Categories
2022-nov uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ৫

উ প ন্যা স । পর্ব ৫

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

হাত ঝাঁকিয়ে স্লোগানচুড়ি বাজিয়ে বললি, তোমাকে লোকেট করা ছিল বেশ সিম্পল। প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে বলেছিলুম, আঙ্কলবাপির অ্যাকাউন্টের ফিনানশিয়াল ট্রেইল ফলো করতে, কোথা থেকে টাকা আসত ওনার অ্যাকাউন্টে আর যেত আমার স্কুলে, এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায়, যাদের আজও সাহায্য করে চলেছ। আর যিনি ফানডিং করতেন তাঁর নাম কি, এখন কোথায় থাকেন।  বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, বড্ড বদভ্যাস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অহরহ বন্ধ করা আর খোলা।  প্রতিটি অ্যাকাউন্ট নম্বর জানি।

               গত রবিবার তোমার লোকেশান জানতে পেরেছি, সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট নিয়ে চলে এসেছি।

               তারপর তুই যা বললি, তা আরও আক্রমণাত্মক, বললি, তোমার বেডরুমটা কোথায়, জিনিসগুলো রাখি।

              বললুম, ওদিকে নয়, ওই রুমটা জিম, এক্সারসাইজ করি।

              ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, জিম, রিয়ালি ? তাই এমন পেটা মাসকুলার বডি রেখেছ, ব্রোঞ্জপুরুষ, হি-ম্যান। ভালো, ট্রেডমিলও রেখেছ দেখছি, কাজে দেবে। ঘুষের টাকায় নয়তো ?

              জিমঘরটা আমার আগে যিনি এই বাংলোয় ছিলেন, তাঁর।

              জানি, তুমি ঘুষ নাও না, তবু জিগ্যেস করতে ভালো লাগল। তুমি তো জ্ঞানবৃক্ষ, বোধিবৃক্ষ, তাই না ? ফাঁসিবৃক্ষ বলা যাবে কি ? ঘুষ নিতে ভয় পাও ? না এথিকসে বাধে ? ঘুষ ছাড়া দিল্লি শহরে সৎ থাকা শুনেছি অলমোস্ট ইমপসিবল, টিকে আছ কেমন করে ? মন্ত্রীদের প্লিজ করতে হলে তো ঘুষ ছাড়া উপায় নেই ! ঘুষ নেয়া হল এ ফর্ম অফ আর্ট, দুর্বলহৃদয় মানুষ রপ্ত করতে পারে না, বিশেষ করে ডুগুডাররা। দিল্লিতে কতদিন আছো ? ট্রান্সফার অর্ডার এলো বলে, ঘুষ না খেলে আর তা শেয়ার না করলে ট্রান্সফার অনিবার্য, তাও তুমি আবার এজিএমইউ ক্যাডারের, পাঠাবে সিলভাসা, পোর্ট ব্লেয়ার বা পুডুচেরি ; অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমেও পাঠিয়ে দিতে পারে।

##

              শিশিরে কেউটের গন্ধ।  উতরোল কোলাহল।

              স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি। চাউনির অতিশয়োক্তি।

              এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

##

               আমি সুটকেসটা তুলে নিচ্ছিলাম, তুই নিজেই তুলে নিয়ে বললি, যথেষ্ট শক্তি আছে গায়ে, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট, আই নিউ, সামওয়ান ওনস মি, অ্যান্ড ওয়াজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।

              এক পলকে দেখলাম, তোর সোনালি আর রুপালি স্লোগান-চুড়িগুলোতে গোলাপি রঙে লেখা লাভ ইউ, কিস ইউ, ইউ আর মাইন, ইংরেজিতে। দু-হাতে কনুই পর্যন্ত মেহেন্দির নকশা। আমেরিকায় মেহেন্দির ব্যবসা পৌঁছে গেছে, আশ্চর্য লাগল দেখে।

              বললাম, কি মাথামুণ্ডু বকছিস ! আমার গলায় শ্লেষ্মার বদলে অবাক হওয়ার শেষে অতিপরিচিতির স্ফূর্তি।

              এই তো, এই তো, তুমি থেকে তুইতে এলে তো ? তুই বললি।

              আমার কাছে এসে, নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে দাঁড়িয়ে বললি, প্রায় ফিসফিস করে বললি, ফ্রম টুডে অনওয়ার্ডস, আই ওন ইউ ইন দ্য সেম ওয়ে অ্যাজ ইউ ওনড মি ওয়ান্স আপঅন এ টাইম। হ্যাঁ, তুমি আমার অস্তিত্বের মালিক ছিলে এতকাল, এখন আমি তোমার অস্তিত্বের মালিক, বা মালকিনি, হোয়াটএভার। অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল এবার আমার মুঠোয়।

##

              এগোলুম বেডরুমের দিকে, তোর হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিয়ে, পেছন-পেছন তুই। আবৃত্তি করতে লাগলি, খোশমেজাজি কন্ঠস্বরে, কোনো পরিচিত গায়িকার মতন গলা, কার গলা যেন, কার গলা যেন :

               You do not do, you do not do

               Any more, black shoe

               In which I lived like a foot

               For thirty years, poor and white,

               Barely daring to breathe or Achoo

               #

                Daddy, I have had to kill you

                You died before I had time

                Marble-heavy, a bag full of God

                Ghastly statue with one gray toe

                Big as Frisco seal

                 #

                And a head in the freakish Atlantic

                Where it pours bean green over blue

                In the water of beautiful Nauset.

                I used to pray to recover you

                Ach, du

                #

                পেছন ফিরে জিগ্যেস করলাম, কার কবিতা ।

                তোর মুখেচোখে কেমন যেন পরিতৃপ্ত ব্যঙ্গের ছায়া।

                তুই বললি, জাস্ট দ্যাট ? কবিতাটা সম্পূর্ণ মুখস্হ ; আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিতা। যিনি লিখেছেন তিনি বলেননি কি যে কবিতাটা একজন মেয়ের এলেকট্রা কমপ্লেক্স ? আর হলোকস্টের মেটাফরগুলো ? ভয় পাচ্ছ কেন?  শোনো না পুরোটা। তোমাকে তো আউশউইৎসে পাঠাচ্ছি না। আর হ্যাঁ, বইগুলো তুমিই বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, ঠিকানায় আমার জন্য পাঠিয়েছিলে। মনে করো, মনে করো, মনে করো।

                ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছি, কবিতাটা কার লেখা মনে করতে পারলাম না ; সিলেবাসে ছিল না, বোধহয়। এমিলি ডিকিনসন কি ? নাহ, অন্য কারোর। ক্রিস্টিনা রসেটি, এলিজাবেথ বিশপ, এডিথ সিটওয়েল? মনে আসছে না। এই কবির বই তো পাঠাইনি বলেই মনে হয়, কে জানে হয়তো ভুলে গিয়ে থাকব, আমি নিজে তো পাঠাইনি, জুনিয়ার অফিসারদের দিয়ে কিনিয়ে পাঠিয়ে দিতাম।

               অফিসের ফাইলের জগতে ঢুকে গিয়ে সাহিত্য উধাও হয়ে গেছে মগজ থেকে ; সরকারি ফাইলের আঁকশি হয়, অক্টোপাসের মতন।

##

                বাবলগাম ফুলিয়ে ফাটালি, বললি, নিও-ফ্রয়েড মনস্তত্ব, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, মনে পড়ছে? তুমি তো ইংরেজিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস এম এ ! কবির নাম মনে পড়ছে না ? তোমার স্নাতকস্তরে সাইকোলজি ছিল, তাও জানি।  না, আমি পেনিস এনভির প্রসঙ্গ তুলছি না, ন্যাটালি অ্যানজিয়ার তো বলেই দিয়েছেন, পেনিস এনভি আবার কি, শটগান নিয়ে কী হবে, যখন মেয়েদের রয়েছে অটোম্যাটিক অস্ত্র।

                কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, বোধহয় আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করে, জবাব না পেয়ে, বললি, লিবিডোও নয়, জাস্ট ফ্যাসিস্ট ড্যাডি আর মহাকাব্যের এলেকট্রার সম্পর্কের প্রসঙ্গ, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট।

               পেনিস শব্দটা এমনভাবে বললি, যেন প্রায়ই বলিস ; হতে পারে, আমেরিকানদের তো কথার আড় নেই। আর ইনসেস্ট ? রক্তচাপে শিবের তাণ্ডবনাচ শুনতে পাচ্ছি ; হলোকস্ট ? আউশউইৎস ? রগের দপদপ কানের ইয়ারড্রামে।

               কবিতাটা আবৃত্তি করে কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না, তবে তোর কন্ঠস্বর বেশ মধুর, বললাম, শুকনো গলায় খাঁকারি দিতে না হয়, তাই ঢোঁক গিলে।

               বেডরুমে ঢুকে তোর সুটকেস নামিয়ে রাখতে, তুই দেখলি সেন্টার টেবিলের ওপর ব্ল্যাক ডগ স্কচ আর একটা গেলাসে সামান্য মদ, কাল রাতে অর্ধেক খাইনি, কাজে মশগুল ছিলাম, বেঁচে গেছে কিছুটা।

               তুলে খেয়ে নিলি, এক চুমুকে, বললি, বড়ো ক্লান্ত হয়ে গেছি, জেট ল্যাগ, এত দীর্ঘ ফ্লাইট, কই আরেকটু দাও তো, গিলে বাকি অংশ শোনাই তোমায়। ভাবছ নাকি, যে ইলেকট্রনিক্স ইনজিনিয়ার কি করে কবিতা শোনাচ্ছে? তোমার দেয়া লিরিকাল ব্যধি। হ্যাঁ, তোমারই দেয়া, থরে-থরে বই, তাক-তাক বই, এনজয় করতুম, স্যাডনেস এনজয় করতুম, গ্রিফ এনজয় করতুম, তোমার অদৃশ্য বন্দিত্ব এনজয় করতুম, আর প্যাঁচ কষতুম, কে লোকটা, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আমার হাঁটবার রাস্তায় অ্যাসফাল্ট পেতে সুগম করে দিচ্ছে, জীবনে একবারও হুঁচট খেয়ে পড়তে দিল না।

               এক পেগ মতন ঢালার পর সোডার বোতল খুলতে যাচ্ছিলুম, বললি, নো, নো, মাতন লাগতে দাও, খাবো তবে তো মনের কথা বলতে পারব, কতকাল যাবত চেপে গুমরে উঠেছে কথাগুলো।

               এক চোঁয়ে খেয়ে, ফ্ল্যাপার ছুড়ে ফেলে দিলি দীর্ঘ ঢ্যাঙ নাচিয়ে, বিছানায় চিৎ শুয়ে-শুয়েই আবৃত্তি করতে লাগলি, চোখ বুজে :

               In the German tongue, in the Polish town

               Scraped flat by the roller

               Of wars, wars, wars.

               But the name of the town is common

               My Polack friend

               #

               Says there are a dozen or two

               So I never tell where you

               Put your foot, your root,

               I never could talk to you.

               The tongue stuck in my jaw.

               আবৃত্তি থামিয়ে, আরও বারোটা স্তবক আছে, বললি,  মনে রেখো আই ওন ইউ, আমি তোমার অস্তিত্বের সত্বাধিকারিণী। কবির নাম জানো না ? খুঁজো , খুঁজো, খুঁজো।

               আমি : ঘুমিয়ে পড়, ক্লান্ত হয়ে গেছিস, দেখাই যাচ্ছে, রেস্ট নিয়ে স্নান করে, লাঞ্চ সেরে তারপর কথা হবে।

               তুই : না, না, না, না, পালিও না, বসে থাকো, আমি ঘুমোবো আর তুমি এদিক ওদিক টেলিফোন ঘোরাবে, সেটি হচ্ছে না, মোবাইল কোথায়, অফ করে দাও বা সাইলেন্ট মোডে করে দাও। বসে থাকো, চুপটি করে বসে থাকো, আমি ঘুমোবার চেষ্টা করছি, ঘুম ভেঙে যেন তোমাকে বসে থাকতে দেখি। নয়তো, এতক্ষণে জেনে গিয়ে থাকবে আমার বিহেভিয়ার কেমন রাফ, আনকালচারড, মোটেই ভদ্রজনোচিত নয় , জাস্ট রিক্লাইন অন দ্যাট সোফা।

               বিছানা থেকে উঠে, সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা মোবাইল তুলে সুইচ অফ করে দিলি, ল্যাণ্ডলাইনের রিসিভারটা নামিয়ে রাখলি , আর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি আবার, চোখ বুজলি।

              তুই চোখ বুজতেই খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম তোকে।  তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোর সঙ্গে যৎসামান্য মিল আছে, ভরাট হয়ে উঠেছিস, ডেলিবারেটলি সেক্সি।

               তোর আদেশ শুনে আশ্রয়ের ভালোলাগায় পেয়ে বসল আমায়, অথচ অতিথি তো তুই। আমার শরীর থেকে ব্যুরোক্র্যাটের পার্সোনা ছিঁড়ে ফেলে দিলি যেন।

##

               প্রজাপতিদের ফ্রিল-দেয়া শালুকের কোঁচকানো ঢেউ। আমি ? পাগলের ওড়ানো ঘুড়ি।

               বুকে, বিজয়ের আহ্লাদে মিশেছে জয়ের আছাড়, স্বপ্ন দেখার জন্য গড়ে-নেয়া দ্যুতিময় অন্ধকার।

##

               এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

               যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

                প্রায় দুঘণ্টা বসেছিলাম সোফায় হেলান দিয়ে, চোখ লেগে গিয়ে গিয়েছিল। চোখ খুলতে দেখি তুই পাশে বসে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে, ল্যাভেণ্ডার আইসক্রিমের গন্ধের দূরত্বে, গভীর কালো চোখ মেলে, আমাকে তারিয়ে দেখছিস,  হাতে স্মার্টফোন। এত কাছে একজন যুবতীর মুখ, সুগন্ধ পাচ্ছি হাঁ-মুখের, ল্যাভেণ্ডার মাউথ ফ্রেশেনার ইনহেল করে থাকবি।

                কি গভীর চোখজোড়া, আমার ভেতর পর্যন্ত তিরতিরিয়ে সেঁদিয়ে গেল। কোথা থেকে পেলি এরকম চোখ, চোখের পাতা? তোর মা তোকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবার সময়ে জানত কি যে  তুই এরকম সুশ্রী আর স্মার্ট যুবতী হয়ে উঠবি, সেক্সি অ্যাটিট্যুড ঝলকাবে !

                বললি, দেখছি, তোমার ভেতরের সোকল্ড ঈশ্বরের চেহারাটা কেমনতর, কত পার্সেন্ট হিউমান আর কত পার্সেন্ট গডলি, কিংবা কোনো গডজিলা বা কিংকং লুকিয়ে রয়েছে কিনা।

                গম্ভির হবার অভিনয় করলাম।

                তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দুচারগাছা পাকাচুলে রোমের গ্ল্যাডিয়েটারদের মতন দেখাচ্ছে তোমায় ; হেয়ার ডাই করা আমি একেবারে পছন্দ করতে পারি না। তোমার ঘুমন্ত পোজের গোটা দশেক ফোটো তুলে নিয়েছি, ইন্সটাগ্রাম, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস আর আমার ফেসবুক পাতায় পোস্ট করে দিয়েছি, যাতে ফোটো তুলছি দেখে ডিলিট করার চেষ্টা না করো। একটা সেলফি তুলি, কি বলো, বলে আমার গলা বাঁহাতে জড়িয়ে সেলফি তুলে নিলি, বললি, এটা আপলোড করছি না, আপাতত করছি না, কখনও করব।

               তোকে প্রশ্রয় দিতে আমার ভালো লাগছিল। আর স্পর্শ ? অবর্ণনীয়। নবীকরণ, নবীকরণ, নবীকরণ।

                নারীশরীর, নারীশরীর, নারীশরীর। সুগন্ধ সুগন্ধ সুগন্ধ।

##

                স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

                শিশিরে কেউটের গন্ধ। উতরোল কোলাহল।

##

                তুই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিলি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, পারফিউম মেখেছিস, সিল্কের নাইটগাউন পরে নিয়েছিস, হালকা গোলাপি লিপ্সটিক লাগিয়েছিস, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুলে হয়ে উঠেছিস আকর্ষক, বললুম, ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছিস ?

                 তুই জানালি ফ্রিজ থেকে ব্রেড নিয়ে টোস্টারে টোস্ট করে খেয়েছিস, কিচেনে গিয়ে দুমুঠো অ্যাসর্টেড বাদাম খেয়েছিস।

                 তুই : হ্যাজেলনাট দেখলুম, ইনডিয়ায় আজকাল সবই পাওয়া যায় দেখছি, বললি।

                 আবার ব্যঙ্গের পরিতৃপ্তি তোর কথায় ঝরল, বললি, তোমার প্যানিকড হবার প্রয়োজন নেই, ওয়াচম্যান না কি সেন্ট্রি, তাকে বলে দিয়েছি কেউ এলে বলে দিতে যে আজ সাহেব কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, ওনার এক আত্মীয় এসেছেন বিদেশ থেকে, সদর দরোজা বন্ধ করে এসেছি, এই ঘরের পর্দাও টেনে দিয়েছি, আর তুমি যা চাইছিলে, আমাকে অন্য ঘরে স্হানান্তরিত করতে, পাশের ঘরে আমার বিলংগিংস রেখে এসেছি, দেখলুম ঘরটাতে অ্যাটাচড বাথ রয়েছে, টিশ্যু পেপারের রোলও রয়েছে, আমার এখন রোল ইউজ করার অভ্যাস হয়ে গেছে। ডেস্কটপটা ইউজ করে নিলুম, বেশ কয়েকটা ই-মেল লেখা জরুরি ছিল। একটা শাঁখ দেখে ভাবলুম বাজাই জোরে আর তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাই, তারপর মনে হল, নাঃ, বেচারা ব্যুরোক্র্যাট, সরকারি চেস্টিটি বেল্ট পরে বসে আরাম করছে।

##

                স্মার্টফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে , তুই আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললি, আই লাভ ইউ, আমি তোমায় ভালোবাসি, ইউ আর মাই লাভার, আই অ্যাম ইওর বিলাভেড, ওই ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো, আর স্বচরিত্রে এসো।

                আমি : কী বলছিস কি, আবোল তাবোল, বললুম।

                তুই : ডোন্ট ট্রাই টু বিহেভ লাইক অ্যান ওল্ড বাবা। বাবা সাজার চেষ্টা কোরো না, আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি বাবা অভিনয়কারীদের।

                আমি : আবার মদ খেলি ?

                তুই : হ্যাঁ, মেরে দিলুম এক পেগ তুমি ঘুমোচ্ছ দেখে, কিছু করার নেই, মদের খোঁয়ারিতে তোমাকেই দেখছি কতক্ষণ হয়ে গেল, তোমাকে দেখার মাদকতার সঙ্গে ব্ল্যাক ডগের নেশা, আইডিয়াল। কতকাল তোমাকে দেখার কথা ভেবেছি, কেমন দেখতে ভেবেছি, দেখা পেলে কতগুলো টুকরো করব ভেবেছি, কোন টুকরোটা আগে খাবো ভেবেছি। বিছানায় রুবিক কিউব রয়েছে দেখলুম, ও আমি চেষ্টা করেও পারি না, আমার বোন অবশ্য এক মিনিটে করে ফেলতে পারে।

                আমি : ছাড় দিকি, গলা ছাড়।

                তুই : আবার অ্যান ওল্ড বাবা সাজার চেষ্টা করছ, ভুলে যেওনা মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, আমার নাম ইতি প্রধান নয়, আমার নাম নেতি ব্যানার্জি। তারপর নাকে নাক ঠেকিয়ে, চোখে চোখ রেখে বললি, বলিউডি ফিল্মে যেমন দেখায়, সেই কাঁথাটা রাখোনি, যেটায় আমাকে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল আমার রেপিস্ট বাবা আর ভিতু মা। রেপিস্ট ছিল নিশ্চয়ই, দেখছ তো আমি কতো ওয়েল বিল্ট লম্বা চওড়া, বায়োলজিকাল বাবা গায়ের জোর খাটিয়ে রেপ করেছিল বায়োলজিকাল মাকে, মা হয়ত কাজের বউ ছিল কিংবা চাষি বউ বা পরিচারিকা বা হোয়াটএভার, হু কেয়ার্স।

                আমি : ঠিক আছে, গলা ছাড়।

                তুই : মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, গলা ছাড়ব বলে অত দূর থেকে উড়ে আসিনি। থাকব এখন, একমাস, দুমাস, তিনমাস, যত দিন না আমার উদ্দেশ্যপূরণ হয়। ছাড়াবার চেষ্টা কোরো না, আমার গায়ে তোমার চেয়ে বেশি জোর আছে বলে মনে হচ্ছে, তোমার হাইটের সমান আমি, হাতও তোমার চেয়ে দীর্ঘ।

               তোর চোখের আইল্যাশ কি নকল, এত বড়ো দেখাচ্ছে ? এড়াতে চাইলাম।

               আমার কিচ্ছু নকল নয়, বলে, উঠে দাঁড়ালি তুই, ফাঁস খুলে গাউনটা ফেলে দিলি কার্পেটের ওপর, নগ্ন, জড়িয়ে ধরলি আমাকে, বললি, দেখে নাও, আগাপাশতলা খাঁটি।

               কী করছিস কি ! আমি চড় কষিয়ে দিলাম তোর গালে।

                তুই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলি, ঠোঁটের ওপর ঠোঁটের আলতো ঠোক্কোর মেরে মেরে বলতে লাগলি, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ।  

              আচমকা দুহাত দিয়ে আমার পাঞ্জাবির বোতামের জায়গায় টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললি, মুখ গুঁজে দিলি আমার বুকে, ঠোঁট ঘষতে লাগলি, বলতে লাগলি, আমি এখনও ভার্জিন, তোমার জন্য, তোমার জন্য, তোমার জন্য, কবে থেকে খুঁজছি তোমায়, সেই ক্লাস এইট থেকে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। শুইয়ে দিলি সোফার ওপরে, টান মেরে খুলে দিলি আমার লুঙ্গি, বললি, তবে, ইউ আর গেটিং ইনটু ফর্ম, নাউ মেক লাভ, আমাকে টেনে নামিয়ে দিলি কার্পেটের ওপর, মেক লাভ, প্রভঞ্জন, তোমার অদৃশ্য ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো।

##

               শিশিরে কেউটের গন্ধ। উতরোল কোলাহল।

               স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি। চাউনির অতিশয়োক্তি।

               স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

##

               আমি উঠে বসে আরেকবার চড় মেরে বললাম, স্টপ দিস।

               চড় মেরে ফিলগুড অনুভূতি হাতের তালু বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল শিরা-উপশিরায়, নেমে গেল বুক-পেট-জানু হয়ে পায়ের দিকে, শিউরে-ওঠা কাঁপুনির  এক ভালো লাগা।

                তুই : স্টপ ? তোমার শরীর তো রেসপণ্ড করছে, লুকোচ্ছ কেন যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো। বাবাগিরি ফলিও না, যথেষ্ট বাবাগিরি ফলিয়েছ, এবার প্রভঞ্জনে এসো মিস্টার প্রধান, আমি নেতি ব্যানার্জি, এসো, আমার চোখের দিকে স্পষ্ট করে তাকাও। তাকাও, চোখের পাতা ফেলবে না, তাকাও, আমার মুখের দিকে তাকাও। তুমি যে আমার সো কল্ড বাবা নও, ভুলে যাচ্ছ কেন ? আর হলেই বা বাবা, সম্পর্ক পাতাও, ইনসেস্টের সম্পর্ক, প্রিহিসটরিক যুগে যেমন মেয়েদের সঙ্গে বাবাদের সম্পর্ক হতো, যেমন বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়ার হয়। 

               বলতে লাগলি আই ওয়ান্ট ইওর বেবি, আমি তোমার বাচ্চা কনসিভ করতে চাই, ডোন্ট রেজিস্ট, তোমার মুখে আঁচড়ে-কামড়ে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেবো কয়েক দিনের জন্য। নখ দেখেছ, যৎসামান্য ছুঁচালো ; দাঁতও ব্যবহার করতে পারি। আমার সেক্সের চাহিদা নেই ; আমি বাচ্চা চাই।

                দুহাতের চেটো দেখিয়ে বললি, এই দ্যাখো, মেহেন্দির নকশায়  ডান হাতে লেখা রয়েছে ড্যাড আর বাঁহাতে ব্রো-প্রো ; আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার।

##

                 প্রলোভনের সমস্যা চিরকাল এই যে জীবনের তাৎক্ষণিক সুযোগ আর পাওয়া যায় না।

                 ছেড়ে দিলাম শরীরকে তোর হাতে, টেনে তোকে বিছানায় নিয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম যে  তোকে এই ভাবেই পেতে চেয়েছি, বড়ো করে তুলেছি, অপেক্ষায় থেকেছি যে একদিন না একদিন তুই আসবি ; নেতি ব্যানার্জি আমার, আমিই তাকে আঁস্তাকুড় থেকে তুলে আনার পর নারীত্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি।

                আমাকে জড়িয়ে তুই নিজের ওপর তুলে নিলি । তোর বুকে মুখ গুঁজলুম, কী তপ্ত তোর বুক। উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরলুম তোকে।

              বললুম, আমিও ভার্জিন রে, সেক্স করিনি এখনও। দুবছর আগে পর্যন্ত আমার নাইট ফল হতো, স্বপ্নে তোকে পেয়ে, চটকে-মটকে । ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করেছিলাম, সে বললে ম্যাস্টারবেট করে বের করে দিতে। কম বয়সে করতাম, তোর মুখ মনে করেই করতাম, কিন্তু এত বয়সে কেউ কি ম্যাস্টারবেট করে ; ইচ্ছে করেছে, কিন্তু করিনি, কেমন নোংরা মনে হতো, ওই যে তুই চেস্টিটি বেল্টের কথা বলছিস।

               আমিও করিনি, ইন দ্যাট সেন্স করিনি, তোমাকে ইম্যাজিন করে ডিজিটালি যতটুকু  আনন্দ পাওয়া যায় ; ননডিজিটালি করলে নাকি ভার্জিন থাকা যায় না, জাঠনি বাড়ির ভিতু মেয়ে বলতে পারো। এই তো তোমার বেডশিটে দ্যাখো, ব্লাড। চাদরটা তুলে দিতে হবে, আমি এই অংশটা কেটে নেবো, মেমেন্টো হিসাবে, নয়তো তোমার সারভেন্ট সকালে এসে সন্দেহ করবে।

                মগজে প্রশ্ন উঠল, কত স্বাভাবিক বোধ করছি এখন, কেন, এই দৈহিক সম্পর্ক ঘটে গেল বলে ? আড়ষ্ট লাগছে না তো ! আমাদের দেখা হয়নি কত বছর, অথচ দুজনেই দুজনের অতিপরিচিত ছিলাম।

                 বললাম, তুলে দিস, অনেক চাদর আছে, কালারড প্রিন্টেড চাদরও আছে। জাঠদের সংস্কৃতি থেকে পেয়েছিস নাকি এই বিদকুটে প্রদর্শনী ?

               তুই : হতে পারে, অভিভাবক মা যখন জাঠনি, কিছু তো পাবো। যাকগে, এবার এলেকট্রা বলে ডাকো।

                আমি : এলেকট্রা, মাই ডিয়ার চাইল্ড, জানি তুই নিও টেরেস্ট্রিয়াল।

               তুই :  জানলে কি করে ?

               আমি : আন্দাজে, নেটি যখন, তার মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল। আমি মনে মনে তোকে ইতি নাম দিয়েছি।

              তুই :না, তুমি হলে ইটি,  এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল। মঙ্গলগ্রহের সরকার তোমায় চেস্টিটি বেল্ট পরে পাঠিয়েছে।

              আমি : কিন্তু তুই আনওয়েড মাদার হয়ে সমাজে থাকবি কী করে ?

              তুই : ধ্যুৎ, আমি আমেরিকায় থাকি। তুমি কি আমাকে রিচুয়ালি বিয়ে করতে চাও ?

              আমি :  হ্যাঁ।

              তুই : আমি কনসিভ করতে চাই, বিয়ে-ফিয়ে আবার কি ? এক পাকেই বাঁধতে চাই না নিজেকে তো সাত পাকে। তোমার রিমোট কন্ট্রোল যথেষ্ট প্রয়োগ করেছ, এবার আমার পালা, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট। বাট আই উড  থিংক ওভার ইয়র প্রোপোজাল।

              আমি : কি করে জানলি যে বাচ্চা পেতে হলে এই সব করতে হয় ?

               তুই : আঁস্তাকুড়ে শুয়ে শুয়ে শিখে ফেলেছি ; তুমি কি করে শিখলে ?       

              আমি : শরীরের জিপিএস কাজ করল ; উ উ উ উ উ উ করছিলিস কেন ? অরগ্যাজমের উত্তেজনা রিলিজ করার জন্য ?

              তুই :হাঃ, এতক্ষণ তোমাকে কবিতা শোনালুম, রাইমিং মার্ক করোনি ? উ উ উ উ ? মহাকাব্যের এলেকট্রার স্বপ্নপূরণ হল বলে মনে হচ্ছে।

              আমি : না, মার্ক করিনি, টেন্সড আপ ছিলাম, তুই হঠাৎ এসে পড়েছিলিস, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, লস্ট ফিল করতে আরম্ভ করেছিলাম।

              তুই বললি, লস্ট ? নিজের মধ্যে নয়, আরেকজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে হয়, ইতস্তত করতে নেই, সব সীমা মানুষের বানানো, ভাঙো যেদিন যখন চাও, নেভার গেট লস্ট । তারপর আরম্ভ করলি তোর গায়িকাসুলভ  কন্ঠস্বরে :

                It struck me a barbed wire snare

                Ich, ich, ich, ich,

                I could hardly speak

                I thought every German was you

                And the language obscene

                #

                An engine, an engine

                Chuffing me off like a Jew.

                A Jew to Dachau, Auschwitz, Belsen.

                I began to talk like a Jew.

                আমি : আমাকে শোনাবি বলে মুখস্হ করে রেখেছিস ? কার কবিতা বললি না তো ?

                তুই : খুঁজো, খুঁজো। হ্যাঁ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছি, কল্পনা করেছি তোমাকে কেমন দেখতে।

                আমি : কেমন ? ফানুসনাভি ব্যাঙ-থপথপে শুশুকমাথা আমলা, চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো ?

                তুই : হা হা, সেল্ফডেপ্রিকেট করছ কেন, লেডিজ টয়লেটের দেয়ালে আঁকা ড্রইংয়ের মতন। কোরো না, শিরদাঁড়া ঘিরে তালের আঁটির মতন শুকিয়ে যাবে।

                 আমি :কত কথা বলতে শিখে গেছিস।

                  তুই : থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট, সবই মোর অর লেস বরোড ফ্রম বাঙালি ক্লাসমেটস ।

                  আমি : তাহলে কি করব ? পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দুভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস হয়ে উড়ব?

                  তুই : হ্যাঁ, হেঁইয়ো করাতেও তো পাল তুলতে হল আমাকেই।

                 আমি : এখন দ্যাখ, চিংড়িদাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি-ঠোঁটের হাসি।

                 তুই : ইয়েস, বেটার দ্যান আই এক্সপেক্টেড ; আমি ভেবেছিলুম তুমি সত্যিই ড্যাডি টাইপের হবে, পেট মোটা, আনস্মার্ট, লেথারজিক, বুকে চুল নেই, বগলে চুল নেই, কুঁচকিতে চুল নেই।

                আমি : কী করতিস অমন হলে।

                তুই : এখন যা করলুম, তা-ই করতুম, তোমাকে কেমন দেখতে ওটা ইররেলিভ্যান্ট।

                 আমি : আমি তো আরোহী-ফেলা পুংঘোড়ার লাগাম-ছেঁড়া হ্রেষা।

                তুই : হ্যাঁ, আই ওয়ান্টেড ইউ, দি পার্সন হু ওনড মি। নাউ আই ওয়ান্ট দি সোয়েটিং স্ট্যালিয়ন, প্রত্যেকদিন , অফিস থেকে ফিরতে দেরি করবে না, আর, আমি সকালেও তোমাকে চাই, দি মর্নিং গ্লোরি। আমার কাছে সেক্স অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তোমাকে আমার জীবনে কখনও অতীত হতে দিতে চাই না, তাই আমার বেবি চাই, সম্পর্ককে যে বাচ্চা অতীত হতে দেবে না, যতদিন সে বেঁচে থাকবে ততদিন, আর তারপর তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে নিজের ছেলেমেয়ের মাধ্যমে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে নিয়ে যাবে। ক্যারি অন অ্যাণ্ড অন অ্যাণ্ড অন ইনটু ইটারনিটি, ইনটু নিউ সানরাইজ এভরি ডে।

                 তোকে বললুম, এত ফ্যাক-ফ্যাক করে কনভেন্টি ইংলিশ বলিসনি, দিল্লিতে এখন হিন্দিঅলাদের রাজত্ব শুরু হয়েছে, ওপরে উঠতে হলে হিন্দির বাঁশের মই বেয়ে উঠতে হবে, নেহেরুভিয়ান অক্সব্রিজ বাবু-মন্ত্রীদের যুগ ফুরিয়েছে। মোগল সম্রাট আকবরের বংশধররাও ক্যারি অন করে পোঁছেছিল ক্যাবলা বাহাদুর শাহ জাফরে, যত ক্যারি অন হয় তত ফিকে হতে থাকে ভবিষ্যত। মোতিলাল নেহেরু পৌঁছেচে রাহুল আর বরুণ গান্ধিতে।

                 তুই : ভালো বলেছ, ফাক-ফাক হিন্দির বাঁশ; এ হল অকলোক্র্যাসি বা টির‌্যানি অফ দি মেজরিটি, মেজরিটি সেক্টের পুরুষরা পাকিস্তানে কি করছে দেখতেই পাচ্ছ, তুই খিলখিলিয়ে বললি। যোগ করলি, কাঁধ শ্রাগ করে, হিন্দি সাবজেক্টেও প্রতিটি ক্লাসে সবচেয়ে বেশি মার্কস পেতুম, সো আই ডোন্ট কেয়ার ; আই ওন ইউ ইন অল দি ইনডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস। আমার জিভে আছে তোমার অস্তিত্বের মালিকানা।

##     

 

                 এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

                 যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

                 আমি : আই ডিডন্ট ওন ইউ ; তুই তোর নিজের মালিক, কেউ কাউকে ওন করে না।

                 তুই : করে, সম্পর্ক হল অন্যের আত্মার মালিকানা। তুমি আমার আত্মার মালিক, আমি তোমার।

                 আমি : আত্মা ? হয় নাকি সেরকম কিছু ?

                 তুই : কেন হবে না ! না হলে কী করে তোমাকে খুঁজে বের করলুম, কাঠঠোকরা যেমন গাছের বাকলে ঠোঁটের ঠোক্কোর মেরে মেরে পোকা বের করে আনে।

                 আমি : পোকা ?

                 তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দি মেল অরগ্যান লুকস লাইক এ বিগ ক্যাটারপিলার, উত্তুঙ্গ গুটিপোকা, প্রজাপতির নয়, টাইগার মথের। টু বি ফ্র্যাংক, আজকেই আমি স্পষ্ট করে দেখলুম প্রত্যঙ্গখানা কতটা আর্টিস্টিকালি বিল্ট। তোমার প্রত্যঙ্গখানা বোধহয় গ্রিসে বা রোমে তৈরি, খাজুরাহোয় নয়।

##

                   আমি : চণ্ডীগড়ে, জগদীশের বাড়িতে আগে যাওয়া উচিত ছিল তোর।

                  তুই : দুটো কারণে যাইনি ; উনি তোমাকে ইনফর্ম করে দিতেন আর তুমি নির্ঘাত লুকিয়ে পড়তে, আমার পরিকল্পনা, জীবন নিয়ে ভাবনা, তোমাকে আগাপাশতলা খেয়ে ফেলার ইচ্ছে, সব গোলমাল হয়ে যেত।

                  আমি : আর দ্বিতীয় ?

                  তুই : বৈদেহী ওর বরকে ডিভোর্স দিয়েছে, বরটা গে, নেশাভাঙ করে, বাস্টার্ড, কোনো গে ছেলেকে বিয়ে করলেই পারত, কোর্ট তো অ্যালাউ করে দিয়েছে। স্কাউন্ড্রেলটা বৈদেহীকে কামড়ে দিয়েছিল, হাতে, কাঁধে। ওর বিধবা শাশুড়ি আর ওর বর দুজনে মিলে এক রাতে, তখন রাত দুটো, বৈদেহীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, ওর মোবাইল কেড়ে নিয়ে, হায়দ্রাবাদের  রাস্তায় ভেবে দ্যাখো ; সাইবারাবাদ আইটি ইনডাস্ট্রির এক এমপ্লয়ি  স্কুটারে  ফিরছিল, তাকে থামিয়ে বাড়িতে ফোন করতে বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, ওনার আইএস বন্ধুকে জানায়, তিনি বৈদেহীকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখেন, আর পুলিসে এফ আই আর করেন।

                 আমি : জানি, আমাকে আবার কি বলছিস, আমিই তো পরিচিত একজন আন্ডার সেক্রেটারিকে বলে বৈদেহীর চণ্ডীগড় ফেরার ব্যবস্হা করেছিলাম। জগদীশের তো শুনেই ব্লাড প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল ; সারাজীবন হরিয়ানায় কাটাল, বাইরের ক্যাডারের অফিসারদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় নেই।

                 তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি ? তুমি ? তুমি ? তোমার ভূমিকা, অ্যাজ ইউজুয়াল, ওনারা চেপে গিয়েছিলেন, বলেননি আমাকে। বলতে পারতেন, আমি তো আর তক্ষুণি আমেরিকা থেকে উড়ে তোমায় কবজা করতে আসতুম না।

                তুই : আরিয়ানও আঙ্কলবাবা আর মাকে, আই মিন আন্টিমাকে, না জানিয়ে বিয়ে করে চলে গেছে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে। ওনারা যথেষ্ট ডিপ্রেসড, আই অ্যাম শিওর। যাবো না ওনাদের বাড়ি, জানতে দিতেও চাই না যে আমি ইনডিয়ায় এসেছি।

                  আমি : জানি, আমি জগদীশকে বলেছিলাম যে বৈদেহীর পাত্র বিশেষ সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, একটা পুলিশ এনকোয়ারি করিয়ে নিই, তা ওর আর অমরিন্দরের টাকাকড়ি সম্পর্কে এমন লোভ যে কানে হিরের টপ-পরা পাত্রের বানজারা হিলসের বাড়ি, বিএমডাবলিউ গাড়ি  আর ব্যবসার সাইনবোর্ড দেখে ভিরমি খেয়ে গিয়েছিল, শেষে এই বিপদ ডেকে এনেছে।

                 তুই আচমকা বললি, আমি তো শুনেছিলুম, বৈদেহী অব্রাহ্মণ কাউকে পছন্দ করত, তার বয়স নাকি ওর চেয়ে চোদ্দো-পনেরো বছর বেশি, ওনারা তাতে রাজি হননি, সেই লোকটি সুদর্শন, ওয়েল বিল্ট, আইএএস, তোমার মতো এজিএমইউ ক্যাডারের।

                আমি : তা জানি না, ওরা বলেনি কখনও এ-ব্যাপারে, বললে মধ্যস্হতা করতাম।

                তুই : করতে ? আর ইউ শিয়র ?

                আমি : আরিয়ানের পছন্দ করা মেয়েটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিতে বলেছিলাম, করল না, ট্রাইবাল ফ্যামিলির বলে। আরিয়ান হল অ্যানথ্রপলজিস্ট, যে মেয়েটিকে বিয়ে করল তাদের সমাজে ঢুকে বিস্তারিত জেনে নিতে চাইছে, তাতে দোষের কি? শুনতে ট্রাইবাল, আমি ফোনে কথা বলেছি মেয়েটির সঙ্গে, স্কুলে পড়ায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী ছিল। জগদীশ ভাবল যে ওর ভবিষ্যৎ প্রজেনির ব্রিড নষ্ট হয়ে গেল। ব্রিড বলে কিছু হয় নাকি, তোকে দেখে শেখা উচিত ছিল ওদের, তোর ব্রিড কেউ জানে ? আজ কোথায় পৌঁছে গেছিস।

##

                 লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার….

                 মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে…..

                 কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে….

                 নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে….

##

                  তুই : ধ্যুৎ, এইসব প্রসঙ্গ তুলছ কেন ! আমার তো অ্যাপ্রিহেনসান ছিল, আতঙ্কও বলতে পারো, এসে দেখব, একজন হাড়গিলে টাকমাথা চশমাচোখ বুড়ো অন দি ভার্জ অফ রিটায়ারমেন্ট। আমার ডিটেকটিভ এজেন্সি প্রচুর সময় নষ্ট করে দিলে তোমায় লোকেট করতে, আমিই ওদের আঙ্কলবাপি আর মা, আই মিন আন্টিমায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে বললুম ফাইনানশিয়াল ট্রইল ধরে এগোতে। আঙ্কলবাপি তো এতো ঘুষ খায় যে ওরা ডাইভার্টেড হয়ে যাচ্ছিল ; তখন ওদের বললুম পুরোনো ট্রেইল ধরে এগোতে, যখন আমি আইআইটিতে  পড়তুম, আর আমার অ্যানুয়াল ফিস এটসেটরা পে হচ্ছে, সেই সময়ের ট্রেইল।

                 আমি : বুড়ো হলে কি করতিস।

                 তুই : সুইসাইড, জোক করছিনা, বুড়ো হলে তার কোঁচড় থেকে ফুলঝুরির বদলে কুয়াশা উড়ত। কুয়াশায় বাচ্চা হয় না।

                  আমি : ইশারার সাহায্যে বেশ পোয়েটিক কথাবার্তা বলতে শিখেছিস দেখছি।

                 তুই : বাঙালি ব্যাচমেটদের কনট্রিবিউশান। প্রচুর বাংলা গালাগাল জানি। বলব ? হিন্দিও জানি, গিগলিং টাইপ। হরিয়ানভি গালাগাল কিন্তু বেশি ইউজার-ফ্রেণ্ডলি।

                 আমি : না না, বলতে হবে না। বুড়োর বদলে কি পেলি ?

                 তুই : কোঁচড় থেকে বকুল ফুলের ঝরণা ঝরাতে পারে এমন মাসকুলার স্ট্যালিয়ন। এসো, বুলশার্ক, আরেকবার হয়ে যাক।

                নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনলাম, প্রভঞ্জন, তুমি কতোকাল নেতির জন্য অপেক্ষা করেছ, আর লজ্জায় বিব্রত বোধ কোরো না, নিয়ে নাও, যতো পারো নিয়ে  নাও, একেই যদি প্রেম বলে তাহলে চুটিয়ে ভালোবেসে নাও, প্রেমকে গোপন রেখো না, একেই তো চাইতে তুমি, নিজেকে এই মেয়েটির বাবা বলে মনে কোরো না।

               এতকাল যুবক-যুবতীদের পারস্পরিক সান্নিধ্য আর প্রেমের প্রদর্শনী দেখে হিংসে করতাম, আড়চোখে,   ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি প্রভঞ্জন প্রধান, নিজেকে নিজে ভাবতে আড়ষ্ট বোধ করতাম, ভয়ও পেতাম, মনে মনে তোকে ধন্যবাদ দিলাম, নিজেকে প্রভঞ্জন প্রধান হিসাবে নিজের কাছে তুলে ধরার যোগ্য করে তোলার জন্য, আমার ভেতর থেকে আমাকে প্রসব করার উপযুক্ত করে তোলার জন্য, বুঝতে পারলাম রে, যে আমি কোনও স্হাবর-স্হির বস্তুপিণ্ড নই, তোর শিশুকাল থেকে আমিও তোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছি, তুই না এলে আমার অতীত থেকে যেত একেবারে ফাঁকা , ব্যথার মোড়ক খুলে আরেক ব্যথার সাথে মেশানো হয়ে উঠত না।

                বললাম, হোক, উ উ উ উ করিসনি, প্লিজ।

               তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি এক্টিভ হও, আমি তোমাকে কবিতাটার একটা রেলিভ্যান্ট প্যারা শোনাচ্ছি, বেশ মজার হবে, না ? কবি কখনও ভাবতেও পারেননি যে ওনার কবিতা এইভাবে কাজে লাগানো হবে, স্টার্ট।

               No God but a swastika

               So black no sky could squeak through

               Every woman adores a Fascist,

               The boot in the face, the brute

               Brute heart of a brute like you

               পাশে শুয়ে পড়লাম, বললাম, আমাকে ফ্যাসিস্ট বলছিস, ব্রুট বলছিস, অতদূর থেকে উড়ে এই কথা বলতে এলি ?

                তুই : ব্রুট ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কি ? আমার জীবনকে একেবারে আয়রন গ্রিপে রেখেছিলে, গেস্টাপো কেজিবি সিআইএর মতন নজর রেখেছো সদাসর্বদা। আমি ভিতু টাইপের নই, তুমি যদি বিদ্রোহ না করো তাহলে ভালোবাসা পাবে না, ভালোবাসতে গেলে গায়ে আঁচড়-কামড়ের রক্ত ঝরবে, ভালোবাসায় মাংসের সঙ্গে মাংসের জখমগুলো খুবই সুন্দর, এমনকি মধুময় বলা যেতে পারে, প্যাশনে রক্ত গরম হয়ে উঠবে, তবেই তো ভালোবাসার আমেজ নিতে পারবে। ভয়ও যদি করে, ঝাঁপাতে হবেই।

                 আমি : এলি কেন তাহলে ?

                 তুই : আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম। তোমার গ্লোরি দখল করে তোমার প্রথম রক্ত প্রথম স্পার্ম নেবো বলে ; এখন তোমার মাথার পেছন থেকে হ্যালো ঝরিয়ে দিয়েছি, তোমার রক্ত পালটে দিয়েছি, তোমার যিশুখ্রিস্টগিরি শেষ করে দিয়েছি। তুমি আর আগের প্রভঞ্জন প্রধান নও, না ব্রো-প্রো ?

                 আমি : জানিস ব্রো-প্রো ?

                 তুই :  জানিতো, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা ওই নামেই তো উল্লেখ করেন তোমায়, তুমি সামনে কোনোদিন না এলেও আমি অনুমান করেছিলুম যে এই ব্রো-প্রো লোকটাই আমাকে কনট্রোল করছে, দি ব্লাডি ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি ডিকটেটরিয়াল পালক পিতা, অ্যাবরিভিয়েট করলে হয় পাপি। তোমার ব্যাচমেটরা আর পরের আগের ব্যাচের সবাই তোমাকে ব্রো-প্রো মানে ব্রাদার প্রভঞ্জন বলে ডাকে, জানি।

                আমি : বিয়ের মেহেন্দি-নকশা কোথায় করালি ?

               তুই :  হোটেলে রিসেপশানিস্ট কে বলতেই ও পাঠিয়ে দিলে ঘরে ; লাগিয়ে বসে রইলুম চার ঘণ্টা, তোমার প্রতি ডিভোটেড, একা-একা আমার মেহেন্দি সেরিমনি, পরে দুজনে মিলে সঙ্গীত সেরিমনি করব।

##

 

                স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল জীবন।

                 চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস।

##

                 এর মতো, এর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

                 যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

##

 

                আমি : ওই স্টিলের আলমারিটা খোল, বাঁদিকে একটা সেফ আছে, সেটাও খোল, চাবি সামনের ড্রয়ারে আছে।

               তুই : কী আছে সেফে ? আমার গয়না-ফয়না টাকাকড়ি সম্পত্তি-ফম্পত্তি চাই না।

                আমি : খুলে তো দ্যাখ, যা আছে নিয়ে আয় বিছানার ওপর।

                তুই সম্পূর্ণ নগ্ন,  ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে সেফ থেকে কাগজপত্র বের করে প্রায়-স্তম্ভিত হয়ে গেলি, বললি, এতো আমার স্কুলের আইডেনটিটি কার্ডগুলো, ফাইনালের রেজাল্টগুলো, আর এটা, আরে, মাই গড, এতে তো আমার ইনটারভিউ বেরিয়েছিল, সিসটার অ্যানে নিয়েছিলেন, আর এটা, এটা তুমি ?

                আমি : হ্যাঁ, আমি, তোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তুই তখন এক বছরের।

                তুই : তুমি তো দারুন দেখতে ছিলে গো , পালক পিতা হের হিটলার, ওয়ান হু ওনস মি। ফোটোতে তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো সূর্যের গুঁড়ো মুখে মেখে হাসছ। ডানহাতে ওটা তোমার কনট্র্যাক্ট, তাই না, আমার লাইফ লং এডুকেশান স্পনসর করার ?

                আমি : দুটো কনট্র্যাক্ট রে, একটা তোর স্বনির্ভর না হওয়া পর্যন্ত এডুকেশান স্পনসর করার, আরেকটা তোকে অ্যাডপ্ট করার ? তোর পদবির এফিডেভিট জগদীশের কাছে ছিল, তোর স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাবার পর হয়তো ডেসট্রয় করে দিয়েছে।

                তুই : মাই গড, তুমি অ্যাডপ্ট করেছিলে ? আমি ভাবতুম বাপি, মানে আঙ্কলবাপি, করেছিল, আমার নামে তোমার পদবির বদলে তাহলে আঙ্কলবাপির পদবি জুড়লে কেন ? অ্যাডপ্ট করেও ডিজওন করতে চাইলে, আমি তোমার কনট্র্যাকচুয়াল ডটার বলে ?

                 আমি : না, আমি তো মোড়লচাষার ছেলে, প্রধানরা মাহিষ্য হয় ; তোকে ব্রাহ্মণ করার জন্যে জগদীশকে দিয়ে এফিডেভিট করিয়ে তোর পদবি ব্যানার্জি করিয়ে নিয়েছিলাম।

                 তুই : ধ্যুৎ, আমার ওবিসি হবার সুযোগটাই কেড়ে নিয়েছিলে, কত সুযোগ-সুবিধা পেতুম, তা নয়, বামুন, শ্যাঃ। অবশ্য একদিক থেকে ভালো যে আমি তোমার মেয়ে নই, জাস্ট অ্যান অ্যাডপ্টেড বেবি, এলেকট্রা অফ দি এলেকট্রা কমপ্লেক্স লাস্ট। দি ইনফেমাস এলেকট্রা, বুকের মধ্যে পুষে রাখা ইনসেসচুয়াস ব্যাটলক্রাইয়ের এলেকট্রা, ফসটার ফাদারের  প্রতিষ্ঠিত সন্তান। ইইইইইএএএএএ।

                আমি : সিচুয়েশান ভিলিফাই করছিস কেন ?

                তুই :  তোমার সংগ্রহের কাগজপত্রগুলো দেখব পরে সময় করে।

                আমি : হ্যাঁ, পরে সময় করে বসে বসে দেখিস, যখন অফিস চলে যাব। একটা পেপার কাটিং আছে, দেখতে পারিস, তুই যে ডাস্টবিনে পড়েছিলিস, তার সংবাদ।

               তুই :  তোমার বাঁহাতের কাটা দাগটা সেই বালি মাফিয়াদের আক্রমণে পাওয়া, না ?

               আমি : তুই কি করে জানলি ? ও তো অনেককাল আগের ঘটনা। হ্যাঁ, বেআইনিভাবে নদীর বালি তুলে নিয়ে গিয়ে বেচত বালিমাফিয়ারা, তাদের ট্রাক ক্রেন লোডার সিজ করার অর্ডার দিয়েছিলাম, তারই পরিণতি।

              তুই : জানি, তার পরের দিনই তোমার বদলি হয়ে গেলে।

              আমি : আর টিভিতে দেখালো মাফিয়াকর্তা জেল থেকে বেরিয়ে দু-আঙুলে ভি এঁকে হাসছেন ; সাঙ্গোপাঙ্গোরা তার জয়ধ্বনি করছে।

 

              প্রদাহ, যন্ত্রণা, আশঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ, মুখের ভিতরে জিভে।

              তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো  ঐশিতা, উপলব্ধি, সান্ত্বনা, অনুবোধ।

 

               তুই : আমি তোমাকে তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, জানো ?

              আমি : চিঠি ? কই পাইনি তো ? স্কুল কি সেন্সর করে দিয়েছিল ? নাকি জগদীশ-অমরিন্দর ?

              তুই : ধ্যুৎ, সেসব চিঠি পাঠাই-ইনি তোমায়; তুমি তো ইনভিজিবল ডুগুডার, জাস্ট অ্যান্টিসিপেট করে যে তুমি আমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছ, আমি দশ, এগারো আর বারো ক্লাসে তোমায় চিঠিগুলো লিখেছিলুম।

                আমি : রেখে দিতে পারতিস তো ! পড়তাম।

               তুই : তোমাকে প্রেমিকড্যাডি মনে করে লিখেছিলুম।

               আমি : ডেসট্রয় করে দিলি কেন ?

               করিনি, আমার সঙ্গেই এনেছি।

               তুই : কই, দে দে দে, কেউ তো কোনো কালে আমাকে চিঠিই লেখেনি, প্রেমপত্র তো বাদ দে।

               আমি : ওই তো টেবিলের ওপরে রাখা খামে আছে, চাইলডিশ যদিও, পড়ে দ্যাখো। বাংলায় লিখেছি, তার কারণ স্কুলে সিসটার আর ওয়ার্ডেনরা বাংলা জানতেন না।

              আমি : কার কাছে শিখলি বাংলা ?

              তুই : কেন , আঙ্কলবাপির কাছে, উনি ভিষণভাবে বেঙ্গলি, দেখছ না আন্টিমাকে কত তাড়াতাড়ি বাঙালি বানিয়ে দিয়েছিলেন, আণ্টিমাও বাংলা পড়তে-লিখতে পারেন, তাই স্কুলের পর্ব শেষ হলে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে চিঠিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলুম, তারপর নিজের সঙ্গেই রেখেছি। তোমার খবর পেতেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, যাতে আমার ফিলিংস বুঝতে পারো, চিঠিগুলোর এমোশান দেখেই বুঝতে পারবে কত পুরোনো আনুগত্য আর ডিপরুটেড ফিলিংস।

              তোর চিঠি আমি এক -এক করে পড়া আরম্ভ করলাম, পড়তে-পড়তে তোর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বিব্রত বোধ করছিস, আবার আহ্লাদিতও হচ্ছিস, ঠোঁট বন্ধ রেখে গিগল করছিস।

##

 

ক্লাস টেন ( ২৫ ডিসেম্বর )

ডারলিং ড্যাড,

তুমি সান্টাক্লজের মোজায় লুকিয়ে চলে এসো, আমি স্লেজগাড়ি পাঠাচ্ছি। আমরা দুজনে শীতের এই ঠাণ্ডায় মোজার ভেতরে ঢুকে বেশ মজা করব। আমি তোমার পোশাক খুলে মোজার বাইরে ফেলে দেব আর বলব, ড্যাড, এই দ্যাখো, তোমার বুকে মিথ্যা কথা বলার জন্য লোহা গরম করে ডেভিল তোমায় নরকে পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তুমি কেমন লোক ড্যাড, আমার জন্যে তোমার একটুও মনকেমন করে না ? কেন তুমি লুকিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছ ? যদি নিয়ন্ত্রণ করছই, তাহলে আমার সামনে আসার তোমার সাহস নেই কেন ? আমি তোমাকে ভালোবাসি ড্যাড, তুমি মনে কোরো না যে তুমি দূর থেকে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চিরকাল আড়ালে থেকে যাবে। আমি তোমাকে একদিন নিশ্চিত খুঁজে বের করব। আর যেদিন তোমায় খুঁজে পাবো, সেদিন তোমায় আমি খুন করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব। ইয়েস, আই উইল কিল ইউ অ্যাণ্ড ইট ইউ। সামনে এসো, দেখা দাও, প্রক্সি দিও না। তুমি কি বুড়ো, ফোকলা দাঁতে হাসো, গুটকা খাও, ছাতা মাথায় অফিস যাও ? তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছ ? তোমার নাতি-নাতনি কয়টা ? যতই যাই হোক, তোমাকে আমি ছাড়ছি না, ছাতা উড়িয়ে তোমায় টেনে নিয়ে আসব ঝাঁঝা রোদ্দুরে, কাদা-জমা বৃষ্টিতে, মনে রেখো, হুশিয়ারি দিয়ে রাখছি। পুরাণের ঋষিমুনিরা তো বুড়ো হয়েও কত কি করতেন, যেখানে সেখানে সিমেন ফেলতেন, সেই সিমেন থেকে শিশুরা জন্মাত, যা ঋষিমুনিরা জানতেও পারতেন না। পুরাণ অনুযায়ী ওল্ড এজ ইজ নট এ ফ্যাক্টর ইন ইমমরাল লাভ অ্যান্ড ইনহিউম্যান ওয়ার। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা চিন্তা করেছ কখনও, কিংবা হেলেন অফ ট্রয়ের জন্য যুদ্ধ ? এপিকগুলোয় বুড়োরাই যুদ্ধ করেছে, চিরকাল। এপিক লেখা তাঁমাদি হয়ে গেলেই বা, আমি আর তুমি তো আছি, আমাদের এপিক প্রোপোরশানের সম্পর্ক তো আছে, ইন পারপেচুইটি ? আরেকটা কথা। তুমি গোপন থাকতে চাও কেন ? তোমার গোপন জীবন আমি একদিন ঘা মেরে আখরোটের মতন দুফাঁক করে দেবো। তবে গোপনীয়তা তোমাকে বেশ রহস্যময় করে তুলেছে ; তোমার কি মনে হয় না যে গোপনীয়তাও একরকমের ভার, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাকে রিলিজ করার পথ করে না দিলে উন্মাদ হয়ে যাবে? ইনসেস্টকে অস্বাভাবিক মনে কোরো না। তোমার সন্মোহনপ্রবৃত্তিকে এবার ক্ষান্ত দাও।

তোমার মেয়ে ও প্রেমিকা

নেতি ( দি আগলি নেম ইউ গেভ মি )

##

 

ক্লাস ইলেভন ( দুর্গাপুজো, বিজয়া দশমী )

ডিয়ার ড্যাড দি মহিষাসুর

আমার আগের বছরের চিঠি তুমি পাওনি বলেই মনে হচ্ছে, তুমি এই এক বছরে নিজেকে অসুর হিসাবে প্রমাণ করেছ ; বৈভবী আর আরিয়ানের জন্য কমদামের পোশাক , আর আমার জন্য দামি পোশাক। আমার তা একেবারে পছন্দ নয়। জানি তুমি পাঠাওনি,  আন্টিমা কিনেছেন, কিন্তু আন্টিমা এই কাজ করে ফাঁস করে দিলেন যে তুমি আছ কোথাও। এরকম করার উদ্দেশ্য ? তুমি কি আমাকে এনটাইস করার চেষ্টা করছ ? সিডিউস করতে চাইছ? করো, করো, যতো পারো করো। তুমি অমন না করলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি। আগের চিঠিতে লিখেছিলুম যে আমি তোমার প্রেমিকা। তুমি কি জানো প্রেমিকা কাকে বলে ? জীবনে কখনও প্রেম করেছ ? নাকি এরকম আড়ালে থেকেই মদনের শর চালিয়েছ। মদনের কথা কার কাছে জানলুম। আন্টিমায়ের কাছে। উনি পুরানের গল্প আমাকে শোনান যাতে আমি বাইবেলের কাহিনিতে নিজেকে গুলিয়ে না ফেলি। আমি কিন্তু মেরির চেয়ে বেশি ভার্জিন। তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাইনি, চাইবো না কোনোদিন, দেখে নিও। আগের চিঠিতে তোমার ফ্যামিলির কথা জানতে চেয়েছিলুম, বললে না তো কিছু, তুমি এরকম ভিতু কেন ? ফ্যামিলি থাকলেই বা, তুমি যদি কাউকে বিয়েও করে থাকো, তবু আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করব, আর প্রেম করার পর পুরুষ মাকড়সাকে যেমন প্রেমিকা মাকড়নি মেরে ফ্যালে, তেমন করে কুচিয়ে মেরে ফেলব। তোমাকে কিন্তু বলে রাখলুম, আমি সবকয়টা ঋতু তোমার কাছ থেকে চাই, শুধু বসন্তকাল নয়। তুমি আমার শরীরের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো, ও তোমাকে খাঁটি সত্য কথা বলবে ; আমার ঠোঁট, জিভ, মুখের ভিতরটা তোমার। চিঠি লিখো। লিখে না পাঠালেও আমি পেয়ে যাব। গুড নাইট ডিয়ার ব্রহ্মা, ইট ইজ পদ্মা হেয়ার ফ্রম হেভেন। তুমি আমার নাম নেতি কেন রেখেছ, আমি জানি। কারণ ইমমরাল প্রেমের মতন স্বর্গীয় সুষমা আর নেই ; প্রেমে ইমমরাল না হওয়া হল নৈতিক শূন্যতা, ব্যানালিটি। আমাদের বয়স প্রতি বছর বাড়ে কেন ? যাতে আমরা ক্রমশ ইমমরাল হতে পারি, প্রেমকে মেনে নিতে পারি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। তুমি আমার ইনটারভিউটা কি করে পড়লে। নিশ্চয়ই পড়েছ। ছুটিতে বাড়ি ফিরে দেখলুম, আঙ্কলবাপি দেখালেন, আমার আলমারিতে নতুন বই, বাংলা কবিতার, ইংরেজি কবিতার। ঘরে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি ঝুলছে। আন্টিমাকে জিগ্যেস করতে উনি বললেন, ফার্স্ট হয়েছি বলে গিফ্ট এসেছে। কার গিফ্ট, তা উনি জানেন না, যে পাঠিয়েছে সে ঠিকানা লেখেনি। তুমি কেমন পাগল গো ? ধ্যুৎ, এত এত বই আমি পড়তে পারব না, বড় হলে পড়ব। রিমাইন্ড করিয়ে দিই, ইনসেস্টকে অনৈতিক মনে কোরো না।

ফাক ইউ অ্যান্ড লাভ ইউ।

তোমার নেতি ( ইওর এলেকট্রা অফ দি ম্যাজিকাল এপিক )

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022-sep uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ৪

উ প ন্যা স । পর্ব ৪

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

জগদীশ আর অমরিন্দর প্রথমে গররাজি থাকলেও, নেতি, তোকে ওনারা ডানার আড়ালে নিয়েছিলেন, তা তুই স্বীকার করিস  কিনা জানি না।

    আমি ব্যানার্জির বলে-দেয়া অ্যাকাউন্টে প্রতিবছরের শুরুতে টাকা জমে করে দিয়েছি, আজও করি। ওরা যে অ্যামাউন্ট বলে, জমা করে দিই। বারবার নতুন অ্যাকাউন্ট খোলে, বড্ড মনে রাখার ঝামেলা। তুই অ্যাডাল্ট হলে তোর নামে খুলবে হয়ত, কিন্তু তখন তো তুই স্বাবলম্বী। আমাকে কি বিদায় করে দিবি স্বাবলম্বী হলে?

    এনজিওকে সাহায্যের রিবেট পায় আয়করে, তাই ব্যানার্জিও মেনে নিয়েছিল বন্দোবস্তটা।

    ব্যানার্জিকে স্হানীয় অভিভাবকই শুধু নয়, ওদের পদবীটাও আমি তোর নামে জুড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি তো ব্রাহ্মণ নই, জানি অব্রাহ্মণদের নিয়ে কেমন ঠেলাঠেলি চলে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে।

    আমার পদবি তো প্রধান, প্রভঞ্জন প্রধান। গুজরাতি, কর্নাটকি, মারাঠিদের মধ্যেও প্রধান পদবি আছে।

    আমি তোকে বাঙালি করে তুলতে চেয়েছি; তাতেও তোর চাপা অস্বস্তির কথা অমরিন্দর জানিয়েছিলেন একবার। তখনও পর্যন্ত তুই জানতিস না যে তোকে কলকাতা শহরের এক আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিল তোর মা। যখন জানলি তখন তোর গোঁসা গিয়ে পড়ল পশ্চিমবাংলার ওপর।

     বৈদেহী আর আরিয়ানের চরিত্রে, শুনেছি, বাঙালি হয়ে ওঠার গোঁ, সব দ্রুত সেরে ফেলতে হবে, শিখে ফেলতে হবে, ক্লাস ফাইভ থেকে, গান, নাচ, বইপড়া, শাড়ি, নলেন গুড়, ছানার মুড়কি, পলাশ ফুল, মাছরাঙা, শুঁটকি মাছ, রাধাবল্লভি, পান্তুয়া-লুচি, ভাপা ইলিশ, সরস্বতী পুজো, বলেছিল অমরিন্দর।

     পদবি ব্যাপারটা কত গুরুত্বপূর্ণ তা তোকে স্পনসর করতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম।

     আঁস্তাকুড় তো পদবি দিতে পারে না, নাম দিতে পারে না, জন্মদিনও দিতে পারে না।

 

                ব্যানার্জি, বন্দ্যোপাধ্যায়, চ্যাটার্জি, চট্টোপাধ্যায়, মুখার্জি, মুখোপাধ্যায়, গাঙ্গুলি, গঙ্গোপাধ্যায়।

                কারা তুলে নিয়ে যাবে পথপার্শে পড়ে থাকা কয়েকদিনের বাসি লাশ?

                মৃতদেহে পোকা? মৃতের দেহ থেকে তাহলে প্রাণও জন্মায়, অবাক অবাক হও।

                শ্মশানে কাদের হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে চলে যেতে চাও!

