Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

ধা রা বা হি ক । পর্ব ২

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

বিরতির পর দেখি পাহাড়ে আগুন

বন্ধু তালিকা আর বাড়বে না।
অনেক বন্ধু দেখলাম, শিখলাম উহাদের কাছে, সমুদ্র দেখাও হল – হল বিড়ি ফোঁকা বন্ধুর দৌলতে, হাঁপাতে হাঁপাতে পাহাড়েও হল ওঠা, বন্ধুর কারণে।

এতো বন্ধুর পথ হাঁটিতে পারি না আর।

তবু বন্ধুর সিগারেটের কাউন্টার পার্ট মনে থেকে যায়। বন্ধুর আবেগ মনে থেকে যায়।
বন্ধুরাই আমাকে আফ্রিকার চাঁদ দেখিয়েছিল। তারাই আমাকে রূপসার অপার সৌন্দর্যের কথা বলেছিল গোপনে, কোনো এক মাটি-মূর্তির নিষ্পাপ সকালে।

*

একটানা পরপর অনেক লেখা বা কবিতা পড়তে পারি না। একটানা তোমাকে যেমন দেখতে পারি না, তাকালেই চোখ ঝলসে যায়। একটানা বারান্দাতেও পৌঁছতে পারি না তোমার কাছে।

একটু বিরতি, একটা ছোট ইন্টারভ্যাল… তারপর আবার ফিরে তোমার তোমাদের চির-রৌদ্রের নিকটে যাই। ভাসি তোমার ঢেউয়ে। একটানা ভালবাসা আমাকে মিস্তিরিঘাট পৌঁছে দিল, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথ চেনালো না।
বিরতির পর দেখি পাহাড়ে আগুন। বিরতির পর দেখি আমাদের অনু ফিরেছে বিধবার বেশে হাসপাতাল থেকে, ঝলসানো ঊষালগ্ন থেকে…

*

আমাদের গ্রামের পাশেই সমুদ্র। দূর ধানখেত থেকে সমুদ্রের কথা ও বার্তা, সমুদ্রের ক্রোধ, তার গান, তার অশ্রুপাতের শব্দ, তার প্রেমের আলতো নিঃশ্বাস ভেসে আসে। এইভাবে সমুদ্রের সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। সমুদ্র তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাদের মাঝে মাঝেই দূর দেশে নিয়ে যায়। আমাকে নিরুদ্দেশে নিয়ে যায়। আমার নিরুদ্দেশে যেতে ভালো লাগে। যেখানে সবাই আমার অচেনা। সবাই অজানা, শুধু সমুদ্র আমার বন্ধু। আমি তাই সমুদ্রের হাত ছাড়ি না। তার হাত ধরে অচেনা দেশের হাটে বাজারে মেলায় ঘুরি। সমুদ্র আমায় মায়া শেখায়। ভালোবাসা।

প্রবল বৃষ্টির দিনে সে বড় একটা পালতোলা গান হয়ে আমাদের গ্রামের সবাইকে খুশি করে। গরীব দুঃখী সুখি হাসিখুশি বিরহী বিষণ্ণ সবাইকে সমুদ্র প্রবল বর্ষায় নেমন্তন্ন করে খাওয়া। ভাসায় হাওয়ায়, হাসায় গানে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে। আমরা সবাই সমুদ্রের হাত ধরে এ জন্ম থেকে ওই জন্মে লাফ মারি আনন্দে। আমরা সবাই সমুদ্রের হাত ধরে যাই বাতাসের নতুন সুরের কাছে, বাতাসের দীর্ঘ শ্বাসের কাছে। আমাদের গ্রামে উৎসব এলে সমুদ্র তার ঢেউদের নিয়ে আসে, তখন তারা আমাদের প্রিয়জন। সমুদ্রের ঢেউদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমরাও ঢেউ হতে শিখি। গর্জন করতে শিখি, আমরা এগোতে শিখি আরো দূর, অনেক দূর।

*

সন্ধে এসেছে তাঁকে খুঁজতে। সে কী নিরুদ্দেশ! সন্ধে তাঁকে খুঁজতে লাগল সারা গ্রাম। পুকুরঘাট। কবরখানার ওইদিকে, বাঁশবনে, পথের ধুলোয়, বৃষ্টির জলে, বসন্তের বাতাসে। কিন্তু সে কোত্থাও নেই। আদিবাসী গ্রামের রোদকে গরম বাতাসকে সন্ধে জিজ্ঞেস করে – সে কোথায় গেল? আদিবাসীদের বৃদ্ধ বন্ধু, আদিবাসীদের সহায়, কাছের জন – সে গেলো কোথায়? অন্ধকার তাকে নিয়ে গেছে, তাকে অন্ধকার লুকিয়ে রেখেছে নিজের ভিতরে।

সন্ধ্যা অন্ধকারের ঘরের ভিতর অন্ধকারের খাটের নিচে আলমারির পিছনে তাঁকে খুঁজতে লাগল। কোথাও সে নেই। সন্ধ্যা তাঁকে খুঁজে না পেয়ে বিষণ্ণ মনে এক পুকুরঘাটে গিয়ে বসল। সন্ধের গায়ে হেমন্তের ঠান্ডা বাতাস। সে অল্প আলুথালু হয়ে যাচ্ছে।

