Categories
2021_jan

উজ্জ্বল পাঠ । পর্ব ৮

উ জ্জ্ব ল পা ঠ ।  পর্ব ৮

সে লি ম   ম ণ্ড ল

ছায়া কিংবা স্বপ্নবাগানের কবি: গৌরাঙ্গ ভৌমিক

 

‘উজ্জ্বল পাঠ’ সিরিজিটির বাকি সাতপর্বে যে সমস্ত কবিকে নিয়ে লিখেছি, তাঁদের কোনো না কোনো কাব্যগ্রন্থ আমি সংগ্রহ করে পড়েছি। চেষ্টা করেছি সমগ্র পড়তে। এই প্রথম এমন একজন কবিকে নিয়ে লিখছি যাঁর কোনো সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ আমি পড়িনি। তবুও লিখছি, এজন্য কৃতজ্ঞ ‘স্বকাল’ পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশ দাসের কাছে। আগস্ট ২০১৬ সংখ্যাটি তিনি করেছেন কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিককে (১৯৩০-২০০১) নিয়ে। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন গুণীজনদের লেখা তো রয়েছেই, তবে আমার যেটা আমার সবথেকে ভালো লেগেছে তা হল গৌরাঙ্গ ভৌমিক শতাধিক কবিতা তিনি সংখ্যাটিতে ছেপেছেন। আমি বারবার মনে করি, অন্যের চোখে না; একজন কবিকে নিজ পাঠে আবিষ্কার করা দরকার। এই আবিষ্কারের আলাদা আনন্দ থাকে।একজন আনালোচিত কবি, যাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ খুঁজে পাওয়া একপ্রকার দুষ্কর ব্যাপার-স্যাপার, সেক্ষেত্রে এই একশ কবিতা কী মূল্যবান বলে বোঝানো সম্ভব না!

কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিক ‘যুগান্তর সাময়িকী’বিভাগে চাকরি করতেন। সম্পাদনা করতেন ‘অনুভব’ লিটল ম্যাগাজিন। আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন। তবে কোথাও অনর্থক বেশি সময় কাটাতেন না। আসর ছেড়ে উঠে চলে যেতেন। একজায়গায় বেশিক্ষণ বসলে তাঁর মনে হত, পৃথিবীর সমস্ত আয়োজন যেন ফুরিয়ে গেছে। শব্দের মধ্যে যে জীবন তার অনুসন্ধান প্রয়োজন। কিন্নর রায় তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, “গৌরাঙ্গ ভৌমিক মানেই নিবিড় আড্ডা। ঘন ঘন চা। তার সঙ্গে অনুপান হিসেবে সিগারেট। ক্রমাগত ধূমপানের ফলে তাঁর ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমার ফাঁকে তীব্র নিকোটিন হলুদ। প্রায় বারোমাসই খাদি বা হ্যান্ডলুমের রঙিন পাঞ্জাবি, সেইসঙ্গে মিলের ধুতি। ক্কচিৎ কখনও ঢোলা পায়ের দড়ি ভরা পায়জামা। শীতের দিনে পাঞ্জাবির উপর খদ্দরের জহরকোট, আর একটু বেশি শীতে রঙিন শাল, চাদর, পায়ে স্যান্ডেল।”

 

           

     

প্রথমে পড়া যাক, কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিকের কয়েকটি কবিতা—

 

এখনো মানুষ

 

মানুষ এখনো কাঁদে, কান্না আজও ভালো লাগে বলে

বাসা বাঁধে, ভালোবাসে, কিংবা দুঃখে

আবছা করে ঘর।

 

কখনো বিস্মৃতি আসে, কখনো-বা প্রতিশ্রুতি

অবিশ্বাস্য তারা হয়ে জ্বলে—

আকাশ উন্মুক্ত হয় অসুখের পর।

 

আবেদন

 

শুনেছি, টাকার মূল্যে সবই কেনা যায়—

দোতলার মস্ত সিঁড়ি,

দক্ষিণের খোলা বারান্দায়

                  অসামান্য জলের প্রপাত।

 

বাড়ে রাত। সকলের কাছে আমি ঋণী।

নেই কোনো অর্থের সঞ্চয়।

কি দিয়ে এসব আমি কিনি?

ধার পাব তোমার হৃদয়?

 

চাঁদ নিয়ে

 

যেদিন পুকুরে চাঁদ খান্‌খান্‌ ভেঙে গিয়েছিল,

সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলে তুমি,

            পুকুর ছিল না স্থির সেইদিন মধ্যরাত্রিবেলা।

আজকেও আশ্চর্য চাঁদ শালের জঙ্গল ঘেঁষে হেঁটে আসছে

                          শাদা এক ভালুকের মতো

তাকে নিয়ে খেলা যায় ‘চাঁদ চাঁদ’ খেলা?

 

ইঁদুর

 

পাহাড়ী অরণ্যে আমি বেশ আছি— এই ভেবে

গিরিখাতে যখন নেমেছি,

আমার নরম স্বপ্ন কিছুটা ব্যাহত হল ধূসর রঙের এক ইঁদুরের ডাকে—

‘দেখ হে গোপন পথে হাঁটাহাঁটিব মোটে ভালো নয়,

দেখ আমি কী রকম আটকা পড়ে গেছি।’

 

সতর্ক হওয়ার দায় স্বপ্নের ভেতরে কারো নয়,

স্বপ্নভঙ্গে ইঁদুরের কথাগুলি পুনরায় ভেবে দেখা যাবে—

এমন সান্ত্বনা নিয়ে গুহামুখে বিমলার সাক্ষাৎ পেয়েছি।

 

বিমলা চতুরা মেয়ে নয়, ভালোবেসে কাঁদতে পারে দুঃখের সময়।

সেও জানে, দুঃখহীন ভালোবাসা একান্ত দুর্লভ।

তার তৈরি ফাঁদে এক আজ রাতে ইঁদুর পড়েছে।

 

উপরের তিনটি কবিতা পড়তে গিয়ে কী মনে হয়?জীবানানন্দ পরবর্তীরা কবিরা যখন অনেক স্মার্ট, নির্মাণে আত্মসচেতন তখন কেন তিনি কবিতার প্রাচীন সুর নিয়ে থেমে আছেন?কবিতায় ডিজে বাজিয়ে যে হ্যাঙ্গামা তা থেকে কেন তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন? এই উত্তর পাওয়ার জন্য একজন কবিকে ধারাবাহিকভাবে পড়া প্রয়োজন। এই ধারাবাহিকতা আসলে খান্‌খান্‌ করা চাঁদের মতো। পুকুরজলে পড়ে থাকা এই চাঁদ আমরা অপার দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বলতে পারি—  আকাশ উন্মুক্ত হয় অসুখের পর। এই অসুখ কী? নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়া শরীরবেদনা? নাহ্‌ এই অসুখ আসলে আত্মকেন্দ্রিকতা। আত্মকেন্দ্রিকতার নিজস্ব কোনো রোডম্যাপ থাকে না। হাঁটতে হাঁটতে যখন ক্লান্ত লাগে তখনই সন্ধ্যা নামে। কোনো কোনো সন্ধ্যা তাঁর রাত্রির মতো। তিনি হিসেব করতে বসেন জীবনের লেনদেন। হয়ে ওঠেন এক প্রেমিক পুরুষ। তাঁর নরম স্বপ্নে শুনতে চান খয়েরি ইঁদুরের ডাক। খোঁজ করতে থাকেন বিমলা নামের মেয়েটিকে, যে ভালোবেসে দুঃখের সময় কাঁদতে পারে। কারণ, দুঃখহীন ভালোবাসা একান্ত দুর্লভ।

 

একজন কবি প্রকৃতির মধ্যে আত্মস্থ হয়ে উঠলেই বোধহয় তিনি ধ্যানী হয়ে ওঠেন। গৌরাঙ্গ ভৌমিক তেমনই এক ধ্যানী পুরুষ। তিনি চান না, জ্যোৎস্না নিভিয়ে কেউ হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখুক। প্রকৃতি তার নিজের মতো সুন্দর। আমরা তাকে রঞ্জিত করতে গিয়ে হত্যা করি। ‘পাখিরাও শিখে ফেলল’ কবিতায় তাঁর আর্তি মনে করায় ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মার্তৃক্রোড়ে’। শিকারীর দল যদি পাখি শিকার করে তাঁদের ভাষা শিখিয়ে দেন, তাহলে সত্যিই তো আমরা অরণ্যভ্রমণে কী সুখ পাব? 

 

পাখিরাও শিখে ফেলল

 

প্রকৃত স্বাধীন ছিল ঐসব পাখিগুলি, আশ্চর্য শুভ্রতা ছিল

তাদের পালক।

শিকারীরা ধরে এনে তাদের শেখাল শুধু নষ্ট সব মানুষের ভাষা।

অরণ্য-ভ্রমণে সুখ আমরা তবে পাব কার ডাকে?

 

সাধু ক্রিয়াপদেলেখা গদ্যকবিতা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতার ক্ষেত্রে এই প্রয়োগ দেখেছি। তবে গৌরাঙ্গ ভৌমিক অনেক আগেই কবিতায় এই সাধু ক্রিয়াপদের ব্যাবহার করেছেন। যখন বাংলা কবিতা এই পুরোনো ঘরানা ত্যাগ করতে চাইছে, তখন তিনি কেন এই সুরে লিখতে চাইছেন? কবিতা বা ভাষা অনেকসময় মুক্তি খোঁজে। একটানা দীর্ঘক্ষণ যেমন একই সুরের গান শুনতে ভালো লাগে না। তেমনটা কবিতার ক্ষেত্রেও।

 

বাড়িটা

 

বাড়িটার বাহিরে দেখিয়াছি, ভিতরে দেখি নাই।

 

দেখিলাম। ঘরে ঘরে আলো জ্বলিতেছে, পাখা ঘুরিতেছে,

রেডিও চলিতেছে, সানাই বাজিতেছে, সেতার বাজিতেছে

টি-ভির পর্দা কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে, বাড়িতে কেহ নাই।

 

দারোয়ানকে কহিলাম, কী ব্যাপার! কেউ নাই, অথচ…

 

দারোয়ান কহিল, নাই বলিয়াই তো এত উদ্যোগ আয়োজন,

জাগাইয়া রাখিবার এত চেষ্টা। বাড়ি ঘুমাইয়া পড়িলে

যাহারা বাহির হইয়াছে, তাহারা ফিরিবে কী করিয়া?

 

একদিন না একদিন সকলকে ফিরিতে হইবে।

 

পড়া যাক, আরও কয়েকটি কবিতা—

 

অথচ দুঃস্বপ্নে

 

হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, মাথার ওপরে গাছ, বৃদ্ধ পিতামহ যেন,

ছায়া দিচ্ছে কুণ্ঠাহীণ, প্রতিবাদহীন।

অথচ দুঃস্বপ্নে আমি পৃথিবীর সব গাছ মৃত দেখে

ভীষণ কেঁদেছি।

 

দুঃখের ভেতরে দুঃখ

 

নিভন্ত আগুন জ্বলে যে-রকম বহুক্ষণ ধরে, সেরকম প্রতিদিন সূর্যোদয় হয়

দুঃখের ভেতরে দুঃখ জমা রেখে মানুষেরা জেগে ওঠে,

                      মানুষের সঙ্গে কথা বলে।

আমাকে মৌনতা ভেঙে এসব শোনাতে হবে? এ রকম ভয়

জেগে থাকে প্রতিক্ষণ অলৌকিক বৃক্ষের আড়ালে।

 

 

ধ্বংসের বিরুদ্ধে

 

আমার মৃত্যুর পরেও রাস্তায় রাস্তায় আলো জ্বলবে,

কলে জল আসবে, নতুন রাস্তা তৈরি হবে,

বাড়িঘরে রং লাগানো হবে।

 

আমার মৃত্যুর পরেও গাছে গাছে ফুল ফুটবে,

       আকাশে পাখি উড়বে, বৃক্ষরোপণের উৎসব হবে,

                দোলনা পার্কে ছুটোছুটি করবে ছেলেমেয়েরা।

 

আমার মৃত্যুর পরেও কুলুমানালি বেড়াতে যাবে মানুষ,

মাথার ওপরে বিমান উড়বে, জাহাজের ভোঁ শোনা যাবে,

দূরের দিকে ছুটে যাবে রাতের ট্রেন।

 

বলতে বলতে কী যেন সুখের আবেশে তিনি চোখ বুজলেন।

 

আমি বললুম, ‘ব্যস, এতেই আপনি নিশ্চিন্ত?’

তিনি বললেন, ‘হু, এতদিন আমি মিছিমিছিই ভেবে যাচ্ছিলুম, যে,

আমি মরলে আমার ছেলেমেয়েদের কী হবে? কোন্‌ অন্ধকারে

আমি রেখে যাব তাদের? এখন বুঝতে পারছি,

আমার মৃত্যুর পরেও ধ্বংসের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে মানুষ’।

 

কবি স্বপ্নের ভিতর দুঃস্বপ্ন দেখেন— তাঁর মাথার উপর থেকে যেন ছায়া সরে গেছে। কোথাও যেন আর গাছ নেই। নিজেরভয় তিনি লুকিয়ে রাখছেন অলৌকিক বৃক্ষের আড়ালে। এই ভয়, এই লুকিয়ে থাকা, এই আড়াল কবিকে পারেনি ঘোর সংসারী থেকে বিবাগী করে তুলতে। তিনি বার বার চেয়েছেন অরণ্যের পথ ধরে কোনো বনদেবতার কাছে শান্তি পেতে। ‘আমি মরে গেলে আমার ছেয়েমেয়েদের কী হবে?’ এই লাইন থেকে বোঝা যায়— কবিতার শীত যতই হাড়ে লাগুক না কেন, রক্তমাংসে শৈত্যপ্রবাহ হবেই…নিজের ভিতরে দুঃখ জমা রেখে অপেক্ষা করতে হবে সূর্যোদয়ের। প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের একটি বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে— “দুঃখ বড়ো হলে/ তাকে নিয়ে ঘর করা যায়”। সত্যি কি আমরা দুঃখ বড়ো হলে তার সঙ্গে ঘর করতে পারি? ঘর কি কেবলই আশ্রয়? ঘরের মধ্যেই আমরা জীবনের এত সুতো আমরা ছড়িয়ে ফেলি, পায়ে পায়ে জড়িয়ে যায়… আমরা বুনন শিখতে চাই। বহনেই আমাদের কেটে যায় বেলা। ধ্বংসের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করার মতো মাথার অনুসন্ধান করতে করতে যে পথ আমরা খুঁড়ছি, তার মাটি নখে লেগে থাকি… নখ দিয়েই যেন বানিয়ে ফেলি বাড়ি…

 

 

 

পাঁচের দশকের এই কবি কেন অপঠিত? কেন নতুন পাঠক প্রজন্মের পাঠকের কাছে তিনি ম্লান হয়ে রইলেন, তা জানা নেই। তবে কি তাঁর কবিতা সতেজ, স্বপ্রাণ কবিতা পারেনি নতুন পাঠক বা অনুজ কবিদের অন্তরে জায়গা করে নিতে? গৌতম বসুর হয়ত ঠিকই বলেছেন—“পরের লেখা ভালবাসতে না পারলে সে-অপ্রেম একদিন অনিবার্যভাবে আমাদের লেখাও গ্রাস করবে। খোলা আকাশের নীচে এমনই এক সুদীর্ঘ, হয়তো অনিঃশেষ, জলঝড়ের রাত কাটাবার জন্য আমরা নিজেদের প্রস্তুত রেখেছি তো?”

 

সবশেষে তাঁর কবিতাতেই বলা যায়—

 

“লোকটা দাঁড়িয়ে আছে এখানে একাকী।

 

হাত নেই, পা নেই, পায়ের তলায় নেই মাটি।

অথচ দাঁড়িয়ে আছে লুপ্ত কোনো সাম্রাজ্যের

সম্রাটের মতো।

 

তার শুধু আছে অহংকার।”

swaKAL
Untitled-1

কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিক

চিত্রঋণ: সন্তু দাস

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

শংকর চক্রবর্তী

বি শে ষ  র চ না  | পর্ব ৬

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি 

ঝাড়বাতি

প্রশংসাযোগ‍্য কিছু লেখা বা কার্যকলাপ লক্ষ করার পরেও কিছু মানুষ কেন যে নীরবতায় মুখ ফিরিয়ে রাখেন তা দেখে অবাক হই । মনখারাপও হয় । আজকাল কেউ যেন প্রকৃত যোগ‍্যতাকে দ্বিধাহীন সম্মান জানাতে পারেন না । শুধু তাই নয় একজন কবির কোনো ভালোলাগা লেখা সম্পর্কে সমকালের অন্য কোনো কবিকে প্রশংসাবাক‍্য শোনালে সেই কবি অকারণে ঈর্ষান্বিত হন কেন বোঝা যায় না । তাঁর যদি সেই লেখা ভালো না লাগে তো সে কথা দূরভাষীকে জানাতেই হবে ? তা কি ওই ব‍্যক্তির আস্থাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার পরিকল্পনা ? আবার এটাও ঠিক যে কোনো লেখা সম্পর্কে এইসব আলোচনা ব‍্যক্তিগত পর্যায়ে যতটা স্বচ্ছ সোশ‍্যাল মিডিয়ায় ততটা নিশ্চিত রূপে নয় । সেখানে নানা ধরনের প্রভাব কাজ করে বলেই আমার ধারণা । প্রকাশ‍্যে কাউকে খুশি বা তুষ্ট করার প্রবণতা বোঝা যায় । আজকাল যেটা স্বাভাবিক তা হল , অধিকাংশ কবিই তাঁর নিজের লেখার প্রশংসায় আপ্লুত হতে ভালোবাসেন । সমালোচনা নৈব নৈব চ । যে কোনো সমালোচনাকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার ব‍্যতিক্রমী কবি সাহিত‍্যিক কেউ নেই তা তো নয় । আমার ব‍্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে সেইসব উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও অত্যন্ত মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবনত অবস্থায় ধরা আছে ।

পঞ্চাশের দশকে প্রয়াত এক বিপুল জনপ্রিয় কবি-সাহিত‍্যিকের সঙ্গে একান্তে এক আড্ডায় তাঁকে আমার অল্প বয়সের আবেগ দিয়ে খুশি করতে গিয়ে কেমন লজ্জায় পড়তে হয়েছিল সেকথা জানাই। তিনি তখনও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পাননি। সদ্য সেই পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম তিনি এবার নিশ্চিত পুরস্কারটি পাবেন। অথচ পেয়েছেন তাঁর অনেক পরে লিখতে আসা একজন সাহিত্যিক। এবং তিনিও যথেষ্ট পাঠকপ্রিয় ছিলেন সেইসময়। তো আমার বুক ভর্তি আবেগ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এটা কীভাবে সম্ভব? আপনার এতগুলো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও কবিতার বই থাকা সত্ত্বেও উনি কীভাবে পেলেন এবারের সাহিত্য অকাদেমি?’ এখনও মনে আছে, তিনি আমার বালখিল্য আবেগকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে, খুবই বিরক্তির সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন, ‘না না ওভাবে বলো না। ওর উপন্যাসটা খুবই ভালো। আমি পড়েছি। ঠিক নির্বাচনই হয়েছে।’ আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাও বেড়ে গেছিল দ্বিগুণ। ভাবছিলাম, ইনিই তো সরস্বতীর প্রকৃত বরপুত্র হবেন— তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে! আশ্চর্যের এটাই যে এইধরনের প্রশস্ত হৃদয়ের প্রতিক্রিয়া এখনকার লেখকদের আনেকের কাছেই আশা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। মনে আছে, একবার কোনো এক পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত সেই লেখকের উপন্যাস পড়ে হতাশ হয়েছিলাম। তাঁকে সে কথা জানাতেই তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘ভালো লাগেনি তোমার? এবার খুবই তাড়াহুড়ো করে লিখতে হয়েছিল। ভালো না-লাগারই কথা।’ এমন মধুর উপলব্ধিতে কাউকে নিজের লেখা সম্পর্কিত বিরূপ সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করতে দেখা যায় না সচরাচর। আসলে স্তাবকদের প্রশংসা শোনা অভ্যস্ত কানকে নিন্দেমন্দ শোনার জন্য প্রস্তুত রাখতে হয়। যা কেউ কেউ পারেন, সবাই নন। আমাদের ওই অগ্রজ শ্রদ্ধেয় লেখক তো সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকার সুযোগ পাননি কখনো। বরং ওই মিডিয়াহীন প্রশংসাবাক্যেই সংপৃক্ত থাকতেন সর্বদা। আবার অপছন্দের মতামতকেও কী সাবলীল ভঙ্গিমায় আত্মসমালোচনার সঙ্গে জুড়ে দিতে দেখেছি তাঁকে। আমরা এমন শিক্ষা অগ্রজদের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারিনি কখনো। আর এখন এই সময়ের কোনো এক লেখককে তাঁর লেখার বিরূপ সমালোচকের সঙ্গে বাক্যালাপ ও মুখদর্শন বন্ধ করে দিতেও দেখেছি আমি। অথচ আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক অগ্রজ লেখককে নিজের নয়, শুধু অন্যের লেখার সুখ্যাতিতেই তৃপ্ত থাকতে দেখি সর্বদা। তাঁর লেখার কোনো অসাধারণ পঙক্তি বা গদ্যাংশের কথা উল্লেখ করলে তিনি দ্রুত অন্য প্রসঙ্গে সরে যেতে চান। নিজের লেখার স্তুতি শুনতে চান না কখনো। বরং বিভিন্ন সময়ে এই অসামান্য লেখক-ব্যক্তিত্ব নিজের কোনো কোনো লেখার উত্তীর্ণ হওয়া নিয়ে নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করতেন আমার কাছে। যা দেখেশুনে অবাক হই আর নিজেদের অবস্থান সম্পর্কেও সন্দিহান হতে হয়।

আমরা যেন ভালো লাগার কথা নির্দ্বিধায় জানাতে পারি সবাইকে। আর, যাবতীয় বিরূপতাকে গ্রহণ করার জন্য নিজেদের মনের সমস্ত জানলা খুলে রাখতে পারি।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

নারী শহরের সম্পদ । পর্ব ১

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ১

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন বর্তমানে কর্মসূত্রে ফ্রান্স নিবাসী ম্যাডিকেল আল্ট্রাসাউণ্ডের তরুণ গবেষক…

রূ প ক  ব র্ধ ন   রা য়

নারী শহরের সম্পদ

পনেরোশো শতকে ক্রিস্টিন দে পিজান, সতেরোশো শতাব্দীর আনে ব্র‍্যাডস্ট্রীট অথবা ১৭৯২ সালে মারি ওলস্টোক্রাফট বিরচিত “আ ভিণ্ডিকেশান অফ দি রাইটস অফ ওম্যান” এর অনুপ্রেরণায় অঙ্কুরিত নারীবাদের প্রথম তরঙ্গ ১৯২০ সালে, তৎকালীন মার্কিন নারীকে এনে দিয়েছিল গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার।

কিন্তু তার ৩ দশক পরেও আন্তর্জাতিক কীর্তিবাস নারীর পক্ষ্যে সাহিত্যে, এবং মূলত পুরুষ শাসিত কবিতার জগতে স্বাধীন যাপন ছিল প্রায় অসাধ্য। ১৯৪৯ সালে সিমন দি বাভোয়া রচিত “দি সেকণ্ড সেক্স” সেই বাঁধে চিড় ধরায়, এবং ফ্রান্সে শুরু হয় নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের উদযাপন। ১৯৫৩ সালে “দি সেকণ্ড সেক্স” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে বেট্টি ফ্রিডান লেখেন “দা ফেমিনিন মিসটিক”। এরপর অবশ্য আতর্জাতিক কবিতার আঙিনায় মহিলা কবিদের আরে পিছনের সারিতে বদ্ধ থেকে যেতে হয়নি। কেবল নারীবাদি রাজনীতির বিভিন্ন আঙ্গিক, আবেগ বা ধারাই নয় সে সমস্ত কবিদের কলমে উঠে এসেছে এক সম্পূর্ণ আধুনিক মানবিক যাপন, যেখানে প্রেম, ভালবাসা, অভিমান বা রাগের মত অনুভুতির সাথে সাথেই ধরা পড়ে সুররিয়ালিজম, টাওইজম, অথবা মার্ক্সবাদের দার্শনিক তত্ত্ব। সিমন যেমন বলেছেন “জেণ্ডার ইজ সোশাল”। 

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় থেকে তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ফরাসী ও মার্কিনি বিশিষ্ট মহিলা কবিদের এক গুচ্ছ জানা অজানা কবিতাকে বাঙালী পাঠক মননে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই বর্তমান কাজটির(সিরিজটির) প্রয়াস।

একে একে যেমন উঠে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনিস লেভেরটোভ, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, এ্যানে সেক্সটন, ম্যারিয়ান মোর অথবা ফ্রান্সের সিলভিয়া ব্যারোন সুপারভিএলে, মারি ক্লেয়ার ব্যানকার্ট, মার্টিনে ব্রোডা, আন্নে মারি এ্যালবিয়াক ইত্যাদির নাম আবার তেমনই ভাষান্তরিত হয়েছেন দ্বিতীয় তরঙ্গের নাম না জানা রাজনৈতিক কিছু কবি।

এই অনুসঙ্গই ” নারী শহরের সম্পদ”, যেখানে নামটি নিজেই ক্রিস্টিন ডে পিজানের বই “The Treasure of the City of Ladies”এরই অনুপ্রেরণার অনুদান।

এই সংখ্যায় ফরাসী কবি, সাহিত্য আলোচক এবং অনুবাদক মার্টিনে ব্রোদা (মার্চ ১৯৪৭এপ্রিল ২০০৯)। একই সাথে দর্শন এবং লেটারস পড়া শেষ করে ব্রোদা মূলত কবিতা রচনার দিকেই নিজেকে নিমজ্জিত করেন এছাড়াওএ্যাকশান পোয়েটিকজার্নালের সদস্যা এবং সি এন আর এস-এ গবেষক হিসাবেও যুক্ত ছিলেন  মূলত আধুনিক কবিতা নিয়েই ব্রোদার কাজনিজের কবিতা ছাড়াও, পল সেলানের কাজের অনুবাদ এবং আলোচনার জন্য ব্রোদার খ্যাতি রয়েছে

মার্টিনে ব্রোদা (Martine Broda)

আমি তোমায় বলতে চেয়েছি

অশ্রু নয় শব্দেই

আমি তোমায় ও কথাটা বলতে চেয়েছি

 

ঠিক যখন 

আমার প্রেমের অভ্যন্তরে

একটা দিগন্ত জেগেছিল

তোমায় চেনার প্রথম সেদিন 

আমায় দিয়েছে এক অনভিজ্ঞ সূচনা আমায় দিয়েছে

অনভ্যস্ত মুখ

 

সেই কবিতার নাম


আমি ধুয়ে ফেলি

আমি ধুয়ে ফেলি

যা আমি কুড়িয়েছি

আলোয় বা অশ্রুর 

মরুদ্দানে আমি খাই 

আমার জ্বলন্ত চোখ


একটা কুঠারের সাথে কবিতা…

একটা কুঠারের সাথে কবিতা

যারা প্রেম জানেনি

তাদের ভালবাসার সাথে কবিতা

 

কিন্তু যারা বাঁচার জন্য মরে গেল

যাতে আমরা বাঁচতে পারি

 

আমাদের কি আবার দেখা হবে

দেখা হবে আবার

 

কিন্তু যারা এগিয়ে গেছে

কিন্তু যারা এগিয়ে গেছে

আকাশের ভয়াবহ শূন্যতার উপর

 

ঠেস দেওয়া হাতের পাতায়

এত নীল এত শান্ত প্রতিচ্ছবির

খেলা চলে চিরতরে হারায়

একটা পিরারিক বিজয়

 

আমাদের কি দেখা হবে

তারা থেকে তারায় ভাবনা

আকাশের স্থিরতায় এক সুতো নিক্ষেপ করে

 

দেখা হবে আবার

 

একটি কুঠার দিয়ে

ভালবাসা দিয়ে খণ্ডনরত

আমাদের


সে নিছকই ছেড়ে গেছে…

সে নিছকই লুঠের মালের মত ঝিলমিলে

একটা হারানো স্মৃতি ছেড়ে গেছে

 

উদ্ভাসিত আমি ছিলাম

সেই দীর্ঘ আলোর দেবদূত

পাতাদের এক বিশুদ্ধ নির্যাস

 

সংক্ষিপ্ত আলো

থাকুক

 

যখন ওরা…

যখন ওদের যারা যারা যন্ত্রণা অতিক্রম করেছে

ছদ্মবেশে মুখোমুখি দেখা হয়

ওরা বিবস্ত্র হয় দ্রুত

রক্তে ঝলসানো ওদের চামড়া

ওরা নিজেদের দুর্দান্ত উত্তাপটায় উষ্ণ করে

 

এবং তা অবিশ্বাস্য প্রেম

তোমার বিস্মৃত চাহনির মত ততটাই নীল

আগের থেকে আরো মনোরম উদ্দীপনা

আমরা তাকে জীবনের মত পান করি

 

তার আরোগ্য হয়

ক্ষত থেকে আঁশ ঝরে পড়ে

গুরুত্বপূর্ণ কাজ-

কবিতা গ্রন্থ 

Éblouissements , Paris, Flammarion, 2003

Summer Poems , Paris, Flammarion, 2000

Eight Pages about the Shoah in Robert Antelme , Paris, Gallimard, 1996

Poèmes d’Éblouissements in 29 Femmes / une anthologie , Paris, Stock, 1994

Grand jour , Paris, Belin, 1994, (Contemporary Extreme)

Ce recommencement , Nice, Unes, 1992 (with Frédéric Benrath )

Passage , Lettres de Casse, 1985

Tout ange est terrible , Paris, Clivages, 1983 (with André Marfaing )

Double , La Répétition, 1978 (with Gisèle Celan-Lestrange )

অনুবাদ

Paul Celan , La Rose de personne / Die Niemandsrose , bilingual edition, Paris, Le Nouveau Commerce 1979. New edition, Paris, José Corti, 2002.

Paul Celan , Grille de parole , Paris, Christian Bourgois, 1991.

Paul Celan , Enclos du temps , Paris, Clivages, 1985.

Nelly Sachs , Enigmes en feu , in Eli, lettres, Enigmes en feu , Paris, Belin, 1989.

Nelly Sachs , The one who sets out in quest , in Po & sie , n o  69, Paris, Belin, 1994.

TS Eliot , East Coker , (one of the quartets), in Europe , n o  830-831, June-July 1998.

Walter Benjamin , The Translator’s Task , in Po & sie , n o  55, Paris, Belin, 1991, p. 150-158

রূপক বর্ধন রায়

অনুবাদক

GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

উজ্জ্বল পাঠ । পর্ব ৭

উ জ্জ্ব ল পা ঠ ।  পর্ব ৭

সে লি ম   ম ণ্ড ল

পিকাসোর নীল জামা পরা লোকটি: সজল বন্দ্যোপাধ্যায়

সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার কথা বলতে গেলে কবিতা লেখার প্রথম দিকের কথা মনে পড়ে। সময়টা ২০১৪-২০১৫ হবে। ফেসবুকে সিনিয়র দাদাদের দেখতাম তাঁর কবিতা শেয়ার করতে। তখনই শুনেছিলাম ওঁর বইপত্র পাওয়া যায় না। কিছুদিন পরে ফেসবুকে ‘কবি সজল বন্দ্যোপাধ্যায়’ ( https://www.facebook.com/PoetSajal ) নামে একটি পেজ পাই। ওখান থেকে নানা কবিতা পড়তাম। বই হাতে নিয়ে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। তারপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে। একদিন অনিন্দ্য দা’র (কবি অনিন্দ্য রায়) সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারি— ২০২০ কলকাতা বইমেলায় ‘গ্রাফিত্তি’ থেকে প্রকাশ পেয়েছে সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘সজল সরণী’। সম্পাদনা করেছেন কবি নীলাব্জ চক্রবর্তী। নীলাব্জদার সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় থাকলেও সেভাবে কখনো আলাপ হয়নি। তখন ভরা লকডাউন। কলকাতায় না ফিরলে সংগ্রহ করার উপায় নেই… অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন সুযোগ এল। বেলঘরিয়া স্টেশনে সদাহাস্য নীলাব্জদার থেকে বইটি সংগ্রহ করলাম। ষাটের দশকের এই কবি চন্দননগরের তেলেনীপাড়ায় বেড়ে উঠলেও জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। বাংলা কবিতা আন্দোলনের এক সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। ‘মঙ্গলবার্তা’ নামে বাইবেলের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। এই বই দু-বাংলাতেই জনপ্রিয় হয়। যদিও তিনি সবসময় প্রচারবিমুখ থাকতে পছন্দ করতেন।

 

প্রথমে কবির একটি কবিতা পড়ব—

 

ছবি

সমস্ত সিঁড়িতে         

তোমার ছবি

ধূপের ধোঁয়ায়

পায়ের শব্দে

বেজে উঠুক

ফুটে উঠুক ফুল

সারাক্ষণ

নতজানু

সাপের ওপর যেতে যেতে

তোমার বুকের রক্ত দু’হাত পেতে

তোমার হাতের পেরেকের দাগ থেকে জলছবি নিয়ে

নিজের হাতের ছাপ দিয়ে

তোমার আমার ছবি

সমস্ত সিঁড়িতে।

 

‘ছবি’ কবিতাটিতে শুধু নামকরণে নয়, চিত্রময়তা কবিতাটির সর্বস্ব জুড়ে। কবিতাটি পড়ার সময় মনে হয়, কবি একটি সাদা ক্যানভাসে রং-তুলি নিয়ে দৃশ্য আঁকছেন। আর আমরা সেই দৃশ্যের সামনে বসে থাকা একজন দর্শক, দেখছি— কীভাবে ক্যানভাস জুড়ে একটু একটু করে ফুটে উঠছে ছবি। এই ছবি যেন তাঁর জীবনের সিঁড়ি। নিজের হাতে পেরেক গেঁথে, সেই রক্তে আঁকা জলছবি। এই ছবি কি কবি কখনো নিজে দেখতে চান? নাকি দেখতে চান না বলে ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেন নিজ ধূপধোঁয়া?

 

কবির একটি কাব্যগ্রন্থ ‘মিড়’। এই কাব্যগ্রন্থের প্রতি আমার আলাদা একটা দুর্বলতা আছে। সংগীতের একটি স্বর থেকে আরেকটি স্বরে অবিচ্ছিন্নভাবে গড়িয়ে যাওয়াকে মিড় বলে। কবি এই কাব্যগ্রন্থের নাম ‘মিড়’ কেন রাখলেন? মহাদিগন্ত পত্রিকা সম্পাদক উত্তম দাসের লেখা  সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্বাচিত কবিতা’র ভূমিকা থেকে জানতে পারি— পারিবারিকসূত্রেই তাঁর সঙ্গে গানের সংযোগ। এরপর দেবব্রত বিশ্বাসের গানের প্রতি ছিল তাঁর অপার মুগ্ধতা। আর রবীন্দ্রসংগীতকে জীবনের চালিকা শক্তি হিসেবে নিয়েছিলেন। গানের সঙ্গে তাঁর যাপনের প্রতিফলনই হয়ত এই কাব্যগ্রন্থ…

 

এই কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটি কবিতা প্রথমে পড়া যাক—

 

মিড়

 

সমস্ত সময় বারান্দায় ছায়া

 

১১

ঘড়িতে দম দেওয়াও যা

না দেওয়াও তা—

 

১৯

সারাটা দিন পুকুর ভরা রাত

 

৩০

আর একটা চুল

সাদা হয়ে গেল—

আয়নায় দেখতে দেখতে

আয়নাটা বরফে ঢেকে যাচ্ছে—

আয়নায় ভেসে ওঠা মুখটাও

সাদা হয়ে যাচ্ছে—

 

 

৪৬

বরফের পাশে

পাত্র ধ’রে

দাঁড়িয়ে আছি

গ্রীষ্মের জন্যে

ঠায় অপেক্ষা করছি

 

৫৮

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের

চুড়ো বেয়ে

সাবানের ফেনা গড়িয়ে পড়ছে—

 

‘মিড়’ ৫৮টি কবিতার সিরিজ বলা যায়। এই কাব্যগ্রন্থটি যতবার পড়ি, মনে হয় একজন দার্শনিক গান গাইতে বসেছেন। সহজ, ইঙ্গিতময় একটি পর একটি বাক্য rhythm হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কবিতার সঙ্গে গানের যে অদ্ভুত যোগ তা আমরা জানি। লালন, কুবীর, কবীর এঁরা প্রত্যেকে গানের মাধ্যমে মানুষের মনের ভিতর পৌঁছেছিলেন। ভাষার মধ্যে সুর প্রবেশ করলে তা আরও গতি পায়। সুর অতিমাত্রায় স্পন্দনশীল… সুরের কোনো বিশ্লেষণ হয় না… সুর কেবলই অনুধাবনযোগ্য… ইঙ্গিতময়…  ‘ঘড়িতে দম দেওয়াও যা/ না দেওয়াও তা—’  এই দু-লাইনের একটি কবিতা (অণু কবিতা!) কী অদ্ভুত ইঙ্গিতময়ে তরঙ্গায়িত হচ্ছে! সত্যিই তো ঘড়িতে দম দিলেই বা কী, না দিলেই বা কী? জীবনের পাঠ বা অভ্যাস কি ঘড়িতে দম দিয়ে সম্ভব? বরফাবৃত আয়নাতে নিজের সাদা মুখ দেখতে দেখতে আমরা কি কখনো ভাবি, একটা পুকুর ভরা রাত আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি? না, এ কেবল কোনো গ্রীষ্মের ঠায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা—

স্মৃতিসৌধের চূড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমাদের শরীর ধোয়া সাবানের ফেনা?

 

সজল বন্দ্যোপাধায়ের আরও কিছু কবিতা পড়লে তার ভিতরে প্রবেশ করতে সুবিধা হবে। পড়া যাক—

 

স্বপ্ন

 

আমি পাহাড়ে ছুটি কাটানোর স্বপ্ন দেখি।

আমি সমুদ্রে ডুবে থাকার স্বপ্ন দেখি।

আমি না-জামা না-কাপড় মেয়েমানুষের স্বপ্ন দেখি।

আমি কিন্তু

মৃত্যুর স্বপ্ন দেখিনা।

এবং

সেই ঘুমের মধ্যে অপেক্ষায় থাকি—

কখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখব।

 

 

স্মৃতি

 

রক্ত ক্ষরণে ক্রমে ক্রমে রক্তটা শুকিয়ে জমাট হয়ে গেল। আহত লোকটা তার নাম দিল স্মৃতি। তারপর সারাক্ষণ ধরে ঐ স্মৃতির দিকে গভীর অভিনিবেশে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। ওর রক্তের সঙ্গে কি নিবিড় সম্পর্ক। আমি দেখলুম সারাক্ষণ স্মৃতির দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যে লোকটাকে কেমন পাথরের মত দেখাচ্ছে। লোকটা যেন রক্তেরই মত জমাট হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হল ঐ আহত লোকটার নামও স্মৃতি।

 

 

সেই ভাঙা বাড়ীটা

 

সেই ভাঙা বাড়ীটা। নাবিকটি মদের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে  বলেছিল। এরমধ্যে সেই ভাঙা বাড়ীটা। বাড়ী থেকে চিঠি এসেছিল। বাড়ী  থেকে চিঠি এসেছিল। তাতে লেখা ছিল এখানের সমস্ত কিছুর মধ্যেই সেই ভাঙা বাড়ীটা। নর্তকীর কপালের ওপর শিশিরের মত যে ঘাম চিকচিক করছিল, তারও মধ্যে সেই ভাঙা বাড়ীটা। চুম্বন আলিঙ্গনের মধ্যে বাতাস সমুদ্র জ্যোৎস্না। সেই ভাঙা  বাড়ীটা। মদের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে তার চোখে সম্মোহনের ছায়া নেমেছিল। তার শক্ত হাত, বুকের মধ্যে রাখা ছবি, বন্দরের হল্লা, মায়ের মত ঘনিষ্ঠ শৈশব—  সব ঝাপসা হয়ে আসছিল। সব অন্ধকারে। বিদায়, বিদায়। শুধু সেই ভাঙা বাড়ীটা। তার মধ্যে। তার সমস্ত কিছুর মধ্যে। সেই ভাঙা বাড়ীটা। ডুবো পাহাড়ের মত সমস্ত সমুদ্রের মধ্যে সে শুধু দেখতে পেয়েছিল সেই অমোঘ ভাঙা বাড়ীটা। দুঃখিত নির্জনতার মত সেই ভাঙা বাড়ীটা।

 

আমি

 

ভেতরে

ক’জন অন্ধ

হাত বুলিয়ে বুলিয়ে

ছবিটা

দেখছে।

 

সজল বন্দোপাধ্যায়ের কবিতা মনোযোগ নিয়ে দেখলে খেয়াল করা যায়— নানা স্তর তিনি রেখেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। একজন কবির বোধহয় এটাই প্রধান অস্ত্র। আমি ব্যক্তিগতভাবেও মনে করি, একই কবিতা একাধিক ভালো লেখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভাঙাচোরা। শ্রুতি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হয়েও তিনি আবদ্ধ থাকেননি। তিনি নিজের ভিতর ঘুমোতে চেয়েছেন। আবার স্বপ্নে দেখেছেন একটি ভাঙা বাড়ি নর্তকীর কপালে শিশিরে মতো ঘাম নিয়ে, মায়ের মতো ঘনিষ্ঠ শৈশব নিয়ে তাঁর ভিতরে ক্রমাগত হাত বুলিয়ে চলেছেন। তিনি অন্ধ। এই স্পর্শ তিনি অনুভব করছেন।

 

সজল বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু ‘আমি’ কবিতাটির জন্যই স্মরণে রাখা যায়। এই কবিতা দিয়েই আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। কবিতাটির ভিতরে যে এত শক্তি, শ্লেষ তা ভাবা যায় না। কিছু কিছু কবিতা এভাবেই আসে যা কবিতাটি লেখার পর কবি বুঝতে পারেন। অন্ধকারে পায়চারি করতে করতে শব্দ থেকে কখন যে আলো বিচ্যুত হয়ে সারা ঘর ছড়িয়ে পড়বে তা কবিও জানেন না…     

 

কবিতায় স্পেস যে কী মারাত্মকভাবে ব্যবহার হতে পারে, তা সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় বোঝা যায়। দক্ষতার সঙ্গে স্পেস ব্যবহার করেছেন। ঘর-সংসার কবিতাটির— ‘সারা/ রাত/সারা/ দিন/ কাচের/ ওপর/ একা/ শু য়ে থা কা’ এটুকুই যদি খেয়াল করা যায় প্রথমে দেখব লাইন ব্রেক, তারপর দেখব ‘কাচের ওপর’ এই বাক্যকে মূল অ্যালাইনমেন্ট থেকে সরিয়েছে, এরপর ‘শু য়ে থাকা’ শব্দটি এভাবে ছাড়া ছাড়া রেখেছেন… এবার ভাবুন… ‘সারা দিন, সারা রাত’ মানে এই দীর্ঘ একটা সময় এটাকে তিনি দেখিয়েছেন যেন একটা বিরাট ঘর আর ওই ঘরে এক সাইডে খাটিয়ে পাতা রয়েছে। আর খাটিয়ার ওপর কবি সটান একাকীত্ব কাটাচ্ছেন। ‘শু য়ে থা কা’ এই ছাড়া ছাড়া শব্দটি যেন কবির দেহ। এই দৃশ্যময়তার কথা ভাবলেই চমকে উঠি… আবার যদি আরেকটি কবিতা ‘ক্যালেণ্ডার’ দেখি, সেখানেও কবি ভীষণ মুন্সিয়ানায় স্পেসের ব্যবহার করেছেন। একটি পাতা যেন কবি আমাদের সামনে ওলটাচ্ছেন… একটি পাতা বা অন্য পাতার পর কবি ইচ্ছে করলেই ড্যাশ (— ) ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু সচেতনভাবেই করেননি। একটি পাতার পর যে স্পেস তা যেন সময়কাল। সময় যতই দ্রুত বয়ে যাক, হিসেবে করতে বসলে তার খতিয়ান মেটানো আমাদের পক্ষে খুব সহজ না। কবি যেন ওই স্পেসের মাধ্যমে আরও জোর দিয়ে বলছেন দ্যাখো, দ্যাখো…

  

কয়েকটি এমন কবিতা পড়ে নিই—

 

ঘর-সংসার

 

আমার

সারা

রাত

সারা

দিন

     কাচের

     ওপর

একা

শু  য়ে  থা  কা।

 

 

ক্যালেণ্ডার

 

একটা পাতায়        আমরঙের গন্ধ।

একটা পাতায়        গায়ে কাঁটা দেওয়া কদমের মন কেমন করা।

একটা পাতায়        শিউলিভাসা বুকতোলা নদী।

অন্য পাতায়         শিশিরে কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া।

অন্য পাতায়         বুড়ি ঠাকুমার নেই-পাতা-গাছ।

অন্য পাতায়         রাজকন্যের প্রথম স্নানের সুখ।    

 

লাল দেওয়ালে উড়ছে

এ কোন্‌ সালের ক্যালেণ্ডার!

 

 

দূরত্ব

 

যে মেয়েটা জঙ্গল থেকে ফিরছিল

চিতাবাঘের সঙ্গে দেখা করে—

যে লোকটা গরুর গাড়িতে কাঠ বোঝাই

পাহাড়ের সঙ্গে সারারাত—

যে গাড়িটা পথের ধুলো উড়িয়ে

বনের হরিণ তাড়িয়ে

মাঝরাতে শহরে—

সে সারাগায়ে বনের গন্ধ—

 

পাহাড়    বন    ঝর্ণা    জন্ম    মৃত্যু

কিছুই দেখা হল না

 

মেয়েটাকে দেখছি

লোকটাকে দেখছি

গাড়িটাকে দেখছি

 

আমার কিছুই জানা হল না—

 

 

স্পেসের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার আকার নিয়ে বেশ কয়েকজন কবি, বিশেষ করে শ্রুতির কবিরা ভেবেছিলেন। আমি প্রথম পরেশ মণ্ডলের কবিতায় দেখেছিলাম জ্যামিতিক আকার। কবিতার ভালোমন্দ বিচার করা দায় ভার আমার না। তবে বাবা-মায়ের মতো অগ্রজ কবিদের জিনও আগামী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চলে আসে। কবিতার বাঁক পরিবর্তনে এই কবিতা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

 

সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ে দুটো কবিতার কথা আমি এখানে বলব— ‘বৃষ্টি’ এবং ‘কারা কথা বলতে বলতে’। দু’টি কবিতার দিকে তাকালে আমারা চোখে সামনে দেখতে পারি যেন ওই দৃশ্য। কখনো তির্যক, কখনো লম্বালম্বিভাবে বৃষ্টি পড়ছে আবার গড়িয়ে যাচ্ছে জল, ভরে উঠছে পুকুর-নালা… আবার উপচে পড়ছে ওই জলধারা… কবিতাটির দিকে তাকালেই ছবি স্পষ্ট। 

‘কারা কথা বলতে বলতে’ এই কবিতাটিও ব্যতিক্রম নয়। এই কবিতার visualisation একাধিক স্তরে। প্রথমে আমি এটাকে একটি মানুষের অবয়বের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। দু-পাশে দুই চোখ, নাক, থুতনি…  মানুষের মধ্যে দিয়েই যেন দেখিয়েছেন আমাদের সমস্ত আঁকবাঁক।  দেখিয়েছেন বাসে, ট্রামে চলার সমান্তরাল পথ, ঘরের কোনে চেয়ার-টেবিল-বই। আবার দেখিয়েছেন নিজেকে খুঁড়তে খুঁড়তে কবরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া… যেন নিত্যদিনের এক কোলাজ করছেন…

কবি সজয় বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতায় নানারকম এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে নিজের চেতনা জগত থেকে অন্তর্জগতে পাঠককে নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি বেরিয়েছেন আবার ঘুরে ফিরে বাড়ি ফিরেছেন একই বিছানায় ঘুমিয়েছেন আর নিজেকে বার বার প্রশ্ন করেছেন— আমি একই কথায় কবিতা লিখি না কেন? আমি একই মানুষ থাকি না কেন? এ প্রশ্ন আমাদের চিরকালীন। এই উত্তর, আমরা কখনো জানার চেষ্টা করি না। একজন কবিতা লেখকের কাছে এ-উত্তর কোনো পায়রার পায়ে লেগে থাকা ধুলোর প্রলেপের মতো… আসলে আমাদের কাছে একটি সাদা পায়রা বা তার উড্ডয়ন গুরুত্বপূর্ণ… 

কবি সজল বন্দ্যোপাধ্যায়

ঋণ:

নীলাব্জ চক্রবর্তী

অনিন্দ্য রায়

শমীক ষাণ্ণিগ্রাহী

 

তথ্যস্বীকার:

সজল সরণী (গ্রাফিত্তি)

নির্বাচিত কবিতা (মহাদিগন্ত)

মিড় (পিলসুজ)

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

জেরোম রথেনবার্গের কবিতা । পর্ব ৩

অ নু বা দ

অ মি তা ভ   মৈ ত্র

জেরোম রথেনবার্গের কবিতা

রিয়েল থিয়েটার

মঞ্চ

খোলা একটা জায়গা— চার্চ বা অন্য কোনো ধর্মস্থানের চত্বর হতে পারে। লম্বা কাঠের বেঞ্চে চারদিক ঘেরা। দর্শকরা বসে। মাঝখানে গভীর যাতে কোনো মানুষ দাঁড়াতে পারে। খসখসে চওড়া কাঠের পাটাতনে সেটা ঢাকা। পাশের টেবিলে কাঁচি, ছুরি, ফিতে, কসাইয়ের ছুরি, কাগজের ফুল রাখা। মঞ্চ সাজাতে বড়ো কিছু গাছ কেটে চারপাশে শক্ত করে পুঁতে দিতে হবে। ছাগল  ভেড়ার মতো গৃহপালিত পশু জীবন্ত ঝোলানো রয়েছে গাছের ডালে। এছাড়াও পাখি, নানা রঙের ফিতে, সোনা আর রুপোর অলঙ্কারে গাছগুলোকে সাজানো যায়।

 

প্রথম পর্যায়

সাদা ছোটো গাউন পরা চাকরদের হাত থেকে শ্রোতারা লম্বা ঝলমলে রঙের গাউন নেয়। রাস্তার পোশাক বদলে তারা পড়ে নেয় লম্বা গাউন।

 

দ্বিতীয় পর্যায়

চাকররা আগুন ধরিয়ে দেয় গাছগুলোয়।

 

তৃতীয় পর্যায়

গাছগুলো জ্বলে উঠলে পাঁচজনের একটা দল ভিতরে আসে। চাকরের মতো সাদা পোশাক তাদেরও, যা তাদের বুকে শক্ত করে বাঁধা আর ঝুলে আছে পা পর্যন্ত। একজন ছাড়া বাকিদের মাথা খোলা, কামানো। যিনি নেতা তার মাথাই শুধু জমকালো পাগড়িতে ঢাকা। তার ডানহাতে বাচ্চাদের ঝুমঝুমি আর বাঁ হাতে পুরনো দিনের লন্ঠন। বাকি চারজনের হাতে, যথাক্রমে— ১। ধাতুর রান্নাপাত্র ২। প্লাস্টিকের ছোট্ট ক্রিসমাস ট্রি ৩। একটা বড়সড় মেয়েদের হাতপাখা ৪। দোকানের কোনো ম্যানিকিনের বাঁহাত। নেতার ইঙ্গিতে সেই চারজন দর্শকদের থেকে কোনো পুরুষ (নারী)-কে নির্বাচিত করে মঞ্চের কাছে তাকে নিয়ে আসে। সেই পাঁচজন এবার টেবিলের সামনের মাটিতে তাদের জিনিসপত্র রাখে আর নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবী লোকটিকে ফিতে, কাগজের ফুল, ছুরি দিয়ে সাজিয়ে দেয়। তার সাজ শেষ হলে নেতা তাকে গর্তে নেমে যেতে সাহায্য করে। অন্য চারজন চওড়া কাঠের পাটাতনে গর্তের মুখ ঢেকে দেয়। নেতা গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে। চারজন তখন শুরু করে স্তোত্রের গান— “আনন্দে আমি বহন করব ক্রুশ”। শ্রোতারাও অংশ নেয় সেই গানে।

 

চতুর্থ পর্যায়

সত্যিকারের ফুলপাতা দিয়ে ঢাকা একটা ষাঁড়কে আনা হয় অনুষ্ঠানের জায়গায়। সহকারী চারজন কাঠের পাটাতনের ওপর দাঁড় করায় ষাঁড়কে। কসাইয়ের ছুরি তুলে নিয়ে দীর্ঘ আর গভীর আঘাত করে, যাতে সেই রক্তস্রোত কাঠের পাটাতনে আর গর্তে পড়ে, সেখানে নির্বাচিত লোকটি মুখ ওপরে তুলে সেই রক্ত মুখে, মাথায়, সারা শরীরে আর পোশাকে গহণ করে। শরীর পিছনে হেলিয়ে তাকে গাল চোখ ঠোঁট নাক ভালো করে ভিজিয়ে নিতে হয়। তার হাঁ মুখের মধ্যে যেন রক্ত পড়ে আর সেই রক্ত সে যেন উৎসুকভাবে পান করে। প্রধান যখন মনে করেন তখন ষাঁড়টির কন্ঠনালী ছিন্ন করেন তিনি, যাতে গর্তের মানুষটি রক্তের প্রবল স্রোতে ডুবে যায়। ষাঁড়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হলে এই অঙ্কও শেষ হয়ে যায়।

 

পঞ্চম পর্যায়

মৃত ষাঁড় সরিয়ে এবার পাটাতন সরিয়ে নাও গর্তের মুখ থেকে আর রক্তে স্নান করা শরীর নিয়ে উঠে আসবে স্বেচ্ছাসেবী লোকটি। পাঁচজনের সেই দল তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে দর্শকদের মধ্যে আর মন্ত্রের মতো বলে যাচ্ছে, “আনন্দে থাকো, ঈশ্বর রক্ষা পেয়েছেন।  এত কষ্টের পর এবার মুক্তি পাব আমরাও।”

 

ষষ্ঠ পর্যায়

অন্য সব শ্রোতাদের জন্যও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সবাই রক্তে না ভিজে যায়। যদি আগুন নিভে যায় গাছ আর পশুগুলোর শরীরে, নাটক বন্ধ করতে হবে তখনই, এবং পরের দিন নতুন করে শুরু করতে হবে। ষাঁড় যদি যথেষ্ট না পাওয়া যায় পরিবর্তে ভেড়া বা ছাগল ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো শিশু, পুরুষ হলেই ভালো, ব্যবহার করতেও অসুবিধা নেই। কিন্তু শুধু সেইসব ক্ষেত্রেই যেখানে পুলিশের বিপদ নেই।

১৯৬০ সালে বেরিয়েছিল জেরোম রথেনবার্গের ( জন্ম-১৯৩১) প্রথম কবিতার বই ‘White Sun Black Sun’. সেই বইয়ের শুরুতেই টেলিগ্রামের মতো মিতকথনে তাঁর কবিতাভাবনা জোরালোভাবে জানিয়েছেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর একা রাস্তার শুরু। আগের এবং সমসময়ের সমস্ত চিহ্ন ও লক্ষণ আত্মস্থ করেছেন তাঁর এই যাত্রাপথে। বিভিন্ন জনজাতির verbal এবং non-verbal poetics এর বিপুল বৈচিত্র্য, তার সঙ্গে উত্তর-মার্কিনি ভারতীয় সংস্কৃতি, জাপানি সাহিত্য, দাদাইজম, ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রত্নপরিচ­­­­­­­­­য়- সব মিলিয়ে ‘Ethnopoetics’ নামে একটি অখণ্ড ভাবনা তিনিই প্রথম এনেছিলেন, যার সাহায্যে সারা বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া লিখিত ও অলিখিত সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে তুলে এনে তাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে বেরিয়েছিল ‘Technicians of the Sacred’ নামের একটি সংকলন যেখানে আফ্রিকান, আমেরিকান, এশিয়ান ও ওশিয়ানিক কাব্যতত্ত্ব ছাড়াও সেইসব দেশের ধর্মীয় আচার ও প্রথার মূল পাঠ, চিত্রনাট্য, দৃশ্য ও শ্রাব্য সাহিত্য তুলে এনেছিলেন তিনি। ‘Alcheringa’ নামের প্রথম Ethnopoetics পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শে উজ্জ্বীবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে আরো পত্রিকা বেরোতে থাকে এবং Ethnopoetics নিয়ে চিন্তায় এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জার্মানিতে, একজন মার্কিন সৈনিক হিসেবে। নিউইয়র্কে ফিরে তিনি অনুবাদ করতে শুরু করলেন দু’হাতে। পাউল সেলান এবং গুণ্টার গ্রাসের প্রথম ইংরেজি অনুবাদক তিনিই।

লেখালেখির প্রথম দিকে তিনি এবং রবার্ট কেলি স্প্যানিশ শব্দ ‘Cante Todo’- এর ছায়ায় লোরকাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে সামনে রেখে শুরু করেছিলেন ‘Deep Image’ আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে ‘Sound Poetry’ বা ধ্বনি কবিতা তাঁর অন্বেষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থহীন শব্দাংশ (syllable), ধ্বনি, সুর, বিকৃত উচ্চারণ সবকিছু নিয়ে এমন কবিতা তিনি ভেবেছিলেন যেখানে কবিতা, গান, অর্থহীন জড়ানো শব্দ সবকিছুই একসঙ্গে চলেছে। এই কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ভাষার নয়। একে লিখে বোঝানো যায় না, লেখাও যায় না সেই অর্থে। অর্থ খুঁজে পাওয়ার কোনো দায়িত্ব নেই। অর্থের বেড়া ডিঙিয়েই এখানে পৌঁছানো যায়।

অমিতাভ মৈত্র

অনুবাদক

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

স্নেহাশিস পাল

গু চ্ছ  ক বি তা

স্নে হা শি স  পা ল

পুরনো পোস্টকার্ডের লেখা

আবিষ্কার

ইভের আপেলটা…

স্টিভের আধ খাওয়া

মধ্যে নিউটন… …

শরীর-ঘেরা মন

 

খিদের ধরাধাম

না-ছোঁয়া চরাচর

মধ্যে শুধু ভার… …

 

প্রেমিক তুমি কার ?

pujo_16_sketch2

মুরলী ফার্নিচার হাউস

গাছের তাকে-তাকে

শিসের ধুলো থাকে

pujo_16_sketch2

নীরা স্টোর

এইখানে চাঁদ কেনে জোছোনার দুল

pujo_16_sketch2

মনোরমা গার্লস হোস্টেল

অশ্রুবনানীর বাঁকে

হারানো হরবোলা থাকে

pujo_16_sketch2

রাজা হরিশচন্দ্র বার্নিং ঘাট

চোখের ভিতর পূর্ণিমা খুলে যায়…

ঝরনাকলম; নদী বায়, মন বায়…

pic333

নূতন বাড়িবৃদ্ধাশ্রম

নিঝুম বাড়ির গায়ে– চাপ-চাপ মেহেদি হাসান

তার কোলে; তারা গোনে…

পাড়-ভাঙা নদীর শ্মশান

কিশোরীতলা ঘাট

কদম ফুলের গাছ; দামাল কিশোর ছাড়া বড় বেমানান

 

বলো দেখি – মনখারাপ, হাঁটু-জল নদী ছাড়া বৃষ্টির বানান

pujo_16_sketch2

আঘাত

 একা বসে ঝিঁঝিঁ শোনে দোতারা-হারানো রাত…

pujo_16_sketch2

লুভ্

কেউ যাচ্ছে অবসাদে আর কেউ মধুর প্যারিস

সমস্ত শিল্পই বৃষ্টি, একা ভেজা মানুষের শিস্…

 

এলিজি জড়িয়ে ওঠা লাস্ট-প্রুফ… কেমন আছিস?

 

কেউ মেঘ – হাসি-হাসি, কেউ বাংলা কবিতার বিষ… …

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

সুদেষ্ণা ঘোষ

গু চ্ছ  ক বি তা

সু দে ষ্ণা   ঘো ষ

বাড়ি

লেভেলক্রসিংয়ের ওপারে দু’একটা জানলায় সারারাত আলো জ্বলত
আর টপ করে পাশের বাড়ির ছাদে লাফিয়ে উঠত ঘোর লালচে চাঁদ।

তুমি বলতে, অনেকটা মেঠো পথ পেরিয়ে ধুলোর ঝড় সরে যাবে।
আর একটা রাস্তা একদম কিছু না বলেই বেঁকে যাবে
সেখানে একটা কাঠের বেড়া দেওয়া সাদা খামারবাড়ি
দরজায় বেগুনি প্যাস্টেলরঙা অর্কিড জড়ানো।
জানবে, ওটাই আমাদের বাড়ি।

সামনের গলিতে তখন লাইটপোস্টের ছায়া ক্রমশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে।
রাজাবাজারের দিকে রোজ রাতেই বাজির শব্দ শোনা যেত।

আমি দেখতাম, আমাদের বাড়ির মুখোমুখি দেওয়ালগুলোয় আলাদা-আলাদা রং।
আমি ভাবতাম, কমলালেবু রঙের দিন আসছে।
আমি ধরে নিতাম, আমার হাতের নিচে একটা হাত ঘেমে উঠছে।
কাঁপছে অল্প-অল্প।
আর বেগুনি রঙের রোগা অর্কিডের শাখা একা-একা এগিয়ে যাচ্ছে…
দু’একটা হারিয়ে যাওয়া চিঠি শুধু যেখানে যেতে পারে।
খুব যত্নে অনেকক্ষণ ধরে যাদের গায়ে স্ট্যাম্প লাগানো হয়েছিল।

মুখে বলতাম, ‘‘শোনো, শাস্তি বাধ্যতামূলক হওয়াই ভাল।
সমস্ত ফাঁকা হল, অনন্ত পর্যন্ত চলে যাওয়া করিডর, আবছায়া নৌকো
এরা প্রতিশোধ নেবে, মেনে নেওয়াই ভাল।’’

তুমি হাসতে আর বলতে, ‘‘এই শীতেই খুঁজে বের করবে ছোটবেলার ড্রয়িংখাতা।’’
বলতে, ‘‘সোনালি রিবনবাঁধা উপহারের বাক্সে গুটিসুটি ঘুমিয়ে আছে আমাদের সমস্ত যাওয়া।
ঠোঁটটা অল্প হাঁ।’’

তুমি হাসতে আর অন্ধকারের মধ্যে খালি শোনা যেত, লিফ্‌ট ঝাঁপ দিচ্ছে।
আর কারও কিচ্ছু যায় আসত না। কখনও।

পরিণতিহীন

একটা লাল সন্ধে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।
আর কাঠের দরজার উপরে একটা স্টাফড হরিণের প্রকাণ্ড মাথা।

হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকার সিঁড়ির নিচে উড়ে আসত পোড়া কাগজের টুকরো
কীভাবে দিনগুলো পেরোবে ভেবে চিন্তায় চিন্তায় ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল টাটকা রং-করা বাসস্ট্যান্ড।
এক্ষুণি আসব বলে কেউ কোনওদিন আসেনি
হেমন্তকাল এসব জানত?
কেন বলেনি কখনও?
শুধু স্বপ্নের ভিতর এঘর ওঘর করতে করতে একদিন ভেঙে পড়ছিল চিনামাটির বিদেশি পুতুল।
হেমন্তকাল জানত এইভাবে দিনের পর দিন কেঁপে যাওয়া অসহ্য খারাপ আলো।
জানত ক্রমাগত ডুবে যাওয়া ভেসে ওঠা ডোবা…
আয়নার ভিতর সম্পূর্ণ ঢুকে পড়ার আগে একবার থমকেছিলে
আর চারদিকের বাড়িতে জ্বলে উঠল উত্তেজক সাইকেডেলিক আলো।
একবার মৃত্যুর জন্য থমকেছিলে।
একবার কাঠফাটা দুপুরের জন্য।
একবার অস্ফুটে বলেছিলে, আর কত দূর?
একবার… একবার
মনে আছে আয়না আচমকা কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল।
আমরা দেখলাম খুব নিষ্ঠুর একটা শনশনে হাওয়া অবুঝের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।
এবার বলো কোনদিকে?
বলো হেমন্তকাল বলো। না বললে কিন্তু রেহাই নেই।
কালো রাতের মুদ্রায় বলো কিংবা শুনশান চিলেকোঠার কান্নায় বলো
খুব নরম গলায় একটার পর একটা বলো, অপেক্ষার শ্বাসরোধী গল্পগুলো।

কখনও ভুলতে দিতে না।
একটা লাল সন্ধে কাছেই দাঁড়িয়ে থাকত।
আর ঘুণধরা দরজার উপরে একটা স্টাফড হরিণের প্রকাণ্ড করুণ মাথা।

pujo_16_sketch2

আমরা

একবার সমুদ্রের ধারে পুরনো একটা গুদামঘরে
আমরা অনেকদিন লুকিয়ে ছিলাম।
‘চিন্তা নেই, দিনগুলো সোনার জলে মুড়ে যাবে’ – এসব তখন আমরা মাঝে মাঝেই বলতাম।
রাতগুলোকে অকারণ অবহেলা করতাম।
তাই শিগগিরি ওদের প্রতিশোধ নেওয়া শুরু হল।

