে হচ্ছে, তোমার হাইটের সমান আমি, হাতও তোমার চেয়ে দীর্ঘ।

               তোর চোখের আইল্যাশ কি নকল, এত বড়ো দেখাচ্ছে ? এড়াতে চাইলাম।

               আমার কিচ্ছু নকল নয়, বলে, উঠে দাঁড়ালি তুই, ফাঁস খুলে গাউনটা ফেলে দিলি কার্পেটের ওপর, নগ্ন, জড়িয়ে ধরলি আমাকে, বললি, দেখে নাও, আগাপাশতলা খাঁটি।

               কী করছিস কি ! আমি চড় কষিয়ে দিলাম তোর গালে।

                তুই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলি, ঠোঁটের ওপর ঠোঁটের আলতো ঠোক্কোর মেরে মেরে বলতে লাগলি, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ।  

              আচমকা দুহাত দিয়ে আমার পাঞ্জাবির বোতামের জায়গায় টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললি, মুখ গুঁজে দিলি আমার বুকে, ঠোঁট ঘষতে লাগলি, বলতে লাগলি, আমি এখনও ভার্জিন, তোমার জন্য, তোমার জন্য, তোমার জন্য, কবে থেকে খুঁজছি তোমায়, সেই ক্লাস এইট থেকে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। শুইয়ে দিলি সোফার ওপরে, টান মেরে খুলে দিলি আমার লুঙ্গি, বললি, তবে, ইউ আর গেটিং ইনটু ফর্ম, নাউ মেক লাভ, আমাকে টেনে নামিয়ে দিলি কার্পেটের ওপর, মেক লাভ, প্রভঞ্জন, তোমার অদৃশ্য ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো।

##

               শিশিরে কেউটের গন্ধ। উতরোল কোলাহল।

               স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি। চাউনির অতিশয়োক্তি।

               স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

##

               আমি উঠে বসে আরেকবার চড় মেরে বললাম, স্টপ দিস।

               চড় মেরে ফিলগুড অনুভূতি হাতের তালু বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল শিরা-উপশিরায়, নেমে গেল বুক-পেট-জানু হয়ে পায়ের দিকে, শিউরে-ওঠা কাঁপুনির  এক ভালো লাগা।

                তুই : স্টপ ? তোমার শরীর তো রেসপণ্ড করছে, লুকোচ্ছ কেন যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো। বাবাগিরি ফলিও না, যথেষ্ট বাবাগিরি ফলিয়েছ, এবার প্রভঞ্জনে এসো মিস্টার প্রধান, আমি নেতি ব্যানার্জি, এসো, আমার চোখের দিকে স্পষ্ট করে তাকাও। তাকাও, চোখের পাতা ফেলবে না, তাকাও, আমার মুখের দিকে তাকাও। তুমি যে আমার সো কল্ড বাবা নও, ভুলে যাচ্ছ কেন ? আর হলেই বা বাবা, সম্পর্ক পাতাও, ইনসেস্টের সম্পর্ক, প্রিহিসটরিক যুগে যেমন মেয়েদের সঙ্গে বাবাদের সম্পর্ক হতো, যেমন বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়ার হয়। 

               বলতে লাগলি আই ওয়ান্ট ইওর বেবি, আমি তোমার বাচ্চা কনসিভ করতে চাই, ডোন্ট রেজিস্ট, তোমার মুখে আঁচড়ে-কামড়ে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেবো কয়েক দিনের জন্য। নখ দেখেছ, যৎসামান্য ছুঁচালো ; দাঁতও ব্যবহার করতে পারি। আমার সেক্সের চাহিদা নেই ; আমি বাচ্চা চাই।

                দুহাতের চেটো দেখিয়ে বললি, এই দ্যাখো, মেহেন্দির নকশায়  ডান হাতে লেখা রয়েছে ড্যাড আর বাঁহাতে ব্রো-প্রো ; আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার।

##

                 প্রলোভনের সমস্যা চিরকাল এই যে জীবনের তাৎক্ষণিক সুযোগ আর পাওয়া যায় না।

                 ছেড়ে দিলাম শরীরকে তোর হাতে, টেনে তোকে বিছানায় নিয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম যে  তোকে এই ভাবেই পেতে চেয়েছি, বড়ো করে তুলেছি, অপেক্ষায় থেকেছি যে একদিন না একদিন তুই আসবি ; নেতি ব্যানার্জি আমার, আমিই তাকে আঁস্তাকুড় থেকে তুলে আনার পর নারীত্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি।

                আমাকে জড়িয়ে তুই নিজের ওপর তুলে নিলি । তোর বুকে মুখ গুঁজলুম, কী তপ্ত তোর বুক। উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরলুম তোকে।

              বললুম, আমিও ভার্জিন রে, সেক্স করিনি এখনও। দুবছর আগে পর্যন্ত আমার নাইট ফল হতো, স্বপ্নে তোকে পেয়ে, চটকে-মটকে । ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করেছিলাম, সে বললে ম্যাস্টারবেট করে বের করে দিতে। কম বয়সে করতাম, তোর মুখ মনে করেই করতাম, কিন্তু এত বয়সে কেউ কি ম্যাস্টারবেট করে ; ইচ্ছে করেছে, কিন্তু করিনি, কেমন নোংরা মনে হতো, ওই যে তুই চেস্টিটি বেল্টের কথা বলছিস।

               আমিও করিনি, ইন দ্যাট সেন্স করিনি, তোমাকে ইম্যাজিন করে ডিজিটালি যতটুকু  আনন্দ পাওয়া যায় ; ননডিজিটালি করলে নাকি ভার্জিন থাকা যায় না, জাঠনি বাড়ির ভিতু মেয়ে বলতে পারো। এই তো তোমার বেডশিটে দ্যাখো, ব্লাড। চাদরটা তুলে দিতে হবে, আমি এই অংশটা কেটে নেবো, মেমেন্টো হিসাবে, নয়তো তোমার সারভেন্ট সকালে এসে সন্দেহ করবে।

                মগজে প্রশ্ন উঠল, কত স্বাভাবিক বোধ করছি এখন, কেন, এই দৈহিক সম্পর্ক ঘটে গেল বলে ? আড়ষ্ট লাগছে না তো ! আমাদের দেখা হয়নি কত বছর, অথচ দুজনেই দুজনের অতিপরিচিত ছিলাম।

                 বললাম, তুলে দিস, অনেক চাদর আছে, কালারড প্রিন্টেড চাদরও আছে। জাঠদের সংস্কৃতি থেকে পেয়েছিস নাকি এই বিদকুটে প্রদর্শনী ?

               তুই : হতে পারে, অভিভাবক মা যখন জাঠনি, কিছু তো পাবো। যাকগে, এবার এলেকট্রা বলে ডাকো।

                আমি : এলেকট্রা, মাই ডিয়ার চাইল্ড, জানি তুই নিও টেরেস্ট্রিয়াল।

               তুই :  জানলে কি করে ?

               আমি : আন্দাজে, নেটি যখন, তার মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল। আমি মনে মনে তোকে ইতি নাম দিয়েছি।

              তুই :না, তুমি হলে ইটি,  এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল। মঙ্গলগ্রহের সরকার তোমায় চেস্টিটি বেল্ট পরে পাঠিয়েছে।

              আমি : কিন্তু তুই আনওয়েড মাদার হয়ে সমাজে থাকবি কী করে ?

              তুই : ধ্যুৎ, আমি আমেরিকায় থাকি। তুমি কি আমাকে রিচুয়ালি বিয়ে করতে চাও ?

              আমি :  হ্যাঁ।

              তুই : আমি কনসিভ করতে চাই, বিয়ে-ফিয়ে আবার কি ? এক পাকেই বাঁধতে চাই না নিজেকে তো সাত পাকে। তোমার রিমোট কন্ট্রোল যথেষ্ট প্রয়োগ করেছ, এবার আমার পালা, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট। বাট আই উড  থিংক ওভার ইয়র প্রোপোজাল।

              আমি : কি করে জানলি যে বাচ্চা পেতে হলে এই সব করতে হয় ?

               তুই : আঁস্তাকুড়ে শুয়ে শুয়ে শিখে ফেলেছি ; তুমি কি করে শিখলে ?       

              আমি : শরীরের জিপিএস কাজ করল ; উ উ উ উ উ উ করছিলিস কেন ? অরগ্যাজমের উত্তেজনা রিলিজ করার জন্য ?

              তুই :হাঃ, এতক্ষণ তোমাকে কবিতা শোনালুম, রাইমিং মার্ক করোনি ? উ উ উ উ ? মহাকাব্যের এলেকট্রার স্বপ্নপূরণ হল বলে মনে হচ্ছে।

              আমি : না, মার্ক করিনি, টেন্সড আপ ছিলাম, তুই হঠাৎ এসে পড়েছিলিস, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, লস্ট ফিল করতে আরম্ভ করেছিলাম।

              তুই বললি, লস্ট ? নিজের মধ্যে নয়, আরেকজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে হয়, ইতস্তত করতে নেই, সব সীমা মানুষের বানানো, ভাঙো যেদিন যখন চাও, নেভার গেট লস্ট । তারপর আরম্ভ করলি তোর গায়িকাসুলভ  কন্ঠস্বরে :

                It struck me a barbed wire snare

                Ich, ich, ich, ich,

                I could hardly speak

                I thought every German was you

                And the language obscene

                #

                An engine, an engine

                Chuffing me off like a Jew.

                A Jew to Dachau, Auschwitz, Belsen.

                I began to talk like a Jew.

                আমি : আমাকে শোনাবি বলে মুখস্হ করে রেখেছিস ? কার কবিতা বললি না তো ?

                তুই : খুঁজো, খুঁজো। হ্যাঁ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছি, কল্পনা করেছি তোমাকে কেমন দেখতে।

                আমি : কেমন ? ফানুসনাভি ব্যাঙ-থপথপে শুশুকমাথা আমলা, চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো ?

                তুই : হা হা, সেল্ফডেপ্রিকেট করছ কেন, লেডিজ টয়লেটের দেয়ালে আঁকা ড্রইংয়ের মতন। কোরো না, শিরদাঁড়া ঘিরে তালের আঁটির মতন শুকিয়ে যাবে।

                 আমি :কত কথা বলতে শিখে গেছিস।

                  তুই : থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট, সবই মোর অর লেস বরোড ফ্রম বাঙালি ক্লাসমেটস ।

                  আমি : তাহলে কি করব ? পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দুভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস হয়ে উড়ব?

                  তুই : হ্যাঁ, হেঁইয়ো করাতেও তো পাল তুলতে হল আমাকেই।

                 আমি : এখন দ্যাখ, চিংড়িদাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি-ঠোঁটের হাসি।

                 তুই : ইয়েস, বেটার দ্যান আই এক্সপেক্টেড ; আমি ভেবেছিলুম তুমি সত্যিই ড্যাডি টাইপের হবে, পেট মোটা, আনস্মার্ট, লেথারজিক, বুকে চুল নেই, বগলে চুল নেই, কুঁচকিতে চুল নেই।

                আমি : কী করতিস অমন হলে।

                তুই : এখন যা করলুম, তা-ই করতুম, তোমাকে কেমন দেখতে ওটা ইররেলিভ্যান্ট।

                 আমি : আমি তো আরোহী-ফেলা পুংঘোড়ার লাগাম-ছেঁড়া হ্রেষা।

                তুই : হ্যাঁ, আই ওয়ান্টেড ইউ, দি পার্সন হু ওনড মি। নাউ আই ওয়ান্ট দি সোয়েটিং স্ট্যালিয়ন, প্রত্যেকদিন , অফিস থেকে ফিরতে দেরি করবে না, আর, আমি সকালেও তোমাকে চাই, দি মর্নিং গ্লোরি। আমার কাছে সেক্স অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তোমাকে আমার জীবনে কখনও অতীত হতে দিতে চাই না, তাই আমার বেবি চাই, সম্পর্ককে যে বাচ্চা অতীত হতে দেবে না, যতদিন সে বেঁচে থাকবে ততদিন, আর তারপর তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে নিজের ছেলেমেয়ের মাধ্যমে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে নিয়ে যাবে। ক্যারি অন অ্যাণ্ড অন অ্যাণ্ড অন ইনটু ইটারনিটি, ইনটু নিউ সানরাইজ এভরি ডে।

                 তোকে বললুম, এত ফ্যাক-ফ্যাক করে কনভেন্টি ইংলিশ বলিসনি, দিল্লিতে এখন হিন্দিঅলাদের রাজত্ব শুরু হয়েছে, ওপরে উঠতে হলে হিন্দির বাঁশের মই বেয়ে উঠতে হবে, নেহেরুভিয়ান অক্সব্রিজ বাবু-মন্ত্রীদের যুগ ফুরিয়েছে। মোগল সম্রাট আকবরের বংশধররাও ক্যারি অন করে পোঁছেছিল ক্যাবলা বাহাদুর শাহ জাফরে, যত ক্যারি অন হয় তত ফিকে হতে থাকে ভবিষ্যত। মোতিলাল নেহেরু পৌঁছেচে রাহুল আর বরুণ গান্ধিতে।

                 তুই : ভালো বলেছ, ফাক-ফাক হিন্দির বাঁশ; এ হল অকলোক্র্যাসি বা টির‌্যানি অফ দি মেজরিটি, মেজরিটি সেক্টের পুরুষরা পাকিস্তানে কি করছে দেখতেই পাচ্ছ, তুই খিলখিলিয়ে বললি। যোগ করলি, কাঁধ শ্রাগ করে, হিন্দি সাবজেক্টেও প্রতিটি ক্লাসে সবচেয়ে বেশি মার্কস পেতুম, সো আই ডোন্ট কেয়ার ; আই ওন ইউ ইন অল দি ইনডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস। আমার জিভে আছে তোমার অস্তিত্বের মালিকানা।

##     

 

                 এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

                 যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

                 আমি : আই ডিডন্ট ওন ইউ ; তুই তোর নিজের মালিক, কেউ কাউকে ওন করে না।

                 তুই : করে, সম্পর্ক হল অন্যের আত্মার মালিকানা। তুমি আমার আত্মার মালিক, আমি তোমার।

                 আমি : আত্মা ? হয় নাকি সেরকম কিছু ?

                 তুই : কেন হবে না ! না হলে কী করে তোমাকে খুঁজে বের করলুম, কাঠঠোকরা যেমন গাছের বাকলে ঠোঁটের ঠোক্কোর মেরে মেরে পোকা বের করে আনে।

                 আমি : পোকা ?

                 তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দি মেল অরগ্যান লুকস লাইক এ বিগ ক্যাটারপিলার, উত্তুঙ্গ গুটিপোকা, প্রজাপতির নয়, টাইগার মথের। টু বি ফ্র্যাংক, আজকেই আমি স্পষ্ট করে দেখলুম প্রত্যঙ্গখানা কতটা আর্টিস্টিকালি বিল্ট। তোমার প্রত্যঙ্গখানা বোধহয় গ্রিসে বা রোমে তৈরি, খাজুরাহোয় নয়।

##

                   আমি : চণ্ডীগড়ে, জগদীশের বাড়িতে আগে যাওয়া উচিত ছিল তোর।

                  তুই : দুটো কারণে যাইনি ; উনি তোমাকে ইনফর্ম করে দিতেন আর তুমি নির্ঘাত লুকিয়ে পড়তে, আমার পরিকল্পনা, জীবন নিয়ে ভাবনা, তোমাকে আগাপাশতলা খেয়ে ফেলার ইচ্ছে, সব গোলমাল হয়ে যেত।

                  আমি : আর দ্বিতীয় ?