গ্রামের একটি যুবক দুটি যুবক তিনটি যুবতী চারটি যুবতী সন্ধের প্রদীপকে বলল যে, তাদের যিনি সহায় বন্ধু পরামর্শদাতা তাঁকে একদল দুষ্টু অন্ধকার ধরে নিয়ে গেছে। দূরের আরো কোনো গভীর অন্ধকারের ভিতর। সন্ধ্যার প্রদীপ সেই একটি যুবক দুটি যুবক তিনটি যুবতী চারটি যুবতীর বৃদ্ধ বন্ধুকে খুঁজতে বেরুলো দূরের কোনো গভীর অন্ধকারের দিকে। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যার মনে হল এই দূরের অন্ধকার, দূরের গভীর অন্ধকার আসলে দূরে নয়। সে কাছেই আছে। সন্ধ্যা প্রদীপের একদম নিকটেই সেই গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে। আর সেই অন্ধকারের ভিতরের অন্ধকারে – যুবক যুবতীদের সেই বৃদ্ধবন্ধুকে আটকে রেখেছে কোনো এক বৃহৎ দুষ্টু অন্ধকার!

সন্ধে, সন্ধে প্রদীপ খুঁজছে আদিবাসী গ্রামের বন্ধু সেই সাহসী প্রতিবাদী বৃদ্ধকে। যে অন্ধকারের দুষ্টুমির প্রতিবাদ করেছিল। এবং যে ছিল সহজ মানুষের পক্ষে।

সন্ধে তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে রাত্রির দিকে যাচ্ছে। রাত্রির ঝোপে অন্ধ শেয়াল অন্ধ নক্ষত্র ঘুমোচ্ছে। সন্ধে সেই অন্ধ ঘুমকে টপকে টপকে তাঁকে খুঁজছে, খুঁজে চলেছে।

*

একটা পাতা খসে পড়ে। দুটো পাতা খসে পড়ে। তিনটে চারটে গাছের পাতা খসে পড়ে। মেয়েটি গাছের গাছেদের – মেয়েটি পৃথিবীর সব গাছেদের পাতা খসা দেখে, পাতা খসে পড়ার শব্দ সে পায়। যেই পাতা খসে পড়ে গাছ থেকে, অম্নি মেয়েটির ঘুম বা স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা বা আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। চুরমার হয়ে যায় তো যায়! তবু পাতা খসে পড়ে মাটির গায়ে। পাতা উড়তে উড়তে কোথায় গিয়ে পড়বে, কোথায় সে নতুন করে আশ্রয় পাবে, পাতা নিজেও বুঝতে না পেরে – মেয়েটির কাছেই পাতা আশ্রয় চায়। মেয়েটি অসহায় তাকিয়ে থাকে গাছ থেকে ছিটকে পড়া পাতার দিকে। ওদিকে মেয়েটিরও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা আশা ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেতে, মাটিতে, চোখের জলে, সময়ের গায়ে।

একদিন গাছেদের সব খসে পড়া পাতার দল আর মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে উড়তে উড়তে গেল, যেখানে কেউ যায় না। যে জায়গা কেউ কোনোদিন দেখেনি, সেখানে – সেইখানে। বৃক্ষচ্যুত পাতার দল ও আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নচ্যুত মেয়েটিও গেল। সেই অজানা অচেনা জায়গার কিনারে বসে তারা শুরু করল গান। এমন গান – যা আশার, স্বপ্নের, যে গান ঢেউয়ের তরঙ্গের সৃষ্টি করে এবং শুরুর গান তৈরি করে।

পৃথিবীর সব খসে পড়া পাতারা পৃথিবীর সব আশা ও আকাঙ্ক্ষা হারানো মেয়েরা আবার ফিরে পেল নিজেদের। ‘শুরুর’ গান দিয়ে তারা শুরু করল নতুন পথে হাঁটা। আলো আর শুভ অন্ধকারের দল এলো তাদের অভ্যর্থনা জানাতে। একটা দোয়েল একটা পায়রা একটা মেঘও এলো তাদের ভালোবাসা জানাতে…

*

একজনের আসার কথা ছিল, কিন্তু সে এলো না। সে নারী না পুরুষ – না কি সে এক বালক – তা আমি জানি না। কিন্তু সে এলো না। আমি অপেক্ষায় ছিলাম, আমি অপেক্ষা করতে করতে আনমনে জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল জ্যোৎস্না মেখে মাঠ ভেঙে, ধানক্ষেত বেয়ে, সে আসছে। সে গত জন্মের কেউ হয়তো, সে এ জন্মের ঢেউ হয়তো। সে বৃষ্টিধারা হতে পারে। সে নিমগাছের হাওয়া হয়তো। সে আসছে আমার কাছে, কিন্তু এখনো এলো না।

চায়ের জল গরম করে রেখেছি, সবচেয়ে দামী চা তার জন্য রাখা আছে। তার জন্য ঠান্ডা হাওয়া। তার জন্য তরুণ কবির টাটকা কবিতাও রেখেছি, শোনাবো তাকে। আসছে হয়তো সে। বাড়ি থেকে, বাসা থেকে, প্রচুর ভালবাসা আমার জন্য নিয়ে আসছে হয়তো। আসছে, কিন্তু এখনো সে পৌঁছয়নি।
সে নারী? সে কী সমুদ্রের নোনা জল? সে কী আমাদের ঢেউ? সে কেউই না? না না সে কেউ তো বটেই। সে হয়তো দেরাদুন এক্সপ্রেস। সে জোনাকির ডানা হয়তো।

আমি অপেক্ষা করছি। বাইরে ঝি ঝি পোকাদের ভালোবাসার সম্মেলন চলছে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার