Categories
2023_jan goddyo

স্টেথোস্কোপ

স্টে থো স্কো প

সং হি তা   ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

sanhita

সুখের অসুখ

চমকে উঠলেন তো? অসুখের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সুখ যদি নিজেই তার কারণ হয়ে ওঠে কেমন হয়? অনেকটা যেন আয়নার মানুষের সঙ্গে শত্রুতা হওয়ার মতো, কিম্বা ডঃ জ্যাকল আর মিঃ হাইড ও বলা যায় ।

একটু খোলসা করে বলি। 2018 সালের পরিসংখ্যান অনুসারে পৃথিবীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মান নির্ধারণের মাপকাঠির মধ্যে বেশ কিছু অসংক্রামক অসুখ তখনি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আবার বিভিন্ন রকম ক্যানসারের পরিসংখ্যান পরিমাপক অন্যতম। কিছু রিস্ক ফ্যাক্টার অসুস্থতার সম্ভাবনার কারণ স্বরূপ মাপকাঠিতে ঢুকেছে, পনেরো বছরের ঊর্ধে মাদক দ্রব্য পানের পার ক্যাপিটা পরিসংখ্যান, তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের পরিসংখ্যান, উচ্চ রক্তচাপ, ওবেসিটি বা শারীরিক স্থূলতা ,মধুমেহ বা ডায়াবেটিস এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম কায়িক পরিশ্রম প্রবণ যাপন চিত্র এর অন্যতম। অসুখ গুলিকে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা নাম দিয়েছেন লাইফ স্টাইল ডিসিসেস বা জীবন যাপন জনিত অসুখ। অসংক্রামক এই অসুখগুলি বেশীর ভাগই দীর্ঘমেয়াদি, ডাক্তারি ভাষায় ক্রনিক, অর্থাৎ হয় স্থায়ী, নয় নিরাময়ের পর কোন পরিণতিগত অসুস্থতার কারণ, এবং দীর্ঘ সময় এর চিকিৎসা ও নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন আছে। এই অসংক্রামক রোগের তালিকায় হৃদরোগ ও স্নায়ুর অসুখ, মানসিক রোগ, বাত বা আর্থারাইটিস, হাঁপানি, ব্রোঙ্কাইটিস, এমনকি, অন্ধত্ব, বার্ধক্য জনিত উপসর্গ, ও অবশেষে সংক্রামক কোভিড ইত্যাদি অসুখের ফলশ্রুতি স্বরূপ কোন অসুখ সবই অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে সারা পৃথিবীতে হৃদ যন্ত্রের অসুখ ও ক্যানসার উন্নত দেশগুলিতে মৃত্যুর প্রধান কারণ। এই পরিসংখ্যান বাকি দেশগুলিতেওবেড়েই চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, মানুষের জন্মকালীন সম্ভাব্য আয়ুর পরিমাপ, অর্থাৎ লাইফ এক্সপেক্টেন্সি, যেমন বেড়েছে বার্ধক্যে জীবিত থাকা মানুষের মধ্যে এই সব রোগের সম্ভাবনাও বেড়েছে। এ ছাড়া আর একটি প্রধান কারণ হলো সময়ের সঙ্গে জীবন যাপনের আচরণ ও পদ্ধতি গত পরিবর্তন। অর্থাৎ লাইফ স্টাইলের পরিবর্তন। ভারতবর্ষের মত উন্নয়নশীল দেশ গুলিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অসংক্রামক রোগগুলির সম্ভাব্য আসন্ন মহামারি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। কয়েকটি পরিসংখ্যান বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করবে। 2016 সালে পৃথিবীতে মোট 57 মিলিয়ান মানুষের বিভিন্ন কারণে মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে 41 মিলিয়ান মূত্যু ছিল অসংক্রামক এই জীবন যাপন জনিত অসুখে। এর তিন চতুর্থাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যমানের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ গুলিতে। 2000 সালে এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেড়ে শুধু এই দেশগুলিতেই 31 মিলিয়ানে দাঁড়িয়েছে। 2016 তে এই মৃত্যুর মূল কারণ ছিল হৃদজনিত অসুখ ও ক্যানসার। ভারতবর্ষ দ্রুত অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যনের ফলে এই সব রোগজনিত মৃত্যুর সম্মুখীন হতে চলেছে। 35 থেকে 64 বছরের কর্মক্ষম বয়সের জনগণের এক সিংহভাগ তাঁদের জীবনের সক্রিয়তার ও সক্ষমতার সময় হারাতে চলেছেন। আমাদের দেশ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর দুই তৃতীয়াংশ বহন করে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস জনিত জটিলতাও এই সব মৃত্যুর অন্যতম কারণ। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, মাদক সেবন, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসুখ এই মৃত্যুর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। একজন তিরিশ থেকে সত্তর বছরের মানুষের হার্টের অসুখ, ক্যানসার, ফুসফুস জনিত রোগ বা ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা বর্তমানে এ দেশে মোট 23 %। যদিও পুরুষের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা 27% নারীর মধ্যে তা 20% ।

এই অসুখগুলি হওয়ার সম্ভাবনার কারণের মধ্যে তামাক সেবন অন্যতম প্রধান কারণ। প্রত্যেক বছর দেশে 7 মিলিয়ন মানুষ তামাক সেবন জনিত কারণে মৃত্যুর শিকার হন। এর মধ্যে সরাসরি তামাক জাতীয় নেশা ধুমপান এবং প্যাসিভ স্মোকিং অর্থাৎ ধুমপায়ী ব্যক্তির ধুমপানকালীন নিসৃত ধোঁয়ার কারণে ধুমপানের শিকার মানুষও অন্তর্ভুক্ত। জানলে অবাক লাগবে, প্রত্যেক বছর আমাদের দেশে ছয় লক্ষ মানুষ এই প্যসিভ স্মোকিং বা পারিপার্শিক ধুমপানে মারা যান আর এর মধ্যে এক লক্ষ সত্তর হাজার হলো শিশু ও কিশোর বয়সী। ধুমপান 71% ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ শুধু নয়, 42% শ্বাসকষ্ট জনিত অসুখ এবং 10% হৃদরোগেরও কারণ। চোখে ছানী এবং পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রাইটিস, পায়ে পেশীর যন্ত্রনা এবং বার্জার ডিসিস নামক রোগও ধুমপানের কারণে হতে পারে।

অসংক্রামক রোগের পরবর্তী যে কারণের কথা বলবো তা হলো কায়িক পরিশ্রমের অভাব। এই কারণে মৃত্যু হয় বছরে 1.6 মিলিয়ান জনের। নিয়মিত কায়িক শ্রম, মানুষের হৃদরোগ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ছাড়াও অবসাদ ও কিছু কিছু ক্যানসার, যেমন স্তন বা বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের সম্ভাবনা কমায় বলে বিজ্ঞান দাবী করে।

অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রভাবে নানা রোগে মারা যান প্রত্যেক বছর 3.3মিলিয়ান জন। এ ছাড়া অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, ফল ও সবজী কম খাওয়া, হৃদ রোগ ও বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ায়। অতিরিক্ত নুন খাওয়ার প্রবণতা উচ্চ রক্তচাপের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব বর্ধক ও বটে। অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, বছরে 2.8 জনের মৃত্যুর অপ্রত্যক্ষ্,বা প্রত্যক্ষ কারণ এবং ডায়াবেটিসের কারণও বটে। বি এম আই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সব রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিশেষে বলি ক্যানসারের কথা।। ভারতবর্ষ বিশ্বের ক্যানসারের 18% দায়ভার একাই বহন করে। এর অন্যতম কারণ হলো কয়েকটি বিশেষ সংক্রমণ যা ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ায়। যেমন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, হেপাটাইটিস বি ও সি বা হেলিকো ব্যাকটর পাইলোরি। এগুলির সংক্রমণ সম্পর্কে সাবধান হলে, এবং হেপাটাইটিসের টিকা নিলে এই সম্ভাবনা কমবে। এসব ছাড়াও পরিবেশ গত কিছু বিষয়, দূষণ, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের প্রভাব এই সব অসংক্রামক অসুখের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছে।

সহজেই অনুমেয়, অসংক্রামক অসুখ ও তার রিস্ক ফাক্টার আমরা স্বেচ্ছায়, জীবন যাত্রার তথাকথিত সুখ সমৃদ্ধি ও আরাম প্রিয়তা এবং অসংযত যাপনের দ্বারা ডেকে এনেছি। তথাকথিত ভালো থাকার মুখোশের আড়ালে রয়েছে অন্ধকার অসুস্থ মানুষের মুখ ! অথচ, নিয়মিত পরিশ্রম, সুস্থ খাদ্যাভ্যাস, অনাবশ্যক স্ট্রেস থেকে বিরত থাকা, তামাক সেবন ও অপর্যাপ্ত মদ্যপান না করা, সর্বোপরি রক্তচাপ ডায়াবেটিস ইত্যাদির জন্য নিয়মিত চিকিৎসাধীন থাকা শুধুমাত্র এটুকুই আজকের পৃথিবীতে জীবন যাপনের প্রেক্ষিতে সুস্থতার প্রয়োজনীয় উপায়। তথাকথিত সুখের মধ্যে অসুখের আয়োজন করে লাভ কি?

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

সাক্ষাৎকার

সা ক্ষা ৎ কা র

প লা শ   দে

কবি ও  চিত্রপরিচালক

palash

'পাগল তুমি থাকো আমার ভেতর, তুমি তো আমার একমাত্র শেষ আশ্রয়', দেবজ্যোতি মিশ্র

১। পৃথিবীর সমস্ত সুরের মাঝে তুমি অথবা তোমার ভেতরে সমস্ত পৃথিবীর সুর… কি মনে হয় তোমার!

আমাদের চারিপাশে সুর বয়ে যায়, সুর বয়েই যায়। কবে সেই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল, ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি হয়েছিল, সুর কি তখনও ছিল? মাঝে মাঝে মনে হয় সুরের জন্ম কবে? মানুষ হাঁক পেড়েছিল, তাই কি সুরের জন্ম হয়েছিল? তবে এটা বুঝি যে আমার চারিপাশে সুর বয়ে যায়, স্রোতের মতো বয়ে যায়, সেই সব স্রোত কখনও কাছের, কখনও দূরের। পৃথিবীর সমস্ত সুর একাকার হয়ে যায়, তারা পাশাপাশি দাঁড়ায়, আর হয়ে দাঁড়ায়, সোজাসুজি, কোনাকুনি। সুর গুলো জড়িয়ে যায় একে অন্যের সঙ্গে, তবে এটা বুঝি ভালোবাসা নিজেই একটা ব্যপ্ত সুর। আমি তো ভালোবাসারই মধ্য থেকে জন্মে ছিলাম, পরষ্পর আমার বাবা মা তারা নিজেদেরকে ভালোবেসেছিল, ভালোবাসা নিজেই একটা সুর, আমার জন্ম তাই সুরের মধ্যে, এই যে আমি এখন কথা বলছি, এই যে আমি লিখছি, এই সমস্ত কিছুই তো আসলে সুরের মধ্যেই ঘটে। কত রকমের সুর, কত ধরনের সুর, আমরা সুর বললে পরেই প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব, তার নিজের দেশের, তার নিজের ভাষার, তার নিজের শব্দের সুরের কথা বলে।

আরও সহজ করে বললে, আমরা সুর বললে পরে একটা গানের কথা বলি, সে তো গান এসছে অনেক পরে, কিন্ত তার আগে তো মানুষ সুরে, শুধুমাত্র স্বরক্ষেপনে গেয়েছে। পাখি শিষ দেয়, ধানক্ষেতে হাওয়া বয়ে যায়, সব কিছুরই সুর আছে, দৃশ্যের সুর আছে, সুর আবার দৃশ্য তৈরী করে। এই সব কিছুর মধ্যে আমি, আবার আমার মধ্যে সুর, অদ্ভুদ মজার ব্যাপার। মাঝে মাঝে মনে হয়, আচ্ছা এই যে কম্পোজিসনটা তৈরী করলাম, এই সুর গুলো কোথায় ছিল? এই সুর গুলো তো এই হাওয়ায়, বাতাসে, আমার স্মৃতিতে ছিল। আমার স্মৃতিতে কোথা থেকে এলো সুর, কে পুড়ে দিল আমার স্মৃতির মধ্যে সুর? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবন, বিভিন্ন সুর শোনা, নাকি জিনের মধ্য দিয়ে সুর শোনা যায়? এর সঠিক কোনো উত্তর কি জানা আছে কারোর? আমারও জানা নেই। ধীরে ধীরে যখন আমার রাগ রাগিনীর সাথে পরিচয় হলো, লোক গানের সাথে পরিচয় হলো, পশ্চিমের সঙ্গীত। পশ্চিমে তো কত রকমের সঙ্গীত, তাদের পশ্চিমী দ্রূপদী সঙ্গীত, পশ্চিমের রঙ, লুজ, জ্যাজ, আরও অনেক কিছু। শুধু পশ্চিম? আমাদের প্রাচ্যের, মধ্য প্রাচ্যের, কত রকমের কত শ্রুতি, সেই সব শ্রুতিকনারা যেভাবে আমাদের জড়িয়ে রাখে, তা বলার বাইরে, আর এই সব কিছু কখন মিলে মিশে যায় মাথার মধ্যে, মাথার ঠিক কোন কোনায় থাকে কেউ জানেনা, শুধুমাত্র আমারই যে সুর আছে, আমি সুর করি বলে, তা নয়। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব সুর আছে, সুরে বাধা থাকে সারা পৃথিবী, প্রতিটি ঘটনা। এইটাই আমার মনে হয় যে সুরের গল্প। সুরের মধ্যে আমি, আমার মধ্যে সুর।

২। মিউজিক-কবিতা-পেন্টিং-গদ্য এতগুলো মিডিয়ামে কাজ করতে গিয়ে কি অনুভব তোমার।

মিউজিক, কবিতা, পেইন্টিং, গদ্য, আসলে সব কিছুই আমার বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাবনা চিন্তা, তার টুকরো টুকরো অংশ, কোনো কিছুই ঠিক করে উঠতে পারলাম বলে তো মনে হয় না। পরিমানে মিউজিক আমার অনেক বেশী, তার কারন এটা পেশা হিসেবে এসেছে। কবিতা তো ক্রমাগত চোখের সামনে জন্ম নেয়, জানিনা তার মৃত্যু আছে কিনা, কত সব দৃশ্য জন্ম নেয়, এই যে ছন্দের সাথে ছন্দ মিলে যায়, যাকে সোজা কথায় বলে অন্তমিল, রাইম, আসলে সে সবই সময়কে কেটে টুকরো করে রাখা, যেন একটা ব্লেড দিয়ে সময়কে টুকরো করে রাখা, একটা টুকরোর সাথে আর একটা টুকরো মিলে গেলে আমরা বললাম ছন্দবদ্ধ হলো। কিন্তু সেই কবিতা কোথায়? কোথায় খুঁজে পাবো? যার কোনো অন্তমিল নেই, বা অন্তমিল থাকলেও অন্তমিল দূরের নির্দেশ দিচ্ছে, আরও দূরে আরও এক প্রত্যন্ত প্রান্তে, যেখানে আর এক অন্ত আছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে যে মিলবেই এমন কোনো কথা নেই, এই যে আনপ্রেডিক্টেবল একটা জার্নি, কবিতায় যেমন আছে, সুরেও আছে। গদ্য লেখক তিনিও যেখানে গল্প ছেড়ে যান, আসলে কি সেখানেও গল্পটি ছেড়ে যায়? যদি খুব প্রকৃত অর্থে একটি গদ্য তৈরী হয়, তা আসলে কখনোই ছেড়ে যায় না, তার থেকে আরও অনেক সুতোয় সুতোয় আরও অনেক তৈরী হয় মানুষের মনে।  পেইন্টিং, ছবিরও সেই একই ব্যাপার। একটা ছবির সামনে আমি হয়তো দাঁড়িয়ে আছি। আসলে সেই দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটার সামনে আসলে অন্ধকার। আকাশ কি করে বুঝতে পারছি! মাঝেমধ্যে কিছু রং দেখা যায়। অভিজ্ঞতায় জানি মাথার উপর দেখা যায় আকাশ। কিন্তু তাই কি? আকাশ তো নিজেই ব্রহ্ম। চোখ বন্ধ করে থাকলেও, থাকে। হঠাৎ যদি মনে হয় কিছু রং কিছু আঁচড় ছেলে মানুষের মতো, দেয়ালেই আঁকলাম কিম্বা কাগজে, মাটিতে অথবা একটা ক্যানভাসে। তারও এক সুর আছে ছন্দ আছে। তারও একটা গভীরতা সমস্ত কিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া আছে। সেই ছবির রং অন্যরকম। সুর যখন করি সুরের সঙ্গে থাকি তখন তো ছবি থাকে, হয়তো লুকিয়ে। কবিতা থাকে গদ্যও থাকে। তবে আমাকে সব থেকে বেশি আন্দোলিত করে অক্ষর। এবং সেই অক্ষর যখন থেকে যখন শব্দ তৈরি হয়, শব্দ থেকে আরেকটি শব্দ তারপর আরেকটি শব্দ। ক্রমাগত একটা প্রলোভন দিয়ে যায়। হাতছানি দিয়ে যায়। একটা অন্তের দিকে। যে অন্তের দিকে দেখি কোন অন্ত নেই। কবিতার সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রেম নিবিড় প্রেম ভালোবাসা তৈরি হয়। কখনো কখনো সেগুলোকে ওই যে বললাম ব্লেডের টুকরো দিয়ে সময় কাটা… সেরকম ভাবে কিছু কিছু লেখা হয়ে যায়। সেগুলো কবিতা হলো কিনা গদ্য হলো কিনা সে দায় নেই আমার। থেকে যায়। তার মধ্যে আদর ভালবাসা সবই থাকে। আর একটা ডুকরে ওঠা কান্নাও থাকে বুঝি। যা আসলে কখনোই কাব্য হয়ে ওঠে না। কবিতার জন্ম বোধহয় সেখানেই। সুরের মধ্যে একটু সহজ বিচরণ আমার। অনেক ছোটবেলায় সেই সুরের দেখা মিলেছিল বাবার হাত ধরে ভায়োলিন শেখার মধ্যে দিয়ে। এই আজও যখন লিখছি কিছুক্ষণ আগে বিরাটিতে একটি শো করে এসেছি সেই ভায়োলিন হাতে মাইক্রোফোনের সামনে দু হাজার শ্রোতা। কি করে যে বাজিয়ে চললাম! তাই মনে হয় ছেলেবেলায় বাজানো ভায়োলিন মিথ্যে বলে না আমাকে। কি সহজে একটা তার যখন সুরে একটু নিচু হয়ে গেছে, একটু ঢিলে হয়ে গেছে… আঙুল মেপে নিয়ে নিজের সুরের সাথে মিলিয়ে নেয় সে। অভ্যেস বহু বছরের। শেষ দিন পর্যন্ত আমার হাত ধরে থাকবে সুর। একই রকমভাবে যখন আমি ছবি আঁকি। যা আঁকতে ইচ্ছে করে তা আঁকতে আরম্ভ করেও আঁকা যে কোথায় চলে যায় … যেখানে শুরু করব মনে করেছিলাম সেখানে শেষ হয় না। ছবি আঁকার তাই শুরুও নেই শেষও নেই। একটা যা হোক কিছু কাগজে কিংবা ক্যানভাসে কিংবা একটা খাতায় থেকে যায়। তার থেকে আমি মুক্তি পাব বলে কখনো সখনো ফ্রেমে বন্ধ করি। সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো কেউ বলেছে কখনো ‘বাহ্’।  সেই বাহবাটা মনে থেকে গেছে। পরবর্তী সময়ে ছবি আঁকতে গিয়ে কখনো স্মৃতি আমাকে তাড়না দেয়নি। নতুন স্লেটেই আবার ছবি আঁকা শুরু হয়েছে। ‘একদা জাহ্নবী তীরে’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে বা সত্যজিৎ রায়ের উপর ‘কম্পোজার সত্যজিৎ’। দুটো বই একেবারে ভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পড়লে নিজেই প্রায় কোথাও হারিয়ে যাই মনে হয়। তাহলে দেখুন ‘একদা জাহ্নবী তীরে’ এখানে শব্দেরা, অক্ষর… একটা ইতিহাসের নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সত্যজিৎ রায় তার বিপরীত। সবকিছুকে ধরা দেবে বলে বসে আছে। তার কারণ সুরের গল্প লিখতে গিয়ে সুরের কাছে হেরে বসে আছি যে!

এরকম বহু লেখা বিভিন্ন সময়ে লিখেছি। গদ্য পদ্য ওই লেখার অছিলা আর কি।

তাই সুর পেইন্টিং গদ্য পদ্য এগুলো আসলে মিলেমিশে যায়। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হয় গল্প হয় ভাব হয় ঝগড়া হয়… কোন্দল করে তারা।

এইরকম… এইরকমই অনুভব আমার।

৩। তুমি তো রাজনীতি সচেতন মানুষ। ব্যক্তিগত একা একলা মানুষের রাজনীতি আর পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় তোমার কাছে।

ব্যক্তিগত একা… একলা মানুষের রাজনীতি। একটা রাজনীতি তো আছেই। একা তুমি কখনও নও আসলে। এই যে দাঁড়িয়ে আছি, বসে আছি বা এই যে আমি লিখছি এখন। এই যে চারটে দেওয়াল রয়েছে… এই construction… বহু বহু মানুষের তৈরি করা বহু বছরের তৈরি করা একটা construction এর মধ্যে বসে আছি আমি… চারটে দেওয়ালই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের কত কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে, তাই একলা কি সত্যিই কখনও হতে পারা যায়? আমার চারপাশে টিভি চলছে… বা ফোন… এই যে আমি লিখছি… এই যে অক্ষরেরা… আমি একা কখন? এই আক্ষরদের সঙ্গে তো আমি আছি। তাই একা একলা মানুষের রাজনীতির মধ্যে গোটা ইতিহাসটাই লুকিয়ে রয়েছে আসলে। ঘরের সামনে একটা আয়না আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটা ছায়া দেখতে পারি, সেই ছায়াটা যে আমি সেটা কি করে আমি জানি, তার মানে আমার মস্তিষ্কের একটা ঘটনায় আমি চিনতে পারি ওই ছায়াটাকে আমি বলে। এটা চিনতেও তো বহু বহু বছর সময় লেগেছে। তাই আমি আসলে কখনই একা বা একলা নই, আমাকে ঘিরে রেখেছে সব কিছু। আমার এই যে বই, এতগুলো বই রয়েছে চোখের সামনে… এত কিছু রয়েছে… musical instruments রয়েছে, খাবার রয়েছে… সবকিছু… একটা বই, সেই বইটার একটা দাম রয়েছে। কোনও একদিন ঠিক হয়েছিল… সেই বইটা রয়েছে আমার। এই বই-এর rack-এ, সেই বইটা published হয়েছে একটা জায়গায় সেখানে বহু মানুষ তাদের শ্রম দিয়ে তারা তৈরি করেছে বইটা ফলে আমি একা যখন বসে আছি তখনও অসলে ইতিহাসের এবং আমার সমসাময়িক সময়ের বহু মানুষের শ্রম আবেগ এসব কিছুর সঙ্গে আমি জড়িয়ে আছি। তাই আমার একা বা একলা মানুষের রাজনীতি আসলে একলা মানুষের নয়, বহু মানুষের।

আর যদি বলা যায় যে পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় আমার কাছে তা এক এক সময় এক এক রকম। আমার ষোলো বছরের জীবনে আমি এক রকম ভাবে খবরের কাগজের খবর পড়ে আমি react করতাম। এখন হয়ত অন্যভাবে করি। হয়তো খবরের কাগজ পড়াই হয় না। হয়তো এই মোবাইল ফোনে আমি দেখছি বিভিন্ন লেখা আসছে ভাসছে যাচ্ছে এবং আমি শুনছি বিভিন্ন information আমার কাছে আসছে অথবা আমি দোকানে যাচ্ছি, একটা কিছু কিনছি, সেই কিনতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি দাম বেড়ে গেছে কিম্বা আমি জানি যে একটা lock down হল… pandemic দুটো বছর আমি জানছি যে পৃথিবীতে কি করে মানুষ তখনও ব্যবসা করছে, ব্যবসা করার কথা ভাবতেও পারছে… সে নিজেও জানে না পরের দিন সে বেঁচে থাকবে কিনা… সে ভাবছে কি করে তার ব্যবসাটা চলে… একটা ঘোরের মধ্যে বসে। Oxygen Sylinder কিম্বা Mask সংগ্রহ করছে সে। বাজার থেকে সব কটা জিনিস তাকে নিজেকে নিয়ে চলে আসতে হবে, সে যেন বেঁচে থাকে। প্রতিটি মানুষ এভাবে ক্রমাগত একটা রাজনৈতিক আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে বেঁচে থাকার রাজনৈতিক আবর্ত এবং সেই বেঁচে থাকাটা যে শুধু মাত্র physically বেচেঁ থাকা নয়… অনেক রকম ভাবে… শক্তি… power game… gender politics… সমস্ত কিছু মিলে মানুষ শেষ পর্যন্ত একটা দুটো ক্লাস… একজন oppress করে একজন oppressed হয়, এই জায়গার বাইরের দিকে বেরিয়ে আস্তে পারে না। তবুও পৃথিবী অনেকটা সময় ধরে বহু কিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যে যুদ্ধটা চলছে … রাশিয়া বনাম ইউক্রেন, আমরা এখন আর কোনো খবরই পাইনা শুধু খবরটা যেভাবে হতে পারে বলে মনে হয়, দেশের economyটা আস্তে আস্তে আস্তে আস্তে… বিভিন্ন পৃথিবীর equation… তাদের নিজেদের দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে… আমরা বুঝতে পারি, আমাদের effect করে একটা তেলের দাম বাড়ার ওপর আমাদের জীবন যাপন বেচেঁ থাকা এবং তা দিয়ে একটা দেশের বিপরীত রাজনীতি বিপরীত narrative যেমন ভাবে তৈরী হবে তা তৈরি হয়। তাই যে কথা বলছিলাম পৃথিবীর রাজনীতি কিভাবে আসে যায় বা যায় আসে সেটা জরুরি হয়ে ওঠে তখনই যখন ঠিক আমার বাড়ির পাশে একটা ঘটনা ঘটে কিম্বা কিছু দূরে কেননা খুব বেশি দূরে ইউক্রেনে ঘটনার সঙ্গে আমি কতটা সুতোয় বাঁধা রয়েছি আমি জানি না। খুব indirectly যে সুতোয় বাঁধা থাকি সেগুলোকে আমরা বুঝে উঠতে পারিনা। আমরা theoretically বোঝবার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা বুঝে উঠতে পারিনা শুধু এটা বুঝতে পারি যে পৃথিবী কোনো মঙ্গলের দিকে যাচ্ছে না… কোনো মঙ্গল হওয়ার নয়। কিন্তু তাও তো আমরা আশা ছাড়তে পারিনা। এই যে শ্রমজীবী ক্যান্টিন আমাদের ভাবনায় উঠে এল pandemic-এর মধ্যে, lock down-এর সেই প্রথম দিকে তখন আমরা মনে মনে ভাবলাম যাদবপুরের community kitchen শ্রমজীবি ক্যান্টিন… তার এক হাজার দিন পূর্ন হল তার এক হাজার দিন পূর্ণ হল, ভেতরে কি একটা তৃপ্তি আসেনি? নিশ্চই তৃপ্তি এসেছে। বহু মানুষ খাবার পেতে পারে। বহু মানুষকে চোখের সামনে দেখেছি, অন্তত তাদের কিছুটা ক্ষুধার নিবৃত্তি দিতে পারা গেছে এটা আমার কাছে একটা বড় পাওনা। এটাও তো রাজনীতি। এখানেও তো বহু মানুষ এক সঙ্গে মিলেছে। যেরকম ভাবে যুদ্ধে বহু মানুষ এক সঙ্গে মেলে একটা ধ্বংসের জন্য। তেমনি বহু মানুষ একসঙ্গে মিলেছে একটা ভালোর জন্য, একটা মঙ্গলের জন্য। তাই আমি এই পৃথিবীর ব্যাপারে কৌতূহলী এবং কৌতূহলী থাকবও।

৪। তোমার সঙ্গে যারা মিশেছেন তারা টের পান তোমার পথ সহজিয়ার। অথচ এই পথই সবচেয়ে কঠিন তোমার জার্নি টা যদি একটু বলো।

সহজিয়া কি হওয়া যায়?  এ জীবনে আর সহজিয়া হতে পারবো না। তবে সহজিয়া যে জীবন চোখের সামনে দেখি বা যাদের দেখেছি… তাদেরকে সবসময় মাথায় করে রাখব।… আমার বাবা… আমার বাবা বললাম কেন? সেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমার… শুধু বাবা কেন… মা। যে কথা একদম প্রথম প্রশ্নে বলেছিলাম যে আমার বাবা মা, তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ছিলো আর তাই তো আমি। সেই বাবা আমার হাতে বেহালা দিয়েছিল… ভায়োলিন… সেই ভায়োলিন দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার যাত্রা… সুরের যাত্রা। আজও আমি… এই লেখা লিখতে বসার আগে বিরাটিতে দু আড়াই হাজার মানুষের সামনে মাইক্রোফোনে যখন ভায়োলিন বাজাচ্ছিলাম, মনে পড়ছিল প্রথম দিনের কথা… কি কষ্টে স থেকে র, র থেকে গ, একটা আঙুল থেকে আর একটা আঙুল… মনে পড়ে যায়। কিন্তু এই বাবার জীবনই তো ভীষণ একটা সহজিয়া জীবন ছিল। কি অনায়াসে খালি গায়ে একটা লুঙ্গি পরে মানুষটা টালিগঞ্জ চন্ডিতলার একটা কলোনি পাড়া এলাকায় হেঁটে বেড়াত, মানুষ সম্ভ্রম করত, শ্রদ্ধা করত কিন্তু কোথাও দূরত্ব ছিল না। আবার যখন এই টালিগঞ্জ চণ্ডীতলা পেরিয়ে ট্রাম লাইন পেরিয়ে গড়িয়ার পর  যখন লোয়ার স্ট্রিট-এ সলিল চৌধুরীর বাড়িতে সলিলদার সঙ্গে কাজ করতাম দীর্ঘ সময় ধরে দেখেছি কত সহজ জীবন একটা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ… সেগুলো দেখা একটা বিরাট বড় ব্যাপার। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেছি দীর্ঘ দিন… দীর্ঘ তেরো বছর… কত ছবি, ছবির বাইরে ছবি, গানের বাইরে মাসিক অ্যালবামের গান হয়তো background score… তার সঙ্গে কাজ করেছি, বহু বহু মিউজিশিয়ান… কেরালা চেন্নাই বোম্বে ওড়িশা বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন মিউজিশিয়ানরা, কত শত মিউজিশিয়ানদের সাথে আলাপ হয়েছে পরিচয় হয়েছে… সবার মুখ না মনে পড়লেও সবাই আসলে আমাকে ছুঁয়ে আছে। তাঁরা সবাই ছুঁয়ে না থাকলে আজকে আমি যেটুক করছি সেতুক সম্ভব হত না। ভারতবর্ষের কত শ্রেষ্ঠ মিউজিশিয়ানদের দেখেছি সলিলদার দৌলতে এবং সলিল চৌধুরীর compose করা সুর স্বরলিপি করে তাদের সামনে যখন রেখেছি, তাদের চোখে আমি দেখেছি এক ধরনের স্নেহ একটা প্রশ্রয়… আমি এই যে আজকে মিউজিশিয়ান কিংবা  composer বা গান গাই যদি কখনও গেয়ে ফেলি গাইতে পারি তখন ভাবি এ তো সবই তাদের জন্য। তাদের প্রশ্রয় আমাক আরও দৃঢ় করেছে। কিন্তু ওই যে একটা কথা বললাম, বারবার করেই বলি ওই সহজিয়া জীবনই আমাকে মনে করে যে আমাকে মানুষের সঙ্গে একদম পাশাপাশি থাকতে হবে এবং আছিও তাই তার বাইরে কিছু মহান কাজ কিছু করিনি, কোনো মহান কাজ করার ইচ্ছেও নেই, শুধু ওই মহান জীবনগুলোর সাথে আবার যদি দেখা হয়, আর একটু যদি দেখা হয়… শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সেরকম একটা চেষ্টা থাকলে পরেই হবে… পথটা কঠিন, তার কারণ এমন একটা সময় আমরা বাস করি  যেখানে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত আমি… আমি হয়েই থাকি, আমরা হয়ে যেতে পারি না আর এই আমরাই পথটা তো সহজ নয়… আমিকে ভোলা কঠিন, খুব কঠিন শেষ পর্যন্ত… খ্যাতির মোহ থাকে, সেই মোহে আমি জড়িয়ে যায়, সে আমরা হতে দেয় না … সেই ঝুট ঝামেলা যে আমার মাথায় বাঁধে না তা বলতে পারি কি এত সহজে… সহজিয়া জীবন আমাকে দেখে লোকের মনে হলেও নিজেকে অনেক অনেক কিছুর মধ্যে থেকে ছাড়িয়ে আনতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত লালন সাঁঈদের কাছে বোধয় পৃথিবীর সমস্ত মুক্তির তালা চাবি। এই যে বললাম তালা চাবি… তালা চাবি দিয়ে যদি বন্ধই হলাম তাহলে মুক্ত হওয়ার এত ইচ্ছে কেন! এদিকে ওই মুক্ত হওয়ার ইচ্ছের মধ্যেই মুক্তি ঘটে। দেখা যাক এই জীবনে কোনও মুক্তি ঘটে কিনা সেরকম।

৫। তোমার ভেতরে যে আশ্চর্য পাগল বাস করে সেই পাগলের কথা শুনতে চাই।

পাগল কি না জানি না… তবে আমার মধ্যে ইচ্ছেটা বাস করে। সে তো প্রতিটা মানুষের মধ্যেই ইচ্ছেটা বাস করে। তাদের ভেতর ইচ্ছেটা কেমন ভাবে বাস করে তো বলতে পারব না, তবে আমার মধ্যে ইচ্ছেটা কেমন ভাবে বাস করে বলতে পারি। আমার বিভিন্ন ইচ্ছেরা… তারা সকালবেলা বল্গাহীন ভাবে বেরিয়ে পড়ে, তাদের অনেক স্বাদ এবং তারা সময়োপজীব্য সমস্ত কিছু করে না। এদের উপর আমার রাশ টানা খুবই মুশকিল। আমি কখন ছবি আঁকব, কখন সুর করব, কখন আমার পরিচালক আসবেন তাঁকে শোনাতে হবে কিন্তু আমি এতটুকু তৈরী নই। কিন্তু তাঁকে দেখেই আমার ভেতরে কিছু একটা হবে আর সামনের লেখাটা সুর হয়ে উঠবে। এইটা আমি নিজেও বুঝিয়ে বলতে পারব না। আর পাগল হওয়া কি এত সহজ সে তো বড় কঠিন। সেরকম পাগল নিজের মধ্যে কিছু মুহূর্ত জীবনে দেখেছি। যখন আমি বুঝতে পারি যে সারাটা দিন আমি খুব খেটেছি কিন্তু আমি বুঝতেই পারি নি যে আসলে আমি খাটছি। এবং বাইরে থেকে যারা আমাকে দেখছে তারা বলে এবং অনেক সময় বলেছে যে এত এনার্জি কি করে পাও। আসলে একটা পাগলামি থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা করে ফেরেও। আমি রাস্তাঘাটে যখন সত্যি কারের একজন মানুষ তথাকথিত ভাবে যাকে বলা হয় মূলধারার জীবন থেলে ছিটকে গেছে আমি খুব খেয়াল করে দেখবার জন্য চেষ্টা করেছি কখনো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে মনে তো হয়নি তারা পগল। ঠিক আমার সামনে যখন আমি দাঁড়াই তখন বুঝতে পারি না কোনটা আসলে পাগলামি। হ্যাঁ এটা বলতে পারি আজও পর্যন্ত আমার কোনো কিছুর প্রতি অধিকার বোধ তৈরী হয়নি। শুধু মুখ গুলো আমার অবলম্বন। যে মুখগুলোর সাথে আমার গল্প হয় সেই মুখগুলিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাদের সাথে আমার অনেক রকমের কথা হয়। কোন মুখ ছাড়িয়েছি কোন রাস্তার পাড়ে সেই মুখের সাথে গল্প জুড়ে দি। মানুষ তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। মানুষ বলতে আমার আত্মীয়, স্বজন, বন্ধুজন— তারা হয়তো আমায় দেখছে আমি মিউজিক কম্পোজ করছি আমি হয়তো ত্রিশ বছর আগে বা কত শতাব্দী ধরে জানিনা সেখানে একজনের সাথে গল্প করছি। আর অন্যরকম একটা সুর বেরিয়ে আসছে, কিংবা একটা লেখা, কিংবা একটা ছবি… আমি বলি পাগল তুমি থাকো আমার ভেতর, তুমি তো একমাত্র আশ্রয় বা শেষ আশ্রয়। সেই পাগলের কথা শুনতে পাই আমি কিন্তু আপনাদের শোনাবো কি করে আমি যে তার সবকটা কথা এখনও শুনে উঠতে পারি নি। সে রাত্রির বিভিন্ন প্রহরে ডাক দিয়ে যায়। তাকে ধরতে পারি নি কখনো কিন্তু বুঝি সে আছে। থাকুক। এভাবেই সে থাকুক আমার সাথে।

৬। তীব্র গুণীজনদের সঙ্গে তুমি কাজ করেছ বিভিন্ন মাধ্যমে। সেই তেঁতুল পাতায় ন-জনের কিছু গল্প যদি বলো…

হ্যাঁ, সত্যিই তাই, তীব্র গুণীজনের সঙ্গে আমি কাজ করেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। আমি যদি সঙ্গীতের কথাই বলি প্রথম দেখা আমার বিস্ময়কর মানুষ আমার বাবা। আমার বাবাকে আমি দেখেছি বাবা, বাহাদুর খাঁ, ঋত্বিক ঘটক, উদয়শংকর একসঙ্গে… খুব ছোটবেলার স্মৃতি সেসব। কিন্তু বুঝতে পারতাম আমার বাবা খুব সহজ সরল, আমার বন্ধুর বাবাদের মতো নয়। যারা স্নেহশীল, যারা সংসার দেখেন, ওই কলোনীপাড়াতেই যে যার সাধ্যমতো অফিসে যান ফেরেন, কিংবা স্কুল যান বাড়ি ফেরেন সে রকম নয়। আমি দেখেছি আমার মা প্রায় সময় উদ্বিগ্ন মুখে থাকতেন মাসের মাঝ বরাবর। বাবাকে তখন দেখেছি বাবা অবলীলাক্রমে ওয়েস্টার্ন ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে বাংলা স্বরলিপি করছেন। খুব আশ্চর্য লাগত। পরবর্তী সময়ে সেই স্বরলিপি বাজিয়েছি যখন মুগ্ধ বিস্ময়ে বাবাকে একজন তীব্র গুণী মানুষ বলেই মনে হয়েছে। মাকে জিজ্ঞেস করতাম, এরকম একটা মানুষকে নিয়ে সংসার করতে তোমার… মনে হয় নি কখনো তোমার যে তোমার জীবন অন্যরকম হতে পারত। বাবার মৃত্যুর পর মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা বলেছিল না রে প্রথমে ভাবতাম এসব সবার যেমন সংসার হলো আমার তেমন হলো না। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যা মানুষ আমাকে এত ভালোবাসলো তাঁর এমন কিছু জিনিস ছিল যা দেখে আমি মুগ্ধ হতাম। এই কথা আজ লিখতে গিয়ে আমিও বিস্মিত হচ্ছি।

বাবার পরই মনে পড়ছে সলিল চৌধুরীর কথা। বাবা যদি হন ব্যাকরণের বই ‘রায় এন্ড মার্টিন’ সলিলদা যেন আমার কাছে শেক্স পিয়ারের সাহিত্য, তাঁর সনেট, তাঁর আলো… আমাকে সমস্ত জানলাগুলো খুলে দিল। সেই আলোয় আমি সমস্ত পৃথিবীকে দেখলাম। ওই যে গানের মধ্যে আছে না ‘কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিল, সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল’… এই ভালোবাসার আলো আমি সলিল চৌধুরীর মধ্যে দেখেছিলাম। সত্যজিৎ রায়কে দেখেছি। একেবারে ভিন্ন মেরুতে। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। অবাক হতাম এত এত কাজ করে যাচ্ছেন যে মানুষটা তিনি নির্বিকার ভাবে একটা গাড়িতে করে এলেন, এইচ এম ভি-র ফ্লোরে ঢুকলেন এবং কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছেন। যে কাজ একবার করলেন সে কাজকে ফিরে আর দেখেন নি। তাঁকে নিয়ে আমার বই ‘কম্পোজার সত্যজিৎ’ বেরিয়েছে। মৃণাল সেন… এই মৃণাল সেনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা বা কাজ সেই আটের দশকের গোড়ায়। সেই ছবি ‘আকালের সন্ধান’-এ। সলিল চৌধুরী তাঁর সুর পরিচালক আমি সহকারী। দেখেছি দুই বন্ধুর গল্প… সলিল চৌধুরী আর মৃণাল সেন… ভাবা যায়? দু’জনে ফ্লোরের মধ্যে যখন কাজ করছেন তখন আমরা মিউজিশিয়ানরা বুঝতেই পারতাম না যে আমরা একজন মহান পরিচালক আর একজন মহান কম্পোজিটারের সঙ্গে কাজ করছি। মনে হত যেন দুই বন্ধু কাজ করছে। তা তো সত্যি। সেই গণনাট্যের সময় থেকে তাঁরা বন্ধু। যদিও মৃণাল সেন গণনাট্যের সঙ্গে ছিলেন না কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। সে গল্প অন্য একদিন হবে। মৃণালদার সঙ্গে কাজের একটি গল্প বলি, ‘আমার ভুবন’ ছবির কাজ করছি। মৃণালদা বললেন, এই ছবিতে একটা বিশেষ জায়গায় ‘আলোর পথযাত্রী’ ব্যবহার করবেন। তখন সলিল চৌধুরী বেঁচে নেই। তাঁদের প্রবাদপ্রতিম বন্ধুত্বের গল্প। আমি বললাম, ‘এখানে কি ‘আলোর পথযাত্রী’ যাবে? এই সিকোয়েন্সে?’ উনি বললেন, ‘তাই? তাহলে এক কাজ কর অন্য কোনো মিউজিক কর’। মিউজিক করা হল। বহু পরে যখন ছবিটা দেখা হচ্ছে স্ক্রিনে, মৃণালদার ঠিক পাশে বসে আছি আমি। ভুলে গেছি আসলে কি মিউজিক হয়েছে। হঠাৎ ওই সিকোয়েন্সে দেখি ‘আলোর পথযাত্রী’ বেজে উঠল। মৃণালদা আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন ‘তুমি কিছু মনে কর না। আসলে সলিলকে আমার একটা ট্রিবিউট জানানোর কথা ছিল।’ এই যে বন্ধুত্ব… দুজন অসম্ভব গুণী মানুষ… এবং তাঁরা দু’জন বন্ধু। একজন নেই আজ, আমার শিল্প বড় কথা নয়, আমি আমার বন্ধুকে ট্রিবিউট জানাতে চাই… এই অনুভূতি… মনে হয় আজ এরকম ভাবেই থাকতে পারব তো কারোর বন্ধু হয়ে কিংবা কেউ আমার বন্ধু হয়ে।

বহু প্রজন্মের সঙ্গে তুমি কাজ করেছ নতুন প্রজন্মের কাজের সম্পর্কে তোমার কি মনে হয়?

বহু প্রজন্মের সঙ্গে আমি কাজ করেছি এমন ভাবলে আমার মনে হয় এই তো সবে আবার কাজ শুরু হল… ঠিক এইটাই মনে হল। হ্যাঁ, আমার সতেরো বছর বয়সে আমি সলিল চোধুরী, মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়কে পেয়েছি। হ্যাঁ মাত্র সতেরো, আঠারো, উনিশ, কুড়ি বছর বয়সেই। সারা ভারতের আরও অনেক শ্রেষ্ঠ ও গুণী মানুষদের সাথে কাজ করেছি। কাজ করেছি অপর্ণা সেনের সঙ্গে, ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে। ঋতুর সঙ্গে যখন কাজ করেছি ঋতু অন্য একটা পৃথিবী তৈরী করেছিল। সলিল চোধুরী ও মৃণাল সেনের কথা যেমন বললাম তেমন বাইরের বহু লোককে বলতে শুনি আমার আর ঋতুর বন্ধুত্বের কথা। আমরা যেসব কাজগুলো করেছি সেই সব কাজগুলো মানুষ ভালোবাসছে আজ এ আমার এক পরম প্রাপ্তি। আমার বন্ধুটি নেই আর। কি বলব। আমার প্রজন্ম আর তাঁর পরের প্রজন্ম-এর যাঁদের দেখছি বহু মানুষদের মধ্যে, বহু কিশোরের মধ্যে, বহু তরুণের মধ্যে আমি অনেক প্রতিভা দেখতে পাই। সেটা কবিতায়, সেটা ছবিতে, সেটা সিনেমায়, সাহিত্যে কিন্তু যেটা বলব আরেকটু ধৈর্য আরেকটু নিষ্ঠা প্রয়োজন। পরে থাকতে হবে। লেগে থাকতে হবে সেটা প্রয়োজন। আসলে ওরা তো এই সময়ের। এই সময়টাই তো বিক্ষিপ্ত। বিক্ষিপ্ত করে দিচ্ছে সবাইকে। তবু সবাইকে আমার ভালোবাসা। ওদের কাছে আমার চাওয়া, তোমারা আরও মন দিয়ে, আরও ভালোবাসা দিয়ে, আরও আবেগ দিয়ে তোমরা তোমাদের নিজের কাজগুলোকে জড়িয়ে ধর। তোমরা আমাদের থেকে অনেক অনেক বেশি প্রতিভা ধারণ করেছ। শুধু প্রতিভা নয় করতে হবে একনিষ্ঠভাবে পরিশ্রম।

আমি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে করতে আশ্চর্য হয়ে যাই। আমি ভুলে যাই আমি কোন প্রজন্ম থেকে আসছি। পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ হওয়ার কোনো বাসনা নেই আমার। আমি সব সময় মনে করি জন্ম ক্রমাগত হচ্ছে এবং কোনো মৃত্যু নেই। আর তাই এই মুহূর্তে আমিও আমার সতেরো বছরকে পেরিয়ে আসিনি। তাঁকে আঁকড়ে ধরেই আমি আছি। তাই এই প্রজন্মেও আমি ওদের সঙ্গে ওদের মতো করেই থাকি। আবার কখনো সেই মানুষটা যে আটের দশক থেকে এসেছিল সে এসে উঁকি মারে। সে অনেক কথা বলে। হুকুম জারি করে। কিন্তু তাকে আমি চেপে দিই। বলি সেই সময় তুমি তো অনেক কথা বলেছিলে, তোমার নিজস্ব ভিউ ছিল… আজকের প্রজন্ম এসেছে… ওদের নিজস্ব ভিউ আছে… সেগুলোকে ভালো করে দেখ। সেগুলো থেকে শেখ।    

বিশেষ ধন্যবাদ

অর্পিতা সরকার প্রামাণিক
মোহনা মজুমদার

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

রূপ কথা

রূ প  ক থা

অ নু ক্তা   ঘো ষা ল

মডেল ও কবি

anukta

কাফতানে কামাল

কথায় বলে ‘Change is the only constant’ তা সে পছন্দই হোক বা স্বাদ, ছুটতে থাকা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় অনেক কিছু। আবার কিছু কিছু পরিবর্তন বড়ই নিশ্চিত। যেমন আজ যা ট্রেন্ড কাল তা ব্যাকডেটেড। আর এইসব নিশ্চিত পরিবর্তনের সাথে পা মিলিয়ে একটু একটু করে বদলে চলেছে ফ্যাশান। শুধু ফ্যাশান নয় ড্রেস সেন্স, ফ্যাশান সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও বদল ঘটেছে অনেক। নিজস্ব স্টাইল-এ আমরা তখনই হয়ে উঠব অনন্য যখন আমরা সেই পোশাক পড়ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ও স্বচ্ছন্দ ভাবে। আজকের ফ্যাশানও সেই কথাই বলে। আপনি যে পোশাকে স্বচ্ছন্দ সেই পোশাকেই আপনি অন্যের দৃষ্টি কাড়তে পারেন যদি আপনার মধ্যে থাকে আত্মবিশ্বাস। সেক্ষেত্রে আপনার চেহারা, আপনার বয়স নিতান্তই গৌণ। আজ এমনই এক ধরণের পোষাকের কথা বলব যাতে যেকোনো বয়সের, যেকোনো চেহারার মানুষই স্বচ্ছন্দ বোধ করার সঙ্গে সঙ্গে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন অন্যকে।

আজ বলব কাফতানের কথা। এই কাফতানের আবির্ভাব মেসোপটেমিয় সভ্যতার সময়কালে। ফুরফুরে রঙিন কাপড়ের উপরে তাক লাগানো নকশার নৈপুণ্যেই যেন ফুটে ওঠে কাফতানের আভিজাত্য। কাফতান যেমন আরামদায়ক তেমনই ফ্যাশানেবল। যা ঘরে ও বাইরে স্বচ্ছন্দে পড়া যায়। কাফতানের বিশেষত্ব এতে আরামদায়ক হাতা থাকে এবং কোমরের দিকে বাঁধার জন্য বেল্ট বা ইলাস্টিকের কোমর বন্ধনী থাকে। এই কোমর বন্ধনী কাফতানের সৌন্দর্যে আলদা মাত্রা যোগ করে। নীচের অংশের সমান বা অসমান অংশ এই পোশাককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। অনেকক্ষেত্রে কাফতানের নিচের অংশ হয় কোণাকৃতি। কাফতানের এই কাটের আরও অনেক রকমফের আছে। যেমন— শোল্ডার কাফতান, ড্রেপ কাফতান, ড্রেপ কত্তল কাফতান, সার্কেল কাফতান, কাট উইং বাটারফ্লাই কাফতান প্রভৃতি। আবার নকশা ও ডিজাইনের দিক থেকেও কাফতানের  নানা বৈচিত্র দেখা যায়।

‘লেবেল সুকন্যা’-এর কর্ণধার ডিজাইনার সুকন্যা গুহর কাছে আছে ডিপ নেক কাফতান, ভি গলার কাফতান, বিচ কাফতান সহ নানা ধরণের কাফতানের এক চোখ ধাঁধাঁনো সম্ভার। কাফতানের জন্য তিনি ব্যবহার কখনো ব্যবহার করেছেন জর্জেট, কখনো শিফন, কখনো সিল্ক। উজ্জ্বল সব রঙের প্রাধান্য তাঁর কাফতানের অন্যতম বৈশিষ্ট। আর তাই তাঁর কালেকশান নজর কেড়েছে ছোট বড় সকলের। তাঁর কালেকশানের আরেকটি বৈশষ্ট তাঁর সমস্ত কালেকশানই যেন ভারতীয় তাঁতের ঐতিহ্যের উদযাপক। বাংলার শিল্প বৈচিত্রকে তিনি যেমন সকলের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন তেমনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাতে বোনা কাপড় সংগ্রহের মাধ্যমে জাতিগত শিল্প বৈচিত্রকেও সম্মান জানান। এর সাথে যুক্ত হয় তাঁর নিজের সৃজনশীলতা ও শিল্পনৈপুণ্যতা। আর তার ফলেই সৃষ্টি হয় সুকন্যার অনবদ্য ও অভিনব সব সৃষ্টি। সুকন্যার কাফতানের অবিশ্বাস্য কালেকশান আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করবেই তার নিজ মহিমায়।  

মডেল | অনুক্তা ঘোষাল

ড্রেস | সুকন্যা গুহ

প্লেস | মেলবোর্ন ক্যাফে

সুকন্যা গুহ :

‘লেবেল সুকন্যা’-র কর্ণধার ও একজন প্রতিশ্রুতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে সুকন্যা গুহর পথ চলা শুরু ছয় বছর আগে। কিশোরী বেলা থেকেই তিনি সযত্নে লালন করে এসেছিলেন এই স্বপ্ন। কলকাতা এবং বর্ধমানে আছে তাঁর নিজস্ব বুটিক স্টুডিও। বর্তমানে তিনি কলকাতার একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ফ্যাকাল্টি হিসাবে তরুণ প্রজন্মকে এই সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে দেওয়ার কাজে ব্রতী আছেন। তিনি মনে করেন, স্বাচ্ছন্দ্যই যেকোনো পোশাকের সৌন্দর্য-এর মূল চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

জিভে জল

জি ভে  জ ল

পা ঞ্চা লি   দ ত্ত

বিশিষ্ট ফুড জার্নালিস্ট

panchali

মালিশ

মিষ্টি কুমড়া ( বড় টুকরো করে কাটা ) ৪০০ গ্রাম
চেরা কাঁচা লঙ্কা ১০/১২ টা
বেগুন বড় টুকরো করে কাটা ৪০০ গ্রাম
পেঁয়াজ কুচি ১০০ গ্রাম
কাঁচকলা টুকরো (বড় করে কাটা ) ২০০ গ্রাম
তেজপাতা ২ টা
ধনেবাটা ১ টেবিল চামচ
রসুন বাটা ১ চা চামচ
হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ
নুন স্বাদমতো
সর্ষের তেল ৭৫ গ্রাম

প্রণালি :

কাঁচকলা হলুদ , জল ও নুন দিয়ে হালকা সেদ্ধ করে জলটা ফেলে দিন। এবারে একটা কড়াইতে কাঁচকলা সমেত সব সবজি দিয়ে তাতে ২ কাপ জল দিয়ে সেদ্ধ বসাতে হবে। তাতে হলুদ , নুন, চেরা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে সেদ্ধ করুন। খেয়াল রাখবেন যাতে সবজি গলে না যায় । জল শুকিয়ে গেলে সবজি নামিয়ে ফেলুন। একটা কড়াইতে তেল গরম করে তাতে পেঁয়াজ কুচি ভাজুন। লাল হলে পর একে একে তেজপাতা , রসুন বাটা , ধনে বাটা দিয়ে ভাল করে ভেজে সবজি মেশান। সবকিছু ভালভাবে মিশে মাখামাখা হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

আনারসি পোলাও

গোবিন্দভোগ চাল ৩০০ গ্রাম, মিক্সিতে মিহি করে পেস্ট করে নেওয়া আনারস ২০০ গ্রাম, জল ২০০ গ্রাম, তেজপাতা ২ টা, এলাচ ৩টা, দারচিনি ২ টুকরা, লবঙ্গ ৫ টা, নুন স্বাদ মত, চিনি ২ চা বেচামচ, রোস্ট করা কাজু ১০ টা, ভাজা কিশমিশ ১০ টা, সামান্য দুধে ভেজানো জাফরান ৭/৮ টা, সাদা তেল ১ চামচ , ঘি ১ চামচ +১ চা চামচ, আদাবাটা ১ চামচ

প্রণালি :

চাল ধুয়ে আধ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। এবারে চালনিতে জল ঝরিয়ে রাখুন। কড়াইতে তেল ও ঘি দিন। তাতে গোটা গরম মশলা ও তেজপাতা দিন। সুন্দর গন্ধ বেরোলে চাল দিয়ে নাড়ুন দু টিম মিনিট। এবারে আদা বাটা দিয়ে আবারো সামান্য নাড়ুন। এবারে নুন, আনারসের রস ও জল দিন। কিছুক্ষণ ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে দমে বসান। চিনি দিন। জল টেনে ভাত ঝরঝরে হয়ে এলে ভেজানো জাফরান দিন। দু মিনিট স্ট্যান্ডিং টাইম এ রেখে পরিবেশন করুন। কষা মাংস, দই রুই, কালিয়া , কোর্মার সঙ্গে just জমে যাবে।

চালকুমড়া পাতার ভ্যাদা

চালকুমড়া পাতা ৭ টি
নারকেলের দুধ ২০০ গ্রাম
আদা বাটা ১ চা চামচ
রসুনবাটা ১ চা চামচ
জিরা বাটা এক টেবিল চামচ
পেঁয়াজ বাটা ১ চা চামচ
হলুদ বাটা আধ চা চামচ
কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ
সাদা সর্ষে বাটা ২ চা চামচ
নুন স্বাদমতো
সর্ষের তেল ৩ চামচ

প্রণালি :

চালকুমড়া পাতার আঁশ ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে হবে । সব বাটা ও গুঁড়ো মশলা তেল দিয়ে মেখে নিন। প্রতিটি পাতায় সমান ভাবে মশলা মাখিয়ে ভাঁজ করে নিন। কড়াইতে সামান্য তেল দিয়ে পাতাগুলো ভেজে তুলে নিন। ওই কড়াইতে নারকেলের দুধ দিয়ে দুমিনিট ফুটতে দিন । তারপর ভাজা পাতাগুলো তাতে ছেড়ে ফোটান। দুধ ঘন হয়ে প্রায় শুকিয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

সিনে দুনিয়া

সি নে  দু নি য়া

অ র্পি তা   স র কা র

arpita

তরঙ্গ… the wave of life

পাশাপাশি ঘর দুটো। দুটো জানলা। নির্বাক। ওম্হারা। চায়ের কাপের আরাম নিছকই ভান… এমনই নিস্তরঙ্গ ফ্রেম ডিঙিয়ে ঢুকতে হলো ‘তরঙ্গ… the wave of life…’ ছবিতে। সোহাগ থাকে একটা ঘরে।  অভিজিৎ আর একটা ঘরে। আগর গাছের বুক ছিঁড়ে গন্ধ নিঙড়ে নেয় অভিজিৎ। অসুস্থ সে। মারণ রোগ। সোহাগকে দিতে পারেনি সন্তানও। কলকাতা থেকে দূরে পুরুলিয়ায় চাকরি নিয়ে এসে সোহাগ জীবনটাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। বাঁচাতে চায় যাপনটাকে। সোহাগের বন্ধু রাজীব হাত বাড়িয়েছে। নিজের কোম্পানিতে চাকরিটা রাজীবই করিয়ে দিয়েছে। কৃতজ্ঞ সোহাগ।  কৃতজ্ঞতার ঘাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনন্ত একটা প্রান্তরও বোধহয় ডাকবে কিছু পরে। অতএব চেনা চেনা গল্পের আদলে ছবি হাঁটতে থাকে। বাধ সাধে অভিজিৎ। একদিন ডিমের তরকারি রান্না করে অপেক্ষা করতে থাকে সোহাগের জন্য। সোহাগ খেতে ভালোবাসে। সে তরকারি সোহাগ খেল নাকি খেল না সেটা বুঝতে বুঝতে মনটা দ্রব হয় রাজীবের নরম চোখদুটো দেখে… সোহাগ মাখতে চায় ওইচোখ। তাই বলে পুরুলিয়ার মুখোশ শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা পাইয়ে দিতে চাকরি ছাড়তে পিছপা হয় না সোহাগ। রাজীবের কোম্পানিতো ঠকাচ্ছে মুখোশ শিল্পীদের। শিল্পী হয়ে এই অন্যায় সোহাগ মানবে কেন! ক্রমশ আপোষে অনীহা জমাচ্ছে যে তার জীবনেও, জীবিকাতেও। আপোষে আপত্তি অভিজিতেরও। চিকিৎসা আর চিকিৎসকের সঙ্গে আপোষ করতে চায় না। কারণ কেমো নিলে  সে অসুন্দর কুদর্শন হয়ে যাবে সে। সুন্দরকে সে আদরে আতরে রাখতে চায়। পারফিউম এর কোম্পানি ডুবে গেলেও তাই সুগন্ধী বানানোর নেশায় অভিজিৎ ডুবেই থাকে। গন্ধ খোঁজে। পরাণের। পায়ও হয়তো। তাই হারিয়ে যাওয়ার আগে এবং পরেও সুগন্ধী আঙুলে ছুঁয়ে থাকে তার সোহাগী জীবনকে। আর জীবন ছুঁয়ে থাকে সোহাগকে। নতুন ব্যবসা আর নবীন স্বপ্নের গা ঘেঁষে ভেসে আসে আলতো রঙের পাঞ্জাবীর ইশারা। সোহাগের ইচ্ছে ছিল রাজীবকে পাঞ্জাবীতে দেখার। দেখল…

ক্যারাম খেলে অভিজিৎ। একা একা। নিজের দান, তারপর প্রতিপক্ষের দানও দিয়ে দেয়। আসলে বোধয় কথা বলে একা একা। দুয়ে মিলে এক হওয়া হয়নি তাই নিজেকে টুকরো করেছে। ছেঁড়া ছেঁড়া কোলাজ কোলাজ দিন কাটে তার। খাটে শুয়ে থাকে দিনের বেশি সময়ে। খাটখানা ছোট। অভিজিতের পা বেরিয়ে থাকে খাটটা থেকে। আশ্রয় অকুলান। সেও যে পারেনি ছায়ার ঠাঁইটুকু পেতে দিতে। সোহাগের চোখের পাতায় তাই শীত লেগে থাকে। শীত লেগেছিল এগ্রামের শিল্পীদের বুকেও, তাই তো আগুনের খোঁজ জারি ছিল। কানা কড়ি মূল্যের শিল্পী বিপ্লবের  ছটফটানিতেও এই খোঁজ ধরা পড়ে যায়। এমনই ফিকে গাঢ় রেখায় হৃদয়ের অবয়ব আঁকা হয়ে যায়। এঁকে দেন পরিচালক পলাশ।

ছবিটির দেওয়াল পুরুলিয়া। বৃষ্টি ধোয়া পুরুলিয়ার সবুজ আকাঙ্খা গড়িয়ে নেমেছে একের পর এক দৃশ্যে। কখনও দৃশ্য ডুব দিয়েছে শান্ত জলের মতো প্রকৃতির অতলে।

কাহিনি, দৃশ্য আর প্রকৃতি একে অন্যের অন্দরে অন্তরে যাওয়া আসা করেছে বারবার। কি সাবলীল সে চলন! সে চলন মৌতাত লিখেছে, লিখেছে হাতছানি। তরঙ্গের ডাক…।

ডাক অমোঘ হয়েছে সুরে, আবহসঙ্গীতে। এ ছবির গান যেন অনেক দিনের পরে মেঘ পেয়েছে বুকের কাছে। তার সোঁদা গন্ধে পায়ের পাতা ভিজিয়ে চলতে চলতে পৌঁছনো যায় মনের কাছে। মন মাঝির কাছে। তারপর তো আকুতি অশেষ। সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রকে শ্রদ্ধা জানাই।

Dialogue মনোগ্রাহী। অকারণ বাক্যের ভিড়ে হারিয়ে যায়নি কথারা। শ্বাস নিশ্বাসের শব্দরাও তাই ভাষা বুনেছে কত! গাভীর চোখের মতো কথারা বেঁধে রাখেনি মন, বেঁধে বেঁধে রেখেছে মুহূর্তদের। মুহূর্তরা মুখ আর মুখোশের রঙ বিনিময় করেছে অনায়াসে। তাতেই চরিত্ররা জন্মের মতো মৃত্যুর মতো জেগেছে নিভেছে আবার জেগেছে। সোহিনী, বাদশা,  রণজয়, অমিত সাহা, পাপিয়া ঘোষ, সুকান্ত গুহরায়, বিশ্বজিৎ রায় কি আদৌ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাকি চরিত্র যাপন করেছেন?

Make up বিহীন তাদের মুখগুলোতে কি অনায়াসে উড়ে গেছে মাছরাঙা, ভেসেছে মৃত তারাদের কবিতা।

গভীরতা মন্থর করে। তাই ছবিটির গতি ধীর। গর্ভে শস্যের গন্ধ নিয়ে সময় যেমন চলে আরকি… প্রতীক্ষায় ঘন। ক্ষতি নেই।  ক্ষতরা আরাম পায় বরং।

Main stream ছবি নয়! প্রতিকূলতার অভাব নেই। স্বার্থের অর্থ বা অর্থের স্বার্থ এখানে নগণ্য। কেবল সৃষ্টির উদগ্র নেশাতেই এই ধরনের ছবি জন্মায়।  আসলে জন্মায় স্বপ্নকামী ঢেউগুলো…তরঙ্গ… the wave of life।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

চরৈবেতি

চ রৈ বে তি

ড. ফা ল্গু নী   দে

falguni_dey

শৃঙ্খলা পাহাড়ের প্রথম এবং একমাত্র শর্ত

পথের নেশাই মানুষকে ঘরছাড়া করেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু অথবা আরও দূর দিকশূন্যপুরে সে পাড়ি দিয়েছে নিজের অন্তরাত্মাকে জয় করতে। তাই খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই “কতটা পথ হাঁটলে পথিক হওয়া যায়”, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই অমোঘ প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে দিকে দিকে। মানুষ চিরকাল সুন্দরের উপাসক এবং সত্যের অনুসন্ধানী। এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর এবং অনিত্য মানুষ তার কাছে যেতে চেয়েছে বারবার। এইভাবে একদিন পায়ের তলায় সর্ষের আয়োজনটুকু কোনোক্রমে জুটিয়ে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। আসমুদ্রহিমাচল প্রসারিত এই ভারতবর্ষের উত্তরে জাগরুক দাঁড়িয়ে আছে সুমহান হিমালয় পর্বত। বৈদিক সভ্যতার মুনি-ঋষি থেকে শুরু করে হাল আমলের ট্রেকার-মাউন্টেনিয়াররা পাহাড়ের এই বিশালতার সামনে নিজেকে সমর্পণ করেছে। এই যে পাহাড় পথে হাঁটা, রহস্যের ভেতর পথ খুঁজে খুঁজে এই যে হিমাদ্রি বেঁচে থাকা, এ তো আসলে নিজেরই বিন্দুতম অস্তিত্বের অনুসন্ধান। 

ভূগোলের পাতায় পাহাড়ের একটি বিশেষ অবদান রয়েছে। হিমবাহের বরফে ঢাকা উপত্যকা, খরস্রোতা বয়ে চলা নদী, সুনীল জলের সরোবর, সবুজ পাইনের জঙ্গল, বৃষ্টি অরণ্য, মেঘের আড়ালে সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, বিরল প্রজাতির জীবজন্তু পাখি ইত্যাদি মিলিয়ে এক মনোহর প্রাকৃতিক আয়োজন। অন্যদিকে এঁকেবেঁকে উপরে উঠে যাওয়া অচেনা পাহাড়ি পথ, সবুজ বুগিয়ালের বুক চিরে এক টুকরো জনপদ, ভেড়ার পাল নিয়ে পথ আগলে পাহাড়ি বেদুইন, কঠোর পরিশ্রমী পাহাড়ি জনজাতির মানুষ, এইসব নিয়েই আমাদের পাহাড় পথের সংসার। 

সমতলের দৈনন্দিন জীবনের ইঁদুর দৌড়ে যখন বুকের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসে, মানুষ এক ছুট্টে পালিয়ে আসে পাহাড়ের কাছে। মাথার ভিতর জীবনের নানান প্রশ্নের জটিলতা যখন মাকড়সার মতো জাল বোনে মানুষ তখন পাহাড়ের বিশালতার কাছে এসে দাঁড়ায়। গৃহস্থ থেকে সংসারী, চাকুরীজীবী থেকে ব্যবসায়ী, ভবঘুরে থেকে দার্শনিক প্রায় সকলেই পাহাড়কে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজস্ব অনুভবে চিনতে চেয়েছে। 

তপস্যার দেবভূমি এই হিমালয় একদিন কালের নিয়মে প্রযুক্তির হাত ধরে ঢুকে পড়ল বিনোদনের অঙ্গরাজ্যে। পরিবেশের স্বার্থ রক্ষায় ভাটা পড়লো, গুরুত্ব পেল অর্থ উপার্জনের চাহিদা। সমতল থেকে কিলবিল সংখ্যক মানুষ পাড়ি জমালে আরও উপরে হিমালয়ের নিভৃত অন্দরমহলে। ভাবখানা এমন যেন টাকা থাকলেই পাহাড়কে কিনে নেওয়া যায়! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য তাঁর ‘পাহাড় চূড়ায়’ কবিতায় স্বেচ্ছায় ঠকে গিয়ে একটি নদীর বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিলেন একটি আস্ত পাহাড়। কিন্তু ভাব রাজ্যের এমন রাবীন্দ্রিক ‘বলাই’ এ পৃথিবীতে আর কয়টি আছে? 

পাহাড়ের প্রতি মানুষের টান দীর্ঘদিনের। সেই ১৯৬০ সালে পর্বত অভিযাত্রী সংঘের নন্দাঘুন্টি সফল অভিযানের মধ্যে দিয়ে বাঙালির পাহাড় চড়া শুরু। ভারতীয় ইতিহাসটি আর সামান্য কিছু পুরোনো। কিন্তু ইদানিং যেন ‘উঠলো বাই তো ট্রেকিং করতে যাই’ গোছের একটি মানসিকতা তীব্রভাবে ধরা পড়ছে চারিদিকে। কোনোরকম নিয়ম কানুন না জেনে অথবা সামান্য জেনে, আগাম শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি না নিয়ে, কাগজপত্র-বই না পড়ে, শুধুমাত্র কিছু ভুঁইফোড় ইউটিউব ভিডিওর ভরসায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। বিপুল অর্থ উপার্জনের এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। ফলস্বরূপ প্রতিদিন পর্যটক, পুণ্যার্থী এবং ট্রেকারদের জন্য তৈরি হল বিভিন্ন গুণমানের হোটেল, মোটেল, লঙ্গরখানা এবং হোমস্টে। গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, কাঞ্চনজঙ্ঘার উঠোন অব্দি মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যন্ত্রযান হাজির হলো। সফল অভিযানের নিশ্চয়তা দিয়ে রাতারাতি তৈরি হলো ট্রাভেল এজেন্সি। পথ দেখানোর জন্য গাইড-মালবাহক। পাহাড়ের যে কোনো উচ্চতায় মনপসন্দ খানাপিনার আয়োজন কম পড়লো না। মাথার টুপি থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত ঢেকে ফেলবার নামিদামি সাজ পোশাক তৈরি হলো। রাত কাটাবার জন্য অত্যাধুনিক টেন্ট কেনা হলো। পাহাড়কে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে নেবার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হলো। হাঁটার পথে বলিউডি উল্লাসে বিনোদনের জন্য ব্লুটুথ স্পিকার এলো। যেখানে সেখানে ফেলে রাখা প্লাস্টিক আবর্জনা স্তূপ হয়ে উঠলো। কর্পোরেট দুনিয়ার ধুরন্ধর এজেন্সির কাছে অসহায় মাথা নামিয়ে বশ মেনে নিলো গ্রামীণ অশীতিপর বৃদ্ধ গাইড। নিরীহ গ্রামবাসীদের জমি ঠকিয়ে সস্তায় কিনে নিলো সমতলের জমি মাফিয়া। রাষ্ট্রের স্বার্থে বড়ো বড়ো জলাধার নির্মাণে স্থানীয়রা ভিটে-মাটি-জঙ্গল খুইয়ে রিফিউজি হলো। ভাবুন, ভালোবাসার পাহাড়কে, নৈসর্গের পাহাড়কে, জীববৈচিত্রের পাহাড়কে, সমতলের কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের সামনে বিনোদনের থালায় সাজিয়ে দিয়ে পাহাড় অথবা পাহাড়িয়াদের কি এতকিছু পাওনা ছিল? আমাদের কি তাদের কাছে একটি সবিনয় অনুমতি অথবা ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে নেওয়া জরুরি নয়? তেনজিং নোরগে তো এভারেস্ট শীর্ষ স্পর্শ করার পর সাগরমাথার কাছে চোখের জলে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। তাহলে কার হাতে তিনি পরম্পরা ছেড়ে গেলেন?

সুতরাং ‘নিভৃত সেই বিজনপ্রদেশ’ বলে পৃথিবীতে তাহলে আর কিছু রইল না। একটু তথ্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। বিগত ৩০ বছরে (১৯৯০-২০২০) জনপদ বিস্তারের প্রয়োজনে, বাড়তি খাবারের যোগান মেটাতে এবং অবশ্যই শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে আমরা পৃথিবীর ১০% বিজনপ্রদেশ হারিয়ে ফেলেছি। আন্টার্কটিকাকে বাদ দিলে রাশিয়া, কানাডা, আমেরিকা, ব্রাজিল এবং অস্ট্রেলিয়া- এই পাঁচটি মিলিত দেশ এমন এক ৭০% শেষতম পৃথিবীর অধিকারী যেখানে মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। পৃথিবীর এই বহুচর্চিত কৌমার্যের অধিকাংশই ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য এবং নাতিশীতোষ্ণ বনভূমি দিয়ে তৈরী। গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস অ্যাসেসমেন্ট, ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ মিলিয়ন হেক্টর অরণ্য আমরা নির্বিচারে ধ্বংস করে চলেছি। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র হ্রাস, বিশ্ব উষ্ণায়ন ইত্যাদির তথ্যসূত্রে তা প্রমাণিত সত্য।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি পরিচিত শব্দবন্ধ। একে একটি ব্র্যান্ড বললেও দ্বিমতের অবকাশ নেই। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশেষত বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে এর ব্যাপক প্রভাব আর ঠেকিয়ে রাখা গেল না। হিমালয় তথা পৃথিবীর যে কোনো পাহাড় এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জর্জরিত। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারোর মাথায় হিমবাহগুলি, যা কিনা আফ্রিকার শেষতম অহংকার, হারিয়ে যাবে ২০৫০ সালের মধ্যে। আমাদের বাড়ির পাশেই হিমালয়ের অবস্থা আরও দুর্বিষহ। এখানে ৬০০০ মিটার উচ্চতার আশেপাশে ঘটে চলেছে নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বুঝতে হবে পাহাড়ের চরিত্র পাল্টাচ্ছে। বুঝতে হবে শৃঙ্খলা পাহাড়ের প্রথম এবং একমাত্র শর্ত। বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে বরফ গলে হিমবাহের ফাটল বেরিয়ে পড়ছে। গাছ কেটে নেবার ফলে ভূমিধ্বসের ঘটনা বারংবার ঘটছে। উলম্ব-আকাশ ভেঙে অথবা হড়পা বন্যায় জনপদ ভেসে যাচ্ছে। তুষার ধ্বসের জেরে বরফ চাপা পড়ে প্রায়শই জীবনহানি ঘটছে। সাম্প্রতিক কালের সাড়াজাগানো ঘটনা, নেহেরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং-এর পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ শিবিরে ছাত্র-প্রশিক্ষক মিলিয়ে তিরিশ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি প্রশাসনিক চেয়ার নড়িয়ে দিয়েছে। আজকের ঘটনা আগামীকাল ভুলে গিয়ে মানুষ আবার পাহাড়ের পথে বেরিয়ে পড়ছে। এইভাবে আগাম প্রস্তুতি এবং সাবধানতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাবড়ার সুজয়, কল্যাণীর অলোক, বাঁকুড়ার সুভাষ, নিমতার নির্মলরা মৃত্যু মিছিলে সামিল হয়ে যাচ্ছে। সম্মোহিত জনতার মতো, কেউ বোঝার চেষ্টা করছে না, পাহাড় কোটি কোটি বছর ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু পাহাড়ে জীবন ও মৃত্যু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে একটি ভুলের দূরত্বে।

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

খেলাইডোস্কোপ

খে লা ই ডো স্কো প

স ব্য সা চী   স র কা র

sabya

লা আলবিসেলেস্তে ও মেসি-মায়া

এখনও চোখ বুজলে শুনতে পাই সেই মায়াময় শব্দটা, ‘মে—সি—য়া!’

শীতের রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়, লেপটা পছন্দমতো সাজিয়ে পাশ ফিরে শুই। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ফাইনালে পেনাল্টিতে করা প্রথম গোলটা, তার পরে দ্বিতীয় গোলের সময় ম্যাক অ্যালিস্টারকে সাজিয়ে দেওয়া ব্যাকহিল। একস্ট্রা টাইমে লাউতোরো মার্তিনেজের শট লরিস বাঁচানো পরে ঠিক সময়ে বলে পা ছুঁইয়ে তৃতীয় গোল।

কিংবা ট্রাইব্রেকার শুরু হওয়ার আগে দু’বার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো। নিশ্চিন্তে গোলটা করে জিভটা অল্প বের করা। লুসেইল স্টেডিয়ামে ওই শব্দের বিস্ফোরণ! মেসি তো মেসিয়াই, যাকে বলে পরিত্রাতা। একটা প্রজন্মের হৃদয়ে লেখা রক্তাক্ষর।

বিশ্বকাপ কভার করে কাতার থেকে ফিরে এসেছি প্রায় মাসখানেক হতে চলল, এখনও পুরোপুরি মেসি-ম্যানিয়া থেকে বেরোতে পারিনি। আদৌ বেরোনো যায় কি? ওয়ান ডে-টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে গোটা আটেক ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করেছি। কিন্তু ফুটবলে বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাত্রার সঙ্গে তার তুলনাই হয় না!

কাতারে পৌঁছনোর পর থেকে ফুটবল সমর্থকদের নানারকম খামখেয়ালিপনা আর পাগলামি দেখেছি। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে আর্জেন্তিনার প্রতিটি ম্যাচ দেখেছি, দেখেছি ব্রাজিলের ম্যাচও। চোখ বুজে বলে দিতে পারি, উন্মাদনা আর টিমের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যদি মাপকাঠি হয়, লা আলবিসেলেস্তে (আর্জেন্তিনা টিমের নাম) হাসতে হাসতে বাকি সব দেশের সমর্থকদের পাঁচ গোল মারবে। হ্যাঁ, ব্রাজিল সমর্থকদের কাছ থেকে দেখেই এই কথা বলছি। শুধু আর্জেন্তিনার দূতাবাসের হিসেব বলছে, প্রায় ৫০ হাজারের মতো আর্জেন্তিনীয় এসেছিলেন কাতার বিশ্বকাপ দেখতে। 

ছোট্ট শহর দোহা, বিশ্বকাপের সময় হোটেল-অ্যাপার্টমেন্টের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। এসব সমস্যাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে মূল শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে আর্জেন্তিনীয়রা গড়ে তুলেছিলেন ছোটখাটো একটা বুয়েনস আইরেস। জায়গাটার নাম আল জনৌব, মরুভূমির কাছাকাছি। সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং ভাড়া করার পাশাপাশি তাঁবু খাটিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু খুঁজে নিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। কনকনে ঠাণ্ডায় কোনওরকমে একটা স্লিপিং ব্যাগে নিজেকে মুড়ে একটা শুকনো বার্গার চিবিয়ে রাত কাটিয়েছেন বহু আর্জেন্তিনীয়। কোনও অভিযোগ নেই, কাকুতি-মিনতি নেই, ফুটবলের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা আছে। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে মেসিরা জেতার দিন স্টেডিয়ামে আলাপ আর্জেন্তিনীয় জুটি সিজার আর ব্যালেন্তিনার সঙ্গে। কত বয়স হবে? সুপুরষ যুবক সিজার বড়জোর ২৫, প্রেমিকা সোনালি চুলের ব্যালেন্তিনা মেরেকেটে ২২! বছর চারেকের প্রেম। ভালোই ইংরেজি জানে দু’জনে, কথা চালাতে গুগল ট্রান্সলেটরের দরকার হচ্ছিল না। 

চার বছর আগে রাশিয়ার বিশ্বকাপে যখন ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ হেরে ছিটকে গিয়েছিল নীল-সাদা জার্সি, বুয়েনস আইরেসে সিজারের অ্যাপার্টমেন্টে টিভির সামনে বসে কেঁদে ভাসিয়েছিল ব্যালেন্তিনা। প্রেমিকার মুখের দিকে তাকিয়ে সিজার বলে ফেলে, ‘কী একটা রাত! ওর কান্না সামলানো যাচ্ছে না। আমরা বারবি কিউ করেছিলাম, ওয়াইন কিনেছিলাম। সব পড়েছিল। কারণ, ব্যালেন্তিনা ধরে নিয়েছিল, মেসি আর পরের বিশ্বকাপে খেলবে না! তাই এ বার যখন আমরা এক বছর আগে কোপা আমেরিকা জিতলাম, ব্যালেন্তিনাই ঠিক করল, কাতার যাবে!’ সেই আমাদের অল্প অল্প করে অর্থ জমানোর শুরু। তার পরেও ডলার ধার করতে হয়েছে, কিন্তু বুয়েনস আইরেস থেকে কাতারের প্লেন ধরতে ভুল করেনি প্রেমিক-প্রেমিকা।

ব্যালেন্তিনা পাশ থেকে বলছিল, ‘ইউ নো হোয়াট? হোয়েনেভার আয়াম ইন এনি কাইন্ড অফ ট্রাবল ইন লাইফ, আই থিঙ্ক অফ মেসি! এভরিটাইম হি সেভস মি!’

সিজার নিজে ছোটখাটো ব্যবসা করে, কিন্তু কাতার আসার প্ল্যানে সমস্যা ছিল ব্যালেন্তিনার চাকরি। ব্যালেন্তিনার অফিস বিশ্বকাপের জন্য এক মাস ছুটি দিতে রাজি হচ্ছিল না। তার পরে? 

সিজার উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, ‘ব্যালেন্তিনা এক কথায় ভালো একটা কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে দিল!’

পাশ থেকে ব্যালেন্তিনা যোগ করে, ‘জব ক্যান কাম অ্যান্ড গো। হু কেয়ারস! আই লাভ মেসি। সো আয়াম হিয়ার টু উইটেনস হিস্ট্রি!’