                  তুই : বৈদেহী ওর বরকে ডিভোর্স দিয়েছে, বরটা গে, নেশাভাঙ করে, বাস্টার্ড, কোনো গে ছেলেকে বিয়ে করলেই পারত, কোর্ট তো অ্যালাউ করে দিয়েছে। স্কাউন্ড্রেলটা বৈদেহীকে কামড়ে দিয়েছিল, হাতে, কাঁধে। ওর বিধবা শাশুড়ি আর ওর বর দুজনে মিলে এক রাতে, তখন রাত দুটো, বৈদেহীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, ওর মোবাইল কেড়ে নিয়ে, হায়দ্রাবাদের  রাস্তায় ভেবে দ্যাখো ; সাইবারাবাদ আইটি ইনডাস্ট্রির এক এমপ্লয়ি  স্কুটারে  ফিরছিল, তাকে থামিয়ে বাড়িতে ফোন করতে বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, ওনার আইএস বন্ধুকে জানায়, তিনি বৈদেহীকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখেন, আর পুলিসে এফ আই আর করেন।

                 আমি : জানি, আমাকে আবার কি বলছিস, আমিই তো পরিচিত একজন আন্ডার সেক্রেটারিকে বলে বৈদেহীর চণ্ডীগড় ফেরার ব্যবস্হা করেছিলাম। জগদীশের তো শুনেই ব্লাড প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল ; সারাজীবন হরিয়ানায় কাটাল, বাইরের ক্যাডারের অফিসারদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় নেই।

                 তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি ? তুমি ? তুমি ? তোমার ভূমিকা, অ্যাজ ইউজুয়াল, ওনারা চেপে গিয়েছিলেন, বলেননি আমাকে। বলতে পারতেন, আমি তো আর তক্ষুণি আমেরিকা থেকে উড়ে তোমায় কবজা করতে আসতুম না।

                তুই : আরিয়ানও আঙ্কলবাবা আর মাকে, আই মিন আন্টিমাকে, না জানিয়ে বিয়ে করে চলে গেছে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে। ওনারা যথেষ্ট ডিপ্রেসড, আই অ্যাম শিওর। যাবো না ওনাদের বাড়ি, জানতে দিতেও চাই না যে আমি ইনডিয়ায় এসেছি।

                  আমি : জানি, আমি জগদীশকে বলেছিলাম যে বৈদেহীর পাত্র বিশেষ সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, একটা পুলিশ এনকোয়ারি করিয়ে নিই, তা ওর আর অমরিন্দরের টাকাকড়ি সম্পর্কে এমন লোভ যে কানে হিরের টপ-পরা পাত্রের বানজারা হিলসের বাড়ি, বিএমডাবলিউ গাড়ি  আর ব্যবসার সাইনবোর্ড দেখে ভিরমি খেয়ে গিয়েছিল, শেষে এই বিপদ ডেকে এনেছে।

                 তুই আচমকা বললি, আমি তো শুনেছিলুম, বৈদেহী অব্রাহ্মণ কাউকে পছন্দ করত, তার বয়স নাকি ওর চেয়ে চোদ্দো-পনেরো বছর বেশি, ওনারা তাতে রাজি হননি, সেই লোকটি সুদর্শন, ওয়েল বিল্ট, আইএএস, তোমার মতো এজিএমইউ ক্যাডারের।

                আমি : তা জানি না, ওরা বলেনি কখনও এ-ব্যাপারে, বললে মধ্যস্হতা করতাম।

                তুই : করতে ? আর ইউ শিয়র ?

                আমি : আরিয়ানের পছন্দ করা মেয়েটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিতে বলেছিলাম, করল না, ট্রাইবাল ফ্যামিলির বলে। আরিয়ান হল অ্যানথ্রপলজিস্ট, যে মেয়েটিকে বিয়ে করল তাদের সমাজে ঢুকে বিস্তারিত জেনে নিতে চাইছে, তাতে দোষের কি? শুনতে ট্রাইবাল, আমি ফোনে কথা বলেছি মেয়েটির সঙ্গে, স্কুলে পড়ায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী ছিল। জগদীশ ভাবল যে ওর ভবিষ্যৎ প্রজেনির ব্রিড নষ্ট হয়ে গেল। ব্রিড বলে কিছু হয় নাকি, তোকে দেখে শেখা উচিত ছিল ওদের, তোর ব্রিড কেউ জানে ? আজ কোথায় পৌঁছে গেছিস।

##

                 লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার….

                 মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে…..

                 কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে….

                 নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে….

##

                  তুই : ধ্যুৎ, এইসব প্রসঙ্গ তুলছ কেন ! আমার তো অ্যাপ্রিহেনসান ছিল, আতঙ্কও বলতে পারো, এসে দেখব, একজন হাড়গিলে টাকমাথা চশমাচোখ বুড়ো অন দি ভার্জ অফ রিটায়ারমেন্ট। আমার ডিটেকটিভ এজেন্সি প্রচুর সময় নষ্ট করে দিলে তোমায় লোকেট করতে, আমিই ওদের আঙ্কলবাপি আর মা, আই মিন আন্টিমায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে বললুম ফাইনানশিয়াল ট্রইল ধরে এগোতে। আঙ্কলবাপি তো এতো ঘুষ খায় যে ওরা ডাইভার্টেড হয়ে যাচ্ছিল ; তখন ওদের বললুম পুরোনো ট্রেইল ধরে এগোতে, যখন আমি আইআইটিতে  পড়তুম, আর আমার অ্যানুয়াল ফিস এটসেটরা পে হচ্ছে, সেই সময়ের ট্রেইল।

                 আমি : বুড়ো হলে কি করতিস।

                 তুই : সুইসাইড, জোক করছিনা, বুড়ো হলে তার কোঁচড় থেকে ফুলঝুরির বদলে কুয়াশা উড়ত। কুয়াশায় বাচ্চা হয় না।

                  আমি : ইশারার সাহায্যে বেশ পোয়েটিক কথাবার্তা বলতে শিখেছিস দেখছি।

                 তুই : বাঙালি ব্যাচমেটদের কনট্রিবিউশান। প্রচুর বাংলা গালাগাল জানি। বলব ? হিন্দিও জানি, গিগলিং টাইপ। হরিয়ানভি গালাগাল কিন্তু বেশি ইউজার-ফ্রেণ্ডলি।

                 আমি : না না, বলতে হবে না। বুড়োর বদলে কি পেলি ?

                 তুই : কোঁচড় থেকে বকুল ফুলের ঝরণা ঝরাতে পারে এমন মাসকুলার স্ট্যালিয়ন। এসো, বুলশার্ক, আরেকবার হয়ে যাক।

                নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনলাম, প্রভঞ্জন, তুমি কতোকাল নেতির জন্য অপেক্ষা করেছ, আর লজ্জায় বিব্রত বোধ কোরো না, নিয়ে নাও, যতো পারো নিয়ে  নাও, একেই যদি প্রেম বলে তাহলে চুটিয়ে ভালোবেসে নাও, প্রেমকে গোপন রেখো না, একেই তো চাইতে তুমি, নিজেকে এই মেয়েটির বাবা বলে মনে কোরো না।

               এতকাল যুবক-যুবতীদের পারস্পরিক সান্নিধ্য আর প্রেমের প্রদর্শনী দেখে হিংসে করতাম, আড়চোখে,   ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি প্রভঞ্জন প্রধান, নিজেকে নিজে ভাবতে আড়ষ্ট বোধ করতাম, ভয়ও পেতাম, মনে মনে তোকে ধন্যবাদ দিলাম, নিজেকে প্রভঞ্জন প্রধান হিসাবে নিজের কাছে তুলে ধরার যোগ্য করে তোলার জন্য, আমার ভেতর থেকে আমাকে প্রসব করার উপযুক্ত করে তোলার জন্য, বুঝতে পারলাম রে, যে আমি কোনও স্হাবর-স্হির বস্তুপিণ্ড নই, তোর শিশুকাল থেকে আমিও তোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছি, তুই না এলে আমার অতীত থেকে যেত একেবারে ফাঁকা , ব্যথার মোড়ক খুলে আরেক ব্যথার সাথে মেশানো হয়ে উঠত না।

                বললাম, হোক, উ উ উ উ করিসনি, প্লিজ।

               তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি এক্টিভ হও, আমি তোমাকে কবিতাটার একটা রেলিভ্যান্ট প্যারা শোনাচ্ছি, বেশ মজার হবে, না ? কবি কখনও ভাবতেও পারেননি যে ওনার কবিতা এইভাবে কাজে লাগানো হবে, স্টার্ট।

               No God but a swastika

               So black no sky could squeak through

               Every woman adores a Fascist,

               The boot in the face, the brute

               Brute heart of a brute like you

               পাশে শুয়ে পড়লাম, বললাম, আমাকে ফ্যাসিস্ট বলছিস, ব্রুট বলছিস, অতদূর থেকে উড়ে এই কথা বলতে এলি ?

                তুই : ব্রুট ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কি ? আমার জীবনকে একেবারে আয়রন গ্রিপে রেখেছিলে, গেস্টাপো কেজিবি সিআইএর মতন নজর রেখেছো সদাসর্বদা। আমি ভিতু টাইপের নই, তুমি যদি বিদ্রোহ না করো তাহলে ভালোবাসা পাবে না, ভালোবাসতে গেলে গায়ে আঁচড়-কামড়ের রক্ত ঝরবে, ভালোবাসায় মাংসের সঙ্গে মাংসের জখমগুলো খুবই সুন্দর, এমনকি মধুময় বলা যেতে পারে, প্যাশনে রক্ত গরম হয়ে উঠবে, তবেই তো ভালোবাসার আমেজ নিতে পারবে। ভয়ও যদি করে, ঝাঁপাতে হবেই।

                 আমি : এলি কেন তাহলে ?

                 তুই : আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম। তোমার গ্লোরি দখল করে তোমার প্রথম রক্ত প্রথম স্পার্ম নেবো বলে ; এখন তোমার মাথার পেছন থেকে হ্যালো ঝরিয়ে দিয়েছি, তোমার রক্ত পালটে দিয়েছি, তোমার যিশুখ্রিস্টগিরি শেষ করে দিয়েছি। তুমি আর আগের প্রভঞ্জন প্রধান নও, না ব্রো-প্রো ?

                 আমি : জানিস ব্রো-প্রো ?

                 তুই :  জানিতো, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা ওই নামেই তো উল্লেখ করেন তোমায়, তুমি সামনে কোনোদিন না এলেও আমি অনুমান করেছিলুম যে এই ব্রো-প্রো লোকটাই আমাকে কনট্রোল করছে, দি ব্লাডি ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি ডিকটেটরিয়াল পালক পিতা, অ্যাবরিভিয়েট করলে হয় পাপি। তোমার ব্যাচমেটরা আর পরের আগের ব্যাচের সবাই তোমাকে ব্রো-প্রো মানে ব্রাদার প্রভঞ্জন বলে ডাকে, জানি।

                আমি : বিয়ের মেহেন্দি-নকশা কোথায় করালি ?

               তুই :  হোটেলে রিসেপশানিস্ট কে বলতেই ও পাঠিয়ে দিলে ঘরে ; লাগিয়ে বসে রইলুম চার ঘণ্টা, তোমার প্রতি ডিভোটেড, একা-একা আমার মেহেন্দি সেরিমনি, পরে দুজনে মিলে সঙ্গীত সেরিমনি করব।

##

 

                স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল জীবন।

                 চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস।

##

                 এর মতো, এর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

                 যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

 

                আমি : ওই স্টিলের আলমারিটা খোল, বাঁদিকে একটা সেফ আছে, সেটাও খোল, চাবি সামনের ড্রয়ারে আছে।

               তুই : কী আছে সেফে ? আমার গয়না-ফয়না টাকাকড়ি সম্পত্তি-ফম্পত্তি চাই না।

                আমি : খুলে তো দ্যাখ, যা আছে নিয়ে আয় বিছানার ওপর।

                তুই সম্পূর্ণ নগ্ন,  ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে সেফ থেকে কাগজপত্র বের করে প্রায়-স্তম্ভিত হয়ে গেলি, বললি, এতো আমার স্কুলের আইডেনটিটি কার্ডগুলো, ফাইনালের রেজাল্টগুলো, আর এটা, আরে, মাই গড, এতে তো আমার ইনটারভিউ বেরিয়েছিল, সিসটার অ্যানে নিয়েছিলেন, আর এটা, এটা তুমি ?

                আমি : হ্যাঁ, আমি, তোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তুই তখন এক বছরের।

                তুই : তুমি তো দারুন দেখতে ছিলে গো , পালক পিতা হের হিটলার, ওয়ান হু ওনস মি। ফোটোতে তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো সূর্যের গুঁড়ো মুখে মেখে হাসছ। ডানহাতে ওটা তোমার কনট্র্যাক্ট, তাই না, আমার লাইফ লং এডুকেশান স্পনসর করার ?

                আমি : দুটো কনট্র্যাক্ট রে, একটা তোর স্বনির্ভর না হওয়া পর্যন্ত এডুকেশান স্পনসর করার, আরেকটা তোকে অ্যাডপ্ট করার ? তোর পদবির এফিডেভিট জগদীশের কাছে ছিল, তোর স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাবার পর হয়তো ডেসট্রয় করে দিয়েছে।

                তুই : মাই গড, তুমি অ্যাডপ্ট করেছিলে ? আমি ভাবতুম বাপি, মানে আঙ্কলবাপি, করেছিল, আমার নামে তোমার পদবির বদলে তাহলে আঙ্কলবাপির পদবি জুড়লে কেন ? অ্যাডপ্ট করেও ডিজওন করতে চাইলে, আমি তোমার কনট্র্যাকচুয়াল ডটার বলে ?

                 আমি : না, আমি তো মোড়লচাষার ছেলে, প্রধানরা মাহিষ্য হয় ; তোকে ব্রাহ্মণ করার জন্যে জগদীশকে দিয়ে এফিডেভিট করিয়ে তোর পদবি ব্যানার্জি করিয়ে নিয়েছিলাম।

                 তুই : ধ্যুৎ, আমার ওবিসি হবার সুযোগটাই কেড়ে নিয়েছিলে, কত সুযোগ-সুবিধা পেতুম, তা নয়, বামুন, শ্যাঃ। অবশ্য একদিক থেকে ভালো যে আমি তোমার মেয়ে নই, জাস্ট অ্যান অ্যাডপ্টেড বেবি, এলেকট্রা অফ দি এলেকট্রা কমপ্লেক্স লাস্ট। দি ইনফেমাস এলেকট্রা, বুকের মধ্যে পুষে রাখা ইনসেসচুয়াস ব্যাটলক্রাইয়ের এলেকট্রা, ফসটার ফাদারের  প্রতিষ্ঠিত সন্তান। ইইইইইএএএএএ।

                আমি : সিচুয়েশান ভিলিফাই করছিস কেন ?

                তুই :  তোমার সংগ্রহের কাগজপত্রগুলো দেখব পরে সময় করে।

                আমি : হ্যাঁ, পরে সময় করে বসে বসে দেখিস, যখন অফিস চলে যাব। একটা পেপার কাটিং আছে, দেখতে পারিস, তুই যে ডাস্টবিনে পড়েছিলিস, তার সংবাদ।

               তুই :  তোমার বাঁহাতের কাটা দাগটা সেই বালি মাফিয়াদের আক্রমণে পাওয়া, না ?

               আমি : তুই কি করে জানলি ? ও তো অনেককাল আগের ঘটনা। হ্যাঁ, বেআইনিভাবে নদীর বালি তুলে নিয়ে গিয়ে বেচত বালিমাফিয়ারা, তাদের ট্রাক ক্রেন লোডার সিজ করার অর্ডার দিয়েছিলাম, তারই পরিণতি।

              তুই : জানি, তার পরের দিনই তোমার বদলি হয়ে গেলে।

              আমি : আর টিভিতে দেখালো মাফিয়াকর্তা জেল থেকে বেরিয়ে দু-আঙুলে ভি এঁকে হাসছেন ; সাঙ্গোপাঙ্গোরা তার জয়ধ্বনি করছে।

 

              প্রদাহ, যন্ত্রণা, আশঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ, মুখের ভিতরে জিভে।

              তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো  ঐশিতা, উপলব্ধি, সান্ত্বনা, অনুবোধ।

 

               তুই : আমি তোমাকে তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, জানো ?

              আমি : চিঠি ? কই পাইনি তো ? স্কুল কি সেন্সর করে দিয়েছিল ? নাকি জগদীশ-অমরিন্দর ?

              তুই : ধ্যুৎ, সেসব চিঠি পাঠাই-ইনি তোমায়; তুমি তো ইনভিজিবল ডুগুডার, জাস্ট অ্যান্টিসিপেট করে যে তুমি আমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছ, আমি দশ, এগারো আর বারো ক্লাসে তোমায় চিঠিগুলো লিখেছিলুম।

                আমি : রেখে দিতে পারতিস তো ! পড়তাম।

               তুই : তোমাকে প্রেমিকড্যাডি মনে করে লিখেছিলুম।

               আমি : ডেসট্রয় করে দিলি কেন ?

               করিনি, আমার সঙ্গেই এনেছি।

               তুই : কই, দে দে দে, কেউ তো কোনো কালে আমাকে চিঠিই লেখেনি, প্রেমপত্র তো বাদ দে।

               আমি : ওই তো টেবিলের ওপরে রাখা খামে আছে, চাইলডিশ যদিও, পড়ে দ্যাখো। বাংলায় লিখেছি, তার কারণ স্কুলে সিসটার আর ওয়ার্ডেনরা বাংলা জানতেন না।

              আমি : কার কাছে শিখলি বাংলা ?

