Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৩

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

পাখি

পাখি দেখে প্রথম কবে মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে নেই। পাখি উড়ে আসে কাছে, দূরে চলে যায় আপনমনে, খেয়াল করিনি। বোধহয়, খুব মন খারাপে উঠোনের পেয়ারা গাছ বা কোনো ফুল গাছের দিকে চেয়েছিলাম, দেখি একটি ছোট পাখি আমার দিকে চেয়ে আছে। কী পাখি নাম জানি না। কিন্তু আশ্চর্য রঙের বাহার তার। ছোট। কিন্তু অনেক দূর অব্দি তার রঙের ছটা। আমার দিকে তাকায়, আবার অন্যদিকে। আমার ভিতরে মায়া খেলা করে। আমিও বিস্মিত তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। সাধারণত অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখার মতো চট করে কিছু পাই না। ভালোর দিকে তাকিয়ে থাকার মতো জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। 

পাখিটি অক্ষরবৃত্তের ডালে বসে আছে। মাঝেমাঝে মাত্রাবৃত্তের ডালে চলে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে অক্ষরবৃত্তের ডালে। কিন্তু তাহাকে গদ্যকবিতার মতো দেখিতে। আমি অবাক হয়ে একদৃষ্টে তাকে দেখি।

একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখার মতো মন থাকা দরকার। আমার আছে? কী জানি! হয়তো আছে। একদৃষ্টে তোমার দিকে তাহার দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে। তাকিয়েছিলাম, পাখি তোমার দিকে সেই কবে থেকে, সেই আগের জন্ম, তার আগের জন্ম, তারও আগের জন্মের থেকে। পাখি তুমি নিজেকে গাছের পাতার আড়াল থেকে নিজেকে দেখিয়েছ, সরিয়েও নিয়েছ নিজেকে, আবার দেখা দিয়েছ শীতের সকালে। কিন্তু আমার বড়ো অভিমান তুমি আমাকে সেভাবে দেখো নাই, তাকাও নাই।

পাখিটি উড়ে গেল। আমি শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলাম। শূন্যতার মধ্যেও সে রয়ে গেল। আর রয়ে গেল আমার ক্লাস সিক্স। আর শূন্যতার ভিতর জেগে উঠল পাটিগণিত, অ্যালজেব্রা, আশিস স্যারের লাল চোখ, আর সেই দূর গ্রাম থেকে বুকে বই চেপে আসা করুণ চোখের মেয়েটি। মেয়েটি গার্লস স্কুলে পড়ত। সে এখন কোথায়? সে বোধহয় দোয়েল বা টুনটুনি পাখি হয়ে আফ্রিকার কোনো প্রাচীন শ্যাওলাধরা বনে জঙ্গলে গাছের এ ডাল ও ডালে উড়ছে, সংসার করছে স্বামী ও সন্তান লইয়া। হবে হয়তো! কিন্তু আজ সকালে আমার দেখা ছোট পাখিটি গেল কোথায়? আমার মন আনচান করে ওঠে।

আমি আকাশের ডালে তাকাই, তাকে খুঁজি। লেবুগাছের পাতার আড়ালে খুঁজি তাকে। সংসারের যে নানান রঙিন ডালের আড়াল, সেখানেও খুঁজি তাকে। মনখারাপ হয়ে যায়। আমার জেদ চেপে যায়। সে হঠাৎ ফিরে আসে একটি পোস্টকার্ডের অক্ষরের ভিতর। নানান অক্ষরের ডালে পাতায় সে ঘুরছে, আমার দিকে তাকাচ্ছে, আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আবার তাকাচ্ছে। আমি অভিভূত! মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যেও এক আদিগন্ত আনন্দ আছে। শুধু এই ছোট পাখিটি নয়, কত হাঁস কত গরু ও ছাগল ও উট ও শিয়াল ও নানান জাতের লোকাল ট্রেন আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, আবার আমার দিকে তাকিয়েছে, আড়াল থেকে! মেপেছে আমাকে। দেখা, তাকানো, একদৃষ্টে তাকানো ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এসবের মধ্যে বনশ্রী সেনগুপ্তের গান লুকিয়ে আছে, আমি বুঝতে পারি, টের পাই, আনন্দ হয়।

পাখিটি আমাকে আর ভয় পাচ্ছে না। ভয়ে উড়ে যাচ্ছে না দূরে। সে আমার কাছে, কাছেই থাকছে নির্ভয়ে। আমার ভালো লাগছে। সে তার ছোট চোখ দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে আমার চোখে জল কিনা! না জল নেই। চোখে আমার হাসি, চোখে আমার মাউথঅরগ্যান বাজছে তাকে দেখে। ফলে সে নির্ভয়। সে নিশ্চিন্তে, আমাকে দু’দন্ড শান্তি দিয়ে আমার কাছে রয়ে যায়, ফুল ফোটায় অজস্র ফুল আমার ভিতর।

আমি খুব ভালো করে কাকের দিকেও তাকিয়ে দেখেছি, যে সে নিরীহ নিষ্পাপ এক কালো পাখি। কিন্তু তাকেও আমার ভালো লাগে। কাকের ভিতরে যেন টলটলে জলেভরা এক পুকুর আছে, কাকের মধ্যেও এক দিঘিভরা অভিমান ও শান্তি আছে। অভিমানী পক্ষীকে আমার নিজের আত্মীয় মনে হয়। ইলেক্ট্রিকের তারে একটা দুটো তিনটে কাক বসে আছে আপনমনে, কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলছে না। উহারা বড্ড অন্তর্মুখী পক্ষী। আমার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হয়। কাকটি, কাকগুলো এদিক ওদিক তাকায়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষের যাতায়াতের দিকে লক্ষ্য করে, মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করে। মানুষের মনের নর্দমার দিকে তাদের নজর, মৃত ইন্দুর মৃত মৎস্যেরা আছে সেখানে, কাকেরা খিদে নিয়ে তাকিয়ে আছে মানুষের মনের নর্দমার দিকে নালার দিকে। কাক সমাজকর্মী, নোংরা পরিষ্কার করা তাহাদের কর্তব্য। 

কিন্তু কাকের ভিতরেও একটা শান্ত নগরী আছে। শান্ত ধীর স্থির কাক যখন একেলা বসে জগতের আশ্চর্য রাজনীতির দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে থাকে দার্শনিকের মতো, তখন তাকে ভালো না বেসে আমার উপায় থাকে না। কাকের কালোর মধ্যে আমাদের পিতৃপুরুষের আদি শ্যাওলা জড়ানো আছে। কাক আমাদের মনের অতলের নিভন্ত শ্যাওলা আসলে। কাক নিভন্ত। নিভে থাকা পাখি। আমরা মানুষেরা কাককে মনে মনে জ্বলন্ত করে তুলি। আর আশ্চর্য, বিদ্যুতের তারে কাকেরাই বেশি ঝলসে যায়। যেন ঝলসে যাবে বলেই তারা জন্মেছিল পাখি হয়ে।

কিন্তু দয়েল, দয়েল পাখি কোথায় থাকে? তাকে তো দেখিনি! দয়েল মানুষের মনের সৌন্দর্যের ডালে পাতায় মিশে আছে হয়ত। দয়েল না দোয়েল? দোয়েলকে কোকিলকে আমি মনে মনে এস্রাজ তানপুরা ভাবি। ওগো বসন্তকাল এলো। কোকিল ডাকছে যে! ‘গাছে গাছে কোকিল কোকেইন কোকেইন বলে ডাকছে!’ কোকিলের ডাকে আমাদের মেয়েটির শরীরে মনে পবিত্রতা জাগে। সে বসন্তমতী হয়।

আসলে আমাদের সব অনুপ্রেরণার পিছনে টুনটুনি বুলবুলি চড়াই সাদা বকেরা আছে। আহা, আমাদের সবার মন যদি পাখির পালকের মতো নরম হতো! যদি হতো? তাহলে আমরা সবাই উপাসক হয়ে যেতাম, আমরা সবাই ধ্যানী ও বিপ্লবী হয়ে যেতাম!

নদী বয়। নৌকো চলেছে একার দুঃখে একার সুখে। মাঝি দূরের জলের দিকে তাকিয়ে। সে খেয়াল করে নাই, তার গলুইতে এক অজানা পাখি একবার উড়ে উড়ে এসে বসছে। আবার চলে যাচ্ছে। মাঝি ভাবে বেশ তো! আসলে পাখি আকাশকে মুখে করে ঠোঁটে করে এনে নদীর জলে মেশায়। নদীর জল আকাশের রঙে আরো ব্যাপক ও নীল হয়ে ওঠে। পাখি নৌকো হয়ে ভাসতে ভাসতে কোন নতুনের দিকে যায় তো কে জানে!

আমাদের এই ছোট্ট জীবনও পাখিনৌকো হয়ে ভাসতে ভাসতে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ের দিকে যায়, পিছনে পড়ে থাকে আমাদের পাখিস্বপ্ন পাখিদিন পাখিহারমোনিয়াম পাখিরক্তপুঁজ। আমাদের সবার ভিতরের ডালপালায় অনেক পাখি বসেছিল একদিন, বসে আছে এখনো। আমরা টের পাইনি, খেয়াল করিনি অতো। আমাদের শোক আমাদের দুঃখ আমাদের হা হা হাসি আমাদের বাহিরের রং আমাদের দেখতে দেয়নি ভিতরের পাখিদের। অনেক পরে খেয়াল করেছিলাম যে ভিতরের হ্রদে পাখিরা এসেছিল কিচিরমিচির করতে। পাখিদের শিশুমন আমার ভিতরেই ছিল যে!

দূরের বৃষ্টি আকাশে পাখিরা ভিজে ভিজে গানের মতো ওড়ে। বড়োরা খেয়াল না করলেও, শিশুটি কিন্তু তাকিয়েছিল অনেকক্ষণ তার মনের জানলা দিয়ে। ভিজে পাখি আসলে ভিজে কবিতার খাতা।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার