Categories
2021-july

তৃণা চক্রবর্তী

দী র্ঘ  ক বি তা

তৃ ণা   চ ক্র ব র্তী

ঈশ্বরের মুখ দেখে ফেলার অপরাধে

না লেখা খাতার মতো সাদা বারান্দা একদিকে

নির্জন শব্দের ভেঙে পড়া রেফ্‌ অন্যদিকে

তবু অনন্যোপায় মেলে রাখা জামায় সুতোর মিহি কাজ

এক উৎসব থেকে আর এক উৎসবের দিকে হাওয়া দেয়

 

আর কিছু নয়, শুধু আমি এসবের কতটুকু জানি

এ প্রশ্নের সামনে এসে অস্বস্তি হয়, ঘাড়ের কাছে জমে ওঠা সন্দেহ

গাঢ় শ্বাস ফেলে সরে যায়, সিগার ধরাতে চেষ্টা করে

আর আমি হঠাৎই দেখে ফেলি তাঁর তাৎক্ষণিক ভাঙাচোরা মুখ

 

অথচ দেখা হয়েছে কতবার এর আগে

সেইসব অপরিচিত বিকেল নেই আর

একই রাস্তায় ছুটে চলে যাওয়ার অন্ধকার নেই

লুকিয়ে রাখাগুলো নেই

সমস্ত শহর জুড়ে ভ্যান গঘের মিউজিয়াম   

আমি কি তাহলে ঈশ্বরের মুখ দেখে ফেলার অপরাধে

এক ক্যানভাস থেকে ক্রমাগত ঢুকে পড়ছি অন্য এক ক্যানভাসে

pujo_16_sketch2

না লেখা খাতার মতো পড়ে থাকা সাদা বারান্দা

আর নির্জন শব্দের ভাঙা রেফ্‌ আমাদের মাঝখানে

আমাদের চন্দনপুর যাওয়া হয়নি কখনই 

তারই মধ্যে দেখেছি তোমার উৎসব 

ক্রমাগত কমলা রঙের হয়ে গেছে

 

আমার কোনও উৎসব ছিল না কোনোদিন

তবু অন্যের উৎসবে সামিল হতে হতে

সাদা বারান্দার পাশে পিতলের মূর্তি

পদাবলী পেরিয়ে যাওয়া দুপুরে জাগ্রত হয়ে উঠত কীভাবে

সেই আশ্চর্য খেলা শিখতে না পারার অপরাধে

পিছু হঠতে না পারার অপারগতায়

ভেঙে যাওয়া খেলনা জোড়া না দিতে পারার অভিযোগে

সমস্ত সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে থেকেও সরে গিয়েছি একসময়

pujo_16_sketch2

সকলে যেভাবে যায়, অথবা যেভাবে থাকে

আমি তার কতটুকু জানি 

ফাঁকা আয়নায় ভেঙে পড়ার শব্দটুকু আগলে রেখে  

বহুবার মুখোমুখি হয়েছি, ঝর্ণার শব্দে সম্বিত ফেরার আগে

শুধু একবার তাঁর মুখ দেখে ফেলার অপরাধে

দিগন্তের ধারনায় তাকিয়ে থেকেছি শূন্যে

    

আমার শূন্যের অধিকারটুকুও খোয়া যাবে একদিন

আমাদের চন্দনপুর যাওয়া হবে না কখনোই     

আমরা গিলে ফেলব এই অর্বাচীন মুখোমুখিগুলো

অথবা ভুলে যাব, জানলা বন্ধ করব 

ফিরে যাবে স্নানরত দুপুর

এসব তবু লিখে রাখবার মতো কিছু নয়

 

আমি বারবার একই শব্দে ফিরে যেতে চেয়েছি

আর পুনরাবৃত্তি হবে বলে চলে যেতে চেয়েছি সমুদ্র

একটানা কথা বলে, বোতামঘর পাল্টে ফেলে   

কোনও নাটকীয়তা নয়, আমি চেয়েছিলাম নির্লিপ্তি এক

চেয়েছিলাম সি-বিচে ফেনার ওপর দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে

কতটা বালি ফিরে যায় প্রতি ঢেউ-এ

কতটা লেগে থাকে বোকামির মতো, অধিকারে

pujo_16_sketch2

নির্জন, তোমার থেকে একমাত্রা কমে যাক

তুমি আরও কাছের হয়ে ওঠো

আয়নার ভেতর নেমে যাক শেষ দুপুরের রোদ

নেহাতই অসাবধানতায় আমি ঢুকে পড়েছি এই কাচের মধ্যে

এখান থেকে সবকিছুই স্বচ্ছ দেখায়

কোনও শব্দ কানে আসে না  

সমস্ত মুখ নিখুঁত হয়ে ওঠে, ভোরবেলার মতো দেখায় 

এসব তবু লিখে রাখবার মতো তেমন কিছু নয়

 

আসলে যা লিখতে চেয়েছি সবই সাদা খাতার মতো স্থির

অথবা বারান্দার মতো এক দীর্ঘ মনোলগ

স্বল্প পরিচিত করিডোর কোনও

কিছুটা আলো ও অন্ধকার সামলে ওঠা

লম্বা গাছের নিচু ঢালু ছায়া  

যার উৎসর্গে লেখা থাকেনি কোনও নাম

যাকে ঈশ্বর বলে মানতে গিয়ে দেখেছি অসংখ্য মুখ

বেশিরভাগ আদলই চেনা, অযথা সংযত, সচেতন

অতিথির দূরত্বে এগিয়ে দেওয়া স্মিত সাহচর্য

দু-একটা ভাঙাচোরা গোপন করা রয়েছে সাবধানে

pic333

অথচ আমি এর কতটুকু জানি

প্রথম জন্মের দূরত্ব আজও কাটিয়ে উঠতে না পেরে

কীভাবে পৌঁছে গিয়েছি দ্বিতীয় জন্মের শেষে

ভুল করে দেখে ফেলেছি ভেঙে যাওয়া বিগ্রহ

মনে রেখেছি যা কিছু ভুলে যাওয়ার

পেরিয়ে গিয়েছি এমন কিছু অনায়াস

প্রতিটা স্তরে জমে থাকা গল্পের সম্ভার

আমাকে নিপুণভাবে বুনে নিয়েছে সূচের তীব্র

দুপুরের গায়ে ফুটে উঠেছে সুতোর মিহি কাজ

সাদা বারান্দা অথবা নির্জনতার প্রশ্নে ফিরে গিয়ে শুনেছি

অমীমাংসিত শব্দের গাঢ় নিঃশ্বাস

যাকে অতিক্রম করতে গিয়ে থেমে যায় সমুদ্র

লাইট হাউসের গায়ে আছড়ে পড়ে ফিরে যায় নিরুপায় জল  

 

এসব তবু লিখে রাখবার মতো তেমন কিছু নয়

আমি এসবের কতটুকুই বা জানি

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

শংকর চক্রবর্তী

ধা রা বা হি ক  | পর্ব ১১

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

sankar_chakrabarty_hm

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি

ঝাড়বাতি

তখনও তাঁর সঙ্গ উদযাপন করতে পারিনি আমি। ষাটের দশকের শেষভাগে প্রিয় বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা তাঁর একটি চিঠির শেষের কিছু অংশ এরকম ছিল,  ‘… তুমি মাঝে মাঝে আমায় সাধারণ যোগবিয়োগে ফেলে দাও এই দুঃখ। আমায় সবসময় তা স্পর্শ করে না,  কিন্তু তোমায় তা যে কোনো কারণে ভীষণ স্পর্শ করে।  তোমার দুঃখ বাড়ে।  ভালোবাসা প্রকাশ করা আমার হল না।  তবু এই সকল দুঃখ না বাড়ার জন্য আমি প্রাণপণ করছি সুনীল। তোমার প‍্রতি আমার কোনরূপ বাধা নেই বলেই আজ পরোক্ষে সামান্য হৃদয় নিক্ষেপ করলাম।  কিছু মনে কোরো না।  তোমার সঙ্গে এখানে যেদিন দেখা হবে সেদিন কিন্তু এইসব মালিন‍্য থাকবে না মনে। সেদিন চিৎকার করে আহ্লাদ করবো।…..’

হ‍্যাঁ, তাঁর হৃদয়ের স্পর্শ যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা জানেন কতটা প্রশস্ত ছিল ওই ছোট্ট গৃহ। এই চিঠিটি চাইবাসা থেকে লিখেছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বাংলা কবিতার এই বিরল ব‍্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার তার কয়েক বছর পরেই।  ইতিমধ্যে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের মিথ্ তৈরি হয়ে ঘুরতে শুরু করেছিল কবিতা -পাড়ার পড়শিদের মুখে মুখে।  কিন্তু তাঁর হৃদয় – ভর্তি ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েছিলেন কতজন জানা নেই। তবে সে সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।

তখন আমারও শিলঙের প্রবাস জীবন শুরু হয়ে গেছে।  আমি সেখানে যাওয়ার বহু আগে থেকেই আমার সেজো মামা রেলের চাকরি সূত্রে গুয়াহাটির মালিগাঁও-এ থাকতেন। প্রথমবার শক্তিদা সপরিবারে শিলং এসেছিলেন। মনে আছে,  সেবার ট্রেনে এসে নেমেছিলেন জালুকবাড়ি স্টেশনে।  পরে সেই স্টেশনের নাম পাল্টে রাখা হয় কামাখ‍্যা।  সেদিন স্টেশন থেকে ওঁদের নিয়ে মামার রেলের কোয়ার্টারেই উঠেছিলাম।  এবং বিকেলেই শক্তিদার ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে নিয়ে যেতে হয়েছিল গুয়াহাটির পিটিআই অফিসের তৎকালীন কর্ণধারের কাছে।  উত্তর পূর্বাঞ্চলে তখন সন্ধের পরবর্তী সময়কেই গভীর রাত আখ‍্যা দেওয়া হতো। যানবাহনের গতিবিধিও এতটা মসৃণ ছিল না তখন। ফলে সেই রাতে তাঁকে আড্ডার আসর থেকে টেনে তুলে মালিগাঁও-এ ফেরার কথা ভাবতেই পারতাম না যদি গুয়াহাটির আমার কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতা না পেতাম। তো সেই রাতে আমাদের দু’জনকেই মীনাক্ষী বৌদির তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। 
সে সব অন্য বিষয়। খাওয়ার টেবিলে রাতে, আমার মামির অনুরোধে শক্তিদার রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার সৌভাগ্যও  প্রথম হয়েছিল আমাদের। পরের দিন শিলং। তার তিনদিন পর আবার গুয়াহাটির মামার বাড়ি। সেখান থেকে শক্তিদা, বৌদি –  তাতার – তিতিরকে নিয়ে কাজিরাঙা ঘুরতে গেলেন। আমি শিলং ফিরে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন পরেই সেখানে শক্তিদার চিঠি পাই  –  ‘প্রিয়বরেষু,  আমরা গতকাল তোমার মামা – মামীর ঘাড় থেকে নামতে পারলাম।  কাজিরাঙা থেকে লিখছি। সকাল। একটু পরেই জোড়হাটের পথে দুলিয়াজান যাবো।  তারপর পরশু নাগাদ ডিমাপুর – কোহিমা –  মণিপুর সেরে আবার তোমার মামার বাড়ি। তোমার মামার বাড়ি আমার মামার বাড়িতে পর্যবসিত। ফিরবো ২৮ তারিখে। যদি পারো ২৭শে এসো। ২৯শে  গাড়ি ধরবো। কৃষ্ণা ও বাচ্চাকে আমার শুভেচ্ছা স্নেহ জানিও। শক্তিদা’

তার দু’তিন দিন পর আরও একটা চিঠি। দুলিয়াজান থেকে…

‘শংকর ,
             কাজিরাঙা থেকে গোলাঘাট,  জোড়হাট হয়ে গতকাল রাত ন’টা নাগাদ দুলিয়াজানে পৌঁছেছি।  চা বাগানের মধ‍্যে দিয়ে ট‍্যাক্সিতে। বৃষ্টি নেই। গুমোট ভাব আছে। রোদ্দুরে ঝকমক করছে চতুর্দিকের সবুজ। এই সবুজ বাংলাদেশের সবুজের চেয়ে শ্বাসরোধী। ভালো লাগছে। এখান থেকে অরুণাচল খুব কাছে। একটা গাড়ি পেয়ে সকালে গিয়ে রাতে ফিরে আসা যেতে পারে। চেষ্টা চলছে।  বিহু আজ সন্ধেয় দেখা যেতে পারে। পরশুর মধ‍্যে নোঙর তুলতে হবে। মণিপুর রোড থেকে কোহিমা।  টেলিফোনে  যোগাযোগ করবো আজ সন্ধেবেলা।  কোহিমা থেকে মককচং, সেখান থেকে মণিপুর হয়ে গৌহাটি। ২৭ রাতে কিংবা ২৮ সকালে। আগের চিঠি পেয়েছিলে তো?  মেঘালয় ট‍্যুরিস্ট অফিস থেকে আমার জন্য  যতগলো Handouts পাও নিয়ে এসো তো?  নিশ্চয় এসো। আমি তোমার মামার বাড়িতেই যাচ্ছি। ভালোবাসা।
                                                                                                                                                                                                                    শক্তিদা’

তো এইসব চিঠি পড়ে শক্তিদাকে যতটুকু বোঝা যায় তার থেকেও ঢের সংসারে এক সন্ন‍্যাসীর মতন জীবন কাটাতে দেখেছি তাঁকে। পরের বছর শীতে কলকাতায় গেলে একদিন আনন্দবাজার অফিস থেকে বেরিয়ে তিনি সারাটা বিকেল – সন্ধ‍ে আমার সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। কফিহাউসে নয়। কলেজস্ট্রিটের বিভিন্ন প্রকাশকের ঘরে। সেখান থেকে প্রকাশিত তাঁর যাবতীয় বইগুলিতে ভালোবাসায় আমার নাম লিখে আমার কাঁধের ঝোলা উপচে দিয়েছিলেন। ‘চলো বেড়িয়ে আসি’  – এই নামে একটি ভ্রমণের বইও লিখেছিলেন তিনি। ব‍্যতিক্রমী, তবে অসাধারণ গদ‍্যে। সেই বইটি  আনন্দবাজারে আলোচনার জন্য কিছুদিন আগে আমাকে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাচক্রে তার আগের শনিবারই সেটি প্রকাশ পায়  ‘পুস্তক পরিচয়’  বিভাগে। সেদিনই শক্তিদা সেই বইটির প্রকাশকের ঘরেও নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। তাঁকে বলেছিলেন, ‘এই যে শংকর, কাগজে লিখে তোমার বই-এর প্রচার বাড়িয়ে দিয়েছে।’ আর আমাকে বলেছিলেন, ততদিনে আমি  ‘তুই’ সম্বোধনে উত্তীর্ণ হয়েছি,  ‘আমাকে একটা ট্রামে তুলে দে। বাড়ি ফিরবো।’ মনে আছে, প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে থেকে একটা ট্রামে উঠেছিলেন তিনি। পরের দিন সন্ধেয় সপরিবারে আমাকে তাঁর বাড়ি যাবার প্রতিশ্রুতি আদায় করে একলাফে উঠে পড়ে ছিলেন ওই ট্রামে। যার পেছনটা, আমি একা একা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, সন্ধের ধূসরতায় মিলিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

রিমঝিম আহমেদ

বাং লা দে শে র  ক বি তা

রি ম ঝি ম   আ হ মে দ

তুচ্ছ

সকল অধিকারবোধ তুচ্ছ করে আমি ছায়ায় এসে দাঁড়াব।

 

পাখিদের শেখাব কীভাবে একই সম্পর্কের ভিতর মৃত্যু হয় মানুষের।

হয়তো তারাও নির্বন্ধন আঙুল ছুঁতে শিখে যাবে বিকেল পেরুলে।

 

বহু পথ বদলে যাবে, মেঘ হয়ে ভেসে যাবে রোদ, দূরের কার্নিশ।

 

সকল ক্লান্তি শেষে পাতারা শোনাবে তাদের অতিলৌকিক হাওয়া

 

আর, মাঠের ধারের মোমজ্বলা এক আস্তাবল থেকে কোনো ছায়ামূর্তি

আমার দিকে ছুঁড়ে দেবে তার নতুন খেলনাবাটি।

 

যখন পাতায় বর্ষা লাগে

প্রসঙ্গত;

 

মাতাল রোদের পর ঝরে পড়া গামারির পাতা

 

ডেকেছিল ডাকনাম ধরে

 

কতটুকু যাচ্ঞা ছিল, ভেঙে যাওয়া কশেরুকা জুড়ে?

 

অবনত…!

 

নদী থেকে মুছে যায় জল, অতীন্দ্রিয় চররেখা—

 

গোপনতম চন্দ্র-আভাস

 

তুমুল ফাঁকির পর যেটুকুই প্রেম বলে চিনি

 

সে কি ক্ষত?

 

নাকি আরও কোন নাম আছে তার? পাঁজরের উৎস হতে

 

যে ব্যথা জমাট বাঁধে বুকে–

 

শরীরের খাঁজে খাঁজে ছুঁড়ে দেয় বিষমাখা তির

 

অবিরত…

 

দগ্ধ দিন ফিরে আসে, বৃষ্টির লেফাফা খুলে দেখি

 

সামান্যই আনুকূল্য তাতে

 

ময়ূরী— চেতনা থেকে মুছে ফেলি নৃত্যপ্রবণতা

 

অসংযত

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

হাসানত শোয়েব

বাং লা দে শে র  ক বি তা

হা সা ন ত   শো য়ে ব

শিরোনাম ছাড়াই ১

কেউ কোথাও বসে সুতো কাটছে। তবুও ক’দিন পর পর মানুষের চিড়িয়াখানা দেখার ইচ্ছে জাগে। আমরা জানি দূরে বেড়াতে গেলে পকেটে বাঘের ছবি রাখতে হয়। তুমি তো জানোই, পৃথিবী একটা ঘোড়ার ডিম। আবার জিজ্ঞেস কোরো না ঘোড়া কী। ঘোড়া যেহেতু উড়ে না, সেহেতু সেটা পাখি না। আর পাখি যেহেতু উড়ে, সেটা নিশ্চয় ঘোড়া না। মানুষ ঘোড়াও না, পাখিও না। মানুষ হলো ঘোড়ার ডিম।

 

এসব কারণে আজকাল আমি পোস্টঅফিস পর্যন্ত এসে ফিরে যাই। পোস্টমাস্টারের বউয়ের চিঠি পড়ি। বাঘ দেখার লোভে সে পালিয়ে গেছে চিড়িয়াখানার দারোয়ানের সাথে। এখনো সে প্রতিদিন পোস্টমাস্টারকে চিঠি লিখে। চিঠিতে থাকে চিড়িয়াখানার গল্প। এখন পোস্টমস্টার বাঘ দেখতে চিড়িয়াখানায় আসেন । চিড়িয়াখানা অনেক দূরে। আমিও মাঝেমাঝে তার সাথে যাই। সে বাঘ দেখতে দেখতে বলে, পৃথিবী নিশ্চয় তার প্রেমিকের কাছ থেকে পালিয়ে আসা গোল কমলালেবু।

 

শিরোনাম ছাড়াই ২

এখনো কেউ কেউ পা থেকে জুতা খুলে রাখে। জুতার নাম হতে পারে মাস্টার শু। পায়ের কোনো নাম নেই। পায়ের নাম দিলাম মহানন্দা। মহানন্দা নদীর নামও হতে পারে অথবা সেতুর। সেতু নামে আমার এক বন্ধু ছিলো। স্কুলে থাকতেই যে পানিতে ডুবে মারা যায়। পানি একটা তরল পদার্থ। নদী এবং সমুদ্রের পানি এক নয়। সমুদ্রের পানি খুব সম্ভবত নদীর পানি চেয়ে হালকা। ছোটবেলায় পড়েছিলাম নদীর পানিতে সাঁতার কাটা সহজ। সাঁতার কাটতে গিয়ে আমি সাইকেল চালানো শিখতে পারিনি। সেতু সাইকেল চালাতে পারতো, তবুও সে নদীতে ডুবে মারা যায়। নদীর নাম মহানন্দা। যার চারটি উপনদী আছে। যার একটি পুনর্ভবা। এই নামের এক মেয়ে প্রতি সোমবার আমাকে চিঠি লিখত। চিঠির শেষে থাকতো চারটি কমলা ফুল। কমলা ফুল হলুদও না কমলাও না। দুটোর মাঝামাঝি কিছু একটা হবে। সেটা নিশ্চিত বেগুনিও না নীলও না। মহানন্দা তুমি উত্তর দিও।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

য়িন ঝিয়াউয়ান

ক বি তা  ভা ব না

এই সংখ্যায় চীনের কবি

য়ি ন   ঝি য়া উ য়া ন

inn

অথবা বুদবুদের মতো...

মেয়েটি জানতই না যে দীর্ঘদিন থেকে আমার ওপর নজর রাখা হচ্ছে, আমি খেয়াল করেছি– গদ্যের চরিত্র তারা, ছিল দুর্বলা আর ফ্যাকাসে, সাবওয়ের ভেতর বিজ্ঞাপনের আলো থেকে ঝলকে উঠে তারা আমার দৃষ্টির গোচর পেরিয়ে হুশ করে চলে যেত, অথবা বুদবুদের মতো ভেসে উঠত মোবাইলের পর্দায়, যা আমায় চকিত করে, তবু একপলকে হাজার হাজার অচেনা মুখের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে যায়। দীর্ঘকবিতা থেকে পলাতক চরিত্রগুলি কিন্তু এর থেকে অনেক জটিল। খুব মনে আছে একদিন রাস্তা পেরোতে গিয়ে একটি লোকের সঙ্গে গা ঘষে গেল, লোকটার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে আমি বেশ হকচকিয়ে গেলুম। একেবারে মারমুখী ভ্রূকুটি, কপালের শিরা-টিরা ফুলে ধুন্ধুমার অবস্থা, মনে হল যেন মারাত্মক কোন অভিশাপ ছিল তাঁর মধ্যে। পরে মনে পড়ল, লোকটি আর অন্য কেউ নন, ছিলেন গুন্ট্র্যাম স্তোৎজনার, সারা টাউন দাপিয়ে চলেছেন এলহসপিতাল দে লিঁয়তে, মারিয়েনে বিউফোর্টের খোঁজে।

ডাক্তার মার্কো অসবোর্ণ, সমস্ত কিছুর প্রস্ফুটনকে যিনি বৃন্তের মতোন ধারণ করেন, তাঁর কাজই হল সবকিছুর আদিরূপ হিসেবে সক্রিয় থাকা আর থাকা আমার শক্তির মূল আধার হয়ে। 

(গদ্যাংশটি কবির ‘Twin Flames’ গ্রন্থ থেকে কবি চয়ন করে দিয়েছেন।)

মূল রচনা থেকে ভাষান্তর: অরিত্র সান্যাল

মূল রচনা

She did not know that I had been stalked by them for a long time, which I had noticed- the characters from crisp prose were pale and feeble, who flashed across my eyes swiftly from advertising light boxes in the subway, or pop-up windows in my mobile, which caught me by surprise, but dissolved back into unrecognizable faces in the wink of an eye. But the ones escaping from long poems were never easy to deal with: I still have a sharp recollection of that day when I brushed against a man while crossing the street, and was taken aback by his expression: a belligerent frowning, with veins on his forehead bulging, as if he was a carrier of some fatal curse. I remembered later that he was no other than Guntram Stötzner, striding across town to L’hôpital de Lyon in pursuit of Marilène Beaufort.

Dr. Marco Osborne, the rachis that connects everything blooming in an umbellar order. He functions as their archetype and my primary container of energy.

য়িন ঝিয়াউয়ান একজন আভাঁ গার্দ কবি যিনি গদ্য পদ্যের সীমারেখা অবলীলায় লঙ্ঘন করে মহাকাব্য রচনার লক্ষ্যে স্থির। ২০০৭ সাল থেকে চীনে য়িন Encyclopedic Poetry School –এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সে দেশে  hermaphroditic writing movement –এর মূল হোতা ও সে আন্দোলনের মুখ্য প্রস্তাবক য়িন যে কবিতা লেখেন তার বিষয় রসায়ন, ভূতত্ত্ব, নৃতত্ব, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, সঙ্গীতশাস্ত্র, ফটোগ্রাফি, আবহাওয়াবিজ্ঞান – সমস্ত কিছু থেকে নিজের উপাদান শুষে নিতে থাকে। Translators Association of China, the Poetry Institute of China and of Beijing Writers’ Association-এর সদস্য য়িনের লেখালেখি ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান আর জাপানি ভাষায় অনুদিত, আর তা নানা সময়ে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, কানাডা, জাপান, থাইল্যাণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। Ephemeral Memories, Beyond the Tzolk’in, Avant-garde Trilogy, and Agent d’ensemencement des nuages (Encyclopedic Poetry School’ 10th anniversary celebration Series)- এই চারটি কাব্যগ্রন্থ-সহ য়িনের প্রকাশিত গ্রন্থ নয়টি।  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

সম্বিত বসু

উ ই ন্ডো  সি ট

স ম্বি ত   ব সু

sambit

পাথরের সবাক গন্ধ

যেদিকে যাওয়ার ছিল, সেদিকে গেলাম না মোটে। এই যেমন ভেবেছিলাম, সকালবেলা উঠে ছোট ছোট আলুর তরকারি দিয়ে কচুরি খাব– সেসব কিছুই হল না। উল্টে দুঃসংবাদ: এখন আর সেই স্বাদ নেই রে সম্বিত। এদিকে জল জমে গেল রাস্তায়। চায়ের দোকান থেকে প্লাস্টিকের ডিঙায় ভেসে চলছে লালপিঁপড়ের জলদস্যু সংস্করণ। এসব দিনে ডিমগোলার আওয়াজেই ডিমভাজা খাওয়া হয়ে যায়। মশাদের জন্যও গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয় সরকারি বিজ্ঞাপন। রোনাল্ড রস সরণিতে আমাদের দেখা হয়েছিল, মনে আছে? একটা ভাঙা গাছের ওপর বসেছিলাম আমরা। অথচ সেখানেও প্রাণ– কাঠপিঁপড়ে, তোমাকে কামড়ায়নি, আমাকেও না। আমরা নিজেদেরকেও না। তবু হাত থেকে বারবার পড়ে গেল নানা দেশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী কবিতা-গদ্যের সংকলন। ফিরে এসে দু’তিন লাইন লিখলাম: রাতে গুনগুন করতে করতে/ যে সমস্ত ডানাওয়ালা তারিখ কামড়ায়/ তাদের পিষে ফেলবার কথা ভাবতে পারি না/ চাই, প্রত্যেক তারিখে রক্তের সুষম বণ্টন।

ভেবেছিলাম, দিনটা হবে আমার, কিন্তু রিভার্স সুইপ। এ আগেও হয়েছে। যাচ্ছিলাম একেবারে হারিয়ে। উড়ে। জীবনের মধ্যে কী হু-হা হাওয়া বইছিল তখন, কোচিং কাট মেরে বসেছিলাম রাতের রোদ্দুরে। হাতে বাদাম। হাতে ঘাস। অশ্লীল ভাগ্যরেখাও হাতে। হাতে থেকে হাতে ছড়িয়ে গিয়েছিল তারিখের দীর্ঘ স্বপ্ন। শামুক দিয়ে তৈরি সেই দেওয়াল ঘড়ি থেকে শামুকটাই বিদায় নিয়েছে। অপেক্ষার জন্য কোনও চিরকুটও রেখে যায়নি। এখন শুধু ১ থেকে ১২। 

এর মধ্যেই পৃথিবী ঘুরছে। আমি ঘুরছি। তুমিও ঘুরছ। আমার ও তোমার মধ্যে তাহলে কে বেশি পৃথিবী? তার দিয়ে টানটান এই শহর তার কথা কিছু কিছু জানে। দু’টি পাণ্ডুলিপি শুধুমাত্র একইরকমভাবে শেষ হতে চেয়েছিল বলে, সম্পাদনায় ক্রমশ দূরে চলে গেছে। এই গাঢ় দুঃখের কথা জানে একটি চিঠি, একটি হাতে আঁকা ছবি ও কলম। সমতলে, সমুদ্রে, পাহাড়ে, জঙ্গলে এই পাণ্ডুলিপি দেখতে পায় আরেক পাণ্ডুলিপির অপস্রিয়মাণ ছায়া।

সকলেই থাকে না; কেউ কেউ থাকে। চলে যাওয়ার সময় সাক্ষী থাকে একটা-দুটো অ-মানুষ– কুকুর-বিড়াল। সাক্ষী থাকে শেষ জড়িয়ে ধরা, ফুলগাছ, দোলনা, অন্যমনস্ক পরপর সিগারেটের টান, কবিতা বই, অচেনা পাখিদের গজল্লা। সাক্ষী বজ্রপাত– যা হয়েছিল শরীরের ভেতর। সাক্ষী পোস্টম্যান, যে হেমন্তের অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই যুবক-যুবতীকে চুম্বনরত দেখে খামের বাড়ি দেখিয়ে দেয়।

কিন্তু ঘুরে যায় মাথা। নেই নেই নেই। কখনও স্পষ্ট বোঝা যায়, এই চলে যাওয়া। এই যে বিচ্ছেদ মুহূর্ত শুরু হল। এই বাক্যের পর সব কথা শেষ হয়ে গেল। পুরনো ঠোঁট খসে গেল একেবারে। পুরনো হলুদ পাতার হাত ঝরে গেল। সেই ঠোঁটের পথে ঘুরে ঘুরে আর কোনও দিন বেঁচে থাকা ভিক্ষে করা হবে না দুপুরবেলায়। আবার কখনও হঠাৎই উধাও। বলা-কওয়া নেই। আভাস নেই। ফুসমন্তর।

দু’ক্ষেত্রেই যে ছিল, সে ‘হাওয়া’ হয়ে গেছে। এখন এই হাওয়া-ই হারানোর আইডেনটিটি কার্ড। সে হাওয়ায় কাঁপছে মফস্‌সল, সে হাওয়ায় চোখের পাতা কাঁপছে, এবং হয়তো সে হাওয়াতেই কাঁপছে দূরের নক্ষত্র। এই এখনও।

হারাতেও সবাই জানে না, কেউ কেউ জানে। তারাই জানে, যারা হারিয়ে যাওয়ার পরও থেকে যায়। দেখা হওয়া, কথা হওয়া আর নিয়ন্ত্রণ করে না উপস্থিতি। ‘কী খবর’-এ আটকে থাকে না সেই পুনর্কথন। সেই কথা, যে-কথা শুরু হয়েছিল প্রেমেরও অনেক আগে, তা ঘুরে বেড়াচ্ছে একান্ত মনোলগে। একবার সে, একবার আমি। সে তো ছুঁয়েছে আমাকে, সুতরাং, আমি মাঝে মাঝে সে হতে পারি। অনেকটা ‘পরশপাথর’ ফরমুলা। বাংলাভাষার থেকে সেই প্রেম ধার নিতে পারে চমৎকার এক ত্রিবিন্দু…

এই ত্রিবিন্দুর কথা ভুলে যাওয়া যাবে না। মনে পড়বে, হারানো চকমকি পাথরকে। পাথরের মধ্যেকার দূরত্ব যতই থাক, দাবানল-সম্ভাবনা ছিল তাদের। একথা কোনও দিন তারা যেন না ভোলে। ভুলে না যায়, সঙ্গে না থাকলেও অনুষঙ্গে আছে। দিব্যি অনুষঙ্গে সঙ্গে আছে।

অনেক দিন পর ভোরবেলা ছাদে গেলাম। কয়েকটা পাখি, দিনের বেলায় যাদের ডাক শোনা যায় না, শুনলাম। পাতলা, খারাপ কাগজে ছাপা, কিন্তু নিয়মিত দ্বিমাসিক কবিতাপত্রের ভেতরে যেন আকস্মিক কোনও পঙ্‌ক্তি! অক্ষয় নয় এই স্মৃতি। ভুলে যাব। কিন্তু আজ ভোরে এর থেকে বড় সত্যি আর কী আছে! এই কবিতাপত্র হাতে নেওয়ার মতো সত্যি।

একটা বাড়ি পরের আমগাছে অনেক আম। সেই গাছের কাছের ছাদে দু’জন। খালি গা, কোমরে গামছা। আম পাড়ছে একজন। আরেকজন জমাচ্ছে। হাত থেকে মাঝে মাঝে ছুড়ছে পাথরও। কিন্তু টিপ সম্ভবত লাগছে না। যে গাছে উঠে পাড়ছে, একবার তার কাছ থেকে কাঁচা খিস্তিও নতুন রোদের মতো ভেসে এল। সামনের ছাদে একটা সাদা-খয়েরি বিড়াল কী আশ্চর্য হয়ে যে তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই! গতিবিধি লক্ষ করছে। অনেক দিন আগে, শিবপুর বাজারে এক আমবিক্রেতাকে দেখেছিলাম, যে প্রবল গরমে ঘেমে-নেয়ে স্রেফ ‘সাগর, সাগর’ বলে চেঁচাচ্ছিল। মনে পড়ে, তার গলায় আলগোছে ফেলা ছিল গামছা। হয়তো প্রস্তুত ছিল সাগর স্নানের জন্য। ‘হিম’ শব্দটা রাখলে তার গরমবোধ কম হত।

লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাচীন এই ভোরবেলা আজ ছাদে কুড়িয়ে পেলাম। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কেউ ছাদে ওঠেননি? আজ একেবারে নতুন কি কিছুই হচ্ছে না– একথা আমি একাই ভাবছি, এরকম মনে করতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, ওই বিড়ালও এ নিয়ে চিন্তামগ্ন। না হলে সে এত অনুসন্ধিৎসু কেন? ওই বালক, যে হয়তো জীবনে প্রথমবার আম পাড়ার সঙ্গী হয়ে এসেছে, সে-ও তো এই অভিজ্ঞতায় নতুন। আমগাছের নীচে ওই শিরশিরে আমের গন্ধ তার শরীরে ঘুরছে এখন। বাড়ি গিয়ে ওই আম তৃপ্তি করে খাবে। আমি দেখতে পাই সেই সাদা আঁটি, বিন্দুমাত্র আম না-লেগে থাকা।

তারপর অনেক দিন কেটে যাবে। এই ভোর ও আমপাড়ার স্মৃতিও একেবারে পিছনের তাকে চলে যাবে তার। মাতৃগন্ধ, পিতৃগন্ধ হারিয়ে ফেলার পর এক প্রবল গ্রীষ্মে যদিও সে ফিরে পাবে এই আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার বিষণ্ণ ও তীব্র গন্ধ।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

শ্যামশ্রী রায় কর্মকার

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

শ্যা ম শ্রী   রা য়   ক র্ম কা র

shmyashree2

একটি আবহমান হত্যা ও ডিলান

১৯৬১ থেকে ২০২১ এক অভাবনীয় অতিক্রম, এক আশ্চর্য ছায়াপথ।  সেই পথের যাত্রা এখনো একই রকম  আলোকসম্ভব ও দ্যুতিবিজড়িত। মানুষের সীমা যেখানে শেষ হয় ঈশ্বরের সেখান থেকেই শুরু। কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা সেই সীমাকে অতিক্রম করে যান। তাঁদেরই একজন বব ডিলান। ঊনআশি এমন এক বয়স, যখন মানুষের আর কোনো দিকে দৌড়নোর নেই, সাফল্যের পেছনে ছোটার দায় নেই, ব্যর্থতার ভারে নুয়ে পড়ারও। তেমনই এক সন্ধিক্ষণে যদি কেউ গিটার হাতে নতুনের অত্যুজ্জ্বল বিভাময় একটি দিব্য বলয়ে আমাদের স্থাপন করেন, তখন তাঁকে মানুষের সীমা অতিক্রমকারী এক ঈশ্বর বলেই মনে হয়। প্রতিভার ঈশ্বর। 

ডিলান যেন এক অশেষের নাম। তিনি নিজেও সে কথা উপলব্ধি করেন বলেই লেখেন-  ‘I contain multitudes’। দু’হাজার কুড়ি সালে প্রকাশিত হয়েছে ডিলানের নতুন অ্যালবাম ‘রাফ অ্যান্ড রাউডি ওয়েজ’। স্বর্ণময় কেরিয়ার পার হয়ে বয়সের উপান্তে এসে নতুন অ্যালবামের ঝুঁকি নেওয়ার দাপট দেখানো ডিলানের পক্ষেই সম্ভব।

ডিলানের শ্রেষ্ঠতম গান কোনটি? এই প্রশ্নের উচ্চতায় এসে আছড়ে পড়বে অগুণতি লিরিক। জনপ্রিয়তম ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ নাকি রোমান্টিকতার চূড়ান্ত উপস্থাপন ‘ট্যাম্বোরিন ম্যান’!  ডিলানের নিজের পছন্দের তালিকায় উপরের দিকে থাকা মাস্টারপিস ‘ইটস অলরাইট মা’, নাকি আইরিশ এবং স্কটিশ ব্যালাডের  আদলে লেখা ‘টাইমস দে আর চেঞ্জিং’, কাকে বসানো হবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই; অন্তত নেই বলেই শ্রোতারা বিশ্বাস করেছেন এতকাল। কিন্তু অতিমারীর এই উচ্চকিত ষড়যন্ত্রের সময়ে ডিলান যখন ‘মার্ডার মোস্ট ফাউল’- এর মতো গান রচনা করেন, তখন আমাদের সঙ্গীতবোধ, জীবনবোধ ও ইতিহাসের স্মিত ধারণার ওপর দিয়ে ক্রমবর্ধমান জলস্তরের মতো গানটি প্রবাহিত হতে থাকে। আমাদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসতে থাকে। গানটি আমাদের ক্রমাগত  ঠেলতে ঠেলতে যেন এক নতুন ও স্বচ্ছতর উন্মোচনের দিকে নিয়ে যায়। সেই জলস্তরের নির্জন যেমন আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে, তেমনই বিহ্বল করে রাখে তার উন্মোচনের বৈভব। 

সতেরো মিনিটের এই গানটি ধীর লয়ে আমাদের একটি পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায়। সেই পরিক্রমার কেন্দ্র একটি হত্যা, সেই পরিক্রমার বিস্তার একটি ইতিহাস। উনিশশো তেষট্টি সালে ঘটে যাওয়া প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকে কেন্দ্র করে গানটি একটি অপটিক্যাল ইলিউশনের মতো আবর্তিত হতে থাকে। সেই আবর্তনের কোনো বিন্দু যদি বিটলসকে স্পর্শ করে, তবে কোনোটি রোলিং স্টোন, আবার কোনোটি প্যাটসি ক্লাইনকে।

সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর প্রত্যেক সমসাময়িক ঔজ্জ্বল্যকে তিনি বিশ্বস্ত হাতে ছুঁয়ে থাকেন এই প্রদক্ষিণে। গানটি শুরু হয় গল্পের ছলে- 

‘ডালাসের এক কালো দিন, তেষট্টি,  নভেম্বর

একদিন, এমন দিন, কলঙ্কের অধ্যায়

প্রেসিডেন্ট কেনেডি, শত সাফল্যের নায়ক 

যত উজ্জ্বল বাঁচার দিন, তত উজ্জ্বল মরার

উৎসর্গের আগে কেঁপে ওঠা মেষশাবকের মতো

তিনি বললেন, “বলো সত্যিই কি চিনেছো? আমায়?” 

“চিনেছি। হা হা! চিনেছি, আমরা জানিই তো তুমি কে-” 

বলতে বলতে গুলির আঘাতে ধ্বস্ত করে দিয়ে 

ওরা কুকুরের মত মেরেছিল তাকে প্রকাশ্যে, আলোয়

সময়ের খেলা ছিল সব। ওহে, সময়টা ছিল ঠিক 

অপরিশোধিত ঋণ ছিল, সব শোধ করো এইবার

ঘৃণা দিয়ে চেপে মারবো তোমাকে, অশ্রদ্ধা ছুঁড়ে ছুঁড়ে

শ্লেষে বিদ্রূপে মাখামাখি করে ছেড়ে দেবো রাস্তায় 

তোমার আসনে এবার কে? তাকে বসানো আমার দায়।’

গানটি খুব ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়; ভায়োলিন, পিয়ানো এবং হালকা পারকাসনের শৈল্পিক সঙ্গমদৃশ্যের ওপর দিয়ে সময়ের মতো মৃদু হয়ে বয়ে যেতে থাকে। ডিলানের কণ্ঠ এই গানের আরেক সম্পদ। গানের কথা যেভাবে হাওয়া মোরগের মতো দিক পরিবর্তন করতে থাকে, তাঁর কণ্ঠের অভিব্যক্তি যেভাবে লিরিকের ওপর দিয়ে অনায়াস দক্ষতায় বিচরণ করতে থাকে, শ্রোতা যেন এক চলৎশক্তিহীন গিনিপিগে পরিণত হন । গানটির আবর্ত থেকে তিনি কোনোভাবেই  নিজেকে মুক্ত করতে পারেন না। 

‘ওরা একবার তাকে মেরেছে, ওরা আবারও যেভাবে মারল

বলির বেদীতে বেঁধে রেখে তাকে কুপিয়ে কুপিয়ে কাটল

তার হত্যার সেই তারিখে, ভাবছি, কে যে বলেছিল আমাকে

ওহে খোকা! শুনে রাখ, শয়তান-যুগ এই সবে শুরু হয়েছে’

গানের এই অংশটি অবধারিতভাবে আমাদের খ্রিস্টের হত্যা এবং আশ্চর্য ভাবে গান্ধী হত্যার কথাও মনে করায়। সম্ভবত এই খ্রিস্টিয় অনুষঙ্গের  কারণেই রবীন্দ্রনাথের এই গানটিও অবচেতনে অনুরণিত হতে থাকে- 

‘একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে

রাজার দোহাই দিয়ে’… 

কেনেডি এখানে একটি ধারণা, একটি বিশ্বাস, ঠিক যেমন গান্ধী। সেই ধারণা, সেই বিশ্বাসকে যখন উপর্যুপরি হত্যা করা হয়, আমরা সকলেই, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, সেই হত্যার অংশীদার হয়ে পড়ি। কারণ আমরা হত্যাটিকে আটকাতে পারি না, আটকাবার চেষ্টা করি না, মেনে নিই। কেনেডি হত্যা বা গান্ধী হত্যা একটি আবহমান হত্যার সূচনা হয়ে ওঠে। ‘এইজ অফ অ্যান্টিক্রাইস্ট’ এখানে শুধুমাত্র ঈশ্বর বিরোধী একটা চেতনা নয়। ঈশ্বর আমাদের ভেতরকার পবিত্রতা, বিশ্বাস, আস্থা এবং অন্তর্নিহিত সু-চেতনার একটি প্রতীক। ঠিক যেমন ব্লেকের কবিতার সেই ল্যাম্ব বা বাইবেলের গল্পের মেষশাবকও একটি প্রতীক। ঈশ্বর স্বয়ং সেই মেষশাবকের প্রতিপালক। অর্থাৎ যতক্ষণ আমরা আমাদের অন্তঃস্থ পবিত্রতাকে লালন করছি, ততক্ষণ আমরাই ঈশ্বর। এই কবিতায় ডিলান কেনেডিকে সচেতনভাবেই সেই মেষশাবক বলে অভিহিত করেছেন। 

ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মহাত্মা গান্ধী হয়ে ওঠেন সেই পবিত্রতার প্রতীক, কল্যাণ কামনার প্রতীক; কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক নন। তাঁর সর্বজনগ্রাহীতা তাঁকে একটি মাত্র মতাদর্শের ঘেরাটোপে বন্দী থাকতে দেয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এখানে মানুষ কেনেডি বা মানুষ গান্ধী আর বিচার্য নন। তাঁদের ব্যক্তিগত কুৎসা বা দুর্বলতা আর বিচার্য নয়। তাঁরা তখন সমগ্র রাষ্ট্রের তথা পৃথিবীর পবিত্রতা, সারল্য ও বিশ্বাসের রূপক হয়ে ওঠেন।  ঠিক এই কারনেই আমরা তাঁদের হত্যার দায় থেকে মুক্ত হতে পারি না। ঠিক এই কারণেই ডিলান তাঁর এই কবিতায় বলেন,-  ‘অনলি ডেড ম্যান আর ফ্রি’। 

এ কথা আর আলাদাভাবে বলে দিতে হয় না যে ‘মার্ডার মোস্ট ফাউল’ আদতে একটি দীর্ঘ কবিতা। ডিলানের আরো অনেক গানের মতো এটিও শুধুই একটি গায়নযোগ্য ছন্দোবদ্ধতা নয়, পূর্ণমাত্রার কবিতা। ‘মার্ডার মোস্ট ফাউল’-এর শ্রবণযোগ্যতা এবং পাঠযোগ্যতা পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। কেউ কারো কক্ষপথ থেকে এতটুকুও বিচ্যুত হয় না। 

* ছবিটি গুগল থেকে সংগৃহীত।  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

অগ্নি রায়

অ গ্নি  রা য়ে র  ডা য়ে রি | পর্ব

অ গ্নি   রা য়

agniroy

রিনা ব্রাউন ও এক বৃষ্টি ভেজা ম্যাজিক স্পেল

দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে যত পথ তত মত! গড়িয়াহাট মোড়ের প্রহর শেষের আলোয় রাঙা চৈত্র সেলের দিকে যেতে চাইলে এক। হাজরা মোড়ের সিনেমা পাড়ার নুন শো-র জন্য অন্য। আবার সদাব্যস্ত বিরিয়ানিগন্ধী পার্ক সার্কাসের জন্য তার উল্টো।

সেগুলি আপাতত নয়। আজ এখানে পাততে বসেছি এর বাইরের সেই নির্জন রাস্তাটির ফাঁদ। বালিগঞ্জ ধাবার লাগোয়া বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, যা দু’পাশের অভিজাত, নীরব, খেলানো গাড়িবারান্দাওয়ালা বাড়ি, কৃষ্ণ ও রাধাচূড়ার রং কাটাকুটি, কাঠচাঁপা, দেওদার গাছের ফিসফাস নিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যায় অনন্তের দিকে। এই রাস্তায় শৈশব পুইয়ে কৈশোর কাটিয়ে ক্রমশ বয়ঃসন্ধির দিকে হেঁটে গিয়েছি স্কুল পোশাকে বছরের পর বছর। কখনও শরতের মেঘ মাথায়, অথবা ঝানু গ্রীষ্মে। দেওয়ালে তখনও কংগ্রেসের সাহসী শ্লোগান, ‘বন্যার ত্রাণে টাকা লুটেছি, মরিচ ঝাঁপিতে মানুষ মেরেছি, ভোট না দিলে খুন করবো আমরা সিপিএম’ (মাঝে আরও কিছু লাইন থাকতে পারে, আজ আর মনে নেই)। দেওয়ালে কাস্তে-হাতুড়ি-তারার গ্র্যাফিটি আর এক তরুণ নায়ক অনিল কাপুরের নতুন ছবি ‘সাহেব’-এর পোস্টার। ল্যাম্পপোস্ট আলো করে রয়েছেন তাপস পাল! হাতে গোনা প্রাইভেট বাস, অটো চলাচল নেই, মন্থর টানা রিকশার টুংটাং। আর ছিল মাটি ফুঁড়ে ওঠা একটি টকটকে লাল ডাকবাক্স। স্কুল যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে প্রায়শই ধরিয়ে দেওয়া হত নীল ইনল্যান্ড লেটার। ওই লালের মধ্যে নীল ঠিকানা লেখা চিঠি গলিয়ে দিয়ে আবার হাঁটা। রাস্তা এসে পড়ত ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে, যার উল্টোদিকেই আমার ফাইনাল গন্তব্য, অর্থাৎ বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল।  

কথায় কথায় জেনেছিলাম এই রাস্তাতেই নাকি থাকেন সুচিত্রা সেন। যাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছে বসুশ্রী-ইন্দিরা-পূর্ণতে, আর তার চেয়েও বেশি বিস্তীর্ণ পারিবারিক বড়োদের আড্ডায় থেকে, হল কালেকশনে! যাঁকে তখনও খুব কম হলেও মাঝে মাঝে দেখতে পায় নাকি কলকাতা। একবার তো আমারই মনে আছে, বাবার সঙ্গে এয়ারকন্ডিশন মার্কেটে গেছি আমি আর দিদি, একটি পরিচিত চশমার দোকানে। যাওয়ার পরেই পরম আক্ষেপে পরিচিত দোকানি বাবাকে বললেন, ‘এহ্ হে! এই তো মিসেস সেন এসেছিলেন, চটপট চলে গেলেন!’ তখন খুব ছোট হলেও, মনে আছে উত্তমের পরম ভক্ত বাবার মুখে ‘হারানো সুর’ আবার হারিয়ে ফেলার আক্ষেপ!

তো সে যাই হোক। একটু উঁচুর দিকের ক্লাস তখন। আচমকা ছুটি হয়ে গিয়েছ, বোধহয় রেনি ডে-র কারণেই। বাস চলছে না। বারবার হারিয়ে ফেলার কারণে তখন প্রায়শই ছাতাহীন আমি হেঁটে ফিরছি ফাঁড়ির দিকে, ওই রাস্তা দিয়ে। একটা সময় আর এগোনো যাচ্ছে না এমনই ধুম বৃষ্টি। সপ্তপর্ণী বলে একটি তৎকালীন মাল্টি-স্টোরিডের থেকে একটু এগিয়ে (নাকি পিছিয়ে?) একটি বড় ছাতিম জাতীয় গাছের নীচে কোনওমতে দাঁড়িয়ে আছি। হ্যাভারস্যাক (তাই বলা হত তখন) মাথায় ঢেকে, চশমা ঝাপসা।

একটি অ্যাম্বাসাডর গাড়ি এসে দাঁড়ালো সামনে বাঁদিকে। ঢুকবার কথা, কিন্তু বৃষ্টিজনিত কারণে সামনে কোনও বাধা, সাইড কাটতে একটু পাঁয়তারা কষতে হচ্ছে। পথ জনহীন আঁধারে বিলীন! এমনকি একটা কুকুরও নেই ভেজার জন্য। সম্ভবত স্কুল ড্রেস পরে একটি বেচারা কিশোরের ফ্রেম কৌতুহল তৈরি করে থাকবে গাড়ির সওয়ারির, বা অন্য কারণে, কাঁচটা নেমে গেল কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। এবং ছোটবেলা থেকে ভারী চশমার কাঁচ, আরও ঝাপসা জলের জন্য, সামনেও উপর্ঝরণ। কিন্তু তার মধ্যেও ওয়াশের কাজের মতো জানলায় একটি ছবি! যে ছবির জন্য তখনও কলকাতা পাগল। রিনা ব্রাউনকে তো, আগেই বলেছি, ততোদিনে দেখা হয়ে গিয়েছে নুন শো-এ। গায়ে কাঁটা দিয়েছিল? মনে নেই। যা ভাবছি তা সম্পূর্ণ ভুলও হতে পারে ওই ইলিউশনময় পরিবেশে। তবে এই কয়েক সেকেণ্ডে ওই ঘনঘোর বরিষায় এক কিশোরের ম্যাজিক স্পেল তৈরি হয়েছিল নির্ঘাত। বান ডেকে উঠেছিল ছাতিমের গন্ধে। কাঁচ উঠে যায়, এবং গাড়ি ঘুরে যায় যথারীতি। আমি গোলমেলে মাথা নিয়ে ভিজতেই থাকি।    

এর অনেক, অনেক পরে, মানে সম্পূর্ণ অন্য জন্মে, এই তো প্যানডেমিকের কিছু আগে, মুনমুন সেন ডেকেছিলেন ডিনারে। সেই বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড। সেই বাড়ি (যদিও এখন ভেঙেচুরে অনেকটা পাল্টে নেওয়া হয়েছে বলেছিলেন, আমার বোঝার কথা নয়)। ছবি তুলবো না এই আস্থা আছে বলেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন, সুচিত্রা সেনের ঘর, পুজোর জায়গা, টেবিল, আলমারি, বেলজিয়াম গ্লাসের পানপাত্র সমূহ।

না, সে সব দেখে আলাদা করে কোনও ম্যজিক তৈরি হয়নি। এমনকি গভীর রাতে বেরিয়ে নির্জন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে ওই বাড়ির সামনে দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে গাছটা খুঁজে পেলাম না আর। ছাতিমের ওই গন্ধটাও পঁয়ত্রিশ বছরের ওপার হতে ফিরে এলো না তো! আর ফেরার কথাও কি ছিল? সেই মুগ্ধ কিশোরটি হয়তো এখনও ওই ফ্রেমেই চিরবন্দি হয়ে আছে। ভরা বর্ষায়।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

পঙ্কজ চক্রবর্তী

উ দা সী ন  তাঁ ত ঘ র পর্ব

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

pankaj

সাম্প্রতিকের মায়াকান্না বনাম সাধারণ পাঠক

মনে পড়ছে আমার এক ছাত্রীর কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে গবেষণা শুরু করেছে কবিতা সিংহের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে। প্রায় দশ বারো বছর আগে কবিতা সিংহ’র বেশীরভাগ বই বাজারে পাওয়া যেত না। দীর্ঘদিন কোনো প্রকাশক তাঁর বই প্রকাশের কর্তব্য এবং আগ্রহ বোধ করেননি। শুধু ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আর দু-একটি পরিচিত উপন্যাস কেবল পাওয়া যায়। আমি ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কিছু লেখা জোগাড় করে দিলেও তা যথেষ্ট নয়। নিরুপায় অবস্থায় তাকে জানালাম কবিতা সিংহের মৃত্যুর পর খবরের কাগজে কয়েকজন লেখিকার শোকবার্তা ছাপা হয়েছিল। আশা করা যায় তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য অনেক বই মিলবে। সে বহু আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁদের বাড়িতে উপস্থিত হয়। অথচ কারোর কাছেই কবিতা সিংহের কোনো বই পাওয়া গেল না। কিন্তু খবরের কাগজে তাঁদের মূল দাবি ছিল, কবিতার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখিকা কোনো যোগ্য স্বীকৃতি পেলেন না। কারোর আবার ধারণা পুরুষতান্ত্রিক লেখালেখির ধারা নারী হিসেবে তাঁকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। যাঁরা এসব বলে মায়াকান্নার শোকলিপি তৈরি করেছিলেন, কার্যত দেখা গেল তাঁরাই পাঠক হিসেবে কবিতা সিংহকে উপযুক্ত মর্যাদা দেননি। আমাদের চারপাশে লেখকের স্বীকৃতির একটা বড়ো অংশই বায়বীয়, মিথ্যে কথার ফানুস মাত্র।

কবিতা সিংহের বই ছিল না তাঁদের কাছে, তার মানে এই নয় তাঁরা কবিতা সিংহের বই পড়েননি। কোনো বন্ধুর কাছ থেকে নিয়ে, অথবা স্থানীয় গ্রন্থাগার থেকে নিয়েও পড়া সম্ভব। আজ থেকে কুড়ি-তিরিশ বছর আগেও নানা সাধারণ গ্রন্থাগারে প্রচুর পাঠক নিয়মিত বইপত্র আদান প্রদান করতেন। বই কেনার সামর্থ্য থাকলেও লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে পড়ার আলাদা একটা পাঠক সমাজ ছিল শহরে এবং মফসসলে। সেইসব সাধারণ পাঠকের কেউ কবি বা লেখক নন। তাঁরা অনেকেই হয়তো ভাতঘুমের সঙ্গে বইটি ব্যবহার করেন। তাঁরা এমন এক পাঠকদল যাঁরা প্রায় পুনর্পাঠে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু প্রিয় লেখকের প্রতিটি বই পড়ার চেষ্টা করেন। এই নিতান্তই সাধারণ পাঠকেরাই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বিভিন্ন গ্রন্থাগারকে। তাঁদের বাঁকা চোখে দেখে আমরা ভেবেছিলাম এঁরা রুচিহীন অদীক্ষিত পাঠক। গোগ্রাসে তাঁরা বই গেলেন আর গোল গোল কাহিনির প্রতিই তাঁদের চোরাটান। আমরা জানতাম তাঁরা আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বা নারায়ণ সান্যাল পড়বেন, কিন্তু  কেউ কমলকুমার বা সন্দীপনের পাঠক হবেন না।  ‘এক ব্যাগ শংকর’-এর প্রতিই এঁদের যাবতীয় আকর্ষণ। মেধাবী দূরত্ব বজায় রেখে এঁদের প্রায় অশিক্ষিত লোকজন ভেবে একধরণের আত্মতৃপ্তি নিয়ে আমরা বড়ো হয়ে উঠছিলাম। পড়ার চেয়ে মিথের মূর্তি তৈরি করে আমরা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম লিটল ম্যাগাজিন অথবা দুরন্ত কবিসম্মেলনের দিকে।

তখন শহর এবং মফসসলে সরকার পোষিত অজস্র লাইব্রেরী ছিল। ছিল গুরুত্বপূর্ণ জেলা গ্রন্থাগার। সাধারণ পাঠক ন্যাশনাল লাইব্রেরী বা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো গ্রন্থাগারে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করতেন না। আর ছিল মূলত স্থানীয় শিক্ষিত মানুষদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি বিভিন্ন লাইব্রেরী পাড়ায় পাড়ায়। বেশ কিছুদিন আগেও একদল সক্রিয় মানুষের উদ্যোগে তৈরি হত এইসব ছোটো লাইব্রেরী বা স্থানীয় ক্লাব অথবা ব্যায়াম সমিতি। এইসব লাইব্রেরীতে শিক্ষিত বিভিন্ন ছেলেমেয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতেন বই ভালোবেসে। আর্থিক দুরবস্থা থাকলেও পাঠকের দাবি মেনে বিভিন্ন নতুন বই কেনার চেষ্টা ছিল। থাকতো দু-তিনটি খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিন। এসব  বিভিন্ন সহৃদয় মানুষের আর্থিক সহায়তায় তৈরি। আজ বিভিন্ন সরকারি লাইব্রেরী পাঠকের অভাবে বন্ধ। পাড়ার লাইব্রেরীগুলোরও একই অবস্থা। বই আছে অথচ পাঠক নেই। অনেক পাঠকই আজ লাইব্রেরী না গিয়ে নিজেই কিনে নিচ্ছেন নানা বই। বাড়ির ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর জৌলুস বাড়ছে। সেইসব রুচিবোধসম্পন্ন মানুষেরা আজ আর নেই। তাঁদের উত্তরপুরুষেরা রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী বা গ্রন্থাগার নির্মাণের স্বপ্নও দেখেন না। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর প্রয়োজনবোধটুকুও অবশিষ্ট নেই। লোকাল নেতার হাতে যাবতীয় সুখ-দুঃখ আর সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের ভার দিয়ে তাঁরা দূরে সরে গেছেন। এখন ছোটো পত্রিকা এবং প্রকাশনীর সুবর্ণযুগ। তাদের পাঠকেরা মূলত নিজেরাও কবি অথবা লেখক।  ছোটো প্রকাশনীর বইয়ের একটা বড়ো অংশের ক্রেতা বই কেনেন ব্যক্তিগত পরিচয়সূত্রে। সাধারণ পাঠক আজ এক বিলুপ্ত প্রাণী। কোথাও নেই অথবা হেমন্তদিনের ভ্রমণকারীর স্মৃতিলোকে আছেন।

মেধাবী দীক্ষিত পাঠক বা গবেষকের চেয়ে সাধারণ পাঠকের মূল্য এবং গুরুত্ব অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। তাঁরা একটি বই পড়ে শুধু ভালো মন্দের কথা বলেন। পাঠপ্রতিক্রিয়ার সুযোগ তাঁদের নেই। লেখককে তাঁরা চেনেন না। লেখকের নাম ছাড়াই বই পড়তে তাঁদের অসুবিধা নেই। আসলে তাঁদের জীবনে পাঠপ্রতিক্রিয়ার ফেসবুক ছিল না। লেখককে খুশি করতে লেখা এবং বিনিময়ে নিজের বইয়ের রিভিউ লিখিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ইস্তাহারে সাধারণ পাঠকের কোনো ভূমিকা নেই। তাঁরা কমলকুমার-অমিয়ভূষণ- ইলিয়াসের কেউ নন। কিন্তু বাংলাসাহিত্যে তাঁদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ন্যাশনাল লাইব্রেরীর চেয়েও এইসব স্থানীয় লাইব্রেরীর অবদান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিকাশে। সাহিত্যের পাঠশালা দীর্ঘদিন বেঁচে আছে সাধারণ পাঠকের জোরে।

আমার সেই গবেষক ছাত্রীটির কথায় ফিরে আসি। কবিতা সিংহের বইয়ের জন্য অনেক বড়ো লাইব্রেরী তাকে নিরাশ করেছে। শেষপর্যন্ত মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় লাইব্রেরী থেকে পাওয়া গেল কবিতা সিংহের প্রচুর বই। আর কবিতার বইগুলি পাওয়া গেল মণীন্দ্র গুপ্ত এবং দেবারতি মিত্রের সহায়তায়।  আরেকজন সহকর্মী গবেষকের কথা বলি। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে নিয়ে সে কাজ করতে চায়। তখন দু-একটি বই ছাড়া তাঁর কোনো বই বাজারে পাওয়া যায় না। অনেক অপেক্ষাকৃত বড়ো লাইব্রেরীতেও সব বই মিলল না। শেষপর্যন্ত বর্ডারের কাছের এক স্থানীয় গ্রন্থাগারে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর অনেক বই পাওয়া গেল। এই মুহুর্তে  মনে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকার কথা। বহুদিন আগে পড়া একটি উপন্যাস স্মৃতি থেকে তুলে আনেন তিনি। অথচ বইটি আর পাওয়া যায় না। আমাদের পাশের পাড়ায় মন্দিরের ভিতর কিছুটা জায়গা নিয়ে একটি ছোটো লাইব্রেরী ছিল। সরকার পোষিত নয় বরং কিছু মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে চলে। নিতান্তই ছোটো সেই লাইব্রেরীতে আমি পেয়ে যাই দুষ্প্রাপ্য বইটি। দীপালি দত্তরায়ের ‘লাল হলুদ সবুজ আলো নেই’ উপন্যাসটি। এছাড়াও উপরি হিসাবে লেখিকার আরেকটি উপন্যাস ‘বনসাই’ পাওয়া গেল। একটি স্কুলের ছোটো লাইব্রেরীতে আমি হঠাৎ পেয়ে যাই তারাপদ রায়ের প্রথম বই ‘তোমার প্রতিমা’র কৃত্তিবাস সংস্করণ। পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদসহ।  আরেকটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি লাইব্রেরীতে আমি দেখতে পাই পঞ্চাশের বিস্মৃত কবি দুর্গাদাস সরকার সম্পাদিত কয়েক খণ্ড বাঁধানো ‘মাসিক বাংলাদেশ’ পত্রিকার বেশ কিছু সংখ্যা। নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রণীত অনেক দুষ্প্রাপ্য বইও। অথচ আজকের প্রযুক্তির জীবনে এই সব স্থানীয় গ্রন্থাগারের কোনো মূল্য নেই। আজ আমরা অনেকখানি দরিদ্র হয়ে গেছি ভিতরে ভিতরে।

মফসসলের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলের সরকারী লাইব্রেরীর গ্রন্থাগারিকরা সুখে ছিলেন।  কোনো পাঠকের জিজ্ঞাসার উত্তর বা গবেষকদের সাহায্য করার ক্ষমতা বেশিরভাগের ছিল না। তাঁরা কেবল চাকরি করতেন। বই কেনার মরসুম এলে তাঁরা গ্রাহক পাঠকদের কাছে বইয়ের তালিকার আবেদন জানাতেন। সাধ্যমত সেসব বই কিনে জনরুচি বজায় রাখতে হত। কিন্তু আজ সেইসব অলৌকিক মানুষ কোথায়? যাঁরা সুদূর এক পাঠক বা গবেষকের কথা ভেবে প্রত্যন্ত লাইব্রেরীতে কবিতা সিংহের বা জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বইগুলি আনিয়ে রেখেছিলেন! কোন দুর্নিবার প্রাণশক্তি নিয়ে একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগের লাইব্রেরী  কোনো একদিনের পাঠকের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন দীপালি দত্তরায়ের বই? কোনো ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগটুকু না রেখে তাঁরা হারিয়ে গেছেন। আমাদের অগোচরে,  নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে তাঁরা সাহিত্যের অনেকগুলি দরজা খুলে দিয়েছিলেন সাধারণ পাঠকের জন্য। বিনিময়ে আস্ফালন বা বিষোদগার করেন নি। সেইসব অলীক মানুষের ছায়া আজ আর আমাদের জীবনে পড়ে না। সেইসব মানুষের উপর দিয়ে চলে গেছে মর্যাদাহীন হেমন্তের দিন। একটা হল্টস্টেশনের নির্জন রেলব্রিজের মতো তাঁরা ছিলেন নেই-মানুষের দলে নিজেকে যথাসাধ্য গোপন করে।

ইদানিং বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি পত্রপত্রিকায় বা সামাজিক মাধ্যমে বিস্মৃত কবি বা লেখকের পুনরুদ্ধার প্রকল্প। দু’টি পত্রিকার দু’জন সমালোচকের কথা বলি। তাঁরা যথাক্রমে সুশীলকুমার নন্দী এবং পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রতি পাঠকের উদাসীনতা নিয়ে অভিযোগ করেন। লেখার অর্ডার পাওয়ার আগে তাঁরাও যে উদাসীন ছিলেন সেকথা অবশ্য মনে রাখেন নি। অপরের দিকে অনুযোগের এই ভণ্ডামি আমাদের একধরনের মুদ্রাদোষ। সম্প্রতি ফেসবুকে নিত্য মালাকার, স্বদেশ সেন, শম্ভু রক্ষিতের কবিতা নিয়ে কিছু কবি বনাম পাঠক একহাত নিচ্ছেন যেসব পাঠক তাঁদের রচনা নিয়ে উদাসীন তাঁদের প্রতি। শুধু অনুযোগ নয় বরং বিষোদগার।  কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত না হলে কবিরা যে পাঠকের মনোযোগ পান না সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত। এই দলে একদিন তাঁরাও ছিলেন সেকথা বেমালুম চেপে যান। শুধু পাঠকের দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে সহমত মন্তব্য কুড়োন। একথা দোষের বলছি না। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য এবং প্রবণতা নিয়ে আপত্তি আছে। তাঁদের কাজ কবি সম্পর্কে বৃহত্তর পাঠকের মনোযোগ তৈরি করা। প্রয়োজনে সঠিক বিপণনের মাধ্যমে পাঠকের হাতে বই তুলে দেওয়া। এটুকুই। এর বেশি কোনো দাবি নয়। পাঠককে অযোগ্য ভাবার আগে তৈরি হওয়ার সুযোগটুকু তাঁরা করে দিতে পারেন। এই মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। বিস্মৃত কবির বদলে যে কোনো মূল্যে নিজের দিকে আলো টেনে নেওয়ার সুযোগ এবং পন্থা আমাদের ছাড়তে হবে।

আসলে এইসব মায়াকান্নার কোনো প্রয়োজন নেই। দরকার নেই কোনো অভিযোগের। বরং নিজের কাজটুকু নেপথ্যে থেকে করে যেতে হবে। সম্ভাবনার সমস্ত পথ খুলে রাখতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে সুদূর পাঠকের উপর। পরিযায়ী গবেষকের জন্য অকৃতজ্ঞতার দরজাও খোলা রাখতে হবে। শুধু লেখকের মৃত্যুর পর সস্তা বাইট দিয়ে অলৌকিক পাঠকের উপর দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ইতিহাস সেই ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেবে একদিন। আর আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে প্রযুক্তির সঙ্গে আমরা যেন আধুনিক চিন্তায় গ্রন্থাগার নির্মাণ করে নিই। সেইসব মানুষের আজও প্রয়োজন আছে যাঁরা নিজস্ব মননে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্মৃত অথচ গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের আবিষ্কারের পথ খোলা রাখেন।

আর, হে সাধারণ পাঠক, দিবানিদ্রা আকুল অথবা রাতের ঘুমে আপনার সঙ্গী ছিল বই। আমরা সমস্ত উপহাস ফিরিয়ে নিচ্ছি। আপনি যতক্ষন না আসছেন আমাদের আকুলতা শেষ হবে না। কবিবন্ধু-পাঠক আমরা পেয়েছি। তার অক্ষম ঈর্ষা আর নীরবতার রাজনীতি আমরা জানি। শুধু আপনার সামান্য ভালোমন্দ, বোবা মনের লজ্জাটুকু আমাদের দিন। হে সুদূর, আমাদের পিপাসা আজও আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-july

ভাঙা দেরাজের গল্প

ব ই ক থা  

অ ভি জি ৎ   পা ল চৌ ধু রী

avijit

কাব্যগ্রন্থ : ভাঙা দেরাজের গল্প

ভাঙা দেরাজের গল্প

মন্দিরা ঘোষ

প্রকাশক । বার্ণিক প্রকাশন

প্রচ্ছদ । কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

১২০ টাকা

এস্রাজের মোটিফ আঁকা প্রচ্ছদের নিচে যে ভাঙা দেরাজ সেখানে এক ভালোবাসাময় জগতের আকাশ আর অনিবার্য প্রেম-বিরহ-বিষাদের রাগ রাগিনী । দেরাজটি ভাঙা কেন? হয়তো সময়োত্তীর্ণ তাই । অনুভবের পরতে পরতে যে দেখা থাকে তারই যেন এক বাঙ্ময় চিত্রকর্ম – কবি মন্দিরা ঘোষের চতুর্থ কাব্য সংকলন ‘ভাঙা দেরাজের গল্প’।

দেরাজের প্রতিটি প্রকোষ্ঠের গল্প মন্দিরার সিগনেচার শব্দবন্ধ, মেটাফর ও অ্যালিগরির ঔজ্বল্যে মানবিক বোধ এবং বৌদ্ধিক চেতনার দিগন্তকে প্রসারিত করে পাঠককে এক অনন্য অনুভবে জারিত করে । এইখানেই হয়তো এই কাব্য সংকলনটি সফলতার ভিকট্রি ল্যাপে দড়িটা ছুঁয়ে ফেলে !

গ্রামের ভেঙেপড়া জমিদার বাড়ি, রাঙা ধুলোর পথ, শাল-পিয়ালের জঙ্গল পেরিয়ে এসে যিনি হাওড়া শহরের একটি বর্ধিষ্ণু পরিবারের গৃহবধূর নিশ্চিন্ত জীবন আঁকড়ে ধরে থাকতে পারতেন, তিনি স্বপ্রতিভায় ও অদম্য অধ্যাবসায়ে তাঁর চতুর্থ কাব্য সংকলনটি নিয়ে পাঠকের দরবারে হাজির হচ্ছেন, ঘোষণা করছেন – “গুটিপোকার পরম্পরা আর নাগরিক হতাশার কুয়ো থেকে/ উঠে আসে ভাঙা দেরাজের গল্প”  – ভাঙা দেরাজের গল্প / পৃ ১১

যে দার্শনিক বোধের পঙক্তিটি বর্তমান লেখাটির শিরোনাম সেটি “ফলাফল হারিয়ে যায়” কবিতা (পৃ ১৩) প্রারম্ভিক পঙক্তি যার শেষ স্তবকের – “নাভির দেবতার পাতে সন্ধি আচার /বৃন্তপলাশের ঘুম ভাঙা মুহূর্ত /রক্তের তছনছ/ ছেঁড়াখোঁড়া যুদ্ধের পাতায় ফলাফল হারিয়ে যায়” ব্যঞ্জনাটি চিরকালীন।

যাপনের অন্তক্ষরণে বিষাদের সুর আছড়ে পড়ে “ঢেউ” কবিতাটিতে (পৃ ১৫) – “এত ঝড়, স্তব্ধতা, অন্ধকার ! এত কান্না কুড়ানো মেঘ! এত শ্রাবণগন্ধ শোক ! / কাকে নেবো আমি!”

অথবা “দেয়ালে কান্না খুঁড়ছে সরীসৃপের নখ, ম্যাতিসের জয় অফ লাইফ থেকে গড়িয়ে পড়ছে /শরীরের উপপাঠ।” কবিতাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে “বিষাদের মহাসংগম”।

মানবিক সম্পর্কটি যেন পুনরসংজ্ঞায়িত হয় “হিন্দোল” কবিতাটির (পৃ ১৬) এই পঙক্তিতে – “একটা সম্পর্ক আলোর মতো/ যাকে ঠিক না ছুঁলেও কাছে আসে অথবা আসে না / যাকে মাত্রাজ্ঞানে আটকে রাখে সুতো কিংবা সুতোর মতো আড়াল” ।

বর্তমান অতিমারী সময়ের একটি দলিল হয়ে উঠেছে ভাঙা দেরাজের এক একটি কবিতা। সভ্যতার বেপরোয়া ঔদ্ধত্য পরাজিত হয়েছে ভয়ঙ্কর অতিমারীর সংক্রমণে । তাই উচ্চারিত হয় –

“এগোনোর কাছে হাঁটু ভেঙে গেছে মিছিলের”

বা “ভয় জড়িয়ে নিয়েছি স্নায়ুর অভিসারে/ ক্রমশ সাদা হতে থাকা আঙুলে মৃত্যুর ক্যাকোফোনি /অন্তরীণ আকাশে ঢুকে পড়েছে স্যানিটাইজার এর গন্ধ” । অন্তরীণ সময়ের একাকীত্বের অনুভবটি বিম্বিত হয়েছে – “দুহাতে মেঘ ধরে বসে আছি /বুকের সিস্মোগ্রাফের ছবিতে হারিয়ে যাচ্ছে রক্তের কম্পন /পুরোনো গিটারের পিকগ্লাইডে গড়িয়ে পড়ছে /আলোর মতো তোমার স্পর্শ দিনের তালিকা”। সেই অনুভবের আকুল আর্তিটি ধরা থাকে শেষ স্তবকে কবিগুরুর গানের মূর্ছনায় – ‘হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো /দাও গো আমার হাতে-/ ধরব তারে, ভরব তারে, রাখব তারে সাথে’– হে বন্ধু হে প্রিয় / (পৃ ১৭)

এই অতিমারী কারণে অন্তরীণ যাপনের ছন্দোবদ্ধ অনুভূতির ছবিটি আঁকা হয় “থমকে থাকার খেলা” কবিতায় (পৃ ২১) ।

আতঙ্কগ্রস্ত সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের নৈরাশ্য আর বাঁচার লড়াইটিও বিধৃত “মানবতাহীন” কবিতায় (পৃ ২২)।

একদিন এই দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার আলো জ্বলে ওঠে মন্দিরার সুনিপুণ অক্ষরমালায় –

“সব বন্দী আলো রোদ হয়ে ওঠার অপেক্ষায়/ করাতকলে কাটা পড়ছে পাখির পায়ের দাগ/ নামাজের রং মেখে এবার উঠে দাঁড়াবে /ছেঁড়া ছেঁড়া সবুজ জনপদ”।

তবু সংবেদনশীল অনুভবের লেন্সে ধরা পড়ে – “এখনো গ্রিলের গায়ে লেগে থাকা/ বৃষ্টি ফোঁটা সাবালক হলো না বলে /জলাশয় হয়ে উঠছে ঘর”। – দুর্যোগ কাটিয়ে / (পৃ ২৩)

সময়ের ভাইরাস মেটামরফসিসে কিভাবে সম্পর্কের ভাইরাস হয়ে ওঠে তার ছবি “মাক্ষিক ভোর” কবিতাটিতে-

“ঝলমলে রোদেও জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু অন্ধকারের গোপন /প্রতিষেধক হীন ব্যাধিঘুমের চোখে নির্ঘুম রাতের আঁচড় / উড়ে আসে পুরোনো চিঠির বাষ্প, দারুণ দিনের উষ্মা ঘর /ছোটো ছোটো ঢেউ মাখা ঝিনুককলহ/ উন্মাদ নখের দাগের কালশিটে মেলানিনের শতসহ্যের বিষযাপন !” – মাক্ষিক ভোর / (পৃ ২৬)

সচেতন কবির উচ্চারণে সতর্কবাণীটিও শোনা যায় – “তোমরা এখনো বিবদমান !/ হাত ছুঁয়ে দ্যাখো/ শত্রুতার আগুন নয়/ ঠাণ্ডা পাথর হয়ে উঠছে আঙ্গুল” – মৃত্যুর গন্ধ / (পৃ ২৭)

“কীভাবে বাঁচাবো / প্রিয় সৃষ্টিসুখ মানুষ তোমায় !” অসহনীয় সময়ের বেড়াজালে অসহায় পৃথিবীর আর্তি আঁকা হয়ে যায়।

– অসহায় পৃথিবী / (পৃ ২৮)

“অন্ধকার একদিন জার্সি বদল করবেই” – এমন আত্মবিশ্বাসী পজেটিভ ন্যারেটিভে শেষ হয় “যখন কোন অবরুদ্ধ রাস্তার নাম ভাইরাস” কবিতাটি (পৃ ২০)।

জীবনে নারী পুরুষের ভালোবাসার আকাশটি মুখ তুলে নীল ছড়ায় যখন “হালকা নীল টিশার্টে সমুদ্রের গন্ধ” প্রাণের জোয়ারে ডাকে “গোলাপি টপে উপচে পড়া ঢেউ” আর তার  “সিস্মোগ্রাফ”-কে । তখনই “একটার পর একটা প্ল্যাটফর্মের আলো /পেরোতে পেরোতে লেখা হয়ে যায় /অজস্র মুখের হিজিবিজি কবিতা” – ট্রেনজার্নি / (পৃ ১৮)

‘ভোরের সাক্ষাৎকার” কবিতাটির (পৃ ১৯) ক্লোজ শট্ –এ “দিনের শাড়িতে মেলা মন খারাপের হলুদ জ্যোৎস্না/ দীর্ঘশ্বাসের কলমে মেঘলা আকাশ।“ অথবা “নিঃসঙ্গতার ঝড় খুঁজে রাখছে একলা কোনো বুকের ভূগোল” । একাকীত্বের রঙে আঁকা ক্যানভাসটি । কিংবা এক অনিবার্য বোধের অকপট উচ্চারণ – “সব অকপট জানলায় দাঁড়িয়ে স্বার্থের গোপন সিঁড়ি ।” একাকীত্বের আরো একটি বিষাদময় ক্যানভাস “বিকেলবাড়ি” কবিতাটিতে (পৃ ২৯)- “একা একা রংচটা ব্লাউজ ব্যথা সেলাই করে /বালিশের ঢাকায় মোড়া তিতিরের গন্ধ/ কাঁসার থালায় ফুলকাটা বিকেলবাড়ির গান”। শেষ স্তবকের  সেই অমোঘ দেখাটি – “হয়তো নীল খামের বিষণ্ণ অক্ষর /অপেক্ষা  আঁকছে একা”।

হারিয়ে যাওয়া সময়ের যন্ত্রণার করুণ সুরটি শোনা যায় – “জানি সবটাই একার বিলাপ/ সকালের চায়ের কাপের নীচে / ভেসে ওঠে ছেঁড়া বুকের বোতাম” অথবা “আমরা তো ছিলাম কোথাও তুমুলভাবে /সমস্ত নগ্নতায় দাঁড়ি টেনে /ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ সহবাসে” পঙক্তিগুলিতে। আবার হৃত অতীত এবং বিপ্রতীপ বর্তমানের অভিঘাতে বেজে ওঠে অনন্য বোধের রাগিণী –

“পুকুরের পাড় ঘেঁষে উন্মাদ জীবন /কোন অলৌকিক অভিশাপের /ছিল কিনা জানা নেই /এঁটো আঙুলগুলিতে এখনো /ভোরের বিস্ময় জল ঝরে পড়া দেখি” -অলৌকিক অভিশাপগুলি / (পৃ ৩০)

হঠাৎ বাতাসে দুলে ওঠা পর্দার মতো শাশ্বত প্রেমের বন্দিশটি ধরা পড়ে যখন লেখা হয় –

“হঠাৎ খসে পড়া পর্দার অনুচ্ছেদে/ ঝিঁঝিঁ পোকার ক্যারল / এসে পড়ে আলোর মতো তোমার মুখ / আর আমার এলোমেলো চুলের গোছা সরিয়ে দাও দু’হাতে” – ডিসেম্বর / (পৃ ৪২)

ছয়টি ছোটো ছোটো কবিতার সিঁড়ি বেয়ে এক অনাবিল উত্তরণে প্রেমিককে শিরোনামে বসিয়েছেন প্রেমিকা কবি বিশুদ্ধ উচ্চারণে আন্তরিক অনুভবে – “যেভাবে গাছের কাছে ছায়া/ নদীর কাছে জল /যেভাবে আগুনের কাছে অক্ষর / পাখির কাছে উড়ান আর / তুলির কাছে রং/ সেভাবেই আমার শিরোনামে তুমি” অথবা “তারে তারে সেতারের ঘুম/ চুরি করো কবিয়াল/এ জোৎস্না ভরে নাও ঠোঁটে” – শিরোনামে তুমি / (পৃ ৪৩-৪৪)

ভালোবাসার চিরন্তন রূপটি অরূপ হয়ে ধরা দেয়-  “অবাধ্য শ্রাবণ যেন নিয়ম না মানা শিশু/ সব কথা ভুলে যখন তখন/ ভিজিয়ে দেয় সব” – স্তবকটির অনুভবে । ভালোবাসি / (পৃ ৪৮) প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদের যন্ত্রণাস্রোত কবিতার সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে নেমে পাঠককে ভেজায় যখন,  মন্দিরা লেখেন – “বন্ধুহীন কোন শীতের বারান্দায় দুলছে হলুদ শার্টের উদাসীনতা/ রাত জাগা ঘড়ির কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত ভার্চুয়াল টিপ/ একটা রুলটানা ভোরের পাতা একা একা এলোমেলো হচ্ছে কেবল”। অলিখিত / (পৃ ৫৫)

আবার প্রেমিকার অভিমানের সুরটি কবির অনুভবের এস্রাজে বেজে ওঠে “ভালো থেকো” কবিতাটির (পৃ ৫৯) অন্তিম স্তবকে –

“গাছের পাতা রইল চুপ /হতভম্ব পাখি ভিজে একসা!/ চোখের ভিতর টলটলে নদী /সাদা খাতায় নোনা অক্ষর /ফুলে ফুলে উঠলো”

দাম্পত্য জীবনের দায়বদ্ধতায় ও সাংসারিক জীবনের প্রাত্যহিকতায় সংস্কারের আড়ালেও

চিরপ্রেমিকের অধিষ্ঠানটি সূচিত হয়  “ভ্রুণপর্ব” কবিতার (পৃ ৬২) এই উচ্চারণে –

“আজও আবহে বালিকা বিকেল /শাঁখ সন্ধ্যায় সিঁদুরের প্রণিপাত /গরদ শাড়ির ভাঁজে শুয়ে /সমস্ত অনুধ্যানে তোমার নীল পদক্ষেপ/ ভ্রুণপর্বের সূচক হয়ে ওঠে”

“আত্মহননের শেষতম বিন্দুর কাছ থেকেও/ ফিরে আসা যায় /যদি স্বপ্নেরা ধরে থাকে হাত/ যে ভাবে ফিরে আসে কবিতা…” – ফেরা / (পৃ ৬০)

ভাঙা দেরাজে জীবনের জয়গানের মণিমুক্তো গুলি এভাবেই রাখা আছে আন্তরিক অনুভবী পাঠকের প্রতীক্ষায় । গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় বিশুদ্ধ প্রাণের অমোঘ মন্ত্রটি ভালোবাসার আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়ে –

“স্পর্শ পেরিয়ে পেরিয়ে / শরীরে সেতার খুলি/ তারে তারে ছল ছল জল”।  -স্পর্শ / (পৃ ৬৪)

আরও পড়ুন...