Categories
2021-june

রূপক বর্ধন রায়

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ৬

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ বিজ্ঞানী…

রূ প ক   ব র্ধ ন   রা য়

rupak

নারী শহরের সম্পদ

হেলেন কাদো ( Helene Cadou)

জন্ম | ৪ঠা জুন, ১৯২২, মেসকের (লোয়ার-আতলান্তিক)

মৃত্যু | ২০শে জুন ২০১৬, নানতেস।

111313411

বিখ্যাত ফরাসী কবি ‘রেনে গুই কাদো’-র স্ত্রী হেলেন কাদো তাঁর জীবনের মূল সময় রেনে’র উপর কাজের মাঝেই কাটিয়েছেন।  কিন্তু তাঁর কাজকে শুধুমাত্র সেই পরিসরটুকুর মধ্যে থেকে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। 

দর্শনতত্ত্বে পড়াশোনা শুরু করলেও ১৯৩৮ সালে টিউবারকুলসিসে রোগগ্রস্ত হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষায় বাধা পড়ে। সুস্থ হওয়ার পরে হেলেন কবিতায় নিজেকে নিমজ্জিত করেন, এবং সেই সময়েই রেনের কবিতার সঙ্গে পরিচয় ঘটে যুবতী হেলেনের। ১৯৪৩ সালে কিছু বন্ধুদের সঙ্গে করা “Sillages” নামক একটি কবিতা সংকলনে প্রথম নিজের কাজ প্রকাশ করেন। লেখা প্রকাশিত হয় ‘ক্লেয়ার জরদান্ন’ এই ছদ্মনামে। এই কাজ ও বন্ধুদের হাত ধরেই প্রথম রেনের সঙ্গে পরিচয় ও ধীরে ধীরে প্রণয়। ১৯৪৩-১৯৪৪ এই একটি বছর হেলেন নিজের বোনের কাছে বোরদুতে কাটান। রেনের বিভিন্ন কাজে – মূলত ‘লরমঁ’ ও ‘রু দু সাং’ লেখাদু’টিতে বোরদুতে চলা সেই তরঙ্গায়িত প্রেমের ছোঁওয়া মেলে। এরপর ১৯৪৬ সালের ২৩ এপ্রিল দু’জনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময় থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত খুব অল্পই লেখালেখি করেছিলেন হেলেন। ১৯৫১ সালে রেনের মৃত্যুর পর ওরলিয়ঁন-তে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কাজ শুরু করেন। রেনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুদের সাহায্যে ওরলিয়ঁন শহরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন হেলেন। 

১৯৫৬ ও ১৯৫৮ সালে হেলেনের প্রথম দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তারও প্রায় দুই দশক পরে কবি হেলেন কাদো আমাদের সামনে সম্পূর্নভাবে প্রস্ফুটিত হন। ১৯৭৭ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২৩। এই একই সময়কালে দর্শনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করেন। মাস্টার ডিগ্রির থিসিসের কাজও রেনের কবিতায় মৃত্যু চেতনার উপর। ১৯৮৭ সালে রিটায়ারমেন্টের পর নিজের কাব্য সাধনা ছাড়াও রেনের কবিতা আরও বহুল পরিমাণে মানুষের মাঝে নিয়ে আসার চেষ্টা করে গেছেন। ১৯৯৩ সালে নানতেস শহরে ফিরে আসার পর সরকারের সাহায্যে মিডিয়া লাইব্রেরির বাড়িটিতেই ‘Center René-Guy-Cadou’ তৈরি করেন। ২০০৮ সাল অবধি নানতেস ও রেনের স্মৃতি-সমৃদ্ধ লুইফার্ট শহরের মধ্যে ভাগাভাগি করে জীবন কাটিয়েছেন। আরও কিছু বছর পর লুইফার্ট স্কুল  “La Demeure René-Guy-Cadou”, a writer’s house museum-এ রূপান্তরিত হয়। ২০১৯ সালে সেই স্থাপত্যের নামকরণ হয় “Demeure René Guy et Hélène Cadou”, museum and place of residence of artists and writers। 

হেলেন তাঁর নিজের এবং রেনের সমস্ত কাজের পুথি নানতেস শহরকে দান করে যান। সেই সমস্ত কাজ নানতেস মিউনিসিপাল লাইব্রেরিতে বহু যত্নে রাখা রয়েছে। জীবনের শেষের দিকে তাঁর ও রেনের একসঙ্গে কাটানো জীবন নিয়ে একটি স্মরণিকাও প্রকাশ করেন।

প্রধান কাজ

  • HAPPINESSOF THE DAY, ১৯৫৬
  • Cantata of the interior nights,  ১৯৫৮
  • The pilgrims seeking clover, ১৯৭৭
  • Long rains from the West , ১৯৮৩
  • Poems of Time Rediscovered , ১৯৮৫
  • The memory of water, ১৯৯৩
  • A whole life: René Guy Cadou, death, poetry, ২০০৩

হেলেন কাদোর কবিতা

দৌড়ের মাঝে…

সময়ের কাল-ছুটে

একটাই মুখ থেকে যায়

ছবি নষ্টের কালে

বর্তমান প্রাসঙ্গিকতার খোঁজে

আমি যার কাছে যাই

 

সে তোমার চাহনি যা আমায় গভীর বনে

পথ দেখায়

তোমার কথা যা আমার দেয় আচ্ছাদন 

দেয় রঙ ও স্বচ্ছতা

তোমার কাছে কি আমি আমার মতো কথা বলি

স্বপ্ন ও যাদুর অগোছালো ভয়গুলোর ভিতর

তুমি গভীরে প্রবেশ করো

 

যে মুহুর্তে আমি তোমায় খুঁজে পাই

আমাদের জীবন আবারও মিলিত হয়

আমরা বাস করি একই আস্তানায়

পৃথিবীর গ্রীষ্মের উপর প্রস্ফুটিত হই

মরণশীল বিভাজনের ওপাশে

উষ্ণ নাভির পৃথিবী অন্তহীন আকাশ।

 

তারপর তুমি আমায় দাও গম

আর চিরজীবী কালঝর্ণার থেকে

এই এক মিনিট

শাশ্বত বসন্তের অশ্রুর মত

আমাদের লহু-মুক্তির সমন্বয়।

শরীরটা…

শরীরটা এলোমেলো জঙ্গল

যেখানে ব্যথা ও রক্ত মাংসের

দুর্ভেদ্য বয়নের ভিতর

কথার ঘনত্ব বাড়ে

কিন্তু চামড়ার অভ্যন্তরে সোহাগ

এক শব্দের খসড়া এঁকে দেয়।

প্রতীক ও খিঁচুনি প্রদান করে অর্থ।

 

উন্মুক্ত হৃদয়ে…

উন্মুক্ত হৃদয়ে

আমাদের জীবন

একটা বইয়ের মতো

 

এক বিস্মিত শিশুর

বিবর্ণ ভীতি নিয়ে

তুমি বলেছিলে

সে তো কালপূর্বে

নির্দিষ্ট ছিল

 

কিন্তু আমি উল্টোদিকে পালটে ফেলি পাতা

টুকরো করি সময়

 

কারণ বিশৃঙ্খল লাবণ্যের মাঝে

তোমার শব্দ-সীমা বিস্ফারিত হয়

 

যাতে ইতিহাসের আগ্রহ

তার রাজকীয় সীলমোহর

 

আজ

তুষার অগ্নি

ও তোমার শরীরের আঁকিবুকি

 

আজ সেদিন

উৎসহীন অপার মাটি থেকে

যেদিন তুমি আমার কাছে পৌঁছে যাও

 

প্রান্তসীমায়…

প্রান্তসীমায়

মৌমাছিদের সুদূর গুঞ্জন ছাড়া আর

কিছু নয়

 

ম্লান হতে থাকা এক পদক্ষেপ

 

একটা পাতা তার গাছ ছেড়ে গেছে

এক প্রতিবিম্ব তার উপকূলে টিকে থাকে

 

প্লাবনের মত আসে 

পবিত্র দিন

শূন্যতার প্রান্তে

আর অপেক্ষমানতা নেই

 

প্রথম চাহনি থেকেই সব

সেখানে বিদ্যমান

 

চিরন্তন নিস্তব্ধতার উপর

সম্পূর্ণ ফোকাস

 

সেই মহান স্বচ্ছতা…

সেই মহান স্বচ্ছতা

যা তোমার কাছে এসেছিল

 

এই স্থানে

 

রুগ্ন ঘরটায়

দাগানো সময়ের

এই দিনে

 

কয়েকশো বার

তুমি তাকে হারিয়েছ

পেয়েছ খুঁজে

 

হারিয়েছ

 

তা কখনও 

না বুঝে

শূন্য গভীরতার চেয়েও

স্বচ্ছতা

কত স্পষ্ট ভাবে প্রদত্ত

 

তোমার কবিতার ছাদে

সেই ধোঁয়াশা

সেই নোনতাভাব

সেই অনস্তিত্ব

 

তোমার জন্য এক সংরক্ষিত পৃথিবী

উন্মোচিত করে

* ক্রমশ  

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৬

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৬

অ দি তি   ব সু রা য়

aditibasu_hm

ডানাভাঙাদের শুশ্রুষার কাহিনি...

ছবির নাম । সাবিবুর

পরিচালক । কনস্টানটিন কাবেনস্কি

দেশ । রাশিয়া

অভিনয় । নাওমি ওয়াটস, আন্ড্রু লিঙ্কন, রেচেল হাউস

গল্পটা শুরু জার্মানিতে। হিটলারের গণহত্যার সিরিজে সাবিবুর ক্যাম্পের গুরুত্ব একেবারে অন্য।  পোল্যান্ডের এই সাবিবুর নামের ক্যাম্পে, ইহুদিদের পাঠানো হত, গ্যাসচেম্বারে হত্যা করার জন্য। হিটলারের নির্দেশে। কিন্তু এই সাবিবুর ক্যাম্পেই এমন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যায়, যা স্বয়ং হিটলারকেও চিন্তায় ফেলে দিতে বাধ্য করে। এখানে ক্যাম্পের বন্দিদের অত্যাচার থেকে উঠে আসার কথার সাক্ষী, ইতিহাস। রাশিয়ার ইহুদি নাগরিক আলেকজান্ডার পেকারস্কি এই ছবির হিরো। লাল আর্মির লেফটেন্যান্ট আলেকজান্ডার গোড়া থেকেই চরমপন্থী। ক্যাম্পের নির্বিচার হত্যা, অত্যাচার, নিষ্টুরতার বিরুদ্ধে তিনি, গোপনে অন্যান্য বন্দিদের একত্রিত করেন। প্রহরীদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে এই কাজ যে অত্যন্ত কঠিন ছিল – তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, সেনা অফিসারদের বজ্র-আঁটুনিকে তুচ্ছ করে, সাবিবুর ক্যাম্পের প্রায় তিনশো জন মৃত্যুর প্রহর–গোণা মানুষ, মুক্তি অর্জন করে।  সাবিবুর, আদতে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্থানের ছবি। যেখানে শত-শেকলকে হারিয়ে দিয়েছিল, একদল মুক্তিকামী মানুষের জেদ ও প্রত্যয়। 

স্বাধীনতার থেকে বড় বেঁচে থাকার শর্ত যে হয় না – তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল, এই ক্যাম্পে আটকে থাকা প্রতিটি নারী-পুরুষ। আর তাদের মনের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা আগুনের শিখাটিকে জ্বালিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, আলেকজান্ডার পেকারস্কি। একজন প্রকৃ্ত কমান্ডারের মতোই তিনি বারুদের গন্ধ জাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বন্দি শিবিরে। শুধু ইহুদি হওয়ার ‘অপরাধে’ যে সব অসংখ্য নির্বিরোধী নরনারী ও শিশু হিটলার নামের দানবটির প্ররোচনায় প্রাণ হারান – সাবিবুর ছবিটি সেই সব অকালে শেষ হয়ে যাওয়া মনুষ্য – প্রাণগুলিকে স্মরণ রেখে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, আসলে  লড়াইয়ের কোনও  বিকল্প নেই। মনে করিয়ে দেয়, শ্বাস নেওয়া প্রতিটি মুহুর্তেই জন্ম দেওয়া যায় পরবর্তী প্রতিশ্রুতির। ১৯৪৩ সালের ওই মরণকূপ থেকে যেভাবে প্রায় তিনশো বন্দি, বেরিয়ে আসে, তা দৃষ্টান্ত-স্বরূপ। যুদ্ধ- বন্দুক – পাহারা – শোষণ সবকিছুকেই হারিয়ে দিতে পারে, মনোবল এবং সদিচ্ছা। সাবিবুর, সেই উড়ালের গল্প। সাবিবুর, ডানাভাঙাদের শুশ্রুষার কাহিনি।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

কাঁচা মাংসের বাড়ি

ব ই ক থা  

মৃ ণা লি নী

mrinalini2

কাব্যগ্রন্থ : কাঁচা মাংসের বাড়ি

কাঁচা মাংসের বাড়ি

সেলিম মন্ডল

প্রকাশক । ইতিকথা পাবলিকেশন

প্রচ্ছদ । রাজীব দত্ত

১৫০ টাকা

সেলিমের “কাঁচা মাংসের বাড়ি” বইটি নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ভাবে, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করেছেন। আসলে কবিতা তো একটি ভাব, ভাবের একটি আশ্চর্য মুহূর্ত, যা বিভিন্ন বাতাবরণে ছুঁয়ে যায় পাঠকমন। একটি অসামান্য বই নিয়ে আলোচনা নয়, নিজের পাঠ অভিজ্ঞতা লিখতে বসেছি।

“মায়াজন্ম” বইয়ে যে সম্ভবনা তারই পরিপূর্ণ ইঙ্গিত “কাঁচা মাংসের বাড়ি”। সেলিমের পাঠক মাত্রেই জানেন, চিরাচরিত রাস্তায় তাঁর কবিতা কোনদিন বিচরণ করেনি। চিত্রকল্প বা ছন্দময় অনুভূতির চেয়েও কবিতা অনেকবেশি ভাবের, আশ্চর্য বোধের যা তাড়িয়ে বেড়ায় কাঁচা মাংসের বাড়ির ভেতর, প্রত্যেকটি জানালা দরজার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঢুকে পড়ে আশ্চর্য অথচ মর্মাহত জীবনাবেগ যা বিষন্নতা রঙের নয়, বরং বোধের হাতছানির রামধনু, কবিতার ঘরে বসে পাঠক মনও রাঙিয়ে নেন চেতনার রঙ। সেলিমের কবিতার স্ট্রাকচার শর্তসাপেক্ষ নয় বরং স্বতঃস্ফূর্ত ভাবোচ্ছ্বাসের বিন্দু বিন্যাসে গড়ে ওঠা কবিতার শরীর, কাঁচা মাংসের শরীর।

বইয়ের উৎসর্গে লিখেছেন, মুনাইয়ের কথা
“বিষণ্ণ গঙ্গাপার ও গঙ্গাপারের সেই আশ্চর্যময়ী নারী মুনাইকে…”

“দু-কামরার বাড়ি
এক কামরায় মা-বাবা,আরেক কামরায় থাকে মুনাই
আমি থাকি বারান্দায়
আমি এক অভিজ্ঞ কসাই
একবার এঘর থেকে কাঁচা মাংস কেটে আনি, আরেকবার ওঘর থেকে
মাংস ফুরোয় না, খরিদ্দারের ভিড় বাড়ে
আমি কাঁচা মাংসের বাড়িতে হয়ে উঠি সফল ব্যবসাদার”

তাই কাঁচা মাংসের বাড়িতে একটি আয়না, ” আমরা সকলেই মুখ দেখি
কী আশ্চর্য, একটিই; একটিই মুখ সেখানে ধরা পড়ে।”

অদ্ভুত ভাবের ব্যঞ্জনা, সহজ অথচ কী মারাত্মক গভীর অনুভূতি। বইয়ের প্রত্যেক কবিতায় লুকিয়ে আছে চেনাজানা কাঠামো ভেঙে চেতনার স্বাধীনস্বাদ যা মোড় ফিরিয়ে নিয়ে যায় কাঁচা মাংসের বাড়ির উঠোনে যেখানে “স্বপ্নের ভিতর তুমি সেই ফড়িং
যাকে ধরব বলে রোজ ছুটি
আমার বধির স্কুল, ঘন্টা বাজে না”