তারপর থেকে যখন যেখানে যেতাম
একটা কালো ফিনফিনে পরদা আমাদের ঘিরে থাকত।
হাতে সময় থাকলে আমরা পরস্পরকে বোঝাতাম
অভিধান যাই বলুক ‘উপহাস’ শব্দটার মানে হয়তো পরিহাস-ই।
ক্ষোভগুলো আমরা নামিয়ে রাখতাম ওই গানটার সামনে
‘ওই আসনতলে মাটির পরে লুটিয়ে’…

আয়নার ভিতর যে একটা লুকনো নিবিড় রাস্তা আছে
এটা তুমি একবার বলে ফেলেছিলে
তারপর বহুবছর অনুতাপ করেছিলে।
শান্ত অনুতাপদগ্ধ কথার দু’দিকে ভর দিয়ে
আমরা সারাদিন বসে থাকতাম।
হিমবাহের নীরবতা নেমে আসছিল ধীরে ধীরে শিরা বেয়ে চোখের মণিতে।
হঠাৎ সমুদ্র থেকে একটা স্বপ্ন আমাদের ছুটিয়ে মারত শুরু করল।
একটা পোড়া নৌকোর কাঠে বন্দি একটা নিষ্পলক চোখের স্বপ্ন।

pujo_16_sketch2

মৃত্যু, বেগুনি ফুল আর লাল-নীল পাথর

অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে অনেক লাল-নীল-সবুজ পাথর
আর ওদিকে এক অনর্গল জলপ্রপাত দু’বেলা চিৎকার করে স্বপ্নের কথা বলে।
আর মৃত্যুর আঁশটে গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে হাওয়া।
দৌড়ে-দৌড়ে ছাদের দিকে উঠে যেতে চাও তুমি প্রতি বিকেলে
এদিকে একটা সাদা গাড়ির ড্রাইভার কিছুতেই তোমায় দেখতে পায় না।
হাহাকার ছটফট করে জানলার ফুলকাটা পরদায়।
ঠেলাগাড়িতে বসে হাসতে-হাসতে চলে যায় ঘামে-ভেজা বাচ্চারা।
তুমি ভেঙে যেতে-যেতে দেওয়াল লিখতে থাকো
লিখতে থাকো রক্ত, লিখতে থাকো নাচ, লিখতে থাকো কাঁপতে থাকা আলো
আর গোপনে বল এগিয়ে যায় জনশূন্য বাউন্ডারির দিকে।
মৃত্যুর ছোট্ট আঙুল ধরে বাড়ি ফিরতে চায় বেগুনি ফুলে ঢাকা বিকেল
এতক্ষণ টানা অন্ধকার হাতড়ে-হাতড়ে চোখ যখন অন্ধকারেও দেখতে শিখেছে
কলুটোলার কাছে প্রত্যেক বাড়িতে একসঙ্গে আলো জ্বলে ওঠে।
হেলে পড়া সন্ধের ছায়া বিড়ালের মতো পায়ে পায়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসে।
তুমি তাকে জল আর আগুনের প্রতিহিংসার গল্প বলে লোভ দেখাও।
বলো, মৃত্যু একদিন লাল-নীল পাথর হয়ে উপচে দেবে আমাদের অ্যাকোয়ারিয়াম
দেখে নিও। ঠিক এমনটাই বলে গেছে সক্কলে। চিরকাল। বিশ্বাস রাখো।

ছোটবেলার কথা ভেবে বাস থেকে অনেক আগে নেমে ভিড়ে মিশে যাও তুমি।

pujo_16_sketch2

দূরত্ব

একটা কবিতা থেকে কত দূরে থাকে আর একটা কবিতা?
রাস্তা দিয়ে গাড়ি গেলেই আলো চমকে ওঠে ঘরের মধ্যে।
খাড়া খাদ অভিমানের মতো লুকিয়ে থাকে পায়ের খুব কাছে।
কেন রোজ আকাশি ছাতায় মুখ আড়াল করে কেউ মিলিয়ে যাবে গলির শেষে?
কেন রোজ সন্ধেবেলায় বলবে, এই শেষ দেখে নিও।
একটা বাড়ি থেকে কত দূরে থাকে অন্য বাড়ি?
একটা অপেক্ষা থেকে অন্য একটা ভুলে যাওয়া?
লাল বল সুযোগ পেলেই গড়িয়ে-গড়িয়ে হারিয়ে যেতে চাইছে খাটের তলার দিকে।
একটা মুখচোরা সন্ধেকে প্রাণপন লোভ দেখাচ্ছে জন্মদিনের বেলুন আর নরম পারফিউম।
সব কথার ভিতর অন্য দিকে তাকিয়ে হাসছে আরেকটা কথা,
সব বাড়ির মধ্যে একা রেলিং, পুরনো ওষুধের গন্ধ আর ভাঙা কাঠের ঘোড়া।

pic333

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

বই কথা ২

বই কথা । 

সো না লী   ঘো ষ

নিঃস্বার্থ প্রকৃতিই পারে হৃদয়ের রঙ বদলাতে

পর্নোগ্রাফি

বুদ্ধদেব হালদার

হাওয়াকল

মূল‍্য ১৬৫/-

জীবন একটি সাধন ক্ষেত্র, আর প্রতিটি মানুষ সাধক। প্রত‍্যেকের জীবনের শৈলী আলাদা, তার ব‍্যাকরণও । বহমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আত্মোপোলব্ধির চরম সীমায় পৌঁছোই। কবিদের জীবনবোধ তদ্ভিন্ন নয়, বরং তাঁরা সন্ধান দেন  আরেক সাধনপীঠের।

অধুনা কবি বুদ্ধদেব হালদারের ‘পর্নোগ্ৰাফি’তে সেই সাধন ভূমির চূড়ান্ত একটি পর্যায় রচিত হয়েছে।

কবি ক্রমাগত আত্মকথন করে গিয়েছেন, আর বোধের ভূমিতে রেখে গিয়েছেন তাঁর জীবন দর্শন। আমাদের চর্বিতচর্বন জীবনের পাশে বসে এত কথা অবলীলায় সাবলীলভাবে বলা যায়, তা কবি হাতে ধরে পাঠককে শিখিয়েছেন। আমাদের প্রথাগত চেতনাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন, কোনো আবরণের সাহায্য না নিয়েই তিনি বলেন-
‘এবং নানাবিধ পেটের সমস্যাই শেষ পর্যন্ত একজন ধান্দাবাজকে বিখ‍্যাত কবি বানিয়ে ফেলতে সক্ষম। আমি অবশ‍্য যাকে নকল করি, তিনি একজন সাইকো’। (সাইকো)

আমাদের কবিতা পড়ার ধরণে প্রতি মুহূর্তে বদল এনেছেন তিনি, চেনা ছক থেকে বের করে এনেছেন আর তাই হৃদয়ে প্রেম নয়, ‘গজিয়ে ওঠে ম‍্যাজিক মাশরুম’। প্রাক্তন প্রেমিকার প্রত‍্যাবর্তন বা স্মৃতিচারণ চান না কবি, বরং মনের ভেতর জমা যন্ত্রণাকে সরাসরি ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “অথচ তুমি স্বামীর জিভে জিভ রেখে বলছ, ‘Night is an inhuman time’ ” (নিভাকে লেখা চিঠি ২০)। আর এখানেই তো সেই চরম আধুনিকতাবাদ, যেখানে ‘একটা গভীরতা নিয়ে সমুদ্ররঙের ডটপেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়’। আমাদের মতোই কবি অস্থির হয়ে ওঠেন, ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, সমীর চন্দ্র দাসকে জানান- “কিছু একটা করুন। বাঁচতে চাই” (১৭ডিসেম্বর)। এ যেন আমাদেরই আর্তনাদ।

আবার তিনিই নিপাট দার্শনিকের মতোই বলেন-

‘এভাবেই কেটে যাবে দিন। নিভে যাবে প্রিয় নদীটির আলো, আর
একদিন একা হয়ে যাবে সমস্ত মানুষ যে যার মতন। আমরা এসব নিয়ে
কিছুই ভাবব না। বরং নখ খুঁটতে খুঁটতে গভীর রাতের অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে
আমরা দেখব কীভাবে সেপ্টেম্বর এলেই কবিরা দীর্ঘকবিতা লিখতে বসেন।’ (পর্নোগ্ৰাফি)

চলমান জীবন নদীর মতোই একা, তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়, একাকী বেঁচে থাকার
শর্তই যে কোনো কিছুর গভীরে প্রবেশ না করা। শুধু পর্যবেক্ষণ করে যাওয়াই ভালো থাকার নামান্তর ।

আবার কবির সারা চেতনায় বাসা ধরা ঘুণপোকাকে জানান-
‘তোমাকে আজকাল ভুলে থাকার চেষ্টায় আছি আমি, আর
উপবিদ‍্যার ভিতর সারাটা শহর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটানীল অ্যাম্বুলেন্স’ (মদ)

মনের মানুষকে ভুলে থাকার যন্ত্রণা, কীভাবে কুরেকুরে খায়, ‘নীল অ্যাম্বুলেন্স’-এর শহর জুড়ে ঘুরে বেড়ানো তারই প্রমাণ। হৃদয়ের ভেতরে যে বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, সেখানে তাঁর বক্তব‍্য খুব সাবলীল-

‘তোমার গভীরে বাঁচতে চাইছি খুব। ভাগ করে নিতে চাইছি যাবতীয় নিঃশ্বাস। তোমার
দরজার একপাশে গলাতে বকলেস বেঁধে আটকে রাখো আমায়।
তোমার বর দেখুক, তোমার ছোট্ট ছেলেটিও দেখুক, সারাটা দুনিয়া
দেখুক, তোমার প্রেমিক আদতে এক কুকুর’ (ঘুরন্ত প‍্যাডেল অথবা ছেঁড়া সময়ের গল্প)

প্রেমিকের হৃদয়ের দহন অবলীলায় কবি তুলে ধরেন। প্রেমকে প্রয়োজন তার, তাকে ছাড়া অস্তিত্ব বিপন্ন বোধ করে সে, প্রেমিকের সেই রোমান্টিক প্রতিমূর্তির উপর হাতুড়ি মেরে কবি দেখিয়েছেন তার অন্তঃসারশূন্য দশা। যা অতি বাস্তবতার একটুকরো রূঢ়তা।

আবার তিনিই পেলব সুরে পাঠকের কানে কানে ফিসফিস করে বলেন-

‘হাঁসের শরীর নিয়ে তুমি বেঁচে আছ, যেখানে নীল
উঠোনে গড়িয়ে নামে চাঁদ। গাছে গাছে নড়ে ওঠে
কথকতা, পদ্মবনে উছলে পড়ে হৃদয়’ (কবি চলিয়া যায়)

আধুনিক মন যতই সংঘর্ষময় হোক, প্রকৃতির প্রলেপে মানুষের হৃদয় বানভাসি হয়। আসলে মানুষ নয়, নিঃস্বার্থ  প্রকৃতিই পারে হৃদয়ের রঙ বদলাতে। কোথাও যেন অনুমিত হয় তুমি আমি আমরা আসলে একই। আসলে কবিরাই পারেন তাঁদের যাদুস্পর্শে , আমাদের ভেতরে ‘আরশি নগর’ গড়ে তুলতে। তাঁর এই বইতে রাজনীতি, ধর্ম, মনস্তত্ত্ব, সমসাময়িক সমস‍্যা, আত্মিক সংকট, প্রেম এবং তা থেকে উদ্ভূত জটিলতা- এ সকল কিছুতে তিনি এমন ভাবে কলম চালনা করেছেন, যে বুঝতে অসুবিধা না হয় এগুলি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সাধনার অঙ্গ এ বিষয়গুলির সঙ্গে সঠিক মাত্রায় সম্পৃক্ত হতে পারলেই, জীবনের জটিল রসায়ন সহজবোধ‍্য হবে।

চেনা জীবনের প্রতি এক তীব্র আসক্তি জন্মাতে কবি যেভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে এই বইটি পাঠককুলকে যে ভিন্ন জীবনবোধের সন্ধান দেবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সোনালী ঘোষ

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

বই কথা ১

বই কথা । 

স ব্য সা চী   স র কা র

প্রেম ও প্রেমহীনতার মধ্যবর্তী এক উপত্যকা

অসতীপ্রবণতা

অদিতি বসুরায়

ঋত প্রকাশন

নামকরণের মধ্যে যেমন নতুনত্ব আছে, তেমনই রয়ে গিয়েছে প্রচ্ছন্ন বিরোধিতার গন্ধ।  অদিতি বসুরায়ের লেখা ‘অসতীপ্রবণতা’ বইটি হাতে এল কিছুদিন আগে। এই বই মোটেই ক্লিশে হয়ে যাওয়া ফেমিনিস্ট বকরবকর বা স্লোগান নয়, বরং পাতা উল্টোলে  ধাক্কা দেয় এক ঝলক টাটকা অক্সিজেন। অদিতি নতুন কবি নন, দীর্ঘদিন ধরেই লিখছেন। তাঁর কবিতার ভাষায় সারল্যের সঙ্গে মিশে থাকে উৎকণ্ঠা, আবার স্পষ্ট কথা খুব গভীর ভাবে উচ্চারিত হয়। 

কিন্তু ‘অসতীপ্রবণতা’ বইটিতে তাঁর মধ্যে এক আশ্চর্য উদাসীনতা, যা প্রেম ও প্রেমহীনতার মধ্যবর্তী এক উপত্যকায় আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। যে উপত্যকায় দাঁড়িয়ে অদিতি লিখছেন, ‘আগেই বলেছি, তবু বলি,–ওহে/টারজান নাম দেব, চল জঙ্গলে ফিরে যাই।’

 গভীর একটা বেদনাবোধ যেমন কবিতাগুলোয় ধরা পড়ছে,  তেমনই আছে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার চিরকালীন আকুতি। ‘তোমার মাথায় যে রাজার মুকুট/আমি তার ডাকনাম রেখেছি ‘দুঃখ’।

ধর্ষণ কবিতাটির কয়েকটি লাইন স্বব্ধ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এ কবিতা মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কোনওরকম জটিলতার আশ্রয় না নিয়ে খুব সহজ কথায় গল্প বলতে চেয়েছেন কবি। ‘তুমি ভাবো, এর থেকে অফিসের বসও কি ভালো ছিল?/ গাড়িতে উঠেও যে প্রেমিক ফুল কিনে দেয়, সে-ই? কলকাতা থেকে কত দূর, বোলপুর?’ একই ভাবে লক্ষ্মী মুর্মু কবিতায় শেষ লাইনটি রক্তাক্ত করে দেয়, ‘লক্ষ্মীর উন্মোচিত, ছেঁড়াখোঁড়া যোনি ভাইরাল হল, অতঃপর।’

কলমের ডগায় লেগে এই আগুনই আবার পাঁপড়ি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র। যেমন দাম্পত্য কবিতায় অদিতি লিখছেন, ‘শিবিরে মাঝে মাঝে সাদা পতাকা ওড়াতে ভালোবাসি আমিও/তুমিও পায়রা পোষো দেখাদেখি….’। বিষাদের মাঝে এই লাইন মন ভালো করে দেয় দ্রুত।

কয়েকটি নারী চরিত্রকে নিয়েও এই বইতে কবিতা আছে। যেমন সিলভিয়া প্লাথ, মেরলিন মনরো বা পার্ক স্ট্রিটে ধষির্তা সুজেট জর্ডন। চরিত্রগুলিকে কবিতার মধ্যে দিয়ে ধরতে চেয়েছেন অদিতি।  অধিকাংশ লেখাতেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসা খুঁজে নেওয়ার স্পষ্ট কন্ঠস্বর। এই খোঁজই হয়তো সারাজীবন করতে হয় কবিকে। ঋত প্রকাশনকে ধন্যবাদ, এমন একটি কবিতার বই উপহার দেওয়ার জন্য। ছাপা সুন্দর, চিরঞ্জিৎ সামন্তের প্রচ্ছদ চোখ টানে।  

অদিতির কাছে প্রত্যাশা অনেক, ভবিষ্যতে তাঁর হাত থেকে আরও অনেক ভালো কবিতার জন্ম হবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। 

সব্যসাচী সরকার

আরও পড়ুন...

Categories
2021_jan

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ১

সিনেমা যখন কবিতা । পর্ব ১

অ দি তি   ব সু রা য়

স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা অর্জন করাই বেঁচে থাকার মুকুট। সেই মুকুটের সবচেয়ে বড় মণিটিই হল– আশা!

ছবির নাম ।  চেঞ্জলিং (২০০৮)

পরিচালনা ।  ক্লিন্ট ইস্টউড

অভিনয় ।  এঞ্জেলিনা জোলি, এমি র‍্যান, জন মাকোভিচ

আমাদের এই গল্পের শুরু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।  প্রায় একশো বছর আগের কথা – ১৯২৮ সালের লস এঞ্জেলেস। মা এবং ছেলের ছোট্ট সংসার – ছবির মতো বাড়ি – সামনে রুমালের মতো বাগান। পশ্চিম উপকূলে সে সময় টেলিফোনের ব্যবহার শুরুর মুখে। মা ব্যস্ত সেই কাজে। সিঙ্গল মাদার। সিপিয়া রঙের সেই সব দিন – পথে পথে ট্রাম – লম্বা ভিক্টোরিয়ান টুপি এবং পেন্সিল হিলে সেজে মেয়েরা কাজে, পার্টিতে হইচই করতো! ক্রিস্টিন কলিন্স (এঞ্জেলিনা জোলি)  কাজে যেত বটে – তবে শিশুপুত্রের জন্য তার অবসর বন্দি থাকত। দু’জনে মিলে ছবি দেখতে যেত তারা। আইসক্রিম খেত। কত রং – আনন্দ – খেলা – এরই মধ্যে একদিন হারিয়ে গেল ছেলে। বাড়ি থেকেই।  ঠিক ছিল, সেদিন মায়ে-ছেলেতে সিনেমা দেখতে যাবে – শেষ মুহূর্তে কাজ থেকে ডাক আসে মায়ের। পুত্র বিষণ্ণ বসে থাকে একা ঘরে। ক্যামেরা রোল করে! তারপর আর পাওয়া যায়নি তাকে ।

এরপর আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটতে থাকে। একলা মায়ের বিপরীতে অস্ত্র তোলে এবং দেওয়াল হয়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্র। কাজ থেকে, বাড়ি থেকে সেই মায়ের ঠাঁই হয় পাগলাগারদে। সে আর এক কঠিন আখড়া – যে সব মেয়েরা প্রশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করতে বাধ্য হতো – তাদের নির্বিচারে কয়েদ করে দেওয়া হত পাগলাগারদে। সে দেশে তখন জীবিকার স্বাধীনতা ছিল বটে – কিন্তু আদতে সেখানেও মেয়েরা তখন দ্বিতীয় লিঙ্গ, যাদের ‘প্রতিবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও রাষ্ট্রের অনুমোদন দরকার হত। তাই রাষ্ট্র তাদের মুখ অব্দি বন্ধ করে দিত এমনভাবে, যাতে মুখ খুললেও মানসিক অসুস্থতার কারণে তাদের কথায় গুরুত্ব দেওয়া না হয়।

আজ সারা দুনিয়া, আমেরিকাকে ‘ফ্রি কান্ট্রি’ নামে ডাক দেয় – কিন্তু সে দেশেই মাত্র একশো বছর আগেও যেভাবে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে মেয়েদের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হত – তাকে ফ্যাসিজম বলে। আজও কিন্তু নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগের ভুরি ভুরি নজির মেলে মার্কিন পুলিশের বিরুদ্ধে।  সবারই মনে আছে বছর খানেক আগেই জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গকে পুলিস বিনা বিচারে মেরে ফেলে এবং উত্তাল হয়ে ওঠে সারা বিশ্ব। সামাজ্যবাদের এ এক অভিশাপ! তাই সেই অহমিকায় পুলিশের কাছে বেশ্যা নিজের উপার্জন দাবি করলে তাকে জেলে যেতে হয়। এবং পাগলা গারদের অন্ধকার তার জন্যে অপেক্ষা করে। এক্ষেত্রে মেয়েরা অপেক্ষাকৃত দুর্ভাগ্যের অধিকারী। পুরুষদের অন্তত এই কারণে মানসিক অসুস্থতার তকমা মিলতো না।

ক্রিস্টিন কলিন্সকে প্রথমে যে শিশুটিকে এনে দেওয়া হয় তার পুত্র বলে, সে আদপেই তার ছেলে নয়। মায়ের নজর ফাঁকি দেওয়া কঠিন ! ক্রিস্টিন স্বীকার করে না তাই। শত অত্যাচারেও সে অটল- এ তার সন্তান নয়। পুলিশ নিজেদের হার মেনে নেওয়ার পাত্র নয় – ওদিকে মায়ের হৃদয় মরিয়া। এই সময় এক বিকৃতমনস্ক খুনি ধরা পড়ে। সে বেশ কয়েকটি কিশোরকে হত্যা করেছে তার খামারবাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়ে। ফাঁসির আগের মুহূর্তে সে আশা দিয়ে যায় কাতর মাকে, কিন্তু সন্ধান দেয় না। বছর কাটতে থাকে – পাল্টাতে থাকে দিন।  প্রবল প্রতাপশালী মার্কিন পুলিশবাহিনী ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয় ! প্রমাণিত হয় – সৎ লড়াইয়ের কোনও বিকল্প নেই। হতে পারে না। পরিণাম যাই হোক – লড়ে যাওয়াই আসল কথা। স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা অর্জন করাই বেঁচে থাকার মুকুট। সেই মুকুটের সবচেয়ে বড় মণিটিই হল – আশা!

জীবন নিজের নিয়মে মোহনার দিকে পাড়ি দিতে থাকে – কিছুই অপেক্ষা করে না! শুধু মা – একমাত্র মায়ের প্রতীক্ষার শেষ নেই। সে আশা নিয়ে বাঁচে – সন্তানমুখ দেখার আশা। গল্প শেষ হয় না – ছবি শেষ হয় – আমাদের গল্পেও কোথাও কোথাও সেই অপেক্ষারতার ছায়া ভেসে থাকে! আর ‘হোপ’ শব্দের হাত ধরে আমরা আয়ুর নদীতে জল কাটাতে থাকি…

আরও পড়ুন...