Categories
2021_feb

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৪

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৪

অ দি তি   ব সু রা য়

যাওয়ার গল্প

ছবির নাম । এ সেপারেশন

পরিচালক ।  আসগর ফারহিদি

দেশ  ।  ইরান

অভিনয় । নাওমি ওয়াটস, আন্ড্রু লিঙ্কন, রেচেল হাউস

সিমিন আর নাদের আর একসঙ্গে থাকবে না ! সিমিনের মতে, তাদের এগারো বছরের কন্যাকে  ভালো ভাবে বড় করে তোলার উপযুক্ত অনুকূল পরিবেশ ইরানে নেই। ওদিকে নাদের, দেশ ছেড়ে যাবে না। তার অশীতিপর বাবাকে কার কাছে সে রেখে যাবে? সিমিন সে সব মানে না। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সে এতটাই চিন্তিত যে অন্য কোনও দায়-দায়িত্ব সে মনে রাখতে চায় না। নাদেরের বিরোধীতা স্বত্বেওবাড়ি ছেড়ে চলে যায় সে। ওদিকে তাদের  মেয়ে, বাবাকে ছাড়বে না। নাদের, কিশোরী কন্যা এবং পিতাকে দেখাশোনার জন্য ব্যতিব্যস্ত – শেষ পর্যন্ত, এক সহায়িকা্র সন্ধান পেতে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। স্ত্রীর জন্য তার ব্যাকুলতা কেবল গৃহকাজের ঝামেলা সামলানোর জন্য। তাছাড়া সেও নিজের জেদে অনড়। নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় এবং বোরখার কারনে,  ওদিকে বাড়িতে আগত, সহায়িকা মেয়েটি যে অন্ত্বঃস্বত্বা তা সে জানতে পারে নি। এক দুপুরে, অসময়ে বাড়ি ফিরে সে দেখে, বাবা পড়ে মেঝেতে। সহায়িকা উধাও। রাগে- দুঃখে সে মেজাজ হারায়। চরম বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে, তাড়িয়ে দেয় মেয়েটিকে। মিসক্যারেজ হয় মেয়েটির। এবার শুরু হয় এক আশ্চর্য কাহিনী – কোর্ট, বিচার, পুলিস, টাকা, দারিদ্র, ইরানের তৎকালীন পরিস্থিতি– সব মিলিয়ে ছবিটি এমন এক উত্তেজনা তৈরি করে দেয়, যে সহায়িকার শিশুকন্যাটির ভীরু এবং করুণ উপস্থিতি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। সে মায়ের কাজের বাড়িতে বই –খাতা বোঝাই ব্যাগ নিয়ে আসে। মাকে হেনস্থা হতে দেখে, চোখ নামিয়ে নেয়। একই কাজ করে হেনস্থাকারীর কন্যাও। বাবার ব্যবহারে লজ্জিত সে।  এক শিশু এবং এক কিশোরীর মধ্যে এক অন্য রকম ভালবাসার সেতু  রচিত হয়ে যায়। রাজিয়া ( গৃহসহায়িকা)-র বাড়িতে অশান্তি শুরু হয় আসল সত্য সামনে আসতেই। 

অভিমান সরিয়ে রেখে,  সিমিন ফিরে আসে, নাদেরকে সাহায্য করতে। অসুস্থ, বিস্মৃতিপ্রাপ্ত বৃদ্ধটি– এইসব টানাপোড়েনের কিছুই বুঝতে পারেন না। অসহায় নাদের, তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে বাইরে যেতে বাধ্য হয়! কিন্তু অসুস্থ বাবা বা নাবালিকা কন্যার দায়িত্ব নিয়ে আদালতের মাথা ব্যথা থাকার কোনও কারণ নেই। ফলে, পুলিশ কাস্টডিতে থাকার কারণে, স্ত্রীর সাহায্য তাকে অনেকখানিই আশ্বস্ত করে। এ সেপারেশন, আসলে একটা টাইম ফ্রেমের গল্প– যে গল্প নাদেরের বাবা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, রিজিয়া স্বামীর সঙ্গে থেকেও নেই, সিমিন দেশ ও পরিবেশ, পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন, নাদের আলাদা তার স্ত্রীর থেকে– এই গল্পে আরো একটা ব্যাপার স্পষ্ট।  তা হল, আদতে আমরা সবাই-ই এক, অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন। আলাদা। ফলে কেউই অন্যের জীবনবোধকে অনুভব করতে পারে না– কেউই দাঁড়াতে পারেনা অন্যের যন্ত্রণার জায়গায়। সেখান থেকে শুরু হয় আর এক স্বতন্ত্র যাপনের। সেও বড় ব্যথার– সেখানেও একে অপরকে স্পর্শ করা সম্ভব হয় না। জেদ, আত্ম-কেন্দ্রিকতা এই আধুনিক জীবনের এক অভিশাপ যাকে আমরা মাঝে মাঝে ‘স্পেস’ দেওয়া নাম দিয়ে মর্যাদা দিয়ে থাকি। এ সেপারেশন ছবিতে বারবার এই বিষয়টাতে ফিরে এসেছেন পরিচালক। আমাদের জন্যও।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৩

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ৩

অ দি তি   ব সু রা য়

আকাশপাড়ে উড়ে যাওয়ার ডানা মুড়ে রাখতে বাধ্য হয় যারা, ‘পেঙ্গুইন ব্লুম’ তাদের ছবি।

ছবির নাম । পেঙ্গুইন ব্লুম

পরিচালকগ্লেন্ডিং আইভিং

অভিনয় । নাওমি ওয়াটস, আন্ড্রু লিঙ্কন, রেচেল হাউস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ কবিতার কথা মনে পড়ে, আমার ছবিটা দেখে। আকাশপাড়ে উড়ে যাওয়ার ডানা মুড়ে রাখতে বাধ্য হয় যারা, ‘পেঙ্গুইন ব্লুম’ তাদের ছবি। সাম,মধ্য তিরিশের তরুণী,  স্বামী-পুত্রদের সঙ্গে থাইল্যান্ড ঘুরতে গিয়েছিল। সেই প্রমোদ ভ্রমণ, শেষ পর্যন্ত সুখকর হয় নি। ব্যালকনি থেকে নীচে পড়ে যায় সে। আকস্মিক সেই দুর্ঘটনায় হাঁটার ক্ষমতা হারায় সাম। হুইল চেয়ারে বন্দী হয়ে যায় তার দিন – যাপন । মেয়ে,  হারিয়ে ফেলে বেঁচে থাকার ইচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার তাদের বাড়িটি সাগর পারে। এবং সেই ছবির মতো বাংলো থেকেই সাম সটান সমুদ্রে নেমে পড়তো সার্ফ করতে। নামকরা সি-সার্ফার সে। থাইল্যান্ড থেকে ফেরার পর, সবকিছতেই তালা পরে যায়। সারাদিন জলের গর্জন শুনে, কান্না চাপে সাম। এর মধ্যেই ঘরে আসে এক ম্যাগপাই পাখির ছানা। ছেলেরা সাগর পাড়ে খেলতে গিয়ে সেই আহত শিশু-পাখিকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। নাম রাখে ‘পেঙ্গুইন’।  সাম পছন্দ করে নি, তার মতোই ডানা-ক্ষত নিয়ে থাকা পাখিটিকে। তবে  ধীরে ধীরে, তারা একাত্ম হয়ে ওঠে। পাখির কিচির-মিচির থেকে ঝরতে থাকে আনন্দ। ইচ্ছেরা ফুটে ওঠে আবার ! আসলে ইচ্ছের তো মৃত্যু হয় নি। হয়ও না কক্ষনও ! সে কথা নতুন করে বোঝে বিষণ্ণ নারীটি।

সামের বাড়িতে,  ‘পেঙ্গুইন’ নামের ম্যাগপাই পাখি সুস্থ হতে থাকে।  সমবেত দানা-পানি-আদর থেকে ডানায় জোর বাড়ে তার।  শক্তি বাড়ে তার। সেই পেঙ্গুইন আকাশ পায় আবার । অথর্ব  সামের সামনে ফের  খুলে যায় জলের বারান্দা। কায়াকিং শিখতে শুরু করে সে। হুইল-চেয়ারের বন্ধন ঘুচিয়ে সে ঝাঁপ খায় প্রিয় সাগরে। পুত্ররা ফিরে পায় মাকে। স্বামীর কাছে আবার সে ফিসফিসিয়ে ভালবাসার গল্প করে। মায়ের সঙ্গে বাদানুবাদের দিন শেষে, জড়িয়ে ধরে ছোট মেয়ের মতো। বোনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে হই হই করে।  বিষাদের ঝারোখা সরিয়ে বাইরে আসে তার পুরনো হাসি- উচ্ছ্বলতা। এর মধ্যেই ঘটে যায় – আর একটি জীবন বদল করা ঘটনা। সাম বুঝতে পারে, জীবনের এগিয়ে চলাতেই তাল মেলানো দরকার সবচেয়ে বেশি। রবি ঠাকুরের  সেই ‘একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ’ যেভাবে হাওয়া থেমে গেলে, মাটির দিকে মনোযোগ ফিরে পায়, সেই ভাবেই সাম খুঁজে পায় জীবন যাপনে আস্থা রাখার বিশ্বাস। নিমগ্নতার আনন্দ তাকে পুনরায় সমুদ্রের কাছে নিয়ে যায়। আকাশ বেয়ে ফিরে আসে পেঙ্গুইন নামের পাখি। জলে নামে মেয়েটি। আকাশ-জলের মাঝের সেতুতে তাদের শান্তির সহাবস্থান নির্মাণ করে জীবন। আসলে তারা সব পারে। সব । ইচ্ছে এবং আত্মবিশ্বাসের পাখায় তো উদযাপনের অক্ষর। ফিরে পাওয়ার স্বাক্ষর।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

ফ্রাঁসিস পঁঝের কবিতা

অ নু বা দ

অ মি তা ভ   মৈ ত্র

ফ্রাঁসিস পঁঝের কবিতা

ফ্রাঁসিস পঁঝ ও আঁরি মিশো, দুজনেরই জন্ম ১৮৯৯ সালে। কিন্তু চক ও চীজের মধ্যে যে ফারাক এই দুজনের কাব্যাদর্শের দূরত্ব ততটাই। মিশোর জগত অদ্ভুত কল্পসার, অনিশ্চয়তার, নিষ্ঠুরতার। ফ্রাঁসিস পঁঝের জগত নিরাসক্ত আবেগ বর্জিত। কবি ও তার বর্ণিত বস্তুর মধ্যে একটা একাত্মতা গড়ে ওঠে তাঁর কবিতায়– যার ফলে কবিতার সাথেই কবিরও যেন নতুন এক অস্তিত্ব শুরু হয়। ফ্রাঁসিস পঁঝ একে বলেন সহ-জন্ম। স্বচ্ছ নমনীয় গদ্য তাঁর কবিতার চাহন।

ঝিনুক

ঝিনুক সাধারণ নুড়ির মতোই সে— শুধু খানিকটা কর্কশ। রংও অন্যরকম। উজ্জ্বল সাদার নিচে উদ্ধতভাবে রুদ্ধ এক পৃথিবী। খোলার জন্য দরকার কোনো কাপড়ে আলতো জড়িয়ে তারপর ধারাল আড়ষ্ট ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত। আর ঠিক এই সময়েই অতি-উৎসাহীদের আঙুল কাটে, নখ ভেঙে যায়। কাজটা কঠিন। যে কোনো আঘাত সাদা বৃত্ত তৈরি করে ওর চামড়ায়। এক ধরণের শূণ্যতা এনে দেয়।

 

কিন্তু ভেতরে যাও, এক পরিপূর্ণ পৃথিবী। খাদ্য ও পানীয়ের বিশাল সম্ভার। ঝকঝকে মুক্তোর আকাশ— যেখানে শূণ্য ঝাঁপিয়ে নামছে মাটির নিচে অন্য এক শূণ্যে। আর ছোট পুকুর তৈরি হচ্ছে সবুজ কাদায় ঠাসা থলের মতো। কালো একটা রেখা তৈরি করে ঘ্রাণ ও দৃশ্যময়তা নিয়ে যা মিলিয়ে যাচ্ছে।

 

দুষ্প্রাপ্য। তবু যখন কোনো ঝকঝকে গলায় যখন সে উঠে আসে মুক্তো হয়ে তখনই বোঝা যায় তার মহিমা।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

মিসিং ভাষা

বি শে ষ  র চ না 

সারা পৃথিবীর মতো এদেশেও এমন অনেক ভাষা ছড়িয়ে আছে সেসব ভাষার আজও কোনো নিজস্ব লিপি নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘোরে সেসব ভাষা। শুধু তাই নয়, সেসব ভাষাতেও আছে নানান মৌখিক লোকসাহিত্য। অথচ বাইরের দুনিয়ার মানুষের কাছে সে ঐশ্বর্যের হদিশ প্রায় নেই বললেই চলে।

ভারতের উত্তরপূর্ব অংশে এমন একাধিক জনগোষ্ঠীর সমাবেশ লক্ষ্য করা যায় যেগুলির প্রত্যেকটিই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র।  পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতির মতো তাদের ভাষাও আলাদা আলাদা। আর বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এক্ষেত্রে মুখে মুখেই রচিত হয় তাদের লোকসাহিত্য। অনুবাদের মাধ্যমে তার যেটুকু এসে পৌঁছেছে বাইরের দুনিয়ায়, তা নিঃসন্দেহে চমকে দেওয়ার মতো। এমনি এক জনগোষ্ঠী হল ‘মিসিং জনগোষ্ঠী’। এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা হল ‘মিসিং ভাষা’। 

মিসিং ভাষা ও মিসিং জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত কিছু তথ্য...

আসাম-এর ভৈয়ামের জনজাতিসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম জনজাতি এই মিসিং জনগোষ্ঠী’।  আসামের ধেমাজি, তিনসুকিয়া, লখিমপুর, ডিব্রুগড়, শিবসাগর, গোলাঘাট, যোরহাট, দরং, শোণিতপুর জেলায় মিসিংরা প্রধানভাবে বাস করে।  এই জনগোষ্ঠীর ভাষা হল ‘মিসিং ভাষা’। ২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী প্রায় ৫,১৭,১৭০ সংখ্যক (উইকিপিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী) মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। শিক্ষা-দীক্ষায় যথেষ্ট অগ্রসর এই জনগোষ্ঠী লেখাপড়া শেখেন অসমিয়া মাধ্যমে। অসমিয়া ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁরা অসমিয়া ভাষা ব্যবহার করেন, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় তাঁরা সর্বত্র মিসিং ভাষাই ব্যবহার করে থাকেন। মিসিং ভাষার ভাণ্ডারে রয়েছে ছড়া, গান, কবিতা, লোককথা ইত্যাদির বিপুল সম্ভার। কিন্তু তা সবই মৌখিক। এই লিপি না থাকার ব্যাপারে মিসিং-দের ভেতর একটি লোক বিশ্বাস প্রচলিত আছে—

“ভগবান বিশ্ব-সৃষ্টির পর বিশ্বের সব জাতের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা ভাষা তৈরি করেন। ভাষার সঙ্গে লিপি। মিসিংদের জন্য তিনি যে ভাষা তৈরি করেন তা তিনি তাঁদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে তার লিপিটা টুকে নিতে বলেন। মিসিংদের কেউ সেটা টুকে নেওয়ার উপযুক্ত কিছু না পেয়ে একটি হরিণের গায়ে লিখে রাখে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে সেই হরিণটাকে মেরে তার মাংস খেয়ে ফেলে। ফলে মাংসের সঙ্গে তারা তাদের লিপিও উদরস্থ করে। সেই থেকে তারা লিপি ছাড়া।”

মিসিং ভাষার বিপুল সাহিত্য সম্ভারকে প্রথম অনুবাদের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের কাছে নিয়ে আসেন অসমিয়া ভাষার প্রথম সারির কবি ও অধ্যাপক জীবন নরহ মহাশয়। তিনি মিসিং সমাজের লোক। লেখেন অসমিয়া ভাষায়। তিনি মিসিং জনগোষ্ঠীর মানুষদের মুখে মুখে ঘোরা মিসিং ভাষার লোককবিতাগুলিকে সরাসরি অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। অসমিয়া কবিতা অনুরাগীরা অভিভূত হয়ে পড়েন তাঁর এই অনুবাদে। রাতারাতি আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মিসিং কবিতা।

পরবর্তী কালে অসমিয়া ভাষা থেকে তা বাংলায় অনুবাদ করেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মানিক দাস মহাশয়।  নিতান্ত ভালোলাগা থেকে স্বয়ং জীবন নরহ মহাশয়ের সাহচর্যে তিনি সম্পন্ন করেন তাঁর অনুবাদের কাজ কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে। প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক শ্রী প্রশান্ত চক্রবর্তী ও গদ্যকার-অধ্যাপক শ্রী কান্তারভূষণ নন্দী কর্তৃক সম্পাদিত ‘ফিনিক্স’ পত্রিকায় সেই অনুবাদের কিছু অংশ প্রকাশ পায়। বর্তমানে ‘যাপনকথা’ পত্রিকা সম্পাদনারত মাননীয় কান্তারভূষণ নন্দী মহাশয় আমাদের হাতে সেই অনুবাদের অংশটি তুলে দিয়ে বিশেষ সহযোগিতা করেন। আমরা তা পুনঃপ্রকাশের অনুমতি পেয়ে সম্পাদকদ্বয়ের কাছে আন্তরিক ভাবে ঋণী। আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে মিসিং কবিতার সঙ্গে পরিচয় করানোই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য…

মিসিংদের জীবনযাত্রার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা...

মিসিংরা অসমের একটি প্রধান উপজাতি। শদিয়া থেকে শুরু করে তেজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে এঁদের বসতি লক্ষ্য করা যায়। সোঅনশিরি ও ব্রহ্মপুত্র সহ অন্যান্য ছোট ছোট নদীর তীরেও এঁরা বসবাস করে থাকেন। মিসিংরা তিব্বতী-বর্মী গোষ্ঠীর অন্তর্গত। এঁদের দৈহিক গঠন মঙ্গোলীয়দের মতো। মাঝারি উচ্চতা, ফর্সা গায়ের রঙ। মিসিংরা নিজেদের চন্দ্র-সূর্যবংশীয় বলে মনে করেন। চন্দ্র তাঁদের পিতা আর সূর্য তাঁদের মাতা। যাবতীয় মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে চন্দ্র-সূর্য বন্দনা করার রীতি আছে। এই জনগোষ্ঠী অনেকগুলি ভাগে বিভক্ত। তার মধ্যে আটটি প্রধান। নদীর তীরে এঁদের বসবাস বলে মাচা বেঁধে তার উপর ঘর তৈরী করেন তাঁরা। রঙচঙে পোশাক তাঁদের বিশেষ পছন্দের। মিসিং মেয়েরা তাঁত বোনায় বিশেষ পারদর্শী। আয়-ব্যায়ের দায়িত্ব মিসিং পুরুষদের হলেও হাস-মুরগি-শূকর ইত্যাদি পুষে মহিলারা তাঁদের সহায়তা করে থাকেন। পুরুষরা প্রধানত চাষ বাদ করে থাকেন। শিক্ষা-দীক্ষায় এই জনগোষ্ঠী যথেষ্ট অগ্রসর। হিন্দু হলেও তাঁদের নিজস্ব কিছু লোকাচার আছে। অসমিয়াদের মতো তাঁরা বছরে তিনটি বিহু পালন করে থাকেন।

সমৃদ্ধ লোকভাষা হওয়ার কারণেই লিপির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এই মিসিং ভাষা আজও টিকে আছে এই মিসিং জনগোষ্ঠীর ভেতর। প্রিয় পাঠকদের কাছে এই সংখ্যার বিশেষ আকর্ষণ হিসাবে রইল মানিক দাস মহাশয় কৃত কিছু মিসিং কবিতার বাংলা অনুবাদ—

মিসিং ভাষায় রচিত কিছু কবিতার বাংলা অনুবাদ...

মা নি ক   দা স

তোমার দিকে এই আমার শেষ চাহনি

(বিলাপগীতি)

 

১।

ঝলমল করে বেড়ে ওঠে ঘাস

ও আমার সোনা,

আলতো করে ছেঁকে ধরেছে তোকে

আহা, আগে যদি জানতাম,

আহা, আগে যদি বুঝতাম

সময়ের ঘূর্ণিঝড়ে

তোকে হারিয়ে যেতে দিতাম না

 

দিনের পর দিন

আমার কাছ থেকে তোকে

ছিনিয়ে নিয়েছে

অমাবস্যার অন্ধকার,

ও আমার সোনা।

 

২।

ও আমার মা,

সৃষ্টিকর্তা কি কোথাও ভুল করেছেন,

ও আমার বাবা,

পালনকর্তা কি কোথাও ভুল করেছেন,

যার দরুণ আমার আজ এ-দশা?

এই আমার শেষ দৃষ্টিপাত

এই আমার শেষ বিদায়

তুমিও ভুলে যেয়ো আমাকে

আমিও ভুলে যাব তোমাকে

আমরা যে চিরকাল একা

 

৩।

ও আমার সোনামুখ,

তোমাকে অভিশাপ দিলেও

ফলে না

তোমার কথা ভাবলেও

আমার ভাবনা খেই পায় না

কোন মুখপোড়া আমাদের পৃথক করেছে

যার দরুন আমরা কখনও

আপন হব না।

 

৪।

জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই

তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়

ও আমার আদরের ধন,

তখন থেকেই তোমার চোখে

আমার চোখের ভাষা

তোমার অন্তরের সাথে

আমার অন্তরের মিল

বেলাভূমিতে বালিঘর গড়ে

খেলাচ্ছলে মাটির ভাত রেঁধে খেয়েছি

তৃষ্ণায় আপং ভেবে

নদীর জল খেয়েছি

সেই তখন থেকেই তোমার সঙ্গে আমার প্রেম,

ও আমার আদরের ধন।

 

৫।

তুমি আমার কাছে হৃদয়ের ফুল

একসাথে ফুটব বলে ভেবেছিলাম

জীবনকালে সুখে-সন্তোষে থেকে

একসাথে মরব বলেও ভেবেছিলাম

 

তুমি কেন আমার সঞ্চিত প্রেমটুকু

বাতাস যেভাবে কাত করে উড়িয়ে

নিয়ে যায়,

সেভাবে উড়িয়ে নিলে?

 

৬।

মা-বাবার সুখের সংসারের

এই অভাগিনীর জন্ম

হে বিধাতা,

কার পাপের ফলে আমার জন্ম?

নাকি আমার জন্মের সময়

মা-বাবা কোনো দোষ করেছিলেন?

আমি সারা জীবন

দুঃখের ভার বয়ে যাচ্ছি

নিঃসঙ্গতা আমাকে দহন করছে

হে বিধাতা,

দুঃখের ভার আমাকে চেপে ধরছে।

 

৭।

হে মোর পিতৃদেব,

সূর্য বলতে একটাই।

হে মোর মাতৃদেবি,

চন্দ্র বলতে একটাই।

চন্দ্রপিতা শোন,

সূর্যমাতা শোন,

কী করে এতদিন একা একা আছি

আমার ভাবনা তার খেই পায় না।

 

৮।

সূর্যোদয়ের মুহূর্ত থেকেই,

চাঁদের আলো ছড়ানোর সময় থেকেই,

তারাদের ঝিকিমিকি শুরু হওয়ার কাল থেকেই

তুমি আমার।

তুমি সম্পর্ক ছিঁড়ে চলে গিয়েছিলে

এখন কান্না জুড়ে কী লাভ?

আর, তোমার থেমে-থেমে কান্নার

অর্থই-বা কী।

রূপবান জামাইবাবা কাছে ঘেঁষো না

(ছেলেভুলানো গান)

 

১।

আমার ছোট্ট সোনা কেঁদো না,

ঘুঘুপাখিটা উড়ে যায়নি

উড়ে গেলে তবে তো কাঁদবে!

 

২।

কাঁদবে না তো!

প্রকান্ড সেই শিমুল গাছটার তলায়

ইয়া বড় এক অজগর

এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।

 

৩।

আমার ছোট্ট সোনার কান্নাটা

নলখাগড়ার বাঁশির মতো

কানে এলেই আত্মহারা হই।

সোনা আমার,

একখানা চাদর বুনে দেব

তোকে বুকে জড়িয়ে রাখবে।

 

৪।

জামাইবাবু এসেছেন ছাতা হাতে

দুলকি  চালে

রূপবান জামাইবাবু কাছে ঘেঁসো না

গামু কেঁদে উঠবে!

 

৫।

ও আমার সোনাধন,

উজানেও অগভীর জল

ভাটিতেও অগভীর জল

মাঝখানে কাঁটাবন

গাঁয়ের ছেলেরা গাছে চড়ে ফল খায়,

পিঁপড়ে কামড়ায় কিন্তু!

 

৬।

সামনে শিমুল,

পেছেন শিমুল,

ওপারে সাদা মেঘ।

মেঘের ওপর দেবতাদের ফুলবাগিচা,

ফুল ফোটে আকাশ আলো করে।

 

৭।

বুড়ি ঠাকুমার বউমা

ঢেঁকিতে পাড় দিতে জানে না

পা পড়ে ভুল জায়গায়

সোনা আমার, কাঁদে না,

ঢেঁকি ডাকবে কিন্তু!

আমার সোনাকে

ঝলমলে টুপি কিনে দেব,

খেলা করবে আনন্দে।

শোনো আমার ফুলকুঁড়ি

(প্রণয়গীতি)

 

১।

নিজেকে ভালো বলে বড়াই কোরো না

ওহে জোয়ান ছেলে,

বেশি জানার মতো ভানও কোরো না

ভেবেচিন্তে কথা বলবে

না-হলে পরে একা হয়ে যাবে

মৃদু মাথা নুইয়ে

বাঁকা দৃষ্টির ঝলক দেবে না,

ধরা পড়বে।

ভেক করে ফুঁপিয়ে কাঁদবে না

ধরা পড়ে যাবে।

 

২।

নিজেকে বেশি রূপসী বলে ভেবো না,

ওহে বাড়ন্ত মেয়ে,

বেশি সেজেগুজে মন ভোলাতে

কারো দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ো না

পড়ে যদি কেউ তোমাকে বিয়ে না-করে

তাহলে সারা জীবন চোখের জল ফেলবে।

কারো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য

ছল করে তাকিয়ো না

 

৩।

উজানের দিকে তাকালেও

শেষ হয় না

ভাঁটির দিকে তাকালেও

শেষ হয় না

আকাশের দিকে তাকালেও

শেষ হয় না

তুমি কাছেই রয়েছ

অথচ মনে হয় যেন অনন্ত দূর।

 

৪।

দূর-দূয়ান্তের ভালোবাসা

গভীর জলের মতো গভীর

একান্ত কাছের ভালোবাসা

চঞ্চল-অস্থির

 

৫।

নদীচর ছেড়ে

কোথায় উড়ে গেল অইকলি*,

ও আমার ফুলকুঁড়ি,

সর্বহারা করে

কোথায় গেলে সই?

ও আমার ফুলকুঁড়ি,

তোমাকে বলিনি কি

ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে

আঘাত না-করতে;

হৃদয় গলিয়ে দেওয়া

ভালোবাসা না-দিতে?

 

*অইকলি- এক বিশেষ প্রজাতির পাখি।

 

৬।

ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসাটা

নূতন ওঠা কাস্তেচাঁদের মতো,

চোখের জল মুছে কাঁদাটা

কারো ভালোবাসা

খুঁজে বেড়ানোর মতো।

 

৭।

 চাঁদ ডোবা রাতে, ওগো,

গলা ছেড়ে কেঁদো না,

আমাকে যদি ভালোবাসছই, ওগো,

আর কাউকে প্রেম নিবেদন করো না।

 

৮।

আনন্দে যখন নাচতে থাকি

তখন আত্মহারা হয়ে যাই।

তুমি আমার সোহাগ-সুন্দর,

তোমাকে কাছে পেলে

খিদে-তেষ্টা উবে যায়।

নাচে মগ্ন থাকার সময়

তুমি পাশ কেটে গিয়েছ;

ডাক না-দিয়ে বিদায় নিয়েছ।

 

৯।

তুই বন্য লতার মতো,

ক্ষীণকটির সোনা আমার,

মৃদুমন্দ মনের ভাব।

হালকা কোম্ল ফুলগুলো

একসাথে ফুটে যেভাবে সরে গেছে

সেভাবে তুইও সরে গেছিস।

 

১০।

তোর আমার ভালোবাসা

হে প্রেম, হে প্রীতি,

মাঝপথেই ছাড়াছাড়ি!

হায় আমার দুঃখ!

 

১১।

উজানে চাঁদটা

লাজরাঙা হয়ে বেরিয়েছে।

তুমি আমার হৃদয়ের ফুল,

তুমি বেরিয়েছ রংচঙে সাজে

শিথিল পায়ে।

 

১২।

এত বৃষ্টি হয়ে গেছে

অথচ কচুপাতা ভেজেনি,

ইনিয়ে-বিনিয়ে এত কেঁদেছি

অথচ আমার চোখের জল

তোর হৃদয়ে ঢোকেনি।

 

১৩।

তুমি একবারটি ডাকও দিলে না,

চট করে একটু ফিরে তাকিয়ে

ফের সোজা পথ ধরলে।

অমন করো না

হৃদয়ে দুঃখ দিতে নেই।

 

১৪।

মামা, চলো,

পিসিমা, তুমিও চলো।

 

মহুয়ার রস রেখেছি এক কলসি

দাদা-ভাই-জামাইবাবু— যে-ই আসুক

ঘরে যেটুকু আছে দেব

লজ্জা দিয়ো না কিন্তু!

 

১৫।

আচ্ছা, তুমি কোথায় আছ?

গেলেই-বা কোথায়?

তুমি আমার হৃদয়ের ফুল

অনেক দিন হলো তোমাকে দেখছি না।

তুমি যেখানেই থাক-না কেন

মনে রেখো,

তুমি আমার প্রাণসখা।

তাই বলে কি কোনোদিন

দেখা দেবে না?

 

১৬।

তুমি ফুল হয়ে ফোটো,

ও আমার মধুর ভালোবাসা,

হেলেদুলে ফোটো।

তোমার দিকে কেউ বাঁকা চোখে

না-তাকালেও

তোমার সুবাস আনন্দ ছড়াবে।

 

১৭।

তুমি লাল হয়েও ফোটো না

সবুজ হয়েও ফোটো না

ধবধবে সাদা হয়ে ফোটো

যেরক্ম বৃষ্টির ফুল সাদা।

 

১৮।

সূর্য যেমন একটাই

আমার ভাবনাও একটাই।

বেড়ে উঠে সরে যাওয়া আখ গাছের মতো

তুমিও আমার কাছ থেকে সরে গেছ।

 

১৯।

তুমি সোনা ধবধবে ধবলা

তুমি চাঁদের মতো আলো

আখখেত ঢুঁড়ে

আখ খেতে যাবার দিন থেকেই

তোমার সঙ্গে আমার প্রেম।

তুমি আমাকে ভুলে গেলে

নাকি আমি তোমাকে?

মনের তলাকার ভাবনাগুলো যে

হারিয়ে গেছে।

 

২০।

আজ তোমার সঙ্গে দেখা

কালও দেখা হেব।

আজকের দেখাটা স্মরণীয়

কাল তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে না।

 

২১।

ও আমার ফুলকুঁড়ি,

চারদিকে মেঘ।

আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছি,

দেখি, খন্ড খন্ড মেঘ

তোমাকে দেখার জন্য

এদিক-ওদিক তাকিয়েছি

দেখি, সেখানেও বিক্ষিপ্ত মেঘ।

 

২২।

কে কীভাবে বড় হয়েছি

কেউ জানে না।

এসো, সাথিরা, একজোট হই,

প্রেম-ভালোবাসা বিনিময় করি—

যাতে রোজ সকাল-সন্ধ্যা মনে থাকে।

 

২৩।

বৃষ্টিফুলের মতো ফুটতে ইচ্ছে করে,

ও আমার সোনা,

কিন্তু ফুটব কোথায়?

ফুটলেও আমার দিকে তাকাবে কে?

 

২৪।

ফুল হয়ে ফোটার ইচ্ছে ছিল

ফোটা হলো না

তোমার মতো গানও

গাওয়া হলো না

ঘুঘুপাখির মতো

ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদতেও পারিনি।

অন্তরের গোপন কথা

অন্তরেই থেকে গেল—

নিরালায় বলা হলো না।

 

২৫।

খাবার জোটেনি বলে কাঁদব না

তেষ্টার জন্যও কাঁদব না।

তোমাদের জন্যই শুধু কাঁদছি

যে যাবার সে চলে গেছে

মন খারাপ করা কেন?

যারা বেঁচে আছে তাঁরা কোথায়?

 

এসো, সমবেত হই

নেচে-কুঁদে রং-তামাশা করি।

 

২৬।

সিরিকি* পার হয়ে যাব

তবু তোর কাছে যাব না

ওহে জোয়ান ছেলে,

অবনিরও* পার হয়ে যাব

তবু তোর কাছে যাব না

চাষবাদ না-করা

গান গেয়ে বেড়ানো জোয়ান ছেলে,

ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদলেও

আমি তোর সঙ্গিনী হব না।

 

*সিরিকি- একটি নদীর নাম

*অবনরি- আরেকটি নদীর নাম।

 

২৭।

সারাদিন চোখের জল

ফেলে দেখেছি

কথা না-বলে, কিছু না-খেয়ে

থেকে দেখেছি

ও আমার অনজাল*,

হৃদয়ের ব্যথা পাবার মতো করে

আমাকে ভাবতে দিয়ো না।

হে আমার হৃদয়,

দুঃখ পাবার মতো করে

আমাকে ফোঁপাতে দিয়ো না।

 

* আনজাল- আদরের ডাক নাম।

 

২৮।

তুমি গাছপালার মতো

তরতর করে বেড়ে উঠছ;

প্যাঁচিয়ে বেয়ে ওঠা লতার মতো

আমিও তোমার শরীরে বেয়ে উঠছি।

 

২৯।

আমরা যেখানে নৃত্য করি

সেখানটা বালুচর,

আমারা যেখানে গা ধুই

সেটা নদীর জল,

ওগো বন্ধু আমার,

আমি যেখানে তোমাকে খুঁজে বেড়াই

সেখানে শুধু এজার-চারা*।

 

*এজার- এক ধরণের গাছ

 

৩০।

নদীপারের বাতাস

ঝিরঝির করে বয়, সোনা,

ঝিরঝির করে বয়।

বালুকাবেলায় নখ দিয়ে

ফুল-লতা পাখি আঁকার দিন থেকে

আমি তোমাকে আমার বলে ভেবেছিলাম

এখন কোথায় তুমি, সোনা?

কোথায় গেলে?

নাকি মাঝপথে শত্রু এসে

ফুসলে নিয়ে গেছে কোথাও?

 

৩১।

ও আমার লচপচি*,

তোর মুখখানা

জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল।

না-দেখার ভান করে

মাথাটা সামান্য বাঁকিয়ে

তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

দেখা হলে ভালো লাগে,

সরে গেলে বুকে বাজে।

 

*লচপচি- আনন্দে চঞ্চলা। আদরের ডাকনাম।

 

৩২।

শিমুল ফোটার সময়

তোমার সঙ্গে আমার

দেখা হয়েছিল।

আবার একদিন

শিমুল ফোটার দিনেই

আমাকে বিদায় দিয়ে

চলে গেছ।

এখন তুমি কোথা থেকে

মাঝরাতে স্বপ্নে

আমার সঙ্গে হেসেখেলে

কথা বলো?

 

৩৩।

পারলে, ও আমার ফুলকুঁড়ি,

খুদে তারাদের এনে

মুক্তোর মালা গেঁথে

তোমাকে দিতাম।

একা পেলে,

ও আমার ফুলকুঁড়ি,

মনের সব কথা খুলে বলতাম।

গ্রীষ্মের তাপ আমাকে

নাইয়ে-ধুইয়ে ছেড়েছে,

তোমার ভালোবাসা

আমাকে হৃদয় চাপড়ে কাঁদাচ্ছে।

 

৩৪।

আমার ভাবনার এই হৃদয়

না-দেখা এক অরণ্য,

অরণ্যের নির্জনতায়

পাখপাখালির চাপা কান্না।

আমার চোখের জল এক নদী,

বাড়ন্ত যৌবন একটি নৌকো,

নৌকায় চড়ে পারহারা হলে

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মরব।

 

৩৫।

তোমাকে না-দেখে থাকতে পারি না,

ও আমার সোনা,

অন্যের বাড়ন্ত সমবয়সীদের দেখলেও

আমার চোখ জুড়োয় না।

ও আমার সোনা,

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কী হবে?

তোমার আমার মিলন না-হলে

কী লাভ বেঁচে থেকে?

হে আমার দুধবরন রূপসী কন্যা

(উৎসবগীতি)

 

১।

নাচুনিরা দেরি কোরো না

তাড়াতাড়ি করো

সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ো

পাখির মতো

ফুড়ুৎ করে চলে এসো।

বাইন মাছের মতো চুলগাছা

যত্ন করে আঁচরে নাও

এসো, এসো, উঠোনে পা ফেলি

ঝনঝনিয়ে নেচেকুঁদে মাতাল হই।

 

২।

হে আমার দুধবরন রূপসী কন্যা

দাঁড়াও, এখনই উঠো না—

জোড়া মিলিয়ে সিঁড়ি কাটাই হয়নি;

ওহে আমার রূপসী কন্যা,

দাঁড়াও, এখনই উঠো না

এখনও দেওধাই*-এর ধোঁয়া ওড়েনি।

 

ওঠো! ওঠো! দুধবরণ কন্যা,

জোড়া মিলিয়ে সিঁড়ি কাটা হয়েছে

দেওধাই-এর ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে।

 

*দেওধাই- নৃত্যভিত্তিক একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

 

৩।

তুমি আমার সামনে

আসা-যাওয়া করছ—

এই আছ এই নেই।

এসো, আজ উৎসবের দিন,

আমরা নৃত্য করি

বাদ্যযন্ত্র ঝনঝনিয়ে উঠছে

আকাশে গুড়গুড় শব্দ,

মেঘ আসছে।

আমরা বৃষ্টির ফুল,

এসো ফুটি!

নৃত্য করি—

আমরা জোড়া কপৌফুল*

একসাথে ফুটি।

 

*কপৌ- বিশেষ প্রজাতির অর্কিড।

পানকৌড়ি ডাকে ক-ল-পি ক-ল-পি

(দেওধনি গীত)

 

১।

বৃক্ষ-লতা ঝলমল করে বেড়ে ওঠে,

ওহে সুন্দর,

ফাগুনের ফুল হেলেদুলে নাচে

ওহে সুন্দর,

যুবক-যুবতীরা আনন্দে মাতোয়ারা

ওহে সুন্দর,

ইহজগতের মাটির পদক্ষেপগুলো

সার সার,

ওহে সুন্দর,

পদক্ষেপগুলো মুছে যায়,

ইহজগতের মাটির গ্রামগুলো,

হে আদি পুরুষেরা,

কল্যাণ করো।

ফাগুনের ফুলের মতো প্রস্ফুটিত করো,

উজ্জ্বল করো মাটির মানুষদের

ঢেউ খেলে উজান ঠেলে আসা

বাতাসের মতো!

 

২।

বৃক্ষ-লতার মাঝে

যেভাবে ফোটে ফুলের তোড়া

বসন্তের ফুল যেভাবে

মনোহর হয়,

হে অদৃশ্য ঈশ্বর,

আমরাও উঠতি ছেলে-মেয়ে,

আমাদেরও উজ্জ্বলভাবে বেড়ে ওঠা

বৃক্ষ-লতার মতো

সুন্দর কর,

অমঙ্গল থেকে রক্ষা করো

গ্রাম্য অতিথিকে পথ দেখিয়ে দাও

এই ঘোর অন্ধকার থেকে

আলোতে নিয়ে যাও

তোমার চলার পথ ধরে

আমরাও পথ খুঁজে নেব।

 

৩।

পানকৌড়ি ডাকে

ক-ল-পি

ক-ল-পি

ইনিয়ে-বিনিয়ে ডাকে

ক-ল-পি

ক-ল-পি

হে অপদেবতা,

তুমি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছ,

আমরা ইহজগতের বাদিন্দারা

যে-পথে চলেছি

সেই পথ আগলে ধরেছ

ক-ল-পি

ক-ল-পি।

ঋণ স্বীকার – ‘ফিনিক্স’ পত্রিকা ও গদ্যকার, অধ্যাপক শ্রী কান্তারভূষণ নন্দী মহাশয়।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

নারী শহরের সম্পদ । পর্ব ২

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ২

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ গবেষক…

রূ প ক  ব র্ধ ন   রা য়

নারী শহরের সম্পদ

পনেরোশো শতকে ক্রিস্টিন দে পিজান, সতেরোশো শতাব্দীর আনে ব্র‍্যাডস্ট্রীট অথবা ১৭৯২ সালে মারি ওলস্টোক্রাফট বিরচিত “আ ভিণ্ডিকেশান অফ দি রাইটস অফ ওম্যান” এর অনুপ্রেরণায় অঙ্কুরিত নারীবাদের প্রথম তরঙ্গ ১৯২০ সালে, তৎকালীন মার্কিন নারীকে এনে দিয়েছিল গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার।

কিন্তু তার ৩ দশক পরেও আন্তর্জাতিক কীর্তিবাস নারীর পক্ষ্যে সাহিত্যে, এবং মূলত পুরুষ শাসিত কবিতার জগতে স্বাধীন যাপন ছিল প্রায় অসাধ্য। ১৯৪৯ সালে সিমন দি বাভোয়া রচিত “দি সেকণ্ড সেক্স” সেই বাঁধে চিড় ধরায়, এবং ফ্রান্সে শুরু হয় নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের উদযাপন। ১৯৫৩ সালে “দি সেকণ্ড সেক্স” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে বেট্টি ফ্রিডান লেখেন “দা ফেমিনিন মিসটিক”। এরপর অবশ্য আতর্জাতিক কবিতার আঙিনায় মহিলা কবিদের আরে পিছনের সারিতে বদ্ধ থেকে যেতে হয়নি। কেবল নারীবাদি রাজনীতির বিভিন্ন আঙ্গিক, আবেগ বা ধারাই নয় সে সমস্ত কবিদের কলমে উঠে এসেছে এক সম্পূর্ণ আধুনিক মানবিক যাপন, যেখানে প্রেম, ভালবাসা, অভিমান বা রাগের মত অনুভুতির সাথে সাথেই ধরা পড়ে সুররিয়ালিজম, টাওইজম, অথবা মার্ক্সবাদের দার্শনিক তত্ত্ব। সিমন যেমন বলেছেন “জেণ্ডার ইজ সোশাল”। 

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতাকে বাঙালী পাঠক মননে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই বর্তমান কাজটির(সিরিজটির) প্রয়াস।

একে একে যেমন উঠে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনিস লেভেরটোভ, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, এ্যানে সেক্সটন, ম্যারিয়ান মোর অথবা ফ্রান্সের সিলভিয়া ব্যারোন সুপারভিএলে, মারি ক্লেয়ার ব্যানকার্ট, মার্টিনে ব্রোডা, আন্নে মারি এ্যালবিয়াক ইত্যাদির নাম আবার তেমনই ভাষান্তরিত হয়েছে দ্বিতীয় তরঙ্গের নাম না জানা রাজনৈতিক কিছু কবির কবিতা।

এই অনুসঙ্গেই এই নামটি ” নারী শহরের সম্পদ”। নামটি  ক্রিস্টিন ডে পিজানের বই “The Treasure of the City of Ladies”-এরই অনুপ্রেরণার অনুদান।

এই সংখ্যায় আন্দ্রেই শেডিড (Andree Chedid)। নিজের প্রজন্মের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, কাব্যিক চিত্রকল্পের কুশলী এবং একজন বিরামহীন দক্ষ গদ্যকার আন্দ্রেই শেডিড প্রায় ৬০ বছরের অধিক সময় ধরে ফরাসী ও মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন করে এসেছেন। শেডিডের জন্ম ১৯২০ সালে মিশরের কায়রোয় হলেও, তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই ফ্রান্সে কেটেছে। ১৯৪২ সালে কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক হয়েছেন। ১৯৪৬ সালে স্বেচ্ছায় প্যারিসে এসে ফরাসী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১১ সালে প্রয়াণ অবধি সেখানেই ছিলেন।

শেডিডের কাজ মানবিক অবস্থানকে প্রশ্ন করে, এবং মানুষের ঐকিক যাপনের সঙ্গে পার্থিব একান্নবর্তীতার যোগ সৃষ্টির প্রয়াস ঘটায়। তাঁর একাধিক লেখা কেবলমাত্র যুদ্ধবিরতির উদযাপন। লেখিকার প্রথম বই “On the Trails of my Fancy” ইংরেজি ভাষায় রচিত। নিজের কাজ সম্পর্কে আন্দ্রেই বলেছেন “it is an eternal quest for humanity”। 

১৯৭৫-এ রয়াল এ্যাকাডেমি অফ বেলজিয়াম থেকে Grand Prize of French Literature, ১৯৯০-এর গুটেনবার্গ পুরস্কার অথবা ১৯৯৬ এর আলবেয়ার ক্যামু পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছেন একাধিক পুরষ্কার। ২০০৯ সালে তাকে Grand Officer of the French Legion of Honour প্রদান করা হয়।

আন্দ্রেই শেডিড (Andree Chedid)

হেঁয়ালি – কবিতা

নারী যে নিজেকে বস্তু গর্ভের গভীরে নিবিষ্ট করে

নারী যে পৃষ্ট ভাঙে ও দ্রুত বিগত হয়

নারী যে প্রত্যেক বন্দরেই অঙ্কুরিত হয়

নারী যে এক-একটি প্রশ্নেই পাশ বদল করে

নারী যার শব্দ লাগামহীন

নারী যে সমস্ত আশ্রয়-গ্রাসী

নারী যে আয়নাদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে

নারী যার না আছে অন্ত না আছে নাম।

 

স্বাধীনতায় মাতাল…

স্বাধীনতা ও সংবিধানে মাতাল 

জীবন নিজের মাপে ছোটে

নিজের খেল দেখায়

কয়েকশো কোটি আকারে গ্রন্থিলতা খুঁজে পায়

 

উন্নত জন্মে প্রস্ফুটিত হতে

নিজের পথে চলে

সবুজ বিকাশের খোঁজে

নিজেকে খতম করে

 

আমরা চলেছি

কোনও পরিশেষ নেই

নেই কোনো নিষ্কলুষ বাগান

 

স্বত্বের দ্বন্দ্বযুদ্ধে

সময়ের মাংসে

দোরগোড়ায় না পৌছে

আমরা চলেছি        আমাদের চলতে হবে

 

নিরন্তর পথচলাটায়

না আছে আবদ্ধতা

না আছে প্রতিবর্তন

 

বিস্তৃতি কম্পমান

অন্তরঙ্গ খাদের নিচে

যেখানে  আমাদের তন্তু এবং আমাদের টিস্যুর কাছে অন্তর্বর্তী বহন স্তব্ধ

আমাদের যন্ত্রণায়    

জর্জরিত      আমরা ভুলি

যে দূরে কোথাও     যে চতুর্পাশে

বিস্তৃতি কম্পমান

 

আমরা কীভাবে প্রবেশ করবো?

কীভাবে আমরা এই ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়াতে পারি?

আরোপিত ক্ষতির থেকে স্বত্বকে উপড়ে ফেলতে পারি?

 

কীভাবে আমরা সৌন্দর্যের মাঝে সৌন্দর্যের পুনরুদ্ধার করতে পারি?

 

একটা ভাঙা হৃদয় নিয়েও

আমরা কিভাবে টিকিয়ে রাখবো

সেই জীবনের অনিশ্চিত 

আর অপব্যয়ী খেলা

সদা সচেতন?

গুরুত্বপূর্ণ কাজ-

Le sixième jour  (The sixth day), 1960

The Other , 1969

Behind the Faces , 1984 

La femme de Job , 1992

Beloved Earth , 2006

Le Sommeil délivré. 1952.

Le Grand Boulevard., 1996; ইত্যাদি।

রূপক বর্ধন রায়

অনুবাদক

GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

রাজীব চক্রবর্তী

পা ঠ  প্র তি ক্রি য়া

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

কবিতার নিভৃত যাত্রী অরুণেশ ঘোষ ও এক মুক্ত গদ্যালাপ

শিল্প নিছক প্রতিবাদ নয়, সৃষ্টিশীলতা ইস্তেহার বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়। বরং তা এই পচনশীলতার মধ্যে, বিশৃঙ্খলতার মধ্যে বেঁচে থাকার একটা অঙ্গীকার নিয়ে আসে। ” — (‘অপরিচিত অথচ সৃষ্টিশীল’ )

বাংলা কবিতাকে যতনে কুসুমরতনে সাজাবার মধ্যযুগীয় বিলাসিতার বাইরে বার করে এনে একটা নিজস্ব হাড়গোড়-মজ্জা-মাংসের কাঠামো নিয়ে তাকে বাস্তবিকই ‘বেঁচে থাকার একটা অঙ্গীকার’ হিসাবে দেখেছেন যাঁরা, তাঁদের নামের তালিকা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা বৃথা । এই প্রসঙ্গে যে ধারা এক চলমান জীবন্ত জীবাশ্ম হয়ে রয়েছে, তার অন্যতম নাম জীবনানন্দ দাশ । রবীন্দ্র উত্তর কালে বাংলা কবিতাকে যথার্থ মানব প্রতীতিদানের দ্বারা গড়ে তোলার দায় কবি নিয়েছেন বেলা-অবেলা-কালবেলায় । রূপসার ঘোলা জলে বহু স্রোত তৎপরবর্তীতে বাহিত হয়েছে । সৃষ্টি-স্থিতিশীল জগতের দ্বিমাত্রিক ভারসাম্য বিলুপ্ত হয়ে এক উন্নাসিক নৈরাজ্য সমকালীন ভাবনার জগতকে দিয়েছে এক বাঙ্ময়-নীরবতা, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুধু স্থাণু পরিচয় বহন করে চলেছে বাহুল্যের মাধ্যমে । ফাঁপা শূন্যগর্ভ শব্দ আমাদের ভাবায় না, বরং বিস্মিত করে তার চমকে । এরইমধ্যে কেউ কেউ দিশাহীন পৃথিবীর অনন্ত যাত্রী ; তিনি বা তাঁরা চান এক তীব্র বদল । চাইছেন নতুন ভারসাম্য গাঁথা হোক আমাদের ঘুমন্ত দিকবলয় জুড়ে । কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? প্রশ্ন ও উত্তরের বিস্ময় ও সংশয়ের দ্বন্দ্বের মাঝবরাবর বাংলা কবিতাকে তার পার্শ্বস্থভাবনাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই এলেন ‘শব ও সন্ন্যাসী’ খ্যাত ‘ক্ষুধার্ত’ কবি অরুণেশ ঘোষ, যিনি নাগরিক বৈভবের বাইরে একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিলেন কোচবিহারের ঘুঘুমারির মতো প্রত্যন্ত গ্রামে নিজস্ব উঠোন, বাড়ির দেওয়াল, গাছপালা ও বাংলাভাষাকে আঁকড়ে ধরে পরিষদপরিবৃত নির্জনতায় । এই বিস্ময়কর নির্জনতা ও একাত্মকে প্রতিষ্ঠা করার আবাল্য তাড়নায় তিনি যেমন সৃষ্টি করেছেন ‘অপরাধ আত্মার নিষিদ্ধ যাত্রা’, ‘গুহামানুষের গান’-এর মতো গ্রন্থকাব্য, পাশাপাশি কলম ধরেছেন বিস্ময়কর গদ্যরচনার কাজে । তেমনই তাঁর রচনা ‘কবিতার অন্ধকার যাত্রা’ গদ্যগ্রন্থটি, যা তবুও প্রয়াস প্রকাশনার এক অমূল্য অবদান । বইটির অন্তর্গত নামভূমিকার প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় কবিতীর্থ পত্রিকায় ১৯৮৯ সালে । উক্ত প্রবন্ধটির সঙ্গে লেখকের আরও এগারোটি প্রবন্ধ নিয়ে বর্তমান গ্রন্থে এক মলাটের মধ্যে প্রকাশিত হয় এই মহার্ঘ সংকলনটি । 

বইটির প্রথম প্রবন্ধে  স্থবিরতার যাপনচিত্রকে অগ্রাহ্য করে বাংলা কবিতার গম্যতাকে তুলে ধরেছেন লেখক বলেছেন, “জীবনানন্দ পড়ার পর রবীন্দ্রনাথে আর ফেরা যায়না, সময় ও ভাষার এক বিশাল তফাৎ ঘটে গেলো ।” এতেই থামা নয়, বাংলা কবিতাকে তার বোধগম্যতাকে ‘জীবনানন্দীয় গভীর গ্রাস’ থেকে মুক্তির দীঘল পথ খুঁজে দেখাতে চেয়েছেন লেখক । লেখার মাধ্যমেই নিজস্ব প্রত্যয় ও স্বাক্ষর তৈরি হয়- এই হওয়াটা একটা পবিত্র কর্তব্য যেমন, তেমনি না হওয়াটাও এক অপরাধ, এমনটাই মনে করতেন কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত । এই চেষ্টার তরিকা  ও তরীকৎ পেয়ে নিজস্ব ছাঁদ ও ছিরি নির্মাণের উদ্যোগ নেন আঠারো থেকে অষ্টআশির কলমচিরা । কিন্তু “…. তারাও তাদের কলমে কালি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ঝরে যায় ।” বদলে পড়ে থাকে শূন্যতা । এমনকি এই দোষে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো জীবৎকালেই কাল্ট বনে যাওয়া কবিও দুষ্ট হয়েছেন । ‘সস্তা লিরিক জোয়ারে’ বাঁধা পড়েছেন শক্তি; সুতরাং, তাঁর আর জীবনানন্দকে  ছোঁয়া হয়ে ওঠেনি । 

কবিতা এক নির্মাণ –একক নির্মাণ । বোধের ক্রন্দসী নির্যাস, যার মূল-কাণ্ড-শাখা রয়েছে কাদা-মাটি-পূরীষসম্বলিত লৌকিকতায় । যৌথতায়, স্লোগানে বা আত্মতৃপ্তিকামী মফসসলি যুবকের গোষ্ঠীচেতনায় নয় । নির্দয় আঘাত করে তাই লেখক কবিতার কারিগরদের এক নিজস্ব সড়ক নির্মাণ করার নির্দেশ দিলেন । তিনি ইউরোপজাত ন্যারেটিভের ধার ধরে এক সুস্পষ্ট ঋজুরেখ মাত্রা দেখিয়ে আমাদের বললেন, “আর জীবনানন্দ দিয়ে আমাদের আধুনিকতার শুরু । ওদের যখন শেষ, আমাদের তখন শুরু ।” কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে ইউরোপিয় কালবিভাজনকেই বা কেন ভারতীয় বিশেষত বাংলা কাব্যধারার ধারণায় সমান্তরাল আদি-মধ্য-আধুনিকযুগ বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র  বিচার্য করে দেখতে হবে? কিংবা জীবনানন্দীয় গ্রাস থেকে যদি মুক্ত হওয়ার কামনাই অবলম্বন হয় তবে “র‍্যাঁবোর কাছে, দস্তয়েভস্কির কাছে, কাফকার কাছে” আমাদের শুধু হাত পাততে হবে কেন? দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভাবনার বদলে জীবনানন্দীয় হৃদবৃত্তি কি ‘আবেগবর্জিত’?

