Categories
2023_jan golpo

মনীষা মুখোপাধ্যায়

গ ল্প

ম নী ষা   মু খো পা ধ্যা য়

manisha

শিবাজিবাবুর ছাতা

বাড়ি থেকে বেরনোর মুখেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল শিবাজিবাবুর।

বাজখাঁই গলায় পথ আগলে হাতে ছাতাটা গুঁজে দিয়েছেন গিরিবালা। গিরিবালা শিবাজিবাবুর ৩৮ বছরের পুরনো বউ। ছাতাটার মতো নতুন নয়। তবে গুমর, ঝাঁজ আর মেজাজে এখনও ছাব্বিশের তরুণীটি। পাটভাঙা ধুতি আর আদ্দির পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে রুমালে একটু কড়াগোছের এসেন্স মাখিয়ে সবে পকেটে পুরেছেন শিবাজিবাবু। আষাঢ় সবে শুরু হয়েছে, তবু মেঘের তেমন দেখা নেই। আজকাল কোনওটাই সময়ে হয় না। আষাঢ়ে বৃষ্টি হয় না, মাঘে শীত পড়ে না, টাইমকলে ঠিক সময়ে জল আসে না, ঠিকে কাজের লোকের কামাইয়ের কোনও ঠিক থাকে না, সময়ে ঠিক কথা বলা হয় না, ঠিক কাজ করা হয় না। মোটকথা কোথাও কিছু ঠিক হয় না। 

আকাশে একফোঁটা মেঘ নেই দেখে খুশিই হয়েছেন শিবাজিবাবু। নেমন্তন্ন’র দিন ঝড়জল পোষায় না। খুশি খুশি মনে মুখে কয়েকটা মৌরি ফেলে ধুতির মালকোঁচা সামলে বেরচ্ছিলেন। হঠাৎই সামনে স্ত্রী গিরিবালা, হাতে একটি ছাতা। আজকাল স্ত্রীর চেয়েও এই ছাতাটাকে বেশি ভয় পান শিবাজিবাবু। এ ছাতা জীবনে আসা ইস্তক তাঁর সব সুখশান্তিই প্রায় ঘুচেছে। এমনিতে ছাতা হারানোয় বেশ সুনাম ছিল শিবাজিবাবুর। তাই একটা বয়সের পর আর ঘুণাক্ষরেও ওই বস্তুটি সঙ্গে রাখেননি। বর্ষায় বর্ষাতি আর গ্রীষ্মে রুমালটুমাল দিয়ে কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। 

গণ্ডগোলটা হয়েছে মাস তিনেক। ছোট শালার ছেলে নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার পর। পিসেমশাইকে ভালোবেসে একটা বিলিতি ছাতা কিনে এনে দিয়েছে বুকুন। আর সেই ছাতা বাড়িতে পোঁছে দেওয়ার পর থেকে গিরিবালার গুমর আরও বেড়েছে। প্রতিবেশীদের ডেকে ডেকে ছাতা দেখানোর পালা একটা সময় অবধি চলল। তারপর খাওয়ার নিমন্ত্রণ পেতে শুরু করলেন শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়রা। সঙ্গে ছাতাদর্শন ফ্রি। ছাতার গুণপনা বাড়িয়ে বলতে বলতে কল্পনার সব সীমারেখা মাঝে মাঝেই হারিয়ে ফেলছেন গিরিবালা। নো-ম্যানস ল্যান্ডে পৌঁছে আর ম্যানেজ দিতে না পারলে হাল ধরতে হচ্ছে শিবাজিবাবুকে। এই হাল ধরার কাজটা মোটেই ভালোবেসে করছেন না তিনি। তবু দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে এমন অনেক কাজই করতে হয়, যা না করলে ঝড় ওঠে, বৃষ্টি হয়। তারপর অতিবৃষ্টির মতো সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সে কথা আটষট্টিতে এসে বিলক্ষণ জানেন নিঃসন্তান শিবাজি চাটুজ্জে। তবে সেদিন শিবাজিবাবুর মেজদি’কে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানোর ছলে ছাতাখানাকে ‘বিশ্বের এক নম্বর’ বলে ফেলায় একটু জোরে কেশে ফেলেছিলেন শিবাজিবাবু। ওটি ছিল সিগন্যাল। ‘এবার থামো, লাইন ক্রশ করে যাচ্ছ,’ বলার উপায়। কিন্তু গিরিবালা দুর্বার। কোনও সিগনালেরই ধার ধারেননি। যথারীতি ছাতার শিক থেকে শুরু করে কাপড়-ডাঁটি সবেতেই ইউনিক কিছু খুঁজে পেয়েছেন। 

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বউকে বাড়াবাড়িটা বুঝিয়ে বলবেন বলে ভাবলেন শিবাজি। ‘গিরি, বলছি কি, ছাতা না আমেরিকানরা ভালো বানায় না, ওটা আসলে জাপানিদের কাজ।’ 

ব্যস! আগুনে ঘি পড়তে ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল। 

খনখন করে বলে উঠলেন গিরিবালা, ‘তা তো বলবেই! আমার বাপের বাড়ির লোক দিয়েছে কি না! এখন তো আমেরিকার চেয়েও ভালো ছাতা জাপানিরা ওই কুঁদে কুঁদে চোখ নিয়ে বানাবেই।’ 

‘আহা কুঁদে চোখ তো কী? অন্ধ তো নয় যে বানাতে পরবে না!’

‘সেই তো, এখন তো এসব যুক্তি দেবেই। কোনওদিন তোমার দিকের আত্মীয়দের তো একটা দামি কিছু দিতে দেখিনি। এই তো সেবার বড়দিরা সবাই মিলে পুরী গেল। কী এনেছিল? না, খাজা আর সম্বলপুরী একটা ব্লাউজ পিস!’ 

‘গিরি তুমি বুঝতে পারছ না, পুরী থেকে ছাতা কী করে আনবে? ওখানে তো খাজা আর ওই সম্বলপুরীই বিখ্যাত। না মানে, এগুলো ছাড়া রথও বিখ্যাত। কিন্তু রথ তো আর অত দূর থেকে টানতে টানতে আনতে পারবে না বলো! 

কথাটা গিরিবালার মোটেই ভালো লাগল না। আরও দ্বিগুণ ঝেঁজে বলে উঠলেন, ‘থাক থাক, বুঝেছি। আমার বুকুন যে মনে করে পিসের জন্য একটা বিদেশি ছাতা এনেছে, সেইটেই সহ্য হচ্ছে না তোমাদের। দেখলে না, মেজদি কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে বলে গেল, ‘আমাদের টুম্পাও তো আগেরবার দার্জিলিং থেকে একটা ইমপোর্টেড ছাতা এনে দিয়েছিল ওর বাবাকে।’ হুঁহ্! কোথায় আমার বুকুনের নিউ ইয়র্ক আর কোথায় তোমাদের টুম্পার দার্জিলিং!’

শিবাজি বুঝলেন, এভাবে লাভ হবে না। এ কেস জাত্যাভিমানের দিকে গড়িয়ে গিয়েছে। একটু পরেই ফ্যাঁচফেঁচে কান্না, তারপরেই একটানা গজরগজরের দিকে ব্যাপারটা গড়াবে। তাই তা ঠেকাতে আরও নরম স্বরে বউয়ের দিকে খানিক ঘেঁষে শান্ত হয় আরও দু’-চার কথা বলতে গেলেন শিবাজি।

‘তা বেশ তো, ভালো ছাতা বলছ, বলো। কিন্তু মসলিন কাপড়-টাপড় বোলো না লোকের সামনে। মানে, ইয়ে, ছাতার কাপড় মসৃণ হতে পারে গিরি, কিন্তু মসলিন কখনওই নয়।’

ভেবেছিলেন নরম স্বরে বললে গিন্নির মেজাজে একটু জল পড়বে। কিন্তু গিরিবালা পাকা গোলকিপার। অ্যাটাকিং কোনও প্লেয়ারেরই ডিফেন্স দেখে ভেবলে যান না। কোমরের ব্যথা ভুলে এক ঝটকায় উঠে বসে বললেন, ‘মসলিন নয় মানে? আলবাত মসলিন। বুকুন যেদিন বাড়িতে এল, সেদিন তুমি তো গুপ্তিপাড়া গিয়েছিলে। আমাকে ও বারবার বলে গিয়েছে, মসলিন কাপড় পিসি, আর সুইচ টেপা শিক। এমনকী, এই ছাতা প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট-বড়ও করা যায়। আর রংখানা দেখেছে? যেন গোটা আকাশ নেমে এসছে ছাতায়।’

‘এই, এইখানেই আমার ঘোর আপত্তি গিরি। এ ছাতা ঠিক আকাশি নয়, পুরো তুঁতেপানা। এই বয়সে অমন ছাতা আমার মতো বুড়োদের মোটেই মানায় না। মেয়েরা চেয়ে চেয়ে দেখে আর মুখ টিপে হাসে।’

শেষ বাক্যে কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন গিরিবালা। কিন্তু জাত খেলোয়াড় তো! বল বুঝতে দেরি হয় না। ‘তা মেয়েরা তাকালে তাকাক, তুমি তাকাবে না। মিটে গেল!’ সপাট সমাধান গিরিবালার। 

‘কিন্তু না তাকালে তো বুঝতে পারব না, ওরা ছাতাটা দেখে প্রশংসা করতে চাইছে, না ভীমরতিতে ধরেছে ভাবছে!’

‘আ মোলো, ভীমরতি ভাববে কেন? আমার বুকুনের দেওয়া ছাতা বলে কথা! অমন আশমান রঙের ছাতা জম্মে চোখে দেখেছ?’

‘না গিরি, দেখিনি। ছাতার যে অমন রং হতে পারে তা আমি কেন, আমার চোদ্দোগুষ্টিতে কেউ জানত না।’ কথাটা বলার সময় তেতে ওঠাটা কিছুতেই আড়াল করতে পারলেন না শিবাজি।

এরপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। হঠাৎই কাঁদো কাঁদো গলায়, ছলোছলো চোখে গিরিবালা বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ গো, ছাতাটা তোমার পছন্দ হয়নি, না? বুকুন বলছিল বটে, পিসের হয়তো ভালো লাগবে না পিসি, হাজার হোক বিলিতি ছাতা তো, আর পিসে তো আবার স্বদেশি করা বাপের ছেলে!’

এই রে একদম ভুল পথে বল গড়িয়েছে। এক্ষুনি না থামালে রাতের ঘুমের বারোটা। গিরিবালা কিন্তু বাপ-ঠাকুরদাতেই থামবে না। তুরন্ত বল আটকালেন শিবাজিবাবু।  ‘ছি ছি গিরি, অপছন্দ হবে কেন? বুকুন হল আমার সন্তানতুল্য।  শুধু এই তুঁতেরঙা ছাতা কি না! আর ছাতা তো সাধারণত অবসরের দিন বা শ্রাদ্ধে দেওয়া হয়। তা আমার তো অবসর হয়েই গেছে, পড়ে আছে শুধু শ্রাদ্ধটুকু। নইলে জ্যান্ত মানুষকে হঠাৎ করে ছাতা দিচ্ছে কেউ এমন তো শুনিনি!’ 

কী মোক্ষম এগচ্ছিলেন শিবাজিবাবু! কেঁচিয়ে দিলেন শেষদিকে এসে। শোওয়া থেকে প্রায় লাফ দিয়ে সটান উঠে বসলেন গিরিবালা। ‘কী বললে, আমার বুকুন শ্রাদ্ধের জিনিস দিয়ে গেছে? অ্যাঁ! এত বড় কথা! তোমার এত ছোট মন? কে বলল তোমাকে যে শুধু ওই দুটো দিনই ছাতা দেয় লোকে! হুবহু নিজের মায়ের মতো হয়েছ! যত্তসব হাড়জ্বালানে যুক্তি!’ এতেই থামলেন না গিরিবালা। শিবাজিবাবুর মা  কবে কবে কোথায় কোথায় কী কী ‘কুযুক্তি’ দিয়েছিলেন তা নিয়ে একটা অতীতসফর সেরে খানিক দম নিলেন। দু’-চারটে শ্বাস ভেতরে পুরেই ফের ফুল ফর্মে। ‘আমি কালই বাপেরবাড়ি চলে যাব… না না তা কী করে হয়? আমি বাপেরবাড়ি চলে গেলে তুমি তো বেঁচে যাও। আমি আর কক্ষনও বাপেরবাড়ি যাব না। কিছুতেই না।’ এই অবধি বলে দুমদুম পা ফেলে পাশের ঘরে গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন গিরিবালা। একটু পরে ফুরুৎ ফুরুৎ নাকও ডাকতে শুরু করলেন। শিবাজিবাবুর বাকি রাত বিনিদ্র ও নিশ্চিন্তে কাটল।

 

ছাতাখানা নিয়ে মুশকিলের শুরু সেই সেদিন থেকেই। তাই আজ বেরনোর আগে ওটা গিরিবালা গছিয়ে দিতেই সতর্ক হলেন শিবাজিবাবু। মিনমিন স্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। 

‘আজ নয় গিরি, আকাশে একদম মেঘ নেই, বৃষ্টি তো হবেই না। শুনলে না আবহাওয়ার খবর?’ 

‘বলুক, ওরা দিনরাত ভুল বলে।’

‘আরে না, না সে তো এককালে বলত। এখন তো সবই মিলিয়ে দেয়।’

‘দিক গে। শোনো, বর্ষায় ছাতা আর শীতে কাঁথা কখনও হাতছাড়া করবে না।’

বেরনোর আগে ঘরোয়া দুর্যোগে পড়তে চাইলেন না শিবাজি। বললেন, ‘আচ্ছা বেশ তো, তাহলে দাও না, আমাদের বিয়ের ওই পুরনো ছাতাখানা তো রয়েইছে, ওটাই না হয়…!’

কথাটা শেষ করার আগেই গিরিবালা এমন একটা মুখ করে শিবাজির দিকে তাকালেন যেন অবোধ শিশু না বুঝে কীসব বলে ফেলেছে। 

‘ওই মান্ধাতার যুগের শিক বের করা ছ্যাকরা মার্কা ছাতাটা? না ব্যবহার করে করে তো ওটাকে যমের বাড়িতে পাঠানোর দশায় নিয়ে গেছ। বৃষ্টি এলে খুলতে খুলতে তো বৃষ্টি থেমে যায়।’

শিবাজির রাগ হচ্ছিল খুব। কিন্তু অপোনেন্ট যতই রাগিয়ে দিক, এসব ট্রেন ধরার দিনে রাগলে চলবে না। রাগলেই দেরি, আর দেরি হলেই ট্রেন মিস। গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব মিহি করে শিবাজিবাবু বললেন, ‘না না যাহ্! যতটা বলছ, ততটা মোটেই নয়। এই তো সেদিন হলধরবাবু ছাতাখানা ধার নিলেন। কই তেমন কিছু তো বললেন না। বরং ছাতাটা বেশ পছন্দ হয়েছে বলে গেলেন!’

ওসব হলধরটরকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনলেন না গিরিবালা। তাঁর স্পষ্ট জবাব, ‘হলধরের শালার ছেলে তো আর আমেরিকায় থাকে না, তাই তোমার ওই ধর্মতলার ছাতা উনি বুকে বেঁধে রেখেছেন। আমেরিকার ছাতা হাতে পেলে না, তোমার ওই ছাতা উনি কুকুর তাড়াতেও নিতেন না।’

মাথাটা ধাঁই করে তেতে উঠল শিবাজির। ইচ্ছে করল বলেন, তোমার ওই বুকুনের ছাতা না কুকুর তাড়াতেও কাজে আসবে না, উল্টে ওই ক্যাটকেটে তুঁতে দেখলে কুকুর উল্টে তাড়া করতে পারে। কিন্তু না থাক, এখন এসব বললে বেরনো তো হবেই না, উল্টে যাওয়াটাই কেঁচিয়ে যেতে পারে। শেষ চেষ্টা করলেন শিবাজি। 

‘কিন্তু গিরি, ট্রেনে করে এতটা যাব, তারপর আবার অটো… বুঝতেই তো পারছ, আর আমার যা ছাতা হারানোর স্বভাব, এত ভালো বিদেশি ছাতা, শেষে একটা কেলেঙ্কারি না করে বসি!’

ঠিক এই কথাটার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলেন গিরিবালা। ঠিক যেন চেনা পাশ পেয়েই গোলের মুখ খুলে দিলেন। একগাল হেসে বললেন, ‘ওসব চিন্তা কোরো না গো, আমি আছি কী করতে? আমি মাঝেমধ্যেই তোমাকে ফোন করে ছাতার কথা মনে করিয়ে দেব।’ 

শিবাজি বুঝলেন কপালে আজ আরও দুঃখ আছে। 

 

বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ট্রেনে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। সারা দিন যা ধকল গেল! গোটা দিনে বার কুড়ি ছাতার জন্য ফোন ধরেছেন বাড়ির। লক্ষ করেছেন, ওঁর বন্ধুর ছেলে-ছেলের বউ সহ নিমন্ত্রিত আরও অনেকেই ওঁর ছাতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছে। নইলে ফিসফিস করে কীসব যেন বলেছে। খাওয়ার সময় যাতে খাবারের তেলঝোল একটুও ছাতায় না পড়ে তার সাবধানতা প্রতি পলে আউড়ে গিয়েছেন গিরিবালা। ফোন ধরার ঠেলায় তো মাংসের নলিটা জুত করে টানতেও পারলেন না শিবাজি। পায়েসটাও আর একটু নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। ফোন আর ছাতা সামলাতে সেসবে আর মন দেওয়া যায়নি। ফোন যে অফ করে দেবেন, তাতেও বিপদ। বাড়ি ফিরলে তবে আর রক্ষে থাকবে না। তাই প্রায় সব ক’টা ফোনই হুঁ, হ্যাঁ করে সারলেও ধরতে হচ্ছিল শিবাজিকে। তাই দেখে অধীরের বউ হেসে-হেসে বলছিল, ‘কী দাদা, বউদি বুঝি এখনও খুব মিস করে? এ তো ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন!’ অধীরও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, একঘর লোকের মাঝেই হা হা করে হেসে উঠল। শিবাজির মনে হচ্ছিল, ধরণী দ্বিধা হও। এসব পরিস্থিতিতে মনে যাই আসুক, মুখে একটা হেঁ হেঁ ভাব বজায় রাখতে হয়। শিবাজিও তাই করলেন।

ট্রেন সবে বেলুড় ছেড়েছে। বুকপকেটে পিরিং পিরিং শুনতে পেলেন শিবাজি। তাচ্ছিল্য নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভুরু কুঁচকে গেল। ফের গিরিবালা!

‘হুঁ’।

‘ও মা, হুঁ আবার কী? ছাতাখানা সামলে রেখেছ তো? যা ভুলো মন তোমার!’

‘হুঁ রাখছি।’ ইচ্ছে করেই ফোনটা কেটে দিলেন এবার। তবু আড়চোখে একবার বাঙ্কে দেখে নিলেন, যেমনকার ছাতা, তেমনই আছে। ট্রেনের দুলুনিতে ফের চোখটা লেগে এল শিবাজির। চোখ খুললেন যখন ট্রেন তখন হাওড়া ঢুকছে। এই সময়টায় নামার ভিড় কম, বরং ওঠার চাপ বেশি। বাঙ্ক থেকে ছাতা হাতে নিয়ে স্টেশনে পা রাখলেন শিবাজি। এবার একটা ট্যাক্সি ধরলেই বাড়ি। একহাতে ছাতাটা নিয়ে ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখলেন। ক্যাটকেটে তুঁতের জায়গায় ম্যাড়মেড়ে কালো। শিক বের করা। ক্ষয়াটে ডাঁটি। 

নামার সময় বাঙ্ক থেকে ছাতা নিতে গিয়েই গণ্ডগোলটা টের পেয়েছেন শিবাজি। হুবহু তাঁর বিয়ের ছাতার মতো একটা ছ্যাকরা রং মজে যাওয়া কালো ছাতা। কোনও সুইচ টেপার ব্যাপার নেই, একেবারে গায়ের জোরে কসরত করে খোলা আদ্দিকালের ছাতা। গা থেকে যেন পুরনো যুগের গন্ধ বেরচ্ছে। বাঙ্কের এককোণে অবহেলিত প্রেমিকার মতো গুটিসুটি মেরে পড়ে রয়েছে। ছাতাটা হাতে নিতেই বুকে যেন আনন্দধ্বনি বাজছে শিবাজির। 

ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়েই মোবাইলটা বন্ধ করলেন শিবাজি। এই প্রথম ছাতা জিনিসটাকে ভালোবেসে ফেলছেন তিনি।

আরও পড়ুন...

Categories
2022-nov golpo

একটি পাগলী ও কয়েকজন পুরুষ

গ ল্প

রি নি  গ ঙ্গো পা ধ্যা য়

rini2

একটি পাগলী ও কয়েকজন পুরুষ

খুব পেলব সঙ্গমের পর মন যেমন তুলো তুলো হয়ে যায়, ঠিক তেমন করে সে এগিয়ে আসছিল মোড়ের দোকানটার দিকে। এটা কলকাতা শহরই, তবে এক্সটেনডেড। এখানে বড়ো বড়ো হাউসিং আছে, কিছু দূরে শপিং কমপ্লেক্স আছে। বাকিটা নির্জন। গাছগাছালি, মাঠ, ডোবা বা বড়ো পুকুর। সামনেই হাইওয়ের মসৃণ রাস্তা। সাঁই সাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। সেই রাস্তার ধারেই মূর্তিমান বেআইনের মতো গজিয়ে উঠেছে এই ছোট্ট চা সিগারেটের দোকানটা। দোকানী বিশুই তাকে প্রথম দেখতে পেল। সম্পূর্ণ ন্যাংটো একটা মেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপন মনে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পাগল। বিশু এই ভোরবেলা দোকান খুলতে এসে এ দৃশ্য দেখে হাঁ হয়ে গেল। বিশু থাকে একটু দূরের বস্তিতে। তার দোকান থেকে বস্তিটা আবছা দেখা যায়। কী করবে বুঝতে না পেরে বিশু দু’একবার বস্তির দিকে তাকিয়ে নিল। এখান থেকে শুধু ঝুপড়িগুলোই দেখা যায়। তার বেশি কিছু নয়। মেয়েটা রোগা। কিন্তু মাইদুটো জব্বর। ছত্তিরিশ না হয়েই যায় না। মেয়েটা হাঁটছে, আর ও দুটো লাফাচ্ছে। বিশু কেমন মোহিত হয়ে যাচ্ছিল। তার জিভ জলজলে হয়ে গেছে। চোখ দুটো চকচক করছে। বারবার এপাশ ওপাশ দেখছে আর মেয়েটাকে। পাগল মেয়েটা ততক্ষণে দোকানের সামনে বিশুকে দেখে দাঁড়িয়ে গেছে।

একটু জল দিবি? জল! খুব তেষ্টা পেয়েছে! একটু জল দিবি!

এতোটা কাছ থেকে মেয়েটাকে দেখে বিশু এবার একটু অবাক হয়। মেয়েটার সারা শরীরে ভিজে মাটি লেপ্টে রয়েছে কাদার মতো। সেই সঙ্গে ওর পা বেয়ে রক্ত নামছে। হাতে বুকে আঁচড়ানোর দাগ। বোঁটা দুটোর কাছে রক্ত না কাদা জমাট বেঁধে আছে বোঝা যাচ্ছে না। ঠোঁটে গালে রক্তের ছোপ। বিশুকে ওরম তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা হঠাৎ হেসে ফেলল,

দেবো, তোকেও দেবো। আমার মাই দুটো, আমার গুদ, তোকেও দেব। এখন নিবি??

বিশু হঠাৎ কি বলবে বুঝতে পারে না।

মেয়েটাই বলে ওঠে, একটু জল দিবি!! জল! 

বিশু ভাঁড়ে করে ওকে জল খাওয়ায়। আশপাশ দিয়ে তখন হুসহাস গাড়ি যাচ্ছে। দু’একটা গাড়ি থেকে একজোড়া দু’জোড়া চোখ ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাউসিং থেকে একটা গাড়ি বেরল। বিশুকে আর মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে গেল। প্রায় বিকারহীন। বড়োলোকেরা এমনই হয়। উদাসীন গোছের। পৃথিবীর চরম বিস্ময়েও তারা বিস্মিত হয় না। টাকা তাদের অবাক হওয়ার আনন্দটাই কেড়ে নিয়েছে। আর এ তো বোঝাই যাচ্ছে সমস্যার ব্যাপার। বিশু বয়াম খুলে মেয়েটার জন্য দুটো বিস্কুট বের করে ওর হাতে দেয়। 

মেয়েটা গদগদ হয়ে হাসে। বিস্কুট হাতে নিয়েই খেতে শুরু করে। 

বিশু বলে, এখানে বসো। আমি আসছি।

মেয়েটা হঠাৎই তড়িৎ গতিতে বিশুর পায়ে পড়ে যায়।

যেও না, যেও না, লক্ষ্মীটি। আমার বাচ্চাটা দিয়ে যাও।

বিশু আরো এক প্রস্থ অবাক হয়। সঙ্গে বাচ্চাও ছিল! বাচ্চাটার তবে কী হল? বিশু থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসাই করে বসে, তোমার বাচ্চা আছে? 

মেয়েটা হাসিহাসি মুখে বিশুর দিকে তাকায়। হ্যাঁ, হবে তো। আমার বাচ্চা হবে তো। তুই দিবি।

বিশু আকাশ থেকে পড়ে। একথার মানে সে বুঝে উঠতে পারে না। ওদিকে মেয়েটার পা থেকে থোকা থোকা রক্ত বেরিয়ে থাইয়ের পাশে জমাট বাঁধছে, গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দেখে বিশুর বমি উঠে আসতে চায়। দৌড়ে যায় সে বস্তিতে। প্রায় নিঃশব্দে ডাকে তপনা, বিল্টু, ব্যাঁকা, ঘন্টিকে। ন্যাংটো মেয়ের কথা শুনেই ওদের খাড়া অবস্থা। প্রায় দৌড়ে চারজন চলে আসে। মেয়েটা তখনও বসে বসে বিস্কুট খাচ্ছে। ওদের দেখে মেয়েটা প্রথমে একটু ভয় পায়। তারপর পেটের নিচের অংশ সামনের দিকে বাড়িয়ে ছেনাল মেয়েদের মতো ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

চুদবি?? আমাকে তোরা চুদবি?? কিন্তু লাগাবি না বল!! সেদিন ওরা খুব ব্যথা দিয়েছে। দেখ, রক্ত, রক্ত পড়ছে… তোরা ব্যথা দিবি না তো! ব্যথা দিবি না তো!!

বিল্টু বলে, শালা গাঁড় মারানি, সক্কাল সক্কাল কাকে তুলেছ গো বিশুদা!! পাখি যে নিজেই ছটপট করছে বাঁড়া! বলে সে নিজের হাতটাকেই খানিক ছটফটিয়ে নেয়। 

ব্যাঁকা বলে, এই, এই ওকে বিলের ধারের মাঠে নিয়ে চল। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।

উঁউউউ, খুব শখ বানচোদ। এখখনি চাই একেবারে। সবার আগে খাবি না কি রে ব্যাঁকা!

তপনা খিঁচিয়ে ওঠে। 

ঘন্টি বলে, শালার ব্যাঁকা তো, বাঁড়ার তাই খিদে বেশি। ব্যাঁকার যৌনাঙ্গে হাত দিয়ে বিশ্রী ইঙ্গিত করে। বাকিরা হেসে ওঠে। পাগলীটাও ওদের সঙ্গে হাসতে থাকে।

তপনা বিল্টুকে বলে, একটা কাপড় টাপড় নিয়ে এসে মাগীটাকে পরিয়ে দে। তারপর সারাদিনের জন্য কোথাও একটা শাল্টিং করতে হবে।‌‌ রাতে হবে যা হবার। 

পাগলী আবার হাসে। বলে, রাতে বাচ্চা হবে। কী মজা বাচ্চা হবে। সে হাততালি দিয়ে লাফাতে থাকে। 

হেই, পোঁদ মারানি, বলে কী রে!! বাচ্চা হবে। খুব শখ না কি বাচ্চার মামনি। চলো তোমাকে পাঁচ পাঁচটা বাচ্চা দেব। তপনা পাগলীর থুতনি ধরে নেড়ে দেয়। 

রাতে ওরা সব বিলের ধারে উপস্থিত হয়। মুখে গামছা বেঁধে কেউ কোনো কথা বলে না। পাগলীকে নিয়ে রঙ্গ তামাশা শুরু হয়। একসঙ্গে পাঁচজনে ওরা হামলে পড়ে। পাগলীর স্তন, পেট, যোনি, শ্রোণিদেশ নিয়ে খাবলা খাবলি করতে করতে ওরা খুব মস্তি করে। প্রত্যেকেই দু’বার, তিনবার, চারবার যতবার ইচ্ছে… পাগলীটার কষ্ট হচ্ছিল। তবু সে সবাইকে আদর করে কাছে টেনে নিচ্ছে। আর মুখে তার একটাই কথা, আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা। তবে ওরা তখন ওসব শোনার অবস্থাতেই নেই। শুনলেও ওদের কানে পৌঁছচ্ছে না সে কথা।

খানকি মাগীর কি চোদনের নেশা মাইরি!! এতগুলো লোক চুদছে শালা, একবার উফ করছে না! 

শুধু ব্যাঁকার কানে বারবার ধাক্কা মারছিল- আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা।

প্রত্যেকবার শব্দটা উচ্চারণ হচ্ছে। আর ব্যাঁকার মাথায় যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে। যেন মাথার অতল থেকে কী একটা পাক খাচ্ছে তার চোখের চারপাশে। যতবার আমার বাচ্চা বলছে, কার যেন মুখ ভেসে আসছে। ঠিক চিনতে পারছে না ব্যাঁকা তাকে। কে যেন! ভীষণ চেনা। তবু কিছুতেই মনে পড়ছে না। ব্যাঁকা আর পারছে না। ও পাগলীটার পাশেই মাটিতে বসে পড়ে। বন্ধুরা একে একে করে চলেছে। ব্যাঁকা পাশে বসেও যেন দেখতে পাচ্ছে না। এই কুয়াশা জড়ানো হালকা শীতের রাতেও ব্যাঁকা প্রবল ঘামছে। তার মনে হচ্ছে এই ‘আমার বাচ্চা’ শব্দটা তাকে যেন তাড়া করছে! তাকে যেন মেরে ফেলতে পারে এই শব্দবন্ধ। ব্যাঁকা উঠতে চেষ্টা করে, পারে না। তার চোখের সামনে পরপর কতকগুলো দৃশ্য পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। এক খানকি মাগী শালা আদ্ধেকটা মাই বের করে দরজায় দাঁড়িয়ে খদ্দের ধরছে। খদ্দের একটা বাচ্চাকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। বাচ্চাটা দিনের পর দিন ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

তারপর সেই ছেলেটাই একটু বড়ো। শালা যেন ফিল্ম চলছে চোখের সামনে। একের পর এক সিন… ব্যাঁকা কিছুতেই বেরোতে পারছে না এই সিনের ঘোরালো নেশা থেকে। সে দেখতে পাচ্ছে নেশার ঘোরে মাগীটার কাছে পয়সা চাইছে ছেলেটা। মাগীটা শালী মেরে দিল ছেলেটাকে, ঠাস করে একটা চড়।

ছেলেটা ক্ষেপে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাগীটার ওপর। দেওয়ালে ঠেসে ধরে মাগীটাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিচ্ছে…. আর মাগীটা বলছে, মাগীটা বলছে…

ব্যাঁকা ঘোরের মধ্যেই কিল চড় ঘুষি মারতে থাকে তপনাকে। ওর চোখের সামনে তখন ভাসছে ওর মা’র মুখ।

তপনা মার খেয়ে ছিটকে যায়। ব্যাঁকাকে উল্টে দু’চার ঘা মারতেই ব্যাঁকা কাঁদতে শুরু করে। তারপরই হুড়হুড় করে বমি করতে থাকে। 

ওদিকে রাতের কুয়াশায় ভেসে উঠৈছে পুরনো দিনের তেমহলা বাড়ির সিংহদরজা। সাদা কাপড়ে আলতা রাঙা ছাপ ফেলে নতুন বউ প্রবেশ করছে বিরাট জমিদার পরিবারে অনেক স্বপ্ন আর একটু একটু ভয়কে সঙ্গী করে। তার সুপুরুষ স্বামী, উথলানো সংসার, বিত্ত সবই তার কাছে স্বপ্নের মতো। শাশুড়ি মা বরণ করছেন আর বলছেন, এ বাড়ির বংশধর আনার দায়িত্ব তোমার। যত শীঘ্র সম্ভব আমরা নাতির মুখ দেখতে চাই !

মেয়েটি বিস্মিত হচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে না। আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে লজ্জা পাচ্ছে। এ দাবির মধ্যে কোথাও অন্যায্য কিছু নেই, এই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু দৃশ্যের পর দৃশ্য পাল্টে যাচ্ছে। যে হাত একদিন আশীর্বাদ হয়ে মাথায় উঠেছিল, তা এখন হিংস্র ভাবে চুলের মুঠি ধরে দরদালান থেকে সিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছে। বাঁজা বলে তীব্র আক্রমণ চলছে। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অচৈতন্য মেয়েটি ডাস্টবিনের পাশে জেগে উঠছে। বিস্ময় নয়, স্বাভাবিক….. ওদের যে বংশধর চাই। বংশধর এনে দিতে হবে। মেয়েটির মনে এখনো কোনো প্রশ্ন নেই। তার একটা বাচ্চা চাই। আর কিছু না। একটা বাচ্চা…

তারপর সব কিছুই অস্পষ্ট… ধোঁয়া ধোঁয়া… বাচ্চা চাইতে চাইতে কখন যে প্রাণের কাপড়টাও তার নেই হয়ে গেছে সে আর খেয়াল করে না। অত্যাচারে দীর্ণ হতে হতে তার মনে হয় সন্তানের জন্য সাধনা… এটুকু কষ্ট যে করতেই হবে। ওই দরদালান জুড়ে খসখসে নতুন শাড়ি, ঠিনঠিনে কঙ্কণ, আঁচলের গোড়ায় বেঁধে রাখা একগুচ্ছ চাবির ঝুনঝুন, চাকরবাকরদের ছুটোছুটি আর ছেলে কোলে করে মেয়েটি… এইসব পূর্ণতার জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অত্যাচারিত হয়ে যাওয়া। কোথায় সেই সব পেয়েছির দেশ আজ আর মনে পড়ে না। তবু আছে কোথাও! পৃথিবীর কোনো প্রান্তে! প্রশ্ন নয়, বিস্ময় নয়, আছে স্বাভাবিক সুখটুকু।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_aug golpo

রাশিচক্র

গ ল্প

ফা ল্গু নী   ঘো ষ

falguni

রাশিচক্র

হলুদ চটা ছেড়ে যাওয়া দেওয়ালে একমাত্র সজীব নিশান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার পাল্লা দু’টি। টুকটুকে সবুজ রঙের। সে পাল্লায় জঙধরা কড়াগুলি বেমানান যেন। ঘন সবুজ জঙ্গলের বন্ধুত্বে এ পাল্লার অবস্থিতি হলে ছ্যাতলাপড়া গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মানানসই হত এ আবহটি। দরজা থেকে নজর একটু উপরের দিকে দিলে দেখা যাবে ঘোলাটে রঙের একটি সাইনবোর্ড। অনেক বছরের পুরনো তা সহজেই বোঝা যায়। আসল রঙটি ছিল দুধসাদা। দীর্ঘ দিনের অযত্ন, রোদ জল ঝড়ের সখ্য সে ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার উপরে ঝকমকে লাল রঙে লেখা কয়েকটি শব্দ–

‘সৌভাগ্য’

জ্যোতিষ আচার্যা ইন্দ্রাণী

সমস্ত রকম দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে

বদলের ইঙ্গিত দেওয়া হয় এখানে।

পথচলতি দুর্ভাগা মানুষ এখানে পা না রাখতেই পারে। কারণ মনে মনে সে হয়তো ভাববে যার নিজের বিজ্ঞাপনটিই ম্যাড়মেড়ে ধুলোমলিন, সে আর আমার দুর্ভাগ্যের গতিপথ কোন বিদ্যাতেই বা বদলাবে! কিন্তু যারা হাতেনাতে ফল পেয়েছে, ঘটে গেছে কোনো মির‍্যাকল, তাদের সূত্র ধরে গুটি গুটি কিছু পা প্রায়শই এসে দাঁড়ায় সৌভাগ্যে’র দরজায়। 

কার চাকরি হচ্ছে না, কার জমিজমা সংক্রান্ত আইনি গোলযোগ, মামলা-মোকদ্দমার হালহদিশ সব সমাধান রাশি -দিনক্ষণ- জন্মকুণ্ডলী মিলিয়ে করে দেন জ্যোতিষ আচার্যা। এবং সে সমাধান অব্যর্থ। সৌভাগ্যে’র দরজা দিয়ে ভিতরে পা গলালে কেমন যেন বিশ্বাস ভর করে আসে। মনে হয় ভাগ্যের বন্ধ দরজা খুলবেই।

ছোট্ট ঘরের চারকোণে চারটি উজ্জ্বল সাদা আলো। তবে আলোগুলি বৃত্তাকার ব্যাসার্ধে ছড়ায় না বেশি। ফলত আলো আবছায়ার চালচিত্র রচিত হয় সুনিপুণভাবে। অনেকটা সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্যের জলছবি যেন, পাশাপাশি আলো আর ছায়া। জ্যোতিষ আচার্যার আসনের উল্টোদিকে যে সবুজ টুকটুকে দরজার পাশে ভিতরের দিকের দেওয়াল সেখানে কালচক্রাকারে জল, পৃথিবী, বাতাস, আগুন ঘুরছে। যে পঞ্চভূতের সমন্বয়ে আমাদের দেহ গঠিত সে পঞ্চভূতের উপাদান মানুষের চরিত্র আর মনেও প্রভাব ফেলে। যেন এক একটি মানব চরিত্র এক একটি দিক। মূল চার দিক নির্দেশের চিহ্নগুলি পৃথিবী থেকে অন্তরীক্ষে ঘুরে ঘুরে ফেরে। একদিকে ক্ষিতি, আরেকদিকে অগ্নি, একপাশে অপ এবং অন্যদিকে মরুৎ। এসব চিহ্ন মিলিয়ে বারোটি রাশির জাতক জাতিকাদের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই মিলে যায়।

যারা জ্যোতিষের এসব হিসেব নিকেশে মুখ বাঁকিয়ে হাসে বা বুজরুকি মনে করে উল্টে তাদের দিকেই তাকিয়ে হাসেন আচার্যা ইন্দ্রাণী। নাতনির হাতের রেখা দেখেই নিতাই মজুমদারকে ইন্দ্রাণী বলেছিলেন, মেয়ে বেশ একগুঁয়ে আর স্বাধীনচেতা। ধনু রাশির জাতিকা তো! খুব সামলে সুমলে রাখবেন! তখন তাঁর কথা নিয়ে সে কী হাসাহাসি! অথচ আজ! আজ চারিদিকে শুধু বুনবুনি আর নান্টুর বিয়ের চর্চা। ইন্দ্রাণী জানে আগুনে মেয়েগুলো একটু এরকম হয়! 

আর্থ, ফায়ার, এয়ার, ওয়াটার- এই চার চিহ্ন অনুযায়ী আচার্যার গণনায় মানুষের স্বভাব বৈশিষ্ট্য কিছুতেই অমিল হয়নি আজ অবধি। শুধু একবারই নীরব থেকেছিলেন তিনি। হালদার বাড়ির মেয়েটার যখন ডিভোর্স হয়ে গেল। মেয়ের বাবা এসে বলেছিল– ‘আপনার সব বুজরুকি! এত বিচার করে জন্মছক, কুণ্ডলী, রাশি, গণ, লগ্ন মিলিয়ে বিয়ে দিলাম! আপনি বললেন, না কি বৃশ্চিক আর মীনের রাজযোটক। দু’জনেই জল রাশির বৈশিষ্ট্যের। সরল তরল মন। কোনো জেদ ধরে বসে থাকে না। মানিয়ে গুছিয়ে নেয়…’

ইন্দ্রাণী শুধু বলতে গিয়ে ঠোঁট দুটো নেড়েছিলেন যে, দুজনেই জল রাশি হলে এমনটা হওয়ার কথা নয়… কিন্তু তাঁর সে বাক্য জিভের মধ্যে শুকিয়ে পেটের পথে সেঁধিয়েছিল।

‘ছাড়ুন তো! আপনার রাশি আর তার ঠিকুজি কুষ্ঠী! জামাইয়ের কী খুনে রাগ! জলরাশি না ছাই! মেয়েটাকে সময় মতো ডিভোর্স না করালে এতোদিনে খুন করেই দিতো বোধহয়! আর কোনো মেয়ের এভাবে সর্বনাশ করবেন না! এসব ধান্দাবাজির ব্যবসা বন্ধ করে শাড়ি গয়নার দোকান দিন…’। বলতে বলতে গজগজিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা লাগান মেয়ের বাপ।

আচার্যার সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল, নিজের অক্ষমতায় নয়। মানুষের অবিশ্বাস দেখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহ নক্ষত্রও স্থান পরিবর্তন করে, সে কথা মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। বোঝেও না, বুঝতে চায়ও না। তখন আরো গভীর বিচার, গৃহশান্তি, গ্রহরত্ন ধারণ করার দরকার পড়ে। আজকাল আচার্যা ফলত বিয়ে বা প্রেমের ভবিষ্যদ্বাণী করেন না তেমন। কেউ জোরাজুরি করলে যদিও উপায় বাতলে দেন, তার সঙ্গে পরামর্শও থাকে সব কিছু বুঝে শুনে চলার।

তবে ইদানীং তিনি আরো গভীর খোঁজে মত্ত। মেয়েটি প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি, যেখানেই গিয়ে দাঁড়ায় মাতিয়ে দেয় সবাইকে। ভাব-ভঙ্গি, ইশারা-ইঙ্গিতে জমিয়ে দেয় সবাইকে। ঠিকুজি-কুষ্ঠী, জন্মলগ্ন সবই ভালো, শুধু আগুনে ফাঁড়া আছে। ওইটাই ভাবিয়ে রেখেছে আচার্যাকে। আজকাল কেস তেমন আসে না। এলেও বাইরের ঘরে অ্যাসিস্ট্যান্টের হাতে ছেড়ে দেন। চার মহাকালচক্রের পাশেই দরজা ফুঁড়ে একটি ছোট্ট বিশ্রামঘর বানিয়েছেন তিনি। সেই সকালে চাট্টি নাকে মুখে গুঁজে চলে এসে সন্ধে অবধি থাকা। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট জানে দুপুরের দিকে ঘন্টা দুয়েক আচার্যা গড়িয়ে নেন। 

আসলে ওই সময়টাই প্রশস্ত খোঁজার জন্য। মেয়েটি যে বড় ভালো। রাশি, লগ্ন, গণ, দোষ, নিপুণভাবে মেলালে কি  আর ভালো স্বভাব চরিত্রের ছেলে মিলবে না! এক দুটো ক্ষেত্রে না হয় ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁকে সফল হতেই হবে। ভাবতে ভাবতে চোখ মুখ দৃঢ় হয়ে ওঠে নিজের অজান্তেই। সামনে কোনো যুবক চাকরি বা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে এসে দাঁড়ালে কুষ্ঠী বিচার করে যদি দেখেন, যে জলরাশির মানুষ। চোখের পাতা নরম হয়ে আসে ইন্দ্রাণীর। মনে হয় এরকম নরম, ধৈর্যশীল, শান্ত মানুষ ঠিক বুঝবে প্রাণচঞ্চলতাকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই খটকা আসে। যদি না বোঝে! কখনও ভুল করে আর ভুল স্বীকার না করে! জলরাশির মানুষদের যে এটাই সবচেয়ে বড় দোষ।

আজকাল রাস্তা ঘাটে, বাসে ট্রেনে মানুষের মুখ চোখ দেখেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কোথায় কোন স্বভাব বা চরিত্র বৈশিষ্ট্য থেকে হাসিখুশি মেয়েটার জোড় খুঁজে পাওয়া যায় কে বলতে পারে! ধীর, স্থির, ধৈর্যশীল, ছটপটে, বিরক্ত, হাস্যমুখ, অশান্ত কতো রকম মানুষ আশেপাশে। হাস্যমুখ, ধৈর্যশীল, শান্ত মেজাজের মানুষ আচার্যার তালিকায় প্রাধান্য পায়। কিন্তু ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ট্রেন ক্যানসেল শুনে হতাশ হয়ে যাওয়া মুখ দেখে নিজেই অধৈর্য হয়ে পড়েন আচার্যা! মাথা নাড়েন, নাঃ! হবে না! এরকম মানুষ বাতাসের মতো ফুরফুরে মেয়েটাকে কী করে সামলে রাখবে! ছটফটে বিরক্তি ভরা মানুষেরা আগুনে রাশির না হয়ে যায় না। মেয়েটার যে আবার আগুনে ফাঁড়া আছে! 

বৃত্তাকার জটলাকে ঘিরে আরো বৃত্তাকারে হাসিগুলি ছড়িয়ে পড়ছিল আকাশে বাতাসে। মিশে যাচ্ছিল রেণু রেণু হয়ে ধ্বনি, প্রতিধ্বনি, উপধ্বনি। জটলাটি পাড়ার মহিলা মহলের। মফস্বল এলাকা বা গাঁ-গঞ্জে এখনও দেখা যায় এরকম বৈকালিক আড্ডা। এসব আড্ডায় কারো বাড়ির হাঁড়ির খবর থেকে পঞ্চব্যঞ্জনের স্বাদ যেমন থাকে, তেমনই এসব আড্ডায় ঘরোয়া সুখ দুঃখের পাঁচালিও পড়া যায়। শ্রোতারা মনোযোগ দিয়ে শোনে। আহা উহুও করে, আবার নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়ে মনে মনে বলে – “মিত্তির গিন্নীর টাকার খুব গরম; সুখের মুখ দেখছে এখন।” তেমনি মিত্তির গিন্নি চায়ের কাপ হাতে কত্তাকে বলে, “ঘোষেদের নতুন বউটা বড় ছিঁচকাদুনে। কথায় কথায় আমার কিছু নেই, আমার কিছু নেই বলে নাকি কান্না।”

তবে এসব জটলা প্রায়শই গড়িয়ে পড়ে বিয়ের বা প্রেমের আলোচনায়। কোন পাড়ার ছেলে এ পাড়ার কোন উঠতি মেয়ের সঙ্গে চুলবুলানি করছে, নয়তো কার মেয়ের বিয়ের ঠিক হল কী না! কে না জানে প্রেম আর বিয়ের রসের গাঢ়ত্বই আলাদা। সে গাঢ় রসে যদি মিঠিয়া উড়ে এসে বসে তো আরোই রস উপচে পড়ে। এই যেমন সেদিন ক্ষ্যাপা উদয়চাঁদের পুচকে মেয়ে বুনবুনি যে গোপনে ভচ্চাজদের নান্টুর সঙ্গে বিয়ে সেরে ফেলেছে, সে খবর মিঠিয়া না দিলে এদের জানাই হতো না। জটলার হল্লাগুল্লার পাশ দিয়ে মিঠিয়া দ্রুত বেগে চলেই যাচ্ছিল। ওদিকে জটলা তো হেসে হেসে ফুলে ফেঁপে উঠেছে বর্ষাকালীন বাঁধভাঙা নদীর মতো। স্বাভাবিকভাবেই নদীর স্রোত মিঠিয়াকে ঘিরে ধরল, “কি রে মিঠিয়া, এত তাড়াতাড়ি চললি কোথায়…”

“ইককুল পাড়া… ইককুল পাড়ায়…”। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত প্রৌঢ় মহিলাটি ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে, “এতো বয়েস হলো! ধিঙ্গিপনা আর কবে যাবে তোর!”

“ইঁইই… বুনি বুনি… উলুলুঁ… উলুলুঁ…… ও পাড়ার নান্টুর বউ বুনি… যাবঁ যাবঁ…”

মিঠিয়া বলে কী! ঐটুকু পুঁচকে মেয়ে বুনবুনির পেটে পেটে এতো বিয়ে করার শখ ছিল! আর মিঠিয়াও তেমনি! সারা দুনিয়ার সবার বিয়ের খবর না রাখলে যেন তার চলে না। জটলায় রঙ্গ রস চলতে থাকে। সঙ্গে চলে চটুল আলোচনা। হঠাৎ মুখুজ্যে গিন্নির বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মিঠিয়া বলে ওঠে, “রিনা … রিনা… বড় হবে। ইককুল পড়বে…… তারপর রিনার উলুলুঁ হবে…”

এতক্ষণ মুখুজ্যে গিন্নি বেশ রসিয়ে রসিয়ে শুনছিলেন। হাসছিলেন একগাল ভরে। কিন্তু এইবার হাসিটি গেল বন্ধ হয়ে। বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আমার এত ছোট মেয়ে। ওর এখন থেকে বিয়ে বিয়ে আবার কী রে মিঠিয়া…”

মিঠিয়া হি হি করে হাসতে হাসতে সরে যায় জটলা থেকে। মিত্তির গিন্নি মুখুজ্যে গিন্নির মুখ পড়ে নেন মুহুর্তে। কলকলিয়ে বলে ওঠেন, “খোনা গলায় পাগলামি করলে কি হবে! মিঠিয়ার পেটে পেটে অনেক বদবুদ্ধি আছে!”

প্রৌঢ় মহিলাটি মুখ বেঁকিয়ে বলেন, “হবে না! কোন মা বাপের মেয়ে দেখতে হবে…! সারাদিন ঘরে মা-বাপের টিকি থাকে!” যে যার বিরক্ত মুখে ঘরে ফিরে যায়। অন্যের ছেলে মেয়ের বিয়ে, প্রেম, স্বভাব চরিত্র নিয়ে আলোচনায় যতো রসের মাছি ভনভন করুক না কেন, নিজের নিজের ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে সে রস গেঁজে ওঠে প্রায়শ। সুতরাং বিরস বদনে যে যার বাড়ির পথ ধরে অগত্যা। আসর ভেঙে যায় সেদিনের মতো।

মেয়েটার নাম মিঠিয়া। তবে গলার আওয়াজটি নামের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সম্পর্ক বেঁধে রেখেছে। বহু দূর থেকেও এলাকার যে কোনো মানুষ নিশ্চিত হয়ে বলে দেবে এ আওয়াজ মিঠিয়ার। এমন খোনা খোনা ফাটা কাঁসরসম গলার আওয়াজ এ অঞ্চলে একমাত্র মিঠিয়ারই। কেন তার গলার আওয়াজ এমন খোনা বা কাঁসরফাটা হলো সে নিয়ে এলাকায় গুঞ্জন ওড়ে বিস্তর। কেউ কেউ বলে জন্মদোষ কেউ বা বলে অন্য কিছু হবে! আসলে কোনো না কোনো সূত্রে মিঠিয়াও ঐ বৃত্তাকার জটলার অংশভাগিনী। আত্মীয়গুষ্টির মধ্যে কবেই বা তেমন নিন্দেহীন ভালোবাসা জায়গা পায়! 

গলার আওয়াজ যতোই উত্তাল হয়ে কানে গিয়ে ধাক্কা দিক না কেন, কেউ যদি মিঠিয়ার চলে যাওয়ার পথরেখায় দৃষ্টি পাতে তো দেখবে, এক সহজ সরল ছন্দের দোলাচল। ঋজু তার ভঙ্গী। কোঁকড়ানো কালো একরাশ চুলের ঢেউ সহজ সরল ছন্দের তালে আনমনে খেলে ফিরছে। পরিছন্ন পরিপাটি পোশাক পরিচ্ছদ। কিন্তু মিঠিয়ার চলে যাওয়াটি ঘুর পথে এঁকেবেঁকে আপনার কাছে যখনই ফিরে আসবে, ঠিক তখনই আপনার আন্দোলিত মন চেতনার কাছে সজোরে এক থাপ্পড় খাবে। আপনি অবাক বিস্ময়ে দেখবেন, যার গমন পথের দৃশ্য দেখে মন বলে ওঠে আহা! সেরকম কিছু ইত্যাকার ভাবনার মিথ্যে হয়ে যাওয়া। দেবীস্বরূপ সে সামনে এসে দাঁড়ালে আপনি চমকে উঠবেন। এত জীর্ণ চামড়ার আবরণে কোনো যুবতী কি মুখ ঢেকে থাকে! কোনো এক অতি প্রাচীন পোড়া মাটির মন্দির বহু কালের ক্ষয়ে যে এবড়োখেবড়ো শ্রীহীন রূপ ধারণ করে তেমনই অনুজ্জ্বল ম্যাড়মেড়ে চামড়ায় সজীব ও উজ্জ্বল একজোড়া কৌতুকী চোখ আপনার দিকে চেয়ে থাকবে।

মিঠিয়ার চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায় জীবনের প্রতি অনিঃশেষ কৌতুক তার। জেদ করেই একসময় স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। পড়াশোনা, জ্ঞান এসব কিছু তাকে আকুল করে না তুললেও ‘পাশ-ফেল’ শব্দবন্ধটি মাথায় ভালোভাবেই গেঁথে গিয়েছিল তার প্রাইমারি বেলায়। প্রতিটি ক্লাসে দ্বিবার্ষিক পঠনপাঠনের পর ‘পাশ’ এই সুযোগটি আসতো মিঠিয়ার জীবনে। পোড়া মুখে দু’চোখের মণি উঠত ঝিকিয়ে। সারা দিনমান তার মনে তখন একই ধুন—‘আমি পাশ… আমি পাশ… জানিস জানিস মাস্টার আমি পাশ…।’ সম্বোধনে অস্বস্তি মিঠিয়ার জন্মগত নয়।

মিঠিয়া ছাত্রী হিসেবে একই ক্লাসে দু’বার করে থাকলেও বয়েস কোনো খুঁটিতে বাঁধা থাকে না। সুতরাং সপ্তম অষ্টম শ্রেণির গণ্ডিতে সে মনে ও শরীরে পূর্ণবয়স্ক যুবতী। স্বভাবতই প্রেম, বিয়ে এসবে তার নজর গেছে বেশি। এলাকায় কবে কার বিয়ে, কোন কোন নতুন প্রাণে প্রেমের জোয়ার লেগেছে তা মিঠিয়ার নখদর্পণে। বিয়েবাড়ি, বউ, আলো, সানাই, ফুলচন্দনের গন্ধ সে খুব উপভোগ করে। যে কোনো বাচ্চা মেয়েকে দেখলে তার মনে হয়, এরা একদিন বড় হবে। শরীর জুড়ে পাহাড়ি ঝরনার মতো নেমে আসবে নদী। সে নদীতে পা ডুবিয়ে বসে থাকবে তার প্রাণের পুরুষ! মনের মতো জুটি হয় যেন তারা, এই তার সবসময়ের প্রার্থনা।

রবিবার সকাল মানেই আয়েশ। সপ্তাহে এই দিনটাতে ঘর সংসার, রান্না খাওয়ার দিকেই নজর থাকে মজুমদার গিন্নির। তার সঙ্গে থাকে কতো বাড়তি কাজ। কাজ আর আয়েশ চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। সঙ্গী হয় ভালো মন্দ খাওয়ার শখ সাধ। আজকেই যেমন মিঠিয়া সকাল থেকে চ্যাঁচাচ্ছে, “মা চাউমিন করো, চাউমিন করো!” মেয়ের সেই আব্দার মেটাতে কোমর বেঁধে লেগেছেন মজুমদার গিন্নি। চাউমিন সেদ্ধ হয়ে গেছে। সবজি ভেজে তাতে চাউমিন দিয়েছেন সবে। বাতাসে বাস ছড়িয়েছে। এমন সময় টুনা আর মিলির মা বারান্দায় এসে বসলো। এরা সবই মজুমদার গুষ্টির। এদের রবি, সোম, বুধ সব দিনই সমান। “এই এখন বকবক শুরু হবে…” মনে মনে বলল মিঠিয়ার মা। তবু পাড়াঘরের রেওয়াজ, অতিথি এলে সম্ভাষণ করতেই হয়।

“বলো বৌদি কেমন আছ?”

“আর কি বলবো বলো! তোমরা সারাদিন নিজেরা সব ব্যস্ত, তাছাড়া সারা সপ্তাহে রবিবার ছাড়া তোমাদের দেখা পাওয়া ভার।” মিলির মা ঢোঁক গিলে বলেন। মিঠিয়ার মায়ের মেজাজ বোঝা ভার। মিঠিয়ার মা টুনার মায়ের দিকে তাকান। এই মহিলা অনেক ভদ্র সভ্য। মৃদু হেসে টুনার মা বলে, “ঐ যে বুনবুনি আর নান্টু বিয়ে করে নিয়েছে… কী সাহস ঐটুকু মেয়ের!” মৃদু হাসেন মজুমদার গিন্নি। বলেন, “কী বলবে বলো দিদি! খুব অস্থির আর অশান্ত মেয়ে তো… ও মেয়েকে ধরে বেঁধে রাখা কষ্টের।”

“তা বলে এভাবে লোক হাসাবে, ছিঃ! খবর তো তোমার মিঠিয়াই দিলো”— মুখ বাঁকান মিলির মা। 

“তোমাদেরও বলিহারি যাই! অতো বড় মেয়েকে বাইরে ওভাবে চরে বেড়াতে দাও কেন! কোন দিন কী বিপদ না হয়ে বসে!” টুনার মায়ের গলায় স্নেহ ঝরে। আড্ডাপ্রিয় মিঠিয়াকে এসব কলরব ঠেলে নিয়ে আসে আড্ডাস্থলে। যদিও মিঠিয়ার মা চান না মিঠিয়া এ আড্ডায় যোগ দিক। তবুও মিঠিয়া আসে। এসেই জুড়ে দেয় কলকল, “বুনি বুনি… উলুলুলুঁ… হি হি… হি হি…।” মিলির মা বাঁকা হেসে বলেন, “এবার তোরও উলুলুলু…।” এ কথা শুনে মিঠিয়া চরম খুশি হয়। একপাক নেচে নেয় বারান্দায় আনন্দের আতিশয্যে। যায় ছুটে মায়ের কাছে । মায়ের আঁচল ধরে পাক খেতে খেতে বাতাসিয়া হয়ে ওঠে আরো। মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে, “মা, মা আমার উলুলুলুঁ…” একমুখ হাসি নিয়ে নিজের সিঁথির দিকে ইশারা করে। মজুমদার গিন্নির ঘরোয়া আবহাওয়া তখন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। পড়শিরা ধীরে ধীরে সরে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে মিঠিয়ার উত্তেজনা তুঙ্গে। সে হাসছে… সে হাসিতে বারান্দা জুড়ে নামছে গোধুলি আলো। একটি পোড়া মুখ সে গোধুলি আলোয় হয়ে উঠছে মোহময়, রাঙা নেশাজড়ানো অস্তছবি। মজুমদার গিন্নি দাঁতে দাঁত কষে মেয়েকে শাসন করতে গিয়েও পারেন না। কতো কী মনে এসে জড়ো হয়।

এই তো সেদিন মিঠিয়া জন্মাল দুর্গাপুজোর আগে আগে। মা দুগগার মত রূপ নিয়ে জন্মেছিল বলে শাশুড়ি গৌরি ডাকতেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই বোঝা গেলো, মেয়ের গলার আওয়াজ খোনা। তখন থেকেই মজুমদার গিন্নি ঠাকুরের থানে হত্যে দিতেন। যদি কোনো পুজোআচ্চায় মিঠাস এসে বসে মিঠিয়ার গলা জড়িয়ে। এর আরো পরে মেয়েটার অত রূপ আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পোড়া মাটি করে দিলো। মিঠিয়ার মা আর দেরি করেননি। ঠিকুজি কুষ্ঠী ঘেঁটে, জন্ম ছক বিচার করে বুঝেছিলেন এ মেয়ের আগুনে ফাঁড়া। বুঝেছিলেন মিঠিয়ার শরীরে বায়ুর বৈশিষ্ট্য, তাই সে এতো অস্থির, চঞ্চল। নাহ, কোনো জ্যোতিষীর কথায় তাঁর ভরসা হয়নি। নিজেই গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে নড়ে চড়ে বসেছিলেন। শুরু হয়েছিল খোঁজ। এ সংসারে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী চোখ বুজলে মিঠিয়ার কী হবে!

তখনই বুঝেছিলেন আচার্যা ইন্দ্রাণী, মিঠিয়ার পাশে জলের মতো শান্ত, নরম অথচ মাটির মত ধৈর্যশীল মানুষ চাই। শুরু করেছিলেন রাশি মিলিয়ে মিঠিয়ার সৌভাগ্যের খোঁজ… আজও খুঁজে চলেন আচার্যা… আর মনে মনে স্বপ্ন দেখেন মিঠিয়ার মা… একমাথা সিঁদুর নিয়ে মিঠিয়া এ জন্মের মতো সুখে সংসার করছে। আকাশ বাতাস ভেসে যাছে একটিই ধ্বনিতে… উলুলুলুঁ… উলুলুলুঁ… 

আরও পড়ুন...

Categories
2022_july golpo

শ্রীকান্ত অধিকারী

গ ল্প

শ্রী কা ন্ত  অ ধি কা রী

srikanta

বাঁক বদল

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি কালো করগেট টিনের চালার সেই বাড়িটার সামনে। চারুদের বাড়ি। টিনের দরজায় ভেতর থেকে শেকল দেওয়া। দরজায় একটা ফুটো। অনায়াসে ফুটোতে আঙুল চালিয়ে দরজা খুলে আস্তে করে ডাকলাম— চারু…। সামান্য কয়েক পা সরু উঠোন পেরিয়ে চারুর এক খোপ ঘরের বারান্দার সামনে।

চারু কাঠের উনুনের ধারে। আগুনে মুখ লাল। এলোমেলো চুল। খোলায় চাল ফট ফট করে ফুটছে। চারু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ঠোটের কোণ ফাঁক। বললাম—চারু, আমাদের বাড়ি যাওনা কেন?

চারু নিরুত্তর। মাঝে মাঝে চ্যালাকাঠ আগুনের দিকে ঠেলে দিয়ে তুষের ছিটে দিচ্ছে। লক লক করে আগুনের শিখা নেচে উঠছে। ভাজা খোলায় গরম কালো বালিগুলোকে কুঁচি কাঠি দিয়ে নাড়তে থাকে। সেই অবসরে ওর মুড়ি ভাজার উনুনশালটা আবার অতি পরিচিতের মত আলাপ জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কালো দেয়ালগুলো আরো কালো হয়ে গেছে। থেবড়ানো মাটির দেয়ালে এখানে ওখানে খোলাঙ্কুচিগুলো আরও স্পষ্ট। টিনের চালে বহুদিনের পুরনো লম্বা ঝুলগুলো ছড়ানো চুলের মত আগুনের আঁচে তিরতির করে কাঁপছে। একদিকে গাদ হয়ে পড়ে রয়েছে ব্যবহৃত পলিথিনের ক্যারিব্যাগের বান্ডিল। আর এক কোণে স্তুপাকারে ঝুড়ি ঝুড়ি ঘুঁটে, চ্যালাকাঠ, শুকনো ডালের তাড়া। বস্তাখানেক তুষ। বাইরে বাথরুমের ভাঙা টিনের দরজাটা হাট করে খোলা। ঘরের মেঝেতে একটা থালা, তার চারদিকে ভেজা মুড়ি ছড়িয়ে। দেখলেই বোঝা যায় কেউ খেয়ে এঁটো গুটিয়ে নেয়নি।

—বোসো। চারু চাল নাড়া থামিয়ে বলল— ঐখানটায়।

কোনো ভণিতা না করেই বললাম, আমার মুড়ি চাই চারু। তোমার হাতের মুড়ি।

চারু খানিকক্ষণের জন্য চমকে উঠে বলল— অ্যাঁ!

— আমার পেটে ঐসব ছাইপাঁশ সহ্য হচ্ছে না চারু। আমার বাড়িতে তুমি মুড়ি দিয়ে এসো।

মনে হলো চারু এবার হেসে উঠল। বলল— বেশ। আজকে হবে না। এ মুড়ি অন্যদের বরাদ্দ। কাল বিকেলে।

ওকে থামিয়ে বললাম– না না, বিকেল হলে হবে না। অফিসের টিফিনে নিয়ে যাবো। তুমি সকালেই আমাকে দেবে।

চারু মাথা নেড়ে জানাল– তাহলে খুব ভোরে উঠতে হবে।

আগে লৌতুনিমাসির কাছে শুনেছি বেশি চাপ থাকলে ভোরে উঠে চাল ওলাতে হয়, তারপর মুড়ি ভাজলে বেশ ফুল ফোটার মত নরম খাস্তা মুড়ি ফোটে। খেতেও বেশ সুস্বাদু।

সেই সুস্বাদু মুড়ির প্রসঙ্গ মনে করেই বললাম– তাই করো।

জ্ঞানত জলখাবারে মুড়ি ছাড়া কিছুই খাইনি। ছোটবেলা থেকেই সকালে চা—মুড়ি। বড় স্টিলের গ্লাসে হাফগ্লাস র’চা। তাতে চারুর আনা কুড়কুড়ে মুড়ি যেন মোগলাই সরবতে মিছরির দানা। তারপর চামচ দিয়ে ঠুসে ঠুসে যতটা ঢোকানো যায় তার চেয়েও বেশি ঠোসানো মুড়ি। ততক্ষণে মুড়ি আর চায়ে মাখামাখি– আহা অপূর্ব! 

তখন এদিকটা অতটা শহুরে হয়ে যায় নি। বিকেলে গামছার কোঁচড়ে মা’র মাখানো তেলমুড়ি, হাতে আস্ত একটা পিঁয়াজ কিংবা মুলো। কিংবা কাঁচা বিলেতিবেগুন দিয়ে খাবলা খাবলা মুড়ি মুখে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গী সেই চারু। দু’দিকে লাল ফিতে বাঁধা ঝুটি নিয়ে একসময় পথ চলতে চলতে শুকনো মুড়ি চিবোনোর শব্দে পথেই হারিয়ে যাওয়া।  

সেই পথ এখন পাকা  হয়েছে। আমার জীবনে রমা এসেছে। তবু চারু ওর মা লৌতুনিমাসির অর্ধেক মাটি আর অর্ধেক ইটের ঘরে  থেকে গেল। আর আমার ঘরে মুড়ির জোগান দিয়ে গেল।

দেশি চালের মুড়ি, বিস্কুটের টিনে বাড়ি বয়ে দিয়ে যেত চারু। একদিন চারু আমার স্ত্রী রমাকে বলে, বেশ ক‘দিন আসতে পারব না গো। মা তো চলে গেল, আমি একা।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। যা! তাহলে খাবো কী? হাজার রকমের অসুখের ভয়ে আমার কলজে সেঁধিয়ে গেল। চারু কি আর আসবে না!

রমা বলল, ডোন্ট ওরি। পাড়ার মোড়ে ভজা মুড়ি ভাজার মেসিন বসিয়েছে। বস্তা নিয়ে গেলেই হলো।

মুড়ি তো এলো, মুখে রোচে না। কোনটাতে নোনতা লাগে, কোনটা আবার ফ্যানা কাটে। ইউরিয়া ভিজে জল না সোডা দেয় শুনেছি। কেউ কেউ আবার কেরোসিনের ছিটেও দেয় ভিজে চালে। বেজার মুখ দেখে রমা বলল, তোমার মুড়ি খেয়ে কাজ নেই। এই দ্যাখো আমাদের মতো দুধ—ডিম—পাঁউরুটি খাও। মুখে লাগবে, শরীরও ভালো থাকবে।

এদিকে চারুর পাত্তা নেই। শুনেছিলাম ওর বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যায় না। বরকে নিয়ে মায়ের উনুনশালে আবার মুড়ি ভাজতে শুরু করেছে। তবে যোগাযোগ ছিলই না একেবারে। ফোন নাম্বারও রাখা হয়নি। অগত্যা রমার কথামতো ডিমের সাদা অংশ দিয়ে ডিমটোস্ট খেতে শুরু করলাম। একসময়ে ডিমের সাদা অংশে হলুদ অংশ মাখামাখি হয়ে গেল।

এভাবে বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই বিকেল দিকে পেটে চাপ চাপ লাগছে মনে হলো। রমাকে বলাতে রমা বলল— ধুর! এমনিতেই তুমি বাতিকগ্রস্ত। ওরকম ছোটোখাটো ব্যাপার মাথায় এনো না। আনলাম না।                                                  

তার দু’দিন পরে অফিসের শেষবেলায় কেমন ধিকধিক করে বুকে ব্যথা শুরু হলো। অফিসের সুভাষদা সব শুনে বললেন— বদহজম থেকে অ্যাসিড। তারপর গ্যাস। মুড়ি খান বুঝলেন।

মুখ কুঁচকিয়ে বললাম—ঐ মুড়িই তো সর্বনাশ করলো।

—কিন্তু বাঙালির মুড়ি মানে চিনেদের চাউমিন, তামিল—তেলেগুর ইডলি—ধোসা। সহজাত বলে একটা কথা আছে। যে যেমন অভ্যাসে বড়ো হয় আর কি! আমরা বাঙালি, মুড়ি ছাড়া চলে? মুড়ি খান। আপনি বাঁচুন বাঙালির শিল্পকেও বাঁচান।

আর কোনো রিস্ক না নিয়ে ছুটলাম চারুর বাড়ির দিকে।

                                 

চারুর প্রতিশ্রুতি আমাকে অনেক ফুরফুরে করে তুলল।

পরদিন যথারীতি টিনভর্তি মুড়ি এলো। একটা কচি মুখের মেয়ে দু’দিকে লাল ফিতে দিয়ে মাথার মাঝে সিঁথি করে চুল বাঁধা।

রমা তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বলে, মুড়ি! কে পাঠাল?

— মা। কিশোরী সঙ্কুচিত।

বললাম, তুমি কে?

— আমি শিলা। আপনি কালকে আমাদের বাড়ি গেছিলেন।

রমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বলে, তুমি মুড়ি খাবে! তোমার না অ্যাসিডের সমস্যা? 

বললাম– টিনটা নিয়ে নাও।

— আর ঘরে আনা হেলদি ফুড!

রমার মুখ ভার। সেটা দূর করতেই বললাম, হেলদি ফুডও চলবে। মাঝে মাঝে মুখ পালটাতে মুড়ি।

কিন্তু সেটা কথার কথা। সকালে একবার, অফিসে একবার, অফিস ফেরত একবার। সাত দিন পেরল না টিন ফাঁকা।

রমা বলল, চারুকে খবর দাও।

বললাম, ফোন করে দিলেই তো হতো। আবার যাবো?

— ওর কি আদৌ ফোন আছে?

যখন থেকে বলা তখন থেকেই মনের মধ্যে সেই শান্ত নিরীহ মুখটা তোলপাড় করতে লাগল। একটা মেয়ে সারাজীবন উনুনে হাতা–কুঁচি—বালি—খোলা—খাপুড়ি—মুড়ি এই সব নিয়েই কাটিয়ে দিল। অন্যদিন হলে আটটায়—ও সকাল হতো না। আজ সূর্য ওঠার আগেই আমি বিছানা ছেড়ে দিয়েছি। ছাতে উঠে দু’একবার হাত—পা স্ট্রেচও করেছি। এমনকি প্রতিবেশী রামু সদগোল, যে কিনা দশ বছর ধরে আমার পাশেই রয়েছে। চোখে—চোখে কিংবা ঘাড় কাত করে ভাল থাকার রিহার্সাল দিয়েছি মাত্র, তাকে পর্যন্ত আমার গুমোর ভেঙে হাত নেড়ে ডেকে শুধিয়েছি – ভালো আছেন তো?

সারা সকাল এক অজানা উৎফুল্লতা সারা শরীরে ছড়িয়ে রইল।

মুড়ির বস্তাতে টিনের মুখটা উপুড় করে মুড়ি ঢালে চারু। ওর কচি লাউয়ের মতো মুখটা আমার অনেক কাছে। পলিথিনের বস্তায় মুড়ি পড়ার সরসর শব্দ। চারুর কানের কাছে আস্তে আস্তে বললাম– কেমন আছো চারু?

চারু মুখ তুলে ধরল। খানিকক্ষণ আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে রইল আমি লজ্জা পেলাম। বললাম— তোমার মেয়েটা কোথায়?

আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কোত্থেকে একটা দড়ি এনে বস্তাটা বেঁধে দিলো। তখনই দেখলাম ওর ব্লাউজটা ফাটা। খানিকটা তেলচিটেও বটে।

মুড়ির বস্তা হাতে নিয়ে বাইরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল চারু। বললাম– একটা ফোন নাও চারু।

চারু মাথা নাড়ে।

                                   

দিন পাল্টেছে। সাধারণ ঘরে আগে সকালে—বিকেলে জলখাবার বলতে শুধু মুড়িই থাকতো। চা—মুড়ি, গুড়—মুড়ি, দুধ—মুড়ি ,চপ—ঘুগনি—মুড়ি ছাড়া ভাবাই যেত না। এখন প্যাকেটবন্দি নানান খাবার। রুটি—পাঁউরুটি—বিস্কুট পাওয়া যায় পাড়ার দোকানগুলোতে। হাত বাড়ালেই ফাস্ট—ফুড। মনের মধ্যে কু ডাকে— চারু কি এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?    

দেশি মুড়ি ভাজা এমনিতেই অনেক ভজকট। শুনেছিলাম মুড়ি ভাজার হ্যাপা। একবার মুড়ি আনতে দেরি করেছিল বলে বিনা টিফিনে স্কুল গেছিলাম। রাগ হয়েছিল খুব। পরদিন যখন লৌতুনিমাসির সঙ্গে চারু মুড়ি নিয়ে এলো, দুম করে বলে ফেললাম— কী এমন করছিলে চাট্টি মুড়ি আনতে পারোনি। অমনি চারুও কোমরের দু’দিকে হাত রেখে তড়বড়িয়ে বলেছিল– তুমি জানো মুড়ি ভাজতে কত ঝামেলা! একজনকে চাল ধুয়ে নুনাতে হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে   দাঁতে কেটে দেখতে হয় খরা করে শুকিয়েছে কিনা। যদি কটাঙ না করে, তাহলে মুড়ি ভালো হবে না। তারপর আরেক জনকে বড়ো খোলাতে সব চাল উলাতে হবে। মানে বড়ো হাতা দিয়ে নেড়ে চেড়ে কষতে হবে মাংস কষার মতো। যতক্ষণ না তেঁতুলের বীজের মত রঙ না আসে। তারপর…

আমি বললাম, তারও পর?

—তারপর খাপুড়ির গরম বালিতে এক খাবল করে চাল দিলেই… উঁ, জানে না যেন! 

যাবার সময় বললাম— মুড়ি ভাজার বিজনেসটা বাড়াতে পারো। এখনো দেশি মুড়ি অনেকের পছন্দ।                                                          

আবারও কোনো উত্তর করল না। শুধু ক্লিশে হাসি হাসল।

বললাম— ব্যাঙ্ক—ট্যাঙ্ক থেকে সাহায্য নিতে পারো। বলো তো আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তো নানান প্রকল্প রয়েছে।

এবার সে কথা বলল— ভাববো। 

                                   

আমাকে নিয়ে রমার আর কোনো সমস্যা নেই। সময়ে মুড়ি ঘরে চলে আসে। সবসময় চারু না এলেও মেয়েকে দিয়ে মুড়ি ঠিক পাঠিয়ে দেয়। কখনো কখনো শিলাকে ডেকে বাড়ির ছোটোখাটো কাজ— তরকারি কাটা, পাশের মুদি দোকান থেকে নুন, সাবান কিংবা বিস্কুট এনে দিতে বলে। কখনো বা চারুকে রান্নাঘরের ভেতর ঢুকিয়ে ছ্যাঁচড়া, টক কিংবা কচি লাউয়ের পায়েস রান্নাটাও শিখে ফেলে।

সেদিন রমা বলল— পুজোতে চারুকে আর ওর মেয়েকে কাপড়জামা দিতে

হবে। একদিন দিয়ে এসো।

বললাম— আবার বাড়ি কেন? এখানেই তো ওরা আসবে, তখন না হয় দিও।

— বাড়ির কাছে পেয়ে উপহার দেওয়া ঠিক শোভা পায় না। ছুটির দিন দেখে

এক সময় দিয়ে এসো। রমা বলে, ওর বরটা আবার পালিয়েছে, জানো?   

বললাম– লটারির টিকিট বিক্রি—বাটা করত না?

—সে আর ক’দিন। উড়ে—আদিরে ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। লৌতুনিমাসি চারুর বিয়েটা ঠিকঠাক দিতে পারেনি। রমা গজগজ করে।

                                   

অনেকদিন পর আবার চারুর বাড়ি। সেই অভ্যাসবশে হাত ঢুকিয়ে বাইরের দরজা খোলা। তারপর হঠাৎ মনে হলো এভাবে দরজায় টোকা না দিয়ে দরজা না খুললেই হতো। তাই অকারণে টিনের দরজাতে লোহার শিকলের আওয়াজ করি। কিন্তু তাতেও কেউ এলো না দেখে কয়েক পা ভেতরে ঢুকতেই চমকে উঠি। চারুর উনুনশাল ভাঙা। আধপোড়া।  

মাথার ওপর চাল নেই। বাজপড়া গাছের মত খাঁকড়া চারটে পোড়া দেওয়াল নির্বাক দাঁড়িয়ে। উনুনশালের ভেতর দু’খানা ঝিকভাঙা উনুন ফাঁকা আকাশের দিকে তাকিয়ে হা—হুতাশ করছে। দেওয়ালের কোণে আধপোড়া দলা পাকানো সেই প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের গাদ। উপুড় করা ভাঙা খোলা খাপুড়ি। এক চটক দেখলেই মনে হবে এখানে একটা ঝড় বয়ে গেছে।

আঁতকে উঠি, চারুর কিছু হয়নি তো! চারু কোথায়? এদিক—ওদিক তাকিয়ে দেখি, ভেতরে মাটির মেঝেতে চারু শুয়ে। আমাকে দেখেই ওর চোখ ছলছল করে ওঠে। ইশারায় ডাকে। এক মুহূর্তে মনে হলো লৌতুনিমাসি শুয়ে। পরক্ষণেই ভুল শুধরে কাছে গিয়ে শুধোলাম– শিলা কোথায়?              

—আসছে। মুদিখানা গেছে।

হাতের প্যাকেটটা ওর পাশে নামিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করি— শরীর খারাপ বুঝি?

চারু নিস্পৃহ চোখে প্যাকেটের দিকে চাইল।

বললাম— তোমাদের জন্য দিদি পাঠিয়েছে।

শুকনো মুখে মরিয়া হাসি এনে বলে— দিদি আমাকে খুব ভালবাসে।

আমি মাথা নাড়ি। এবারে আসল কথাটা জিজ্ঞেস করি— উনুনশালটার ওরকম হাল হলো কী করে?

— দিদিকে বলো মাস দুয়েক অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে চালিয়ে নিতে। এখন মুড়ি ভাজা বন্ধ।

— কিন্তু কেন?

এর কোনো উত্তর সে দেয় না। শুধু চোখের কোণ বেয়ে কানের পাশে জল গড়িয়ে পড়ে। আমি ঠিক কী করব বুঝে উঠতে পারি না, এই মুহূর্তে আমি থাকব ওর পাশে, না উঠে চলে যাবো।   

তখনই শিলা আসে। হাতে থলে। বলে— বাবা পুড়িয়ে দিয়েছে। খোলা খাপুড়িও লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছে।

বললাম— বাবা কোথায়?    

— পালিয়েছে। শিলার নির্বিকার উত্তর।

চারু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে। শিলা পরম যত্নে একটা একটা করে মুদির দোকান থেকে আনা নুন তেল আলুর হিসেব দিচ্ছে— দু’টাকার নুন, পাঁচ টাকার আলু, আট টাকার সরষের তেল। চারুর সেদিকে আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না।

ঘরের এক কোণে কতগুলো স্টিল–অ্যালুমিনিয়মের বাসন—কোসন। একটা ছোটো গ্যাস সিলিন্ডার। মাথায় ওভেন। স্টিলের আলনা, কিন্তু ফাঁকা। কাপড়—চোপড় ছড়ানো ছিটানো।

বললাম— চিন্তা কোরো না চারু, ব্যাঙ্কে ফরটি পার্সেন্ট সাবসিডিতে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দেবো। আবার নতুন করে শুরু করবে। আর তা যদি পছন্দ না হয় সেল্ফ হেল্প গ্রুপে নাম লেখাও। দেখো তোমার মতো অনেকেই আছে। কোনো অসুবিধা হবে না। আমি তো আছি। চারুর মুখের প্রতিক্রিয়া দেখার বহু কসরৎ করলাম, কিন্তু মুখটা এমনভাবে গুঁজে রইল দেখতে পেলাম না।  

আমি উঠে এলাম, তখনো চারু কোনও কথা বলল না। শুধু কাপড়ের প্যাকেটটা আঁকড়ে ধরে রইল।

বুকের মাঝে একটা চাপ নিয়ে কোনো রকমে চারু—শিলার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই মনে হলো, বাইরের আকাশটা এত সুন্দর! আগে কখনো দেখিনি তো!

কিন্তু দু’পা এগোতেই আমাকে আগলে ধরল চারুর আদরের উনুনশাল। সেই মুখপোড়া দু’খানা ভাঙা ঝিক, খাঁ খাঁ করা মাথা আর রক্ত জমাটে কালোর মত পোড়া ফাটা দেয়ালগুলো অদ্ভুত ভাবে দাঁত বের করে আমাকে যেন ব্যঙ্গ করতে  লাগল… — আমাদের তাড়ানো অত সহজ না। আমরা এ ভাবেই থাকি। তোমাদের মধ্যে, মানুষের মধ্যে। আজীবনকাল! সে কী কিম্ভূত হাসি। ভীষণ ভয়ে যখন প্রায় দৌড়ে উঠোনটুকু পেরিয়ে দরজার ওপারে, মনে হলো কে যেন ডাকছে— শিলা। হয়তো কিছু বলবে। হয়তো আরো কিছু দরকার। মা—মেয়ের একার সংসারে একটা শক্ত কাঁধ।

মনে পড়ে গেল, আমাকে অফিস বেরতে হবে। দ্রুত রাস্তার বাঁকটা ধরে ফেললাম।

আরও পড়ুন...

Categories
2022_june golpo

রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

গ ল্প

রি নি   গ ঙ্গো পা ধ্যা য়

rini

রাই কিশোরী ও একটি নগরী

সকালের কাজকর্ম তাড়াতাড়ি সেরে কোনোরকমে দুটো ডাল-ভাত মুখে তুলেই রাই দাঁড়িয়ে পড়ে আয়নার সামনে। লম্বা চুলের সামনেটা পাফ করে পিছনে কোনোদিন খেজুর বেণী, কোনোদিন পনি ঝুলিয়ে দেয়। মুখে পাউডার লাগিয়ে আইলাইনার দিয়ে নিপুণ হাতে এঁকে নেয় চোখ। লিপস্টিক তার সাকুল্যে দুটো। তাই-ই জামার সঙ্গে মোটামুটি ম্যাচ করে লাগিয়ে নেয়। প্রতিদিন কলেজ যাওয়ার আগে প্রসাধনে এটুকু সময় তাকে দিতেই হয়। এমনকি বাদ যায় না পরীক্ষার দিনগুলোও। ধ্যাত, যেমন তেমন করে বেরনো যায় না কি! তার ছিপছিপে, একটু বেশিই রোগা কিন্তু লম্বা শরীরটায়, ফিটিংস চুড়িদারে, গলার কাছে জড়ো করা ওড়নায় এইটুকু সাজ না হলে মানায়! বাড়ি থেকে কলেজ বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে যাতায়াত করার সময় দু-একটা সিটি, ‘তোমায় হেব্বি লাগছে’ গান যে তার উদ্দেশ্যেই ছুটে আসে সে কি আর সে বোঝে না! এই রাস্তাটুকুই তো তার ওড়াউড়ি! বাদবাকি তো সেই কলেজ, লেকচার, ম্যাডামদের চোখপাকানো! কোনো কোনো স্যার অবশ্য একটু আধটু অন্যরকম হাসেন! কিন্তু ওই অব্দিই! 

জমে যায় যখন কোনো বন্ধু প্রেমে পড়ে। না না, কলেজের ছেলেগুলোর সঙ্গে না। ওরা মেয়েদের দিকে তাকায় না। রাত থাকতে উঠে মাছের ভেড়িতে কাজ করে। দুপুরে কলেজে এসে ঝিমোয়! প্রেমে পড়ার ছেলেরা হয় অন্য; ওই যে কলেজের বাইরে বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, মাথায় স্পাইক করা, ডগার কাছটা লালচে, কিংবা অটো চালাতে চালাতে সাইড কাঁচে একঝলক তাকিয়ে চোখ মারে! বন্ধু তখন সুযোগ পেলেই ফিসফিস করে! কবে কলেজের রাস্তায় ওড়না ধরে টান মেরেছে; কবে পিঠে ছুঁড়েছে ফুল; পুরো ‘দিদি তেরা দেওয়র দিওয়ানা’; ভাইজান স্টাইল; কবে সন্ধের আলো-ছায়ায় বাড়ির পিছনের বাবলা গাছের আড়ালে ঠোঁট কামড়ে ধরেছে! আরো একটু নিচেও নামিয়েছিল হাতটা!

কোথায় রে! গলায়!

না, আর একটু।

কোথায় রে! ওখানে! একদম ভিতরে! আহা বল না বাবা!

তার দু-এক মাসের ভিতরেই বন্ধু নিখোঁজ হয়। বাপ-মা কান্নাকাটি করে আসে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ খোঁজ চালালেও খোঁজ মেলে না। কিন্তু একসময় বন্ধুদের মোবাইলের ইনবক্স ভরে যায় একমাথা টকটকে লাল সিঁদুরে মাখামাখি পাউট করা নানা বিভঙ্গের ছবি। পাশে অবশ্যই স্পাইক করা ভাইজান। 

তারপর হারিয়ে যায়। আর কোনো খোঁজ নেই। কোথায় যায়, কী হয়, বন্ধুরাও জানতে পারেনা। তারা তখন শুধু স্বপ্ন বোনে! আহা, পড়াশোনা নেই; বকাঝকা নেই; বরের ঘর; নতুন শাড়ি-জামা; সাজগোজ; সিনেমা-ফুচকা; আর রাতে… উউউফফফ! হাত পা কেমন শিরশির করে!! 

দু-একজন যে একেবারে ফিরে আসে না তা নয়! সিঁদুর, শাঁখা পলা লোহা বাদ দিয়ে কুমারী মেয়ের মতো আসে! জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। দু-একমাস বাপের ঘরে থেকে এবার বাপের দেখে দেওয়া ছেলেকে বিয়ে করে। অনেকে আবার বাচ্চা কোলেও ফেরে। তারাও বিয়ে করে। একটু বেশি বয়সী বর জোটে তাদের। কিন্তু এসব ঘটনার মাঝেই কলেজের ম্যাডামরা কেবল ভয় দেখায়! বলে- মন দিয়ে পড়াশোনা করো। নিজের পায়ে দাঁড়াও। তারপর বিয়ে করবে।

বলে- প্রেম তো হতেই পারে। প্রেমিককেও বলো তোমার মতো পড়াশোনা করে চাকরির চেষ্টা করতে!

বলে- বিয়ের লোভ দেখিয়ে এ অঞ্চল থেকে মেয়ে নিয়ে নোংরা জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। তোমরা চাও তেমন জীবন? এখন কষ্ট করলে সারাজীবন মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে  বাঁচতে পারবে!

আরে বাবা! ম্যাডামগুলো যেন কী! নিজেরা বিয়ে করে বসে আছে! আমাদের বেলা যতো আপত্তি! ভালোবাসলে আর অপেক্ষা করা যায়! মনটা ছটফট করে না! শরীরটা আছাড়ি-বিছাড়ি করে না! 

অবশ্য ঋতী ম্যাডাম আলাদা। বিয়ে-টিয়ে করেনি! অথচ বেশ দেখতে কিন্তু! একমাথা কোঁকড়া চুল। কি ঘন! অথচ বড়ো চুল রাখে না। সকলের সঙ্গে  কেমন হেসে কথা বলে। ঋতী ম্যাডামের ক্লাসে নেতিয়ে পড়া ছেলেগুলোও কেমন চাঙ্গা হয়ে যায়! শুধু যখন প্রেমের কবিতা পড়ান, জীবনানন্দ কিংবা গালিব, কেমন উদাসী হয়ে দূরের জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলতে থাকেন! সব কথা ভালো বোঝা যায় না। ক্লাসটা থমথমে ভারি হয়ে ওঠে। উনি চুপ করলেই রাইদের কারো কারো ভিতর থেকে ফস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

যাক গে! বাবা-মাকে চেঁচিয়ে বলে বেরোতে গিয়েই দরজায় হোঁচট খেল রাই। আরে, সামনের ছোটো পাঁচিলটায় কিশোরদা বসে আছে না!

তুমি কবে এলে?

কিশোর এক থাবলা সাদা থুতু পাশের জমিতে ফেলে ব্রাশ চিবোতে চিবোতে বলে- এই তো কালই।

বাব্বা, কত্ত বছর বাদে!

হ্যাঁ, ছ’বছর।

তুই কি কলেজ যাচ্ছিস?

হ্যাঁ।

আর কতো পড়বি?

এই তো আর দুটো সেমেস্টার!

ও।

রাই বেরিয়ে আসে।

পরদিন বড় রাস্তা পার করে পুকুর পাড় ধরে কলেজের রাস্তাটায় ঢুকতেই সোঁওওওও করে একটা সাইকেল ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে দাঁড়ায়। রাই বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করছিল। খেয়াল করেনি। কিশোর ডাক দেয়- এদিকে শোনো।

রাই অবাক হয়। পিছন থেকে বন্ধুরা গুঁতো মারে। রাই এগিয়ে যায়।

এটা তোমার জন্য। একটা প্লাস্টিকে মোড়া লাল মতো কী যেন এগিয়ে দেয় কিশোর।

রাই নেয়।

কিশোর এঁকেবেঁকে সাইকেল চালিয়ে সিটি দিতে দিতে অদৃশ্য হয়।

রাই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। বন্ধুরাও হাসে। এসব ইশারা ওদের পরিচিত। প্যাকেট খুলে দেখা যায় একটা লাল রঙের ওড়না; জরি-চুমকিটুমকি বসিয়ে খুব কাজ করা। বন্ধুরা গান ধরে ‘লাল দুপট্টা উড় গয়ারে হাওয়াকে ঝোঁকে সে…’

ব্যস, তারপরই হয় বাবলা, নয় অশ্বত্থ, নয় অন্ধকার পুকুরের পাড়… শরীরী খেলায় মেতে ওঠে রাইয়ের কুমারী মন।

সেদিন সন্ধেবেলা বসে বসে কলেজের মিড-সেমের খাতা দেখছিল ঋতী। একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসে। কলেজের কোনো স্টুডেন্টরই হবে!

হ্যাঁ, বলছি।

ম্যাডাম, রাই বিয়ে করেছে।

কে রাই?

ম্যাডাম, ওই যে ফিফ্থ সেমেস্টারে পড়ে না! লম্বা করে! দেখতে ভালো!

ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। কী হয়েছে?

ম্যাডাম, ও বিয়ে করেছে।

সে কী!

হ্যাঁ ম্যাডাম, আর কালকেই বম্বে চলে যাচ্ছে।

মানে? বম্বে কেন? তুমি কে বলছো?

ওর বর বম্বেতে থাকে ম্যাডাম। বরের মা বারে নাচে। ওকে ওখানেই নিয়ে যাচ্ছে।

ঋতীর কান দিয়ে খানিকটা গরম হাওয়া বেরিয়ে গেল। কোনোরকমে জিজ্ঞাসা করল- তুমি কে?

ফোনটা কেটে দিল। ছেলেটা কিছুতেই নিজের নামটা বলল না।

যাক, সেটা পরে ভাবলে চলবে। আপাতত ঋতী প্রিন্সিপাল স্যারকে ফোন করে সবটা জানাল। স্যার বললেন- দাঁড়াও, স্টিফেন আছে, সজল আছে; ওরা লোকাল লোক। আমি আগে দেখি ব্যাপারটা কী!

প্রায় দু’ঘন্টা হয়ে গেছে। ঋতী পায়চারি করেই যাচ্ছে। বাবা বলছে, তুই এতো টেনশন করছিস কেন? প্রিন্সিপাল স্যার তো ব্যাপারটা দেখছেন!

তুমি বুঝতে পারছ না বাবা! মেয়েটাকে পাচারের চেষ্টা করছে! মেয়েটা দেখতে ভালো। পড়াশোনাটাও খারাপ করে না।

ঋতী হাতের তালুতে অন্য হাত মুঠো করে মারে। এতো করে বোঝাই! এতো বলি! তবু সেই ভুল করল!! ঋতীর অস্থির লাগতে থাকে।

আরো বেশ খানিকটা সময় পার করে প্রিন্সিপাল স্যার ফোন করে। ঋতী শোনো, ওই ছেলেটি এর আগেও একটি বিয়ে করেছিল। সেই বউ পালিয়ে এসে এখানে আবার বিয়ে করেছে।

কেন স্যার? পালিয়ে এসেছে কেন?

সেটা বলতে চাইছে না।

তবে কাল ওদের বিকেল চারটেয় ট্রেন। তার আগে দশটার মধ্যে কলেজে আসতে বলেছি।

আসবে স্যার? পালিয়ে যাবে না তো?

আমি লোকাল থানার ওসির সঙ্গে  কথা বলেছি। সাদা পোশাকে পুলিশ নজর রাখবে।

ঠিক আছে স্যার। আমি কাল দশটার আগেই পৌঁছে যাব।

চিন্তা কোরো না। মেয়েটাকে বাঁচাবোই।

পরদিন কলেজ পৌঁছেই ঋতী দেখা করে প্রিন্সিপাল স্যারের সঙ্গে। অন্য কয়েকজন অধ্যাপকও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত। স্যার বলেন- দে অলরেডি হ্যাভ ডান হোয়াটএভার দে ওয়ান্ট টু ডু। অ্যান্ড উই কান্ট ক্যানসেল দেয়ার ম্যারেজ, বিকজ দে আর অ্যাডাল্ট!

ইয়েস স্যার।

সো আওয়ার ইনটেনশন ইজ জাস্ট টু কিপ গোয়িং দ্য গার্লস স্টাডি অ্যান্ড অলসো টু স্টে হার হিয়ার ইন হার পেরেন্টস কেয়ার!

ইয়েস স্যার। উই জাস্ট ডোন্ট অ্যালাও হার টু গো উইথ হার হাসব্যান্ড!

প্লিজ ঋতী। ডোন্ট বি এক্সাইটেড! উই মাস্ট ট্যাকেল ইট ভেরি ট্যাক্টফুলি!

সরি স্যার। ওকে স্যার।

লেটস গো। দে হ্যাভ অলরেডি কাম।

ঘরে ঢুকেই ঋতীর চোখ পড়ে যায় রাইয়ের ওপর। একমাথা সিঁদুর লাগিয়ে, রোগা রোগা হাতে চারটে শাঁখা পলা নোয়া চাপিয়ে লাল রঙের একটা শাড়ি পড়ে বসে আছে। ওকে দেখেই ঋতীর মনে হয় ওর সারা শরীর-মন ক্ষতবিক্ষত করে বুঝি অতো লাল রঙ পাওয়া গেছে!!

দেখুন স্যার, আমি আমার বৌমাকে পড়াব। মুম্বাইতে কলেজে ভর্তি করে দেবো। ও যতদূর খুশ পড়বে! রাইয়ের শাশুড়ি বলছে ভাঙা ভাঙা বাংলায়। বেশ ভারিক্কি চেহারা তার। সাজগোজে খুব একটা ভদ্রতার ছাপ নেই। তার হাবেভাবে তার পেশার একটা আন্দাজ করা চলে।

ঋতী বলে, রাই তো বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করে। মুম্বাইতে সেটা কীভাবে সম্ভব?

আরে বাংলা পড়বে না তো, অন্য কিছু পড়বে!

রাই বাংলা মিডিয়ামের স্টুডেন্ট। ওর পক্ষে হিন্দি, মারাঠি বা অন্য ভাষায় পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। আর তাতে তো সময়ও নষ্ট হবে!

স্যার বলেন- ওর আর দুটো সেমেস্টার বাকি আছে। এখানে ওকে পড়াশোনাটা শেষ করতে দিন। মাত্র তো একটা বছর, তারপর না হয় মুম্বাই যাবে!

ঋতী বলে, গ্র্যাজুয়েট হয়ে থাকলে পরে চাকরির চেষ্টা করতে পারবে।

শুনে মহিলা কেমন ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসে।

এতক্ষণ কিশোর বা রাই, রাইয়ের বাবা-মা একটা কথাও বলেনি। ওরা যেন ভয় পেয়েছে। চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। হঠাৎ কিশোর ঋতীর পা চেপে ধরে। ঋতী চমকে উঠে আরেকটু হলে পড়েই যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি ছাড়িয়ে নিতে চায়। স্যারও অবাক। কিশোর ওঠে না। বলে- আপনি ওকে এখানে রেখে দিন ম্যাডাম। ও পড়াশোনা করুক। আপনার পায়ে ওকে জায়গা দিন।

রাই জোরে কেঁদে ওঠে।

দরকার পড়লে আমি এখানেই কোনো কাজ ধরে নেবো। ওকে যেতে হবে না!

ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি ওঠো। ওঠো।

ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে স্যার বলেন- আমরা তো রাইকে পড়ানোর কথাই ভাবছি। সেইজন্য তো তোমাদের এখানে ডেকেছি কথা বলব বলে।

ওরা প্রিন্সিপাল স্যার আর অধ্যাপকদের  হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বারবার ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায়। শুধু শাশুড়ি মা’র বিরক্তি টা চাপা থাকতে চায় না। নিজের ছেলেকে গজগজ করে কী যেন বলতে থাকে। রাই ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে।

পরদিন থেকে রাইকে ক্লাসে দেখে ঋতী কিছুটা স্বস্তি পায়। বন্ধুরা রাইকে নিয়ে হৈ হৈ করতে চায়। ঋতী গুরুত্ব দেয় না। সকলকে বুঝিয়ে দিতে চায় বিয়ে করে রাই জীবনের কোনো মহান ব্রত পালন করেনি। বরং তার যথেষ্ট ক্ষতির সম্ভাবনাই তৈরি হয়েছিল। মনে মনে ভাবে, আগামীতেও যে মেয়েটার কপালে কী দুর্ভোগ আছে! নজরে নজরে রাখতে হবে ওকে।

রাই কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সমস্ত দুর্ভাবনা কাটিয়ে ওঠে। আবার বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করে, সাজগোজ করে; চেহারায় ওর একটা বেশ ঢলঢলে ভাব এসেছে; ফলন্ত লাউ ডগাটির মতো।

কলেজের অ্যানুয়াল স্পোর্টস। এবারে বেশ বড়ো করে আয়োজন করা হয়েছে। স্টুডেন্ট সংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়ছে। নতুন নতুন স্ট্রিম খোলা হচ্ছে। স্যার তাই এই অঞ্চলের বেশ বড়ো মাঠটাই ভাড়া করেছেন। কলেজের নিজস্ব মাঠটা ছোটো; জায়গা কম। স্টুডেন্টদের ন’টার মধ্যে চলে আসতে বলা হয়েছে। সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে ছোটো করে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান; তারপর প্রিন্সিপাল স্যারের বক্তৃতা; তারপর এমএলএ স্পোর্টস-এর উদ্বোধন করবেন। 

রাই আজ খুব সেজেছে। নাচের দলটাকে ও লিড করছে। সঙ্গে আছে দেবযানী। হৈ হৈ করে স্পোর্টস হলো; এক একটা রাউন্ডে সে কি উত্তেজনা! সবচেয়ে বেশি মজা হয়েছে টিচারদের ব্যালেন্স রেসে। পছন্দের টিচারদের নিয়ে স্টুডেন্টদের সে কী উন্মাদনা! সব মিটতে মিটতে প্রায় পাঁচটা বেজেছে। মাঠ খালি করে স্টুডেন্টদের রওনা করিয়ে তবে ঋতীরা বাড়ি ফিরেছে। সারাদিনের ক্লান্তি, হৈ চৈ… দিনটার রেশ যেন কাটতেই চাইছে না।

রাত তখন সাড়ে বারোটা হবে। ঋতীর ফোনটা বাজছে। ঋতী ধড়মড় করে উঠেছে। পাশের ঘর থেকে বাবাও ছুটে এসেছে। ছোটোমামু অসুস্থ; কিছু হলো না তো! ঋতী দেখে স্টিফেন ফোন করছে।

হ্যালো?

ম্যাডাম, স্টিফেন বলছি। কলেজের একটা মেয়ে পালিয়েছে। পুলিশ আপনাদের ওই রাই মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গেছে।

ঋতীর পুরোটা মাথার ওপর দিয়ে যায়। কে পালিয়েছে? রাইকেই বা তুলে নিয়ে গেছে কেন?

ম্যাডাম, স্যারকে ফোনে পাচ্ছি না। তাই আপনাকে বলছি।

কী হয়েছে পরিষ্কার করে বলো?

সবটা জানি না ম্যাডাম।

আচ্ছা, আমি দেখছি।

ঋতী প্রিন্সিপাল স্যারকে ফোন করে; সুইচড অফ। একটু চিন্তা করে সরাসরি থানার ওসিকেই ফোন করে।

ও, আপনি তদবির করছিলেন না এই মেয়েটাকে আটকাবার জন্য?

হ্যাঁ, মানে, কী হয়েছে?

কী আবার হবে! এরা সব লোকালি র‍্যাকেট চালায়!

কী বলছেন আপনি এসব!

যা বলছি ঠিক বলছি। ফোনটা কেটে যায়।

ঋতী ঘামতে শুরু করেছে। রাই র‍্যাকেট চালায়! রাই!

ঋতী রাজদীপকে ফোন করে। ও কলেজের কাছাকাছিই থাকে। ওরা দু’জনে মিলে ওই রাতেই পৌঁছোয় থানায়। রাই ঋতীকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে- ম্যাডাম আমি কিছু জানি না। আমি কিছু করিনি। আমি কিছু করিনি। ঋতী দেখে রাইয়ের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে। কষ কেটে রক্ত পড়ছে। ঋতী আগলে নিয়ে ধরে রাইকে।

আপনারা ওকে মেরেছেন?

ম্যাডাম, আপনি জানেন না ও কতো ধুরন্ধর! ওই সরিয়েছে মেয়েটাকে। ক’দিন ওর সঙ্গেই দেখা যাচ্ছিল। শেষবারও ওর সঙ্গেই দেখা গেছে!

সেই জন্য আপনি ধরেই নিচ্ছেন দেবযানীর মিসিং-এর পিছনে ওর ভূমিকা আছে। ওরা দু’জন ভালো বন্ধু অফিসার!

ওসব বন্ধু-টন্ধু অনেক দেখা আছে ম্যাডাম! আরোও দু’ঘা পড়লে সব বেরিয়ে আসবে!

 ওর এগেন্সটে আপনাদের চার্জটা কী? কোনো এফআইআর হয়েছে?

সোমত্থ মেয়ে পাচার হলে বাপ-মা এফআইআর করে! কী বলছেন ম্যাডাম!

আপনি বিনা চার্জে ওকে থানায় এনে টর্চার করছেন? এটা তো পুরো বেআইনি!

আমাকে আইন শেখাতে আসবেন না ম্যাডাম!

অবস্থা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে রাজদীপ কথা বলতে এগোয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। সে রাতে রাইকে ছাড়া হয় না।

পরদিন প্রিন্সিপাল স্যার থানায় এসে কথা বলে রাইকে বাড়িতে নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশ রাইয়ের পিছন ছাড়ে না। বারবার বাড়িতে হানা দেয়; ভয় দেখায়; হুমকি দেয়। রাই কলেজ আসা বন্ধ করে দেয়। ওদিকে দেবযানীর কথা ভেবে ঋতীর কেমন পাগল পাগল লাগে। ইতিমধ্যে রাইয়ের শাশুড়ি এসে হাজির হয়েছে। রাইয়ের বন্ধুরাই ঋতীকে জানায়।

প্রায় পনেরো দিন পর দেবযানী ফোন করে ওর বাবার নম্বরে। ও বিয়ে করেছে। যোধপুরে আছে। ভালো আছে। শুরু হয় পুলিশী তৎপরতা। যোধপুর পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে কলকাতা পুলিশের একটা টিম উদ্ধার করে আনে দেবযানী আর ওর বরকে। ছেলেটা এ অঞ্চলেরই। বিয়ে করে যোধপুরে মামারবাড়ি পালিয়েছিল। দেবযানী ফিরলে এখানে ওর ধুমধাম করে বিয়ে হয়। হানিমুন তো আগেই সারা হয়ে গেছিল। দেবযানী তাই এবার পড়াশোনায় মন দেয়। ফাইনাল পরীক্ষাটা দিতে হবে না!

ওদিকে এলাকায় বদনাম হওয়ার অজুহাতে শাশুড়ি রাইকে নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেয়। এবার আর কলেজকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। খুব শিগগিরই ট্রেনিং কমপ্লিট হয় রাইয়ের। মুম্বাইয়ের এঁদো গলির মদের ঠেকে বুক-পিঠ প্রায় খোলা ব্লাউজ আর নাভির নিচে কোমরের ভাঁজ দেখিয়ে হাঁটু অব্দি ঘাঘরা পরে কাস্টমারদের খুশি করতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয় রাইকে! ওর লাল জরিদার ওড়নাটা এখন রঙ্গিলা আশিকদের গলায় দোল খায়। শুধু কিশোর বসে বসে ভাবে কোথায় যেন সে পড়েছিল দুটো লাইন…

তোমাকে যে ছেড়ে যাই সে তোমারই জন্য

শ্রীরাধা যায় না কভু মথুরা জনারণ্য!

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may golpo

সৈকত ঘোষ

গ ল্প

সৈ ক ত   ঘো ষ

saikat

সেকেন্ড হানিমুন

সামনে সমুদ্র। একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। চোখের সামনে একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমা ধীরে ধীরে রক্ত মাংসে রঙিন হয়ে উঠছে। সবকটা রঙকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে অনিন্দ্য। নিজেকে বার কয়েক চিমটি কাটে। তারপর আরও দু-পা এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। পায়ের তলায় আবার সরে যাওয়া বালিগুলো এসে জমাট বাঁধছে। হাওয়ার ঝাপটায় কপালের ওপর থেকে সোনালি সাদা চুল এক ঝটকায় দুই-কুড়ি বয়স কমিয়ে এক অদ্ভুত ম্যাজিকে ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে উত্তাল যৌবনে। সময়টা আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিক। কলকাতায় তখন বামপন্থার জোয়ার। চারিদিকে লাল সেলাম, কমরেড কমরেড। ছাত্র রাজনীতিটা মনপ্রাণ দিয়েই করতো অনিন্দ্য। আর নেশা বলতে মিঠুনদা। বলিউডের বাঙালিবাবু। কি মুভস, কি অসম্ভব প্যাশন। এক একটা ডায়লগ আগুন, জাস্ট আগুন। ডিস্কো ডান্সার দেখে ফিদা হয়ে গেছিল অনিন্দ্য। এরকমটাও হয়! এই না হলে মশলা ছবি, মামুলি পেটো নয় পুরো অ্যাটম বোম। আত্রেয়ী অবশ্য এসব থেকে বহু যোজন দূরে। অনিন্দ্যর চেয়ে দু-বছরের জুনিয়র, যাদবপুর ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্ট। প্রেমটা কীভাবে শুরু হয়েছিল! সে সময়ের আর পাঁচটা সাধারণ প্রেমের মতো একেবারেই নয়। প্রথম মুখোমুখি ইউনিভার্সিটির ডিবেট কম্পিটিশন। সবাইকে চমকে দিয়ে পর পর দুবার ইন্টার কলেজ ডিবেট চ্যাম্পিয়ন অনিন্দ্যর হ্যাটট্রিকের স্বপ্নটা ফাতাফাতা করে দিয়েছিল আপাত নিরীহ সাদামাটা চুপচাপ একটি মেয়ে। আত্রেয়ী, নিখুঁত যুক্তি আর অসম্ভব ভালো প্রেজেন্টেশনে মারকাটারি বক্তা অনিন্দ্যও একেবারে ক্লিন বোল্ড। গল্পটা শুরু হতে অবশ্য আরও এক বছর লেগেছিল। প্রথম ছমাস ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ থিওরিতে অপেক্ষা করে অনিন্দ্য আর পরের ছমাস ওকে মিষ্টি করে ঝুলিয়ে রাখে আত্রেয়ী। 

দুই।

নীল আইল্যান্ডের এই নীল নির্জনের চেয়ে ভালো হানিমুন আর কী হতে পারে। আকাশ সমুদ্র আর এই নির্জনতার মাঝে এক অদৃশ্য প্রজাপতি, এ যেন এক নতুন আলোকবর্ষ। আত্রেয়ীর কপালে একটা আলতো চুমু খায় অনিন্দ্য। এই মুহূর্তটার জন্যই তো এতটা অপেক্ষা। ওদের কটেজ থেকে কয়েক পা মাত্র হাঁটলেই জল। কটেজটা ঠিক ছবির মতো যেমন ক্যালেন্ডারে থাকে। 

– শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়েটা হয়েই গেল, কি বলো…

অনিন্দ্যর কথাটা শুনে আত্রেয়ী ওর চোখের দিকে তাকায়। সে দৃষ্টি অদ্ভুত শীতল, যেন বর্ষার শেষ বারিধারা। হয়তো অনিন্দ্যর চোখের গভীরে আরও একবার নিজেকেই খুঁজে নিতে চায় আত্রেয়ী। হয়তো বা ডেস্টিনি…

– কি হলো, কি ভাবছো?

আত্রেয়ী হাসে, কোনও কথা বলে না। কিন্তু সে হাসিতে অনেক না বলা চলকে ওঠা দুধের মতো হঠাৎ ফুলে উঠে থিতিয়ে যায়। 

এজি বেঙ্গলে এই চাকরিটা পাওয়ার মাস ছয়েকের মধ্যেই অনিন্দ্যর বিয়ে। দু-বাড়িতে দেখে শুনে যেমনটা হয় সেরকম নয়। আত্রেয়ীরা ব্রাহ্মণ আর ওরা রায়, নমশূদ্র। সুতরাং দুই বাড়ির অমতে, তবে পালিয়ে নয়। একদম সবার চোখের সামনে সদর্পে বুক ফুলিয়ে সোজা আন্দামান। নির্বাসন নয় বিয়ে করতে। একান্তে। যেহেতু ডিসিশন দুজনের তাই ভালো-মন্দ সবটা দুজনের। শুধু দুজনের। আর তাই বিয়ে নামক এই বিশেষ দিনটিতে আর কাউকে কোট আনকোট অ্যালাউ করেনি ওরা। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে বিষয়টা মোটেও সহজ ছিল না। আজ ভাবতে অবাক লাগে। 

– চলো আর একটু এগোই

আত্রেয়ীর কথায় হঠাৎ ঘোরটা কেটে যায় অনিন্দ্যর। মনে মনে ভাবে বয়স হচ্ছে। মুখে বলে

– জানো, আজ খুব হালকা লাগছে। যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম…

কথাটা শেষ করার আগেই আত্রেয়ী ওকে নিজের দিকে টানে। কপালে আলতো করে একটা চুমু খায়। তারপর অনিন্দ্যর হাতটাকে শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে নেয়।  

– কিছু কথা কখনও বলতে নেই, এই যেমন ধরো এই নির্জনতার ভাষা…

বলতে নেই, বুঝলে

শুধু উপলব্ধি করো, আমি বুঝি, সব বুঝি…

অনিন্দ্যর চোখের কোনটা চিকচিক করে ওঠে। আত্রেয়ীর আঙুলের সঙ্গে আঙুল। স্বর্গীয় এ স্পর্শ-সুখ। সাদা বালির ওপর একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। ঢেউ ভাঙছে আত্রেয়ীর বুকের ভিতরেও। একটা নিঃশব্দ বিপ্লব, জলে পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বালির ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজনে। সবকিছু থেকে দূর, অনেকটা দূর। 

তিন।

এই জানলাটা থেকে আকাশ দেখা যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা নিজের মতো করে। আঠেরোশো স্কোয়ারফিট ঝাঁ-চকচকে অন্যের সংসারের চেয়ে এই ঘরটা অনেক শান্তির। ছেলে যতই নিজের হোক, বৌমা কখনও নিজের হয় না। হাজার হোক অন্য গাছের ছাল। আর বাস্তবে বেশি ভালো ছেলেদের হয়তো কিছু করারও থাকে না। তা যাই হোক, গত এক বছর এই বৃদ্ধাশ্রমে বেশ চমৎকার আছে আত্রেয়ী। এটা নামেই বৃদ্ধাশ্রম, তবে ফেসিলিটির দিক থেকে বেশ কয়েকটা স্টার দেওয়াই যায়। একটু ইন্টেরিয়র হলেও কী নেই! বিরাট বড়ো বাগান একটা ছোট্ট পুকুর কতো গাছ কতো কতো পাখি। ভালো লাগে, শহর থেকে দূরে এই ছোট্ট একটা জগৎ। কোনও প্রশ্নোত্তরের দায়ভার নেই। সকালে উঠে একটু পায়চারি করে আত্রেয়ী। এই একটা বছরে এখানে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সখ্যতাও তৈরি হয়েছে। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। সারাদিন নানা অ্যাকটিভিটিতে কেটে যায়। খাবার দাবারের চিন্তা নেই, এদের সবকিছু একদম টাইমে টাইমে। মাঝে মাঝে নাতনিকে নিয়ে ছেলে আসে। দেখে যায়। আর ভিডিও কল তো আছেই। একটা বয়সের পর এই বেশ ভালো। সংসারে বোঝা হয়ে থাকার চেয়ে নিজের স্বাধীনে…এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রায়শই রাতে ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আর ঘুম আসতে চায় না। এক একদিন বই নিয়ে বসে। এখনও এই একটা অভ্যেস ওকে ছেড়ে যায়নি। ছেলে গতমাসে একটা কিন্ডেল দিয়ে গেছে। সব সময় সব বই তো পাওয়া যায় না। এই যন্ত্রটা বেশ ভালো যখন যা ইচ্ছে ডাউনলোড করে পড়া যায়। বয়স একষট্টি হলে কি হবে, টিপটপ আত্রেয়ীকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এই বয়সে যথেষ্ট আপডেটেড। মনের ওপর দিয়ে যতই ঝড় বয়ে যাক চেহারায় একটা আভিজাত্যের ছাপ তো আছেই। ছেলে আইটি প্রফেশনাল, ওয়েল এস্টাব্লিশ। আত্রেয়ীর এক কলিগের মেয়ের সঙ্গেই বছর পাঁচ আগে রীতিমতো দেখেশুনে সম্বন্ধ করেই একমাত্র ছেলের বিয়ে দেয় আত্রেয়ী। বিয়ের দু-বছরের মধ্যেই আসে দিয়া। মানে নাতনি। আর তার জন্মের ঠিক দু-দিন পরেই আরিত্রর বাবা মানে আত্রেয়ীর স্বামীর হঠাৎ মৃত্যু। আর তারপর একটা ঝড়ের মতোই জীবন তার গতিপথ বদলায়। নিজের হাতে গোছানো সংসার একদিন হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে যায়। হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম। আজ আর কোনও আক্ষেপ নেই। কিন্তু সত্যিই কি কোনও আক্ষেপ নেই! স্যুটকেস খুলে পুরোনো বেশ কিছু জিনিস বের করে আত্রেয়ী। একটা ডায়েরি, একটা পুরোনো এইচ এমটি হাতঘড়ি, বেশ কিছু ফটোগ্রাফ আর কয়েকটা চিঠি। এই শেষ বয়সে পৌঁছে সম্বল বলতে এটুকুই তো ওর নিজের। শুধুমাত্র নিজের। 

চার।

এই বয়সে আর একবার বিয়ে করার বেশ একটা মজা আছে যাই বলো। সেকেন্ড হানিমুন বলে কথা। আজকের দিনটা আমার জীবনের বেস্ট ডে। আমার তো এখনও মনে হচ্ছে সেই চল্লিশ বছর আগে আমাদের সময়টা থেমে আছে। জানো সমুদ্রের চোখে সত্যিই এক অদ্ভুত নেশা আছে। বড়ো গভীর। মায়াবী। বিশ্বাস হচ্ছে না! আমাকে ছুঁয়ে দেখো। সবকিছুই বড্ড আগের মতো। আত্রেয়ী ফিল করে, আজও একই রকম ভাবে ফিল করে অনিন্দ্যকে। সত্যিই কি ও আজও সেই সময়টা থেকে এগোতে পেরেছে! চল্লিশটা বছর কেবল একটা সংখ্যা মনে হয়। নীল আইল্যান্ডের সেই কটেজের বাইরে হাতে হাত রেখে বসে আছে দুজনে। সামনে সমুদ্র। একটার পর একটা ঢেউ ভাঙছে। এই নির্জনতার ভাষা বড্ড পরিচিত দুজনের। অনিন্দ্যর কাঁধে মাথা রাখে আত্রেয়ী। সত্যিই বড্ড হালকা লাগে নিজেকে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জীবনের কাছে আর কীইবা চাওয়ার থাকতে পারে। 

ঘড়ির দিকে তাকায় আত্রেয়ী। রাত দুটো বাজে। এবার শুয়ে পড়তে হবে। নাহলে শরীর খারাপ করবে। কাল সকাল সাড়ে দশটায় ফ্লাইট। সাতটার মধ্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে বলেছে অভিষেক। অভিষেক এখানকার ম্যানেজার। খুব এফিসিয়েন্ট। সবদিক দিব্বি সামলায়। বিছানায় ওপর থেকে আবার সবকিছু যত্ন করে গুছিয়ে স্যুটকেসে ভরে রাখে আত্রেয়ী। বাথরুমে গিয়ে হালকা করে একটু চোখে মুখে ঘাড়ে জল দেয়। তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে পরপর দশটা ডিজিট লিখে ডায়াল করে…

পাঁচ।

অনিন্দ্য সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। হাওয়ার ঝাপটায় কপালের ওপর এসে পরে সোনালি সাদা চুল। পায়ের তলায় সরে যাওয়া বালিগুলো জমাট বাঁধছে আবার। হঠাৎ চারিদিকের নির্জনতা ভেঙে বেজে ওঠে মোবাইলটা। কিন্তু এখন এতো রাতে কে ফোন করবে! স্ক্রিনের দিকে তাকায়। একটা আননোন নাম্বার। রিসিভ করে বুকের কাছে ফোনটা ধরে। ফোনের ওপারে তখন কথা খুঁজছে চল্লিশ বছরের নির্জনতা। এই নির্জনতাটা দুজনেরই খুব চেনা…

আরও পড়ুন...

Categories
2022_april golpo

সুদীপ ঘোষাল

গ ল্প

সু দী প   ঘো ষা ল

sudipp

একটি পারিবারিক গল্প ও প্রণামীর বাক্স

গৃহশিক্ষক দীপকের ভারী সমস্যা। এখন অতিমারির সময়ে তার ছাত্রের সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। সব অভিভাবক এখন অনলাইনে পঠনপাঠনের দিকে ঝুঁকেছে। অনেকের মাইনে বাকি পড়ে গেছে। কারণ করোনা রোজগার কেড়েছে। দীপক আর ইতুর বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হল। কোন সন্তান নেই। ডাক্তারবাবু বলেছেন, সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। ওভারিতে সিষ্ট আছে। জটিল কেস।

বিয়ের আগে গৃহশিক্ষক দীপক ইতুদের টালির ঘরে ভাড়া থাকত। ইতুর বাবার দুটো টালির ঘর। বাবা আর মেয়ের একটা ঘর হলেই চলে যায়, তাই ভাড়া দেওয়া। ইতুর মা নেই। বাবা বেকার, ঘরের ভাড়া থেকে কোনরকমে তাদের সংসার চলে।

ছোটো থেকেই দীপক মায়ের আদরের ছেলে। মা ছাড়া সে কিছু বোঝে না, চেনে না। ফলে মায়ের স্নেহছায়া একটু বেশি পেতো সে। মা জানতেন এই ছেলে আমার অবর্তমানে অন্য ছেলেমেয়েদের দেখবে। দীপকের বাবা ছিলেন সরকারী কর্মচারী। তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে পড়াশোনা শেখাতে সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন। খাওয়া পরার কোনো অসুবিধা নেই। বেশ চলছিলো বটগাছের ছায়ায় সাতটি জীবন। কিন্তু মহাকালের বিচার মানতেই হবে। হঠাৎ মারা গেলেন দীপকের বাবা। 

তখন দীপকের বয়স একুশ। বি এ পাশ করে আইটিআই-এ ভর্তি হয়েছিলো। কিন্তু অর্ধপথে পড়া থেমে গেলো। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলো দীপক। তবে বাবার চাকরিটা সে পেল না। গৃহশিক্ষক দীপক এবার ভাইবোনদের পড়াশোনা, মাকে যত্ন করা সব ওই সামান্য মাইনের টাকাতেই চালাত।

এক রাতে বাসা বাড়িতে খাবার নেই। টিউশানির মাইনের টাকা গ্রামে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। সামান্য ক’টা টাকা আছে। দীপক জানে মাস চালাতে হবে। রাত বেশি হওয়ায় দোকানগুলো বন্ধ। একগ্লাস জল ঢকঢক করে পান করলো। অমৃতের স্বাদ। কিন্তু খালি পেট তবু মানে না বারণ। খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে। তবু লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। হঠাৎ দরজায় শুনতে পেলো ঠক ঠক আওয়াজ। দীপক বলে, কে? 

— আমি, দরজাটা খুলুন।
— জগতে সবাই তো আমি। নাম বলুন।
— আমি ইতু।
— এত রাতে!
— আরে খুলুন না ছাই।

দরজা খুলে সে দেখলো সত্যিই বাড়িওয়ালার সুন্দরী অষ্টাদশী মেয়েটা। হাতে একটা থালা। বললো, আজকে আমাদের সত্যনারায়ণ পুজো ছিলো, মা তাই প্রসাদ পাঠালেন। খেয়ে জল খাবেন। প্রসাদ খেয়ে জল খেতে হয়। সেই প্রসাদ খেয়ে দীপক ঘুমিয়েছিলো।

বাড়িওয়ালার মেয়ে ইতু দেখতো, দীপক সকালে বেরিয়ে যায় আর রাতে ঢোকে। তার মানে হোটেলে খায়। কোনোদিন বেশি কথা বলে না। শুধু জিজ্ঞেস করে, ভালো আছেন? আর ভাড়া দিতে এলে বলে, বাবা আছে, দাঁড়ান ডেকে দিচ্ছি। ইতু বাবাকে বলে, আমি দীপকের কাছে ইংরাজিটা দেখিয়ে নেবো। বাবা খুব কিপটে। বিনা পয়সায় পড়ানোতে আপত্তি নেই। 

রাতে দীপক এলে ইতু বই নিয়ে ওর ঘরে গেলো। লুঙ্গি পরে তক্তায় সে বসেছিলো। সে বললো, কিছু বলবে?

— হুঁ, একটু ইংরাজিটা দেখিয়ে দেবেন?

— কই দেখি, আমিও বই পড়তে ভালোবাসি।

— আর পড়াতে ভালোবাসেন না?                                                                   

— হ্যাঁ, তবে দুজনে আলোচনা করবো। ইংলিশ আমার বেস্ট সাবজেক্ট ছিলো।

— তাই! তাহলে ভালো হলো। আমি ইংলিশে উইক।

দীপক দেখছে ইতুর পড়াশোনায় মন নেই। শুধু কথা বলে চলে। বলে, আপনি এত অগোছালো কেন? তারপর দেখলো ইতু সব কিছু গোছাতে শুরু করেছে।

দীপক বললো, তুমি  বাবার একমাত্র মেয়ে, আমার কাজ করবে কেন?

— আমি এসব দেখতে পারি না। আপনি চুপ করে বসুন। আর আমি একবার করে আপনার কাছে গল্প করতে আসবো। তাড়িয়ে দেবেন না তো?

— না, না আমিও তো একাই থাকি। কথা বলার সঙ্গী পাবো।

— বাবাকে বলবেন, আমি খুব পড়ি।

— মিথ্যা বলতে নেই। যা বলার তুমি বলবে। আমি কিছু বলবো না।                                    

— ঠিক আছে, আপনি ক্যাবলার মতো এসব বলবেন না।

–আমি এসব ভালোবাসি না।

দীপক ভাবে মেয়েটা কী চায়? আমার মাথার ওপর বড়ো সংসারের দায়িত্ব। আমাকে সাবধানে চলতে হবে।

পুজোর ছুটিতে দীপক গ্রামের  বাড়িতে এসেছে। মায়ের জন্য সাদা তাঁতের শাড়ি। দুই ভাইয়ের জন্য জামা, প্যান্ট একই কালারের। বোনেদের চুড়িদার এনেছে। বাড়িতে দুর্গাপুজোর পালা। আগের দিন রাত থেকে সব্জি কাটা, কুটনো কোটা শুরু হলো। অনেক লোকজন বাড়িতে, তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা। বড়ো বড়ো গামলায় রেখে সব্জি সব উঠোনে নামানো হলো। কাল সকালবেলা রান্না হবে। দীপককে ওর মা বলে, এবার বিয়ে করে নে। আমি দোনাগ্রামে মেয়ে দেখে রেখেছি। কথাও বলেছি। মায়ের কথা ফেলতে পারে না দীপক। সে সম্মতি দিলো না কি বুঝতে পারল না তার মা। দীপক মাথা নাড়ল। তা না হলে মা দুঃখ পাবেন।

পুজোর ছুটি ফুরিয়ে গেলে দীপক ফিরে এলো শহরে। এসেই দেখলো, ইতু হাতে একটা চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীপক বললো, কী এটা?

–পুজোতে তোমার জন্য লিখেছি।

–থাক, তোমার কাছে থাক। 

–কিন্তু আমি যে অনেক কিছু দিয়েছি তোমাকে। আমার মনপ্রাণ সবকিছু।

দীপককে, ইতু জড়িয়ে ধরলো লজ্জা ভুলে। চোখের জলে তার জামা ভিজিয়ে দিলো। আর দীপক তো কাঁদতে পারছে না। ইতুর জন্য তার মন কতবার যে ডাক দিয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। দীপকের বাসা বাড়ির টালির চাল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো, চাঁদ আজ জোছনা ঢেলেছে সবুজের বুকে।

দীপক মা-কে সবকথা বলে বিয়ে করেছে ইতুকে। মা খুব খুশি। তারপর বারো বছর কেটে গেলো। মা চলে গেলেন। ভাইবোনেরাও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দীপকের খুব খারাপ অবস্থা। আর আগের মত গৃহশিক্ষকতা করার সুযোগ পায় না। ইতুর বাবা পরলোকে চলে গেলেন। এখন দীপক আর ইতু থাকে টালির চালের ঘরে। সামনে বড় উঠোন। ইতুর শরীর সুস্থ করার জন্য ডাক্তারের দেওয়া পরামর্শ মেনে চলে। ওষুধ খায়। দীপক জানে ওষুধ আর খাওয়াপরা নিয়ে দু’জনের এই দুর্মূল্যের বাজারে পাঁচহাজার টাকা হলে কোনরকমে চলে যাবে। দীপকের এখন আয় সাকুল্যে দেড়হাজার টাকা। চলে না সংসার। ঠেলাগাড়ির মতো ঠেলে ঠেলে চালাতে হয়। হাসিমুখি ইতুর মুখ এখন ভরা শ্রাবণের বর্ষার মেঘের মত কালো হয়ে থাকে। দীপক মরিয়া হয়ে ওঠে। একটা কিছু করতেই হবে। ইতু বলে, বাড়ি বাড়ি আমি রান্না করলেও দু’মুঠো জুটে যেত। কিন্তু বড়বংশের মেয়ে হয়ে এ কাজ করতে লজ্জা লাগে। দীপক মুনিষের কাজ করতে পারবে না। ঘাস কাটতে জানে না। দীপক ভাবে, শাড়ির দোকানে সেলসম্যানের কাজ নেবে। দীপক শাড়ি মিউজিয়ামে গেল। ঢুকে সরাসরি মালিককে বলল,আমার একটা কাজ দরকার। মালিক বললেন, এখন বিক্রিবাট্টা কম। কাজের লোক নেব না।

তারপর রূপশ্রী, দেবনাথ, রামকানাই, হাওড়া শাড়ি শো সব ঘুরে বাড়ি এসে হতাশ হয়ে বসে পড়ল। ইতুকে বলল, একগ্লাস জল দাও।

ইতু বলল, এবার জলই খেতে হবে গো।

সারারাত দু’জনের ঘুম নেই। ভোরবেলা দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। আজ ঘুম থেকে উঠতে ওদের আটটা বেজে গেল। উঠেই দেখে উঠোনে মাটির এক দেবতামূর্তি। মিস্তিরি হয়ত কার্তিকঠাকুর বানাতে গিয়েছিল, কিন্তু এটা কার্তিক না কী বোঝার উপায় নেই। সিঁদুর ঢেলে একাকার করে দিয়েছে চোখমুখ। বোঝার উপায় নেই।

ইতু বলেন, আমাদের ছেলেপিলে নাই বলে পাড়ার ছেলেরা হয়ত কার্তিক রেখে গেছে। আবার খরচ বাড়ল। পুজো করতে হবে।

ইতু বিয়ের আগে ছবি আঁকত। এখনও কিছুটা অভ্যাস আছে। দীপক বলল, চেঁচামেচি কোরো না। তুমি তুলি দিয়ে এই মূর্তিটা রঙচঙে করে দাও। ইতু বলে, কেন? এসব কেন?

দীপক বলে, তর্ক করার সময় পরে পাবে। এখন যা বলছি তাই করো।

ইতু তুলিরং বের করে কাজ শুরু করল। দীপক উঠোনে গর্ত করে শিলনোড়াটা পুঁতে দিল। মাটির মূর্তিটাও কিছুটা গর্ত করে বসিয়ে দিল। উঠোনটা প্রায় এককাঠার মত জায়গা জুড়ে রয়েছে। দীপক সিঁদুর মাখিয়ে মূর্তি ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। মানুষ দেখলেই ভয়ে ভক্তি করবে। কাজ কম্প্লিট করে চান করে মূর্তির সামনে বসে পড়ল সে। ইতু দীপকের কথামতো পাশের বাড়িতে জানালো। পাশের বাড়ির লোক পাঁচকান করে দিলো।

লোকজনে উঠোন ভর্তি হয়ে গেল। টুকটাক টাকাপয়সা পড়তে শুরু করল। কেউ আপেল দিল, কেউ নানারকম ফলমূল নিয়ে এসে হাজির। পাড়ার যারা রাতে এই কাজটি করেছে, তারা বলল দীপককে, আমরা কিন্তু একটা মূর্তি আপনার উঠোনে রেখেছিলাম। কিন্তু সেটা গেল কোথায়? দীপক মৌন হয়ে আছে। তার বদলে ইতু বলল, তা তো জানি না। আমরা উঠেই দেখলাম উঠোনের এই অবস্থা। পাড়ার ছেলেরা বলল, না বৌদি কোনোদিন মিছে কথা বলেন না। তাদের মধ্যে একজন বলল, ওই পাথরও তো মাটির তলা থেকে উঠেছে। মাথাটা জেগে আছে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা দীপকের ভক্ত হয়ে গেল। তারা বলল, এটা নিশ্চয় ওপরওয়ালার দয়া। দীপক মনে মনে হাসে আর ভাবে ওপরওয়ালা তো আমি। কী করব, না খেয়ে মরার থেকে তো ভালো। কিন্তু সে মৌনব্রত ধারণ করেছে। মিথ্যা কথা বলতে সে পারবে না। ইতু আর কিছু বলে না। এবার সব দায়িত্ব পাড়ার লোকজন নিলো।

পাড়ায় সন্ধ্যাবেলায় সকলে জড়ো হল দরজাঘাটের মাঠে। ঠিক হল, সকলে মিলে চাঁদা তুলে একটা ছাউনি করা হবে। সকাল, সন্ধ্যায় ধূপধুনো দেবে দীপক আর ইতু। মণিকাকা বললেন, এখন এটা পাড়ার মঙ্গলের জন্য সকলকে করতে হবে। রাতে ইতু বলে দীপককে, যারা অভাবে পেটভরে খেতে পায় না, তাদের যদি পাড়ার সকলে এক হয়ে খাবার ব্যাবস্থা করত, কত ভাল হত। দীপক বলে, সেখানেই তো গন্ডগোল। ছাড়ো ওসব। এবার একটা ভেল্কি দেখাব। ইতু বলে, কী ভেল্কি? দীপক বলে, রেশনে পাওয়া ছোলা কত কেজি আছে? ইতু বলে, একবছরে অনেক ছোলা জমে গেছে। বড় হাঁড়ির এক হাঁড়ি হবে। দীপক বলল, ভিজিয়ে দাও ছোলাগুলো সব। একদিন পরে ছোলাগুলো ভিজে সামান্য অঙ্কুরিত হবে। তারপর এগুলোকে ভিজে মাটির তলায় রেখে অনবরত গঙ্গার জলে ভেজাতে থাকব। তারপর বালির মধ্যে রাখা নোড়া মাটির তলা থেকে বেরিয়ে উপরে উঠবে। ইতু বলে, হ্যাঁ পনের কেজি ছোলা সম্পূর্ণ অঙ্কুরিত হলেই চাপ সৃষ্টি হবে আর ওই উর্ধ্বমুখী চাপে নোড়া উপরে উঠবে। নোড়ায় সিঁদুর, চন্দনে মাখামাখি। দেখলেই ভক্তি আসবে। আর নোড়া উপরে উঠতে দেখলেই কুসংস্কারের মনগুলো ভক্তিতে গদগদ হয়ে প্রচুর অর্থ ঢালবে জলের মতো। দীপক গর্ত করে নোড়ার তলায় ভিজে পনের কেজি ছোলা  রেখে দিল। এবার সকাল থেকেই অল্প করে জল ঢালতে হবে অনবরত।

পরের দিন সকালবেলা লোকজন আসার আগে পাড়ার ছেলেরা বাঁশের ব্যারিকেড করে দাঁড়াবার জন্য গোল গোল দাগ করে দিল। সকলে মাস্ক পরেই আসছে। গ্রাম ছাড়িয়ে গুজব শহরে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মত। প্রচুর লোক আসছে। ক্লাবের সেক্রেটারি থানায় একটা খবর দিয়ে রেখেছেন। থানার অফিসার বলে দিয়েছেন তিরিশজনের বেশি একসঙ্গে ঢোকাবেন না। 

পাড়ার স্বেচ্ছাসেবকরা গুণে গুণে লোক ঢোকাচ্ছে। প্রায় বারোটা নাগাদ নোড়া ঠেলে উঠতে শুরু করল উপরের দিকে ধীরে ধীরে। ক্লাবের সেক্রেটারি বললেন, আরে দেখ, দেখ পাথরটা ওপরের দিকে উঠছে। সকলে দেখল, তাই তো! মাটির তলা থেকে ওপরে উঠছে সিঁদুরমাখানো পাথরটা। সমস্বরে সকলে চিৎকার করে উঠল, জয় বাবার জয়। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা…

দীপক মৌন হয়ে বসে আছে উঠোনে। বসে বসেই গৃহশিক্ষকের বড় ব্যবসাদারের মতো আয় হতে লাগলো। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেলো দীপকের মাহাত্ম্য। কেউ কেউ বলে উঠল, জয় দীপকবাবার জয়, জয় দীপকবাবার জয়। ইতু মুচকি হাসল।

বেশ কয়েক মাস এভাবেই কাটল। তারপর একরাতে দীপক আর ইতু দু’জনে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিল মূর্তি ও পাথর। গঙ্গার কাছাকাছি দীপকের বাড়ি হওয়ায় এটা সম্ভব হল। ভোরবেলা দীপক আর ইতু উঠে বসল উঠোনে উন্মুক্ত হাওয়ায়। বেলা বাড়লে পাড়ার সকলে এসে দেখল, উঠোন ফাঁকা। সেই মূর্তিও নেই আর পাথরটাও নেই। সকলের এক প্রশ্ন, গেলো কোথায়? এতো লোকের মাঝখান থেকে কী করে উধাও হল মূর্তি! গুজব ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। দীপকবাবা একজনের প্রশ্নের উত্তরে কথা বললেন। তিনি বললেন, মানুষকে ভালো না বাসলে, মানুষের উপকার না করলে, মানবসেবা না করলে তিনি সেখানে থাকেন না। দীপকবাবার কথায় সকলে তার জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। প্রণামীর বাক্স  ভরতে শুরু করল ধীরে ধীরে।

দীপক মুচকি হেসে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্থির হয়ে বসল…

আরও পড়ুন...

Categories
2022_feb golpo

বেবী সাউ

গ ল্প

বে বী   সা উ

baby

মারি

এবং পাখিটিকে জিঘাংসাপ্রবণ মনে হচ্ছিল তার। যদিও এখনো পর্যন্ত চোখ এবং ক্যামেরার লেন্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়েও কিছুই দেখা, ধরা যায়নি। তাও পাখিটি ডেকে উঠলে আশ্চর্য এক ভয় এবং ভ্রমণ কাজ করে মাথার মধ্যে। মনে হয় যেন আশ্চর্য এক মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, আবার একটা মহামারি। এবং এখুনি হয়তো ফোন বেজে উঠবে আর সঙ্গে সঙ্গে একটা আর্ত কণ্ঠস্বর ব্যাকুল ও আকুল এবং সর্বস্বান্ত স্বরে অর্ধেক কথা মুখে, আর অর্ধেকের অর্ধেক নেটওয়ার্ক কোম্পানির দায়বদ্ধতা থেকে এবং অর্ধেক, তার মন স্মৃতিপীড়িত কোনো ঘটনার মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে শুনতেই পাবে না।

///

পাখিটির ডাক ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জুয়ান তার চোখকে সঙ্কুচিত করলো, বাইরে ঘন গাছটির দিকে তাকাল এবং কিছু দেখতে না পেয়ে শুধু শব্দকে অনুসরণ করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। নীচে শ্যাওলা পড়া পাঁচিলের ওপর একটা আশ্চর্য ধরনের বেড়াল, যার গায়ে অনেকটা বুনো বেড়ালের মতো ডোরাকাটা দাগ এবং চোখ শীতল, নির্লিপ্ত। ঘুরে জুয়ানের দিকে তাকাল। জুয়ান একটা শীতল হাওয়ার গন্ধ পেল এবং সে অনুভব করলো একটা অধিক ব্যস্ততম শহরের, যেখানে ভাবনার আধিক্য থাকে না এবং নিজেকে ভিড় ও ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে ফেলা সহজ হয়। কিন্তু এই মৃত্যুমিছিলের দিনে সেসব অসম্ভব ভেবে সে বেড়ালটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাখিটি খোঁজার দিকে মন দিল।

///

জুয়ান নিশ্চিত ছিল, পাখিটির ডাকই মৃত্যু সংবাদ শোনার কারণ।  সে বহু চেষ্টা করেছে পাখিটির নাম জানতে। বন্ধুদের পাখির ডাক রেকর্ড করে শুনিয়েছে। বাড়ির লোকজনের সাহায্য চেয়েছে, এমনকি গুগলে কন্টিনিউ প্রায় ছ’মাস ধরে বিভিন্ন পাখিদের ডাক এবং তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই পাখি এবং ডাকটিকে খুঁজে পেতে সে অসফল হয়েছে।

///

একটা অ্যাম্বুলেন্সকে চলে যেতে দেখলো জুয়ান। আর পাখিটির ডাক ম্রিয়মাণ মনে হলো তার। সে হঠাৎই অনুভব করলো একটা অ্যাম্বুলেন্স যেতে যতটা সময়ের প্রয়োজন, তার চেয়েও খানিকটা সময় বেশি নিচ্ছে এবং চারপাশের লোকজনের কান্নার একটা সুর গুনগুন করে উঠছে।  সেও বেড়ালটির মতো নির্লিপ্ত এবং অমনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলো এবং রুমে এসে হোয়াটসঅ্যাপ অন করলো। দেখলো কার কার সবুজ আলো জ্বলছে এবং কারা কতক্ষণ আগে অনলাইন ছিল। কিছু কিছু নাম্বার সে দেখলো প্রায় ছ’মাস, পাঁচ মাস, দু’তিন কিংবা লাস্ট সাতদিন আগে অন ছিল। তারপর…

সে এতকিছু না ভেবে হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে গেল এবং অ্যাম্বুলেন্স আসার কারণ ও বিলম্বের কারণ খুঁজে পেতে সক্ষম হলো। এবং তার হঠাৎই খুব জল তেষ্টা পেল। সে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই সফল হলো না। সে অনুভব করলো পা দু’টি অত্যধিক ভারী এবং অবশ…

///

এমন অবস্থা তার আগেও বহুবার হয়েছে। তাই জুয়ান অবস্থাটিকে ইগনোর করার চেষ্টা করলো এবং কোনো হোপফুল ঘটনার কথা ভাবতে চেষ্টা করলো। সে কল্পনা করলো ওমান সিনেমাটির কথা। এবং নটি হিলের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তার মাথা কোনো সিনেমাটিক জগতে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না, গেলও না। সে বারবার পাখির ডাকটির কাছে ফিরে আসছিল।  প্রথম যখন সে ডাক শোনে, সে চমকে ওঠার চেয়ে একটা কৌতূহল অনুভব করছিল। এবং যথারীতি ক্যামেরা নিয়ে ব্যালকনিতে ছুটে গেছিল। পরের বার যখন পাখিটি ডেকে উঠেছিল, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছিল মহামারী, লকডাউন এবং তাদের বাড়ির প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটিও। তৃতীয় বারের ডাক, তাকে আরও আশ্চর্য করেছিল এবং সেখানেও কাকতালীয়ভাবে হলেও আরেকটি মৃত্যু যুক্ত হয়েছিল। চতুর্থ বারে ডাকের সঙ্গে সঙ্গে কোনো মৃত্যু আসেনি। ফলে সে কিছুটা নিশ্চিত হয়ে নিজেকে ভুল প্রমাণিত করতে পেরে মনে মনে খুশিই হয়েছিল। সত্যি কি খুশি হয়েছিল! নাকি অপেক্ষা করছিল আরেকটি ঘটনার! না হলে পঞ্চম বার পাখিটি যখন ডেকে উঠেছিল এবং তার দিন দু’য়েক পরে যখন মৃত্যুর হার প্রচণ্ড বেড়ে গিয়ে সারা পাড়াটি থমথম করছিল, জুয়ান কি খুব আশ্চর্য হয়েছিল! বিষাদ কি তাকে বিভ্রান্ত করেছিল! নাকি ডাকের সঙ্গে এই মিলে যাওয়াটা তাকে আরও কৌতূহলী করে তুলেছিল!

///

সে ক্লান্ত অনুভব করলো। এবং সে বুঝতে পারছিল একটা অবশ মস্তিষ্ক তাকে ক্রমশ বিধ্বস্ত করে তুলছে। সে সামনের দিকে তাকালো, দেখলো, সবাই শশব্যস্ত! মা স্থির হয়ে বসে। চোখে জল। ভাই ছুটোছুটি। পাড়ার সবাই তাদের ঘরে! সে অবাক এবং আশ্চর্য হলো। সে অনুভব করলো পাখির ডাকটির শক্তি। এতো এতো মানুষকে একসঙ্গে হতে সে বিগত একবছরে কখনো দেখেনি। তার ভয় এবং ভালোলাগা দুটোই হচ্ছিল। সে আরও একবার জলের প্রয়োজন অনুভব করলো।  এবং মা’কে জল চাইল। মা তার দিকে তাকালো না। চুপচাপ বসে। জুয়ান অগত্যা আরও চিৎকার করে উঠলো এবং ভাইকে কিছু বলতে চাইলো। ভাই তার দিকে একবার এগিয়ে এলো এবং জল না দিয়ে চলেও গেল… জুয়ানের প্রচণ্ড রাগ এবং অভিমান দু’টোই হলো। সে নিজে ওঠার চেষ্টা করলো এবং অসফল হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো…

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo golpo

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

গ ল্প

সৌ ভি ক   ব ন্দ্যো পা ধ্যাা য়

এপিটাফ

মেঘলা হয়ে আসছে ভীষণ। বিকেল চারটেতেই ঘন অন্ধকার, খুব হাওয়া দিচ্ছে, উড়ছে শুকনো পাতা। আজ শনিবার, অফিস ছুটি, তাই উজান শ্রাবন্তীকে নিয়ে বেরিয়েছিল দুপুরে। পার্ক স্ট্রিটের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে , এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েছে এই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে । উজান আর শ্রাবন্তীর এই কবরখানায় আসতে বেশ ভালো লাগে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ যেন , কোনও হই-হট্টগোল নেই , লোকজন প্রায় নেই ভেতরে , শুধু এপিটাফ চারিদিকে , আর ঘাসে মোড়া নির্জন ছায়াপথ । এখানে সময় যেন থমকে আছে । ডিরোজিও, উইলিয়াম জোন্স-সহ আরও অনেক বিখ‍্যাত মানুষদের কবর আছে এই সিমেট্রিতে। শোনা যায়, বহুকাল আগে এখানে ঘন জঙ্গল ছিল , বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সেই জঙ্গলে বাঘ শিকার করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক অফিসার ও তাদের পরিবারের লোকজন এখানে চিরঘুমে শায়িত । বেশিভাগেরই মৃত্যু ঘটেছে অকালে, কলেরা বা অন্য কোনও রোগে । একটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে উজান – লেখা আছে উইলিয়াম বার্লো। উজান স্মৃতি ফলকের ওপর জন্মসাল আর মৃত্যুসালের মধ্যে ব‍্যবধান হিসেব করে বুঝলো উইলিয়াম মারা গেছিল মাত্র সতেরো বছর বয়েসে।

ভারতবর্ষ শাসন করতে এসে অনেক ব্রিটিশ অফিসারই তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছিলেন এ দেশের মহামারী-জল হাওয়ায় । হাঁটতে হাঁটতে উজান আর শ্রাবন্তী এসে পড়ে একটা খোলা প্রান্তরের সামনে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা আকৃতির কবর । বিত্তবানদের কবরের ওপর বড় বড় স্মৃতিসৌধ , অনেক ছোট ছোট কবরের ওপর নাম পড়া যাচ্ছে না , মুছে গেছে নাম ও পরিচয়। হঠাৎ বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা শুরু হয়ে গেল। সঙ্গে ছাতা নেই , শ্রাবন্তী নিজের ও উজানের মাথা কোনোরকমে তার নীল ওড়না দিয়ে ঢেকে , উজানের হাত ধরে ছুটে এসে দাঁড়াল একটা বিশাল গাছের তলায় । ততক্ষণে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে , চারিদিকে অন্ধকার , মেঘ ডাকছে , একটা ছমছমে পরিবেশ। উজান একটা সিগারেট ধরালো , শ্রাবন্তী কোনো কথা বলছে না , এমনিতেই কথা কম বলে , এখন বোধহয় বাড়ি ফেরার টেনশনে পড়ে গেছে । উজান দেখলো শ্রাবন্তী একমনে বৃষ্টি দেখছে , ওর চুল উড়ছে হাওয়ায় , উজান আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল । এই শেষ বিকেলের বৃষ্টিতে কবরখানায় এভাবে আটকে পড়াটা উজানের খুব রোম্যান্টিক মনে হচ্ছিল – ওর হঠাৎ খুব ইচ্ছে হল শ্রাবন্তীকে একটা চুমু খায়। বিদ‍্যু‍তের আলো সহসা আকাশ চিরে দিল , ভীষণ জোরে বাজ পড়ল কোথাও আর আচমকা শ্রাবন্তী জড়িয়ে ধরল উজানকে। শ্রাবন্তীর ভিজে শরীরের গন্ধ , ওর নরম উষ্ণতায় ডুবে গেল উজান। বললো, “ভয় নেই, আমি আছি…”

উজান তাকিয়ে দেখলো পাঁচটা বাজে, মানে গেট বন্ধ হয়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। বৃষ্টি কমে এসেছে , থেমেই গেছে প্রায়, ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভরে গেছে চারিদিক। হঠাৎ খেয়াল হল, সে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছের তলায়, শ্রাবন্তী পাশে নেই। শ্রাবন্তী কোথায় গেল? উজান অবাক হয় খুব। পাশাপাশি দু’জনে দাঁড়িয়ে ছিল, শ্রাবন্তী কখন সরে গেছে, বুঝতেও পারেনি উজান। এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্রাবন্তীকে কোথাও দেখতে না পেয়ে উজান হাঁটতে থাকে ভেজা রাস্তা দিয়ে , শ্রাবন্তীর নাম ধরে ডাকে দু’বার, ওর কন্ঠস্বর যেন স্মৃতিসৌধের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে নিজের কাছেই । মোবাইল হাতড়ে শ্রাবন্তীর নাম্বার ডায়াল করে উজান – সুইচড অফ। এবার উজানের সত‍্যিই টেনশন শুরু হয়ে যায়। শ্রাবন্তী তো এরকম করবার মেয়ে নয়। কিছু না বলে কেন সে উজানের পাশ থেকে সরে গেল! আর কখনই বা গেল তা উজান টেরই বা পেল না কেন ? হাঁটতে হাঁটতে উজান চলে আসে এক নির্জন কোণে , যেখানে পাশাপাশি দুটো কবর , আর তাদের মাথায় উপর নেমে এসেছে একটি প্রাচীন গাছ। আলো-আঁধারিতে উজান দেখলো ডানদিকের কবরের উপর চুপচাপ একা একা বসে আছে শ্রাবন্তী , মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে । “শ্রাবন্তী” বলে উজান ডাকতেই সে মুখ তুললো। উজান দেখলো শ্রাবন্তীর মুখ আকাশের মতই মেঘলা , আর কোথা থেকে যেন এলোমেলো উড়ে আসছে হাজার হাজার গাছের পাতা। দেখতে দেখতে শ্রাবন্তীর মুখ, ঠোঁট , সারা শরীর ঢেকে গেল পাতায় , আর ধীরে ধীরে সে ডুবে যেতে থাকলো, দুই কবরের মাঝখানে কালচে ঘাসজমির মধ‍্যে মিলিয়ে গেল শ্রাবন্তী, পড়ে থাকলো কিছু বিবর্ণ পাতা।

“দাদা , ক্লোজিং টাইম হয়ে গেছে” – সিমেট্রির কেয়ারটেকারের কণ্ঠস্বরে ঘোর কাটলো উজানের। সে এখন কী করবে ? শ্রাবন্তী আর নেই , তার চোখের সামনেই মাটির তলায় সে মিলিয়ে গেছে একটু আগেই । মাথায় মহাকাশ শূন্যতা নিয়ে উজান বেরিয়ে এলো গেটের বাইরে। সন্ধ‍ের আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিট যেন অন্য জগৎ । রঙচঙে যুবক-যুবতীদের পাশ কাটিয়ে উজান অন‍্যমনস্ক হেঁটে যেতে থাকলো । কোথাও যাবার নেই , একা একা ঠিকানাবিহীন উজান।

উজান আজ শ্রাবন্তীর সঙ্গে বেরিয়েছিল । সেই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি , সেই আলোছায়া পথ। উজানের মনে হয় , শ্রাবন্তী ঠিক ফোন করবে রাত্রে , যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে , আর তারাদের আলো এসে পড়বে জানলায়।

ঠিক এক বছর আগে শ্রাবন্তীদের গাড়িটা দুমড়ে মুচড়ে পড়ে ছিল কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে। অফিসের কলিগদের সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিল শ্রাবন্তী। ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টি , ব্রেক ফেল করে যায়।

ধীরে ধীরে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের পুরনো ট্রামলাইনের দিকে চলে যেতে থাকে উজান। হঠাৎ খেয়াল হয় আজ ১২ই জুলাই, পরশু শ্রাবন্তীর জন্মদিন। তাড়াতাড়ি পার্কস্ট্রিটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একটা গিফট শপ খুঁজতে থাকে উজান।

সন্ধে‍র আলো পেরিয়ে একটা ছায়া মূর্তি ভেসে যায় অজানার দিকে।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo golpo

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

গ ল্প

বি না য় ক   ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

যে সিনেমা হয়নি

মাফিয়া ডনদের জীবনে ধর্মের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। ফাটাকেষ্ট যে কারণে  কালীপুজোয় কম্বল বিলি করে, আলতাফ সেই কারণেই ইদের দাওয়াত দেয়। কারণটা প্রথমত জনসংযোগ এবং দ্বিতীয়ত নিজের একটা রবিনহুড ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু তার বাইরেও একটা কিছু থাকে। দিনভর চুরি-ডাকাতি-খুন-তোলাবাজি করে বেড়ানো লোকগুলো অজানা কোনও সুতোর টানে সাকার বা নিরাকার ঈশ্বরের সামনে বসে একটা বোঝাপড়া সেরে নিতে চায় হয়তো বা।  

আলতাফ নিজের ধর্মের প্রায় সব নিয়ম-কানুন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলত। তবে ধর্মের নামে কসম খেলেও তালাককে ও ঘোর অধর্ম বলে মনে করত।  বিশেষ করে তিন তালাকের কথা উঠলেই মাথা গরম হয়ে যেত ওর। তিনবার একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই একটা মেয়েকে নিজের সাজানো সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে এটা আলতাফ সহ্যই করতে পারত না। এই প্রসঙ্গে ওর সাফ জবাব ছিল যে কোন পণ্ডিত কী বোঝাচ্ছে ওর জানার দরকার নেই; ও নিজে যেটা বোঝে তা হল, এতবড় না-ইনসাফি কোনওদিনই ওপরওয়ালা পছন্দ করতে পারেন না। “হিন্দু হো ইয়া মুসলিম, কোই লড়কি কো ঘর সে নিকালনা জুর্ম হ্যায়।” আলতাফের লব্জ ছিল।   

লোকটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বম্বে গিয়ে। একটা বাই-লিঙ্গুয়াল ছবি হবে হিন্দি আর বাংলায়। তার বাংলা চিত্রনাট্য লেখানোর জন্য এক প্রোডিউসার আমাকে থাকা-খাওয়া আর পঞ্চাশ হাজার টাকার কড়ারে মাস দুয়েকের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ভিতরেই লিখে ফেলতে হবে স্ক্রিপ্ট। ব্যাপার এরকমই সহজ-সরল কিন্তু মুশকিল হত প্রতিদিন সকালে যা লিখতাম, রাতের মিটিঙে সেটাই ক্যানসেল হয়ে যেত। হিন্দিতে যে সিনটা যেভাবে আসছে, বাংলায় নাকি ঠিক সেভাবে  জমছে না। আরে মোলো যা! হিন্দি আর বাংলা তো দুটো আলাদা ভাষা শুধু নয় দুটো আলাদা পরিমণ্ডল। সিন বাই সিন একই জিনিস চাই তো আমাকে নিয়ে গিয়ে লেখানোর কী দরকার! দুটো ভাষাই জানে এমন কাউকে দিয়ে কপি-পেস্ট করিয়ে দে! 

ঝামেলা না করলে এই যুগে কোথাওই নিজের মত প্রকাশ করা যায় না। এখানেও আলাদা হবে কেন? তাই বলে ঝামেলা করতে তো যাইনি, কাজ করতে গিয়েছিলাম।  যে গেস্ট হাউজের একটা ঘরে আমায় রেখেছিল সেটা ভারসোভাতে। সামনেই সমুদ্র। জেলেরা মাছ ধরত আর সেই মাছ অনেকসময় পাড়ে জমা করত বলেই হয়তো খোলা জানলা দিয়ে  ভোরবেলা কীরকম একটা মেছো হাওয়া ঘরে ঢুকে আসত। তার অর্ধেকটা মিষ্টি, অর্ধেকটা লোনা। 

বম্বের গলা-কাটা কম্পিটিশনের জগতে অবশ্য নুন-মিষ্টির চল ছিল না তত। ঝাঁঝ আর ঝালটাই চলত। 

সেদিন রাতে আমাদের ছবির বাংলা ভার্সনের ডিরেক্টর প্রতীকদা আমায় একটা ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। জায়গাটা বার কাম রেস্তোরাঁ, কিন্তু তখন আমি মদ একেবারেই স্পর্শ করতাম না বলে আমার কাছে যাহা বাহান্ন তাহাই তিপান্ন ছিল।

ঘটনা হল, মাতালরা সাধারণত মদ খায় না এমন কাউকে পাশে বসিয়ে  মদ্যপান করে না। কিন্তু আমি হিন্দি গানটা মোটামুটি গাইতাম বলে ফ্রিতে গান শোনার জন্য আমাকে মাঝেসাঝেই বগলদাবা করে এদিক-ওদিক নিয়ে যেত প্রতীকদা। একবার লোখণ্ডওয়ালার সেই ওপেন এয়ার বার কাম রেস্টুরেন্টে বসে আছি।  হঠাৎ প্রতীকদাই আড়চোখে একজনকে দেখিয়ে বলল, এই লোকটাকে চিনিস? বিরাট ডন, নাম আলতাফ। কম সে কম তিরিশ-চল্লিশটা মার্ডার করেছে। বম্বেতে ওরকম কত ডন ঘুরে বেড়াচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ কুড়িটা মার্ডার করেছে তো কেউ চল্লিশটা। তাদের ভিতরে একজনকে চিনে লাভটাই বা কী? আমি তাই তত কিছু পাত্তা না দিয়ে মাংসের পকোড়া খেতে খেতে পরের গানটা ধরলাম। 

কিন্তু গানের মাঝখানেই আলতাফ সামনে এসে দাঁড়াল আর গান শেষ হতেই আমার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলল, বড়িয়া আওয়াজ হ্যায়, আর একটা হয়ে যাক। একটু ভয় যে করল না তা নয় কিন্তু ভয় কেটেও গেল একটু বাদে যখন আমার গাওয়া পরের গানটারও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে উঠল লোকটা। আরও তিন-চারটে গানের পর যখন ওই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আসছি, তখন লোকটা নিজের হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে ওর ভাললাগা পৌঁছে দিতে চাইল আমার কাছে। 

দু-তিনদিন পর প্রতীকদা আবার আমায় নিয়ে বেরোবার সময় খানিকটা উৎসাহের ঢঙেই বলল, আলতাফ তোর গান শুনে এমন ফ্যান হয়ে গেছে যে একদিন বসতে চাইছে তোর সঙ্গে। আমার এবার একটু ভয়ই লাগল। রেস্তোরাঁয় আলাপ হয়েছে, গান শুনে বাহবা দিয়েছে, ব্যস, চুকে গেছে! আবার ওই ডনের সঙ্গে বসে খেজুর করতে হবে কেন? রেগে গেলে দেবে চাকু চালিয়ে! প্রতীকদাকে জানিয়ে দিলাম যে আমি একেবারেই আগ্রহী নই ওই মাফিয়া ডনের সঙ্গে বসতে।   

-আরে না, অত ভয়েরও কিছু নেই। আর তাছাড়া চালালে পরে চাকু চালাবে কেন? ওদের কাছে কি ইনস্যাস, একে-ফর্টি সেভেন-এর অভাব আছে? প্রতীকদা হেসে উঠল। 

-ঝাঁঝরা করে দেবে একদম? 

-চাইলে, দিতেই পারে কিন্তু কেন দেবে না জানিস? তুই যে কারণে পয়সা ছাড়া বম্বেতে মাসের পর মাস পড়ে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখবি না। 

-মানে?

-মানে, আলতাফ একটা প্রফেশনাল ক্রিমিনাল। আর বম্বেতে প্রতিটা মার্ডারের পিছনে বিশ লাখ-পঁচিশ লাখ টাকার ডিল হয়। এবার যাদের খুন করে আলতাফের পকেটে পাঁচ-সাত লাখ ঢুকবে ও তাদেরই খুন করবে বাবু। তোকে মেরে হাতে গন্ধ করবে কেন?    

হয়তো প্রতীকদা ঠিকই বলছিল কিন্তু আমার সত্যি করে ইচ্ছে ছিল না একদম। আলতাফের হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা ওই সোনার দাঁত আমাকে ঘুমের ভিতর ভয় দেখাল একাধিক দিন। কিন্তু ভিনমুলুকে নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কতটাই বা দাম! আলতাফ একে-তাকে দিয়ে বারদুয়েক তাগাদা দিতে প্রতীকদাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল আমার সঙ্গে ওর মিটিং করাতে। প্রতীকদার ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছিলাম। অ্যাড হোক বা ফিচার, ওকে বম্বেতে ছবি বানিয়ে খেতে হবে। কিন্তু আমার মনটাকে কিছু বোঝাতে পারছিলাম না। বুঝতে বা বোঝাতে না পেরেও পৃথিবীর হাজারো কাজ হয়। তারই একটা ধরে নিয়ে আমি শেষমেশ প্রতীকদার সঙ্গে তর্ক করা বন্ধ করে দিলাম। আর একটা শনিবার সন্ধেয় আবারও আলতাফের সঙ্গে দেখা করতে  বেরোলাম। 

আর কোনও হোটেল-ফোটেলে নয়। ওরলির একটা সি-ফেসিং বাড়ির তিনতলায় এবারের মোলাকাত। বম্বে নিজের হেরিটেজ ধরে রেখেছে। তাই ভারতের সবচেয়ে গ্লোবাল শহর হয়েও নিজের ভিতরকার পুরোনো গন্ধটাকে মরতে দেয়নি;  কলকাতার মতো সমস্ত ঐতিহ্য ভেঙেচুরে ‘কোমর ছাব্বিশ, বুক ছাব্বিশ, পাছা ছাব্বিশ’ ফ্ল্যাটে বদলে দেয়নি পুরোটা।

আমরা ফ্ল্যাটের দরজায় বেল দিতে যে লোকটা দরজা খুলল, তার উচ্চতা ছ’ফুট ছাড়িয়ে আরও ইঞ্চি তিনেক। একদম পাথর কেটে তৈরি করা চেহারা। দেখলেই বুকটা কেঁপে ওঠে সামান্য। আমাকে আর প্রতীকদাকে যে নিয়ে এসেছিল সেই রীতেশ সালাম দিতেই লোকটা দরজা থেকে সামান্য সরে দাঁড়াল। কিন্তু আমরা ভিতরে ঢুকতেই সে প্রথমে আমাকে, পরে  প্রতীকদাকে,  জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে নিল একবার। 

-আসিফ, এরা সব আমাদের চেনা-পরিচিত। রীতেশ মিনমিন করে বলল। 

আসিফ ঠান্ডা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, মুঝে আপনা কাম করনে দো। 

সেই ‘কাম’ মানে জড়িয়ে ধরে শরীর থাবড়ানোর সময় লোকটার গা থেকে একটা তীব্র সেন্টের গন্ধ আমার নাক বন্ধ করে দিচ্ছিল প্রায়। আমি দমবন্ধ করেই দাঁড়িয়েছিলাম একরকম। আর আমার পালা শেষ হয়ে গেলে, প্রতীকদা কীভাবে সামলায় ব্যাপারটা দেখছিলাম। আমাকে অবাক করে প্রতীকদা হেসে উঠল আসিফ নামের সেই লোকটির বাহুবন্ধনে। 

সিকিওরিটি চেক শেষ করে আসিফ যখন আমাদের ঘরের সোফায় বসার ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেল আমি প্রতীকদাকে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না যে ও হাসছিল কেন ওইসময়।

-কী করব? লোকটা জড়িয়ে ধরতেই ওর আঙুলের ছোঁয়ায় আমার কাতুকুতু লাগছিল তো।  

-সেদিন তো দিব্যি ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে গান গাইছিল। আজ এখানে এত নিরাপত্তার ঘনঘটা কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

-খোলা জায়গায় ওর পিছনে তিন-চারটে বডিগার্ড থাকে। খেয়াল করা যায় না খালি চোখে। রীতেশ জবাব দিল।

ঠিক তখনই  ধোঁয়া ওঠা কফি আর বেশ কয়েকরকম কেক-পেস্ট্রি-বিস্কিট-ড্রাই ফ্রুটস ট্রে’তে নিয়ে হাজির হল দু’জন। 

-সন্ধে নেমে গেছে এখন আবার কফি? প্রতীকদা বলে উঠল। 

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আলতাফ ঘরে ঢুকে বলল,  রাত একটু গড়াক, তখন যার যা পছন্দ সবই মিলবে। 

প্রতীকদা চুপ করে গিয়ে কফিতে চুমুক দিল, আমি কয়েকটা পেস্তা হাতে নিয়ে কুটুসকাটুস করতে শুরু করলাম আর রীতেশ আলতাফের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কী বলল, ঠিক ধরতে পারলাম না।  

আমি আলতাফকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম যে ওই পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চির লোকটাকে ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবী বলে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায়। তেমন কোনও বিশেষত্বই নেই চেহারায় কেবলমাত্র নাকটা একটু বেশি চোখা আর চোখদুটো একটু ধারালো। ওর পাশে ওই আসিফ দাঁড়ালে সবার নজর আসিফের দিকেই যাবে। কিন্তু দুনিয়ায় শুধু চেহারা দিয়ে কবে কী হয়েছে যে আজ হবে? 

খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম, আলতাফ বলে উঠল, সিঙ্গার সাব আপনি রাইটার ভি আছেন জানার সাথে সাথে আমার মন হল কি আপনাকে দিয়ে আমিও একটা স্ক্রিপ্ট লেখাই। বহুদিন ধরে ইচ্ছা একটা ফিল্ম বানানোর। এটাও বাংলা আর হিন্দি দোনো মে হি হবে। আপনি বাংলাটা লিখবেন।  

-ডিরেকশন আমি দেব তো আলতাফ ভাই? প্রতীকদা বলে উঠল। 

-সেটা আমি এখনও ফাইনাল করিনি। আলতাফ ঝামা ঘষে দিল তৎক্ষণাৎ। 

প্রতীকদা মাথা নিচু করে কেকে কামড় দিল আর আমাকে খানিকটা অবাক করেই আলতাফ বলে উঠল, আমার সিনেমার নাম হবে, ‘তালাক’। খুব খারাপ জিনিস আছে। আপনি বোঝেন তো রাইটার সাব?

আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, বোঝালে বুঝব না তা নয় কিন্তু আমার মনে হয় এই সাবজেক্টটা আপনার কমিউনিটির কেউ আমার চেয়ে অনেক ভাল লিখতে পারবেন। 

-কিঁউ? তালাক কি শুধু মুসলিমরাই দেয় নাকি? হিন্দুরা দেয় না? তালাকের জন্য হিন্দু মেয়েদের জীবন নষ্ট হয়ে যায় না? 

-আমি আসলে এই ব্যাপারটা ভাল জানি না। একরকম সারেন্ডার করে দিলাম । 

আলতাফ দমে না গিয়ে বলল, জানতে হবে। আপনার সেদিনের গান শুনে আমি ফিদা হয়ে গেছি। এত দরদ দিয়ে গাইছিলেন আপনি। আমার স্টোরিটাও খুব দরদ দিয়ে লিখতে হবে। আর এর দুটো পার্ট আছে। প্রথমটা শুনলে তবেই পরেরটা বুঝতে পারবেন। তো পহেলে আপ মেরা কিসসা সুনিয়ে। ফির, বাকি বাত।  

রীতেশ হেসে উঠল কথাটা শুনে। প্রতীকদা বোকার মতো সেই হাসিতে যোগ দিল। আমি চুপ করে রইলাম। আলতাফের লোকেরা ট্রে’তে মদের বোতল আর গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকল। ওরা যখন সোডা আর বরফ দিয়ে মদ বানাচ্ছে, আলতাফ একটা লম্বা সিগারেট ধরিয়ে বলল, গল্প শুরু করার আগে একটা গান হয়ে যাবে নাকি? 

প্রতীকদা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আমি সুব্রত চ্যাটার্জীর একটা পুরোনো হিন্দি গান ধরলাম।                           

৩  

গানটা শেষ হতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আলতাফ, আপনার সুব্রতবাবুর গান ভাল লাগে?  

আমি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললাম। 

-শুধু বাঙ্গাল নয়, অল ইন্ডিয়া ফেমাস শকস হ্যায় উও। এই গল্পে উনিও আসবেন। বাট ফার্স্ট আমার কথা শুনুন।  

আলতাফ নিজের জীবনকাহিনি শুরু করল, হুইস্কিতে প্রথম চুমুকটা দিয়ে। 

গল্পটা শুনতে শুনতে  কীরকম অন্য একটা জগতে চলে যাচ্ছিলাম। সেই যেখানে সরু সরু রাস্তা, সন্ধেবেলা নানারকম আওয়াজ শোনা যায়, মেহেন্দি করা হাত সুর্মা করা চোখের নজরে পড়ে যায়; যেখানে লোহার শিকে গাঁথা থাকে মাংস আর ঝুট-ঝামেলায় গাঁথা থাকে জীবন, যেখানে বর্ষা হলেই নোংরা জল ঢুকে আসে কিন্তু গাড়ি  ঢুকতে পারে না, যেখানে গোটা মহল্লায় গ্র্যাজুয়েট একজন বা দু’জন কিন্তু জেলখাটা আসামি অজস্র, সেখানেই বেড়ে উঠেছিল আলতাফ।

ওর বাবা আলতাফের মাকে তালাক দিয়ে ফের শাদি করেছিল। আলতাফরা পাঁচ ভাইবোন কীভাবে বেঁচে আছে তার খোঁজটুকু পর্যন্ত নেওয়ার দরকার মনে করেনি। একবেলা খেয়ে, দু’বেলা না খেয়ে দিন কাটত ওদের আর মনে মনে একটা তীব্র জ্বালায় ভুগত আলতাফ যখন দেখত ওর সমবয়সী কোনও বাচ্চা, নিজের বাবার আদর পাচ্ছে। 

সময় থেমে থাকে না, সে সবাইকেই সেই মোড়ে এনে দাঁড় করায় যেখানে আধপেটা খেয়ে থাকা লোকের ভিতরেও সেই ভুখ জেগে ওঠে যা রুটি-মাংস কিংবা ভাত-মাছে মেটে না। আলতাফ যেহেতু খিদে দিয়েই দুনিয়া মাপত তাই সেই ভুখটাকেই ও ‘প্রেম’ বলে ধরে নিয়েছিল। আর সেই প্রেম ওর জেগে উঠেছিল ওদেরই মহল্লার লাগোয়া এলাকার একটা মেয়ের প্রতি। ছিপছিপে চেহারার, লম্বা বেণী করা সেই ‘মারাঠি মুলগি’র জন্য আলতাফের ভিতরটা ছটফট করত। মন যদি একটা মুরগি হত তাহলে আলতাফ কবে সেটাকে গলা মটকে মেরে দিত। কিন্তু মন তো হাজারবার মারার পরও কোঁকর-কোঁ করে ওঠে, তাকে নিয়ে কী করা যায়? 

মেয়েটা হিন্দু ছিল। কিন্তু তাতে কি? প্রেম কি হিন্দু মুসলমান মানে? আলতাফের যে মন, দিন নেই, রাত নেই ওই মেয়েটার কথাই ভাবত সেও তো ধর্মে, ‘প্রেমিক’ কেবল। ব্যবহারিক কোনও ধর্মের চাপ সে সহ্য করবে কেন?

মেয়েটা যখন ছাদে কাপড় শুকোতে দিত, আলতাফ ওই ভেজা কাপড়ের গন্ধে গন্ধে গিয়ে  দাঁড়াত গলির মোড়ে।  ভেজা কাপড়ের গন্ধটা কী করে চিনত, আলতাফ আজও বুঝতে পারে না। কিন্তু সেই দিনগুলোয় ওই সামনের বড় দোকানের ঘড়িটায় ঢং ঢং করে বারোটা বাজলেই নাকে একটা সুবাস লাগত এসে আর পেট পর্যন্ত কেমন মোচড় দিয়ে উঠত। 

একটা সময়ের পর আলতাফকে দেখলে মেয়েটা হাসত। আঙুল চালিয়ে চুল ঠিক করত। সাইকেল নিয়ে আলতাফ ওর পিছনে ধাওয়া করছে দেখে একদিন একটা টাঙায়  উঠে পড়ল মেয়েটা আর হঠাৎ করে টাঙাটা থামিয়ে আলতাফ যে গোলাপটা ওকে দেবে বলে ছুটে আসছিল সেটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল। 

সেদিন ভেবেছিল যে মেয়েটা ওকে  ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু তারপর কয়েকদিন মেয়েটাকে দেখতে পেল না ও। আর  একে-ওকে খোঁজ করে জানল মেয়েটার ফ্যামিলি পুনায় বেড়াতে গেছে। ওই পুনা থেকেই মেয়েটার বিয়ে দিয়ে ফিরে এল ওরা। স্তম্ভিত আলতাফ দেখল, যে রাস্তা ধরে ও মেয়েটার পিছু নিয়েছে সেই রাস্তা ধরেই একমাথা সিঁদুর নিয়ে নিজের বরের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটা। আর তার কয়েকদিন পর নাসিক না ঔরঙ্গাবাদ কোথায় একটা চলে গেল সে বরের চাকরির সুবাদে। এর-তার মুখে সবই শুনল আলতাফ। 

আলতাফ চোখের সামনে খুন, রাহাজানি, আরও অনেক কিছুই দেখেছে কিন্তু বুকের ভিতর এই অসহ্য যন্ত্রণা যেটায় রক্তটা বাইরে না এসে আরও ভেতরে ঢুকে যায়, সেটাকে কী বলে ওর জানা ছিল না। ভালবাসা কী এরকমই হয়? আলতাফ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করত। উত্তর পেত না। বদলে  ওর মনে হত যে ওকে স্ট্যাব করে যাচ্ছে দুপুরের রোদ্দুর, স্ট্যাব করে যাচ্ছে সমুদ্রের বাতাস,  রাতের বৃষ্টি, সন্ধের হাওয়া।

আলতাফ পাগল হয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুদের কেউ ওকে বেশ্যাখানায় নিয়ে গেছে, ও একটুও আনন্দ পায়নি;  দরগায় নিয়ে গেছে, ও এতটুকু শান্তি পায়নি। ভিতর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে না গেলে, এই যন্ত্রণাও বেরোবে না, এমনই ভেবে নিয়েছিল। আর এই মরতে হবে ভেবে নেওয়ার পরই ওর মাথায় আসে যে ওই মেয়েটা আর তার হাজব্যান্ডকে মেরে মরলে কেমন হয়? ওরা কবে আবার আসবে বম্বে? ততদিনে কি মেয়েটা প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে? এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে একদিন বার থেকে প্রচুর মদ খেয়ে বেরিয়ে রাস্তা ক্রস করার সময় একটা গাড়ির ধাক্কা খায়। গাড়িটা ওকে একেবারে শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে চলে যায়।  

অনেক পরে জেনেছিল যে সেই গাড়িটা হুশ করে বেরিয়ে গেলেও পরের গাড়িটা থেমেছিল। মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এক ভদ্রমহিলা ড্রাইভারের সাহায্যে আলতাফকে তুলে নিয়েছিলেন গাড়িতে। নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। প্রায় দেড়মাস  আলতাফ হাসপাতালে ছিল। ষোলোটা ফ্র্যাকচার হয়েছিল ওর। অতদিন হাসপাতালে থেকেও সারেনি আলতাফ, সেই ভদ্রমহিলা তারপরও ওকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিলেন তিনমাস। মায়ের মমতায় সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন। কিংবা মায়ের থেকে একটু বেশিই। কারণ আলতাফের নিজের মা তো ওর খোঁজ নিতেও আসতে পারেনি। সংসারের চাপে সেটা হয়তো স্বাভাবিকই ছিল। অবশ্য আলতাফ খুব বেশি মিসও করেনি নিজের মাকে। কেন করবে? জয়শ্রীদিই যে ততদিনে ওর মা, দিদি, ভগবান, আল্লা সব হয়ে উঠেছে। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো একটা সময়কে ঝর্নার জলে বদলে দিচ্ছে একাই।  

কিন্তু জয়শ্রীদির নিজের জীবনে দুঃখের অন্ত ছিল না। ওঁর বাড়িতে থাকতে থাকতে সেই দুঃখের সঙ্গেও পরিচয় ঘটল আলতাফের। তিনটে মেয়ে জয়শ্রীদির। নীলা, লীলা আর শীলা। কতই বা বয়স, নয়, সাত আর চার। ফুলের মতো দেখতে মেয়েগুলো কিন্তু ওদের বাবা, সেই সময়ের ভারত-বিখ্যাত গায়ক সুব্রত চ্যাটার্জীর চোখে ফুল নয় কাঁটা। ছেলে হয়নি বলে জয়শ্রীদিকে অকথ্য গালিগালাজ করত লোকটা। গোরেগাঁও-এর সেই ফ্ল্যাটের একটা ঘরে শুয়ে সেই গালি শুনতে পেত আলতাফও।  

-ছেলে ধরে এনেছ নাকি রাস্তা থেকে? ছেলে তো না, এ তো দেখছি লোক। ছেলের জন্ম দিতে পারোনি বলে যেখান থেকে যা পাচ্ছো তুলে আনছ? আলতাফকে দেখিয়ে জয়শ্রীদিকে বলেছিল লোকটা। 

আলতাফের মনে হয়েছিল উঠে দাঁড়িয়ে গলা টিপে ধরে লোকটার। কিন্তু তখন তো ওর সেই শক্তি নেই। মুখ বুজে সহ্য করেছিল তাই।  

লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর মেয়েগুলো কান্না জুড়ে দিত, আর জয়শ্রীদি বলত, বাবা একটুও ভালবাসে না তবু মেয়েদের মন তো বাপের জন্য কাঁদে তাই না? যদি আমাকে গালাগালি করার জন্যেও প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরত, তাহলে শান্তি পেতাম। 

লোকটাকে একদম পছন্দ হত না আলতাফের। কী রুড কথাবার্তা। জয়শ্রীদি তো দূর, নিজের একটা মেয়ে কোলে বসতে এলে তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। মাসের মধ্যে তিন সপ্তাহ তো দেশ-বিদেশ করে বেড়ায় গানের ট্যুরে, যে কয়েকটা দিন বাড়িতে থাকে, একটু ভালবাসতে পারে না বাড়ির লোকগুলোকে? এত বড় সেলিব্রিটি কিন্তু মনটা বম্বের ট্যাক্সির মতো ছোট। আলতাফ ভাবত। 

উল্টোদিকে জয়শ্রীদির নিজের দুর্দান্ত গলা, কিন্তু গানের কেরিয়ার ভুলে গিয়ে এই লোকটার জন্য জীবন উৎসর্গ করে বসে আছে। এই লোকটার ছেলের বাসনা পূর্ণ করবে বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রেগন্যান্ট হয়েছে তিনবারের বার, আর তারপরও ছেলে হয়নি বলে সুব্রত চ্যাটার্জীর খিস্তি-খামারি খাচ্ছে। দিনরাত খেটে মানুষ করছে মেয়েগুলোকে। পিয়ানোর ক্লাসে নিয়ে যাচ্ছে, গান শেখাচ্ছে, পড়তে বসাচ্ছে। তার মধ্যে, কে জানে কেন, রাস্তায় পড়ে থাকা আলতাফকে জীবন বাজি রেখে জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসছে। 

-তুমি শেষে আমার জন্য তোমার হাতের বালা দুটো বিক্রি করে দিলে? আলতাফ একদিন আর থাকতে না পেরে বলল। 

-কে বলল, বিক্রি করে দিয়েছি? 

-তোমার মেয়ে নীলাই, লীলাকে বলছিল। আমি শুনতে পেয়েছি।

-ওরা বাচ্চা, কান শুনতে ধান শুনেছে। আমি বিক্রি করিনি মোটেই, বন্ধক রেখেছি। সময় হলেই ছাড়িয়ে নেব।

-কিন্তু কেন দিদি? আমি তোমার কে যে আমার জন্য এত করছ? আলতাফের গলা বুজে এসেছিল। 

জয়শ্রীদিও কেঁদে ফেলেছিল জবাব দিতে গিয়ে, আমি জানি না তুই আমার কে। কিন্তু রাস্তা থেকে তোকে তুলে আনার পর যখন আমার কোলে তোর মাথাটা রেখেছিলাম আর আমার শাড়ি ভিজে যাচ্ছিল রক্তে তখন তুই আমার দিকে তাকিয়ে আধো অচেতনে বলে উঠেছিলি, “মুঝে বাচাও”। আর সেই সময় থেকে আমার মনে হতে থাকল যে তুই আমার জন্ম না নেওয়া ছেলে। কেন মনে হতে থাকল জানিস? কয়েকদিন আগেই আমি আবার কনসিভ করেছিলাম আর ডাক্তাররা আমার মত না নিয়েই অ্যাবর্ট করে দিয়েছিল বাচ্চাটাকে। আবার জন্ম দিতে গেলে আমি শিওর মরে যেতাম তাই। তারপরই তোকে রাস্তায় পেলাম আর তুই ওই কথাটা বললি; বিশ্বাস কর, তখন থেকে আমার মনে হতে থাকল যে তুইই সে। আমাকে কাতর গলায় বলছে, বাঁচতে চাই। এবার আমার পেটের ভিতর যে ছিল তাকে তো আমি বাঁচাতে পারিনি, তোকে মরতে দিতাম কী করে ?  

আলতাফ আর কিছু বলতে পারেনি উত্তরে। শুধু জয়শ্রীদির পায়ে নিজের মাথাটা রেখেছিল। আর জয়শ্রীদি ওর মাথাটা তুলে ধরে কপালে একটা চুমো খেয়ে বলেছিল, বেঁচে থাক।

শরীর সারতে আলতাফ যখন নিজের মহল্লায় ফিরে গেছে, পোর্ট এলাকার এক ছোট মাফিয়ার আন্ডারে কাজ শুরু করেছে, তখন জয়শ্রীদি একদিন পৃথিবীর থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। আলতাফ ওর এক বন্ধু মারফৎ খবর পেল যে একসঙ্গে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি আছে জয়শ্রীদি। 

খবরটা পেয়েই আলতাফ ছুটে গেল হাসপাতালে। 

-তুমি মেয়েগুলোকে রেখে, আমাকে রেখে, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলে? তোমার লজ্জা করল না একবারও?  

-করেছিল। কিন্তু যখন মেয়েদের স্কুলের ফিজ দিতে পারছিলাম না আর ওদের প্রিন্সিপাল ফোন করছিল, তখন আরও লজ্জা করছিল। ভেবেছিলাম আমি মরে গেলে হয়তো ওদের বাবা ওদের দায়িত্ব নেবে। আর তখন ওর নতুন বউও বাধা দিতে পারবে না।

-দাঁড়াও, দাঁড়াও। সুব্রত চ্যাটার্জী আবার বিয়ে করেছে?

-হ্যাঁ। ইন্ডাস্ট্রির উঠতি সিঙ্গার স্বপ্না চাওলাকে। আর বিয়ে করার পরই আমাকে সংসার খরচের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে পুরোপুরি। আগেও যে খুব বেশি দিত তা নয়, কিন্তু এখন একেবারে স্টপ। এমনকী এই ফ্ল্যাটের ভাড়া পর্যন্ত আটকে দিয়েছে। আর দশদিন পর আমাকে নীলা, লীলা আর শীলাকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আমি সুইসাইড অ্যাটেম্পট করব না তো কে করবে ? 

-কী বকোয়াস করছ তুমি? তোমাকে ডিভোর্স না করে চ্যাটার্জী ফিরসে শাদি করল কী করে? তুমি পুলিশে নালিশ করলে, ওর তো হাতে হাতকড়া লাগবে। 

-পুলিশ, আদালত কোথাও গিয়েই কিছু করা যাবে না। আইন যেমন আছে, আইনের ফাঁকও তো আছে। সুব্রত চ্যাটার্জী ধর্ম পালটে বিয়ে করেছে। ও এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

-মতলব?

-মতলব, সুব্রত চ্যাটার্জী মুসলিম হয়ে এই বিয়েটা করেছে। 

-উসনে সচমুচ ইসলাম কবুল কিয়া?

-না। মিথ্যেমিথ্যি মুসলিম হওয়ার নাটক করছে আমাকে আর আমার মেয়েগুলোকে না খাইয়ে মারবে বলে। বম্বেরই একটা ছোট মসজিদে গিয়ে কলমা পড়েছে, তারপর উকিলকে টাকা খাইয়ে এফিডেভিট করে ‘সারোয়ার হুসেন’ হয়েছে। এবার সেই ব্যাপারটা কোর্টের খবরাখবর ছাপা হয় এমন একটা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছে। সেই কাগজটা কেউই পড়ে না, কিন্তু ছাপা তো হয়। এবার কাগজটার কয়েকটা কপি নিজের কাছে রেখে দিয়েছে লোকটা। ও দিব্যি আগের মতো সুব্রত চ্যাটার্জী হয়েই জীবন কাটাবে কিন্তু আমি কোনও লিগাল স্টেপ নিতে গেলেই নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, একাধিক বিয়ে জাস্টিফাই করবে। 

-রোক্কে রোক্কে। এত কথা তুমি জানলে কীভাবে?

-সুব্রত নিজেই একদিন স্বপ্নাকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে এসেছিল, আর আমার মায়ের দেওয়া গয়নাগুলো সব আলমারি থেকে জবরদস্তি বের করে নিতে নিতে বলল, যে মেয়ে ছেলে বিয়োতে পারে না, তার গয়না পরা মানায় না। এগুলো আমার নতুন বেগম পরবে। আমি বাধা দিতে গেলাম ওকে, তখন… 

-চুপ করে গেলে কেন, বলো। 

-আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘তালাক, তালাক, তালাক’। জয়শ্রীদি চিৎকার করে উঠল।  

-হিন্দু আউরতকো তালাক দে দিয়া? ওয়া রে ওয়া! বলতে বলতে আলতাফের চোখের সামনে অজস্র মুখ ভেসে উঠল। প্রথম মুখটাই ওর মায়ের। তালাক পেয়ে যাকে পাঁচটা বাচ্চার হাত ধরে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। তারপর মনে পড়ল ওর ফুফির কথা, যাকে বাজারে পাঠিয়েছিল শ্বশুরবাড়ির লোক। আর সে গেটের বাইরে বেরোতেই দোতলা থেকে চিৎকার করে উঠেছিল তার স্বামী, ‘তালাক, তালাক, তালাক’ বলে। গেট পেরিয়ে আর ভিতরে ঢুকতে পারেনি সেই মহিলা। কিম্বা ওর সেই চাচাতো বোন যাকে হানিমুনে নিয়ে গিয়ে তালাক দেওয়া হয়েছিল। অজস্র উদাহরণ। আলতাফ ছোট থেকে দেখে এসেছে। অথচ হাজি আলির দরগায় বসে এক সুফি গায়ক ওকে বুঝিয়েছিলেন, তালাকের সঙ্গে ওর ধর্মের কোনও অচ্ছেদ্য সম্পর্ক নেই। যে ধর্মে, মায়ের পা’কে মানুষের জান্নাত বলা হয়েছে সেই ধর্মের নাম করে মেয়েদের অত্যাচার করাটাই তো সবচেয়ে বড় গুনাহ। আলতাফ ওর অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল,  তালাক আসলে কতগুলো স্বার্থান্বেষী শয়তানের নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার একটা ধান্দা। 

কিন্তু এই ধান্দা কতদিন চলতে পারে? হিন্দুধর্মেও তো সতীদাহ ছিল, মেয়েরা বিধবা হয়ে গেলে তাদের স্বামীর চিতায় তুলে দেওয়া হত। সেই নারকীয় প্রথা বন্ধ হয়নি? সাহেবরা এসে কোন একটা বাঙালির হেল্প নিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই বাঙালির নামটা জয়শ্রীদির থেকে শুনেছিল আলতাফ। কিন্তু মনে রাখতে পারেনি। আচ্ছা, ও নিজে এমন কিছু করতে পারে না যাতে জয়শ্রীদি আর বাচ্চারা ওর নামটা মনে রাখে সারাজীবন?   

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ততদিনে বম্বের অলিগলি মোটামুটি সড়গড় হয়ে গেছে আলতাফের। খুঁজতে খুঁজতে বান্দ্রার লিংক রোডের সেই ফ্ল্যাটেরও খোঁজ পেয়ে গেল যেখানে সুব্রত চ্যাটার্জী ওরফে সারোয়ার হুসেন নিজের নতুন বউ বা বেগমের সঙ্গে লিভ-ইন করছেন। হাতের পিস্তলটা দেখে দারোয়ান নিঃশব্দে আলতাফ আর ওর দুই স্যাঙাতকে ফলো করল আর নিজেই নক করল তিনতলা ফ্ল্যাটের দরজায়। সিল্কের লুঙ্গি আর হাত কাটা গেঞ্জি পরে তখন মদে ডুবে আছেন গায়ক। দারোয়ানের গলার আওয়াজ শুনে দরজা ফাঁক করতেই, ওকে একটা ঠেলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল আলতাফ আর ওর সঙ্গীরা?   

-অ্যাই তোমরা কে? গেট আউট অর আই উইল কল দ্য পুলিস। সুব্রত চ্যাটার্জী চেঁচিয়ে উঠল। 

-পুলিশ ডাকার আগে তোর গলার নলিটা কেটে দেব। লজ্জা করে না শুয়োরের বাচ্চা, আমার মজহবকে ইউজ করে নিজের খোয়াইশ মেটাচ্ছিস? তুই কী ভেবেছিস, পার পেয়ে যাবি? 

-ওহ তুই সেই লোকটা? তোর সাথে জয়শ্রীর কী সম্পর্ক? কেন তুলে এনেছিল তোকে রাস্তা থেকে? তোর সঙ্গে শোয়ার জন্য নিশ্চয়ই। যা এখন শো গিয়ে ওর সঙ্গে। আমি ছেড়ে দিয়েছি ওকে।   

কথাগুলো শেষ হতেই আলতাফ ঠাটিয়ে চড় মারল সুব্রত চ্যাটার্জীকে। লোকটা মাথা ঘুরে পড়ে গেল।

-তোর গান, তোর সুর, সব মিথ্যা। যে নিজের মেয়েদের খেতে দেয় না, নিজের বউকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়, সে আবার শিল্পী? নে, আমার দিদির গয়নাগুলো বের করে দে আগে।

-কীসের গয়না? কার গয়না? সুব্রত নিচু গলায় বলল। 

-বুঝতে পারছিস না, নাকি দিতে চাইছিস না? তা তুই তো এখন মুসলমান হয়েছিস, আমাদের মজহবে চুরির কী শাস্তি জানিস তো? বলতে বলতে আলতাফ ওর প্যান্টের পকেট থেকে লম্বা চাকুটা বের করল।

সুব্রত চ্যাটার্জী ভয় পাওয়া গলায় চেঁচিয়ে উঠল, না, প্লিজ আমার হাত কেটে দিও না।

ওর চিৎকারে কি না কে জানে, এই এতক্ষণে একটা স্লিভলেস নাইটি পরে স্বপ্না চাওলা ভিতরের ঘর থেকে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপতে শুরু করল।  

আলতাফ খেয়াল করল যে ভদ্রমহিলা বেশ ভালরকম প্রেগন্যান্ট। বিয়ে না করে সুব্রত চ্যাটার্জীর হয়তো উপায় ছিল না। কিন্তু জয়শ্রীদি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেনি কেন? নাকি আলতাফকে বলতে লজ্জা পেয়েছে? 

-আমার দিদির জীবনটা নষ্ট করে এখানে তুই আবার নতুন সংসার বানাবি? আলতাফ চাকুটা উঁচু করে এগিয়ে গেল একটু। 

-প্লিজ ওকে মেরো না। স্বপ্না ন্যাকা গলায় বলে উঠল। 

-আপনি ভিতরে যান। আর এখন থেকে বাইরের পুরুষমানুষের সামনে পর্দা করবেন। মজহব চেঞ্জ করেছেন না?   

-আমি কিছু চেঞ্জ করিনি। ও কী করেছে, জানি না। স্বপ্না বলে উঠল। 

-কী রে তোর নতুন বেগম কী বলছে?

-ওর কথা বাদ দাও আলতাফ। তুমি যা বলবে, আমি তাই করব। শুধু আমার হাতটা কেটে দিও না। আমি এটা দিয়ে মাইক ধরে গাই। ফাংশানে ফাংশানে। 

-সেই গান কে শোনে? আওয়াজ তো একটা দিল থেকে আর একটা দিলে যায়। কিন্তু তোর নিজেরই তো দিল নেই, তুই একটা পাত্থরদিল । তোর মতো লোকের কি গান গাওয়া উচিৎ? শোন, শুধু গয়নাগুলো ফেরত দিলেই হবে না। তুই যে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিস, ওটার মতো ভাড়া নিসনি, সে খবর আমি নিয়েই এসেছি। এবার এই ফ্ল্যাট আর নিজের সম্পত্তির অর্ধেক জয়শ্রীদির নামে লিখে দিয়ে বম্বে থেকে চলে যাবি। যে বম্বেতে আমি থাকি, যেখানে জয়শ্রীদি আছে, সেখানে তোর কোনও জায়গা নেই।  ইন্ডিয়ার যেখানে খুশি চলে যা কিন্তু এই শহরে থাকবি না। আর তুই হিন্দু হয়ে না মুসলমান হয়ে বাঁচবি, আমার দেখার দরকার নেই। আমি শুধু একটা জিনিস জানি তুই ইনসান হতে পারবি না। শয়তান হয়েই থাকবি।  

সুব্রত চ্যাটার্জী থরথর করে কাঁপতে লাগল, আমার এখন কত কাজ এখানে… 

-ওসব বুঝি না। পনেরো দিনের ভিতর বম্বে ছেড়ে চলে যাবি। নইলে… আর শোন আমি যা বলে গেলাম সেটা পুলিস কমিশনারকেও ফোন করে বলতে পারিস। 

ওদের কথার ভিতরেই স্বপ্না এসে জয়শ্রীদির সব গয়নাগুলো দিয়ে গেল। সেগুলো নিজের পাঞ্জাবির ভিতর ভরে নিয়ে আলতাফ অ্যাবাউট টার্ন করল।   

পরের ঘটনা বেশ নাটকীয়। পুলিশেও ফোন গেল না। মিলিটারিতেও না। উল্টে মাসখানেকের মধ্যে বম্বে থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সুব্রত চ্যাটার্জী কলকাতা চলে গেল।  মাঝেমধ্যে বম্বে আসত গান রেকর্ডিঙের জন্য, কিন্ত দু-তিনদিনের বেশি থাকত না কখনই। ‘বম্বে থেকে কেন চলে গেলেন’,  এই প্রশ্ন কোনও রিপোর্টার জিজ্ঞেস করলেই, সুব্রত চ্যাটার্জীর বাঁধা উত্তর ছিল, “বম্বের অ্যাটমোস্ফিয়ারটা ঠিক স্যুট করল না।” 

আলতাফ কথাটা শুনলেই হাসত। চ্যাটার্জী চলে যাওয়ার আগে নিজের ফ্ল্যাট জয়শ্রীদির নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিল, তিন মেয়ের নামে পাঁচ করে আর জয়শ্রীদির নামে দশ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটও করে গিয়েছিল। জয়শ্রীদি একটা চাকরিতে জয়েন করেছিল সুব্রত চ্যাটার্জী বম্বে ছাড়ার কয়েকদিন পরেই। সেখান থেকে আরও ভাল একটা চাকরিতে। সেই চাকরিগুলো পাওয়ার পিছনে আলতাফের ভূমিকা জয়শ্রীদি নিজেও কখনও জানতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিদির মেয়েরাও দাঁড়িয়ে গেছে প্রত্যেকেই। একজন পাইলট হয়েছে, একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন প্রফেসর। সুব্রত চ্যাটার্জীর মৃত্যুর পর কোন একটা মিডিয়া থেকে ওদের তিনজনের প্রতিক্রিয়া নিতে এসেছিল। তিন বোন একটাই কথা বলেছিল, উই ডোণ্ট রিমেমবার হিম।  

-সেই সুব্রত চ্যাটার্জীর গান আমি গাইছিলাম যখন, আপনি বাধা দিলেন না তো? গল্পটা শেষ হতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

আলতাফ হাসতে হাসতে উত্তর দিল, আমার বয়স এখন ফিফটি সেভেন। আর এই বয়সে আসতে আসতে আমি কী বুঝেছি জানো? শয়তানের ভেতরেও একটা ভগবান বাস করে আর গানটা সেই গায়। গানের সঙ্গে শত্রুতা কীসের? ইন ফ্যাক্ট কারও সঙ্গেই কীসের শত্রুতা? ভাববে এই কথা আমি বলছি, একটা মার্ডারার! কিন্তু মার্ডার করেছি বলেই বলতে পারছি, মানুষ মারায় কোনও সুখ নেই। ধান্দা ভেবে করি।  আসলি সুখ পেতাম যদি জয়শ্রীদির মতো করে মানুষকে বাঁচাতে পারতাম। 

-জয়শ্রী ম্যাডাম আছেন তো এখনও? 

-জরুর। এই সিনেমাটা তো ওকে ট্রিবিউট দেব বলেই বানাব। স্টোরিটা ইন্টারেস্টিং করে লিখে আনো তো দেখি। কিছু অ্যাডভান্স দেব? 

-না, আগে খসড়াটা অন্তত করি, তারপর। আমি জবাব দিলাম ।  

সেই খসড়া শেষ হওয়ার আগেই রাইভাল গ্যাঙের সাতটা বুলেট আলতাফকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল একদিন কোলাবার বিশাল বাজারের সামনে। ওর বডিগার্ডরা আন্দাজই পায়নি। গুলি যারা চালিয়েছিল তারা বাইকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল পলকে। মরবার আগে আলতাফ কী বলেছিল জানি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল একদম বিনা নোটিসে জীবনকে তালাক দিয়ে চলে যাওয়ার আগে আলতাফ বোধহয় ওর জয়শ্রীদিকে একবার শেষ দেখা দেখতে চেয়েছিল।

আরও পড়ুন...