Categories
2023_jan uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ৬

উ প ন্যা স । পর্ব ৬

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

ক্লাস টুয়েলভ ( দোলযাত্রা )

ইউ ফ্যাসিস্ট বাস্টার্ড বাবা

আজকে দোলযাত্রা, আমাদের ছুটি নেই। সিজনটা ভিষণ খারাপ। বাজে হাওয়া দিচ্ছে। আমার রুমমেট পামেলা ঝিংরণ পারমিশান নিয়ে বাড়িতে দোল খেলতে গেছে। সুতরাং দুই দিনের সুযোগ। তোমাকে ইম্যাজিন করে কী করলুম জানো ? রাতের বেলায় আলো নিভিয়ে, জামা-কাপড় খুলে ফেলে পুরো উলঙ্গ হয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম। চোখ বুজে নিজেকে বিছানার ওপর ঘষতে লাগলুম, এগোলুম, পেছোলুম। তোমার জন্যে আমি আমার জীবনের প্রথম অরগ্যাজম ডেডিকেট করলুম। হস্টেলে আমার ক্লাসে সবাই করে, আমিও শিখে নিয়েছি। আমি কিন্তু হাত দিয়ে বা কোনো জিনিস দিয়ে ম্যাস্টারবেট করি না। করলে আমি ভার্জিন থাকব না। ডিয়ার ফ্যাসিস্ট ফাদার অলমাইটি, তোমার জন্য আমি নিজেকে ভার্জিন রেখেছি। তুমি কি চাও যে আমি ভার্জিন হয়েই মরে যাই ? কবে দেখা দেবে তুমি ? কেমন দেখতে তোমায় ? তুমি বুড়ো নও তো ? বুড়ো হলে ভিষণ খারাপ হবে কিন্তু, ছিঁড়ে খেয়ে নেবো। তুমি কি আমার জন্যে তোমার ইম্যাজিনেশান ডেডিকেট করো ? কালকেও আরেকবার ডেডিকেট করব। আমি কি তোমার স্বপ্নে আসি, যেমন তুমি আমার স্বপ্নে আসো ? স্বপ্নে আমাকে কষে জড়িয়ে ধোরো, আমি তোমার বুকের চাপ অনুভব করতে পারব। তুমি যে মিথ্যাবাদী তা ধরে ফেলেছি, প্রেমিকরা অমন মিথ্যাবাদী হয় ; আসলে প্রেম তো এক ধরণের সন্ত্রাস, তাই না? তুমি কি নিজের প্রতি বিশ্বস্ত। চিন্তা কোরো না, ইনফেডেলিটি প্রেমিকদের সাহসী করে তোলে। আমি বলছি তুমি খোলোস থেকে বেরিয়ে এসো, আমি তোমাকে আগাপাশতলা চাই, এই চাওয়াকে যেন সেক্সুয়ালি ইনটারপ্রেট কোরো না। যেদিন দেখা হবে সেদিন আমি তোমার মাথায় এমন ঠুসে-ঠুসে উদ্বগ, অশান্তি, আশঙ্কা, আতঙ্ক, যন্ত্রণা ভরে দেব যে যতদিন বেঁচে থাকবে মাথার জায়গায় এক কুইন্টালের বাটখারা বইবে। আমি নিশ্চিত যে সবাই, তোমার পরিচিত মানুষেরা, তোমাকে ভিষণ নিরাশ করেছে, তাই তুমি আমার সঙ্গে বায়বীয় সম্পর্কে পাতিয়েছ ; ওভাবে স্মৃতিকে ধরে রেখো না, পশ্চাত্তাপ হবে, আমি তো রয়েছি, তোমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র নিরাময়। মনে আছে তো যে ইনসেস্ট ব্যাপারটা প্রকৃতির অবদান ?

নেতিস্মর ( যার  স্মৃতি নেই)

##

 

               চিঠি তিনটে পড়ার পর দুজনেই চুপচাপ বসেছিলাম কিছুক্ষণ। দুজনেই জানতে পারছিলাম কে কি ভাবছে। আমিই প্রথমে কথা বলা আরম্ভ করলাম।  

               আমি : তোর বাংলা হাতের লেখা খুব স্পষ্ট, স্ট্যাণ্ডার্ড টেন থেকেই রবীন্দ্রনাথের মতন হাতের লেখা রপ্ত করে ফেলেছিস।

                তুই : হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ; আসল প্রসঙ্গে এসো, কনটেন্টে, বিষয়ে, হ্যান্ডরাইটিঙের প্রশংসা করে পাশ কাটিয়ে বেরোতে চাইছ কেন, টেক্সট ডিকন্সট্রাক্ট করো, সম্পর্ক, রিলেশানসিপ, রক্তের খেলা।

                আমি : ডিকন্সট্রাক্ট আবার কি করব, জানি তো, তুই কোল্ড ব্লাডেড রিভেঞ্জ নেবার ফাঁদ পাতছিলিস, আমি তো তোর ভালোর জন্যই সবকিছু করেছি, আর নেতিস্মর লিখে জানিয়ে দিয়েছিস তুই কি বলতে চাস , ওয়ার্ডটা শুনিনি আগে।

               তুই :নেতিস্মর শব্দটা আঁস্তাকুড়ে পেয়েছিলুম, ইউ লায়ার লাভার, লুকিয়ে রিমোট কনট্রোল করে গেছ, আর এখন অ্যালিবাই খাড়া করছ, ইউ আর এ কাওয়ার্ড।

               আমি : বলে নে, বলে নে, মেটা তোর ঝাল, আমি ছাড়া কার কাছেই বা পুষে রাখা ক্রোধ, ক্ষোভ, আক্রোশ, দুঃখ, নিঃসঙ্গতা রিলিজ করতিস।    

               তুই আহত হলি আমার কথায়, কাঁদতে আরম্ভ করলি, ফুঁপিয়ে, সামলে নিলি, তারপর বললি, আমাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল কলকাতার এক আঁস্তাকুড়ে, আমি দিল্লির এনজিওর হাতে গেলুম কেমন করে গো, তুমি তো আমাকে দিল্লির সংস্হা থেকেই সেলেক্ট করেছিলে ?

                 আমি : ওঃ, বেশিরভাগ এনজিও বিদেশ থেকে ডলার-ইউরোর ধান্দায় যতো পারে আনওয়ান্টেড বেবিদের নিজেদের আওতায় আনতে চায় ; বিদেশীরা অ্যাডপ্ট করার জন্য ওদের কাছে আসে বা ওদের ফাণ্ডিং করে, বাচ্চাদের পড়াশুনা করাবার জন্য, স্বাস্হ্যের জন্য। দিল্লির এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড  চালায় একজন অবসরপ্রাপ্ত আই এ এসের স্ত্রী। ওরা অ্যাবানডণ্ড চিলড্রেনদের সংবাদের দিকে লক্ষ্য রাখে , তোর সংবাদ কাগজে পড়ার পর ওদের প্রতিনিধি কলকাতা পুলিসের সঙ্গে কথা বলে দিল্লি এনেছিল।

                 তুই : তুমি মাঝখান থেকে কি করে উদয় হলে ? তুমি স্পনসর করলেই বা কেন ? তুমি তো ব্যাচেলার ছিলে, ফ্যামিলি লাইফ শুরু করোনি, নেহাতই কাঁচা অভিজ্ঞতা তখন।

                 আমি : আমার কাছে চিঠি এসেছিল একটি গার্ল চাইল্ডকে স্পনসর করার জন্য। জানি না কে আমার ঠিকানা ওদের দিয়েছিল। আমি কিছু একটা ভালো কাজ করতে চাইছিলাম, চাকরিতে ঢুকেই তো চারিদিকে দেখছিলাম রাজনীতিকদের জোচ্চুরি আর লোকঠকানো, আমার কলিগরাও এই ধান্দায় প্রথম থেকেই ফেঁসে যাচ্ছিল, যেচে ফেঁসে যাচ্ছিল, যারা বিয়ে করেনি তারা মোটা ডাউরি হাঁকছিল, সে এক বিরাট নরক, আমি সেখানে এক টুকরো স্বর্গ গড়তে চাইছিলাম, আর ব্যাস, পেয়ে গেলাম তোকে। জগদীশও পড়েছে গিয়ে ওই নরকে, তাই জন্যেই ও হরিয়ানা ছেড়ে যেতে চায় না ; মন্ত্রিদের তেল দাও, তাদের কথামতো চলো আর আনলিমিটেড কালোটাকা রোজগার করো।

                 তুই : ভাগ্যিস দিয়েছিল ; নয়তো বাচ্চাগুলো কোথায় যাচ্ছে, তাদের শেষপর্যন্ত কি হচ্ছে, তার ফলো আপ হয় না। আমিও পড়তুম কোনো বাজে ফ্যামিলির খপ্পরে।

                 আমি : হ্যাঁ, তুইও তো নিজেই যেচে আমার খপ্পরে পড়তে এলি। নীতি আমার ঠাকুমার নাম, তাই আমি ওই নামটা বেছেছিলাম, কিন্তু রেজিস্ট্রেশানের ক্লার্কটা গোলমাল করে একটা ই বাদ দিয়ে তোকে করে দিলে নেতি।

                তুই : স্বর্গে সামান্য নরকের নুন-মিষ্টি থাকা দরকার, নয়তো বিস্বাদ লাগতো, তোমার আমার দুজনের রসায়নই। আমি নেতি আর তুমি ইতি, ব্যাস, প্লাস-মাইনাসের যোগফল যা হয়, কী বলো।

                আমি : ইতি বলিস বা ইটি বলিস, যা ইচ্ছে হয় বলিস। ওগো, হ্যাঁগাও বলতে পারিস।

                তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দ্যাট ইজ এ গুড ওয়ান। না, তুমি আমার ড্যাডি, আমি তোমার বেবি এলেকট্রা, ড্যাডি বলেই ডাকব।

##

   

               এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

               যেন এমন, যেমন অমন, যেন তেমন নয়।

##

 

                তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আরে, ফোটো দ্যাখো দ্যাখো, তুমি কোলে নিয়ে আমার গালে চুমো খাচ্ছ ? তখনই চুমো খেয়ে নিয়েছিলে তাহলে ?

                আমি : খেয়েছিলাম, অনেক চুমো খেয়েছিলাম, গালে, পেটে। পেটে ফুঁ দিয়ে হাসিয়েছিলাম , কত হাসতিস খিলখিল,  আমি তোর ন্যাপিও চেঞ্জ করেছি কয়েকদিন।

               তুই : ওঃ, সব জায়গায় হাত দেয়া হয়ে গেছে ; তাই মনে হচ্ছিল, হাতটা, ঠোঁটটা যেন চেনা-চেনা লাগছে। এখন আরেকবার পেটে ফুঁদিয়ে হাসাতে পারতে।

               আমি : তুই অ্যাস্ট্রনট হতে চাইছিলি, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাইছিলি, বাচ্চা নিয়ে কি করে সামলাবি?

               তুই : সব ব্যাপার ইনডিয়ান পার্সপেক্টিভে ভাবো কেন ? যারা অ্যাস্ট্রনট তাদের কি ওয়াইফ বা হাজব্যাণ্ড বা বেবিজ নেই ? আমার ইনটারভিউটা পড়ে বলছ, বুঝেছি। কয়েকটা রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছি, পিয়ার অ্যাপ্রুভড, আরও কিছু করতে হবে।

               আমি : তুই স্নান করে নিয়েছিস ?

               তুই : পাগল নাকি ! প্রেম করব বলে প্ল্যান করে তোমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষা করছিলুম, পাউডার পারফিউম মেখে নিয়েছিলুম, লিপ্সটিক লাগিয়ে নিয়েছিলুম, ব্যুরোক্র্যাট বিশ্বামিত্রের চেস্টিটি বেল্টের তালা খোলার পণ করে বসেছিলুম। চলো তোমাকে চান করিয়ে দিই। তুমি আমার ডায়াপার চেঞ্জ করতে, আমি তোমার গায়ের ময়লা ঘষেমেজে তুলি। তোমার পিঠে যথেষ্ট ময়লা জমে আছে, নাকের দুপাশে ব্ল্যাকহেড ফুটে উঠেছে, তোমার পাও বেশ নোংরা।

               আমি : চল, ওই ঘরের বাথরুমে চল, ওটা বড়ো। স্ক্রাবার আছে। ভাগ্যিস তুই আমেরিকান মেয়েদের মতন গায়ে ট্যাটু করাসনি ; আমার একেবারে ভালো লাগে না কারোর গায়ে উল্কি আঁকা দেখলে।

               তুই : ধ্যুৎ, ট্যাটু আবার কি করাব ! তামাটে চামড়ায় কেউ ট্যাটু করায় না।

               আমি : তামাটে নয়, তোর ত্বক হল উজ্জ্বল।

               তুই : থ্যাংকস ফর দি মিথ্যেকথা। চুলটুল না কামিয়ে তুমি কিন্তু রিয়্যাল হিম্যান। আজকাল বুকে বগলে কুঁচকিতে পুরুষরাও চুল রাখছে না; পুরুষের গা থেকে পুরুষ হরমোনের দুর্গন্ধ না বেরোলে আকর্ষণ গড়ে ওঠে না, মনে হয় ডলফিন।

               ঘরে ঢুকে, দেখলুম তোর বাক্স খুলে বিছানার ওপর পোশাক টুকিটাকি ছড়িয়ে রেখেছিস, জিগ্যেস করলি, দেয়ালে ওটা কার ফোটো গো ?

              বললুম, চিন্তা করিসনি, ওটা আমার মায়ের।

              তুই : কোনে রাখা গিটারটা ?

              আমি : ওটা আমার, কলেজে বাজাতাম।

              তুই : দারুণ হবে, তুমি গিটার বাজাবে আর আমি গাইব, আমার পেনডিং সঙ্গীত সেরিমনি।

              আমি : গিটার বাজালে আর গান গাইলে পাশের বাংলোয় ‌ভাণ্ডারির মেয়েরা শুনতে পাবে,  আর ওরা দেখতে আসবে, যে আজ অচানক প্রধান সাহেবকো হো কেয়া গয়া, এক লড়কি গা রহি হ্যায় অওর গিটার বজা রহি হ্যায়, কৌন হ্যায় ইয়ে লড়কি ? আমার বাংলোয় তরুণী কেউ তো কখনও আসেনি।

               তুই : তাহলে নেক্সট হলিডেতে কোথাও বাইরে চলো, দূরে, ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে গিটার বাজিও আর আমি গান গাইব।

               আমি : মার্কিন গান ? এদিকে ধানের খেত পাবি না, পাবি কালো টাকায় কেনা ফার্মল্যাণ্ড।

               তুই : না, না, আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারি, আমেরিকায় বাঙালিদের অনুষ্ঠানে গাই।

               আমি : বারবার আমেরিকা বলছিস, শহরের নাম বলছিস না তো ? কোন রাজ্যের কোন শহর,  কোন রাস্তা, অ্যাঁ?

               তুই : হুঁ হুঁ, আমি যেমন তোমাকে লোকেট করার জন্য খেটে মরেছি, আমি চাই আমি চলে যাবার পর তুমিও সেরকম মরো, তোমার তো লোকবল আছে, কানেকশান আছে, সরকারি যন্ত্র আছে, চেষ্টা চালিও ; আমার ডিসপোজালে কিছুই ছিল না মিস্টার আগামেমনন, কিছুই ছিল না, কাঠের ঘোড়ায় লুকোনো সৈন্যসামন্তও নয়, জাস্ট একা, বুঝেছ, জাস্ট একা। আর আরশুলাকে ঠিক ধরে ফেলেছে টিকটিকি। খুঁজো, আমাকে খুঁজো।

               আমি : কেনই বা খুঁজব তোকে ?

               তুই : যেদিন যাব সেদিন বলব। রিভেঞ্জ, রিভেঞ্জ, প্রতিশোধ হল সবচেয়ে সুন্দর শিল্প ; প্রত্যেক মাসে আমি রক্ত ঝরাই, কেন ? প্রতিশোধ হল নলেন গুড়ের সন্দেশ।

##

               এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

               যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।  

##

 

               আমি :আচ্ছা, বাথরুমে চল আপাতত। আমি কিন্তু শর্টস পরে নিচ্ছি, বেশ এমব্যারাসড ফিল করছি এভাবে, অভ্যাস নেই তো।

               তুই : তুমি যাও, আমি একটা জিনিস নিয়ে আসছি। আমারও অভ্যাস নেই, তো তাতে কি। যা-যা করলুম, তার কি অভ্যাস ছিল নাকি, করলুম তো, বিন্দাস, তোমার জন্য।

               আমি শাওয়ারের তলায় টুলের ওপর বসেছিলাম, তুই হাঁটুগেড়ে আমার সামনে বসলি, নেকেড, শাওয়ারের তলায়, একটা আঙটি হাতের তালুতে রেখে বললি, আমি নেতিস্মর আঁস্তাকুড়বাসিনী, আজ দ্বিপ্রহরের এই ঝরণাতলায়, তোমায় প্রোপোজ করছি, তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে ?