কবিতা ক্রমশ আশা-নিরাশা, বিদ্রোহ, ছন্দ, লিরিকের বাইরে এসে বিপন্ন নগ্নতাকে আলিঙ্গন করেছে বা সেইপথেই আরো এগিয়ে চলেছে ; আর সেই পথে চলবেন কবি, একা, অস্বীকৃতির বিস্বাদে তিক্ত সুরা গলায় ঢেলে চৈতন্যকে জাগিয়ে রাখবেন তাঁর লেখায় । এই পথের প্রথম ধাপে জীবনানন্দ থাকলে, পরবর্তীতে রয়েছেন বিনয় মজুমদার । লেখক আমাদের মনে করিয়ে দিতে চান, কবির ‘রাজনীতির দীক্ষা’ কবি ও কবিতায় নিহিত । বললেন, “জীবনানন্দে ও কমিউনিস্ট পার্টিতে আমি একইসঙ্গে প্রবেশ করলাম ।” তাঁর কাঁধের ঝোলায় থাকা কবিতার অস্থূল গ্রন্থই তাঁর ইস্তেহার, কৈশোরের আবেগে জারিত কবিতাই তখন ভাষা ও সমাধান খোঁজে, খোঁজে নিষিদ্ধতা…. মজার কথা, এই নিষিদ্ধতার অবদমন প্রাকৃত বিস্ময়কে দিগন্তের দ্রাঘিমায় পৌঁছে দেয় । তাই তো একজন নয়, একশো বা হাজারজন নয়, যুগে যুগে স্বপ্নের মান্দাসে ভাসে যৌথখামার – আর নির্মাণ হয় কবিতার । তাতে মানুষ ও প্রকৃতির ( মানুষী ) যৌথতা তো এক অনিবার্য পরিণাম । পেয়ে বসে আবিষ্কার ও বিজয়ের নেশা । নেশায় আসে তন্দ্রা – তখন সাতটি তারার তিমির জ্বলে গুহামানবের গানে । এইসব বহুমুখীনতার নিগড়ে বিশৃঙ্খলা নিহিত, তাকে  বুনে ফেলতে জানতে হয় । আর এই একক প্রক্রিয়ায় কবির দ্রোহমুখ তো তাবৎ প্রতিষ্ঠান, এমনকি নিজেরও বিরুদ্ধে । তাই বারবার নিজস্বতার সন্ধানে কবি খুঁড়ে চলেছেন নিজেকে, আর যতই খুঁড়বেন ততই বদলাতে থাকবেন নিজের আশ্রয় । ঠাঁইনাড়া হবেন বারবার । সেই  বদলের অভিমুখ আত্মকেন্দ্রিকতায় আবৃত নয়, বরং উন্মুক্ত নিজস্ব উপলব্ধিতে ।

‘শার্ল বোদলেয়ার : জীবন ও জীবনের পথ’ শীর্ষক প্রবন্ধেও স্পষ্টতই তিনি উচ্চারণ করেন  এক রাগানুগ ভক্তি, যা রবীন্দ্রপ্রেমের নাম ধরেছে তার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ রাবীন্দ্রিক ‘গ্রাম্যতা’-কে ঝেড়ে কবিতার স্মার্টনেস প্রকাশিত হয়েছে জীবনানন্দের আগমনে । আবার পাশাপাশি শার্ল বোদলেয়ার তাঁর স্যুররিয়াল আবেদনে মাত করেছেন ব্যতিক্রমী ভাবনার আসর । সমকালীন অবস্থার বিবরণ দিয়ে লেখক জানাচ্ছেন, “একদিকে শহুরে গ্রাম্যতা, আরেকদিকে অজপাড়াগাঁর গ্রাম্য অনাসৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে আপাদমস্তক মুড়ে দিতে চাইছিল ।” এই পরিস্থিতিতেই  র‍্যাঁবো, রিলকে, বোদলেয়ারের অনুবাদ বাংলা কবিতার এক মানদণ্ড সৃষ্টি করেছিল । তাই সহজেই তিনি তুলে দিলেন তাঁর অগ্রবর্তী সহগামীদের নামের তালিকা, যাতে রয়েছেন জীবনানন্দ, বোদলেয়ার, র‍্যাঁবো, কাফকা, জেমস জয়েস, জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত । নিজস্ব মননে বারবার এঁদের ধার ও ভারকে নিপুণভাবে ধার্য করেছেন লেখক । অথচ, সেখানে অদ্ভুতভাবে নেই  বিনয় মজুমদার ।

অকপটে জাঁ আর্তুর র‍্যাঁবোর কাছে নিজের অকৃপণ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে লেখক বলে ফেললেন “… কোনোভাবেই শিকড়ের অস্তিত্বকে এড়িয়ে সৃষ্টি নয় । কোনোভাবেই শিকার হওয়া নয়, শিকারীও হওয়া নয়, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা কবির জন্য নয় । যথার্থ অর্থেই তাকে বিদ্রোহ করতে হবে, আর সেই বিদ্রোহের শেষে থাকবে নতুন এক জগৎ । নতুন এক সময়ের দিকে যাওয়া ।” যথার্থ মূল্যায়নে তাই গ্যাদগেদে নান্দনিকতা কিংবা ব্যাকরণের কেঠো পথ দুটোকেই কাটিয়ে কবি দায়বদ্ধ হবেন আগামীর কাছে, তাঁর শ্রমেই তো কবিতা লোকায়ত ও অনির্বাণ হয়ে থাকবে । কবিতার নির্যাস শুধু কবির ভাবনার দরজায় কড়া নাড়ে । এক তন্ময়তায় আবিষ্ট করে কবিতাকে । ভাবনার তরঙ্গস্রোতের যে নির্মোক গতায়ত কবিমানসে ঘটে যায় তা তো স্থির নয়, স্থির হতেও পারেনা । এই অস্থির অম্লানদ্যুতি এক নবমাত্রায় পাঠক চেতনাকেও ছুঁয়ে যায় । তরঙ্গে তরঙ্গে অদৃশ্যপূর্ব মিলন ঘটলেই কবিত্বের প্রাকৃতায়ন ঘটে । সমস্ত গ্রন্থি ছিন্ন হয় এমনটাই মনে করতেন কবি মণীন্দ্র গুপ্ত । এই তদ্বিধচৈতন্যই ৱ্যাঁবোর সঙ্গে রামকৃষ্ণের মতো মেঠো কথকের  সঙ্গত করিয়ে ফেলেছে। লেখকের অনুভূতিতে যা ধরা পড়েছে তা তাঁর স্থানুবৎ অস্তিত্ব কেবল,  ‘যোনিভেদী’ লৈঙ্গিক সত্তা -অসীমের পথে যাত্রা । এই ‘অসীম’ কি তথাকথিত মোক্ষ? উত্তরে বলা যায়, বাস্তবিকই কবির সংসারে তো অনেক কিছুই বাড়ন্ত হবে, কিন্তু সেখানে ডানা মেলবে মধ্যবিত্ত ভাবনার ডানা – অনন্তপেখম । তাতে যেমন থাকবে আঁধারের আদর, তেমনি থাকবে আলোর শাসন । সময় তার বাহন হবে । এই দ্বৈতের মধ্যেই ব্যক্তিসত্তা  স্রষ্টায় উত্তীর্ণ হন । কিন্তু শর্ত হল, কবি-লেখক হবেন স্বাধীন ও দ্রোহী । তাঁর সৃষ্টিকর্ম একদিকে হবে আপোষহীন অন্যদিকে নির্জনতাচারী  । তিনি জানবেন নৈরাজ্য থেকে শৃঙ্খলায় প্রত্যাবর্তনের পথ ।  মিথ্যার আড়ম্বরের খোলস খুলে ‘উলঙ্গ ও সত্য রূপকে’ মেলে ধরাই কবির কাজ, কবিতার কাজ ।

তবে, প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ‘সত্য’ কী? তার কি কোনো সার্বিক ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপ আছে? প্রাজ্ঞ লেখক চেয়েছেন জাগতিক চমকশীলতার জারিজুরি তুলে ফেলে শিল্পকে নির্মোহ ও পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের মাধ্যমে শিল্পের স্বাবলম্বন ঘটাতে । তাই তিনি একাধারে কবি, অন্যদিকে বিপ্লবী । তাঁর লক্ষ্য স্থবিরতা নয় । কারণ তিনিও তো মানেন “এ পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য/ শেষ সত্য নয় ।”

রোমান্টিক বিপ্লবের ফ্যান্টাসিতে ঠাসা আমাদের মধ্যবিত্ত চোখ যে স্বপ্ন দেখে ও বৈশ্বিক বোধভাণ্ড ভরে ফেলে, তার স্ফুরণই নিজের ভিতরে ঘটে ক্রমাগত । তাই-ই প্রকাশ পায় শিল্পে । শিল্পী তাঁর স্বপ্নকে আমৃত্যু লালন করেন । কিন্তু এই কাজ কেউ কেউ করেন নির্জনে, সমস্ত বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে । কোনো বৃত্তের জীব হয়ে নয় । বর্তমান গ্রন্থের লেখক সেই কাজ করেছেন । বারবার ছুটে গেছেন সমকামী, মাতাল, বেশ্যা, কবিদের কাছে । খুঁজে দেখতে চেয়েছেন অন্য বর্গের নিষিদ্ধ ভাষ্য । তাই লিখেছেন, “একদিকে র‍্যাঁবো ও জীবনানন্দ আমি চলেছি বেশ্যাপাড়ার দিকে, ভাটিখানার দিকে, গ্রাম্য মেলার দিকে, জুয়াড়ি, গেঁজেল ও মাতালদের দিকে । গ্রন্থ ও মানুষ । শব্দ ও মাংস । গান ও যৌনসঙ্গম । বিশুদ্ধ কবিতা থেকে বীর্যের গড়িয়ে যাওয়া ধারা । সাংঘাবাড়ি ও ভাটিখানায় বসে আমি র‍্যাঁবো পড়ি… বেশ্যার ঘরে জীবনানন্দ…. জুয়ার আড্ডায় বসে দস্টয়েভস্কি….” এভাবে বারবার নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে  সাংকেতিক সংযোগ স্থাপন করেছেন এক থেকে অন্য, অন্য থেকে অনন্য অরুণেশ, যা এই বইয়ের পাতায় পাতায়, প্রবন্ধে প্রবন্ধে উৎসারিত হয়েছে ।

 

গ্রন্থ: কবিতার অন্ধকার যাত্রা

লেখক: অরুণেশ ঘোষ 

প্রকাশনা: তবুও প্রয়াস

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

বই কথা

বই কথা

রি প ন   হা ল দা র

ঘন্টাখানেক সময় পাঠক উৎকৃষ্ট কাব্য আনন্দ লাভ করবেন বলা যায়

হে তথাগত

সোনালী ঘোষ

যাপনচিত্র

মূল্য ৬০টাকা

কবিতা অনেক রকম। সেই অনেক রকমের একরকম যেমন প্রথাবদ্ধ লেখা তেমনি আরেক দল নির্মাণ করে চলেছেন ঝুঁকিপূর্ণ ভিন্ন পথ। ভিন্ন পথের যাত্রীগণ স্বসময়ে কোনো দেশেই সেভাবে সমাদৃত হন না। পাঠক-রুচি বদলাতে সময় লাগে। বাংলা কবিতায় মেইন স্ট্রিমের পাশাপাশি সেই ভিন্ন পথও সমান্তরালে চলে। এটা আশার কথা। তবে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের প্রচার ও প্রসার কম।

বহুচর্চিত এই কথাগুলো মনে পড়ল একটা কাব্য পুস্তিকা পড়ার সময়। বইয়ের নাম ‘হে তথাগত’। কবি সোনালী ঘোষ। আলোচ্য কবিতাগুলো প্রথাবদ্ধ ধারাতেই লিখিত। তাই এর প্রধান গুণ পাঠ উপভোগ্যতায়। কিছু কিছু পঙক্তিতে কবির নিজস্বতা ধরা পড়ে, যেমন-

“আমার গ্রীবাদেশ থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে তোমাকে না দেখার যন্ত্রণা”, “কত ভুল অনুপ্রবেশ করেছে তারকাঁটার ওপারে…” “দুহাত ভর্তি ক্লান্তি, পারেনি তছনছ করতে/ আয়ুরেখা”। অন্যত্র কবি লেখেন “কোন এক অজানা বসন্তের মধ্য দুপুরে/ নিংড়ে আসে হাড় পাঁজর…” “এত হিরণ্যপ্রভা সুবাসী হয়ে যায়,/ শুধু নির্জনতায়…” “তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে আরো/ ভেঙে আসি…” “দিগন্ত ঝেঁপে আসছে আবির ভরা কার্তুজ”, “আমি শিকার করেছি মাইলের পর মাইল”। “ধীরে ধীরে বশ হয়ে যায় সব/ সারা গায়ে লেগে থাকা, বলিরেখাও তখন/ দীঘল সৈকত হয়ে যায়”। নাম কবিতায় কবি আকাঙ্ক্ষা, “জলের কোনও মেরুদন্ড নেই… / হে তথাগত আমি জল হতে চাই”। আবার অন্যত্র মুদ্রিত, “সময়ের মধ্যে তুমি দাঁড়িয়ে/ অথবা তোমার মধ্যে সময়? কেউ মিথ্যে নয়”। “তবু এ দীর্ঘ রাতে গেলাসের পর গেলাস সেবন করে ফেলি/ জীবনের শ্লোক”। “কে যেন জলশঙ্খের ভেতর কুড়িয়ে নিচ্ছে/ এত এত আলো…”

উপরের পঙক্তিগুলি এক নিবিষ্ট কাব্যকৃতির ছাপ বহন করে। ঘন্টাখানেক সময় পাঠক উৎকৃষ্ট কাব্য আনন্দ লাভ করবেন বলা যায়। তবে পাশাপাশি একথাও বলে রাখা ভালো যে লেখাগুলো পাঠককে সেভাবে বিব্রত করে না। এই বিষয়টা একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় গুণই বহন করে। আগামীতে এই কবির লেখার দ্বারা বিব্রত হতে চাওয়ার দাবি থাকল।

প্রকাশক যাপনচিত্র নবীন কবিদের প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছেন। সেই সিরিজের এটি অন্যতম গ্রন্থ। প্রচ্ছদ, ফন্ট, বর্ণগ্রন্থণ প্রভৃতিতে খুবই যত্নের আভাস পাওয়া যায়।

ripan

রিপন হালদার

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

তমিজ উদ্‌দীন লোদী

বাং লা দে শে র  ক বি তা

ত মি জ   উ দ্‌ দী ন   লো দী

সবকিছু পুড়ে যাবার পরও

প্রচ্ছন্ন কত কিছুই তো থাকে— মায়া, বাৎসল্য এমনকি প্রেম

আমি উড়ন্ত সসারের মতো যেতে দেখেছি তাকে

                                  যে একদা মায়াতেই জড়িয়ে ছিল

 

সে আসলে লুকিয়ে ছিল কাদা এবং পানির ভেতর

ছাপগুলো তখনো ছিল, শুকিয়ে যাবার আগেও

কুমারের হাতের কারিশমা জানার পরও

                          আমরা মাটিতে আস্থা হারাইনি

 

যে মাটিতে বীজ ও রক্তের দাগ ছিল

পুড়ে যাবার আগে ওইসব আকরিক মাটি

                           ফুলে ,ফসলে ও বীজে উর্বর ছিল

জল ছিল, মায়া ছিল

প্রেম ছিল ‘জিবরাইলের ডানা’র মতো প্রসারিত

 

আমাদের সমূহ আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে

সবকিছু পুড়ে যাবার পরও কোনো ফিনিক্স পাখির

দেখা মেলেনি

মায়া গিয়েছে, বাৎসল্য, প্রেম গিয়েছে

                                ফিরে আসেনি।

 

তবু বিপ্লব থেমে যায়নি

মনে পড়ে

ভার্গাস ঝোসার সেই ‘সাহিত্যের আগুন’

আগুন পোড়ায় কবিকে

অন্য আগুন পোড়ায় সমাজ ও যত জঞ্জালকে

 

উদাসীন, হিমশীতল, নীরক্ত আর নাকউঁচু নন্দনতাত্ত্বিকরা যায়

কলাকৈবল্যবাদে হাঁটে শুঁয়োপোকা

যদিও বারবার ভেঙে গিয়েছিল স্বপ্ন, উৎকাঙ্ক্ষার স্বতঃ:স্ফূর্ত প্রকাশ

বারবার মোহভঙ্গ, বারবার ব্যর্থতার বোধ

বারবার স্বৈরাচার, বারবার রক্তপাত

 

তবু বিপ্লব থেমে যায়নি

লেখা হয় মেহিকোর পাথরে, ধুলোয়, মরুভূমির বালির রাশিতে

লেখা হয় হুয়ান রুলফোয়, তার ‘পেদ্রো পারামো’য়, ‘জ্বলন্ত প্রান্তর’-এ।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

ফারুক আফিনদী

বাং লা দে শে র  ক বি তা

ফা রু ক   আ ফি ন দী

আমরা

মৃত্যু যখন আসে মৃত্যু নিয়েই আসে। ভাবো, মৃত্যুর আবার মৃত্যু আছে নাকি, অথবা সঙ্গী- যেমন আমার তুমি?

 

আমি যখন আসি আমাকে নিয়েই আসি। ভাবো, আমার আবার আমি আছে নাকি, অথবা তুমি! যেমন মিশমিশে আলকাতরার বেড়ায় বসে আছে কালো প্রজাপতি।

 

পালাবার ডাক

(অগ্রজ কবি শাহীন রেজাকে)

 

এসব কথা- ষোল-সতেরো-আঠারো বছর আগের

দুই হাজার বিশে ফিরে আসছে

 

তখন আমার বলতে ছিল— শুধু মা—

 

-এইখানে ‘ছিল’ মানে আছে। ‘আছে’ বলতে বোঝাবে অমেয় ঘ্রাণ আর নিঝুম মন নিয়ে একটা গন্ধরাজের ফুটে থাকা। একটি গন্ধরাজ মরে গেলে- গন্ধরাজ তবু থেকে যায়। এখানে মনে মৃত্যু ধরে না কেউ।

 

আর, যখন আমার বলতে ছিল শুধু মা

 

[-এই খানে ছিল মানে আছে। আছে বলতে বোঝাবে যতদিন এসব কথাবলাবলি চলবে, শালিকেরা ঝগড়ায় মন দেবে হেমন্তের রোদে নেমে। তখন হয়তো আমি থাকব না। কিন্তু কোথায় যাব? কোথাও কি যাবার সাধ্য আছে কোনো? নেই কি সাধ!]

 

একটা শার্ট, ছিল

দুই হাজার দুই-তিন বা চারে

পবিত্রতার মতো

ভেতর এবং দৃশ্যহীনতা থেকে নীল

তখন মতিঝিলে- ঘুরি-, আমরা প্রতিদিন দুপুরে বিকেলে

 

বিকেল থেকে সন্ধ্যা

-বিকেল থেকে রাত

 

একটা শার্ট

ছিল প্রিয় খুব

মতিঝিলপাড়ায় কেনা। এবং দারুণ সস্তায়

তুলির কাজের মতো একটা শার্ট

হাওয়ায় হাওয়ায় নীল চাদরের তুমুল খেলা, প্রজাপতি যেরকম খেলে, রোদে হারিয়ে হারিয়ে—

একবার মুছে যাওয়া, আবার

মেঘের ভেতর থেকে এসে এসে

মায়ের মতো

ভেতর এবং দৃশ্যহীনতা থেকে নীল

এসব আকাশের খেলা দেখেছি অনেক

দুই হাজার, দুই হাজার এক দুই তিন বা চারে

তখন আমার বলতে ছিল এই নীল—

নীল মেঘের বড় চেকের শার্ট

এইখানে ছিল মানে কি আছে?

কিন্তু কেন ফিরিয়ে দিলেন সেসব- মেঘের ঈদের ভোরে—

আমি তো এসব ছবি জিইয়ে রাখিনি কখনো

কেন না আমি জানতাম- এইসব ছবি আমার সংসারকে ভারী করে তুলবে

 

ছোট সংসারের মানুষ আমি। বলতে পারেন কাইত্তানে তাড়া খেয়ে ডেরাঘরে আশ্রয় নেয়া ভেজা শালিক। সামান্য বেদনা বিস্ময় মহানগরীর পথ নিরন্ন মানুষ রিক্ত প্রেম রক্তাক্ত প্রেমের মধ্য দিয়ে আমার আসা সাদা প্রেমের মধ্য দিয়ে ফিরে যাওয়া, আনন্দ এলে এলো- এসব নিয়ে থাকতে চেয়েছি।

 

আমি কি কখনো বলেছি- আল মাহমুদের সঙ্গে সিগ্রেটের পর সিগ্রেট খেতে খেতে তার চোখের আলোর গল্প শোনা, ফজল শাহাবুদ্দীনের কামকলাপের বিবরণ শুনে মাহমুদ ভাইয়ের নড়ে ওঠা- ‘আরো বলো, আরে বলো মিয়া, তারপর…?’। এসব কিছুরই ছবি নেই আমার ঘরে। কেন না আমি কখনো পালানোর ইশারা তৈরি করে আসতে চাইনি। আমি জানতাম, একদিন পেছনে ফিরে যেতে মন খুব আকুলিবিকুলি করবে, মানুষ মূলত যা করে। আমি জানতাম, জীবন যতটাই এগোক, যেভাবেই ফুটুক, ছেড়ে আসা রোদগুলো একদিন হলুদগাঁদা, ধুলোগুলো তামার ঐশ্বর্য, ক্ষুধাগুলো পানির মতো প্রশান্তি হয়ে ডাকবেই। যেমন ডাকছে এই নীল শার্ট। হ্যাঁ, গমগম করে ডাকছে। কোথা থেকে আসে এই ডাক! কোথায়! আমি পালাতে চাই পালাতে চাই।

 

আমি তো আগেই জানি, পৃথিবীর কাজ হচ্ছে সব কিছু আধুনিক করে নেয়া। যেমন বেদনাকে করা হচ্ছে রোজ রোজ নবায়ন, নিরাশাকে করা হচ্ছে দীর্ঘ। কাজকে করা হচ্ছে সহজ, সময় সাশ্রয়ী। প্রেম হচ্ছে খাটো। স্বপ্নকে সেকেলে অপবাদ দিয়ে ছেটে ফেলা হচ্ছে। গৃহিনীরও এখন বন্ধু থাকতে হয়, গৃহকর্তার থাকতে হয় বহুগামিনী। আপনি কী বলবেন? আমি পালাতে চাইব না, এইসব ছবি দেখে, স্মৃতি মেখে?

 

কী বলেন?

আরও পড়ুন...

Categories
2021_feb

ভিনদেশে । পর্ব ৮

ভি ন দে শে । পর্ব ৮

সম্প্রতি ‘ইতিকথা পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি অসাধারণ দু’ ফর্মার ভ্রমণ বিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘ভিনদেশে’। একাধিক বিদেশ ভ্রমণের টুকরো অভিজ্ঞতার  কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। এখানে প্রতি পর্বে  আমরা জানব তাঁর তেমনই আরও কিছু দারুণ অভিজ্ঞতার কথা।

ঈ শি তা  ভা দু ড়ী

মাইন নদীর ধারে | ২য় পর্ব

যাই হোক, আমরা মিউজিয়াম দেখছিলাম– Deutsches Filmmuseum — ফিল্ম সংক্রান্ত ক্যামেরা তথ্যাদি রয়েছে। এটি আর্কিটেকচার মিউজিয়াম। মাঝে একটি কফির দোকান দু’টি মিউজিয়ামকে সংযুক্ত করেছে। একটি বাড়ির মধ্যে বাড়ি, তার মধ্যে বাড়ি, সবটুকু একটি বড় কাচের ব্লকে মোড়া, এটি নাকি খুবই ঝঞ্ঝাটপূর্ণ প্রোজেক্ট ছিল। নিউ ইয়র্কের স্থপতি Oswald Mathias Ungers তৈরি করেছিলেন। কিছু দূরে জার্মান পোস্টাল মিউজিয়ামটিও বেশ ভাল দেখতে, এটি কয়েক বছর হলো তৈরি হয়েছে। পরবর্তী মিউজিয়াম Stadel — খুঁটিয়ে দেখতে গেলে সারাদিন লেগে যায়। ইতালীয় ফ্রা আঞ্জেলিকো থেকে পলক্লি অবধি ৬০০ বছরের আর্ট সামগ্রী রয়েছে। এছাড়া পঁচিশ হাজার ড্রয়িং এবং পঁয়ষট্টি হাজার প্রিন্ট রয়েছে। স্ট্যাডেল আর্ট ইনস্টিটিউট ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান বাড়িটি অবশ্য ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৮—এই কয় বছর ধরে তৈরি করেছেন অস্কার সমার। এই ইনস্টিটিউটের একভাগে স্টেট কলেজ অফ আর্ট। স্ট্যাডেলে গ্যালারিতে উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বহু সংগ্রহ রয়েছে।

Eiserner Steg—মাইন নদীর ওপর এটি একটি ইস্পাত-ব্রিজ, মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীতে চালু হয়েছিল। তখন এই ব্রিজে চলাচল করা যেত শুল্কের বিনিময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিজটি ভূমিসাৎ হয় এবং নতুন করে তৈরি করা হয় মূল ব্রিজটির অনুকরণে। এই ব্রিজটি মানুষের পায়ে হাঁটার জন্য। রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ব্রিজের লেভেলে যেতে হয়। সিঁড়ি ছাড়া লিফটও আছে। কটাই বা সিঁড়ি। কিন্তু আমরা লিফটে করেই উঠলাম। বিদেশে এক-একটি লিফট এক-একরকম। উঠে কোন সুইচে হাত দেব বুঝতে না পেরে সােমা এমন একটি বোতামে হাত দিল যার জবাবে একটি মহিলা কণ্ঠ জার্মান ভাষায় কীসব বলতে লাগল মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। তবে এইটুকু বুঝলাম, বিপদে পড়লেই ওই বোতাম চালু করতে হয়। শেষাবধি অবশ্য অন্য বোতামের সাহায্যে ব্রিজের ওপরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি!

ওই ব্রিজে যাওয়ার আগে Dreikonigskirche চার্চ, নদীর দিকে মুখ করে। এর চুড়োটি ৮০ মিটার লম্বা। ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রথম বৃহত্তর নিও-গথিক চার্চ, Franz Josef von Denzinger তৈরি করেছিলেন। পাশেই নিও-ক্লাসিক্যাল ফোয়ারা। এই চার্চের কিছু দূরেই Deutschordenshans—তৎকালীন যোদ্ধাদের প্রতিষ্ঠান। Daniel Kayser নকশা করেছিলেন, ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ এই ছয় বছর ধরে তৈরি করা হয়েছিল, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে বোমা বর্ষণে ধ্বংস হয়েছিল। কিছু অদল বদল করে নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল প্রায় তিন বছর ধরে, ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি। পাশেই সেন্ট মেরি চার্চ। এখান থেকে আমরা বেড়াতে বেড়াতে কিছু না বুঝেই মদ্য তৈরির জায়গায় চলে গিয়েছিলাম —অনেকখানি চত্বর জুড়ে একটি বিশাল বাড়ি, সুবিশাল মিনার, লিফটে করে ওপরে যাওয়া যায়, সেখানে ২টি রিভল্ভিং রেস্টুরেন্ট আছে, সন্ধের পর খোলে। লিফটে যেতে গেলে যথেষ্ট দক্ষিণা দিতে হয়। অতএব যাঁরা পারেন তাঁরা ৭৩১টি সিঁড়ি হেঁটে উঠতে পারেন। ১২০ মিটার উঁচু থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টকে খুবই সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। ওপরে একটি মিউজিয়ামও আছে, সেখানে বিভিন্ন রকম মদ্য সংরক্ষিত রয়েছে।

Screenshot_20210129-121602

যাই হােক, ওই Eisemer Steg ব্রিজে হেঁটে, আমরা Remerberg-এ পৌঁছে গেলাম। এই অঞ্চল অল্প উঁচুতে। আগেকার দিনের শহরবাসীরা অবশ্য হিল(hill) বলত। এই অঞ্চলটি পাঁচ রাস্তার একটি চত্বর। ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রথম রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি এখানে হয়। আগে বিরাট চত্বর ছিল, বাড়ি-ঘর ছিল না। ধীরে ধীরে এই চত্বরটিকে উন্নত করা হয়েছে। মধ্যিখানের ফোয়ারাটি ১৫৪১-১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়। দ্রুত এই চত্বরটি শহরের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠল। এই অঞ্চলটির প্রায় সর্বাংশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস হয় এবং বর্তমান Romerberg পুনরায় তৈরি হয়। এই চত্বরেই Romer টাউন হল। বর্তমানে Dom ক্যাথিড্রালের মিনার যেখানে, সেখানেই মূল টাউন হলটি ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়। তাছাড়া বড় অনুষ্ঠানের পক্ষে জায়গাটি ছোট হওয়ায় ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন বাড়ি কেনা হয়। পরবর্তী ৪০০ বছরে টাউন হল বিস্তৃত হয়, আরও নয়টি বাড়ি সংযুক্ত হয়। এই চত্বরটিতেই ত্রয়াদোশ শতাব্দীর গথিক স্থাপত্যের সেন্ট নিকোলাস চার্চ ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয় এবং মাঝিমাল্লাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। আগে মিনারের ওপরে প্রহরী থাকত হর্ন বাজিয়ে বড় জাহাজকে স্বাগত জানাবার জন্য। এখন বন্দুকধারী নিরাপত্তা বাহিনী নজর রাখে সেখান থেকে যখন কোনও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়। চার্চের পেছনে হিস্টরিকাল মিউজিয়াম। যেভাবেই হোক ভেতরের সংগ্রহাদি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রকোপ থেকে রেহাই পেয়েছিল এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মিউজিয়ামটি ফ্রাঙ্কফুর্টের ঐতিহাসিক স্মারকই নয় শুধু, পরিবর্তনশীল আধুনিক তথ্যকেন্দ্রও। এখানে গ্রাফিক ছবি, স্লাইড এবং আরও উন্নতমানের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ইতিহাসকে বিস্তৃতভাবে হাতের নাগালে পাওয়া যায়।

এই Romerberg অঞ্চলেই Schirn আর্ট গ্যালারি—নানারকম প্রদর্শনী, নাটক, কনসার্ট ইত্যাদি হয়। একদিকে Struwwelpeter মিউজিয়াম—ডঃ হেরিক হফম্যানের মূল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। ডঃ হফম্যান ফ্রাঙ্কফার্টের মানুষ ছিলেন। ১৮০৯ থেকে ১৮৯৪ অবধি জীবিত ছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আজও তার সৃষ্টি মানুষের কাছে আদরণীয়। জীবিতকালে তিনি ডাক্তার ছিলেন পেশায়। তিনি বিশ্ববিখ্যাত লেখকও বটে—শিশুদের জন্য তার লেখা, ছবি খুবই বিখ্যাত। মিউজিয়ামে যা প্রদর্শিত ছিল, লেখাগুলি জার্মান ভাষায়, ইংরেজিতে অনূদিত কিছু পাওয়া যায়নি, অতএব বােঝার তাে উপায় নেই, ছবিগুলি দেখে সুকুমার রায়ের কথাই য়ামার মনে পড়লো। আমার জ্ঞান খুবই কম, ডঃ হফম্যানের লেখাকে জানার সৌভাগ্য হয়নি আমার, কিন্তু এটুকু অনুভব করতে পারলাম যে সুকুমার রায়ের লেখা এবং তাঁর লেখার মধ্যে কোথাও একটা ভীষণ মিল রয়েছে। ডাঃ হফম্যান তার সব পাণ্ডুলিপি, স্কেচ এই মিউজিয়ামে দিয়েছেন। এছাড়া ডাঃ হফম্যানের ফ্রাঙ্কফুর্টের শহরবাসী হিসেবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা বিরাট, বিশেষত ডাক্তারি ক্রিয়াকর্ম, মনোরোগবিদ্যায় সংস্কারকের ভূমিকা,  এবং ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে গণতন্ত্রবাদী হিসেবেও তার ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

এই মিউজিয়ামের সামনেই Dom ক্যাথিড্রাল, বেলেপাথর দিয়ে তৈরি, নবম শতাব্দীর চার্চ, ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ক্যাথিড্রাল হিসেবে আখ্যা পায়, ১৫৬২ থেকে এই ক্যাথিড্রাল রাজার অভিষেকের জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়। গথিক স্থাপত্যের মিনারটি এত বিরাট যে আমার ক্যামেরায় তাকে আনতে খুবই বেগ পেতে হয়েছে, ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়েছে। এই ক্যাথিড্রালটির চুড়োয় ওঠা যায়, তার জন্য অবশ্য ৩৮৩টি সিঁড়ি ভাঙতে হয়, এবং যথেষ্ট দক্ষিণাও দিতে হয়। এই দুটির শেষটি যদিও বা সম্ভব, প্রথমটি তো আমাদের পক্ষে বেশি অসুবিধাজনক ছিল। এই ক্যাথিড্রালের সঙ্গে একটি মিউজিয়ামও রয়েছে।

মাইন নদীর উত্তর ধারের মূল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি। সেদিকেই Paulsplatz-এ সেন্ট পলসের চার্চ—যেটি ফ্রাঙ্কফুর্টের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট ফ্রান্সিসের অনুগামীরা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লাইব্রেরি এবং স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হত। ঘটনাচক্রে এই চার্চটি প্রোটেস্টান্টদের প্রধান প্রার্থনার মন্দির হয়ে উঠেছিল। ধর্ম-নিরপেক্ষ ইতিহাসই এর খ্যাতির কারণ। এই চার্চটি জার্মানদের মধ্যে স্বাধীনতার এবং একতার প্রতীক। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জে এফ কেনেডি স্বয়ং এখানে এসে ভাষণ দিয়েছেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ব বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশনা সংস্থার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ সভা এখানেই হয়। গ্যেটে (Gothe) পুরস্কার থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ হয় সাহিত্য সমাজ-বিজ্ঞান দর্শন ইত্যাদির জন্য, এছাড়া বিশ্ব শান্তির জন্য, ক্যান্সার গবেষণার জন্যও এখানে পুরস্কার বিতরণ হয়।

সেন্ট্রাল, রেল স্টেশনের কাছেই বিখ্যাত কবি গ্যেটে (Gothe) র স্ট্যাচু, আমরা অবশ্য সারা শহর ঘুরে এখানে এসে পৌঁছেছিলাম। কেউই আর বলতে পারে না, আমি যথেষ্ট বিরক্ত ওদের না বলতে পারায়। সোমা অবশ্য খুবই সহানুভূতিশীল, সে আমাকে বোঝানো চেষ্টা করল—আরে, কলকাতার কয়জন নেতাজির স্ট্যাচু বা গান্ধীজির স্ট্যাচুর হদিশ দিতে পারে! হাঁটতে-হাঁটতে গ্যেটের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম এখানে ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন। ১৯৪৪-এর বোমায় এটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ভেতরে গ্যেটের পরিবারের জিনিসপত্র রয়েছে। সংলগ্ন মিউজিয়ামে প্রচুর তথ্য ও ছবি আছে। লাইব্রেরিতে এক লক্ষেরও বেশি বই এবং বহু পাণ্ডুলিপি রয়েছে।

দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিনে ফের Zeil, তার একদিকে Hauptwache আগে শহরের মূল কারাগার হিসেবে ব্যবহার হত। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এটি কফি খাওয়ার দোকান হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়, তারপর ধীরে-ধীরে রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়। েখন এখানে খুব ভিড় হয় বিকেলে কফি খাওয়ার জন্য। এই বাড়িটির পেছনে নিও ক্লাসিকাল ফোয়ারা, রেনেসাঁ আমলের একটি কুয়োর বদলে এটি তৈরি হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। এই চত্বরের দক্ষিণ দিকে কোণাকুণিভাবে সেন্ট ক্যাথারিনের চার্চ, যেখানে গ্যেটে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। ১৯৪৪-এ চার্চটি ধ্বংস করা হয় এবং দশ বছর ধরে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এখানে ধর্মীয় গান-বাজনা হয়।

IMG_20210129_123259

আরও পড়ুন...