Categories
2022_may path_protikriya

দূরত্বে রচিত অন্ধকার

ব ই  আ লো চ না

নি শী থ   ষ ড়ং গী

nishith

বিপর্যয় ধরা আছে শব্দের জানালা দরজায়

দূরত্বে রচিত অন্ধকার

দেবাশিস চন্দ

ছবি:‌‌ যোগেন চৌধুরী

প্রকাশক: কবিতা আশ্রম

৩০০ টাকা

‌‘‌কলকাতা, ২৩ মার্চ, ২০২০। বিকেল ৫টায় নেমে এল লকডাউনের খঁাড়া। তারপর মাসের পর মাস স্তব্ধ জনজীবন। অন্তরিন জীবনে তছনছ হয়ে গেল সব কিছু। এক ধাক্কায় পাল্টে গেল যাপনের ধারাপাত। করোনা ভাইরাসের আক্রমণে ‘‌বিপর্যয়ের কানাগলি’‌তে দিশেহারা সবাই ‘‌এঁটেছে খিল অন্দরে বাহিরে।’‌ পেছনের মলাটে বইটি সম্পর্কে যে লেখা রয়েছে তা থেকে এই উদ্ধৃতি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে আচমকা নেমে আসা অতিমারীর বিপর্যয়ের ফলে যে দূরত্ব রচিত হল মানুষে মানুষে, যে অসহায় পরিস্থিতি তৈরি হল তারই নানা দিক উঠে এসেছে দেবাশিস চন্দের কাব্যগ্রন্থ ‘‌দূরত্বে রচিত অন্ধকার’–এ। সঙ্গতে রয়েছে যোগেন চৌধুরীর অসাধারণ সব ছবি। এই বই কবিতা–ছবির বিরল যুগলবন্দি। শুধু আঁকা নয় যোগেন চৌধুরী পুরো বইটি ডিজাইন করে দিয়েছেন। গতানুগতিকতার বাইরে এ এক অন্যরকম জলতরঙ্গ বাংলা বইয়ের গ্রন্থসজ্জায়। ‘‌নতুন রকম কিছু’‌ শিরোনামে যোগেন চৌধুরী লিখছেন— ‘‌অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, সমাজের নানাবিধ বিপর্যয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা, কর্মহীনতা— সব কিছু কবিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তার কবিতার মধ্য দিয়ে আমরা এক ‘‌অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারের দিকে—’‌ পৌঁছে যাই। আরও লিখছেন শিল্পী—‘‌কাব্যগ্রন্থটির সঙ্গে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছি। বইয়ের প্রচ্ছদ, ভেতরের রেখাচিত্র এবং গ্রন্থসজ্জার দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়েছে। আমি সেক্ষেত্রে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন রকম কিছু,করার কথা ভেবেছি।’‌ ‌


দেবাশিস চন্দ নিজেকে বলেন ‘‌শব্দশ্রমিক’‌। কবিতার পাশাপাশি শিল্পকলা নিয়ে লিখেছেন তিনটি বই এবং তাঁর সম্পাদনায় নয়া দিল্লির নিয়োগী বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে দেশ–বিদেশে সমাদৃত পশ্চিমবঙ্গের ২২ জন শিল্পী ও একজন ভাস্করের লেখা কবিতা–ছবির দ্বিভাষিক সঙ্কলন ‘‌ছবি আঁকিয়েদের কবিতা– Visual Rhapsody’। ‌


‘‌কেউ কি জানত একদিন এই জনপদ হয়ে যাবে/‌ ভাইরাস–‌চিহ্নিত, শীতঘুমে যাবে ভোরের মায়া!’‌‌ (‌শীতঘুম)— এই বিস্ময়ের কাছে কবির সঙ্গে পাঠকও বিস্মিত না হয়ে পারেন না‌। নিভৃতবাসের নির্বাসনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে মন। মন কেমনের নৌকো ভেসে চলে পারাপারহীন, অবলম্বনহীন, আশ্রয়হীন। মানবিক দূরত্বের জারি হওয়া পরোয়ানা দুঃখ ও আনন্দ বিনিময়ের পথে বিছিয়ে দেয় কঁাটা। মন খারাপের ঘুড়ি উড়তে থাকে মেঘের সন্ন্যাসে।


কী দুরূহ এই বেঁচে থাকা!‌ কী নিদারুণ এই যাপিত জীবন !‌ ‘‌স্পর্শহীন বেঁচে থাকা এক দুরূহ পাটিগণিত/‌ সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই অবসাদঘুম চেপে বসে/‌ চৌকাঠে স্থির সময়, অতিমারীর নিত্যনতুন/‌ থিমসঙ কামড়ে ধরছে ভয়ে বোবা ড্রইংরুম (‌দুরূহ)‌’‌— যন্ত্রণাময় কারাগারে ছটফট করতে থাকা অসহায় এক যাপন শব্দরূপ পেয়েছে, ভাষা পেয়েছে দেবাশিসের এই কবিতায়।


এই অসহায়তা কিংবা অচলায়তনের বন্দিত্ব বর্ণনাই কবি দেবাশিসের একমাত্র উচ্চারণ নয়। সাধারণ, শ্রমিক, প্রান্তিক, কায়িক পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের দুর্দশা ও দুর্ভোগ তঁার সহানুভূতিশীল দৃষ্টিকে বিপন্ন করেছে বার বার— ‘‌ভাতের গল্পে মুখ ফেরায় রাষ্ট্র (‌কঁাপে বিশ্বাসের নোঙর)’‌, ‘‌রাষ্ট্র তো হঁাটতে বলেনি, রাষ্ট্র তো বলেনি বাড়ি ফিরে যেতে,/ ‌রাষ্ট্র বলেছে যক্ষপুরীতে শ্রম দা‌ও, তৈরি করো স্বর্ণ সিংহাসন/‌ রাষ্ট্র চেনে ভোটার— সংখ্যায় গুনতি, বেচুবাবু রাষ্ট্র চেনে বাজার/‌ মানুষের নেই তার প্রয়োজন (‌রাষ্ট্র চেনে বাজার)‌।’‌ বা, ‘‌হেঁটে চলেছে একটি দেশ,/‌ যে হঁাটার কোনও শেষ মাইলস্টোন নেই,/ ‌যে দেশ ভাতের বদলে রক্ত তুলে দেয়/ ‌শিশুর মুখে, পথে পথে থ্যঁাতলানো সূর্যমুখী,/ যে দেশ জানে না তার লোকের ঠিকানা,/‌ শরীরের ঘাম পরিযায়ী হয়ে উড়ে যায়, (‌থ্যঁাতলানো সূর্যমুখী)‌’‌। এরই সঙ্গে যু্ক্ত হয়েছে রাজনৈতিক চাপান–‌উতোর, যা কবির দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি— ‘‌দ্বিধা–‌দ্বন্দ্বের করোনাক্রান্তি/‌ উতরোল বিবিধ বাণিজ্য সাম্পান/ ‌দাদা যদি বলে ইহা দিদি বলে উহা/ ‌এই চাপানো–‌উতর তুমি চাহ নাই (‌চাহ নাই)‌’‌, অথবা ‘‌তিনি বাংলার প্রভু/ ‌তিনি বাংলার বাবু (‌একলা বৈশাখের গান)‌।


কিন্তু শুধুই কি দুঃসহ যাপন?‌ মৃত্যু, বিপর্যয়, দুর্দশা, কর্মহীনতা?‌ রাষ্ট্রিক উদাসীনতা ও রাজনৈতিক কাজিয়া?‌ শুধু অন্ধকার, বিধুরতা?‌ হতাশার বিপ্রতীপে ভয়ের ও ত্রাসের বিপরীতে আলোকরেখার উদ্ভাসটিও কবি এঁকেছেন অপরূপ মায়ায়, ভালবাসায়, আশ্চর্য আশাবাদে— ‘‌আসুক নতুন বৃষ্টি/ ‌ভেসে যাক/‌ সব পাপ, বিদ্বেষ/‌ উড়ুক প্রজাপতি/‌ জোনাকির/‌ কারুসরণিতে/‌ বাজুক শঙ্খ/ ‌ভয়ের আগুন/ ‌নিভে যাক/ ‌পরিযায়ী মেঘের/ ‌কুসুমে স্নান সেরে/ ‌মানুষ আবার/‌ মানুষ হোক (‌অন্তরিন)’‌। যে কবি বলেছিলেন ‘‌মানুষ ভুলে যাওয়া এই দেশ আমার নয় (‌থ্যঁাতলানো সূর্যমুখী)‌, যিনি লিখেছিলেন ‘‌বাতাসের পাশে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া পথ নেই কোনও (‌গোপন)‌’,‌ ‘‌ধোঁয়াশা অঁাকা ভয়ের ডোরাকাটা দাগ (‌অদৃশ্য)‌’‌ তিনিই বলে উঠছেন— .‌.‌.‌সামাজিক দূরত্বের/‌ অসামাজিক বর্শাফলকের রক্তচোখে চোখ রেখে/‌ তোর কাছে যাই, এগিয়ে আসা ঝরনার শব্দমূর্ছায়/ ‌ধুয়ে নেব সব পাপ, হাতে হাত, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে/‌ উড়ে যাব আকাশে, বর্ষার পোয়াতি মেঘ দেবে ছায়া,/ ‌রাজপথ, নির্জন বারান্দায় ছড়িয়ে যাবে সম্পর্কশেকড়,/ ‌দূরত্ব–‌মানচিত্রের কণ্ঠনালি চেপে ধরে শেখাব সহবত,‌/ ‌বুক চিরে দেখাব ভাল থাকার আলোকিত শিলালিপি (‌পলাশমিতালি)‌। কবি বলে ওঠেন— ‘‌দূরত্ব শাসনের উদ্ধত তর্জনী এক ফুঁয়ে/‌ উড়িয়ে বলি, দূরে নয়, কাছে কাছে স্পর্শে/ ‌স্পর্শে জীবনের বৃন্দগান,.‌.‌.‌ নৈঋত কোণের ঝড়ে উল্টে যাওয়া ঘর/‌ নতুন করে সাজাই, মধ্যরাতের পাগলা ঘণ্টি ঘুম কেড়ে/ ‌নিলে ভয়কে তুড়ি মেরে সামাজিক দূরত্বের অষ্টপ্রহর বেজে/‌যাওয়া বিষাদহুকুম হটিয়ে এসো পাশে বসি, ভরসার বন্ধনে ফিরে/‌ পাই হারানো ঠিকানা, অন্তরিনের শেকল ছিঁড়ে স্নান হেমন্তের শিশিরে (‌ছুঁয়ে থাকি)’‌। অনন্ত এক প্রত্যাশায় কবির অনুপম উচ্চরণ— ‘‌কাচের মতো ঠুনকো অবিন্যস্ত সময় যাবে একদিন মুছে/ ‌নতুন পৃথিবী দঁাড়িয়ে আছে সমুদ্রকল্লোলের মতো সত্য (‌নতুন পৃথিবী)‌।’‌


‘‌দূরত্বে রচিত অন্ধকার’‌ কবিতা বইতে কবি দেবাশিস করোনাকালের অন্তঃসারশূন্য মধ্য ও উচ্চবিত্তের ভার্চুয়াল সর্বস্বতাকে ব্যঙ্গ করেছেন— ‘‌অমুকে কবিতা লিখছে, তমুকে ধারাবাহিক,/‌ বানাচ্ছে সিনেমা, ফেসবুকে হেড়ে গলায় গান, দিগন্ত থেকে দিগন্তে/ ‌উড়ছে খুশির অঁাচল, মোমের মতো নরম গালের চুম্বিত আহ্লাদ,/ ‌বিনি পয়সার ভোজ, ফেসবুকের পাতায় পাতায় উড়ছে রংমশাল,/ ‌পরস্পরের পিঠ চুলকোতে চুলকোতে আর পিঠই পাওয়া যাচ্ছে না.‌.‌.‌ ফেসবুক উপচে পড়ছে খাবারের ছবিতে, মদ্যপানের আব্দারে,/ ‌ইন্ডিয়ার বাবু–‌বিবিদের পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা, ছুটির আমেজে দিবানিদ্রা,/‌ ভোজের পর ভোজ, সকালে, ‌দুপুরে, বিকেলে, রাত্রে, টেবিল উপচানো/‌ খাবার, কত রং, কত বাহার, কত কিসিমের আয়োজনে আয়োজনে/‌ গড়ায় সকাল থেকে রাত, যৌনক্রীড়া, লোভের ক্রিমি কিলবিল করে/‌.‌.‌.‌ অথচ ‘‌হেঁটে চলেছে খিদের ভারত, ভাইরাসের ভারত, অন্ধকারের ভারত,/‌ যে ভারতকে চেনে না ইন্ডিয়া, (‌লজ্জা দিবেন না)‌’‌। অথবা ‘‌জঁাতাকলে পড়িয়া গিয়া/ ‌বাবু–‌বিবিরা কবিতা গল্প পাঠ করিয়া/ ‌গান, ‌আবৃত্তি, নাচ করিয়া, তবলা ঠুকিয়া/ ‌বাহির ভুবন খুঁজিয়া বেড়ায় (‌জঁাতাকল)‌’‌। কবি দেবাশিস ক্রমশ আগ্রাসী ও অপ্রতিরোধ্য তঁার সামুহিক ক্রোধ ও ঘৃণায়, বিতৃষ্ণায়, ফেসবুকীয় অন্তঃসারশূন্যতায়।


‌‌‌‌‌‌বিপন্নতার ভিতরে ভিতরে আকাঙ্ক্ষা ও মিলনের দুরূহতার এবং অতীত যাপনের স্মৃতিতে ‌উদ্বেল কবি। অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখেন। কারণ অন্ধকারই তো জীবনের শেষ কথা নয়— কতদিন হয়ে গেল যুবতীর আঁচলের ছায়া/‌ পড়ে না, স্তনবৃন্তের কুসুমিত তাপে শরীর/ ‌সেঁকতে না পারার দুঃখ নিয়ে শুয়ে আছে (‌ভয়)‌’‌। অথবা ‘‌যাব না ভেসে নৈরাজ্য–‌জঞ্জালে/‌ আছি হে আছি দেখে যাও বালিকা/‌ তোমার হাত ধরেই বেঁচে আছি (‌যাব না ভেসে)‌। কিংবা ‘‌তোমার স্তনের স্বর্ণচাপা আলোয় চাপা পড়ে যায়/‌ সব আতঙ্ক, মানুষের সব পাপের প্রাচীর ছাই হয়’‌ (‌আলো)‌‌।


কাব্যগ্রন্থের চিত্রকল্পে মাঝে মাঝেই ঝলসে ওঠে চমক— ‘‌জ্বলন্ত সূর্যকে ঢেঁকিছঁাট দিতে দিতে চাষিবউ/‌ অপেক্ষা করে কখন জ্বলে উঠবে সোহাগের আলো’‌ (‌কঁাপে বিশ্বাসের নোঙর)‌‌। অথবা ‘‌দিগন্তে উড়ে যায় সবুজ সাইকেল (ভোর)‌’‌। কিংবা ‘‌গোধূলির/ ‌করুণ মায়াকাজালে/ ‌অন্ধ চোখ/ ‌জমে জমে/‌ পাললিক শিলা/‌.‌.‌.‌ নাগরিক/ ‌চালাকির গায়ে/‌ টাঙিয়েছে/‌ অর্থহীন এক/‌ ব্যর্থ পথলিপি (‌অন্তরিন)‌’‌। আরও লক্ষ্য করি— ‘‌খরগোশের মতো তুলতুলে সঙ্গিনী/‌ সন্দেশের মতো সারবান পুত্র–‌কন্যা (‌একলা বৈশাখের গান)‌।’‌ দেখি— ‘‌তিনি তো/‌ কান্নাকে/ ‌আনন্দগানে/ ‌ভিজিয়ে/‌ ব্রেকফাস্ট সারেন/ ‌অন্তরিনের অস্থিরতা/‌ মিশিয়ে লাঞ্চ/‌ অজানা অন্ধকার/ ‌দিয়ে ডিনার (‌একলা বৈশাখের গান)‌’‌। এরকম আরও অনেক।


ঝকঝকে ছাপা, উৎকৃষ্ট কাগজ, নিপুণ বঁাধাই— এরকম একটি কাব্যগ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য কবিতা আশ্রমকে ধন্যবাদ।‌

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may goddyo

নিষিদ্ধ সব সোনার খনি । পর্ব ১

ধা রা বা হি ক । পর্ব ১

স ব্য সা চী   স র কা র

নিষিদ্ধ সব সোনার খনি

sabyasachi

অঙ্ক খাতার প্রতি পাতায়

যত দিনটা এগিয়ে আসত, ততই শুরু হত সে সব অবধারিত পেট গুড়গুড়, বুক ধুকপুক

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখতাম একবার বিছানার কোণে পড়ে থাকা কেসি নাগ আর খাতাটার দিকে তাকাতাম তার পরে সিদ্ধান্ত নিতাম, মোটামুটি পাশ মার্ক পেতে হলেও অন্তত ঘণ্টা দুই হাতে নিয়ে বেরোতে হবে কপাল ক’রে যদি টাইমে বাস স্টপে পৌঁছে সাড়ে ন’টার ষোলো নম্বর বাসটা পাওয়া যায়, তা হলেই ওস্তাদের মার! অরিন্দমের ঠিক পাশের সিটটা কনফার্মড!

কিন্তু পাব তো ঠিক পাশের সিটটা? যদি না পাই? তা হলে? প্ল্যান বি কী হতে পারে? কাল্পনিক পরীক্ষার হল আর কড়া কোনও ইনভিজিলেটরের নিঃশব্দ পদচারণার ফাঁকে কী ভাবে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়তে হবে, তা নিয়ে একটা ছক মাথার মধ্যে খেলা করত স্কেলের পিছনে ক্ষুদ্রতম হরফে সময় নিয়ে লিখে রাখতাম কিছু প্রয়োজনীয় উপপাদ্য, কয়েকটা দরকারি ফর্মুলামোজার ভিতরে বা বেল্টের ফাঁকে বিস্ময়কর দক্ষতায় চোতা লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে স্কুল জীবনে বহু মেসি বা রোনাল্ডোকে দেখেছি মুগ্ধ চোখে সেসব শিল্প দেখেছি এবং আত্মস্থ করা চেষ্টা করেছি চোতা বরাবরই একটা মহৎ শিল্প যার বুকের পাটা আছে, সে পারে যার নেই, সে হাঁ করে দেখে

মাঝে মাঝে বিবেক জাগ্রত হতো বারবার দুলে দুলে পড়ে মুখস্থও করে ফেলতাম কয়েকটা সমীকরণের অঙ্ক কিন্তু মুখস্থ করে কে আর কবে অঙ্ক পরীক্ষার মহাসমুদ্র পার করেছে? 

আর মুশকিল হল, আমাদের সেই ছেলেবেলায় প্রতিবারই অঙ্ক পরীক্ষা হতো একেবারে শেষে সব কিছুর মতো এরও প্লাস-মাইনাস আছে প্লাস বলতে, প্রথমেই বাউন্সারের মুখোমুখি হতে হতো না নিশ্চিন্তে বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস, জীবন বিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞানের সব গাঁট পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে মনে হত—অঙ্ক? ধুত্তোর, এখনও অ-নে-ক দেরি আছে! কিন্তু তার পরে একদিন সব শেষ হয়ে অঙ্ক পরীক্ষা আসতই তার মানে একেবারে স্লগ ওভার ছ’বল বাকি, ২২ করতে হবে যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়! সেই আটের দশকে আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, টি-টোয়েন্টি বলে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না মহেন্দ্র সিং ধোনি বলে কোনও ফিনিশারও জন্মায়নি ফলে ধোনিকে দেখে ইন্সপায়ার্ড হয়ে ‘শেষ ওভারে দেখা যাবে’ কেস করতে গেলে যে টিনের মতো দুমড়ে মুচড়ে যেতে হবে, তা নিয়ে একটু একটু ধারণা ছিল তবু জ্ঞানপাপীর মতো ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতাম

অগত্যা ভয়ঙ্কর আতঙ্কের সেই দিনটা শেষমেশ এসেই পড়ত সাড়ে ন’টার মধ্যে কোনওরকমে নাকে-মুখে গুঁজে পড়িমরি করে বাসস্ট্যান্ডের দিকে দৌড়নো আমরা থাকতাম গোলপার্কের কাছে কাঁকুলিয়া রোডে পড়তাম বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ইংরেজিতে যা-ই বলা হোক, বাংলায় বরাবরই বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় ক্লাস সেভেন পর্যন্ত স্কুলবাস ছিল, কিন্তু এইট থেকে প্রাইভেট বাস ফুলপ্যান্ট সাদা শার্ট, সঙ্গে খাকি ফুলপ্যান্ট সব গোঁফ বেরোচ্ছে, গলা ভাঙছে আর নিষিদ্ধ সব সোনার খনির প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে বিশাল একটা হলঘর ছিল স্কুলে, সেখানে দোতলার একটা গ্যালারি টাইপ ব্যালকনি সেখানে স্কুল শুরু হওয়ার আগে আমরা সবাই কোরাসে হেঁড়ে গলায় ‘ওঠো গো ভারতলক্ষ্মী’ বা ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ গাইতামবাধ্যতামূলক ওই গানের পরে শুরু হতো স্কুল

স্কুলে যাওয়ার জন্য বাস ধরতাম রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচারের সামনে বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশির ভাগ সময়ই টার্গেট থাকত সরকারি ১৬ নম্বর বাস নামতে হত ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের সামনে সেখান থেকে হেঁটে স্কুল আর পাঁচটা পরীক্ষার দিনের মতো মা অঙ্ক পরীক্ষার দিনও কপালে দইয়ের ফোঁটা দিত, বেরোনোর সময় দুগ্গা দুগ্গা বলতো কিন্তু তাতে কী? অঙ্ক খাতায় মা দু্গ্গা উতরে দেবেন, এই ভরসা করতে পারিনি

ক্লাস সেভেন-এইট পর্যন্ত বেশ চলছিল একশোয় একশো বা পঁচানব্বই না পেলেও সত্তর-আশি অবধি দিব্যি মুখস্থ করে মেরে দেওয়া যেত কিন্তু নাইন থেকেই হল মুশকিল একে তো অ্যালজেব্রার গেরো, তার উপরে সুগ্রিবের দোসর হিসেবে যোগ হল অনুপাত-সমানুপাত, পরিমিতি-ত্রিকোণমিতি বাড়তি বলতে জ্যামিতির ভয়ঙ্কর সব একস্ট্রা উপপাদ্য মুখস্থ করে ম্যানেজ করা যায় ঠিক, কিন্তু এক্সট্রার নাম শুনলেই হু হু করে জ্বর আসত পরে যখন খেলার সাংবাদিকতায় পেশায় এলাম, ক্রিকেটের স্কোর লিখতে গিয়ে সবশেষে এক্সট্রার অনুবাদে লিখতে হত অতিরিক্ত কে না জানে, ক্রিকেটের একটা ইনিংসে নো বল, বাই, ওয়াইড বল, লেগ বাই—এসব যোগ করে যা দাঁড়ায়, তা ইনিংসের শেষে এক্সট্রা হিসেবে লেখা হয় স্কোরে এক্সট্রা থেকে স্রেফ বাংলা অনুবাদ করে অতিরিক্ত শব্দটা বসিয়ে দাও ব্যাস, কাজ শেষ! আনন্দবাজার স্পোর্টসে জয়েন করার পরে যতবার স্কোর লেখার সময় এক্সট্রা লিখতে হত, ততবার আশ্চর্য আনন্দে উদ্ভাসিত হতাম আমি কী সোজা—এক্সট্রা মাত্র একটা শব্দ অনুবাদ করলেই হল! অথচ মাধ্যমিকের আগে জ্যামিতির ওই এক্সট্রা কী তুর্কি নাচন না নাচিয়েছে এককালে! ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, সমকোণ—বড় জটিল ব্যাপারস্যাপার

বালিগঞ্জ প্লেসের কাছে সোমেনদা বলে একজনের কোচিং ক্লাসে যেতাম বটে, কিন্তু ক্লাসে বসেই অঙ্ক খাতার পিছনে অবধারিত ঠাঁই পেত সদ্য বেরোনো ইন্দ্রজাল কমিক্সের সংখ্যা সপ্তাহে সপ্তাহে বেরোত সেই সব আশ্চর্য কমিক্স কী সব নাম ছিল সেই চটি বইগুলোর—মহাকালের চাবুক, বিষাক্ত নিঃশ্বাস, জলার ড্রাগন, শয়তানের স্বর্গ বেতাল, জাদুকর ম্যানড্রেক, ফ্ল্যাশ গর্ডনের সঙ্গে যোগ হয়েছিল বাহাদুর—গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি পরা রোগা-সোগা যুবক যার গার্লফ্রেন্ডের নাম ছিল বেলা বাহাদুর চম্বলের ডাকাতদের সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত জিতে যেত 

বাড়িতে আসত সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা, সেখানে এক পাতা জুড়ে থাকত রঙিন অরণ্যদেব কে আগে সেটা পড়বে, তা নিয়েও আমি আর আমার ভাই কম কাড়াকাড়ি করিনি এর সঙ্গে ছিল আনন্দমেলার টিনটিন, সন্তু-কাকাবাবু, গোগোল, মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, শুকতারার বাঁটুল দি গ্রেট সপ্তাহে সপ্তাহে আমাকে মোহিত করে রাখত ডেনকালির জঙ্গল, খুলিগুহা, বুড়ো মজ, রেড ইন্ডিয়ানদের মতো টুপি পরা গুরান, রেক্স, মিস তাগামা আর অবশ্যই বেগুনি রঙের পোশাক ও নৌ-নীল রঙের ডোরাকাটা জাঙিয়া পরা বেতাল চলমান অশরীরী

কিন্তু চলমান অশরীরী তো আর অঙ্ক পরীক্ষার দিন আমাকে বাঁচাবেন না জাদুকর ম্যানড্রেকও না বাঁদরের বাঁশে ওঠানামার অঙ্কই হোক বা পরিমিতির ড্রামের ব্যাসার্ধ, দেখলেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা সাপ হু-উস করে নেমে যেত আর অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাত? সেইসব রাত মানেই বিভীষিকা বিভিন্ন সাইজের সব রাক্ষস আর খোক্কস নিরেট মস্তিষ্কে অহেতুক হামলা চালাত!

বিছানার উপরে অঙ্ক খাতা, কেসি নাগ আর এবিটিএ-র থান ইঁট সাইজ টেস্ট পেপার খোলা গোমড়াথেরিয়ামের মতো মুখ করে কয়েকটা অঙ্কে শেষবার চোখ বুলোতে না বুলোতে প্যান্টের গোপন খাপ থেকে বেরোত সামান্য দুমড়ে যাওয়া নম্বর টেনের প্যাকেট বহুদিন অবলুপ্ত, কিন্তু আটের দশকের মাঝামাঝি নম্বর টেন আর চার্মস ছিল আমাদের মতো বখাটেদের কাছে তখন খুব হ্যাপেনিং সিগারেট নাইনের শেষদিকে সিগারেটে হাতেখড়ি, ধরা পড়ে বাড়িতে বেদম উত্তমমধ্যম—এসব পর্যায় পেরিয়ে ক্লাস টেনে তখন রীতিমতো নম্বর টেন প্রেমী বিপদ বুঝলে এক চান্সে জ্বলন্ত সিগারেট ম্যাজিশিয়ানের মতো কৌশলে হাতের তুলোয় রেখে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিতে পারি, ফেলুদা স্টাইলে রিং ছাড়তে পারি আর ধরা না পড়ার জন্য অভূতপূর্ব মিথ্যের আমদানি করতে পারি অম্লানবদনে

সে যা-ই হোক, সেই সব রাতে ফেরা যাক রাত বাড়লে পাড়া যখন স্তব্ধতায় ডুবে যেত, রাস্তার নেড়িদের চিৎকার ছাড়া কিছুই শোনা যেত না, তখন অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাতে চুপিচুপি বারান্দায় গিয়ে নম্বর টেন ফুঁকে এলে কিছুটা টেনশন তো কাটতই কিংবা মনে পড়ত ইতিহাস পরীক্ষা দিয়ে বেরোনোর সময় সহপাঠী ভুতোর মন্তব্য, ‘অঙ্ক নিয়ে এত দুঃস্বপ্ন দেখিস কেন? জানিস আরডি বর্মণ আমাদের স্কুলে পড়ত? বলতো, ক্লাস টেনে অঙ্কে কত পেয়েছিল? মাত্র ২২!’

সত্যজিৎ রায় আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিলেন আরডি বর্মণও আমাদের স্কুলের প্রাক্তনী, সেটাও জানতাম কিন্তু অঙ্কে কোনওদিন ২২ পেয়েছিলেন কি না, বা সেই তথ্য ভুতো কোন আশ্চর্য সংগ্রহশালা থেকে বের করেছিল, তা অবশ্য জানা হয়নি জিগ্যেস করলে অবশ্য ভুতো কী বলত, আমার জানা ছিল উদাস একটা চোখে বলত, ‘স্কুলের এক্স স্কলারদের নিয়ে কিসস্যু জানিস না আমাকে আন্ডারএস্টিমেট করাটা এ বার বন্ধ কর!’ 

ভুতোর কথায় যে খুব মোটিভেটেড হতাম তা নয়, কিন্তু জটায়ুর মতো মনে একটা আশ্চর্য বল পেতাম সেই বয়সে লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসে পড়তে শুরু করেছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’, পুজোসংখ্যায় হাতেখড়ি হয়ে গিয়েছে নীললোহিতের সঙ্গে, সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ পড়ে শিহরিত হয়েছি আর এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, মাথায় ঢুকে পড়েছে কবিতার ভূত শৈশবে বিভিন্ন ফাংশনে রবি ঠাকুরের প্রশ্ন, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, আফ্রিকা, পুরাতন ভৃত্যের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি শুনে শুনে যখন ক্লান্ত, তখনই কী ভাবে যেন হাতে এসেছে ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব’ কবির নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটা কবিতার নাম, ‘যদি পারো দুঃখ দাও’

পড়ে দেখছি আর একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ছি এসব কী লিখেছে লোকটা?

‘যদি পারো দুঃখ দাও, আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি

দাও দুঃখ, দুঃখ দাও—আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি

তুমি সুখ নিয়ে থাকো, সুখে থাকো, দরজা হাট-খোলা

এই লেখা তো আমার মনের কথাই বলছে আমিও তো দুঃখ পেতে ভালোবাসি অঙ্ক পরীক্ষা মানেই তো একরাশ দুঃখ পাশের পাড়ার বারান্দার মেয়েটার চোখ মানেও দুঃখ ওই যে মেয়েটাকে মাঝে মাঝে দেখি, সন্ধেবেলা কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার সময় কীরকম ভাবে যেন তাকায় কিন্তু তার পরেই মুখ ফিরিয়ে নেয়! কেন অঙ্ক করতে করতে ওই মুখটা মনে পড়ে? বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে? ও কি কোনওদিন কথা বলবে আমার সঙ্গে? একদিন? সাহস করে বলব একদিন কথা? সেদিন পাশের পাড়ার রাজুকে বলতেই খিলখিল করে হাসি, ‘ওদিকে তাকাস না ও মেয়ে ডেঞ্জারাস জিনিস তোকে ছবি করে ছেড়ে দেবে! জানিস না, সুজনদার সঙ্গে ওর প্রেম?’

ছবি করে দেবে? তাই? সত্যিই মেয়েটা পারে ছবি করে দিতে? আবার একটা কবিতার কথা চলে আসে অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাতে ঝরঝর করে বৃষ্টি আর বইয়ের মধ্যে চোখ

‘বৃষ্টির ভিতরে কিছু অভিমান আছে

জলে প’ড়ে ঠোঁট ফোলায়, করে লুকোচুরি,

ক্ষেতে ও খামারে প’ড়ে সোঁদা গন্ধ তোলে

কেন তার অভিমান? পতনে-পীড়নে?’

তা হলে বৃষ্টিরও অভিমান আছে এই বিপুল জলধারার অভিমান কি আমার মতো? কেন আমার মাথায় অঙ্ক ঢোকে না? সবাই টপাটপ অঙ্কগুলো করে ফেলে আর আমি কেন পারি না? সমীকরণের অঙ্কে বন্ধুরা কি সহজে এক্স ধরে নামিয়ে দেয় সেটা টপাটপ সব সল্ভ হয়ে যায় আমি কেন এক্স, ওয়াই, কিছুই ধরতে পারি না?

একে তো অঙ্ক দেখলেই শিরদাঁড়া দিয়ে সাপ নামে, তার উপরে গোদের উপরে বিষফোঁড়ার মতো ছিল ঘরশত্রু বিভীষণের দল কেন বুধবার সন্ধেয় চিত্রহার দেখলেই ছেলে বখে যাবে, কেন বাড়িতে এজন্য টিভি রাখা উচিত নয়, কেন ইন্দ্রজাল কমিক্স পড়লে পড়াশোনা আর কিছুই হবে না, এ নিয়ে বাবা-মায়েদের কানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কুমন্ত্রণা ভরে দেওয়ার মতো লোকজন চারপাশে গিজগিজ করত অমুকের ছেলে আইআইটি পেয়েছে, তমুকের সেজ জ্যেঠুর নাতি জয়েন্টে ফাটিয়ে দিয়েছে—এসব শুনে শুনে কান পচে গিয়েছিল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়র না হতে পারলে জীবন পুরো ঠাণ্ডা চাউমিনের মতো হয়ে যাওয়া অবধারিত, এই প্রবাদবাক্য সেই যুগে ক্লাস নাইন থেকে কানে কাটা রেকর্ডের মতো বাজত

কিন্তু সব কিছু সামলেও মনের মধ্যে আর একটা ভূত ঠিক ঘুরঘুর করত সে ফিসফিস করে ঠিক বলত, বেশ করো, পারো না! ক্রিকেট তো খেলতে পারো ওই যে আগের দিন পাশের পাড়ায় বুবলাদের সঙ্গে ম্যাচটায় একা জেতালে তুমি? উল্টোদিকে পটপট করে উইকেট পড়ে যাচ্ছে আর তুমি করাচি টেস্টে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সুনীল গাভাসকরের মতো দাঁতে দাঁত চিপে দাঁড়িয়ে থাকোনি? বেপাড়ার উইকেট, রকে পাজামা পরা সে পাড়ার বিশেষজ্ঞ কোচ সিগারেট হাতে দীপুদা, সে স্লেজিং করেনি? তুমুল করেছে বারবার বুবলাকে বলেছে, পেসারটা আন থ্রি কোয়ার্টারে ফ্যাল ছেলেটা পারবে না ধুসর রঙের ক্যাম্বিস বলটা যখন সোঁ সোঁ করে আসছিল, তখন তুমুল চাপ সহ্য করেও তুমি ক্রিজে থেকেছ লাস্টম্যান বাবুনকে যাতে পরের ওভার খেলতে না হয়, লাস্ট বলে সিঙ্গল নিয়ে নিয়ে ম্যাচটা বের করে দাওনি?

দিয়েছ তো! কিন্তু কেউ বোঝেনি ক্রিকেটটা মন দিয়ে খেলার কথা উঠলেই কানের কাছে ভেসেছে, ‘তুই কি গাভাসকর? যা, টেস্ট পেপার খুলে অঙ্ক নিয়ে বোস!’

সেসব দুঃসহ সন্ধেয় লো়ডশেডিং হতো আর হ্যারিকেনের আলোয় বসে টেস্ট পেপার খুলে অঙ্ক করতে বসতে হতো কত অভিশাপ যে কেসি নাগ বলে ভদ্রলোককে দিয়েছি! 

আসলে ক্যাম্বিস বলে বেপাড়ার বুকুনের পেস সামলানো এক জিনিস, অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আর এক অগত্যা সকাল সকাল উঠে ষোলো নম্বর বাসের জন্য চোঁ-চা দৌড় ক্লাস নাইন অনায়াসে অরিন্দমের পাশে বসে ওর খাতা টুকে হাফ ইয়ার্লি আর অ্যানুয়াল অনায়াসে উতরে দিয়েছিলাম, ক্লাস টেনের হাফ ইয়ার্লিও মেরে দিয়েছিলাম কিন্তু মুশকিলটা হল প্রি-টেস্টে আগের দিনই ভুতো একটা কাণ্ড করে বসল অঙ্ক পরীক্ষার আগে সম্ভবত শেষ পরীক্ষা ছিল জীবনবিজ্ঞান সেটা নামিয়ে দেওয়ার পরে দু’দিন গ্যাপ তার পরে মহাযুদ্ধ তা জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষা শেষে অরিন্দমের সঙ্গে অঙ্ক পরীক্ষার দিন কোন বেঞ্চে বসাটা স্ট্র্যাটেজিক্যালি ঠিক হবে, এই ছকটা করছি, হঠাৎ ভুতো এসে অরিন্দমকে বলল, ‘গ্ল্যাক্সো, আমি বেশি চাই না ১০০-এর মধ্যে ৩০টা নম্বর শুধু আমাকে তুলে দিস বেশি চাইব না তোর পিছনে বসব না হলে একেবারে গাড্ডা খেয়ে যাব!’ 

টকটকে ফর্সা, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, গাবলু-গুবলু টাইপ ক্লাস নাইন-টেনেও অরিন্দমের মুখে একটা বেবি ফ্যাট ছিল সে সময় বেবি ফুড গ্ল্যাক্সোর বিজ্ঞাপনে বাচ্চাদের ছবি দেখিয়ে একটা গান হত, ‘আহা দেখলেই বোঝা যায় গ্ল্যাক্সো বেবি…’ তা ক্লাসে অরিন্দমের নাম দ্রুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল গ্ল্যাক্সো পরে যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে এখন অরিন্দম বেঙ্গালুরুনিবাসী নামী বহুজাতিক সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর আজ নিউইয়র্ক তো কাল লন্ডন, পরশু জাপান তো পরের সপ্তাহে সুইৎজারল্যান্ড, এসব করে বেড়ায় তার উপরে চমৎকার গানের গলা, আরডি-র সুরে কিশোরের গানে যে কোনও আড্ডা মাত করে দেওয়ার ব্যাপারে চোখ বুজে সেরা বাজি 

ভুতো তার আগেই আমাকে ম্যানেজ করেছে আমি অনেকটা নিমরাজি টাইপস শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশটা ঠিক কতটা রিস্কি, বুঝতে পারছি না গ্ল্যাক্সো সাহস দিল, ‘ভুতো তো পিছনে বসবে তুই তো আমার পাশে ম্যানেজ হয়ে যাবে!’

তা ঠিক সময়েই হাতে এল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র উপরে লেখা গণিত তার তলায়, বাঁ দিকে পূর্ণমান ১০০ এর পরে লেখা থাকত, ‘প্রতিটি প্রশ্নের পাশে প্রদত্ত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান দ্যোতক’ যতদূর মনে আছে, অবজেক্টিভ দুই নম্বর করে দশটা মানে ২০ নম্বর, পাটিগণিত ২০, অ্যালজেব্রা ৩০, জ্যামিতিতে ১০, পরিমিতি-ত্রিকোণমিতিতে ২০ নম্বর থাকত 

এক একটা ছোট বেঞ্চে দু’জন বসতে পারত গ্ল্যাক্সো মানে অরিন্দমের পাশে আমি, পিছনের বেঞ্চে ভুতো সকাল এগারোটায় ঢং ঢং করে বাজল স্কুলের নেপালি দারোয়ান বাহাদুরের ঘণ্টা আর শুরু হল ম্যাচ প্রথমেই অবজেক্টিভ মানে টি-টোয়েন্টির পাওয়ার প্লে চার-পাঁচ লাইনের অঙ্ক, নামাতে পারলেই দু’নম্বর 

সেই সময় পরীক্ষকরা ছিলেন একেবারে হিটলার ইন্টু একশো সেই ক্লাস টেন থেকে শুনে আসছি, টেস্ট বা মাধ্যমিকে প্রশ্ন সহজ হতে পারে, কিন্তু প্রি-টেস্ট হচ্ছে গাঁট যত কঠিন প্রশ্ন, ততই বিজাতীয় আনন্দ পান হিটলাররা প্রশ্নপত্র হাতে আসতেই বুঝলাম, যা বুঝছি, মেরে-কেটে ২৫-৩০ পেতে পারি তার পরে ‘হাতে রইল পেন্সিল’ হয়ে যাওয়া অবধারিত স্বয়ং ভগবান আমার হয়ে ব্যাট হাতে ক্রিজে গেলেও তার বেশি একটুও এগোতে পারব না 

আর এমনই কপাল, সেদিনই ইনভিজিলেটর হিসেবে ক্রিজে দেবব্রতবাবু! রাশভারী চেহারা, মোটা গোঁফ, শেষ কবে জীবনে মন খুলে হেসেছেন, কেউ দেখেনি অঙ্ক পড়াতেন বটে, কিন্তু থানার অতিরিক্ত দক্ষ বড়বাবু হিসেবে বেশি মানাবে যেসব ইনভিজিলেটর পরীক্ষার হলে দশ পনেরো মিনিট ঘুরে তার পর ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়েন, তাঁরা আমাদের খুব ভালোবাসার তখন জীবন মানেই, ‘আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে!’

কিন্তু সে ভাগ্য বেশির ভাগ সময়েই হতো না বেশির ভাগ সময় দেখেছি, গার্ড দেওয়ার সময়ে কেউ কেউ অকারণে শার্লক হোমস বা ফেলুদা হতে পছন্দ করেন সব সময়েই চোখ ঘুরছে, সারাক্ষণ এপাশ থেকে ওপাশ গম্ভীর মুখ নিয়ে টহল চলছে দেবব্রতবাবু এই শার্লক ঘরানার সব সময়ই রেড অ্যালার্ট জোনে থাকতে হয় কাজ সারতে হয় অত্যন্ত সন্তর্পণে একটু এদিক ওদিক হলেই সর্বনাশ হয়ে যাওয়া অবধারিত তিনটে স্টাম্পই মাটিতে গড়াগড়ি খাবে! 

ম্যাচ তো শুরু হয়েছে বাঁ দিকে গ্ল্যাক্সো দ্রুত নামাচ্ছে একের পর এক অবজেক্টিভ আড়চোখে ওর খাতায় চোখ রেখে নিখুঁত দক্ষতায় কপি করছি পাশের লোকের খাতা দেখে টুকতে চাইলেই কিন্তু টোকা যায় না মাথা সোজা থাকবে, চশমা এমন ভাবে নামানো থাকতে হবে, যাতে ইনভিজিলেটর ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ না করে তাকাতে হবে আড়চোখে, নির্দিষ্ট একটা অ্যাঙ্গলে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নার্ভ একেবারে টি-টোয়েন্টিতে শেষ ওভারের নার্ভ কোনও পরিস্থিতি থেকেই যেন বোঝা না যায়, টোকাটুকি চলছে স্কেলের পিছনে খুদে অক্ষরে লেখা ফর্মুলা টোকা বা পকেট থেকে চোতা বের করারও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে ইনভিজিলেটর যখন ঘুরতে ঘুরতে হলের অন্য প্রান্তে যাবেন, তখনই বের করতে হবে সোনার খনি খাতার ফাঁকে এমন ভাবে রাখতে হবে, যাতে কাক পক্ষীও ধরতে না পারে শহরের যে কোনও স্কুল বা কলেজের ক্লাসরুমে যান, দেওয়ালে চোতা শিল্পের নানা আশ্চর্য ভ্যারিয়েশন চোখে পড়বেই কোথাও অ্যালজেব্রার ফমুর্লা পেন্সিলে বা ডট পেনে লেখা, কোথাও বা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দশটি কারণ এক সেন্টিমিটার জায়গার মধ্যে লেখা আছে পিঁপড়ের সাইজের অক্ষরে 

সে যা-ই হোক, প্রথম আধ ঘণ্টা নিশ্চিন্ত গ্ল্যাক্সো হু হু করে রান তুলছে, পাশে আমি কিন্তু ভুতো আমাদের সঙ্গে পারবে কেন? সেই স্কিলই তো ওর নেই নেট প্র্যক্টিসই তো কোনওদিন করেনি! ও দিকে, গ্ল্যাক্সোর সঙ্গে আমার আশ্চর্য বোঝাপড়া একেবারে সচিন-সৌরভ জুটি ইতিহাসে আমাদের ঠিক করা থাকে, কে চন্দ্রগুপ্তটা মন দিয়ে পড়বে, কে আকবর বা ঔরঙ্গজেব জীবন বিজ্ঞানে ও যদি ব্যাঙের পৌষ্টিক তন্ত্রটা গ্রিপে রাখে, তো আমি মাথায় রাখি সালোকসংশ্লেষ এইরকম আর কী! সব কিছুতেই সিলেবাসে মোটামুটি ফিফটি-ফিফটি শেয়ার তার পরে হলে খাতা পাল্টাপাল্টি করতাম তুমুল দক্ষতায় শুধু অঙ্ক পরীক্ষায় আমার নন স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনও ভূমিকা নেই সেদিন আমি নেহাতই লাস্টম্যান লাস্টম্যানকে যেমন বড় ব্যাটার শেষ বলে সিঙ্গল নিয়ে নিয়ে বাঁচায়, সেরকমই আমাকে বৈতরণী পার করে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব গ্ল্যাক্সোর উপর

মুশকিলটা হল কী, সেদিন আধ ঘণ্টা পর থেকেই ভুতো উসখুস করতে শুরু করল ও গ্ল্যাক্সোর স্পিডের সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না ফলে অধৈর্য হয়ে শুরু করেছে আমার পিঠে আঙুল দিয়ে খোঁচা মারা ওর খোঁচায় বিরক্ত হয়ে একটু সাইড করে বসেছি, যাতে আমার খাতাটা ও পিছন থেকে দেখতে পারে, আর তার থেকেই হয়ে গেল সর্বনাশ 

সোজাসুজি দেবব্রতবাবুর খপ্পরে ‘অ্যাই, তোদের এত গুজুরগুজুর কীসের রে? তখন থেকে দেখছি–’ এর পরেই একেবারে আমার সামনে এসে কড়া গলায়, ‘ওঠ তুই যা ফার্স্ট বেঞ্চে গিয়ে বোস

 ‘কিছু করছিলাম না স্যর,’ বলে শেষরক্ষার একটা ট্রাই নিতে হয় নিয়েওছিলাম কাঁচুমাচু মুখে এসব কাকুতি-মিনতি কবেই আর শার্লক হোমসরা শুনেছে?শোনেনি! তাই অবধারিত উত্তর এল, ‘ওঠ বলছি ফার্স্ট বেঞ্চ! যা!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ভুতোর দিকে রক্তচক্ষু হেনে বিড়বিড় করে উঠে আসা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না ফার্স্ট বেঞ্চ! সামনের সারি সারা জীবন ব্যাপারটা থেকে শত হস্ত দূরে থেকেছি সুবোধ বালকেরা ওখানে বসে যারা পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে স্কুলে আসে, প্রতি ক্লাসে প্রতিটা হোমওয়ার্কে ঝুড়ি ঝুড়ি নম্বর পায়, টিফিন বক্স খুলে নিজের টিফিন মন দিয়ে গুছিয়ে খায় স্কুলের গেটে দাঁড়ানো ফুচকাওয়ালার দিকে মা বারণ করেছে বলে যায় না, তেঁতুল গোলা জল খায় না, সিঁড়ির নীচে গোপালদার দোকানের বাদাম বিস্কুটে ভুলেও কামড় দেয় না জিগ্যেস করলে বলে, ‘ওসব খেলে পেট খারাপ করবে!’ 

আমার আবার ওসবেই বরাবরের অপরিসীম আগ্রহ বাদাম বিস্কুটের জন্য প্রাণ দিতে পারি, টিফিন বক্সের ডিম টোস্ট, অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের চিনির গোলার মতো খেতে শুকনো ক্ষীর কদম্ব আর কলা, মায়ের যত্ন করে কেটে দেওয়া আপেল একেবারেই মুখে রোচে না বাড়ি ফেরার আগে মায়ের ভয়ে সাবধানে স্কুলের নর্দমায় ফেলে দিই তার বদলে লুকিয়ে জমানো আট আনা দিয়ে গেটের ফুচকা অনেক আকর্ষণীয় ক্লাসে সুনীলবাবু যখন অঙ্ক পড়ান, ফার্স্ট বেঞ্চ যখন গভীর মনোযোগে সেসব লেখে, আমি তখন লাস্ট বেঞ্চে বসে অঙ্ক খাতার পিছনে রাখি ইন্দ্রজাল কমিক্সের গত শনিবার বেরোনো সংখ্যা এত অনাচারের একটা ফল ভুগতে হবে না? তাই অঙ্ক পরীক্ষার দিনই আধ ঘণ্টার মধ্যে ফার্স্ট বেঞ্চ!

যথারীতি পেন মুখে করে বসে ততক্ষণে ২২ নম্বরের উত্তরও করতে পারিনি তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় মোটামুটি দেড় ঘণ্টা হতে যাচ্ছে চোখের সামনে ভাসছে শীর্ষেন্দুর সেই অমর লাইন, ‘বুরুন তুমি অঙ্কে তেরো! বুরুন তুমি অঙ্কে তেরো!’ টিনটিনের কমিক্সে চরিত্রদের মাথায় আঘাত লাগলে যেমন নানা রকম চিহ্ন আর তারা আঁকা ছবি থাকে, মাথার মধ্যে সেই সব হচ্ছে একটা অ্যালজেব্রার অঙ্ক কমন পড়েছিল বলে কোনওরকমে নামিয়েছি, কিন্তু আর এগোতে পারছি না চার পাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, বাকিরা সবাই আইনস্টাইন! শুধু আমিই গণ্ডমূর্খ! সবাই খসখস করে অঙ্ক কষেই চলেছে 

তখনও বিশ্বাস করতাম, আজও করি- জীবনে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে আর একটা দরজা ঠিক খুলে যায় শুধু দরজাটা চিনতে হয়, সাহস করে ঢুকে পড়তে হয় জীবন ঠিক রাস্তাটা সাজিয়ে রাখে ওই যে ইংরেজিতে বলে না, ‘নো রিস্ক, নো গেইন’ কী হলে কী হতে পারে, সেই নেতিবাচক ভাবনায় মনকে আচ্ছন্ন না করে ঝুঁকিটা নিয়ে ফেলাই আসল মনের মধ্যে একটা সম্ভাবনার কথা ভাবছিলাম কিন্তু সুযোগটা নিতে পারব কি না, নিশ্চিত ছিলাম না কিন্তু জানতাম, ওটাই লাস্ট চান্স পারব?

ঠিক দেড় ঘণ্টায় ইনভিজিলেটর বদল হয় তখন দেবব্রতবাবু রিসেস নেবেন টানা তিন ঘণ্টা কোনও টিচারই গার্ড দেন না দেড় ঘণ্টা পরে অন্য কেউ আসেন বাকি দেড় ঘণ্টার জন্য আজ কেউ আসছে না কেন? 

এল ঠিকই এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট নাগাদ দরজার কাছাকাছি কাশীনাথ খামরুইয়ের মুখ কাশীনাথবাবুও অঙ্ক পড়াতেন, সাদা ধুতি, সাদা গিলে করা পাঞ্জাবি, শার্লক হোমস গোত্রের মোটেই নন বীরদর্পে গোটা হল ঘুরে বেড়ানো নয়, চেয়ারে বসে মাঝে মাঝে চারদিকে তাকানোই তাঁর প্রিয় হবি সেফ বেট!

গার্ড বদল হচ্ছে, দরজার দিকে যাচ্ছেন দেবব্রতবাবু, কাশীনাথবাবু ঢুকছেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু’জনের হাসি বিনিময় হচ্ছে হাতে বড়জোর পনেরো সেকেন্ড কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে একটু নীচু হয়ে একটা লম্বা লং জাম্পে গ্ল্যাক্সোর পাশে পুরনো সিটের সামনে এবং সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে ওরই পাশের সিটে এই কয়েক মাস আগে গ্ল্যাক্সো মানে অরিন্দম ওর একটা ফেসবুক পোস্টে লিখেছে, অমন চমৎকার লং জাম্প নাকি ও জীবনে একবারই দেখেছে! জিও! 

তা দেখুক দেবব্রতবাবু বেরিয়ে গেলেন, কাশীনাথবাবু ঢুকে নিজের চেয়ারে বসলেন হেলেদুলে সহপাঠীরা দু’একজন কেসটা দেখেছে বটে, কিন্তু বিস্ময়ে হতবাক হওয়া ছাড়া কী আর করবে? কী ঘটে গেল, বাকিরা বুঝলই না শুধু ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে আমি ব্যাক টু পুরোনো সিট! গ্ল্যাক্সোর পাশে বাকিরা? আইনস্টাইন হতে ব্যস্ত ছিল 

অতএব পরবর্তী দেড় ঘণ্টায় রান উঠল ঝড়ের গতিতে গ্ল্যাক্সোর খাতাটাই তো আমার জিম্মায় চলে এল! আর দ্রুত লিখতে পারার ব্যাপারে আমার সুনাম আজও নকুড়ের সন্দেশ লেভেলের মারাত্মক ব্র্যান্ড ভ্যালু! এখানে চলমান অশরীরী এলেও কোনও কথা হবে না আমার সঙ্গে পারা একটু মুশকিল আছে যারা জানে, তারা জানে যারা সাংবাদিকতায় আমার সহকর্মী ছিল বা এখনও আছে, তারা সব্বাই জানে 

প্রি টেস্টে অঙ্কে গ্ল্যাক্সো সম্ভবত ৯২ পেয়েছিল, আমি ৭১ ওই দেড় ঘণ্টা নষ্ট না হলে আমিও কাছাকাছি থাকতাম আর মাধ্যমিকে কত পেয়েছিলাম? ৯৫! কী করে? অবশ্যই সৌজন্য গ্ল্যাক্সো তথা অরিন্দম! রেজাল্ট দেখে আমি নিজেই চমকে চৌষট্টি! তাতে গ্যাস খেয়ে অতি উৎসাহী হয়ে হায়ার সেকেন্ডারিতে সায়েন্স নিতে গিয়ে অবশ্য মাস দুয়েকের মধ্যে ৪২ অল আউটের মতো ভরা়ডুবি হয়েছিল কেমিস্ট্রি ক্লাসে ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ আর ফিজিক্স ক্লাসে ‘ঘুণপোকা’ পড়লে যা হয়! অঙ্ক ক্লাসে পাতার পর পাতা কবিতা লিখলে যা হয়!

সেন্ট জেভিয়ার্সের প্রবাদপ্রতিম ফাদার হুয়ার্ট ভাগ্যিস তিন মাস পরে আমাকে ইকো-স্ট্যাট-ম্যাথস স্ট্রিমে অ্যালাও করেছিলেন আবার ম্যাথস? কী করব, আর সাবজেক্ট ছিল না যে!

এ বার হায়ার সেকেন্ডারিতে অঙ্কে কত? এমনিতে ফার্স্ট ডিভিশন, কিন্তু অঙ্কে ২০০-র মধ্যে ৪৩! বুরুন তুমি অঙ্কে তেরোর চেয়ে ভালো তো বটেই! গর্বিত হওয়ার মতো, বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখার মতো রেজাল্ট! 

গ্ল্যাক্সো ছাড়া স্কুলে সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল পার্থ দীপ্ত জ্বলজ্বলে চোখ, চমৎকার ফুটবল খেলত, গায়ের রঙটা কালোর দিকে ছিল বলে নাম হয়ে গিয়েছিল কেলটে আজও খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কলকাতার ফর্টিস হাসপাতালের অত্যন্ত নামী ডাক্তার গ্ল্যাক্সো চমৎকার বাংলা লেখে, একটা উপন্যাসও লিখে ফেলেছে সম্প্রতি পার্থও লেখে দারুণ কোভিডের দিনলিপি বলে ফেসবুকে যে লেখাগুলো লিখেছিল, বড় ভালো সেসব লেখা আমরা তিনমূর্তি একটা সময়ে যে সব দিন কাটিয়েছি, অরিন্দমদের একডালিয়া প্লেসের বাংলো টাইপ বাড়ির প্রতিটি ইঁট সেসব জানে অরিন্দমের মা মানে আমাদের কাকিমা এখনও বেঁচে, আমাদের বহু অত্যাচার কাকিমা হাসিমুখে সহ্য করতেন

সে যাই হোক, গত বছর যখন সেকেন্ড ওয়েভের সময়ে হঠাৎ কোভিড হল, চারপাশে শুধু মৃত্যুর খবর, যথারীতি পার্থের নম্বরে ডায়াল করলাম ‘শোন না, আমি পজিটিভ বুঝলি ভাইরাল লোড কী একটা সেভেনটিন বলছে মানে কী রে? মরে যাব? বলবি?’

উল্টোদিকে খিকখিক হাসি ‘মরে যাবি? ফোট! যা বলছি শোন হোয়াটসঅ্যাপে যা যা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, আনিয়ে নে! একটা স্ক্যান করা তার পরে রিপোর্টটটা আমাকে পাঠা আর সিনেমা-টিনেমা দ্যাখ চাপ নিস না মাচ ডিজার্ভড ব্রেক বুঝলি

‘খুব ভয় করছে রে টেঁসে যাব মনে হচ্ছে!’

পার্থ আবার হাসে, ‘সে তো প্রতিবার অঙ্ক পরীক্ষার আগে তুই টেঁসে যেতিস মনে নেই?’

মনে আবার নেই? অক্ষরে অক্ষরে, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মনে আছে পরের ২১ দিন পার্থ যে ভাবে আমার সঙ্গে ছিল, তা ঠিক লিখে বলার কোনও মানে হয় না এখন আর অঙ্ক করতে হয় না কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় দেখি অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির মোটা মোটা বই দোকানি জিগ্যেস করে, ‘নেবেন দাদা?’ 

ওরে বাবা! আমি ফুটপাথ বদল করে নিই বরং ধ্যানবিন্দুর স্টলের দিকে যাই কিংবা দে’জ বা সিগনেট

আমার কৈশোরের দিনগুলোয় অঙ্ক খাতার প্রতি খাতায় এই সব রহস্য ছিল, ছিল নিষিদ্ধ সব সোনার খনি ইন্দ্রজাল কমিক্স আবার চলে আসছে মাথায় জাদুকর ম্যানড্রেকের গল্পে একেবারে শেষে প্রেমিকা নার্দা জিগ্যেস করত ম্যানড্রেককে— কী করে করলে? 

ম্যানড্রেকের মুখে থাকত অদ্ভুত একটা হাসি তার পর কী বলতেন?

‘জাদুকররা কখনও বলে না!’

ঠিক তেমনই আমিও কিছু বলি না শুধু সোম থেকে শনি, দিনগুলোকে গড়িয়ে দিই যাক না, যে দিকে খুশি যাক! 

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ১

উ প ন্যা স । পর্ব ১

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

রেজিস্ট্রেশানের সময় বানান ভুল করে ফেলেছিল ক্লার্ক নবীন খান্না, মুখে পান সত্ত্বেও পরশ্রীকাতর ফিকে হাসি, ঠোঁটের কোনায় লালচে ফেনা, পেটের ভেতর কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে চলেছে ফিনফিনে পাপড়ি, টাকের জেদি কয়েকটা চুল ফ্যাকাশে, আলস্য দেখে মনে হয় যেন ঠাকুমার পালঙ্কের পাশে হাঁটু গেড়ে সম্পত্তির আশায় সময় কাটাচ্ছে ।

তখনও পর্যন্ত জংধরা টাইপরাইটার সরিয়ে ঝকঝকে কমপিউটার আর ঝুলেল টুনিবালব নিভিয়ে কুয়াশাময় সিএফএল ঢোকেনি সরকারি দপ্তরে ।

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের জন্মদিন কে নিশ্চিত করবে; করল একটা ভুল, যেমন নামের ভুল, ভুল লেখা হল বার্থ সার্টিফিকেটে, তোর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি, হ্যাপি নিউ ইয়ার আর হ্যাপি বার্থডে ।

কত মজার, না? উঁহু, তুই বলবি, মোটেও মজার নয় ।

দিল্লিতে প্রথম আষাঢ়ের ফোঁটায় ফোঁটায় ভেজা সকাল, গাড়ির কাচে ওয়াইপার নিজের মনে গাইছে, মুছে দাও মুছে দাও মুছে দাও ।

 

চিরুনিধার বৃষ্টিতে, ভুরুকোঁচকানো হাওয়ায়, সমস্ত ডানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে আকাশ থেকে।

রুলটানা শুকনো অশথ্থপাতা ওড়ে। নারকেল পাতার ওপর কাকগৃহিণীর বলাশয়।

ফুটপাতের বালিতে জল সেঁদোবার রিনরিন রিনরিন রিনরিন রিনরিন।

শোনা গিয়েছিল অন্ধের পা রাখার আওয়াজ। বৃষ্টির টুপটাপে সময় পড়ার শব্দ।

ভাসিয়ে নিয়ে গেলি ধাঁধার উড়ন্ত মেঘের পালকে শুয়ে চাই চাই চাই চাই, তোর দাবি।

 

যায়নি মোছা, মুছতে পারিনি রে।

কত জরুরি ছিল মুছে ফেলা।

জগদীশ ব্যানার্জি তখন পানিপথে পোস্টেড, এজিএমইউ ক্যাডার বলে হার্ড পোস্টিঙ ঘুরে এসে আমি দিল্লিতে প্রথম পোস্টিঙে, ওকে বলেছিলাম আসতে, তোকে পছন্দ করার জন্য।

জগদীশ ব্যানার্জির নতুন টাকের ফিকে উঁকির ওপর বৃষ্টি, খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করছে বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টি আমার ভালোলাগে, মাত্র কয়েকটা তো ফোঁটা, আদর করতে করতে গড়িয়ে চলে যায় বুকে, পেটে বা আরও তলায়।

আমরা দুজনে, বৃষ্টির পিছু ধাওয়া এড়াতে, প্রায় দৌড়ে ওদের হলঘরে ঢুকতেই, প্রথমে তুই-ই চোখে পড়লি, তোর খিলখিল হাসি, এক বছর বয়সেই। অন্য বাচ্চাদের চেয়ে তোর পা লম্বা, নজরে পড়ে গিয়েছিলি, সবার চেয়ে ঢ্যাঙা।

কোলে তুলে নিলাম তোকে । 

এটা সেই মুহূর্ত, যা সবায়ের জীবনে আসে, এমনই এক মোড়, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া যায় না, সবুজ প্রতিভা, সুরের গমক, মায়া; নিজের অবস্হান এক মুহূর্তের মধ্যে নির্ণয় করে ফেলতে হয়। আমি অনুপ্রাণনা-তাড়িত পুরুষ, ঠিক সময়ে যথার্থ নির্ণয় নিতে না পারলে জীবনের ভারসাম্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে, এরকমটা মনে হয়, শেষে জমে-থাকা হতাশা হয়ে উঠবে অত্যন্ত কষ্টকর, ভবিষ্যতে কি হবে আঁচ করে নির্ণয় ঝুলিয়ে রাখতে পারি না।

 

স্পর্শের মর্মার্থ হয়, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস। প্রতিরোধে ক্ষয়ে অনড় ঝর্ণাপাথর। জিওল মাছের নিঃশব্দ ছটফট। তোর মতো তোর মতো তোর মতো করে নিয়ে গেলি আমাকে আমার আমি থেকে ছিঁড়ে।

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

 

তোর নাকে নাক দিয়ে আদর করেছিলাম, গালে আর নাভিতে চুমো খেয়েছিলাম, উসকে দিয়েছিলাম তোর খিলখিল, পাখিদের গান শুধরে দেবার হাসি, খাঁজকাটা রোদ্দুরের ডালে-ডালে দোয়েল-কিশোরীরা স্বরলিপি ভুলে যায়, পায়ের তলায় আদর করতে পা গুটিয়ে নিয়েছিলি, ওঃ, তোর সেই মিডাস টাচ।

তোর নাম আমি রাখতে চেয়েছিলুম নীতি, আসলে ওটা আমার ঠাকুমার নাম; উনি আমায় সবচেয়ে বেশি আদর করতেন, খাওয়ার পরও জানতে চাইতেন, কি রে খাওয়া হয়েছে?

 

নকশিকাঁথা, আমসত্ব, শেতলপাটি, তামার পয়সা, গোবিন্দভোগ, কুমড়োবিচির মেঠাই, রেড়ির তেলের গন্ধ, কুপির আলো, পুকুর, ধানখেত, টিয়াপাখি। রামধনু গড়তে শিখছে আকাশ। গাছের ছায়া কিনে নিয়ে গেছে পাইকার। পায়ের শিরায় মাইল-পাথরের স্হায়ীত্ব। ঠাকুমা।

 

একটা ইংরেজি ‘ই’ বাদ পড়ায় তোর নাম হয়ে গেল নেতি; শুনেছি, বন্ধুরা তোকে নেটি নাটি নাট করে দিয়েছে, তা তো আমার দোষ নয়।

শুনেছি, তোর একাধজন ক্লাসমেট খুনসুটি করে নেটা বলে ক্ষ্যাপায়, নেটা মানে শিকনি। তুই একেবারে গা করিস না, তাও শুনেছি, তোর এক সহপাঠিনীর অভিভাবকের কাছে, আমার সঙ্গে সেও তখন পুডুচেরিতে পোস্টেড, কাঁধ শ্রাগ করে নাকি বলিস, সো হোয়াট, আই’ল স্টিক ইট টু ইওর আস, ক্লাস ফোর থেকেই ।

জগদীশের স্ত্রী অমরিন্দর, কখনও হরিয়ানভি জাঠ ছিল, বিয়ের পর মাছভাত খেয়ে, জামদানি পরে, দুর্গাপুজোয় গরদের শাড়িতে সিঁদুর খেলে, জলসায় গলাকাঁপা বাংলা গান গেয়ে, পুরোপুরি বাঙালি, তোকে নিত্তু বলে ডাকে, জানি, নিত্তু বেটি, কি খাবি, বাংলা না পানজাবি রেসিপি, সরসো কা সাগ উইথ মক্কি কি রোটি, ছোলে ভাটুরে, রাজমা চাওয়ল। বলেছে জগদীশ, চেককাটা লুঙ্গিতে বাইফোকাল পুঁছে।

তুই বলতিস, নো নো, আন্টিমা, আমি মাছ ভাত খাবো, মুড়িঘন্ট বানাও না, আঙ্কলবাপির ফেভারিট। শুনেছি।

জগদীশের বড় মেয়ে বৈদেহী বিরক্ত হতো, এতো সাধাসাধি কিসের? যা সবাই খায় তা-ই খাবে । পরে মানিয়ে নিয়েছিল, তোর আপন করে নেবার বৈশিষ্ট্যের আদরে। তোর আয়ত্বে আছে গোপন উষ্ণমণ্ডল, শুনেছি।

অমরিন্দরের বিয়ের সময়ে ঝামেলা করেছিল ওদের এক ভঁয়সাপেটা জাঠ পঞ্চায়েত কর্তা; জগদীশ সিলকের পাঞ্জাবি খুলে, পৈতে দিখিয়ে হেঁকেছিল, আমি হলুম বাঙালি ব্রাহ্মণ, স্যারজি, ব্যানার্জি, সবচেয়ে উঁচু ব্রাহ্মণ ।

ওদের ষণ্ডাদের ব্যানার্জির হাঁটু ছুঁয়ে সে কি পরনাম, পরনাম, পরনাম । এও শোনা, বলেছে অমরিন্দর ।

পৈতেতে বুড়ো আঙুল জড়িয়ে বাপের বয়সী ভুঁড়োদের পাগড়িতে হাত রেখে জগদীশ বলেছিল, জিতে রহো পুত্তরজি, ফুলো ফলো, পিও পিলাও ।

বিয়ে হল, বিয়েতে মদ খেয়ে ব্যাণ্ডবাজিয়েদের তালে-তাল নাচ হল, জগদীশ যৌতুকে পেল গুড়গাঁওয়ে জমি, যার ওপর ও দোতলা বাঙলো তুলেছে, আর ঘুষের টাকায় তাকে ক্রমশ ফিল্মসেটের মতন করে ফেলেছে, মায়াবি। ঘুষের টাকায় কলকাতায় নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে, অমরিন্দরের নামে, মায়াবি। চণ্ডীগড় ছেড়ে বেরোতে চায় না, তাই। ছুটিতে বোতলক্রেট গুড়গাঁও কিংবা যেখানে আমি বা কোনো বাঙালি কলিগ পোস্টেড; থ্রি চিয়ার্স।

ঘুষের টাকা নেবার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে আর বছর দুয়েক পরে বন্ধ করে আবার অন্য অ্যাকাউন্ট খোলে; কখনও নিজের নামে, কখনও অমরিন্দরের নামে, কখনও শিডুল্ড ব্যাঙ্ক, কখনও প্রায়ভেট ব্যাঙ্ক, কখনও আরবান কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, কখনও টয়লেটের লফ্ট ব্যাঙ্ক, কখনও পুজোর ঘরের ফাঁপা দেয়ালে আনারকলি ব্যাঙ্ক।

গলা অব্দি কুয়াশায় ডোবা মানুষের নাম না-পালটাতে পারার মজাদার অসুখের আনন্দ। চাঁদবণিক প্রায়ভেট লিমিটেড বললে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। প্রতি বদলির বিদায় সম্বর্ধনায় একই বক্তৃতা দ্যায়, লিখে রাখা আছে।

সকালে স্নানের পর গামছা-কোমর জগদীশ, টাকের চুল ফুরিয়ে গিয়ে করোটিতে রূপান্তরিত, বাঁহাতে পেতলের ছোটো ঘন্টিতে টুংটাং, ডানহাতে দুশো এম এল গঙ্গাজল, গ্যাঁদাপাপড়ি, দরোজায় দরোজায়, সংস্কৃত মন্তরের ফিসফিস, বৈশাখ জৈষ্ঠ আষাড় শ্রাবণ ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণ পৌষ মাঘ ফাল্গুন চৈত্র, কিছুটা ঝুঁকে, যেন সময়ের সঙ্গে বেমানান আধ্যাত্মিক কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার ।

পুজোর ঘর পাথর-মাটি-কাঠ-পেতলের দেবী-দেবতায় ছয়লাপ, দেয়ালের পেরেকে-পেরেকে কুড়ি-পঁচিশ বছরের পুরোনো বাংলা ক্যালেণ্ডারের দেবী-দেবতা, থাক-থাক পাঁজি, পুজোর বই, পাঁচালি, পিলসুজ, পুজোর ন্যানো সাইজের থালা-ঘটি-বাটি, রুপোর; হেসে, গলার লাল শালুতে শালিগ্রামশিলা ঝুলিয়ে, বলেছিল ওর পার্টটাইম পুরুত অবিনাশ ভট্টচাজ্জি, যে নিজেই গজগজ করে দেবী-দেবতারা সংস্কৃত মরা ভাষা থেকে আজও বেরোতে পারেনি, বুঝতে পারে না কোন বিসর্গের কি অর্থ।

জগদীশের জ্বরজারি হলে, অমরিন্দর, কালোর চেয়ে কালো কলপে ভেজা চুল, কোমরে এক গামছা বুকে আরেক, আজও জিগ্যেস করে, এর পর কোন মন্তর? গামছা যায় কলকাতা থেকে, বাঙালি জুনিয়ার অফিসারদের দৌলতে । অবশ্যই লাল, অবশ্যই সবচেয়ে বড় মাপের, যদিও অমরিন্দরের জাঠনি বুক ঢাকতে পারে না সে-গামছা, পেটে সিজারিয়ানের কাটার দাগ উঁকি দিয়ে ঝোলে । তিন বছর লেগেছিল শাঁখ-বাজানো শিখতে, শুনেছি।

কী করে আপনাদের পরিচয় হল, অমরিন্দর তো দু-এক ইঞ্চ লম্বা, জানতে চেয়েছিলাম ।

জগদীশ বলেছিল, ভাঁজের প্রতিভায় ছিল সীমাভাঙার টান, জগদীশেরই দপতরে, পানিপতে, এসডিও অফিসে এসেছিল কোনো কাজে । ব্যাস, বাস্তববাদিনীর উদ্যমের  সঙ্গে বলগাছেঁড়া কল্পনা ; দেহের আনাচে-কানাচে টই-টই জাঠনির অবিমিশ্র উপঢৌকন ; ধুলোয় মোচড় দেয়া গন্ধ । জাঠনির মতো উরু পাবেনা ভারতে ; মোষের দুধ-দই খায়, গোরু একদম নয়।

পানিপতের রঞ্জক গোলাপ, সাদা গোলাপ, লাল গোলাপ, হলুদ গোলাপ, কমলা গোলাপ, গোলাপি গোলাপ, কালো গোলাপ, ইরানি গোলাপ, মিরিন্ডা গোলাপ ; শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম, চোখ কলম । আহাআহা। দেহজুড়ে চুমুর দাঙ্গা ।

 

সংবেদনশীল আলোড়ন, জলসিক্ত উড়ন্ত ছাতা ।

শান্তির মৌনতা হাওয়া থেকে হাওয়ায়, স্হান থেকে স্হানান্তরে ।

উতরোল কোলাহল।

 

অমরিন্দর:  যাক ওই করওয়া চৌথের জুঠঝামেলা থেকে বাঁচলুম, না খেয়ে থাকো সারাদিন, ওসব আমার দ্বারা হবে না, চালুনি দিয়ে বরের মুখ দেখে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে আমি সিঁদুর-খেলা খেলে তাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখব। বরকে বরং আলুর পরোটা, মেথি-শাকের পরোটা, পুদিনার পরোটা, বেসনের পরোটা, কিমার পরোটা খাওয়াবো, সিঁদুর খেলা থেকে ফিরে, ঘিয়ে চপচপে পরোটা। করওয়া চৌথ হল চালুনি কারখানাগুলোর কারসাজি; নয়তো কবেই বন্ধ হয়ে যেত, পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়ে এখন বের করেছে প্লাস্টিকের চালুনি।

সাহেবরা চাঁদে গিয়ে গোসল করে এলো, সেই চাঁদের দিকে তাকাও, মানে হয় কোনো, অ্যাঁয়জি !

জগদীশ: কিন্তু তুমি লাঞ্চ আর ডিনারে কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খাবার অভ্যাস ছাড়তে পারলে না।

অমরিন্দর: তোমার শুঁটকি মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারি, আর তুমি কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ সহ্য করতে পারো না? প্যার মোহব্বত প্রেম ভালোবাসা হল গন্ধের আপোস। বাজারে পেঁয়াজ না এলে হরিয়াণার সরকার উলটে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বাজারে মাছ না এলে কি সরকার ওলটায়?

জগদীশ: অমন কখনও হয় না, মাছ আসবেই, বাঙালি মাছ খাবেই, যত দামই হোক, সরকারকে ফেলবে না। সেখানে সরকার পড়ে মাৎস্যন্যায়ে।

অমরিন্দর: তোমরা বাংগালিরা পরৌনঠাকে পরোটা বলো কেন, অ্যাঁয়জি?

চাবির ঘোলাটে ফুটোয় যাবৎজীবন চোখ। অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে-আনা সকালের বিকল্প।

সান্নিধ্যের নৈকট্য ঘিরে অফুরন্ত অবসর। প্রেম-টিকলিং নিড়ুনি।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলো পর্যন্ত বেরোতে পারেনি।

জগদীশ আর অমরিন্দর আমাকে ব্রো-প্রো বলে ডাকে, এল বি এস ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে ট্রেনিঙের সময় থেকে আমাকে সকলে ব্রো-প্রো করে নিয়েছে, ব্রাদার প্রভঞ্জন । জগদীশ আমার চেয়ে পাঁচ বছরের সিনিয়র, ঘোঁৎঘাঁত বিশেষজ্ঞ । ও ঠিক খবর রাখে  কখন বিরোধীদলে চলে যাবার কথা চিন্তা করছে সকালবেলার সূর্য ।

তুই কি কখনও আমার নাম জানতে পারবি নেতি ?  

আমার গোপন কোষাগারে তোর নাম নেতি থেকে ইতি করে নিয়েছি; তুই জানিস না, জানতে পারবি একদিন, যখন আমার উইলে তোর নাম থাকবে, আমি এতদ্বারা আমার স্হাবর ও অস্হাবর সমস্ত সম্পত্তি নেতি ওরফে ইতি ব্যানার্জিকে । তেমনই তো ভেবে রেখেছিলাম রে ।

পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তার আগেই সব জেনে ফেলেছিলি; তোর গায়ে গোখরোর ঠাণ্ডা রক্ত। কোনো যুবতীর গা এত ঠাণ্ডাও হয় ! প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র শিরায়-শিরায়, রসতরঙ্গিনী তুই। তোর দুই হাতে অ্যানাকোণ্ডার দমবন্ধ করা পাকের পর পাকের পর পাকের পর পাক, উফ কি ঠাণ্ডা, আঁস্তাকুড়ের হেমন্তের শীতেল জঞ্জালের জাপট।

চব্বিশ বছরের শ্যামলী দীর্ঘাঙ্গী, জানি না কেমন দেখতে হয়েছে তোকে, খুঁজে বেড়াচ্ছিস তোর নামকরণকারীকে, জন্মদিন নির্ধারণকারীকে, যেন তোর অস্তিত্বকে সেই লোকটা করায়ত্ব করে গুমখুন করে লুকিয়ে রেখেছে নিশুতি রাতের পোড়োবাড়ির সিঁড়ির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে।

শিমুলের পাকা ফল ফেটে রোঁয়া উড়ছে, তুই তাদের ধরতে চাইছিস, শিমুলের লাল টকটকে ফুলগুলো শুকিয়ে তৈরি করেছে রোঁয়াবীজ, সেগুলোকে উড়িয়ে চলেছে দূরান্তরে, কোথাও গিয়ে অঙ্কুর তুলে লুকিয়ে গাছ হয়ে উঠবে, বসন্তের আকাশকে রাঙিয়ে দেবে ।

তুই কি চাস না যে বিশাল একটা শিমুলগাছ সবুজ মুকুট মেলে আকাশের চিরনবীন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছুঁয়ে দেখুক, মেখে নিক বসন্তের উদাসীন রক্তাক্ত তাড়না, বল তুই?

আমারই মস্তিষ্কে ওই গাছ পুঁতে দিবি, রোঁয়া উড়বে, আঁচ করিনি। তুই মারাত্মক। বৃষ্টি ফোঁটারা কি হলুদ পাতার রঙ তুলতে পারে, বল তুই? মোম-আলোয় শ্যামাপোকা নাচতে ভোলে না।

প্রেপ থেকে তোকে ভর্তি করা হল নৈনিতালের সেইন্ট মেরি কনভেন্ট হাই স্কুলে, বোর্ডিঙের অঢেল, সিসটাররা ছাত্রীদের সুখসুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন, স্কুলের রেজাল্টও ভালো হয় প্রতিবছর । ফিস বেশি হলেই বা, আমার মাইনেটা আছে কি জন্য ! ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত টানা পড়লি সেখানে । ব্যাস, জিভে সেই যে কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি ঘাঁটি গাড়ল, তা কখনও ছাড়ল না তোকে । এও শোনা, সূত্র অমরিন্দর, টেলিফোনে, আমি তখন পোর্ট ব্লেয়ারে ।  

জগদীশের মেয়ে তোর চেয়ে চার বছর সিনিয়র, ও কি জিভে অক্সব্রিজ কনভেন্টি ইংরেজি জড়াতে দিয়েছে? বলেনি কেউ, কেনই বা জানতে চাইব, বল? আমার আগ্রহের কেন্দ্রে তো তুই। ওই স্কুলের বোর্ডিঙেই তো ছিল বৈদেহী।  

কত ইচ্ছা করছিল, তবু ভর্তির সময়ে আমি স্কুলে যাইনি, কিন্তু নৈনিতালে গিয়েছিলাম, উদ্বেগ, উদ্বেগ, যাতে তোর অ্যাডমিশানে অসুবিধা না হয় । এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের দপ্তরের পর আমি তোকে আর চাক্ষুষ দেখিনি, কেবল ফটোতে যা । তারপর থেকে, জগদীশের মেয়ে আর ছেলেকেও দেখিনি। ওদের বাড়িতে আমি যাই না, তোর কারণেই যাই না ।

এনজিওর মনোবিদ তনজিম হায়দার বলেছিল, আপনি নেতির সামনে কখনও যাবেন না, স্মৃতিতে আপনার মুখ থেকে যাবে, খুঁজবে আপনাকে, শেষে আপনাকে না পেলে ডিসগ্রান্টলড আর রিভেঞ্জফুল ফিল করবে; আপনি তো তা চাইছেন না। অচেনা একজন মানুষ ওর সমস্তকিছু ফানডিং করছে জানতে পারলে হীনম্মন্যতার দোষ ফুটে উঠবে চরিত্রে ।

আমি চেয়েছি তুই বোল্ড হয়ে ওঠ। তাই বলে এরকম বোল্ড, অ্যাঁ?

শাদা ঘোড়া, কেশর হাওয়ায়, দৌড়োচ্ছে, সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে, ওই দূরে সূর্য, ওই দূরে পূর্ণিমার চাঁদ, দৌড়চ্ছে ঘোড়া, ওই দূরে ঝড়, ওই দূরে বৃষ্টি ।

ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ… মরুভূমিতে ঘোড়ারা দৌড়োলে বালি ওই শব্দকে শুষে নেয়।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may goddyo

কারাবাসের কবিতা । পর্ব ৩

বি শে ষ  র চ না । পর্ব ৩

ডঃ রূপক বর্ধন রায়

rupak2

কারাবাসের কবিতা: বাংলা অনুবাদে ব্রায়টেন ব্রায়টেনবাখ

( গত সংখ্যার পর )

[‘কারাবাসের কবিতা’ ধারাবাহিকের বর্তমান পর্বটি আজকের অন্ধকার দিনে দাঁড়িয়ে লেখা রণজিৎ অধিকারীর সূর্যের মতো কবিতাগুলোকে উৎসর্গ করলাম]

ব্রায়টেনবাখ-এর “The True Confessions of an Albino Terrorist” বইটায় মোট তেরোটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটা কবিতারই অনুবাদক Denis Hirson। এই সংখ্যায় সেই বই থেকেই তিনখানা কবিতার বাংলা অনুবাদ করা হল।

লেখাচুরি

১৬/৯-এ তার জন্মদিনে

একটা লোক নিজের জন্য একটা কবিতা বানালো-

ও, ঘর আর ছড়া আর ছন্দ আর ইয়াম্ব 

আর জিনিসপত্র, বা একটা নিস্তব্ধ কোলাহল বা একটা খোঁচানোর হাড়

অথবা অন্যান্য কাব্যিক টুকিটাকি দিয়ে এক অভিনব ব্যাপার নয়-

বর্তমান সময়ের মত সামান্য পরিস্থিতিতে 

নয়, পাহাড়-শোষা-চোখ, স্থির প্রহরগুলো, তারা-সহ-গাছ,

স্ত্রী ও সমুদ্র গত- দুঃখজনকভাবে

সমস্ত উপাদান অনুপস্থিত;

তবুও; চতুর্পাশে অদরকারী এটা-সেটা অবশ্যই ছিল-

চেঁছে ও ঝেড়ে নিয়েছিল ও, যা খুঁজে পায় তা নকল করে

আর নিজের নিঃশ্বাস দিয়ে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট

কিছু একটায় পরিণত করতে চেষ্টা করেছিল-

এমনকি মরুভূমিতেও জিভটার নিজের ছায়া থাকে;

এরপর প্রথমে লোকটা নিজে, তার কাঁধের উপর কুঁজ-

কুঁজখুলি বুড়ো, দাম্ভিক বেবুন,

(তবে সর্বনাশ ইতিমধ্যেই তার শুক্রাণুতে জীবিত – ওটা মৃত্যুর শিল্পের অংশ)

আর এরপর তার হাতের উপরের সাদা চুলগুলো, আর মাছিটা

(আমার নামাঙ্কিত স্তালিন) কারণ একটা খুপরির সর্বস্বে

ওটা সত্যিই এক মেঘ, আর মাসুল-হীন ছুঁড়ে দেওয়া আরো কিছু শব্দ-

১৬/৯ তাকে শক্তি ও আশিসে 

নিয়ে আসে, একের বিরুদ্ধে দশ, অভিন্ন- 

আর ছুটে বেরোনোর সময় তাকে তার প্যান্টকেও

কবিতায় এনে ফেলতে হয়- অনেকের পরা

বেঁটে খাকি হাফপ্যান্টগুলো, এই এখানে কোমরের অংশগুলোয়

অ্যাপেন্ডিক্সের ক্ষতচিহ্নের মত বেগুনি কাপড় সেলাই করা

চামড়ার উপর আংশিক গজিয়ে ওঠা কলঙ্ক, আর তাকে 

বাক্যের শেষে পৌঁছনোর সাহায্যে, নিষ্কলঙ্ক স্টীলে 

তৈরি হাতলে ‘সর্বোচ্চ’ দাগানো (চিবোনো?) চামচটা

(‘আমি অপবিত্র! অপবিত্র!’) (এক মৃত্যুশীল বাহুল্যে ও ভাবনাটাকে গেঁথে বের 

করে)

আর এরপর ছিল এক-পা-ভাঙা-শরীর টেনে আনা পিঁপড়েটা

যেটা কে-জানে-কোথা থেকে ভুলপথে এসেছিল

আর যতিচিহ্নের মত অনুভূতিহীনতার সময়ে

প্রেমের-স্মৃতি

 

হাতের কাছে সমস্ত কিছু ব্যবহারের শেষে

পরে সেই সন্ধেয় ওটাকে স্পষ্ট ভাবে লিখে ফেলার উদ্দেশ্যে

ও সেটাকে পরিষ্কার কাগজে সাবধানে মুড়ে ফেলে

কিন্তু রাত্রি নাগাদ যখন সে উপহারের মোড়ক খোলে

অভিশপ্ত কাগজখানা ততক্ষণে কবিতাটাকে গিলে ফেলেছেঃ

আর লোকটা নিজের কুঁজ আকড়ে ধরে এবং অবিশ্বাসে গুঙিয়ে ওঠেঃ

‘আমার কবিতা, আমার কবিতা – এবার আমার ১৬/৯-এর জন্মদিনে

দেখানোর মতো কি থাকবে!’ 


ইয়াম্ব- একটি ছন্দবিশেষ 

 

শুরু থেকে

কবিতাটার শুরু থেকে আমরা আরো একবার

আগের সমস্ত সময়ের মতো

সমস্ত সময়ের শেষ সীমায় রয়েছি

 

তাকাও

এক অসভ্য বিনষ্ট অঞ্চল থেকে বেরিয়ে

বিশ্বাসযোগ্য যা আছে তাই নিয়ে

এইখানে আমি আমার পথে আসি

জীবনের কাঠ-ছাইয়ে ফুঁ দিতে আসি আমি

আমার ফাঁসিকাঠের আনন্দ আর দিনটার 

জন্য ঝোলা ভর্তি শব্দ নিয়ে আমি আসি

যখন মুখটা ধুলোর মত বোবা

তলোয়ারগুলোর খাপ লালাভ হয়ে জঙ ধরে

মাটির ভিতর কিলবিল করা 

মাছটা বা পোকাটাকে টের পেতে

মাটি আর ইস্পাতের শব্দ স্তবক 

আয়নার শিকড়ে ভরা পিরামিডগুলো

একটা কালো আর তিতকুটে দেশ থেকে

যেখানে শব্দটা কন্ঠ-ফল ও জিভ-খাদ্য

 

আমার ধমনীগুলোয় তলোয়ারজল আর বুলেটরস নিয়ে

এক টিলায় সওয়ার

আমার শরীরের আর আমায়

প্রয়োজন নেই

হাতে স্বত্ব

পাছা থেকে নির্গত দীর্ঘশ্বাস

আত্মা আমায় চালনা করে

ধ্যানে নয় প্রতিফলনে

দৃষ্টিতে নয় স্বীকৃতিতে

ঘোমটা ছিঁড়ে গেছে

আর আমি এক কালো ও অসভ্য দেশ থেকে বেরিয়ে আসি

বা আমি কি সত্যিই এখানে থাকতে পারি?


কারণ আসা অথবা যাওয়া

দুই-ই স্থায়িত্ব বোঝায়

 

জীবন আছে

গাছেদের গায়ের কাঁটায় আবদ্ধ যিশুরা আছে

অযৌক্তিকতায় আক্রান্ত বন্যতার মাঝে নবীরা

পূজারী যাদের চোখ ফোটে সূর্যের নিচে

ফিগ-ফল হাতে একপাশে আলোচনারত বুদ্ধেরা

 

মেঘেদের মধ্যে আছে ক্রমশ সবুজায়িত প্রাণ

আর ডলফিন যারা ঢেউয়ের মাধ্যমে ঝরে যায়

সিগালদের বিচলিত সাহসী চিৎকার

পাহাড়পাঁজরের গায়ে খসখসে খালি পা

 

বাড়বাড়ন্ত হাওয়ার পিছনে খাদের আগুনবক্তৃতা

সরতে থাকা নিস্তব্ধতার মত বরফের ঢাল

স্বর্গে যখন একচুল ফাটল ধরে

আর কালো রূপকথারা সোয়ালো-পাখি ডাভ বেরিয়ে আসে

 

হাড়েরা আছে যারা পৃথিবীকে বেঁধে রাখে

আর আনন্দ যা নশ্বরতা ভেঙে নির্গত হয়

আমি এক ভ্রান্তিকারী এক দিবাস্বপ্নদর্শী হতে পারি

আমি তবু দিনের উজ্জ্বল আলোয় সমৃদ্ধি পাবো

 

রাত্রিজুড়ে আঁশেরা জ্বলেছে

আমিও হয়তো কোনো একদিন বন্দী ছিলাম

কিন্তু এখানে হৃদপিণ্ডের কম্পন চুক্তি স্পষ্ট করা

হয়েছে; এখন থেকে একশো বছর পরে আমরা সবাই উলঙ্গ থাকবো

ক্রমশ

লেখক পরিচিতি :  GE Heathcare-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত, ফ্রান্স-এর নীস শহরে থাকেন। টার্কি-র সাবাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। এছাড়াও মার্কিন যুক্ত্রাস্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি ও পি এইচ ডির পর বছর খানেক জার্মানির ফ্রনহফার সোসাইটিতে সায়েনটিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। লেখালেখির স্বভাব বহুদিনের। মূলত লেখেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, সাহিত্য মনন নিয়েই। কলেজজীবনে বন্ধুরা মিলে “দেওয়াল” নামক কবিতা পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক বছর। এছাড়াও কবিতা, গদ্য প্রকাশ পেয়েছে একাধিক বাঙলা অনলাইন পত্র পত্রিকায়। লেখা লেখি ছাড়াও গান বাজনা, নোটাফিলি, নিউমিসম্যাটিক্সের মত একাধিক বিষয়ে রূপকের সমান আগ্রহ রয়েছে।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may kobita

লোপামুদ্রা রায় চৌধুরী

ক বি তা

লো পা মু দ্রা  রা য়   চৌ ধু রী

বয়ঃসন্ধি

“এম. এন. দত্তের টাইপ ইস্কুল
তার উল্টোদিকের একতলা বাড়িটাই আমাদের স্যার”–

সাইকেল থেকে নামলেন নবীন শিক্ষক।
রঙিন মাছের চৌবাচ্চা ঘেঁষে উঠোন,
বদ্রি পাখির খাঁচা
“দেখে স্যার, মাথায় লাগবে–“

পরিপাটি বিছানা
সোফা কাম বেডের ওপর ফুলছাপ বেডকভার
প্লাস্টিকের টেবিলে মলাট করা অঙ্ক বই,
বর্ণলিপি খাতা, নটরাজের জ্যামিতি বাক্স।

একটাই ঘর।
এজমালি বারান্দা থেকে ভাইয়ের অস্ফূট কান্না
“ঘয়ে দাবো, দিদিল কাচে দাবো”
ঘরের ভেতর বাধ্য ছাত্রী
মনোযোগী মাস্টারমশাই
কাচের প্লেটে দুটো মেরী বিস্কুট
চায়ের ওপর পাতলা সর
তরুণ শিক্ষকের সদ্য ওঠা গোঁফে
হালকা হালকা ঘাম–


এটুকুই

 

ধীরে ধীরে বালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে একটা জ্যান্ত শহর।

 

দহন যখন

জলের ভেতর লুকিয়ে রাখি
দগদগে ঘা, পোড়ারমুখী
ছটফটিয়ে বীজ নামালো
ধ্বংসস্তূপে, সেসব কালো
আলগা পিঠে ঠোঁটের মতো
শুষছে ফসল, দোয়েল-ক্ষত
খেতের বুকে, মাটির বুকে
অচেনা সেই আগন্তুকের
ডাক আসেনি, বয়স ছুঁলো
শস্য কাহন, ধুলোয় ধুলো
দুঃখী মাঠের শুকনো ঘাসে
বৃষ্টি নামুক, বৃষ্টি নামুক–
চৈত্র মাসে

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may bangladesher_kobita

সায়্যিদ লুমরান

বাং লা দে শে র  ক বি তা

সা য়্যি দ   লু ম রা ন

হাত রেখে সমুদ্রের গায়ে

হে প্রাচীন কচ্ছপ, আমাকে শেখাও ধীর পদক্ষেপ

পৃথিবীর ম্যারাথনে অংশ নিয়েই আমার দু’পায়ে এখন

ভীষণ আক্ষেপ,

ক্ষিপ্র চিতাবাঘ শিকারী বাজপাখি–

এমন’তো চাইনি হতে আমি!

আমার প্রতিজ্ঞা ছিল হাত রেখে সমুদ্রের গায়ে– 

প্রণয়ের পাড় ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে মাথা তুলে দেখব আকাশ, 

জল ছোঁবো পায়ে।

 

প্রতি কাপ রাত্রি

একটা দীর্ঘ রাত আমার নিকট এক কাপ কফির সমান

আমি পান করি প্রতিটি চুমুকে একটু অন্ধকার,

কিছুক্ষণ বিরতি নিই স্বাদের জাবর কাটি এবং 

ভাবনায় টেনে আনি নক্ষত্রের মতো অসংখ্য নেভা-জ্বলা

অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ

যেমন- ইঁদুরে খাওয়া আমার আনন্দগুলো

দু’পকেট ভর্তি দীর্ঘশ্বাস ও হতাশা

দূরবীনে সিন্দাবাদের দারুচিনি দ্বীপ…

এভাবেই চুমুকে চুমুকে নিঃশেষ কফির মতো প্রতি কাপ

রাত্রিও শেষ হয়, থেকে যায় রেশ।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may golpo

সৈকত ঘোষ

গ ল্প

সৈ ক ত   ঘো ষ

saikat

সেকেন্ড হানিমুন

সামনে সমুদ্র। একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। চোখের সামনে একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমা ধীরে ধীরে রক্ত মাংসে রঙিন হয়ে উঠছে। সবকটা রঙকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে অনিন্দ্য। নিজেকে বার কয়েক চিমটি কাটে। তারপর আরও দু-পা এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। পায়ের তলায় আবার সরে যাওয়া বালিগুলো এসে জমাট বাঁধছে। হাওয়ার ঝাপটায় কপালের ওপর থেকে সোনালি সাদা চুল এক ঝটকায় দুই-কুড়ি বয়স কমিয়ে এক অদ্ভুত ম্যাজিকে ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে উত্তাল যৌবনে। সময়টা আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিক। কলকাতায় তখন বামপন্থার জোয়ার। চারিদিকে লাল সেলাম, কমরেড কমরেড। ছাত্র রাজনীতিটা মনপ্রাণ দিয়েই করতো অনিন্দ্য। আর নেশা বলতে মিঠুনদা। বলিউডের বাঙালিবাবু। কি মুভস, কি অসম্ভব প্যাশন। এক একটা ডায়লগ আগুন, জাস্ট আগুন। ডিস্কো ডান্সার দেখে ফিদা হয়ে গেছিল অনিন্দ্য। এরকমটাও হয়! এই না হলে মশলা ছবি, মামুলি পেটো নয় পুরো অ্যাটম বোম। আত্রেয়ী অবশ্য এসব থেকে বহু যোজন দূরে। অনিন্দ্যর চেয়ে দু-বছরের জুনিয়র, যাদবপুর ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্ট। প্রেমটা কীভাবে শুরু হয়েছিল! সে সময়ের আর পাঁচটা সাধারণ প্রেমের মতো একেবারেই নয়। প্রথম মুখোমুখি ইউনিভার্সিটির ডিবেট কম্পিটিশন। সবাইকে চমকে দিয়ে পর পর দুবার ইন্টার কলেজ ডিবেট চ্যাম্পিয়ন অনিন্দ্যর হ্যাটট্রিকের স্বপ্নটা ফাতাফাতা করে দিয়েছিল আপাত নিরীহ সাদামাটা চুপচাপ একটি মেয়ে। আত্রেয়ী, নিখুঁত যুক্তি আর অসম্ভব ভালো প্রেজেন্টেশনে মারকাটারি বক্তা অনিন্দ্যও একেবারে ক্লিন বোল্ড। গল্পটা শুরু হতে অবশ্য আরও এক বছর লেগেছিল। প্রথম ছমাস ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ থিওরিতে অপেক্ষা করে অনিন্দ্য আর পরের ছমাস ওকে মিষ্টি করে ঝুলিয়ে রাখে আত্রেয়ী। 

দুই।

নীল আইল্যান্ডের এই নীল নির্জনের চেয়ে ভালো হানিমুন আর কী হতে পারে। আকাশ সমুদ্র আর এই নির্জনতার মাঝে এক অদৃশ্য প্রজাপতি, এ যেন এক নতুন আলোকবর্ষ। আত্রেয়ীর কপালে একটা আলতো চুমু খায় অনিন্দ্য। এই মুহূর্তটার জন্যই তো এতটা অপেক্ষা। ওদের কটেজ থেকে কয়েক পা মাত্র হাঁটলেই জল। কটেজটা ঠিক ছবির মতো যেমন ক্যালেন্ডারে থাকে। 

– শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়েটা হয়েই গেল, কি বলো…

অনিন্দ্যর কথাটা শুনে আত্রেয়ী ওর চোখের দিকে তাকায়। সে দৃষ্টি অদ্ভুত শীতল, যেন বর্ষার শেষ বারিধারা। হয়তো অনিন্দ্যর চোখের গভীরে আরও একবার নিজেকেই খুঁজে নিতে চায় আত্রেয়ী। হয়তো বা ডেস্টিনি…

– কি হলো, কি ভাবছো?

আত্রেয়ী হাসে, কোনও কথা বলে না। কিন্তু সে হাসিতে অনেক না বলা চলকে ওঠা দুধের মতো হঠাৎ ফুলে উঠে থিতিয়ে যায়। 

এজি বেঙ্গলে এই চাকরিটা পাওয়ার মাস ছয়েকের মধ্যেই অনিন্দ্যর বিয়ে। দু-বাড়িতে দেখে শুনে যেমনটা হয় সেরকম নয়। আত্রেয়ীরা ব্রাহ্মণ আর ওরা রায়, নমশূদ্র। সুতরাং দুই বাড়ির অমতে, তবে পালিয়ে নয়। একদম সবার চোখের সামনে সদর্পে বুক ফুলিয়ে সোজা আন্দামান। নির্বাসন নয় বিয়ে করতে। একান্তে। যেহেতু ডিসিশন দুজনের তাই ভালো-মন্দ সবটা দুজনের। শুধু দুজনের। আর তাই বিয়ে নামক এই বিশেষ দিনটিতে আর কাউকে কোট আনকোট অ্যালাউ করেনি ওরা। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে বিষয়টা মোটেও সহজ ছিল না। আজ ভাবতে অবাক লাগে। 

– চলো আর একটু এগোই

আত্রেয়ীর কথায় হঠাৎ ঘোরটা কেটে যায় অনিন্দ্যর। মনে মনে ভাবে বয়স হচ্ছে। মুখে বলে

– জানো, আজ খুব হালকা লাগছে। যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম…

কথাটা শেষ করার আগেই আত্রেয়ী ওকে নিজের দিকে টানে। কপালে আলতো করে একটা চুমু খায়। তারপর অনিন্দ্যর হাতটাকে শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে নেয়।  

– কিছু কথা কখনও বলতে নেই, এই যেমন ধরো এই নির্জনতার ভাষা…

বলতে নেই, বুঝলে

শুধু উপলব্ধি করো, আমি বুঝি, সব বুঝি…

অনিন্দ্যর চোখের কোনটা চিকচিক করে ওঠে। আত্রেয়ীর আঙুলের সঙ্গে আঙুল। স্বর্গীয় এ স্পর্শ-সুখ। সাদা বালির ওপর একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। ঢেউ ভাঙছে আত্রেয়ীর বুকের ভিতরেও। একটা নিঃশব্দ বিপ্লব, জলে পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বালির ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজনে। সবকিছু থেকে দূর, অনেকটা দূর। 

