Categories
2020_pujo goddyo

অমৃতা ভট্টাচার্য

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

অ মৃ তা   ভ ট্টা চা র্য

নুনশিউলি

“নুনশিউলি… নুনশিউলি… পনের টাকায় একশো… আট টাকায় পঞ্চাশ…” আশ্বিনের সকালে ঘুম ভাঙত এই আওয়াজে। ঘুমের ঘোরেই জানতাম আরশাদ কাকুর গলা। নুনশিউলি আসলে অবিকল শিউলি ফুলের মতো দেখতে এক রকমের কুড়মুড়ে মুখরোচক খাবার। একটু নোনতা, আবার একটু মিষ্টি। ডাল দিয়ে বানানো খাবারটা বেশিদিন টাটকা রাখা যেত না। তাই দু-তিনদিন ছাড়াই আরশাদ কাকু বাড়ির গলি পেরিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে নুনশিউলি নিয়ে হেঁকে যেতেন। দু’চারজনের ভিড় জমলেই মাথা থেকে যত্নে বেতের ঝুড়ি নামিয়ে রেখে দিতেন শিবমন্দিরের চাতালে। পলিথিন কাগজে মোড়া ছোট ছোট নুনশিউলি আর তার চারপাশে ঝুড়ির কানা ঘেঁষে গোল করে সাজানো টাটকা শিউলি ফুল। প্রতিবার আমার বরাদ্দ ছিল পঞ্চাশ গ্রাম। একটা খেলনা দাঁড়িপাল্লার মত ছোট পিতলের দাঁড়িপাল্লায় হিসেব করে ঠোঙায় ভরে তারপর আরও দু’চারটে ফাউ। শেষে উপরে দু’চারটে শিউলি ফুল ছড়িয়ে তবে ঠোঙাটা আমার হাতে দিতেন কাকু। দেবার সময় হেসে বলতেন, “এটা পুজোর প্রসাদ”। টাকা মেটানোর পর প্রতিবার মা আমার হাত থেকে ঠোঙাটা কেড়ে নিয়ে নিয়ম করে সব ফুলগুলো বেছে বেছে ফেলে দিতেন। আমি কিন্তু খাওয়ার সময় প্রতিবার ফুলের গন্ধ পেতাম। বেশ কয়েকবার কয়েকটা পাপড়ি চিবিয়েও ফেলেছিলাম। আলাদা কিছু মনে হয়নি। শুধু একটু কষা! আশ্বিনের সকালেই আরশাদ কাকু নুনশিউলি নিয়ে আসতেন নিয়ম করে। তাই নুনশিউলি মানেই তখন পুজো শুরু।

দুর্গাপুজো নিয়ে সবার উত্তেজনার কারণ আমার অল্প অল্প বোধগম্য হতে শুরু হয়েছে অনেক পরে। পুজো বলতে আমার কাছে একদিন বা বড়জোর দু’দিন নতুন জামাকাপড় পরে ভিড়ের মাঝে প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে ঘোরা। বাকি সব বাচ্চাদের কাছেও হয়ত পুজো একইরকম। মজার ব্যাপার হল পুজোর অনুভূতিটা আজও আমার কাছে খুব বেশি বদলায়নি। আমার কাছে ছোট থেকেই দেবী দুর্গা একটা বেশ সুন্দর দেখার জিনিস। সুন্দর মূর্তি, সুন্দর আলো… সব কিছুই সুন্দর সুন্দর। বড় বড় প্যান্ডেলের মধ্যে বড় বড় মূর্তি খুব সুন্দর করে সাজানো আর প্রচুর লোকের ভিড়। বাবা-মার হাত ধরে এই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে মূর্তিগুলোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা। প্যান্ডেলের মধ্যে অদ্ভুত নরম আলো আর অসংখ্য কারুকার্যে ঝলমল করা সন্ধেগুলো নেশার মত মনে হত প্রতিবার। ফেরার পথে রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাড়ি ফিরে কাদা হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। প্রায় প্রতি বছরই অষ্টমী কিংবা নবমীতে ঠাকুর দেখতে যাওয়া। দশমী মানে বিসর্জন শুনে এসেছি বরাবর। আমার কাছে অবশ্য আবাহন বা বিসর্জন সবই ওই এক বা দু’দিনেই। যেদিন ঠাকুর দেখতে যাবো সেদিনই দুর্গাপুজো। সকাল থেকেই বেশ একটা অন্যরকম ব্যাপার। সুন্দর সুন্দর প্যান্ডেল, ঝলমলে সন্ধে, রাতে রাস্তায় ভিড়… কত মানুষ ! আলাদা করে ষষ্ঠীর বোধন বা দশমীর বিসর্জন কিছুই দাগ ফেলত না। আজও তাই।

ছোটবেলায় মনে হত ঠাকুর দু’রকমের হয়। একরকম ঠাকুরকে পুজো করা হয় আর একরকম ঠাকুরকে দেখতে হয়। পুজো করতে হয় যে ঠাকুরকে, সেই ঠাকুর আবার মূর্তি নয়। কারণ বাড়িতে মূর্তিপুজোর চল নেই। পূর্বপুরুষ নিষিদ্ধ করে গেছেন মূর্তিপুজো। ছোট থেকে দেখে আসছি বাড়ির তিনটে মন্দির। কালীমন্দিরে তামার ঘট। শিবমন্দিরে পাথরের শিবলিঙ্গ আর মহাপ্রভুর মন্দিরে তুলসীগাছ। যে ঠাকুরকে পুজো করতে হয় সেই ঠাকুরের আবার মানুষের মত চোখ, নাক, কান, হাত, পা থাকে, এটা কখনো মাথাতেই আসেনি। বন্ধুদের বাড়িতে সরস্বতী মূর্তি আসত। আমার বাড়িতে একটা তামার ঘটে আমশাখা। সুন্দর আলপনা এঁকে ঘট রাখা হতো। ঘটের সামনে বিস্তর বই, হারমোনিয়াম, গান-এর যাবতীয় সরঞ্জাম। সরস্বতী পুজোর সকাল থেকে তাই স্কুলে যাওয়ার তাগাদা বেশি ছিল। কি সুন্দর টানা টানা চোখ, সুন্দর শাড়ি পরা একটা ছোটখাটো মূর্তিকে পুজো করতো স্কুলে। আমিও বসতাম সবার সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দিতে। সেই আমার পুষ্পাঞ্জলির একমাত্র অভিজ্ঞতা। বাড়ির আশেপাশে দুর্গা ঠাকুর বলতে বেশ খানিক দূরে জমিদার বাড়ির পুজো আর রায় বাড়ির পুজো। কিংবা আরও খানিকটা দূরে বাসস্ট্যান্ডে বাজারের পুজো। কোনও পুজোর শব্দই আমার কানে এসে পৌঁছত না। ষষ্ঠীর দিনটা আমার কাছে বিশেষ ছিল কারণ প্রতিবছর মামাদাদু ষষ্ঠীতে আমাদের বাড়িতে আসতেন। হই হই ব্যাপার ! নতুন জামা, মিষ্টি। মাকে সারাদিনই দেখে মনে হত উৎসব লেগেছে। যে চারদিন দাদু আমাদের বাড়িতে থাকতেন মা’র মুখটা জ্বলজ্বল করত। আমারও তাই যাবতীয় দুষ্টুমির সাতখুন মাফ। আমার কাছে সেটাই পুজোর আনন্দ। দাদু মারা যাওয়ার পর ষষ্ঠীর দিন থেকে পুজো শুরু হয়না আর।  

আমার কাছে দেবী দুর্গা একটা অদ্ভুত ভাললাগার গল্প, এক পছন্দের প্রতীকী। প্যান্ডেলে ঢুকে আজও প্রণাম করতে পারিনা। কারণ কোনদিনই ওই প্যান্ডেলের দুর্গা আমার ঈশ্বর  হননি। যেমন ঈশ্বর হননি প্যান্ডেল বা মন্দিরের সরস্বতী, কালী, গণেশ, কার্তিক বা ফটোতে জটাধারী শিব। আমার কাছে ঈশ্বর কখনো মূর্তি হয়ে আসেননি। না, আমি নাস্তিক নই একেবারেই। শিবলিঙ্গের পুজো আমার বেশ পছন্দের। শিবের গল্পের সঙ্গে জুড়ে থাকা ধারণা বা দর্শন আমাকে বারবার টানে। যেমন টানে কালী বা দুর্গার সঙ্গে আটকে থাকা ধারণা আর দর্শন। কিন্তু আমার গল্প ওই ধারণাতেই শুরু আর শেষ। বড় হবার পর দেবীমূর্তি দেখে মনে হয়েছে মূর্তির গঠন এক অদ্ভুত ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু পুজো করার কথা মনে হয়নি তখনো। এখনও একবারও মনে হয় না যে আশ্বিনের কোন এক আগমনীতে সমস্ত অশুভ নাশ হবে। তেমনই কোন বিসর্জনের বাজনায় মন কাঁদেনা আমার। 

তবে দুর্গাপুজো আমার কাছে এরকমই কিছু কারণে বিশেষ হয়ে থেকেছে। পঞ্চমীর সকালে আমার হাত দিয়ে মা গরিব বাচ্চাদের নতুন জামা দিতেন। এখন নিজের হাতেই দেন। কারণ, পঞ্চমীতে আমি বাড়ি গিয়ে পৌঁছতে পারিনা। বাকি তিনদিন আমার হাতে শুধু  বিভূতিভূষণ… জানিনা কেন পুজোর কয়েকটা দিন বিভূতিভূষণ ছাড়া আর কিছু মনে আসেনা আজও। আর অষ্টমীর দিনে বাবার আনা মাটির ভাঁড়ে ক্ষীর।

আরশাদ কাকু মুম্বাইতে ছেলের কাছে চলে গেছেন অনেক বছর হল। নুনশিউলির স্বাদটা এখন আর বর্ণনা করার মত করে মনে করতে পারিনা। তবে জিভে টাটকা স্মৃতি লেগে আছে। আশ্বিনের কোনও এক সকালে হঠাৎ ঘুম ভাঙে। মনে হয় কে যেন হেঁকে গেল “নুনশিউলি… নুনশিউলি… পনের টাকায় একশো…” কে জানে এতদিনে নিশ্চয়ই দামটা একটু বাড়াত আরশাদ কাকু! মুম্বাইতে কোন এক গলিতে এই আশ্বিনের সকালে কি কেউ অপেক্ষায় থাকে নুনশিউলির? মুম্বাইতে সেই গলিতে শিউলি ফোটে নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই তারা বোঝে আরশাদ কাকুর নুনশিউলি নামকরণের মাহাত্ম্য! হঠাৎ সকালে ঘুম ভাঙলে ওই রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়াই বারান্দায়। গলির রাস্তায় হাওয়ায় নাকে এসে লাগে শিউলির গন্ধ! ওপরের আকাশটাকেও কি নরম মনে হয় এই ক’দিন! আহা… বছর বছর দুগগা আসুক… বড় ভাল দুগগাঠাকুর…

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

রবিউল ইসলাম

বি শে ষ  র চ না

র বি উ ল   ই স লা ম

বিষয়: শারদীয়া সংখ্যা

কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর সবচেয়ে বড় পার্বণটি হল দুর্গোৎসব। দুর্গোৎসবকে ঘিরে বাঙালির উন্মাদনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছোয় যে সমাজের প্রতিটি স্তর এই উৎসবে প্রভাবিত হয়। সাহিত্যও তার ব্যতিক্রম নয়। শারদীয়া সংখ্যার ব্যাপকতা দেখে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পূজা সংখ্যা’ প্রবন্ধে বলেছেন—

 “সাম্প্রতিককালে শারদীয়া পূজা উপলক্ষ্য করিয়া আমাদের মাসিক ও দৈনিক পত্রিকাগুলির সম্পাদকমণ্ডলী যে পূজা সংখ্যারূপে এক নূতন সংক্রামক প্রথার প্রবর্তন করিয়াছেন, তাহাতে আমাদের মনন-জীবনে যে প্রতিক্রিয়া আসিয়াছে, তাহা মোটেই বহিরঙ্গ বলিয়া উপেক্ষিত নহে।”

(সন্দীপ কুমার দাঁ, ‘পুজো সংখ্যার সেকাল-একাল’)

বাংলা সাহিত্যচর্চা সবচেয়ে বেশি হয় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। সারাবছর পত্রপত্রিকাগুলি দৈনিক থেকে শুরু করে দ্বি-মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বাৎসরিক ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হলেও দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ পত্রপত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে এবং এই সংখ্যাগুলি ঘিরে সাহিত্যপ্রেমীদের মনে যথেষ্ট উৎসাহ থাকে। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ সংখ্যা অর্থাৎ শারদীয়া সংখ্যা বা পুজো সংখ্যা প্রকাশিত হয় সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। 

শারদীয়া সংখ্যা  নিয়ে যে প্রশ্নটি সবার মনে প্রথমে আসে সেটি হল, শারদীয়া সংখ্যার সূত্রপাত কবে থেকে এবং কোন পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। প্রাবন্ধিক ও গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী ১২৮০ বঙ্গাব্দে কেশবচন্দ্র সেনের ‘সুলভ সমাচার’-এর একটি সংখ্যাকে আমরা প্রথম শারদীয়া সংখ্যা বলতে পারি। এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১২৮০ বঙ্গাব্দের ১০ই আশ্বিন। এই বিশেষ সংস্করণটির দাম ছিল এক পয়সা। এ প্রসঙ্গে ‘পুজো সংখ্যার সেকাল-একাল’ প্রবন্ধে সন্দীপ কুমার দাঁ জানিয়েছেন—

“…কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত সংস্কার সভা’ তাদের তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা ‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকার একটি সংস্করণ ‘ছুটির সুলভ’ নামে প্রকাশ করেছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দের পুজোর সময়। অবশ্য পুজো সংখ্যা বলে এতে কোনও উল্লেখ ছিল না, কারণ সম্পাদক কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন ব্রাহ্ম— স্বভাবতই পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি।”

(সন্দীপ কুমার দাঁ, ‘পুজো সংখ্যার সেকাল-একাল’)

‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকার বিশেষ সংস্করণটি যেমন প্রথম শারদীয়া সংখ্যা, তেমনই এই বিশেষ সংখ্যার বিজ্ঞাপনটি হল প্রথম শারদীয়া সংখ্যার বিজ্ঞাপন—

“ছুটির সুলভ!!

আগামী ছুটি উপলক্ষে সুলভের বিশেষ একখণ্ড বাহির হইবে!

উত্তম কাগজ, উত্তম ছাপা। দাম কিন্তু এক পয়সা।

মজা করে পড়িতে পড়িতে ঘরে যাও। একটা পয়সা দিয়ে সকলের কিনিতেই হইবে। দেখ 

যেন কেউ ফাঁকি পোড়ো না।”

(সন্দীপ কুমার দাঁ, ‘পুজো সংখ্যার সেকাল-একাল’)

এরপর আমাদের বেশ কিছুটা সময় অর্থাৎ ১৩২০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় প্রথম পূর্ণাঙ্গ শারদীয়া সংখ্যা পেতে। ১৩২০ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে মাসিক ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা তাদের পুজো সংখ্যা প্রকাশ করে। প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার এই পুজো সংখ্যাটিতে তৎকালীন সময়ের খ্যাতনামা সাহিত্যিক সত্যেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বিপিনবিহারী দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, নিরূপমা দেবী প্রমুখ লিখেছেন। এখন প্রশ্ন হল, ১২৮০ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩২০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত কি দুর্গাপুজোকে নিয়ে কোনো লেখা প্রকাশিত হয়নি? ‘সুলভ সমাচারে’র পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ শারদীয়া সংখ্যা বাঙালির হাতে পেতে ৪০ বছর সময় লাগলেও, এই সময়ের মধ্যে বলা যায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশের পূর্ব প্রস্তুতি চলছিল। এই সময়পর্বে (১২৮০-১৩২০ বঙ্গাব্দ) কোনো বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ না হলেও দেবী দুর্গাকে নিয়ে বিভিন্ন রকমের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, মনোমোহন বসু সম্পাদিত ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় ‘দুর্গাবন্দনা’ ও ‘দুর্গোৎসব’ নামক কবিতা প্রকাশিত হয়। এছাড়া ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকাতে দুর্গাপুজো উপলক্ষে পুজোর পদ্য প্রকাশিত হত। এরপর ১৩২২ বঙ্গাব্দে চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘নারায়ণ’ পত্রিকার পুজো সংখ্যা ‘সচিত্র শারদীয় সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়। এই শারদীয়া সংখ্যাটিতে রঙিন ছবি, কবিতা আর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। আলোচ্য পত্রিকাটিতে দুর্গাপুজো সম্পর্কিত কবিতা— ললিতচন্দ্র মিত্রের ‘আগমনী’ ও ‘বিজয়া’, বিপিনচন্দ্র পালের প্রবন্ধ ‘বাঙ্গালীর প্রতিমা-পূজা ও দুর্গোৎসব’, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শ্রীশ্রীদুর্গোৎসব’, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রবন্ধ ‘দুর্গোৎসবে নবপত্রিকা’ ছাড়াও ভবানীচরণ লাহার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। 

 ১৩২৯ বঙ্গাব্দে মাসিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়, যা বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ গল্পের মধ্যে পড়ে। এই কারণে ১৩২৯ সালের ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ।  ১৩৩২ সনে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের সম্পাদনায় ‘বসুমতী’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ‘বসুমতী’র এই সংখ্যাতেই প্রথম শারদ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকার পুজো সংখ্যাতে রবীন্দ্রনাথের ‘পরিত্রাণ’ নাটকটিও প্রকাশিত হয়। এবার আসা যাক ‘ভারতী’ পত্রিকা প্রসঙ্গে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতী’ পত্রিকার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শারদীয়া সংখ্যা ১৩৩৩ সনে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতী’র পুজো সংখ্যার দাম ধার্য করা হয়েছিল এক টাকা। ‘ভারতী’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’। এর নাট্যরূপ দেন শিবরাম চক্রবর্তী। এই সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতী’ কবিতাটিও প্রকাশিত হয়। 

এবার আসা যাক বাণিজ্যিক পত্রিকা আনন্দবাজার প্রসঙ্গে। আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে ১৯২৬ সালে। আনন্দবাজার পত্রিকায় অনেক খ্যাতনামা সাহিত্যিক লিখতেন। আনন্দবাজার পুজো সংখ্যায় সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, যদুনাথ সরকার, বিধুশেখর শাস্ত্রী, অন্নদাশঙ্কর রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সজনীকান্ত দাশ প্রমুখ লিখতেন। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম শারদীয়া উপন্যাস প্রকাশিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শহরতলী’। ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের এই সংখ্যাতেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রবিবার’ গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। আনন্দবাজার পুজো সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাবরেটরি’ (১৩৪৭) ও ‘প্রগতিসংহার’ (১৩৪৮) গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। আনন্দবাজার গ্রুপেরই পত্রিকা ‘দেশ’ তার প্রথম পুজো সংখ্যা প্রকাশ করে ১৩৪১ সনে। এই পত্রিকাতে প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় আরো কয়েক বছর পরে অর্থাৎ ১৩৫৬ সনে। দেশ পত্রিকার প্রথম শারদীয়া উপন্যাস হল সুবোধ ঘোষের ‘ত্রিযামা’। আনন্দবাজার গ্রুপের ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। ২০০৪ সালে আনন্দমেলা পত্রিকা দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি ‘আনন্দমেলা’ এবং অল্প বয়সি তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রকাশিত হয় ‘উনিশ কুড়ি’। যদিও ‘উনিশ কুড়ি’র মুদ্রিত সংস্করণ এখন আর প্রকাশিত হয় না। বর্তমানে আনন্দবাজার পত্রিকার সমস্ত পত্রিকাই শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে।

বাণিজ্যিক পত্রিকার মধ্যে বর্তমানে প্রতিটি সংবাদপত্র দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে গল্প-উপন্যাস ও কবিতার পসরা সাজিয়ে পাঠকের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়। এই পত্রিকাগুলির মধ্যে আজকাল, স্টেটসম্যান, প্রতিদিন, বর্তমান, এই সময়, উৎসব, শুকতারা, নবকল্লোল, ফেস্টিভ্যাল টাইমস,  প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। 

বাণিজ্যিক পত্রিকার আলোচনা প্রসঙ্গে লিটল ম্যাগাজিন এসেই যায়। বাণিজ্যিক পত্রিকার মতোই লিটল ম্যাগাজিনও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে কতগুলি লিটল ম্যাগাজিন শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে সেই তথ্য আমাদের হাতে নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত কাজ করার অবকাশ থেকে গেছে। তবুও আমরা কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের নাম করতে পারি যারা খুব ভালো শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করত বা এখনও করে থাকে। যেমন নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ’, আসানসোল থেকে প্রকাশিত ‘কোলফিল্ড টাইমস’, আন্দামান থেকে ‘দ্বীপবাণী’, ‘অনুষ্টুপ’ প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন উল্লেখ করার মতো শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে।

শুধুমাত্র সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত পত্রপত্রিকাই শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আকাশবাণী’র ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা, সিনেমা সংক্রান্ত পত্রিকা ‘উলটোরথ’ ও ‘প্রসাদ’-এর নাম করা যায়। বলা বাহুল্য যে ‘প্রসাদ’ পত্রিকায় মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশীর মা’ প্রকাশিত হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনও শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে। যেমন, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পত্রিকা ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার শারদ সংখ্যা, রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশনের ‘তত্ত্বমসি’ শারদ সংখ্যা, আদ্যাপীঠ মন্দির থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃপূজা’ প্রভৃতি পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যাগুলি উল্লেখযোগ্য।

পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে দুর্গোৎসবে পত্রপত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা বাঙালির জীবনে কতখানি জুড়ে রয়েছে। তাই বর্তমানে প্রিন্ট থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা তাদের শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করছে। ব্লগজিন, ওয়েবজিন ও অনেক পত্রিকা তাদের ওয়েব সাইটে পুজো সংখ্যা এই মহামারীতেও পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে শারদীয়া সংখ্যার প্রকাশ মাধ্যমও পরিবর্তনের দিকে পা বাড়িয়েছে। মাধ্যম যাই হোক না কেন, লাভ বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যপ্রেমী পাঠকেরই।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo Uncategorized

সুদীপ্তা রায়চৌধুরী মুখার্জী

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

সু দী প্তা   রা য় চৌ ধু রী   মু খা র্জী

দুর্গা পূজা: কার্নিভাল

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের ম‍ধ্যে দুর্গাপূজা শ্রেষ্ঠ পার্বণ। ঐতিহ্যে-অলঙ্কারে-সমারোহ-প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্যে যে অনুষ্ঠান আজ কার্নিভালের রূপ নিয়েছে। দর্শন-পৌরাণিক কাহিনি-আনুষ্ঠানিকতা এই তিনের মেলবন্ধনই ধর্ম । বাঙালি সেই সঙ্গে আন্তরিকতার মিশেলে ধর্মকে উৎসব থেকে ঐতিহ্যের কার্নিভালে পরিণত করেছে। যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের থেকেও সামাজিক, পারিবারিক, স্নেহবিধুর মরমী আবহের সার্বিক চিত্র পরিলক্ষিত হয় । উমা এখানে পূজিত হন কন‍্যা ভাবে। তাই তো বাংলার ঘরে ঘরে গান বাজে ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী উমা নাকি বড় কেঁদেছে’ – বাঙালি মায়ের চিরন্তন আকুতি ।

জগজ্জননীকে এইভাবে ঘরের কন্যা করে গড়ে তোলার রীতি ভারতের আর কোনো প্রদেশে বড় একটা দেখা যায় না । অধ‍্যাত্মবাদের সঙ্গে নিত্যযাপনের মিশেলের অন্য নাম বাঙালিয়ানা। 

আগমনী গানে বাংলার প্রকৃতি প্রতিফলিত হয় । কাশফুলের মায়া , শিউলির গন্ধ , প্রভাতী শিশির , নীলকন্ঠ পাখির ডাকে মুখরিত বাংলার গ্রামের শরৎ সজ্জা । সুজলাং-সুফলাং-শস‍্যশ‍্যামলাং ধরণী যেন তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ উজাড় করে অপেক্ষা করে দেবী আবাহনের । পূজার উপচারেও বাংলার প্রকৃতির উজ্বল উপস্থিতি । নবপত্রিকা অর্থাৎ বাংলার ফসল – ধান, যব, কচু , মানকচু, বেল, অশোক , হলুদ , কলা, ডালিম । যা কলা বউ নামে পরিচিত । এই কলা বউকে আবার গণেশের বউ ভাবা হয় । এও বাংলার সংস্কৃতি । একাত্ম হবার সংস্কৃতি ।

দেবী মন্ত্রে আছে ‘স বাহনায় স পরিবারায়’-এর উল্লেখ , যা কি না রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত ‘বাংলার ঘরে যত ভাইবোন’-এর মূর্ত প্রতীক । কার্তিক হচ্ছেন দেবীর কনিষ্ঠ সন্তান , যিনি বৈদিক দেবতা নন , পৌরাণিক মতে ইনি দেব সেনাপতি । ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইনি পূজিত হন মুরুগান-স্কন্দ-সেন্থিল নামে । কিন্তু বাংলায় ইনি পুরুষের সৌন্দর্য পুত্র সন্তানের দ‍্যোতক । কার্তিক মাসে ইনি পূজিত হন আর কথিত আছে ছড়ার আকারে ‘কার্তিক ঠাকুর হ‍্যাংলা একবার আসে মায়ের সাথে একবার আসে একলা’। এরপর আসি গণেশের কথায়। ইনি সমৃদ্ধির প্রতিভূ । সর্বপ্রকার সাফল্য এঁর নখদর্পণে । ইনি গজানন, গণপতি প্রভৃতি নামে পরিচিত । বাংলায় তিনি Chubby শিশুর প্রতীক । ‘গনেশ দাদা পেটটি নাদা , লুচি খায় গাদাগাদা’ এই ছড়াতেই তিনি আবদ্ধ । আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও বাংলায় এঁর আলাদা পূজার প্রচলন ছিল না । ইনিও পৌরাণিক দেবতা । এঁর মূর্তি শুধু পূজা নয় , সৌন্দর্য্যায়নেও ব‍্যবহৃত হয় । দেবীর অপর পাশে থাকেন লক্ষ্মী । যিনি অর্থ-সৌভাগ্য-সমৃদ্ধি-সৌন্দর্য‍ের প্রতীক । তিনি ধনলক্ষ্মী, তিনিই ধান‍্যলক্ষ্মী । কোজাগরী পূর্ণিমায় ইনি শুধু বাংলার ঘরে ঘরে পূজিতা হন । অথচ সারা ভারতে এঁর অসংখ্য মন্দির আছে । ধৃতি , কমলা , আরনা , নন্ধিকা নামে ইনি সমাদৃতা । দেবী সরস্বতী বিদ‍্যা-চারুকলা-সঙ্গীত-শিল্পকলার উপমা । তিনি বীণাবাদিনী । তিনি বসন্ত পঞ্চমীতে পূজিতা হন । ইনি বৈদিক দেবী । সরস্বতী নদীর ইনিই উৎস । বাংলায় ইনি সর্বগুণাসম্পন্নার উদাহরণ । বাংলার প্রতিটি বধূই রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী । আর দেবী সাক্ষাৎ জগজ্জননী মা । তিনি কখনো গিরিরাজের কন‍্যা , আবার কখনও শিবের ঘরণী । মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে তিনি আদ‍্যাশক্তি মহামায়া শ্রীশ্রীচণ্ডী । তিনি বাংলার নারীদের চেনা রূপ । দশপ্রহরণধারিণী দশ হাতে সংসারকেও ধারণ করেন । বাংলার পূজা ঘিরে পারিবারিক মিলনের যে চিত্র ফুটে উঠে তা বাঙালির একান্ত যাপনের এক পূর্ণ চিত্র ।

বাংলার খাদ‍্যাভাসের আভাসও পাওয়া যায় দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভোগে । শোভাবাজার রাজবাড়ি-সহ অনেক সাবেকি পূজায় আলুর ব‍্যবহার হয় না । কারণ তা বাংলায় উদ্ভূত নয় । কোথাও নিরামিষ , কোথাও চারদিনই আমিষ খাদ্য থাকে । লুচি , পরমান্ন , মোহনভোগ , নাড়ু থেকে শুরু করে ছোলার ডাল , বেগুন ভাজা , ইলিশ মাছ-সহ বিভিন্ন মাছের পদেই সেজে ওঠে ভোগ সামগ্রী । যেখানে বলির প্রচলন আছে সেখানে পাঁঠার মাংসও ভোগের উপচারে থাকে । কারণ বাঙালি মাত্রই ভোজনরসিক ।

মধুর সামাজিক বন্ধন, সাবেকি আবেশ , বারোয়ারি পূজার মণ্ডপ স্থাপত্যের মুন্সিয়ানা , থিমের দাপট , অষ্টমীর অঞ্জলি , আরতির নাচ, বোধন থেকে বিসর্জন প্রভৃতির অসাধারণত্ব এই পূজাকে বিশ্বজনীন করেছে । যার আবেদন ভারতে ‘বিবিধের মাঝে’ মহা মিলনের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

অভিমন্যু মাহাত

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

অ ভি ম ন্যু   মা হা ত

দুর্গা দেবী নন, তিনি হত্যাকারী

নাহ, আমাদের পুজো নেই। 

বলা ভালো, শারদ উৎসবের আবাহন বর্জিত এই দেশভূমি। মায়ের আগমন বা বিদায়ে আবেগহীন জনপদ। আমার যে গ্রাম, এখানে আদিকালে কোনো পুজো ছিল না। বৈদিক সংস্কৃতির আগ্রাসনের পরেও প্রান্তজনভূমিতে চরণ পড়ে না ‘দেবী’ দুর্গার। এই তল্লাট কার্যত উৎসবের আবহ থেকে শত যোজন বাইরে। পুজোয় আপামর বাঙালির মধ্যে ধুম পড়ে নতুন জামা, নতুন শাড়ি কেনার! আমাদের নতুন পরিধান বস্তু কেনার রীতিও নেই। সামর্থ্যও থাকে না।  ভাদ্র-আশ্বিন জুড়ে ঘরে ঘরে অনটন। কারণ মাঠ থেকে ফসল ওঠেনি যে! মনে পড়ে শৈশবের দিনগুলি। পুজোর সময় আমরা কদ-গুন্দলু খেয়ে থাকতাম। কোনও দিন জনহার সিঝা (ভুট্টা সেদ্ধ)। রেডিওতে ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে’… শুনে আলাদা কোনো অনুভূতি জাগত না। এখনো জাগে না!

নতুন জামা, নতুন শাড়ি কেনার রীতি আমাদের একমাত্র টুসু পরবে। তখন ঘরে ঘরে খামার ভর্তি ধান! ফসল বিক্রি করেই নতুন রঙিন জামা আসে ছানাপোনাদের গায়ে।

উপরে উল্লিখিত দুর্গা ‘দেবী’। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আদিজাতিদের কাছে ‘দেবী’ নন তিনি। তিনি হত্যাকারী। অনার্য বীরকে তিনি ছলনা করে হত্যা করেছেন। তাই পুজোর দিনগুলিতে আমরা মেতে উঠি দাসাই পরবে।  মুখে মুখে প্রচলিত উপজাতিদের গানে বারবার ফিরে আসে জনগোষ্ঠীর পুরনো ইতিহাস৷ চাঁইচম্পা বা চম্পা ছিল তাদের বাসভূমি৷ সেই আদিম জীবনে মেঘ ঘনায় আর্যদের দখলদারি শুরু হলে৷ প্রচলিত বিশ্বাস, হুদুড় দুর্গার (অনার্য বীর) সঙ্গে বলে এঁটে উঠতে না পেরে কৌশল নেয় দখলদাররা৷ মহিলার সঙ্গে লড়াইয়ে নীতিগত আপত্তি ছিল হুদুড় দুর্গার৷ তাই ছলনা করে এক আর্য নারীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় তাঁর৷ সেই নারীর হাতেই মৃত্যু হয় উপজাতি নেতার৷ হুদুড় দুর্গা বধ হওয়ার পর খেরোয়ালদের (উপজাতি) নেতৃত্ব দেওয়ার আর কেউ ছিল না৷ ধর্মগুরুদের পরামর্শে তারা সরস্বতী নদীতে স্নান করে মহিলাদের পোশাক পরে নাচতে নাচতে পূর্ব দিকে পালাতে থাকে৷ এই নাচই দাসাই নামে প্রচলিত৷ আশ্বিন মাসও এক অর্থে উপজাতিদের কাছে দাসাই৷ দাসাইয়ের অর্থ অসহায়৷ নেতাহীন খেরোয়ালরা সেই সময় যথার্থই অসহায় হয়েছিল৷  দাসাই নাচের গানেও সেই হা-হুতাশ আছে৷ তাতে বলা হয়, ‘দুর্গা অন্যায় সমরে মহিষাসুরকে বধ করেছেন৷ হে বীর, তোমার পরিণামে আমরা দুঃখিত৷ তুমি আমাদের পূর্বপুরুষ৷ প্রণাম নাও …৷’ নবমীর দিন রঙিন পোশাক পরে মাথায় ময়ূরের পালক গুঁজে বাজনার তালে তালে নাচ-গান করেন উপজাতিকুল। সেদিন স্মৃতিতর্পণের পর হুদুড় দুর্গা তথা মহিষাসুরের উদ্দেশে ছাতা উত্তোলনের অনুষ্ঠান চলে৷ যা পরিচিত ‘ছাতা ধরা’ উৎসব নামে৷ বীর বন্দনার এই পালা ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে আদিবাসী সমাজে৷ এই পুজোর ক্রমশ প্রসার ঘটছে৷ হুদুড় দুর্গা পুজোকে নিজেদের সমগ্র জাতিচেতনার অহংকার হিসেবে দেখেন জনজাতির অনেকেই।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

পলাশ দে

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

প লা শ   দে

কেউ আছেন নাকি ভেতরে?

শুরুয়াৎ

হাতে রোল ক্যাপ ভরা বন্দুক। হাফ প্যান্টের পকেটে উঁচু নিচু ক্যাপের ব্যাকআপ। সকাল ১১টা। স্পোর্টিং সেন্টারের সঙ্গে দাশ কলোনির লড়াই আজ। এই যুদ্ধের সকাল থেকে দুপুর চিরকালীন। বিকেলে নতুন গন্ধের পোশাক পরে বন্ধুরা অপেক্ষা করছে। আজ প্রথম মোগলাই খাওয়া হবে তাও আবার সোদপুর ভগবতীতে বসে। টাকাপয়সার হিসেব কষা হয়ে গেছে। উফ্ কী যে উত্তেজনা। বাড়ির বাইরে থেকে অস্থির ডাক ইকো হচ্ছে- ‘কী রে আয়, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, আয় জলদি’…  

এমন সময় দম আচমকা ওঠানামা করছে কেন! কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে গোটা শরীর। আরে! কিছু বোঝার আগেই খলবল খলবল করে পাশের গঙ্গা নদীর এক চিকন ধারা বইতে লাগল চোখ থেকে। জামার বুক ভিজে যাচ্ছে। কী করা যায় কী করা যায়। কেন এমন হচ্ছে! কই কোথাও তো কোনো কারণ নেই। যদি মা দেখে ফ্যালে? বন্ধুরা? গৌতম বুগলাই দীপক যদি কিছু জিজ্ঞেস করে কী বলব!

বাথরুম, হ্যাঁ, চোখে মুখে জল দিতে গিয়ে জামায় লেগেছে। আর লাল হয়ে ওঠা চোখ? ওই তো চোখে একটা শ্যামাপোকা ঢুকে কী যে জ্বালা… 

ও হ্যাঁ, আজ ভোরবেলায় রাতের চোখ ডলতে ডলতে শিউলি ফুল তোলা হয়েছে–

 

নুন 

যত সমবেত তত একা নাকি কেউ কোথাও নেই এমন ভাবেই একা সম্ভব?

হাজার হাজার মানুষের মেলা। ফানুস, রঙিন বল, তালপাতার সেপাই… মাছভাজার গন্ধে ম ম চতুর্দিক। আলো সরিয়ে দেখি ফেনা গলে গলে পড়ছে পাথরে। তিন নম্বর ঢেউটা কি ভাঙবে আগেই? নাহ্, ওই যে আগেই কোলাকুলি করে নিল পাঁচ নম্বর ঢেউ সব। তার বেশি দ্যাখা যায় না। আন্ধার অ-নে-ক জল পেরিয়ে হ্যাজাকের আলো। পরপর, এখান থেকে সরলরেখা মনে হলেও নৌকা আগু পিছু জাল পেতে চলেছে।

সমুদ্রের জলে কিছু অভিশপ্ত মানুষের রস মিলেমিশে নুনের জন্ম। সেই স্বাদ গ্রহণ করতে গেলে সাধনার প্রয়োজন। সমুদ্র পরীক্ষা নেয়। 

ধুর, কীসব বলছ?

হুমমম, ওই যে জলে নামতে না নামতেই লাথি মারতে শুরু করল দ্যাখো -ওরা ফেল।  

পাশ করা মানুষ দায়িত্ব পায় নিম্নচাপ সরিয়ে সরিয়ে মেঘ রং করে সাদা আর আকাশি পৃথিবী প্রস্তুত করার, কী বুঝলে!

তোমার মাথামুণ্ডু। যত্তোসব…

 

উৎসব

উৎসব সারাক্ষণ একলা মানুষ খুঁজে যায়। সারাবছর অন্ধকার গলিতে যখন টুনি বাল্ব চকমকি করবে, অথচ কেউ সারাবছরের একই অভ্যাসে হেঁটে আসবে যাবে, তখন, ঠিক তখনই বশ করবে। সাইকেলের ক্রিং মুছে যাবে চটুল গানে। ছাদে সন্ধে জাপটে রাত্তির করতে থাকা মেয়েটাকে খুব আলগোছে যখন শহরের ঠাকুরের কথা বলবে আর সে সময় কীভাবে কোন মন্ত্রে যেন সে-ই দেবী!

রূপ রস ঘ্রাণ মিলেমিশে অসুর সন্ধান চলছে তখন।

অসুর কই? ওই যে এখন জীবনে প্রথম সিগারেটে টান দিয়ে কাশছে…

 

ম্যাজিক

যে কোনো দ্যাখা ছটফট করে ওঠে। শহরে নিয়ে যাওয়া বাস ট্রেন এক জাদুপৃথিবী। লোকাল সেন্টের গন্ধ, খাবারের দোকানের ডাকাডাকি, দূরে কাছে নকল আলোর মফস্‌সল। চায়ের দোকান প্রায় ফাঁকা। সকলেই আইসক্রিম। ওই গলে গলে পড়া আরামে অনাথ মেয়েটা।

কি রে, কিছু খাবি?

ভাইয়ের জন্য দেবে তো!

উৎসব এইসব অভিশপ্তে প্রতীক্ষায় থাকে। তুমি পৌঁছনোর আগেই ভাইবোন হাপিস। তুমি কোথায় তাহলে। তুমি এখন কী ভূমিকায়?

গাছ থেকে পেরেক তোলা।

হার্টের রোগীর ঘরে জানলা বন্ধ করে দেওয়া।

বেলুনওয়ালার হাত দিয়ে ইয়া বড় গ্যাসবেলুন উড়িয়ে দেওয়া।

আতস কাচ দিয়ে একলা খুঁজে যাওয়া।

 

বাকল খুলে খুলে নতুন হচ্ছে। হাওয়ায় লাজুক লাজুক ভাব। সমুদ্র নীল আসমান। পাখি উড়তে পুড়তে দিশা ভুলে যাওয়া।

এসবের মানে কী?

উৎসব, তোমাকে খুঁজছে, একলা 

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

শ্রী দ র্শি নী   চ ক্র ব র্তী

যে উমা ঘরে ফেরে নি

আশ্বিনের শারদপ্রাতে আলোকমঞ্জির বেজে উঠতেই ছোটবেলায় একটা আলাদা আনন্দ হতো, যেটা বয়েস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলেছে ধীরে ধীরে। যত বয়েস বেড়েছে, দেখেছি কলকাতার পুজো আস্তে আস্তে কেমন একটা চকমকে গিফট র‍্যাপের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। থিম পুজোর রমরমার মধ্যে যেমন বিভিন্ন শিল্পী, কারিগরদের হাতের জাদু উঠে এসেছে, তেমনই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে উমার ঘরে ফেরার উষ্ণতাটুকুনি। ছোটবেলায় পুজো মানেই আমাদের ভাইবোনদের কাছে ছিল বিধানপল্লির বাড়ির পুজো। সেখানে হরিদাদু, ছোটদিদা, পিসি ও কাকা-জ্যাঠা, ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হওয়া। পুজোর মধ্যেই সারাদিন আড্ডা, গান, গল্প, খেলা, খাওয়াদাওয়া, সন্ধ্যা-আরতির সঙ্গে ঢাকের তালে তাল মেলানো আনন্দ আর বিসর্জনের পর ফাঁকা দুর্গামণ্ডপে একলাটি প্রদীপের দিকে তাকিয়ে শান্তির জল নিতে নিতে ভাবা “আসছে বছর আবার হবে”। কিন্তু জীবন যে ওই ছোট্টবেলাটির থেকে অনেক অনেক বড় আর দারুণ আলাদা, সেটা বুঝতে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। যে উমারা ঘরে ফেরে তারা ছাড়াও এ পৃথিবীতে এমন অনেক উমাই যে আছে যাদের ফেরা হয়না। প্রবাসে কাটানো পুজোর দিনগুলোতে সেটা আরও বেশি করে উপলব্ধি করেছি। কানাডায় থাকতে প্রথম উইক-এণ্ডের পুজো দেখি। দিন-সময়-লগ্ন, পুজোর যথাযথ প্রক্রিয়া ইত্যাদি গৌণ হয়ে গিয়ে সবাই মিলে আনন্দ করাটাই সেখানে আসল ব্যাপার। মনে হয়েছিল, এটাই তো হওয়া উচিত। বাঙালির দুর্গোৎসব তো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আদতে এ তো মিলনোৎসব। এক মেয়ের ঘরে ফেরার আনন্দই যেখানে আসল। 

কিন্তু এইসবের মধ্যে যে এমন একটা পৃথিবীও লুকিয়ে আছে, যেখানে উমারা ঘরে ফেরে না বা হয়তো ফিরতে পারে না বা হয়তো তাদের কোনও ঘরই নেই। মুম্বই প্রবাসে বছর দুয়েক কেটে গেছে তখন। আমি আর আমার এক বন্ধু, মাঝে মধ্যেই কাজের থেকে ছাড়া পেলে পৃথ্বী থিয়েটার যেতাম। অনবদ্য সব থিয়েটার দেখা ছাড়াও ওইখানকার আড্ডাটার আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল। কোথায় কী হচ্ছে, কে কী নতুন অন্যধরণের কাজ করছে, হাল-হকিকতের কী অবস্থা ইত্যাদি আলোচনায় কখন সন্ধে গড়িয়ে রাতে পৌঁছে যেত ঠিক নেই। তো তেমনই একটা আড্ডায় আমরা সেবার ঠিক করেছিলাম এবার পুজো এবং নবরাত্রিতে দুটো দিন বের করে আমরা এমন দুটো জায়গায় যাব যেখানে অধিকাংশ মানুষই উৎসবে ঘরে ফিরতে পারেন না। আমাদের বিভিন্ন এনজিও-তে কাজ করা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দু’টি জায়গা ঠিকও করে ফেললাম এবং পৌঁছেও গেলাম ‘বিজয় আশ্রম’ ও ‘আশাদান’-এ। দু’টি সংস্থার কাজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- গৃহহীন শিশুদের শিক্ষা ও আশ্রয়দান এবং আশ্রয়হীন, অসুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন বয়স্কদের দেখাশোনা করা। গৃহহীন শিশুদের সঙ্গে এর আগেও আমি কাজ করেছি, ওয়ার্কশপ করেছি, তাই ওদের এই অসম্ভব লড়াইয়ের জীবন সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা আগে খুব কাছ থেকে দেখতেই হয়েছে। কিন্তু এইবারে আমাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়ে গেল তিনজন বয়স্কার বাস্তব। বাইরে তখন দশমী বা দশেরার আনন্দ উদযাপিত হচ্ছে। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠেছে সেই আলোকমঞ্জির। ছোট করে কিছু আয়োজন হয়েছে আশ্রমেও। তার মধ্যে হাত মিলিয়েছি আমরাও। কিন্তু এই তিন মায়ের কোনো আনন্দে ফেরা নেই। দৃষ্টি সুদূরে মেলে চেয়ে আছেন তিনজনই চাতালের তিনদিকে বসে। মালতী বেন সন্তানহীনা, সারাজীবনটাই প্রায় আত্মীয়স্বজনের কটাক্ষে কেটেছে। কিন্তু স্বামীর ভালোবাসায় সব ক্ষতে প্রলেপ পড়তো। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে তুমূল একটা ধাক্কায় সাময়িকভাবে মানসিক ভারসাম্য হারান। পরিবারের অন্যান্যরা ভর্তি করে দেন মানসিক হাসপাতালে। কিন্তু বছরখানেকের ভেতর সুস্থ হয়ে উঠলেও কেউ এসে তাঁকে নিয়ে যায় না, থেকে যান সেইখানেই। আর সেখানেই আলাপ হয় তাঁর অঞ্জলিদেবীর সঙ্গে। অঞ্জলিদেবীর স্বামী অল্পবয়সেই মারা যান লিভার সিরোসিসে, খুব একটা কেজো মানুষ তিনি ছিলেন না, তাই বিয়ের পর থেকেই কোনো না কোনো কাজ করতে হয়েছে অঞ্জলিদেবীকে। মেয়েকেও বড় করেছেন, পড়াশোনা করিয়েছেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বছরখানেক যেতেই ধীরে ধীরে মানসিক অসুস্থতার নানা উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। প্রায় সারাক্ষণই দরজার কড়া নাড়া শুনতে পেতেন, শুনতে পেতেন কেউ ডাকছে, আর সেই ডাক শুনে বেরিয়ে যেতেন বাড়ি থেকে উদ্দেশ্যহীন। সেই কারণেই মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। মানসিক অসুস্থতা বছর তিনেক বাদে কাটে। তাঁর কন্যা চালের একটি খোলিতে থাকেন পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে, তাই সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মায়ের থাকবার ব্যবস্থা করেন এই হোমে এবং সঙ্গে সঙ্গে মালতী বেন-এর বিষয়েও কথা বলেন যে আশ্রমে যদি কোনও ডোনারের সাহায্যে ওঁর থাকার ব্যবস্থা করা যায়। ভাগ্যক্রমে সে ব্যবস্থা হয় এবং দু’জনেই একসঙ্গে মানসিক হাসপাতাল থেকে আশ্রমে এসে থাকতে শুরু করেন। তৃতীয় জনের কথা কী বলব ঠিক জানিনা, কারণ কেউই জানেন না তাঁর ঠিক কী হয়েছিল। আরতি কাওয়াস্কর। বহু বছর হয়ে গেছে তিনি কথা বলেননি। বলেন না। চেহারায় আভিজাত্যের একটা ছাপ রয়েছে, এককালে সুন্দরী ছিলেন সেটাও বোঝা যায়। সাদা চুলে আলগা খোঁপার মৌনতায় তাঁকে যেন আরও সুন্দর লাগছিল আমার। এই তিনজনের আর একটি বিষয় আমার মন টেনেছিল, তা হল সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা। সকাল থেকে আর সব কাজের মধ্যে একটি দুর্গাবন্দনার একাংশ ওঁদের শিখিয়েছিলাম। আরতি দেবী শুধু মন দিয়ে দুলে দুলে শুনছিলেন। সন্ধেবেলায় ঘটপুজোর সময় ওঁরা যখন সেটা গাইছেন আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। হঠাৎ যেন দেখলাম আরতি দেবীর মাথা নিচু ও জোড়হাতের মাঝখানে তাঁর ঠোঁটদুটো নড়ছে। যে উমার খোঁজ নিতে বহুদিন কেউ আসে না, যে উমার ঘরে ফেরা নেই, যে উমার কথা বলা নেই, সে উমার কাছে আজ গান এসেছে। এর থেকে বড় উৎসব আর কী বা হতে পারে! ফেরার পথে আমাদের দুই বন্ধুর মুখে কোনো কথা ছিল না। মনে হচ্ছিল আজ যদি বিসর্জন হয় তবে তা দুঃখের বিসর্জন হোক।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

সঙ্ঘমিত্রা হালদার

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

স ঙ্ঘ মি ত্রা   হা ল দা র

মনে পড়া পাখি

বর্ষা তার সজলটুকু মুছে নিলে মেঘজলরোদের হাসিতামাশায় সে একটু একটু দেখা দেয়। দেখা দেয় আর মিলিয়ে যায়। সে মানে শরৎ। আর শরৎ মানে গাঢ় আর ছটফটে নীলের ক্যানভাসে সফেদের কুণ্ডলী পাকানো থাবা। শরৎ মানে স্মৃতিতে পথে বিছানো টাটকা শিউলি। হঠাৎ হঠাৎ ট্রাম বাস মোড় নেওয়ার সময় কাশের দুলে ওঠা। কোথায় কী যেন একটা ঘটবে কী যেন একটা হবে তারই প্রস্তুতি। একটু বড় হয়ে ঈশ্বর অবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্লেয়ার্স কর্নার, সৃষ্টি বা বড়িশা ক্লাবের মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমাদর্শনের দিন ফুরোয়। কিন্তু রাস্তায় হরেক আলোর রোশনাই আর মানুষের তামাম ভিড় তবু বড় ভালো লাগে। বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে ঘুরে আড্ডা দেওয়া আর হঠাৎ পেয়ে যাওয়া চারদিনের অফুরান স্বাধীনতা ঢাকের কাঠির দিম দিম কিংবা ফুলঝুরির চেয়েও দিশেহারা করে দিত ভিতর ঘর। নিজে কোনওদিনই সাজতে পছন্দ করি না, কিন্তু আলোর ঝরনাধারার পাশে নিজেকে প্রাণবন্ত করে সাজানো মানুষ দেখতে কী যে ভালো লাগত! কিংবা, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া হাল্কা দাড়ির শার্ট বা পাঞ্জাবির আতরের হু হু কেমন যেন ক্ষণিকের জন্য দিশেহারা করে দিত। এসবের মধ্যেই বিসমিল্লা থেকে থেকে বড় করুণ সুরে বেজে উঠতেন। ভেতর ঘরে খানিক শূন্যতার মোচড় তখন। 

কিন্তু বিগত অনেকগুলো বছর রাস্তার ভিড় দূর থেকেই টের পাই। হেঁটে হেঁটে পায়ে ফোস্কা ফেলে দেওয়া বন্ধুরা এখন অনেক দূরে। কিংবা ভাইসি ভার্সা। আমার মনটাও অনেক পাল্টে পাল্টে গেছে। আগেকার জামা তার গায়ে আর আঁটে না। তবু আমার মতো ঈশ্বর অবিশ্বাসীর কাছে প্রকৃতির এই শরৎ প্রস্তুতি আপন খেয়ালে ভালোলাগাগুলো বুনে দেয়। কী যেন এক অপেক্ষায় অপেক্ষায় শরৎ আসে, শরৎ যায়। মন ভার হয়, মন হাল্কা হয়। আর এর মধ্যেই সেই পুরনো দিনের বিসমিল্লা আজও গেয়ে ওঠেন। অনেক উৎসব অনেক আলোর তলায় মরা নদীর মতো বয়ে যায় বিসমিল্লার সানাই। বিসমিল্লা আসলে সেই মনে পড়ার পাখি। যে থেকে থেকে মনে করিয়ে দেয়—অনেক উৎসব আর আলো, তবু কোথাও তার শেষ আছে। কিংবা, শেষ বাঁকে কোথাও ঘোরানো সিঁড়ির মতো, নিচে অন্ধকার জমা আছে। এত আলো, এত আনন্দ আয়োজন, তবু সে সকলের নয়। 

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

কিশোর ঘোষ

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

কি শো র   ঘো ষ

বাঁশয়ারার পুজোর ভুল বাংলা বানানে "ঠিক" চর্চা

পুজোমণ্ডপে হতকুচ্ছিত হাতের লেখায় ভুল বাংলা বানানের ছড়াছড়ি। তা দেখে সে-কী আনন্দ আমার ! বিষয়টা ব্যাখ্যা করা কঠিন। ঘটনার বর্ণনা দিলেই বুঝবেন, যে আমার জায়গায় পবিত্র সরকার কিংবা শঙ্খ ঘোষ থাকলেও, তাঁরাও ওই ভুল বানানে আপ্লুতই হতেন । এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাঁশয়ারায়।

মধ্যপ্রদেশ সীমান্তে রাজস্থানের ছোট শহর ও জেলা বাঁশয়ারা । সেবার সংবাদপত্রের সম্পাদককে হিপনোটাইজ করে কুড়ি দিনের ছুটি হাতিয়ে পুজোর সপ্তাহ খানেক আগেভাগে বাঁশয়ারার উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে বসেছিলাম । ২০১৪ সালের কথা। সেই সময়টায় উট, কেল্লা, বালি আর খমাঘনি রাণাদের দেশে থাকত আমার বোন-ভগ্নীপতি। আনন্দের কথা হল, যোধপুর, জয়পুর, উদয়পুরের মতো বড় শহরে থাকত না ওরা। বড় শহর আঞ্চলিকতাকে খেয়ে নেয় কিংবা পণ্য করে তোলে (রাজস্থানের শহরগুলোর ক্ষেত্রে দুটোই হয়তো সত্যি) । বাঁশয়ারার মতো ছোট শহরে ওইসব নেই। গিয়েই বুঝেছিলাম নেহাতই দেহাত। গ্রাম-গাঁওয়ের ছাপ স্পষ্ট। রাস্তাঘাট, মানুষজন সবেতেই। আসলে তুলনায় ব্যস্ত শহরগুলো খানিক দূরে। বাঁশয়ারা থেকে সবচেয়ে কাছের রাজস্থানের অতি চেনা বড় শহর উদয়পুর। বাসে ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। উল্টোদিকের কাছের ব্যস্ত জংশন স্টেশন মধ্যপ্রদেশের রতলাম। সময়ের হিসেবে বাঁশয়ারা থেকে দূরত্ব আড়াই ঘণ্টা প্রায়।

শেষরাতে রতলামের আগের স্টেশন মন্দসৌর-এ নেমে বাঁশয়ারায় পৌঁছানোটাও ছিল অপূর্ব অভিজ্ঞতা। পাহাড়-জঙ্গল ভেদ করে ছুটেছিল আমাদের প্রাইভেট গাড়ি। ধীর ধীরে তারা মুছে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্য উঠেছিল। খেত-খামারে ঘুরছিল রোদের ময়ূর। রাস্তায় মাঝেমাঝেই বিরাট উটের পাল নিয়ে দেহাতি রাখাল। সাদা রাজস্থানী ফতুয়া, সাদা খাটো ধুতি পরণে। মাথায় সাদা কাপড়ের পাগড়ি। যা দেখে অবাক হয়েছিলাম, তা হল ওদের প্রত্যেকের হাতে ওই ভোরবেলাতেও একটা করে হ্যাজাক লণ্ঠন। কেন? নিজের সঙ্গে খানিক কথোপকথন চালিয়ে বুঝলাম- সারাদিন উট চরানো। ঘরে ফিরতে ফিরতে সন্ধে। ইলেক্ট্রিসিটিহীন পাহাড়ে-জঙ্গলে, অন্ধকারে গ্রামের পথ খুঁজে নিতে প্রয়োজন হ্যাজাকের আলোর। অর্থাৎ কিনা জিনিসটা সকালে চোখে পড়ল বটে আমার, কিন্তু ব্যবহার হবে সন্ধ্যায়। উট-পালকের ডায়েরির লেখক সামনাসামনি উট-পালকদের দেখে শিহরিত হয়েছিল বলা বাহুল্য !

বাঁশয়ারায় পৌঁছেও আরাবল্লীর রেঞ্জ পিছু ছাড়েনি। বোনেদের তিনতলার ফ্ল্যাটের বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে দাঁড়াতেই দেখি খানিক দূরে সবুজপাহাড়। এমনিতে সবটাই ভালো। কলকাতা থেকে এত দূরে আসা নতুনের জন্যেই তো। নতুনের খোঁজেই লোকে পয়সা খসিয়ে হিল্লিদিল্লি পাড়ি দেয়। ঝুঁকি নেয়। প্রাণের এমনকী!  কিন্তু আমি যে বচ্ছরকার দুর্গাপুজো ফেলে এসেছি কলকাতায়!

একেবারেই ভক্তিবাদী নই। ঠাকুরমশাই ভুল উচ্চারণে সংস্কৃত বললেন, তার উপর আমি আরও কিছুটা ভুল যোগ করে ‘ভক্তিভরে’ অঞ্জলি দেব, যার গোটা এক লাইনের মানেও জানি না! এইসব ঝক্কিতে আমি নেই । লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখাতেও অনীহা। পুজোর চারদিন নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম থাকে যাঁদের, যাঁরা খুব আড্ডা দেন, সিনেমা-থিয়েটার দেখেন, রেস্টুরেন্টে খান, তাঁদের দলেও পড়ি না। গোটা বছরের মতোই অবজার্ভেশন মোডে কাটে আমার পুজোর চারদিন। মানুষ দেখি, মানুষের আনন্দ দেখি। দুঃখ অবদমনের আশ্চর্য আনন্দকৌশল দেখি! খেয়াল করেছি, ছোটদের আনন্দ সারা বছর পবিত্র। কিন্তু বড়দের আনন্দ পবিত্র মাত্রা পায় পুজোর সময়েই। দুনিয়ার মার খেয়ে সন্তানের জন্য নতুন জামা-জুতোর ব্যবস্থা করেছে যে বাপ-মা, সন্তান যখন সেই জামা পরে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সেই বাপ-মার চোখে “বিশ্বরূপ” দেখেছি! পুজোর একটা দৃশ্য বড্ড প্রিয় আমার। দৃশ্য এরকম— অসুস্থ দাদু বা ঠাকুমাকে হাত ধরে ধীরে ধীরে মণ্ডপের দিকে নিয়ে আসছে উত্তরপ্রজন্ম। ওঁরা এসে দাঁড়ালেন আনন্দ-ঈশ্বরীর সামনে। নতজানু হয়ে ভক্তিভরে প্রণাম ও প্রস্থান। এমনকী যাঁরা অসুস্থতায় বিছানা নিয়েছেন, তাঁরাও পুজোর সময় নতুন পোশাকে ওই বিছানাতেই আরোগ্যআনন্দ খোঁজেন ! ছেলেপুলে, নাতি-নাতনিদের সহযোগিতায় আধশোয়া হয়ে মণ্ডপের দিকে মুখ করে জোড়হাতে প্রণাম দেখেছি ! আহ, এই না হলে নশ্বর মহাজীবনের মহিমা! একদিকে অর্থবানের ছেলের দশটা জামা, অন্যদিকে ঢাকির ছেলের ছেঁড়া গেঞ্জি, খালি পা ! এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি আমি ও আমরা ! যেন জীবনানন্দকথিত বিপন্ন বিস্ময়ের বহুমাত্রিক সিনেমা হলে জন্মেছি! তারই একটা পর্দায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের পাড়ার ‘বিশ্বকর্মা’ মণীশকে। পড়াশুনো শেখেনি, কিন্তু জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানা। বছর ভর সাইকেল সারায়, ইলেক্ট্রিকের ছোট কাজ করে, গরিবের সাইকেলে বড়লোকের ছেলেমেয়েদের চাপিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেয়। আর পুজোর সময় পাড়ার মণ্ডপের মাঠের উল্টো দিকের রাস্তায় চারদিনের এগরোল-চাউমিনের দোকানদার। প্রতিবার। অবশ্য এসব দেখার বাইরেও থাকে দুর্গাপুজোর ব্যক্তিগত মায়া !

যেমন, উঠোন-সাজানো শিউলি দেখতে মনে হয় ভোররাতেই উঠে পড়ি। বিশ্ব উষ্ণায়নেও যদি প্রকৃতি সদয় হয় শেষ রাতের তথা ভোরের মৃদু শীত উপভোগ করতে কী ভালো লাগে! তারপর অল্প দূর থেকে ভেসে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ! চির রহস্যময় আনন্দের তাল! বেলা বাড়তেই মাইকে উদার মন্ত্র, ট্রেড মার্ক হিন্দি-বাংলা পুজোর গান। কিছু গান যেন পুজোর গান হবে বলেই…! তারপর বাড়িতে মায়ের হাতের ভালো রান্না,  আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে টুকটাক আড্ডাও। এবং একাই বেরিয়ে পড়া হঠাৎ। পৃথিবীতে কত কোটি রকমের সুন্দরী হয় এবং তাদের পবিত্র তথা মিথ্যে প্রেমের ম্যাজিক দেখতে ভালো লাগবে না! এমন কত কী যে ছেড়ে এসে পৌঁছেছি বাঁশয়ারায়! আমার মতো একটা আপাত নির্লিপ্ত লোক পুজোর থেকে দূরে এসে প্রথমবার পুজোর কাছে যাওয়ার ইচ্ছেটাকে বেমালুম বাড়িয়ে ফেলেছে বুঝতে পারছি! কিন্তু সেই আবেগ ভেঙেছে বোন-ভগ্নীপতির বাড়িতে আসা-ইস্তক। কেন?

কারণ বোন-ভগ্নীপতিও জানে না, বাঁশয়ারায় একটিও পুজো হয় কি-না ! যেহেতু ওরা যতদিন হল এখানে এসেছে, ততদিনে পুজোর সময়টা এখানে কাটায়নি। কিন্তু, স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগে সবখানেই বাংলা চ্যানেল। অতএব, তৃতীয়া থেকেই দেখানো শুরু কলকাতা তথা গোটা রাজ্যের পুজো পরিক্রমা ! যা ফেলে আসা দুর্গাপুজোর আনন্দকে গাঢ় দুঃখে পরিণত করতে যথেষ্ট। এর মধ্যে, সম্ভবত ষষ্ঠীর দিনে একটা কানাঘুষো শোনা গেল, পুরানা বাসস্ট্যান্ড বলে একটি জায়গায় একটা পুজো নাকি হয় । আমি ভাবছি, যদি সেখানে হয় তো হয়, নচেৎ রামকৃষ্ণ মিশনের খোঁজ করব। রামকৃষ্ণ মিশন দুনিয়ার সবখানে আছে। আর সেখানে একশো শতাংশ পুজো হবেই । নিশ্চিত।

না, রামকৃষ্ণ মিশন খুঁজতে হয়নি। ষষ্ঠীর দিন সকালে পুরানা বাসস্ট্যান্ডের ব্যাপারটা কনফার্ম হল। সেদিন সকালে ও সন্ধ্যায় টিভিতে খাপছাড়া পুজো দেখলাম। বাইরে বেরোনোর জো নেই। অক্টোবরেও অসম্ভব গরম বাঁশয়ারায়। সাড়ে দশটা এগারোটার পর তো রীতিমতো  লু। পথেঘাটে অল্প মানুষ। তাদেরও নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। তবে সূর্যাস্ত হলেই বদলায় আবহাওয়া। পাহাড়ের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসে। তখন মনে পড়ে বাংলার শরতের কথা । সেদিন রাতে শুতে গেলাম কলকাতা থেকে দু’হাজার কিলোমিটার দূরের দুর্গাপুজো কেমন হতে পারে, সেই সব ভাবতে ভাবতে।  

সপ্তমীর সকালটা কোনোমতে ডিঙিয়ে সন্ধেবেলা বেরিয়ে পড়লাম বাঁশয়ারার পুজোর সন্ধানে । বোনদের ফ্ল্যাট বড় রাস্তার গায়ে গায়ে গলিতে। উঁচু বড় রাস্তায় উঠে অটো নিলাম আমরা । পুরানা বাসস্ট্যান্ড নামের জায়গাটায় পৌঁছাতে মিনিট পনেরো লাগল । আগেই জেনেছিলাম, জায়গাটা বাঁশয়ারার অন্যতম ব্যস্ত অঞ্চল। দেখলাম, টুকিটাকি অনেক দোকান। সবজি বাজারও আছে। বোন-ভগ্নীপতি জানাল, আজকের ভিড় কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তার মানে পুরানা বাসস্ট্যান্ডের ময়দানে পুজো হচ্ছে ! দলে দলে ভিড় সেই দিকেই এগোচ্ছে যে। আমরাও ময়দানে পৌঁছোলাম। মাঠের যেদিকে রাস্তা, সেইদিকেই প্যান্ডেল। সাদামাটা। তবে, দেখলেই বোঝা যায় যে এ দুর্গামণ্ডপ না হয়ে যায় না । সবচেয়ে বড় কথা, এখানে শুধু পুজোই হচ্ছে না, মেলাও বসেছে একটা। নাগরদোলাটোলা নেই, হরেক মাল কেনাকাটার দোকানের মেলা । মণ্ডপেই ঢুকলাম আমরা। ছোট মাতৃপ্রতিমা দর্শন করলাম । প্রতিমা সাধারণ। দেখেই মনে হল, স্থানীয় কুমোরের কাজ । আসলে প্রতিমার ছাঁচ অচেনা ঠাকুরের মুখচোখও । প্রতিমার পায়ের কাছে রাখা ঘট-ডাব, ফল-প্রসাদ, ধূপধুনো। সবটা দেখে অদ্ভুত আনন্দ হল। প্যান্ডেলের ভেতরে কয়েক জোড়া ডেকরেটার্সের চেয়ার পাতা। তাতে খানিক বসলাম। বসে বসে ভাবছিলাম, বাঁশয়ারার বাঙালিরাই যে এ পুজো করেছে তা তো বুঝেছি, কিন্তু তাদের যদি দেখা যেত একঝলক। ভাবতে ভাবতেই মণ্ডপে ঢুকল একদল কম বয়সি ছেলেমেয়ে। বয়স পনেরো থেকে আঠারো-কুড়ি হবে। ছেলেরা পাঞ্জাবি পরেছে, মেয়েরা সালোয়ার, এমনকী শাড়ি কারো কারো। যদিও তারা নিজেদের মধ্যে হিন্দিতেই কথা বলছে। শারীরিক অভিব্যক্তিতেও একটা জাত-কে চেনা যায়। এদের দেখে বোঝা গেল এরা বাঁশয়ারার পরিবর্তিত বাঙালি প্রজন্ম। এর মধ্যে পুজোর উদ্যোক্তা বড়রাও ঢুকলেন মণ্ডপে। ধুতি পরা কাউকে দেখিনি। তবে, পাজামা-পাঞ্জাবি সকলের। মা-কাকিমারা মা-কাকিমাদের মতোই। বড়রা অবশ্য বাংলাতেই কথা বলেন। সবচেয়ে বড় কথা, বড়দের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই কম বয়সিরাও বাংলা বলছে, যদিও কতকটা হিন্দি টানে। বুঝতে পারলাম, কেবল ভূখণ্ড বদলের কারণেই পুরোনো প্রজন্মকে নিজের ঐতিহ্য ও ভাষাকে বাঁচাতে কতটা লড়তে হচ্ছে। এরই মধ্যেই চোখে পড়ল মণ্ডপের একদিকে কাপড়ের গায়ে আর্ট পেপার কাগজ সাঁটা। এগিয়ে গিয়ে দেখি বাংলা অক্ষর ! সেখানে পুজোর নির্ঘণ্ট লেখা। সেই লেখা দেখে পিলে চমকালো আমার। একে তো ভয়ঙ্কর হাতের লেখা। তার উপর ভয়াবহ বানান। সপ্তমী হল “সপতমি”। একই যুক্তিতে “অষটমি”, “নবমি” ও “দশমি”। এবং এইরকম আজব অক্ষরজোটে আরও পুজো সংক্রান্ত আরও কত কী লেখা । অতি আক্ষেপে কয়েক পলক সেই বানানের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই আচমকাই চূড়ান্ত আনন্দ হল আমার । চাপা উল্লাস করে উঠল মন । অনুভব করলাম, জীবিকার জন্য কিংবা অন্য কোনও অস্তিত্বের সংকটে কলকাতা থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে এসেও বস্তুত একটা লড়াই চালাচ্ছে বাঁশয়ারার এই বাঙালি সমাজ। অতি কঠিন লড়াই। যে সময় পশ্চিমবঙ্গের “শিক্ষিত” বাঙালি বাপ-মা সন্তান ইংরেজি জানলে ও বাংলা ভুলে গেলে নৈসর্গিক আনন্দ পায়, যখন ভাষার যুদ্ধ বেধে গেছে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে ভারত মহাদেশের, প্রভাবশালী উত্তর ভারতীয়রা কৌশলগতভাবে চাইছেন, গোটা ভারতের মুখের ভাষা হোক হিন্দি। আঞ্চলিক ভাষা সংস্কৃতির সেই সংকটকালে বাঁশয়ারার শিকড় ছেঁড়া বাঙালিরা আসলে ভুল বাংলা বানান লিখেও নিজেদের “ঠিক” রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

বৈশাখী মিত্র

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

বৈ শা খী   মি ত্র

এক দুর্গা, অনেক দুর্গা

দুগ্গাচাতালের ফাটা মেঝে ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে জানি ঝিকিয়ে উঠত !

