Categories
2020_dec

উজ্জ্বল পাঠ । পর্ব ৬

উ জ্জ্ব ল পা ঠ ।  পর্ব ৬

সে লি ম   ম ণ্ড ল

নিজের দরজার সামনে: নিশীথ ভড়

 

‘কবিতা সংগ্রহ’ হল একজন কবির যাবতীয় লেখার সংগ্রহ। বছর তিনেক আগে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে খয়ের রঙের কভারের ‘কবিতা সংগ্রহ’ নামে একটি বই চোখে পড়ে। এত রুগ্ন ‘কবিতা সংগ্রহ’ কীভাবে হয়? বইটি হাতে তুলে নিয়ে কয়েকটি কবিতা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েই পড়ি। সহজ সরল ভাষায় লেখা কী অদ্ভুত সব লেখা! সহজের একটা সৌন্দর্য আছে। আলাদা রূপ-রস আসে। আমরা সহজে অনুধাবন করতে পারি বলে অনেকসময় এড়িয়ে যাই। এই এড়িয়ে যাওয়া একটা বদভ্যাস। এই বদভ্যাস আসলে একজন তৃষ্ণার্ত পথিকের কাছে কাছের কোনো কলতলা পেরিয়ে দূরের কোনো কলতলার খোঁজ। কবির নাম নিশীথ ভড়।সত্তর দশকের এই কবি জীবনপথে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন একটু প্রশান্তি। সে কবিতা হোক, বন্ধুবান্ধব বা সংসার। কিন্তু তিনি যে প্রশান্তি চেয়েছিলেন সেই প্রশান্তি পাননি। পুড়িয়েছিলেন নিজের অসম্পূর্ণ দুটি উপন্যাস, আটটি ছোটোগল্প এবং দুশো সত্তরের বেশি কবিতার পাণ্ডুলিপি।যৌনপল্লীর পরিমণ্ডপে বাস করেছেন। স্বচক্ষে দেখা এক নির্যাতিত, বর্ণাঢ্য জীবনের নির্যাস তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে নানাভাবে।

 

 

কবির জীবদ্দশায় মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়। নিজের পায়ের শব্দ (১৯৮৪), খেলার তুচ্ছ প্রতিমা (১৯৮৬) ও তীর্থ সংহার (১৯৮৮)। তিনটি কাব্যগ্রন্থ পাঠ করলে বোঝা যায়— কবির অন্তর্দৃষ্টি কত তীক্ষ্ণ। কতটা জীবনকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে গেছে বহুদূর। তিনি কি সত্যিই চেয়েছিলেন সাজাতে? তাঁর কবিতার শরীরে জীবনের অসংখ্য ছিদ্র ফুটে থাকে। আর তাতে ফুটে থাকে অসংখ্য চোখ। সেই চোখ কার?সেই চোখ দিয়েই কি টপটপ করে জল ঝরে?কবি ‘জল নেই’ কবিতায় একধরনের জলহীন জলের চাহিদার কথা বলেছেন। কোন জল সেটা?

পড়া যাক কবিতাটি—

 

জল নেই

 

জল নেই, জলের চাহিদা নেই কোনো

জল না পেলেও দিন কেটে যাবে, এরকমভাবে

এর আগে ভাবিনি কখনো

 

এই জলহীন দেশ আমার স্বপ্নের পাশে শুয়ে

আমার স্বপ্নেরও কোনো জলের পিপাসা নেই আর।

 

সুখে আছি, সকলেই সুখে

 

জল নেই, জলের চাহিদা নেই কোনো

 

এই কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার মধ্যে বারবার অভিঘাত ঘটেছে। আমি শুনতে পেয়েছি সেই শব্দ যা আমার মধ্যে সারাক্ষণ বেজে উঠেছে। জলের শব্দ কী যে মারাত্মক হতে পারে তা শুধু অনুভব করা যায়। আমরা জলে ডুবতে পারি। জলে ভেসে যেতে পারি। তবে জলের শব্দেও হতে পারি চুরমার। আমাদের এই চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া শরীর কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য আমরা ছাড়া কেউ নেই। সেই গভীর আর্তিই যেন কবিতার অন্তরে বেজে উঠেছে। কবিতা সম্পর্কিত বিনয় মজুমদারের একটি কথা মনে পড়ে যায়— “কবিতা হচ্ছে চিরস্মরণীয় বাক্য সমষ্টি যা হুবহু মুখস্থ করা যায়”। কবি নিশীথ ভড়ের এই কবিতাটিও যেন সেইরূপ। মনের ভিতর কোথাও যেন গেঁথে যায়। আলাদা করে আর মুখস্থ করতে হয় না।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিজের পায়ের শব্দ’ থেকে পড়া যাক আরও কিছু কবিতা:

 

বাসনা মিটল না

 

কোথায় জ্বালা জুড়োই আমার ঘরের খুঁদকুড়োই ভর্তি আরশোলা নাদিতে

চক্ষে করমচা ফুটেছে ভাগ্য এখন যা নিভন্ত নিষিদ্ধ পল্লীতে

একটা বেশ্যা ঊরু তুলল, শরীরেও কি রোঁয়া উঠল আর কিছু জানি না

হরি-হরি বলতে বলতে বৈতরণী কি পেরুতে পারানি লাগবে না

মন্দ যদি বেশ করেছি, হৃদয়-কপাল ভেঙে দিয়েছি, ভাঙাই চেয়েছিলে

কেন এমন হলো আমার জন্মে কী দোষ ছিল শুধু ধূসর বা পাটকিলে

জামায় কেন আমায় মানায় তুচ্ছ সাড়ম্বরে বানায় চোখে পৃথিবী ঘুরছে না

পা রয়েছে স্থির, কামে পাগলামি গভীর, তবু বাসনা মিটল না

 

মানায় না

 

কার সঙ্গে কথা বলবে, বলবে না

কার সঙ্গে চলবে এবং চলবে না

কাদের কথা শুনবে, কাদের শুনবে না

ভাবতে-ভাবতে দেখলে তোমায় মানায় না

 

মানায় না এ মিথ্যে করতলের ওপর আমলকী ফল

মানায়  না এ মিথ্যে ঠোঁটে স্তবের গন্ধ দিব্যসজল

মানাচ্ছে না কলাবেচার সঙ্গে রথটি দেখার এ ছল

 

ভাবতে-ভাবতে-ভাবতে হাতের দস্তানা

খুলে রাখতে গিয়ে দেখলে মানায় না

বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে যে হায়না

তাকে খোঁচা দেওয়া তোমার মানায় না

বাঁচার গোপন হদিশকাঠি যে পায় না

তাঁর দু চোখে অশ্রুও ঠিক মানায় না

 

মেথর

 

যে মেথর সকালবেলা আমাদের নর্দমা পরিষ্কার করে

আর বিকেলবেলা ট্রানজিষ্টর হাতে বেড়াতে যায়

রাতের বেলা বৌকে বলে

‘তোকে কিনে দেব একটা শাড়ি

পরেছিল হেমামালিনী

তুই কতদিন আসিসনি

আমার পাশে

বল’

তারা তিনজন্ না একজন ভাবতে-ভাবতে দেখি

এক সকালে সে এসে বলছে

‘তিনদিনের ছুটি দিতে হবে বাবু

দেশে যাব, বিয়ে করতে’

‘কেন রে?’     

‘ও-সে ভেগে গিয়েছে তিনমাস হঠাৎ’

 

হুম, পরের বাড়ির এঁটোকাটা সাফ করতে নিজের ঘরে নিদেনপক্ষে

বৌ তো একটা চাই-ই।  

 

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থেই বোঝা যায়— কতটা মননশীল ছিলেন লেখার ব্যাপারে। নিশীথ ভড়ের অন্তরঙ্গ বন্ধু কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল বইটির ভূমিকাতে লিখেছেন, “স্কুলে থাকাকালীনই নিশীথের লেখা (সাবালক পাঠকের জন্য নাবালক পত্রিকায় লেখা) পত্রিকায় ছাপা হয় । সেটা ৬৬-র শেষদিক। সম্পাদক ছিলেন গৌরাঙ্গ ভৌমিক।” ভাবা যায়? একজন কবি যিনি ৬৬-তে সাবলীল লিখিছেন আর প্রথম বই প্রকাশ করছেন ১৯৮৪ সালে!

 

নিশীথের কবিতায় শ্লেষ খুব তীব্রভাবে থাকে। জীবনকে গভীরভাবে খনন করলেই বোধহয় এভাবে বলা যায়! ‘মানায় না’ । সত্যিই কি আমরা জানি, আমাদের কোথায় মানায়?কীভাবে মানায়? দ্বন্দ্ব আর অন্তর্দ্বন্দের মাঝখানে আমরা নিজেরাই রাস্তার মাঝে ছড়িয়ে যাওয়া শস্যবীজ। যেকোনো মুহূর্তে হড়কে পড়তে পারি। মানায় না চোখে জল… মানায় না বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা হায়নাকে খোঁচা দেওয়া… মানায় না ভাবতে কেন মানাচ্ছে না… কবিতাটি যত পড়ি ভাবি— “মন্দ যদি বেশ করেছি, হৃদয়-কপাল ভেঙে দিয়েছি, ভাঙাই চেয়েছিলে/ কেন এমন হলো আমার জন্মে কী দোষ ছিল শুধু ধূসর বা পাটকিলে”।

 

 ‘মেথর’ কবিতার একটি লাইনই যথেষ্ট আমাদের ফালা ফালা করে দেওয়ার জন্য।“হুম, পরের বাড়ির এঁটোকাটা সাফ করতে নিজের ঘরে নিদেনপক্ষে/ বৌ তো একটা চাই-ই।”কী নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন এই লাইন! সত্যিই তো যে লোকটা সকালবেলা আমাদের নর্দমা পরিষ্কার করে আর বিকালবেলা ট্রানজিষ্টর হাতে ঘুরে বেড়ায় তার বউ কি হতে পারে না বেনারসি পরে হেমামালিনী?নাকি নিম্নবৃত্তের মানুষদের একটাই কামনা হবে— পরের বাড়ির এঁটোকাটা সাফ করার জন্য একটা বউ?

 

কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘খেলার তুচ্ছ প্রতিমা’। এই কাব্যগ্রন্থে কবি আরেক নিশীথ। যিনি একটি ভোরের অপেক্ষা করছেন। যে ভোর নিয়ে যাবে তাঁর শূন্যতার সব অন্ধকার। শবের মতো পড়ে থেকে শুনতে চান না লক্ষ লক্ষ শিশুর কান্না। সব ফুলের মতো সহজ হোক। পৃথিবীর শুশ্রূষার দিন ভরে উঠুক বাড়ির দরজায় দরজায়। চোখের তারায় কাঁপতে থাকা ভয় নিয়ে কবি দেখতে চান না— বাবার অসুখে মা যাক মন্দিরে… ফুলেরা নত হয়ে অরোগ্যের অনুমতি দিক আর অল্পবয়সির মতো মা পরে নিক পায়ে লাল টকটকে আলতা…

 

পড়া যাক এই কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনটি কবিতা–

 

ভোর

 

নিবিড়ভাবে মন্থন করুক আমাকে আজকের ভোর

আমার সমস্ত ভোর ভরে যাক মৃত্যুর হাসিতে

                           জন্মের প্রথম কান্নায়

এত শুচি পৃথিবীকে আমি ভালোবাসি

প্রত্যেকের কপালে রয়ে গেছে চন্দনতিলক

প্রত্যেকের ঘরের ভিতর লক্ষ লক্ষ শিশুর কলরব

                                    জেগে উঠবে এখনি

শুকতারার ম্লান মিলিয়ে যাবার আগে

                                আমার স্তর থেকে স্তরান্তরের শূন্যতায়

 

 

ফুলের মতো সহজ

 

আমার বাবার অসুখ করলে মা যান মন্দিরে

তাঁর চোখের তারায়-তারায় কাঁপতে থাকা ভয়

সর্বাঙ্গে মেখে স্নান করেন পুরোহিত, আর সুদূর দেবতা

ধূপধুনোর ধোঁয়ায় নাচতে নাচতে নাচতে নাচতে নাচতে

ভেঙে পড়েন শব্দে, ঘণ্টার শব্দে

বাগানের সব ফুল নত হয়ে আরোগ্যর অনুমতি দেয়, আর

মা অল্পবয়সীর মতো রাঙা হয়ে বাড়িতে এসে আলতা পরেন

                                                   অনেকদিন পর।

 