এভাবেই তো মধ্যবিত্ত মস্তিষ্কে জং ধরে, জীবনের চাকচিক্যে নিরুদ্দেশ এর জঙ্গলে হারিয়ে যায়, “খুচরো আদর চেয়ে বিধবা হয়ে গেল মেয়েটি
এখন তার নখে সাপ
সিঁথিতে কালো গোখরো”

প্রত্যেকটি লাইনে যেন ধরা আছে অজস্র কথা অথচ স্বল্প পরিসরে বর্ণনা যেন অসাধ্য বিষয়। বিষয়বস্তু খুঁজতে গিয়ে ভাবের রাস্তায় নিরুদ্দেশ হওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না, অনুভব একমাত্র যার স্মৃতিফলক।

কবি হৃদয়ের কল্পিত মুনাই নামে মেয়েটিকে পেলেও পাগলির জন্য অনুভূত যন্ত্রণাবোধ পুরুষ হৃদয়ে শাশ্বত, ধিমি আঁচের মতো এ যন্ত্রণা স্বীকার করে ব্যক্ত হয়েছে, “আমার একটা পাগলি আছে। না, সে আমার প্রেমিকা না। তার কষ্টে আমি কাঁদতে পারি না। তার আনন্দে আমি হাসতে পারি না।” তাই হয়তো “ছেলেটি প্রেমিক হতে পারেনি। শেষজীবন পর্যন্ত সারাক্ষণ নিজেকে চাবুক মারত আর পিঠ- ভরতি বোঝা নিয়ে ছুটে যেত শুকনো পাতার হৃৎপিণ্ডে। পাতা তাকে এক অবুঝ সবুজ দিয়েছিল। দিয়েছিল তার লিকলিকে শিরা- উপশিরা।”

শিয়ালদা স্টেশনের ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সত্যের অমোঘ উচ্চারণ যা অনায়াসে ছুঁয়ে যায় শিরায়, অস্থি ভেদে মজ্জায়,”শিয়ালদা কবিতায় লিখেছেন আমিই একমাত্র মান্থলি কাটা প্যাসেঞ্জার, যার ডেস্টিনেশন শুধুই শিয়ালদা”

জুয়া পর্ব, উচ্ছে খেতের কবিতা প্রভৃতি কবিতা গুচ্ছে আছে ভাবের আশ্চর্য ঘোর, যা বারেবারে পাঠককে ঘুরিয়ে বেড়ায় কাঁচা মাংসের বাড়ির অভ্যন্তরে। তবে, সেলিমের কবিতায় শব্দের অভিজাত-সুলভ উন্নাসিকতা নেই, রক্তে বহমান গভীর ও গম্ভীর ব্যঞ্জনা, বিষণ্ণ অথচ ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি সংহত স্বল্পভাষ এবং ব্যঞ্জনাময় প্রকাশশৈলি, শব্দের প্রচলত অর্থকে ভেঙে নতুন অর্থের দিকে ইঙ্গিত কবিতাগুলোর বৈশিষ্ট্য বলা যায়।
স্বল্প শব্দে ব্যাপক অর্থের বোধ ও ব্যঞ্জনা আগাগোড়া সেলিমের কবিতাকে অন্যান্যদের তুলনায় আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। ছন্দের দোলনায় নয়, বোধ, বুদ্ধি ও অনুভূতির ঘোর তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। বোধের দরজায় অনুভূতির চিত্রকল্পে ভিন্ন ধারার কবি বললেও হয়তো ভুল হবে না। আগামীতে বইটির কবিতাগুলো অন্য স্থান পাবে বলে আশা করা যায়।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

ঘুণ ধরা শরীর

ব ই ক থা  

অ নি ন্দ্য সু ন্দ র   পা ল

anindya

কাব্যগ্রন্থ : ঘুণ ধরা শরীর

ঘুণ ধরা শরীর

রাজীব মৌলিক

প্রকাশক । প্ল্যাটফর্ম

প্রচ্ছদ । রাজদীপ পুরী

১৫০ টাকা

বাংলা কবিতার এখন এক দুর্বিষহ সময়, যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক এক দৈন্য অনিবার্যভাবে এসে পড়েছে সাহিত্য-শিল্পকলার স্বরান্তরের প্রসারে। বিহ্বল ভঙ্গিতে সন্ধিবিচ্ছেদের মতো ভেঙে যাচ্ছে শব্দ ও বাক্যের অন্তর্নিহিত সূক্ষ্মকোণ, অন্তঃস্থলের নিবিড় অনুভূতিপুঞ্জ, আকর্ষণ ও বিকর্ষণের উন্মুক্ত জঙ্ঘা। বারবার এই তিন মেরুতে আহত হতে হতে যতবার এই ‘ঘুণে ধরা শরীর’-এর মুখোমুখি হয়েছি, ততবারই যেন নীল স্তব্ধতা ভেদ করে প্রস্ফুটিত হয়েছে ছন্দবদ্ধ শাসন। যেখানে প্রতীকে-ব্যঞ্জনায়-রূপকে আন্দোলিত হয়েছে রহস্যতিমির। কবি স্বতন্ত্র সাহসে আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্য, নাগালহীন প্রভৃতি বহুলপ্রচলিত ধারণাকে পিছনে ঠেলে সূক্ষ্মতা, আশ্লেষব্যঞ্জনা, সংরক্ত-প্রেমের মতো উপজীব্য বিষয়গুলো নিঃশব্দে এক অমোঘ দর্শনমূলক টেক্সটে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কাব্যগ্রন্থের একেবারে সাক্ষাৎপর্বে : ‘এভাবে আতর মেখে শরীর ছুঁয়ো না/ জানো তো, প্রেমের চেয়ে সংসার ঢের গুণ ত্যাগী।’ এই শব্দবহুল গভীরতায় অনন্ত জীবন যেন উদ্যত ভঙ্গিতে লিখে চলে ঐশ্বর্যহীন বাস্তবতার। ভিতরে ভিতরে প্রাথমিক ভাবেই ঝড় ওঠে, প্রশ্ন আসে, পুনরায় কিছুটা শান্ত হলে বুঝতে পারি অন্তরঙ্গতা একটা সাক্ষাৎকার, যেখানে পারস্পরিক নিয়মে চেয়ে থাকে মানুষ ও তার প্রেম এবং ব্যক্তিগত নগ্নতা। আবার কিছুটা যেতেই চোখে পড়ে- ‘ভেঙে পড়লেও/উঠে দাঁড়ানোর কথা কিংবা/চে গুয়েভারের কথা বলতাম’, যা একজন কবির গঠনমূলক অভিব্যক্তি। আবার একটু এগোলে শেষ হয় এমন বাক্য দিয়ে- ‘আমি তাকে তাই স্বৈরতন্ত্রের কথা বললাম/হিটলারের কথা বললাম।’ বোঝাই যায় ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে সোশিয়ালিসম্, হিউম্যানিজম্ ও নাৎসিজম্ মতো বিষয়কেও কবি রিলেট করতে পেরেছেন বাস্তবিক প্রেমের নিরিখে। মোহন মাধুরীর মতো ঘোমটা সরিয়ে দেখাতে চেয়েছেন জীবনের কিনারাগুলো প্রসারিত বিস্তৃত অনুধাবিত হলেও সেই পরাবাস্তবের চোরাস্রোতে কেবল যেন সান্ত্বনা। যাঁর রাগ-বিপর্যয়-ক্ষিতি শেষপর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে সমাজের গূঢ় নাশকতায়। যেখান থেকে মুক্তির পথ হয়ত সেই একনায়ক কিংবা মুষ্টিগত মননশীলতা, তা নিপুণ হলেও, সমপরিমাণে ক্রোধান্ধ। এই স্বরমিশ্র বাহুল্য রাজীব মৌলিকের কবিতার একটি স্মিত বৈশিষ্ট্য। এমন ধীর স্থির তীক্ষ্ণ শক্তিশালী ধারা অনুরিত আছে এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কাব্যের অন্দরে অন্দরে কিংবা লাইনে লাইনে। ভণিতাহীন সংযোজিত এক উৎকীর্ণ কোয়ার্টেট ভঙ্গি এই কবিতার বইয়ের সমস্ত কবিতায় ছড়ানো: ‘গল্প হবে, কবিতা হবে, গান হবে/ দিনশেষে ফুলগুলো আয়ুষ্মান হবে।’ ‘স্মরণসভা’ এই বইয়ের অন্যতম ফলবান কবিতা।

একদিকে নিরুত্তর সংঘর্ষ, অন্যদিকে সীমানা লুপ্ত মেঘমল্লার ধ্বনি- এই দুইয়ের মধ্যে দেশ কাল সমুদ্র শরীর ডুবে যাচ্ছে কবির ভাবনায়। তিনি লেখেন- ‘বৃদ্ধ বয়সে লোকটি প্রেসিডেন্ট হলো/অথচ যুবক ছেলেটির চাকরি হলো না’ কিংবা ‘কবিতা লিখি বলে/ মা আমাকে মরে যেতে বলে।’ অথবা ‘শুধু চেতনা নেই। অনুভূতি নেই।/বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই/মরে যাওয়ার আকুতি নেই।’ পড়তে পড়তে মনে হয় কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছি আড়ালের তারকাপুঞ্জের মতো। প্রচন্ড ক্ষোভ, আক্ষেপ, শ্লেষ, বেয়ারুর মতো রতিচেতনা সমস্ত কনসেপ্ট ফর্ম ছন্দ ছেড়ে কবি এখন জর্জরিত ক্ষীণ অভিব্যক্তির সংস্কারে। কবি বুঝতে পারছেন জীবন মৃত্যু পর্যায় একটা আবহমান, তবুও তিনি নিরুপায়, সন্ধিহীন, এলোমেলো, কিন্তু উপেক্ষাবর্জিত।

কবিতা কতটা অসাংগঠনিক সেইটা এই বই হাতে না নিলে বোঝা দায়। যেসব ব্যাপারে আমরা ভীষণ উদাসীন, সেইসব ব্যাপার কবি ভাবনার রুজিরুটি, আবার যা আমাদের মদ্যবহুল, চাতুর্যের প্রকাশশৈলী, তা কবির অনারুঢ় অসাংকেতিক অনুৎসাহী কিন্তু তা কখনই স্বপ্নবিমিশ্রিত নয়। তাই কি ধরে নেওয়া যায় কবির কাছে খোলস কিংবা বোরখা আলাদা? নাকি বিসর্জন কিংবা খিদে একটা মেটাফা, যেখানে কবি সেক্স ফুড ডিমান্ড একটা রিপুর নেগেটিভিটি বলে ধরে নিচ্ছেন? তা না হলে তিনি লিখবেনই বা কেন ‘দুটি আপেল ছাড়া ওর কাছে তখন/কামড়ে খাওয়ার মতো কিছুই পড়ে থাকে না’ কিংবা ‘এক মৃত মানুষের সঙ্গে আমার ভালোবাসা হয়েছে/শুনেছি তার মন নাই।’ সমস্ত মৃদুলস্বতঃস্ফূর্ততা ছেড়ে কলম গর্জে উঠেছে ঘোরতর ঘূর্ণিঝড়ে, যেখানে সবকিছু মহাকর্ষময়, অস্থির, স্থিতিস্থাপক। প্রাচীন রিপুকে তাঁর চুম্বক মনে হচ্ছে, যার সমধর্মিতা বলতে শুধুই বিকর্ষণ, আকর্ষণ কেবল বিপরীতমর্মিতা।

রাজীবের কবিতাগুচ্ছ পড়তে পড়তে পাঠকের মনে পড়তেই হবে শঙ্খ ঘোষের কথা, পিটার হান্টের কথা কিংবা জন হোরগ্যানের কথা। কিন্তু কবি এখানে এক সূক্ষ্ম জাগতিক ইন্দ্রিয়জ চেতনার জন্ম দিয়েছেন। গড়পড়তা জীবন ত্যাগ না করেই আলোকপাত করেছেন কবিতার ব্ল্যাক-হোল থিওরি। অবাক লাগবে কিছুটা দৃশ্যমান হবে, ব্যতিক্রমী হবে, যত মুখোমুখি হবে নিগূঢ় অন্তরচেতনায় ততই নিজেকে একজন পাঠক, নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করবে কোনো এক নিভৃত নগ্ন প্রান্তিকে। যেখানে গলা ভর্তি আর্তি, দৈন্য, অপচয়, অসম্পূর্ণতা, তবু তার শরীর তার এক একটি অঙ্গ একটি দর্শন, হেগেল-এর এক একটা বাণী, আশ্চর্য চিত্রকল্পের ধর্ম-বিগ্রহ।

আলোচনার একবারে অমিতলগ্নে এসে বলতেই হয় আধুনিক কবিতার নির্দিষ্ট একটি প্যাটার্ন আছে, কিছু প্রচলিত ধারণা আছে, কিছু প্রচলিত মেটাফোর আছে, এক একজন সহৃদয় পাঠক এক একভাবে সেটি ব্যাখ্যা বা আলোচনা করতেই পারেন কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ভাবনায় উপনীত হতেই পারেন, এতে কোনো অন্যায় নেই বরং স্বাধীনতা অনেক বেশি। তবুও মেনে নিতে হবে কবির নিয়মে তা একটি টেক্সট মাত্র, যা আমি আগেই বলেছি। কারণ কাঠে ঘুণ ধরা আর শরীরে ঘুণ ধরার মধ্যে আপেক্ষিক বা শব্দযুক্ত ব্যতিক্রম থাকলেও বস্তুত কোনো পার্থক্য নেই। জীবনের স্থাপন ও পচন দুটোই ইকোসিস্টেমের একটি পার্ট, কাঠ কিংবা শরীর দুটোই দাহ্য বস্তু। কিন্তু তাঁর কবিতার আড়ালে যে থেকে যাচ্ছে সমাজতত্ত্ব, ক্যাপিটালিসম, বিষাদ, বাস্তবতা, তা-ই রাজীব মৌলিকের কবিতাকে করে তুলেছে আরও ঔপপত্তিক , ক্রিয়াত্মক ও অ্যানালিটিক- ‘এই তো জীবন! পিঠ ঠেকলেও দেওয়ালে/ কিছু পাথর, পাথরই; ভাঙে না কোনো কালে।’ অথবা ‘আদতে আমি ফুল বিশেষজ্ঞ/বৃন্ত দেখলেই বুঝে যাই/তার রূপের রহস্য/অহংকারের পরিণতি।’

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

রূপক বর্ধন রায়

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ৫

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ বিজ্ঞানী…

রূ প ক   ব র্ধ ন   রা য়

rupak

নারী শহরের সম্পদ

এস্থেয়ার তেলেরমান্ন-এর জন্ম ১৯৪৭ সালে, প্যারিসে। প্রথম বই “First appearance with thickness” বিখ্যাত “Grand Prix of the French Academy” পুরষ্কারে ভূষিত হয়। 

এস্থেয়ারের কবিতা; প্রতীক-বাস্তবতার বচসা এবং সিম্ফনির মাঝে স্থাপন করা গানের ধারাবাহিক হিসাবে সংগঠিত। একটি অসম্ভব সান্ত্বনার লক্ষ্য নিয়ে তাঁর কাজ ব্যক্তিগত ভাগ্য এবং সর্বজনীন সুযোগকে মিশ্রিত করে। চেষ্টা করে পুরাণ ও ইতিহাসের করুণ পুনরাবৃত্তির বাইরে বেরিয়ে যেতে। তাঁর কাজ যেন অনির্দিষ্টকালের জন্য পুনরায় শুরু হওয়া এক অনুসন্ধান। আদি-অন্ত-হীন – অভাবনীয় এক ঐক্যের খোঁজ। 

দ্বিতীয় তরঙ্গ পরবর্তী কবিদের অধ্যে অন্যতম এস্থেয়ারের প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা কুড়ি। এছাড়াও ‘Anthology of French poetry from the 17th to the 20th century (Gallimard, La Pléiade, 2000)’ বইতে স্থান পেয়েছে তাঁর কাজ। 

বিখ্যাত কাজ

Corps assembled, 2020.

Under your name, 2015.

The Third, 2013.

Against the Episode, 2011.

Exact Earth, 2007.

Redder ink, 2003.

Extreme warfare, 1999.

Pangéia, 1996.

Escape Distance, 1993.

Three Inhuman Plans, 1989.

First appearance with thickness, 1986.

 

পুরস্কার

Grand Prix of the French Academy (১৯৮৬), 

François Coppée পুরস্কার , এবং; 

Max Jacob পুরস্কার।

TELLERMANN Esther - Date: 20110100 ©Didier PRUVOT/Opale/Leemage

আমি মোটেই এক নারী হতে চাই না, আমি থাকতে চাই

আমি চাই

 

আমি গঠন করতে চাই।

আমার মেরুদণ্ড সে কারণে কঠোর পরিশ্রম করে।

-স্বেচ্ছাচার বেছে নাও।

 

 পোয়াতি পুরুষ

 

পোয়াতি পুরুষ

বে-সুর নাকি স্পন্দন?

 

ভয়ের মানে

 

ভয়ের মানে।

বাতাসে নেশা ধরছে।

ওরা পৌঁছে গেছে।

ওটা ছিল না।

 

ইতিহাস

 

ইতিহাস বজায় রাখতো (সম্পূর্ণ স্তব্ধ নয়)

অসম্পূর্ণ ইঙ্গিত

 

এই আঁচড়ানো জায়গা

 

খণ্ডিত চলনে

এই আঁচড়ানো জায়গা

জয়যুক্ত হয়েছিল


তলার ঢেউগুলো

 

তলার ঢেউগুলো।

ফার্ন।

-অবস্থিত দাগে

তোমার খেলা হোঁচট খায়।

“অভিযোগগুলোকে পলিফোনিতে

রূপান্তরিত করো।”

 

 ফাটলের উপর

 

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ফাটলের উপর

দৃষ্টিটা জড় হতে পারেনি

সমতলদের ছাঁটতে পারেনি শব্দেরা

 

নৈরাজ্যের পর নৈরাজ্য আমাদের

এক আবদ্ধ এলাকায় পৌঁছে দিয়েছে

 

সেই আখ্যান

 

ধ্বংসের এক তত্ত্ব

সেই আখ্যান।

-সে ছিল তোমার নির্বাসনের

মুদ্রণ

সমাধানের বিফলতা

ব্যবধানের নিঃশ্বাস

সেই উড়ন্ত বিন্দু

 

আঁকা শহর

 

আঁকা শহর।

বাগানের উচ্চতা খাদটাকে

বিভক্ত করে

বাতাসের সাথে একাত্ম হয়ে

সেই তিন ভূ-চিত্রে দৃশ্য লেখে

এক দেবদূত

* ক্রমশ  

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

পলাশ দে

উ ই ন্ডো  সি ট

প লা শ   দে

palash_hm

আলাদিনের আশ্চর্য টিকিট

একটা বড় ফাঁকা, দরজা, যার ভেতর থেকে অনেক কিছু যাতায়াত করতে পারবে। চার দেওয়ালের মধ্যে আবার দুটো অর্ধেক ফুটো, জানালা বলে ডাকি। সেখান থেকে কিছু জিনিস যাওয়া-আসা করতে পারে। আবার ঠিক ছাদের কাছাকাছি দুটো চারটে ছোট ছোট ফাঁকা… ঘুলঘুলি বলে ডাকা যায়।

এরপর মনসিঁড়ি ঠেলে ঠেলে উঠিয়ে নেওয়া ওপরে, চিলেকোঠা। বেরিয়ে গিয়ে আরো ফাঁকা ফাঁকা আকাশ। আমার নেশা লাগে। জানালা দেখবো নাকি বিছানার ওপর টুল রেখে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করব ঘুলঘুলি। এতগুলো ফুটো কেন!  একটা দরজার পরেও জানালা, জানালার পরেও ঘুলঘুলি… আশ মেটে না-

হাঁটতে হাঁটতে দেখি বহুতল, বহুতলের গা ঘেঁষে বটগাছের মরা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে। একসময় ওর শরীর ছিল পূর্ণতায়, সেই শরীরে বর্ষাকাল আসত, রোদ্দুর আসা-যাওয়া পাখি কিচিরমিচির উড়ে যাওয়া… সেই ভরাট সংসার ছিন্ন করে এখন বহুতল।

বি টি রোড হেঁটে হেঁটে যায় আরো। আমার সাইকেল জুড়ে স্লো মোশন, পিছনের দিকে বয়ে চলেছে মফস্বল…

কিছু দূরে গঙ্গার ঘাট। সংকীর্তনের গুঞ্জন কমে আসে, চিৎকারসম বেজে ওঠে ডিগবাজি ডিগবাজি গান। চায়ের দোকানগুলো উবে গিয়েছে ফাস্টফুড সেন্টারের দাদাগিরিতে।

কোন ফাঁকায় যাবো ভাবতে ভাবতে ফেরিঘাট লোক পারাপার করায়। কে আসছে আর কে যায় টিকিট কোনদিনও সেটা বুঝতে পারে না। হাত থেকে হাত গুটিয়ে গিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকে হাঁটার রাস্তায়, হাওয়া সেই টিকিটকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। কখনো গঙ্গার জলে, কখনো কোন একা বোকা মানুষের সাইকেলে ক্রিং ক্রিং শব্দ করে এগিয়ে যায়।

সেই টিকিট তোমাকে খোঁজে। এই টিকিটে জাদু আছে। আলাদিনের আশ্চর্য টিকিট হাতে নিয়ে ঘষলেই তুমি পেয়ে যাবে কাঙ্ক্ষিত ডেস্টিনেশন। কিন্তু চলে যাওয়াগুলোর কোনো স্টপেজ নেই। ফলে সাইকেল চলতে থাকে। সবাই ওঠে, গন্তব্য ঠিক করতে না পেরে আবার নেমে যায়।

টিকিট হাতে হেঁটে যাচ্ছ তুমি। টিকিট এক্সপায়ার হওয়ার আগেই তোমাকে নির্দিষ্ট করে নিতে হবে কোথায় যাচ্ছ। একটা জলটানা রাস্তা, রাস্তায় ভরাট মানুষজন… আনন্দ মানুষজন… মশগুল মানুষজন… কোথাও কেউ একা বোকা নেই। এখান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আলাদিনের আশ্চর্য টিকিটকে বলি, ‘আমি আমার কাছেই যাবো’-

না, কোন ম্যাজিক ঘটে না। কোথাও কোন ধোঁয়া উঠে পাল্টে যাওয়া দৃশ্য নেই। অনেকটা দূর থেকে পোঁটলাপুঁটলি সমেত কিছু মানুষ হেঁটে আসছে। আবছা দেখা যায় একটা ল্যাংটো ছেলে কচু পাতা মাথায় দিয়ে বৃষ্টি আড়াল করছে। এক মেয়ে ফিঙে পাখির পালকে হাত বোলাতে বোলাতে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ম্যাজিক গেল কোথায়! টিকিটের ম্যাজিক? আমি যে বললাম আমি আমার কাছেই যাবো, সেই যাওয়াটা হচ্ছে কোথায়?