যে মেয়ের অস্থি-মজ্জা, শিরায় শিরায় মেসি-মায়া ঢুকে পড়েছে, সে-ই তো পারে এমন পাগলামি করতে! এ পাগলামির পিছনে ভণ্ডামির বদলে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ আছে, মেসি-মায়ার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা আছে, তার জন্য প্রবল বিশ্বাস আর এক আকাশ ভালোবাসা আছে।

আমি অবাক হচ্ছি দেখে সিজারকে কী একটা বলল ব্যালেন্তিনা। এ বার সিজার বলল, ‘আপনি একবার আল জনৌবে আসুন। দেখবেন কীভাবে শুধু মেসির জন্য এই বিশ্বকাপে এসেছে নতুন প্রজন্ম। দিয়েগো আমাদের দেশে ঈশ্বর, বাবা-কাকাদের কাছে ওঁর কথা শুনেছি। টিভিতে ছিয়াশির গোলগুলো দেখেছি। বিশ্বজয় দেখেছি। কিন্তু মেসি আমাদের রক্তের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। আপনাকে লুসিওর কথা বলি!’

কে লুসিও?

‘বয়স ৮২, মাস পাঁচেক আগে হাইওয়েতে গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী, ছেলে-বউকে হারিয়েছে। ছেলে মেসির ভক্ত ছিল। এ বার বাড়ি বন্ধক রেখে বিশ্বকাপে এসেছে ছেলের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে!’ বলছিল সিজার।

কেন?

সিজার বলে ওঠে, ‘ঠিক ছিল, ছেলে বৃদ্ধ বাবাকে কাতারে নিয়ে আসবে বিশ্বকাপ দেখতে। লুসিও বিশ্বাস করে, স্টেডিয়ামে প্রতিটি ম্যাচে ছেলে ওর পাশে বসে থাকে। মেসিকে দেখে। আর্জেন্তিনাকে দেখে। রাতে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ছেলের সঙ্গে আপনমনে মেসির গোলগুলো নিয়ে কথা বলে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচটা আমরা হেরে যাওয়ার পর সারা রাত লুসিও ছেলের সঙ্গে কথা বলেছিল, বুঝিয়েছিল, কেন হাল ছাড়তে নেই!’

কীভাবে ব্যাখ্যা করি এই বিষাদময় ভালবোসার? এই চিরকালীন বিশ্বাসের? ফুটবল পারে, সব পারে। বদলে দিতে পারে জীবনের মানে!

বিরাশির লুসিওর সঙ্গে দেখা হয়নি, এই আফশোস সারা জীবন থাকবে। কিন্তু কল্পনা করতে পারি, লুসেইল স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের রাতে ছেলের সঙ্গে বসে ও নিশ্চয়ই ওয়াইনে চুমুক দিয়েছে! দু’জনে হাই-ফাইভ করেছে। 

কবি বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন, ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!’ 

লুসিও-ই আসলে প্রকৃত সারস, যে উড়ে যাচ্ছে। মেসির দিকে, ফুটবল-ঈশ্বরের দিকে!

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

ক্যানভাস

ক্যা ন ভা স

শু ভ   চ ক্র ব র্তী

suvo

আঁধারহীন অচিন্ত্য সে

আমাদের আশ্চর্য লাগে এটা দেখে যে রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষদিকে একেবারে নতুন করে মেতে উঠলেন অন্য এক নেশায়। হয়তো অন্য এক উত্তরণের আকর্ষণেই তিনি নিবিষ্ট হন এই ছবির নেশায়। ছবির বিষয়ে কথা উঠলে তাঁর চোখে রঙের যে ধাঁধা লাগে তার কথা ওঠে । আমাদের বিস্মিত হই এটা জেনে যে বিশেষ করে লাল রঙের মতো অতি তীব্র একটা আঘাত তাঁর চোখে পড়ে না। অথচ কত ভিন্ন রঙের শব্দ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে আমাদের জানিয়ে এসেছেন । ভিন্ন ভিন্ন লাল রঙের বৈচিত্র্য কি নেই তাঁর শিল্পী জীবনের অন্তরের সবটুকু জুড়ে? অবশ্যই আছে, আর তা তাঁর কবিপ্রকৃতির আভায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলবেন লাল বলতে ঠিক যা বোঝায়, সে আভায় তাঁর দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, এরকম একটা ভয়ঙ্কর প্রলেপ তিনি তাঁর দৃষ্টির বাইরেই পেলেন না ! এটা সম্ভব কি যদি আমরা তাঁর আঁকা ছবির দিকে তাকাই? মনে কি হবে সত্যি এরকম টা যেন ভিন্ন কোনও রুচির প্রভাব, ভিন্ন কোনও মনের প্রভাব? এভাবে কি দেখা যায়, এমন করে কেউ কি ভাবতে পারেন নিজের জীবনে? আমরা তাঁর আঁকা একটি ছবির কথা ভাবতে পারি, যে ছবিটিতে আমরা একটি নারীকে নৃত্যের ভঙ্গিমায় দেখি এবং তার দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত এক ভিন্ন ভঙ্গিমায়।

ছবিটি একঝলক দেখে কেউ বলতে পারেন নারীমুক্তির আহ্বান বা বলতে পারেন লোকায়ত নৃত্যের আভা যেন রবীন্দ্রনাথ ওই ছবিতেও ধরতে চেয়েছেন। যার দু’ই হাতে আগুন আলোয় উদ্ভাসিত ভিন্ন কোনও নাচের উপকরণ যেন আমাদের দৃষ্টিকে আরও রহস্যময় করে তুলছে! সত্যি কি এমন করে ভাবতে পারি আমরা? যখন ওই ছবিটি ঘিরে রয়েছে অজস্র ভাবনার আগুন। মনে কি হয় তখন এই সহজ উপায় আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে? ইচ্ছে হয় ভাবতে, যেন অগ্নি বসন্তের আহ্বান করছে, রবীন্দ্রনাথ যেন বসন্তের আহ্বানে আত্মবিশ্বাসী অগ্নি-কে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কল্পনা করেছেন, তেমনই যেন বর্ণবিন্যাস আমাদের আরও সংযত হতে বাধ্য করে। আমরা যদি ছবিটিকে একটু তলিয়ে দেখি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার একটা ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতি অনুমান করতে পারব। রবীন্দ্রনাথ অন্য ছবির মতো এ ছবিটিও প্রথম কালি কলমে স্কেচ করেছেন তারপর রঙ ভরেছেন, ওয়াশ করছেন। কিন্তু তা তিনি করছেন সেই সময়েই, স্পেস ব্যবহার করছেন এক ভিন্ন আঙ্গিকে, আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি সেইদিকে। সমস্ত ছবি জুড়ে যে তিনি ভারতীয় ছবিকে ভিন্ন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং আমাদের চিত্রশিল্পকে কয়েকশো বছর এগিয়ে দিলেন তাঁর মনের রঙে, যেখানে অগ্নি একদিকে প্রাণের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে তার আঙ্গিকে, আবার অন্যদিকে ফর্মকে ভেঙে ফেলছেন। এক ভিন্ন আঙ্গিকে আমরা এক অধরার অর্তি ফুটে ওঠা দেখি সমস্ত ছবিটি জুড়ে। কখনও আবার স্কেচের উপর রঙ দিয়ে পূর্ণ করেছেন ছবির ভুবন। কখনও হাত দিয়ে, কখনও তুলির সাহায্যে ছবিকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। এই ছবিতে শুধু নয়, অন্য ছবিতেও একইভাবে রঙের আভায় ভেঙেছেন ফর্ম। এই যে তাঁর ছবি আঁকার ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতির কথা বলা হলো, তা তিনি আয়ত্ত্ব করেছিলেন ভিন্ন এক ঘটনায়, যখন তিনি তাঁর পাণ্ডুলিপি সংশোধন করছেন, আর ছবির মতো কিছু গড়ে উঠছে সেই সময় থেকে। আমরা অনুমান করতে পারি, যদি তাঁর সেই সময়কার কিছু লেখার ভিতরে দিয়ে যেতে পারি এবং আরও আশ্চর্য হতে হয়, যখন তিনি ‘রক্তকরবী’ সংশোধন করছেন বারবার, তখনই যেন ভিন্ন ভিন্ন ছবির  ফর্ম বেরিয়ে আসছে। আমরা মনে করতে পারি যখন তিনি জাপান ভ্রমণের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছিলেন তাঁর রেখার রহস্যময় উন্মোচন। ভেতরে ভেতরে অনুভূতি জমাট বাঁধছে তাঁর অন্তরে। যেন তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর অন্তরজগতের আধারটি। এমন একটা বোধে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে খুঁজে পেলেন, যেন তাঁর চিত্রবোধের আকাঙ্ক্ষাটি গেল, আরও সহজ হয়ে উঠল আত্মবিশ্বাসের ছন্দ।

এমনকি এও মনে হতে পারে অগ্নি যেন ‘নন্দিনী ও দামিনী’-র আদলে বসন্তের চিরন্তন রক্তিম আকাঙ্খাই ওই ছবিটির সামগ্রিক বেদনা । যে বেদনা শুধু আমি-র দিক থেকে হয়ে ওঠে না, সে হয়ে ওঠে সমগ্রের দিক থেকে সত্যকে ছুঁয়ে থাকবার ব্যথা । আমরা যদি তাঁর অন্য একটি ছবির কথা ভাবি, যে ছবিটিতে আমরা দেখি একটি নারী ঘোমটা টানা, বাসন্তী ও ফুল, সেখানেও যেন অন্ধকার থেকে উঠে এসেছে বাসন্তী নতুনের দিকে। আর ওই সময়ের জাপান ভ্রমণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘টাইক্কানের ছবি যখন প্রথম  দেখলুম, আশ্চর্য হয়ে গেলুম। তাতে না আছে বাহুল্য, না আছে শৌখিনতা। তাতে যেমন একটা জোর আছে, তেমনি ‘সংযম’ চমক লাগে তাঁর গোপন পাড়ায়, চমক লাগে আমাদের মনেও একেবারে সামনের সারিতে এসে ধাক্কা দেয়। এই যে ধাক্কা দেওয়ার কথা উঠল, এ কি রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি ওই সময়ের অন্তর দ্বন্দ্বে? একদিন তো এই আঘাতের কথাই লিখলেন চিঠিতে, সে আঘাত বাইরের আঘাত। যা আমাদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে অসীম প্রত্যাশাময় করে তুলে মনের উত্তরণ ঘটায়। তেমন করেই তো একদিন রবীন্দ্রনাথ ঘোষণা করে রানী মহলানবিশকে লিখলেন সে কথা, “এবার আমার জীবনে নতুন পর্যায় আরম্ভ হল। একে বলা যেতে পারে শেষ অধ্যায়। এই পরিশিষ্টভাগে সমস্ত জীবনের তাৎপর্যকে যদি সংহত করে সুস্পষ্ট করে না তুলতে পারি, তাহলে অসম্পূর্ণতার ভিতর দিয়ে বিদায় নিতে হবে। আমার বীণায় অনেক বেশি তার— সব তারে নিখুঁত সুর মেলানো বড়ো কঠিন। আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সমস্যা আমার কবিপ্রকৃতি। হৃদয়ের সব অনুভূতির দাবীই আমাকে মানতে হল— কোনোটাকে ক্ষীণ করলে আমার এই হাজার সুরের গানের আসর সম্পূর্ণ হবে না।” তখন, একটু ভিন্ন কোনও প্রত্যাশা আমাদের আচ্ছন্ন করে, মনে হয় ওই ছবিটি ঘিরে রয়েছে অন্য সময়ের প্রতিধ্বনি, সমগ্র জীবনের উত্তরণের বসন্ত।

 

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

নিষিদ্ধ সব সোনার খনি । পর্ব ৫

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৫

স ব্য সা চী   স র কা র

নিষিদ্ধ সব সোনার খনি

sabyasachi

পাকিস্তানে দেওয়ালে পিঠ…

দুরুদুরু একটা বুক নিয়ে করাচি এয়ারপোর্টে নেমেছিলাম।

জীবনে প্রথমবার পাকিস্তান বলে কথা! সিনিয়র কলিগরা পইপই করে সাবধান করে দিয়েছেন, কোথাও যেন অতি উৎসাহ না দেখাই। কোথাও একটি বাড়তি কথা নয়। ম্যাচ দ্যাখো, কভার করো, হোটেলে ফিরে যাও। সন্ধের পরে একা একা হোটেলের বাইরে নয়!

এসব সাবধানবাণী আমার জীবনে কখনওই খুব একটা কাজে লাগেনি। যতোই আমাকে কোনও কিছু নিয়ে সাবধান করা হয়, তত বেশি সেই জিনিসটার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি। হোটেলে বসে থাকার জন্য এসেছি? করাচির ক্লিফটন বিচ, লাহোর ফোর্ট, এসব তো দেখতেই হবে। লাহোরের বিখ্যাত ফুড কোর্ট গুলবার্গে একবার যাব না?  

ইমরান খানের দেশ, জাভেদ মিয়াঁদাদের দেশ, হানিফ মহম্মদের দেশ! মাথায় আছে, লাহোরে ইমরান খানের জামান পার্কের বাড়িটা দেখে আসতেই হবে। সেটা ১৯৯৭। তখনও কার্গিল যুদ্ধ বলে কোনও শব্দ পৃথিবী শোনেনি, নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারের পেটে প্লেন ঢুকে পড়েনি, সীমান্তে রুটিন গোলাবর্ষণের বাইরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, নিয়মিত ভারত-পাক দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হত। তার আগের বছর থেকে কানাডার টরন্টোয় শুরু হয়েছে দু’দেশের মধ্যে  বাৎসরিক সাহারা কাপ। সেখানে কভারও করে এসেছি সিরিজ। 

 দু’দেশের মধ্যে তিন ম্যাচের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ভারতের ক্যাপ্টেন সচিন তেন্ডুলকর, পাকিস্তানের সইদ আনওয়ার। সিন্ধ প্রদেশের হায়দরাবাদে প্রথম ওয়ান ডে। তারিখটা আজও মনে আছে ২৮ সেপ্টেম্বর। সকালে শুরু হয়ে ম্যাচ নির্বিঘ্নে শেষ হল, বিকেল চারটের মধ্যে। কিন্তু সমস্যাটা শুরু তার পরে।

আমাদের ভারতীয়দের জন্য সে বার যে ভিসা দেওয়া হয়েছিল, তাতে পরিষ্কার লেখা ছিল, করাচি বা লাহোরে থাকতে কোনও সমস্যা নেই, কিন্তু সিন্ধ প্রদেশের হায়দরাবাদে সন্ধে ছ’টার পরে থাকা যাবে না। কারণ, স্টেডিয়ামের পাশেই ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। এটা মাথায় রেখেই কলকাতার খবরের কাগজের অফিসে ম্যাচ রিপোর্ট পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলাম আমরা। করাচির হোটেল থেকে গাড়ি ভাড়া করে গিয়েছিলাম আমরা তিনজন সাংবাদিক। কলকাতার দু’জন এবং মুম্বইয়ের মরাঠি কাগজের নামী সাংবাদিক পাপ্পু সংসগিরি। ঠিক ছিল, সাড়ে পাঁচটার মধ্যে লেখা শেষ করে গাড়িতে উঠে পড়ব। হায়দরাবাদ থেকে করাচির দূরত্ব গাড়িতে আড়াই ঘণ্টা। যদি কোনও লেখা পরে লিখতেও হয়, করাচিতে পৌঁছে লিখব। সেই প্ল্যানিং অনুযায়ীই চলছিল। কিন্তু সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমাদের গাড়িতে সঙ্গী হওয়া কলকাতার ইংরেজি কাগজের এক সাংবাদিকের কপি বা প্রতিবেদন ফ্যাক্স মারফৎ কলকাতার অফিসে পৌঁছে গেলেও লাইন না পাওয়ায় আমার কপি যেতে দেরি হচ্ছিল। মরাঠি কাগজের পাপ্পুও লাইন পাচ্ছিল না। ব্যাপারটা এখনকার মতো নয় যে, যখন খুশি কম্পোজ করে ই-মেলে সেন্ড বাটন টিপলেই কপি নিমেষে কলকাতায় পৌঁছে যাবে। তখনও মোবাইল আসেনি, বহু খরচ করে ইন্টারন্যাশনাল লাইন পেতে হতো। 

তা, আমাদের দু’জনের দেরি হচ্ছে দেখে কলকাতার ইংরেজি কাগজের সাংবাদিক মশাই ‘আমি পাঁচ মিনিট ওয়েট করব’ বলে নীচে পার্কিংয়ের দিকে চলে যান। আমরা কপি-টপি পাঠিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে পার্কিং লটে পৌঁছে দেখি, গাড়ি নেই। সেই ‘মহান’ সাংবাদিক পাঁচটা চল্লিশ বাজতে না বাজতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। 

তা হলে? কী করে ফিরব? ক্যান্টনমেন্ট এলাকা বলে মাঝে মাঝেই সামনের রাস্তা দিয়ে সেনাবাহিনির গাড়ি চলে যাচ্ছে। জনতার ভিড় কমে আসছে, স্টেডিয়ামের পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে আমরা দু’জন। মোবাইল নেই, কাজেই অ্যাপ খুলে আজকের মতো উবার ডেকে নেওয়ার সুযোগ নেই। 

কম বয়স, পেশার জন্য যে কোনও চ্যালেঞ্জ নিতে পারি, কিন্তু এখানে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? পাকিস্তান বোর্ডের কর্তারাও বারবার ম্যাচের সময় বলে দিয়েছিলেন, ‘ছ’টার আগে হায়দরাবাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন কিন্তু। ভিসা ছাড়া এই এরিয়ায় ধরা পড়লে কপালে দুর্ভোগ আছে।’

আমি ঘামছি। পাপ্পু ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। তাকেও চিন্তিত লাগছে। বলল, ‘যে ভাবে হোক, বেরোতে হবে। ক্রিকেট কভার করতে এসে পাকিস্তানি আমির্র হাতে বন্দি হওয়ার চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না! নির্ঘাত গুপ্তচর বলে চালান করে দেবে!’

প্রায় ফাঁকা পার্কিং লট, একটা দুটো গাড়ি তখনও দাঁড়িয়ে। বাকি সব বেরিয়ে গিয়েছে। ঘড়িতে ছ’টা দশ। ঠিক তখনই একটা গাড়ির দিকে এগোতে দেখলাম এক মাঝবয়সী পাকিস্তানি সাংবাদিককে। আমাদের দু’জনকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা এখনও এখানে? গাড়ি কই?’

ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম আমরা। এক মিনিট সময় লাগল তাঁর। তার পরে এহসান কুরেশি  রীতিমতো আদেশের সুরে বললেন, ‘এখনই চেকিং শুরু হয়ে যাবে। উঠুন। এখনই গাড়িতে উঠুন!’ পাপ্পু আর আমি একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি, বুঝতে পারছি না, কাজটা ঠিক হচ্ছে কি না। একেবারে অজানা একজন মানুষ, হতে পারেন সাংবাদিক, কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবেন, কী করবেন, কিছুই তো জানা নেই।

এ বার এহসান কুরেসি গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘আপ লোগ মেহমান হ্যায় হামারা! হাম আপকা দুশমন নেহি। আইয়ে!’ মেন রাস্তা দিয়ে না গিয়ে সম্পূর্ণ ঘুরপথে এগোতে লাগল এহসানের গাড়ি। হেসে বললেন, ‘মেন রাস্তায় দুটো চেকপোস্ট আছে। সেখানে চেক করলে আপনারা ধরা পড়ে যাবেন। তাই অন্য রাস্তা! আমি যতক্ষণ স্টিয়ারিংয়ে আছি, আপনারা সেফ!’ 

সরু গলিঘুঁজি আর বিভিন্ন মহল্লা পেরিয়ে গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা ছিমছাম ছোটখাটো বাড়ির সামনে। গাড়ি পার্কিং করার জন্য দালান আছে, সেখানে এক বৃদ্ধ বসে হুঁকো টানছিলেন। ‘আব্বাজান’ বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন এহসান। বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে আমাদের বসিয়ে পর্দা সরিয়ে ভিতরে গেলেন। 

মিনিট তিনেকের মধ্যে সামনে সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা, চোখে-মুখে আভিজাত্যের চিহ্ন। এহসানের স্ত্রী নাজমা। তার পরেই বললেন, ‘দাঁড়ান, আপনারা সারা দিন খাননি। একটু অপেক্ষা করুন।’

এ বার পাপ্পু বলল, ‘না না ভাবী, ওসবের দরকার নেই। আমাদের যে ভাবে হোক, করাচি ফিরতে হবে!’

পাশ থেকে হেসে উঠলেন এহসান, ‘সেটা কি আমি জানি না? দুটো অপশন আছে। রাতটা আমার বাড়ি থেকে যান আপনারা। আমাদের একটা ঘর আপনাদের দিয়ে দেব, কোনও অসুবিধে হবে না। সকালে উঠে গাড়ি ভাড়া পেয়ে যাবেন, তখন চেকিং হয় না। আর সেকেন্ড অপশন, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি! এখান থেকে প্রচুর ট্রাক যাচ্ছে করাচি। রাত ন’টা থেকে ছাড়ে। আমার চেনা লোক আছে। সেরকম একটা ট্রাকে আপনাদের তুলে দিতে পারি। সে ক্ষেত্রে রাত বারোটা-একটা নাগাদ করাচি পৌঁছে যাবেন। আপ ডিসাইড কিজিয়ে!’

পাপ্পু আর আমি বললাম, ‘কিন্তু কাল সকালে যদি চেকিং হয়? আমরা ট্রাকে করেই যাব। আপনি প্লিজ ব্যবস্থা করে দিন!’

এহসান হাসেন, ‘আগে তো ডিনার করুন। তার পরে ভাবব!’

ব্যবস্থা বলে ব্যবস্থা! নাজমা ভাবীর হাতে বানানো গরম তন্দুরি রুটি, গোস্ত কাবাব, কালি ডাল আর সুজির হালুয়া খেয়ে আমরা যখন ঢেকুর তুলছি, এহসান বললেন, ‘মেহমান হিসেবে কোথাও কোনও ভুল হলে মার্জনা করবেন। আমার বন্ধুর ট্রাক বেরোবে আর আধ ঘণ্টা পরে। আমি আপনাদের তুলে দিয়ে আসছি।’ বেরোনোর সময় নাজমা ভাবী দু’জনের হাতে তুলে দিলেন দুটো জলের বোতল আর এক বাক্স টফি। নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আবার আসবেন!’

রাত ন’টা নাগাদ ফের ঘুরপথে এহসান আমাদের পৌঁছে দিলেন ট্রাকের আড্ডায়। সেখানে আলাপ হল ড্রাইভার মহম্মদের সঙ্গে। এহসানের বন্ধু। ট্রাকে ওঠার সময় এহসানকে ধন্যবাদ দিতে যেতেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন, এই যথেষ্ট। মেহমানের কাছ থেকে ধন্যবাদ নিতে নেই। ইনসাআল্লাহ, ঠিকঠাক করাচি পৌঁছে যাবেন। আমি মহম্মদের কাছে খবর পেয়ে যাব!’

রঙবাহারি ট্রাকের ড্রাইভারের পিছনে আরামদায়ক আরও তিনটে সিট। বেশ পা ছড়িয়েই বসা যায়। মহম্মদের সঙ্গে গল্প করতে করতে রাতের হাইওয়ে ধরে ফিরছিলাম। পাপ্পু বলল, ‘এহসান আমাদের বাঁচিয়ে দিল বললে কিছুই বলা হয় না! অথচ আমরা ভাবছিলাম…’

 সত্যিই তো ভাবছিলাম! গাড়িতে ওঠার সময়ে মাথায় কাজ করছিল অনিশ্চয়তা। কিডন্যাপ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

আজও যখন ঘটনাটা ভাবি, কী হতে পারতো, ভাবলে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। তার পরে এহসানের হাসিমুখটা মনে পড়ে, ‘আপ মেহমান হো, দুশমন নহি!’

কাঁটাতারের বেড়া কি মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নিতে পারে? সম্ভবত নয়। এখনও এহসানরা আছেন এই পৃথিবীতে, সে জন্যই এখনও পৃথিবীটা সুন্দর। 

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2023_jan goddyo

আবার রাণার কথা । পর্ব ১১

ধা রা বা হি ক । পর্ব ১১

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

পুকুর কে না-পাঠানো চিঠি

তোমার কথা মনে পড়ে। বিয়ে হয়ে গেছে এতদিনে নিশ্চয়। ছেলেমেয়ে? তাদেরও নিশ্চয় বিয়েশাদী হয়ে গেছে।

তুমি আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়তে।

তুমি সবুজ হয়েছিলে আমার সমস্ত কৈশোর জুরে।

একদিন স্কুল থেকে এসে ছিপ নিয়ে দৌড়েছি, মাছ ধরব বলে, (তখন মাছ ধরার সে কি নেশা!) দেখি তুমি সাপ হয়ে ঘাটের রানারে জল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আছো! বুকে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছো।

তুমি জল,  সাপ হয়ে আমার সামনে।

আমি আমার বাল্যের যাবতীয় কৌতূহল-মেশানো সাঁতার শিখেছি তোমার শরীরেই। আমার কৈশোরের আবছা যৌন-অযৌন সাঁতার তুমিই শিখিয়েছিলে আমায়।

তখন দিনগুলো কেমন আবছা আবছা ছিল। মা বাবা পাঠ্যবই বোন স্কুলের স্যার ও বন্ধুরা এইই ছিল আমার আবছা অস্পষ্ট আকাশ, আর তুমি। তোমার ধারে ধারে তীরে তীরে ঘুরে বেড়াতাম। তুমিই ছিলে আমার কঠিন পাটীগণিত, তুমিই ছিলে আমার সহজ ইতিহাস, তুমিই মোঘল সাম্রাজ্য, তুমিই মনকেমন করা রাজলক্ষী-শ্রীকান্ত!

হয়তো একটু বেলা অব্দি ঘুমোবে ভেবেছো। কারণ কাল সারারাত ঘুমোওনি। জেলেরা জাল টেনেছে সারারাত, তোমার শরীর জুড়ে, তন্নতন্ন জাল টেনেছে। ভোরে তুমি ক্লান্ত!

আমিও এক অবুঝ — ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে গেলাম তোমার পারে, দিলাম এক ঝাপ।  তখন বৈশাখ। তুমি নড়ে উঠলে শ্যাওলা সমেত, ঘুম সমেত। ঢেউ স্রোত তরঙ্গ  তোমার অবচেতন জুড়ে। কি সহ্যই না করেছ তখন।

এইসব ভেবেছিলাম লিখে জানাবো তোমায়। আমার না পাঠানো চিঠি। তোমাকে স্বপ্নে দেখি। আনন্দে দেখি। শান্তিতে দেখি। দুঃখিত ছায়ায় দেখি।

আমার চিঠি তোমার বুকে কাগজের নৌকা হয়ে ভাসুক। তুমি ঐ চিঠির কাগজনৌকোয় তোমার কথাও, তোমার আজীবন আমার জন্য ভেসে থাকার কথাও লিখো, জানিও।

তোমার দুই পারে সুখী বাতাস। তোমার গভীরে (মাঝ পুকুরের মাটি তোলার সময় শুনেছি সে গান) রাজেশ্বরী দত্তর গান, তুমি তুমি আজো সাপ হয়ে, লতা হয়ে, জল হয়ে, চাঁদের আয়না হয়ে আছো —- আমার, আমার ভিতর। ভালো থেকো, আমার প্রিয় জল, আমার চিৎ সাঁতার, আমার খুব ডুব সাঁতার, আমার মাছ ধরার অঙ্ক বই, ভালো থেকো তুমি।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...