ঋণ

 

তোমার শরীরের আলো এসে পড়ুক আমার চোখের ওপর

                                        আমার অন্তরাত্মায়

আর অল্পে-অল্পে জেগে উঠুক ছোটোবেলার সকাল

সূর্য ওঠার আগে শুকতারার শুচিতার কাছে ঋণ

ওগো মেয়ে, তোমার দু হাতের অঞ্জলিতে

                     মনে পড়ল নীলিমাময় শান্তিপ্রতিমা

আর আমার আনন্দ চতুর্দিকের হাওয়ায় হাওয়ায়

                       বানিয়ে তুলছে নিবেদনের গান  

 

যত দিন গেছে, কবির মধ্যে যেন জেগে উঠেছে মহাজাগতিক চেতনা। কবির ভিতর আশ্রয় নিয়েছে এক ধ্যানী পুরুষ। প্রেমিক পুরুষ। তিনি যেন চাঁদের রেণুতে মিশে ফাঁকি দিতে চান জীবনের ভয়াবহ পরিহাস। কখনো চান নিজের বিরুদ্ধে যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে। সেই বিদ্রোহই যেন নীলিমাময় শান্তিপ্রতিমা। এটুকুই যেন কবির নিজের কাছে ঋণ…হাওয়ার শরীরে তিনিই যেন হয়ে উঠবেন কোনো সরল কণ্ঠের গান। করুণাহীন গ্রীবায় আঁকবেন নতুন ভাস্কর্য। আকাশে জ্বর ও প্রলাপ তুলে নিজ রক্তে দুলে উঠবেন অন্যমনস্কতায়।

 

শীর্ষসংকটে

তখন যাত্রীরা ক্লান্ত, নর্তকী রূপসী যারা শেষ করতালি দিয়ে

বসে আছে নতমুখ, বিশ্রামের প্রয়োজনে। যারা কবি

চাঁদের রেণুতে মিশে ফাঁকি দিতে চেয়েছিল

                                    জীবনের ভয়াবহ ফাঁস

তাদের মুখের স্পর্শে প্রথম আলোর গান, প্রভাতের অরূপ ভৈরবী।

এখন বিচার হবে প্রেমিকের ।

এখন বিচার হবে সেই প্রতিবাদী মানুষের।

      প্রেমিক এলেন। তাঁর মুখ দক্ষিণী ভাস্কর্য যেন, ক্ষমাহীন, নিষ্ঠুরতাহীন

সকালে মৃদুস্তবে তাঁর উত্তরীয়ে যেন কিছুটা চাতুর্যে মিশে আছে

যাত্রীদল সমভাবে তরুণের সাথে একস্বর, ঘোষণা করল

এবার বিচার হবে প্রেমিকের

সেই প্রতিবাদী মানুষের।

প্রেমিক রহস্যে লীন মূর্তিতুল্য, চোখে তাঁর অসামান্য জ্যোতি।

 

মুখরেখা

 

কে ভাঙাবে ঘুমঘোর?কে জাগাবে সরল কণ্ঠের গান?

পবিত্র কুসুমগুলি একে একে স্বপ্ন হয়ে ঝরে গেল…

সারারাত শুধু হাওয়া অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বালকের মতো আসে যায়

খুব একা, গভীর চুলের নীলে, ভিজে ঘাম পিঠময়

সারারাত অতন্দ্র প্রহরী যেন দ্বার খুলে মৃত শরীরের মতো

পরিত্যক্ত                   রেখেছে আমায়

কে আর আকাশে আজ জ্বর ও প্রলাপ তুলে

আমার রক্তেই যেন দোল দেবে অন্যমনস্কতা

কে আর করুণাহীন গ্রীবার ভাস্কর্য দেবে

                             করুণার মতো, প্রিয়মদ…

   কে যেন নিষ্ঠুর হাতে লুণ্ঠন করে যায় আমার শরীর সারারাত

মানুষের মতো মুখ, অন্তরালে— অবিশ্বাস— আরেক মানুষ।

 

কবি রণজিৎ দাশের এই কথাটির সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত না হয়ে পারা যায় না— “নিশীথের কবিতার একটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তার অনেক কবিতাই পড়ামাত্র আমাদের মনে পড়বে সেসব কবিতার বিভিন্ন পূর্বসূরি কবিদের ছায়াপাতের কথা, অথচ একই সঙ্গে আমরা নির্দ্বিধায় মেনে নেব যে সেই কবিতাগুলি নিশীথের বলিষ্ঠ স্বকীয়তার গুণে একই সঙ্গে যৌগিক ও মৌলিক”।

 

কবি মারা যান ২০১২ সালে। কিন্তু শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘তীর্থ সংহার’ প্রকাশ হয় ১৯৮৮ সালে। মৃত্যুর আগে ২৪ বছর তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। বলা যায়— একপ্রকার নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কবির এই বন্ধুর কথায় “নিশীথদা জীবন্মৃত ছিলেন। বেঁচে গেছেন।”

 

 

পৃথ্বী বসুর একটি লেখা থেকে তাঁর ডায়েরির কিছু টুকরো অংশ তুলে দেও্য়া হল। এই অংশটি পড়েব্যক্তি নিশীথ ভড়কেও কিছুটা জানতে পারি।

 

“১. ‘…আত্মজিজ্ঞাসার অধিকার থেকে যেমন যেকোনো বিদ্যা ও ধর্মের আবির্ভাব, কবিতারও জন্মসূত্র তাই। আত্মজিজ্ঞাসাই আমাদের ভবিষ্যত কর্মপ্রবর্তনার দিকে নিয়ে যায়।… কল্পনা আর বাস্তব, বই আর বর্তমান, প্রত্যক্ষ আর অপ্রত্যক্ষ এ-সমস্তই আমাদের জানা-অজানার মধ্যে, নিরন্তর ফারাক আর মিলনের মধ্যে কবিকে গড়তে থাকে ক্রমশ। তাই আর সব মানুষের মতো কবিরও জানা নেই সে কী হয়ে উঠবে।…’”

 

২. ‘… কাল একটা কবিসম্মেলন হল। হাততালি পেলাম প্রচুর। লক্ষ করে দেখেছি আমার যে সমস্ত superficial reality নিয়ে লেখা, সেগুলোই ভালো লাগে লোকের। অথচ আমি ওরম লেখা লিখতে চাই না। চাই গভীর, মর্মজ্ঞ, মায়াবী কিছু লিখতে, যা সভায় পড়া যায় না, বিরলে বসে, নিঃশব্দে পড়তে হয়।…’

 

৩. ‘… দুঃখ, আমার আনন্দকে, আমি দু-হাতে নিবিড়ভাবে পাব। সব মানুষের আত্মা নেই। অথচ আত্মা দিয়ে আত্মাকে দেখাই ঠিক দেখা। সেই আত্মাই লাভ করতে হবে আমাকে। আমার জীবন সত্যে প্রবেশ করুক, সত্যময় হয়ে উঠুক, এই একটামাত্র প্রার্থনাই ধ্বনিত হোক আমার নিঃশব্দে।…’

 

নিবিড়, আত্মমগ্ন এই মানুষটি বার বার চেয়েছেন একলা হতে। সমস্ত ভিড়, আলো থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। অজস্র লেখা নষ্ট করেছেন, যা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনটি কাব্যগ্রন্থ আর অপ্রকাশিত কিছু কবিতা নিয়ে সত্তর দশকের এই কবির কবিতা সংগ্রহ প্রকাশ পায়। কবি রণজিৎ দাশের সুসম্পাদনা ও কাছের বন্ধু কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের স্মৃতিতাড়িত অসামান্য একটি ভূমিকা এই সংকলনের আভা ছড়িয়েছে। আমরা যাঁরা পাঠক, যতদূর চোখ যাবে তার থেকেও বেশি তাকাব বলে ওই আভা ধরেই হেঁটে বেরিয়েছি। হাঁটতে হাঁটতে যেন ফিরে এসেছি নিজের কাছে। কবিতার পথ যতই বিস্তৃত হোক না কেন, আলটিমেটলি তা গোলাকার। ঘুরতে ঘুরতে একসময় ঠিক নিজের গন্তব্যেই ফিরে আসতে হয়। ফিরে আসার পর দেখা যায়— কবিতার যে বীজটি আমরা সারা পথ ছড়িয়ে এসেছি, তার গাছছায়া আসলে আমাদের ঘরেই পড়েছে…

কবি নিশীথ ভড়

তথ্যসূত্র

কবিতা সংগ্রহ: রাবণ প্রকাশনা

Prohor.in

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

স্মরণ । নাসের হোসেন । ড. চন্দন বাঙ্গাল

স্মরণ । নাসের হোসেন

ড.   চ ন্দ ন   বা ঙ্গা ল

রুট ওভার নাসের হোসেন

নদী তো ভাঙবেই। কেননা নদীর ধাতু প্রকৃতি জুড়ে আছে ভাঙন আর প্রবাহ, প্রবাহ আর ভাঙন। আমরা কেবলই পাড় ভাঙার হিসেব নিই, গল্প বলি, মন খারাপ করি, নিজেদের ভেতরে ঠেলে গুঁজে পুরে দিই বিচ্ছিন্নতা হাহাকার। ভবিতব্য মেনে নিয়ে বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে কুটুম্বিতা করি। উড়িয়ায়, নাকি বাংলায়, নাকি অহমিয়ায় চাটিলপাদ জন্মেছিলেন। তিনি ভাঙা পাড়ের গোলাপ-পার্কে বসে বাদামের খোসা ছাড়ানোর কোনো গল্প না, তৈরি করেছিলেন, ভাঙা দু-দুটো পাড়ের মধ্যে সাঁকো। সেতুবন্ধন। যাতায়াত। ভাঙন-ভাস্কর্য।

কবি নাসের হোসেন এই চাটিলের যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি, সেতুবন্ধন, যাতায়াত, ভাঙন ভাস্কর্যের কবি। তাঁর কাব্যভুবনে কোনো পাড় ভাঙার গল্প নেই। জীবজগতের যা-কিছু বৈপরীত্য সেসবকে একসূত্রে গেঁথে বেঁধে জীবনের প্রবহমানতার সঙ্গে মিশিয়ে নাসের হোসেন বাংলা কবিতায় নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র, আশ্চর্য এক কবিতা জগত। সহজ সত্য সুন্দরের মত বিরাজিত এই কবির মাথার উপরে বিস্তৃত এক ব্রহ্মাণ্ড, চারপাশে দিগন্তরেখা ছুঁয়ে গভীর শূন্যতা। অথচ তিনি কখনোই ব্রহ্মাণ্ড ও শূন্যতা নিয়ে ‘অপার হয়ে বসে’ থাকেননি। গত প্রায় পঞ্চাশ বছরের কবিতা যাপনে তিনি তৈরি করেছেন এক অলীক সাঁকো এক অলীক যাতায়াত। এই যাতায়াতে যেমন আছে-‘ডানা’, ‘জামার ভুবন’, ‘আলপিননামা’, ‘জবরদখল’, ‘ছায়াপুরাণ’, ‘কপিলা ও পিতৃতন্ত্র’ তেমনিই রয়েছে ‘অপারেশান থিয়েটার’, ‘কৃষ্ণগহ্বর’, ‘কোমা’, ‘গ্যাব্রিয়েল বলো’।এসবকে কেন্দ্র করে নাসেরের কবিতায় ধুয়ার মতো বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষ এবং মাটির গান। সমর সেন কিংবা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এঁদের মতোই নাসেরের কবিতায় উপজীব্য মানুষ এবং মাটি । কিন্তু তাঁর কবিতায় মানুষ এবং মাটি যতোটা অনুভবের, ঠিক ততটা যেন দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। আশ্চর্যের বিষয় এগুলো নিয়ে তাঁর কোনো শপথ নেই। মানুষের জন্য সকলের ‘তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা/ পরের তরে’ এই ধরনের কোনো আপ্তবাক্য তাহার কবিতায় ধ্বনিত হয় নি। মন্ত্রের মতো নাসের উচ্চারণ করে গেছেন, আনন্দের- বেদনার, সুখের-দুঃখের, জীবন-মৃত্যুর, নিঃশ্বাসের-প্রশ্বাসের, আলোর-আধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষকে।

এই কবির কাব্যভুবন জুড়ে যে মাটির কথা ধ্বনিত হয়েছে, সে মাটি শুধু অস্তিত্ব নয়-ক্ষুধা ও সৌন্দর্যের আধারও।

আটের দশকের অগ্রগণ্য আলোচ্য কবির বিশিষ্টতা শুধু এখানেই নয়। কবিতার আরও বেশকিছু ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট স্বতন্ত্রতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রথমেই আসি পঙক্তি বিন্যাসের কথায়। বিবৃতিমূলক, টানা গদ্য ফর্মে লেখা হলেও বাংলা কবিতার প্রচলিত ও জনপ্রিয় পংক্তি বিন্যাস রীতি থেকে নাসের সরে গেছেন। কবিতার ভাব শুধু নয়, তাঁর কবিতার শব্দও প্রচলিত নিয়মে  যে পঙক্তিতে থাকবার কথা, তা না থেকে পরবর্তী পঙক্তিতে এসে শেষ হয়ছে নতুবা নতুন পঙক্তি সঙ্গে মিশে গেছে। পাঠক লক্ষ্য করুন-

‘যখন সেই বাতাস আমাকে মৃদুস্বরে বলল যে বেশি
ভালোবাসা ভালো নয়, আমি উত্তরে জানালাম যে কেন
নয়, ভালোবাসা বেশি বেশি বেশি, অনেক বেশি হলেও
ভালো, আমার ভালোবাসায় কোন ধ্বংস কার্য হয় না
সে বললো, হয়, বেশি আদরে স্বভাব নষ্ট হওয়ার

মতো, মাথায় চড়ে বসার মতো, যে যাই বলুক না কেন
আমি আমার সিদ্ধান্তে অবিচল: ভালোবাসা বেশি হোক
বেশি বেশি করে হোক, আমার বিশ্বাস তাদের স্বভাব
উন্নত হয়, এবং মাথায় নয়, মানুষ মানুষের পাশেই থাকে
যে মন পাহারা, যেরকম একে অপরকে রক্ষা করে, অবিকল’
                                                            (পাহারা, যেরকম )

আজকের বেশিরভাগ কবিদের কবিতা পোয়েটিক হ্যাং-ওভার রোগাক্রান্ত। খুবই সাধারণভাবে কিছু কথা বলে গেলেন, কবিতার শেষে দেখা যায় এমন কিছু বললেন বা লিখলেন যাতে করে পাঠককে চমকে যেতে হয়‌। নাসিরের কবিতা এ ধরনের স্টান্টবাজি থেকে মুক্ত। তিনি যা দেখেছেন, তাঁর চোখের পাতা ঘেঁষে যা কিছু ঘটেছে সেগুলোকেই তিনি এক মরমিয়া সাধকের মত লিরিক্যাল রূপ দিয়েছেন।

আলোচ্য কবির কবিতার নামকরণের প্রকৃতিও স্বতন্ত্র রকমের। সাধারণভাবে নাসেরের কবিতার শিরোনাম হয় কোনো শব্দবন্ধ। আবার অনেক সময়  দুটি শব্দকে কমা চিহ্ন দিয়ে পৃথক করে রাখা হয়, কখনো আবার দুটি পৃথক শব্দকে একই সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় । যেমন-‘চলো, তাড়াতাড়ি’ , ‘নবীন, ভালোবাসা’, ‘সমস্যা, চিরদিনের’, ‘থাকে, তবে’, ‘যুদ্ধ, সারাদিন’, ‘উন্মত্ত, এরকম’, ‘ওঠো, দ্যাখো’, ‘কাছেই, নিসর্গের’, ‘আছে, এত’, ‘মুহুর্তে, সুন্দর’, ‘শরীরে, অসংখ্য’, ‘ভিতর, ক্রমশ’, ‘যাচ্ছে, মাটিতে’  কিম্বা ‘খাওয়াদাওয়া’, ‘চিরনতুন সুন্দর’, ‘শিল্পীদের বাড়ি’, ‘জবরদখল’, ‘কাঁধে পাখি’, ‘বন্দী করো’, ‘পাথরের চোখ’ ইত্যাদি। নাসেরের কবিতাপাঠের অন্যতম মজা এখানেই, দুটি শব্দবন্ধের যেকোনো একটি শব্দকে শিরোনাম হিসেবে ধরে নিয়ে, একই কবিতাকে পৃথক-পৃথকভাবে পাঠ করা যেতে পারে। এর ফলে পাঠক দু’ধরনের পাঠ আস্বাদন করতে পারেন।
যেমন- যে কবিতার নাম ‘নবীন, ভালোবাসা’

কত কিছু ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে সংগীত পিরিচ
পিরিত ভেঙে যাওয়ার মতোই মনে হয়, কৃষ্ণ রাধার পিরিত কি ভেঙে যায় নি

 অচিরেই, অথবা কিছুই ভাঙে না সবই থেকে যায় অক্ষত অম্লান
নবীন, ভালোবাসা কাকে বলে এই প্রশ্নের সমাধান অতএব চাওয়ারও
কোনো মানে হয় না কেননা হিমেল গাছের থেকে যে পাতা ঝড়ে পড়ে

প্রেমিকপ্রেমিকার শরীরে, তাতে তাদের মৃতদেহের আচ্ছাদন খুব ভালো হয়

কিন্তু বেঁচে থাকাকে কোনোভাবে বাঁচানো যায় না, বেঁচে থাকা আরো কিছু

শুশ্রূষা প্রার্থনা করে, বেঁচে থাকার অনুযোগ নানাপ্রকার

 নানান আকারে ইঙ্গিতে সে বলে, বাঁচাও বাঁচাও জীবনের স্পন্দন যেন কোনদিনও

না বন্ধ হয়, বেঁচে থাক সন্তান-সন্ততি, তাদের শিল্পবোধ ও প্রেরণা অবিচ্ছেদ্য

নাসেরের কবিতায় যতি চিহ্ন হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কমা চিহ্নটি।অবশ্য কখনো-সখনো সমাসবদ্ধ শব্দের ক্ষেত্রে হাইফেন চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। কমা মানে অল্প একটু থেমে এগিয়ে যাওয়া। ঠিক যেমন আমাদের জীবন।সময়ের সাথে সাথে অনেক ঘাত প্রতিঘাত আসে।তাতে জীবনের গতি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় না। একটু থেমে জীবন আবার এগিয়ে চলে। নাসের তাঁর কবিতায় জীবনের গতিময়তাকে সঞ্চারিত করেছেন কমা চিহ্ন ব্যবহার করে। এমনকি তাঁর কবিতার শেষও উল্লেখযোগ্যভাবে পূর্ণচ্ছেদ চিহ্ন বর্জিত। বেশিরভাগ কবিতা শেষ হয়েছে কমা চিহ্নের পর একটি মাত্র শব্দ, অথবা একটিমাত্র বাক্য দিয়ে-

কতটা মাত্রা ছেড়ে দিলে মানুষের কাছাকাছি যাওয়া যায়, ভেবে

দেখেছো, কতটা মাটি মুঠোতে নিয়ে যেতে হয় মাটির প্রেম
পেতে হলে, এইসবই জানা কথা, অজানা নয় কিছু তবুও

অন্বেষণ জারি থাকে, কতকগুলো নির্বাক দৃশ্য থেকে অন্য

কিছু নির্বাক দৃশ্য গঠিত হয় মানুষের মুখ ভেসে ওঠে তার

মধ্যে হাঁকে এ তুমুল উদ্ভাস, হাঁকে বিস্তৃত প্রতিভাস, ভালোবাসার

জন্য যাবতীয় আন্তরিকতা বকুলফুলের মতো ছড়িয়ে থাকে

পথে পথে, পরক্ষণেই ভেসে ওঠে একটি কুকুরের মুখ, হাঁকে,

ভেসে ওঠে বিড়ালের মুখ, হাঁকে, ভেসে ওঠে ঘোড়ার মুখ,

হাঁকে, ভেসে ওঠে গাছের সবুজ পাতারা ক্লোজআপে, হাঁকে

দুরন্ত ধুলোর মতো চারিদিকে বয়ে যেতে থাকে পাগল হাওয়া,

এক সময় এসবও মেটে, হয়তো এরই নাম মিটে যাওয়া,

বৃষ্টি নেমে আসে, ভেজা গন্ধে স্তিমিত হয় চারপাশ, যাবতীয় রেনু

দিয়ে পড়তে থাকে

        (আসে, ভেজা)

সাধারণভাবে এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য কবিতায় স্পেস চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু লক্ষ্য করুন, নাসের হোসেন তাঁর কবিতায় স্পেস চিহ্ন ব্যবহার করেছেন প্রথম স্তবক এর সঙ্গে দ্বিতীয় স্তবকের সংযোগ তৈরি করে।লক্ষ্য করুন দেখতে পাবেন একটি স্তবকের বাক্য অনেক সময় যেন শেষ হচ্ছে পরবর্তী স্তবকের সূচনাতেই, মাঝখানে স্পেস চিহ্ন। এই স্টাইলে নাসেরের কবিতার উল্লেখযোগ্য দিক।

আলোচ্য এই কবির বেশ কিছু কবিতায় সিনেমেটিক-দৃশ্য চোখে পড়ার মতো-

ছবি ছিড়ে বাইসন ছুটে যাচ্ছে, ঊর্ধ্বশ্বাস

বাঁকানো শিং, চকচকে শরীর, উত্তাল পেশীর তীব্র

বাইসন ছুটে যাচ্ছে

বড়ো দীর্ঘ এরিনা, উঁচুতে সার গ্যালারি

ও লোকজন, কিছু মহামান্য ব্যক্তিও

আমার হাতে লাল কাপড়

হাততালি উল্লাস অথবা চকিত
আমি ছুটে যাচ্ছি, ছুটে, এগিয়ে, কোনো না কোনো ভাবে

মেলে ধরেছি লাল জামা

ক্রুদ্ধ চোখ, বাঁকানো শিং, মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে

যে করেই হোক ওর পিঠে চড়তে হবে

বাইসনের পিঠে যে চড়েনি সে বুঝবে না

ব্যাপারটা কতটা দালির কতটা পিকাসোর কতটা

আমার

এখন আমার বুক থেকে পিঠ থেকে কাঁধ থেকে

ছুটে বেরোচ্ছে অজস্র বাইসন

                (বাইসন)

এই কবি কবিতায় ইংরেজি শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করেননি। কিন্তু বাংলা বেশকিছু শব্দ ও বানান তিনি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যেন তিনি ইংরেজি শব্দকে প্রবেশাধিকার দিয়েছেন। এর ফলে তাঁর কবিতা অন্য মাত্রা পেয়েছে। বিশেষত কবি যখন উচ্চারণ অনুযায়ী বাংলা বানান লেখার পক্ষপাতি।আমরা বেশিরভাগক্ষেত্রেই দেখেছি তিনি ‘দ্যাখো’, ‘ক্যানো’ ইত্যাদি উচ্চারণ অনুযায়ী বাংলা বানান ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘কোন’ এখানে পাঠক শব্দটিকে কোনো অথবা ইংরেজি Angel বসিয়েও পড়তে পারেন।আবার যেখানে তিনি লিখছেন সুন্দর, সেখানে Beauty পড়লে সুন্দরের পরিবর্তে বিউটি ব্যক্তিনাম এসে যায়। এইভাবে নাসেরের কবিতার পরবর্তী পাঠে কবিতার সমগ্র আবহ যেন বদলে যায়। কবিতায় ধরা পরে বহুমাত্রিকতা। কবি পাঠকের জন্য খুলে দেন তাঁর কবিতা-দুয়ার।

নাগার্জুনের শূন্যতাবাদ কিংবা চন্দ্র কীর্তি আচার্যের মধ্যমকবৃত্তির ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে কবিতা রচনা করেছেন এই কবি। শূন্য শুধু শূন্য নয়, এর ভেতরেই রয়েছে পূর্ণতার ইঙ্গিত। এই চিন্তা চেতনার প্রতিফলন তার কাব্য ভুবনের অসংখ্য কবিতাতেই পাওয়া যাবে।

আটের দশকে এরকমই এক শক্তিশালী ব্যতিক্রমী স্বতন্ত্র কবি চলে গেলেন ৯ই ডিসেম্বর কোঠারি হাসপাতালে।
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি কবি নাসির হোসেন জন্মগ্রহণ করেন কলকাতা শহরে। তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৭০-এ। অকালপ্রয়াত এই কবির মোট কাব্যগ্রন্থ প্রায় ২১টি। কবিতা পাক্ষিক পত্রিকায় তিনি ধারাবাহিকভাবে কবিতা সংবাদ লিখতেন অর্জুন মিশ্র ছদ্মনামে।কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় ‘দ্য লাস্ট পেজ’ নামে একটি পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করতেন। পরবর্তীকালে সম্পাদনা করেছেন রৌরব। দীর্ঘ চার বছর ধরে নাসের কবিতা পাক্ষিক পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন।

চিত্রশিল্পী হিসেবে ও নাসের হোসেন ছিলেন অনন্য। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনাথ কলেজে তার ছবি প্রথম  প্রদর্শিত হয়। ১৯৮৪-তে বিড়লা একাডেমি অফ্ ফাইন আর্টস অ্যাণ্ড কালচার-এ তার একক চিত্র প্রদর্শনী ‘দেবী ও পোড়া শহর’ প্রদর্শিত হয়।এই প্রদর্শনীর মুগ্ধ দর্শক ছিলেন চিত্রকলার কিংবদন্তি মকবুল ফিদা হুসেন।

অনেকেই কবি নাসের হোসেনকে শুধুমাত্র পোস্টমডার্ন কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কিংবা করতে চাইছেন। আমরা এর ঘোর বিরোধী। যারা এই ধরনের ঔপনিবেশিক তকমায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা কবিকে সমগ্রতার পরিবর্তে খন্ডিত রূপে দেখতে চান। সুকান্ত কি সত্যিই কিশোর কবি? নজরুল কি তাঁর সমস্ত কাব্য জগৎ জুড়ে শুধু বিদ্রোহ ঘোষণা করে গেছেন? কাস্তে কবির বাইরে বাংলার কবিতা পাঠক কি দীনেশ দাসের আর কোন অন্য পরিচয় খুঁজে পাননি? সুভাষ মুখোপাধ্যায় কি শুধুই পদাতিক কবি? প্রিয় পাঠক মনে হয় ভাববার সময় এসে গেছে। প্রায় পঞ্চাশ বছরের কবিতা যাপনকালে নাসের হোসেনের যতটা চর্চা হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। এর কারণ কী? প্রিয় পাঠক, ভাববেন না আপনি? 

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

স্মরণ । নাসের হোসেন । অমিতাভ মৈত্র

স্মরণ । নাসের হোসেন

অ মি তা ভ   মৈ ত্র

আমাদের সান্তাক্লস

ঈশ্বরও ঈর্ষা করতেন নাসেরকে, কেননা তিনি চেষ্টা করেও যা হতে পারেননি, নাসের প্রকৃতিগতভাবেই ছিল ঠিক সেরকম। ওর মুখ ছিল প্রসন্ন, দ্যুতিময় স্ফটিকের মতো। প্রথমবার যে সামনে এসেছে নাসেরের, সে ওর সাদা আত্মায় পৌঁছে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। অনেক বছর আগে বুড়ো একজন ভিক্ষুককে দেখেছিলাম বিস্ময় নিয়ে ওর মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে। তাকে টাকা দিয়ে নমস্কার করে অন্যমনস্ক ভাবে ধীরে ধীরে হাঁটছে নাসের, আর সেই মানুষটি মুখ ফিরিয়ে শুধু দেখেই যাচ্ছে তাকে।

ধীরে সুস্থে হাঁটত নাসের। ওর শরীরের ভঙ্গিতে কোনো দ্রুততা ছিল না কোনোদিন। একজন শান্ত ধ্যানস্থ মানুষ সুদূর প্রসন্ন চোখে হেঁটে যাচ্ছে— এভাবেই সবাই দেখেছে ওকে হাঁটতে। সম্ভবত বছর ৪৫ আগে প্রথম দেখেছিলাম ওকে। ও সাইকেল চালাতে জানত না। সব জায়গায় ধীরে সুস্থে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত। কাঁধে সবসময় থাকত ভারী ভারী বই আর পত্রিকায় ঠাসা বড়সড় একটা ব্যাগ। সবার জন্য পত্রিকা বা বই রাখা আছে সেখানে। শান্তভাবে ও ব্যাগ থেকে বের করবে ‘কবিতা পাক্ষিক’ বা কোনো বই। সামনে বসে যত্ন করে লিখবে “প্রিয় অমিতাভদাকে/ নাসের” তারপর তারিখ লিখে হাতে তুলে দেবে। কলকাতা, বহরমপুর ছাড়াও সারা পশ্চিমবং যখনই যার সাথে দেখা হয়েছে, সবাইকে ঠিক এভাবেই যত্ন আর সম্মানের সঙ্গে কিছু দিয়েছে ও। কতো হাজার বই-পত্রিকা সারা রাজ্য জুড়ে যে ছড়িয়ে থাকল এভাবে কতো বছর ধরে! কতো “নাসের” যে ছড়িয়ে থাকল!

যেদিন থেকে ও চাক্রিতে এসেছে, প্রতি সপ্তাহশেষের সন্ধ্যায় ও বহরমপুরের জন্য বেরিয়ে পড়ত। আর প্রতি সোমবার ভোরে কলকাতায় ফেরার ট্রেন ধরতে ও প্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকত বহরমপুর স্টেশনের পেপার স্ট্যান্ডে।

ট্রেনে বসে প্রথমেই বেশ কয়েকটা কাগজের শব্দছক একাগ্রভাবে সম্পূর্ণ করে, কোনো কবিতার বই বা পত্রিকার ঢাউস সব প্রুফ দেখতে শুরু করতো। কতো হাজার বই বা পত্রিকার প্রফ দেখা আর তা যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ যে করে গেছে ও সারাজীবন ধরে তার ইয়াত্তা নেই। এক শীতের সকালে লালচে চোখ আর কাশি নিয়ে ওর স্বাভাবিকের থেকে ভারী গলায় ডাকল আমাকে। পত্রিকা দিল ঘরে এসে। জানলাম আগের রাতে ট্রেন লেট ছিল। সাড়ে বারোটায় স্টেশ্নে নেমে ও আর বাড়ি যায়নি। বয়স হয়েছে মায়ের, রাত্র ঘুম থেকে উঠে এসে দরজা খুলতে যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়! স্তব্ধ হয়ে শুনেছিলাম। পড়ে জানলাম আগেও এরকম করেছে নাসের। সজহভাবে সম্পূর্ণ ফাঁকা স্টেশনে একটা খবরের কাগজ পেতে বসে সারারাত জেগে অন্যদের জন্য প্রুফ দেখে যায় তখন।

বছর পঁচিশ আগে এরকমই রাতের ট্রেনে বাড়ি ফিরছে নাসের। খুব শীত পড়েছে। বেথুয়াডহরীর পর কামরায় একা নাসের। নির্বিকার কাজ করে চলেছে ও। হঠাৎ খেয়াল হয় ওর সামনে তিনজন দাঁড়িয়ে ওকে তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ আর যা কিছু আছে দিয়ে দিতে বলছে। তারপর নাসেরর মাথা পিস্তলের বাট দিয়ে মেরে ফাটিয়ে রক্তস্নাত নাসেরকে কামরায় রেখে সবকিছু নিয়ে চলে যায়। রক্তমাখা শরীরে বহরমপুরে নামার পর চেনাজানা কয়েকজন হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। চারটে সেলাই পড়েছিল মাথায়। ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন ওঁরা। নাসের এড়িয়ে যায় এবং সারারাত স্টেশনের বাইরে এক বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে মাচায় বসে কাটায়। ওর মনে হয়েছিল স্টেশনের ভেতরে গেলে ওকে হয়তো জোর করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে।

সবখানেই ওর উপস্থিতি ছিল অনুচ্চকিত এবং মধুর। নিচু মুখে আত্মমগ্ন হয়ে বসে থাকত খুব উচ্ছ্বাসপূর্ণ চায়ের দোকানের আড্ডায় বা অন্য কবিতাকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানে। নিজেকে নিয়ে, নিজের লেখা নিয়ে একটা শব্দও কখনো মুখ ফসকে বলেনি নাসের। সারা জীবনে একবারের জন্যও কোনো নেশার জিনিস হাতে নেয়নি। কোনো মদের আড্ডায় কেউ লাগাম হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পরিচর্যা করার দায়িত্ব ছিল ওর। ন্যূনতম কোনো বিরক্তির আভাস জীবনে কখনো কেউ দেখতে পায়নি ওর মুখে।

সময় নাসেরকে হারাতে পারেনি কখনো। সময় যেন গতিহীন হয়ে যেত ওর সামনে এসে। কোনো তাড়া ছিল না ওর। বেলা বারোটায় খুব শান্তভাবে আমার বাড়ি থেকে চলে যেত তিন কিলোমিটার দূরে অন্য কোনো বন্ধুর কাছে। সেখান থেকে দু’কিলোমিটার দূরে আরেক বন্ধু অপেক্ষা করছে ওর জন্য। নাসের যাবে তার কাছেও। রাত দুটোর সময় ফোন করলে, যদি ধরতে একটুও দেরি হয়, নাসের অপরাধীর মতো মার্জনা চাইবে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য।

ঈশ্বর কি পারতেন এরকম? মনে হয় না। এই সুদূরতা, এই উচ্চতাকে ঈশ্বরও দেখতেন ঘাড় উঁচু করে- যেভাবে পাহাড়ের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে তার উঁচু চূড়ার দিকে তাকিয়ে থাকি আমরা।

বিদায় আমাদের সান্তাক্লস! আমরা বোধহয় বড়ো হয়ে গেলাম।     

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

সুমন ঘোষ

গু চ্ছ  ক বি তা

সু ম ন   ঘো ষ

রেখা

লাফিয়ে নেমেছি করতলে!
রেখা থেকে আরেক রেখায়
যেতে-যেতে খড় গোঁজা শীতল শালিখ
রাধামাধবের অশ্রু, বাতাসা-নির্ভর দুটি প্রাণ

 

যেতে-যেতে ধুলোর স্বভাব
মাটিতে নামানো শিরস্ত্রাণ

 

ছদ্মবেশী প্রতারক টানা চুপিসারে
রয়েছে সে,
দেখি বারেবারে—
সে কখন খুন করবে অথবা সে আবার উধাও
ধরা সে দেবে না জানি, তাও
ধাওয়া করব পিছু-পিছু—
বুনো-আল, করতল থেকে করতলে

 

রেখাবাষ্প বিপর্যয় অহরহ উপেক্ষা-অঞ্চলে!

pujo_16_sketch2

শাঁস

পথে যে গোচর নয়,
সেই ক্রিয়া অবসাদে গত

 

অকস্মাৎ জেগে ওঠা চক্রাকারে, শীর্ণ তৃণদলে
মাংসাশী প্রাণীর ঠোঁটে স্মৃতিহীন পবনে উদ্যত

 

কী হঠাৎ বাড়িঘর, বাক্যহারা কী হঠাৎ শাঁস

 

তরলের সেতু ধরে হেঁটে-হেঁটে পিপাসা উদ্ধার

 

পথে-পথে সাধনামঙ্গল
আর যত অপতিত আলোকণা, দু’জনের জানালা প্রয়াস!

pujo_16_sketch2

কুঁড়ি

বাসনার বাতি জ্বলে। নিভন্ত সংসারে
ত্রস্ত ছাই জ্বলে ওঠে মধুপে-মধুপে

 

এত যে হরিণী হও শিকারিনী হও একা-একা
না-বলে যে চলে গেছে
আজও সেই অসফল রূপে প্রাণ পাও
নিপীত কুশিতে পড়ে থাকো একাগ্র অঙ্গুরি

 

যদি কেউ ছুঁয়ে দেখে গাঢ় মেঘ, বৃন্তচ্যুত কুঁড়ি!

pujo_16_sketch2

ললাট

অচল আধুলি নিয়ে থাকা।
বাণিজ্যে দুরাশা পাই— ঘুরে মরি দরজায়-দরজায়

 

সারাদিন হতাশা অলংকার।
সুধাবৃন্দ সারাদিন কেবল বিহ্বল করে রাখে

 

সূর্যাবস্থা পার হয় একা যে ফকির—
চোখে-মুখে ঘুমন্ত সংসার
তাকে কেন স্থির দাও, বলো হে বিদ্রুপ
তাকে কেন দাও অবশেষ

 

ঝনাৎ ঝনাৎ করে সমস্ত শরীর—
মিলনের আগে অচল আধুলিগুলি
ঝরে যায় পতঙ্গ-গহ্বরে!

pujo_16_sketch2

ছায়াপত্র

অনঘ সে হাসি আবিষ্কার!
তোলপাড়, তোলপাড় চঞ্চু, বক্র সিঁড়ি, বোঁটা
অর্ধেক গোপন ইচ্ছে— আজন্ম লালিত

 

বর্ষা দিয়ে হেঁটে গেলে তুমি
নীচু মুখ, চকিত ও স্মিত

 

মৃতকল্পে ঝড় ওঠে খাঁ-খাঁ ঝড় শূন্যতা শোভিত

 

তাতে যে হরণ হবে ঝরোঝরো ধাবিত গ্রহণে
সেটুকু হরণ আজ দূরে বনে-বনে
অধিক উজ্জ্বল হয় নির্বিকল্প পুড়ে যেতে-যেতে
ছায়াপত্রে লেখা জল, স্বপ্নাদ্য সংকেতে!

pujo_16_sketch2

অধর

সংকেত কুড়িয়ে পাই আশ্চর্য অধরে তার, নাব্য বসতিতে।
দুর্গম সম্বন্ধ যত ঠোঙাভর্তি আলোর আঙুল
কুড়িয়ে-কুড়িয়ে রাখি, যদি তুমি ডাক দাও ফের

 

যদি তুমি ভবিতব্য পার হয়ে চলে আসো কাছে
হাতে বাটি পায়েসান্ন গোবিন্দভোগের
কিঞ্চিৎ শুনশান দেহ। ভাঙা চুড়ি। ভাঙা-ভাঙা ভয়।

 

ধুকপুক ধুকপুক করে অলিন্দ-নিলয়

 

যদি কেউ দেখে ফেলে, গিঁট বাঁধে কেউ যদি অহেতুক ত্রাসে
নিজেকে টাঙিয়ে রাখি আহত পলাশে
ললাটে অতল শোক, সেই মর্মে রয়ে যেতে চায়—

 

যে তোমায় খুব ভালবাসে!

দোকান

শ্বাসের দোকানে উঁকি, গ্রিল ধরে ঝোলা!
বেঁকেছে যে রঙিন ক্রন্দন দু’হাতের ভূমিকায়
তাকে কেন আরও কাছে টানো!

 

ছল-চাতুরিতে কেন বনের কাজল ধরে ডাক
মৃৎপাত্রে প্রসিদ্ধ মূর্তি ধীরে-ধীরে উড়ন্ত কাঁসর
আকাশে আরতি হবে—

 

মনস্তাপে, কুমারসম্ভবে

 

স্নানাতুরা রমনীর উদার বন্ধনী মনে হবে শ্বাসের মলাট
পাতা উল্টে ধরা পড়বে ছোট কমা, সমাহিত খাট
ব্যাকুল শরমধ্বনি শিথিল লবণ

 

ঘুরে মরবে পবনপল্লবে

 

দাঁড়িপাল্লা কেঁপে উঠবে অশনি-সফল কোনও নভে!

pujo_16_sketch2

সংসার

শিরোনামে শেষ হলে কাগজের কৃশ কৃতাঞ্জলি
দুপাশে বধির মাত্রা শিথিল উৎসুক

 

কেউ নেই কোনওখানে,
অস্বীকার পার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুধু সে-ই
তোমার বিনিদ্র মুখ
গাছের গার্হস্থ্য, কিছু ঝর্ণা-সঞ্চালন

 

ঊর্ধ্বমুখে পিছুডাক, অতর্কিতে উড়েছে জোনাকি
ঝলমল ঝলমল করছে ক্ষুধা—
সেই নিয়ে অবিচল বেঁচেবর্তে থাকি!

pic333

ছাপ

সংসার হয়নি। চিন্তাহরণের কালে
স্বভাব নীরব হয়ে কপালে উঠেছে।

 

সামর্থ্যে জোটেনি সে তো, অসামর্থ্যে তার আগমন
পুরনো জোনাকি খুলে দেখি দিনক্ষণ
কতদিন আসা-যাওয়া, খসে-খসে পড়া বারেবারে
পুকুরে অসুখ রাখি, রাখি প্রান্ত, মেঘের গর্জন

 

সলিলে পায়ের ছাপ
দিন গোনা পুকুরের চূড়ায়-চূড়ায়

 

নীবিবন্ধে সন্ধ্যাভাষা কোনওদিন ফুরাবে না তবু
খালি বলে,
শেষ হয়ে গেছি আমি একেবারে শেষ

 

অসম্ভব প্রেমের বয়েস!

pujo_16_sketch2

মন

অশান্ত তোমার মন—
শরীরে‌ পদ্মের ডাক, সেই পদ্মে ঠাঁই
বাহিরে দর্পণ জ্বলে শোণিতের অববাহিকায়
ঝাঁক-ঝাঁক পাখির বসত

 

অলস-লতার জল!
খুঁটিনাটি আগমন, শাখায়-শাখায় দোলে ভাঙা মনোরথ
ঠোঁটে ওষ্ঠ, ওষ্ঠে দীঘি ঘনিয়েছে দায়ে-অনাদায়ে
শরীরে পদ্মের ডাক—

 

শ্রীচুম্বন রেখে যাই পায়ে!

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

শংকর চক্রবর্তী

বি শে ষ  র চ না

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি 

পর্ব ৫

বিদ্বিষ্ট কবি

১৯৭৫ সালের কথা। আমি তখন শিলং থেকে চাকরির একটা বিশেষ ট্রেনিং-এর জন্য পাটনা গিয়েছিলাম। প্রায় বছরখানেকের জন্য। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে হোস্টেলেই থাকতাম। এর আগে আমার পত্রিকা ‘শতাব্দী’-র বেশ কয়েকটি সংখ্যা শিলং থেকে বেরিয়েছে। তো পাটনায় পৌঁছেই পত্রিকাটির ২৫শে বৈশাখের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অথচ শহরের কাউকেই চিনি না। প্রতিদিন ট্রেনিং ক্লাসের পর একা একা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখতে থাকি। আমি এটুকু জানতাম যে সমীর রায়চৌধুরী চাইবাসায় থাকলেও পাটনাতেও তাঁদের বাড়ি আছে। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক জুতোর দোকানে ঢুকে পড়ি চপ্পল কেনার জন্য। কেননা অফিস বা ট্রেনিং সেন্টারে জুতো ছাড়া গতি নেই। কিন্তু এই গ্রীষ্মে ঘোরাঘুরির জন্য আরামদায়ক এই বস্তুটির প্রয়োজন খুব। সেদিন জুতোর দোকানের মালিক দাম নেবার সময় আমার উন্নতমানের হিন্দি উচ্চারণে মুগ্ধ হয়ে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এই শহরে নতুন?’ আমি তৎক্ষণাৎ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেই বাংলা সহযোগে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছোবার চেষ্টা করি। পরবর্তী সময়ে এই বিরল কেশের বাঙালি ভদ্রলোককে ‘পালদা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তাঁর কাছে সেদিন সমীর রায়চৌধুরীর ঠিকানা জানতে চাইলে সামান্য দূরের একটি অ্যাকোয়ারিয়ামের দোকানের খোঁজ দিয়েছিলেন। যেখানে নাকি প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে। পরের দিনই ওই দোকান খুঁজে পৌঁছে যাই আমি। কবিতা লিখি জানতে পেরে ওই দোকানের মালিক রঞ্জুদা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেদিন থেকে প্রতি সন্ধ্যায় ওখানে বসার জন্য আমিও একটা স্থায়ী চেয়ার পেয়ে গেলাম। একদিন সমীরদা এলেন। চাইবাসায় তখন সমীরদার বাড়িতে শক্তি-সুনীলের নিত্য যাতায়াত। সে এক অন্য কাহিনি। তো সমীরদার কাছে আমার পত্রিকা ‘শতাব্দী’-র একটি ‘২৫শে বৈশাখ সংখ্যা’ বের করার ইচ্ছে প্রকাশ করলাম। সমীরদা উত্তেজিত। লেখা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গেল।

একদিন বিখ্যাত হিন্দি উপন্যাস ‘ময়লা আঁচল’-এর লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণুর বাড়ি গেলাম সমীরদার সঙ্গে। বাসু চ্যাটার্জির পরিচালনায় তাঁর কাহিনির চিত্ররূপে তৈরি ‘তিসরী কসম’ তখন বেশ কিছু পুরস্কার সংগ্রহ করে নিয়েছে। সেই সন্ধ্যায় নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা জমে উঠেছিল আমাদের। পরে সমীরদা চাইবাসা ফিরে গেলেও আমি প্রায় নিয়মিত তাঁর বাড়ি যেতাম। পূর্ণিয়ায় তাঁর ছেলেবেলা কেটেছিল। তিনি বাংলা ভালোই জানতেন। কিন্তু বাংলায় লেখেননি কোনোদিন। অনেক অনুরোধের পর তিনি আমার কাগজে বাংলায় একটি গদ্য লিখতে রাজি হলেন। তার কিছুদিন আগে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন, ফলে তাঁর লেখায় প্রাধান্য পেল সুনীল-শক্তি-সন্দীপন-পূর্ণেন্দু-শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়দের সঙ্গে সুদীর্ঘ আড্ডার এক বিবরণী। তাঁর সঙ্গে গিয়ে পরিচিত হলাম ‘কটকী কবিতা’ আন্দোলনের পুরোধা হংসরাজ তিওয়ারীর সঙ্গে। ওই আন্দোলন বিষয়ক একটি সাক্ষাৎকারও নিলাম তাঁর। ঠিক তখনই দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়েছে। জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ফণীশ্বরনাথ রেণু গ্রেপ্তারি এড়াতে আত্মগোপন করলেন। তাঁর বাড়ি যাই, বৌদির সঙ্গে কথা হয়, কিন্তু তাঁর সন্ধান আর পাইনি। নানা অসুবিধার মধ্যেও ফণীশ্বরনাথ রেণুর গদ্যসমেত পত্রিকার ওই বিশেষ সংখ্যা ২৫শে বৈশাখের দিন সকালে বের করলাম। মনে আছে বিকেলে পাটনার রবীন্দ্র ভবনে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছিল। পত্রিকা হাতে নিয়ে কলকাতার রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণের ভোরের মতন সেখানেও উপস্থিত ওই বিশিষ্ট বাঙালি সমাজের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেছে আমার সঙ্গে আসা অবাঙালি সহকর্মীরাও। কিন্তু ট্যাবলয়েড পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ফণীশ্বরনাথ রেণুর নাম ও লেখা দেখে জরুরি অবস্থার আতঙ্কে দূরে দূরে সরে থাকলেন সেখানকার অধিকাংশ বাঙালি দর্শক।

যাই হোক, এক সহৃদয় ব্যক্তির সঙ্গে পরের দিনই বেশিরভাগ কপি কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বন্ধুদের কাছে। তারা কিছু স্টলে বিক্রির জন্য রেখে বাকিগুলো বিভিন্নজনের কাছে পৌঁছে দেয়। তখন মাসিক কৃত্তিবাস বেরোচ্ছে অক্রুর দত্ত লেন থেকে। সুনীলদা পত্রিকাটি পেয়েই চিঠি লিখলেন-

index
index2

এর কিছুদিন পরেই ফণীশ্বরনাথ রেণু প্রয়াত হলেন। আমি তখন আবার শিলং ফিরে গিয়েছি। সুনীলদা রেণুজীকে স্মরণ করে আমাকে কৃত্তিবাস-এ একটি গদ্য লিখতে বললেন। সেটি বেরোবার দু’এক সংখ্যা পর ফণীশ্বরনাথ রেণুকে নিয়ে কৃত্তিবাসের একটি বিশেষ সংখ্যা বের করার পরিকল্পনা হয়। অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় সমীর রায়চৌধুরীকে। সমীরদা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টেলিগ্রাম পাঠালেন শিলঙে। রেণুজীর বাংলা লেখার পাণ্ডুলিপি, চিঠি, যা কিছু আমার কাছে আছে সব নিয়ে দ্রুত কলকাতায় যেতে বলেছিলেন সম্পাদনার কাজে সহায়তার জন্য।

তখনই পরপর দুটো বঞ্চনার গল্প জমে উঠল আমার জীবনে। মাসিক কৃত্তিবাসের সেই সংখ্যাটি প্রকাশের ব্যাপারে কলকাতায় দপ্তরে বসে আমার সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছিলাম সমীরদাকে। সংখ্যাটি বেরোয়। এবং প্রায় সেরকম সময়েই ‘অমৃত’ পত্রিকা, তখন সম্পাদক ছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘শতাব্দী’তে প্রকাশিত ফণীশ্বরনাথ রেণুর বাংলা লেখাটি হুবহু ছেপে দেয়। কোথাও কোনো পুনর্মুদ্রণের কথা উল্লেখও ছিল না। একটি ছোটো পত্রিকার যাবতীয় পরিশ্রমের ফসলটুকু কীভাবে যে একটি বড়ো পত্রিকা অনায়াসে তুলে নেয়- সেই অভিজ্ঞতাও আমার প্রথম নয়।

‘কৃত্তিবাস’-এর ৫০ বছর উপলক্ষে যে উৎসব হয়েছিল, তাতে একদিন শিশির মঞ্চে কবিতা পড়লাম অনেকের সঙ্গে। যদিও অপ্রাসঙ্গিক, তবুও জানিয়ে রাখি, মঞ্চে সেদিন আমার সঙ্গে কবিতা পড়েছিলেন সদ্য প্রয়াত কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যাই হোক, কবিতা পড়ার পর নিচে নেমে ৫০ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত ‘কৃত্তিবাস’-এর একটি স্যুভেনির নজরে পড়ল। তাতে অনেকের লেখার সঙ্গে সমীর রায়চৌধুরীরও একটি লেখা ছিল। তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’-এর ‘ফণীশ্বরনাথ রেণু সংখ্যা’টি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। এবং বলা বাহুল্য, সেখানে আমার নামের কোনো উল্লেখ নেই। ফণীশ্বরনাথ রেণু সম্পর্কিত আমার যাবতীয় ব্যক্তিগত সংগ্রহের জিনিস কিছুই দপ্তর থেকে খুঁজে পাইনি পরে। সামান্য মনখারাপ হলেও আমি সমীরদার উপর রাগ করতে পারিনি। কেননা সমীরদা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমিও সমীরদাকে। কিছুদিন পরেই এক ঘরোয়া আড্ডায় সমীরদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ওই লেখায় আমার নামটি উল্লেখ না-করার প্রকৃত কারণ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় জিভ কেটে চমকে উঠে বলেছিলেন, ‘সে কী! তোমার কথা লিখিনি? তুমি না থাকলে তো ওই সংখ্যা বের করতে অসুবিধা হত খুব। আমার এমন ভুল কীভাবে হল বুঝতে পারছি না। আমায় ক্ষমা করে দিও তুমি।’

সমীরদার এ কথা শুনে আমিও লজ্জা পেলাম। আর আমি তো সত্যি কথা বলতে, ক্ষমা ছাড়া কিছুই করতে পারিনি। এখনও কতজনকে যে মনে মনে ক্ষমা করে যেতে হচ্ছে!

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

ভিনদেশে । পর্ব ৬

ভি ন দে শে । পর্ব ৬

সম্প্রতি ‘ইতিকথা পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি অসাধারণ দু’ ফর্মার ভ্রমণ বিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘ভিনদেশে’। একাধিক বিদেশ ভ্রমণের টুকরো অভিজ্ঞতার  কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। এখানে প্রতি পর্বে  আমরা জানব তাঁর তেমনই আরও কিছু দারুণ অভিজ্ঞতার কথা।

ঈ শি তা  ভা দু ড়ী

গ্রীনিচ নামের ভিলেজ

বিদেশে মানুষের খুবই ভ্রমণের শখ। গ্রীষ্মে প্রত্যেক সপ্তাহের শেষেই গাড়ি করে গাড়ির পেছনে গোটাকতক সাইকেল একত্র করে তারা অবসর কাটাতে যায় সমুদ্রের ধারে বা অন্য কোথাও। লন্ডনের আশপাশে টেমস নদীর ধারে অনেক ‘ভিলেজ’ রয়েছে। ভিলেজ বলতে আমাদের দেশে যা বুঝি আমরা, লন্ডনে ভিলেজগুলি অবশ্য আক্ষরিক অর্থে সেরকম গাঁ নয়। তা সেই অনেক ভিলেজের মধ্যে গ্রীনিচ, হ্যাম্পটন কোর্ট, রিচমন্ড ইত্যাদি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজের ঘাট থেকে এইসব ভিলেজগুলির লঞ্চ ছাড়ে। আমরা সেই লঞ্চে করেই গ্রীনিচে গিয়েছিলাম প্রথমবার। সেন্ট্রাল লন্ডনের পুবদিকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে গ্রীনিচ লন্ডনের ভিলেজগুলির মধ্যে অন্যতম। আমরা রিটার্ন টিকিট কেটেছিলাম, তাতে সস্তা হয়, ফেরিতে যাওয়া এবং আসা। কিন্তু সস্তার বিষয়ে না ভেবে প্রত্যেক পর্যটকেরই উচিত যাওয়া-আসার যে কোনও একটি ফেরিতে এবং অন্যটি ১২১৭ ফুট লম্বা ফুটটানেলে হেঁটে ‘আইল গার্ডেন’-এ এসে ডকল্যান্ড রেলে করে লন্ডনে ফেরা। টানেলটি আইল গার্ডেনের দিকে ৪৪ ফুট গভীর এবং গ্রীনিচের দিকে ৫০ ফুট। আমরা যদিও লঞ্চে ফিরেছিলাম, কিন্তু এই পথটি হেঁটে অভিজ্ঞতা জড়ো করেও নিয়েছিলাম। এছাড়া ‘ব্যাঙ্ক’ স্টেশন থেকে ডকরেলে ‘কাস্টম হাউস’ স্টেশনে নেমে ব্রিটিশ রেলে চড়ে ‘নর্থ উলউইচ’ স্টেশনে নেমে ফুটটানেল দিয়ে হেঁটে ‘উলউইচ আর্সেনাল’ স্টেশনে পৌঁছে  সেখান থেকে বাসে করেও গ্রীনিচে যাওয়া যায়। 

আমরা দ্বিতীয়বার এইভাবেই গিয়েছিলাম। যেহেতু সঙ্গে ট্রাভেল কার্ড, তাই যে কোনও যানেই যখন খুশি ওঠা-নামা করতে কোনও অসুবিধে নেই। উপরন্তু সবরকম অভিজ্ঞতা। বিশেষত ফুটটানেলগুলির বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। এই টানেলগুলি টেমস্ নদীর নিচে। এরকম বেশ কিছু টানেল রয়েছে লন্ডনে, কোনওটি পায়ে হাঁটার জন্য, কোনওটি গাড়ি চলাচলের জন্য। এই ফুটটানেলগুলি রাস্তার লেভেল থেকে অনেক নিচে থাকে, লিফটে করে নামতে হয়। টানেলের পথগুলি মোটামুটিভাবে বেশ নির্জন থাকে, তার জন্য অন্য ব্যবস্থা করে রাখা আছে যাতে নিরাপত্তার অভাব না হয়। লিফটের ভেতর ক্লোজ-সার্কিট টিভি থাকে, যাতে লিফটে বসেই লিফটম্যান টানেল পথের খুঁটিনাটি ব্যাপার দেখতে পায়। এছাড়াও টানেলের দু’পাশের দেওয়ালে আয়না লাগানো থাকে, যাতে চলতে-চলতে পেছনের মানুষজনও দেখা যায়। এইসব টানেলে সাদা মানুষ গান গেয়ে ভিক্ষা চায়, অবশ্য তাদের দেখে আমাদের দেশের ভিখারিদের সঙ্গে কোনও মিল পাওয়া যাবে না। তারা অত্যন্ত দামী-দামী যন্ত্রাদি নিয়ে গান করে। তাদের পরনের জামাকাপড়ও আমাদের দেশের ভিখারিদের চেয়ে অনেক ভাল। সেদেশে মুচিরাও খুবই ভাল পোশাক পরে বড় হোটেলের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে জুতো পালিশের জন্যে। তাদের পাশে আমাদের দেশের মুচির ছবি অত্যন্ত বেমানান।

যাই হোক যা বলছিলাম, নর্থ উলউইচ ও উলউইচ আর্সেনাল মধ্যবর্তী ফুটটানেলটি ১৬৬৫ ফুট লম্বা, উত্তরদিকে ৬৪ ফুট গভীর, দক্ষিণে ৫১ ফুট। জোয়ার ভাটায় টানেলের ওঠা-নামা হয়। এই টানেলটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়, সাতাশি হাজার পাউন্ড খরচ হয়েছিল। এইসব বিশদ বিবরণ লিফটের সামনের দেওয়াল থেকে মন দিয়ে পড়ছিলাম যখন, লিফটম্যান মুখে যথেষ্ট গাম্ভীর্য বজায় রেখে প্রশ্ন করল- আপনি কি টানেলটি কিনবেন? এমন প্রশ্নে প্রথমে থমকে গেলেও পরে রসিকতা বুঝে হ্যা-হ্যা করে হাসলাম আমরা। ব্রিটিশদের ঠোট ফাঁক না করে গম্ভীরভাবে রসিকতার কথা কে না জানে!

সে যাই হোক, গ্রীনিচ খুবই সুন্দর এবং ছোট্ট একটি জায়গা, রাস্তা এবং ছোট-ছোট দোকানগুলি খুবই ঘরোয়া ধরনের। গ্রীনিচের ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়। রাজা অষ্টম হেনরি, রানি মেরী এবং রানি এলিজাবেথ (প্রথম) এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, এইসব ইতিহাস ন্যাশনাল মারিটাইম মিউজিয়ামে নির্মিত রয়েছে। এই মিউজিয়ামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, স্যার ক্রিস্টোফার রেন-এর নকশায় ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত, এখানে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ইতিহাসও প্রদর্শিত রয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন পালতোলা নৌকা, জাহাজের মডেল, বিভিন্ন পদক, চিত্রাদি রয়েছে। এই মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য সাড়ে তিন পাউন্ড, কিন্তু ইয়ুথ হস্টেলের সভ্যকার্ড থাকলে আরও কম। বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে গ্রীনিচ পার্কটি মূলত রাজাদের শিকারের মাঠ ছিল। এখন সেখানে বসে মানুষ রোদ পোহায়, বাচ্চারা খেলে, তাদের খেলার বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা রয়েছে। নানারকম সুন্দর-সুন্দর ফুলের গাছ, আর ঘাস তো নয় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো পার্ক। পার্কের সামনেই রয়্যাল ন্যাভাল কলেজ, ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি, এখানে খুবই চিত্রিত একটি হল এবং সুন্দর চ্যাপেল রয়েছে যেখানে মাঝেমধ্যেই গান-বাজনা হয়। জাহাজ-ঘাটায় দু’টি ঐতিহাসিক জাহাজ ভ্ৰমণার্থীদের দর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুট্টি সার্ক- ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পূর্বদেশের সঙ্গে চায়ের বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়, তিন পাউন্ড দক্ষিণার বিনিময়ে দেখা যায় জাহাজটির খুঁটিনাটি। অন্য জাহাজটি জিপসি মথ (চতুর্থ)— স্যার ফ্রান্সিস চিচেস্টার ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিজে হাতে চালিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরেছিলেন, এই জাহাজটিতেও স্বল্প কিছু প্রবেশ মূল্য রয়েছে। কুইনস্ হাউস (রানির বাড়ি)-এর স্থাপত্যটি দেখার মতো— ইংল্যান্ডের প্রথম প্যালাডিয়ান রীতিতে তৈরি। গ্রীনিচ বলতেই যেটি সর্বপ্রথম মনে আসে সেটি হল ওল্ড রয়্যাল অবজার্ভেটরি, টিলার ওপর উজ্জ্বল বাড়িটি ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, নকশা সেই স্যার ক্রিস্টোফার রেন-এরই। এই অবজার্ভেটরির ভেতর দিয়ে যে মধ্যরেখাটি গেছে, তাকেই ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূলমধ্যরেখা ধার্য করা হয়েছে অর্থাৎ জিরো ডিগ্রি। এই মধ্যরেখা থেকে অন্য যে কোনও স্থানের মধ্যরেখার কৌণিক দূরত্ব পরিমাপ করা হয়। এর সাহায্যে স্থানীয় সময় অর্থাৎ গ্রীনিচ মিন টাইম (জি.এম.টি) নির্ণয় করা হয়। এখানে প্রবেশ মূল্য চার পাউন্ড। গ্রীনিচে সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসা যায়, আমরা দু-দু’বারই সেরকমই করেছি, তবে ইচ্ছে করলে দু-চারদিন থাকাও যায়, ভালই লাগবে, ইয়ুথ হস্টেলও রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

মধুসূদন রায়

ছো ট  গ ল্প

ম ধু সূ দ ন   রা য়

বন্ধু

এবারের ছুটিটা ভালোই কাটল অম্বরীশদের। স্ত্রী রিমি বলেছিল—  “এবার কাছাকাছি কোনও আদিবাসী গ্রামে চলো। আমার বান্ধবী রমিতা গতবছর যেখানে গিয়েছিল ওই বাংলোটা খুব ভালো। পাশেই আদিবাসী গ্রাম। ওকে বলে বুকিং করে রাখি?” অম্বরীশ বাধা দেয়নি। দূরে যাওয়ার খরচ‌ও বেশি। আট মাস হল চার চাকা কিনেছে। গাড়ির ইএমআই— এর খরচ ছাড়াও বেশ কিছু টাকা খরচ হয় গ্রামের বাড়ির জন্য। মামা— মামীর কাছে মানুষ হ‌ওয়া অম্বরীশ রিমিকে লুকিয়ে বেশ কিছু টাকা পাঠায় ওদের। রিমি হয়তো বাধা দেবে না। তবু ও জানাতে চায় না।

বাংলোটা সত্যিই ভালো। তিনদিন অসাধারণ কাটল ওদের। লোকাল একটি ছেলের সৌজন্যে নিকটবর্তী জঙ্গলে হাতিও দেখতে পেয়েছে। হাড়িয়া খেয়ে আদিবাসী নাচেও মজে গেছে। রিমি খুব খুশি, অম্বরীশ‌ও। ফেরার পথে মন কেমন করছিল অম্বরীশের। তিনটে দিন কীভাবে যে দ্রুত কেটে গেল। লাঞ্চটা সেরেছে আজ রাস্তার পাশের এক ধাবায়। খুব‌ই সাদামাটা খাবার। অম্বরীশ ভাবছিল রিমি হয়তো রাগ করবে। না, রিমি রাগ করল না বরং রমিতাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানালো।

গাড়ি ছুটে চলেছে সাঁই সাঁই করে। রোদ পড়ে আসছে। ওদের বাড়ি ঢোকার আগে মোড়টার মুখে নতুন বাজার বসছে, অম্বরীশ গাড়ি থামিয়ে বলল—  “চলো ডাব খাই।” বাজারটা ছোটো হলেও মোটামুটি সব‌ই পাওয়া যায়। কিন্তু ডাব পাওয়া গেল না। রিমি আঙুল তুলে দেখাল দূরে একটা সবজীর দোকানে কয়েকটা ডাব রয়েছে। অম্বরীশ সেদিকে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল। সবজী বিক্রেতা জয়ন্ত না ? স্কুলে একসঙ্গে পড়ত ওরা। উচ্চ মাধ্যমিকের পর কে কোথায় ছিটকে গেল! কী অসাধারণ সব কবিতা লিখত জয়ন্ত। দেখতে হ্যান্ডসাম না হলেও স্কুলে মেয়েরা ওর কবিতার জন্য‌ই ওকে আলাদা চোখে দেখত। অম্বরীশের রাগ হত খুব। বিশেষত সঞ্চিতা, ওকে পাত্তা না দিয়ে জয়ন্তর পাশে ঘুরঘুর করত। তবে আর যাই হোক জয়ন্ত কবিতা লিখত দারুণ। ওর দেখাদেখি অম্বরীশ‌ও কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিল, জয়ন্ত দু’একটা কবিতা চেক‌ও করে দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো সঞ্চিতা পড়ে বলেছিল জয়ন্তর মতো নয়। সেই জয়ন্ত এখন সবজী বেচে! ওদের ব্যাচের মোটামুটি সবাই কমবেশি সরকারি চাকরি নয়তো বড়সড় ব্যবসা করে। জয়ন্তকে এই অবস্থায় দেখেই ও নিজেকে যেন গুটিয়ে নিল।

অম্বরীশ গাড়ির ভিতরে এসে বসল। রিমি বলল—  “বসো তুমি, আমি আনছি।” অম্বরীশ একবার ভাবল সামনে গিয়ে কথা বলবে, তারপর‌ই ভাবল রিমি যদি জানতে পারে ওরা একসময় বন্ধু ছিল, কী যে ভাববে ! এত বড় চাকুরিজীবীর বন্ধু কিনা সবজী বেচে!  রিমি এমনিতেই কবিতা-টবিতা পছন্দ করে না। তাছাড়া কথা বলতে গিয়ে যদি জানতে পারে অম্বরীশ এখন সরকারি বড় চাকুরে, কিছু হয়তো চেয়ে বসবে, চাকরি করিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ‌ও দিতে পারে।

রাতে খেতে বসে রিমি বলল—  “তোমাকে আর কাল থেকে সকালে সবজী কিনতে তেমাথার মোড়ে যেতে হবে না। আমি ডাব কিনতে গিয়ে ওই নতুন বাজারের সবজীওয়ালার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি, ও সকালে বাড়িতে সবজী দিয়ে যাবে। ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি।”
— “একদিকে ঠিক‌ই করেছ, অফিস যাওয়ার আগে সকালে ওসবের হ্যাপা না রাখাই ভালো। কিন্তু মাছ— মাংসের জন্য, গ্রোসারির জন্য সেই তো বাজার যেতে হবে।”
— “কাল সকালে ও এলে আমি কথা বলে নেব, লোকটার কথা শুনে মনে হল ওকে বললে কথা শুনবে।”
অম্বরীশ চমকে উঠল। সত্যিই জয়ন্তকে কিছু বললেই কথা শুনত। সেবার সঞ্চিতার জন্মদিনে জয়ন্তকে দিয়ে প্রেমের কবিতা লিখিয়েছিল, টাকা দিতে চেয়েছিল অম্বরীশ, যদিও জয়ন্ত নেয়নি কিছুতেই। সঞ্চিতা কবিতাটা পড়ে বলেছিল, জয়ন্তর লেখা পুরো, টুকে দিয়েছিস মনে হচ্ছে!

সারারাত জয়ন্তর কথা মনে পড়েছে। কাল কি একবার ফেরার সময় কথা বলবে?  দরকার নেই, রিমি তো সবজী ওর থেকেই কিনছে, এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেছে সেদিন।  

পরদিন অফিসে কাজের চাপে সব ভুলে গেছে অম্বরীশ। ফেরার পথে এসে দাঁড়িয়েছে জয়ন্তর দোকানের ঠিক পাশের চায়ের দোকানে। না, এক‌ই আছে জয়ন্ত, সেই ইনোসেন্ট লুক, মুচকি মুচকি হাসি। তবে ওকে চিনতে পারেনি। অম্বরীশ অবশ্য আগের থেকে কিছুটা মোটা হয়েছে। চোখে চশমা। মনে মনে খুশিই হল ও, যাক চিনতে পারেনি বেচারা।

সপ্তাহখানেক হলো রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না অম্বরীশের। চোখ বুজলেই জয়ন্তর দুটো চোখ যেন ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, সঞ্চিতার প্রতি আলাদা একটা অনুভব ছিল অম্বরীশের, বিভিন্নভাবে বোঝাতেও চেয়েছে, সঞ্চিতা একদম‌ই পাত্তা দেয়নি সেসবে। উল্টে জয়ন্তর সঙ্গে মেলামেশা করেছে নিবিড়ভাবে। এই কারণেই কি জয়ন্তর উপর প্রতিহিংসা গড়ে উঠেছে মনে মনে ?

একদিন পুরনো বন্ধু সুমনকে ফোন করে জয়ন্তর খবর জানতে চায় অম্বরীশ। সুমন বলে, জয়ন্ত তো বাংলায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিল কলেজে, কিন্তু ওর বাবা মারা যাওয়ায় পড়াটা চালাতে পারেনি। কোথায় একটা চালকলে কাজ করত শুনেছিলাম।  তারপর আর জানি না। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে আমাদের বন্ধু অনির্বাণ দেখি জয়ন্তর নতুন ব‌ইয়ের ছবি পোস্ট করেছে। এটুকুই।

সকাল থেকেই চরম ব্যস্ত রিমি। আজ অম্বরীশের জন্মদিন। রিমি অনেকবার আবদার করেছিল অম্বরীশকে অফিসে না যাওয়ার জন্য, কিন্তু জরুরি মিটিং— এর কারণে ওকে যেতেই হবে।  রিমির মোবাইলে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন করছে আত্মীয়রা, ওদিকে রান্নার ব্যস্ততা, নাজেহাল অবস্থা। অম্বরীশের ভালো লাগছে খুব, রিমি ওর পছন্দের অনেকগুলো পদ রান্না করছে। ও কথা দিয়েছে রিমিকে, দুপুরে বাড়ি ফিরে লাঞ্চ করবে।

অফিস থেকে ফিরতে বেশ কিছুটা দেরি হয়েছে অম্বরীশের।  ফ্রেশ হয়ে যখন খেতে বসল, রিমি বলল—  “একটা খারাপ খবর আছে, কাল থেকে সকালে সবজী আনতে বাজার যেতে হবে তোমাকে। মোড়ে যে বাজার বসত ওখান থেকে বাজার তুলে দিচ্ছে।”
— “সে কী, কেন?”
— “রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ চলছে যে। জয়ন্ত আর ওর বৌ সঞ্চিতা দেখা করতে এসেছিল আমার সঙ্গে, বলে গেল দোকান আর থাকছে না, ওরা গ্রামের বাড়ি ফিরে গেল। তবে না খাইয়ে ছাড়িনি ওদের, প্রথমের দিকটায় খেতে চাইছিল না, তোমার জন্মদিন বলায় তবে খেলো দু’জনে। খাওয়ার পর অপেক্ষা করছিল তোমার জন্য, দেরি দেখে একটা ব‌ই রেখে গেল ওই টেবিলে।”
অম্বরীশ ছুটে টেবিলে গিয়ে ব‌ইটা হাতে তুলে নিল, জয়ন্ত‌র লেখা কবিতার ব‌ই। দ্বিতীয় পাতায় লেখা—  ‘শুভ জন্মদিন। না চিনে ভালোই করেছিস অম্বরীশ, রিমির বন্ধুত্বটা মাথায় তুলে রাখব।’
অম্বরীশের চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ যেন বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে ভীষণভাবে।

রিমি অম্বরীশের কাঁধে হাত রেখে বলল—  “লুকিয়ে গেলে সব কিছু?”
অম্বরীশ নিশ্চুপ। রিমি আবার বলল—  “নতুন করে শুরু করো, ফোন নাম্বার তো আমার কাছে আছেই।”
রিমি ফোন করল জয়ন্তকে, ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল—  ‘দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ কলড ইজ সুইচড অফ।’

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

অর্পিতা সরকার

ক বি তা

অ র্পি তা  স র কা র

একটু আগুন ও ছাই

মুখে কী নিষ্পাপ হাসি রণদাদার । দিনরাত দুহাত দিয়ে নিজের পুরুষাঙ্গ চেপে ধরে থাকত। লজ্জায় কেউ তার চোখের দিকে তাকাত না। অথচ আমি দেখতাম সেই নিঃশেষ আঁধারেও প্রথম আলোর মতো জ্বলজ্বল করত রণদাদার চোখ।

 

সেদিন তামাটে রঙের জ্যোৎস্নার গা চুঁইয়ে পোড়া মাংসের গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছিল বড়োবাড়ির খিড়কি পুকুরের আনাচে কানাচে । আমি জ্বরের ঘোরে স্পষ্ট দেখলাম রণদাদার ঘর থেকে একটা কমলা প্রজাপতি উড়ে এসে আমার পুবের জানলায় বসল।

 

রণদাদার রানী বিড়ালটা মিউ মিউ করে শূন্য ঘরটার পাশ দিয়ে শুধু ঘোরে। দরজা খোলে না।

আমি আর সেদিকে চেয়ে দেখি না।

 

এখন রোজ ঘুমন্ত দুপুরগুলোতে এক অদ্ভুত জ্বর আসে শরীরে। বিস্বাদ জিভে লেগে থাকে পাকা মরিচের স্বপ্নগুড়ো। রণদাদাদের ঝিয়ের মেয়ে পরি, আঁচলে বেঁধে চুপিচুপি নিয়ে আসে লাল করমচা।

 

আমি তাকে জনান্তিকে বলি—

 

“পরিদিদি, তুমি কোঁচড় ভরে আগুন নিয়ে এসো। আমি পুনর্বার খান্ডব দাহন করি।”

 

আদিম

চলো ওই নিবিড় ছায়ায় বসি।
নখে শান দিতে দিতে
পড়শির ভরন্ত উঠোনে
অনাবৃষ্টি ডাকি,

চলো ঈর্ষার রঙ মাখি অবসর গায়ে,
একসাথে নিঃশ্বাস ছাড়ি,

চলো শেষ করি এই অরণ্য—
সবুজ সীমানা, জলের পৃথিবী

এরপর নিশ্চিত ধ্বংসকাল এলে, দেখো
এইসব গাছেদের শব কোল পেতে দেবে।

চলো মাথা গুঁজে দিই।
হয়ে যাই শস্য পরিমাণ।

দেখো, দ্বিজন্মে ঠিক
পুষ্পগর্ভ পাব।

 

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

জেরোম রথেনবার্গের কবিতা । পর্ব ২

অ নু বা দ

অ মি তা ভ   মৈ ত্র

জেরোম রথেনবার্গের কবিতা

ক্ষুধার্ত আত্মাদের নরক

বাগানের মধ্যে সাদা একটা গোলাপ পুড়ে যায়। কিছু কি বলার আছে এটা নিয়ে? কোট না পরেই আমি দাঁড়াব এখানে আর কথা শুনবো অন্যদের। একজন অভিযোগ করে তার খিদে পেয়েছে। কিন্তু আগেও তো দেখেছি ক্ষুধার্তদের। আজ রাতে আমি এসবের মধ্যে থাকব না। ক্ষুধার্ত, মরীয়া, উন্মাদ— এরা তো কার্বন হয়ে যাওয়া সেই সব হাড় যাদের ছেড়ে এসেছি আমরা। বাদ দাও। কালো আকশ এখনও মাথার ওপড়ে ওঠে আমাদের।

 

এবং আগুন নেভে। ফুলে ওঠা জিভ গড়ায় মুখের ভেতরে। দাঁতগুলো পরস্পরকে মেজে চকচক করে তোলে। সাদা পাতলা চামড়া উঠে আসে গলা থেকে। মেঝের ওপর গড়াচ্ছে মৃত্যুপথযাত্রী আমাদের কাছেই। বিশ্বাস করা যাবে না আর। যে বিষ ওকে দিয়েছিলাম সেটা কি ভাল নয়? বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া খুলির চোখ কাঁপছে। কী চাইছিল ও তোমার কাছে? খাবার?

 

বসার ঘরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়। তার শিকারের চামড়া দিয়ে বানানো পোশাক পড়ে জানলার কাছে বসে সিগারেট ধরাচ্ছে পরিচালক। টেবিলের ওপর মাটির পাত্রে সেই শিকারের হৃৎপিণ্ড আর আঙুল। ডিশের ওপর ঝকঝক করছে বিয়ের আংটি। হাতের মুঠোয় থুতনি রেখে পরিচালক চিন্তা করছে অপেক্ষা করছে। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ হয়। এবার হাড়গুলোকে রাখা হয় রুপোর বাক্সে— বড় একটা মঞ্চের ওপর।

 

নরক থাকে সবসময়। তলোয়ারের মতো আকাশে উঠে যাওয়া গাছে খুব সাবধানে উঠি আমরা। তবু ধারালো ব্লেডে আমাদের পা আমাদের বীজের থলে কেটে যায়। বাতাস উঠলে খুরের মতো ধারালো পাতায় ক্ষতবিক্ষত হয় আমাদের চোখ আর কান। অন্ধকারে আমরা আলগোছে পড়ে যাই যেখানে নদী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমাদের মুখ ভিনিগারে ভরে ওঠে।

 

খিদে পেল আমারও। সৈন্যরা যখন নদী থেকে তুলে এনেছিল, খাবারের জন্য তাদের পায়ে পড়েছিলাম। আগুনে লাল হয়ে যাওয়া শাবল আমার মুখে ঠেলে ঢুকিয়ে তারপর জ্বলন্ত আগুনের গোলা পুরে দিল আমার ভেতরে। আর্ত চিৎকারে নেমে যাচ্ছিল আগুন আমার জিভ গলা আন্র বুকের ভেতর দিয়ে। আমার দিন রাত্রি একইরকম। নরক থেকে লিখছি এই কথাগুলো, হ্যাঁ।

 

তুমি যা তাই থাকবে। আগুন একটু চকচকে করে দিতে পারে, কিন্তু সামান্য স্মরণিকাই শুধু সে। চারপাশে যেন নানা মৃত মানুষের স্বর— যারা ভালবাসত যারা ঘৃণা করত একদিন। অন্ধকারে যখন আমরা কাছে আসতে পারতাম না, ছুঁতে পারতাম না, যখন খিদে আর যন্ত্রণার কোনো মানে হতো না, বেঁচে থাকাও ছিল না কোথাও— আর এসব ছিল সেই শাস্তির মধ্যেই।

যদি বলো আরও বড় শাস্তিও আছে, আমি বিশ্বাস করব না। কিন্তু যদি বলো আরো বড় যন্ত্রণা আছে, আমি মেনে নেব, আমি ডেকে নেব তাকে।  

১৯৬০ সালে বেরিয়েছিল জেরোম রথেনবার্গের ( জন্ম-১৯৩১) প্রথম কবিতার বই ‘White Sun Black Sun’. সেই বইয়ের শুরুতেই টেলিগ্রামের মতো মিতকথনে তাঁর কবিতাভাবনা জোরালোভাবে জানিয়েছেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর একা রাস্তার শুরু। আগের এবং সমসময়ের সমস্ত চিহ্ন ও লক্ষণ আত্মস্থ করেছেন তাঁর এই যাত্রাপথে। বিভিন্ন জনজাতির verbal এবং non-verbal poetics এর বিপুল বৈচিত্র্য, তার সঙ্গে উত্তর-মার্কিনি ভারতীয় সংস্কৃতি, জাপানি সাহিত্য, দাদাইজম, ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রত্নপরিচ­­­­­­­­­য়- সব মিলিয়ে ‘Ethnopoetics’ নামে একটি অখণ্ড ভাবনা তিনিই প্রথম এনেছিলেন, যার সাহায্যে সারা বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া লিখিত ও অলিখিত সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে তুলে এনে তাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে বেরিয়েছিল ‘Technicians of the Sacred’ নামের একটি সংকলন যেখানে আফ্রিকান, আমেরিকান, এশিয়ান ও ওশিয়ানিক কাব্যতত্ত্ব ছাড়াও সেইসব দেশের ধর্মীয় আচার ও প্রথার মূল পাঠ, চিত্রনাট্য, দৃশ্য ও শ্রাব্য সাহিত্য তুলে এনেছিলেন তিনি। ‘Alcheringa’ নামের প্রথম Ethnopoetics পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শে উজ্জ্বীবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে আরো পত্রিকা বেরোতে থাকে এবং Ethnopoetics নিয়ে চিন্তায় এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জার্মানিতে, একজন মার্কিন সৈনিক হিসেবে। নিউইয়র্কে ফিরে তিনি অনুবাদ করতে শুরু করলেন দু’হাতে। পাউল সেলান এবং গুণ্টার গ্রাসের প্রথম ইংরেজি অনুবাদক তিনিই।

লেখালেখির প্রথম দিকে তিনি এবং রবার্ট কেলি স্প্যানিশ শব্দ ‘Cante Todo’- এর ছায়ায় লোরকাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে সামনে রেখে শুরু করেছিলেন ‘Deep Image’ আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে ‘Sound Poetry’ বা ধ্বনি কবিতা তাঁর অন্বেষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থহীন শব্দাংশ (syllable), ধ্বনি, সুর, বিকৃত উচ্চারণ সবকিছু নিয়ে এমন কবিতা তিনি ভেবেছিলেন যেখানে কবিতা, গান, অর্থহীন জড়ানো শব্দ সবকিছুই একসঙ্গে চলেছে। এই কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ভাষার নয়। একে লিখে বোঝানো যায় না, লেখাও যায় না সেই অর্থে। অর্থ খুঁজে পাওয়ার কোনো দায়িত্ব নেই। অর্থের বেড়া ডিঙিয়েই এখানে পৌঁছানো যায়।

অমিতাভ মৈত্র

অনুবাদক

আরও পড়ুন...

Categories
2020_dec

শ্যামলকান্তি দাশ

গু চ্ছ  ক বি তা

শ্যা ম ল কা ন্তি   দা শ

হত্যা

আর তোমাকে জীবন্ত রাখবার

সত্যিই কোনো মানে হয় না,

সুযোগ বুঝে আমি তোমার পেছনে

একটা পাটকিলে রঙের

কুকুর লেলিয়ে দিলাম,

এই গভীর লোকালয়ের ভিতর

এই গণিকাআবাসের আড়ালে

কোনো মানুষ নয়, একটা ঠান্ডা মাথার

উৎফুল্ল কুকুর তোমাকে হত্যা করেছে!

pujo_16_sketch2

তোতে-আমাতে

তোতে-আমাতে কোনো তফাত নেই,

সত্যি বলতে কী, তুই-আমি অভিন্ন,

একাত্মা, পরমাত্মা,

পেট ফেটে মরে গেলেও কথাগুলো

কাউকে বলিস না,

রসের অভাবে দেহ পাতা হয়ে গেল,

শরীর খড় হয়ে গেল,

চল আমরা একটু শুয়ে পড়ি,

গায়ে গা লাগাই,

শাস্ত্রে আছে, শোয়া-বসাই তো

মুক্তির চরম পথ!

pujo_16_sketch2

সংগ্রাম

ঘরভর্তি বই খাতা

কুঁজোভর্তি জল!

জানলা থেকে দেখা যায়

               আমার সংগ্রাম!

হাঁড়িভর্তি রক্ত, আর

সাজিভর্তি ফল!

দরজা থেকে দেখা যায়

              বেশ্যাদের গ্রাম!

pujo_16_sketch2

প্রকান্ড শ্যামল

হ্যাঁ গা, তুমি আমাকে চিনতে পারো?

পারোনি তো?

গায়ে এত ছাপ্পাছুপ্পি, এত সব

জড়ানো জ্যাবড়ানো— ধাঁধা লেগে গেছে,

নিশ্চয়ই চিনতে পারোনি।

পূর্ণিমার রাত্রি কিনা!

হঠাৎ হাভেলি থেকে

বেরিয়ে এসেছি।

মিঠাই-সন্দেশ নয়,

জামবাটি ভর্তি করে রক্ত দিও,

আর একটু ঈষদুষ্ণ জল,

সুহাসিনী পিসিমা গো

ড্রাকুলাসূত্রে আমি এখানে এসেছি—

আমি সেই তোমাদের চিরচেনা

প্রকান্ড শ্যামল!

pujo_16_sketch2

ড্রাকুলা

অত বড় দাঁত আমি

কখনও দেখিনি,

ধারযুক্ত, অমন মসৃণ!

তুমি কি ড্রাকুলা নাকি?

চেটে খেতে এসেছ আমাকে।

 

বেশ, বেশ, খুশমনে খেয়ো।

হে ড্রাকুলা, ড্রাকুলা হে,

অত বড় দাঁত আমি বাঁধিয়ে রাখব।

কিন্তু কেন-বা তুমি, অসময়ে

হাভেলির খিল খুলে দিলে—

তেসরা নভেম্বর, সেদিন ফ্রাইডে,

আমাদের দেখা হোক

ডিনার-টেবিলে!

pujo_16_sketch2

আমার শ্যামলে

কলহ বিবাদে নেই

গোষ্ঠীতে শিবিরে নেই

তাঁবুতে ছাতায় নেই

জুড়ে আছি ফাটাফুটো

             আধখানা দলে

মেঘের সঞ্চার দেখি

বজ্রের পতন দেখি

পাহাড়ে বিপ্লব দেখি

মিশে আছি গা-ভর্তি

            আমার শ্যামলে

আরও পড়ুন...