Categories
2020_pujo golpo

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

গ ল্প

সৌ ভি ক   ব ন্দ্যো পা ধ্যাা য়

এপিটাফ

মেঘলা হয়ে আসছে ভীষণ। বিকেল চারটেতেই ঘন অন্ধকার, খুব হাওয়া দিচ্ছে, উড়ছে শুকনো পাতা। আজ শনিবার, অফিস ছুটি, তাই উজান শ্রাবন্তীকে নিয়ে বেরিয়েছিল দুপুরে। পার্ক স্ট্রিটের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে , এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েছে এই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে । উজান আর শ্রাবন্তীর এই কবরখানায় আসতে বেশ ভালো লাগে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ যেন , কোনও হই-হট্টগোল নেই , লোকজন প্রায় নেই ভেতরে , শুধু এপিটাফ চারিদিকে , আর ঘাসে মোড়া নির্জন ছায়াপথ । এখানে সময় যেন থমকে আছে । ডিরোজিও, উইলিয়াম জোন্স-সহ আরও অনেক বিখ‍্যাত মানুষদের কবর আছে এই সিমেট্রিতে। শোনা যায়, বহুকাল আগে এখানে ঘন জঙ্গল ছিল , বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সেই জঙ্গলে বাঘ শিকার করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক অফিসার ও তাদের পরিবারের লোকজন এখানে চিরঘুমে শায়িত । বেশিভাগেরই মৃত্যু ঘটেছে অকালে, কলেরা বা অন্য কোনও রোগে । একটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে উজান – লেখা আছে উইলিয়াম বার্লো। উজান স্মৃতি ফলকের ওপর জন্মসাল আর মৃত্যুসালের মধ্যে ব‍্যবধান হিসেব করে বুঝলো উইলিয়াম মারা গেছিল মাত্র সতেরো বছর বয়েসে।

ভারতবর্ষ শাসন করতে এসে অনেক ব্রিটিশ অফিসারই তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছিলেন এ দেশের মহামারী-জল হাওয়ায় । হাঁটতে হাঁটতে উজান আর শ্রাবন্তী এসে পড়ে একটা খোলা প্রান্তরের সামনে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা আকৃতির কবর । বিত্তবানদের কবরের ওপর বড় বড় স্মৃতিসৌধ , অনেক ছোট ছোট কবরের ওপর নাম পড়া যাচ্ছে না , মুছে গেছে নাম ও পরিচয়। হঠাৎ বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা শুরু হয়ে গেল। সঙ্গে ছাতা নেই , শ্রাবন্তী নিজের ও উজানের মাথা কোনোরকমে তার নীল ওড়না দিয়ে ঢেকে , উজানের হাত ধরে ছুটে এসে দাঁড়াল একটা বিশাল গাছের তলায় । ততক্ষণে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে , চারিদিকে অন্ধকার , মেঘ ডাকছে , একটা ছমছমে পরিবেশ। উজান একটা সিগারেট ধরালো , শ্রাবন্তী কোনো কথা বলছে না , এমনিতেই কথা কম বলে , এখন বোধহয় বাড়ি ফেরার টেনশনে পড়ে গেছে । উজান দেখলো শ্রাবন্তী একমনে বৃষ্টি দেখছে , ওর চুল উড়ছে হাওয়ায় , উজান আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল । এই শেষ বিকেলের বৃষ্টিতে কবরখানায় এভাবে আটকে পড়াটা উজানের খুব রোম্যান্টিক মনে হচ্ছিল – ওর হঠাৎ খুব ইচ্ছে হল শ্রাবন্তীকে একটা চুমু খায়। বিদ‍্যু‍তের আলো সহসা আকাশ চিরে দিল , ভীষণ জোরে বাজ পড়ল কোথাও আর আচমকা শ্রাবন্তী জড়িয়ে ধরল উজানকে। শ্রাবন্তীর ভিজে শরীরের গন্ধ , ওর নরম উষ্ণতায় ডুবে গেল উজান। বললো, “ভয় নেই, আমি আছি…”

উজান তাকিয়ে দেখলো পাঁচটা বাজে, মানে গেট বন্ধ হয়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। বৃষ্টি কমে এসেছে , থেমেই গেছে প্রায়, ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভরে গেছে চারিদিক। হঠাৎ খেয়াল হল, সে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছের তলায়, শ্রাবন্তী পাশে নেই। শ্রাবন্তী কোথায় গেল? উজান অবাক হয় খুব। পাশাপাশি দু’জনে দাঁড়িয়ে ছিল, শ্রাবন্তী কখন সরে গেছে, বুঝতেও পারেনি উজান। এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্রাবন্তীকে কোথাও দেখতে না পেয়ে উজান হাঁটতে থাকে ভেজা রাস্তা দিয়ে , শ্রাবন্তীর নাম ধরে ডাকে দু’বার, ওর কন্ঠস্বর যেন স্মৃতিসৌধের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে নিজের কাছেই । মোবাইল হাতড়ে শ্রাবন্তীর নাম্বার ডায়াল করে উজান – সুইচড অফ। এবার উজানের সত‍্যিই টেনশন শুরু হয়ে যায়। শ্রাবন্তী তো এরকম করবার মেয়ে নয়। কিছু না বলে কেন সে উজানের পাশ থেকে সরে গেল! আর কখনই বা গেল তা উজান টেরই বা পেল না কেন ? হাঁটতে হাঁটতে উজান চলে আসে এক নির্জন কোণে , যেখানে পাশাপাশি দুটো কবর , আর তাদের মাথায় উপর নেমে এসেছে একটি প্রাচীন গাছ। আলো-আঁধারিতে উজান দেখলো ডানদিকের কবরের উপর চুপচাপ একা একা বসে আছে শ্রাবন্তী , মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে । “শ্রাবন্তী” বলে উজান ডাকতেই সে মুখ তুললো। উজান দেখলো শ্রাবন্তীর মুখ আকাশের মতই মেঘলা , আর কোথা থেকে যেন এলোমেলো উড়ে আসছে হাজার হাজার গাছের পাতা। দেখতে দেখতে শ্রাবন্তীর মুখ, ঠোঁট , সারা শরীর ঢেকে গেল পাতায় , আর ধীরে ধীরে সে ডুবে যেতে থাকলো, দুই কবরের মাঝখানে কালচে ঘাসজমির মধ‍্যে মিলিয়ে গেল শ্রাবন্তী, পড়ে থাকলো কিছু বিবর্ণ পাতা।

“দাদা , ক্লোজিং টাইম হয়ে গেছে” – সিমেট্রির কেয়ারটেকারের কণ্ঠস্বরে ঘোর কাটলো উজানের। সে এখন কী করবে ? শ্রাবন্তী আর নেই , তার চোখের সামনেই মাটির তলায় সে মিলিয়ে গেছে একটু আগেই । মাথায় মহাকাশ শূন্যতা নিয়ে উজান বেরিয়ে এলো গেটের বাইরে। সন্ধ‍ের আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিট যেন অন্য জগৎ । রঙচঙে যুবক-যুবতীদের পাশ কাটিয়ে উজান অন‍্যমনস্ক হেঁটে যেতে থাকলো । কোথাও যাবার নেই , একা একা ঠিকানাবিহীন উজান।

উজান আজ শ্রাবন্তীর সঙ্গে বেরিয়েছিল । সেই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি , সেই আলোছায়া পথ। উজানের মনে হয় , শ্রাবন্তী ঠিক ফোন করবে রাত্রে , যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে , আর তারাদের আলো এসে পড়বে জানলায়।

ঠিক এক বছর আগে শ্রাবন্তীদের গাড়িটা দুমড়ে মুচড়ে পড়ে ছিল কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে। অফিসের কলিগদের সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিল শ্রাবন্তী। ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টি , ব্রেক ফেল করে যায়।

ধীরে ধীরে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের পুরনো ট্রামলাইনের দিকে চলে যেতে থাকে উজান। হঠাৎ খেয়াল হয় আজ ১২ই জুলাই, পরশু শ্রাবন্তীর জন্মদিন। তাড়াতাড়ি পার্কস্ট্রিটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একটা গিফট শপ খুঁজতে থাকে উজান।

সন্ধে‍র আলো পেরিয়ে একটা ছায়া মূর্তি ভেসে যায় অজানার দিকে।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo golpo

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

গ ল্প

বি না য় ক   ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

যে সিনেমা হয়নি

মাফিয়া ডনদের জীবনে ধর্মের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। ফাটাকেষ্ট যে কারণে  কালীপুজোয় কম্বল বিলি করে, আলতাফ সেই কারণেই ইদের দাওয়াত দেয়। কারণটা প্রথমত জনসংযোগ এবং দ্বিতীয়ত নিজের একটা রবিনহুড ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু তার বাইরেও একটা কিছু থাকে। দিনভর চুরি-ডাকাতি-খুন-তোলাবাজি করে বেড়ানো লোকগুলো অজানা কোনও সুতোর টানে সাকার বা নিরাকার ঈশ্বরের সামনে বসে একটা বোঝাপড়া সেরে নিতে চায় হয়তো বা।  

আলতাফ নিজের ধর্মের প্রায় সব নিয়ম-কানুন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলত। তবে ধর্মের নামে কসম খেলেও তালাককে ও ঘোর অধর্ম বলে মনে করত।  বিশেষ করে তিন তালাকের কথা উঠলেই মাথা গরম হয়ে যেত ওর। তিনবার একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই একটা মেয়েকে নিজের সাজানো সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে এটা আলতাফ সহ্যই করতে পারত না। এই প্রসঙ্গে ওর সাফ জবাব ছিল যে কোন পণ্ডিত কী বোঝাচ্ছে ওর জানার দরকার নেই; ও নিজে যেটা বোঝে তা হল, এতবড় না-ইনসাফি কোনওদিনই ওপরওয়ালা পছন্দ করতে পারেন না। “হিন্দু হো ইয়া মুসলিম, কোই লড়কি কো ঘর সে নিকালনা জুর্ম হ্যায়।” আলতাফের লব্জ ছিল।   

লোকটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বম্বে গিয়ে। একটা বাই-লিঙ্গুয়াল ছবি হবে হিন্দি আর বাংলায়। তার বাংলা চিত্রনাট্য লেখানোর জন্য এক প্রোডিউসার আমাকে থাকা-খাওয়া আর পঞ্চাশ হাজার টাকার কড়ারে মাস দুয়েকের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ভিতরেই লিখে ফেলতে হবে স্ক্রিপ্ট। ব্যাপার এরকমই সহজ-সরল কিন্তু মুশকিল হত প্রতিদিন সকালে যা লিখতাম, রাতের মিটিঙে সেটাই ক্যানসেল হয়ে যেত। হিন্দিতে যে সিনটা যেভাবে আসছে, বাংলায় নাকি ঠিক সেভাবে  জমছে না। আরে মোলো যা! হিন্দি আর বাংলা তো দুটো আলাদা ভাষা শুধু নয় দুটো আলাদা পরিমণ্ডল। সিন বাই সিন একই জিনিস চাই তো আমাকে নিয়ে গিয়ে লেখানোর কী দরকার! দুটো ভাষাই জানে এমন কাউকে দিয়ে কপি-পেস্ট করিয়ে দে! 

ঝামেলা না করলে এই যুগে কোথাওই নিজের মত প্রকাশ করা যায় না। এখানেও আলাদা হবে কেন? তাই বলে ঝামেলা করতে তো যাইনি, কাজ করতে গিয়েছিলাম।  যে গেস্ট হাউজের একটা ঘরে আমায় রেখেছিল সেটা ভারসোভাতে। সামনেই সমুদ্র। জেলেরা মাছ ধরত আর সেই মাছ অনেকসময় পাড়ে জমা করত বলেই হয়তো খোলা জানলা দিয়ে  ভোরবেলা কীরকম একটা মেছো হাওয়া ঘরে ঢুকে আসত। তার অর্ধেকটা মিষ্টি, অর্ধেকটা লোনা। 

বম্বের গলা-কাটা কম্পিটিশনের জগতে অবশ্য নুন-মিষ্টির চল ছিল না তত। ঝাঁঝ আর ঝালটাই চলত। 

সেদিন রাতে আমাদের ছবির বাংলা ভার্সনের ডিরেক্টর প্রতীকদা আমায় একটা ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। জায়গাটা বার কাম রেস্তোরাঁ, কিন্তু তখন আমি মদ একেবারেই স্পর্শ করতাম না বলে আমার কাছে যাহা বাহান্ন তাহাই তিপান্ন ছিল।

ঘটনা হল, মাতালরা সাধারণত মদ খায় না এমন কাউকে পাশে বসিয়ে  মদ্যপান করে না। কিন্তু আমি হিন্দি গানটা মোটামুটি গাইতাম বলে ফ্রিতে গান শোনার জন্য আমাকে মাঝেসাঝেই বগলদাবা করে এদিক-ওদিক নিয়ে যেত প্রতীকদা। একবার লোখণ্ডওয়ালার সেই ওপেন এয়ার বার কাম রেস্টুরেন্টে বসে আছি।  হঠাৎ প্রতীকদাই আড়চোখে একজনকে দেখিয়ে বলল, এই লোকটাকে চিনিস? বিরাট ডন, নাম আলতাফ। কম সে কম তিরিশ-চল্লিশটা মার্ডার করেছে। বম্বেতে ওরকম কত ডন ঘুরে বেড়াচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ কুড়িটা মার্ডার করেছে তো কেউ চল্লিশটা। তাদের ভিতরে একজনকে চিনে লাভটাই বা কী? আমি তাই তত কিছু পাত্তা না দিয়ে মাংসের পকোড়া খেতে খেতে পরের গানটা ধরলাম। 

কিন্তু গানের মাঝখানেই আলতাফ সামনে এসে দাঁড়াল আর গান শেষ হতেই আমার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলল, বড়িয়া আওয়াজ হ্যায়, আর একটা হয়ে যাক। একটু ভয় যে করল না তা নয় কিন্তু ভয় কেটেও গেল একটু বাদে যখন আমার গাওয়া পরের গানটারও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে উঠল লোকটা। আরও তিন-চারটে গানের পর যখন ওই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আসছি, তখন লোকটা নিজের হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে ওর ভাললাগা পৌঁছে দিতে চাইল আমার কাছে। 

দু-তিনদিন পর প্রতীকদা আবার আমায় নিয়ে বেরোবার সময় খানিকটা উৎসাহের ঢঙেই বলল, আলতাফ তোর গান শুনে এমন ফ্যান হয়ে গেছে যে একদিন বসতে চাইছে তোর সঙ্গে। আমার এবার একটু ভয়ই লাগল। রেস্তোরাঁয় আলাপ হয়েছে, গান শুনে বাহবা দিয়েছে, ব্যস, চুকে গেছে! আবার ওই ডনের সঙ্গে বসে খেজুর করতে হবে কেন? রেগে গেলে দেবে চাকু চালিয়ে! প্রতীকদাকে জানিয়ে দিলাম যে আমি একেবারেই আগ্রহী নই ওই মাফিয়া ডনের সঙ্গে বসতে।   

-আরে না, অত ভয়েরও কিছু নেই। আর তাছাড়া চালালে পরে চাকু চালাবে কেন? ওদের কাছে কি ইনস্যাস, একে-ফর্টি সেভেন-এর অভাব আছে? প্রতীকদা হেসে উঠল। 

-ঝাঁঝরা করে দেবে একদম? 

-চাইলে, দিতেই পারে কিন্তু কেন দেবে না জানিস? তুই যে কারণে পয়সা ছাড়া বম্বেতে মাসের পর মাস পড়ে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখবি না। 

-মানে?

-মানে, আলতাফ একটা প্রফেশনাল ক্রিমিনাল। আর বম্বেতে প্রতিটা মার্ডারের পিছনে বিশ লাখ-পঁচিশ লাখ টাকার ডিল হয়। এবার যাদের খুন করে আলতাফের পকেটে পাঁচ-সাত লাখ ঢুকবে ও তাদেরই খুন করবে বাবু। তোকে মেরে হাতে গন্ধ করবে কেন?    

হয়তো প্রতীকদা ঠিকই বলছিল কিন্তু আমার সত্যি করে ইচ্ছে ছিল না একদম। আলতাফের হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা ওই সোনার দাঁত আমাকে ঘুমের ভিতর ভয় দেখাল একাধিক দিন। কিন্তু ভিনমুলুকে নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কতটাই বা দাম! আলতাফ একে-তাকে দিয়ে বারদুয়েক তাগাদা দিতে প্রতীকদাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল আমার সঙ্গে ওর মিটিং করাতে। প্রতীকদার ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছিলাম। অ্যাড হোক বা ফিচার, ওকে বম্বেতে ছবি বানিয়ে খেতে হবে। কিন্তু আমার মনটাকে কিছু বোঝাতে পারছিলাম না। বুঝতে বা বোঝাতে না পেরেও পৃথিবীর হাজারো কাজ হয়। তারই একটা ধরে নিয়ে আমি শেষমেশ প্রতীকদার সঙ্গে তর্ক করা বন্ধ করে দিলাম। আর একটা শনিবার সন্ধেয় আবারও আলতাফের সঙ্গে দেখা করতে  বেরোলাম। 

আর কোনও হোটেল-ফোটেলে নয়। ওরলির একটা সি-ফেসিং বাড়ির তিনতলায় এবারের মোলাকাত। বম্বে নিজের হেরিটেজ ধরে রেখেছে। তাই ভারতের সবচেয়ে গ্লোবাল শহর হয়েও নিজের ভিতরকার পুরোনো গন্ধটাকে মরতে দেয়নি;  কলকাতার মতো সমস্ত ঐতিহ্য ভেঙেচুরে ‘কোমর ছাব্বিশ, বুক ছাব্বিশ, পাছা ছাব্বিশ’ ফ্ল্যাটে বদলে দেয়নি পুরোটা।

আমরা ফ্ল্যাটের দরজায় বেল দিতে যে লোকটা দরজা খুলল, তার উচ্চতা ছ’ফুট ছাড়িয়ে আরও ইঞ্চি তিনেক। একদম পাথর কেটে তৈরি করা চেহারা। দেখলেই বুকটা কেঁপে ওঠে সামান্য। আমাকে আর প্রতীকদাকে যে নিয়ে এসেছিল সেই রীতেশ সালাম দিতেই লোকটা দরজা থেকে সামান্য সরে দাঁড়াল। কিন্তু আমরা ভিতরে ঢুকতেই সে প্রথমে আমাকে, পরে  প্রতীকদাকে,  জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে নিল একবার। 

-আসিফ, এরা সব আমাদের চেনা-পরিচিত। রীতেশ মিনমিন করে বলল। 

আসিফ ঠান্ডা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, মুঝে আপনা কাম করনে দো। 

সেই ‘কাম’ মানে জড়িয়ে ধরে শরীর থাবড়ানোর সময় লোকটার গা থেকে একটা তীব্র সেন্টের গন্ধ আমার নাক বন্ধ করে দিচ্ছিল প্রায়। আমি দমবন্ধ করেই দাঁড়িয়েছিলাম একরকম। আর আমার পালা শেষ হয়ে গেলে, প্রতীকদা কীভাবে সামলায় ব্যাপারটা দেখছিলাম। আমাকে অবাক করে প্রতীকদা হেসে উঠল আসিফ নামের সেই লোকটির বাহুবন্ধনে। 

সিকিওরিটি চেক শেষ করে আসিফ যখন আমাদের ঘরের সোফায় বসার ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেল আমি প্রতীকদাকে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না যে ও হাসছিল কেন ওইসময়।

-কী করব? লোকটা জড়িয়ে ধরতেই ওর আঙুলের ছোঁয়ায় আমার কাতুকুতু লাগছিল তো।  

-সেদিন তো দিব্যি ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে গান গাইছিল। আজ এখানে এত নিরাপত্তার ঘনঘটা কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

-খোলা জায়গায় ওর পিছনে তিন-চারটে বডিগার্ড থাকে। খেয়াল করা যায় না খালি চোখে। রীতেশ জবাব দিল।

ঠিক তখনই  ধোঁয়া ওঠা কফি আর বেশ কয়েকরকম কেক-পেস্ট্রি-বিস্কিট-ড্রাই ফ্রুটস ট্রে’তে নিয়ে হাজির হল দু’জন। 

-সন্ধে নেমে গেছে এখন আবার কফি? প্রতীকদা বলে উঠল। 

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আলতাফ ঘরে ঢুকে বলল,  রাত একটু গড়াক, তখন যার যা পছন্দ সবই মিলবে। 

প্রতীকদা চুপ করে গিয়ে কফিতে চুমুক দিল, আমি কয়েকটা পেস্তা হাতে নিয়ে কুটুসকাটুস করতে শুরু করলাম আর রীতেশ আলতাফের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কী বলল, ঠিক ধরতে পারলাম না।  

আমি আলতাফকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম যে ওই পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চির লোকটাকে ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবী বলে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায়। তেমন কোনও বিশেষত্বই নেই চেহারায় কেবলমাত্র নাকটা একটু বেশি চোখা আর চোখদুটো একটু ধারালো। ওর পাশে ওই আসিফ দাঁড়ালে সবার নজর আসিফের দিকেই যাবে। কিন্তু দুনিয়ায় শুধু চেহারা দিয়ে কবে কী হয়েছে যে আজ হবে? 

খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম, আলতাফ বলে উঠল, সিঙ্গার সাব আপনি রাইটার ভি আছেন জানার সাথে সাথে আমার মন হল কি আপনাকে দিয়ে আমিও একটা স্ক্রিপ্ট লেখাই। বহুদিন ধরে ইচ্ছা একটা ফিল্ম বানানোর। এটাও বাংলা আর হিন্দি দোনো মে হি হবে। আপনি বাংলাটা লিখবেন।  

-ডিরেকশন আমি দেব তো আলতাফ ভাই? প্রতীকদা বলে উঠল। 

-সেটা আমি এখনও ফাইনাল করিনি। আলতাফ ঝামা ঘষে দিল তৎক্ষণাৎ। 

প্রতীকদা মাথা নিচু করে কেকে কামড় দিল আর আমাকে খানিকটা অবাক করেই আলতাফ বলে উঠল, আমার সিনেমার নাম হবে, ‘তালাক’। খুব খারাপ জিনিস আছে। আপনি বোঝেন তো রাইটার সাব?

আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, বোঝালে বুঝব না তা নয় কিন্তু আমার মনে হয় এই সাবজেক্টটা আপনার কমিউনিটির কেউ আমার চেয়ে অনেক ভাল লিখতে পারবেন। 

-কিঁউ? তালাক কি শুধু মুসলিমরাই দেয় নাকি? হিন্দুরা দেয় না? তালাকের জন্য হিন্দু মেয়েদের জীবন নষ্ট হয়ে যায় না? 

-আমি আসলে এই ব্যাপারটা ভাল জানি না। একরকম সারেন্ডার করে দিলাম । 

আলতাফ দমে না গিয়ে বলল, জানতে হবে। আপনার সেদিনের গান শুনে আমি ফিদা হয়ে গেছি। এত দরদ দিয়ে গাইছিলেন আপনি। আমার স্টোরিটাও খুব দরদ দিয়ে লিখতে হবে। আর এর দুটো পার্ট আছে। প্রথমটা শুনলে তবেই পরেরটা বুঝতে পারবেন। তো পহেলে আপ মেরা কিসসা সুনিয়ে। ফির, বাকি বাত।  

রীতেশ হেসে উঠল কথাটা শুনে। প্রতীকদা বোকার মতো সেই হাসিতে যোগ দিল। আমি চুপ করে রইলাম। আলতাফের লোকেরা ট্রে’তে মদের বোতল আর গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকল। ওরা যখন সোডা আর বরফ দিয়ে মদ বানাচ্ছে, আলতাফ একটা লম্বা সিগারেট ধরিয়ে বলল, গল্প শুরু করার আগে একটা গান হয়ে যাবে নাকি? 

প্রতীকদা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আমি সুব্রত চ্যাটার্জীর একটা পুরোনো হিন্দি গান ধরলাম।                           

৩  

গানটা শেষ হতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আলতাফ, আপনার সুব্রতবাবুর গান ভাল লাগে?  

আমি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললাম। 

-শুধু বাঙ্গাল নয়, অল ইন্ডিয়া ফেমাস শকস হ্যায় উও। এই গল্পে উনিও আসবেন। বাট ফার্স্ট আমার কথা শুনুন।  

আলতাফ নিজের জীবনকাহিনি শুরু করল, হুইস্কিতে প্রথম চুমুকটা দিয়ে। 

গল্পটা শুনতে শুনতে  কীরকম অন্য একটা জগতে চলে যাচ্ছিলাম। সেই যেখানে সরু সরু রাস্তা, সন্ধেবেলা নানারকম আওয়াজ শোনা যায়, মেহেন্দি করা হাত সুর্মা করা চোখের নজরে পড়ে যায়; যেখানে লোহার শিকে গাঁথা থাকে মাংস আর ঝুট-ঝামেলায় গাঁথা থাকে জীবন, যেখানে বর্ষা হলেই নোংরা জল ঢুকে আসে কিন্তু গাড়ি  ঢুকতে পারে না, যেখানে গোটা মহল্লায় গ্র্যাজুয়েট একজন বা দু’জন কিন্তু জেলখাটা আসামি অজস্র, সেখানেই বেড়ে উঠেছিল আলতাফ।

ওর বাবা আলতাফের মাকে তালাক দিয়ে ফের শাদি করেছিল। আলতাফরা পাঁচ ভাইবোন কীভাবে বেঁচে আছে তার খোঁজটুকু পর্যন্ত নেওয়ার দরকার মনে করেনি। একবেলা খেয়ে, দু’বেলা না খেয়ে দিন কাটত ওদের আর মনে মনে একটা তীব্র জ্বালায় ভুগত আলতাফ যখন দেখত ওর সমবয়সী কোনও বাচ্চা, নিজের বাবার আদর পাচ্ছে। 

সময় থেমে থাকে না, সে সবাইকেই সেই মোড়ে এনে দাঁড় করায় যেখানে আধপেটা খেয়ে থাকা লোকের ভিতরেও সেই ভুখ জেগে ওঠে যা রুটি-মাংস কিংবা ভাত-মাছে মেটে না। আলতাফ যেহেতু খিদে দিয়েই দুনিয়া মাপত তাই সেই ভুখটাকেই ও ‘প্রেম’ বলে ধরে নিয়েছিল। আর সেই প্রেম ওর জেগে উঠেছিল ওদেরই মহল্লার লাগোয়া এলাকার একটা মেয়ের প্রতি। ছিপছিপে চেহারার, লম্বা বেণী করা সেই ‘মারাঠি মুলগি’র জন্য আলতাফের ভিতরটা ছটফট করত। মন যদি একটা মুরগি হত তাহলে আলতাফ কবে সেটাকে গলা মটকে মেরে দিত। কিন্তু মন তো হাজারবার মারার পরও কোঁকর-কোঁ করে ওঠে, তাকে নিয়ে কী করা যায়? 

মেয়েটা হিন্দু ছিল। কিন্তু তাতে কি? প্রেম কি হিন্দু মুসলমান মানে? আলতাফের যে মন, দিন নেই, রাত নেই ওই মেয়েটার কথাই ভাবত সেও তো ধর্মে, ‘প্রেমিক’ কেবল। ব্যবহারিক কোনও ধর্মের চাপ সে সহ্য করবে কেন?

মেয়েটা যখন ছাদে কাপড় শুকোতে দিত, আলতাফ ওই ভেজা কাপড়ের গন্ধে গন্ধে গিয়ে  দাঁড়াত গলির মোড়ে।  ভেজা কাপড়ের গন্ধটা কী করে চিনত, আলতাফ আজও বুঝতে পারে না। কিন্তু সেই দিনগুলোয় ওই সামনের বড় দোকানের ঘড়িটায় ঢং ঢং করে বারোটা বাজলেই নাকে একটা সুবাস লাগত এসে আর পেট পর্যন্ত কেমন মোচড় দিয়ে উঠত। 

একটা সময়ের পর আলতাফকে দেখলে মেয়েটা হাসত। আঙুল চালিয়ে চুল ঠিক করত। সাইকেল নিয়ে আলতাফ ওর পিছনে ধাওয়া করছে দেখে একদিন একটা টাঙায়  উঠে পড়ল মেয়েটা আর হঠাৎ করে টাঙাটা থামিয়ে আলতাফ যে গোলাপটা ওকে দেবে বলে ছুটে আসছিল সেটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল। 

সেদিন ভেবেছিল যে মেয়েটা ওকে  ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু তারপর কয়েকদিন মেয়েটাকে দেখতে পেল না ও। আর  একে-ওকে খোঁজ করে জানল মেয়েটার ফ্যামিলি পুনায় বেড়াতে গেছে। ওই পুনা থেকেই মেয়েটার বিয়ে দিয়ে ফিরে এল ওরা। স্তম্ভিত আলতাফ দেখল, যে রাস্তা ধরে ও মেয়েটার পিছু নিয়েছে সেই রাস্তা ধরেই একমাথা সিঁদুর নিয়ে নিজের বরের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটা। আর তার কয়েকদিন পর নাসিক না ঔরঙ্গাবাদ কোথায় একটা চলে গেল সে বরের চাকরির সুবাদে। এর-তার মুখে সবই শুনল আলতাফ। 

আলতাফ চোখের সামনে খুন, রাহাজানি, আরও অনেক কিছুই দেখেছে কিন্তু বুকের ভিতর এই অসহ্য যন্ত্রণা যেটায় রক্তটা বাইরে না এসে আরও ভেতরে ঢুকে যায়, সেটাকে কী বলে ওর জানা ছিল না। ভালবাসা কী এরকমই হয়? আলতাফ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করত। উত্তর পেত না। বদলে  ওর মনে হত যে ওকে স্ট্যাব করে যাচ্ছে দুপুরের রোদ্দুর, স্ট্যাব করে যাচ্ছে সমুদ্রের বাতাস,  রাতের বৃষ্টি, সন্ধের হাওয়া।

আলতাফ পাগল হয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুদের কেউ ওকে বেশ্যাখানায় নিয়ে গেছে, ও একটুও আনন্দ পায়নি;  দরগায় নিয়ে গেছে, ও এতটুকু শান্তি পায়নি। ভিতর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে না গেলে, এই যন্ত্রণাও বেরোবে না, এমনই ভেবে নিয়েছিল। আর এই মরতে হবে ভেবে নেওয়ার পরই ওর মাথায় আসে যে ওই মেয়েটা আর তার হাজব্যান্ডকে মেরে মরলে কেমন হয়? ওরা কবে আবার আসবে বম্বে? ততদিনে কি মেয়েটা প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে? এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে একদিন বার থেকে প্রচুর মদ খেয়ে বেরিয়ে রাস্তা ক্রস করার সময় একটা গাড়ির ধাক্কা খায়। গাড়িটা ওকে একেবারে শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে চলে যায়।  

অনেক পরে জেনেছিল যে সেই গাড়িটা হুশ করে বেরিয়ে গেলেও পরের গাড়িটা থেমেছিল। মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এক ভদ্রমহিলা ড্রাইভারের সাহায্যে আলতাফকে তুলে নিয়েছিলেন গাড়িতে। নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। প্রায় দেড়মাস  আলতাফ হাসপাতালে ছিল। ষোলোটা ফ্র্যাকচার হয়েছিল ওর। অতদিন হাসপাতালে থেকেও সারেনি আলতাফ, সেই ভদ্রমহিলা তারপরও ওকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিলেন তিনমাস। মায়ের মমতায় সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন। কিংবা মায়ের থেকে একটু বেশিই। কারণ আলতাফের নিজের মা তো ওর খোঁজ নিতেও আসতে পারেনি। সংসারের চাপে সেটা হয়তো স্বাভাবিকই ছিল। অবশ্য আলতাফ খুব বেশি মিসও করেনি নিজের মাকে। কেন করবে? জয়শ্রীদিই যে ততদিনে ওর মা, দিদি, ভগবান, আল্লা সব হয়ে উঠেছে। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো একটা সময়কে ঝর্নার জলে বদলে দিচ্ছে একাই।  

কিন্তু জয়শ্রীদির নিজের জীবনে দুঃখের অন্ত ছিল না। ওঁর বাড়িতে থাকতে থাকতে সেই দুঃখের সঙ্গেও পরিচয় ঘটল আলতাফের। তিনটে মেয়ে জয়শ্রীদির। নীলা, লীলা আর শীলা। কতই বা বয়স, নয়, সাত আর চার। ফুলের মতো দেখতে মেয়েগুলো কিন্তু ওদের বাবা, সেই সময়ের ভারত-বিখ্যাত গায়ক সুব্রত চ্যাটার্জীর চোখে ফুল নয় কাঁটা। ছেলে হয়নি বলে জয়শ্রীদিকে অকথ্য গালিগালাজ করত লোকটা। গোরেগাঁও-এর সেই ফ্ল্যাটের একটা ঘরে শুয়ে সেই গালি শুনতে পেত আলতাফও।  

-ছেলে ধরে এনেছ নাকি রাস্তা থেকে? ছেলে তো না, এ তো দেখছি লোক। ছেলের জন্ম দিতে পারোনি বলে যেখান থেকে যা পাচ্ছো তুলে আনছ? আলতাফকে দেখিয়ে জয়শ্রীদিকে বলেছিল লোকটা। 

আলতাফের মনে হয়েছিল উঠে দাঁড়িয়ে গলা টিপে ধরে লোকটার। কিন্তু তখন তো ওর সেই শক্তি নেই। মুখ বুজে সহ্য করেছিল তাই।  

লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর মেয়েগুলো কান্না জুড়ে দিত, আর জয়শ্রীদি বলত, বাবা একটুও ভালবাসে না তবু মেয়েদের মন তো বাপের জন্য কাঁদে তাই না? যদি আমাকে গালাগালি করার জন্যেও প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরত, তাহলে শান্তি পেতাম। 

লোকটাকে একদম পছন্দ হত না আলতাফের। কী রুড কথাবার্তা। জয়শ্রীদি তো দূর, নিজের একটা মেয়ে কোলে বসতে এলে তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। মাসের মধ্যে তিন সপ্তাহ তো দেশ-বিদেশ করে বেড়ায় গানের ট্যুরে, যে কয়েকটা দিন বাড়িতে থাকে, একটু ভালবাসতে পারে না বাড়ির লোকগুলোকে? এত বড় সেলিব্রিটি কিন্তু মনটা বম্বের ট্যাক্সির মতো ছোট। আলতাফ ভাবত। 

উল্টোদিকে জয়শ্রীদির নিজের দুর্দান্ত গলা, কিন্তু গানের কেরিয়ার ভুলে গিয়ে এই লোকটার জন্য জীবন উৎসর্গ করে বসে আছে। এই লোকটার ছেলের বাসনা পূর্ণ করবে বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রেগন্যান্ট হয়েছে তিনবারের বার, আর তারপরও ছেলে হয়নি বলে সুব্রত চ্যাটার্জীর খিস্তি-খামারি খাচ্ছে। দিনরাত খেটে মানুষ করছে মেয়েগুলোকে। পিয়ানোর ক্লাসে নিয়ে যাচ্ছে, গান শেখাচ্ছে, পড়তে বসাচ্ছে। তার মধ্যে, কে জানে কেন, রাস্তায় পড়ে থাকা আলতাফকে জীবন বাজি রেখে জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসছে। 

-তুমি শেষে আমার জন্য তোমার হাতের বালা দুটো বিক্রি করে দিলে? আলতাফ একদিন আর থাকতে না পেরে বলল। 

-কে বলল, বিক্রি করে দিয়েছি? 

-তোমার মেয়ে নীলাই, লীলাকে বলছিল। আমি শুনতে পেয়েছি।

-ওরা বাচ্চা, কান শুনতে ধান শুনেছে। আমি বিক্রি করিনি মোটেই, বন্ধক রেখেছি। সময় হলেই ছাড়িয়ে নেব।

-কিন্তু কেন দিদি? আমি তোমার কে যে আমার জন্য এত করছ? আলতাফের গলা বুজে এসেছিল। 

জয়শ্রীদিও কেঁদে ফেলেছিল জবাব দিতে গিয়ে, আমি জানি না তুই আমার কে। কিন্তু রাস্তা থেকে তোকে তুলে আনার পর যখন আমার কোলে তোর মাথাটা রেখেছিলাম আর আমার শাড়ি ভিজে যাচ্ছিল রক্তে তখন তুই আমার দিকে তাকিয়ে আধো অচেতনে বলে উঠেছিলি, “মুঝে বাচাও”। আর সেই সময় থেকে আমার মনে হতে থাকল যে তুই আমার জন্ম না নেওয়া ছেলে। কেন মনে হতে থাকল জানিস? কয়েকদিন আগেই আমি আবার কনসিভ করেছিলাম আর ডাক্তাররা আমার মত না নিয়েই অ্যাবর্ট করে দিয়েছিল বাচ্চাটাকে। আবার জন্ম দিতে গেলে আমি শিওর মরে যেতাম তাই। তারপরই তোকে রাস্তায় পেলাম আর তুই ওই কথাটা বললি; বিশ্বাস কর, তখন থেকে আমার মনে হতে থাকল যে তুইই সে। আমাকে কাতর গলায় বলছে, বাঁচতে চাই। এবার আমার পেটের ভিতর যে ছিল তাকে তো আমি বাঁচাতে পারিনি, তোকে মরতে দিতাম কী করে ?  

আলতাফ আর কিছু বলতে পারেনি উত্তরে। শুধু জয়শ্রীদির পায়ে নিজের মাথাটা রেখেছিল। আর জয়শ্রীদি ওর মাথাটা তুলে ধরে কপালে একটা চুমো খেয়ে বলেছিল, বেঁচে থাক।

শরীর সারতে আলতাফ যখন নিজের মহল্লায় ফিরে গেছে, পোর্ট এলাকার এক ছোট মাফিয়ার আন্ডারে কাজ শুরু করেছে, তখন জয়শ্রীদি একদিন পৃথিবীর থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। আলতাফ ওর এক বন্ধু মারফৎ খবর পেল যে একসঙ্গে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি আছে জয়শ্রীদি। 

খবরটা পেয়েই আলতাফ ছুটে গেল হাসপাতালে। 

-তুমি মেয়েগুলোকে রেখে, আমাকে রেখে, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলে? তোমার লজ্জা করল না একবারও?  