বিরক্ত হই রাগ উঠে গিয়ে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি ফাঁকা… এইতো! এইতো ম্যাজিক হচ্ছে। এবার আমি আমার কাছে যাব।

পায়ের ছোট্ট আঙুলে আচমকা ব্যথা শুরু হল। তাকিয়ে দেখি লাল হয়ে ফুলে রয়েছে। পাশে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া কেন্নো। সেই ছোটবেলায় বর্ষাকালে জামরুল গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি এই কেন্নোর সংসার। ব্যথা ফেলে হাঁটতে থাকি। কেউ কোথাও নেই, সত্যিই কেউ কোথাও নেই। আমি ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছি সেই ম্যাজিকের। সেই আমার কাছে যাওয়ার। গঙ্গার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে একটা নৌকো, জানতে পারি, ওপারে সেই আমার আমি-র সন্ধান রয়েছে। কাদা পেরিয়ে উঠে পড়ি নৌকায়। নৌকোর ভেতরে গিজগিজ করছে পোকামাকড় জীবাণু। আমি জানি এসব সত্যি নয়। আলাদিনের আশ্চর্য টিকিটের খেলা। ফলে, আমি ভয় পাই না।

গলুই ঠেলে ঠেলে চলতে থাকি মাঝনদীতে। এক জীবাণু মুখোমুখি বসে, প্রস্তাব দেয়, ‘পৃথিবী শূন্য হলে তুমি তোমার কাছে পৌঁছতে পারবে’। 

আমি হাসি। কেননা আমি জানি এসবই জাদুবাস্তব চলছে। বলি, ‘আমি কিন্তু সাঁতার জানি, নৌকা উল্টে তোমাদের মেরে ফেলে আমি দিব্যি সাঁতরে ওপারে অপেক্ষায় থাকা আমার কাছে চলে যেতে পারবো’-

নৌকোর সমস্ত পোকামাকড় জীবাণু হেসে ওঠে। একটু খটকা লাগে। কারণ ওদের সব হাসির শব্দগুলো আমার কেমন চেনাজানা পৃথিবীর মতোই লাগছে। আমি বারবার নিজেকে বোঝাচ্ছি এটা জাদুবাস্তব, এটা আলাদিনের আশ্চর্য টিকিটের প্রভাব, অন্য কিছু নয়। নৌকোটা উল্টে দিয়ে আমি সাঁতরে ওপারে চলে যাব এমন স্থির করে ফেলে টিকিটটাকে খুব যত্ন করে খুব সামলে পকেটের ভেতরে রেখে নৌকো উল্টে দিতে গিয়ে দেখি, আমি ছাড়া আর সবকিছুই ভ্যানিশ! এবার কিছুটা আতঙ্কিত হই। টিকিটটাকে আরেকবার ঘষে নিই। আলাদিনের আশ্চর্য টিকিটকে বলি, ‘কোনটা সত্যি?’

টিকিট খুব নিচু স্বরে কিছু বলে যায়… কিন্তু বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে যায় সেইসব কথা।

এই নৌকোর সবটাই দরজা সবই জানালা, ঘুলঘুলি, চিলেকোঠা, ছাদ…

আমি কোন ফুটো দিয়ে বেরোবো বুঝতে পারছি না…

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

শংকর চক্রবর্তী

ধা রা বা হি ক  | পর্ব ১০

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

sankar_chakrabarty_hm

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি

বিদ্বিষ্ট কবি

“…কণার বিয়ের সময় আমি কলকাতাতেই ছিলাম, তুমি জানতে না! আগে বন্ধুদের পারিবারিক, ব্যক্তিগত বহু ব্যাপারে আমার কিঞ্চিৎ অংশীদারিত্ব ছিলো সেটাও বোধহয় এতদিনে গেছে।…”

ওপরে উল্লিখিত চিঠিটির এই অংশে এক ধরনের অভিমানের বাষ্প বাতাসে ভেসে থাকতে দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃত কবিদেরই এমন অভিমান মানায়। ১৯৬৫ সালে তারাপদ রায় চিঠিটি লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। সুনীলদার বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত না-হওয়ার অভিমান স্পষ্ট ছিল তারাপদদার এই চিঠিতে। হয়তো অনিচ্ছাকৃত এই সামান্য বিচ্যুতি থেকে এক অভিমানের পাহাড় মাথা উঁচু করে উঁকি দিয়েছিল সেদিন। অথচ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দু’জনের পারস্পরিক অপরিসীম টান লক্ষ্য করার জন্য কখনোই আমাকে একদেশদর্শীর চশমা পরতে হয়নি।

আসলে এইসব মান-অভিমানের ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগত চিঠিপত্রেই স্পষ্ট হয় সাধারণত। মুখোমুখি যদিও বা তর্ক-বিতর্কের আগুন জ্বলতে পারে ঘনঘন, কিন্তু অভিমান গোপন জায়গা থেকে প্রকাশ্যে আসে না সচরাচর। মনে হয়, অভিমান এমনই এক আশ্চর্য বস্তু যে সযত্নে লালন করেই মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায় ঢের। যা কখনো সখনো শুধুমাত্র চিঠির মাধ্যমেই প্রকাশ্যে আসে। অগ্রজ কবি-সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশিত চিঠিপত্রের ঝাঁপি খুললেই স্পষ্ট হয়। কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো বা জীবনানন্দ, বা আরো পরে শক্তি-সন্দীপন-শরৎকুমার প্রমুখের চিঠিপত্রে বাষ্পায়িত অভিমানের কণা ভাসতে দেখা যায়।

একবার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় উত্তরপ্রদেশ থেকে ১৯৬৪ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তার শুরুটা ছিল এরকম,

“প্রিয় সুনীল, এখানে এসেই ৯/১০ তারিখে আপনাকে একটা inland দিয়েছিলাম, আশা করছি পাননি। পেয়ে থাকলে এতদিনে আমার একটা উত্তর পাবার কথা। কিংবা আমি মিথ্যা কথা বলছি। আমি মিথ্যাবাদী। বোধহয় ঠিকানা শুধু ৩২ লিখেছিলাম।

৩ সপ্তাহের বেশি এখানে কেটে গেল। কলকাতায় কেউ আমার অনুপস্থিতি feel করে না। যখন আমার টিবি হয়েছিল বলে মনে করা হয়েছিল ও ১ মাস বাড়িতে বসেছিলাম, তারপর মনে আছে কফি হাউসে প্রথম দিন যখন যাই শরৎবাবু বলেছিলেন কী মশাই আমরা তো ভাবছিলাম joint একটা চিঠি দেব সবাই সই করে। শরৎবাবুর কন্ঠস্বর ও বলার ভঙ্গি আজো সেইরকম আছে।…”

আমি শিলঙে থাকাকালীন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সবচেয়ে বেশি, মোট ৪ বার গিয়েছিলেন। তার মধ্যে একবার রীনা বৌদি ও মেয়ে তৃণাকে নিয়েও৷ তো প্রথমবার, ১৯৭৭ সালের এক শীতকালীন পাহাড়ি সন্ধ্যায় হঠাৎই খুঁজে খুঁজে আমার বাড়ি এসে পৌঁছোলেন সন্দীপনদা। সঙ্গে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব, কবি পার্থসারথি চৌধুরী। পরদিন সকালে আমার সঙ্গেই আমার অফিসে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। তখন শিলং থেকে কলকাতায় টেলিফোনে যোগাযোগ করাটা তত সহজসাধ্য ছিল না। তবে আমার অফিসের ঘরে এরকম যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকত। সেদিন ওঁরা দু’জন যে যাঁর বাড়ির সঙ্গে জরুরি কথাবার্তা সেরে, সন্দীপনদা বললেন, ‘শংকর, একবার সুনীলের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দাও, কথা বলব।’

মনে আছে, সেদিন কোনো অভিমানের কথা নয়, বলেছিলেন, ‘সুনীল, আজ ভোরে শংকরের বাড়ির জানলা দিয়ে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের অমায়িক আলো ছড়িয়ে পড়তে দেখলাম। তারপর, এক সুন্দরী পাহাড়ি কন্যা এলো শংকরের বাড়ির কাজ করতে। আপনি সঙ্গে থাকলে খুব ভালো হতো। খুব মিস্ করছি আপনাকে।’

পরে সুনীলদা আমার সঙ্গেও কথা বলতে চাইলেন। আমাকে বললেন, ‘তোমার তো নিশ্চয়ই মন খারাপ থাকবে না, বেশ মজা এখন। ক’দিন তোমার হইহুল্লোড় করে কাটবে।’ তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে মলিনতা খুঁজে পাইনি সেদিন। অথচ কবিদের অভিমান মলিন জামা গায়েই ঘুরে বেড়ায় সর্বত্র।
১৯৮৪ সালের ৫ নভেম্বর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আমাকে যে দীর্ঘ চিঠিটি লিখেছিলেন, তার প্রথমাংশটা এরকম-

