Categories
2022_dec goddyo

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ১৩

ধা রা বা হি ক পর্ব ১৩

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

উদাসীন তাঁতঘর

pankaj

পাঠকের মতামত অথবা ব্যাজস্তুতি অলংকার

ধরা যাক আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি একটি কিংবদন্তি এবং অনেকের মতে একটি মাইলস্টোন। কী হতে পারে আপনার? আসতে পারে জনপ্রিয়তা ও সহজ খ্যাতি। পাঠকের বিস্তার দেখে আপনার মনে হতেই পারে এরপর আপনি আজীবন উল্লেখযোগ্য। যদি উদাসীন পাশ কাটিয়ে যাবেন ভেবেছেন জানবেন নিস্কৃতি নেই। যদি ভাবেন উপেক্ষা করবেন সন্দেহ আরও গভীর হবে। যদি উপভোগ করেন তাহলে আপনি নিশ্চিত কবির ছদ্মবেশে নিছক সরবরাহকারী।  একজন পুতুল প্রস্তুতকারকের মতো কারণে অকারণে কেবলমাত্র উৎপাদনশীল। প্রথম কবিতার বইয়ের নিজস্বতা বিপজ্জনক। প্রথম কাব্যগ্রন্থের উপর যেকোনো উন্মাদনা এবং কিংবদন্তির ছায়া একজন কবিকে সারাজীবন তাড়া করে। এক হিসেবে তাঁর জীবন অভিশপ্ত। কেননা আজীবন তাঁকে নিজের অতিকায় ছায়ার বিরুদ্ধে লড়তে হয়। যা পাঠক নির্মিত। পুরস্কার নির্মিত। মিডিয়া নির্মিত। চেনা জলে স্নান না করলে পাঠক দুঃখ পান। ভাবেন কোথায় সেই পূর্বপরিচিত অসামান্য আলো? কোথায় সেই মধ্যরাত্রির মুগ্ধ মুহূর্ত, যখন একটা গোটা পাঠকজীবন বদলে যায়? অন্যায় নেই এই আচরণে। একটি অসামান্য কাব্যগ্রন্থ লিখে ফুরিয়ে যান এমন কবির সংখ্যা কম নয় । একটি কাব্যগ্রন্থের অজস্র অনুকরণে অজস্র কাব্যগ্রন্থ লিখে অহেতুক টিকে থাকতে চান এমন কবির অভাব নেই। কিন্তু যিনি প্রতিমুহূর্তে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নতুন নতুন পথে চলেছেন পাঠকের মতামত কতখানি সাহচর্য দেয় তাঁকে? নাকি তার নিয়তি পাঠকহীনতায়? নাকি শুধু কয়েক দশক পেরিয়ে নতুন পাঠকের জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো সদুত্তর নেই তাঁর হাতে। এ কী গো বিস্ময়।

আপাতত কবিতার পাঠকের কথাই বলতে চাইছি। বাকি পাঠকদের কথা এখানে বিচার্য নয়। কবিতার পাঠকেরা কখনও কখনও অনেক বেশি সংক্রামক। স্বধর্মে অবিচল থেকেও নতুন স্বরের প্রত্যাশা করেন। কিন্তু যেকোনো উন্মাদনার দূরের অতিথি তাঁরা ছিলেন একদিন। অথচ পঞ্চাশের দশক থেকে পাঠকের চরিত্র বদলে গেছে অনেকখানি। অনিবার্য কবিসম্মেলনের হাত ধরে একদিন তাঁরা কবির কাছাকাছি এলেন। প্রত্যক্ষ সাহচর্যে আগ্রহ তৈরি হল কবির বেপরোয়া জীবনের প্রতি। কবিতার বদলে তাঁদের মনোযোগ দেখা গেল কবিকে নিয়ে গড়া নানা মিথের দিকে। সম্মেলনমনস্ক এইসব পাঠক নিজের পাঠকসত্তা নিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার কোনো সুযোগ পেলেন না। বরং জনপ্রিয়তা এবং পুরস্কারের নানা লক্ষণ মিলিয়ে খুঁজে নিলেন আরাধ্য কবিকে। আর তাই মিডিয়ার শান্ত অপেক্ষা একদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়। মনীন্দ্র গুপ্ত এঁদের চিহ্নিত করেছেন কীভাবে দেখুন:

 “এক সময় শিক্ষিত এবং দীক্ষিত পাঠকদের জন্য কবিদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজকাল কেউ আর অপেক্ষায় বিশ্বাসী নন, মুরুব্বীরা দ্রুত বলে দেন,অমূক অমূক ভালো লিখছে।পাঠকেরা সেই অন্যের পছন্দ শিরোধার্য করে কবিতা পড়েন,প্রকাশকেরা সেই পছন্দ অনুসারেই বই বার করেন, পুরস্কারকর্তারা সেই পছন্দ অনুযায়ীই পুরস্কার দেন। চাকা ঘুরতে ঘুরতে মোমেনটাম সংগ্রহ করে – কবিকে ঘিরে একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠে।

এই যদি অবস্থা তাহলে পাঠক বাড়লেই বা কি,কমলেই বা কি! অলস পাঠক, নির্বিবাদী পাঠক, লেখকের কৃপাধন্য হতে চাওয়া পাঠক, কোনো অন্য মতলব নিয়ে চলা পাঠক তো সবসময় মিথ্যে কথা বলবেন। এঁদের কথায় নির্ভর করলে সাধারণ পাঠককে ঠকতে হবে।”

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

এইমুহুর্তে কবিতার পাঠক অনেক দূরদর্শী। সে অনেকদূর দেখতে পায়। আসলে কবি ও প্রকাশকের মাঝখানে আজকের পাঠক মধ্যবর্তী এক সুবিধাভোগী। পাঠকের ছদ্মবেশে কবিতার অধিকাংশ পাঠক মূলত কবি, সম্পাদক এবং নানা সম্মেলনের প্রচ্ছন্ন হোতা। তাঁর প্রয়োজন নানা কুহক, সংকেত। যা স্পষ্ট নয় এবং দুদিক খোলা একাধিক অর্থে প্রয়োজনীয় সুবিধাটুকু আদায় করে নেয়। এছাড়াও আছেন পাঠকের ছদ্মবেশে নবীন কবি যশোপ্রার্থী। এইসব পাঠক ক্ষমতার অভিপ্রায় বুঝে মতামত তৈরি করে। সম্মেলনের সুযোগ বুঝে কোন কোন কবির প্রশংসা করতে হবে তার গোপন তালিকা তৈরি করে রাখে। যেহেতু সে নিজেও কবি তাই মনোগত ঈর্ষা ছলনার ছায়া পড়ে তাঁর পাঠক সত্তায়। নিজের বলয়ের বাইরের কবিতার পাঠককে রুচিহীন ভাবতে তাঁর দ্বিধা নেই। এঁদের মাথায় সবসময় ঘুরছে শ্রেষ্ঠ কবির একটি ছোটো তালিকা। উন্নাসিক এক আচ্ছন্ন এবং সংক্রামক তালিকা। গ্রহণের আগে বর্জনেই সে বুঝে ফেলে পথ কতদূর। অতিবিপ্লবীর এই তালিকা তারপর একদিন সুযোগ সুবিধা বুঝে বদলে যায় সম্পাদকের চাপে, সম্মেলনের প্রয়োজনে আর পুরস্কারদাতার গোপন শিকারে। ‘ কিছুই তো হল না’ এই গান গাইবেন এমন বোকা পাঠক কলকাতার আকাশে কাক- শকুনের আগেই বিলীয়মান।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (যৌবনবাউল), ভাস্কর চক্রবর্তী( শীতকাল কবে আসবে সূপর্ণা), শামসের আনোয়ারের ( মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে) ক্ষেত্রে এই সমস্যা দীর্ঘদিন ছিল। মৃদুল দাশগুপ্তর (জলপাই কাঠের এসরাজ) ক্ষেত্রে হয়তো আজও আছে। তাঁরা শুধু অলোকরঞ্জনকে যৌবনবাউলের কবি ভাবলেন ‘ জবাবদিহির টিলা’য় উঠলেন না। দেখলেন না বিপন্ন বিশ্বের প্রতিটি অমানবিক চিহ্নের প্রতি অলোকরঞ্জনের ধিক্কার এবং প্রতিবাদ। ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘ কীরকম আছো মানুষেরা’ পড়ে দেখবার প্রয়োজন হল না তাঁর। ‘জলপাই কাঠের এসরাজে’র সাধারণ পাঠক আজ ‘ আগুনের অবাক ফোয়ারা ‘ পর্যন্ত পৌঁছেছেন কিনা আমরা জানি না। সাম্প্রতিক সময়ে শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়কেও শুনতে হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ হলুদ দাগের বাইরে পথচারীর’মেধা তিনি এখনও পেরোতে পারেননি। অথচ পরবর্তী অসামান্য তিনটি কাব্যগ্রন্থ ( রঞ্জন রশ্মির ক্লিনিক, সার্কাসের আলো, বকুলমন্দ্রিত) পড়লে পাঠক বুঝতেন এই নবীন কবির জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করা যায়। এসবই উদাহরণমাত্র। আরও অনেক নাম জড়ো করে তালিকা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের কিংবদন্তি পেরিয়ে কবি হয়তো আরও নতুন এবং গভীর পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে অপ্রত্যাশিত বাঁক আর ভাষাবদলের মুখে দাঁড়িয়েছেন। সেই পথ চর্বিতচর্বন নয়,  হয়তো আরও তীব্র এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু প্রথম কাব্যগ্রন্থের পরিচিত ঢেঁকুর তুলে আজও পাঠক তাঁকে বলছেন, ‘যাই বলো লিখেছিলে বটে একটা মাস্টারপিস, তুলনা নেই, এখনও বিস্ময় ফুরোয়নি!’ কবি অপ্রস্তুত। এই মতামত আসলে নিন্দা না প্রশংসা তা বুঝে ওঠার আগেই পাঠক অন্য পালে হাওয়া দিচ্ছেন। আর কবি ভাবছেন শূন্য এখন ফুলের বাগান। পাঠকের তার সামগ্রিক লেখার প্রতি আগ্রহ নেই।

ভয়? খুব ভয়? না ভয়ের কিছু নেই। আপনি হয়তো জানেন না আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থের পাঠক আপনার আর কোনো বই পড়েননি। শুধু বিজ্ঞাপন দেখে খোঁজ রেখেছেন আপনার কি কি বই প্রকাশিত হয়েছে। আর স্থানে অস্থানে নিজেকে আপনার একান্ত পাঠক প্রমান করতে ওই কথাগুলি বলে চলেছেন। সুতরাং এখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রশংসার ছলে যে নিন্দা আপনাকে তাড়া করে তা পাঠকের মতামত না একজন দর্শকের মতামত। আপনিই শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিন। পথভ্রষ্ট হবেন না। কয়েকজন তরুণ কবি আজ প্রথম বইয়ের অপ্রত্যাশিত সাফল্যের চাপে দ্বিতীয় বইয়ের কথা ভাবতে ভয় পাচ্ছেন । কেউ কেউ অহেতুক থমকে আছেন। অনেকের উন্নাসিক পাঠ নিজের ঘরেই সিঁদ কেটেছে। কোথায় এর শেষ আমরা জানি না। তবুও বলব এবার বোধহয় বলার সময় এসেছে মনের অহেতুক আনন্দ বা বিস্ময়টুকু যত ছোটোই হোক তাতেই আমাদের চলবে। বাংলা কবিতা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পাঠকের কুয়াশাচ্ছন্ন মতামত বিদায় নিক।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec kobita

ইন্দ্রাণী পাল

গু চ্ছ ক বি তা

ই ন্দ্রা ণী   পা ল

অ্যাসাইলাম 

গমের ক্ষেতে হেঁটে যাওয়া; আর রোদ্দুর

 এই গল্পে কোথাও খুনোখুনি নেই

 উজ্জ্বল রঙে কাকগুলি উড়ে যায়

 অ্যাসাইলামের বারান্দা, আশেপাশের মাঠ

 

 দূর কুয়াশার মধ্যে

 মানুষেরা হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসে আবার।

 আমরাও ভিন্ন হই অন্যরকম আঁচে

 নিশীথে ফুলমালা দোলে

 যামিনী না যেতে 

 মহীনের ঘোড়াগুলি মরে ভূত হয়ে গেছে

 

 হাওয়ায় খঞ্জনির শব্দ নৈঃশব্দ্য ভেঙে কাছে আসে

 চকিতে সুদূরে মিলায়

 তারাভরা আকাশের নীচে

 এক উন্মাদ অসুস্থ কল্পনা থেকে

 শিল্পের জন্ম দিয়ে যায়।

pujo_16_sketch2

প্রহরশেষের ঘন্টা

ধুলোজনিত স্মৃতির কাঁচ ঠেলে সাজিয়ে রাখি শোপিস

মার্জারিনের দিন ফিরে এসেছে

গোটা বিচারপর্ব জুড়ে নিরুত্তাপ থেকে যাই

যদিও উপস্থিত সুধীজনের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা

 

প্রথম কয়েক ঘন্টা কিছুই শোনা যাবে না। চাপা কাশি

বুকের ওঠানামা হাপরের মতো দেখাবে

থুতু ও নাভির ভিতর

একটি মাকড়সার জাল এগিয়ে যাচ্ছে

যখন আমাদের কণ্ঠনালি দশদিন কেউ চেপে রেখেছে

 

প্রহরশেষের ঘন্টা বেজে ওঠে 

এইমাত্র মর্ত্যে দেবদূতের আবির্ভাব ঘটেছে

আর উজ্জ্বল নক্ষত্র অনুসরণ করে তিনজন প্রাজ্ঞ

আস্তাবলের দিকে এগিয়ে চলেছে।

ধূপ, ধুনো, অগুরু, চন্দন— সুগন্ধী পুড়ছে

pujo_16_sketch2

সন্তাপ

প্রতিটি অপরাধের পর বিবেক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে

আর আমরা অসহায় আত্মসমর্পণ করি

লাল উল চলে যাচ্ছে লাল ভেড়ার সামনে দিয়ে

রগ টিপে ধরে ধাতস্থ হতে চেষ্টা চালাচ্ছি

 

এসি চালু আছে; এবং গাড়ির তাপমাত্রা হুহু করে

কমছে; চাবি ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছি।

 

সৈনিকদের হইহল্লা; আর তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসার জন্য

হরিণীর চিৎকার; সব মিলেমিশে যাচ্ছে

বড়দিনে গির্জার ঘন্টায়

 

পেরেকে ঝোলানো চে গেভারা

মোমবাতিটা নিভে গেছে,

আমরা নতমস্তকে দেশলাই খুঁজে চলি।

pujo_16_sketch2

নিরাময়

সেরে যাওয়া প্রতিটি ক্ষত যন্ত্রণার স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে

ম্যাস্টিফ আপেল চিবোতে চিবোতে

তালাবন্ধ ঘরের দিকে চলে যাচ্ছে

যখন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব চিনতে পারে না সাতদিন

 

বন্ধ দরজার কেবিন। যুবতী লাইটহাউজ

একটি জাহাজ পানামা খালের দিকে চলে যাচ্ছে

 

প্লেট লাফিয়ে নামছে; কাঁচের টুকরো এসে বিঁধছে

প্রতিটি আপেল অন্য আপেলের গলা টিপে ধরছে

 

সেরে যাওয়া ক্ষতে শুকনো চামড়া খসখস করছে

একবার ব্রাশ বুলিয়ে নেওয়া দরকার

শেষবারের মতো ওয়াশরুম খুঁজছি।

pujo_16_sketch2

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec kobita

বর্ণালী কোলে

গু চ্ছ ক বি তা

ব র্ণা লী   কো লে

কাব্য বিবর্জিত কবিতা

 

“আচ্ছা মা, তুমি বসে আছ কেন? খেয়ে নাও। রাত হচ্ছে।”

 

“কী করে খাব, বল। তুই কেমন করে আছিস।”

 

মেয়ে সন্ধে থেকে খাটে শুয়ে। মাথা গুঁজে, চোখ গুঁজে। কষ্টের ছোবল। চাবুকে চাবুকে

তোলপাড়

স্নায়ু।

অদূরে জননী

গর্ভযন্ত্রণা নতুন করে অনুভব করছেন চল্লিশ পার হওয়া মেয়েকে দেখতে দেখতে

pujo_16_sketch2

 

জীবনে আমি এত বোকামো করেছি, এখন ভাবলে আশ্চর্য হয়ে যাই। মানুষ তো অতীত পাল্টাতে

পারে না। ভাবি, মানুষের মোহমুক্ত চোখ পেতে কত যুগ সময় লাগে।

মাঝেমাঝে মনে হয় আমি বোধহয় মৃতই ছিলাম। পাশাপাশি বয়েছিল একটি চেতন সত্তা।

কষ্ট সহ্য করে মাথার মধ্যে কেমন ব্যথা। ইচ্ছে করে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোই।

pujo_16_sketch2

 

একটি খড়্গ। যা দিয়ে জীবন আমাকে কেটেছিল। অদৃশ্যে অনেক

দর্শক। মদ্যপান সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করেছিল। ধড়ের ও মুন্ডের নড়ে নড়ে ওঠা।

মৃত্যু আজকাল দর্শনীয়।

স্নায়ুর জোর বাড়ায়।

খড়্গ। যা এখনও শূন্য প্রান্তরে পড়ে। তার গায়ে আমার রক্ত।

এখনও তাজা।

pujo_16_sketch2

 

সবাই ঘাপটি মেরে বসে। কে যে কখন এ কে ফর্টি সেভেনের মতো ফুলের শুভেচ্ছা পাঠাবে। ফুল ভেবে

খুশি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই অতর্কিতে দেখতে

পাবে বন্দুকের নল।তোমাকে,তোমাকেই হত্যা করবে একটি অট্টহাস্য।

তার হাসির শব্দ ছিল ঠিক হায়েনার মতো। বদমায়েশি বুদ্ধিতে তার মস্তিষ্ক পোকারা ভনভন। মাছির মতো

 হিসেব নিকেশ নষ্ট করে, হৃদয়

pujo_16_sketch2

 

অতিরিক্ত কষ্টের মধ্যে থাকলে শরীরের মধ্যে কামনার

কুন্ড তৈরি  হয়। ধিকিধিকি জ্বলে। বাকি পেশী সহ্য শিখন

করে ব্যথায় মূক।স্থির হয়ে থাকা শরীরের মধ্যে রাক্ষুসীর

নৃত্য। এত আগুন নিয়ে কী করবে? দহন-ই নিয়তি তার।

প্রেমিকেরা এখন সব অলঙ্ঘনীয় দূরত্বে।

বিজ্ঞাপনের হাতছানি সে দূরে সরিয়ে রাখে।

মনেমনে ভাবে দাহ-এর পর চামড়ার অন্তরালে লুকানো মনের,শরীরের

 রঙ পোড়া কয়লার মত হয়?

হয় না, হতে পারে না।

 

এই আর্তনাদ শুনে নেওয়ার পর হৃদয়ের

মধ্যে দেখে সে গোলাপকানন।

pujo_16_sketch2

 

আপনার কথা মাঝেমাঝে ভাবি। দেখার চেষ্টা করি আপনাকে। তেমন তো চিনি না। বুঝতে পারি না।

ভিতরে অপার স্তব্ধতা। অন্ধকার। ফুল ফুটুক। ছোট,ছোট ফুল।

আপনাকে লেখা সব মেসেজই কবিতা? জানি না। এরপর কী? এরপর। চুপ হয়ে আছি। পাখি ডাকছে।

পাখির ডাক শুনে মনে হচ্ছে আজ হয়তো রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল। কদমবৃক্ষে অজস্র কদম। ওদের ভীরু

চোখ।

ডিঙি নৌকো

আপনি, কাশফুল..!?

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec bangladesher_kobita

নূরে জান্নাত

বাং লা দে শে র  ক বি তা

নূ রে   জা ন্না ত

নৌকার চোখ

স্যাঁতস্যাঁতে নৌকার চোখ লেগে আছে

বক্ষবন্ধনিহীন খোলা ১৩ বছরী পিরামিডে!

শিউলি তার কোমলতা বাড়িয়ে চলছে

ঘৃতকুমারীর আবরন ছাড়ানো ভেষজী কায়দায়।

লাগামহীন ঠোঁট ছুটছে আলোর গতির থেকেও দ্রুত

নৌকার চোখ-পিরামিড-শিউলির কোমলতা

ঘৃতকুমারীর থলথলে আবরন ভেদ করে, নিস্তেজ উপসনায়…

 

কোন দিকে যাব

তুমি যে আমাকে সরে থাকতে বলো

আমি কোন দিকে সরে থাকবো?

সুগন্ধী বাম পাজর থেকে ডান দিকে?

ঠোঁট থেকে কপালের দিকে?

নাকি তোমার শক্ত হাত পার করে একটু দূরে থাকা

মাথা ভর্তি কোঁকড়া কালো চুল ছেড়ে

চোখ পার করে ভ্রু-র দিকে।

পুরো তুমি জুড়েই তো আমার প্রিয়

                       বকুলের বিছানা পেতে রাখো…

 

আমি কোন দিকে যাবো—

                     বলে দেবে আমায়?

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec bangladesher_kobita

শিশির আজম

বাং লা দে শে র  ক বি তা

শি শি র  আ জ ম

টিকিট কাউন্টার

লিখুন ময়নামতি, হ্যা আমরা ময়নামতি যাবো। আচ্ছা জায়গাটা

ঠিক কোথায়, এই গ্রহের ভিতরেই তো, মানে বিভূতিভূষণ

যেখানে থাকতেন? কোনটা পথ কোনটা প্রান্তর, এই ধোঁয়াসায় পড়ে

এতোবার গাড়ি বদলেছি, স্টপেজ চিয়ারগার্লস হেরিটেজ ছাড়িয়ে এসেছি,

জরুরী কাজে ঠাসা জীবন – ভুলে যাবার কথা তবু জানতে চাই

কোথা থেকে এসেছি আমরা, মানে সেটা ময়নামতি নয় তো?

 

যে কলমে কালি ফুরিয়েছে

ওকে ছুড়ে ফেলো না। একটু আগে ও শ্বাস নিয়েছে,

কথা বলেছে।

 

বরাবর দেখেছি বুদ্ধিজীবীদের এড়িয়ে চলতো।

ওর বলা কথাগুলো আমাদের হাসিয়েছে

রাগ বাড়িয়েছে

আমাদের জন্য অশান্তি ডেকে এনেছে।

 

তবু আজ আমরা ওকে ক্ষমা করে দেবো

ওর অক্ষমতাকে।

কেননা

আসল কথাটা ও বলেইনি

বলতে পারেনি

যেটা ও বলতে চেয়েছে।

 

দাসের বিছানা

প্রতিটা প্রাণী যারা কথা বলে

হাঁচি দেয়

কেউ চলে গেলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে

সে

যখন ঘুমোতে যায়

কেবল যখন সে ঘুমোতে যায়

তোমারই মতো

সে নগ্ন হবে

সে নিজেকে দেখবে

সে সুযোগ পাবে নিজেকে দেখার

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec kobita

সুব্রত দাস

ক বি তা

সু ব্র ত   দা স

ফ্রিকোয়েন্সি 

ঈশ্বর-পরবর্তী স্টেশনের আগাম রেডিও সতর্কতা   

 

আবহাওয়ার অনুকূল নও তুমি, অথচ উত্তাল সমুদ্রে মাছ ইশারায় লাজুক 

আলগা বুকের কাছে একটি সেফটিপিন দিয়ে নাবালিকা বয়সের উত্তেজনা ঢাকা

দেখি, ভাসমান দ্রাক্ষারসে চোখ দু’টি বুলিয়ে নিয়েছ যেন উপগ্রহের কৃত্রিম ফ্রিকোয়েন্সিতে 

বেজুবান মুহূর্তের কলমিলতার বন বড়ই নাজুক  

 

ওড়নার মানচিত্রে ওড়ে সুধন্য আকাশ, ছুঁয়েছিল আস্কারার রঙিন মশারি

আমার পরকিয়া নোটবুক লিখেছে মান্দারিন ঠোঁট, উত্তমাশা পেরিয়ে নিজস্ব জলপথ

খুঁজে পাব বলে তোমার কক্ষপথে ঘুরেছি অসংখ্য দিন, সেইসব 

 

সহজে উপেক্ষা করো, লজ্জাবতী গৃহিনীর মতো তোমারও 

 

জাহাজঘাটের দিকে পড়ে আছে ভ্রাম্যমান ভূগোলের বই,

একটি নাবিক টুপি, অসমাপ্ত পিতলের ঝিনুকবাটি      

 

লুপ লাইন

অপুষ্পক কবিতার কাছে একটি চেয়েছি সারল্য পুষ্পধনু তবু  

ইশারার মেলট্রেন ছুটে যাচ্ছে অন্য অভিমুখে    

 

অপেক্ষার সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চিতে শুয়ে আছে একটি মখমল মুখ 

তুমি সূক্ষ্ম সুতোর কাজে তীব্র আলো জ্বেলে দিচ্ছ চোখের গভীরে 

 

অথচ ভিতর উজাড় করে সকলেই যেতে চায় স্বর্গের কাছে     

 

তোমার বাড়ির কাছে কোনও রেলের স্টেশন নেই, 

আমার সরলবর্গীয় লাইনে সংরক্ষিত ব্যর্থ টিকিটের মুশায়েরা,  

 

ইশারার টয়ট্রেন ছুটে যাচ্ছে অন্য অভিমুখে    

 

বিধিসম্মতভাবে মুখ বদলে গিয়েছে

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec kobita

মধুপর্ণা বসু

ক বি তা

ম ধু প র্ণা   ব সু

ক্যাম্প ফায়ার

মাঝেমধ্যে ঘুম ভেঙে পড়ে যায় দুঃস্বপ্নেরা অবচেতনের দরজা ভেঙে,
আর তখনই প্রয়োজন হয় অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র,
এতো খুব চাহিদার ছারখার নয়,
তাই রোগের আগেই মজুত করে রাখতে হয় অ্যান্টিডোট,
আগুনে শুদ্ধতায় ডুবে গিয়েও ফিরে আসি নিজের চৌহদ্দির মধ্যে।
হাতের কর গুনে গুনে প্রত্যেকটা ক্ষতবিক্ষত মেরামতের রসদ ফুরিয়ে এনেছে জীবন…
এখন কোন বিষ বা বনৌষধি কাজ দেয় না, 
একটা আকণ্ঠ অস্বস্তি নিয়ে মাথায় একমাত্র মায়ার বোধ কুরে কুরে খায়।

শেষ অবধি এই মিহিন সন্ধ্যায় আগুন জ্বালিয়েছি, আরও একবার-
এও এক উৎসব- ক্যাম্প ফায়ার।
আর কিছুটা দাহ্য ঢেলে দিয়ে উপভোগ করার জন্য…
জীবনের সব অশ্লীল  চাওয়া। 

 

ভগ্নাংশ 

দু’একটা শব্দেই এখন সংলাপ শেষ।
মা বটগাছের মতো জড়িয়ে নেয়
আমার মনের ফাঁকা মাঠ,
সুপুরি গাছের দীর্ঘ ছায়ার মতো
পশ্চিমে হেলে পড়বে, সন্ধের পরে।
আমিও বসবো কিছুক্ষণ একা…
ওই একা বিশ্বস্ত মা গাছের পাশে।

এখন আর কোনো রবিবার নেই,
সব ঘরে ঘরে এক একটা দ্বীপ,
ছোট উপসাগর দূরত্বে চেনা মানুষ।
শব্দের ডেসিবেল পৌঁছোতে কত যুগ
তাই এখন রোজই লম্বা উইকএন্ড
বোবা শব্দেরা যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে। 

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec goddyo

আবার রাণার কথা । পর্ব ১০

ধা রা বা হি ক । পর্ব ১০

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

মহাকালের দিকে

ভোরবেলা পাখি দেখি। ঐ পাখির নাম জানি না। ঐ পাখি আমার বসন্তের বসন্তকাল। এ ডাল ও ডাল। পাতার আড়াল। সংসারের আড়াল। সংখ্যার আড়াল। আমি আর দেখতে পাচ্ছি না।  কোথায় গেল? এজিথ্রোমাইসিন ফাইভ হান্ড্রেডের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। জাতীয় সঙ্গীতের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। লাইফ সাপোর্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। ঐ আবার পেয়ারার ডালে, ঐ আবার আদাবাটা-জিড়েবাটা মেখে … গায়ে সেন্ট মেখে নিমের নিয়মভরা ডালে লাফাচ্ছে ঝাপাচ্ছে …

পাখি। ভোরবেলার পাখি। আমার সকাল শুরু হল, দিন শুরু হল আরো একটা… পাখির সঙ্গে… আমি পালকের মতো হালকা বাদ্যযন্ত্রে ভর করে এগোতে থাকি, এগোতেই থাকি, পিছনে তাকাবো না বলে।

বার্ধক্য আমার জীবনে কোনদিন আসবে না। অল্প বার্ধক্য, বেশি বার্ধক্য এইসব অপ্রয়োজনীয় আমার জীবনে। বার্ধক্য আসার আগে আমি লাফ মেরে এইট্টি ফাইভ বাসে চেপে ক্লাস থ্রি-ফোরে পৌঁছে যাবো। 

বার্ধক্য তবুও কোনো কলঙ্ক নয়। বার্ধক্যে তুমিও পৌঁছে একদিন হঠাৎ ছাদে গিয়ে ঘুড়ির প্যাঁচ খেলা দেখে শিশুর মতো হাততালি দেবে, দেবেই। বার্ধক্যেই আবার একজন মা-কে তোমার প্রয়োজন।

আসলে ওটাও একটি জীবনের ভঙ্গি, একটা অনুষ্ঠান, একটা অভ্যাস বা অন্যরকম বাদ্যযন্ত্র।

আমি দূর থেকে সেই অভিমানী অভ্যাসকে, সেই বাদ্যযন্ত্রকে, সেই অনুষ্ঠানকে দেখতে পাচ্ছি, চশমা ছাড়াই।

একটা পাতলা সিলেবাস নতুন বাতাসের মতো উড়ছে এখন এই মুহূর্তে আমার পথে আমার জীবনে।

‘দোষ’ সংসারের একটি অঙ্গ, সে আমাদের নিত্য-সংসারেই বসবাস করে। সকলেরই দোষ আছে, আমারও আছে। দোষ ধরাও আছে। কেউ কেউ খুব সুন্দর, অদ্ভুত দক্ষতায় অপরাহ্নে ও ঊষালগ্নে অপরের দোষ ধরে। দোষ ধরা একটা পুলিশি কায়দা। এর জন্য লাগে একটা সুন্দর কুচুটে মন, যাতে কোনোদিন জোৎস্নার আলো পড়েনি, পড়েনি খোলা জানালার রোদ বা আলো, সেখানে স্যাঁতস্যাঁতে ড্যাম্পধরা একটা হৃদয় নিজের কষ্টে নিজে নিজেই অসুস্থ হয়ে আছে।

তবু দোষ বিনা গুনের বিকাশ সম্ভব নয়। গুনের অধিকারী সেই, যার ভিতর অল্পস্বল্প দোষ বেসুরো বাজে।

একটা দিগন্তব্যাপী নীল সমুদ্রের দিকে তাকালে এই দোষগুনের জগৎ-সংসারকে মনে হয় একটা ছোট্ট সামুদ্রিক পাখি, যে অনন্তকাল উড়ছে তো উড়ছেই।

কার দিকে তাকিয়ে আমার এই প্রার্থনার হারমোনিয়ামটি বাজাবো? উত্তর এলো: সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। বিশাল সমুদ্রের সামনে বসে দোষ আর গুন যখন পাশাপাশি বসে শুধু তাকিয়ে আছে আদিগন্ত সমুদ্রের দিকে, গাইছে তারা একসঙ্গে, তখন তার ব্যাপ্তি আরো ব্যাপক-বিশাল।  দূরে এদেশ ওদেশ, দূরে এই আমি ওই আমির জাহাজ চলেছে কালকে ভেঙে, মহাকালের দিকে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec goddyo

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ১২

ধা রা বা হি ক পর্ব ১২

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

উদাসীন তাঁতঘর

pankaj

পাঠকের মতামত অথবা ব্যাজস্তুতি অলংকার

ধরা যাক আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি একটি কিংবদন্তি এবং অনেকের মতে একটি মাইলস্টোন। কী হতে পারে আপনার? আসতে পারে জনপ্রিয়তা ও সহজ খ্যাতি। পাঠকের বিস্তার দেখে আপনার মনে হতেই পারে এরপর আপনি আজীবন উল্লেখযোগ্য। যদি উদাসীন পাশ কাটিয়ে যাবেন ভেবেছেন জানবেন নিস্কৃতি নেই। যদি ভাবেন উপেক্ষা করবেন সন্দেহ আরও গভীর হবে। যদি উপভোগ করেন তাহলে আপনি নিশ্চিত কবির ছদ্মবেশে নিছক সরবরাহকারী।  একজন পুতুল প্রস্তুতকারকের মতো কারণে অকারণে কেবলমাত্র উৎপাদনশীল। প্রথম কবিতার বইয়ের নিজস্বতা বিপজ্জনক। প্রথম কাব্যগ্রন্থের উপর যেকোনো উন্মাদনা এবং কিংবদন্তির ছায়া একজন কবিকে সারাজীবন তাড়া করে। এক হিসেবে তাঁর জীবন অভিশপ্ত। কেননা আজীবন তাঁকে নিজের অতিকায় ছায়ার বিরুদ্ধে লড়তে হয়। যা পাঠক নির্মিত। পুরস্কার নির্মিত। মিডিয়া নির্মিত। চেনা জলে স্নান না করলে পাঠক দুঃখ পান। ভাবেন কোথায় সেই পূর্বপরিচিত অসামান্য আলো? কোথায় সেই মধ্যরাত্রির মুগ্ধ মুহূর্ত, যখন একটা গোটা পাঠকজীবন বদলে যায়? অন্যায় নেই এই আচরণে। একটি অসামান্য কাব্যগ্রন্থ লিখে ফুরিয়ে যান এমন কবির সংখ্যা কম নয় । একটি কাব্যগ্রন্থের অজস্র অনুকরণে অজস্র কাব্যগ্রন্থ লিখে অহেতুক টিকে থাকতে চান এমন কবির অভাব নেই। কিন্তু যিনি প্রতিমুহূর্তে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নতুন নতুন পথে চলেছেন পাঠকের মতামত কতখানি সাহচর্য দেয় তাঁকে? নাকি তার নিয়তি পাঠকহীনতায়? নাকি শুধু কয়েক দশক পেরিয়ে নতুন পাঠকের জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো সদুত্তর নেই তাঁর হাতে। এ কী গো বিস্ময়।

আপাতত কবিতার পাঠকের কথাই বলতে চাইছি। বাকি পাঠকদের কথা এখানে বিচার্য নয়। কবিতার পাঠকেরা কখনও কখনও অনেক বেশি সংক্রামক। স্বধর্মে অবিচল থেকেও নতুন স্বরের প্রত্যাশা করেন। কিন্তু যেকোনো উন্মাদনার দূরের অতিথি তাঁরা ছিলেন একদিন। অথচ পঞ্চাশের দশক থেকে পাঠকের চরিত্র বদলে গেছে অনেকখানি। অনিবার্য কবিসম্মেলনের হাত ধরে একদিন তাঁরা কবির কাছাকাছি এলেন। প্রত্যক্ষ সাহচর্যে আগ্রহ তৈরি হল কবির বেপরোয়া জীবনের প্রতি। কবিতার বদলে তাঁদের মনোযোগ দেখা গেল কবিকে নিয়ে গড়া নানা মিথের দিকে। সম্মেলনমনস্ক এইসব পাঠক নিজের পাঠকসত্তা নিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার কোনো সুযোগ পেলেন না। বরং জনপ্রিয়তা এবং পুরস্কারের নানা লক্ষণ মিলিয়ে খুঁজে নিলেন আরাধ্য কবিকে। আর তাই মিডিয়ার শান্ত অপেক্ষা একদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়। মনীন্দ্র গুপ্ত এঁদের চিহ্নিত করেছেন কীভাবে দেখুন:

 “এক সময় শিক্ষিত এবং দীক্ষিত পাঠকদের জন্য কবিদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজকাল কেউ আর অপেক্ষায় বিশ্বাসী নন, মুরুব্বীরা দ্রুত বলে দেন,অমূক অমূক ভালো লিখছে।পাঠকেরা সেই অন্যের পছন্দ শিরোধার্য করে কবিতা পড়েন,প্রকাশকেরা সেই পছন্দ অনুসারেই বই বার করেন, পুরস্কারকর্তারা সেই পছন্দ অনুযায়ীই পুরস্কার দেন। চাকা ঘুরতে ঘুরতে মোমেনটাম সংগ্রহ করে – কবিকে ঘিরে একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠে।

এই যদি অবস্থা তাহলে পাঠক বাড়লেই বা কি,কমলেই বা কি! অলস পাঠক, নির্বিবাদী পাঠক, লেখকের কৃপাধন্য হতে চাওয়া পাঠক, কোনো অন্য মতলব নিয়ে চলা পাঠক তো সবসময় মিথ্যে কথা বলবেন। এঁদের কথায় নির্ভর করলে সাধারণ পাঠককে ঠকতে হবে।”

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

এইমুহুর্তে কবিতার পাঠক অনেক দূরদর্শী। সে অনেকদূর দেখতে পায়। আসলে কবি ও প্রকাশকের মাঝখানে আজকের পাঠক মধ্যবর্তী এক সুবিধাভোগী। পাঠকের ছদ্মবেশে কবিতার অধিকাংশ পাঠক মূলত কবি, সম্পাদক এবং নানা সম্মেলনের প্রচ্ছন্ন হোতা। তাঁর প্রয়োজন নানা কুহক, সংকেত। যা স্পষ্ট নয় এবং দুদিক খোলা একাধিক অর্থে প্রয়োজনীয় সুবিধাটুকু আদায় করে নেয়। এছাড়াও আছেন পাঠকের ছদ্মবেশে নবীন কবি যশোপ্রার্থী। এইসব পাঠক ক্ষমতার অভিপ্রায় বুঝে মতামত তৈরি করে। সম্মেলনের সুযোগ বুঝে কোন কোন কবির প্রশংসা করতে হবে তার গোপন তালিকা তৈরি করে রাখে। যেহেতু সে নিজেও কবি তাই মনোগত ঈর্ষা ছলনার ছায়া পড়ে তাঁর পাঠক সত্তায়। নিজের বলয়ের বাইরের কবিতার পাঠককে রুচিহীন ভাবতে তাঁর দ্বিধা নেই। এঁদের মাথায় সবসময় ঘুরছে শ্রেষ্ঠ কবির একটি ছোটো তালিকা। উন্নাসিক এক আচ্ছন্ন এবং সংক্রামক তালিকা। গ্রহণের আগে বর্জনেই সে বুঝে ফেলে পথ কতদূর। অতিবিপ্লবীর এই তালিকা তারপর একদিন সুযোগ সুবিধা বুঝে বদলে যায় সম্পাদকের চাপে, সম্মেলনের প্রয়োজনে আর পুরস্কারদাতার গোপন শিকারে। ‘ কিছুই তো হল না’ এই গান গাইবেন এমন বোকা পাঠক কলকাতার আকাশে কাক- শকুনের আগেই বিলীয়মান।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (যৌবনবাউল), ভাস্কর চক্রবর্তী( শীতকাল কবে আসবে সূপর্ণা), শামসের আনোয়ারের ( মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে) ক্ষেত্রে এই সমস্যা দীর্ঘদিন ছিল। মৃদুল দাশগুপ্তর (জলপাই কাঠের এসরাজ) ক্ষেত্রে হয়তো আজও আছে। তাঁরা শুধু অলোকরঞ্জনকে যৌবনবাউলের কবি ভাবলেন ‘ জবাবদিহির টিলা’য় উঠলেন না। দেখলেন না বিপন্ন বিশ্বের প্রতিটি অমানবিক চিহ্নের প্রতি অলোকরঞ্জনের ধিক্কার এবং প্রতিবাদ। ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘ কীরকম আছো মানুষেরা’ পড়ে দেখবার প্রয়োজন হল না তাঁর। ‘জলপাই কাঠের এসরাজে’র সাধারণ পাঠক আজ ‘ আগুনের অবাক ফোয়ারা ‘ পর্যন্ত পৌঁছেছেন কিনা আমরা জানি না। সাম্প্রতিক সময়ে শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়কেও শুনতে হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ হলুদ দাগের বাইরে পথচারীর’মেধা তিনি এখনও পেরোতে পারেননি। অথচ পরবর্তী অসামান্য তিনটি কাব্যগ্রন্থ ( রঞ্জন রশ্মির ক্লিনিক, সার্কাসের আলো, বকুলমন্দ্রিত) পড়লে পাঠক বুঝতেন এই নবীন কবির জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করা যায়। এসবই উদাহরণমাত্র। আরও অনেক নাম জড়ো করে তালিকা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের কিংবদন্তি পেরিয়ে কবি হয়তো আরও নতুন এবং গভীর পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে অপ্রত্যাশিত বাঁক আর ভাষাবদলের মুখে দাঁড়িয়েছেন। সেই পথ চর্বিতচর্বন নয়,  হয়তো আরও তীব্র এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু প্রথম কাব্যগ্রন্থের পরিচিত ঢেঁকুর তুলে আজও পাঠক তাঁকে বলছেন, ‘যাই বলো লিখেছিলে বটে একটা মাস্টারপিস, তুলনা নেই, এখনও বিস্ময় ফুরোয়নি!’ কবি অপ্রস্তুত। এই মতামত আসলে নিন্দা না প্রশংসা তা বুঝে ওঠার আগেই পাঠক অন্য পালে হাওয়া দিচ্ছেন। আর কবি ভাবছেন শূন্য এখন ফুলের বাগান। পাঠকের তার সামগ্রিক লেখার প্রতি আগ্রহ নেই।

ভয়? খুব ভয়? না ভয়ের কিছু নেই। আপনি হয়তো জানেন না আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থের পাঠক আপনার আর কোনো বই পড়েননি। শুধু বিজ্ঞাপন দেখে খোঁজ রেখেছেন আপনার কি কি বই প্রকাশিত হয়েছে। আর স্থানে অস্থানে নিজেকে আপনার একান্ত পাঠক প্রমান করতে ওই কথাগুলি বলে চলেছেন। সুতরাং এখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রশংসার ছলে যে নিন্দা আপনাকে তাড়া করে তা পাঠকের মতামত না একজন দর্শকের মতামত। আপনিই শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিন। পথভ্রষ্ট হবেন না। কয়েকজন তরুণ কবি আজ প্রথম বইয়ের অপ্রত্যাশিত সাফল্যের চাপে দ্বিতীয় বইয়ের কথা ভাবতে ভয় পাচ্ছেন । কেউ কেউ অহেতুক থমকে আছেন। অনেকের উন্নাসিক পাঠ নিজের ঘরেই সিঁদ কেটেছে। কোথায় এর শেষ আমরা জানি না। তবুও বলব এবার বোধহয় বলার সময় এসেছে মনের অহেতুক আনন্দ বা বিস্ময়টুকু যত ছোটোই হোক তাতেই আমাদের চলবে। বাংলা কবিতা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পাঠকের কুয়াশাচ্ছন্ন মতামত বিদায় নিক।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...

Categories
2022_dec goddyo

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা । পর্ব ৮

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৮

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

আমরা আগের পর্বে দেখেছি কীভাবে ‘লাল দূর্গ’ নামের একটি কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের জন্য ফরাসি পুলিস আরাগঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। মূলত দুটি অভিযোগ ছিল আরাগঁ-র বিরুদ্ধে। এক) হত্যার প্ররোচনা এবং দুই) সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ভাঙার প্ররোচনাদান। ১৯৩২ সালের জানুয়ারিতে এই ঘটনার পরে স্যুররিয়ালিস্ট কবিরা বিবৃতি দান করে আরাগঁর পাশে দাঁড়ান এবং অভিযুক্ত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হন। প্রতিবাদের জন্য হোক কিংবা ব্যাপারটিকে আর গুরুত্ব দিতে না চাওয়ার জন্যই হোক, ফরাসি প্রশাসন আরাগঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু কবিলেখকদের প্রতিবাদ ঘিরে তাঁদের মধ্যেই অনৈক্যের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি, স্যুররিয়ালিস্টরাও প্রতিবাদে এক হতে পারেননি। ‘ল্যুমানিতে’র মতো পত্রিকা আরাগঁর কবিতাকে স্যুররিয়ালিস্টদের আত্মপ্রচারের কায়দা বলে মনে করেছে।বুর্জোয়া নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে স্যুররিয়ালিস্টরা প্রতিবাদ করেন না, কিন্তু তাঁরা একটি লিরিক্যাল কবিতা দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছেন; আমরা কাব্যকর্মের দমনমূলক যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করি-—এই হল পত্রিকাটির মত। প্রায় একই মত প্রকাশ করে রম্যাঁ রলাঁ স্যুররিয়ালিস্টদের প্রতিবাদপত্রে স্বাক্ষর করেননি।

        লেখকদের মধ্যে এই বিষয়ে এতরকম মতামত তৈরি হয় যে আঁদ্রে ব্রতোঁ ‘কবিতার দুরবস্থা’ নামে একটি পুস্তিকা লিখে ফেলেন। এতে তিনি ‘ল্যুমানিতে’র বক্তব্য ও অন্য সব মতের পর্যালোচনা করেন এবং দাবি করেন যে এই সবকিছু ঘটছে কারণ লেখকরা ফ্রান্সে সরকারি দমননীতিকে গুরুত্ব দিতে চান যে কারণে আরাগঁর বিষয়টিকে ব্যতিক্রমী মনে করছেন। তিনি বলেন যে স্যুররিয়ালিস্টরা বৈপ্লবিক প্রোপ্যাগান্ডায় বিশ্বাস করে না।

        ঠিক এই সময় ফ্রান্সের বিপ্লবী শিল্পী ও লেখকদের সমিতি গড়ে ওঠে। এই সংগঠন তৈরির ফলে স্যুররিয়ালিস্টদের একটা অংশ, যার মধ্যে ছিলেন আরাগঁ, জর্গ সাদুল, বুনুয়েল, পিয়ের য়ুনিক ও মাক্সিম আলেকজান্দ্র, সমিতিতে যোগ দিলেন। এঁরা বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছেন যে আঁদ্রে ব্রতোঁর পুস্তিকা প্রকাশের সঙ্গে আরাগঁর কোনোসম্পর্ক নেই। আরাগঁর নাম উল্লেখ করে এই বিবৃতি প্রকাশের ফলে ব্রতোঁ অনুসারী স্যুররিয়ালিস্ট কবিতা সরাসরি আরাগঁঅকে আক্রমণ করে আর একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার নাম ‘ক্লাউন (আরাগঁ বিষয়ের সমাপ্তি)’। এই পুস্তিকায় স্বাক্ষর করেন রনে শান, রনে ক্রভেল, তাঁগু, সালভাদর দালি, পল এলুয়ার, মাক্স আর্নস্ট, ত্রিস্তাঁ জারা প্রভৃতি স্যুররিয়ালিস্ট। 

        আরাগঁ-পর্ব ঠেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, আর তা হল, কম্যুনিস্ট প্রভাবে কবিরা কি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে ব্যবহার করে সরাসরি ‘প্রোপ্যাগান্ডা’ কবিতা লিখবেন? কোনো কোনো স্যুররিয়ালিস্ট বললেন, হ্যাঁ, তাই লিখতে হবে। কিন্তু আরাগঁ, সাদুল, আলেকজান্দ্র প্রমুখ লেখকেরা এই মতের বিরোধিতা করলেন।

        কবিতা ও শিল্পের জগতে স্যুররিয়ালিজম হল একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংশ্লেষ, আর স্যুররিয়ালিস্টরা চেয়েছেন এক নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে। তাঁদের কাচে কখনই প্রত্যাশিত নয় যে তাঁরা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়কে মুখ্য আলোচনার হিসেবে দেখবেন। ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টি স্যুররিয়ালিস্টদের কাচে তেমনই প্রত্যাশা করেছে। তাঁরা যে ধর্মঘট, মিছিল ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হননি সেটা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরাও বিপ্লবের পক্ষে থেকেছেন। আরাগঁর ‘রেড ফ্রন্ট’ কোনো স্যুররিয়ালিস্ট কবিতা নয়, প্রচারমূলক রচনা বললে দোষ দেওয়া যাবে না। কিন্তু কাব্যক্ষেত্রে বুর্জোয়া সরকারের নাক গলানোও অনেকের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়েছিল।

        আরাগঁ বিতর্ক ছাড়াও ১৯৩২ সাল স্যুররিয়ালিজম-এর পক্ষে বেশ ঘটনাবহুল সময়। এই সময় প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য অনেক স্যুররিয়ালিস্টসৃষ্টিকর্ম। যেমন, আঁদ্রে ব্রতোঁর ‘ল্য রেভলভার আ শেভো ব্লাঁক’ ও ‘লে ভাস কম্যুনিকান্ট’, রনে ক্রভেলের ‘ল্য ক্লাভেস্যাঁ দ্য দিদেরো’, সাল্ভাদর দালির চিত্রনাট্য ‘বাবায়ু’, পল এলুয়ার-এর ‘লা ভি ইমেদিয়েত’, ত্রিস্তাঁ জারার ‘য়ু বোয়াভেঁ লে লুপ’ প্রকাশিত হয়েছে এইসময়। আর বেরিয়েছে ‘কোয়ার্তার’ নামের স্যুররিয়ালিস্ট পত্রিকার নতুন সংখ্যা।

        ব্রতোঁ ‘লে ভাস কম্যুনিকান্ট’ এ স্যুররিয়ালিজম-এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ করেছেন, বিশেষ করে স্যুররিয়ালিস্টদের স্বপ্ন-ব্যাখ্যান, কারণ স্যুররিয়ালিস্টদের ধারণা মানবজীবনের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে স্বপ্নজীবন । এই স্বপনজীবনকে বস্তুনিষ্ঠভাবে এবং দ্বন্দ্বগত বস্তুবাদের নিরিখে ব্যাখ্যা করা যায়। ব্রতোঁ পুনরায় এই রচনায় বস্তুজগতের সঙ্গে অন্তর্জগতের আদানপ্রদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

        পল এল্যুয়ার-এর ‘তাৎক্ষণিক জীবন’ ও ‘লা রোজ প্যুব্লিক’ কবি হিসেবে তাঁকে ইউরোপীয় কবিদের সামনের সারিতে দাঁড় করিয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থদুটি রচিত হয়েছে স্যুররিয়ালিস্ট আদর্শ মেনে। তাঁর আগের স্যুররিয়ালিস্ট গ্রন্থ ছিল ‘কাপিতাল দ্য লা দুলর’ ( দুঃখের মূলধন) যা ছিল কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলন।তিনি শুধু নিজে কবিতাই লেখেননি, স্যুররিয়ালিস্ট নন্দনতত্ত্ব নির্মাণেও ব্রতোঁর সঙ্গী হয়েছেন। অনেকের ধারণা স্যুররিয়ালিস্ট দলে প্রকৃত কবি ছিলেন পল এল্যুয়ার। স্বাধীনতার কবি এল্যুয়ার। তিনি লিখেছেন—

        আমি জন্মেছিলাম তোমাকে জানব বলে

        তোমাকে তোমার নাম দিতে

        স্বাধীনতা।

        ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত স্যুররিয়ালিস্টরা খুব বেশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেননি, কিন্তু এবার দেখা গেল যে বৃহত্তর জনসাধারণের জন্য তাঁরা প্রকাশ করেছেন নতুনসুসজ্জিত পত্রিকা Minotaure, আর পত্রিকাটি অচিরেই জনপ্রিয় হয়। পল ভালেরির কবিতার পাশে ছাপা হয়েছে সেজান-এর নিবন্ধ। পরপর সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকাটির। ব্রতোঁ লিখেছেন পিকাসোর ছবি সম্পর্কে। তাঁর রচনার অন্যান্য বিষয় ছিল ‘অটোমেটিক বার্তা’, ‘সৌন্দর্য’ ইত্যাদি।

        ১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে ব্রতোঁ ব্রাসেলস ভ্রমণ করেন। সেখানে ইতিমধ্যেই শিল্পী রনে মাগ্রিত পল নুজে প্রমুখের আগ্রহে স্যুররিয়ালিস্ট কবিশিল্পীদের দল গড়ে উঠেছে। ব্রাসেলস এ ব্রতোঁ অনেকগুলো ভাষণ দিয়েছেন স্যুররিয়ালিজম বিষয়ে, তিনি স্যুররিয়ালিজম-এর বর্তমান প্রবণতাগুলো বিষয়েও কথা বলেছেন। এই সব বক্তৃতা ‘কেস-ক ল্য স্যুররেয়ালিসম’ নামে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।

        ব্রোতোঁ, এল্যুয়ার, বেয়ামিন পেরে আরো অনেক দেশে গেছেন। আর এভাবেই স্যুররিয়ালিজম আন্দোলন পৃথিবীর অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...