Categories
2020_june path_protikriya

সায়ন

পা ঠ  প্র তি ক্রি য়া 

সা য় ন

মানবতার কোনও উপনিষদ হয় না,  কোরান হয় না

“আমি হলাম ককটেল ক্যাবিনেটের নীচে একটা ছোট্ট টিকটিকি, সভ্যতার সমকক্ষ।” হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম, সারা পৃথিবীতে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ একদিন রাষ্ট্র জানাল, আপনাদের বন্দি হয়ে যেতে হবে ঘরে। বাইরে নাকি মৃত্যুমিছিল শুরু হয়ে গেছে। কাকদ্বীপ থেকে ক্যালিফোর্নিয়া সবাই আজ সন্ত্রস্ত, ভীত। প্রাত্যহিক জীবনে ঢুকে পড়ছে সংক্রমণ ও সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং। একে অপরের থেকে সর্বদা দূরে থাকুন কারণ মানুষ এখন এমন এক বাহক, যে অপরকে সংক্রমিত করে দেবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য নয়, চিত্র এক, অনৈক্য বিরাট। আমরা জানতেও পারছি না কিছু- শুধু মৃত্যুর সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের সন্ত্রস্ত করে রেখেছে। শেষের দিনটা আমি কী শুধু একটা পরিসংখ্যান হয়ে বেঁচে থাকব মানুষের মনে! মাথার মধ্যে দুটো লাইন এসে গেল—

 

“আমেরিকা, মহাচীন এগিয়ে আসছে- গরীবের কী হবে?

 আমরা ডাক্তার নই, আমরা মানুষ- ইতি একজন ফুচকাওলা।”

 

সুবোধ সরকার! ২০০৬ সালের একটি কবিতার বই থেকে লাইন ক’টা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। অবাক হয়ে বইয়ের নামটা দেখছি- “যা উপনিষদ, তাই কোরান”। বইয়ের তাক থেকে চোদ্দ বছরের পুরনো একটা বন্দুক হাতে নিলাম, যার প্রতিটি পাতায় বুলেট ছাপানো আছে। এই কবিতাগুলোর সংক্রমণ থেকে তাহলে এখনও মুক্ত হতে পারি নি, আজও। 

সংক্রমণ- ১

২০১১ সাল, ২১শে ফেব্রুয়ারী। ভাষা দিবসে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে দুপুর ২টোয় কান পাতা দায়- মঞ্চে একজন কবি উঠছেন। আমি তখন ফার্স্ট ইয়ার, মেয়েদের কলেজে গেছি কবিতা শুনতে। এটাও হয়! সুন্দরীরা একজন কবির জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে- তাঁর কবিতা শুনবে বলে। আমি কালো টি-শার্ট, জিনস, উনি কালো শার্ট, কটন ট্রাউজার্স। কবি বললেন “আমরা কেউ বাংলায় কবিতা পড়তে ভালবাসি না,” কন্ঠে তাঁর ‘মণিপুরের মা’। একজন তরুণ সংক্রমিত হল কবিকে দেখে, নাম সুবোধ সরকার। 

 

আমি ইনফেক্টেড হলাম কবিতা, প্রেম আর সাহসিকতায়। নিঃসঙ্গ সময়ে ঘরে বসে বসে অতীতের ছবিগুলো দেখছি। ছবি একটা সময়। কবির চোখ দিয়ে সময়কে দেখলে তার পরিসর অনেক বিস্তৃত হয়। ঠিক যেভাবে দান্তে হাত ধরেছিলেন ভার্জিলের, আমার হাত ধরে উনি নিয়ে এসেছিলেন ভাষার নগরে, ভাষানাগরিক হওয়ার আইডেন্টিটি কার্ড দিলেন, কানে কানে বলেছিলেন, “বিড়াল সাদা না কালো, কী দরকার, ইঁদুর ধরতে পারে কী?” (সাদা না কালো)

 

চারপাশটা যখন ক্লান্ত, অসহায়, অনিশ্চিত- তখন কবিতা কী করতে পারে এই সভ্যতার? পারে, অনেককিছু পারে। কবিতায় “সময়টা থাকেই। কারো লেখায় সময়টা একটু বেশি চেনা যায়, আবার কারো কারো কবিতায় এটা লুকিয়ে থাকে। একটু চিনে নিতে হয়।” (সাক্ষাৎকার সংগ্রহ, সুবোধ সরকার)

সংক্রমণ- ২

এই ইউনিপোলার বিশ্বের টুঁটি টিপে ধরবার প্রতিযোগিতায় চীন একটা মারণ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। এমনই দাবি নিয়ে গোটা বিশ্বের গণমাধ্যম উত্তাল। ইতালি থেকে নিউইয়র্ক- গণকবরে তছনছ সর্বত্র। সারা বিশ্ব একটি দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে, তখন চীন একেবারে নিশ্চুপ। লা রেসফুকোর একটি ‘ম্যাক্সিম’-এর কথায় বলি- “স্বার্থান্বেষীরা সব ভাষায় কথা বলতে পারে, সব ধরণের লোকের ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে, এমনকি উদাসীন লোকের ভূমিকায়। এই সময়ে “কী বললেন, বিশ্বায়ন?”—

 

“আমি আমেরিকায় গিয়ে শুনে এলাম

 লোকে ওখানেও বলছে

 দিনকাল যা পড়েছে 

 তুমি তোমার খাবারের কাছে ঠিক সময়ে

 পৌঁছতে না পারলে

 অন্য কেউ পৌঁছে যাবে।”

 

লকডাউনের ফলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। অর্থ যার আছে তার থাকে প্রাণের ভয়, খিদের থেকে বড় সংক্রমণ আর কিছু আছে? 

সংক্রমণ- ৩

“যারা মঞ্চে ওঠেন না তাদের বলি, জল নয়

ওটা মদ

মন্ত্রী

কবি

আমলা

ভাইস- চ্যান্সেলর

      সবাই ওই মদ পান করেন।“  (মঞ্চ)

 

কোন সময়ে দাঁড়িয়ে কোন বইটা পড়ব- এই নির্বাচনকে বলে বোধ। অনর্গল টিভিতে আতঙ্কের প্রচার, সন্ধ্যা নামলেই আলো করে কবিদের খামখেয়ালী বিলাপ। কবিতা, গল্প- সৃষ্টির আপন আত্মপ্রচার একটি জাতির অলস কূপমণ্ডুকতার ছবির বাইরে বিরাট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস, জাতীয়তাবাদী বিষ, উদারভাবনার ঐক্য থেকে সরিয়ে রাখা গণবিচ্ছিন্নতা নিয়ে আমরা কি সামান্য ভাবিত! নির্বোধ আত্মঅহংকার ও স্বল্পবিদ্যার অস্ত্র দিয়েই একটা দেশ কি সুন্দর আমাদের একে অপরের থেকে দুরে সরিয়ে দিল- এই বিষয়ে ভারতীয় কবিরা কতটা সজাগ! এই উত্তর অধরা। সুবোধ সরকারের কবিতা ঠিক এইখানেই বিশ্ববোধের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কবিতা তার সোনার কাঁকন খুলে রেখে – একটি আখ্যানের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে, এক হাতে রাইফেল, আরেক হাতে সংবিধান বই ধরে প্রশ্ন করে—

 

“কপালে আজ যা থাকে

মুণ্ডু যার উড়তে গেছে

 বন্ধ্ ডেকেছে আজকে যার ধড়…

 পুলিশ যদি কখনও মারে চড়

কে তাকে ভার দিয়েছে চড় মারার?

(মাফিয়া)

 

কবির মধ্যে যখন চলতে থাকে “গল্প না থাকলে আমি ভালো করে নিশ্বাস নিতে পারি না। উড়তে পারি না। বাস্তব আমাকে উড়তে বলে। যেভাবে মাটি থেকে একটা বিমান শুরু করে তার উড়ান। ন্যারেটিভ আমার কাছে একটা রানওয়ে।” তখনই সেই সাহিত্য মানুষের জন্য হয়ে যায়। “সে মানুষ যেরকমই হোক, সাহিত্য শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য। … সাহিত্য তা সে যত কম লোকই পড়ুক বা যত বেশী লোকই পড়ুক, আসলে শেষ পর্যন্ত সেটা মানুষের জন্য। ( “আমি বিশ্বাস করি রাজনীতি থাকুক, পলিটিক্স বন্ধ হোক।”

সংক্রমণ- ৪

“বাঙালী সমাজের এরকম হিপোক্রেসি আছে, যে তারা মুখে খুব সুশীল, বাইরের আচরণে খুবই ভদ্র। কিন্তু ভিতরে তারা একটু অন্যরকম। ভেতরে তাদের মধ্যে ভায়োলেন্স আছে, সেই ভায়োলেন্সটা  লুকানোর একটা কায়দা আছে।” (‘কথায় কথায়’) বাঙালির জীবনে এখন সবচেয়ে বড় মারণ ভাইরাসের নাম ফেসবুক। এই বন্দিদশায় শুধু তাদের টয়লেটের আপডেট বাদ দিয়ে সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। একটা দেশের কি বিপুল বৈচিত্র্য ভাবলে গা শিউরে ওঠে। যে মা ‘সন্তান প্রসব করে দু’ঘণ্টা পর হাঁটতে শুরু করে’ – সেই দৃশ্যের পরেই দেখতে পাওয়া যায় বাহারী খাদ্যসামগ্রী। পসরা সাজিয়ে আয়োজন দেখানোর আত্মপ্রচার। এর নামই বোধহয় ‘বিশ্ব’- “মাওবাদীদের সঙ্গে স্নান, আমেরিকায় বিয়ার খান।

গোটা বিশ্বজুড়ে মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে— তখন কী করে প্রাণের আরামে সেজে নিজেদের এত আত্মপ্রচার করতে পারে মানুষ! সামান্য ক’টা জিনিস গরিবের হাতে তুলে দিয়ে ৭০টা ছবি আপলোড হয়ে যায়- কেন? ফিরে দেখেছে কেউ, ক’জনের পেট আরও আছে খালি? কতজন গলায় দিল দড়ি, রেলে দিল মাথা, হাতে তুলে নিল বিষ- “বসে ভাগচাষি, হাতে ফলিডল / গণতন্ত্র মূষিকের স্বপ্নে পাওয়া ফল।” (সুজলাং সুফলাং একজিটপোল)

সংক্রমণ- ৫

“যাও ধর্ম, যাও রাজ, ভণ্ড আর.এস.এস.

দাও পুত্র, ঢালো বিষ, মধুপাত্র শেষ।

যাও ধর্ম, জাতে ওঠো, যাও জল অচল

চন্ডাল লিখুক কাব্য বিন্ধ্য হিমাচল

যাও থুতু, যাও বিষ্ঠা, যাও ক্যাবিনেট

ভুল অর্থনীতি যাও ঋণং দিবেত।” (সুজলাং সুফলাং একজিটপোল)

 

একটা ভয় আর হতাশা কত মানুষকে পিশাচ করে তুলেছে গোটা দেশ জুড়ে। কিন্তু গোটা দেশ বা বিশ্বের টুকরো টুকরো ছবি দেখতে দেখতে আর নিজের শহরের এক একটি অঞ্চলের ‘মুখোশ’ পরা মানুষগুলোর বাঁচার জন্য উগ্র চেহারা যেভাবে প্রকট করে তুলছে, আর সেই সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্র একটি দানবে পরিণত আজ। একটা গেরিলা মন চিৎকার করে—

 

“রিভলবার যদি কখনও ছোটে

 ছুটবে গুলি এ-কান থেকে ও-কান

 দুপুরবেলা কলেজ ষ্ট্রীটে আমরা হব দুজনে খান খান।”

(রিভলবার)

 

ভাইরাস কোনও ধর্ম দেখে না, বিপদের কোনও জাত হয় না। ১৪ বছর আগের একটি বই খুলে বসে আছি। কবিতাগুলোর সামনে বসে ভাবছি- দেশ, বিশ্ব, মানবজাতির আপাত অবস্থা তাহলে একই জায়গায় রয়ে গেল। চেক রিপাবলিকের কম্যুনিস্ট সুন্দরী যেভাবে সব হারিয়েছিল, উহানের গ্রামের মানুষ সংক্রমণের মিথ্যা সন্দেহে একইভাবে দেশছাড়া হয়। শ্রমিক, চাষি, মজুরদের রাজনীতির শিকার বানানো হত, তাদের ঘাম রক্ত দিয়ে লেখা হত সরকারের নাম। না খেতে পেয়ে তখনও মারা যেত, এখনও মারা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ তো আরও অন্ধকার। আমার সেকেণ্ড সেমেস্টারের ছাত্রী অয়ন্তিকার ঘর ঝড়ে সম্পূর্ণ ভেঙে গেলে ক্লাবের লোকেরা তাদের পরিবারকে সিঁড়ির নিচে স্থান দেয়, ক্লাবঘরটুকু পর্যন্ত দিতে পারে না- যদি তারা ভাইরাসের বাহক হয়! আমি আসলে সুবোধ সরকারের কবিতা পড়ছিলাম, না আলোচনা করছিলাম জানি না- তবে কবিতাগুলো একটা নতুন রক্তাক্ত জীবন দেখাচ্ছিল বার বার, যে ভণ্ডামি, হিংস্রতা “কত চালাকি ধরা পড়ে না/ যখন পড়ে, বামাল সহ পড়ে/ পড়েই উঠে দাঁড়ায়”

 

যা উপনিষদ, তাই কোরান  সুবোধ সরকার  |  আনন্দ পাবলিশার্স

আরও পড়ুন...

Categories
2020_june path_protikriya

রাজীব চক্রবর্তী

পা ঠ  প্র তি ক্রি য়া 

রা জী ব   চ ক্র ব র্তী

‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’ : শঙ্খ ঘোষ

এক জায়গায় কবি অরুণ কুমার সরকার বলেছেন যে, কবি মাত্রেই এক হিসেবে সমাজ সচেতন, তবে কেউ সরাসরি বা কেউ অন্যভাবে। কারোর লেখায় যেমন থাকে অদ্ভুত ঋজুতা, কেউ বা সেখানে এক আপাত ক্ষিণ্ণ প্রবাহ বহন করে চলেন। জয় গোস্বামী লিখেছেন, কবিতা এক আকস্মিকের খেলা। কিন্তু কী থাকে সেই আকস্মিকতায়? কবি বা স্রষ্টা (উপনিষদ) কী পান তাঁর সৃষ্টি থেকে? কী পরিচয়ই বা রাখেন কবি? নেহাতই কিছু শব্দ, যাতে ছন্দ-লয়ের রজ্জুপাশ দিয়ে বেঁধেই কি কবিতা হয়! আর হলেই বা কী? তাই কি কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা পাবে? কতজন শ্রোতা বা পাঠকের প্রয়োজন একজন কবির? কত মানুষ শুনলে তাকে কবিতা বলা যায়? এতসব অযুত নিযুত প্রশ্ন কবির মাথায় নিয়ত‌ই ঘোরাটা স্বাভাবিক; কারণ সাধারণ তেল নুন লকড়ির গল্প থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর কালি-কলম নতুন কিছু সৃষ্টি করে ফেলতে চাওয়ার এক স্ফুট বা অস্ফুট বাসনার কারখানাই তো কবির মগজ। তাঁর সামাজিক অবস্থান সেখানে এক দ্যোতনা সৃষ্টি করেই।

 

        এইসব রাশি রাশি প্রশ্নের বাণ ফেলে যে প্রশ্নটি চির বিতর্কিত এক শাশ্বত অবয়ব পেতে চায় তা হলো নিঃসন্দেহে হলো ‘কলাকৈবল্যবাদ’‌।  কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উদ্ভাবিত এই শব্দবন্ধটিকে কেউই এড়িয়ে যেতে পারেন না। শিল্প কি শুধুই শিল্পের স্বার্থে , তার কি কোনো সামাজিক দায়িত্ব নেই! অর্থাৎ আমরা আবার ফিরে গেলাম এই লেখার একেবারে প্রথম কথাটিতে – কবি অরুণ কুমার সরকারের চেতনায়। আমাদের বর্তমান পাঠ চর্চায় এইসব প্রশ্নের‌ই এক বিন্যস্ত উত্তর আমরা যে গ্রন্থে ফিরে পাবো তাকে নিয়েই বর্তমান চর্যা। ব‌ইটির নাম ‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’ এবং রচয়িতা শ্রী শঙ্খ ঘোষ।

 

         যে লেখকের নাম আমরা একেবারে শেষে উল্লেখ করলাম তাঁর কৃতিত্বের বিবরণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। কৃতবিদ্য এই মানুষটি আজীবন কবিতার সঙ্গে অধ্যাপনা, প্রতিবাদের সঙ্গে গবেষণার এক ঋজু অক্ষরমালা হয়ে শুধু ছাত্রছাত্রী বা পাঠক সমাজেই নয়, বরং বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্য অঙ্গনের ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেয়েছেন। তাই চরিত্রপূজার বদলে তাঁর এই সৃষ্টিকে আমরা একটা পাথেয় করে আমাদের কাব্য ব্যাকরণ স্বরূপ গ্রন্থের মর্মবাণীকে তুলে আনতে চাই।

 

          কবি পরিচিতিতে তাঁর যে সত্ত্বাটি অনুল্লেখ্য রয়ে গেলো তা হলো তাঁর প্রাবন্ধিক ধারা, যার বৈশিষ্ট্যটি শুরুতেই একেবারে বলে নেওয়া ভালো। তাঁর গদ্যের সারল্য ও গতিময়তা পাঠককে পাঠ ও তন্ময়তায় আকৃষ্ট করে রাখবে। ফলত, পাঠ সরল ও‌ সাধু হলে যেকোনো স্তরের পাঠকের ক্ষেত্রেই বিষয়ের মূল রস অনুধাবনে বাধা থাকে না ; গদ্যের সাবলীলতায় তাঁর বৈদগ্ধ্য ও ভাষাজ্ঞান অবশ্যই প্রতিফলিত হয়। লেখক তাঁর অন্যান্য গদ্যের মতোই বর্তমান রচনাটিকেও সেই উচ্চতর স্থান থেকে বিচ্যুত করেন নি।

 

          যেকোনো কবির‌ই কবিতা চর্চার সঙ্গে সঙ্গে দায় বর্তায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কবিতার সংজ্ঞা নিরূপণ, যা কাব্যধারাকে সদা প্রবহমান রাখবে। জর্জ অর‌ওয়েল এই রচনার ক্ষেত্রে যে চারটি কারণ তুলে এনেছেন তাঁর ‘হোয়াই আই রাইট’ প্রবন্ধে, সেগুলি হলো – প্রথম, লেখকের বিশুদ্ধ অহংভাব। দ্বিতীয়, নান্দনিক আগ্রহ। তৃতীয়, ঐতিহাসিক প্রণোদনা। চতুর্থ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আবার অন্যদিকে গুস্তাভ প্লবেয়র বলেন “Writing is a dog’s life, but the only life worth living”। হ্যাঁ, কবিতা রচনা কবিকে তাড়িত করে তাঁর জীবনবোধের প্রকাশ ঘটাতে। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি কবিতাকে তাঁর লড়াইয়ের অস্ত্র শানের পাথর করে তুলতে চেয়েছিলেন। শঙ্খ ঘোষের বর্তমান রচনাটি পাঠ করলে সেই বোধকেই শাণিত করা যায়, আর পাওয়া যায় এক প্রত্যয়ী মানুষ যা কবিকে করবে দর্পিত ও উদাসীন। তবে সেই দর্প কখনোই অন্যকে ছোটো করার জন্য নয়, বরং নিজস্বতা তৈরির ভাবনা আর উদাসীনতা, মানে তুচ্ছতার থেকে বৃহতে মিশে যাওয়ার চিহ্ন।

 

          আলোচ্য গ্রন্থটিকে বিষয়বস্তু ও আলোচনার পরিধি অনুযায়ী লেখক সাতটি প্রবন্ধে বিভক্ত করেছেন। একেবারে প্রথম প্রবন্ধের নাম বিশেষণহীন কবিতা যেখানে এক স্বতন্ত্র দ্রাঘিমা নির্মাণ করে আমাদের দেখানো হয়েছে কবির কোনো দশক বা কালের ব্যাপ্তিতে সীমায়িত থাকার বা গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছে তাঁর মৌলিকতাকে ক্ষুণ্ণ করে। কেন কবির বিশেষ কালের (পড়ুন সদম্ভ অমুক দশকের) বলে নিজেকে দেগে দেওয়ার তাগিদ থাকবে? উপনিষদ কবিকে কালের ঊর্দ্ধে তুলে ধরেছে। সেখানে যখন‌ই কোনো বিশেষ দশকে কবি নিজেকে বাঁধেন, লেখকের কথায় তখন‌ই তো তিনি খাটো করেন কবিতার বক্তব্যকে। বর্তমানে সামাজিক বিন্যাস-আর্থিক দুর্দশার যে ভয়াবহ ছবি উঠে আসে, কবিরা নিজেদের কোনো বিশেষ গোষ্ঠী অর্থাৎ আধুনিক, উত্তর আধুনিক ইত্যাদিতে ভাগ করে ‘কবিতাকে আপডেট’ করার মহতী যজ্ঞে সামিল হয়ে এই সবকিছু এলোমেলো করে দিতে চাইছেন। এর‌ই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখক এই সীমায়নের সমালোচনা করেন। কবিতা কোনো কিছুকে ভেবে নিয়ে নির্মিত হয় না, সেই চেষ্টা করলে তাকে আদৌ সার্থকতা দেওয়া যায় কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই। কবির দৃষ্টি যেন সেদিকে সতর্ক থাকে। অর্থাৎ যা লিখছি তারপরও যেন কোনো বিশেষ ঘরানাকে নেতৃত্বের পদে তুলে আনার বাতুল প্রচেষ্টা না হয়। কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর ভাষাকে ব্যবহার করে বলা যায় “… কোনো কবি যদি এক‌ই বিষয় সারাজীবন পুনরুক্তি করেন, তাঁর যদি কোনো উত্তরণ না হয়, তা যেমন দূষনীয়, আবার কবি যদি ‘চরিত্রবান’ না হন, তাঁর যদি নিজস্ব কোনো পৃথিবী তৈরি না হয়ে ওঠে, তাঁর গলার স্বর যদি সহজেই না চেনা যায়, তা-ও এক‌ইভাবে সমালোচনার যোগ্য”। এই অনুভূতির প্রকাশ নিজস্বতা সৃষ্টি, একমাত্র বৃত্তহীনভাবে নিজেকে তুলে ধরা। নিজের কলমের দাগকে প্রকাশ করার মাধ্যমেই তা সম্ভব, তাই লেখক আমাদের জানান। তৃতীয় যে বিষয়টি তা হলো গোষ্ঠীর বাইরে নিজস্বতা তবে কী, কীই বা সেই মহামন্ত্র যা কবিতায় ধ্বনিত হলেই তার সার্থকতা? উত্তর দিয়েছেন তিনি নিজেই। কবির মহামন্ত্র হলো বেঁচে থাকা, ‘‘জীবন ছাড়িয়া যাসনে মোরে” — এই হলো জীবনবোধ এবং এই জীবনবোধ বা জীবনীশক্তি আসে কেবলমাত্র লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে, যে কথা আমরা পাই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত কবি এজেকিয়েল মার্তিনেথ এস্ত্রাদার বোধে “All his work is a battle against oppression, against the privileges and rivalries that separate human being of whatever condition”. অর্থাৎ নৈরাজ্য নয়, শিকলভাঙা হাতের খোঁজ করেছেন লেখক কবিতায়। এই তত্ত্ববিন্যাসে কোনো নির্মোক বৈরাগ্য নেই, যেমন নেই জোর করে মিলিয়ে দেবার চালিয়াতি। সত্যের খোঁজ চলুক কবিতায়। এই তার আলয়। তাই সহজেই তিনি বলতে পেরেছেন, “… কবিতার হয়তো তত্ত্ব হতে পারে, কিন্তু তত্ত্ব দিয়ে কবিতা হয় না”।

 

          দ্বিতীয় অধ্যায়টিকে তিনি সংযোগের কবিতা হিসেবে নামকরণ করেছেন। এখানে তিনি তুলে এনেছেন অন্য এক বাস্তবতাকে, তা হলো কবির সমাজবোধ অর্থাৎ কবিকে তিনি নানান অভিজ্ঞানে দেখলেও কবিতার সঙ্গে তারুণ্যের সাধারণ সম্পর্ক যে ক্ষয়িষ্ণুতা ও বীতস্পৃহা, সেটি তাঁর চোখে অবলীলায় ধরা পড়েছে। কবিকে তিনি ‘সিসমোগ্রাফ’ যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, যেকোনো সমস্যার মাত্রা পরিমাপ করেন কবি, তার প্রকাশ হয় তাঁর লেখনীতে। বিভাজিত সমাজের মৌল হলো অসাম্য ও অপ্রাপ্তি। ক্ষয়িষ্ণু সমাজ আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের জায়গায় তুলে ধরে বিচ্ছিন্নতা, যার বহু উল্লেখ পাই বর্তমান লেখকের লেখায়। এখানেই বিদগ্ধ লেখক রশি ধরেছেন। অর্থাৎ যে ক্ষয় হতাশ করেছে তারুণ্যকে, তিনি হাতে কলম নিয়েছেন নিজের ঘৃণা ও অতুষ্টিকে পাথেয় করে সেই হতাশার কারণ অনুসন্ধানে। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন কবির বিচ্ছিন্নতাকে। যেমন লিখেছেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ঋত্বিক যখন মর্গে শুয়েছিলেন’ কবিতায়–

 

“আত্মহত্যার নিয়ম, তারা শিখেছে এই সময়

জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার…

এই তো সময়

ডাকিনীদের খেয়াপারের…”

 

        এই বিচ্ছিন্নতাকেই দূর করে জীবনের কাছে ফিরে যেতে বলেছেন গ্রন্থকার। তিনি বলেন “এক‌ই মানুষ এক‌ই সঙ্গে ব্যক্তিগত আর সামাজিক হতে পারেন, হ‌ওয়া ভালো। কিন্তু একজন মানুষ এক‌ই সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিক আর সামাজিক হতে পারে না”। অর্থাৎ কিনা কবির ভবিতব্য হবে সামাজিক বোধবিত্ত ও আত্মবোধ — স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁকে বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংসের মুখোমুখি করে, আর তা সম্ভব কবি যদি দৃষ্টান্ত হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেন, খুঁজে নেন তাঁর আত্মশক্তি। প্রশ্ন জাগে, কলম নিজে দার্ঢ্যকে কি দীর্ঘ যোজন পথ এগিয়ে দিতে পারে? শুধু রবীন্দ্রনাথেই কি সব উত্তর মিলবে? পাশাপাশি তিনি আমাদের গুরুজনের মতোই যে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আধুনিকতা বিচ্ছিন্নতার নামান্তর নয়, বরং বিচ্ছিন্নতা বিনাশের অন্য নাম। তাঁর নিজের কাব্যগ্রন্থ ‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’-তে এই ধারণাই স্পষ্ট।

 

       গত শতকের‌ই আটের দশকে লেখা বর্তমান গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের নাম থেকেই স্পষ্ট হয় তাঁর বিষয় — ছন্দকথা। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কবিতার ক্লাস’- এ ছন্দ নিয়ে যে নরম ও স্বকীয় রচনা করে তরুণ বাঙালি কবিকুলকে ছান্দসিক করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করেই বর্তমান লেখক বলেছেন যে, সমস্ত কবিতাতেই ছন্দের বাস। কথোপকথনের ঢঙে রচিত এই অধ্যায়টি তিনি নিগূঢ় নিয়মের বাইরে গিয়ে বিগত দেড়শো বছরের কবিতা প্রবাহে ছন্দের অবস্থান বলতে গিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে তুলে এনেছেন- “কিন্তু কথা বলবার চালের মধ্যেই ছন্দ লুকানো আছে, চলমান সেই ধ্বনি-স্রোতের মধ্যেই যে প্যাটার্ন করা যায় এইটেই তো আধুনিকতার একটা বড় শিক্ষা। আপনারা লক্ষ্য করেন নি যে মাইকেল থেকে বস্তুত সেই চেষ্টাই হয় একাল পর্যন্ত। মাইকেল, গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ”। লেখক আমাদের আরো জানান সুধীন্দ্রনাথ তাঁর ‘অর্কেষ্ট্রা’ নামক সুদীর্ঘ কবিতায় নিজেই কিভাবে ছন্দপতন ঘটিয়ে আমাদের সামনে উদাহরণ তুলে দিয়েছেন। মনে পড়ে কবি ভাস্কর চক্রবর্তী এক জায়গায় ছদ্ম ছন্দপ্রেমের বিরুদ্ধে জবানী দেন, কবিতার জন্য ছন্দ। ছন্দের জন্য কবিতা নয়।

 

         পরবর্তী পর্যায়ের নাম লেখক দিয়েছেন হাল্কা একটা আলাপ। পূর্ববর্তী ঢঙেই নেহাত সরল কথোপকথনের মাধ্যমে কবিতার মূল বা ধ্রুবপদকে তিনি এখানে তুলে এনেছেন। তাঁর প্রত্যয় কবিতায়; কেবল কবিতায়। অর্থাৎ, কবি কোনো বাহ্যিকতায়, যেমন প্রকাশক, সমালোচক বা পাঠকের তৎপরতায় কিংবা পৃষ্ঠপোষকতায় কাব্যিক ধারায় তার মোহনা খুঁজে পাবেনা, তাঁকে হতে হবে নির্মোহ। কিন্তু আমরা যদি কালান্তরে দেখি, যে কবিতা রাজানুগ্রহ পায় তা কিভাবে নির্মম হতে পারে! বিপ্রতীপে ছোটো পত্রিকা বা স্ব-উদ্যোগে প্রকাশিত লেখা যেহেতু দ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, তাই সে পড়ে থাকে আড়ালে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি (কবি বা স্রষ্টা) এই একাকিত্বকে কতদিন ও কিভাবে সামাজিক সমস্যার সঙ্গে জুড়ে নিয়ে লিখে যেতে পারেন? এখানেই বোধহয় মায়াকোভস্কির লেখনী নির্দেশকে নজরে আনতে হবে। ‘সূত্র তৈরি করার প্রণালী কিংবা কবিতা সম্পর্কিত নিয়মাবলীর লক্ষ্য নির্ধারিত হয় শ্রেণী অবস্থান এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনের ভিত্তি থেকে’। অর্থাৎ কবিতাকে তিনি সরাসরি শ্রেণীর লড়াইয়ের হাতিয়ার বা মাধ্যম করতে চাইলেন, যেমন চেয়েছেন ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু এই ‘বাহিরানা’ কি কবিতার বর্ম হিসাবে আদৌ সার্থকতা পেতে পারে সে তর্ক‌ও কিন্তু উঠবে।

 

         পরবর্তী পর্বটি বিনীত অহংকার নামে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ যার রচনাকাল  সবচেয়ে অর্বাচীন ; নয়ের দশকের একেবারে শেষ লগ্নে। পর্বটি তাঁর নিজগুণে অভিনবত্ব ও দর্শনে অনন্যতা পেয়েছে। সংকলককে এখানে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ পূর্ববর্তী প্রবন্ধের এই নৈপুণ্যময় বাঁধন সৃষ্টি করতেই হয়তো পরবর্তী এই প্রবন্ধটির এখানে সার্থক অবতারণা করা হলো। ঋজু উচ্চারণে আত্মশক্তিকে জাগরণের নিদান দিলেন এখানে লেখক কাব্য অনুগামীকে। নিজের ওপর আস্থা রাখতে লেখক বারবার রবীন্দ্রনাথকেই আশ্রয় করেছেন। তাঁর কথনীতেও তাই যেন তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন অসচেতনভাবে এবং ‘অংশত রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি’ হিসেবেই।

 

        তিনি ‘অহং’ কে ‘নঙ্’ অর্থে নয় বরং তাকে চরিত্রের সম্পদ করে ‘বিনয়’-এর আহ্বান করেছেন। আর বাংলা সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছোটো কাগজ ও তার কলমচিদের জন্য নিদান রেখেছেন- ভ্রষ্টের প্রতি আত্মতা ও ঔদাসীন্য। এর মধ্যেকার আমিত্ব যেন চিত্তকে ভয়শূন্য করে, বায়বীয় নয়। এই ধারণা নিঃসন্দেহে পাঠককে বাধ্য করবে লেখকের দর্শনে শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার আশ্রয় খোঁজার তাড়নাকে উৎসাহ দিতে।

 

        কবিতা লেখার জন্য যা প্রয়োজন তা হলো কবিতা পাঠ। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন, বড় চুল, ঢোলা জামা কবিতা লেখার শর্ত হতে পারে না। তাহলে শর্ত কী? কবিতা পাঠ; আরও আরও বেশি কবিতাকে বোঝা আর বোঝার সঙ্গে সঙ্গে পড়া। বর্তমান গ্রন্থের শিরোনাম‌ই হলো তাই ‘কবিতালেখা কবিতাপড়া’। অর্থাৎ এই অধ্যায়টি নির্মিত হয়েছে কবিতা পাঠের আলেখ্যে। ক্ষীণ কলেবর এই প্রবন্ধে আরও কিছু মৌলিক সমস্যা ও তার অপসারণের রাস্তা দেখিয়েছেন লেখক। ইতিহাস চর্চার মুখ্য কারণ হলো অতীতের আয়না ও ভবিষ্যতের দ্রষ্টাকে বর্তমানের ভিত্তিতে পথ দেখানো। এই অংশে লেখক কবিতার উদ্দেশ্যকেও সেখানেই তুলে এনেছেন। ফলে কবিতাকে ইতিহাস ও সামাজিক অক্ষের অক্ষরবৃত্তে আনতেই লেখকের প্রয়াস। এখানে দ্বিতীয় যে বিষয়টি দেখানো হয়েছে তা হলো কবিতা পাঠে সাধারণের অনীহা, যার কারণ স্পষ্টত‌ই কবিতার প্রতীকধর্মিতা বা শব্দের গূঢ় নির্দেশ। এই প্রজন্মের শিক্ষিত আধুনিক-আধুনিকাদের একাংশের মুখে প্রায়শ‌ই শোনা যায় “অত ভাবার সময় নেই”। এই “অত ভাবা” মানেই হলো চিন্তার দৈন্য, তবে তার দায় সেই মানুষ বা মানুষীর নয়। এই দায় অবশ্যই আমাদের জীবনযাত্রার। বেঁচে থাকার জটিল গলিপথের গোলকধাঁধায় সেনাপতি ক্লান্ত। সে ভাবে না, ভাবতে শিখবেও না। আপাত সহজ‌ই তার আশ্রয়। কবিতা কিন্তু চেতনায় ধার আনে অর্থাৎ চৈতন্য ও সমবেদনাই কাব্যের অক্ষরে ঝলসে ওঠে। কবিতা প্রচলিতকে প্রশ্ন করতে শেখায়, তাকে গভীরে নিয়ে যায় কিন্তু ‘যে মেয়েটি ইংরেজি ভাষা শিখে শপিং মলের কাজে যোগ দেয়/ তার জন্য প্রেমিকের বড় প্রয়োজন’, এ কবিতার পংক্তিতে এক রূঢ় বাস্তব ধরা দিলে তাকে ধাবন করতে, তার দুর্বোধ্যতাকে নিজের পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে মেলাতে সব কালেই সমকালীন সমাজের একটা বড়ো অংশ ব্যর্থ হয়েছে। তাই শুধুমাত্র আধুনিক যুগেই নয় রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ বা বিনয়, সকলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দুর্বোধ্যতার। প্রসঙ্গত দুটি কথা আসে, প্রথম, যেকোনো চর্চার গভীরত্ব‌ই তো কাটতে পারে জটিলতার তন্তুজাল। সেখানে কবিতা কেন তার পাঠকের কাছে নিজস্ব অবস্থানের গৎ অনুযায়ী নিজস্ব অর্থ হিসেবে একক হয়ে দাঁড়াবে না, কেন পাঠক চিরন্তন একটি অর্থ অনুসরণ করেই মূল পাঠটিকে নিয়ে ক্ষান্ত থাকবেন? বনলতা সেন কেন জীবনানন্দেই আবদ্ধ থাকবেন? সে পাঠকের স্বপ্নচারিণী অথবা তার চেতনা কেন হবে না? এটা না ধরতে পারলেই তো কবিতা সুদূরের হাতছানি। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সমস্ত সচেতন (সমাজ ও আত্ম) মানুষ কি কবিতা পাঠ বা লেখালিখি করেন? বিপরীতে যারাই লিখছেন বা লেখেন তাদের সবার রচনাই কি কবিতা হয় — তারা সকলেই কি ভাবেন? তাহলে কবি আব্দুল ওয়াহাব আল-বায়তিকে কেন বলতে হয় স্বক্ষোভে- “নির্বাসন আমার স্বদেশ/ শব্দরাই আমার নির্বাসন”?  পাঠক এখানে ভাবনার খোরাক পাবেন নিঃসন্দেহে।

 

        একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আমরা স্মরণ করবো বাংলা সাহিত্যের অনন্য পুরুষ কমলকুমার মজুমদারকে। তিনি তাঁর পাঠক সংখ্যা চেয়েছিলেন মাত্র পঁচিশ (মতান্তরে সতেরো জন)। অর্থাৎ অধিক সন্ন্যাসীতে যে গাজন নষ্ট করে সেই ধারণা সাহিত্যেও সত্য। এই বক্রতায় কিন্তু তলিয়ে দেখলে বাজারী মনোভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও সাহিত্যমূল্যের মূল্যায়নের তাগিদ স্পষ্ট। বর্তমান প্রবন্ধে অনেকটা এই মন্তব্যের‌ই ছায়া পড়েছে, যার নামকরণ লেখক করেছেন কবি, পাঠক ও শ্রোতা।

 

        আধিক্য, খ্যাতির প্রতি দুর্মর লোভ তাৎক্ষণিকতার সঙ্গে ব্যাকুলতার বশবর্তী করে কবিকে। এই খ্যাতির দাসত্ব করতে গিয়ে মনোরঞ্জকে পরিণত হন। মনে পড়ে বাংলাদেশের এক খ্যাতনামা কবির উক্তি, যিনি সুদীর্ঘ প্রায় এক দশক কাল কোনো গ্রন্থ প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে বলেছিলেন পূর্ববর্তী গ্রন্থের পর্যায়ে যদি তা না পৌঁছায় তবে তা কবি মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করবে। এই সংকোচের বিহ্বলতাকেই ধিক্কার জানান বর্তমান লেখক। বৃহতের সঙ্গে মিলিত হ‌ওয়ার অভিমন্ত্র হলো জীবনবোধ আর এই অভিজ্ঞান‌ই যেন আমাদের একেবারে প্রথম অধ্যায়ের মর্মকথায় পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। গোটা গ্রন্থটিকে একটি নিপুণ বাঁধনে বেঁধে পাঠক তথা সম্ভাব্য কবিকে সূত্রবদ্ধ করে সরল‌ ও সুদীর্ঘ মননের পথ দেখান লেখক।

 

        একেবারে শেষ পর্বে জানানো উচিত এই দীর্ঘ আলোচনা যে গ্রন্থকে উপাত্ত করে, তার রসদ হলো ‘কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ কমিটি’ আয়োজিত সভায় এক বক্তৃতার পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ, যা লেখক আমাদের জানিয়েছেন গ্রন্থের ভূমিকাতেই। আর এই প্রসঙ্গেই জানিয়ে রাখা উচিত কাকতালীয়ভাবে হলেও বর্তমান গ্রন্থটি পাঠ ও আলোচনার সৌভাগ্য হলো কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষে পৌঁছে। রচনাটি নিঃসন্দেহে পাঠকের অভীপ্সা পূর্ণ করে কবিতার আঙিনাকে কুসুমিত করবে ও সুস্পষ্ট কুয়াশামুক্ত কাব্যপথ রচনা করবে। এখানেই গ্রন্থটির সার্থকতা।

 

কবিতা লেখা কবিতা পড়া  শঙ্খ ঘোষ  |  সপ্তর্ষি প্রকাশন

আরও পড়ুন...

Categories
kobita_may path_protikriya

পাঠ প্রতিক্রিয়া

পা ঠ প্র তি ক্রি য়া

শ তা নী ক  রা য়

‘লোচনদাস কারিগর’: এক অনন্ত অর্থহীনতার প্রতীক

আজকাল আর নিছক আনন্দ বা তাৎক্ষণিক সুখ উদ্রেকের জন্য কবিতা পড়ি না। আমি এমন কবিতা পড়তে চাই যার সামনে দীর্ঘদিন দীর্ঘ বছর আমি বিস্মিত হয়ে বসে থাকতে পারব। কোনো অর্থপূর্ণ প্রতিক্রিয়া নয়, শুধু কবিতার রেশটুকু থাকুক। গভীর নিদ্রা ভেঙে যাওয়ার পরও যেমন ঘুম থেকে যায়। ঘুমের জন্য শুধু নয়, সেই গভীরতার রেশটুকু থাকুক এটাই চাই। উৎপলকুমার বসুর ‘লোচনদাস কারিগর’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ছিলাম বেশ কিছুদিন হল। ওই বইয়ের ‘সপ্তর্ষি’ কবিতাটি আমার খুব প্রিয় কবিতা। উৎপলকুমার বসুর কবিতা আমার কাছে বড়ো একটা উদ্যানের মতো। এখানে সবরকম আশ্চর্যের বস্তু আছে, লোভের বস্তু আছে, প্রলোভন আছে, আবার এই সবকিছু থেকে দূরে একটা ফাঁকা নির্জন কোণ আছে যেখানে গিয়ে পাঠক একবারটি বসলে অনন্তের অনুভূতি পায়। যেন কোনো কিছুর ভেতর প্রবেশ করছি আমি, যে-জগৎটাকে বিশেষ জানি না আমি। যে-কবিতাটি উল্লেখ করেছি সেটার মধ্যে ‘সুষুপ্তি’ বলে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এই শব্দটা আমি প্রথম জানতে পারি প্রশ্ন উপনিষদ পড়ার সময়। তখন শুধু জানতাম তার অন্তর্গত উদ্দেশ্য সাধনা। একটা মানসিক নিবৃত্তির স্তর। 

‘সপ্তর্ষি’ কবিতায় ‘ভয়াবহ’ আর ‘সুষুপ্তি’ পাশাপাশি অবস্থানরত। হ্যাঁ, ওখানেই আবার ‘সাতখানি ঘুম’-এর উল্লেখ আমরা পাই। ‘উদ্বেগ’ শব্দটা কবিতাটিকে দিশা দেওয়া শুরু করে। আর আবিষ্কার করি তিনটি অদ্ভুত শব্দ ‘শূকরবাহিতা’, ‘খগবিলাসিনী’ আর ‘ডিগবাজিপ্রিয়’। পুরো কবিতাটি শ্লেষ এবং ব্যঙ্গ প্রবণতায় সিক্ত। অবক্ষয়ের কবিতা হতে গিয়েও কবিতাটি নিজ মহিমায় এই সবকিছু থেকে সুষুপ্তির দিকে ভয়াবহ হয়ে উঠল। এই জন্য শুধু নয় তার মধ্যেকার উত্তরণ প্রবণতা বাক্য গঠিত করল এমনভাবে যে, এখানে সুষুপ্তির হয়তো নতুন বিভঙ্গ তৈরি হল। অর্থহীন করে দিল সব। কবিতাটি উদ্ধৃত করছি: 

“গভীর উদ্বেগ নিয়ে শুয়ে পড়ি বিছানায়

                 সাতখানি ঘুম

                 আমাকে রয়েছে ঘিরে—

কেউ শূকরবাহিতা, কেউ খগবিলাসিনী, কেউ 

                   ডিগবাজিপ্রিয়

বয়স্য ক্লাউন, তার কুষ্ঠের সঙ যেন, ঐ পেটায় ঢোলক

                                    মাথায় কাগজটুপি

                                      পরনে ইজের

টানে শিল্কী ধরে সাধের ছাগলে—

                                      ওরা 

                         সাতখানি ঘুম আমাকে রয়েছে ঘিরে, বলে

                এখনি সঙ্গে চলো,

বলে—আয়

                গভীর উদ্বেগ থেকে

                          ভয়াবহ সুষুপ্তির দিকে।”

ওলোট-পালোট করে দেওয়া ভূখণ্ড মনে হয়। মনে হয় বহু বছর কোনো মানুষ এমন বোধের কাছে ঋণী হয়ে থাকতে পারে। সে পাঠক হতে পারে কিংবা স্বয়ং কবি। স্রষ্টাকেও অপেক্ষা করতে হয় জীবন তাঁকে কবিতা কীভাবে ফিরিয়ে দেবে। উৎপলকুমার বসুর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘হাঁস চলার পথ’ যেটা জয় গোস্বামী ও প্রশান্ত মাজীর উদ্যোগে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রথম কবিতাটি ‘হাঁস চলার পথ’ শিরোনামে কবি জীবিতকালে অনেকগুলো পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। আর প্রতিটি নতুন প্রকাশকালে কবিতাটি বদলে গিয়েছিল নানাভাবে। প্রতিটি কবিতাই একই শিরোনামে প্রকাশিত হলেও সেগুলো আলাদা আলাদা অস্তিত্বের মর্যাদা দাবি করে বলে আমার মনে হয়। সেই কবিতায় ‘হাঁস চলার পথ’ বোঝাতে গিয়ে যেভাবে আস্তে আস্তে মন্থর পদে স্মৃতিকে রোমন্থন করা আর তা নিয়ে আবিষ্কার আছে সেটা বড়ো আশ্চর্যের। সেখানে কবি বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাওয়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। যদি যুক্তি-বুদ্ধি সহকারে ভাবি তাহলে কবি তাঁর বাড়ির ঠিকানা ভুলে যেতে পারেন না। যতক্ষণ না তিনি ভোলার আপ্রাণ অভিপ্রায় নিয়ে নতুন কোনো ঠিকানার আশ্রয় চাইছেন। অতীত হাতড়ে হাতড়ে একটি হাঁস পরাবর্ত ক্রিয়া যেন। যেখান দিয়ে এসেছিলেন তারই অলিগলি, বিপুল টান আর মিশে যাওয়া— এটাকে গভীরভাবে চাইছেন। তারপর একটা ঘুম। তাঁর বহু কবিতায় ঘুমের প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসে। একে কোনো সংজ্ঞায় বাঁধার চেষ্টা আমি করব না। বরং কোনো অভিপ্রায়হীন মিলিত হওয়া মনে করি। নিজের সঙ্গে নিজেরই মিলিত হওয়া। সেরকই ওই ‘সাতখানি ঘুম’-এর প্রসঙ্গ। ঘুরে ফিরে আসে। যেখানে সময়ের যোগাযোগ কিংবা যোগসূত্র কেবল সময়হীনতার অন্ধকারে। ‘সপ্তর্ষি’ কবিতাটি অনেকবার পড়ে আমি দেখেছি সেখান থেকে সরাসরি কোনো অর্থ কেউ খুঁজে পাবে না। কবি সেখানে ঘুমের তারে বেঁধেছেন জীবনকে। সাতখানি ঘুম আর ভয়াবহ সুষুপ্তির এই অখণ্ড যোগাযোগ যেন চিরকালের বিচ্ছেদ আর সংযোগের কথা বলে। ছিঁড়ে যেতে যেতে ক্রমাগত যে-মানুষ চরম নেয় বিরতির পর আরও একবার ছিঁড়ে যেতে হবে তাকে। অদ্ভুত এই পৃথিবীর নিয়ম। অদ্ভুত যোগসূত্র আমাদের। সবকিছুর সঙ্গে এক বিপুল টান।                                      

এর আগের কবিতাটিই হল ‘তীর্থ’। যেন কবি তীর্থই করছেন। যাত্রা করছেন আবার কোনো সূক্ষ্ম জগতে। আলোহীনতার উদ্দেশে। এখানে কোনো নির্ণায়ক নেই। যে-কোনো পাঠক যেভাবে ইচ্ছে কবিতার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে পারেন। মানুষের সবার আগে মানস ভ্রমণ। বিচরণ করতে করতে সে শেখে। উৎপলকুমার বসুর কবিতায় বারবার নিত্যদিনের স্মৃতির টুকরো টুকরো মানচিত্র জুড়ে কবিতা হয়ে ওঠে। সেখানে যে-বৃহৎ চিত্রটির খোঁজ আমরা রাখি তার খানিকটাই আমরা পাই। কবি নিজেই ভালোবাসেন তীর্থ করতে। নানা অভিজ্ঞতার মিলিত ফসল তাঁর কবিতা। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা সরাসরি লুপ্ত হয়ে কোনো নিরাময় হয়ে আসে নয়তো নির্ণায়ক হয়ে দেখা দেয়। আর বাক্যের ভেতর শাব্দিক গঠনের সূক্ষ্মতা সেই তীব্র বাসনারই প্রতীক। কবি যেভাবে তীব্রভাবে যুক্ত এবং বিযুক্ত হতে চাইছেন। ‘তীর্থ’ কবিতাটির দুই নম্বর কবিতাটি পড়া যাক: 

“যাই সুখের ভিতরে নেমে, সিঁড়ি আছে, আলোও জ্বলছে, অনেক

অনেক বছর পর এই পথে কুয়াশায় দৌড়ে নামছি, বৃষ্টি পড়ছিল,

মহাবীর মন্দির-গুহায় রুপোর টুকরো, ভুল নয় নামার মুহূর্তে

ঠিক এ-ভাবেই দৌড়ে থাকি, সোনার ভিতরে নামি ধাতু ও তামার

উজ্জ্বল দণ্ড কাঁধে, সুখের ভিতরে নামি, হয়ত এমন

জটিল নামার জন্য মনগড়া শর্ত আছে, কেন বা পুরুষ

সুখের সন্ধানে যায় একা একা তারো কানুন রয়েছে, আমরা জানি না,

দৌড়তে ব্যস্ত থাকি, পাথরে পিছলে পড়ি, যাই গাছের শিকড়ে বেঁধে, 

                                             সেখানে ভোরের

আলোর ভিতরে জ্বলছে রাস্তার বাতিগুলি। আজো আমরাই প্রথম এসেছি।”             

‘লোচনদাস কারিগর’ বইয়ের প্রথম কবিতাটি ‘প্রকৃতি’ পড়তে গিয়েই লক্ষ করি একটা সুপ্ত তেজ সুপ্ত কারণ। কেন বেঁচে আছি তারই সুপ্ত কারণ লুকিয়ে আছে। ‘আগুন’ শব্দটি কবিতায় অনেকবার এসেছে। নিজেকে গোপন করে রাখার কবিতা এটি। নিজের গোপন থেকে বেরিয়ে আসার কবিতাও এটি। শূন্যে ভাসমান থাকার প্রসঙ্গ থেকে বহু জটিল আবর্তে কবি ফিরে এসেছেন ভ্রূণরূপী হয়ে। সেখানে নানা চিত্র বারবার ফিরে আসে। নানা আবর্ত নানা অবস্থানের কথা। সহাবস্থানের কথাও আসে। শ্বেত মেষরেখা আর শ্বেত শকুনের ডানা আসে। বুনো হাঁস। ভুলের কথা আসে। এটাই তো চিরন্তন বিভ্রম আমাদের। জড়িয়ে থেকেও কোথায় আবার লুপ্ত হয়ে যাই। শেষে পথের ফাটলের উল্লেখ তো এই আত্মগোপনকেই নির্দেশ করে। আর এই সবকিছুর কোনো যুক্তি কোনোদিন হয় না।                      

‘শীতকাতর ঘুমের ভিতর গভীরতর শীতের ঘুম আছে’ কবিতায় ‘অবরোহিতেশ্বর’-কে সম্বোধন করা হয়েছে। এই কবিতাকে কোন মাপকাঠিতে মাপব? এর কোনো সুরাহা করতে পারব না। ক্রমশ নানা ধরনের ইঙ্গিত কবিতাকে লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার গতি করেও কোথাও কোনো অন্ধকার বিজনে পাঠককে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আর অনিশ্চয়তার যাত্রা। অনেক কিছু। অবরোহন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে বারবার ভাবতে থাকা। পুনরায় সবকিছু হারানোর আশ্বাস আর ধ্বনি। একটু পরই লুপ্ত হওয়া। আর ঘুমের প্রসঙ্গে আবার বলতে ইচ্ছে হয় সেই পুরোনোকে আদিমকে আটপৌরে করে বেঁধে রাখা আরকী। এখান থেকে ভ্রমের উৎপাদন। ভ্রমনাশও এখানেই। 

‘সুখের কথা আর বোলো না’ কবিতাটি টানা গদ্যে লেখা। এখানেও জীবন আছে। গল্প আছে। কোনো বোধের কথা নেই। ইঙ্গিত নেই। শুধুই গল্প। এই বইয়ের অন্য কবিতাগুলো যেমন ‘বিজলীবালা’, ‘তদন্ত’, ‘রক্ষাকবচ’, ‘রণনিমিত্ত হৃদয় আমার’ সবেতেই এই ডায়ালেক্ট লক্ষ করি না। এই নিপাট গল্পের মধ্যে ভীন ভাষার উচ্চারণ প্রবণতাও লক্ষ করি। আরেকটি খুবই উল্লেখযোগ্য দিক হল এই কবিতারই দুই নম্বর কবিতাটি কিন্তু প্রথমটা থেকে অনেকটাই আলাদা। এই হল জীবন যা কবিতায় প্রতিবার খোঁজ করি। এই খোঁজের তীব্র অনন্য প্রয়াস কিন্তু লুকিয়ে থাকে কবি কীরকম ভ্রমের উৎপাদন করেন কিংবা কবিতাকেই জীবনের উপায় বলে বেছে নেন কিনা এর মধ্যে। চলতে চলতে যার ভেতর অসংখ্য অনুপুঙ্খ স্মৃতি উপার্জন করে কবিতা হয়ে ওঠে স্মৃতির দলিল। ইতিহাসচেতনা আমি একেই বলব তাই নয় কি!

      এই কাব্যগ্রন্থের ‘রাক্ষস’ কবিতাটি খুব আলোচিত কবিতা। এর মধ্যে একটা সহজ ইঙ্গিত আর ভাষার আবহে আস্তিত্বিক কথা বলার প্রবণতা লক্ষ করি। কবিতাটি একটু পড়া যাক:

“যেদিন সুরেন ব্যানার্জি রোডে নির্জনতার সঙ্গে দেখা হল।

তাকে বলি : এই তো তোমারই ঠিকানালেখা চিঠি, ডাকে দেব,

তুমি মনপড়া জানো নাকি? এলে কোন্‌ ট্রেনে?

আসলে ও নির্জনতা নয়। ফুটপাথে কেনা শান্ত, নতুন চিরুনি।

দাঁতে এক স্ত্রীলোকের দীর্ঘ, কালো চুল লেগে আছে।”

একেই কি আমি অন্ধকারের কবিতা বলব? চিরুনির দাঁতে লেগে থাকা দীর্ঘ কালো চুল আসলে কিসের প্রতীক হিসেবে ধরব? এখানে কোন উত্তরই পর্যাপ্ত নয়। তাই উত্তরের অপর্যাপ্ত রেশ কাটিয়ে উঠে এই বিভ্রমে মজে থাকার কথাই বারবার মনে হয়। পুনরায় আবার ‘সংসার’ নামক কবিতায় ফিরে আসে ঘুম। এই অবচেতন বারবার মুগ্ধ করে। আর এই মুগ্ধ করার থেকে বেশি বিভ্রম সৃষ্টি করে। এরকম একটি মহৎ বই সম্পর্কে খুব বেশি বলতে ইচ্ছে হয় না। আর এই বইয়ের শেষ কবিতাও সেই পূর্বাপর অনন্তের ইঙ্গিত রাখে।

 

প্রকাশ কাল । ১৯৮২, প্রকাশক । প্রতিবিম্ব

আরও পড়ুন...