“প্রিয় শংকর,
             তুমি, কৃষ্ণা ও তুতান আমার উষ্ণ ভালোবাসা নেবে। শিলঙে গেলে তোমাদের জন্য যাই এবং আবার ঐ জন্যই যাব। তোমাদের সৌন্দর্য দেখতে। তুতানকে খুব মনে পড়ে। আজকাল-এর গল্পটি তোমার ও অভীকের ভাল লেগেছে জেনে সুখী হলাম। তোমাদের মত গুণগ্রাহী আছে, তাই আজও লেখা। কৃষ্ণার কেমন লাগল? ‘তবে, জয়ন্তী সম্পর্কে এত গল্প বলার প্রয়োজন ছিল কি?’ তুমি লিখেছ। জানি না, কী বলতে চেয়েছ। আসলে, উপন্যাসটি তত ভালো লাগেনি, এই তো? আমি কিন্তু জানি উপন্যাসটা ভালো হয়েছে। আমি বলতে আমার হাড়, মাংস ও যৎসামান্য পেশী। সামর্থ্যের বেশি ওজন ঐখানে আমি তাদের তুলে ধরতে বাধ্য করি। যাই হোক। লেখবার ছিল, লিখেছি। লেখাও শেষ হয়েছে, হাতটাত ধুয়ে নিয়েছি। মনে হয় আর কখনো লিখব না। আর মানে হয় না লেখার। যদি কিছু লেখার ছিল, এতদিনে নিশ্চয়ই লিখেছি। নইলে ও আর হবার নয়।…”

লেখালেখি নিয়ে এরকম তর্কবিতর্ক সন্দীপনদার সঙ্গে এর আগেও হয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে, সেই সুযোগ ও স্পেসটুকু তিনি দিতেন আমাকে। আর তাঁকে অভিমানাহত হতেও দেখেছি বিভিন্ন সময়ে।

১৯৮৫ সালে এপ্রিলের ৩ তারিখ সন্দীপনদা আরেকটি চিঠির শেষভাগে আমাকে লেখেন, “… কলকাতায় সেই এলে, আমাদের বাড়ি এলে না। থাকলে না। আসলে কলকাতাতেই আমরা সকলে সকলের চেয়ে দূরে থাকি।
তোমাদের বাড়ি থেকে দেখা যেত পাহাড়ের গায়ে একটি পরিত্যক্ত প্রতিমা, খুব মনে পড়ে। যখনই চিঠি লিখি কারুকে, মনে হয় এই বুঝি শেষ চিঠি। তাই কদাচিৎ লিখি। অশেষ প্রীতিসহ সন্দীপনদা।”

সুতরাং পুরনো চিঠির ঝাঁপি খুললে শুধু ইতিহাসের স্পর্শই পাওয়া যায় না, এখনো কোথাও কোথাও মান-অভিমানের হাল্কা আবেশও টের পাওয়া যায়। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ওঁদের আরো কাছাকাছি আমি পৌঁছতে পারি। 

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

আঁচলে বিষাদ ফুল

ব ই ক থা  

সো না লী   ঘো ষ

sonali2

কাব্যগ্রন্থ : আঁচলে বিষাদ ফুল

আঁচলে বিষাদ ফুল

সুস্মিতা কৌশিকী

প্রকাশক । তবুও প্রয়াস

প্রচ্ছদ । রাজদীপ পুরী

১৩৫ টাকা

জীবনের খসড়া লিখতে লিখতে একজন নিতান্ত সাদামাটা মানুষও হয়ে ওঠে খাঁটি দার্শনিক। পৃথিবীর চরম সত্যি দেখে তার আর ঘোর লেগে আসে না বরং নির্ভীক কন্ঠে তিনি গেয়ে ওঠেন—

‘বেঁচে থাকার বিনিময়ে বন্ধক রেখেছি চেতনা,
নীল থেকে ঘন নীল হয়ে অবশেষে অন্ধকারের হাতছানিতে আমার আকাশের জিওম্যাট্রিক টেক্সচার।
অনুভবে হারাচ্ছি তোমায় ক্রমশ
ধ্রুবতারার অবস্থান বদল কি কোন মহাজাগতিক রদবদলের ইঙ্গিতবাহী?’

কবি সুস্মিতা কৌশিকী তাঁর ‘আঁচলে বিষাদ ফুল’ কাব্যে এভাবেই মনোলোক উন্মুক্ত করেছেন। কত ব্যর্থ যাপনের পর দীর্ণ এক কবির অন্তর দর্শন এমন পোক্ত ভিত্তি পায় তা পাঠককে পরম বিস্ময়ের গভীরে নিয়ে যায়।

মানুষের জীবনের সমীকরণ বড় জটিল, কোথাও কারো হিসেব ঠিক মেলে না কোথাও আবার গড়পড়তা। যতই তাকে মজবুত করতে চাইবে ততই কোথায় যেন ফাঁকফোকর দিয়ে- ‘নিঃসীম অন্ধকারে বহুদূর থেকে ভেসে আসে/ অস্পষ্ট ক্ষরস্বর/ ‘তফাৎ যাও… ত-ফা-ৎ-যা-ও/ …সব ঝুট হ্যায়।’

কি অপূর্ব মায়ায় কবি ঘুরে তাকান আঁচল পাতেন সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে আর জানান—
‘আশ্রয়হীন আকাশের ছায়াতলে ঈশ্বরী ও মানবের মহামিলনের ক্ষণ
এ-সব ই বিলম্বিত বিকেলের কল্পনা
‘তোমাকে আশ্রয় করে শত স্বচ্ছতোয়া নামিয়ে আনতে পারি’ বলেছিলে তুমি,
হে ভিনগ্ৰহ ভগীরথ’…

আর তাই অবলীলায় জানান, অকপট ভঙ্গিতে জানান— ‘সব ধুলো আমি হাত পেতে নেবো/ সব ধুলো আমি মুঠো ভরে নেবো’ পাঠকের মনোজগতকে উথালপাথাল করার পর তিনি যেন অভয় মন্ত্র দান করেন—

‘এসো এই পথে, কবে থেকে সেই বিছিয়ে রেখেছি সোহাগ শীতল পাটি‌। গায়েতে জড়াবে কথা-কাঁথা। পড়ে থাক শোক সাদাফুল আয়ু নিয়ে। আমাদের হলুদ বসন্তগান। বার্তাবহ রাজহাঁস দ্রুতগামী হও। ছুঁয়ে দাও জলসীমা তার।’

মনস্তত্ত্ব, প্রেম, বিপ্লব ও ঈশ্বরকে তিনি একসূত্রে গেঁথে পাঠককে মণিহার উপহার দিয়েছেন। পাঠক এবং কবি একই সঙ্গে একটি দীর্ঘ যাত্রা পথ অতিক্রম করে এক নতুন পথের দিশা পাবে তা বলার অবকাশ রাখে না।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

ভ্রমণ

ব ই ক থা  

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

rajib2

কাব্যগ্রন্থ : ভ্রমণ

ভ্রমণ

সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য

প্রকাশক । তবুও প্রয়াস

প্রচ্ছদ । সন্তু দাস

১০০ টাকা

কবিতা লেখা এক অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ সৃষ্টি।  এর চলমানতার মধ্যে ছন্দ থাকলেও কোনো নিয়মের অধীনে থাকে না কবিতা, কারণ কবির ভাবনা তো আদিগন্ত বিস্তৃত… সেখানে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার মানা নেই। বিখ্যাত ইউরোপীয় কবি ও গণিতবিদ ভ্যালোরি যেমন বলেছিলেন, ‘প্রথম লাইনটা (কবিতার ) আসে স্বর্গ থেকে, বাকিটা তুমি তৈরি করে নাও।’ আর তৈরি মানে কী? শুধুই কবিতার জন্যই কবিতা, লেখার জন্যই লেখা, রঙের জন্যই রঙ, সুরের স্বার্থেই সুর! অনেকেই এভাবে ভাবনার সার্থকতা পান।  কিন্তু, কোনো মতই তো শাশ্বত নয়, তাই অনেকেই তাকে বাঁধেন বাণী ও বার্তায়। কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যর ‘ভ্ৰমণ’ কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলি পাঠ করে তেমনই সিদ্ধান্তে আসতে পারেন লেখক।

প্রথম কবিতাটিতে এক প্রখর আশাবাদের ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে মরুভুমিকে অতিক্রম করেছে সমুদ্র। তেরো সংখ্যক কবিতায় এসেছে এক সহজাত দ্বান্দ্বিক মননের দ্রাঘিমা।  ‘এতদিন পরে মনে হল কিছুই ফেলবার নয়।’ কিন্তু সবই কি রেখে দেওয়া যায়, নাকি সমস্তটা সঞ্চয় করা উচিত কখনো? যা কিছুই মূল্যবান বা হীনমূল্য, তাও তো আপেক্ষিক, এই বোধকে জাগিয়ে রেখেও এই কবিতায় কবি জিতিয়ে দিয়েছেন সেই আদি ভাবনাকে ‘যা রাখো, তাই রাখে।‘  সব কিছুই ফেলনা নয়– তাই কবি কতো সহজেই লেখেন ‘ফেলবে না, একদম ফেলবে না, মনে নেই? একদিন বঁটি  ছিলোনা আমাদের?’ এ তো আমাদের থামার নির্দেশ ।

পনেরো সংখ্যক কবিতাটি নিখাদ বন্ধুত্ব ও তার নির্যাসে পূর্ণ। অতিমারি, মৃত্যু, দূরত্ব, একাকিত্বের মাঝখানে এই কবিতাটি বারবার পড়তে ইচ্ছে হয়। কাছে ডাকে মানুষ নামে এক নদীকে যা ‘আজো এক অপার মোহানাসম্ভব।‘

কবিতায় কিছু আখর অমলিন হয়ে এক নিজস্ব সরণি সৃষ্টি করে, যা কবিতার জাত চিনিয়ে দেয় সহজেই।  তারই মূর্ত নজির হলো একুশ সংখ্যক কবিতাটি।  ‘এখন পতনের আশঙ্কা থেকে জন্ম নেয় / উত্থানের আশ্চর্য রীতি।’  চির উত্থান-পতনশীল এই ব্রহ্মাণ্ড, সেভাবেই তো নিয়ত বদলাতে থাকে। এখানেই দাগ দিতে চেয়েছেন কবি। বত্রিশ সংখ্যক কবিতাটি আমাদের এক ছবি উপহার দিচ্ছে — যাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা বেঁচে আছি পরম ত্রাসে, বেঁচে আছে ভয়ার্ত এই সভ্যতা। এতে রয়েছে এক দুর্মর যন্ত্রণা ও উপহাসের তীক্ষ্ণতা। এই মারির প্রেক্ষিতে ঘটে চলা অনন্ত ঘটনার ক্ষতে ‘শব্দৌষধ হয়ে যা ধরা দেবে পাঠকের চেতনায়।’

নিতান্তই নিরীহ শব্দের তির্যক ব্যবহারে পাঠককে একের পর এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় বলীয়ান বর্তমান গ্রন্থের কবি পাঠকের মন জয় করবেনই, এই প্রত্যয়ের সাক্ষর রয়েছে এখানে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021-june

কাগজই ভালো ছিলো

ব ই ক থা  

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

rajib2

কাব্যগ্রন্থ : কাগজই ভালো ছিলো

কাগজই ভালো ছিলো

সজল দাস

প্রকাশক । তবুও প্রয়াস

প্রচ্ছদ । রাজদীপ পুরী

১০০ টাকা

দেবারতি মিত্র লিখেছিলেন, ‘মানুষের জীবনে এবং মননে ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। দর্শন এ কথা বলে এবং বিজ্ঞানও তাতে সায় দেয় আজকাল।’ এই কথাগুলোই যেন ভেসে আসছিলো কবি সজল দাসের কবিতার বই ‘কাগজই ভালো ছিলো’ পড়তে পড়তে।  ‘শূন্য কোনো মাথার ভিতরে বেড়াতে এসে’ শীর্ষক কবিতাগুলো তিনি সাজিয়েছেন নানান অনুভূতির নিযুত মালায়। এই বিচিত্র ভাবনার কারণ তো অবশ্যই কবির সমাজ, তা বাসযোগ্য হোক বা নাই হোক — তার প্রায় সমস্ত পরতেই কবির স্পর্শ লাগবেই, তাই তো স্বাভাবিক।  সেই স্পর্শকেই সম্বল করে এই কাব্যগ্রন্থও সেজেছে হাতানিয়া-দোয়ানিয়ায়।

তিন সংখ্যক কবিতাটি সুন্দরের জলছবি, যেখানে তিনি সাজিয়েছেন ফুলের পাশে শিশুকে, তারপর এসেছে বৃষ্টি…. কিন্তু এরপরেই এক বিচিত্র মোচড়, ‘বৃষ্টির পর হালকা হয়ে যায় / মনে হয়, মায়ের প্রেমিক ছিল।’  ভেঙে পড়ছে একমাত্রিক নান্দনিকতা, যার চরম প্রকাশই হয়তো ঘটেছে শেষ দুটো পংক্তিতে- ‘পাথর / ঘুরে আসবে বলে / নরম আর লঘু মন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লেখা।’

অন্য একটি লেখায় প্রকাশিত এক স্ববিরোধ — যা হয়তো কেবল স্রষ্টাকেই মানায়।  ‘পাথর ভাঙছ আর বাতিল করছ মূর্তিকেই / যেন এখনই সেরে উঠবে এই ছেনি…’  কিন্তু এই ভাঙা-গড়ার খেলা কি সবসময় সৃজনাত্মক হয়? ছেনির রোগ কি বাস্তবেই সারে? উত্তরও তো রয়েছে এখানেই- ‘গাছের মৃত্যুর পর পাতা একাই ভাসতে শিখেছে।’

‘নির্জনে’ কবিতায় ধরা পড়েছে কবির প্রখর্য, যেখানে তিনি উপবাসকে বিকেলের সঙ্গে তুলনা করেছেন ।  এক করুণ আবেদন ঝরে পড়ছে লেখাটির শরীর থেকে।  ঠিক যেমন অন্য একটি কবিতায় আছে ‘শিশুর পাশে খেলনা ঘোড়া রেখে চলে গেছে মা…’ যে মা শিশুকে রেখে হারিয়ে যায় চিরঅনুদ্দেশে, সে শিশু তো খোঁড়া হবেই।  তার স্থবিরতার শিক্ষক যথার্থই হতে পারে গাছ।  মনে পড়ে বলাইয়ের কথা।

এভাবেই বুনতে বুনতে এই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ‘সম্পর্ক’ নামের লেখাটিতে এসে যেন কিছুটা থমকে যেতে হয় ।  কারণ, ‘অসতর্কতার ভিতরেও যে কিছুটা আগুন ছিলো / এটুকু বোঝার জন্যই / মানুষ প্রতিবার ঘর বানায়।’  এখানে ‘আগুন’ আর ‘প্রতিবার’ শব্দক্ষেপণে যেন কবিতাটি এক ক্লাসিক সাহিত্যের মর্যাদার দাবিদার ।

‘নৌকো’ লেখাটি পাঠককে দিতে পারে এক গভীর দার্শনিকতার আস্বাদ। কবি দেখেছেন, পারদর্শী ঢেউয়ে ভর করে মৃতদেহ ভাসে — যে মৃত অবস্থাতেই এই ভেসে থাকার কৃৎকৌশল শেখে- কিন্তু কীভাবে! কেউ তা জানে না। তবে হয়তো এই জীবনসাগরে নিজের অজ্ঞাতে এইভাবে ভাসমান জীবনের কৌশল মানুষ রপ্ত করতে পেরেছে।

কবিতাগুলি প্রত্যেকটিই ক্ষুদ্রদেহী, কিন্তু তাদের আবেদন বা ক্ষমতা ক্ষুদ্র নয়।  প্রতিটি লেখায় শব্দকে ব্যবহার করা হয়েছে মেপে, যাতে তার অপচয় বা অবহেলা না হয়।  শব্দকে করেছেন আলোকিত প্রয়োগ। তাঁকে ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন...