Categories
Uncategorized

আবার রাণার কথা । পর্ব ২

ধা রা বা হি ক । পর্ব ২

রা ণা   রা য় চৌ ধু রী

আবার রাণার কথা

rana2

বিরতির পর দেখি পাহাড়ে আগুন

বন্ধু তালিকা আর বাড়বে না।
অনেক বন্ধু দেখলাম, শিখলাম উহাদের কাছে, সমুদ্র দেখাও হল – হল বিড়ি ফোঁকা বন্ধুর দৌলতে, হাঁপাতে হাঁপাতে পাহাড়েও হল ওঠা, বন্ধুর কারণে।

এতো বন্ধুর পথ হাঁটিতে পারি না আর।

তবু বন্ধুর সিগারেটের কাউন্টার পার্ট মনে থেকে যায়। বন্ধুর আবেগ মনে থেকে যায়।
বন্ধুরাই আমাকে আফ্রিকার চাঁদ দেখিয়েছিল। তারাই আমাকে রূপসার অপার সৌন্দর্যের কথা বলেছিল গোপনে, কোনো এক মাটি-মূর্তির নিষ্পাপ সকালে।

*

একটানা পরপর অনেক লেখা বা কবিতা পড়তে পারি না। একটানা তোমাকে যেমন দেখতে পারি না, তাকালেই চোখ ঝলসে যায়। একটানা বারান্দাতেও পৌঁছতে পারি না তোমার কাছে।

একটু বিরতি, একটা ছোট ইন্টারভ্যাল… তারপর আবার ফিরে তোমার তোমাদের চির-রৌদ্রের নিকটে যাই। ভাসি তোমার ঢেউয়ে। একটানা ভালবাসা আমাকে মিস্তিরিঘাট পৌঁছে দিল, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথ চেনালো না।
বিরতির পর দেখি পাহাড়ে আগুন। বিরতির পর দেখি আমাদের অনু ফিরেছে বিধবার বেশে হাসপাতাল থেকে, ঝলসানো ঊষালগ্ন থেকে…

*

আমাদের গ্রামের পাশেই সমুদ্র। দূর ধানখেত থেকে সমুদ্রের কথা ও বার্তা, সমুদ্রের ক্রোধ, তার গান, তার অশ্রুপাতের শব্দ, তার প্রেমের আলতো নিঃশ্বাস ভেসে আসে। এইভাবে সমুদ্রের সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। সমুদ্র তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাদের মাঝে মাঝেই দূর দেশে নিয়ে যায়। আমাকে নিরুদ্দেশে নিয়ে যায়। আমার নিরুদ্দেশে যেতে ভালো লাগে। যেখানে সবাই আমার অচেনা। সবাই অজানা, শুধু সমুদ্র আমার বন্ধু। আমি তাই সমুদ্রের হাত ছাড়ি না। তার হাত ধরে অচেনা দেশের হাটে বাজারে মেলায় ঘুরি। সমুদ্র আমায় মায়া শেখায়। ভালোবাসা।

প্রবল বৃষ্টির দিনে সে বড় একটা পালতোলা গান হয়ে আমাদের গ্রামের সবাইকে খুশি করে। গরীব দুঃখী সুখি হাসিখুশি বিরহী বিষণ্ণ সবাইকে সমুদ্র প্রবল বর্ষায় নেমন্তন্ন করে খাওয়া। ভাসায় হাওয়ায়, হাসায় গানে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে। আমরা সবাই সমুদ্রের হাত ধরে এ জন্ম থেকে ওই জন্মে লাফ মারি আনন্দে। আমরা সবাই সমুদ্রের হাত ধরে যাই বাতাসের নতুন সুরের কাছে, বাতাসের দীর্ঘ শ্বাসের কাছে। আমাদের গ্রামে উৎসব এলে সমুদ্র তার ঢেউদের নিয়ে আসে, তখন তারা আমাদের প্রিয়জন। সমুদ্রের ঢেউদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমরাও ঢেউ হতে শিখি। গর্জন করতে শিখি, আমরা এগোতে শিখি আরো দূর, অনেক দূর।

*

সন্ধে এসেছে তাঁকে খুঁজতে। সে কী নিরুদ্দেশ! সন্ধে তাঁকে খুঁজতে লাগল সারা গ্রাম। পুকুরঘাট। কবরখানার ওইদিকে, বাঁশবনে, পথের ধুলোয়, বৃষ্টির জলে, বসন্তের বাতাসে। কিন্তু সে কোত্থাও নেই। আদিবাসী গ্রামের রোদকে গরম বাতাসকে সন্ধে জিজ্ঞেস করে – সে কোথায় গেল? আদিবাসীদের বৃদ্ধ বন্ধু, আদিবাসীদের সহায়, কাছের জন – সে গেলো কোথায়? অন্ধকার তাকে নিয়ে গেছে, তাকে অন্ধকার লুকিয়ে রেখেছে নিজের ভিতরে।

সন্ধ্যা অন্ধকারের ঘরের ভিতর অন্ধকারের খাটের নিচে আলমারির পিছনে তাঁকে খুঁজতে লাগল। কোথাও সে নেই। সন্ধ্যা তাঁকে খুঁজে না পেয়ে বিষণ্ণ মনে এক পুকুরঘাটে গিয়ে বসল। সন্ধের গায়ে হেমন্তের ঠান্ডা বাতাস। সে অল্প আলুথালু হয়ে যাচ্ছে।

গ্রামের একটি যুবক দুটি যুবক তিনটি যুবতী চারটি যুবতী সন্ধের প্রদীপকে বলল যে, তাদের যিনি সহায় বন্ধু পরামর্শদাতা তাঁকে একদল দুষ্টু অন্ধকার ধরে নিয়ে গেছে। দূরের আরো কোনো গভীর অন্ধকারের ভিতর। সন্ধ্যার প্রদীপ সেই একটি যুবক দুটি যুবক তিনটি যুবতী চারটি যুবতীর বৃদ্ধ বন্ধুকে খুঁজতে বেরুলো দূরের কোনো গভীর অন্ধকারের দিকে। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যার মনে হল এই দূরের অন্ধকার, দূরের গভীর অন্ধকার আসলে দূরে নয়। সে কাছেই আছে। সন্ধ্যা প্রদীপের একদম নিকটেই সেই গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে। আর সেই অন্ধকারের ভিতরের অন্ধকারে – যুবক যুবতীদের সেই বৃদ্ধবন্ধুকে আটকে রেখেছে কোনো এক বৃহৎ দুষ্টু অন্ধকার!

সন্ধে, সন্ধে প্রদীপ খুঁজছে আদিবাসী গ্রামের বন্ধু সেই সাহসী প্রতিবাদী বৃদ্ধকে। যে অন্ধকারের দুষ্টুমির প্রতিবাদ করেছিল। এবং যে ছিল সহজ মানুষের পক্ষে।

সন্ধে তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে রাত্রির দিকে যাচ্ছে। রাত্রির ঝোপে অন্ধ শেয়াল অন্ধ নক্ষত্র ঘুমোচ্ছে। সন্ধে সেই অন্ধ ঘুমকে টপকে টপকে তাঁকে খুঁজছে, খুঁজে চলেছে।

*

একটা পাতা খসে পড়ে। দুটো পাতা খসে পড়ে। তিনটে চারটে গাছের পাতা খসে পড়ে। মেয়েটি গাছের গাছেদের – মেয়েটি পৃথিবীর সব গাছেদের পাতা খসা দেখে, পাতা খসে পড়ার শব্দ সে পায়। যেই পাতা খসে পড়ে গাছ থেকে, অম্নি মেয়েটির ঘুম বা স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা বা আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। চুরমার হয়ে যায় তো যায়! তবু পাতা খসে পড়ে মাটির গায়ে। পাতা উড়তে উড়তে কোথায় গিয়ে পড়বে, কোথায় সে নতুন করে আশ্রয় পাবে, পাতা নিজেও বুঝতে না পেরে – মেয়েটির কাছেই পাতা আশ্রয় চায়। মেয়েটি অসহায় তাকিয়ে থাকে গাছ থেকে ছিটকে পড়া পাতার দিকে। ওদিকে মেয়েটিরও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা আশা ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেতে, মাটিতে, চোখের জলে, সময়ের গায়ে।

একদিন গাছেদের সব খসে পড়া পাতার দল আর মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে উড়তে উড়তে গেল, যেখানে কেউ যায় না। যে জায়গা কেউ কোনোদিন দেখেনি, সেখানে – সেইখানে। বৃক্ষচ্যুত পাতার দল ও আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নচ্যুত মেয়েটিও গেল। সেই অজানা অচেনা জায়গার কিনারে বসে তারা শুরু করল গান। এমন গান – যা আশার, স্বপ্নের, যে গান ঢেউয়ের তরঙ্গের সৃষ্টি করে এবং শুরুর গান তৈরি করে।

পৃথিবীর সব খসে পড়া পাতারা পৃথিবীর সব আশা ও আকাঙ্ক্ষা হারানো মেয়েরা আবার ফিরে পেল নিজেদের। ‘শুরুর’ গান দিয়ে তারা শুরু করল নতুন পথে হাঁটা। আলো আর শুভ অন্ধকারের দল এলো তাদের অভ্যর্থনা জানাতে। একটা দোয়েল একটা পায়রা একটা মেঘও এলো তাদের ভালোবাসা জানাতে…

*

একজনের আসার কথা ছিল, কিন্তু সে এলো না। সে নারী না পুরুষ – না কি সে এক বালক – তা আমি জানি না। কিন্তু সে এলো না। আমি অপেক্ষায় ছিলাম, আমি অপেক্ষা করতে করতে আনমনে জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল জ্যোৎস্না মেখে মাঠ ভেঙে, ধানক্ষেত বেয়ে, সে আসছে। সে গত জন্মের কেউ হয়তো, সে এ জন্মের ঢেউ হয়তো। সে বৃষ্টিধারা হতে পারে। সে নিমগাছের হাওয়া হয়তো। সে আসছে আমার কাছে, কিন্তু এখনো এলো না।

চায়ের জল গরম করে রেখেছি, সবচেয়ে দামী চা তার জন্য রাখা আছে। তার জন্য ঠান্ডা হাওয়া। তার জন্য তরুণ কবির টাটকা কবিতাও রেখেছি, শোনাবো তাকে। আসছে হয়তো সে। বাড়ি থেকে, বাসা থেকে, প্রচুর ভালবাসা আমার জন্য নিয়ে আসছে হয়তো। আসছে, কিন্তু এখনো সে পৌঁছয়নি।
সে নারী? সে কী সমুদ্রের নোনা জল? সে কী আমাদের ঢেউ? সে কেউই না? না না সে কেউ তো বটেই। সে হয়তো দেরাদুন এক্সপ্রেস। সে জোনাকির ডানা হয়তো।

আমি অপেক্ষা করছি। বাইরে ঝি ঝি পোকাদের ভালোবাসার সম্মেলন চলছে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
Uncategorized

test post

শারদ অর্ঘ্য ১৪২৮ ।  কবিতা

শং ক র   চ ক্র ব র্তী

sankar_chakrabarty_hm

বাংলা কবিতার আলো আঁধারি

ঝাড়বাতি

হারিয়ে যাওয়া এই কবির কথা হঠাৎই মনে পড়ল। শীর্ণ, ভাঙাচোরা শরীর। তামাটে রং। অফুরন্ত সিগারেটের তাপে পোড়া ঠোঁট। পরনে ধুতি এবং সাদা পাঞ্জাবি। এ হেন জৌলুসহীন মানুষটি, না; শুধু মানুষ নন, একজন সত্যদ্রষ্টা, আমূল বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করা সার্থক কবি, একদিন পায়ের ছেঁড়া চটি ছুড়ে ফেলার মতো নিঃশব্দে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, নিখিলদা। পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি নিখিলকুমার নন্দী’র কথাই বলছি। সাতান্ন বছর বয়েস একজন কবির পক্ষে এমন অবহেলায় চলে যাওয়ার উপযুক্ত সময় নিশ্চয় ছিল না। অথচ প্রায় এই বয়েসেই জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিময় জীবনও স্তব্ধ হয়েছিল। সুতরাং আরো বহু প্রিয় কবিদের কথা ভেবে ভয় হওয়াটাও নেহাত অমূলক নয়।

সারা জীবনে কিন্তু নিখিলদা’র একটিও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়নি। তাঁর অসংখ্য কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এতদিনে নিশ্চয়ই হারিয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হওয়া এই কবির লেখাগুলো গ্রন্থভুক্ত করার দায়িত্বও কেউ নেননি। অন্তত ‘পূর্বাশা’ পত্রিকার প্রধান কবির ক্ষেত্রে এই আশা অন্যায় কিছু নয়। ‘অনুক্ত’ পত্রিকারও অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। তিনি সেই বিরল শ্রেণির লেখক, যাঁর মেধাবী রচনাধারার সঙ্গেই নিজের জীবন অঙ্গাঙ্গীভূত। ফলে, পড়াশোনাও করতেন বিস্তর। শ্যামাপ্রসাদ কলেজের বাংলা বিভাগীয় প্রধান বা উপাধ্যক্ষ থাকাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না তাঁর কাছে। বরং বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য ধারাবাহিক কাজগুলি স্রেফ অমরত্বের জন্য নয়, নিছক খেলার ছলে করে গেছেন যাবতীয় সাংসারিক দুর্দৈবের মধ্যেও। শেক্সপীয়ারের সনেটগুলির বাংলায় অনুবাদ নিয়ে একটি বই আছে তাঁর। সরোজ চৌধুরীর গ্রন্থাবলীর সম্পাদনা করেছেন যথেষ্ট দায়িত্ব সহকারে। এবং সর্বোপরি তাঁর ‘দেশ-কাল-সাহিত্য’ প্রবন্ধের বইটি বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল সংযোজন।

বাম রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নিখিলদা কখনো নিজের কবিতায় সরাসরি কোনো প্রতিফলন রাখেননি। বরং সমাজ বা পারিপার্শ্বিকতার ওপর তাঁর আস্থাহীনতাই বারবার প্রকাশ পেয়েছে কবিতায়। রাগ-দুঃখ বা নির্বিকার শ্লেষ ও আশ্লেষে, এক বেদনার্ত মোচড়ে নিজের কবিতায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেন যেন। আবার মতাদর্শ বা নিজস্ব চেতনাকে কখনোই গৌণ হতে দেননি লেখায়। যার ফলে সর্বজনীন হতে বাধা ছিল না তাঁর কবিতার। কিন্তু নিজের মতো মুখচোরা ছিল তাঁর কবিতাও। ভিতরের অজস্র কবিতার বুদবুদ কদাচিৎ বেরিয়ে আসতো কলমে। হয়তো অন্তঃস্থলের কোনো ব্যথা নিয়েই বেঁচে ছিলেন এতদিন। যে ব্যথা ছন্দ বা বিন্যাসে কখনো বা স্পন্দিত করতো কবিতাকেও।

‘চেয়ে দেখছি চারদিকে খুব, খুবই খোলামেলা/ আকাশে ছুটেছে নাকি বাতাস বোলবোলা গমগমে/ রক্তের ফিনিক-লেপা সোনারূপা ডলারের খেলা অনুপম/ বহুবিধ বিদেশী মুদ্রায় অ্যালবামে/ ছবি ফোটে তামাটে তল্লাট/ ঢের হলো রাজাসাজা গণ-সমাজের সমাধি/ এবার ছুটন্ত ঘোড়া শোরগোল-দহরমে পরিশ্রান্ত ভোগে/ গোঙায় হেঁচকি তুলে, খাবি খায়, বুঝি নাভিশ্বাস! যা হয় তা হোক শুধু এই কালবেলার প্রহর/ আবেশে মধুর বড়ো, মুক্ত মনে, যুক্তির বিচ্ছেদে…’। এমন প্রখর দৃষ্টি ছিল বলেই তাঁর স্বল্প সৃষ্টিতে কোনো খাদ ছিল না।

কিন্তু দৃষ্টি ছিল না নিজের শরীরের প্রতি। খাওয়া ও বিশ্রামের প্রতিও তাঁর মনস্কতার খুবই অভাব ছিল। পরিশ্রম যেন ছিল তাঁর জন্মলব্ধ অধিকার। আবার সংসারের প্রতিও ছিল এক ধরনের উদাসীনতা। অথচ নিশ্চিতভাবে বেঁচে থাকার আনন্দ উপলব্ধি করতেন। তা না হলে, অমন সৃষ্টির বহমান সিদ্ধিতে নিজের বিষয় ও বিষয়ী এক অদ্ভুত অ্যাবস্ট্রাকশানে অটুট থাকবেই বা কেন! প্রস্ফুটিত ফুলটি নিশ্চয়ই সুদীর্ঘকাল আরো স্থির সম্পূর্ণতম হবার অপেক্ষাতেই ছিল। তবে কেন এসব পাপড়ি ক্ষণিকত্বের দিকে ভেসে যায়? সঠিক কোনো উত্তরই আমার জানা নেই। জানা নেই, তাঁর বুকের ভেতরের সেই সময়ের অস্থিরতার কারণও। এই যন্ত্রণা-কাতর কবিকে কেন যে আমাদের সমাজ ও আশ্চর্য রূপের সংসার কোনোভাবে সুস্থির থাকতে দেয়নি তাও জানা নেই! অথচ তাঁকে ভুলে যাওয়া নিশ্চিত আমাদেরই অপরাধ। এভাবে আমরা কতো কবিকেই যে হেলায় স্মৃতির ওপারে রেখে আসছি জানি না।

আরও পড়ুন...

Categories
Uncategorized

কবিতা স্টুডিও উজান সম্মান

প্র তি যো গি তা

আরও পড়ুন...

Categories
Uncategorized

Editorial-June

সম্পাদকীয়

রবিবার, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th June 2021

‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ এক বছর অতিক্রান্ত করে ফেলল। এই এক বছরে আমরা কোনো মাসেই অনলাইনে পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ রাখিনি। কিন্তু গত মে মাসে ভয়াবহ মৃত্যুমিছিল দেখতে দেখতে শিউরে উঠেছিলাম আমরা। পত্রিকা, কবিতা এসব কোথায় যেন ভেসে গিয়েছিল পরিচিতদের একের পর এক মৃত্যু সংবাদে। যাঁদের আমরা এই কঠিন সময়ে হারিয়েছি, জুন সংখ্যাটি তাঁদের উৎসর্গ করলাম।

আস্তে আস্তে ফের স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি। বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পাচ্ছে মানুষ। এই জোর নিয়ে আমরাও অনেক নতুন বিভাগ, আরো নানা রকম চিন্তাভাবনার জায়গা নিয়ে প্রকাশ করলাম জুন সংখ্যা। ১৩১৪ সালে প্রকাশিত ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, ‘যেখানে struggle, যেখানে rebellion, সেখানেই জীবনের চিহ্ন, সেখানেই চৈতন্যের বিকাশ…’। আমরা এই মানসিক জোর নিয়েই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আবার সামনের দিকে তাকিয়ে এগোতে চাই।

এই সংখ্যা থেকে আপনারা সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে আপনাদের মতামত জানাতে পারবেন। ওয়েবসাইটে সেই লিঙ্ক দেওয়া রয়েছে। সুস্থ সমালোচনা, পরামর্শ আমাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় বছর থেকে আমাদের নতুন আঙ্গিকের এই প্রকাশ কেমন লাগছে, অবশ্যই জানান। সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ আপনাদের মনোজগতে অবিরাম ভালো লাগা ছড়িয়ে দিক, এই অপেক্ষাতেই রইলাম।

Categories
Uncategorized

Editorial-April

সম্পাদকীয়

রবিবার, ২৮শে চৈত্র ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th April 2021

এপ্রিল সংখ্যা প্রকাশিত হলো আর এরই সঙ্গে ‘হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা’ পূর্ণ করল এক বছরের পরিক্রমা। ফিরে তাকালে মনে পড়ে অতিমারীর সেই চরম দুর্যোগের সময়ে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশের কথা। মানসিক স্থিতি বজায় রাখার অন্যতম উপায় সাহিত্য সঙ্গলাভ। সেই উদ্দেশ্যেই যাত্রা শুরু করেছিল এই ওয়েব ম্যাগাজিন। তারপর নিয়মিত এগিয়ে যেতে চেষ্টা করেছি আমরা। প্রতিষ্ঠিত কবি-লেখকদের পাশাপাশি অনেক নতুন নাম ও লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই পত্রিকা। বহু মানুষের ভালোবাসা ও আশীর্বাদে আজ এক বছরের দোরগোড়ায় এসে বারেবারেই মনে হচ্ছে যে আমরা পেরেছি আবার এখনও অনেক কিছু পারা বাকি আছে। আসলে সাধ আর সাধ্যর ভেতর যে যোজন ফারাক তা এতদিনে বেশ মালুম পেয়েছি আমারা। তবু আমরা সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছি পাঠককে কিছু নতুনত্বের স্বাদ দিতে। আগামীদিনেও আমাদের সেই চেষ্টা জারি থাকবে। কুৎসা, হেয় করার মনোবৃত্তি এই সব কিছু পেরিয়েও আমরা অটল হয়ে রয়েছি ভালো কাজের দিকে তাকিয়ে। পরবর্তী বছরেও সেই মান ও বিষয়ের বৈচিত্র্য নিয়ে এগোব আমরা। বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আসছি আগামী সংখ্যা থেকে। আপনাদের প্রত্যেককে এভাবেই পাশে পাবো জানি। সেটাই আমাদের প্রতি মাসে কাজের অনুপ্রেরণা, আরো ভালো কিছু করার খিদে। আরো কী কী উপায়ে আমরা উন্নতি করতে পারি, সে বিষয়ে আপনাদের মতামত অবশ্যই চাই। সঙ্গে থাকুন। পাশে থাকুন। নির্বাচনের চাপান উতোর পেরিয়ে নতুন ভাবে দেখা হচ্ছে আপনাদের সাথে আগামী সংখ্যায়।