তিন।

এই জানলাটা থেকে আকাশ দেখা যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা নিজের মতো করে। আঠেরোশো স্কোয়ারফিট ঝাঁ-চকচকে অন্যের সংসারের চেয়ে এই ঘরটা অনেক শান্তির। ছেলে যতই নিজের হোক, বৌমা কখনও নিজের হয় না। হাজার হোক অন্য গাছের ছাল। আর বাস্তবে বেশি ভালো ছেলেদের হয়তো কিছু করারও থাকে না। তা যাই হোক, গত এক বছর এই বৃদ্ধাশ্রমে বেশ চমৎকার আছে আত্রেয়ী। এটা নামেই বৃদ্ধাশ্রম, তবে ফেসিলিটির দিক থেকে বেশ কয়েকটা স্টার দেওয়াই যায়। একটু ইন্টেরিয়র হলেও কী নেই! বিরাট বড়ো বাগান একটা ছোট্ট পুকুর কতো গাছ কতো কতো পাখি। ভালো লাগে, শহর থেকে দূরে এই ছোট্ট একটা জগৎ। কোনও প্রশ্নোত্তরের দায়ভার নেই। সকালে উঠে একটু পায়চারি করে আত্রেয়ী। এই একটা বছরে এখানে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সখ্যতাও তৈরি হয়েছে। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। সারাদিন নানা অ্যাকটিভিটিতে কেটে যায়। খাবার দাবারের চিন্তা নেই, এদের সবকিছু একদম টাইমে টাইমে। মাঝে মাঝে নাতনিকে নিয়ে ছেলে আসে। দেখে যায়। আর ভিডিও কল তো আছেই। একটা বয়সের পর এই বেশ ভালো। সংসারে বোঝা হয়ে থাকার চেয়ে নিজের স্বাধীনে…এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রায়শই রাতে ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আর ঘুম আসতে চায় না। এক একদিন বই নিয়ে বসে। এখনও এই একটা অভ্যেস ওকে ছেড়ে যায়নি। ছেলে গতমাসে একটা কিন্ডেল দিয়ে গেছে। সব সময় সব বই তো পাওয়া যায় না। এই যন্ত্রটা বেশ ভালো যখন যা ইচ্ছে ডাউনলোড করে পড়া যায়। বয়স একষট্টি হলে কি হবে, টিপটপ আত্রেয়ীকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এই বয়সে যথেষ্ট আপডেটেড। মনের ওপর দিয়ে যতই ঝড় বয়ে যাক চেহারায় একটা আভিজাত্যের ছাপ তো আছেই। ছেলে আইটি প্রফেশনাল, ওয়েল এস্টাব্লিশ। আত্রেয়ীর এক কলিগের মেয়ের সঙ্গেই বছর পাঁচ আগে রীতিমতো দেখেশুনে সম্বন্ধ করেই একমাত্র ছেলের বিয়ে দেয় আত্রেয়ী। বিয়ের দু-বছরের মধ্যেই আসে দিয়া। মানে নাতনি। আর তার জন্মের ঠিক দু-দিন পরেই আরিত্রর বাবা মানে আত্রেয়ীর স্বামীর হঠাৎ মৃত্যু। আর তারপর একটা ঝড়ের মতোই জীবন তার গতিপথ বদলায়। নিজের হাতে গোছানো সংসার একদিন হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে যায়। হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম। আজ আর কোনও আক্ষেপ নেই। কিন্তু সত্যিই কি কোনও আক্ষেপ নেই! স্যুটকেস খুলে পুরোনো বেশ কিছু জিনিস বের করে আত্রেয়ী। একটা ডায়েরি, একটা পুরোনো এইচ এমটি হাতঘড়ি, বেশ কিছু ফটোগ্রাফ আর কয়েকটা চিঠি। এই শেষ বয়সে পৌঁছে সম্বল বলতে এটুকুই তো ওর নিজের। শুধুমাত্র নিজের। 

চার।

এই বয়সে আর একবার বিয়ে করার বেশ একটা মজা আছে যাই বলো। সেকেন্ড হানিমুন বলে কথা। আজকের দিনটা আমার জীবনের বেস্ট ডে। আমার তো এখনও মনে হচ্ছে সেই চল্লিশ বছর আগে আমাদের সময়টা থেমে আছে। জানো সমুদ্রের চোখে সত্যিই এক অদ্ভুত নেশা আছে। বড়ো গভীর। মায়াবী। বিশ্বাস হচ্ছে না! আমাকে ছুঁয়ে দেখো। সবকিছুই বড্ড আগের মতো। আত্রেয়ী ফিল করে, আজও একই রকম ভাবে ফিল করে অনিন্দ্যকে। সত্যিই কি ও আজও সেই সময়টা থেকে এগোতে পেরেছে! চল্লিশটা বছর কেবল একটা সংখ্যা মনে হয়। নীল আইল্যান্ডের সেই কটেজের বাইরে হাতে হাত রেখে বসে আছে দুজনে। সামনে সমুদ্র। একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। এই নির্জনতার ভাষা বড্ড পরিচিত দুজনের। অনিন্দ্যর কাঁধে মাথা রাখে আত্রেয়ী। সত্যিই বড্ড হালকা লাগে নিজেকে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জীবনের কাছে আর কীইবা চাওয়ার থাকতে পারে। 

ঘড়ির দিকে তাকায় আত্রেয়ী। রাত দুটো বাজে। এবার শুয়ে পড়তে হবে। নাহলে শরীর খারাপ করবে। কাল সকাল সাড়ে দশটায় ফ্লাইট। সাতটার মধ্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে বলেছে অভিষেক। অভিষেক এখানকার ম্যানেজার। খুব এফিসিয়েন্ট। সবদিক দিব্বি সামলায়। বিছানায় ওপর থেকে আবার সবকিছু যত্ন করে গুছিয়ে স্যুটকেসে ভরে রাখে আত্রেয়ী। বাথরুমে গিয়ে হালকা করে একটু চোখে মুখে ঘাড়ে জল দেয়। তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে পরপর দশটা ডিজিট লিখে ডায়াল করে…

পাঁচ।

অনিন্দ্য সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। হাওয়ার ঝাপটায় কপালের ওপর এসে পরে সোনালি সাদা চুল। পায়ের তলায় সরে যাওয়া বালিগুলো জমাট বাঁধছে আবার। হঠাৎ চারিদিকের নির্জনতা ভেঙে বেজে ওঠে মোবাইলটা। কিন্তু এখন এতো রাতে কে ফোন করবে! স্ক্রিনের দিকে তাকায়। একটা আননোন নাম্বার। রিসিভ করে বুকের কাছে ফোনটা ধরে। ফোনের ওপারে তখন কথা খুঁজছে চল্লিশ বছরের নির্জনতা। এই নির্জনতাটা দুজনেরই খুব চেনা…

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may goddyo

প্রচ্ছদ কাহিনী | মে সংখ্যা

প্র চ্ছ দ  কা হি নী

অ ভি ন ন্দ ন   মু খো পা ধ্যা য়

abhi

পশ্চিম মেদিনীপুরের তরুণ প্রজন্মের কবিতাচর্চার খন্ডচিত্র

কবিতাবৃত্তে প্রত্যক্ষ ভাবে জেলার কবিতা এবং মহানগরের কবিতা নামক কোনো বাইনারি না থাকলেও সূক্ষ এবং অস্পষ্ট ভাবে একটি রেখা থেকেই যায় একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই। যদিও স্থানভেদে কবিকে চিহ্নিত করা যায় কিনা এই নিয়ে চিরকালীন এক মতভেদ থেকেই গেছে। পক্ষে এবং বিপক্ষে বহু মত স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন বহুজন। এর কোনোটিকেই একবারে নস্যাৎ করে দেওয়া যায় না। কিন্তু স্থানমাহাত্ম্য যে কবির কবিতায় ছাপ ফেলে সেই নিয়ে অনেকক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ নেই। ধরা যাক প্রান্তিক এলাকায় বসে একজন কবি যখন লিখবেন তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেই স্থানের লোকাল ডায়লেক্ট, ট্যাবু, স্থানীয় প্রবাদ, দৃশ্যমান প্রকৃতি তার কবিতায় ঢুকে পড়তে প্রায় বাধ্য। আবার শহরে বসে লিখলে শহুরে যাপন, চর্যা, ঠেকের ভাষা ঢুকে যাওয়াই স্বাভাবিক। ঠিক এখানেই কবিকে সৎ এবং সাহসী হতে হয়। স্পষ্ট দৃশ্যমানতা এবং জীবনচর্চাকে অস্বীকার না করে, কোনো কৃত্রিম ভাষায় সওয়ার না হয়ে নিজের দেখাটুকুকে যে কোনো আঙ্গিকে এবং শব্দে প্রকাশ করা।

শিল্প এবং সাহিত্যচর্চার দিক দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা বরাবরই অন্য জেলার চেয়ে এগিয়ে থেকেছে বিভিন্ন সময়। সম্ভবত মেদিনীপুরের প্রথম কবি ছিলেন সুরেন্দ্রমোহন দে যাকে সবাই সু মো দে নামেই চিনতেন। ক্রমশ এই চর্চা বেড়েছে এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সাহিত্যও উন্নত হতে হতে পথ চলেছে। এই জেলাতে কবিতা চর্চা করেছেন প্রয়াত বীতশোক ভট্টাচার্য। নিয়মিত কবিতাকে নিয়ে এখনও কাজ করে চলেছেন প্রভাত মিশ্র, বিপ্লব মাজি, অচিন্ত্য নন্দী, সিদ্ধার্থ সাঁতরা, প্রদীপ দেব বর্মন, সনৎ দাস, সুনীল মাজি সহ আরো অনেক সিনিয়ার মানুষ যারা শুধু লেখার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে ক্রমাগত বিভিন্ন কাজে তরুণদের উৎসাহিত করে চলেছেন। কিন্তু পরবর্তী সামান্য কটি কথা যাকে মুখবন্ধও বলা যায়, তা শুধুমাত্র তরুণদের কবিতা নিয়ে। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায় পশ্চিম মেদিনীপুরের শূন্য এবং প্রথম দশকের কবিতাচর্চা নিয়ে।

নব্বইয়ের শেষে, শূন্য দশকের শুরু দিকে একঝাঁক তরুণ উঠে এলো তাদের শাণিত কলম নিয়ে। ঋত্বিক ত্রিপাঠী, স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত, রামকৃষ্ণ মহাপাত্র, নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়, প্রসূন কুমার পড়িয়া, রাণা দাস, অরুণ দাস, বিশ্ব বন্দোপাধ্যায়,  কমলেশ নন্দ, আনন্দরূপ নায়েক, সুমন মহান্তি, লক্ষ্মীকান্ত মন্ডল, দেবাশিস মহারানা, অভি সমাদ্দার, দূর্বাদল মজুমদার, গৌতম মাহাত সহ আরো বহু কবি যাঁরা বঙ্গকবিতার প্রবাহিত ধারায় আলাদা করে নিজেদের চিনিয়ে নিতে বাধ্য করলেন। লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে উন্মাদনা শুরু হলো হইহই করে। বদলে যেতে লাগলো কবিতার ভাষা। চলতে লাগলো দল বেঁধে কবিতা পড়তে যাওয়া, বইপ্রকাশ। বিতর্ক, মতভেদও পিছু ছাড়লো না । সব কিছু নিয়েই পশ্চিম মেদিনীপুরের শূন্য দশকের কবিতাচর্চা এগোতে লাগলো।

প্রথম দশকে পশ্চিম মেদিনীপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল লিটল ম্যাগাজিন আকাদেমি গঠন এবং তাঁকে কেন্দ্র করে নতুন কবিদের ঘূর্ণন। এই আকাদেমির সাথে জড়িয়ে গেল বহু তরুণ কবি যারা কবিতাকে ভালোবেসে নিয়মিত নতুন ভাষা, নতুন আঙ্গিকের চর্চা শুরু করলো। লিটল ম্যাগাজিন মেলাকে উপলক্ষ্য করে তরুণদের কবিতা ভাবনায় এলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উন্মাদনা স্তিমিত হয়ে আসা প্রকৃতির নিয়ম। এক্ষত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম হলো না। লিটল ম্যাগাজিন মেলা বন্ধ হলো। যাঁরা নেতৃত্ব ছিলেন তাঁরাও ক্রমে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হলেন।

ঠিক এই সময়ে যখন মনে হচ্ছিল এর পরে কারা তখনই কার্যত বাংলা কবিতায় সকলকে চমকে দিয়ে উঠে এলো একের পর এক নাম। যারা সাহসী, যারা কারুর মুখাপেক্ষী নয়, যারা প্রয়োজনে কবিতা নিয়ে সারারাত জেগে থাকতে পারে, আবার মহামারীর সময় মানুষকে সুস্থ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পাঠ আগ্রহ, কবিতা বিষয়ে সিরিয়াসনেস, অপঠিত অথচ শক্তিশালী কবিদের খুঁজে বার করে পড়া, মানুষের সাথে ব্যবহার, যে কোনো প্রলোভনকে এড়িয়ে চলার দক্ষতা, দ্রুত বিখ্যাত হওয়ার মোহহীনতা ক্রমশই অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দিলো পশ্চিম মেদিনীপুরের তরুণ কবিদের।

এবার দেখা যাক শালবনীর মধুপুর গ্রামের মৃণালকান্তি মাহাত কী কবিতা লিখছে।  ‘মহুল বিহা’ নামক কবিতায় সে লিখছে ‘ আজ থেকে আশি বছর আগে আমার ঠাকুমা প্রথম বিয়ে করে ছিল মহুল গাছকে’ কিংবা ‘সঞ্চয়’ কবিতাটি শেষ হচ্ছে এভাবে ‘ডুমুর গাছ, গোরুর বাথান, পুকুর আর কুমিরের আদ্দাশ নিয়ে যাব কর্মু-ধর্মুর সাথে’। খুব স্পষ্ট ভাবে তার যাপন এবং পারিপার্শ্বিকতা উঠে আসছে কবিতার শরীরে। সৌমেন শেখর ‘শীত’ কবিতায় লিখছে ‘তার শ্বেতাভ বস্ত্রের শিরায় ছুটে উঠেছে বৈরাগ্য ধ্বনি, অভিজ্ঞান আলো’।

গভীর অনুধ্যান লেখাটির অলঙ্কার। অনিরুদ্ধ ব্যানার্জী লিখছে ‘আমরা এই মফস্বলে থাকতে থাকতে / প্রেমিক হয়ে যাই।’ অমিত পন্ডিত-এর দেখাটুকু অসামান্য হয়ে উঠছে কয়েকটি লাইনে ‘ ইস্ক নামের পাখিটি গাইছে / নীল সুরে গাইছে / কাছে পিঠে কোনো নদী নেই / তবুও কেউ জল রঙের বৈঠা বাইছে।’ খুকু ভূঁঞ্যা-র আখ্যান মূলক লেখা আপনাকে বাধ্য করবে পুরোটা পড়িয়ে নিতে। একটি কবিতায় সে লিখছে ‘ মৃতের কোনো সহোদর নেই/ ফ্যাকাশে রোদ ডুবে যায়, গলায় মুন্ডুমালা’।  সন্তু মুখোপাধ্যায় লিখছে ‘ একটি পরিধির মধ্যে নিজেকে না আটকে / চোখ খোলো, ফুলকে ভালবেসে দ্যাখো’। সুজিত মান্না লিখছে ‘ বৃত্তের ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের বর্গ করছি; দেখছি একই চিৎকার নিয়ে / দীর্ঘকাল বসে আছি’ কিংবা ‘ভূমিকায় একা হয়ে পড়বে তুমি। মনে হবে নিজের অবয়ব যেন / তিরস্কারের ঝাঁক / অথচ/ যে কোনো মুহূর্তেই চোখ বুজিয়ে/ দুই তৃতীয়াংশ মেরুদন্ড বেচে দেওয়া যায়। ‘ অমিত বেরা লিখছে ‘ পবিত্র দুধ, তুমি এসে বসো এ ভাঙা স্তনে’। 

এভাবে অজস্র লাইনের উদাহরণ তুলে এই লেখা পূর্ণ করে দেওয়া যায়, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সবটুকু সম্ভব হয় না। এরা ছাড়াও অর্পিতা কুন্ডু, আকাশ রায়, রূপক সেনগুপ্ত, সোমা প্রধান, সুজাতা কয়াল, শায়েরি চক্রবর্তী, মৌপর্ণা মুখার্জী, সন্তু জানা, দীপক জানা, সায়ন্ন্যা দাশদত্ত, আগমনী কর মিশ্র, রোমা মন্ডল ব্যানার্জী, সূর্যকান্ত জানা, দেবলীনা সিংহ দাস, সুব্রত দাস, রোহন নাম্বিয়ার, রাজেশ্বরী ষড়ংগী, মধুমিতা বেতাল, কেশব মেট্যা, অর্থিতা মন্ডল, সুমিত মন্ডল, পবিত্র পাত্র, শশীভূষণ পাত্র, প্রসাদ মল্লিক, সন্দীপন বেরা, অসীম ভুঁইয়া, অর্ণব মন্ডল, মঞ্জু হেমব্রম, সৌতিক হাতি, রাখি দে পাঁজা, দোলন চাঁপা তেওয়ারি, নিসর্গ নির্যাস, ধনঞ্জয় দেবসিংহ সহ আরো বহু তরুণ-তরুণী অসামান্য কবিতা লিখে চলেছে বা ক্রমাগত লিখতে চেষ্টা করছে। স্মৃতির বেইমানিতে সব নাম উল্লেখ করা গেল না। এদের মধ্যে বেশিরভাগেরই প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। আপনারা এদের খুঁজে পড়বেন এটুকুই প্রত্যাশা। নির্বাচিত দশজনের কবিতা এই সংখ্যায় রইলো। কোনো নির্বাচনই নিখুঁত নয়। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে উল্লেখিত কবিদের নিয়ে হয়তো আরো দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ পাওয়া যাবে।

রামকৃষ্ণ মহাপাত্র
রাজেশ্বরী ষড়ংগী
নিসর্গ নির্যাস
অর্থিতা মন্ডল
আকাশ রায়
সুমিত মন্ডল
সৌমেন শেখর
মৃণালকান্তি মাহাত
খুকু ভূঞ্যা
শায়েরি চক্রবর্তী