বোধনের বাজনা বাজার আগেই আমরা ফ্রকপরা দুইবোনে মাথায় ঝোড়া ভর্তি স্থলপদ্ম আর শিউলি নিয়ে গিয়ে হাজির হতুম। শিশিরে ভেজা ঘাসে বসে সোঁদা গন্ধময় চাতালের দিকে তাকিয়ে থাকতুম। সেন বাড়ির বিমলা, সবাই যাকে বিমলদা ডাকে পুজোর আগে চাতাল ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলত। ভোরের হালকা আলোয় তার শাড়ির মতো করে পরা ধুতি থেকে কেমন কুয়াশা কুয়াশা আলো বেরতো। বিমলার কাজলপরা চোখগুলো যেন তার গোয়ালভর্তি গরুর মত মায়াবী। চন্দনবাটা হলে সে নিজের কপালে বড়ো করে ফোঁটা কেটে শান্তস্থির ঠান্ডা আঙুল বাড়িয়ে দিত আমাদের কপালে। ততক্ষণে রাস্তার এক উটকো পাগলি আঁজলা ভরা শিউলি নিয়ে… চাতালের সিঁড়িগুলো শিউলিতে সেজে উঠত। এইক’টা বেহেড বাউন্ডুলে নিয়ে জৌলুসহীন একটা পুজোর ভোর হত। আমাদের হলুদ ফ্রক ভিজে যেত শিশিরে, গলাসাধার হারমোনিয়ামে ভিজে যেত পাড়া।

পুজো এলেই আরেকজনের কথা অবধারিত ভাবে আসে, বজপন ! আসল নাম কি ছিল মনে নেই। সে নিজেই নিজের নাম দিয়েছিল বজপন।

তখন যারা বুঝেছিল পড়াশোনা করে কিছু হবে না, তারা হঠাৎই একদিন বোম্বে চলে যেত। ফিরত বেশ কয়েকবছর পরে রীতিমতো ফর্সা হয়ে ! গলায় মোটা বাইশ ক্যারেট। এসেই বাইক কিনত একটা। পুজোয় ফেরা তেমনই এক দাদার নাম বজপন। আমাদের ফড়িং ধরার খেলা থামিয়ে সে বোম্বের হিরোইনদের গল্প বলতো; যেন তাদের সঙ্গে তার নিত্য যাপন !

মাইকে সেই সব হিরোইনদের সিনেমার গান হলে আমরা বজপনদার গল্পের সঙ্গে তাদের মেলাতুম। সবার আলাদা আলাদা গল্প তৈরি হতো। মনের ভেতর নিজস্ব রঙিন ফানুস।

ঘষা কাঁচের এপার থেকে বিশাল চোখের কিছু ফেলে আসা মোজাইক উড়িয়েছি কর্মজীবনের একাংশে। অরফানেজ হোমের ওল্ড এজ বিভাগ অন্য এক পুজো চিনিয়েছে বেশ ক’বছর। স্নেহকাঙালের বোধ হয় শেষ আশ্রয় ওল্ড এজ হোম। তাদের স্নেহপাত্র কই ? এদিকে আমি কাঙাল ! বাটি হাতে মিসেস গোমসের থেকে শিখে নিই ফিশ গ্রিল করার পদ্ধতি। দাপুটে সান্যাল জেঠুর চোখ ভিজে যেত নবমীর ঢাকের বাদ্যিতে। ওগো নবমী নিশি না হইও অবসান।

একঘর বুড়োবুড়িকে তাদের প্রেসার ঘুম আরো নানা ওষুধ দিয়ে বাইরের আলোসচল নগরীকে আমার কখনো মায়াবি মনে হয়নি, হৃদয়হীন মনে হয়েছে। পরে অবশ্য দেখেছি সমস্ত পৃথিবীতেই দুরারোগ্য হৃদয়হীনতার ব্যাধি আছে। নবমী নিশি আসে, যে নিশিতে আরতির ধোঁয়ায় চোখে ধাঁধা লেগে যায়। ঠাকুরমা প্রতিমার চোখে দেখেন জল, অশ্রু !

অশ্রু বন্দনার আরেক নামই দুর্গাপুজো।

এসেছে তো যাবে বলেই।

এখন দুগ্গাদের জন্য লক্ষ্মী-সরস্বতীর জন্য হাতে গয়না বানাই, পোশাকে আঁকি, বেশ মজার কাজ। অনেক মানুষ সামান্য হলেও উপকৃত হন। যাঁরা থান কাটেন, সেলাই করেন, বোতাম ঘর বানান,‌ গয়নার নানান অংশ তৈরি করে দেন যিনি, কাঁথার কাজ করেন যিনি, তাঁদের এক বেলার ভাত বা একটা ওষুধ আমার দুগ্গা কাত্তিকরা জুগিয়ে দেয়। এই-ই বা কম কি ?

কোভিডে পলিমাসিকে আয়া সেন্টার‌ বসিয়ে দিয়েছিল দু-তিন মাস। পলিমাসি আমায় মাস্ক তৈরি করে দিয়ে অনেক সাহায্য করেছে।

আসলে তো দুগ্গা কোনও মূর্তি নয়। দুগ্গা বিমলা, যাকে সমাজ বিমলদা বলে ডাকে। দুগ্গা মিসেস গোমস। দুগ্গা আমার বড়দিদুন, যার কাছে  শুয়ে শুয়ে অবিরত শুনেছি সাবেকি রান্নার শিল্প, রবি ঠাকুরের রাজা-চিত্রাঙ্গদা। দুগ্গা পলিমাসি।

আর দুগ্গা সেই সুন্দরীরা যাদের দৃঢ় লাবণ্যময় মুখের দিকে চেয়ে গয়না বানাই।

এবছর প্রথম বাবাকে ছাড়া পুজো। মাকে আগলে রাখার দায়িত্ব বাড়বে ক’দিন আরেকটু বেশিই। দশমীর দিন পিঠোপিঠি ভাই বোন হাত ধরে বসে থাকব দিম্মার বসানো বৃদ্ধ কামিনী গাছটার নিচে, যতক্ষণ না ঝরে পড়া ফুলের পাপড়িতে সম্পূর্ণ ডুবে যাই।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo goddyo

অনিমিখ পাত্র

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

অ নি মি খ   পা ত্র

যা যা থাকে যাতায়াতের পাশে

অগাস্টের একদম শেষদিক থেকে, এই সময়, এই বহুব্যবহৃত হাওয়া-বাতাসের ভেতর থেকেই একটা অন্যমন বেরিয়ে আসতে থাকে। খুব ভালো একটা মনখারাপ হয় আমার! যেন, কতদিন পরে ‘কই গো’ বলে মনের দাওয়ায় একটু বসতে এসেছি। বাইরে, রোদ শরতের চিঠি নিয়ে আসছে তখন। স্বদেশ সেনের কথামতো ‘নীল রবারের থাবা পড়ে গেছে আকাশের গায়’। হাওয়া ক্রমশ মা হয়ে যাবে এবার। আর সেই হাওয়ায় গর্ত করে ঢুকে পড়বে দূরদেশ ভ্রমণের কথা। যাতায়াতের পাশে ফুটে উঠবে কাশফুল। এই ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে থাকা, ক্রমশ নভেম্বরের  দিকে ঢলে পড়তে থাকা ঋতুই এখন আমার পুজো। চাপা পড়ে গুমরে থাকা মনের ওজনের পাশে হাত রাখার বেলা। 

আমার পুজো একটা বাইশ সেকেন্ডের রেলপথ। সাতসকালের ট্রেনে রূপনারায়ণ পেরনো, তার বুকে তখন ইলিশ শিকারী মাঝিনৌকো ভেসেছে। কোলাঘাট স্টেশনের পর কাশফুলের সমারোহ। রোজ দেখেও না দেখে উপায় কী? ট্রেনের দরজায় দাঁড়াই, হাওয়া কতটা নিবিড়  হলো আন্দাজ করি। বুঝি, জীবন আসলে খুব ছোটো ছোটো জিনিসে সাজানো। আর ভাবি, যাত্রাপথের সৌন্দর্যটি না থাকলে গন্তব্যের মানেটাই বা কী! লিখি – যা যা থাকে যাতায়াতের পাশে, তাদের লেখা বলা হয়। 

মাটির প্রতিমায় ভক্তিহীন এই আমার আসলে তো অনেক দেবতা। আমার তো প্রকৃতিই দেবী আর জীবনই দেবতা। এই শরৎ হেমন্ত যেন এক দ্যে জা ভু, যেন কোনো পূর্বস্মৃতির মধ্যে আস্তে ঢুকে পড়া। সারা বছরের কেন্দ্রীয় স্ক্রু এই অক্টোবর মাস। বছর স্পষ্টতই দুটো অক্ষে ভাঙা। গ্রামে, দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ, সকালের পায়ে শিশির। শহরে, মানুষের হাসি দিয়ে বাঁধানো রোশনাই। কখনও এসব টের পাই, কখনও বা দূর প্রদেশের রোমাঞ্চে মনে আর জায়গা থাকে না। তবু, যেকোনো আনন্দের মধ্যে আমি কেন যে বেদনাই পাই! এমনকি বিয়েবাড়িতেও যেন কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে, কী একটা চলে যাচ্ছে, সানাইয়ের সুরে তো আসলে তারই সঙ্গত! 

এদিকে, ক্লাসে, ছাত্রছাত্রীদের তখন উইলিয়াম ব্লেক পড়াবার সময়। Innocence আর Experience। Lamb আর Tiger। আলো আর অন্ধকার। কারো কোনো স্থানাঙ্ক থাকে না। এ ওর মধ্যে নিয়ত ঢুকে পড়ে হিসেব গুলিয়ে দিচ্ছে । কে যে কোন্‌টা ভালোভাবে ঠাহর করার উপায় নেই। মনখারাপ আর মনভালো – এদের কারবারও অনেকটা সেইরকম।  

আরও পড়ুন...