              তুই : কেন , আঙ্কলবাপির কাছে, উনি ভিষণভাবে বেঙ্গলি, দেখছ না আন্টিমাকে কত তাড়াতাড়ি বাঙালি বানিয়ে দিয়েছিলেন, আণ্টিমাও বাংলা পড়তে-লিখতে পারেন, তাই স্কুলের পর্ব শেষ হলে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে চিঠিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলুম, তারপর নিজের সঙ্গেই রেখেছি। তোমার খবর পেতেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, যাতে আমার ফিলিংস বুঝতে পারো, চিঠিগুলোর এমোশান দেখেই বুঝতে পারবে কত পুরোনো আনুগত্য আর ডিপরুটেড ফিলিংস।

              তোর চিঠি আমি এক -এক করে পড়া আরম্ভ করলাম, পড়তে-পড়তে তোর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বিব্রত বোধ করছিস, আবার আহ্লাদিতও হচ্ছিস, ঠোঁট বন্ধ রেখে গিগল করছিস।

##

 

ক্লাস টেন ( ২৫ ডিসেম্বর )

ডারলিং ড্যাড,

তুমি সান্টাক্লজের মোজায় লুকিয়ে চলে এসো, আমি স্লেজগাড়ি পাঠাচ্ছি। আমরা দুজনে শীতের এই ঠাণ্ডায় মোজার ভেতরে ঢুকে বেশ মজা করব। আমি তোমার পোশাক খুলে মোজার বাইরে ফেলে দেব আর বলব, ড্যাড, এই দ্যাখো, তোমার বুকে মিথ্যা কথা বলার জন্য লোহা গরম করে ডেভিল তোমায় নরকে পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তুমি কেমন লোক ড্যাড, আমার জন্যে তোমার একটুও মনকেমন করে না ? কেন তুমি লুকিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছ ? যদি নিয়ন্ত্রণ করছই, তাহলে আমার সামনে আসার তোমার সাহস নেই কেন ? আমি তোমাকে ভালোবাসি ড্যাড, তুমি মনে কোরো না যে তুমি দূর থেকে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চিরকাল আড়ালে থেকে যাবে। আমি তোমাকে একদিন নিশ্চিত খুঁজে বের করব। আর যেদিন তোমায় খুঁজে পাবো, সেদিন তোমায় আমি খুন করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব। ইয়েস, আই উইল কিল ইউ অ্যাণ্ড ইট ইউ। সামনে এসো, দেখা দাও, প্রক্সি দিও না। তুমি কি বুড়ো, ফোকলা দাঁতে হাসো, গুটকা খাও, ছাতা মাথায় অফিস যাও ? তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছ ? তোমার নাতি-নাতনি কয়টা ? যতই যাই হোক, তোমাকে আমি ছাড়ছি না, ছাতা উড়িয়ে তোমায় টেনে নিয়ে আসব ঝাঁঝা রোদ্দুরে, কাদা-জমা বৃষ্টিতে, মনে রেখো, হুশিয়ারি দিয়ে রাখছি। পুরাণের ঋষিমুনিরা তো বুড়ো হয়েও কত কি করতেন, যেখানে সেখানে সিমেন ফেলতেন, সেই সিমেন থেকে শিশুরা জন্মাত, যা ঋষিমুনিরা জানতেও পারতেন না। পুরাণ অনুযায়ী ওল্ড এজ ইজ নট এ ফ্যাক্টর ইন ইমমরাল লাভ অ্যান্ড ইনহিউম্যান ওয়ার। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা চিন্তা করেছ কখনও, কিংবা হেলেন অফ ট্রয়ের জন্য যুদ্ধ ? এপিকগুলোয় বুড়োরাই যুদ্ধ করেছে, চিরকাল। এপিক লেখা তাঁমাদি হয়ে গেলেই বা, আমি আর তুমি তো আছি, আমাদের এপিক প্রোপোরশানের সম্পর্ক তো আছে, ইন পারপেচুইটি ? আরেকটা কথা। তুমি গোপন থাকতে চাও কেন ? তোমার গোপন জীবন আমি একদিন ঘা মেরে আখরোটের মতন দুফাঁক করে দেবো। তবে গোপনীয়তা তোমাকে বেশ রহস্যময় করে তুলেছে ; তোমার কি মনে হয় না যে গোপনীয়তাও একরকমের ভার, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাকে রিলিজ করার পথ করে না দিলে উন্মাদ হয়ে যাবে? ইনসেস্টকে অস্বাভাবিক মনে কোরো না। তোমার সন্মোহনপ্রবৃত্তিকে এবার ক্ষান্ত দাও।

তোমার মেয়ে ও প্রেমিকা

নেতি ( দি আগলি নেম ইউ গেভ মি )

##

 

ক্লাস ইলেভন ( দুর্গাপুজো, বিজয়া দশমী )

ডিয়ার ড্যাড দি মহিষাসুর

আমার আগের বছরের চিঠি তুমি পাওনি বলেই মনে হচ্ছে, তুমি এই এক বছরে নিজেকে অসুর হিসাবে প্রমাণ করেছ ; বৈভবী আর আরিয়ানের জন্য কমদামের পোশাক , আর আমার জন্য দামি পোশাক। আমার তা একেবারে পছন্দ নয়। জানি তুমি পাঠাওনি,  আন্টিমা কিনেছেন, কিন্তু আন্টিমা এই কাজ করে ফাঁস করে দিলেন যে তুমি আছ কোথাও। এরকম করার উদ্দেশ্য ? তুমি কি আমাকে এনটাইস করার চেষ্টা করছ ? সিডিউস করতে চাইছ? করো, করো, যতো পারো করো। তুমি অমন না করলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি। আগের চিঠিতে লিখেছিলুম যে আমি তোমার প্রেমিকা। তুমি কি জানো প্রেমিকা কাকে বলে ? জীবনে কখনও প্রেম করেছ ? নাকি এরকম আড়ালে থেকেই মদনের শর চালিয়েছ। মদনের কথা কার কাছে জানলুম। আন্টিমায়ের কাছে। উনি পুরানের গল্প আমাকে শোনান যাতে আমি বাইবেলের কাহিনিতে নিজেকে গুলিয়ে না ফেলি। আমি কিন্তু মেরির চেয়ে বেশি ভার্জিন। তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাইনি, চাইবো না কোনোদিন, দেখে নিও। আগের চিঠিতে তোমার ফ্যামিলির কথা জানতে চেয়েছিলুম, বললে না তো কিছু, তুমি এরকম ভিতু কেন ? ফ্যামিলি থাকলেই বা, তুমি যদি কাউকে বিয়েও করে থাকো, তবু আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করব, আর প্রেম করার পর পুরুষ মাকড়সাকে যেমন প্রেমিকা মাকড়নি মেরে ফ্যালে, তেমন করে কুচিয়ে মেরে ফেলব। তোমাকে কিন্তু বলে রাখলুম, আমি সবকয়টা ঋতু তোমার কাছ থেকে চাই, শুধু বসন্তকাল নয়। তুমি আমার শরীরের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো, ও তোমাকে খাঁটি সত্য কথা বলবে ; আমার ঠোঁট, জিভ, মুখের ভিতরটা তোমার। চিঠি লিখো। লিখে না পাঠালেও আমি পেয়ে যাব। গুড নাইট ডিয়ার ব্রহ্মা, ইট ইজ পদ্মা হেয়ার ফ্রম হেভেন। তুমি আমার নাম নেতি কেন রেখেছ, আমি জানি। কারণ ইমমরাল প্রেমের মতন স্বর্গীয় সুষমা আর নেই ; প্রেমে ইমমরাল না হওয়া হল নৈতিক শূন্যতা, ব্যানালিটি। আমাদের বয়স প্রতি বছর বাড়ে কেন ? যাতে আমরা ক্রমশ ইমমরাল হতে পারি, প্রেমকে মেনে নিতে পারি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। তুমি আমার ইনটারভিউটা কি করে পড়লে। নিশ্চয়ই পড়েছ। ছুটিতে বাড়ি ফিরে দেখলুম, আঙ্কলবাপি দেখালেন, আমার আলমারিতে নতুন বই, বাংলা কবিতার, ইংরেজি কবিতার। ঘরে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি ঝুলছে। আন্টিমাকে জিগ্যেস করতে উনি বললেন, ফার্স্ট হয়েছি বলে গিফ্ট এসেছে। কার গিফ্ট, তা উনি জানেন না, যে পাঠিয়েছে সে ঠিকানা লেখেনি। তুমি কেমন পাগল গো ? ধ্যুৎ, এত এত বই আমি পড়তে পারব না, বড় হলে পড়ব। রিমাইন্ড করিয়ে দিই, ইনসেস্টকে অনৈতিক মনে কোরো না।

ফাক ইউ অ্যান্ড লাভ ইউ।

তোমার নেতি ( ইওর এলেকট্রা অফ দি ম্যাজিকাল এপিক )

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
editorial

Editorial-November-2022

সম্পাদকীয়

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th November 2022

পুজোয় মুদ্রিত সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর আমরা বিরতি নিয়েছিলাম কিছুটা। পুজো সংখ্যা যেভাবে সমাদৃত হয়েছে মানুষের কাছে, তাতে আমরা আপ্লুত। লেখক, পাঠক সবাইকে ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’র তরফ থেকে অকুন্ঠ ভালোবাসা জানাই। মুদ্রিত পত্রিকার মান ও বিষয়বস্তুতে যাতে আরো বৈচিত্র আনা যায়, সে জন্য আমরা পরবর্তী পুজো সংখ্যার পরিকল্পনাও শুরু করেছি এখন থেকেই। পাশাপাশি প্রকাশ পেলো নভেম্বর মাসের অনলাইন সংখ্যাটিও। প্রতিটি নতুন বছরে্র শুরুতেই আমরা অনলাইন সংখ্যাটিকেও একদম নতুনভাবে সাজিয়ে ফেলি। আগামী বছরও তার ব্যতিক্রম হবে না। কাজ চলছে তারও।

শীতের এই অনুভূতিপ্রবণ দিনগুলোয় এগিয়ে আসছে বই, লিটল ম্যাগাজিন সংক্রান্ত বিভিন্ন মেলা। সবার সঙ্গে মেলামেশা, আড্ডা, বই-পত্রিকা নিয়ে মাঠে বসে পড়া চলতেই থাকবে। ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ও স্বপ্ন দেখে এই মেলাগুলোয় নিজস্ব একটা ঘর ও ঘরানা নিয়ে উপস্থিত থাকার। পাঠক ও গুণীজনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ যে তাঁরাই আমাদের এই স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। আমরা সেই আগামীর দিকে তাকিয়ে।

সকলে ভালো থাকুন। নীরোগ থাকুন। অনলাইন নভেম্বর সংখ্যা আপনাদের মতামতের অপেক্ষায়…

Categories
2022-nov kobita

সুদীপ বসু

গু চ্ছ  ক বি তা

সু দী প  ব সু

মার্কো পোলো

মা’র কোনো ঠিকঠিকানা নেই

বাবা ফেরার।

 

তবে কি হরিণের দীর্ঘশ্বাস থেকে

আমি জন্মালাম?

অর্জুন ফুলের জেদ

আমাকে মানুষ করল?

 

কেউ কিচ্ছু বলে না।

শুধু জিজ্ঞেস করলে বলে,

‘মার্কো পোলো।’

 

আমি যুদ্ধে যাবার নাম করে

অঞ্জুর কফিনে যাই

আমি মাছেদের সংসারে গিয়ে

দেখেছি শৈবাল ও অন্ধকার।

 

রাবেয়া আমাকে ফোন করে।

 

খুব রাতে

আকাশ ফাটিয়ে ওঠে চাঁদ

 

আর কিছুই হয় না

 

শুধু থেকে থেকে—

‘মার্কো পোলো

       অ্যাই মার্কো পোলো

                         অ্যাই…’

 

নিশি

কলোনিমাঠ, খাঁ খাঁ শুনশান বাড়ি

দেয়ালে নুপুর

 

একটি দলছুট ঘোড়া রক্তমণির ঝোপে যায়

 

মাঝে মাঝে চিৎকার ওঠে—

‘আমি নিশি

মলি আখতারের ছোটমেয়ে

আমি হেমন্তের ষড়যন্ত্র জানি

আমি জানি প্রতারক পুরুষের গা

গায়ের গরম—

 

আর

শেষ ট্রেনের হুইসল…

 

জিমি

যে মৃত

তাকে আমি সন্দেহ করি।

 

তুমি মৃত?

জিমি?

 

তোমারই ঘুমের পাশে

জাহাজ নোঙর ফেলে কাঁদে

 

কতদিন তুমি নেই

 

নাচের মেয়েটিকে সেই খুন করে চলে গেলে

যেদিন বিদেশে…

 

হানি

যদি একবার সময় করে আসতে। যদি বসতে। মুখোমুখি। তাহলে তো অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে পারতাম।

 

সেবার কাঠচাঁপার বনে হঠাৎ সব কালো হয়ে গেল। একটা ফাঁকা কেল্লার মধ্যে আমরা হারিয়ে গেছিলাম।

 

একদিন সারাদিন খুব হৈ হৈ হল। চিৎকার হল। তছনছ হল। একদিন আগুন লাগালাম। একদিন সারাদিন ধরে বিদ্যুৎ চমকালো।

 

আর কী!

 

আরেকটা বসন্ত গেল  

আমাদের এবারও কোনো বেবি হল না, হানি!     

 

 

 

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov path_protikriya

বই আলোচনা

ব ই  আ লো চ না

শা শ্ব ত   ক র

kar

"জানলা দিয়ে গড়া একটা বাড়ি"- কিশোর ঘোষের নতুন কবিতার বই

বিবাহ উৎসব

কিশোর ঘোষ

প্রকাশক: হাওয়াকল প্রকাশনী প্রাইভেট লিমিটেড

২৫০ টাকা

পুজোর ছুটি গেল সবে। শারদ সংখ্যা যে কয়েকটা জোগাড় হয়েছিল, তার লেখাগুলো সারা। সাড়া তেমন পাচ্ছিলাম না মনে! মনে জমিয়ে রাখার মতো কথা পাচ্ছিলাম না। বইয়ের তাক হাতড়ে পুরোনো কবিতার বই খুঁজছি। একে একে উঠে আসছে মিহি জ্যোৎস্নার মতো, হাতুড়ির ঘায়ের মতো সব অক্ষরযাত্রা। কবিতা ছুঁয়ে মনে ভেসে উঠছেন কবি। লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় জ্বলজ্বল করছে কবিদের সাক্ষাৎকার। এমনি করে হারিয়ে যেতেকোনো কোনো দিন বেশ লাগে। সেদিন দুপুরের পরে বসেছিলাম ‘উট পালকের ডায়েরি’ নিয়ে। কিশোর ঘোষের প্রথম কবিতার বই। 2009। কবিতায় যাদু।ধুলোর ধুলো আমি। কবির সাথে পরিচয় না থাকাই স্বাভাবিক। তবে প্রকাশক আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন। ভাই। উটপালকের ডায়েরি পড়লেই আমার মনে পড়ে প্রকাশক বিতানের মাধ্যমেই কবির সাথে পরিচয়পর্ব। দাপট নেই, বরং নিরিবিলি, নির্লিপ্ত। কথা শুনতে ভালো লাগে কবির। পরিচয় গাঢ় হয়। অন্তর্মুখী কবির নানান অভিযাত্রার সাক্ষী হয়ে যাই। কত কবিতা পড়লাম কবির। কত অজানা অভিমুখ। কত বিচিত্র দর্শন। কত গভীরতা।  প্রচারবিমুখ কথাটা তো ক্লিশে এখন, তাই বলছি না। তবেখানিক অবাক তো হই ! সব ধরনের পত্রপত্রিকায় এত লেখার পরেও কেনব খুব বেশি তরঙ্গ ওঠে না! কেন 2009 এর পরে সে অর্থে আর বই পাচ্ছি না কবির? একটু ভুল হলো অবশ্য, মাঝখানে সাবমেরিন নামে একটা সিরিজ প্রকাশ করেছিলেন হাওয়াকল।

আছে, আছে- আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে! এমনি এমনি বলছি না, সঙ্গত কারণ আছে। উটপালকের ডায়েরি পড়ার শেষে ফোনটা ঘাঁটছি, হঠাৎ ফেসবুক পোস্ট দেখলাম- কিশোর ঘোষের নতুন কবিতার বই। আশ্চর্য সমাপতন! তারপর আর কী! মহানন্দে কবির সাথে যোগাযোগ- বই জোগাড়- আর ভেসে পড়া নতুন ভাবনার স্রোতে। স্রোত কিন্তু অন্তরমুখী। ভিতর পর্যন্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে এ বইয়ের কবিতারা। উটপালকের কবি এখন আরও অনেক পরিণত, আরও অনেক তীক্ষ্ণ। ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নির্মাণ চেতনার প্রযুক্তি দিয়ে’ গড়া একটা বাড়ি। কবিতার বাড়ি। শুধুমাত্র জানালা দিয়ে গড়া, চরাচর সেখানে আলো হাওয়া গন্ধ বর্ণ এমন বিভিন্ন নামে খেলে বেড়ায়। উন্মুক্ত মাঠের মতো-দিগন্তের মতো, সাগর, আকাশের মতো খোলা। ভোরবেলা রঙের বাড়ি। ঠিকানা পাঠকের হৃদয়। এমন স্বপ্নের কথাই লিখেছেন কবি সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘বিবাহ উৎসব’। বিতান চক্রবর্তীর অনবদ্য প্রচ্ছদের ভিতর অতি যত্নে গাঁথা কবিতা মালা। আমার পড়া কয়েক প্রস্থ হলো, তবে কবিতা তো, যতবার পড়া যায় অক্ষরের মধ্যবর্তী অর্থগুলো আরও ধরা দেয় যেন! কাজেই চলুন, এই পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার অছিলায় আবার খুঁজে দেখি- কবির স্বপ্নবাড়ির জন্য কতখানি জমি তৈরি হলো আমাদের বুকে! হাওয়া কল প্রকাশিত সুসজ্জিত বইটির দুটি অংশ- বিবাহ উৎসব এবং কবির লাগেজ। দ্বিতীয় অংশের ১৮ টি কবিতায় কবির অভিযাত্রা। প্রেম, বিষাদ, সমাজ, বৈষম্য, শ্রদ্ধা, দেখনদারি, বেদনা, কৃত্রিমতা – নানান ঘাটের দৃশ্যে জারিত হয়ে বয়ে গেছে অক্ষর নদী। জীবনপুরের পথিক কবির অভিযাত্রার সন্ধান মেলে ‘কবির লাগেজ’ কবিতায়। আর প্রথম পর্ব- বিবাহ উৎসব। এই অংশের ছত্রিশটি কবিতা। এখানেও যদি কবি অক্ষর নদীতে বজরাসওয়ার হয়েছেন বলে ভাবা যায়, তবে আগে বলা ঘাটগুলোর সাথেই যোগ হবে প্রেম, সমাজচেতনা, নস্টালজিয়া, ক্ষোভ, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সহ নিজস্ব দর্শনের।

 

অদ্ভুত ক্ষমতা কবির। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উট পালকের ডায়েরি’ তেও দেখেছি। এখানেও তার হদিশ পাওয়া যায়। অলংকার নিয়ে খেলার ক্ষমতা। অদ্ভুত এক চোখের মালিক, যে চোখে নিজের মতন দেখেন কবি। নিজস্ব কাব্য ভাষা তৈরি হয়। যে দৃশ্য আমার সাধারণ চোখে একরকম, তাকেই সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে দেখতে জানেন। পরিচিত বৃত্তের বাইরে এসে নির্লিপ্ত চোখ পাততে জানেন।  দেখাটাকে অক্ষরে রূপান্তর করতে জানেন। নির্দিষ্ট অমোঘ অক্ষর। নির্মেদ ছোট ছোট অক্ষর মালা। কেমন একজন আরেকজনের সাথে যেন বন্ধনে আবদ্ধ। অথচ নির্মাণের কৃত্রিমতা নেই । স্নিগ্ধতা আছে। ম্যাজিক আছে, সম্পর্কের বন্ধনের রসায়ন আছে, প্রেম আছে। ভালোবাসা -স্বপ্ন -ইউটোপিয়া। আসুন, বইয়ের ভিতর ঘরে ঢোকা যাক। দরজায় কবি লিখছেন: ‘সুষম দুঃখ খেয়ে বেঁচে আছি’ । চমকে উঠছেন কি না?  এ তো আমার আপনার কথা! আমাদেরই ভিতর ঘর জীবনের ছেঁচায়, আঘাতে জমে থাকা দুঃখের বিনিময়ে বেঁচে থাকার ভাত। বাস্তবের পোড়া কড়াইয়ে সেঁকাপোড়া হতে হতে ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ আকাশ দেখা আমাদের জীবন। অনন্তের ডাক- ‘নক্ষত্রের ছোট বড় খামে চিঠি পড়তে গিয়ে ঝলসে যায় ‘ আমি’ মেলায় বেচার মতো উপযুক্ত হয়ে ওঠে। ‘এ বইয়ের কবিতা কিশোর লিখে থাকতে পারেন। তবে কবিতা আর তার
একার নয়। আমাদের। অতি সাধারণ পাঠক। কবিতার অনুপুঙ্খ ব্যাকরণ গরণ- ইত্যাদি ইত্যাদি সব তোলা থাক পন্ডিত সমালোচকের জন্য। আমাদের জন্য বরাদ্দ থাকুক কেবল কবিতা। বৃষ্টির মতো, খাল বিল- ভাটফুল- যানজট- বিজ্ঞাপন- জন্ম- মৃত্যু- হাসি- কান্না- বিষাদে – প্রেমে স্বতঃস্ফূর্ত জীবন নদীর মতো বয়ে চলা কিশোরের কবিতা। আমাদের কবিতা। কারণ-

‘একা না একা না অন্ধকার- সম্পর্কে আমরা বেদনার আত্মীয়স্বজন।’ (কথোপকথন) সমাজ। কুয়াশায় ঢাকা সমাজ। বহুরূপী। মাস্কিং ডিমাস্কিং এর চাতুর্যে খানাখন্দ অন্ধকার ঢেকে বিষাদের পাত্রে আনন্দের মদ ঢেলে দেওয়া রাষ্ট্রশক্তি। কথা উঠে আসে কবিতায়। পরপর কয়েকটা পংক্তি উল্লেখ করি এ প্রসঙ্গে—


‘কীটনাশক খেয়ে
কৃষি খেত মারা গেল রাতে
কৃষকের দেহ পাওয়া গেল সকালে
নীল ধান খেতে।’ (এগ্রিকালচার)


‘ভোট সারাই হচ্ছে রাস্তায়।
বড় মুরগি ছোট মুরগির পেটে লাথি মারছে।
কাঁদছে কসাই।’  (চিড়িয়াখানা)


‘শহরের একদিকে বসতি খিদের
অপর দিকের তাতে পেট ভরে যায়। (শহর শহর)


আজ নয়, দীর্ঘ কুড়ি বছর কবি দেখছেন লিখছেন। সাজাচ্ছেন মনের ভেতরটাকে। এখন কবির চোখ অন্যভাবে দেখে। সেই স্বতঃস্ফূর্ততা অনায়াসে পাঠকের ভিতর ছুঁয়ে যায়। কষ্ট করে ট্রান্সফার্ড এপিথেট নির্মাণ বিনির্মাণ করতে হয় না। অনায়াস স্বাভাবিক হওয়ার মতো কিশোরের কবিতাকে দোলা দিয়ে যায়। ট্রান্সফার্ড এপিথেটের মনোগ্রাহী নিদর্শন গোটা বই জুড়ে। কয়েকটি উল্লেখ—

‘হলুদ পাখির কাচ, মরা হ্যারিকেন
হাতল ভাঙা জ্যোৎস্নার মাঠ
আমাদের সিড়ির তলায় জমে আছে।’ (সিঁড়ি)

‘হাওয়া দিলে ধানক্ষেতের
ক্যালেন্ডার দোলে…’ (তর্পণ)

‘নিজেরই মৃতদেহ মুড়ি দিয়ে
লোকটা শুয়ে পড়ল।’ (মুখ নেই ফেসবুক আছে)


‘সকাল ঝাঁট দিচ্ছে উঠোন,
উনুন আঁচ দিল অরুনদাকে।’ (প্রভাত ফেরি)

‘হাওয়ায় হলুদ ছাদ উড়ছে।’ (হাওয়া)

নিজস্ব দর্শন আছে কবির। জাতক কাহিনি, ভিখিরি,  মরণের পরে, হাওয়া— এরকম অনেক কবিতা তার স্বাক্ষর। বীজগণিত,  শ্যামাসঙ্গীত কিশোরের একান্ত নিজের ভাবনার ছবি দেখায়। একটা বলি—

‘দেহ এক ছায়াপথ
এক বৌদ্ধ ভিক্ষুক যে দুর্গম পথে পথে
আত্মার ধর্ম প্রচারে এসেছেন’  (জাতক কাহিনি)

ক্ষোভ প্রক্ষোভ- অক্ষরে প্রতিবিম্ব। জীবনের খুঁটিনাটি, কলহ, দাম্পত্য, শরীর , বঞ্চনা, বিষাদ, আরোগ্যের খোঁজ, অবসর- সবাই জায়গা খুঁজে নিয়েছে অক্ষরে। ওই যে বলেছিলাম, কবিতা আর কবির নেই পাঠকের:

‘মানুষ ঘুরতে যায় সেরে উঠতে, শহরের মতোন
দুরারোগ্য থেকে দূরে যেতে চায় সে, ক্ষতবিক্ষত গভীর রাতের ট্রেনে…’
(আরোগ্য  ট্রাভেলস )
‘যাদের কাছে চশমা আছে
চোখ ফেলে এসেছে তারা গতজন্মে’

কী তীব্র শ্লেষ! যে মানুষগুলো বদলে গেছে, অথচ যারা দেখতে জানতেন, দেখার কথা বলতেন, বদলের গান গাইতেন- তাঁরা আজ দৃষ্টিহীন।  যে দৃষ্টি প্রতিক্রিয়াহীন,  তা তো না দেখারই সামিল! ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ- পৃথিবীতে আজ’— জীবনানন্দের কবিতা মনে করায়। আপোষের ভাত। শ্মশানের ফুল। ক্যাকটাসের ফুল। মৃত্যু উপত্যকায় কবির শৃঙ্খল অস্তিত্ব, তবু মুক্ত কবিতার অক্ষর ওড়ে। ক্ষোভ ব্যক্তিগন্ডী ছাড়িয়ে যায়।


‘এখানেই একজন কবি কলম কেনার পয়সা কুড়োতে আসে’   

(খবরের কাগজ )

সম্পর্কের রসায়ন- সম্পর্কের বন্ধন ঘুরে ফিরে আসে কবিতায়। প্রেম প্রজাপতির মত কবিতায় ওড়ে। প্রেমের কবি কিশোর। সে প্রেম শরীর ছুঁয়ে থাকে। শরীর থেকে অনন্তে তার অভিমুখ। বিভাব কবিতা ‘বিবাহ উৎসব’ সেই প্রেমের ছবি। প্রেমিকা আকাশ, প্রেম জীবন আঁকড়েই চরাচরমুখী।

‘যেদিকে জানলা নেই
ঘরের সেই পাশে তোমার প্রয়োজন বসে আছে,
তোমার কপাট খুলবো একে একে আর
আমার দরজা জানালার চোখ খুলে যাবে…’

(বিবাহ উৎসব, এক)

ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা হাত ধরাধরি করে আছে কিশোরের কবিতায়। তর্পণ, মা, অলৌকিক- মনে জায়গা করে নেবেই।  কিশোরের মা লেখার অক্ষর ছুঁয়ে কখন আমাদের মা হয়ে উঠবেন। স্নেহশীলা, সর্বংসহা,সর্বজয়া, দুর্গতিনাশিনী, দশভুজা মা আমাদের। ভালোবাসার গাছ। স্নেহের
আকাশ। নিশ্চিন্ত আশ্রয় আমাদের—

‘সন্তানের পাতে স্নেহ বেড়ে দিয়ে তবে নিজে খাবে’ (অলৌকিক)

এই এক সমস্যা! কবিতা যেখানে মলাট পেরিয়ে, কবিকে ছাড়িয়ে বুকের ভিতরে বাড়ি বানিয়ে ফেলে, সেখানে বাড়ির লোকের কথা বলতে গিয়ে আবেগ আর বাঁধ মানে না। বলতে গেলে তাই গোটা বইটাই বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা তো উদ্দেশ্য নয়। ঠিকও নয়। বরং আপনারা পড়ুন সুজন পাঠক। জীবনের মুহূর্তগুলো যা একান্ত নিজের, সেই মুহূর্তের ছন্দিত অক্ষরমালা তো আসলে আপনার কবিতাই। আপাত ব্যস্ততার কুয়াশায় ঝাপসা আপনার সেই কবিতাগুলোর আর একবার সান্নিধ্য পেতে তাই কিশোর ঘোষের ‘বিবাহ উৎসব’ পড়েই ফেলুন।

 

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov golpo

একটি পাগলী ও কয়েকজন পুরুষ

গ ল্প

রি নি  গ ঙ্গো পা ধ্যা য়

rini2

একটি পাগলী ও কয়েকজন পুরুষ

খুব পেলব সঙ্গমের পর মন যেমন তুলো তুলো হয়ে যায়, ঠিক তেমন করে সে এগিয়ে আসছিল মোড়ের দোকানটার দিকে। এটা কলকাতা শহরই, তবে এক্সটেনডেড। এখানে বড়ো বড়ো হাউসিং আছে, কিছু দূরে শপিং কমপ্লেক্স আছে। বাকিটা নির্জন। গাছগাছালি, মাঠ, ডোবা বা বড়ো পুকুর। সামনেই হাইওয়ের মসৃণ রাস্তা। সাঁই সাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। সেই রাস্তার ধারেই মূর্তিমান বেআইনের মতো গজিয়ে উঠেছে এই ছোট্ট চা সিগারেটের দোকানটা। দোকানী বিশুই তাকে প্রথম দেখতে পেল। সম্পূর্ণ ন্যাংটো একটা মেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপন মনে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পাগল। বিশু এই ভোরবেলা দোকান খুলতে এসে এ দৃশ্য দেখে হাঁ হয়ে গেল। বিশু থাকে একটু দূরের বস্তিতে। তার দোকান থেকে বস্তিটা আবছা দেখা যায়। কী করবে বুঝতে না পেরে বিশু দু’একবার বস্তির দিকে তাকিয়ে নিল। এখান থেকে শুধু ঝুপড়িগুলোই দেখা যায়। তার বেশি কিছু নয়। মেয়েটা রোগা। কিন্তু মাইদুটো জব্বর। ছত্তিরিশ না হয়েই যায় না। মেয়েটা হাঁটছে, আর ও দুটো লাফাচ্ছে। বিশু কেমন মোহিত হয়ে যাচ্ছিল। তার জিভ জলজলে হয়ে গেছে। চোখ দুটো চকচক করছে। বারবার এপাশ ওপাশ দেখছে আর মেয়েটাকে। পাগল মেয়েটা ততক্ষণে দোকানের সামনে বিশুকে দেখে দাঁড়িয়ে গেছে।

একটু জল দিবি? জল! খুব তেষ্টা পেয়েছে! একটু জল দিবি!

এতোটা কাছ থেকে মেয়েটাকে দেখে বিশু এবার একটু অবাক হয়। মেয়েটার সারা শরীরে ভিজে মাটি লেপ্টে রয়েছে কাদার মতো। সেই সঙ্গে ওর পা বেয়ে রক্ত নামছে। হাতে বুকে আঁচড়ানোর দাগ। বোঁটা দুটোর কাছে রক্ত না কাদা জমাট বেঁধে আছে বোঝা যাচ্ছে না। ঠোঁটে গালে রক্তের ছোপ। বিশুকে ওরম তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা হঠাৎ হেসে ফেলল,

দেবো, তোকেও দেবো। আমার মাই দুটো, আমার গুদ, তোকেও দেব। এখন নিবি??

বিশু হঠাৎ কি বলবে বুঝতে পারে না।

মেয়েটাই বলে ওঠে, একটু জল দিবি!! জল! 

বিশু ভাঁড়ে করে ওকে জল খাওয়ায়। আশপাশ দিয়ে তখন হুসহাস গাড়ি যাচ্ছে। দু’একটা গাড়ি থেকে একজোড়া দু’জোড়া চোখ ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাউসিং থেকে একটা গাড়ি বেরল। বিশুকে আর মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে গেল। প্রায় বিকারহীন। বড়োলোকেরা এমনই হয়। উদাসীন গোছের। পৃথিবীর চরম বিস্ময়েও তারা বিস্মিত হয় না। টাকা তাদের অবাক হওয়ার আনন্দটাই কেড়ে নিয়েছে। আর এ তো বোঝাই যাচ্ছে সমস্যার ব্যাপার। বিশু বয়াম খুলে মেয়েটার জন্য দুটো বিস্কুট বের করে ওর হাতে দেয়। 

মেয়েটা গদগদ হয়ে হাসে। বিস্কুট হাতে নিয়েই খেতে শুরু করে। 

বিশু বলে, এখানে বসো। আমি আসছি।

মেয়েটা হঠাৎই তড়িৎ গতিতে বিশুর পায়ে পড়ে যায়।

যেও না, যেও না, লক্ষ্মীটি। আমার বাচ্চাটা দিয়ে যাও।

বিশু আরো এক প্রস্থ অবাক হয়। সঙ্গে বাচ্চাও ছিল! বাচ্চাটার তবে কী হল? বিশু থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসাই করে বসে, তোমার বাচ্চা আছে? 

মেয়েটা হাসিহাসি মুখে বিশুর দিকে তাকায়। হ্যাঁ, হবে তো। আমার বাচ্চা হবে তো। তুই দিবি।

বিশু আকাশ থেকে পড়ে। একথার মানে সে বুঝে উঠতে পারে না। ওদিকে মেয়েটার পা থেকে থোকা থোকা রক্ত বেরিয়ে থাইয়ের পাশে জমাট বাঁধছে, গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দেখে বিশুর বমি উঠে আসতে চায়। দৌড়ে যায় সে বস্তিতে। প্রায় নিঃশব্দে ডাকে তপনা, বিল্টু, ব্যাঁকা, ঘন্টিকে। ন্যাংটো মেয়ের কথা শুনেই ওদের খাড়া অবস্থা। প্রায় দৌড়ে চারজন চলে আসে। মেয়েটা তখনও বসে বসে বিস্কুট খাচ্ছে। ওদের দেখে মেয়েটা প্রথমে একটু ভয় পায়। তারপর পেটের নিচের অংশ সামনের দিকে বাড়িয়ে ছেনাল মেয়েদের মতো ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

চুদবি?? আমাকে তোরা চুদবি?? কিন্তু লাগাবি না বল!! সেদিন ওরা খুব ব্যথা দিয়েছে। দেখ, রক্ত, রক্ত পড়ছে… তোরা ব্যথা দিবি না তো! ব্যথা দিবি না তো!!

বিল্টু বলে, শালা গাঁড় মারানি, সক্কাল সক্কাল কাকে তুলেছ গো বিশুদা!! পাখি যে নিজেই ছটপট করছে বাঁড়া! বলে সে নিজের হাতটাকেই খানিক ছটফটিয়ে নেয়। 

ব্যাঁকা বলে, এই, এই ওকে বিলের ধারের মাঠে নিয়ে চল। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।

উঁউউউ, খুব শখ বানচোদ। এখখনি চাই একেবারে। সবার আগে খাবি না কি রে ব্যাঁকা!

তপনা খিঁচিয়ে ওঠে। 

ঘন্টি বলে, শালার ব্যাঁকা তো, বাঁড়ার তাই খিদে বেশি। ব্যাঁকার যৌনাঙ্গে হাত দিয়ে বিশ্রী ইঙ্গিত করে। বাকিরা হেসে ওঠে। পাগলীটাও ওদের সঙ্গে হাসতে থাকে।

তপনা বিল্টুকে বলে, একটা কাপড় টাপড় নিয়ে এসে মাগীটাকে পরিয়ে দে। তারপর সারাদিনের জন্য কোথাও একটা শাল্টিং করতে হবে।‌‌ রাতে হবে যা হবার। 

পাগলী আবার হাসে। বলে, রাতে বাচ্চা হবে। কী মজা বাচ্চা হবে। সে হাততালি দিয়ে লাফাতে থাকে। 

হেই, পোঁদ মারানি, বলে কী রে!! বাচ্চা হবে। খুব শখ না কি বাচ্চার মামনি। চলো তোমাকে পাঁচ পাঁচটা বাচ্চা দেব। তপনা পাগলীর থুতনি ধরে নেড়ে দেয়। 

রাতে ওরা সব বিলের ধারে উপস্থিত হয়। মুখে গামছা বেঁধে কেউ কোনো কথা বলে না। পাগলীকে নিয়ে রঙ্গ তামাশা শুরু হয়। একসঙ্গে পাঁচজনে ওরা হামলে পড়ে। পাগলীর স্তন, পেট, যোনি, শ্রোণিদেশ নিয়ে খাবলা খাবলি করতে করতে ওরা খুব মস্তি করে। প্রত্যেকেই দু’বার, তিনবার, চারবার যতবার ইচ্ছে… পাগলীটার কষ্ট হচ্ছিল। তবু সে সবাইকে আদর করে কাছে টেনে নিচ্ছে। আর মুখে তার একটাই কথা, আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা। তবে ওরা তখন ওসব শোনার অবস্থাতেই নেই। শুনলেও ওদের কানে পৌঁছচ্ছে না সে কথা।

খানকি মাগীর কি চোদনের নেশা মাইরি!! এতগুলো লোক চুদছে শালা, একবার উফ করছে না! 

শুধু ব্যাঁকার কানে বারবার ধাক্কা মারছিল- আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা।

প্রত্যেকবার শব্দটা উচ্চারণ হচ্ছে। আর ব্যাঁকার মাথায় যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে। যেন মাথার অতল থেকে কী একটা পাক খাচ্ছে তার চোখের চারপাশে। যতবার আমার বাচ্চা বলছে, কার যেন মুখ ভেসে আসছে। ঠিক চিনতে পারছে না ব্যাঁকা তাকে। কে যেন! ভীষণ চেনা। তবু কিছুতেই মনে পড়ছে না। ব্যাঁকা আর পারছে না। ও পাগলীটার পাশেই মাটিতে বসে পড়ে। বন্ধুরা একে একে করে চলেছে। ব্যাঁকা পাশে বসেও যেন দেখতে পাচ্ছে না। এই কুয়াশা জড়ানো হালকা শীতের রাতেও ব্যাঁকা প্রবল ঘামছে। তার মনে হচ্ছে এই ‘আমার বাচ্চা’ শব্দটা তাকে যেন তাড়া করছে! তাকে যেন মেরে ফেলতে পারে এই শব্দবন্ধ। ব্যাঁকা উঠতে চেষ্টা করে, পারে না। তার চোখের সামনে পরপর কতকগুলো দৃশ্য পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। এক খানকি মাগী শালা আদ্ধেকটা মাই বের করে দরজায় দাঁড়িয়ে খদ্দের ধরছে। খদ্দের একটা বাচ্চাকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। বাচ্চাটা দিনের পর দিন ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

তারপর সেই ছেলেটাই একটু বড়ো। শালা যেন ফিল্ম চলছে চোখের সামনে। একের পর এক সিন… ব্যাঁকা কিছুতেই বেরোতে পারছে না এই সিনের ঘোরালো নেশা থেকে। সে দেখতে পাচ্ছে নেশার ঘোরে মাগীটার কাছে পয়সা চাইছে ছেলেটা। মাগীটা শালী মেরে দিল ছেলেটাকে, ঠাস করে একটা চড়।

ছেলেটা ক্ষেপে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাগীটার ওপর। দেওয়ালে ঠেসে ধরে মাগীটাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিচ্ছে…. আর মাগীটা বলছে, মাগীটা বলছে…

ব্যাঁকা ঘোরের মধ্যেই কিল চড় ঘুষি মারতে থাকে তপনাকে। ওর চোখের সামনে তখন ভাসছে ওর মা’র মুখ।

তপনা মার খেয়ে ছিটকে যায়। ব্যাঁকাকে উল্টে দু’চার ঘা মারতেই ব্যাঁকা কাঁদতে শুরু করে। তারপরই হুড়হুড় করে বমি করতে থাকে। 

ওদিকে রাতের কুয়াশায় ভেসে উঠৈছে পুরনো দিনের তেমহলা বাড়ির সিংহদরজা। সাদা কাপড়ে আলতা রাঙা ছাপ ফেলে নতুন বউ প্রবেশ করছে বিরাট জমিদার পরিবারে অনেক স্বপ্ন আর একটু একটু ভয়কে সঙ্গী করে। তার সুপুরুষ স্বামী, উথলানো সংসার, বিত্ত সবই তার কাছে স্বপ্নের মতো। শাশুড়ি মা বরণ করছেন আর বলছেন, এ বাড়ির বংশধর আনার দায়িত্ব তোমার। যত শীঘ্র সম্ভব আমরা নাতির মুখ দেখতে চাই !

মেয়েটি বিস্মিত হচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে না। আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে লজ্জা পাচ্ছে। এ দাবির মধ্যে কোথাও অন্যায্য কিছু নেই, এই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু দৃশ্যের পর দৃশ্য পাল্টে যাচ্ছে। যে হাত একদিন আশীর্বাদ হয়ে মাথায় উঠেছিল, তা এখন হিংস্র ভাবে চুলের মুঠি ধরে দরদালান থেকে সিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছে। বাঁজা বলে তীব্র আক্রমণ চলছে। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অচৈতন্য মেয়েটি ডাস্টবিনের পাশে জেগে উঠছে। বিস্ময় নয়, স্বাভাবিক….. ওদের যে বংশধর চাই। বংশধর এনে দিতে হবে। মেয়েটির মনে এখনো কোনো প্রশ্ন নেই। তার একটা বাচ্চা চাই। আর কিছু না। একটা বাচ্চা…

তারপর সব কিছুই অস্পষ্ট… ধোঁয়া ধোঁয়া… বাচ্চা চাইতে চাইতে কখন যে প্রাণের কাপড়টাও তার নেই হয়ে গেছে সে আর খেয়াল করে না। অত্যাচারে দীর্ণ হতে হতে তার মনে হয় সন্তানের জন্য সাধনা… এটুকু কষ্ট যে করতেই হবে। ওই দরদালান জুড়ে খসখসে নতুন শাড়ি, ঠিনঠিনে কঙ্কণ, আঁচলের গোড়ায় বেঁধে রাখা একগুচ্ছ চাবির ঝুনঝুন, চাকরবাকরদের ছুটোছুটি আর ছেলে কোলে করে মেয়েটি… এইসব পূর্ণতার জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অত্যাচারিত হয়ে যাওয়া। কোথায় সেই সব পেয়েছির দেশ আজ আর মনে পড়ে না। তবু আছে কোথাও! পৃথিবীর কোনো প্রান্তে! প্রশ্ন নয়, বিস্ময় নয়, আছে স্বাভাবিক সুখটুকু।

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov goddyo

প্রচ্ছদ কাহিনী | নভেম্বর সংখ্যা

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

আ ফ জ ল  আ লি

যৌন, যৌনতা এবং কবিতা

যৌন, যৌনতা- এই শব্দগুলো শুনলেই ভিতরে কীরকম একটা সুড়সুড়ি বা গোপনীয়তার ভাব আসে, আমরা ভিতর থেকেই কেমন অপ্রস্তুত ইতস্তত লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ি। মনে হয় এ সব থেকে দূরে থাকলেই ভালো। বিষয়টা আদপে তেমন কিন্তু নয়। যৌন এবং যৌনতা শব্দের বিস্তৃতি অনেকটা, অনেক কিছু আছে এর মধ্যে। আমরা বিষয়টিকে শুধুমাত্র কাম-উদ্দীপনা বা শারীরিক মিলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিই কেবলমাত্র না জানার কারণে।

এখন sex বলতে বিষয়টি কী বোঝায় সংক্ষেপে একটু দেখে নেওয়া যাক। Sex বলতে একজন ব্যক্তি male অথবা female কিনা মূলত তা দেখা হয়। স্কুলের কোনো ফর্মে বা ডাক্তার বা হসপিটালের কোনো নির্দিষ্ট ফর্মে fill up করার সময় যে question থাকে, whether male or female, এটার উত্তরে যা লেখা হয়। এছাড়া sex করা বোঝাতে sexual intercourse এর কথা বোঝানো হয় বা শারীরিক মিলন।

অন্যদিকে যৌনতা বা sexuality বলতে মূলত কী বোঝানো হয় দেখে নেওয়া যাক। যৌনতা বা sexuality বলতে একজন মানুষের সামগ্রিক expression বা ভাবভঙ্গি একজন পুরুষ বা একজন নারী হিসেবে। Sexuality শুরু হয় জন্মানোর সময় এবং মৃত্যুতে শেষ হয়। প্রতিটা মানুষই হল এক একটা sexual অস্তিত্ব। যৌনতার বিষয়টি অত্যন্ত বৃহৎ পরিসর। একটা মানুষের sexuality বা যৌনতা হল শারীরিক ভাব, লিঙ্গ পরিচয় এবং ভূমিকা, সামগ্রিক যৌন বিন্যাস, যৌনতার প্রগাঢ়তা, ইচ্ছা বা যৌন প্রবৃত্তি, যৌন সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং টান। এছাড়া একজন পুরুষ বা নারীর যৌনতার মধ্যে পড়ে তার ভাবভঙ্গি, মূল্যবোধ, জ্ঞান এবং ব্যবহার। একজন পুরুষ বা নারী কীভাবে তার যৌনতা প্রকাশ করবে এ বিষয়ে তার family, culture, সমাজ, বিশ্বাস, নম্রতা এবং যৌন শিক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এবং এই শিক্ষা আসে পিতা, মাতা, বন্ধু, ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিবেশ, মিডিয়া, স্কুল, শিক্ষক এবং পুস্তক সমূহ থেকে।

অর্থাৎ যৌনতা শব্দটির প্রয়োগ এবং অবকাশ অবশ্যই অনেক ব্যপক। একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ থেকে আরম্ভ করে তার চিন্তা ভাবনার মধ্যে sexuality কাজ করে। প্রতিদিনের জীবন যাত্রার সাথে জড়িয়ে থাকে যৌনতা নামক এই ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ ও প্রকাশ। ফ্রয়েডের তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা দেখেছি বাচ্চাদের প্রথম যৌন চেতনা শুরু হয় তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা অনুধাবন শুরু। উনি বলেছেন আমাদের জীবনের বেশির ভাগ সমস্যাই হল যৌনতা কেন্দ্রিক। এবং যৌন প্রবণতা অবদমন বা suppress করে রেখে দেওয়ার মধ্যেই জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক জটিলতা। তাই যৌনতা নিয়ে আলোচনা এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের মধ্যে তিনি সমাজের বা মানুষের মানসিক বা শারীরিক সুস্থ হওয়ার উপায় দেখেছিলেন। ফ্রয়েড সাহেব মনোবিদ ছিলেন এবং তিনি psycho analysis নিয়ে কাজ করেছেন, স্বপ্নের বিবরণ এবং তৎসহ মনের ইচ্ছা নিয়েও বলেছেন। পরবর্তীতে ফ্রয়েডের যৌনতা তত্ত্ব অনেকাংশে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হলেও এখনও আলোচনা কম হচ্ছে না তাঁকে নিয়ে।

প্রাথমিকভাবে আমি যৌন, যৌনতা নিয়ে কিছু কথা বললাম একটা বিষয় কিছুটা আলোচনা করব বলে- তা হল যৌনতার সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক। কবিদের শরীরে যৌনতার প্রভাব এবং বিশেষ করে যৌন উদ্দীপনা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

কবিতার ক্ষেত্রে দু’ধরনের বিষয় আসে। প্রথম হল সরাসরি যৌনতা বিষয়ক কবিতা লেখা, যেখানে নানান প্রকাশ থাকে, যৌন অঙ্গ নিয়ে হোক বা সহবাস সম্পর্কিত বা শারীরিক বিভঙ্গের বা মিলনের অথবা শৃঙ্গারের শব্দগত বহিঃপ্রকাশ থাকে। দ্বিতীয় হল কবিতার মধ্যে যৌন উদ্দীপনা বা যৌনতার প্রকাশ সেভাবে নেই বরং রোমান্টিসিজম আছে, logocentrism বা logocentrism-এর বাইরে, অথবা বেশির ভাগ কবিতা যেভাবে লেখা হচ্ছে। প্রথমটির মধ্যে তো যৌনতা সরাসরি প্রকাশ হচ্ছে যা ফ্রয়েডের তাত্ত্বিক দিকের প্রয়োগ হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে যৌনতা কতটা প্রভাব ফেলছে কবির মানসিক এবং শারীরিক ক্রিয়ার মধ্যে যার উদ্দীপনায় কবিতা লিখতে পারেন একজন কবি। যৌন যাপন করা অর্থাৎ sexual intercourse এর ফলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারীর শরীরের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী সুস্থ ও সতেজ অবস্থায় থাকে। সুস্থ এবং সম্মতিযুক্ত সহবাস প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের মানসিক চিন্তাধারা বিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সদর্থক ভূমিকা পালন করে। শরীরে hormonal secretion এর প্রভাব সামগ্রিক শারীরিক ব্যবস্থাপনার ভিতর কাজ করতে থাকে এবং তা মানসিক ও শারীরিকভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বা বয়স্কাকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখে। এই সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থা অবশ্যই কবির কবিতা লেখার ক্ষেত্রে positive এবং romantic পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। সহবাস কার সঙ্গে কীভাবে আনন্দপূর্ণ হবে সে বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু সুস্থ সহবাস বা sexual intercourse অবশ্যই কবিতা লেখার জন্য উপযুক্ত মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এবং করে। তাই বলে কি অবিবাহিত বা অবিবাহিতারা ভালো কবিতা লিখতে পারেন না । এর উত্তরে অবশ্যই বলব হ্যাঁ পারেন। কিন্তু এখানে যৌনতা অন্য ভাবে কাজ করে। অথবা যাঁরা যৌন জীবন যাপন করেন না তাঁদের মধ্যেও কাজ করে, যদি না কেউ তাঁর মনকে সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে নিয়ে যান অন্যত্র, অন্য মার্গে।

রোমান্টিসিজম অর্থাৎ কল্পনাপ্রবণতার সঙ্গে যৌনতার একটা সম্পর্ক আছে। যৌনতার আধারে রোমান্টিকতা ভিন্ন রূপ ধারণ করে, ভিতরে উত্তাপ ছড়ানোর মতো। মনকে রোমান্টিকতার অঙ্গনে ধাবমান রাখে, মনের ভিতর শক্তি প্রবাহিত হয় এবং সেই শক্তি সৃষ্টিশীলতার বৈভবকে প্রখররূপে বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কবিরা তো সাধারণত রোমান্টিক হয়। এই রোমান্টিকতার রেণুতে যৌনতার অভিঘাত এসে যখন মেশে তখন দুইয়ের মিশ্রণে কবির মধ্যে একপ্রকার power generate হয়, সেই power বা energy শব্দের মধ্যে transfer হয়ে কবিতা লেখার ইচ্ছা ক্ষমতা এবং লেখার ধরণকে করে তোলে আরো শক্তিশালী । এর মধ্যে যেমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে তেমনি আছে psychological কারণ। যৌনতা মানে কাউকে ধর্ষণ করা নয়, যৌনতা মানে পৈশাচিক উল্লাস নয়, নয় নির্যাতন, নয় বলপ্রয়োগ করা। যৌনতার মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিকতা, রুচিশীলতা লুকিয়ে থাকে, থাকে একজন নারী বা পুরুষের সুন্দর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী। যৌনতা এবং রোমান্টিকতা এরা পারস্পরিক একে অপরের catalist . হয়তো বাইরে থেকে এসব মনে হয় না, কিন্তু সূক্ষ্ম পর্যবক্ষেণে তা ধরা পড়বেই। কবিতা তো কল্পনার পটভূমিতে তৈরি শব্দের প্রক্ষেপ। এই কল্পনার পটভূমিতে মিশে থাকে যৌনতা থেকে আগত অতিসূক্ষ্ম রশ্মির আঘাত যা মিশতে থাকে কবির শব্দের কারিগরিতে, শব্দের ঊর্ণজালে। Sexual urge এর একটা অভিঘাত থাকে। এই অভিঘাত মস্তিষ্ক এবং শরীরের উপর যুগপৎ কাজ করে। এই sexual urge বা যৌন ক্রিয়ার ইচ্ছা, সুস্থ এবং কল্পনাবিলাসী বা কল্পনাশ্রয়ী শরীরের এবং মনের একটা অংশ। যে মানুষ সৃজনশীল সেই মানুষের মধ্যে এই প্রভাব এবং প্রক্রিয়া খুব বেশি কাজ করতে থাকে। কেন খুব বেশি কাজ করতে থাকে এর উত্তর বেশির ভাগটাই psychological. তবে তা অনেকটা balanced অবস্থায় থাকলেও, কখনো কখনো তা অতিক্রমও করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক উদাহরণ তো আছেই। অনেক শিল্পী এবং কবিদের অধিক নারী সঙ্গ কি তার প্রমাণ নয়! নারীসঙ্গ বলতে আমি নারী সম্ভোগের কথা সরাসরি বলতে চাইছি না, তা প্রেম পর্যায়েরও হতে পারে। বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে polygamy চরিত্র খুব সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ধর্ম, সমাজ, সংস্কার, লজ্জা বা system-এর চাপে তা অবদমিত হয়। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর কল্পনায় এই চাপ বা অবদমনকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর নিজের জগত তৈরি করে নেন। সেই জগত তাঁর কাছে সুন্দর, সেই সুন্দর জগতে তাঁর যে বিচরণভূমি এবং বিচরণশক্তি, এর পিছনে অন্যতম ভূমিকা বা কলকাঠি নাড়ানোর ক্ষমতা থাকে সেই যৌনতা ধর্ম বা যৌনশক্তি। যৌনতা এক্ষেত্রে মানসিক বিন্যাসের উপর দারুণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং এই mental এবং sexual power এবং sexuality মিলে মিশে যে wave তৈরি হয় তা সৃজনী কাজে এবং সৃজনী মেধাকে সতেজ শক্তিশালী রাখে। তৈরি হয় এক দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা ও পরিকল্পনা। আবার এমনটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হতে পারে যে অত্যাধিক রোমান্টিকতা বা কল্পনাবিলাসিতার মধ্যে থেকে কবির মধ্যে যে ঘোর তৈরি হয় তা শরীরের যৌনক্ষমতা বা ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। তবে এটা নার্ভের উপর অতিরিক্ত চাপ থেকে তৈরি হতে পারে। এর অবশ্যই চিকিৎসা আছে, আবার automatic recover হতে পারে। আমি আমার দু’এক জন কবি বন্ধুকে এরকম ব্যবহার করতে দেখেছি। তবে বেশির ভাগ কবির ক্ষেত্রেই এই যৌনতা এবং যৌনক্ষমতা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে সরাসরি influence খাটায়। এই প্রভাবের ফলে কবি কীরকম কবিতা লিখবেন তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা অভিপ্রায়, তাঁর পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা পরিবেশ পরিস্থিতি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। হাংরি কবি মলয় রায়চৌধুরীর বেশির ভাগ কবিতার মধ্যেই সরাসরি যৌন কেন্দ্রিক শব্দসহ যৌনতা প্রভাবিত চিন্তা থাকে। এটা কবিতার জন্য, জীবনের জন্য অনেকটা মুক্তাঞ্চল তৈরি করতে ওই সময়ে সচেষ্ট ছিলেন হাংরির কবিরা। কারণ, প্রচলিত ধারাকে এই ভাবে খুল্লমখুল্লা যৌনতার প্রকাশের মাধ্যমে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। এটির এক ধারে যেমন আছে ফ্রয়েডিয় চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি ছিল সমাজতাত্ত্বিক ওসওয়াল্ড স্পেংলারের- The decline of the west – গ্রন্থটির দর্শন। স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সে কারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। এবং এর সঙ্গে ছিল হাংরিদের নিজস্ব কিছু চিন্তা চেতনা। সব মিলিয়ে তাঁরা প্রচলিত স্থবির অবস্থানকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। এবং এটির জন্য অন্যতম মাধ্যম ছিল খুল্লমখুল্লা যৌনতাকে ব্যবহার। অর্থাৎ যৌনতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভেঙে দেওয়া শক্তির বহিঃপ্রকাশে। নিচে মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার কিছুটা অংশ তুলে ধরলাম।

সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও

এখানে তো যৌনতাকে সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে সাহিত্যে নতুন কিছু করার জন্য অথবা সব কিছু ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য। আসলে যৌনতা একটা শক্তি। বিভিন্ন ধর্মে এই যৌনতাকে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন নিয়ম আছে তা সেই সম্প্রদায়ের জন্য। ইউরোপে যেমন যৌন যাপন অনেকটা খোলামেলা, আবার ইসলামে তা আইনসিদ্ধকরণের মধ্যে গিয়ে যাপন করতে বলা আছে, অর্থাৎ আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়ে যৌন যাপন করার অনুমতি। হিন্দু মতে তা আবার আঁটোসাঁটো, কেবলমাত্র একটি বিবাহের বাইরে রাখা নিষিদ্ধ। এবং আইনেও সিদ্ধ নেই দ্বিতীয় গ্রহণ করার যতক্ষণ না প্রথমটির সাথে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। অনেক আরব দেশে চুক্তি ভিত্তিক বিবাহ হয় কিছু সময়ের জন্য। মিশরে যেমন গ্রীষ্মকালীন বিবাহ হয়। এই যে যৌনতাকে ব্যবহার করার বিভিন্ন পন্থা বা ছাড়পত্র, আসলে তা এই শক্তিটাকে সুসংহত রাখার প্রয়াস।

কবিতা লেখার শুরুই হয় জীবনে আগত প্রাথমিক প্রেম থেকে। এই প্রেমের মধ্যেই ঢুকে থাকে শারীরিক আকর্ষণের প্রাথমিক দশা বা পর্যায় যার মধ্যে কামস্বরূপ যৌনতা থাকে। Platonic love-এর ব্যাপারটি আমার মনে হয় এক্কেবারে অবাস্তবধর্মী এক প্রয়াস যার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে মীরাবাইয়ের ভালোবাসা এই পর্যায়ের ছিল, সেটা এক্কেবারেই ভক্তিনির্ভর। সেদিকে আলোচনা নিয়ে যাচ্ছি না। প্রেমের মধ্যে দিয়ে কবিতা লেখার যে প্রয়াস শুরু হয়, সেই প্রেমের মধ্যেই তো যৌনতা থাকে লুকিয়ে। কাজেই যৌনতা থেকে উদগত প্রেম-ভাবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার বীজ। যদিও এটি প্রাথমিক পর্যায়ে, কিন্তু এই বীজ থেকেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের কবি এবং কবিতার গাছ।

প্রেম, পূর্বরাগ, অভিসার বা বিরহ ইত্যাদি পর্বের মধ্যে তো লুকিয়ে আছে সেই যৌন উত্তেজনা এবং বিক্রিয়াজনিত মানসিক অবস্থান। পূর্বরাগের পর অভিসারের টান কীসের জন্য হয়, এই টান কি শারীরিক মিলনের জন্য নয়, তীব্র টান এবং কাছাকাছি হওয়ার বাসনা থেকেই জন্মায় অভিসারে যাওয়া।

শুদ্ধ প্রেম সাধলি যদি
কামগতিরে রাখলি কোথা—
আগে উদয় কামের গতি
প্রেম আগমন তারই সাথি
বিদ্যাপতি

আসলে ভালোবাসা হল একপ্রকার রসায়ন যার মধ্যে শরীর মস্তিষ্ক আবেগ হৃদয় জুড়ে থাকে এবং থাকে গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়া এবং জারণ বিজারণ প্রক্রিয়া, অনুভবের শিহরণ। ঠিক কবিতার মতোই। কবিতার মধ্যে যেমন জড়িয়ে থাকে মস্তিষ্ক আবেগ হৃদয় এবং জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রেম বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সামান্য হলেও কাজে লাগাতে পারে। ভালোবাসার ক্ষেত্রে মেধা প্রয়োজন হয় কারণ মেধার frequency মিললেই তবে প্রেম হয়, না হলে হয় না সাধারণত। তবে মনের frequency তো মিলতেই হয়।

যৌনতা হল এক সুস্থ এবং স্বচ্ছ ধারণা যার মধ্যে আছে শক্তি, আবেগ এবং স্বপ্নময়তা এবং অবশ্যই শারীরিক স্থিতি এবং স্বাস্থ্য। একজন কবি বা শিল্পীর সৃজনীর ক্ষেত্রে তাঁর শব্দের মধ্যে, মুডের মধ্যে, শৈল্পিক ছোঁয়ার টানের মধ্যে যৌনতা এমনভাবে মিশে থাকে এবং ভিতর থেকে support জোগায় যে এই সূক্ষ্ম ক্রিয়াটি হয়তো কবির অজান্তেই ঘটে, সবাই বুঝতে, জানতে না পারলেও কেউ কেউ তো জানে বোঝে। আগেই বলেছি ব্যাপারটা এমনটা নয় যে যৌনতার আবেশে সবাই রগরগে যৌন কবিতা লিখবেন, আসলে এটি কবিকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করার এক মাধ্যম। কবির চরিত্র এবং যৌনতা এই দুটো সেই সুতোর মতো জড়িয়ে থাকে, কাজেই যৌনতার বাইরে থাকা যায় না বললেই চলে। উচ্ছৃঙ্খল চরিত্র বা লজ্জাহীন যৌন আচরণ আসলে ব্যতিক্রমী এবং পরিহারযোগ্য, সেই নিয়ে এখানে আলোচনার নয়, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবনা এবং আচরণ। কাজেই এখানে সেই বিষয়টি বিস্তারিত বললাম না।

ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। আবীর মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিলাম এখানে। একটু পড়ুন। একটু বড়ো হলেও পড়ুন। আমার কাজ একটু লাঘব হল আর কি।

নিত্য ভাঙা-গড়ার খেলায় তাঁর সহজিয়া জীবন নিয়ে ক্রমশই জলঘোলা হল শান্তিনিকেতনে। তাঁর দরাজ গলার রবীন্দ্রনাথের গান শুনল না কেউ! বরং শান্তিনিকেতনী তর্ক তুলল তাঁর জীবনচর্যা নিয়ে। কিঙ্করের তখন ঘরে-বাইরে ‘জীবন্ত মানুষের নেশা’।
একবার, দিল্লি যাওয়ার পথে এক আদিবাসী রমণীর যৌবনের দুর্মর আহ্বানের কাছে নতজানু হয়ে তাঁর সঙ্গে নেমে গেলেন অজানা স্টেশনে। হারিয়ে গেলেন যেন। খবর নেই বহুকাল! হঠাৎ করে শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছল ঠিকানাবিহীন এক টেলিগ্রাম। তাতে কিঙ্কর জানালেন, ‘I lost myself, search myself.’
জীবনে অনেক মেয়ে এসেছে, এটা সত্যি। কেউ এসেছে দেহ নিয়ে, কেউ এসেছে মানসিক তীব্র আকর্ষণ নিয়ে। কিন্তু ছাড়িনি কাউকে। ধরেছি, আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছি। হজম করে ছিবড়ে করে ছেড়েছি। হজম করার মানে জানো? ও মন্ত্রটা আমার গুরুদেবের কাছে শেখা। তাঁর থেকে জন্ম নিয়েছে আমার অনেক ছবি, মূর্তি, অনেক কল্পনা, আর অনুভব।… আমার মডেলরা আমার বহু স্কেচে, ছবিতে, মূর্তিতে, বেঁচে আছে। মডেলরা তো এভাবেই বেঁচে থাকে।

নিজের সম্পর্কে নির্দ্বিধায়ায় এমন করে আর কবে, কোন ভাস্করই বা অকপট হতে পেরেছেন! মডেলদের সঙ্গে রামকিঙ্করের সম্পর্ক নিয়ে নিত্য হাওয়ায় ছড়িয়েছে গসিপ।

তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘‘সব কিছুর মধ্যে যৌনতা আছে, যৌনতা ছাড়া সব কিছুই প্রাণহীন, ঊষর!’’

সে সবের প্রসঙ্গ তুললে কখনও এড়িয়ে যাননি কিঙ্কর। কাল্পনিক নয়, মডেলদের সম্পর্কে তাঁর সে-সব সত্য-স্বীকার আর উক্তি সাতসেলাইয়ে জোড়া-তালি দিয়ে দেখে নেব এই পর্বে।

এক বার তাঁকে প্রশ্ন করা হল তাঁর মডেল বিনোদকে নিয়ে। তিনি উত্তর দেন, ‘‘বিনোদ, মানে বিনোদিনী? সে আমার ছাত্রী, মণিপুরী মেয়ে। একটু একটু করে শরীরের বাঁক, উপবাঁকের ভুবন চিনিয়েছিল ও-ই। আলো-অন্ধকারে ওকে ঘুরিয়েফিরিয়ে এঁকেছিলাম অনেক। এক দিন চলে গেল, মণিপুরি ভাষায় একটি নাটকও লিখেছে আমাকে নিয়ে।’’

অসমের মেয়ে নীলিমা?

‘‘নীলিমা বড়ুয়া। নষ্ট হয়ে গেল ওর পোর্ট্রেট। আঁকতে আঁকতে কত বার যে রঙ লেগেছে শরীর থেকে শরীরে… সে সব কোথায় গেল! ভুল করেছি, তখন টাকার অভাবে ভাল রঙ কাজে লাগাতে পারিনি।’’

মনে আছে এসথার জয়ন্তী জয়াপ্পাস্বামীর কথা?

‘‘মনে থাকবে না কেন? সে তো দক্ষিণী ছাত্রী জয়া। খুব ছিপছিপে ছিল। জয়া নামটা আমারই দেওয়া। সুজাতা করেছিলাম ওকে মডেল করে।’’

ভুবনডাঙার খাঁদু?

‘‘দীর্ঘাঙ্গী খাঁদু ফিরে ফিরে এসেছে আমার ভাঙা ঘরে। সুন্দর ছিল ওর ফিগার। প্রায়ই দুপুর দুপুর আমার একলা ঘরে এসে দাঁড়িয়ে থাকত দরজার চৌকাঠ ধরে। এক কাঁখে থাকত ছেলে। সে দুধ খেত মায়ের বুকের। যে ভাবেই দাঁড়াত শরীরে নৃত্যের ভঙ্গি। অজস্র স্কেচ করেছি ওর।’’

আর রাধি?

‘‘ওই তো রইল শেষ পর্যন্ত আমার কাছে। ওর সঙ্গে মেশা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছিল। ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর কর্তারাও। তাও ওকে ছাড়িনি। ও ছাড়েনি আমাকেও। আসলে রাধারানীর সঙ্গে আমার জড়ামড়ি সম্পর্ক!’’

‘‘রিয়ালিটির সবটাই কপি করতে নেই।’’

সম্মাননীয় পাঠক এবার তো বুঝতে পারছেন বিষয়টা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিল্পীকে প্রশ্রয় দিয়ে বলেছিলেন, “রামকিঙ্কর, তুমি তোমার ভাস্কর্য দিয়ে সমগ্র শান্তিনিকেতন ভরিয়ে দাও।”

আমার এটা বিশ্বাস যে, কবি শিল্পীদের যৌন চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকে অনেকের থেকে। এটা আসে মূলত তাদের রোমান্টিক attitude থেকে, আর রোমান্টিকতার মূলে থাকে প্রবল (কখনো সুপ্ত) যৌনতার ছোঁয়া যা কবিদের ভিতরে ইলেকট্রিকের মতো প্রবাহিত হয়। এটাকে আমরা দমিয়ে রাখতে পারি বটে, কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না। যৌনতার ইলেকট্রিক প্রবাহ কবির শব্দ অভিধানে ক্যারাম খেলার স্ট্রাইকারের মতো আঘাত করে, শব্দের নানান বিন্যাস ঘটিয়ে দেয়। অদেখা সুপ্ত এই প্রক্রিয়াটি হয়তো কবি নিজেও জানেন না বা বুঝতে পারেন না। এই যে আমি বললাম, এর পর নিশ্চয় কবিরা টের পাবেন যে যৌনতা সত্যি করেই তাঁদের লেখার উপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। কবি জীবনের নানান অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখনীর উপর প্রভাব ফেলে, সেগুলো বেশির ভাগ বাহ্যিক, কিন্তু যৌনতা যা করে তার শরীরের ভিতর থেকে, মনের বারান্দা থেকে, মস্তিষ্কের অনুধাবন থেকে এবং গ্রন্থিসমূহ থেকে। অর্থাৎ শরীরের এক্কেবারে ভিতর থেকে। কাজেই যৌনতাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, মেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই। মন খুলে কবিতা লিখুন, জীবনকে ভালোবাসুন আর মনে করুন যৌনতা একটি স্বাভাবিক সহায়ক প্রক্রিয়া, জীবনের জন্য, কবিতা লেখার জন্য।

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov goddyo

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ১২

ধা রা বা হি ক পর্ব ১২

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

উদাসীন তাঁতঘর

pankaj

একটি সাংস্কৃতিক চরিত্রের সন্ধানে

এই মানুষটির সঙ্গে আপনার নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে। বাজারের মোড়ে অথবা নির্দিষ্ট কিছু চায়ের দোকানে। সবসময় ব্যস্ত। জীবনে এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশ্নাতুর। সাম্প্রতিক ছেলে মেয়েদের চলাফেরাকে সে সন্দেহের চোখে দেখে। আর প্রতিমুহূর্তে ভাবে সংস্কৃতি গোল্লায় যাচ্ছে। তার হাতে কিছু নেই। তবুও সে লুকিয়ে রেখেছে দুরারোগ্য কিছু রঙিন প্রস্তাব। যেন গর্ভের অন্ধকার থেকেই সে সাংস্কৃতিক এবং বাঙ্ময়। যেন বিংশ শতাব্দীর সকল মনীষী মৃত্যুর আগে তাঁকে খুঁজে ছিল। এমনই এক উত্তরসাধক বসে আছে আপনার পাশে । শুধু মাত্র কথার বিনিময়ে বিনা পয়সায় চাইছে চা এবং সিগারেটের অধিকার। আমরা সামান্য শিক্ষিত এবং কিছুটা সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ দায় নিয়েছি এদের আর আড়ালে হাসাহাসি করেছি।

কিছুদিন আগেও,নব্বই দশকে স্পষ্ট দেখা যেত তাঁদের। কোনো সাংসারিক বা পারিবারিক কাজের জন্য জন্ম হয়নি যাদের। এদের সব কাজ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য। গভীর রাতে বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কোনো সামাজিক কর্তব্য নেই। সারাদিন মনীষীদের বাণী বয়ে বেড়ানো ছাড়া অন্য কোনো সংবেদনা নেই। তাঁরা উদ্যোগী এবং উদ্যমী পুরুষ। প্রতিদিন কোন কবি বা মনীষীর জন্মদিন ঘুম থেকে উঠেই প্রস্তুতি নিতে হয় তাঁকে। যেকোনো ছুতোয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং তার মুরুব্বী হয়ে ওঠাই তাঁর একমাত্র ভবিষ্যৎ। কোন কুক্ষনে সামান্য কিছু সাহিত্যের বুলি সে আত্মস্থ করেছিল ভেবে অবাক হই। দু-একটি কবিতা শিরোধার্য করে হয় সে আবৃত্তির মাস্টারমশাই অথবা মঞ্চের ঘোষক। কোনো অনুষ্ঠানে দুই শিল্পীর মাঝের ফাঁকটুকু সে ভরিয়ে রাখতে চায় স্বরোচিত কবিতায়। তথ্য যাচাই না করেই নানা সাহিত্য গুজবকে সারাজীবন বয়ে চলে। পড়াশোনা নেই। সেই প্রয়োজনও নেই। শুধু সংস্কৃতির অবনতি দেখলে তাঁর মাথার পোকা নড়ে ওঠে। সেই সংস্কৃতি যার কোনো উত্তরণ নেই শুধু প্রাচীন এক পন্থায় প্রথাগত আত্মসমর্পণ ছাড়া।

কৈশোরে অভিভাবকের হাত ধরে সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনেক পুরস্কার জিতে নিয়েছে। আবৃত্তি,ক্যুইজ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় সে ছিল অপ্রতিরোধ্য। পড়া নয় বলার কৌশলে সে হয়েছে সংস্কৃতিমনস্ক। তারপর একদিন নিজেকে করে তুলেছে উদ্যোক্তা। এদেরই গোপন দালালিতে সেজে উঠেছে মফস্বলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একদিন এরাই আদায় করে নিয়েছেন অভিভাবকের সমীহ, নানা কালচারাল কমিটির সম্মান। পড়াশোনা চেনা ছকে বাঁধা। নতুন যা কিছু সবই চলার পথে কোনো না কোনো ব্যক্তির সভাসমিতির কথা সূত্রে। রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ বা ‘প্রশ্ন'(ভগবান তুমি যুগে যুগে…) নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ এইরকম দু- একটি কবিতা গলা কাঁপিয়ে নাটকীয়ভাবে পরিবেশন করতে করতে তাঁর দিন ফুরোয়। কিছুটা এগিয়ে আছেন যিনি তাঁর অস্ত্র নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (উলঙ্গরাজা), শঙ্খ ঘোষ (যমুনাবতী), বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( রাজা আসে রাজা যায়), পূর্ণেন্দু পত্রীর (কথোপকথন) কিছু জনপ্রিয় কবিতা। এইটুকু সম্পদ আর কণ্ঠের নানা মুদ্রাদোষ নিয়ে সে হয়ে ওঠে মফস্বলের অনিবার্য সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি। এদেরই ঘোষণায় মফস্বলের রবীন্দ্র -নজরুল সন্ধ্যা,বিচিত্রানুষ্ঠান, রক্তদান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদেরই কণ্ঠ আমাদের ছোটবেলার ঘুমজাগানিয়া স্বপ্ন, হয়তো বা সংস্কৃতির প্রথম প্রেরণা। আজ নব্বইয়ের সেই দিন গিয়াছে। চাকরির স্বপ্ন ছেড়ে শুধু এক সাংস্কৃতিক যাযাবর জীবন নিয়ে আজ আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ কেউ তাড়ায় না। সাংস্কৃতিক দাদার পদটি মফস্বলে বহুদিন ফাঁকা পড়ে আছে।

আজ কোথায় কীভাবে আছেন তাঁরা? সম্প্রতি তাঁদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এখন আর রবীন্দ্র -নজরুল সন্ধ্যা পাড়ায় পাড়ায় হয় না। এখন মফস্বলের অলিতে গলিতে শোনা যায় না কিশোরী কণ্ঠের ‘ বসন্তে ফুল গাঁথল’ বা’ ম্লান আলোকে ফুটলি কেন ‘ এইসব গান। আমরা পাড়া বেপাড়া ঘুরে সংগ্রহ করতাম শিল্পীদের নাম। অনুষ্ঠান সাজানো হত গান, আবৃত্তি,নৃত্যের এমন এক সমন্বয়ে যাতে দর্শকাসন খালি হয়ে না যায়। সভাপতির দীর্ঘ বক্তৃতার মাঝে চিরকূট পাঠাতে হত থামার জন্য। আর প্রতিমুহূর্তে তাকাতে হত আকাশের দিকে কারণ কোনো এক অবশ্যম্ভাবী কারণে সেইদিন বৃষ্টি হত। আমাদের ঘোষক বা সভাপতির তেমন পড়াশোনা নেই সেসব যখন বুঝলাম তখন বড়ো হয়ে গেছি। তবুও এসব নিয়েই দিব্যি চলছিল দিন।

আজ সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দখল করে নিয়েছে একটি রাজনৈতিক দল। এমনকী ধর্মীয় অনুষ্ঠানও স্থানীয় বিধায়কের উপস্থিতি ছাড়া অসম্ভব। রক্তদানের অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যর ভিতরে বসে আছেন লোকাল কমিটির সদস্য, কাউন্সিলর,বিধায়ক এবং উঠতি মস্তান ঘোষক যাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ‘বিশিষ্ট সমাজসেবী’ বলে। এখন শিল্পী খোঁজার অবসর বা পরিশ্রম করার লোক নেই। তার বদলে একটি নাচের স্কুলকে দায়িত্ব দিলে তিন ঘন্টার ধামাকা মজুত। দর্শক খুশি। দল খুশি। ক্যাডার খুশি। পারিশ্রমিক পেয়ে নাচের দলও খুশি। এভাবেই চলবে রক্তদান, স্বাধীনতা দিবস সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। আর নাচের দলও সাপ্লাই দেবে উদ্দেশ্য বুঝে। লতা মঙ্গেশকরের চটজলদি দেশাত্মবোধক গানের নিচে ঢাকা পড়ে যাবে সবিতাব্রত দত্তর গান। ফলত আজ আর ঘোষকের অবশ্যম্ভাবী চাকরি নেই।

এমনই এক সাংস্কৃতিক দাদার সঙ্গে দেখা হল চায়ের দোকানে। তিনি একাধারে ঘোষক-কবি-বাচিকশিল্পী। তাঁর দাপট দেখেছি একদিন। আজ আবৃত্তি ক্লাসের হাঁটুর বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কথা এগোয় সাংস্কৃতিক দুঃসময় নিয়ে। উঠে আসে শিক্ষা ও রাজনৈতিক নানা প্রসঙ্গ। চা সিগারেট খেতে খেতে আজও দেখছি তিনি অপ্রয়োজনে কবিতা গুঁজে দিচ্ছেন স্বকণ্ঠে। অভ্যাসের অভাবে ভুলে যাচ্ছেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। তাঁর গলায় আক্ষেপ। অথচ এখনও তিনি স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় একজন বড়ো সাহিত্যিকের জন্মভিটে সংস্কারের। প্রয়োজনে স্মৃতিরক্ষা কমিটি তৈরির। এখন তার দিন যায় বিধায়ক আর রাজনৈতিক দালালদের পিছনে পিছনে। একদিন অনেক রাতে মঞ্চ থেকে নামলে জুটত মিষ্টির প্যাকেট, বড়জোর রিক্সাভাড়া। আর আজ পাওয়া যায় বিরিয়ানির প্যাকেট এবং কিছুটাকা। অনুষ্ঠানের পর স্থানীয় কোনো নেতা বাইকে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। প্রায় প্রতিদিনই চার পাঁচটা অনুষ্ঠান। সংস্কৃতির ছলে রাজনৈতিক বক্তব্য রেখে রোজগার মন্দ হয় না। তাই ছদ্মবেশী শোকের ভিতরে দেখছি তার চোখ ম্রিয়মান লোভে চকচক করছে। এই তো সেদিনও তাঁকে দেখলাম চায়ের দোকানে বসে শঙ্খ ঘোষের কবিতার উচ্চারণরীতি শেখাচ্ছেন অকারণে। আবার সন্ধ্যায় লোকাল কেবল চ্যানেলে দুর্গাপুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রার সরাসরি সম্প্রচারে ব্যস্ত।কণ্ঠে কখনও ঝড় কখনও বিষাদ। অনেক রাতে আজ লম্বা একটা সিগারেট ধরিয়ে বাড়ি ফিরবেন তিনি। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার চেয়েও লম্বা।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov goddyo

আবার রাণার কথা । পর্ব ৯

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৯

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

বোবাকে তুমি শত্রু দাও

এই যে আমার সামনে একটা খোলা জানালা রাতদিন নৌকার মতো ভেসে আছে, দুলছে এ এক শরীর পুজোর খেলা। তুমি তো জানো ঐ জানলা দিয়ে হাওয়ায় শরীর পুজোর উপাচার আসে।

জানালাটা সরিয়ে নিলে একটি শ্মশানের চিত্র দেখা যায়। সেখানে চিতা জ্বলছে, যেন শুধু মানুষ নয়, সব কিছু, যা কিছু খারাপ – যা কিছু অন্যায্য সব পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে…

সব কিছু পুড়ে গেলে তো হবে না, কিছুই না থাকলে বালিকা কি দেখে ছবি আঁকবে? কি দেখে আঁকবে পাহাড় নদী সূর্য! সেজন্য আগুন নিজেকে সংবরণ করল।

এই যে আমার সামনে তুমি একটা জানলা ঝুলিয়ে রাখলে , এই জানলা দিয়েই যে পথ দেখা যায়, সে পথ দিয়েই আমাদের চিত্রকর যায় ছবির সন্ধানে শ্মশানের ওপারে, আশা ও শুভেচ্ছাকে ছাড়িয়ে, দৃশ্য কে ছাড়িয়ে অনেক দূরে শ্মশানে শরীর পুজোর খেলা পুড়ছে, স্রোত পুড়ছে, একজন কবির মস্তিষ্ক পুড়ছে— আমাদের চিত্রকর সেই লেলিহান আগুন দিয়ে ছবি আঁকছেন— মায়া আঁকছেন পৃথিবীর বুকে…

ছোকো ছোকোমাল ছকু এই সব শব্দ ছিল আমাদের তরুণ বয়সে। আমি এইসবের, এইসব নিহিত পাতাল ছায়ার মানে বুঝতাম না, বন্ধুদের কাছে জিগ্যেস করে জানতে পারি ছকবাজদের ছকু বলে। সেই অর্থে আমার পিতাজীও ছকু ছিলেন, কারণ তিনিও সারাদিন ছক আঁকতেন, বাঁচার ছক। যিনি সবচেয়ে ভালো ছক কষতেন তিনিই জীবনের শ্রেষ্ঠ ছক্কাটা গ্যালারির বাইরে পাঠাতে পারতেন। আমার পিতা ঠুক ঠুক সিঙ্গল রানের জীবন কাটাতেন। আমার বাবা ছোট ছকু ছিলেন। এখন এইসময়ের কবিতার জগতের ছকুদের দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। কারণ এত কাব্যময় ছকু আমি জীবনে দেখিনি। বেনারসের ছকুরাও এত কাব্যময় নয়।

ছক কষা কোনো খারাপ ব্যাপার নয় তো! ছক কষে সবাই যে জিতবেন এমনটা তো নয়! ছক কষে জীবনে এগোতে গিয়ে অনেকে বিপদেও পড়েন।

আমি ছিপ ফেলেছি পুকুরে। মাছ খাওয়ার ছক আর কি! পুকুরের গভীরে একটি বড় মাছ আছে, তার খুব খিদে, তাকে আমি চিনি বহুদিন ধরে।

সেও সেদিন ছক কষে আমার পাতা খাবারের দিকে এগোতে লাগলো। সত্যিই তো আমরা যা কিছু পেয়েছি এই জীবনে তার সব কিছুর পিছনে অঙ্ক আছে – বা অঙ্কের ছক আছে।

মাছ খিদের খাবার খেতে গিয়ে আমার পাতা ফাঁদে বা অঙ্কে ফেঁসে গেছে।

সে ছটফট করছে আমার পাতা ছক থেকে বেরোতে। তার খুব কষ্ট হচ্ছে। তার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু আমাকেও তো বাঁচতে হবে!

এইভাবে আমরা কেউ বাঁচি আর কেউ মরে। এইভাবে হঠাৎ শ্রাবণের ধারা আসে আমাদের জীবনে…

বোবাকে তুমি শত্রু দাও। বোবার শত্রুর প্রয়োজন গো! না হলে সে জাগবে না, না হলে সে চুপ করে এই সমতল সংসারে রয়ে যাবে চুপে আড়ালে গানহীন মানহীন ক্রোধহীন মলয়বাতাসহীন।

ওগো বোবাকে জাগাও, বোবাকে উৎসবের উপহার স্বরূপ তুমি খুব লাজুক একটা শত্রু দাও, না-হলে ও কী করে বুঝবে ফুলের টব কত ভারী কত অহংকারী!