              বলে,  আমার উত্তরের অপেক্ষা করলি না, বাঁহাতখানা নিয়ে অনামিকায় পরাবার চেষ্টা করলি আঙটিটা, ঢুকল না, তর্জনীতে ঢুকল, বললি, ভালো হল, ওয়েডিং ফিংগারের চেয়ে ডিজিটাল ফিংগার উপযুক্ত, ডিজিটাল ফিংগার ছাড়া প্রেম হয় না, অর্জুনের ডিজিটাল ফিংগার ছিল সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট ; অতগুলো মহাকাব্যিক প্রেমিকাকে হ্যাণ্ডল করা সহজ ব্যাপার ছিল না।

               উঠে দাঁড়িয়ে, বললি, কি কোলে তুলে নিলে না, ছোটোবেলায় তো নিয়েছিলে, নাকে নাক, গালে ঠোঁট ঠেকিয়েছিলে।

               ডিবেতে দেখলাম তনিষ্ক লেখা।        

              পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে জিগ্যেস করলাম, কখন কিনলি, যখন এসেছিলি তখন তো দোকান খোলার টাইম হয়নি।

              গলা জড়িয়ে ধরলি, আমি তোর নাকে নাক গালে ঠোঁট ঠেকাতে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, হাসতে হাসতে বললি, আমি পরশু এসেছি, হোটেলে উঠেছিলুম, তোমার লোকেশান সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্য রিকনাইসান্স ভিজিট করে গেছি, গেটে দেখে গেছি প্রভঞ্জন প্রধানের নাম।

                ডিটেকটিভ এজেন্সি বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, আর আন্টিমায়ের অ্যাকাউন্ট ট্রেইল করার সময়ে, তোমার অ্যাকাউন্টও ট্রেইল করেছিল, আর সেখান থেকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডকে আজও যে টাকা পাঠিয়ে চলেছ তা জানিয়েছিল আমায়; আমি কালকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড-এর পরিচালক মিসেস সোমপ্রীত কৌরের সঙ্গে দেখা করেছি, পরিচয় দিয়েছি, কিন্তু ওনারা তোমার সঙ্গে হওয়া কনট্র্যাক্ট আর আঙ্কলবাপির এফিডেভিট দেখতে দিলেন না, সিক্রেট ডকুমেন্ট।

                ফোটো দেখালেন, ফাইলে, তোমার কোলে, যে ফোটোর কপি রয়েছে তোমার আলমারিতে, প্রায় সেইরকম কয়েকটা ফোটো, নাকে নাক, গালে ঠোঁট। অ্যাকাউন্ট ট্রেইল না করলে তোমার পরিচয়, বাড়ি, এনজিওর ঠিকানা পেতুম না। সরি ফর দি ইনট্রুজান। তুমি আমার লাইফে ঢুকেছ, আমি তোমার লাইফে ঢুকলুম, শোধবোধ। ওকে ?

               ওরকম হাসিসনি, হাসলে তোর বুক দুলে দুলে উঠছে, আর আমি ডিস্টার্বড ফিল করছি, ওদের বাড়িতে থাকার ফলে তোর বুক-পাছাও হয়ে গেছে জাঠনিদের মতন, নিয়ন্ত্রণহীন।

               থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট ড্যাড।

               আঙটিটা দামি, হিরের, কত ক্যারাট রে ? কিন্তু আমার কাছে তোকে দেবার মতন আঙটি তো নেই, কিনে দেবো, কি বল ?

               না, না, ধ্যুৎ,ওসব করতে হবে না, আমরা এনগেজমেন্ট করছি না, ইউ আর মাই ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি রিমোট কনট্রোলার, ওই আসনেই থাকো।

                নামিয়ে দিলাম তোকে শাওয়ারের তলায়।

                হঠাৎ জিগ্যেস করলি, এর আগে চুমো খেয়েছ কাউকে ?

                বেফাঁস বলে ফেললুম, হ্যাঁ। স্মৃতির চোট খেয়ে কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকত ভেসে উঠেছিল।

                তোর মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, কথাটা শুনে চকিতে বদলে গেল অভিব্যক্তি, এক বর্ণনাতীত ক্রোধ ফুটে উঠল, কোমরে দুহাত দিয়ে, নেকেড, তুই জিগ্যেস করলি, কে সে ?

                টের পেলাম, মারাত্মক ভুল  করে ফেলেছি, যৌনসম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা কত যে জরুরি।

                এসে পর্যন্ত তোর এই রূপ যে লুকিয়ে রেখেছিস, জানতে দিসনি, রগের পাশে উঁচু হয়ে উঠেছে শিরা।

                কাছে এসে, বাঁহাত দিয়ে আমার বুকে ঠেলা মেরে বললি, কে সে, অ্যাঁ, কে সে ?

                আমি দ্রুত কি উত্তর দেব ভাবছি, ডান হাত দিয়ে বুকে ঠেলা মারলি, বললি, কে মেয়েটি ?

                আবার বাঁহাতে ঠেলা মারলি, আমি দেয়ালে পিঠ, দ্রুত একটা উত্তর খুজছি, মগজকে বলছি, দাও দাও, তাড়াতাড়ি যোগাও মনের মতন উত্তর। তোর ঠেলাও উপভোগ করছি, দেয়ালটা আরেকটু পেছনে হলে আরও কি-কি বলতিস জানতে পারতাম।

                তুই, আরও ক্রুদ্ধ, আবার বুকে ঠেলা মেরে বললি, আর কি-কি করেছ ?

                নাম কি ?

                অপেক্ষা করতে পারোনি ?

                আমি তো বড়ো হচ্ছিলুমই, না কি, অ্যাঁ ? হলেইবা বয়সের ডিফারেন্স !

                তিন তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, পড়লে তো, তবে ?

                এত তাড়া কিসের ছিল ?

                তোমার জন্যই যে আমি তা কি জানতে না ?

                তোমার নামের মেহেন্দি লাগিয়েছি কেন দুহাতের চেটোয় ?

                দ্যাখোনি লাভ ব্যাঙ্গলস পরে এসেছিলুম ?

                তোমার কাছে এলুমই বা কেন, অ্যাঁ ?

                হোয়াই আই ওয়াজ সিইং ইউ উইদাউট সিইং ইউ ফর মোর দ্যান টু ডিকেডস, বলো, বলো?

                বলো, বলো, বলো, বলো,বলো, চুপ করে থেকো না, কি কথা নেই কেন ?

                প্রথম রক্ত আর প্রথম স্পার্মের বেবি চেয়েছিলুম আমি, জানতে না ? সেক্স নয়, বেবি, তোমার বাচ্চা চেয়েছিলুম, উইদাউট ব্লেমিশ, জানতে না ?

##

                এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

                যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

                অন্ধকারে, অন্ধকারে, অন্ধকারে, কেননা তোর দেহ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়।

                বানভাসি, বানভাসি, ভাসিয়ে নিয়ে সাগরে, কূলকিনারাহীন।

##

               তোর অভিব্যক্তির ভেতর যে বার্তা আবিষ্কার করলুম, তা হল, আমি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারি ভেবে তুই সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে গেছিস, যেন  কখনও কেউ তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, আর তাদের কারাগারের কথা চিন্তা করলেই মগজে ছড়িয়ে পড়ছে উষ্মা।

                আমার মুখের কাছে তোর ঠোঁট হুইস্কির গন্ধের কাছাকাছি নিয়ে এলি, একটা উত্তর আপনা থেকে বেরোলো, দুর্গন্ধের স্মৃতি থেকে, প্রথম চুমুতে ছিল ইনটারপ্রেটার-ট্রানস্লেটারের হাঁ-মুখের দুর্গন্ধ, ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর খাবার পরিণাম, বললাম, হ্যাঁ, আমি একটা ছোট্ট মেয়েকে চুমু খেয়েছিলাম, বহুকাল আগে তাকে কোলে তুলে, নাকে নাক ঠেকিয়াছিলাম, নাভিতে ফুঁ দিয়ে কাতকুতু দিয়েছিলাম।

               আশ্চর্য, যত দ্রুত রেগে গিয়েছিলি, তত দ্রুত তোর উগ্রতা প্রশমিত হয়ে গেল; ফিরে এলি দ্যুতিময়তায়।

                হাত ধরে শাওয়ারের তলায় টেনে নিয়ে গিয়ে বললি, সরি, তোমার ওপর আর কারো অধিকার, তা আংশিক হলেও, আমি মোটেই বরদাস্ত করব না, যথেষ্ট নিষেধ মাথা পেতে নিয়েছি, আর নয়। 

               শান্ত গলায় বললি, জানো কি সাইক্লোনের নাম মেয়েদের নামে হয় ? ক্যাটরিনা, লায়লা, নিলম, হেলেন, নিশা ? আমার নামে আছে তোমার দেয়া সুপার সাইক্লোন।

                টুলের ওপরে গিয়ে বসলাম ; মগজে তখন ভাবনার জেলি তৈরি হয়ে চলেছে, তাহলে কি আমি হেরে গেলাম, তোর সামনে কখনও না গিয়ে তোর ওপরে উল্টে এক কুইন্টালের বাটখারা চাপিয়ে দিয়েছি, যা তুই জীবনে মাথার ওপর থেকে সরাতে পারবি না ? তোকে বড়ো করে তুলে নিজস্ব নারী হিসাবে পেতে চাই বলেই কি এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম, আমার একজন তরতাজা মানস-ক্রীতদাসীর প্রয়োজন মেটাবার জন্য ?

                মুষড়ে পড়লাম।

                তুই বুঝতে পারলি না কেন মুষড়ে পড়েছি, কিন্তু ভাবলি যে তোর কথায় আর বুকে থাবড়ানিতে  অপমানিত আহত হয়ে বাকরুদ্ধ।

                ক্রোধ নয়, তুই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি, বজ্রপাত ঘটিয়ে দিলি, এটাই বোধহয় আমাকে টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলার আগাম ইশারা। আমাকে বাদ দিলেই যেন তোর সামনে কালো গহ্বর, যেন ওই গহ্বরে তোকে কেউ ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকে বেরোবার জন্য আমার হাত আঁকড়ে ধরেছিস।

                বললুম না যে তুই অকারণে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি। বললুম ঠিকই করেছিস, ক্রোধ ধরে রাখলে ভেতরটা পচতে আরম্ভ করে, দেখেছিস তো অ্যানিমাল প্ল্যানেটে, বাঘিনীর ক্রোধে তার থাবা থেকে নখগুলো বেরিয়ে আসে, শিকারকে ধরার সময়ে আসে, খাবার আয়োজন করার সময়ে আসে। গোরিলারা নিজেদের বুক থাবড়ায়, তুই আমার বুক থাবড়ালি।

                  প্রায়শ্চিত্ত করার বা পারস্পরিক দায়মোচনের তরল কন্ঠস্বরে, তুই বললি, ডিয়ার সিলভার-ব্যাক আলফা মেল, এসো, তোমার পায়ের নোংরা ঘষে তুলি, নখে আর পায়ের আঙুলে এতো নোংরা, কখনও কি সাবান লাগাও না ? এত রোজগার করো, স্পাতে গিয়ে পেডিকিওর করালেই তো পারো, কতো স্পা চোখে পড়ল কালকে, এক্সক্লুসিভলি পুরুষদের জন্যে। আমার জন্য তো অনেক কিছু করেছ, এবার না হয় নিজের জন্য করলে

               শাওয়ারের তলায় আমাকে জড়িয়ে ধরে তুই আবার কবিতাটার আরেক স্তবক আরম্ভ করলি, বললি, লিসন ইউ লাভিং বাস্টার্ড:

                There’s a stake in your fat black heart

                And the villagers never liked you

               They are dancing and stamping at you.

               They always knew it was you

               Daddy, daddy, you bastard, I’m through.

              #

               সাবান মাখাবার সময়ে তুই চেঁচিয়ে উঠলি, ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আইডিয়া।

               আমি জিগ্যেস করলাম, কী, শুনি ? জারজপুরুষ হিসাবে আমার নামকরণ ?

               তুই বললি, ধ্যুৎ, আরে নাঃ , চলো, আমার জন্মস্হান সেই আঁস্তাকুড়টা দেখে আসি, ফোটো তুলে নেব, আমি ওখানে বসব, তুমি ফোটো তুলে নিও, যদি নোংরা না হয় তাহলে শুয়ে পড়ব, আর শুয়ে থাকার ফোটো তুলে নিও ।

               দাঁড়িয়ে ফোটো সম্ভব, বসে বা শুয়ে সম্ভব কি না জানি না ; কর্পোরেশানের গাড়ি জঞ্জাল তুলে নিয়ে যাবার পর হয়ত বসতে পারবি।

               নোংরা তো কি হয়েছে, শুয়ে ছিলুম এককালে, কতক্ষণ শুয়েছিলুম কেউ কি জানে ? ফোটো তুলতে তো কয়েক মিনিট।

               আটপৌরে পোশাক আছে কি তোর ? শাড়ি-ব্লাউজ, চুড়িদার ? আঁস্তাকুড়ে বসতে বা শুতে হলে মার্কিন পোশাক তো চলবে না।

               স্ট্রেঞ্জ, না ? আমেরিকায় বহু আফ্রিকান-আমেরিকান গারবেজ ডাম্প থেকে খাবার তুলে খায়, তারা কেউ-কেউ রাতে ড্রাগ ফুঁকে শুয়েও থাকে গার্বেজ ডাম্পে। দেখেছ তো হলিউডের ফিল্মে ?

               যাক, সে তুলনায় আমাদের আঁস্তাকুড় বেশি ডেভেলাপড, অনেকের রুজি-রুটির ব্যবস্হা হয়, বাতিল জিনিস  কুড়িয়ে-বাড়িয়ে।

               যাই, দেখি গিয়ে, কবে যাবে ?

               ঠিক আছে, চল যাওয়া যাক, সেই কতকাল আগে গিয়েছিলাম, দেখে আসি আরেকবার।

               তুই বললি, আবদারের কন্ঠে, এই প্রথম তোর কন্ঠে ড্যাডের প্রতি মেয়ের কন্ঠস্বর শুনলুম, বললি, চলো না তোমার গ্রামেও একটা ট্রিপ মারি, তোমাদের জমিজমা আছে তো সেখানে ? কোথায় তোমাদের গ্রাম, একটু কানট্রিসাইড ঘুরে নেবো, তোমার জ্ঞাতিদের সঙ্গে তোমার বউয়ের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে।

               আমার বাবা স্কুল টিচার ছিলেন, হুগলি জেলার আরামবাগে, মাধবপুর গ্রামে জমিজমা ছিল। সম্পত্তি নিয়ে কখনও ভাবনা-চিন্তা করেননি বাবা-কাকারা ; অনেক জমি ছিল, সবই বেদখল হয়ে গেছে, বাবা রাজনীতি করতেন না, হাতছাড়া জমিজমা আর ফেরত পাননি। কাকারা বাবার আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, কোথায় ওনারা থাকেন, খুড়তুতো ভাইবোনরা কে কোথায়, তাও জানি না।

               আমি আইএএস হবার পর মা-বাবাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি প্রতিটি পোস্টিঙে; আমরা আর ওমুখো হইনি কখনও।

               তুই বললি, তোমার বাবা অমন সাধাসিধে মানুষ ছিলেন বলে তুমি এরকম নিষ্ক্রিয় টাইপের হয়েছ, প্রিহিসটরিক মরালিটির মানুষ, বর্তমান ভারতবর্ষের অনুপযুক্ত। আন্টিমা বলেন যে একটা ফ্ল্যাটও কিনে রাখতে পারোনি প্রভঞ্জন প্রধান, এমনই ফুলিশ।

               আমি  তোকে জিগ্যেস করলাম, কি করে সন্দেহ করলি যে তোর জীবনের আড়ালে আমি আছি ? আর আমি তোকে সাড্ডল্য সুন্দরী করে তুলছি একদিন তোকে পাবো বলে ? আমার ডারলিং ডটার গ্রোইং আপ ফর মি !

                 তুই বললি, ক্লুটা পেয়েছিলি  কবিতার লাইন থেকে, “আই টক টু গড বাট দি স্কাই ইজ এম্পটি।” তারপর আমার গা তোয়ালে দিয়ে পুঁছতে-পুঁছতে বললি, আমি লেগহর্ন মুর্গি তো, তুমি একদিন যে খাবে আমাকে তা জানতুম।

                আর তুই ?

                রয়াল বেঙ্গল টাইগ্রেস, টুঁটি ধরে ঝুলিয়ে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে খাবার পরিকল্পনা চালিয়ে গেছি, ঘ্র্যাঁওওওওও। কাল অফিস যাবার সময়ে সরোজিনি নগর মার্কেটে ড্রপ করে দিও, কটা দরকারি জামাকাপড় কিনে নেবো।

               সরোজিনি নগর মার্কেটে পৌঁছে তোর নজরে পড়ল এক প্রৌঢ় দম্পতি, বললি, পাল্কি ফ্যামিলি, চেনো না বোধহয়। ওনাদের মুখের ভেতর সদাসর্বদা পাঁকের ল্যাণ্ডস্লাইড চলতে থাকে, সাবধান না হলেই ডুববে সেই পাঁকে।

               পাল্কি ?

               মিস্টার পাল আর মিসেস পাল, এত গুলগল্প ঝাড়েন যে ওনাদের আরিয়ান নাম দিয়েছে পাল্কি, লিপিকা-কিরণশঙ্কর থেকে খামচে তোলা ; দুজনেই বুদ্ধি আর কল্পনায় দেউলিয়া। ওই যে এদিকেই আসছেন, তুমি চেনো না, কাচ তুলে দাও, কাচ তুলে দাও, শিগগির, শিগগির, দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারি।

                গেছেন ওনারা, তোর ভয় পাবার কারণ বুঝতে পারলাম না, আমি যখন তোকে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছি, তখন যার যা ইচ্ছা হয় বলুক, কিচ্ছু এসে যায় না।

                ও তুমি বুঝবে না, ওনারা আমাকে তোমার সঙ্গে দেখে ফেললে ভিষণ বিপদ হতো।

                এখন যা,  কি-কি কিনবি কিনে নে। তুই ওই গাছটার তলায় দাড়িয়ে থাকিস, আমার ড্রাইভার আমাকে পৌঁছে তোকে পিক আপ করে নেবে। তোদের বাড়ি যেতে চাস তো গুড়গাঁও হয়ে আয়, বৈদেহী আছে; জগদীশ-অমরিন্দর তো চণ্ডীগড়ে। নয়তো কলকাতা থেকে ফিরে তারপর যাস।

              যাবো’খন, তাড়া নেই, তোমার সঙ্গে তো তিনমাস কাটাবো, তোমার বিছানার চাদর থেকে মেমেন্টোটা কেটে রেখে নিয়ে চাদরটা  তোমার আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছি, তোমার সংরক্ষণের মেমেন্টো হিসাবে ; একটা নীল ফুলফুল বেডশিট বিছিয়ে দিয়েছি, রাতে আকাশে বিচরণ করব।

##

              স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ণ, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

              চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস।

##

               এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

               যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

 

               রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল। উঠে, তোর দেহের পাশে বসে, নাইটল্যাম্পের ফিকে নীল আলোয়, দেখছি , চিৎ হয়ে ঘুমোচ্ছিস, নেকেড। আমি তো পায়জামা বা শর্টস না পরে ঘুমোতে পারি না।

               তোর ভুরু দেখছি, সরু করিয়েছিস। ভ্রুযুগল, ভ্রুযুগল।

               তোর দুজোড়া ঘুমন্ত চোখ দেখছি, আইলাইনার বোধহয় স্মাজফ্রি, রয়েছে এখনও, পাতার তলায়।

               তোর চোখের পাতা দেখছি। সত্যিকার পক্ষ্ম, পক্ষ্ম, পক্ষ্ম। চাপা দিয়ে রেখেছিস, স্বপ্ন, স্বপ্ন।

               তোর নাকের পাটা দেখছি, নাকছাবির দাগ রয়েছে, পরতিস হয়তো শখ করে।

               তোর কান দেখছি, মাকড়ি খুলে রেখে দিয়েছিস।

               তোর ঠোঁট দেখছি, স্নানের পর আর লিপ্সটিক লাগাসনি। ওষ্ঠ, অধর, ওষ্ঠ, অধর।

               তোর কোঁকড়া চুল দেখছি, আঁচড়াসনি মনে হল।

               তোর গলা দেখছি, বেশ লম্বা, ঢ্যাঙাদের গলা বোধহয় এরকমই হয়।

               তোর বুক দেখছি, শ্বাস নিচ্ছিস, আলতো উঠছে-নামছে।

               তোর শরীরের গন্ধ নিলাম ঝুঁকে, শোবার আগে পারফিউম মেখেছিস।

               দেখছি, মানুষীর মাংসল নির্যাস, নীলতিমিরে আচ্ছন্ন প্রতিমা, সেই কবেকার শিশু,  যাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ করছি, চিন্তা করা বন্ধ করে  নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দখলে, উদ্বেল হয়ে উঠছি। প্রেম করার সময়ে এভাবে চোখ বন্ধ রাখিস না কেন যাতে তোকে ভালোভাবে দেখে নিতে পারি, তখন তো হাসিস, কবিতার লাইন বলিস, গানের কলি গেয়ে উঠিস, মাংসের সঙ্গে মাংসের সম্পর্ককে চরমে নিয়ে যাবার নিজস্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিস নাকি ?

               বাস্তবকে অবাস্তব করে দিচ্ছিস, তোর জাদুতে আবিষ্ট হই। ঘুমও প্রেমের স্ফূরণ ঘটিয়ে দিল, ঘুমন্ত শরীরও ভালোবাসার জ্যোতি বিকিরণ করতে পারে। কত কিছু জানা ছিল না, তুই এলি, জানতে পারছি।

##

                ইচ্ছে হল তোর গলা টিপে ধরি, মেরে ফেলি তোকে, যাতে তুই আমাকে ছেড়ে চলে না যাস।

                তোর দেহের দিকে হাত নামালাম, গলায় নয়, বগলের পাশ দিয়ে দুহাতে তুলে নিলাম তোর ঘুমন্ত শরীর, ঘুমের ঘোরে বললি, আই লাভ ইউ ব্রো-প্রো, আমি অন্যের ভূমিকায় অভিনয় করছি না, আমি রক্তমাংসের জেনুইন প্রেমিকা।

               অনেকসময়ে তোকে প্রশ্ন করলে কেন চুপ করে থাকিস, তক্ষুনি উত্তর দিস না, কিসের ইঙ্গিত দিস অমন করে, নাকি নিজের মস্তিষ্কে কোনো উত্তর গড়ে ওঠে না।

               স্বপ্ন দেখছিস, দ্যাখ, দেখে নে স্বপ্নসংকটের স্বপ্ন, ঘুম ভাঙাবো না।

               আলতো শুইয়ে দিলাম তোকে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

স্টেথোস্কোপ

স্টে থো স্কো প

সং হি তা   ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

sanhita

সুখের অসুখ

চমকে উঠলেন তো? অসুখের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সুখ যদি নিজেই তার কারণ হয়ে ওঠে কেমন হয়? অনেকটা যেন আয়নার মানুষের সঙ্গে শত্রুতা হওয়ার মতো, কিম্বা ডঃ জ্যাকল আর মিঃ হাইড ও বলা যায় ।

একটু খোলসা করে বলি। 2018 সালের পরিসংখ্যান অনুসারে পৃথিবীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মান নির্ধারণের মাপকাঠির মধ্যে বেশ কিছু অসংক্রামক অসুখ তখনি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আবার বিভিন্ন রকম ক্যানসারের পরিসংখ্যান পরিমাপক অন্যতম। কিছু রিস্ক ফ্যাক্টার অসুস্থতার সম্ভাবনার কারণ স্বরূপ মাপকাঠিতে ঢুকেছে, পনেরো বছরের ঊর্ধে মাদক দ্রব্য পানের পার ক্যাপিটা পরিসংখ্যান, তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের পরিসংখ্যান, উচ্চ রক্তচাপ, ওবেসিটি বা শারীরিক স্থূলতা ,মধুমেহ বা ডায়াবেটিস এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম কায়িক পরিশ্রম প্রবণ যাপন চিত্র এর অন্যতম। অসুখ গুলিকে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা নাম দিয়েছেন লাইফ স্টাইল ডিসিসেস বা জীবন যাপন জনিত অসুখ। অসংক্রামক এই অসুখগুলি বেশীর ভাগই দীর্ঘমেয়াদি, ডাক্তারি ভাষায় ক্রনিক, অর্থাৎ হয় স্থায়ী, নয় নিরাময়ের পর কোন পরিণতিগত অসুস্থতার কারণ, এবং দীর্ঘ সময় এর চিকিৎসা ও নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন আছে। এই অসংক্রামক রোগের তালিকায় হৃদরোগ ও স্নায়ুর অসুখ, মানসিক রোগ, বাত বা আর্থারাইটিস, হাঁপানি, ব্রোঙ্কাইটিস, এমনকি, অন্ধত্ব, বার্ধক্য জনিত উপসর্গ, ও অবশেষে সংক্রামক কোভিড ইত্যাদি অসুখের ফলশ্রুতি স্বরূপ কোন অসুখ সবই অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে সারা পৃথিবীতে হৃদ যন্ত্রের অসুখ ও ক্যানসার উন্নত দেশগুলিতে মৃত্যুর প্রধান কারণ। এই পরিসংখ্যান বাকি দেশগুলিতেওবেড়েই চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, মানুষের জন্মকালীন সম্ভাব্য আয়ুর পরিমাপ, অর্থাৎ লাইফ এক্সপেক্টেন্সি, যেমন বেড়েছে বার্ধক্যে জীবিত থাকা মানুষের মধ্যে এই সব রোগের সম্ভাবনাও বেড়েছে। এ ছাড়া আর একটি প্রধান কারণ হলো সময়ের সঙ্গে জীবন যাপনের আচরণ ও পদ্ধতি গত পরিবর্তন। অর্থাৎ লাইফ স্টাইলের পরিবর্তন। ভারতবর্ষের মত উন্নয়নশীল দেশ গুলিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অসংক্রামক রোগগুলির সম্ভাব্য আসন্ন মহামারি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। কয়েকটি পরিসংখ্যান বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করবে। 2016 সালে পৃথিবীতে মোট 57 মিলিয়ান মানুষের বিভিন্ন কারণে মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে 41 মিলিয়ান মূত্যু ছিল অসংক্রামক এই জীবন যাপন জনিত অসুখে। এর তিন চতুর্থাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যমানের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ গুলিতে। 2000 সালে এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেড়ে শুধু এই দেশগুলিতেই 31 মিলিয়ানে দাঁড়িয়েছে। 2016 তে এই মৃত্যুর মূল কারণ ছিল হৃদজনিত অসুখ ও ক্যানসার। ভারতবর্ষ দ্রুত অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যনের ফলে এই সব রোগজনিত মৃত্যুর সম্মুখীন হতে চলেছে। 35 থেকে 64 বছরের কর্মক্ষম বয়সের জনগণের এক সিংহভাগ তাঁদের জীবনের সক্রিয়তার ও সক্ষমতার সময় হারাতে চলেছেন। আমাদের দেশ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর দুই তৃতীয়াংশ বহন করে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস জনিত জটিলতাও এই সব মৃত্যুর অন্যতম কারণ। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, মাদক সেবন, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসুখ এই মৃত্যুর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। একজন তিরিশ থেকে সত্তর বছরের মানুষের হার্টের অসুখ, ক্যানসার, ফুসফুস জনিত রোগ বা ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা বর্তমানে এ দেশে মোট 23 %। যদিও পুরুষের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা 27% নারীর মধ্যে তা 20% ।

এই অসুখগুলি হওয়ার সম্ভাবনার কারণের মধ্যে তামাক সেবন অন্যতম প্রধান কারণ। প্রত্যেক বছর দেশে 7 মিলিয়ন মানুষ তামাক সেবন জনিত কারণে মৃত্যুর শিকার হন। এর মধ্যে সরাসরি তামাক জাতীয় নেশা ধুমপান এবং প্যাসিভ স্মোকিং অর্থাৎ ধুমপায়ী ব্যক্তির ধুমপানকালীন নিসৃত ধোঁয়ার কারণে ধুমপানের শিকার মানুষও অন্তর্ভুক্ত। জানলে অবাক লাগবে, প্রত্যেক বছর আমাদের দেশে ছয় লক্ষ মানুষ এই প্যসিভ স্মোকিং বা পারিপার্শিক ধুমপানে মারা যান আর এর মধ্যে এক লক্ষ সত্তর হাজার হলো শিশু ও কিশোর বয়সী। ধুমপান 71% ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ শুধু নয়, 42% শ্বাসকষ্ট জনিত অসুখ এবং 10% হৃদরোগেরও কারণ। চোখে ছানী এবং পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রাইটিস, পায়ে পেশীর যন্ত্রনা এবং বার্জার ডিসিস নামক রোগও ধুমপানের কারণে হতে পারে।

অসংক্রামক রোগের পরবর্তী যে কারণের কথা বলবো তা হলো কায়িক পরিশ্রমের অভাব। এই কারণে মৃত্যু হয় বছরে 1.6 মিলিয়ান জনের। নিয়মিত কায়িক শ্রম, মানুষের হৃদরোগ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ছাড়াও অবসাদ ও কিছু কিছু ক্যানসার, যেমন স্তন বা বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের সম্ভাবনা কমায় বলে বিজ্ঞান দাবী করে।

অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রভাবে নানা রোগে মারা যান প্রত্যেক বছর 3.3মিলিয়ান জন। এ ছাড়া অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, ফল ও সবজী কম খাওয়া, হৃদ রোগ ও বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ায়। অতিরিক্ত নুন খাওয়ার প্রবণতা উচ্চ রক্তচাপের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব বর্ধক ও বটে। অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, বছরে 2.8 জনের মৃত্যুর অপ্রত্যক্ষ্,বা প্রত্যক্ষ কারণ এবং ডায়াবেটিসের কারণও বটে। বি এম আই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সব রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিশেষে বলি ক্যানসারের কথা।। ভারতবর্ষ বিশ্বের ক্যানসারের 18% দায়ভার একাই বহন করে। এর অন্যতম কারণ হলো কয়েকটি বিশেষ সংক্রমণ যা ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ায়। যেমন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, হেপাটাইটিস বি ও সি বা হেলিকো ব্যাকটর পাইলোরি। এগুলির সংক্রমণ সম্পর্কে সাবধান হলে, এবং হেপাটাইটিসের টিকা নিলে এই সম্ভাবনা কমবে। এসব ছাড়াও পরিবেশ গত কিছু বিষয়, দূষণ, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের প্রভাব এই সব অসংক্রামক অসুখের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছে।

সহজেই অনুমেয়, অসংক্রামক অসুখ ও তার রিস্ক ফাক্টার আমরা স্বেচ্ছায়, জীবন যাত্রার তথাকথিত সুখ সমৃদ্ধি ও আরাম প্রিয়তা এবং অসংযত যাপনের দ্বারা ডেকে এনেছি। তথাকথিত ভালো থাকার মুখোশের আড়ালে রয়েছে অন্ধকার অসুস্থ মানুষের মুখ ! অথচ, নিয়মিত পরিশ্রম, সুস্থ খাদ্যাভ্যাস, অনাবশ্যক স্ট্রেস থেকে বিরত থাকা, তামাক সেবন ও অপর্যাপ্ত মদ্যপান না করা, সর্বোপরি রক্তচাপ ডায়াবেটিস ইত্যাদির জন্য নিয়মিত চিকিৎসাধীন থাকা শুধুমাত্র এটুকুই আজকের পৃথিবীতে জীবন যাপনের প্রেক্ষিতে সুস্থতার প্রয়োজনীয় উপায়। তথাকথিত সুখের মধ্যে অসুখের আয়োজন করে লাভ কি?

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

সাক্ষাৎকার

সা ক্ষা ৎ কা র

প লা শ   দে

কবি ও  চিত্রপরিচালক

palash

'পাগল তুমি থাকো আমার ভেতর, তুমি তো আমার একমাত্র শেষ আশ্রয়', দেবজ্যোতি মিশ্র

১। পৃথিবীর সমস্ত সুরের মাঝে তুমি অথবা তোমার ভেতরে সমস্ত পৃথিবীর সুর… কি মনে হয় তোমার!

আমাদের চারিপাশে সুর বয়ে যায়, সুর বয়েই যায়। কবে সেই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল, ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি হয়েছিল, সুর কি তখনও ছিল? মাঝে মাঝে মনে হয় সুরের জন্ম কবে? মানুষ হাঁক পেড়েছিল, তাই কি সুরের জন্ম হয়েছিল? তবে এটা বুঝি যে আমার চারিপাশে সুর বয়ে যায়, স্রোতের মতো বয়ে যায়, সেই সব স্রোত কখনও কাছের, কখনও দূরের। পৃথিবীর সমস্ত সুর একাকার হয়ে যায়, তারা পাশাপাশি দাঁড়ায়, আর হয়ে দাঁড়ায়, সোজাসুজি, কোনাকুনি। সুর গুলো জড়িয়ে যায় একে অন্যের সঙ্গে, তবে এটা বুঝি ভালোবাসা নিজেই একটা ব্যপ্ত সুর। আমি তো ভালোবাসারই মধ্য থেকে জন্মে ছিলাম, পরষ্পর আমার বাবা মা তারা নিজেদেরকে ভালোবেসেছিল, ভালোবাসা নিজেই একটা সুর, আমার জন্ম তাই সুরের মধ্যে, এই যে আমি এখন কথা বলছি, এই যে আমি লিখছি, এই সমস্ত কিছুই তো আসলে সুরের মধ্যেই ঘটে। কত রকমের সুর, কত ধরনের সুর, আমরা সুর বললে পরেই প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব, তার নিজের দেশের, তার নিজের ভাষার, তার নিজের শব্দের সুরের কথা বলে।

আরও সহজ করে বললে, আমরা সুর বললে পরে একটা গানের কথা বলি, সে তো গান এসছে অনেক পরে, কিন্ত তার আগে তো মানুষ সুরে, শুধুমাত্র স্বরক্ষেপনে গেয়েছে। পাখি শিষ দেয়, ধানক্ষেতে হাওয়া বয়ে যায়, সব কিছুরই সুর আছে, দৃশ্যের সুর আছে, সুর আবার দৃশ্য তৈরী করে। এই সব কিছুর মধ্যে আমি, আবার আমার মধ্যে সুর, অদ্ভুদ মজার ব্যাপার। মাঝে মাঝে মনে হয়, আচ্ছা এই যে কম্পোজিসনটা তৈরী করলাম, এই সুর গুলো কোথায় ছিল? এই সুর গুলো তো এই হাওয়ায়, বাতাসে, আমার স্মৃতিতে ছিল। আমার স্মৃতিতে কোথা থেকে এলো সুর, কে পুড়ে দিল আমার স্মৃতির মধ্যে সুর? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবন, বিভিন্ন সুর শোনা, নাকি জিনের মধ্য দিয়ে সুর শোনা যায়? এর সঠিক কোনো উত্তর কি জানা আছে কারোর? আমারও জানা নেই। ধীরে ধীরে যখন আমার রাগ রাগিনীর সাথে পরিচয় হলো, লোক গানের সাথে পরিচয় হলো, পশ্চিমের সঙ্গীত। পশ্চিমে তো কত রকমের সঙ্গীত, তাদের পশ্চিমী দ্রূপদী সঙ্গীত, পশ্চিমের রঙ, লুজ, জ্যাজ, আরও অনেক কিছু। শুধু পশ্চিম? আমাদের প্রাচ্যের, মধ্য প্রাচ্যের, কত রকমের কত শ্রুতি, সেই সব শ্রুতিকনারা যেভাবে আমাদের জড়িয়ে রাখে, তা বলার বাইরে, আর এই সব কিছু কখন মিলে মিশে যায় মাথার মধ্যে, মাথার ঠিক কোন কোনায় থাকে কেউ জানেনা, শুধুমাত্র আমারই যে সুর আছে, আমি সুর করি বলে, তা নয়। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব সুর আছে, সুরে বাধা থাকে সারা পৃথিবী, প্রতিটি ঘটনা। এইটাই আমার মনে হয় যে সুরের গল্প। সুরের মধ্যে আমি, আমার মধ্যে সুর।

২। মিউজিক-কবিতা-পেন্টিং-গদ্য এতগুলো মিডিয়ামে কাজ করতে গিয়ে কি অনুভব তোমার।

মিউজিক, কবিতা, পেইন্টিং, গদ্য, আসলে সব কিছুই আমার বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাবনা চিন্তা, তার টুকরো টুকরো অংশ, কোনো কিছুই ঠিক করে উঠতে পারলাম বলে তো মনে হয় না। পরিমানে মিউজিক আমার অনেক বেশী, তার কারন এটা পেশা হিসেবে এসেছে। কবিতা তো ক্রমাগত চোখের সামনে জন্ম নেয়, জানিনা তার মৃত্যু আছে কিনা, কত সব দৃশ্য জন্ম নেয়, এই যে ছন্দের সাথে ছন্দ মিলে যায়, যাকে সোজা কথায় বলে অন্তমিল, রাইম, আসলে সে সবই সময়কে কেটে টুকরো করে রাখা, যেন একটা ব্লেড দিয়ে সময়কে টুকরো করে রাখা, একটা টুকরোর সাথে আর একটা টুকরো মিলে গেলে আমরা বললাম ছন্দবদ্ধ হলো। কিন্তু সেই কবিতা কোথায়? কোথায় খুঁজে পাবো? যার কোনো অন্তমিল নেই, বা অন্তমিল থাকলেও অন্তমিল দূরের নির্দেশ দিচ্ছে, আরও দূরে আরও এক প্রত্যন্ত প্রান্তে, যেখানে আর এক অন্ত আছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে যে মিলবেই এমন কোনো কথা নেই, এই যে আনপ্রেডিক্টেবল একটা জার্নি, কবিতায় যেমন আছে, সুরেও আছে। গদ্য লেখক তিনিও যেখানে গল্প ছেড়ে যান, আসলে কি সেখানেও গল্পটি ছেড়ে যায়? যদি খুব প্রকৃত অর্থে একটি গদ্য তৈরী হয়, তা আসলে কখনোই ছেড়ে যায় না, তার থেকে আরও অনেক সুতোয় সুতোয় আরও অনেক তৈরী হয় মানুষের মনে।  পেইন্টিং, ছবিরও সেই একই ব্যাপার। একটা ছবির সামনে আমি হয়তো দাঁড়িয়ে আছি। আসলে সেই দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটার সামনে আসলে অন্ধকার। আকাশ কি করে বুঝতে পারছি! মাঝেমধ্যে কিছু রং দেখা যায়। অভিজ্ঞতায় জানি মাথার উপর দেখা যায় আকাশ। কিন্তু তাই কি? আকাশ তো নিজেই ব্রহ্ম। চোখ বন্ধ করে থাকলেও, থাকে। হঠাৎ যদি মনে হয় কিছু রং কিছু আঁচড় ছেলে মানুষের মতো, দেয়ালেই আঁকলাম কিম্বা কাগজে, মাটিতে অথবা একটা ক্যানভাসে। তারও এক সুর আছে ছন্দ আছে। তারও একটা গভীরতা সমস্ত কিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া আছে। সেই ছবির রং অন্যরকম। সুর যখন করি সুরের সঙ্গে থাকি তখন তো ছবি থাকে, হয়তো লুকিয়ে। কবিতা থাকে গদ্যও থাকে। তবে আমাকে সব থেকে বেশি আন্দোলিত করে অক্ষর। এবং সেই অক্ষর যখন থেকে যখন শব্দ তৈরি হয়, শব্দ থেকে আরেকটি শব্দ তারপর আরেকটি শব্দ। ক্রমাগত একটা প্রলোভন দিয়ে যায়। হাতছানি দিয়ে যায়। একটা অন্তের দিকে। যে অন্তের দিকে দেখি কোন অন্ত নেই। কবিতার সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রেম নিবিড় প্রেম ভালোবাসা তৈরি হয়। কখনো কখনো সেগুলোকে ওই যে বললাম ব্লেডের টুকরো দিয়ে সময় কাটা… সেরকম ভাবে কিছু কিছু লেখা হয়ে যায়। সেগুলো কবিতা হলো কিনা গদ্য হলো কিনা সে দায় নেই আমার। থেকে যায়। তার মধ্যে আদর ভালবাসা সবই থাকে। আর একটা ডুকরে ওঠা কান্নাও থাকে বুঝি। যা আসলে কখনোই কাব্য হয়ে ওঠে না। কবিতার জন্ম বোধহয় সেখানেই। সুরের মধ্যে একটু সহজ বিচরণ আমার। অনেক ছোটবেলায় সেই সুরের দেখা মিলেছিল বাবার হাত ধরে ভায়োলিন শেখার মধ্যে দিয়ে। এই আজও যখন লিখছি কিছুক্ষণ আগে বিরাটিতে একটি শো করে এসেছি সেই ভায়োলিন হাতে মাইক্রোফোনের সামনে দু হাজার শ্রোতা। কি করে যে বাজিয়ে চললাম! তাই মনে হয় ছেলেবেলায় বাজানো ভায়োলিন মিথ্যে বলে না আমাকে। কি সহজে একটা তার যখন সুরে একটু নিচু হয়ে গেছে, একটু ঢিলে হয়ে গেছে… আঙুল মেপে নিয়ে নিজের সুরের সাথে মিলিয়ে নেয় সে। অভ্যেস বহু বছরের। শেষ দিন পর্যন্ত আমার হাত ধরে থাকবে সুর। একই রকমভাবে যখন আমি ছবি আঁকি। যা আঁকতে ইচ্ছে করে তা আঁকতে আরম্ভ করেও আঁকা যে কোথায় চলে যায় … যেখানে শুরু করব মনে করেছিলাম সেখানে শেষ হয় না। ছবি আঁকার তাই শুরুও নেই শেষও নেই। একটা যা হোক কিছু কাগজে কিংবা ক্যানভাসে কিংবা একটা খাতায় থেকে যায়। তার থেকে আমি মুক্তি পাব বলে কখনো সখনো ফ্রেমে বন্ধ করি। সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো কেউ বলেছে কখনো ‘বাহ্’।  সেই বাহবাটা মনে থেকে গেছে। পরবর্তী সময়ে ছবি আঁকতে গিয়ে কখনো স্মৃতি আমাকে তাড়না দেয়নি। নতুন স্লেটেই আবার ছবি আঁকা শুরু হয়েছে। ‘একদা জাহ্নবী তীরে’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে বা সত্যজিৎ রায়ের উপর ‘কম্পোজার সত্যজিৎ’। দুটো বই একেবারে ভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পড়লে নিজেই প্রায় কোথাও হারিয়ে যাই মনে হয়। তাহলে দেখুন ‘একদা জাহ্নবী তীরে’ এখানে শব্দেরা, অক্ষর… একটা ইতিহাসের নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সত্যজিৎ রায় তার বিপরীত। সবকিছুকে ধরা দেবে বলে বসে আছে। তার কারণ সুরের গল্প লিখতে গিয়ে সুরের কাছে হেরে বসে আছি যে!

এরকম বহু লেখা বিভিন্ন সময়ে লিখেছি। গদ্য পদ্য ওই লেখার অছিলা আর কি।

তাই সুর পেইন্টিং গদ্য পদ্য এগুলো আসলে মিলেমিশে যায়। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হয় গল্প হয় ভাব হয় ঝগড়া হয়… কোন্দল করে তারা।

এইরকম… এইরকমই অনুভব আমার।

৩। তুমি তো রাজনীতি সচেতন মানুষ। ব্যক্তিগত একা একলা মানুষের রাজনীতি আর পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় তোমার কাছে।

ব্যক্তিগত একা… একলা মানুষের রাজনীতি। একটা রাজনীতি তো আছেই। একা তুমি কখনও নও আসলে। এই যে দাঁড়িয়ে আছি, বসে আছি বা এই যে আমি লিখছি এখন। এই যে চারটে দেওয়াল রয়েছে… এই construction… বহু বহু মানুষের তৈরি করা বহু বছরের তৈরি করা একটা construction এর মধ্যে বসে আছি আমি… চারটে দেওয়ালই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের কত কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে, তাই একলা কি সত্যিই কখনও হতে পারা যায়? আমার চারপাশে টিভি চলছে… বা ফোন… এই যে আমি লিখছি… এই যে অক্ষরেরা… আমি একা কখন? এই আক্ষরদের সঙ্গে তো আমি আছি। তাই একা একলা মানুষের রাজনীতির মধ্যে গোটা ইতিহাসটাই লুকিয়ে রয়েছে আসলে। ঘরের সামনে একটা আয়না আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটা ছায়া দেখতে পারি, সেই ছায়াটা যে আমি সেটা কি করে আমি জানি, তার মানে আমার মস্তিষ্কের একটা ঘটনায় আমি চিনতে পারি ওই ছায়াটাকে আমি বলে। এটা চিনতেও তো বহু বহু বছর সময় লেগেছে। তাই আমি আসলে কখনই একা বা একলা নই, আমাকে ঘিরে রেখেছে সব কিছু। আমার এই যে বই, এতগুলো বই রয়েছে চোখের সামনে… এত কিছু রয়েছে… musical instruments রয়েছে, খাবার রয়েছে… সবকিছু… একটা বই, সেই বইটার একটা দাম রয়েছে। কোনও একদিন ঠিক হয়েছিল… সেই বইটা রয়েছে আমার। এই বই-এর rack-এ, সেই বইটা published হয়েছে একটা জায়গায় সেখানে বহু মানুষ তাদের শ্রম দিয়ে তারা তৈরি করেছে বইটা ফলে আমি একা যখন বসে আছি তখনও অসলে ইতিহাসের এবং আমার সমসাময়িক সময়ের বহু মানুষের শ্রম আবেগ এসব কিছুর সঙ্গে আমি জড়িয়ে আছি। তাই আমার একা বা একলা মানুষের রাজনীতি আসলে একলা মানুষের নয়, বহু মানুষের।

আর যদি বলা যায় যে পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় আমার কাছে তা এক এক সময় এক এক রকম। আমার ষোলো বছরের জীবনে আমি এক রকম ভাবে খবরের কাগজের খবর পড়ে আমি react করতাম। এখন হয়ত অন্যভাবে করি। হয়তো খবরের কাগজ পড়াই হয় না। হয়তো এই মোবাইল ফোনে আমি দেখছি বিভিন্ন লেখা আসছে ভাসছে যাচ্ছে এবং আমি শুনছি বিভিন্ন information আমার কাছে আসছে অথবা আমি দোকানে যাচ্ছি, একটা কিছু কিনছি, সেই কিনতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি দাম বেড়ে গেছে কিম্বা আমি জানি যে একটা lock down হল… pandemic দুটো বছর আমি জানছি যে পৃথিবীতে কি করে মানুষ তখনও ব্যবসা করছে, ব্যবসা করার কথা ভাবতেও পারছে… সে নিজেও জানে না পরের দিন সে বেঁচে থাকবে কিনা… সে ভাবছে কি করে তার ব্যবসাটা চলে… একটা ঘোরের মধ্যে বসে। Oxygen Sylinder কিম্বা Mask সংগ্রহ করছে সে। বাজার থেকে সব কটা জিনিস তাকে নিজেকে নিয়ে চলে আসতে হবে, সে যেন বেঁচে থাকে। প্রতিটি মানুষ এভাবে ক্রমাগত একটা রাজনৈতিক আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে বেঁচে থাকার রাজনৈতিক আবর্ত এবং সেই বেঁচে থাকাটা যে শুধু মাত্র physically বেচেঁ থাকা নয়… অনেক রকম ভাবে… শক্তি… power game… gender politics… সমস্ত কিছু মিলে মানুষ শেষ পর্যন্ত একটা দুটো ক্লাস… একজন oppress করে একজন oppressed হয়, এই জায়গার বাইরের দিকে বেরিয়ে আস্তে পারে না। তবুও পৃথিবী অনেকটা সময় ধরে বহু কিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যে যুদ্ধটা চলছে … রাশিয়া বনাম ইউক্রেন, আমরা এখন আর কোনো খবরই পাইনা শুধু খবরটা যেভাবে হতে পারে বলে মনে হয়, দেশের economyটা আস্তে আস্তে আস্তে আস্তে… বিভিন্ন পৃথিবীর equation… তাদের নিজেদের দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে… আমরা বুঝতে পারি, আমাদের effect করে একটা তেলের দাম বাড়ার ওপর আমাদের জীবন যাপন বেচেঁ থাকা এবং তা দিয়ে একটা দেশের বিপরীত রাজনীতি বিপরীত narrative যেমন ভাবে তৈরী হবে তা তৈরি হয়। তাই যে কথা বলছিলাম পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় বা যায় আসে সেটা জরুরি হয়ে ওঠে তখনই যখন ঠিক আমার বাড়ির পাশে একটা ঘটনা ঘটে কিম্বা কিছু দূরে কেননা খুব বেশি দূরে ইউক্রেনে ঘটনার সঙ্গে আমি কতটা সুতোয় বাঁধা রয়েছি আমি জানি না। খুব indirectly যে সুতোয় বাঁধা থাকি সেগুলোকে আমরা বুঝে উঠতে পারিনা। আমরা theoretically বোঝবার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা বুঝে উঠতে পারিনা শুধু এটা বুঝতে পারি যে পৃথিবী কোনো মঙ্গলের দিকে যাচ্ছে না… কোনো মঙ্গল হওয়ার নয়। কিন্তু তাও তো আমরা আশা ছাড়তে পারিনা। এই যে শ্রমজীবী ক্যান্টিন আমাদের ভাবনায় উঠে এল pandemic-এর মধ্যে, lock down-এর সেই প্রথম দিকে তখন আমরা মনে মনে ভাবলাম যাদবপুরের community kitchen শ্রমজীবি ক্যান্টিন… তার এক হাজার দিন পূর্ন হল তার এক হাজার দিন পূর্ণ হল, ভেতরে কি একটা তৃপ্তি আসেনি? নিশ্চই তৃপ্তি এসেছে। বহু মানুষ খাবার পেতে পারে। বহু মানুষকে চোখের সামনে দেখেছি, অন্তত তাদের কিছুটা ক্ষুধার নিবৃত্তি দিতে পারা গেছে এটা আমার কাছে একটা বড় পাওনা। এটাও তো রাজনীতি। এখানেও তো বহু মানুষ এক সঙ্গে মিলেছে। যেরকম ভাবে যুদ্ধে বহু মানুষ এক সঙ্গে মেলে একটা ধ্বংসের জন্য। তেমনি বহু মানুষ একসঙ্গে মিলেছে একটা ভালোর জন্য, একটা মঙ্গলের জন্য। তাই আমি এই পৃথিবীর ব্যাপারে কৌতূহলী এবং কৌতূহলী থাকবও।