…‘স্বপ্ন দেখি সে-পথের,
অস্তাচল উত্তীর্ণ হয়ে আগামী কালের পানে-
স্বপ্ন যেখানে নির্ভীক,’…

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই ক’টি পংক্তিই আমাদের পাথেয়, আমাদের এগিয়ে চলার রসদ।

Categories
2020_pujo goddyo Uncategorized

সুদীপ্তা রায়চৌধুরী মুখার্জী

আ মা র  পু জো

বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো। তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা? পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে... কলম ধরলেন

সু দী প্তা   রা য় চৌ ধু রী   মু খা র্জী

দুর্গা পূজা: কার্নিভাল

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের ম‍ধ্যে দুর্গাপূজা শ্রেষ্ঠ পার্বণ। ঐতিহ্যে-অলঙ্কারে-সমারোহ-প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্যে যে অনুষ্ঠান আজ কার্নিভালের রূপ নিয়েছে। দর্শন-পৌরাণিক কাহিনি-আনুষ্ঠানিকতা এই তিনের মেলবন্ধনই ধর্ম । বাঙালি সেই সঙ্গে আন্তরিকতার মিশেলে ধর্মকে উৎসব থেকে ঐতিহ্যের কার্নিভালে পরিণত করেছে। যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের থেকেও সামাজিক, পারিবারিক, স্নেহবিধুর মরমী আবহের সার্বিক চিত্র পরিলক্ষিত হয় । উমা এখানে পূজিত হন কন‍্যা ভাবে। তাই তো বাংলার ঘরে ঘরে গান বাজে ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী উমা নাকি বড় কেঁদেছে’ – বাঙালি মায়ের চিরন্তন আকুতি ।

জগজ্জননীকে এইভাবে ঘরের কন্যা করে গড়ে তোলার রীতি ভারতের আর কোনো প্রদেশে বড় একটা দেখা যায় না । অধ‍্যাত্মবাদের সঙ্গে নিত্যযাপনের মিশেলের অন্য নাম বাঙালিয়ানা। 

আগমনী গানে বাংলার প্রকৃতি প্রতিফলিত হয় । কাশফুলের মায়া , শিউলির গন্ধ , প্রভাতী শিশির , নীলকন্ঠ পাখির ডাকে মুখরিত বাংলার গ্রামের শরৎ সজ্জা । সুজলাং-সুফলাং-শস‍্যশ‍্যামলাং ধরণী যেন তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ উজাড় করে অপেক্ষা করে দেবী আবাহনের । পূজার উপচারেও বাংলার প্রকৃতির উজ্বল উপস্থিতি । নবপত্রিকা অর্থাৎ বাংলার ফসল – ধান, যব, কচু , মানকচু, বেল, অশোক , হলুদ , কলা, ডালিম । যা কলা বউ নামে পরিচিত । এই কলা বউকে আবার গণেশের বউ ভাবা হয় । এও বাংলার সংস্কৃতি । একাত্ম হবার সংস্কৃতি ।

দেবী মন্ত্রে আছে ‘স বাহনায় স পরিবারায়’-এর উল্লেখ , যা কি না রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত ‘বাংলার ঘরে যত ভাইবোন’-এর মূর্ত প্রতীক । কার্তিক হচ্ছেন দেবীর কনিষ্ঠ সন্তান , যিনি বৈদিক দেবতা নন , পৌরাণিক মতে ইনি দেব সেনাপতি । ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইনি পূজিত হন মুরুগান-স্কন্দ-সেন্থিল নামে । কিন্তু বাংলায় ইনি পুরুষের সৌন্দর্য পুত্র সন্তানের দ‍্যোতক । কার্তিক মাসে ইনি পূজিত হন আর কথিত আছে ছড়ার আকারে ‘কার্তিক ঠাকুর হ‍্যাংলা একবার আসে মায়ের সাথে একবার আসে একলা’। এরপর আসি গণেশের কথায়। ইনি সমৃদ্ধির প্রতিভূ । সর্বপ্রকার সাফল্য এঁর নখদর্পণে । ইনি গজানন, গণপতি প্রভৃতি নামে পরিচিত । বাংলায় তিনি Chubby শিশুর প্রতীক । ‘গনেশ দাদা পেটটি নাদা , লুচি খায় গাদাগাদা’ এই ছড়াতেই তিনি আবদ্ধ । আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও বাংলায় এঁর আলাদা পূজার প্রচলন ছিল না । ইনিও পৌরাণিক দেবতা । এঁর মূর্তি শুধু পূজা নয় , সৌন্দর্য্যায়নেও ব‍্যবহৃত হয় । দেবীর অপর পাশে থাকেন লক্ষ্মী । যিনি অর্থ-সৌভাগ্য-সমৃদ্ধি-সৌন্দর্য‍ের প্রতীক । তিনি ধনলক্ষ্মী, তিনিই ধান‍্যলক্ষ্মী । কোজাগরী পূর্ণিমায় ইনি শুধু বাংলার ঘরে ঘরে পূজিতা হন । অথচ সারা ভারতে এঁর অসংখ্য মন্দির আছে । ধৃতি , কমলা , আরনা , নন্ধিকা নামে ইনি সমাদৃতা । দেবী সরস্বতী বিদ‍্যা-চারুকলা-সঙ্গীত-শিল্পকলার উপমা । তিনি বীণাবাদিনী । তিনি বসন্ত পঞ্চমীতে পূজিতা হন । ইনি বৈদিক দেবী । সরস্বতী নদীর ইনিই উৎস । বাংলায় ইনি সর্বগুণাসম্পন্নার উদাহরণ । বাংলার প্রতিটি বধূই রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী । আর দেবী সাক্ষাৎ জগজ্জননী মা । তিনি কখনো গিরিরাজের কন‍্যা , আবার কখনও শিবের ঘরণী । মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে তিনি আদ‍্যাশক্তি মহামায়া শ্রীশ্রীচণ্ডী । তিনি বাংলার নারীদের চেনা রূপ । দশপ্রহরণধারিণী দশ হাতে সংসারকেও ধারণ করেন । বাংলার পূজা ঘিরে পারিবারিক মিলনের যে চিত্র ফুটে উঠে তা বাঙালির একান্ত যাপনের এক পূর্ণ চিত্র ।