ওগো বোবাকে‌ দুর্গমের পথ বলে দাও, ওগো ওকে একটা খাপ খোলা শত্রু দাও…

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov goddyo

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা । পর্ব ৭

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৭

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

১৯৩০ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে স্যুররিয়ালিস্ট কবি রনে শারের ‘আরতিন’ সিরিজের গদ্য। এক অনির্বচনীয় অস্তিত্বের তাগিদে তিনি লিখে গেছেন অস্পষ্ট ভাবনাসূত্রের প্রতিবেদন। যেমন তিনি লিখলেন—“কখনও একটি অসতর্ক আন্দোলনের ফলে তৈরি হল মাথা, সেটা আমার ছিল না তবু আরতিনের গলায় গিয়ে বসেছিল। তারপর অনেকটকা গন্ধক নিজের ভিতরকার ধোঁয়া ও কম্পমান নৈঃশব্দ ছাড়াই আস্তে আস্তে নিজেকে খেয়ে ফেলল।” রনে শারের এই সময়কার গদ্যগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে, গ্রন্থের নাম ‘মালিক ছাড়াই হাতুড়ি’ (Le Marteau sans maître)। স্যুররিয়ালিস্ট কবিদের মধ্যে একমাত্র শার-ই কবিতার স্বচ্ছতা ও অন্যান্য খুঁটিনাটি দিকে নজর রাখতেন। এই সময় থেকে তাঁর স্যুররিয়ালিজম থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত মেলে। রনে শারের স্যুররিয়ালিজম যোগ সম্পর্কে আলব্যের কাম্যু খুব সুন্দর একটি মন্তব্য করঞ্ছিলেন। তিনি বলেন যে ‘রনে শারের এই সংযোগ অনুগামীর মতো ছিল না, তা ছিল সঙ্গীর মতো—আর তাতেই তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন যে নিজের পথে একা চলার মতো প্রত্যয় তাঁর আছে’। অথচ এও সত্যি যে স্যুররিয়ালিস্ট ঐতিহ্য বহন করার ক্ষেত্রে রনে শার অন্যদের চেয়ে বেশিই সমর্থ ছিলেন। Le Poèmepulvérisé নামক গদ্যে শার বলেছেন যে আঁদ্রে ব্রতোঁ ও অন্যদের মতো তিনিও ‘বৈপরীত্যের এই বৈপ্লবিক ও নির্জন জগতে’-র মুখোমুখি হন এবং তাঁর সামনের অপরিচিত চিত্রগুলো ছাড়া চলতে পারেন না। আবার চিত্রগুলোকে তিনি ঠিকমতো বুঝে উঠতেও পারেন না। এও স্যুররিয়ালিস্টদের হতাশার কারণ। এই জগতে তাই একজন শিল্পীকে হতে হয় অন্বেষক বা অভিযানকারী। আর কবিতা হল সেই অন্বেষণের মাধ্যম যেখানে শব্দ ও অর্থ সদা বিবাদমান। ইল্যুশনের জগতকে সরিয়ে রেখে সামনে স্বপ্নের জগতের দিকে তাকাতে প্রয়োজন অযৌক্তিকতার শক্তি। তাই তাঁর কবিতা খণ্ডতা দিয়ে গড়া, অসম্পূর্ণ বাক্য ও খণ্ড মেটাফরে ভরা।

     কবিদের মতো চিত্রশিল্পীরাও প্রথম থেকেই স্যুররিয়ালিজম আন্দোলনের সঙ্গে থেকেছেন। প্রথাগত চিত্রসমালোচকদের অভিযোগ যে স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রীরা গঠনগত দক্ষতা, সুক্ষ্ম ড্রয়িং, ক্র্যাফটম্যানশিপ ইত্যাদির পুরোনো স্তর মানেন না। যেভাবে ব্রতোঁরা মিলিতভাবে কবিতা লিখেছেন, শিল্পীরা তেমনভাবে একসঙ্গে মিকে ছবি আঁকলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে ভেবে তাঁরা চিন্তিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শিল্পীব্যক্তিত্বের কী হবে? বস্তুত, স্যুররিয়ালিস্ট ছবির জন্য শিল্পীরা প্রয়োজন বোধ করেছিলেন বাঁধনহীন কল্পনার। স্যুররিয়ালিজম-এর এইসব দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন লুই আরাগঁ তাঁর La Peinture au Défi নামে ক্যাটালগের ভূমিকায়, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে প্যারিসে কোলাজ পেন্টিং-এর প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে। তিনি কোলাজ ছবির প্রধান চারটি ধারার কথা বলেছেন। ১) কিউবিস্ট কোলাজ (জর্জ ব্রাক, পাবলো পিকাসো) ২) দাদাইস্ট কোলাজ (মারসেল দ্যুশ্যাঁ, ফ্রাসিস পিকাবিয়া) ৩) স্যুররিয়ালিস্ট বা কাব্যিক কোলাজ ( মাক্স আর্নস্ট, রনে মারগ্রিত) এবং ৪) প্রচারের জন্য কোলাজ। আরাগঁ-র উদ্দেশ্য এটা বোঝানো যে কোলাজ শুধুমাত্র স্যুররিয়ালিস্ট অনুশীলন নয়। তবে স্যুররিয়ালিস্টরা কোলাজের পরিসর বাড়িয়েছেন। খবরের কাগজ, দেয়ালপেপার, সিগারেটের প্যাকেট কোলাজে ব্যবহার করেছেন পিকাসো ও ব্রাক। এ সম্পর্কে ত্রিস্তাঁ জারা বলেছেন যে, এইভাবে যে ডিজাইন বা ছবি তৈরি হয়েছে তাতে আপাত বাস্তবের মধ্য দিয়ে মনোজগতের আর এক বাস্তব প্রতিফলিত হয়েছে। কিউবিস্টদের থেকে এগিয়ে স্যুররিয়ালিস্ট আর্নস্ট কোলাজ করলেন অন্য পুরোনো দিকের বিস্মিত ছবির অংশ জুড়ে। মিরো ব্যবহার করেছেন পেরেক, দড়ি, কাঠের টুকরো ও সেইসঙ্গে ছেঁড়া কাগজ। আর এইসব  নিরীক্ষা স্যুররিয়ালিস্ট বিষয়গুলোকে স্পষ্ট করেছে, বলেছেন সালভাদর দালি, ডিসেম্বর, ১৯৩১-এ স্যুররিয়ালিস্ট পত্রিকা ‘ল্য স্যুররেয়ালিসম ও সারভিস দ্য লা রেভোল্যুসিইয়ঁ’-তে। স্যুররিয়ালিস্ট বিষয়গুলো নানা ধরনের, নানা আকারের এবং নানা জটিলতায় ঘেরা। এগুলোকে বলা যায় প্রতীক হিসেবে কাজ করা বিষয়। যেমন মারসেল দ্যুশ্যাঁর চিনির খাঁচা, ব্রতোঁর  Nadja-য় বর্ণিত ব্রোঞ্জের দস্তানা, জিয়োমেত্তির ভাস্কর্যের কিছু অংশ, মিরোর কিছু কাজ—সবকিছুই সুয়ররিয়ালিস্ট বিষয়, যা কংক্রিট ফ্যান্টাসি, অযৌক্তিক ও স্বেচ্ছাচারী। অচেতনার স্বয়ংক্রিয় ভাবনার মধ্যে এই বিষয়গুলো জন্ম দেয় এক অতিবাস্তবতার। ‘ল্য স্যুররেয়ালিসম ও সারভিস দ্য লা রেভোল্যুসিয়ঁ’ পত্রিকার তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যায় দালির স্যুররিয়ালিস্ট বিষয় ছাড়া ছিল হেগেলের প্রতি স্মরণলেখ, আর আঁদ্রে ব্রতোঁর ‘লে ভাস কম্যুনিকান্ত’ এর অংশবিশেষ। আর কবিতা ছাড়াও ছিল লুই আরাগঁর দুটি রচনা—লুইস ক্যারোল, আর স্যুররিয়ালিজম ও বিপ্লবের ভবিষ্যৎ। চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশত হয়েছে ব্রতোঁর আগের রচনার পরবর্তী অংশ, ত্রিস্তাঁ জারার কবিতার পরিস্থিতি বিষয়ে প্রবন্ধ, দালির রচনা ‘স্বপ্ন’, এবং পল এল্যুয়ার-এর গুচ্ছকবিতা।  কবিতা প্রসঙ্গে এল্যুয়ার নিজের কবিতায় লিখেছেন—

     আমি অবশ্যই ঘৃণা করি বুর্জোয়াদের দিন

     এ রাজত্ব পুলিসের, পুরোহিতদের

     কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি তাঁকে

     যিনি আমার মতন সর্বশক্তি দিয়ে

     ঘৃণা করেন না ঘৃণ্য এ রাজত্বকাল।

     আমি সেই ঘৃণ্য মানুষের মুখে থুতু দিই

     আমার সমস্ত কবিতার মধ্যে যিনি

     পছন্দ করেন না কবিতার এই বিশ্লেষণ-কথা।

 

অনেকের ধারণা, লুই আরাগঁ তাঁর প্রবন্ধ ‘স্যুররিয়ালিজম ও বিপ্লবের ভবিষ্যৎ’ লেখার সময় থেকেই স্যুররিয়ালিজম সম্পর্কে তাঁর মনে মতদ্বৈততার বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৯৩০ সালে তিনি ও জর্জ শাদুল স্যুররিয়ালিজম আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত  বিপ্লবী লেখকদের খারকভ কংগ্রেস-এ। আর এই সময় থেকে তাঁর মনে স্যুররিয়ালিজম সম্পর্কে দ্বিধার সূচনা হয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রবন্ধে যদিও তিনি স্যুররিয়ালিজম-এর পক্ষে বলেছেন এবং খারকভ কংগ্রেস-এ স্যুররিয়ালিজম-বিরোধী প্রস্তাবের নিন্দা করেছেন, তবু কোথাও দ্বিধার ইঙ্গিত ধরা পড়েছে কারো কারো কাছে। স্পষ্টভাবে তিনই তাঁর মনোভাব প্রককাশ করেননি হয়তো এই কারণে যে তখন পর্যন্ত তিনি নিশ্চিত ছিলেন না গোঁড়া কম্যুনিস্টরা তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করবেন। তিনি মস্কো থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিপ্লবী লেখকদের সংগঠনের ফরাসি সংস্করণের মুখপত্রে ‘লাল সীমানা’ নামের একটি আক্রমণাত্মক কবিতা লেখেন, আর এর ফলে ফরাসি পুলিস এক মাস পরে পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে এবং আরাগঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। মূলত দুটি অভিযোগ ছিল আরাগঁ-র বিরুদ্ধে। এক) হত্যার প্ররোচনা এবং দুই) সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ভাঙার প্ররোচনাদান।  প্ররোচনা দানের অভিযোগ উঠেছিল কবিতার এমন কিছু পঙক্তির জন্য—

    

আগুন লাগুক লিয়োঁ ব্লুমে

     আগুন লাগুক বঁকুর ফ্রোসার দি-তে

        আগুন লাগুক সামাজিক গণতন্ত্রের প্রশিক্ষিত ভল্লুকদের গায়ে।

 

১৯৩২ সালের জানুয়ারি মাসে এই ঘটনার পর স্যুররিয়ালিস্ট গ্রুপ, আরাগঁ যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, একটি প্রতিবাদপত্র সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়। আশঙ্কা করা হয় যে অভিযুক্ত আরাগঁ-র পাঁচ বছর অবধি জেল খাটার সম্ভাবনা, যা ফ্রান্সে কখনও ঘটেনি। কোনো কাব্যিক রচনার জন্য আইনের এই প্রয়োগের বিরুদ্ধে আহ্বান করা হয়েছে এবং অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। তিন হাজারের বেশি গুরুত্বপূর্ণ কবি-লেখকেরা এই আবেদনে স্বাক্ষর করেন এবং আন্তর্জাতিক ‘রেড এড’-এর ফরাসি শাখার ষাট হাজার সদস্য তাঁকে সমর্থন করেন। ফরাসি সরকার আরাগঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নিয়ে আর এগোয়নি, বা আরাগঁ-র কবিতাকে আর গুরুত্ব দিতে চায়নি।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov kobita

নাসরিন নাজমা চৌধুরী

গু চ্ছ  ক বি তা

না স রি ন  না জ মা  চৌ ধু রী

পরাগপাখি ১

উঠোনে আঁচল পেতেছে আগুনরঙা রোদ।

মুহূর্তের পাশে অপেক্ষা,

অলীক পাবার আশায় স্থবির ব্যাকুল।

 

কী জানি কখন চুপিসারে আসে সে,

পাছে তন্দ্রা জড়ায় ঘোর

অভিমান ফিরে যায় ফিসফিস ডেকে

অতন্দ্র থাকি, নিজেরই ডাকে সাড়া খুঁজি বারবার।

 

মোহবুকে কতোকাল কেটে গেছে এইখানে

কে রাখে সে খোঁজ!

একবার সহৃদয় বুকে এসো, দেখো

ভাঙা কুঁড়েটিতে

মাটির আসন সাজিয়ে রেখেছি

চন্দন ঘ্রাণ প্রেমে।

 

বাঁধন যা কিছু ছিল একটানে ছিঁড়ে

আর সব পথ ভুলে চলে এসো প্রেমের পরাগ

কামিনী হাওয়ায় একবার ছুঁয়ে দাও বুক,

কাঙ্ক্ষিত স্পর্শের পাপে

ঈশ্বরী হবো সেইদিন।

 

পরাগপাখি ২

নির্ধারিত কালটুকু সমাপন হলে

পরিযায়ী কানে ভাসে ঘরে ফেরা গান।

নির্ধারিত অভিসার শেষ হয়

মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট বদলায় দ্রুত,

এখন সময় তাই ঘরে ফিরবার।

 

শীতলতা ছুঁয়ে গেছে রক্তের স্রোত,

তঞ্চিত প্রকোষ্ঠ বহতা

চেয়েছিল একবুক ওম।

দুরন্ত বালক,

আপন খেয়ালে গচ্ছিত উষ্ণতায়

পুড়িয়েছ জীর্ণ যা কিছু।

 

রংচটা তোরঙ্গ খুলি

মায়াস্মৃতি যতনে সাজাই,

দিন গুনি, মাস গুনি,

অপেক্ষায় থেমে থাকা পথ।

 

শীতকাল এলে,

উষ্ণতার খোঁজে লিখে রাখি লুকোনো শপথ।

 

পরাগপাখি ৩

পুড়ে যায় স্মৃতি, শোক

খাঁ খাঁ উঠোন রোদ্দুরে বুক পেতে ছুঁতে চায় মায়া,

কাটাকুটি খেলা।

কুমির ছোঁয়ার শেষে

পড়ে থাকে স্তব্ধ দুপুর।

 

কে ডাকে কিশোরী ঘাটে আগের মতন?

অশরীরী কান্নার গানে

জলছবি ফিকে হয়, জেগে থাকে ব্যথার শরীর।

 

ভেসে যায় বিষাদ আয়ু, ধূসরতা

কথকতা দিন।

 

সীমানারও দূর থেকে ফিরে আসা যায়!

নিগূঢ় প্রণয় দু’হাতে আঁজলা ভরে,

আশাহত চেয়ে থাকে, নির্বাক…

 

জন্মান্তর যদি আসে,

প্রণয় অভিলাষে

দু’টি চোখ জ্বেলে বসে থাকি!

 

পূর্বজন্মের স্মৃতি বুকে কিশোরী ঘাটে

কে ও হেঁটে যায় নিঝুম দুপুরে?

কাঁচ জলে ভেসে ওঠে তার অবয়ব

পরজন্ম মোহ ভুলে

মুখোমুখি আলোর কিশোর…

 

পরাগপাখি ৪

বিদায় সংরাগ জানে

ফিরে আসার আগে যে বিরহটুকু

তার রেশ কতটা গভীর,

লালচে আভায় ফোটে

কাতরতা ঠিক কতখানি!

 

ফেলে আসা শৈশব

ওই দূরে রেললাইনের ধারে হাঁটে,

হাতছানি দেয় মাঝেমাঝে

হয়তো বা মরীচিকা, ভ্রম।

 

একে একে জ্বলে ওঠে আলো,

ঘরে ঘরে মঙ্গলশাঁখ।

কোলাহল শেষে ঘরে ফেরে একলা পথিক

কেউ এসে ধুয়ে দেবে ক্লান্তির দাগ।

 

আলোকবর্ষ ধরে ছুটে যাই পথ থেকে পথে

সঞ্জীবনী সুবাস বুকে

সব ক্ষত মুছে দেবে অলীক কিশোর।

আরও পড়ুন...