৪। তোমার সঙ্গে যারা মিশেছেন তারা টের পান তোমার পথ সহজিয়ার। অথচ এই পথই সবচেয়ে কঠিন তোমার জার্নি টা যদি একটু বলো।

সহজিয়া কি হওয়া যায়?  এ জীবনে আর সহজিয়া হতে পারবো না। তবে সহজিয়া যে জীবন চোখের সামনে দেখি বা যাদের দেখেছি… তাদেরকে সবসময় মাথায় করে রাখব।… আমার বাবা… আমার বাবা বললাম কেন? সেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমার… শুধু বাবা কেন… মা। যে কথা একদম প্রথম প্রশ্নে বলেছিলাম যে আমার বাবা মা, তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ছিলো আর তাই তো আমি। সেই বাবা আমার হাতে বেহালা দিয়েছিল… ভায়োলিন… সেই ভায়োলিন দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার যাত্রা… সুরের যাত্রা। আজও আমি… এই লেখা লিখতে বসার আগে বিরাটিতে দু আড়াই হাজার মানুষের সামনে মাইক্রোফোনে যখন ভায়োলিন বাজাচ্ছিলাম, মনে পড়ছিল প্রথম দিনের কথা… কি কষ্টে স থেকে র, র থেকে গ, একটা আঙুল থেকে আর একটা আঙুল… মনে পড়ে যায়। কিন্তু এই বাবার জীবনই তো ভীষণ একটা সহজিয়া জীবন ছিল। কি অনায়াসে খালি গায়ে একটা লুঙ্গি পরে মানুষটা টালিগঞ্জ চন্ডিতলার একটা কলোনি পাড়া এলাকায় হেঁটে বেড়াত, মানুষ সম্ভ্রম করত, শ্রদ্ধা করত কিন্তু কোথাও দূরত্ব ছিল না। আবার যখন এই টালিগঞ্জ চণ্ডীতলা পেরিয়ে ট্রাম লাইন পেরিয়ে গড়িয়ার পর  যখন লোয়ার স্ট্রিট-এ সলিল চৌধুরীর বাড়িতে সলিলদার সঙ্গে কাজ করতাম দীর্ঘ সময় ধরে দেখেছি কত সহজ জীবন একটা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ… সেগুলো দেখা একটা বিরাট বড় ব্যাপার। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেছি দীর্ঘ দিন… দীর্ঘ তেরো বছর… কত ছবি, ছবির বাইরে ছবি, গানের বাইরে মাসিক অ্যালবামের গান হয়তো background score… তার সঙ্গে কাজ করেছি, বহু বহু মিউজিশিয়ান… কেরালা চেন্নাই বোম্বে ওড়িশা বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন মিউজিশিয়ানরা, কত শত মিউজিশিয়ানদের সাথে আলাপ হয়েছে পরিচয় হয়েছে… সবার মুখ না মনে পড়লেও সবাই আসলে আমাকে ছুঁয়ে আছে। তাঁরা সবাই ছুঁয়ে না থাকলে আজকে আমি যেটুক করছি সেতুক সম্ভব হত না। ভারতবর্ষের কত শ্রেষ্ঠ মিউজিশিয়ানদের দেখেছি সলিলদার দৌলতে এবং সলিল চৌধুরীর compose করা সুর স্বরলিপি করে তাদের সামনে যখন রেখেছি, তাদের চোখে আমি দেখেছি এক ধরনের স্নেহ একটা প্রশ্রয়… আমি এই যে আজকে মিউজিশিয়ান কিংবা  composer বা গান গাই যদি কখনও গেয়ে ফেলি গাইতে পারি তখন ভাবি এ তো সবই তাদের জন্য। তাদের প্রশ্রয় আমাক আরও দৃঢ় করেছে। কিন্তু ওই যে একটা কথা বললাম, বারবার করেই বলি ওই সহজিয়া জীবনই আমাকে মনে করে যে আমাকে মানুষের সঙ্গে একদম পাশাপাশি থাকতে হবে এবং আছিও তাই তার বাইরে কিছু মহান কাজ কিছু করিনি, কোনো মহান কাজ করার ইচ্ছেও নেই, শুধু ওই মহান জীবনগুলোর সাথে আবার যদি দেখা হয়, আর একটু যদি দেখা হয়… শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সেরকম একটা চেষ্টা থাকলে পরেই হবে… পথটা কঠিন, তার কারণ এমন একটা সময় আমরা বাস করি  যেখানে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত আমি… আমি হয়েই থাকি, আমরা হয়ে যেতে পারি না আর এই আমরাই পথটা তো সহজ নয়… আমিকে ভোলা কঠিন, খুব কঠিন শেষ পর্যন্ত… খ্যাতির মোহ থাকে, সেই মোহে আমি জড়িয়ে যায়, সে আমরা হতে দেয় না … সেই ঝুট ঝামেলা যে আমার মাথায় বাঁধে না তা বলতে পারি কি এত সহজে… সহজিয়া জীবন আমাকে দেখে লোকের মনে হলেও নিজেকে অনেক অনেক কিছুর মধ্যে থেকে ছাড়িয়ে আনতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত লালন সাঁঈদের কাছে বোধয় পৃথিবীর সমস্ত মুক্তির তালা চাবি। এই যে বললাম তালা চাবি… তালা চাবি দিয়ে যদি বন্ধই হলাম তাহলে মুক্ত হওয়ার এত ইচ্ছে কেন! এদিকে ওই মুক্ত হওয়ার ইচ্ছের মধ্যেই মুক্তি ঘটে। দেখা যাক এই জীবনে কোনও মুক্তি ঘটে কিনা সেরকম।

৫। তোমার ভেতরে যে আশ্চর্য পাগল বাস করে সেই পাগলের কথা শুনতে চাই।

পাগল কি না জানি না… তবে আমার মধ্যে ইচ্ছেটা বাস করে। সে তো প্রতিটা মানুষের মধ্যেই ইচ্ছেটা বাস করে। তাদের ভেতর ইচ্ছেটা কেমন ভাবে বাস করে তো বলতে পারব না, তবে আমার মধ্যে ইচ্ছেটা কেমন ভাবে বাস করে বলতে পারি। আমার বিভিন্ন ইচ্ছেরা… তারা সকালবেলা বল্গাহীন ভাবে বেরিয়ে পড়ে, তাদের অনেক স্বাদ এবং তারা সময়োপজীব্য সমস্ত কিছু করে না। এদের উপর আমার রাশ টানা খুবই মুশকিল। আমি কখন ছবি আঁকব, কখন সুর করব, কখন আমার পরিচালক আসবেন তাঁকে শোনাতে হবে কিন্তু আমি এতটুকু তৈরী নই। কিন্তু তাঁকে দেখেই আমার ভেতরে কিছু একটা হবে আর সামনের লেখাটা সুর হয়ে উঠবে। এইটা আমি নিজেও বুঝিয়ে বলতে পারব না। আর পাগল হওয়া কি এত সহজ সে তো বড় কঠিন। সেরকম পাগল নিজের মধ্যে কিছু মুহূর্ত জীবনে দেখেছি। যখন আমি বুঝতে পারি যে সারাটা দিন আমি খুব খেটেছি কিন্তু আমি বুঝতেই পারি নি যে আসলে আমি খাটছি। এবং বাইরে থেকে যারা আমাকে দেখছে তারা বলে এবং অনেক সময় বলেছে যে এত এনার্জি কি করে পাও। আসলে একটা পাগলামি থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা করে ফেরেও। আমি রাস্তাঘাটে যখন সত্যি কারের একজন মানুষ তথাকথিত ভাবে যাকে বলা হয় মূলধারার জীবন থেলে ছিটকে গেছে আমি খুব খেয়াল করে দেখবার জন্য চেষ্টা করেছি কখনো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে মনে তো হয়নি তারা পগল। ঠিক আমার সামনে যখন আমি দাঁড়াই তখন বুঝতে পারি না কোনটা আসলে পাগলামি। হ্যাঁ এটা বলতে পারি আজও পর্যন্ত আমার কোনো কিছুর প্রতি অধিকার বোধ তৈরী হয়নি। শুধু মুখ গুলো আমার অবলম্বন। যে মুখগুলোর সাথে আমার গল্প হয় সেই মুখগুলিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাদের সাথে আমার অনেক রকমের কথা হয়। কোন মুখ ছাড়িয়েছি কোন রাস্তার পাড়ে সেই মুখের সাথে গল্প জুড়ে দি। মানুষ তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। মানুষ বলতে আমার আত্মীয়, স্বজন, বন্ধুজন— তারা হয়তো আমায় দেখছে আমি মিউজিক কম্পোজ করছি আমি হয়তো ত্রিশ বছর আগে বা কত শতাব্দী ধরে জানিনা সেখানে একজনের সাথে গল্প করছি। আর অন্যরকম একটা সুর বেরিয়ে আসছে, কিংবা একটা লেখা, কিংবা একটা ছবি… আমি বলি পাগল তুমি থাকো আমার ভেতর, তুমি তো একমাত্র আশ্রয় বা শেষ আশ্রয়। সেই পাগলের কথা শুনতে পাই আমি কিন্তু আপনাদের শোনাবো কি করে আমি যে তার সবকটা কথা এখনও শুনে উঠতে পারি নি। সে রাত্রির বিভিন্ন প্রহরে ডাক দিয়ে যায়। তাকে ধরতে পারি নি কখনো কিন্তু বুঝি সে আছে। থাকুক। এভাবেই সে থাকুক আমার সাথে।

৬। তীব্র গুণীজনদের সঙ্গে তুমি কাজ করেছ বিভিন্ন মাধ্যমে। সেই তেঁতুল পাতায় ন-জনের কিছু গল্প যদি বলো…

হ্যাঁ, সত্যিই তাই, তীব্র গুণীজনের সঙ্গে আমি কাজ করেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। আমি যদি সঙ্গীতের কথাই বলি প্রথম দেখা আমার বিস্ময়কর মানুষ আমার বাবা। আমার বাবাকে আমি দেখেছি বাবা, বাহাদুর খাঁ, ঋত্বিক ঘটক, উদয়শংকর একসঙ্গে… খুব ছোটবেলার স্মৃতি সেসব। কিন্তু বুঝতে পারতাম আমার বাবা খুব সহজ সরল, আমার বন্ধুর বাবাদের মতো নয়। যারা স্নেহশীল, যারা সংসার দেখেন, ওই কলোনীপাড়াতেই যে যার সাধ্যমতো অফিসে যান ফেরেন, কিংবা স্কুল যান বাড়ি ফেরেন সে রকম নয়। আমি দেখেছি আমার মা প্রায় সময় উদ্বিগ্ন মুখে থাকতেন মাসের মাঝ বরাবর। বাবাকে তখন দেখেছি বাবা অবলীলাক্রমে ওয়েস্টার্ন ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে বাংলা স্বরলিপি করছেন। খুব আশ্চর্য লাগত। পরবর্তী সময়ে সেই স্বরলিপি বাজিয়েছি যখন মুগ্ধ বিস্ময়ে বাবাকে একজন তীব্র গুণী মানুষ বলেই মনে হয়েছে। মাকে জিজ্ঞেস করতাম, এরকম একটা মানুষকে নিয়ে সংসার করতে তোমার… মনে হয় নি কখনো তোমার যে তোমার জীবন অন্যরকম হতে পারত। বাবার মৃত্যুর পর মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা বলেছিল না রে প্রথমে ভাবতাম এসব সবার যেমন সংসার হলো আমার তেমন হলো না। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যা মানুষ আমাকে এত ভালোবাসলো তাঁর এমন কিছু জিনিস ছিল যা দেখে আমি মুগ্ধ হতাম। এই কথা আজ লিখতে গিয়ে আমিও বিস্মিত হচ্ছি।

বাবার পরই মনে পড়ছে সলিল চৌধুরীর কথা। বাবা যদি হন ব্যাকরণের বই ‘রায় এন্ড মার্টিন’ সলিলদা যেন আমার কাছে শেক্স পিয়ারের সাহিত্য, তাঁর সনেট, তাঁর আলো… আমাকে সমস্ত জানলাগুলো খুলে দিল। সেই আলোয় আমি সমস্ত পৃথিবীকে দেখলাম। ওই যে গানের মধ্যে আছে না ‘কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিল, সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল’… এই ভালোবাসার আলো আমি সলিল চৌধুরীর মধ্যে দেখেছিলাম। সত্যজিৎ রায়কে দেখেছি। একেবারে ভিন্ন মেরুতে। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। অবাক হতাম এত এত কাজ করে যাচ্ছেন যে মানুষটা তিনি নির্বিকার ভাবে একটা গাড়িতে করে এলেন, এইচ এম ভি-র ফ্লোরে ঢুকলেন এবং কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছেন। যে কাজ একবার করলেন সে কাজকে ফিরে আর দেখেন নি। তাঁকে নিয়ে আমার বই ‘কম্পোজার সত্যজিৎ’ বেরিয়েছে। মৃণাল সেন… এই মৃণাল সেনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা বা কাজ সেই আটের দশকের গোড়ায়। সেই ছবি ‘আকালের সন্ধান’-এ। সলিল চৌধুরী তাঁর সুর পরিচালক আমি সহকারী। দেখেছি দুই বন্ধুর গল্প… সলিল চৌধুরী আর মৃণাল সেন… ভাবা যায়? দু’জনে ফ্লোরের মধ্যে যখন কাজ করছেন তখন আমরা মিউজিশিয়ানরা বুঝতেই পারতাম না যে আমরা একজন মহান পরিচালক আর একজন মহান কম্পোজিটারের সঙ্গে কাজ করছি। মনে হত যেন দুই বন্ধু কাজ করছে। তা তো সত্যি। সেই গণনাট্যের সময় থেকে তাঁরা বন্ধু। যদিও মৃণাল সেন গণনাট্যের সঙ্গে ছিলেন না কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। সে গল্প অন্য একদিন হবে। মৃণালদার সঙ্গে কাজের একটি গল্প বলি, ‘আমার ভুবন’ ছবির কাজ করছি। মৃণালদা বললেন, এই ছবিতে একটা বিশেষ জায়গায় ‘আলোর পথযাত্রী’ ব্যবহার করবেন। তখন সলিল চৌধুরী বেঁচে নেই। তাঁদের প্রবাদপ্রতিম বন্ধুত্বের গল্প। আমি বললাম, ‘এখানে কি ‘আলোর পথযাত্রী’ যাবে? এই সিকোয়েন্সে?’ উনি বললেন, ‘তাই? তাহলে এক কাজ কর অন্য কোনো মিউজিক কর’। মিউজিক করা হল। বহু পরে যখন ছবিটা দেখা হচ্ছে স্ক্রিনে, মৃণালদার ঠিক পাশে বসে আছি আমি। ভুলে গেছি আসলে কি মিউজিক হয়েছে। হঠাৎ ওই সিকোয়েন্সে দেখি ‘আলোর পথযাত্রী’ বেজে উঠল। মৃণালদা আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন ‘তুমি কিছু মনে কর না। আসলে সলিলকে আমার একটা ট্রিবিউট জানানোর কথা ছিল।’ এই যে বন্ধুত্ব… দুজন অসম্ভব গুণী মানুষ… এবং তাঁরা দু’জন বন্ধু। একজন নেই আজ, আমার শিল্প বড় কথা নয়, আমি আমার বন্ধুকে ট্রিবিউট জানাতে চাই… এই অনুভূতি… মনে হয় আজ এরকম ভাবেই থাকতে পারব তো কারোর বন্ধু হয়ে কিংবা কেউ আমার বন্ধু হয়ে।

বহু প্রজন্মের সঙ্গে তুমি কাজ করেছ নতুন প্রজন্মের কাজের সম্পর্কে তোমার কি মনে হয়?

বহু প্রজন্মের সঙ্গে আমি কাজ করেছি এমন ভাবলে আমার মনে হয় এই তো সবে আবার কাজ শুরু হল… ঠিক এইটাই মনে হল। হ্যাঁ, আমার সতেরো বছর বয়সে আমি সলিল চোধুরী, মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়কে পেয়েছি। হ্যাঁ মাত্র সতেরো, আঠারো, উনিশ, কুড়ি বছর বয়সেই। সারা ভারতের আরও অনেক শ্রেষ্ঠ ও গুণী মানুষদের সাথে কাজ করেছি। কাজ করেছি অপর্ণা সেনের সঙ্গে, ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে। ঋতুর সঙ্গে যখন কাজ করেছি ঋতু অন্য একটা পৃথিবী তৈরী করেছিল। সলিল চোধুরী ও মৃণাল সেনের কথা যেমন বললাম তেমন বাইরের বহু লোককে বলতে শুনি আমার আর ঋতুর বন্ধুত্বের কথা। আমরা যেসব কাজগুলো করেছি সেই সব কাজগুলো মানুষ ভালোবাসছে আজ এ আমার এক পরম প্রাপ্তি। আমার বন্ধুটি নেই আর। কি বলব। আমার প্রজন্ম আর তাঁর পরের প্রজন্ম-এর যাঁদের দেখছি বহু মানুষদের মধ্যে, বহু কিশোরের মধ্যে, বহু তরুণের মধ্যে আমি অনেক প্রতিভা দেখতে পাই। সেটা কবিতায়, সেটা ছবিতে, সেটা সিনেমায়, সাহিত্যে কিন্তু যেটা বলব আরেকটু ধৈর্য আরেকটু নিষ্ঠা প্রয়োজন। পরে থাকতে হবে। লেগে থাকতে হবে সেটা প্রয়োজন। আসলে ওরা তো এই সময়ের। এই সময়টাই তো বিক্ষিপ্ত। বিক্ষিপ্ত করে দিচ্ছে সবাইকে। তবু সবাইকে আমার ভালোবাসা। ওদের কাছে আমার চাওয়া, তোমারা আরও মন দিয়ে, আরও ভালোবাসা দিয়ে, আরও আবেগ দিয়ে তোমরা তোমাদের নিজের কাজগুলোকে জড়িয়ে ধর। তোমরা আমাদের থেকে অনেক অনেক বেশি প্রতিভা ধারণ করেছ। শুধু প্রতিভা নয় করতে হবে একনিষ্ঠভাবে পরিশ্রম।

আমি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে করতে আশ্চর্য হয়ে যাই। আমি ভুলে যাই আমি কোন প্রজন্ম থেকে আসছি। পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ হওয়ার কোনো বাসনা নেই আমার। আমি সব সময় মনে করি জন্ম ক্রমাগত হচ্ছে এবং কোনো মৃত্যু নেই। আর তাই এই মুহূর্তে আমিও আমার সতেরো বছরকে পেরিয়ে আসিনি। তাঁকে আঁকড়ে ধরেই আমি আছি। তাই এই প্রজন্মেও আমি ওদের সঙ্গে ওদের মতো করেই থাকি। আবার কখনো সেই মানুষটা যে আটের দশক থেকে এসেছিল সে এসে উঁকি মারে। সে অনেক কথা বলে। হুকুম জারি করে। কিন্তু তাকে আমি চেপে দিই। বলি সেই সময় তুমি তো অনেক কথা বলেছিলে, তোমার নিজস্ব ভিউ ছিল… আজকের প্রজন্ম এসেছে… ওদের নিজস্ব ভিউ আছে… সেগুলোকে ভালো করে দেখ। সেগুলো থেকে শেখ।    

বিশেষ ধন্যবাদ

অর্পিতা সরকার প্রামাণিক
মোহনা মজুমদার

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

রূপ কথা

রূ প  ক থা

অ নু ক্তা   ঘো ষা ল

মডেল ও কবি

anukta

কাফতানে কামাল

কথায় বলে ‘Change is the only constant’ তা সে পছন্দই হোক বা স্বাদ, ছুটতে থাকা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় অনেক কিছু। আবার কিছু কিছু পরিবর্তন বড়ই নিশ্চিত। যেমন আজ যা ট্রেন্ড কাল তা ব্যাকডেটেড। আর এইসব নিশ্চিত পরিবর্তনের সাথে পা মিলিয়ে একটু একটু করে বদলে চলেছে ফ্যাশান। শুধু ফ্যাশান নয় ড্রেস সেন্স, ফ্যাশান সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও বদল ঘটেছে অনেক। নিজস্ব স্টাইল-এ আমরা তখনই হয়ে উঠব অনন্য যখন আমরা সেই পোশাক পড়ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ও স্বচ্ছন্দ ভাবে। আজকের ফ্যাশানও সেই কথাই বলে। আপনি যে পোশাকে স্বচ্ছন্দ সেই পোশাকেই আপনি অন্যের দৃষ্টি কাড়তে পারেন যদি আপনার মধ্যে থাকে আত্মবিশ্বাস। সেক্ষেত্রে আপনার চেহারা, আপনার বয়স নিতান্তই গৌণ। আজ এমনই এক ধরণের পোষাকের কথা বলব যাতে যেকোনো বয়সের, যেকোনো চেহারার মানুষই স্বচ্ছন্দ বোধ করার সঙ্গে সঙ্গে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন অন্যকে।

আজ বলব কাফতানের কথা। এই কাফতানের আবির্ভাব মেসোপটেমিয় সভ্যতার সময়কালে। ফুরফুরে রঙিন কাপড়ের উপরে তাক লাগানো নকশার নৈপুণ্যেই যেন ফুটে ওঠে কাফতানের আভিজাত্য। কাফতান যেমন আরামদায়ক তেমনই ফ্যাশানেবল। যা ঘরে ও বাইরে স্বচ্ছন্দে পড়া যায়। কাফতানের বিশেষত্ব এতে আরামদায়ক হাতা থাকে এবং কোমরের দিকে বাঁধার জন্য বেল্ট বা ইলাস্টিকের কোমর বন্ধনী থাকে। এই কোমর বন্ধনী কাফতানের সৌন্দর্যে আলদা মাত্রা যোগ করে। নীচের অংশের সমান বা অসমান অংশ এই পোশাককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। অনেকক্ষেত্রে কাফতানের নিচের অংশ হয় কোণাকৃতি। কাফতানের এই কাটের আরও অনেক রকমফের আছে। যেমন— শোল্ডার কাফতান, ড্রেপ কাফতান, ড্রেপ কত্তল কাফতান, সার্কেল কাফতান, কাট উইং বাটারফ্লাই কাফতান প্রভৃতি। আবার নকশা ও ডিজাইনের দিক থেকেও কাফতানের  নানা বৈচিত্র দেখা যায়।

‘লেবেল সুকন্যা’-এর কর্ণধার ডিজাইনার সুকন্যা গুহর কাছে আছে ডিপ নেক কাফতান, ভি গলার কাফতান, বিচ কাফতান সহ নানা ধরণের কাফতানের এক চোখ ধাঁধাঁনো সম্ভার। কাফতানের জন্য তিনি ব্যবহার কখনো ব্যবহার করেছেন জর্জেট, কখনো শিফন, কখনো সিল্ক। উজ্জ্বল সব রঙের প্রাধান্য তাঁর কাফতানের অন্যতম বৈশিষ্ট। আর তাই তাঁর কালেকশান নজর কেড়েছে ছোট বড় সকলের। তাঁর কালেকশানের আরেকটি বৈশষ্ট তাঁর সমস্ত কালেকশানই যেন ভারতীয় তাঁতের ঐতিহ্যের উদযাপক। বাংলার শিল্প বৈচিত্রকে তিনি যেমন সকলের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন তেমনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাতে বোনা কাপড় সংগ্রহের মাধ্যমে জাতিগত শিল্প বৈচিত্রকেও সম্মান জানান। এর সাথে যুক্ত হয় তাঁর নিজের সৃজনশীলতা ও শিল্পনৈপুণ্যতা। আর তার ফলেই সৃষ্টি হয় সুকন্যার অনবদ্য ও অভিনব সব সৃষ্টি। সুকন্যার কাফতানের অবিশ্বাস্য কালেকশান আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করবেই তার নিজ মহিমায়।  

মডেল | অনুক্তা ঘোষাল

ড্রেস | সুকন্যা গুহ

প্লেস | মেলবোর্ন ক্যাফে

সুকন্যা গুহ :

‘লেবেল সুকন্যা’-র কর্ণধার ও একজন প্রতিশ্রুতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে সুকন্যা গুহর পথ চলা শুরু ছয় বছর আগে। কিশোরী বেলা থেকেই তিনি সযত্নে লালন করে এসেছিলেন এই স্বপ্ন। কলকাতা এবং বর্ধমানে আছে তাঁর নিজস্ব বুটিক স্টুডিও। বর্তমানে তিনি কলকাতার একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ফ্যাকাল্টি হিসাবে তরুণ প্রজন্মকে এই সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে দেওয়ার কাজে ব্রতী আছেন। তিনি মনে করেন, স্বাচ্ছন্দ্যই যেকোনো পোশাকের সৌন্দর্য-এর মূল চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

জিভে জল

জি ভে  জ ল

পা ঞ্চা লি   দ ত্ত

বিশিষ্ট ফুড জার্নালিস্ট

panchali

মালিশ

মিষ্টি কুমড়া ( বড় টুকরো করে কাটা ) ৪০০ গ্রাম
চেরা কাঁচা লঙ্কা ১০/১২ টা
বেগুন বড় টুকরো করে কাটা ৪০০ গ্রাম
পেঁয়াজ কুচি ১০০ গ্রাম
কাঁচকলা টুকরো (বড় করে কাটা ) ২০০ গ্রাম
তেজপাতা ২ টা
ধনেবাটা ১ টেবিল চামচ
রসুন বাটা ১ চা চামচ
হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ
নুন স্বাদমতো
সর্ষের তেল ৭৫ গ্রাম

প্রণালি :

কাঁচকলা হলুদ , জল ও নুন দিয়ে হালকা সেদ্ধ করে জলটা ফেলে দিন। এবারে একটা কড়াইতে কাঁচকলা সমেত সব সবজি দিয়ে তাতে ২ কাপ জল দিয়ে সেদ্ধ বসাতে হবে। তাতে হলুদ , নুন, চেরা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে সেদ্ধ করুন। খেয়াল রাখবেন যাতে সবজি গলে না যায় । জল শুকিয়ে গেলে সবজি নামিয়ে ফেলুন। একটা কড়াইতে তেল গরম করে তাতে পেঁয়াজ কুচি ভাজুন। লাল হলে পর একে একে তেজপাতা , রসুন বাটা , ধনে বাটা দিয়ে ভাল করে ভেজে সবজি মেশান। সবকিছু ভালভাবে মিশে মাখামাখা হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

আনারসি পোলাও

গোবিন্দভোগ চাল ৩০০ গ্রাম, মিক্সিতে মিহি করে পেস্ট করে নেওয়া আনারস ২০০ গ্রাম, জল ২০০ গ্রাম, তেজপাতা ২ টা, এলাচ ৩টা, দারচিনি ২ টুকরা, লবঙ্গ ৫ টা, নুন স্বাদ মত, চিনি ২ চা বেচামচ, রোস্ট করা কাজু ১০ টা, ভাজা কিশমিশ ১০ টা, সামান্য দুধে ভেজানো জাফরান ৭/৮ টা, সাদা তেল ১ চামচ , ঘি ১ চামচ +১ চা চামচ, আদাবাটা ১ চামচ

প্রণালি :

চাল ধুয়ে আধ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। এবারে চালনিতে জল ঝরিয়ে রাখুন। কড়াইতে তেল ও ঘি দিন। তাতে গোটা গরম মশলা ও তেজপাতা দিন। সুন্দর গন্ধ বেরোলে চাল দিয়ে নাড়ুন দু টিম মিনিট। এবারে আদা বাটা দিয়ে আবারো সামান্য নাড়ুন। এবারে নুন, আনারসের রস ও জল দিন। কিছুক্ষণ ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে দমে বসান। চিনি দিন। জল টেনে ভাত ঝরঝরে হয়ে এলে ভেজানো জাফরান দিন। দু মিনিট স্ট্যান্ডিং টাইম এ রেখে পরিবেশন করুন। কষা মাংস, দই রুই, কালিয়া , কোর্মার সঙ্গে just জমে যাবে।

চালকুমড়া পাতার ভ্যাদা

চালকুমড়া পাতা ৭ টি
নারকেলের দুধ ২০০ গ্রাম
আদা বাটা ১ চা চামচ
রসুনবাটা ১ চা চামচ
জিরা বাটা এক টেবিল চামচ
পেঁয়াজ বাটা ১ চা চামচ
হলুদ বাটা আধ চা চামচ
কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ
সাদা সর্ষে বাটা ২ চা চামচ
নুন স্বাদমতো
সর্ষের তেল ৩ চামচ

প্রণালি :

চালকুমড়া পাতার আঁশ ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে হবে । সব বাটা ও গুঁড়ো মশলা তেল দিয়ে মেখে নিন। প্রতিটি পাতায় সমান ভাবে মশলা মাখিয়ে ভাঁজ করে নিন। কড়াইতে সামান্য তেল দিয়ে পাতাগুলো ভেজে তুলে নিন। ওই কড়াইতে নারকেলের দুধ দিয়ে দুমিনিট ফুটতে দিন । তারপর ভাজা পাতাগুলো তাতে ছেড়ে ফোটান। দুধ ঘন হয়ে প্রায় শুকিয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan kobita

গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

ক বি তা

গৌ র শং ক র   ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

কবিতার জন্ম হবে

এমন একটা দিন কি আসবে

যে কোনো রুক্ষ দিনেও

একটা কবিতার জন্ম হবে

মাঝে মাঝে বাতাসের গায়ে গায়ে থাকতে চাই

কেমন এক হা হা ধ্বনি যেন শুনি

দরজা জানলা বন্ধ হচ্ছে

যেমন তেমন

 

কোনো কিছুর মধ্যেই আর

নিমেষ নেই

কেবলই ভাঙা আর ভাঙা

এই ভাঙার পরেই শুরু হবে

নতুন দিনের কবিতা

 

একটা সময় ছিল

একটা সময় ছিল

যখন রোজই আমাদের দেখা হতো

মাঝে মাঝে মনে হতো

হয়ত এমন একটা দিন আসবে

যখন আমাদের আর দেখা হওয়ার

ফুসরত থাকবে না

 

রাস্তার মোড়ে পার্কে

অথবা লেকের জলের ধারে এক মুহূর্ত

দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া

নিরালা বেঞ্চের কাছে

সে সব আর এখন হওয়ার নয়

এখন কেবল একটা সময়

কোনো কিছুর নাগাল পেতে চাওয়া

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

সিনে দুনিয়া

সি নে  দু নি য়া

অ র্পি তা   স র কা র

arpita

তরঙ্গ… the wave of life

পাশাপাশি ঘর দুটো। দুটো জানলা। নির্বাক। ওম্হারা। চায়ের কাপের আরাম নিছকই ভান… এমনই নিস্তরঙ্গ ফ্রেম ডিঙিয়ে ঢুকতে হলো ‘তরঙ্গ… the wave of life…’ ছবিতে। সোহাগ থাকে একটা ঘরে।  অভিজিৎ আর একটা ঘরে। আগর গাছের বুক ছিঁড়ে গন্ধ নিঙড়ে নেয় অভিজিৎ। অসুস্থ সে। মারণ রোগ। সোহাগকে দিতে পারেনি সন্তানও। কলকাতা থেকে দূরে পুরুলিয়ায় চাকরি নিয়ে এসে সোহাগ জীবনটাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। বাঁচাতে চায় যাপনটাকে। সোহাগের বন্ধু রাজীব হাত বাড়িয়েছে। নিজের কোম্পানিতে চাকরিটা রাজীবই করিয়ে দিয়েছে। কৃতজ্ঞ সোহাগ।  কৃতজ্ঞতার ঘাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনন্ত একটা প্রান্তরও বোধহয় ডাকবে কিছু পরে। অতএব চেনা চেনা গল্পের আদলে ছবি হাঁটতে থাকে। বাধ সাধে অভিজিৎ। একদিন ডিমের তরকারি রান্না করে অপেক্ষা করতে থাকে সোহাগের জন্য। সোহাগ খেতে ভালোবাসে। সে তরকারি সোহাগ খেল নাকি খেল না সেটা বুঝতে বুঝতে মনটা দ্রব হয় রাজীবের নরম চোখদুটো দেখে… সোহাগ মাখতে চায় ওইচোখ। তাই বলে পুরুলিয়ার মুখোশ শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা পাইয়ে দিতে চাকরি ছাড়তে পিছপা হয় না সোহাগ। রাজীবের কোম্পানিতো ঠকাচ্ছে মুখোশ শিল্পীদের। শিল্পী হয়ে এই অন্যায় সোহাগ মানবে কেন! ক্রমশ আপোষে অনীহা জমাচ্ছে যে তার জীবনেও, জীবিকাতেও। আপোষে আপত্তি অভিজিতেরও। চিকিৎসা আর চিকিৎসকের সঙ্গে আপোষ করতে চায় না। কারণ কেমো নিলে  সে অসুন্দর কুদর্শন হয়ে যাবে সে। সুন্দরকে সে আদরে আতরে রাখতে চায়। পারফিউম এর কোম্পানি ডুবে গেলেও তাই সুগন্ধী বানানোর নেশায় অভিজিৎ ডুবেই থাকে। গন্ধ খোঁজে। পরাণের। পায়ও হয়তো। তাই হারিয়ে যাওয়ার আগে এবং পরেও সুগন্ধী আঙুলে ছুঁয়ে থাকে তার সোহাগী জীবনকে। আর জীবন ছুঁয়ে থাকে সোহাগকে। নতুন ব্যবসা আর নবীন স্বপ্নের গা ঘেঁষে ভেসে আসে আলতো রঙের পাঞ্জাবীর ইশারা। সোহাগের ইচ্ছে ছিল রাজীবকে পাঞ্জাবীতে দেখার। দেখল…