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may goddyo

আবার রাণার কথা । পর্ব ৫

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৫

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

পুরাতন

এটা সেই পুরনো রাস্তা, যে পথে তুমি শ্মশানের পথে গিয়েছিলে, অন্য নতুন এক জীবনের সন্ধানে, আমরা পিছন পিছন শোকের জামা গায়ে হাঁটছিলাম, নীরবে। এই শোক ব্যাপারটাও অনেক পুরনো এক কুয়াশা, শোকের ভিতর দিয়ে পুরাতনী গান ভেসে আসে, আসে পুরনো বকুল গন্ধ। পুরনো শোককে নতুন করে গায়ে চাপিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। নতুন শোককে কাঁধে করে, নতুন শোককে আপনজন মনে করে আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম তোমার সঙ্গে। শোক যায় শোক আসে। নতুন শোকের কুয়াশার ভিতর দিয়ে চলেছ তুমি। গুনগুণ গান গাইতে গাইতে, নতুন কোনো আস্তানার সন্ধানে, পিছনে আমরা পুরাতন যুবকের দল, তোমাকে নতুন পথে এগিয়ে দিতে যাচ্ছি।

    পুরনো রাস্তার পাশে পুরনো সজনে গাছ তোমার চলে যাওয়া দেখছে, তুমি নূতনের দিকে চলেছ, সেখানেও তুমি একদিন পুরাতন হবে আবার। পুরাতন নূতনের দিকে হেঁটে চলেছে যেন –  পুরাতন গান পুরাতন অশ্রু পুরাতন বিরহ ও বেদনা চলেছে তোমার সঙ্গে – আমরা পিছন থেকে দেখতে পাচ্ছি তাদের। উহারাও তোমার যাত্রা পথের সঙ্গী। 

    সেই কবে নতুন হয়ে এসেছিলে পৃথিবীতে, নতুন চাঁদ দেখে অবাক হতে, নতুন বৃষ্টি দেখে আনন্দে লাফাতে, নতুন মা ও বাবা তোমার – নতুন দাদা দিদি বোন বন্ধুরা তোমায় এই নতুনের পথে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তুমি অবাক হয়ে দেখছিলে সব, প্রশ্ন করছিলে। নতুন চলেছিল অনেকদিন তোমার সঙ্গে, ধীরে ধীরে তুমি পুরনো হলে এই জগতে। তোমার মা বাবা পরিজনেরাও পুরনো হতে লাগল, তুমি সবাইকে চিনে ফেলেছ এতদিনে। সকলেই খুব ভাল, সকলেই পুরাতনের মতো সুন্দর ও গীতিময়। সবাইকেই তোমার পুরনো লিরিক মনে হতে লাগল। তুমি নতুনের সন্ধানে একদিন কবিতার কাছে এলে, নতুন কবিতা তোমাকে এক নতুন রেল স্টেশনে নিয়ে গেল, সেখানে নতুনে ছন্দেরা যাতায়াত করে চিরকাল। 

    তুমি যখন নতুন থেকে পুরাতন হয়ে উঠছিলে ধীরে ধীরে, সে এক কবির হয়ে ওঠা যেন। গায়কের হয়ে ওঠা যেন। তুমি হয়ে উঠছিলে। পুরাতনের কোনো অস্তিত্বের সঙ্কট নেই। সে তো আছেই নিরিবিলিতে, নিজের মতো, চুপিসারে। সে তো এই মহাজগতের এক অস্তিত্ব। কেউ হয়তো তোমায় নেমন্তন্ন করেছে মেয়ের বিয়েতে, কেউ হয়তো তোমায় অধিক গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে, তুমি তোমার পুরাতন বল্কল-গায়ে নিয়ে তখন প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছ। তুমি ‘হে পুরাতন’ হয়ে ঘরের কোণে চুপে থাকতে চেয়েছিলে। কথা তোমার নিভৃতে বয়ে যেত স্তব্ধতার মতো। তোমার মন পুরনো হতে হতে বিরক্তি-শূন্য ক্ষোভহীন দোষারোপহীন হয়ে পড়ে রইল জগতের এধার ওধারে। সবুজ ঘাসের আড়ালে, শ্যাওলার ঝোপে। উড়ানহীন এক পাখির মতো তুমি আকাশ দেখেছিলে একদিন ঘন বর্ষার দুপুরে। 

    বৃষ্টি কোথা থেকে আসে? সেও কি পুরাতন নয়? তুমি ভাবছিলে নিজের মনে। এই ভাবনা সুর হয়ে বাজছিল তোমার ভিতরে। সুরও কী পুরাতন নয়। হে সুর তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? সুর উত্তর করিল – বেদনা হইতে আসিয়াছি, ব্যথা হইতে, অভিমান হইতে – প্রাচীন অভিমান থেকে সুরের জন্ম। তুমি বৃষ্টি ধারার দিকে চেয়েছিলে অপলক। তোমার এই চেয়ে থাকা আরো পুরনো হয়ে যাবে এই বৃষ্টি ধারার ভিতর দিয়ে একদিন। 

    এটা সেই পুরনো শ্মশান। যেখানে তোমাকে আমরা নিয়ে এলাম, নূতন যুবকের দল। এই শ্মশানে প্রথম দাহ করা হয় এক প্রাচীন বট বৃক্ষকে। বট বৃক্ষকে দাহ করার সময় অনেক পাখি দাহের আগুনে পুড়ে যায়। অনেক পাখি ছিল সেই বটবৃক্ষের আশ্রয়ে। তোমার আশ্রয়েও আমরা ছিলাম এতদিন, তুমি পুরাতন থেকে নূতনের দিকে যাত্রা করছ। আমাদের শোক আমাদের বিয়োগ ব্যথাও পুড়ছে তোমার দাহতে। 

    অন্ত্যেষ্টির পর এক নতুনের জন্ম হয় যেন। চারিদিকে নতুনের আহ্বান। যে ঝড় উঠেছে আমাদের ভিতর, তাও যেন নতুন ঝড়। সবে জন্ম নেওয়া ঝড় সে তো তরুণ কবির মতোই নতুন ছন্দে লিখবে তার কবিতা। নতুন চিত্রকল্প নিয়ে হাজির আমাদের নতুন ঝড়, সে এক প্রশান্তির মধ্যেও নতুন বিপ্লবের মতো বয়ে যাচ্ছে আমাদের চিরস্থায়ী ব্যবস্থার ভিতর।

    নতুন ঝড়ে ভেঙে পড়ল আমাদের পুরনো স্তম্ভটি। বহু পুরনো এই স্তম্ভ যা আমাদের অনেক ভ্রমণের সাক্ষী। এই স্তম্ভে হেলান দিয়ে আমরা কত স্বপ্ন দেখেছিলাম একদিন, এই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা ভালোবেসেছিলাম তোমাকে, সবাইকে। সেই স্তম্ভ আজ ভেজে গেল নতুন ঝড়ের দাপটে। 

    স্তম্ভের নিচে চাপা পড়ে রইল আমাদের না লেখা চিঠি, না লেখা কবিতা, না জানানো প্রেমের কথা। পুরাতন ভেঙে যাওয়া স্তম্ভের ওপরে বইছে তখনো নতুন বেশে আসা ঝড় আমাদের।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may goddyo

উদাসীন তাঁতঘর | পর্ব ৮

ধা রা বা হি ক পর্ব ৮

প ঙ্ক জ   চ ক্র ব র্তী

উদাসীন তাঁতঘর

pankaj

জবাবদিহির টিলায় যদি উঠি

আক্ষরিক অর্থেই ছিটকে মেঝেয় পড়েছিল পাপোশের পাশে। ছিঁড়ে গেছে অনেকখানি। আমার এক মেধাবী বন্ধু বিরক্ত হয়ে ছুঁয়ে ফেলে দিয়েছেন বইটি কিছুক্ষণ আগে। আমি দরজা দিয়ে ঢুকে দেখতে পাই তাকে। কুড়িয়ে নিই সন্দেহের বশে। কবিতাসমগ্র। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। প্রমা প্রকাশনী। সেই প্রথম আমার অলোকরঞ্জনের কবিতার সঙ্গে সহবাস। কয়েকমাসের আচ্ছন্নতা। সেই বই শেষ হতেই আমি নিঃস্ব হয়ে যাই। বহুদিন আর কোনো বই পড়তে পারিনি। এমন স্মৃতিময় সহবাস আমাকে দরিদ্র করে দেয় অনেকখানি। ‘যৌবনবাউল’,’রক্তাক্ত ঝরোখা’ আর ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’র ঐশ্বর্য নিয়ে কতদিন একা একা পথ হেঁটেছে উনিশ বছরের এক উদাসীন বালক। কেবলই স্মৃতির ভিতর ঘাই মারে ‘একটি হাঁসের রাজ্যে হব আমি প্রসন্ন উদাসী।’ তার দুদশক পরে সে টের পায়এক অন্তর্ঘাত। পাঠকের অনিবার্য মুদ্রাদোষ। বুঝে ফেলে প্রথম বই কিংবদন্তি হয়ে উঠলে আজীবন সেই মুগ্ধ শবদেহ বহন করতে হয় একজন কবিকে। পাঠকের মুগ্ধতার এক বিপুল সন্ত্রাসের পাশে চুপ করে থাকতে হয় তাঁকে। আর তাই’যৌবনবাউল’পেরিয়ে দেখা হয়না এই বিশ্বগ্রামের বাসিন্দাকে। এই সুদূর ক্ষতর আজও কোনো শুশ্রুষা নেই।

প্রথম কাব্যগ্রন্থের অসামান্য গভীরতা, সহজ এক লোকায়ত সুর অলোকরঞ্জনের কবিপ্রতিভা অনুধাবন করার পক্ষে এক দুঃসহ বাধা।রিখিয়া, শান্তিনিকেতন আর কলকাতার ভৌগোলিক ব্যাপকতাকে ধারণ করে আছে এই বই শিল্পিত স্বভাবে আর লৌকিক চলনে। স্রোতের মধ্যে তিনি ধরতে চান’ধ্রুবতার আদল।’ অথচ আমরা ভাবলাম তিনি যেন এক শান্ত স্বরের আধ্যাত্মিক কবি। প্রাথমিক একটা অনুযোগ ছিল ‘কৃত্তিবাস’এর পক্ষ থেকে ‘অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতায় অস্থিরতা এবং চাঞ্চল্য দুই অনুপস্থিত।’ অথচ কৃত্তিবাসী ভণ্ড বিদ্রোহের পাশে অলোকরঞ্জনের দার্শনিক নির্লিপ্তিটুকুর নিবিড় পাঠ নিলেই বোঝা কঠিন নয় স্রোতের অভিমুখে তাঁর কবিতার চলন ধারণ করেছে সময়ের উত্তাপ ; ব্যক্তিগত চাঞ্চল্যের উল্লম্ফনে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।

যৌবনবাউল থেকে মুগ্ধ জাড্যতা সরিয়ে যদি তাঁর কবিতার যাত্রাপথ অনুসরণ করি তাহলে দেখব কত না বিচিত্র পথে এবং বিপ্রতীপে তিনি ধারণ করে আছেন সময়ের স্বর। ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ পেরিয়ে ‘জবাবদিহির টিলা’য় ধরা আছে স্বতন্ত্র এক পরিসর। বিভাব কবিতায় তিনি জানিয়ে দেন ‘দুদিকে খাটিয়া পেতে ঘুমিয়ে থাকে কাতারে – /কাতারে নরনারী তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথটাই আজ/আমার নিসর্গ।’ এখানেই ছোটো নির্ভার বাক্যের সংহত পাথুরে জমিতে উঠল বিদ্রুপের ছড়। ভ্রমণের ছলে আত্মবিজ্ঞপ্তির মিথ্যে জমিতে ফুটে ওঠে নাগরিক বিষাদ।

“আমার চেয়েও বড়ো?তার মানে বড়োর আড়ালে
এখন লুকোনো যাবে, নিজের নাগরিকতা,
এমন-কী স্বীয় মূল্যবোধ
লুকোনো সহজ হবে, আমার বন্ধুর
মৃত্যুকে ট্যুরিজমের সুরম্য জঙ্গম
অবসরে নিশ্চিন্ত লুকিয়ে
– বুক দিয়ে
সংগ্রাম না করে শুধু আপন-অহং আগলিয়ে-
অপরূপ বিমর্ষ আহ্লাদে
অশাস্ত্রীয় কোকাকোলা খেতে থাকি ছুটির বাগদাদে।”

চতুর্দশ লুইয়ের প্রাসাদ বা আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে আভিজাত্য আর সময়ের ব্যবধান অনেকখানি। শুধু এক জায়গায় চমৎকার মিল – ভৃত্যবর্গের আবাস একইরকম অস্বাস্থ্যকর,পরিসরহীন।’তাহলে কি অর্ধেকও উঠিনি’কবিতার শেষে এই শাণিত প্রশ্নভরা বিস্ময় কি সভ্যতার আব্রু খসিয়ে দিচ্ছে না অনবরত?

এ এমন এক সময় যখন কবির পক্ষে’সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা’থাকার কথা নয়। জরুরি অবস্থা বা নকশাল আন্দোলনে যখন ভারি হয়ে আছে চারপাশ তখন ‘বোধের পাখি’কবিও মনে করলেন ‘কবিতাকে শাশ্বতে ন্যস্ত রেখেও যুগাবর্তের সামিল হতে হবে।’ আর তখনই অলোকরঞ্জনের কবিতা হয়ে উঠল ‘চিরায়তের সঙ্গে সমকালীনের অন্তর্বয়নের সমাচার।’ তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত উচ্চারণের পক্ষপাতী- পাঠকের এই ভ্রান্তধারণার বিপরীতে দাঁড়ালেন কবি বহুমাত্রিক বহুমানুষের স্বর নিয়ে। তাঁর কবিতা বৃহত্তর অর্থে রাজনীতিকে ধারণ করল যার কেন্দ্রে মানুষ আর তার দেশকাল জড়িত সত্তা।আরেক দিকে অলোকরঞ্জনের কবিতায় ছড়িয়ে আছে পরিবার। তাঁর সম্পূর্ণতা রিখিয়া থেকে শান্তিনিকেতন এবং বহির্ভারতের কর্মজগতেও। এখানে তিনি বিশ্বনাগরিক, এক বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। _যৌবনবাউলে’র বুধুয়া,মহিম,তারিনীকাকা,ঝমরু বীতনিদ্র পিতামহ,ঠাকুমা সকলেই এই বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। একটি প্রান্তরের বিষণ্ণ আলো-ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা।

“মন্দিরের পাশে এক মঠ,
দিগ্বলয় হতে আরো আরো দীর্ঘ মনে হয় যাকে,
হাট বসেছিল কাল, আজ তার বিষণ্ণ বিরাট
শূন্য বুকে ঘুরে মরে একা একটি মা-হারা বাছুর,
সমস্ত দুপুর
খুঁজেছে সে মাকে
তারপর শুয়ে আছে বটের ছায়ায় মৌন রৌদ্রভারাতুর।”

অলোকরঞ্জনের কবিতার প্রধান এক সম্পদ চিত্রকল্প। কবিজীবনের প্রথম পর্বে দু-একটি রেখায় কত না সার্থক দৃশ্যচিত্র এঁকেছেন তিনি।’একটি ঘুমের টেরাকোটা’র মতো কবিতা হতে পারে তেমনি এক দুর্লভ সম্পদ।

“ট্রেন থামল সাহেবগঞ্জে, দাঁড়াল ডান পায়ে।
ট্রেন চলল। থার্ড ক্লাসের মৃন্ময় কামরায়
দেহাতি সাতজন
একটি ঘুমে স্তব্ধ অসাড় নকশার মতন ;
এ ওর কাঁধে হাত রেখেছে, এ ওর আদুল গায়ে:
সমবেত একটি ঘুমের কমনীয়তার
গড়েছে এক বৃত্তরেখা, দিগ্বধূর স্তন;
পোড়ামাটির উপর দিয়ে আকাশে রথ যায়।”

যাঁরা অলোকরঞ্জনকে শুধু এক নম্র গীতিকবি ভাবেন তাঁরা হয়তো খোঁজ রাখেন না তাঁর প্রজ্ঞাশাসিত মেরুদণ্ডের – কবিতায় এবং জীবনে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যসভায় ছুঁড়ে দেন সপাট জবাব। এমনকী বয়স তিরিশ পেরোনোর আগেই অগ্রজ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বিনীত সুরে জানিয়ে দেন ‘disturb করা কবিতার ধর্ম নয়।’পঞ্চাশের কবিদের অনেকের সময়টাই যখন আত্মবিজ্ঞাপনের তখন তিনি স্থিত থাকেন এই বিশ্বাসে :

‘কবিতা কবির চেয়েও বড়ো সংঘটন। কবি যদি নিজেকে কবিতার চেয়েও আকর্ষণীয় ও জরুরি করে তোলার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন, কবিতার কোনো উপকার হয় না তো বটেই, কবি সামাজিক উচ্চাশার চাপে তাঁর ক্রমমুক্তির সম্ভাব্যতাকে খুইয়ে বসেন।’

তাই অলোকরঞ্জন জনপ্রিয়তার বদলে চেয়েছেন প্রিয়জনতা। আজীবন স্থির ছিলেন এই বিশ্বাসে ‘আমি যাই-ই করি, সেই সুরটাকে মানবতন্ত্রে বাজিয়ে নেব।’ সেই সুর ‘যৌবনবাউলে’ আছে কিন্তু তাকে সম্পূর্ণত পেতে হলে আমাদের’জবাবদিহির টিলা’য় উঠতেই হবে। ফেলে আসতে হবে অলোকরঞ্জন সম্পর্কিত যাবতীয় অভিযোগ এবং মুদ্রাদোষ।

* ক্রমশ  

আরও পড়ুন...