-করেছিল। কিন্তু যখন মেয়েদের স্কুলের ফিজ দিতে পারছিলাম না আর ওদের প্রিন্সিপাল ফোন করছিল, তখন আরও লজ্জা করছিল। ভেবেছিলাম আমি মরে গেলে হয়তো ওদের বাবা ওদের দায়িত্ব নেবে। আর তখন ওর নতুন বউও বাধা দিতে পারবে না।

-দাঁড়াও, দাঁড়াও। সুব্রত চ্যাটার্জী আবার বিয়ে করেছে?

-হ্যাঁ। ইন্ডাস্ট্রির উঠতি সিঙ্গার স্বপ্না চাওলাকে। আর বিয়ে করার পরই আমাকে সংসার খরচের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে পুরোপুরি। আগেও যে খুব বেশি দিত তা নয়, কিন্তু এখন একেবারে স্টপ। এমনকী এই ফ্ল্যাটের ভাড়া পর্যন্ত আটকে দিয়েছে। আর দশদিন পর আমাকে নীলা, লীলা আর শীলাকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আমি সুইসাইড অ্যাটেম্পট করব না তো কে করবে ? 

-কী বকোয়াস করছ তুমি? তোমাকে ডিভোর্স না করে চ্যাটার্জী ফিরসে শাদি করল কী করে? তুমি পুলিশে নালিশ করলে, ওর তো হাতে হাতকড়া লাগবে। 

-পুলিশ, আদালত কোথাও গিয়েই কিছু করা যাবে না। আইন যেমন আছে, আইনের ফাঁকও তো আছে। সুব্রত চ্যাটার্জী ধর্ম পালটে বিয়ে করেছে। ও এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

-মতলব?

-মতলব, সুব্রত চ্যাটার্জী মুসলিম হয়ে এই বিয়েটা করেছে। 

-উসনে সচমুচ ইসলাম কবুল কিয়া?

-না। মিথ্যেমিথ্যি মুসলিম হওয়ার নাটক করছে আমাকে আর আমার মেয়েগুলোকে না খাইয়ে মারবে বলে। বম্বেরই একটা ছোট মসজিদে গিয়ে কলমা পড়েছে, তারপর উকিলকে টাকা খাইয়ে এফিডেভিট করে ‘সারোয়ার হুসেন’ হয়েছে। এবার সেই ব্যাপারটা কোর্টের খবরাখবর ছাপা হয় এমন একটা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছে। সেই কাগজটা কেউই পড়ে না, কিন্তু ছাপা তো হয়। এবার কাগজটার কয়েকটা কপি নিজের কাছে রেখে দিয়েছে লোকটা। ও দিব্যি আগের মতো সুব্রত চ্যাটার্জী হয়েই জীবন কাটাবে কিন্তু আমি কোনও লিগাল স্টেপ নিতে গেলেই নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, একাধিক বিয়ে জাস্টিফাই করবে। 

-রোক্কে রোক্কে। এত কথা তুমি জানলে কীভাবে?

-সুব্রত নিজেই একদিন স্বপ্নাকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে এসেছিল, আর আমার মায়ের দেওয়া গয়নাগুলো সব আলমারি থেকে জবরদস্তি বের করে নিতে নিতে বলল, যে মেয়ে ছেলে বিয়োতে পারে না, তার গয়না পরা মানায় না। এগুলো আমার নতুন বেগম পরবে। আমি বাধা দিতে গেলাম ওকে, তখন… 

-চুপ করে গেলে কেন, বলো। 

-আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘তালাক, তালাক, তালাক’। জয়শ্রীদি চিৎকার করে উঠল।  

-হিন্দু আউরতকো তালাক দে দিয়া? ওয়া রে ওয়া! বলতে বলতে আলতাফের চোখের সামনে অজস্র মুখ ভেসে উঠল। প্রথম মুখটাই ওর মায়ের। তালাক পেয়ে যাকে পাঁচটা বাচ্চার হাত ধরে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। তারপর মনে পড়ল ওর ফুফির কথা, যাকে বাজারে পাঠিয়েছিল শ্বশুরবাড়ির লোক। আর সে গেটের বাইরে বেরোতেই দোতলা থেকে চিৎকার করে উঠেছিল তার স্বামী, ‘তালাক, তালাক, তালাক’ বলে। গেট পেরিয়ে আর ভিতরে ঢুকতে পারেনি সেই মহিলা। কিম্বা ওর সেই চাচাতো বোন যাকে হানিমুনে নিয়ে গিয়ে তালাক দেওয়া হয়েছিল। অজস্র উদাহরণ। আলতাফ ছোট থেকে দেখে এসেছে। অথচ হাজি আলির দরগায় বসে এক সুফি গায়ক ওকে বুঝিয়েছিলেন, তালাকের সঙ্গে ওর ধর্মের কোনও অচ্ছেদ্য সম্পর্ক নেই। যে ধর্মে, মায়ের পা’কে মানুষের জান্নাত বলা হয়েছে সেই ধর্মের নাম করে মেয়েদের অত্যাচার করাটাই তো সবচেয়ে বড় গুনাহ। আলতাফ ওর অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল,  তালাক আসলে কতগুলো স্বার্থান্বেষী শয়তানের নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার একটা ধান্দা। 

কিন্তু এই ধান্দা কতদিন চলতে পারে? হিন্দুধর্মেও তো সতীদাহ ছিল, মেয়েরা বিধবা হয়ে গেলে তাদের স্বামীর চিতায় তুলে দেওয়া হত। সেই নারকীয় প্রথা বন্ধ হয়নি? সাহেবরা এসে কোন একটা বাঙালির হেল্প নিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই বাঙালির নামটা জয়শ্রীদির থেকে শুনেছিল আলতাফ। কিন্তু মনে রাখতে পারেনি। আচ্ছা, ও নিজে এমন কিছু করতে পারে না যাতে জয়শ্রীদি আর বাচ্চারা ওর নামটা মনে রাখে সারাজীবন?   

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ততদিনে বম্বের অলিগলি মোটামুটি সড়গড় হয়ে গেছে আলতাফের। খুঁজতে খুঁজতে বান্দ্রার লিংক রোডের সেই ফ্ল্যাটেরও খোঁজ পেয়ে গেল যেখানে সুব্রত চ্যাটার্জী ওরফে সারোয়ার হুসেন নিজের নতুন বউ বা বেগমের সঙ্গে লিভ-ইন করছেন। হাতের পিস্তলটা দেখে দারোয়ান নিঃশব্দে আলতাফ আর ওর দুই স্যাঙাতকে ফলো করল আর নিজেই নক করল তিনতলা ফ্ল্যাটের দরজায়। সিল্কের লুঙ্গি আর হাত কাটা গেঞ্জি পরে তখন মদে ডুবে আছেন গায়ক। দারোয়ানের গলার আওয়াজ শুনে দরজা ফাঁক করতেই, ওকে একটা ঠেলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল আলতাফ আর ওর সঙ্গীরা?   

-অ্যাই তোমরা কে? গেট আউট অর আই উইল কল দ্য পুলিস। সুব্রত চ্যাটার্জী চেঁচিয়ে উঠল। 

-পুলিশ ডাকার আগে তোর গলার নলিটা কেটে দেব। লজ্জা করে না শুয়োরের বাচ্চা, আমার মজহবকে ইউজ করে নিজের খোয়াইশ মেটাচ্ছিস? তুই কী ভেবেছিস, পার পেয়ে যাবি? 

-ওহ তুই সেই লোকটা? তোর সাথে জয়শ্রীর কী সম্পর্ক? কেন তুলে এনেছিল তোকে রাস্তা থেকে? তোর সঙ্গে শোয়ার জন্য নিশ্চয়ই। যা এখন শো গিয়ে ওর সঙ্গে। আমি ছেড়ে দিয়েছি ওকে।   

কথাগুলো শেষ হতেই আলতাফ ঠাটিয়ে চড় মারল সুব্রত চ্যাটার্জীকে। লোকটা মাথা ঘুরে পড়ে গেল।

-তোর গান, তোর সুর, সব মিথ্যা। যে নিজের মেয়েদের খেতে দেয় না, নিজের বউকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়, সে আবার শিল্পী? নে, আমার দিদির গয়নাগুলো বের করে দে আগে।

-কীসের গয়না? কার গয়না? সুব্রত নিচু গলায় বলল। 

-বুঝতে পারছিস না, নাকি দিতে চাইছিস না? তা তুই তো এখন মুসলমান হয়েছিস, আমাদের মজহবে চুরির কী শাস্তি জানিস তো? বলতে বলতে আলতাফ ওর প্যান্টের পকেট থেকে লম্বা চাকুটা বের করল।

সুব্রত চ্যাটার্জী ভয় পাওয়া গলায় চেঁচিয়ে উঠল, না, প্লিজ আমার হাত কেটে দিও না।

ওর চিৎকারে কি না কে জানে, এই এতক্ষণে একটা স্লিভলেস নাইটি পরে স্বপ্না চাওলা ভিতরের ঘর থেকে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপতে শুরু করল।  

আলতাফ খেয়াল করল যে ভদ্রমহিলা বেশ ভালরকম প্রেগন্যান্ট। বিয়ে না করে সুব্রত চ্যাটার্জীর হয়তো উপায় ছিল না। কিন্তু জয়শ্রীদি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেনি কেন? নাকি আলতাফকে বলতে লজ্জা পেয়েছে? 

-আমার দিদির জীবনটা নষ্ট করে এখানে তুই আবার নতুন সংসার বানাবি? আলতাফ চাকুটা উঁচু করে এগিয়ে গেল একটু। 

-প্লিজ ওকে মেরো না। স্বপ্না ন্যাকা গলায় বলে উঠল। 

-আপনি ভিতরে যান। আর এখন থেকে বাইরের পুরুষমানুষের সামনে পর্দা করবেন। মজহব চেঞ্জ করেছেন না?   

-আমি কিছু চেঞ্জ করিনি। ও কী করেছে, জানি না। স্বপ্না বলে উঠল। 

-কী রে তোর নতুন বেগম কী বলছে?

-ওর কথা বাদ দাও আলতাফ। তুমি যা বলবে, আমি তাই করব। শুধু আমার হাতটা কেটে দিও না। আমি এটা দিয়ে মাইক ধরে গাই। ফাংশানে ফাংশানে। 

-সেই গান কে শোনে? আওয়াজ তো একটা দিল থেকে আর একটা দিলে যায়। কিন্তু তোর নিজেরই তো দিল নেই, তুই একটা পাত্থরদিল । তোর মতো লোকের কি গান গাওয়া উচিৎ? শোন, শুধু গয়নাগুলো ফেরত দিলেই হবে না। তুই যে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিস, ওটার মতো ভাড়া নিসনি, সে খবর আমি নিয়েই এসেছি। এবার এই ফ্ল্যাট আর নিজের সম্পত্তির অর্ধেক জয়শ্রীদির নামে লিখে দিয়ে বম্বে থেকে চলে যাবি। যে বম্বেতে আমি থাকি, যেখানে জয়শ্রীদি আছে, সেখানে তোর কোনও জায়গা নেই।  ইন্ডিয়ার যেখানে খুশি চলে যা কিন্তু এই শহরে থাকবি না। আর তুই হিন্দু হয়ে না মুসলমান হয়ে বাঁচবি, আমার দেখার দরকার নেই। আমি শুধু একটা জিনিস জানি তুই ইনসান হতে পারবি না। শয়তান হয়েই থাকবি।  

সুব্রত চ্যাটার্জী থরথর করে কাঁপতে লাগল, আমার এখন কত কাজ এখানে… 

-ওসব বুঝি না। পনেরো দিনের ভিতর বম্বে ছেড়ে চলে যাবি। নইলে… আর শোন আমি যা বলে গেলাম সেটা পুলিস কমিশনারকেও ফোন করে বলতে পারিস। 

ওদের কথার ভিতরেই স্বপ্না এসে জয়শ্রীদির সব গয়নাগুলো দিয়ে গেল। সেগুলো নিজের পাঞ্জাবির ভিতর ভরে নিয়ে আলতাফ অ্যাবাউট টার্ন করল।   

পরের ঘটনা বেশ নাটকীয়। পুলিশেও ফোন গেল না। মিলিটারিতেও না। উল্টে মাসখানেকের মধ্যে বম্বে থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সুব্রত চ্যাটার্জী কলকাতা চলে গেল।  মাঝেমধ্যে বম্বে আসত গান রেকর্ডিঙের জন্য, কিন্ত দু-তিনদিনের বেশি থাকত না কখনই। ‘বম্বে থেকে কেন চলে গেলেন’,  এই প্রশ্ন কোনও রিপোর্টার জিজ্ঞেস করলেই, সুব্রত চ্যাটার্জীর বাঁধা উত্তর ছিল, “বম্বের অ্যাটমোস্ফিয়ারটা ঠিক স্যুট করল না।” 

আলতাফ কথাটা শুনলেই হাসত। চ্যাটার্জী চলে যাওয়ার আগে নিজের ফ্ল্যাট জয়শ্রীদির নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিল, তিন মেয়ের নামে পাঁচ করে আর জয়শ্রীদির নামে দশ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটও করে গিয়েছিল। জয়শ্রীদি একটা চাকরিতে জয়েন করেছিল সুব্রত চ্যাটার্জী বম্বে ছাড়ার কয়েকদিন পরেই। সেখান থেকে আরও ভাল একটা চাকরিতে। সেই চাকরিগুলো পাওয়ার পিছনে আলতাফের ভূমিকা জয়শ্রীদি নিজেও কখনও জানতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিদির মেয়েরাও দাঁড়িয়ে গেছে প্রত্যেকেই। একজন পাইলট হয়েছে, একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন প্রফেসর। সুব্রত চ্যাটার্জীর মৃত্যুর পর কোন একটা মিডিয়া থেকে ওদের তিনজনের প্রতিক্রিয়া নিতে এসেছিল। তিন বোন একটাই কথা বলেছিল, উই ডোণ্ট রিমেমবার হিম।  

-সেই সুব্রত চ্যাটার্জীর গান আমি গাইছিলাম যখন, আপনি বাধা দিলেন না তো? গল্পটা শেষ হতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

আলতাফ হাসতে হাসতে উত্তর দিল, আমার বয়স এখন ফিফটি সেভেন। আর এই বয়সে আসতে আসতে আমি কী বুঝেছি জানো? শয়তানের ভেতরেও একটা ভগবান বাস করে আর গানটা সেই গায়। গানের সঙ্গে শত্রুতা কীসের? ইন ফ্যাক্ট কারও সঙ্গেই কীসের শত্রুতা? ভাববে এই কথা আমি বলছি, একটা মার্ডারার! কিন্তু মার্ডার করেছি বলেই বলতে পারছি, মানুষ মারায় কোনও সুখ নেই। ধান্দা ভেবে করি।  আসলি সুখ পেতাম যদি জয়শ্রীদির মতো করে মানুষকে বাঁচাতে পারতাম। 

-জয়শ্রী ম্যাডাম আছেন তো এখনও? 

-জরুর। এই সিনেমাটা তো ওকে ট্রিবিউট দেব বলেই বানাব। স্টোরিটা ইন্টারেস্টিং করে লিখে আনো তো দেখি। কিছু অ্যাডভান্স দেব? 

-না, আগে খসড়াটা অন্তত করি, তারপর। আমি জবাব দিলাম ।  

সেই খসড়া শেষ হওয়ার আগেই রাইভাল গ্যাঙের সাতটা বুলেট আলতাফকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল একদিন কোলাবার বিশাল বাজারের সামনে। ওর বডিগার্ডরা আন্দাজই পায়নি। গুলি যারা চালিয়েছিল তারা বাইকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল পলকে। মরবার আগে আলতাফ কী বলেছিল জানি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল একদম বিনা নোটিসে জীবনকে তালাক দিয়ে চলে যাওয়ার আগে আলতাফ বোধহয় ওর জয়শ্রীদিকে একবার শেষ দেখা দেখতে চেয়েছিল।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo golpo

সৌভিক গুহসরকার

গ ল্প

সৌ ভি ক   গু হ স র কা র

লছমিয়া

রাত তখন প্রায় ন’টা। দক্ষিণগামিনী গঙ্গার কিনার ঘেঁষে, পাটনা শহরের উল্টো পারে অকিলপুর গ্ৰামে তখন ঘন শ্রাবণের রাত বিরহব‍্যথাতুরা নারীর মতো গোঙাচ্ছে। ঝুপঝুপ বৃষ্টির শব্দে গেঁহু আর চানার খেত ভিজছে; খেতের অন্দরমহল থেকে ব্যাঙ আর ঝিঙুরের অবিশ্রান্ত ডাক ভেসে আসছে। কোথাও সাপে ব‍্যাঙ ধরেছে; কোথাও ব‍্যাঙ পোকা ধরেছে; কোথাও পোকা গেঁহুর দানা খাচ্ছে। ইঁদুরও কি এইসব রাতে কাদা আর খড় মেখে ফসলের গোলায় হামাগুড়ি দিচ্ছে না? রাত্রি কি জানে এত শত কথা? সে কি জানে যে তার আগমনে সমাজ পালটে যায়; স্বভাব পালটে যায়; নীতি পালটে যায়? সে কি বোঝে যে বাইরে থেকে সে যে অন্ধকার বয়ে আনে, মানুষের মনের ভেতরে তার চেয়ে আরও গভীর অন্ধকার বাস করে? রাত্রি কি জানে এতসব? রাত্রি কি মানুষ? 

হরকিষণ স্তিমিত বাল্বের আলোয় হিসেবের কাগজ দেখছিল। এমন সময় ধনিয়া এসে সেলাম ঠুকে বলল, হজুর, লছমিয়া এসেছে! কথা শুনে চমকে উঠল হরকিষণ। লছমিয়া এসেছে? তার হাভেলিতে? রাতে? সে মোবাইলে দেখল রাত ন’টা বেজে গেছে। এই সময়ে চিনা রোগের দাপটে এমনিতেই মেলামেশা কমে গেছে মানুষের মধ‍্যে, তাই সন্ধ‍ের পরেই গ্ৰামের পথ ফাঁকা হয়ে যায়। আর এখন তো চারপাশে শ্মশানের নীরবতা। এইসবের মধ‍্যেই লছমিয়া এসেছে! কেন? কী কথা তার সাথে? এতদিন পর? সে ধনিয়াকে বলল, ওকে মেহমান-খানায় বসাও। পাঁপড় আর সরবৎ দাও, আমি আসছি। ধনিয়া সেলাম ঠুকে চলে গেল। 

হরকিষণ উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালে হাত বোলালো। খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়িতে ভ’রে গেছে গাল। দু’দিন দাড়ি কামায়নি সে। সে আমকাঠের চিরুনি দিয়ে কাঁচাপাকা চুল বাগিয়ে নিল। গায়ে গোলাপি ফতুয়া চাপিয়ে, সাদাটে গোঁফের ধারদুটো মুচড়ে নিল। আয়নায় সে নিজের চোখদুটোর দিকে তাকাল। এই চোখদুটো সব দেখেছে। লছমিয়ার জন‍্যে জল ফেলেছে একসময়ে। আজও লছমিয়ার জন‍্য থর মরুভূমির মতো অপরিশ্রান্ত তৃষ্ণা পুষে রেখেছে এই চোখ, পুষে রেখেছে ছত্তিশগড়ের ভোরামদেব অরণ্যের আহত বাঘের মতো ক্ষুধা। আজও এই চোখ ভুলতে পারে নি, কীভাবে তাকে প্রত‍্যাখ্যান করে, গেঁয়ো চাষি বিরজুর গলায় মালা দিয়েছিল লছমিয়া। বিরজুর অওকাত কী! ওর বাপ শালা দু’টাকার ভাগচাষি। ওর দাদু ছিল চারআনার মুটে। ঠাকুর গঙ্গারামের পায়ের তলায় বসে থাকত! ঠাকুরসাহাবের কৃপায় চার-বিঘা জমিতে খেতিবাড়ি করার সুযোগ পেয়েছিল। সেই বাড়ির ছেলে বিরজু। চাষ করার ফাঁকে ফাঁকে মাদার গাছের ছায়ায় বাঁশি বাজাত। বড় বৃষ্টি ছিল সেই বাঁশিতে; সেই বাঁশিই হল কাল। সেই বাঁশির কোটাল স্রোতে লছমিয়ার শরীর যৌবন পদ্ম জ্যোৎস্না অশ্রু চন্দ্রমল্লিকা ভেসে গেল শালপাতায় রাখা মোমের প্রদীপের মতো। 

লছমিয়ার বাপ-দাদা রইস চাষি। কুড়ি-পঁচিশ বিঘা খেত আছে। তারা দশ ভাইবোন। সে বাপের নয়নের মণি। স্বর্গের আগুন। সোনার ভুট্টা। গরম লিঠ্যি। হরকিষণ এত যুবতী দেখেছে, তবু লছমিয়ার মতো এমনটি সে দেখে নি। লছমিয়া যেন বনপরি। ওর চোখজোড়া শরীর আর শরীরজোড়া চোখ। এ মেয়েকে সে দিনরাত কামনা করেছে পাগলের মতো। কিন্তু কী করল সেই মেয়ে? বিরজুর সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করল। তাও তাকে প্রত‍্যাখ্যান করে! অকিলপুর গ্ৰামে খাপ-পঞ্চায়েত নির্দেশ দিল, একঘরে করে দাও। লছমিয়ার বাপ পর্যন্ত তাকে পরিত‍্যাগ করল। পাশের গ্রাম, দৌলতপুরের কিনারে উঠে গেল তারা। শুধু জমিতে চাষ করার অধিকার রয়ে গেল। তাই বিরজু-লছমিয়ার জীবন প্রথম থেকেই ডুবে রইল কঠিন দারিদ্র‍্যে। কিন্তু এ কথা হরকিষণ জানত যে, ভালবাসা থাকলে জীবন থেমে থাকে না; রাতে খড়ের চালের ভেতর দিয়ে জ‍্যোৎস্না এসে ভাঙা কুঁড়ে ঘরে সাদা হাঁসের মতো খেলা করে যায়; দারিদ্র‍্য ছাপিয়ে ঠোঁটের কোণায় হাসির ঝিলিক লেগে থাকে নিশাশেষে ঊষাকালের নরম শিশিরের মতো। বিরজু আর লছমিয়ার সংসারে অভাব থাকলেও শ্রী ছিল। কিছুই থামে নি, কিছুই থামে না। তবে আজ? কেন এল লছমিয়া? গত পনেরো বছরে যার সঙ্গে চোখাচোখি পর্যন্ত হয় নি, আজ সে নিজে এসেছে কীসের জন‍্য? কোন মতলবে? শুধু দেখা করার জন্য সে আসেনি, তার কিছু একটা চাই। কী চাই তার?

হরকিষণকে বড়ঘরে ঢুকতে দেখে লছমিয়া উঠে দাঁড়াল। লছমিয়াকে এতদিন পরে হঠাৎ দেখে মুহূর্তের জন‍্য হরকিষণের শিরায় রক্ত উঠল ছলকে। কপাল অবধি গাঢ় হলুদ রঙের ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে সে। লছমিয়ার শরীরে এখনও জোয়ারের জল উছলে পড়ছে! কোথাও কোনও খামতি নেই! সেই চোখ, সেই ঠোঁট, সেই তাকানোর ভঙ্গিমা। কত বয়স হবে এখন তার? চল্লিশ! তবু, সে এই বয়সেও পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে। হরকিষণের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝল যে তার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। অন‍্য কাউকে বিয়ে করলে সে সুখী হত না; তার চেয়ে বরং সারাবছর ধরে নতুন নতুন মেয়েরা আসে; কেউ কানপুর, কেউ লক্ষ্ণৌ, কেউ বিলাসপুর। টাকা নেয়, পাট-ভাঙা শরীর খুলে দিয়ে যায়। যে যাই বলুক, নতুন শরীরের একটা টান থাকে; চেখে দেখলে মন ভালো থাকে―না হলে এতদিনে একজন নারীকে নিয়ে পড়ে থাকলে সে পাগল হয়ে যেত। শুধু লছমিয়াকে বাদ দিয়ে, কারণ লছমিয়া কেবলমাত্র ‘একজন’ নারী নয়, লছমিয়ার শরীরে একশো নারীর যৌবন।

হরকিষণ ইশারা করে বসতে বলল লছমিয়াকে। 

―কী হয়েছে? হঠাৎ? এতদিন পর? 

―রুপিয়ার জরুরত, লছমিয়া ভনিতা না করেই বলল।

― কত? 

― বিশ হাজার।

― বিশ? এত টাকা? কাহে? 

― লাগবে।

― কেন লাগবে? 

লছমিয়া চুপ করে রইল, কথার উত্তর দিল না। সে যেন জানত যে এই প্রশ্নটা উঠবে; সে প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল, কিন্তু এখন সে যেন তার মুখ খুলতে চাইছে না। নিজের সরবতে চুমুক দেবার ফাঁকে হরকিষণ আড় চোখে দেখে নিল তাকে। গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল,

― প্রশ্নটা কি বহুত শক্ত হল? 

লছমিয়া মাথা নাড়ল। তার মাথা থেকে ঘোমটা ঝ’রে পড়ে গেল, কিন্তু সে টেনে ঠিক করল না। সে যেন এক গভীর চিন্তায় মগ্ন। হরকিষণ বহুদিন পর আকণ্ঠ পান করতে লাগল লছমিয়ার রূপ। তার গলার ডানদিকের উল্কিটা এখনও রয়েছে। সেবার চাঁচরের মেলায় লছমিয়াকে বাইকে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল হরকিষণ। মেলাতেই এক বেদেনীকে দিয়ে নিজের গলায় উল্কি করিয়েছিল সে। তারপরেই বৃষ্টি এসেছিল। তারা ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরেছিল। তখনও তাদের জীবনে বিরজু আসে নি। তখনও হরকিষণ ভাবতে পারে নি যে একদিন লছমিয়া তার হবে না। 

― আমি যে রুপিয়াটা নিয়েছি কেউ যাতে জানতে না পারে। বিরজু যেন জানতে না পারে। আমি হাতজোড় করছি― কেঁপে গেল লছমিয়ার দৃপ্ত কন্ঠস্বর। 

হরকিষণ তাকিয়ে রইল লছমিয়ার দিকে। ঔদ্ধত‍্য থেকে মিনতিতে নেমে এল লছমিয়া! 

― আমি এখনও বুঝতে পারছি না যে তোমার দরকারটা কীসের? 

― মোবাইল কিনব গৌরীর জন‍্য।

― গৌরী? কে গৌরী? 

― আমার মেয়ে।

― তোমার মেয়ে আছে? 

― চোদ্দো বছর বয়স। ছেলেও আছে, কানহাইয়া। সাত বছর বয়স। 

হরকিষণ অবাক হয়। এত বছর কেটে গেল! সে রাগে, অপমানে লছমিয়ার কোনও খোঁজও নেয় নি। তবু এই তথ‍্যগুলো জানতে পেরে তার ভাল লাগে। সে জিজ্ঞেস করে, 

― হঠাৎ মোবাইল কেন লাগবে?

― এই যে চিনা রোগটার জন‍্য সব স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ইস্কুলে এখন সব মোবাইলে পড়াচ্ছে। আমি অতসব বুঝি না, কিন্তু এটা বুঝেছি যে মোবাইল না থাকলে হবে না। কানেকশন ভি লাগবে। পড়ায় গৌরীর মাথা আছে। ও পড়াশোনা করতে চায়। কিন্তু মোবাইল কেনার পয়সা আমার নেই। তাই টাকা লাগবে। এ গ্ৰামে কার কাছে হাত পাতব? তুমি ছাড়া!

‘তুমি ছাড়া’― এ দুটো শব্দ যেন ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল হরকিষণের কানে। তার শরীর কে যেন জল ঢেলে ঠাণ্ডা করে দিল। তার এতদিনের আক্রোশে কে যেন চুন-হলুদ লাগিয়ে দিল। সে গলা ঝেড়ে বলল, 

―কেন, তোমার বাবুজি? তিনি তো এখনও―

―মরে গেলেও দেবেন না। একসময়ে তাঁর আদর পেয়েছি, আজ তাঁর নফরৎ। 

সিগারেট ধরাল হরকিষণ। আড়চোখে দেখল লছমিয়ার দিকে। বাইরে বৃষ্টি নামল। মেঘের মৃদু গর্জন ছড়িয়ে গেল অকিলপুরের আকাশে। 

―তুমি আমার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছ, এটা বিরজুকে না জানানোর কী আছে? 

―জানানো যাবে না। তকলিফ আছে। 

―কী তকলিফ? 

―আমাদের ঘরে একটা গাই আছে। ওর নাম খুশি। শোনপুরের মেলা থেকে পাঁচবছর আগে নিয়ে এসেছিলাম। তখন সে ছোট্ট বাছুর। সে আর কানহাইয়া একেবারে একরকম ছিল। দুটোই বাচ্চা। বিরজু মজা করে বলত, লছমিয়ার জুড়োয়া হয়েছে। একটা লড়কা একটা গাই। খুশিকে আমি কত যত্নে বড় করেছি। একদম মেয়ের মতো। গতমাসে খুশি একটা বাছুর দিয়েছে। সারাক্ষণ খুশির গায়ে গায়ে থাকে। ওর নাম দিয়েছি পোপটলাল। বিরজু বলে, পোপটলাল নাকি আমার নাতি! আমি ওর দাদি। কানহাইয়া ওর সঙ্গে ছোটাছুটি করে। আমার বুক ভ’রে যায়। কিন্তু বিরজু এখন বলছে, খুশিকে বেচে দিয়ে মোবাইলের টাকা জোগাড় করবে। কিন্তু বাছুরের কাছ থেকে গাই নিয়ে গেলে, বাছুর কেমন কাঁদে, তা তো আমরা জানি। তোমার মনে আছে?

হরকিষণ চুপ করে রইল। লছমিয়া বলল, তোমার পিহুরানির কথা মনে আছে?

মাথা নাড়ল হরকিষণ। মনে আছে তার। সব মনে আছে। কৈশোরের সেই স্মৃতি সে কী করে ভুলবে? তাদের গোয়ালের গরু পিহুরানি। তার দুধের দই ছিল যেন অমৃত। সে নিজে পিহুরানির পিঠে চেপে খেলা করত। তখন লছমিয়া বালিকামাত্র—অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত তার দিকে! সেই পিহুরানির একটা বাছুর হল। তার নাম দেওয়া হল, গঙ্গারানি। কিন্তু গঙ্গারানির যখন মাত্র তিন মাস বয়স, ঠিক সেবার তুমুল তুফান এল গাঁয়ে। একরাতে গোয়ালের একদিকের দেওয়াল ভেঙে পড়ল। পিহুরানি মারা গেল। এরপর সাতদিন ধরে তার মাকে খুঁজে খুঁজে ডেকে বেড়িয়েছিল গঙ্গারানি। ডাকের মধ্যে সে কী বুকফাটা কান্না তার! সে তো কথা বলতে পারে না। ঠিকমতো কাঁদতেও পারে না। শুধু ডেকে বেড়াতে পারে! কোথায় গেল তার মা? একদিন মাঝরাতে তার কান্না সহ্য করতে না পেরে হরকিষণের মা নেমে এসেছিলেন গোয়াল ঘরে। সারারাত গঙ্গারানিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন। তার গায়ে হাত বুলিয়েছিলেন। সব মনে আছে হরকিষণের। শৈশবের কথা মনে পড়লে মানুষের বুকের ভেতরে সরোবর জন্মায়, তাতে পদ্ম ফোটে, তাতে ভ্রমর আসে; জীবন সুর হয়। 

লছমিয়া বলল, গত চারদিন ধরে আমাদের বহুত অনবন হচ্ছে। আমি বেচতে দেব না, আর ও বেচবেই। আমায় যে করে হোক খুশিকে বাঁচাতে হবে। আমি যদি সচ্‌ মে ওর মা হই, তাহলে এ তো হতে দিতে পারি না। আমার কাছে গৌরী-খুশি-কানহাইয়া এক। কোনও ফরক নেই। পোপটলাল একটা মোবাইলের জন্যে তার মায়ের থেকে অলগ হয়ে যাবে? আমরা কি ইনসান? আমরা কি… আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে ডুকরে উঠল লছমিয়া। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে নিজেকে সংযত করল। হরকিষণ বলল, 

― বিরজুকে কী বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছ? 

― বলেছি, সরিতা সহেলীর ঘরে যাচ্ছি। দৌলতপুরে একমাত্র ওর কাছে আমি দু’একবার যাই। কিন্তু সরিতার বর ট্রাক চালায়। সে এত টাকা পাবে কোথায়? আর তাছাড়া… আমাদের এমন কীই বা আছে, যার জন‍্যে কেউ এত টাকা দেবে? 

― কুছু নেই? অবাক হল হরকিষণ― সোনার গয়না? দুল? চুড়িয়া? নথনি? টিকলি? পায়েল? 

― তাহলে গৌরীকে শাদির সময় কী দেব? ওর দহেজের রুপিয়া পাব কোথায়? 

দুম করে মাথা গরম হয়ে গেল হরকিষণের― ও, তাহলে এই মতলব! তাই সে হরকিষণের কাছে এসেছে! তাই সে কানে মধু ঢেলেছে, বলেছে― এই গ্ৰামে কে আছে তুমি ছাড়া! তাই এত নাটক! এত ন‍্যাকামি। লছমিয়া এখন এতদূর নেমে গেল? ফোকটে টাকা আদায় করবে ব’লে নাকিকান্না কাঁদতে এসেছে। লছমিয়া খুব ভাল করে তার মুগ্ধতার কথা জানে, আর সেটাতেই সুড়সুড়ি দিচ্ছে হারামজাদি। হরকিষণ খানিকটা কর্কশ গলায় বলে উঠল, 

― আরে সোনাদানা কুছু নেই যখন, কেন এসেছ আমার কাছে? কী ভেবেছিলে, এতদিন পরে তোমার চোখের জল দেখে তোমায় কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে দেব? আজ থেকে পনেরো বছর আগে আমার চোখের জল দেখে তোমার কিচ্ছু যায় আসেনি। আমি যে রাতগুলোয় নিঁদের দাওয়াই খেয়ে ঘুমিয়েছি, সেইসব রাতগুলো তুমি বিরজুকে দিয়েছ! এতবছর দরকার লাগেনি, আজ লেগেছে, তাই এসেছ! তোমার লড়কি, তোমার গাই, তোমার ঘর― তুমি বোঝো! আমি এক রুপিয়াভি দেব না। তুমি যেতে পার। 

হরকিষণের এইরকম উচ্চকিত কর্কশ ব‍্যবহারে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল লছমিয়া। তার চোখের কোণা থেকে জলের বিন্দু মুছে ফেলল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে আহত বাঘিনীর মতো তীব্র দৃষ্টিতে হরকিষণের দিকে তাকিয়ে বলল, 

―আমি কিন্তু তোমার কাছে ভিখ মাংতে আসি নি। 

―আরে, বোলো পবনপুত্র কী জয়! কী দেমাক রে বাবুয়া! খাবার বর্তন নেই, তবু ভিখিরির ঘমণ্ড্‌ যায় না। ভিক্ষেই করছ অথচ বলছ ভিখ মাংতে আসোনি? কী আছে তোমার? জমি বেচলে তো খেতেও পাবে না আর। না খেয়ে মরবে। বড় বড় কথা খালি! কী দেবে তুমি? কী দিতে পার? 

― আমার শরীরটা, শান্ত গলায় বলল লছমিয়া

চমকে উঠল হরকিষণ। এ কী শুনল সে? সে তাকিয়ে রইল লছমিয়ার দিকে। লছমিয়ার মুখে অদ্ভুত এক হাসি, যেন ভাঙা কুঁড়ে ঘরে জ্বলে ওঠা প্রদীপ; যেন পোড়োবাড়িতে উছলে ওঠা হ‍্যারিকেনের আলো; যেন অন্ধকার গোয়ালঘরে কেঁপে ওঠা সাঁঝবাতি। গলায় বিষণ্ণ কৌতুক এনে সে বলল, 

―দাদি হয়েছি, নাতির জন‍্য এটুকু করব না? আমার শরীরের জন‍্য কুড়ি হাজার। খুব বেশি বলা হল? 

হরকিষণের সমস্ত চেতনা অবশ হয়ে আসতে লাগল। তার দু’চোখে হু-হু করে নেমে আসতে লাগল সারাজীবনের ঘুম। তার মনে হল, তার চোখের জলের রাতগুলো মাথা থেকে ক্রমশ উবে যাচ্ছে। তার হাল্কা লাগছে। ভীষণ হাল্কা। কোথাও গিয়ে যেন জীবনের প্রত‍্যেকটি জটিল অঙ্ক মিলে যাচ্ছে। এতদিন পর। সে লছমিয়ার দিকে আবার তাকাল। কানায় কানায় ভরে ওঠা এই শরীর আজও তার স্বপ্ন, তার কামনা, তার অশ্রু। হরকিষণ অনুভব করল, তার শরীর ফেটে বেরতে চাইতে তার অবরুদ্ধ সমস্ত নখ, সমস্ত পদ্ম, সমস্ত ধাতু। রাত্রি, নারী আর বৃষ্টি― এক বিন্দুতে এসে মিশেছে। এই বৃষ্টির রাতে আজ তার পরিপূর্ণতার উৎসব, তার প্রাপ্তির উৎসব, তার অপেক্ষা-শেষের উৎসব। 

একটি অন্ধকার ঘরে সেজের বাতি জ্বলছে। সেগুন কাঠের নক্সা-করা-ছত্রী ধরে দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন লছমিয়া। তার ঘন চুলে ঢেকেছে তার অনাবৃত তামাটে কাঁধ। তার শঙ্খের চেয়ে সুন্দর স্তনের চারপাশে মধুবনী উল্কি; হিঙ্গলপুরার লীলা তালাও-এর চেয়েও গভীর তার নাভির নিচে তীরচিহ্ন আঁকা; তার পিঠ শেরপুরা গ্রামের গেঁহুর খেতের চেয়েও ভরা, তার কোমরের বাঁকে থমকে আছে পৃথিবীর সমস্ত নদী। লছমিয়া তাকে ইশারায় ডাকল। কত রাত সে এই ডাকের জন্য অপেক্ষা করেছে, কত রাত সে এই ডাক পাবে না জেনে অন্য নারীদের ছিঁড়ে খেয়েছে, কত রাত সে এই রাতের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আজ এসেছে, সেই রাত— সেই জ্যোৎস্নামাখা কুসুম তলোয়ার। হরকিষণ লছমিয়াকে পাগলের মতো আদর করতে লাগল; নিংড়ে নিতে লাগল। যেভাবে কল নিংড়ে নেয় আখ; যেভাবে মানুষ নিংড়ে নেয় কাপড়; যেভাবে সময় নিংড়ে নেয় জীবন। হরকিষণের শরীরের ভেতরে বহুজন্ম বন্দি হয়ে থাকা কোনও আদিম ক্ষুধার্ত বিদ্যুৎ যেন মুক্তি পেল। সে বিদ্যুৎ যেন তার শিরায় উপশিরায় কোষে কণিকায় গেয়ে বেড়াতে লাগল স্বাধীনতার গান। সে গান যেন পাখি, সে গান যেন নক্ষত্র, সে গান যেন বাতাসে দুলতে থাকা তামাটে গেঁহুর শিস! 

হরকিষণের সর্বশরীর ঘেমে উঠল। সে লছমিয়ার দিকে তাকাল। লছমিয়ার চোখ একটা উত্তরের জন্য উদগ্রীব। গাঢ় কল্পনার জগৎ থেকে পরিতৃপ্ত শরীরে নেমে এসে হরকিষণ অকস্মাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ধনিয়া! ধনিয়া এসে সেলাম ঠুকে বলল, জী হজুর! হরকিষণ বলল, মুহুরীবাবুর কাছ থেকে পঁচ্চিশ হাজার রুপিয়া নিয়ে আয়। বাত্তি নিয়ে ভাভিজিকে ছোট শোলহাপুরের মাঠ পার করে দিয়ে আসবি। ধনিয়া সেলাম করে বেরিয়ে গেল। 

আর কোনও বাক্যব্যয় না করে, হরকিষণ ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল—লছমিয়া বলে উঠল, আমি কিন্তু ভিখ্‌ নেব না। হরকিষণ দাঁড়িয়ে গেল। পেছনে ফিরে গোঁফ মুচড়ে কৌতুকময় অথচ শান্ত চোখে বলল, এটা ভিখ্‌ নয়, এই রুপিয়াটা উধার দিচ্ছি। আর পাঁচ হাজার আমার তরফ থেকে গৌরী, কানহাইয়া আর পোপটলালের জন্যে। তবে, এই বিশ হাজার রুপিয়া পরে সুদে আসলে ফেরত নেব। পাব তো? 

শরীরের পালকের ভেতর থেকে একটা তিমিরবিনাশী হাসি উঠে এল লছমিয়ার ঠোঁটে। তার রূপ গ্রহণলাগা চাঁদের মতো রহস‍্যময়, জটিল ও অস্পষ্ট। চোখের কোণা থেকে চলকে পড়া জল মুছে সে অস্ফুটে বলল, পাবে।

রাত্রি কখন গান হয়, হরকিষণ জানত না; এখন জানে। সে জানে, কত কিছু না হয়ে, কত কিছু হয়! এমনই বর্ষার রাতে আলের ওপর সাপ আর ব‍্যাঙ মখোমুখি হলেও, সাপ ব‍্যাঙ ধরে না। মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে যে যার ঘরে রহস্যময় বন্ধুত্ব নিয়ে চলে যায়। রাত্রি কি বোঝে এত কথা? রাত্রি কি মানুষ? 

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo golpo

সৌমেন চট্টোপাধ্যায়

গ ল্প

সৌ মে ন   চ ট্টো পা ধ্যা য়

প্রতিশ্রুতি

এক

পিচের রাস্তাটা কারখানার গেট ছুঁয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে চলে গেছে। জায়গাটার একটা নাম আছে। কিন্তু সেটা কাগজে কলমে। লোকের মুখে মুখে মিলগেট নামটাই বেশি প্রচলিত। রাস্তাটা বাঁ দিক ঘুরে মাঠটাকে মাঝ বরাবর চিরে বেরিয়ে গেছে দূরে হাইওয়ের দিকে। রাস্তাটাকে বাঁ হাতে রেখে একটু এগিয়ে গেলেই নদীর চড়া। নদীর উল্টোদিকের গ্রামগুলো থেকে সকাল হলেই দল বেঁধে কাজ করতে আসত সবাই। শুকনো প্রায় মরে যাওয়া নদীটা হেঁটেই পেরিয়ে আসত সারা বছর। বর্ষার সময়েও এমন কিছু জল হত না। নৌকায় সাইকেলসহ চেপে পার হওয়া যায়। নদীতে বাঁধ বলে যা ছিল তাও নেই। বালির লরি নদীর বাঁধ ও পিচের রাস্তার সবটুকু খেয়ে নিয়েছে।        

কারখানার উত্তর দিকে যেখানে নদীতে নেমে যাওয়ার রাস্তাটা শুরু হয়েছে তার মুখে একটা অস্থায়ী ত্রিপলের ছাউনি। ছাউনির এক কোণে বাঁশের ওপরে একটা ছোট্ট বোর্ডে লেখা “আজ অবস্থান বিক্ষোভের ১৭২তম দিন”। ছাউনির ভিতরে বাঁ দিকে একটা খাতা নিয়ে বসে আছে কাজল। মুখটা গম্ভীর। যারা যারা এসেছে তাদের প্রত্যেকের সই হয়ে গেছে। কিন্তু বাপি এখনও আসেনি। ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছে কাজল। কারখানা তারা কিছুতেই খুলতে দেবে না। তাদের চারটে দাবির অন্তত তিনটে মানতেই হবে মালিক পক্ষকে। বাপি যখন আছে তখন ভরসাও আছে। বাপির কামড় একেবার কচ্ছপের কামড়। একটা ছোট্ট অবস্থান বিক্ষোভকে আজ এমন জায়গায় এনেছে যে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে মালিক পক্ষ। বাপি আর কাজলকে সাসপেন্ড করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই বিক্ষোভের আগুনে ঘি পড়েছিল। দলে দলে শ্রমিকরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শাসক ও বিরোধী দু’পক্ষের নেতারাই আন্দোলন থেকে ফায়দা নিতে ছুটে এসেছিল, কিন্তু বাপি একা হাতে লড়েছে। আন্দোলনের রাশ কাউকে ছাড়েনি। কাজলরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু বাপির হলটা কী! কালকেও আসেনি। আজকেও সারাদিনটা পেরিয়ে গেল এল না। শরীর খারাপ নয় তো? সন্ধের দিকে একবার দেখা করা দরকার। বাড়িতেই যাবে কাজল। ছাউনি থেকে নদীটা স্পষ্ট দেখা যায়। একেবারে ওই পাড় পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সূর্য পশ্চিমে হেলে গেছে। আর একটু পরেই কারখানায় ছুটি হয়। ছুটির সময়টা বেশ দেখার মতো। তিনশো শ্রমিক দল বেঁধে বেরিয়ে আসত। কারখানার গেট থেকে পিচের রাস্তা ছুঁয়ে উত্তর মুখে নদীর মধ্যে সবাই নেমে পড়ত। সূর্যাস্তের মুখে লাল আলোয় নদীর ঐ সামান্য জলটুকুও একেবার আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে থাকে। হাত মুখ ধুয়ে একে একে সবাই যে যার বাড়ির দিকে হাঁটা দিত, আবার কেউ কেউ সাইকেল নিয়ে পিচের রাস্তা ধরে দু’পাশের মাঠের ভিতর দিয়ে চলে যেত। বাপি আর কাজল আরও কিছুক্ষণ থাকত। সামনের চায়ের দোকানে এসে বসত দু’জনেই। নদী পেরোলেই বাপির বাড়ি। কাজলের বাড়ি কারখানার পাশেই। ফলে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল না কারোর। সারাদিনের কাজের পর গল্প করতে করতে সাতটা বেজে গেলে তবে উঠত। হাতের টর্চটা জ্বেলে নদীর ভিতরে নেমে যেত বাপি। কারখানার গেটের মুখে চায়ের দোকানটা দীর্ঘদিন বন্ধ। কাজল ছাউনির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে একবার দাঁড়াল। কারখানাটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটতে লাগল।

দুই

“এটা কী বলছ তুমি? না, আমি এই কাজ কিছুতেই করতে পারব না।”

উঠোনের এক কোণে একটা মাদুরের ওপর বসে কাজল মাথা ঝুঁকিয়ে তার অসম্মতি জানাল। 

“কাজল, দেখ এছাড়া আর পথ নেই। এতগুলো দিন কারখানা বন্ধ। কারোর কাজ নেই। হাতে টাকা নেই। ভিতরে ভিতরে সবাই ভেঙে পড়েছে। আমি জানি এখুনি কারখানা খুলে গেলে কাজে যোগ দিতে চাইবে অনেকেই।”

“বাপিদা, তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না, কেউ কাজে যোগ দেবে না। কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে আমিও দেখব। তুমি কাল চলো তো।”

“কাজল, জেদ করিস না, আমার কথা শোন। এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না।”

“আলবাৎ চলবে। বাপি আর কাজল থাকতে কারখানার চিমনি দিয়ে কেমন ধোঁয়া বের হয় দেখব। মালিকের পোঁদ দিয়ে ধোঁয়া বের করে ছেড়ে দেব। শালা ঢ্যামনা।”

“কাজল, আমার কথা শোন, কারখানা খোলা দরকার রে। আমি আর তাকাতে পারছি না ওদের মুখের দিকে।”

“কী ব্যাপার বলো তো বাপিদা? মাল খেয়েছ নাকি? কতোতে রফা করলে মাইরি? আমাকেও ভাগ দাও, সরে যাব।”

“কাজল!”

বাপি উঠে দাঁড়াল। কাজলের কথাগুলো গরম সীসের মতো তার কানে ঢুকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। মুখটা রাগে অপমানে কালো হয়ে গেছে। 

“আমার সঙ্গে আয়।”

কাজলকে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে নদীর একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।

“দেখ, সারারাত ওই পাড়ে লাল আলোটা জ্বলত। আজ কতদিন ঐ আলোটা বন্ধ হয়ে আছে ভেবে দেখ। কারখানা থেকে ফিরে ঐ লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেছি। কিন্তু আজ কী অবস্থা ভাব। কী লাভ অবস্থান বিক্ষোভের যদি কারখানাটাই না থাকে। মালিকের কী আর যাবে আসবে। একটা কারখানা বন্ধ হলে কিছুই হবে না ওদের।”

“কী বলতে চাইছ তুমি? মালিকের মর্জি মাফিক আমাদের চলতে হবে? তোমাকে আমাকে সাসপেন্ড করে দেবে, কোনও কারণ ছাড়াই আর সেটা মেনে নিতে হবে?”

“তোর সাসপেনশন তুলে নেবে, তুই শুধু আমার কথা শোন। তোরা একটা মিটিং কর। আমাকে সেক্রেটারি পদ থেকে সরিয়ে দে। তুই সেক্রেটারি হয়ে মালিকের সঙ্গে আলোচনায় বস। আমি খবর নিয়েছি আগামী বুধবার ম্যানেজমেন্টের লোকজন আসবে কারখানা ভিজিটে। মালিক নিজেও হয়তো আসতে পারে। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায় ওরা। কিছু দাবি মানতেও পারে বলেই শুনেছি। তোরা এই সু্যোগটা হারাস না কাজল।”

“ম্যানেজমেন্টের লোক আসছে তো তুমিই কথা বলছ না কেন। তুমি তো আমাদের থেকে ভাল বলতে পারবে।”

কাজলের কথাগুলো শুনে বাপি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাত প্রায় দশটা। কাজলকে এই নদীর পথেই ফিরতে হবে। আর আটকে রাখা ঠিক হবে না।

“তুই আজ এখানেই থেকে যেতে পারিস। আর যদি বাড়ি যেতে চাস তাহলে বেরিয়ে পড়। আর দেরি করিস না। রাত হচ্ছে।”

“আমার প্রশ্নের উত্তরটা দাও বাপিদা। তুমি নিজেই কেন মালিকের সঙ্গে আলোচনায় বসে আন্দোলন তুলে নিচ্ছ না?”

“বাঘের পিঠে বসে পড়েছি রে কাজল। নামলেও মরব। চেপে থাকলেও মরব। তোর কী মনে হয় আমি মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে এই আন্দোলন তুলে নিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? একটু আগে তুই কী বললি, কত টাকায় রফা হয়েছে? কাল সবাই বলবে। আর এই সুযোগটাই নেবে মালিক পক্ষ। আমার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ক্ষোভ উসকে দিয়ে একটা ফুটো কড়িও না ঠেকিয়ে তোদেরকে বাধ্য করবে কাজে যোগ দিতে আর না হলে কারখানা বন্ধ করে চলে যাবে।”

“কিন্তু তোমার কী হবে?”

“আমার কথা ভাবিস না কাজল। তোরা এখন সংসারের কথা ভাব। ছেলেমেয়ে বউ-এর কথা ভাব। অসুস্থ বাবা-মায়ের কথা ভাব। আমি পিছিয়ে আসতে পারি না। কিন্তু তোদের জন্য পথ খোলা আছে, নেমে পড় সবাই। তোদের কিছুটা দাবি মিটে যাবে, কারখানাও খুলবে।” 

একটানা কথাগুলো বলে বাপি থামল। দূরে নদীর বুকের ওপর যেন একখানা ধারালো ছুরি কেউ রেখে গেছে। অল্প আলোতেও চকচক করছে। বাপি স্পষ্ট দেখল ছুরিটা ক্রমশ চেপে বসছে তার গলায়। একটাও কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। কাজল নেমে গেল নদীর মধ্যে। অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে ছুরির দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশ ফিরল। কাজল শিখে গেছে ছুরির ধার এড়িয়ে কীভাবে রাস্তা করে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। বাপির মুখে একটুখানি হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।

তিন

গোলমালটা কারখানার গেট থেকে ক্রমশ ভিতরে ছড়িয়ে পড়ল।

ম্যানেজারের অফিসটা ভেঙে তছনছ করে দিল একটা দল। আর একটা দল সোজা ঢুকে গেল মেশিন ঘরের মধ্যে।

“শালা গদ্দার! আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি! এখন আমাদের এসেছে বোঝাতে।”

কন্ট্রোল রুমের কাছে এসে কারখানার মালিক সব্যসাচী বসাককে দেখে ভিড়টা থমকে গেল। 

“আপনারা প্লিজ সবাই শান্ত হন। আপনাদের সব দাবি তো মেনে নেওয়া হবে বলেছি। এর পরেও যদি কিছু দাবি থাকে তাহলে বলতে পারেন, কিন্তু ভাঙচুর করবেন না প্লিজ।”

পোড় খাওয়া ব্যবসাদার সব্যসাচী বসাক। দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা চালিয়ে আজ এই জায়গায় এসে পৌঁছেছেন। এত দিনের অভিজ্ঞতায় এই প্রথম তিনি এমন আন্দোলন দেখলেন। রাজনৈতিক ইন্ধন ছাড়াও একটা আন্দোলন যে এতদিন চলতে পারে তা তিনি নিজে না দেখলে জানতেও পারতেন না। কারখানা বন্ধে তাঁর বিপুল ক্ষতি হচ্ছে বুঝতে পেরেই তিনি ম্যানেজমেন্ট ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন। এর আগেও অনেকবার আলোচনা ভেস্তে গেছে। কিন্তু এইবার কাজল নিজে উদ্যোগ নেওয়াতে তিনি নিজেই এসেছেন। বিষবৃক্ষের ঝাড়কে তুলেই ছাড়বেন। কাজলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরে চারটে দাবির তিনটে দাবি মানলেও আর একটা দাবি তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। কোনও কারখানা মালিকের পক্ষেই এমন অদ্ভুত দাবি মানা সম্ভব নয়। তিনি কী করে মানবেন! শ্রমিক কো-অপারেটিভকে কারখানার পার্টনার করার মতো দাবি মানা কখনও সম্ভব নয়। শ্রমিকরাই কারখানার মালিক হতে চাইছে এ কেমন দাবি! তবে তিনি বাকি তিনটি দাবি মেনে নেওয়ার শর্ত হিসেবে বাপিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার শর্ত রেখেছিলেন। কারখানার ভিতরে এমন নেতা কারখানার মালিকের জন্য বিপজ্জনক। কাজলকে বাপি এই আশঙ্কার কথা আগেই বলে দিয়েছিল। ফলে কাজল খুব একটা অবাক হয়নি। কিন্তু কিছুতেই বাপিদার নামে বাকি শ্রমিকদের কাছে সে মিথ্যে বলতে পারবে না। আন্দোলনের নাম করে বাপিদা মালিকের কাছে মোটা টাকা খেয়ে ভিতরে ভিতরে আখের গুছিয়ে নিয়েছে এ কথা সে কী করে বলবে!

“কাজল, এই বিষয়টা আমার ওপর ছেড়ে দাও, আমি দেখছি কী করা যায়।” সব্যসাচী বসাক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে বললেন, “কিন্তু বাপি না থাকলেও তুমি তো আছ কাজল? তোমার সঙ্গে কী করা যায় বলো তো?”

সব্যসাচী বসাকের মুখের দিকে তাকিয়ে কাজল ধরতে পারল না সে ঠিক কী চাইছে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজল এখনও বুঝতে পারল না তার এখন কী করা উচিত। সব্যসাচীবাবু কি সত্যিই সব দাবি মেনে নেবেন? 

“আমরা মুখের কথায় বিশ্বাস করি না। আপনি এখুনি লিখিত নির্দেশ দিন যে আমাদের সব দাবি মানা হল। তবেই কাজে যোগ দেব, না হলে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না। আমাদের সব দাবি না মেটা পর্যন্ত আমরা কাজে যোগ দেব না।” ভিড়ের ভিতর থেকে একটা একটা মুখ থেকে কথাগুলো যত ছড়িয়ে পড়তে লাগল, মনে মনে ততই খুশি হলেন সব্যসাচী বসাক। ধীরে ধীরে মুখের হাসিটা চওড়া হল।

”শুনুন, আপনাদের চারটে দাবির মধ্যে আমরা তিনটে দাবি আগেই মেনে নিয়েছি। আর একটা দাবি মানার কথাও ভাবছি তবে…” বলতে বলতে একবার চারিদিকে তাকালেন সব্যসাচীবাবু, কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, “শ্রমিক কো-অপারেটিভের নামে কারখানার শেয়ার দেওয়া এখুনি সম্ভব নয়।”

ভিড়টার দিকে একবার তাকাল কাজল। কিন্তু চারপাশটা ভাল করে তাকিয়েও বাপিদাকে কোথাও দেখতে পেল না। ঘাড়ের কাছটা ঘামে একেবারে ভিজে গেছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর একটু সামনের দিকে এগিয়ে এসে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলতে শুরু করল, “বন্ধুগণ, আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানাই। আজ আমাদের প্রায় সমস্ত দাবিই মেনে নিতে চলেছেন মালিক পক্ষ। সুতরাং আসুন, আমরাও মালিক পক্ষকে আশ্বাস দিই যে আগামীকাল কারখানা খুললে আমরা সবাই কাজে যোগ দেব।”

ভিড়টা নড়ল না একটুও। কাজল আশা করেছিল সবাই খুশিতে হাততালি দেবে। আনন্দে ফেটে পড়বে। কিন্তু কিছুই হল না। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, “মালিক পক্ষ আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছেন। পুজোয় বাহান্ন দিনের বোনাস, ওভারটাইমের পেমেন্ট বাড়ানো ও সবেতন দশটি মেডিকেল লীভ আমাদের দেওয়া হবে। কী খুশি তো?”

“বাপিদা আর তুমি কতোতে খুশি হয়েছ কাজলদা?”

ভিড়ের ভিতর থেকে তীক্ষ্ণ গলাটা তিরের ফলার মতো এসে কাজলের গলায় বিঁধল।

একটা গুঞ্জন উঠল। তারপর ধীরে ধীরে ভিড়টা সামনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। কাজল কিছু বলতে যাওয়ার আগেই একটা পাথর এসে কপালটা কেটে বেরিয়ে গেল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না কাজল।

সব্যসাচী চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন। ওষুধে কাজ হয়েছে। এবার শুধু ঘা’টা খুঁচিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা। এই দুই বিষবৃক্ষের চারাকে এরাই উপড়ে ফেলে দেবে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মাথাগুলো পাশাপাশি গাছের মত দাঁড়িয়ে আছে। অবিচল কিন্তু সিদ্ধান্তহীন। বাপি-কাজল ছাড়া এদের কোনও অস্তিত্ব নেই তা আগেই বুঝে নিয়েছেন। 

“বাপি কাজলের জন্যই এখন এই দাবি আমাদের মানা সম্ভব নয়। না হলে শ্রমিক কো-অপারেটিভের নামে শেয়ার দিতে আমি নিজেই ইচ্ছুক।”

সব্যসাচীবাবু ভালই জানেন সাধারণ শ্রমিকদের এত শেয়ার, কো-অপারেটিভ, পার্টনারশিপ ইত্যাদি বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। তাঁর কথাটা ভিড়ের মধ্যে আবার মিশে গেল।

“আমরা চাই আপনারা আগামীকাল থেকেই কাজে যোগ দিন…”

“আমরা কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমাদের একটা কথা বলুন, বাপি-কাজল এই কারখানায় কাজ করবে কিনা?” ভিড়ের ভিতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

সব্যসাচীবাবু থামলেন। প্রশ্নের উদ্দেশ্যটা বুঝে নিতে চাইলেন। এরা বাপি-কাজলকে চাইছে নাকি চাইছে না ভাল করে বোঝা দরকার।

“আপনারাই বলুন বাপি-কাজলের সঙ্গে কী করা উচিত। আজ দীর্ঘদিন ধরে আপনাদের কাজে যোগ দিতে বাধা দিয়ে আপনাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিয়মিত টাকা নিয়েছে ম্যনেজারের কাছ থেকে। আমি সব খবর পেয়েই আপনাদের দাবি মেনে নিয়ে কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য ছুটে এসেছি। আপনারাই বলুন ওদের কাজে রাখা কি ঠিক হবে?”

গুঞ্জনটা মুহূর্তের মধ্যে চিৎকারে পরিণত হল। কাজলকে ভিড়ের ভিতর থেকে ঠেলতে ঠেলতে টেনে নিয়ে গিয়ে গেটের বাইরে বের করে দিল একটা দল। বাপি-কাজল মুর্দাবাদ আওয়াজটা তখন রাস্তা ছাড়িয়ে নদীর ভিতরে প্রবেশ করেছে। ধীরে ধীরে শ্রমিকদের দলটা পাতলা হয়ে মুছে গেল বিকেলের আলোয়।

চার

নদীর জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে দুটো ছায়ামূর্তি পাশাপাশি বসে। কারখানার আবছা চিমনিটার ওপর লালচে আলো এসে পড়েছে। আর একটু পরে সূর্য ডুবে গেলেই দিগন্ত বিস্তৃত অন্ধকারের মধ্যে বিরাট কারখানাটা ডুবে যাবে। 

“কাজল, এটা তুই কী করলি?”

“এছাড়া আর উপায় ছিল না বাপিদা। তুমি চলে গেলেও আমাকে সামনে রেখে আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যেতে চাইত। কারখানা আর কোনও দিন খুলত না। 

“আর তোর ভবিষ্যৎ? তোর সংসার?”

“তুমি ভেবেছিলে তোমার সংসারের কথা? তাহলে আমিই বা অত ভাবব কেন? আমাদের দু’জনের জন্য যদি এতগুলো সংসার বাঁচে, তাহলে ওদের ভুল ভাঙিয়ে কী লাভ! বরং এই ভাল হল। তিন তিনটে দাবি মেনে নিয়েছে বাপিদা। স্রেফ একটা মিথ্যে এতগুলো শ্রমিকের জীবন বাঁচিয়ে দিল।”

কাজল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। নদীর ওপর হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। শীত আসছে। অন্ধকারে কেউ কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ।

 “দেখো বাপিদা, কাল থেকে আবার কারখানা খুলবে। ভোরবেলা চিমনির সাদা ধোঁয়া নদীর ওপর দিয়ে সরের মতো ভাসতে ভাসতে চলে যাবে দূরে। কারখানা খোলার খবর ছড়িয়ে পড়বে সব জায়গায়। আমরা নাই বা থাকলাম। এত এত শ্রমিকের মুখে যে হাসি ফুটবে সেটাই বা কম কী। আমরা তো ওদের অধিকারের জন্যই লড়াই করেছি আর সেই লড়াইয়ে আমরাই জিতেছি।”

“কাজল, দেখ দেখ, সামনে দেখ।”

নদীর ওপরে চাপ চাপ অন্ধকার নেমে এসেছে। বাপি আর কাজল মুগ্ধ চোখে ঘন কালো চিমনির অবয়বের দিকে তাকাল। একটা তীব্র লাল আলো চিমনির গা ঘেঁষে উজ্জ্বল ভাবে জ্বলে উঠেছে। 

সব্যসাচী বসাক কথা রেখেছেন।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june golpo

মৃণালিনী

কবির কলমে  |  ছো ট  গ ল্প  ২

মৃ ণা লি নী

সিসিটিভির ফুটেজ

জানালার কাচে সাদা কুয়াশা ঢলে পড়েছে। বেড-এর পাশে পর্দা সরিয়ে অনিরুদ্ধ একবার বাইরে তাকিয়ে নিল। আকাশে থরে থরে মেঘ সাজানো। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শীতের প্রকোপ অনেকটা থাকেনা বললেই চলে। কিন্তু এসময়ে বৃষ্টি! বিছানা ছাড়বার আগেই শুরু হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সাদা কাচ বেয়ে নেমে এলো প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার। প্রকৃতির মেজাজ এখন বোঝা মুস্কিল। আবহাওয়া দপ্তরের প্রতিবেদনে হয়তো এই বৃষ্টিপাত বিনা নির্ঘন্টে ঢুকে পড়েছে।

 

চোখ কচলাতে কচলাতে ওয়াশরুমের পরিবর্তে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল অনিরুদ্ধ। হালকা ঠান্ডা ওয়েদার, তার ওপরে অসময়ে এই ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি। বৃষ্টির ছাট বেশ আরামদায়ক। হাওয়ার সঙ্গে জলের গুঁড়ো চোখেমুখে লেপ্টে থাকে। হয়তো এর জন্য অনিরুদ্ধর প্রিয় ঋতু বর্ষা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে সরু প্যাসেজের দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে অনিরুদ্ধর হঠাৎ চোখ পড়ল সিসিটিভির স্ক্রিনের দিকে। দুটো ছায়া ঝাপটে আছে না! না। ছায়া দুটো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। জীবন্ত মানুষ যেন! হ্যাঁ, মানুষই তো। অনিরুদ্ধর চোখ আটকে গেল সিসিটিভি স্ক্রিনে। বঁড়শিতে বাঁধা মাছের মতো ছায়া দুটো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। একবার দূরে সরে যাচ্ছে আবার হঠাৎ লজ্জাবতী পাতার মতো গুটিয়ে যাচ্ছে। সিসিটিভির ফুটেজ দেখতে দেখতে অনিরুদ্ধর চোখের আধমোড়া ঘুম ও বৃষ্টি হাওয়ার যৌথ সঙ্গমের দৃশ্য দেখবার ইচ্ছেটা যেন মুহূর্তে হারিয়ে গেল।

 

সিসিটিভির স্ক্রিনে পরিষ্কার করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। ছায়ার মালিকদেরও নয়। শুধু তাদের ছায়াটুকুই ধরা পড়েছে সিসিটিভির ফুটেজে। তবে ছায়ার মালিক যে দুজন যুবক যুবতীর সেটা এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে অনিরুদ্ধর কাছে। একবার তারা হাত ধরে একে অপরের থেকে একটু দূরে সরে যাচ্ছে আবার চিলের মতো ঝাপটা দিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। হয়তো চুমু খাচ্ছে। ছায়ায় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। ঝড়বৃষ্টির জন্য ল্যাম্পপোস্টের আলোও যেন নিজেকে অন্ধকারে ঢেকে নিয়েছে। এক পায়ে দাঁড়িয়ে, এক চোখে নির্লজ্জের মতো এসব দৃশ্য না দেখাই ভালো। বেশি উত্তেজিত হলে তার চোখের ফেটে পড়বার সম্ভাবনা আছে। এ ভয়েই হয়তো নিজেকে গুটিয়ে তির্যক চোখে মুখোমুখি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। হলুদ দেওয়ালের নীচে রঙচটা কালো ছোপ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আর দেখা যাচ্ছে ওই দুই যুবক যুবতীর ছায়া।

 

কয়েক বছর আগে বাড়ির চারপাশে ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। চওড়া রাস্তায় বিশাল বাড়ির মেইন গেট। এছাড়াও সরু গলিতে গেট রাখা হয়েছে। পাশেই গ্যারেজ। গ্যারেজের শেডের নীচে এক ধারে দাঁড়িয়েই দিব্যি গল্প করছে দুজন। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় গ্যারেজের সামনের চাতালে এসে পড়েছে তাদের নির্লজ্জ ছায়াছবি। হলরুমের জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট ঘরে ঢুকতেই মা দৌড়ে এসে জানালা বন্ধ করে দিতে দিতে বলল, ‘কি দেখছিস এত মনোযোগ দিয়ে? চা খাবি তো?’

 

 মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘সন্ধে গড়িয়ে গিয়েছে। আমাকে ডেকে দিলেই পারতে।’

 

মায়ের কানে অমনোযোগী অভিযোগ পৌঁছনোর আগেই মা ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছেন। রান্নাঘর থেকে বাসনের আওয়াজ ভেসে এলো। অনিরুদ্ধ সিসিটিভি থেকে চোখ সরিয়ে টিভি চালিয়ে শোফার ওপর বসে পড়ল। নিউজ চ্যানেল উল্টে পাল্টে একই খবর। তবে খবরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে লকডাউন শুরু হচ্ছে। ঘনজনবসতিপূর্ণ এই দেশে এই ভাইরাস কি পরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি করবে, অদূর ভবিষ্যৎ কী এবং ব্যক্তিগত সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির কথা ভাবতে ভাবতে বিমর্ষ মনে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল অনিরুদ্ধ।

 

দুদিন না পেরোতেই শুরু হয়ে গেল লকডাউন পিরিয়ড। সারাদিন বাড়িতে বসে, অফিসের কাজ ছাড়াও নিজের লেখালেখিতে ডুবে গেল সে। রান্নার মাসি এমনকি অতিথি বলতে কেউ ইদানীং আর বাড়িতে আসছে না। নিজের কাজের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগ হল বাড়ির নিত্য ঘরোয়া কাজ। সিসিটিভি ফুটেজেও সারাদিনে দু একটি গাড়ি অথবা দু’একটা মানুষের যাতায়াত ছাড়া আর কিছু লক্ষ্য করা গেল না। কিন্তু সন্ধের পরে গ্যারেজের সামনের ছায়াদৃশ্যের কোনো বদল ঘটল না। সারাদিনের পর সিসিটিভির ফুটেজও যেন অনিরুদ্ধর সঙ্গে হাঁপিয়ে অপেক্ষা করে থাকত এই দৃশ্যের জন্য। প্রথম দিন অনিরুদ্ধ এহেন বেহায়াপনায় বিরক্ত হলেও এখন তার বেশ ভালোই লাগে। যেহেতু ঝড়বৃষ্টি নেই তাই ছবিটাও প্রথমদিনের তুলনায় এখন অনেক পরিষ্কার। সন্ধের পর দুজন এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গল্প করে। কখনও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। স্যানিটাইজার, মাস্ক সব দূরে সরিয়ে রেখে গভীর চুম্বনে দুজন দুজনকে জড়িয়ে রাখে শীতকালীন উষ্ণতায়। অনিরুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে নিজেই নিজেকে বলল, প্রেম সব পারে। অন্তত ভালোবাসার ভাইরাস করোনা ভাইরাসের চেয়ে কম সংক্রমণাত্মক নয়।

 

মার্চ এপ্রিল পেরিয়ে মে মাস গড়িয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীন বিষণ্ণতার দীর্ঘশ্বাস ইদানীং নিউজ চ্যানেল ছাপিয়ে জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে। আমফান ঝড় বাংলার মাথার ওপর থেকে ছাদ কেড়ে নিয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকরা পশুর মতো খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পোকামাকড়ের মতো রাস্তায় শ্মশানভূমি তৈরি করে নিয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডব করোনাকে ধুয়ে মুছে শেষ করতে পারেনি। বরং নতুন নতুন জায়গায় এসে সে থাবা বসিয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে হিমশীতল করবার জন্য তার জিহ্বা যেন আরও লকলক করছে। কে জানে এই মৃত্যু মিছিলের শেষ কোথায়।

 

এত সব ঘটে যাবার পরেও সিসিটিভির স্ক্রিনে রোজ সন্ধের পর সেই একই ছায়াদৃশ্যের অবতারণা! অনিরুদ্ধ মনে মনে ঠিক করল একদিন ওদের সামনে থেকে দেখতেই হবে। ছায়া শরীরদের রক্ত মাংসের জীবন্ত রূপ না দেখলেই নয়। একটা অদম্য তাগিদ খেলা করে বেড়াতে লাগল অনিরুদ্ধর মনের ভেতর। তার দৃষ্টিতে কালো দুটো ছায়ার মধ্যে ফুটে উঠল আদম আর ইভের ছবি। চারপাশের এত ভয়াবহতার মধ্যে এই দুজন কীভাবে এতটা নিরুত্তাপ, এতটা উদাসীন? এরা যেন এক অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা অথবা অন্য এক পৃথিবী রচনার আনন্দে মশগুল। একদিকে ধ্বংস অন্যদিকে সৃষ্টি। একটা অদ্ভুত আতঙ্কে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে। যদি ধ্বংসের কালো ছায়া ওদের পৃথিবীতেও এসে পড়ে। ল্যাম্প পোস্টের হলদে আলোয় কালো দুটো ছায়া নড়েচড়ে বেড়াতে থাকে। একবার নিজেদের ভেতর গুটিয়ে দলা পাকিয়ে যায় আবার আলাদা হয়ে যায়। গাছের সরু ডালের মতো এখন তারা একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অনিরুদ্ধর মনে ভেতর একটা স্বস্তিবোধ কাজ করতে থাকে।

 

 লকডাউন কবে উঠবে ঠিক নেই। এভাবেই কাটতে থাকে অনিরুদ্ধর দিন। সারাদিন অফিসের কাজ, লেখালিখি আর সন্ধের চায়ের সঙ্গে একপাশে টিভির নিউজ আর অন্যপাশে সিসিটিভির ফুটেজে আবছা দুই যুবকযুবতী ছায়া। একদিকে আক্রান্ত, ধ্বংস ও মৃত্যু আরেকদিকে আগামীর পরিকল্পনায় প্রত্যেক মুহূর্ত একে অপরকে ছুঁয়ে উপলব্ধির পরম পবিত্র দৃশ্য। অনিরুদ্ধের মনে হল, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এরা যেন জেহাদ ঘোষণা করছে, ‘আমরা বেঁচে থাকব। পরস্পরকে জড়িয়ে বেঁচে থাকবো আবহমান।’ ‘লকডাউন ইভিনিং শো’ নামে একটা গল্প লেখাও শুরু করল সে। না, সামনে গিয়ে ছায়া শরীরদের রক্ত মাংসের শরীর আর দেখা হয়ে ওঠেনি তার।

 

রোজকার এক দৃশ্য কয়েক মাসে একরকম অভ্যেসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল অনিরুদ্ধর। কিন্তু দেখতে দেখতে রোজকার সেই দৃশ্যেও যে একটু একটু করে পরিবর্তন হচ্ছিল তা পারিপার্শ্বিকতার চাপে অনিরুদ্ধের চোখে পড়েনি। তাই তো! আগে তো সেভাবে খেয়াল করিনি ব্যাপারটা। কোথায় সেই জড়াজড়ি করে থাকা কালো দুটো ছবি… কখনও কখনও দলা পাকিয়ে যাচ্ছে আবার কখনও একটু সরে যাচ্ছে একে অপরের থেকে। দেখে মনে হচ্ছে কেমন একটা ঢিলেঢালা সোয়েটারের ভেতর দুজন একসঙ্গে ঢুকে পড়েছে। কই সেই ছায়াদের ঘন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। একটু অপেক্ষা করেই দেখা যাক না। অনিরুদ্ধ উৎসুক ভাবে তাকিয়ে থাকে সিসিটিভির স্ক্রিনের দিকে।

 

কয়েকদিন পর দেখা গেল দুটো ছায়া মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ছায়া দুটোর মধ্যে হাতের সেই ঘন বন্ধন নেই। তার দু-তিন দিন পর ছবি দু’টোর মধ্যে অনেকটা দূরত্ব লক্ষ্য করে অনিরুদ্ধের মন ছটফট করে উঠল। ওদের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়নি তো? আগামীকাল থেকে লকডাউন উঠে যাচ্ছে। হয়তো এবার দিনের আলোতে দুজন দু’জনকে মন ভরে দেখবে কোনো পার্কে বা শহরের অন্য কোনো নিরিবিলি জায়গায়, আবার আগের মতো জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে… নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে আগামীকাল থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিল অনিরুদ্ধ।

 

রাস্তায় লোকজন বের হলেও একটা থমথমে পরিবেশ। এতদিন পর সবাই বাইরে বেরিয়েছে। দমবন্ধের ছটফটানি থেকে প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে চাইছে, মাস্কের গায়ে ঝরে পড়ছে পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির দীর্ঘশ্বাস। আজ বাড়ি ফিরতে একটু রাতই হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। একেবারে ডিনার সেরে নিজের ঘরে এসে সিসিটিভিটাকে রিওয়াইন্ড করে সন্ধের দিক থেকে চালিয়ে দিল সে। কিন্তু দুটি ছায়ার জায়গায় একটি ছায়া কেন? অনিরুদ্ধর চিনতে ভুল হল না এটা ওই যুবতীটিরই ছায়া। ছেলেটি তবে কোথায় গেল? ধক করে উঠল অনিরুদ্ধর বুকের ভেতরটা। মেয়েটি অপেক্ষা করছে। অনিরুদ্ধও অপেক্ষা করছে। প্রায় এক ঘন্টা পেরিয়ে গেল। দৃশ্যের কোন পরিবর্তন হল না।

 

লক ডাউন উঠে গিয়েছে পনেরো দিনেরও বেশি হয়ে গেল। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে মেয়েটির নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষার ছবির কোন পরিবর্তন হল না। মেয়েটিকে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দেখে অনিরুদ্ধের মনও কেমন ছটফট করে উঠল। একবার তার মনে হল, একটু পিছিয়ে দিয়ে তাদের যুগ্ম ইভিনিং শো-টা দেখবে কিন্তু সময়ের সঙ্গে পুরনো ছবি মুছে গিয়েছে। মহাকালের সিসিটিভিতে তা সেভ করা থাকলেও, অনিরুদ্ধের সিসিটিভিতে তার কোনো রেকর্ড নেই। সুতরাং সেই পুরনো দৃশ্যের আশায় আর নারী মূর্তির অসম্পূর্ণতার দৃশ্য বদলের প্রতীক্ষায় নেশাগ্রস্তের মতো সে সিসিটিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল দিনের পর দিন । অথচ রোজই অনিরুদ্ধের চোখের সামনে ভেসে ওঠতে লাগল একই দৃশ্য। চারিদিকে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতাকে উপেক্ষা করে রোজই মেয়েটি এসে দাঁড়িয়ে থাকে গ্যারেজের ছাউনির নীচে। তার ছায়া কখনো একা একা নড়েচড়ে বেড়ায় গ্যারেজের চাতালে।

 

আজ সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অনিরুদ্ধের মনে পড়ল এমনই এক বৃষ্টির দিনে হঠাৎ করেই সে সিসিটিভি ফুটেজে চোখ রেখে আটকে গেছিল দুটি ছায়ার মায়াজালে। আজ সন্ধের আগেই বাড়ি ফিরে এল অনিরুদ্ধ। চারপাশে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, ল্যাম্প পোস্টের হলুদ আলোয় বৃষ্টির গুঁড়ো ঝরে পড়ছে অনবরত। আজও কি মেয়েটি এসে একা একা অপেক্ষা করে ফিরে যাবে? এমন সুন্দর বৃষ্টির দিনেও অনিরুদ্ধর মনে হল, তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। সিসিটিভি থেকে চোখ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল অনিরুদ্ধ। বিছানায় যাবে, এমন সময় হঠাৎ   মনে হল সিসিটিভির স্ক্রিনে কি যেন নড়েচড়ে উঠল। মনে হল দুটো ছায়া গ্যারেজের সামনেটায় যেন আগের মতো জড়িয়ে দলা পাকিয়ে আছে। অনিরুদ্ধ নিজেকে সামলে নিয়ে আবার শোফায় বসে পড়ল। দু’হাতে ভালো করে চোখ কচলিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল স্ক্রিন জুড়ে অন্ধকার। কারেন্ট চলে গিয়েছে। প্রচন্ড বজ্রপাতের সঙ্গে হাওয়ার ঝাপটানি আরও কিছুটা বেড়ে গেল।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june golpo

তৃষ্ণা বসাক

কবির কলমে  |  ছো ট  গ ল্প  ১

তৃ ষ্ণা   ব সা ক

লুচি কিংবা জামগাছের গল্প

লুচি

প্রথমেই মনে পড়ে লুচির কথা। লুচি, মানে লুচি বেলা।  রান্নাঘর লাগোয়া জাল দেওয়া বারান্দার অর্ধেকটা জুড়ে বাসন মাজার জায়গা, ওখানে বসে জয়াম্মা আর মায়া বাসন মাজে, আর পাশে বসে আমি লুচি বেলি, পাঁচটা দশটা নয়, চল্লিশ পঞ্চাশটা রাশি রাশি লুচি। বেলতে বেলতে আমি জামগাছের দিকে তাকাই, বুঝতে পারি অন্ধকার গাছতলায় অনেক থেঁতলানো জাম পড়ে আছে। জাম থেঁতলে মাটির সঙ্গে মিশলে যে রঙ হয়, আমার রঙ নাকি সেইরকম।

 

বাড়িতে কোন কালো লোক এলেই আমার শাশুড়ি ডেকে বলেন, ‘দেখো দেখো তোমার থেকেও কালো! কিংবা তোমার মতই কালো, কিংবা তোমার চাইতে একটু কম কালো।‘ অর্থাৎ আমি হয়ে উঠি কালোর রেফারেন্স পয়েন্ট। আমার নিরিখে ত্বকের পিগমেন্টেশন মাপা হতে থাকে আর আমি আমার পৃথিবী জোড়া কালো ভাই বোনদের ডাকি মনে মনে- এসো একটা লুচি খেয়ে যাও, আমার হাতের লুচি। ভালো ফোলে না, কখনও নিমকির মতো হয়ে যায়, তাই নিয়ে দুপুরে ঝড় ওঠে পুবের বারান্দায়। আমি তখন সেই বারান্দায় ঝোলানো শাড়ির আড়ালে লুকিয়ে গঙ্গা দেখি আর শুনি আমার লুচির অক্ষমতার কথা।

গঙ্গা

গঙ্গার পশ্চিম কূল তো বারাণসী সমতুল শুনেছি, কিন্তু এখানে বই খুলে বসলে মহা অশান্তি। সবুজ ফাঁক ফাঁক কাঠের রেলিং দেওয়া এল শেপের বিশাল বারান্দা, এল-এর দু বাহুর জোড়ে একটা জাল ঘেরা মস্ত খাঁচা। খাঁচার মধ্যে একটা বনসাই বট রাখা, তাকে ঘিরে একরাশ বদ্রি পাখির কিচিমিচি। এই খাঁচাটা আমার পড়ার অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দু যেন, আমি অদৃশ্য একটা রেখা টানি বারবার, আর বারবার ছিঁড়ে যায়। আমি কত জায়গায় যে বই খুলে বসি কিংবা ডায়েরি খুলে। কিছু পড়ার চেষ্টা করি বা লেখার। আর বারবার গঙ্গার দিকে চাই। গঙ্গা যেন রুপোলি কালি ভরা একটা মস্ত দোয়াত। আমি আমার পেনটা ওই দোয়াতে চুবিয়ে নিলেই যেন জাদু অক্ষর লিখতে পারব। পারি না। জলের দাগ যেমন ফোটে না, ফুটলেও মিলিয়ে যায় নিমেষে, তেমনি।

পুণ্য

পুণ্য অনেকদূর থেকে আসে, ওর বাগান করার ডিউটি। ও ভালো ভালো আলু বীজ আনবে আর কত্তা ভাবেন সেই আলু বেচে ওঁর বাজার খরচ উঠবে। বড় মেয়ের বিয়েও তিনি এখানে থাকতে থাকতেই দিয়ে যেতে চান, কারণ এখানে ডেকরেটরের খরচা নেই, ভালো গিফট পাওয়া যাবে। আমার রবীন্দ্রনাথকে মনে না পড়ে পারে না। তিনি দেবেন ঠাকুরের বিবাহ ভাতার লোভে তড়িঘড়ি সব মেয়েদের উল্টোপাল্টা বিয়ে দিয়েছিলেন। এ বাড়ির কত্তাটিও সেইরকম। শুধু যা তিনি কবিতা লিখতে পারেন না। আমাকে লিখতে দেখলেই বলেন, ‘ কবিতা লিখে কী হয়?’

 

এইভাবে তিনি আমাকে একটি মৌলিক প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেন।

 

বাথরুমের বিশাল জানলার সামনে দাঁড়িয়ে পুণ্যের আলু চাষ দেখতে দেখতে আমি নবকুমারের মতো ভাবি,  ‘এই কবিতা লইয়া কী করিতে হয়? এই কবিতা লইয়া আমি কী করিব?’

ইতিহাস

হাঁসের প্রিয় গুগলি

পর্তুগিজদের হুগলী

গানের প্রিয় তানপুরা

ওলন্দাজদের চিন্সুরা

জানলা

একদিন আবিষ্কার করি আমার শোবার ঘরে কোন জানলা নেই। একদিন আবিষ্কার করি ওটা আমার শোবার ঘরই  নয়। ১৮ বাই ৩০ ফিটের এই ঘরটি বহুবিধ উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এটা কখনো ঠাকুরঘর, কখনো ননদের পড়ার ঘর, কখনো প্রসাধনের। কারণ ঠাকুরের সিংহাসন , পড়ার টেবিল চেয়ার এবং ড্রেসিং টেবিল পর পর রাখা আছে। ঘরটা খুব বড় বলে তাদের মধ্যে অবশ্য যথেষ্ট দূরত্ব, এছাড়া একটা ৩০ বছরের সংসার যত বাড়তি জিনিস জমাতে পারে, তার সবকিছুই এখানে জায়গা পেয়েছে। তার মানে এটি এমন একটি ঘর, যেটি প্রায় মানুষের জাগরণের প্রতিটি মুহূর্তে কারো না কারো দরকার হচ্ছে। কেউ পুজো করতে আসছে, কেউ পড়তে আসছে, কেউ সাজতে, কেউ ঘর মোছার পুরনো কাপড় বা শীতের লেপ বার করতে। আর এ সবের মধ্যেই এক কোণে আমার বিয়ের নতুন খাট সসঙ্কোচে পড়ে। সেখানে বসে আমি একদিন আবিষ্কার করি এই ঘরে জানলা নেই একটাও।

সিঁড়ি

ঠিক ক’টা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এসেছিলাম কে জানে। কিন্তু সংখ্যাটা ইম্পর্টেন্ট নয়, আসল কথা কত উঁচু। আর কতটা চওড়া। একটা হাতি অনায়াসে উঠে আসতে পারে। কোন একজন মুঘল সম্রাট সরু সিঁড়ি দিয়ে পড়ে মারা যান। এই সিঁড়ি দেখে প্রথমেই আমার অদ্ভুতভাবে তাঁর কথা মনে হয়।  দুধে আলতায় পা চোবানোর আগে কেন যে মনে হয় এসব কথা। সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে আমি হাঁপিয়ে যাই। এটা  তো সবে আমার প্রথম দিন!

হাজিম

হাজিম  কত্তার বাজার করে দ্যায় আর আমার রুটির সমালোচনা করে। আমার পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন শেপের রুটি। সে বলে বড়দির রুটি গোল গোল, ছোড়দির রুটি কাঁচা কাঁচা আর বউদির রুটি পোড়া পোড়া । আমি ইউনিভার্সিটির তিনতলায় লাইব্রেরির সামনে বসে মাথা নিচু করে টিফিন বাক্স খুলে ঐ পোড়া রুটি দিয়ে বাঁধাকপির তরকারি খাই।

ধুবুলিয়া

আমি  ওখানে আটমাস ছিলাম। যেন প্রচ্ছন্ন গর্ভ।  কেউ জানত না আমাকে।  গঙ্গা পার হয়ে কলকাতা গেছি রোজ রোজ, কিন্তু কেউ আমায় চেনেনি। শুধু একবার অজন্তা মজুমদার, স্কুলে পড়ত একসঙ্গে, হঠাৎ দেখা, বলেছিল ও ধুবুলিয়া টিবি কলেজে নার্স। সেই থেকে ধুবুলিয়া শব্দটি আমার কাছে খুব নিঃসঙ্গতার ছবি। আমার মনে ভেসে ওঠে ধু ধু নির্জন প্রান্তরে নার্স কোয়ার্টার। সেখানে সংসার না পাওয়া কয়েকটি মেয়ে কেমন উদাসীনতার ঘোরে বেঁচে আছে। আমি আর কখনো অজন্তাকে দেখিনি।

নদী

সবাই বলে গঙ্গা, আমি বলি নদী। গঙ্গা বললে আমি ভেসে যাওয়া শুকনো ফুল, লাশ আর থ্যাবড়ানো জ্যাবড়ানো সিঁদুর দেখতে পাই। ঠিক আমার বিয়ের মতো। অন্য দিকে নদী এক উদাসী বালিকা, সারাদিন সে আপন মনে ফুল তোলে, মালা গাঁথে, জানলায় বসে মেঘ দেখে বৃষ্টি দেখে, কেউ তাকে বিরক্ত করে না। এই নদী পার হয়ে আমি নৈহাটি যাই, পঁচিশ পয়সা ভাড়া। জেটিঘাটে নেমে খানিকটা হেঁটে নৈহাটি স্টেশন, প্লাটফরমে পা রেখে আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। যাক, কলকাতার খানিকটা কাছে চলে এলাম। কলকাতার কাছে, মা’র কাছে। একদিন এই নদী পার হতে গিয়ে শোভন মামার সঙ্গে দেখা।  শোভন মামা মা’র রাশি পিসিমার ছেলে। তাই কি? ওর কি একটা বোন ছিল? সেই বোন খুব পাকা, পড়াশোনায় মন ছিল না, অল্প বয়সে পালিয়ে বিয়ে করে?  সেসব ঝাপসা হয়ে গেছে। শুধু কয়েকটা জিনিস মনে আছে। শোভনমামা দেখতে সুন্দর ছিল, গজ দাঁত, হাসিটা দারুণ। ও একবার আমাকে একটা অংকের ধাঁধা জিগ্যেস করেছিল, আমি পারিনি, তাতে ওর ধারণা হয় আমি অংকে খুব কাঁচা,  ওর ওপর আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম, আর তিন  – ও একবার আমাদের বাড়ি এসেছিল, এক শীতের রাতে। শীত এই কারণে মনে আছে কারণ মা ওকে রাতে রুটির সঙ্গে বিট গাজরের তরকারি দিয়েছিল, সঙ্গে একটা অমলেট। এত সাধারণ খাবার দেখে আমার ধারণা হয় মা  শোভনমামাকে পছন্দ করে না।  

যাদুকর

বড় ননদের বিয়ের আগের দিন রবীন্দ্র ভবনে ম্যাজিক শো। কেউই যায় না, শুধু ও। কত্তার ধারণা ও কোন কাজ করছে না, তাই ওকে ম্যাজিক দেখতে পাঠানো হয়। দুপুরে ও সেলুনে যায় চুল ছাঁটতে, একটা বিচ্ছিরি অচেনা লোক সেলুনে। রাতে দেখে স্টেজে সেই  লোকটাই ম্যাজিক দেখাচ্ছে।সেদিন রাতে ও আমাকে ভ্যানিশ করে দিতে চেয়েছিল!

ঘড়িমোড়

একটা ঘড়িমোড় আছে। তার পেছনে একটা গির্জা। আমরা গেছিলাম এক শীতের সন্ধেতে। মানে ২৫ শে ডিসেম্বর। বাইরে অনেক বেচা কেনা, ভেতরে বেশ একটা ঘিনঘিনে শান্তি। আমি একটা পাতলা বাইবেল তুলে আনি। লেট দেয়ার বি লাইট। আলো, আলো কই? আলো?

শহর

এই শহরটাকে আমি চিনি না। আমি এর ওপর দিয়ে যাই আসি, জেটিঘাট দিয়ে লঞ্চে করে নৈহাটি যাই, নৈহাটি থেকে ট্রেনে শিয়ালদা। আবার ফিরে আসি। এসে তিনতলা সমান দোতলায় উঠি, বুঝতে পারি আমার গর্ভ হয়েছে। খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাই। একটা লাল বল আমার দিকে ছুটে আসে। আমার ঘুম ভেঙে যায়।

জামগাছ

 সার্কিট হাউসের বাঁদিকে বাগান, বাগান পেরিয়ে সরকারি অফিসারদের নিজস্ব ঘাট। ছোট্ট, বিশেষত্বহীন, নির্জন। কারণ বাবু বিবিদের কারো গঙ্গায় নাইবার অবসর নেই, এ ডি সির বুড়ি পিসি যায় মাঝে মাঝে আর সি এইম ও এইচের আধপাগলা ছেলেটা। কিন্তু এই প্রবল প্রতাপান্বিত ঘাটের পাশে বাইরে দিয়ে ঘুরে একটা ঘাট আছে। তার নাম কস্তুরমঞ্জরীর ঘাট। সেখানে আমি কখনো যাইনি।আমার না যাওয়া জায়গাগুলোই ইতিহাসে থাকে বরাবর। এই ঘাটকে বাঁয়ে রেখে রাস্তাটা ষণ্ডেশ্বরতলার দিকে বেঁকে গেছে। হাজি মহসীন কলেজের সামনে দিয়ে কিছুটা হেঁটে যাবার পর একটা বাঁধানো বটতলা। বড্ড টানে আমাকে।   এর  কিছুটা  আগে প্যান্ডেল বেঁধে দুর্গা পুজো হয়। অষ্টমীর দিন ওখানে অঞ্জলি। ফিরে এসে রান্নাঘরের সামনে জাল বাঁধানো বারান্দায় বসে আমি চল্লিশখানা লুচি বেললাম। বেলতে বেলতে  তলপেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা প্রিয় গানের মতো বারবার।  আমি তখন নিঃশ্বাস নেবার জন্যে জামগাছটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। দিদিশাশুড়ি এসে লুচির গুলি পাকিয়ে দিল। ছোট ননদ ওদিক দিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, ‘এই কটা লুচি বেলতে এতজন লাগে?’ লুচি ভাজা শেষ করে আমি প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে বাথরুমে গেলাম। রক্ত রক্ত! অষ্টমীর রাত কাটল কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে। সকালে বাথরুমে যেতে সে বেরিয়ে এল,  আমার সন্তানকে দেখলাম কমোডে ভাসছে। কে তাকে জামগাছতলায় পুঁতে রেখে এসেছিল? আমি না পুণ্য? মনে নেই। শুধু মনে আছে সোয়াবিনের স্বাদ। আমার জন্যে একটা সোয়াবিনের তরকারি আর ভাত রেখে ওরা নবমীর খাসির মাংস ভাতের নিমন্ত্রণ খেতে বেরিয়ে গেছিল। আমি জানলাহীন ঘরে বিয়ের খাটে একা শুয়ে  মনে মনে একটা নিখুঁত গোল লুচি বেলার চেষ্টা করছিলাম!

 

 

আরও পড়ুন...

Categories
golpo kobita_may

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

ছো ট গ ল্প ।

ধ্রুব  মুখোপাধ্যায় কবিতার সাথে সাথে লেখেন গল্পও। বাংলা ও ইংরাজী দুই ভাষাতেই লিখে থাকেন তিনি। সম্প্রতি ‘বিভা প্রকাশনী’ থেকে বই আকারে প্রকাশ হয়েছে তাঁর প্রথম ইংরাজী উপন্যাস। এই সংখ্যায় রইল তাঁর একটি ছোট গল্প। প্রতি সংখ্যায় আমরা হাজির করব এমন কাউকে যিনি কবিতার সাথে সাথে লেখেন গল্পও। ধ্রুবকে ধন্যবাদ তাঁর গল্পের জন্য।

ধ্রু ব   মু খো পা ধ্যা য়

চেষ্টা নয়, হিংসা করো

স্কুলটা একদম পছন্দ হয়নি দেবযানীর। প্রেয়ারের জন্য একটা আলাদা হল পর্যন্ত নেই! সামনে একটা বারান্দায় তিনজন ছাত্র, তিনজন স্যার, আর তার সামনে কাদা-ঘাসে ভর্তি বিশাল একটা মাঠ, সেখানেই চারটে লাইনে সব ছাত্র-ছাত্রী। হাত জোড় করে প্রথমে “আগুনের পরশ মনি” আর তারপর জাতীয় সঙ্গীত। প্রেয়ারের লাইনে দেবযানী যেন অন্য গ্রহের কেউ। সবাই কেমন একটা হাঁ করে তাকিয়ে। অস্বস্তির চোটে মাঝে মাঝেই চোখে চোখ রাখলে, না দেখার ভান করছিল বাকিরা।

দেবযানী, দেবাঞ্জন গাঙ্গুলীর একমাত্র মেয়ে। এই গ্রামে গাঙ্গুলীরা সব বংশ পরম্পরায় ডাক্তার। তবে ডাক্তার হলেও কেউ গ্রাম ছাড়ে নি। শহরে চেম্বার থাকলেও আগে গ্রামের লোকেদের চিকিৎসা। তাই খাতিরটাও অন্যরকম। কিন্তু দেবযানীর মা কোনোদিনও চাননি, মেয়ে গ্রামেথেকে পড়ুক। তাই সেই ছেলেবেলা থেকেই দার্জিলিঙের সেন্ট পলস। কিন্তু গত বছর, মানে ক্লাস সেভেনে ওঠার পর থেকে কীসব যেন ঘতে চলেছে। রোগ, ঘুমের প্রবলেম, মানসিক অবসাদ এবং সবশেষে বাজে রেজাল্ট। ডাঃ দেবাঞ্জন বেশ বুঝেছিলেন, মেয়েকে কাছে না নিয়ে এলে বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই ক্লাস এইটে ভর্তি করলেন এই গ্রামের স্কুলে।

প্রেয়ার শেষে দোতালায় ঘণ্টা ঘরের সামনেই ক্লাস এইট। ক্লাসরুম যে এরকমও হতে পারে, দেবযানী প্রথমে ভাবতেই পারেনি। চুন রং করা দেওয়াল, তার উপর পেনসিলে ব্যাঙের হৃদপিণ্ড, অঙ্কের নানা উপপাদ্য এককথায় সম্ভাব্য যাবতীয় প্রশ্নের সাংকেতিক উত্তরময় একখানা ঘর, যার উপরে দুটো ফ্যান আর নীচে সারি করে পাতা বেঞ্চ। একটা বেঞ্চেপাঁচজন, তার উপর আবার ব্যাগ রাখারও আলাদা কোনও জায়গা নেই। বেঞ্চ গুলোও যেন খাতা শেষ হওয়া কোনও সাইন্টিস্টের। এসব আবিষ্কার করতে করতেই একজন ধুতি পরা স্যার এলে, সিলিং ফ্যানের হাওয়ার থেকে আওয়াজটা যেন বেশী হয়ে গেল। রোল কলের সময় দেবযানী ভালো করে মনে মনে গুছিয়ে নিল নিজের ইন্ট্রোডাক্সনটা। কিন্তু সে সুযোগ পেলে তো! স্যার নিজেই দেবযানীর কাছে এসে বলে দিলেন “এ দেবযানী গাঙ্গুলী, আজ থেকে তোমাদের বন্ধু। দার্জিলিঙের সেন্ট পলসে– পড়ত। তোমরা সুযোগ বুঝে ওর সাথে আলাপ করে নিও। “সেন্ট পলস” শব্দটা শোনার পর “বন্ধু” শব্দটার পরে যেন একটা বিস্ময় সূচক চিহ্ন বসে পড়ল।সেদিন টিফিনে দার্জিলিং, সেন্ট পলস, মিশনারি, ক্রিশ্চান এসব বোঝাতে বোঝাতে দেবযানী বেশ বুঝেছিল এই স্কুলের অলিখিত ফার্স্ট গার্ল সেই-ই।

গাঙ্গুলীদের মেয়ে, আর তার উপর একটা অন্য সিলেবাসে অভিজ্ঞ,তাই স্যারেরাও বেশ স্নেহ করেন; যদিও নেহাত অন্যের স্নেহতে নিজেকে প্রমান করা ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে দেবযানী নয়! কিন্তু এখানে কেউই যেন ফার্স্ট হতে চায়না! ভালো নাম্বার পেলেই সবাই যেন খুশি!এই করেই একটা বছর কেটে গেল এবং যথারীতি মার্কশসিটে টোটালে চার নাম্বার কম – ফার্স্ট। রেজাল্টের দিন মার্কশসিটটা হাতে নিয়ে বেঞ্চে বসতেই সুমন এলোঃ “এই দ্যাখ আমি সেকেন্ড হয়েছি।“ নব্বই নাম্বার কম পেলেও যেন পরিতৃপ্ত। ঝলমলে হাসিমুখে সুমনের কাছে সেকেন্ডটাই যেন ফার্স্ট। তবুও নিজেকে প্রমান করা ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে দেবযানী নয়। তাই কম পাওয়া চার নম্বরটাকে একটা পরাজয়ের বাক্সে ভরে একটু বেজার মুখেই বললঃ “টোটালের থেকে চুরানব্বই কম যে!” “ফার্স্ট ডিভিশন এটা; কম কি!” হাসতে হাসতে মনের খুশিটাকে আর একটু বাড়িয়ে নিল সুমন।

সুমন ফার্স্ট হতে না চাইলেও শিখতে চায়, জানতে চায়; ইতিহাস খুব ভালবাসে। দেবযানী আবার অঙ্ক ছাড়া কিছুই বোঝেনা – নম্বর, ফার্স্ট আর একশোয় একশো; তাই সুমনের থেকে সময় পেলেই ইতিহাসের নানা জিনিস শোনে। ছেলে বন্ধুদের অনেককে হারালেও সুমন দেবযানীকে ক্লাসের বাইরে একটু সময় দিতে ভালোই বাসে! কিন্তু ইদানিং অঙ্ক ইতিহাস কিছুতেই যেন মন নেই দেবযানীর। সুমন রসিয়ে ইতিহাসের গল্প বললেও দেবযানী মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করেঃ “পার্থদাকে স্কুলের স্যারেরা বকেন না?” সুমন অনেকবার বলেছে “কেন বকবেন? ও আছে বলেই তো আমরা এতো বারের ইন্টারস্কুল ফুটবলের চ্যম্পিয়ান।“

পার্থ স্কুলের এক নম্বর ডানপিটে, বখাটে, বেয়াদপ হলেও কেউ কিছু বলেনা, এমনকি স্যারেরাও পার্থকে স্নেহও করে এবং সেটা যেন দেবযানীর থেকেও বেশী– ভাবলেই কেমন একটা রাগ হয় দেবযানীর। ফুটবল ম্যাচের আগে টিমের সবাই ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে স্যারেদের প্রণাম করে। সেদিনই প্রথম চোখাচুখি হয়েছিল দেবযানীর সাথে। প্রথমে দেবযানীর চোখে চোখ রেখে একটা নিষ্পাপ হাসি হাসল পার্থ। দেবযানীও বিনিময়ে হাসতে গেলে,পার্থ মুখটা গোমরা করে এমন ভাবেবিকৃত করল যে দেবযানী লজ্জায় মুখ লুকাবার জায়গা  পর্যন্ত পেলনা! তারপর বাইরে বেরিয়ে বলটাকে আঙ্গুলের উপর ঘোরাতে ঘোরাতেহুস করে একবার ভ্রুটাকে উপরে তুলে নামিয়ে নিল। দেবযানী আর রিস্ক নেয়নি; চুপচাপ চোখটা সরিয়ে নিয়েছিল। এরপর অনেকবার এসেছে পার্থ। চোখের দিকে না তাকালেও, ফুটবলের জার্সিতে, মেদহীন হাত আর পায়ের পেশীগুলোঅবাক হয়ে দেখেছে দেবযানী।

সুমনের কাছে পার্থর ব্যাপারে যতই জেনেছে ততই একটা অদ্ভুত রাগ যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তিন বছর ধরে পার্থ এই স্কুলেই হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছে, শুধু স্কুলের জার্সিতে ফুটবল খেলবে বলে। – পাগল নাকি! ছেলেটা নাকি ভীষণ ফাজিল। এই তো সেদিন সুমন আর দেবযানীকে ডেকেছিল, বলে “বলোতো অরুণাচলের উলটোদিকের শহরের নাম?” সুমন অনেক ভেবেচিন্তেও যখন কিছু বলতে পারলনা, তখন হাসতে হাসতে বলল ”এটাও পারলে না!… অরুনাথাক”। “এই নামে তো কোনও শহর আমি শুনিনি!” দেবযানী বললে পার্থ গলাটা একটু গম্ভীর করে বলেছিলঃ “তাহলে ওই ভূগোলের প্রদীপ বাবু কে জিজ্ঞেস করো।“  দেবযানী জিজ্ঞেসও করবে ভেবেছিল কিন্তু সে যাত্রায় সুমন বাঁচিয়ে দিয়েছিল – “এসবই ফাজলামি রে!” তবে নিজেকে প্রমান করা ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে দেবযানী নয়! তাই ঘুরে গিয়ে বলেছিলঃ “ওটা অরুনা থাক নয়, অরুনা দাঁড়া হবে!”

এভাবেই ‘মালদার পাশের শহর মালদিদি’, বাগমারী আর বাগনানের মধ্যে সম্পর্ক বের করতে করতে ওদের দুজনের মধ্যে কখন যে একটা সফট কর্নার গড়ে উঠেছিল নিজেরাও বোঝেনি। কিন্তু সম্পর্কটা কক্ষনও ঝাপটের ঢাল, পিচকুড়ির ঢালের পর নোয়াদার ঢালের মত সিরিয়াস হয়নি। দেবযানী বরাবর ফার্স্ট হতে চেয়েছিল আর পার্থর উদ্দেশ্য ছিল ফেল – ফুটবল। এরকমও হয় নাকি! মাঝে মাঝেই অবাক লাগতো দেবযানীর আর তারপরেই সেই রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠত। স্যারেদের স্নেহটা কি এতই সস্তা!বেশ কয়েকবার বলেছে পার্থকেঃ “তোমার ভালো লাগে এভাবে একই ক্লাসে থাকতে।“ “না! তবে দারুন লাগে স্কুলের হয়ে ট্রফিটা হাতে তুলতে!” পার্থ অবলীলায় বলে দিলে রাগটা যেন আরও বেড়ে যেত দেবযানীর, তবে আর কথা বাড়াত না।

এখন ওরা দুজনেই ক্লাস টুয়েলভ। তবে সুমন আর সেভাবে মেশে না –ইতিহাসকে ইতিহাস করে দিয়ে সুমনেরও এখন সাইন্স। পার্থর সাথে এক ক্লাসে পড়াটা যেন মেনে নিতে পারছিলনা দেবযানী। তাই চাপা রাগটা বাড়তে বাড়তে একদিন বেরিয়েই গেল। “তুমি জানো তুমি একটা অসভ্য জানোয়ার। ফেল করে ফুটবল খেলাটার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই! ইচ্ছে করে কেউ ফেল করে নাকি? আমিতো বাপু কাওকে শুনিনি। আমি মরে গেলেও পারব না।“

পার্থও বেশ বিরক্ত হয়েছিল সেদিন। “আমি যা ইচ্ছে তাই করব, তুমি বলার কে?” কথা গুলো বলতে গিয়েও বলল না। বরঞ্চ একটা হাসি মুখে লাগিয়ে বলল “সবাই কি সব পারে! শোনো, একটা ফ্রি জ্ঞান দিই,তুমি চেষ্টা না করে, হিংসা করো। কেন না তোমার দ্বারা হবে না।“ রাগে মুখটা তখন লাল দেবযানীর।হয়তো এটারজন্যই পার্থ এতদিন ছিল এক ক্লাসে; দেবযানীর চেষ্টা আর হিংসার মাঝের হিসাবটা মিলিয়ে দিতে।

আরও পড়ুন...

Categories
golpo kobita_may

রিপন হালদার

ছো ট গ ল্প ।

রিপন হালদার কবিতার সাথে সাথে লেখেন গল্পও। সম্প্রতি ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একটি ছোট গল্পের সংকলন ‘এখানে অমল নামে কেউ থাকে না’।  প্রতি সংখ্যায় আমরা হাজির করব এমন কাউকে যিনি কবিতার সাথে সাথে লেখেন গল্পও। ধন্যবাদ রিপনকে এই সংখ্যায়  তাঁর গল্পের জন্য।

রি প ন  হা ল দা র

উৎসের দিকে

প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পর দোকানে পৌঁছে ছেলেটা আজো দেখল বাবা নেই। বেশ কিছুক্ষণ দোকানের ডানপাশের কোণটিতে দাঁড়িয়ে থাকল। ঘামে সারা শরীর জবজব করছে। সাদা জামাটা ভিজে গিয়ে কামড়ে আছে চামড়ার সাথে। ডানহাতের আঙুল দিয়ে বারবার কপালের ঘাম চেঁছে চলেছে।

আগের দিনের সেই লোকটার চোখ এবার পড়ল ছেলেটির দিকে। “বাবাকে চাই?” বলে লোকটা আবার মাথা ডুবিয়ে দিল কোলের উপর রাখা কুলোর উপর। ছেলেটি আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না। হাতের কাজ হঠাত্‌ বন্ধ রেখে লোকটা ছেলেটির দিকে আরেকবার তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। তারপর বলল, “সেইই খানে আছে। চলে যাও!” কেমন যেন টেনে টেনে বলল কথাগুলো। তাচ্ছিল্যের সুর।

ছেলেটি দোকানের পিছন দিকের রাস্তাটায় চলে এল। তাকালো সামনের দিকে। আবার এতটা রাস্তা! ক্লান্তি আর হতাশা ছেয়ে ফেলল। আশেপাশে ট্যাপকলের সন্ধান করল। ইঁটের টুকরো বসানো রাস্তা। এখনো পাকা হয়নি। তাই হয়ত ট্যাপকলের লাইনও এখনো বসেনি। ফিরে আসল দোকানে। জল চাইল। বোতলের প্রায় অর্ধেকটা জল এক নিঃশ্বাসে শেষ করে নতুন উদ্যমে শুরু করল হাঁটা। সেই ‘ওয়াই’ চিহ্নটা সামনে এসে পড়েছে। আরো দেখা যাচ্ছে ইঁটভাটার চিমনিটা ঐ ওয়াইয়ের সংযোগবিন্দু ফুঁড়ে যেন উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ছেলেটা এসে দাঁড়াল সেখানে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিল খানিকক্ষণ। শরীর ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ওর পা হাত মাথা এরা আলাদা আলাদা কিছু। একে অন্যের সাথে যুক্ত অবস্থায় থাকতে তীব্রভাবে আপত্তি জানাচ্ছে। হয়ত যখন তখন ছিটকে খুলে পড়েও যেতে পারে।

এবার মাঠে নামতে হবে। রাস্তার উচ্চতার তুলনায় মাঠটা ঢালু। দুপুরের এই সাদা রোদের মধ্যে মাঠটা যেন ডুবে আছে। ছেলেটা নেমে গেল মাঠে। শূন্য মাঠ ভেদ করে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চিমনিটা এবার ওর আগে আগে চলছে। অবশ্য কোনো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে না। এই চিমনি লক্ষ্য রেখে ওকে এগিয়ে যেতে হবে। উঁচুনিচু এবড়োখেবড়ো মাঠটার উপর দিয়ে টলতে টলতে চলা শুরু করল। এখানে সোজাভাবে হাঁটা যায় না।

অবশেষে অনেকটা পথ অতিক্রমের পর সেই খালটা দৃশ্যমান হল। আর তার পাশেই ইঁটভাটা। ইঁটভাটার দিকে এগোতে থাকল। বেশ কিছুটা যেতেই নাকে আসল সেই বিশ্রী গন্ধটা, যা পুরো জায়গাটার হাওয়াকে বিশ্রীভাবে দখল করে রেখেছে। খিদে পেটে গন্ধটা বমির ভাব জাগাচ্ছে। আরেকটু যেতেই সামনেই পড়ল সেই ড্রামের উপর সাজানো অদ্ভুত যন্ত্রটা। হাঁড়ির নিচে জ্বলছে আগুন। তার থেকে সরু একটা পাইপ মাটিতে বসানো ড্রামের সাথে যুক্ত। ছেলেটি দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছে। একটু দূরে একটা মাঝারি উচ্চতার ঝোঁপের পাশে নিচে জটলা দেখা যাচ্ছে। ভালো করে তাকাল ঐদিকে। রোদের মধ্যে দৃশ্যটা কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে।  বাবা নিশ্চয় ঐখানে আছে। যদিও এখান থেকে ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে না। রোদ থেকে মাথা বাঁচাতে হাতের প্লাস্টিকটা ধরে রাখল মাথার উপর। সামনে কী এগিয়ে যাবে আরেকটু! কিন্তু যা ঝাঁঝালো গন্ধ! বমি হয়ে যেতে পারে। তাই এখানেই দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয় মনে করল।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। কেউ আসাযাওয়া করছে না এইদিকে। কাউকে ডাকতেও ইচ্ছা করছে না। বাবা ওখানে কী সত্যি সত্যি আছে! ওর দিকে কেউ তাকাচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে না। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে! ওদিকে খিদেও পেয়েছে খুব। ছেলেটি বসে পড়ল উঁচু মত মাটির ঢিবির উপর। আগের দিনও সম্ভবত এই জায়গাটাতেই বসেছিল। রোদের তেজ ওর হাড়সর্বস্ব দেহটা থেকে সমস্ত রস শুষে নিচ্ছে। ক্রমশ বুজে আসছে চোখ। প্লাস্টিকের ব্যাগটা মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়তে বাধ্য হল। রোদে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে অনাবৃত অংশের চামড়া। রোদ এড়ানোর জন্য মাথাটা ঘুরিয়ে খালের দিকে রাখল। চোখ মুখের উপরে রাখল বাঁহাতের ছায়া। জলের স্বচ্ছ পাতলা একটা রেখা যেন দুলছে চোখের উপর। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মাথার মধ্যে সৃষ্টি হয় একধরনের ধোঁয়াশা। তবু এখন দেখতে ভালো লাগছে ওর। তাকিয়ে থাকল যতক্ষণ চোখ খোলা রাখতে সক্ষম হল। বন্ধ হয়ে আবার খুলে যাচ্ছে। খুলে গিয়ে আবার মৃদুভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ বা খোলা থাকছে না। একধরনের অর্ধচেতন অবস্থায় ওর মন এখন দোদুল্যমান।

কয়েক মুহুর্ত পর ঐ রেখাটার সামনের দিকটা কেমন যেন আকার পালটাচ্ছে মনে হল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বিরাট এক সাপের মুখের মত হয়ে গেল। এদিক ওদিক নড়াচড়া করে তাকিয়ে কী যেন দেখছে মুখটা। তারপর কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের সন্ধান পেয়েছে এমন ভাব করে তীব্রবেগে ছুটে আসছে ওর দিকে। আসার পথে পড়ল ছোট্ট বেড়ার ঘর। সাপটা আস্তে আস্তে গিলে ফেলছে ধুধু মাঠের উপর অবস্থিত ওদের ঐ ছোট্ট ঘরটা। কড়মড় শব্দও যেন পাওয়া গেল। তারপর দ্রুত ছুটে একদম কাছে চলে আসল ছেলেটির। বিরাট এক হা করে ওর পুরো দেহটা একবারে গিলে ফেলল। অর্ধতরল স্রোতে ভেসে বেরানোর স্মৃতি ভেসে এল। শৈশবে মায়ের কোলে দুলতে থাকার মত। কোলে হয়ত নয়। চারদিক আবৃত কোনো চামড়ার মত আবরণে। দলা পাকানো মাংসপিণ্ড যেন হয়ে গেছে ছেলেটি এখন। চেতনা বা  বোধের কোনো বিন্দু ধীরে ধীরে ওকে জানান দিচ্ছে কিছু। কারো আবছা ডাক ঐ স্ফীত চামড়ার বাইরে দিয়ে যেন কেউ কিছু বলছে, “ছেলে হবে, না মেয়ে?” সঙ্গে  শোনা যাচ্ছে মোছা মোছা হাসি। একটা হাত চামড়ার বাইরে ওর গড়নের উপর দিয়ে বুলিয়ে চলেছে কারো। আর খুব আবছা ভাবে কোনো দূর জগতের পার থেকে যেন বার বার বলছে, “বাবা বলে ডাকো তো!”

আরও পড়ুন...