বাংলার খাদ‍্যাভাসের আভাসও পাওয়া যায় দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভোগে । শোভাবাজার রাজবাড়ি-সহ অনেক সাবেকি পূজায় আলুর ব‍্যবহার হয় না । কারণ তা বাংলায় উদ্ভূত নয় । কোথাও নিরামিষ , কোথাও চারদিনই আমিষ খাদ্য থাকে । লুচি , পরমান্ন , মোহনভোগ , নাড়ু থেকে শুরু করে ছোলার ডাল , বেগুন ভাজা , ইলিশ মাছ-সহ বিভিন্ন মাছের পদেই সেজে ওঠে ভোগ সামগ্রী । যেখানে বলির প্রচলন আছে সেখানে পাঁঠার মাংসও ভোগের উপচারে থাকে । কারণ বাঙালি মাত্রই ভোজনরসিক ।

মধুর সামাজিক বন্ধন, সাবেকি আবেশ , বারোয়ারি পূজার মণ্ডপ স্থাপত্যের মুন্সিয়ানা , থিমের দাপট , অষ্টমীর অঞ্জলি , আরতির নাচ, বোধন থেকে বিসর্জন প্রভৃতির অসাধারণত্ব এই পূজাকে বিশ্বজনীন করেছে । যার আবেদন ভারতে ‘বিবিধের মাঝে’ মহা মিলনের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।

আরও পড়ুন...

Categories
2020_pujo bangladesher_kobita Uncategorized

মাসুদার রহমান

বাং লা দে শে র  ক বি তা

মা সু দা র   র হ মা ন

মেঘ ও মেশিন সিরিজ

গ্রামের উপরে মেঘ ঝুঁকে এসে কাপড় খুলছে

রেলিং থেকে যেভাবে শিশুটি হিসু করে দিয়েছিল নিচে

উঠিয়ে নিচ্ছ দ্রুত বাইরে থেকে মেলে দেওয়া জামাকাপড়গুলো

শুকোতে দেওয়া কাঠ

 

টবের কামিনী শিশুকে উঠোনে নামিয়ে দিলাম মায়ের বুকের কাছে 

নিবিড় 

সে এখন মাতৃদুগ্ধ পান করছে 

 

 

ক্যালেন্ডার ভিজে যাচ্ছে। জলমগ্ন রবিবারের মাথায় 

ছিঁচকাঁদুনে মেঘ

টিস্যুবাক্স থেকে সামান্য একটি টিস্যু কেউ ওদের হাতে দেবে

এমন স্বজনও নেই!

 

বেগুনগাছের ডালে ছোট্ট বাসায় বসে টুনটুনি- টোনা তার 

জলহাওয়া মাথায় করে দুপুরে গঞ্জে গেছে; এখনো ফেরেনি

 

হু হু করে বাড়ছে নদীর কালো জল

 

 

সড়ক পেরুচ্ছে বৃষ্টি- ততক্ষণ গৃহস্থের বারান্দায় উঠে বসে পড়া

 

দু’একটি শালিক ভিজতে নামছে তার গার্লফ্রেণ্ড নিয়ে, বয়ফ্রেণ্ড নিয়ে

তাদের দিকেই তাক করা স্মার্টফোন- ঝলসে উঠছে ক্যামেরা

 

টাইমলাইনে প্রকাশিত হবে বৃষ্টির প্ররোচনা- বিস্তারিত স্ক্যাণ্ডেল

 

 

ঝিলপাড়ে দাঁড়িয়ে সে শাড়ি খুলছে- ভাসুর শ্বশুর সম্বন্ধীয় 

দু’একজন 

লজ্জায় ভিজতে ভিজতে সটকে পালালো

 

একটি জানালা, কিন্তু এ চরাচর জুড়ে বিপুল 

বর্ষা

কখনো সখনো বাসি কাপড়গুলো বারান্দায় টাঙাতে আসো 

 

বৃষ্টি-বৌদি তোমাকে বাসনা করি 

ছাতা হাতে মাইল মাইল হেঁটে যাই তোমার ভেতরে

আরও পড়ুন...

Categories
Uncategorized

প্রকাশিতব্য নতুন বই

নতুন বইয়ের আগাম খবর

কাঁচা মাংসের বাড়ি / সেলিম মণ্ডল

অনিন্দ্য রায়
কোনও কোনও বই পড়বার পর মনে হয় হয়তো না-পড়লেই ভালো হয়। সেলিম মণ্ডলের ‘কাঁচা মাংসের বাড়ি’ বইটির পাণ্ডুলিপি পড়বার সুযোগ হল আমার। আর প্রাথমিক পাঠের শেষে মনে হল, কোনও কোনও বই হয়তো না-পড়লেই ভালো হয়, যেমন, এই বইটি। ৬৪ পৃষ্ঠার একটি বই, বাংলা কবিতার একটি বই যে এমন অব্যর্থ আয়ুধ হয়ে উঠতে পারে, পাঠকের ভাবনার স্থিতাবস্থাকে এমন টলিয়ে দিতে পারে, ভেতর থেকে ফালাফালা করে দিতে নিরাপদ খেলার প্রতিভা তার প্রমাণ হয়ে রইবে এই বই, বইয়ের কবিতাগুলি। এবং আমাদের তাড়িত করবে, এবং আমাদের নিরন্তর ভালো-থাকার অভিলাষকে বিঘ্নিত করবে। প্রবেশক কবিতায় সেলিম আমাদের সঙ্গে বাড়িটির পরিচয় করিয়ে দেন। ‘দু-কামরার বাড়ি এক কামরায় মা-বাবা, আরেক কামরায় থাকে মুনাই আমি থাকি বারান্দায় আমি অভিজ্ঞ কসাই একবার এ-ঘর থেকে কাঁচা মাংস কেটে আনি, আরেকবার ও-ঘর থেকে মাংস ফুরোয় না, কাঁচা মাংসের বাড়িতে হয়ে উঠি সফল ব্যবসাদার’ কার শরীর থেকে কাঁচা মাংস কেটে আনার কথা বলেন কবি? মা-বাবার? মুনাইয়ের? না কি তাদের ঘরে পুষে-রাখা কোনও পার্থিব জন্তুর? না কি তাদের ভেতরে পুষে রাখা সম্পর্কের টুকরো, কাঁচা, কেটে এনে তিনি, কবি ও কসাই, কবিতা লেখেন? আমরা তা পড়ে চমকে উঠি, তবে কি প্রিয়জনের শরীর কেটে, অনুভূতি কেটে, বিক্রি করে কবিরা সফল ব্যবসাদার? কিন্তু এই পারিবারিক ঘেরাটোপে বদ্ধ থাকে না কবিতা, উড়ান দেয় মহাকাশে। ‘মা আমাকে রোজ চাঁদ রান্না করে খাওয়ায় আমি ঘনঘন জ্যোৎস্নাঢেকুর তুলি একদিন মা চাঁদের পরিবর্তে সূর্য রেঁধে খাওয়াল নিভে গেল সমস্ত আলো তবুও আকাশ বাটিতে চিবোতে লাগলাম সূর্য দাঁতের বিরাট ফাঁকে দাউদাউ করে উঠছে গ্রহণ মা ফুঁ দিচ্ছে, মা তরকারি জোগাড় করছে দূর থেকে ঘোষণা হচ্ছে— সৌরকেলেঙ্কারি সৌরকেলেঙ্কারি’ (সৌরকেলেঙ্কারি) এ কোন খাদ্যের মহাজগতে আমাদের নিয়ে আসেন সেলিম! শব্দের আড়ালে ঝলসে ওঠে মিথ আর মিথের আড়াল থেকে অবনির্মিত কবিতার মুখোমুখি হই আমরা। ক্ষুধা— সকল প্রাণের এই প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়তে থাকে পাঠের ভেতর। ‘দ্যাখো— গলাকাটা সাদা হাঁসের বিষণ্ণ লাল ভোরের পায়চারি সেরে কীভাবে কোনো আমিষ সকালের পিঠে লাফাচ্ছে ভাত ভাত ভাত আধখানা থালায়— রাহু খাওয়া চাঁদের মতো কোথাও অমোঘ ডুব নেই শুধু, ছেঁড়া পালকের প্যাঁক্‌ প্যাঁক্‌ প্যাঁক্‌ ক্ষুধাভিক্ষুককে ঈশ্বর বানিয়ে দেয়!’ (ক্ষুধাভিক্ষুক) খাদ্যের সামনে খাদককে একইসঙ্গে ভিক্ষুক ও ঈশ্বর বানিয়ে তোলেন কবি। বইটি থেকে উদ্ধৃতি শেষ হতে চায় না, প্রতিটি কবিতাই উজ্জ্বল, স্বতন্ত্র ও সম্পূর্ণ। প্রতিটি কবিতাই একই সঙ্গে অন্তর্মুখী ও কেন্দ্রাতিগ, যা কবিতাভাবনার ঘুর্ণনপথকে ব্যালেন্স করে আর একটি লুপের মধ্যে নিয়ে আসে আমাদের; একেকটি কবিতা মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে, ঘুরতে থাকে... এতটাই আক্রান্ত হই আমরা এই হ্রস্ব অথচ ধারালো কবিতাগুলির সংস্পর্শে। ভালো-থাকার প্রচেষ্টা ও অভিনয় আমাদের টলে যায়। পারিবারিক যাপনের ক্ষত ও মায়া ফুটে ওঠে। ‘আমাদের পরিবারের একটিই আয়না এই আয়নাতে আমরা সকলেই মুখ দেখি কী আশ্চর্য, একটিই, একটিই মুখ সেখানে ধরা পড়ে’ (আয়না) অপরার ভেতর এভাবেই আলো বিচ্ছুরিত হয়। ‘আমি’ ও দেখা-না-দেখার চরাচর আলোকিত হয়ে ওঠে। যে খিদে ও খাবারের পথ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ‘পেরেক’ দিয়ে ‘সূর্যাস্ত সেলাই’ করা ‘জলন্যাকড়া’য় মুছিয়ে দেয় ‘চোখ’, ‘শিয়ালদা’ থেকে ‘উচ্ছেক্ষেতের কবিতা’ ‘নিজস্ব শ্মশান’ পার হয়ে ঘুরতে যায় ‘তিনের দেশে’— এই ‘নিরুদ্দেশ’, এই ‘প্রিয় অসুখ’ ছিঁড়ে ফেলে সব ‘অবরোধের পতাকা’। অতিরিক্ত শব্দ নেই, খুব আস্তে উচ্চারিত কবির একান্ত মোনোলগ স্পর্শ করে আমাদের। ভাবায়। আবার পড়িয়ে নেয় কবিতাগুলিকে। বারবার। আমরা ভালো থাকি না। যে ভালো-না-থাকায় বাঁচতে চান পাঠক, কবিতার পাঠক। পাঠককের মনোরঞ্জনের জন্য লেখেন না সেলিম। লেখেন নিজেকে, সেই নিজের সেলিম এতদিন অচেনা ছিল আমার। কিছুটা কি পারলাম চিনতে এই বই পড়ে? দেখতে পেলাম বাংলা কবিতার ভবিষ্যতের রাস্তা? কোনও কোনও বই পড়বার পর মনে হয় হয়তো না-পড়লেই ভালো হয়। সেলিম, লিখুন আরও, ভানসর্বস্ব ভালো-থাকা ধ্বংস হোক। আয়নার মুখোমুখি আমরা চিনে নিই আমাদের কসাই সত্তাটিকে।

ইতিকথা পাবলিকেশন

শ্রীচৈতন্যর শিক্ষাষ্টক ও অন্যান্য কবিতা / শুভম চক্রবর্তী

বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় পরিসরে শ্রীচৈতন্যর ভূমিকা সর্বজনমান্য। তুর্কী আক্রমণ পরবর্তী বঙ্গদেশে আচার, আচরণসহ সমস্ত দিকেই যে বিজাতীয় বৈপরীত্য জোর ক'রে চাপিয়ে দেওয়ার উদগ্র প্রয়াস, শ্রীচৈতন্য তাঁর বিপ্রতীপে মূর্তিমান বিপ্লব। আধ্যাত্মিক প্রেক্ষিতে দেখলে, বৈষ্ণব রসতাত্ত্বিক শ্রীপাদ স্বরূপ দামোদর যা উল্লেখ করেছেন তা হ'ল -- ' রাধার প্রণয়-মহিমা, শ্রীকৃষ্ণ প্রেমের মাধুর্য এবং সে মাধুর্য আস্বাদনে রাধার পরিতৃপ্তি কিরূপ ' এই ত্রিবিধ রস আস্বাদনে শ্রীভগবানের, শ্রীচৈতন্য রূপ পরিগ্রহ। আর সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যর পরোক্ষ ভূমিকা স্বীকৃত কিন্তু তাঁর রচিত শিক্ষাষ্টকসহ অন্যান্য কিছু স্তোত্রের কাব্যমূল্য নিতান্ত সামান্য নয়। শিক্ষাষ্টকের মূল উপজীব্য যদিও গৌড়ীয় বৈষ্ণবের জীবনসাধনার মূল প্রতানকে চিহ্নিত ক'রে তবু সেই যাত্রাপথে শ্রীচৈতন্যর যে কবিত্বের দ্যুতি তা অসামান্য। জগন্নাথ-অষ্টকের উপজীব্য জগদীশের সঙ্গে একাত্ম হবার আকুতি -- ' জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে। ' এছাড়াও বেশ কিছু কবিতার ভাবানুবাদ সন্নিবেশিত হয়েছে এই প্রয়াসে৷

ইতিকথা পাবলিকেশন

আরও পড়ুন...

Categories
Uncategorized

নাহিদা আশরাফী

ক বি তা

না হি দা   আ শ রা ফী

বাজেট 

রাষ্ট্রের মত ঘোলা একটি আকাশ

দেখতে দেখতে 

মেঘের গজফিতায় 

মাপি হাহাকারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ । 

 

মাপতে মাপতে ভাবি 

বাজেটের গর্জন শুনে

বিদ্যুৎ তার চমক ভুলে যায়।

 

ওহে নিরাকার 

তোমার মুঠোয় কি কোন ম্যাজিক নাই?

 

সংসারের দরজা ঠেলে 

ভেতরবাড়ি পৌঁছানোর আগেই

আমরাও যেন ভুলে যেতে পারি

ক্ষুধার গায়েবী হুংকার। 

 

মর্গের কবিতা

একটা উচ্চমার্গের কবিতা লিখবার বাসনা 

আমার ম্যালা দিনের

তো সেই উচ্চরে ধরতে গিয়া 

নিচে তাকাইবার আর অবসর জোটে নাই

তোষামোদির তেলেসমাতিতে হোক

দেনাপাওনার দিগদারিতে হোক

য্যামনেই হউক…

যে কোন প্রকারে উচ্চরে আমার চাইই চাই

 

মাটিতে পাও নাই 

চোখে স্বপ্ন নাই 

বোধের ব্যঞ্জনা নাই 

শব্দের গৃহস্থালি নাই…

নাই…নাই…নাই

না থাকুক, তাতে কী?

 

কিন্তু এতসব কূটকৌশলী চিন্তায়

কখন য্যান বেলা পইড়া আন্ধার ঘনায়

আর সেই ফাঁকে মার্গের আ-কারটা 

লয়া গেলো শয়তান কাউয়ায় !  

 

উচ্চ নাই, মার্গের আ-কার নাই

অখনে আমি আর কবিতা 

দুইজনে পইড়া আছি আন্ধার মর্গে 

জানেন নি কেউ 

মর্গ থিকা রাস্তা ঠিক কোনদিকে যায় 

ভোগে নাকি অর্ঘ্যে ? 

 

আরও পড়ুন...