ক্যারাম খেলে অভিজিৎ। একা একা। নিজের দান, তারপর প্রতিপক্ষের দানও দিয়ে দেয়। আসলে বোধয় কথা বলে একা একা। দুয়ে মিলে এক হওয়া হয়নি তাই নিজেকে টুকরো করেছে। ছেঁড়া ছেঁড়া কোলাজ কোলাজ দিন কাটে তার। খাটে শুয়ে থাকে দিনের বেশি সময়ে। খাটখানা ছোট। অভিজিতের পা বেরিয়ে থাকে খাটটা থেকে। আশ্রয় অকুলান। সেও যে পারেনি ছায়ার ঠাঁইটুকু পেতে দিতে। সোহাগের চোখের পাতায় তাই শীত লেগে থাকে। শীত লেগেছিল এগ্রামের শিল্পীদের বুকেও, তাই তো আগুনের খোঁজ জারি ছিল। কানা কড়ি মূল্যের শিল্পী বিপ্লবের  ছটফটানিতেও এই খোঁজ ধরা পড়ে যায়। এমনই ফিকে গাঢ় রেখায় হৃদয়ের অবয়ব আঁকা হয়ে যায়। এঁকে দেন পরিচালক পলাশ।

ছবিটির দেওয়াল পুরুলিয়া। বৃষ্টি ধোয়া পুরুলিয়ার সবুজ আকাঙ্খা গড়িয়ে নেমেছে একের পর এক দৃশ্যে। কখনও দৃশ্য ডুব দিয়েছে শান্ত জলের মতো প্রকৃতির অতলে।

কাহিনি, দৃশ্য আর প্রকৃতি একে অন্যের অন্দরে অন্তরে যাওয়া আসা করেছে বারবার। কি সাবলীল সে চলন! সে চলন মৌতাত লিখেছে, লিখেছে হাতছানি। তরঙ্গের ডাক…।

ডাক অমোঘ হয়েছে সুরে, আবহসঙ্গীতে। এ ছবির গান যেন অনেক দিনের পরে মেঘ পেয়েছে বুকের কাছে। তার সোঁদা গন্ধে পায়ের পাতা ভিজিয়ে চলতে চলতে পৌঁছনো যায় মনের কাছে। মন মাঝির কাছে। তারপর তো আকুতি অশেষ। সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রকে শ্রদ্ধা জানাই।

Dialogue মনোগ্রাহী। অকারণ বাক্যের ভিড়ে হারিয়ে যায়নি কথারা। শ্বাস নিশ্বাসের শব্দরাও তাই ভাষা বুনেছে কত! গাভীর চোখের মতো কথারা বেঁধে রাখেনি মন, বেঁধে বেঁধে রেখেছে মুহূর্তদের। মুহূর্তরা মুখ আর মুখোশের রঙ বিনিময় করেছে অনায়াসে। তাতেই চরিত্ররা জন্মের মতো মৃত্যুর মতো জেগেছে নিভেছে আবার জেগেছে। সোহিনী, বাদশা,  রণজয়, অমিত সাহা, পাপিয়া ঘোষ, সুকান্ত গুহরায়, বিশ্বজিৎ রায় কি আদৌ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাকি চরিত্র যাপন করেছেন?

Make up বিহীন তাদের মুখগুলোতে কি অনায়াসে উড়ে গেছে মাছরাঙা, ভেসেছে মৃত তারাদের কবিতা।

গভীরতা মন্থর করে। তাই ছবিটির গতি ধীর। গর্ভে শস্যের গন্ধ নিয়ে সময় যেমন চলে আরকি… প্রতীক্ষায় ঘন। ক্ষতি নেই।  ক্ষতরা আরাম পায় বরং।

Main stream ছবি নয়! প্রতিকূলতার অভাব নেই। স্বার্থের অর্থ বা অর্থের স্বার্থ এখানে নগণ্য। কেবল সৃষ্টির উদগ্র নেশাতেই এই ধরনের ছবি জন্মায়।  আসলে জন্মায় স্বপ্নকামী ঢেউগুলো…তরঙ্গ… the wave of life।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

চরৈবেতি

চ রৈ বে তি

ড. ফা ল্গু নী   দে

falguni_dey

শৃঙ্খলা পাহাড়ের প্রথম এবং একমাত্র শর্ত

পথের নেশাই মানুষকে ঘরছাড়া করেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু অথবা আরও দূর দিকশূন্যপুরে সে পাড়ি দিয়েছে নিজের অন্তরাত্মাকে জয় করতে। তাই খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই “কতটা পথ হাঁটলে পথিক হওয়া যায়”, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই অমোঘ প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে দিকে দিকে। মানুষ চিরকাল সুন্দরের উপাসক এবং সত্যের অনুসন্ধানী। এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর এবং অনিত্য মানুষ তার কাছে যেতে চেয়েছে বারবার। এইভাবে একদিন পায়ের তলায় সর্ষের আয়োজনটুকু কোনোক্রমে জুটিয়ে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। আসমুদ্রহিমাচল প্রসারিত এই ভারতবর্ষের উত্তরে জাগরুক দাঁড়িয়ে আছে সুমহান হিমালয় পর্বত। বৈদিক সভ্যতার মুনি-ঋষি থেকে শুরু করে হাল আমলের ট্রেকার-মাউন্টেনিয়াররা পাহাড়ের এই বিশালতার সামনে নিজেকে সমর্পণ করেছে। এই যে পাহাড় পথে হাঁটা, রহস্যের ভেতর পথ খুঁজে খুঁজে এই যে হিমাদ্রি বেঁচে থাকা, এ তো আসলে নিজেরই বিন্দুতম অস্তিত্বের অনুসন্ধান। 

ভূগোলের পাতায় পাহাড়ের একটি বিশেষ অবদান রয়েছে। হিমবাহের বরফে ঢাকা উপত্যকা, খরস্রোতা বয়ে চলা নদী, সুনীল জলের সরোবর, সবুজ পাইনের জঙ্গল, বৃষ্টি অরণ্য, মেঘের আড়ালে সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, বিরল প্রজাতির জীবজন্তু পাখি ইত্যাদি মিলিয়ে এক মনোহর প্রাকৃতিক আয়োজন। অন্যদিকে এঁকেবেঁকে উপরে উঠে যাওয়া অচেনা পাহাড়ি পথ, সবুজ বুগিয়ালের বুক চিরে এক টুকরো জনপদ, ভেড়ার পাল নিয়ে পথ আগলে পাহাড়ি বেদুইন, কঠোর পরিশ্রমী পাহাড়ি জনজাতির মানুষ, এইসব নিয়েই আমাদের পাহাড় পথের সংসার। 

সমতলের দৈনন্দিন জীবনের ইঁদুর দৌড়ে যখন বুকের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসে, মানুষ এক ছুট্টে পালিয়ে আসে পাহাড়ের কাছে। মাথার ভিতর জীবনের নানান প্রশ্নের জটিলতা যখন মাকড়সার মতো জাল বোনে মানুষ তখন পাহাড়ের বিশালতার কাছে এসে দাঁড়ায়। গৃহস্থ থেকে সংসারী, চাকুরীজীবী থেকে ব্যবসায়ী, ভবঘুরে থেকে দার্শনিক প্রায় সকলেই পাহাড়কে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজস্ব অনুভবে চিনতে চেয়েছে। 

তপস্যার দেবভূমি এই হিমালয় একদিন কালের নিয়মে প্রযুক্তির হাত ধরে ঢুকে পড়ল বিনোদনের অঙ্গরাজ্যে। পরিবেশের স্বার্থ রক্ষায় ভাটা পড়লো, গুরুত্ব পেল অর্থ উপার্জনের চাহিদা। সমতল থেকে কিলবিল সংখ্যক মানুষ পাড়ি জমালে আরও উপরে হিমালয়ের নিভৃত অন্দরমহলে। ভাবখানা এমন যেন টাকা থাকলেই পাহাড়কে কিনে নেওয়া যায়! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য তাঁর ‘পাহাড় চূড়ায়’ কবিতায় স্বেচ্ছায় ঠকে গিয়ে একটি নদীর বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিলেন একটি আস্ত পাহাড়। কিন্তু ভাব রাজ্যের এমন রাবীন্দ্রিক ‘বলাই’ এ পৃথিবীতে আর কয়টি আছে? 

পাহাড়ের প্রতি মানুষের টান দীর্ঘদিনের। সেই ১৯৬০ সালে পর্বত অভিযাত্রী সংঘের নন্দাঘুন্টি সফল অভিযানের মধ্যে দিয়ে বাঙালির পাহাড় চড়া শুরু। ভারতীয় ইতিহাসটি আর সামান্য কিছু পুরোনো। কিন্তু ইদানিং যেন ‘উঠলো বাই তো ট্রেকিং করতে যাই’ গোছের একটি মানসিকতা তীব্রভাবে ধরা পড়ছে চারিদিকে। কোনোরকম নিয়ম কানুন না জেনে অথবা সামান্য জেনে, আগাম শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি না নিয়ে, কাগজপত্র-বই না পড়ে, শুধুমাত্র কিছু ভুঁইফোড় ইউটিউব ভিডিওর ভরসায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। বিপুল অর্থ উপার্জনের এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। ফলস্বরূপ প্রতিদিন পর্যটক, পুণ্যার্থী এবং ট্রেকারদের জন্য তৈরি হল বিভিন্ন গুণমানের হোটেল, মোটেল, লঙ্গরখানা এবং হোমস্টে। গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, কাঞ্চনজঙ্ঘার উঠোন অব্দি মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যন্ত্রযান হাজির হলো। সফল অভিযানের নিশ্চয়তা দিয়ে রাতারাতি তৈরি হলো ট্রাভেল এজেন্সি। পথ দেখানোর জন্য গাইড-মালবাহক। পাহাড়ের যে কোনো উচ্চতায় মনপসন্দ খানাপিনার আয়োজন কম পড়লো না। মাথার টুপি থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত ঢেকে ফেলবার নামিদামি সাজ পোশাক তৈরি হলো। রাত কাটাবার জন্য অত্যাধুনিক টেন্ট কেনা হলো। পাহাড়কে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে নেবার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হলো। হাঁটার পথে বলিউডি উল্লাসে বিনোদনের জন্য ব্লুটুথ স্পিকার এলো। যেখানে সেখানে ফেলে রাখা প্লাস্টিক আবর্জনা স্তূপ হয়ে উঠলো। কর্পোরেট দুনিয়ার ধুরন্ধর এজেন্সির কাছে অসহায় মাথা নামিয়ে বশ মেনে নিলো গ্রামীণ অশীতিপর বৃদ্ধ গাইড। নিরীহ গ্রামবাসীদের জমি ঠকিয়ে সস্তায় কিনে নিলো সমতলের জমি মাফিয়া। রাষ্ট্রের স্বার্থে বড়ো বড়ো জলাধার নির্মাণে স্থানীয়রা ভিটে-মাটি-জঙ্গল খুইয়ে রিফিউজি হলো। ভাবুন, ভালোবাসার পাহাড়কে, নৈসর্গের পাহাড়কে, জীববৈচিত্রের পাহাড়কে, সমতলের কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের সামনে বিনোদনের থালায় সাজিয়ে দিয়ে পাহাড় অথবা পাহাড়িয়াদের কি এতকিছু পাওনা ছিল? আমাদের কি তাদের কাছে একটি সবিনয় অনুমতি অথবা ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে নেওয়া জরুরি নয়? তেনজিং নোরগে তো এভারেস্ট শীর্ষ স্পর্শ করার পর সাগরমাথার কাছে চোখের জলে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। তাহলে কার হাতে তিনি পরম্পরা ছেড়ে গেলেন?

সুতরাং ‘নিভৃত সেই বিজনপ্রদেশ’ বলে পৃথিবীতে তাহলে আর কিছু রইল না। একটু তথ্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। বিগত ৩০ বছরে (১৯৯০-২০২০) জনপদ বিস্তারের প্রয়োজনে, বাড়তি খাবারের যোগান মেটাতে এবং অবশ্যই শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে আমরা পৃথিবীর ১০% বিজনপ্রদেশ হারিয়ে ফেলেছি। আন্টার্কটিকাকে বাদ দিলে রাশিয়া, কানাডা, আমেরিকা, ব্রাজিল এবং অস্ট্রেলিয়া- এই পাঁচটি মিলিত দেশ এমন এক ৭০% শেষতম পৃথিবীর অধিকারী যেখানে মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। পৃথিবীর এই বহুচর্চিত কৌমার্যের অধিকাংশই ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য এবং নাতিশীতোষ্ণ বনভূমি দিয়ে তৈরী। গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস অ্যাসেসমেন্ট, ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ মিলিয়ন হেক্টর অরণ্য আমরা নির্বিচারে ধ্বংস করে চলেছি। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র হ্রাস, বিশ্ব উষ্ণায়ন ইত্যাদির তথ্যসূত্রে তা প্রমাণিত সত্য।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি পরিচিত শব্দবন্ধ। একে একটি ব্র্যান্ড বললেও দ্বিমতের অবকাশ নেই। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশেষত বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে এর ব্যাপক প্রভাব আর ঠেকিয়ে রাখা গেল না। হিমালয় তথা পৃথিবীর যে কোনো পাহাড় এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জর্জরিত। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারোর মাথায় হিমবাহগুলি, যা কিনা আফ্রিকার শেষতম অহংকার, হারিয়ে যাবে ২০৫০ সালের মধ্যে। আমাদের বাড়ির পাশেই হিমালয়ের অবস্থা আরও দুর্বিষহ। এখানে ৬০০০ মিটার উচ্চতার আশেপাশে ঘটে চলেছে নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বুঝতে হবে পাহাড়ের চরিত্র পাল্টাচ্ছে। বুঝতে হবে শৃঙ্খলা পাহাড়ের প্রথম এবং একমাত্র শর্ত। বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে বরফ গলে হিমবাহের ফাটল বেরিয়ে পড়ছে। গাছ কেটে নেবার ফলে ভূমিধ্বসের ঘটনা বারংবার ঘটছে। উলম্ব-আকাশ ভেঙে অথবা হড়পা বন্যায় জনপদ ভেসে যাচ্ছে। তুষার ধ্বসের জেরে বরফ চাপা পড়ে প্রায়শই জীবনহানি ঘটছে। সাম্প্রতিক কালের সাড়াজাগানো ঘটনা, নেহেরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং-এর পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ শিবিরে ছাত্র-প্রশিক্ষক মিলিয়ে তিরিশ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি প্রশাসনিক চেয়ার নড়িয়ে দিয়েছে। আজকের ঘটনা আগামীকাল ভুলে গিয়ে মানুষ আবার পাহাড়ের পথে বেরিয়ে পড়ছে। এইভাবে আগাম প্রস্তুতি এবং সাবধানতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাবড়ার সুজয়, কল্যাণীর অলোক, বাঁকুড়ার সুভাষ, নিমতার নির্মলরা মৃত্যু মিছিলে সামিল হয়ে যাচ্ছে। সম্মোহিত জনতার মতো, কেউ বোঝার চেষ্টা করছে না, পাহাড় কোটি কোটি বছর ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু পাহাড়ে জীবন ও মৃত্যু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে একটি ভুলের দূরত্বে।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

খেলাইডোস্কোপ

খে লা ই ডো স্কো প

স ব্য সা চী   স র কা র

sabya

লা আলবিসেলেস্তে ও মেসি-মায়া

এখনও চোখ বুজলে শুনতে পাই সেই মায়াময় শব্দটা, ‘মে—সি—য়া!’

শীতের রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়, লেপটা পছন্দমতো সাজিয়ে পাশ ফিরে শুই। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ফাইনালে পেনাল্টিতে করা প্রথম গোলটা, তার পরে দ্বিতীয় গোলের সময় ম্যাক অ্যালিস্টারকে সাজিয়ে দেওয়া ব্যাকহিল। একস্ট্রা টাইমে লাউতোরো মার্তিনেজের শট লরিস বাঁচানো পরে ঠিক সময়ে বলে পা ছুঁইয়ে তৃতীয় গোল।

কিংবা ট্রাইব্রেকার শুরু হওয়ার আগে দু’বার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো। নিশ্চিন্তে গোলটা করে জিভটা অল্প বের করা। লুসেইল স্টেডিয়ামে ওই শব্দের বিস্ফোরণ! মেসি তো মেসিয়াই, যাকে বলে পরিত্রাতা। একটা প্রজন্মের হৃদয়ে লেখা রক্তাক্ষর।

বিশ্বকাপ কভার করে কাতার থেকে ফিরে এসেছি প্রায় মাসখানেক হতে চলল, এখনও পুরোপুরি মেসি-ম্যানিয়া থেকে বেরোতে পারিনি। আদৌ বেরোনো যায় কি? ওয়ান ডে-টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে গোটা আটেক ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করেছি। কিন্তু ফুটবলে বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাত্রার সঙ্গে তার তুলনাই হয় না!

কাতারে পৌঁছনোর পর থেকে ফুটবল সমর্থকদের নানারকম খামখেয়ালিপনা আর পাগলামি দেখেছি। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে আর্জেন্তিনার প্রতিটি ম্যাচ দেখেছি, দেখেছি ব্রাজিলের ম্যাচও। চোখ বুজে বলে দিতে পারি, উন্মাদনা আর টিমের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যদি মাপকাঠি হয়, লা আলবিসেলেস্তে (আর্জেন্তিনা টিমের নাম) হাসতে হাসতে বাকি সব দেশের সমর্থকদের পাঁচ গোল মারবে। হ্যাঁ, ব্রাজিল সমর্থকদের কাছ থেকে দেখেই এই কথা বলছি। শুধু আর্জেন্তিনার দূতাবাসের হিসেব বলছে, প্রায় ৫০ হাজারের মতো আর্জেন্তিনীয় এসেছিলেন কাতার বিশ্বকাপ দেখতে। 

ছোট্ট শহর দোহা, বিশ্বকাপের সময় হোটেল-অ্যাপার্টমেন্টের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। এসব সমস্যাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে মূল শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে আর্জেন্তিনীয়রা গড়ে তুলেছিলেন ছোটখাটো একটা বুয়েনস আইরেস। জায়গাটার নাম আল জনৌব, মরুভূমির কাছাকাছি। সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং ভাড়া করার পাশাপাশি তাঁবু খাটিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু খুঁজে নিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। কনকনে ঠাণ্ডায় কোনওরকমে একটা স্লিপিং ব্যাগে নিজেকে মুড়ে একটা শুকনো বার্গার চিবিয়ে রাত কাটিয়েছেন বহু আর্জেন্তিনীয়। কোনও অভিযোগ নেই, কাকুতি-মিনতি নেই, ফুটবলের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা আছে। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে মেসিরা জেতার দিন স্টেডিয়ামে আলাপ আর্জেন্তিনীয় জুটি সিজার আর ব্যালেন্তিনার সঙ্গে। কত বয়স হবে? সুপুরষ যুবক সিজার বড়জোর ২৫, প্রেমিকা সোনালি চুলের ব্যালেন্তিনা মেরেকেটে ২২! বছর চারেকের প্রেম। ভালোই ইংরেজি জানে দু’জনে, কথা চালাতে গুগল ট্রান্সলেটরের দরকার হচ্ছিল না। 

চার বছর আগে রাশিয়ার বিশ্বকাপে যখন ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ হেরে ছিটকে গিয়েছিল নীল-সাদা জার্সি, বুয়েনস আইরেসে সিজারের অ্যাপার্টমেন্টে টিভির সামনে বসে কেঁদে ভাসিয়েছিল ব্যালেন্তিনা। প্রেমিকার মুখের দিকে তাকিয়ে সিজার বলে ফেলে, ‘কী একটা রাত! ওর কান্না সামলানো যাচ্ছে না। আমরা বারবি কিউ করেছিলাম, ওয়াইন কিনেছিলাম। সব পড়েছিল। কারণ, ব্যালেন্তিনা ধরে নিয়েছিল, মেসি আর পরের বিশ্বকাপে খেলবে না! তাই এ বার যখন আমরা এক বছর আগে কোপা আমেরিকা জিতলাম, ব্যালেন্তিনাই ঠিক করল, কাতার যাবে!’ সেই আমাদের অল্প অল্প করে অর্থ জমানোর শুরু। তার পরেও ডলার ধার করতে হয়েছে, কিন্তু বুয়েনস আইরেস থেকে কাতারের প্লেন ধরতে ভুল করেনি প্রেমিক-প্রেমিকা।

ব্যালেন্তিনা পাশ থেকে বলছিল, ‘ইউ নো হোয়াট? হোয়েনেভার আয়াম ইন এনি কাইন্ড অফ ট্রাবল ইন লাইফ, আই থিঙ্ক অফ মেসি! এভরিটাইম হি সেভস মি!’

সিজার নিজে ছোটখাটো ব্যবসা করে, কিন্তু কাতার আসার প্ল্যানে সমস্যা ছিল ব্যালেন্তিনার চাকরি। ব্যালেন্তিনার অফিস বিশ্বকাপের জন্য এক মাস ছুটি দিতে রাজি হচ্ছিল না। তার পরে? 

সিজার উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, ‘ব্যালেন্তিনা এক কথায় ভালো একটা কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে দিল!’

পাশ থেকে ব্যালেন্তিনা যোগ করে, ‘জব ক্যান কাম অ্যান্ড গো। হু কেয়ারস! আই লাভ মেসি। সো আয়াম হিয়ার টু উইটেনস হিস্ট্রি!’

যে মেয়ের অস্থি-মজ্জা, শিরায় শিরায় মেসি-মায়া ঢুকে পড়েছে, সে-ই তো পারে এমন পাগলামি করতে! এ পাগলামির পিছনে ভণ্ডামির বদলে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ আছে, মেসি-মায়ার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা আছে, তার জন্য প্রবল বিশ্বাস আর এক আকাশ ভালোবাসা আছে।

আমি অবাক হচ্ছি দেখে সিজারকে কী একটা বলল ব্যালেন্তিনা। এ বার সিজার বলল, ‘আপনি একবার আল জনৌবে আসুন। দেখবেন কীভাবে শুধু মেসির জন্য এই বিশ্বকাপে এসেছে নতুন প্রজন্ম। দিয়েগো আমাদের দেশে ঈশ্বর, বাবা-কাকাদের কাছে ওঁর কথা শুনেছি। টিভিতে ছিয়াশির গোলগুলো দেখেছি। বিশ্বজয় দেখেছি। কিন্তু মেসি আমাদের রক্তের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। আপনাকে লুসিওর কথা বলি!’

কে লুসিও?

‘বয়স ৮২, মাস পাঁচেক আগে হাইওয়েতে গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী, ছেলে-বউকে হারিয়েছে। ছেলে মেসির ভক্ত ছিল। এ বার বাড়ি বন্ধক রেখে বিশ্বকাপে এসেছে ছেলের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে!’ বলছিল সিজার।

কেন?

সিজার বলে ওঠে, ‘ঠিক ছিল, ছেলে বৃদ্ধ বাবাকে কাতারে নিয়ে আসবে বিশ্বকাপ দেখতে। লুসিও বিশ্বাস করে, স্টেডিয়ামে প্রতিটি ম্যাচে ছেলে ওর পাশে বসে থাকে। মেসিকে দেখে। আর্জেন্তিনাকে দেখে। রাতে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ছেলের সঙ্গে আপনমনে মেসির গোলগুলো নিয়ে কথা বলে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচটা আমরা হেরে যাওয়ার পর সারা রাত লুসিও ছেলের সঙ্গে কথা বলেছিল, বুঝিয়েছিল, কেন হাল ছাড়তে নেই!’

কীভাবে ব্যাখ্যা করি এই বিষাদময় ভালবোসার? এই চিরকালীন বিশ্বাসের? ফুটবল পারে, সব পারে। বদলে দিতে পারে জীবনের মানে!

বিরাশির লুসিওর সঙ্গে দেখা হয়নি, এই আফশোস সারা জীবন থাকবে। কিন্তু কল্পনা করতে পারি, লুসেইল স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের রাতে ছেলের সঙ্গে বসে ও নিশ্চয়ই ওয়াইনে চুমুক দিয়েছে! দু’জনে হাই-ফাইভ করেছে। 

কবি বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন, ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!’ 

লুসিও-ই আসলে প্রকৃত সারস, যে উড়ে যাচ্ছে। মেসির দিকে, ফুটবল-ঈশ্বরের দিকে!

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

ক্যানভাস

ক্যা ন ভা স

শু ভ   চ ক্র ব র্তী

suvo

আঁধারহীন অচিন্ত্য সে

আমাদের আশ্চর্য লাগে এটা দেখে যে রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষদিকে একেবারে নতুন করে মেতে উঠলেন অন্য এক নেশায়। হয়তো অন্য এক উত্তরণের আকর্ষণেই তিনি নিবিষ্ট হন এই ছবির নেশায়। ছবির বিষয়ে কথা উঠলে তাঁর চোখে রঙের যে ধাঁধা লাগে তার কথা ওঠে । আমাদের বিস্মিত হই এটা জেনে যে বিশেষ করে লাল রঙের মতো অতি তীব্র একটা আঘাত তাঁর চোখে পড়ে না। অথচ কত ভিন্ন রঙের শব্দ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে আমাদের জানিয়ে এসেছেন । ভিন্ন ভিন্ন লাল রঙের বৈচিত্র্য কি নেই তাঁর শিল্পী জীবনের অন্তরের সবটুকু জুড়ে? অবশ্যই আছে, আর তা তাঁর কবিপ্রকৃতির আভায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলবেন লাল বলতে ঠিক যা বোঝায়, সে আভায় তাঁর দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, এরকম একটা ভয়ঙ্কর প্রলেপ তিনি তাঁর দৃষ্টির বাইরেই পেলেন না ! এটা সম্ভব কি যদি আমরা তাঁর আঁকা ছবির দিকে তাকাই? মনে কি হবে সত্যি এরকম টা যেন ভিন্ন কোনও রুচির প্রভাব, ভিন্ন কোনও মনের প্রভাব? এভাবে কি দেখা যায়, এমন করে কেউ কি ভাবতে পারেন নিজের জীবনে? আমরা তাঁর আঁকা একটি ছবির কথা ভাবতে পারি, যে ছবিটিতে আমরা একটি নারীকে নৃত্যের ভঙ্গিমায় দেখি এবং তার দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত এক ভিন্ন ভঙ্গিমায়।

ছবিটি একঝলক দেখে কেউ বলতে পারেন নারীমুক্তির আহ্বান বা বলতে পারেন লোকায়ত নৃত্যের আভা যেন রবীন্দ্রনাথ ওই ছবিতেও ধরতে চেয়েছেন। যার দু’ই হাতে আগুন আলোয় উদ্ভাসিত ভিন্ন কোনও নাচের উপকরণ যেন আমাদের দৃষ্টিকে আরও রহস্যময় করে তুলছে! সত্যি কি এমন করে ভাবতে পারি আমরা? যখন ওই ছবিটি ঘিরে রয়েছে অজস্র ভাবনার আগুন। মনে কি হয় তখন এই সহজ উপায় আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে? ইচ্ছে হয় ভাবতে, যেন অগ্নি বসন্তের আহ্বান করছে, রবীন্দ্রনাথ যেন বসন্তের আহ্বানে আত্মবিশ্বাসী অগ্নি-কে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কল্পনা করেছেন, তেমনই যেন বর্ণবিন্যাস আমাদের আরও সংযত হতে বাধ্য করে। আমরা যদি ছবিটিকে একটু তলিয়ে দেখি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার একটা ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতি অনুমান করতে পারব। রবীন্দ্রনাথ অন্য ছবির মতো এ ছবিটিও প্রথম কালি কলমে স্কেচ করেছেন তারপর রঙ ভরেছেন, ওয়াশ করছেন। কিন্তু তা তিনি করছেন সেই সময়েই, স্পেস ব্যবহার করছেন এক ভিন্ন আঙ্গিকে, আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি সেইদিকে। সমস্ত ছবি জুড়ে যে তিনি ভারতীয় ছবিকে ভিন্ন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং আমাদের চিত্রশিল্পকে কয়েকশো বছর এগিয়ে দিলেন তাঁর মনের রঙে, যেখানে অগ্নি একদিকে প্রাণের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে তার আঙ্গিকে, আবার অন্যদিকে ফর্মকে ভেঙে ফেলছেন। এক ভিন্ন আঙ্গিকে আমরা এক অধরার অর্তি ফুটে ওঠা দেখি সমস্ত ছবিটি জুড়ে। কখনও আবার স্কেচের উপর রঙ দিয়ে পূর্ণ করেছেন ছবির ভুবন। কখনও হাত দিয়ে, কখনও তুলির সাহায্যে ছবিকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। এই ছবিতে শুধু নয়, অন্য ছবিতেও একইভাবে রঙের আভায় ভেঙেছেন ফর্ম। এই যে তাঁর ছবি আঁকার ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতির কথা বলা হলো, তা তিনি আয়ত্ত্ব করেছিলেন ভিন্ন এক ঘটনায়, যখন তিনি তাঁর পাণ্ডুলিপি সংশোধন করছেন, আর ছবির মতো কিছু গড়ে উঠছে সেই সময় থেকে। আমরা অনুমান করতে পারি, যদি তাঁর সেই সময়কার কিছু লেখার ভিতরে দিয়ে যেতে পারি এবং আরও আশ্চর্য হতে হয়, যখন তিনি ‘রক্তকরবী’ সংশোধন করছেন বারবার, তখনই যেন ভিন্ন ভিন্ন ছবির  ফর্ম বেরিয়ে আসছে। আমরা মনে করতে পারি যখন তিনি জাপান ভ্রমণের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছিলেন তাঁর রেখার রহস্যময় উন্মোচন। ভেতরে ভেতরে অনুভূতি জমাট বাঁধছে তাঁর অন্তরে। যেন তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর অন্তরজগতের আধারটি। এমন একটা বোধে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে খুঁজে পেলেন, যেন তাঁর চিত্রবোধের আকাঙ্ক্ষাটি গেল, আরও সহজ হয়ে উঠল আত্মবিশ্বাসের ছন্দ।

এমনকি এও মনে হতে পারে অগ্নি যেন ‘নন্দিনী ও দামিনী’-র আদলে বসন্তের চিরন্তন রক্তিম আকাঙ্খাই ওই ছবিটির সামগ্রিক বেদনা । যে বেদনা শুধু আমি-র দিক থেকে হয়ে ওঠে না, সে হয়ে ওঠে সমগ্রের দিক থেকে সত্যকে ছুঁয়ে থাকবার ব্যথা । আমরা যদি তাঁর অন্য একটি ছবির কথা ভাবি, যে ছবিটিতে আমরা দেখি একটি নারী ঘোমটা টানা, বাসন্তী ও ফুল, সেখানেও যেন অন্ধকার থেকে উঠে এসেছে বাসন্তী নতুনের দিকে। আর ওই সময়ের জাপান ভ্রমণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘টাইক্কানের ছবি যখন প্রথম  দেখলুম, আশ্চর্য হয়ে গেলুম। তাতে না আছে বাহুল্য, না আছে শৌখিনতা। তাতে যেমন একটা জোর আছে, তেমনি ‘সংযম’ চমক লাগে তাঁর গোপন পাড়ায়, চমক লাগে আমাদের মনেও একেবারে সামনের সারিতে এসে ধাক্কা দেয়। এই যে ধাক্কা দেওয়ার কথা উঠল, এ কি রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি ওই সময়ের অন্তর দ্বন্দ্বে? একদিন তো এই আঘাতের কথাই লিখলেন চিঠিতে, সে আঘাত বাইরের আঘাত। যা আমাদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে অসীম প্রত্যাশাময় করে তুলে মনের উত্তরণ ঘটায়। তেমন করেই তো একদিন রবীন্দ্রনাথ ঘোষণা করে রানী মহলানবিশকে লিখলেন সে কথা, “এবার আমার জীবনে নতুন পর্যায় আরম্ভ হল। একে বলা যেতে পারে শেষ অধ্যায়। এই পরিশিষ্টভাগে সমস্ত জীবনের তাৎপর্যকে যদি সংহত করে সুস্পষ্ট করে না তুলতে পারি, তাহলে অসম্পূর্ণতার ভিতর দিয়ে বিদায় নিতে হবে। আমার বীণায় অনেক বেশি তার— সব তারে নিখুঁত সুর মেলানো বড়ো কঠিন। আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সমস্যা আমার কবিপ্রকৃতি। হৃদয়ের সব অনুভূতির দাবীই আমাকে মানতে হল— কোনোটাকে ক্ষীণ করলে আমার এই হাজার সুরের গানের আসর সম্পূর্ণ হবে না।” তখন, একটু ভিন্ন কোনও প্রত্যাশা আমাদের আচ্ছন্ন করে, মনে হয় ওই ছবিটি ঘিরে রয়েছে অন্য সময়ের প্রতিধ্বনি, সমগ্র জীবনের উত্তরণের বসন্ত।

 

আরও পড়ুন...