                শকুন, পদবি বলো, কাদের মাংসপিণ্ড অসীম আকাশে গিয়ে খাও।

 

       তুই বেশ পরে সুস্পষ্টভাবে জানতে পেরেছিলি, যে তোকে ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পেয়েছিল কলকাতার যাদবপুর থানার পুলিশ, ভোররাত থেকে যারা বাঁশদ্রোণী বাজারের সামনে বাঁধাকপির সবুজ পাহাড় গড়ে তোলে, একের পর এক দূরপাল্লার ট্রাক থেকে, তখনই ওরা তোর কান্না শুনতে পেয়েছিল।

      এত জায়গা থাকতে ডাস্টবিনেই কেন? তুই বার বার নিজেকে আর তোর অভিভাবকদের প্রশ্ন করেছিস, শুনেছি। তারাই বা এর উত্তর কী করে দেবে। হয়ত তোর মা চেয়েছিলেন যে তুই বেঁচে থাক, বাজারের সামনে ভোর রাত থেকেই সবজির ট্রাক আসে একের পর এক।

       তোর মায়ের হয়তো আশা ছিল যে ট্রাকচালদের কেউ যদি সন্তানহীন হয়, সে তোকে কোলে তুলে নেবে। নেয়নি রে, নেয়নি। ওরা কাছের ক্লাবের ছেলেদের খবর দিলে, তারা থানায়, আর থানা তুলে নিয়ে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে, নয়তো তুই সত্যিই মরে যেতিস।

       হাসপাতাল থেকে সমাজসেবীদের চ্যানেল হয়ে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড এনজিওতে পৌঁছোলি ; আরও বহু পরিত্যক্ত শিশুদের একজন।

       সংবাদপত্রে তোর ওই সময়ের যে ফোটো বেরিয়েছিল, তা আমার সংগ্রহে আছে ; হলুদ হয়ে গেছে, ভাঁজে-ভাঁজে ছিঁড়ে গেছে, কতোবার যে দেখেছি। তোর এখনকার মুখের সঙ্গে একেবারে মেলে না, ভাগ্যিস মেলে না।

       তোর চোখমুখ, এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড দপতরে, ওই বয়সেই এমন আকর্ষক মনে হয়েছিল যে চব্বিশটা শিশুর মধ্যে থেকে তোকেই স্পনসর করার জন্য বেছে নিয়েছিলাম আমি।

 

        বাঁশদ্রোণী বাজার  যে  কোথায় স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিচিত বাঙালি অফিসাররা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা যেতে পড়ে, বলেছিল কেউ। কলকাতায় গিয়ে, জিপিএস নিয়ে, পৌঁছেছিলাম। আঁস্তাকুড় বা ডাস্টবিন বলা উচিত হবে না; জায়গাটা আসলে ভ্যাট, সারাদিনের বাতিল পচাগলা শাক-সবজি আর মাছের আঁশ-পোঁটা ওখানে ফেলা হয়, হয়তো সবজির নরম সবুজ পাতার ওপরে শুয়েছিলি, হেমন্তের রাতে।

       বাজারের ভেতরে গিয়ে দীর্ঘদেহী কোনো বিক্রেতাকে দেখিনি, সবজিঅলারা অধিকাংশই মুসলমান,  চাষি পরিবারের।

       অন্য কোনো এলাকা থেকে তোকে এনে ওখানে ফেলে গিয়ে থাকবে তোর মা কিংবা বাবা, যাতে সহজে তাদের  খুঁজে পাওয়া না যায়।

       আঁস্তাকুড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই তুই বিব্রত হতিস, তোর মনে হতো সারা গায়ে নোংরা, কখনও উৎসাহ প্রকাশ করিসনি জায়গাটা দেখে আসার, শুনেছি। বরং বিরক্ত হতিস প্রসঙ্গটা উঠলে।

       জগদীশ বলেছিল আমাকে, ক্লাস সেভেন থেকে পড়াশুনার শেষ ধাপ পর্যন্ত তুই প্রতিবছরের ডায়রিতে একটা বাক্য অবশ্যই লিখেছিস, “আই নো সামবডি ওনস মি, বাট হি ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।” তোর সেই সব ডায়রির ওই পাতাটা ছিঁড়ে আমাকে দিয়েছে অমরিন্দর।  

       শেষে, বাঁশদ্রোণী বাজার তুই গেলি দেখতে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে।  যৌবনের শীর্ষে তখন তুই, আঁস্তাকুড়ের কথা শুনলেই যার সারা গায়ে র‌্যাশ বেরোতো ? শুনেছি,  অমরিন্দরের মুখে।

  

দুই

    ইলেকট্রিক ? এরকম নাম হয় নাকি !

    তাই তো বললেন।

     অনুমান করিনি তুই কখনও আমার শান্তি ইনভেড করবি, এইভাবে, হাতে লাল সুটকেস, কাঁধে হলুদ ব্যাগ, ফেডেড জিন্স, লাল ঢিলেঢালা টপ কিংবা জার্সি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি মনে হল, তার ওপর শাদা ব্লেজার, পায়ে সাতরঙা ফ্ল্যাপার, ডান হাতে গোটা পাঁচেক স্লোগানচুড়ি, কানে চুড়ির মাপের লাল রঙের মাকড়ি, হাতের আর পায়ের নখে ব্রাউন-লাল নখপালিশ, হাতের নখ ততো বড়ো নয়, পোশাক অত্যন্ত দামি, আঁচ করতে পেরেছিলাম, ঘাড় পর্যন্ত কোঁকড়া চুল। অথই আলগা চটক, অথই।

     দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি ; সন্মোহনকে অনুবাদ করা নির্বাক দৃষ্টি; আজ দশটা বেজে তিন মিনিটে সময় কিছুক্ষণের জন্য স্হির, অবিচল, পৃথিবী শুরু হল, রাতে  ঘুমিয়েছিলাম কিনা মনে করতে পারছি না, ধুনুরিরা কি আমাকে পিটিয়ে মেঘ করে উড়িয়ে দিয়েছে !

      তুই ছাড়া আর কে-ই বা এভাবে শান্তিভঙ্গ করতে চলে আসবে নিজের বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ?

      দুই হাতে মেহেন্দির নকশা !

      মেহেন্দি ? কেন ? প্রশ্নের উদ্বেগে আক্রান্ত হল মস্তিষ্ক ; মরুভূমির বালিতে মাকড়সাপায়ে আঁকা মানচিত্র।

      তুই তো চাকরি নিয়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলি, নিঃশব্দে নিজেকে বললাম, নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম শুনে, যাক, সেটল হলি, আমার মিশন সাকসেসফুল, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, তোকে দেখতে দেখতে, তোকে দেখে যে চিনতে পারিনি তা বলব না, চিনতে পারার আক্রমণে বিপর্যস্ত, সেই ক্লাস টুয়েলভের পর তোর ফোটো দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু ঝলকানি, ঝলকানি, ঝলকানি।

       কেবল স্বপ্নে যেটুকু আবছা ঢেউ।

       আমার সমান ঢ্যাঙা হয়ে উঠেছিস।

       আমি স্তব্ধ হতবাক থ দেখে তুই বলে উঠলি, ঠিকই বলেছে তোমার পিওন না অর্ডারলি, হোয়াটএভার, আমি এলেকট্রা, মহাকাব্যের নায়িকা, কবিকল্পনার মেয়ে।

       মগজের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটল, এলেকট্রা, কবিকল্পনার নায়িকা, অপার্থিব, রহস্যময় ?

       একটা শব্দের ভেতরে কতটা বারুদ যে লুকিয়ে থাকতে পারে তা আমিই জানি। নিজেকে বললাম, হ্যাঁ, স্বপ্নের ভেতরে তোকে, যার পালক পিতা আমি, যাকে তুই বলেছিস ফাউনডিং ফাদার, পেয়েছি, এলকট্রার মতনই নিষিদ্ধ সম্পর্ক পাতিয়েছি।

               সেই সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা দিতে এলি নাকি, মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না, গলা শুকিয়ে গেছে।

 

      আমার চাঞ্চল্য গোপন করতে গিয়ে প্রবল আবেগে আপ্লুত হলাম, টের পাচ্ছিলাম যে প্রতিক্রয়ার বিস্ফোরণ ঘটছে নিঃশব্দে, তোকে ঘিরে তেজোময়তার দুর্নিবার জ্যোতি, তুই এই মুহূর্তে যদি না আসতিস তাহলে আমি পচনে ধ্বসে পড়তাম – এরকম মনে হল, বাসনার , চকিত দ্যুতি দিয়ে আমাকে নতুন দৃষ্টি দিলি তুই, এতদিন পর্যন্ত আমি বন্দি ছিলাম ফালতু জাগতিক জীবনে, তুই মুক্ত করে ছড়িয়ে দিলি মঙ্গলময় লিবিডোর গোপন রঙ্গ। উচ্ছ্বাস।

      এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

      যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

       ইতি, তুমি, আমার মুখ দিয়ে এইটুকই বিস্ময় ক্ষরিত হয়েছিল, সন্তর্পনে, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসে।

       কান থেকে ইয়ার-প্লাগ বের করে বললি, ইতি, এখন ইতি, নেতি নাম রেখেছিলে তো ! নেটি, বাঃ, কি একখানা নাম রেখেছিলে ! আশ্চর্য লাগছে না? কী করে তোমায় খুঁজে বের করলুম ? এনিওয়ে, আজ তো রবিবার, তোমার কর্মীদের দিয়ে আজও খাটাচ্ছো? ওদের তো পরিবার পরিজন আছে। টেল দেম টু গো হোম।

      বোধহয় বাবলগাম খাচ্ছিস, কথাগুলো চিবিয়ে বললি, চিবিয়ে বলা সংলাপে থাকে বেপরোয়াভাব, জানি। ইয়ার-প্লাগ  জিন্সের সামনের পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে-রাখতে বললি, তোমাদের ঈশ্বরগুলো সব কালা হয়ে গেছে, কেউ তাকে ছাদে দাঁড়িয়ে লাউডস্পিকারে ডাকছে, কেউ আবার দল বেঁধে জগঝম্প বাজিয়ে ডাকছে, ডিসগাস্টিং টোটালিটেরিয়ানিজম। ঈশ্বরগুলোও আমার মতো সকাল থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়ে থাকবে জগঝম্পের ঝালাপালায়।

      অ্যাটিট্যুড, অ্যাটিট্যুড, আই অ্যাম কুল, আই অ্যাম গার্লি, আই অ্যাম ফেমিনিন, অ্যাটিট্যুড। তোর দিকে, চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এক পলক তাকিয়ে, নিজেকে নিঃশব্দে বললাম আমি।

      আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে, স্লোগানচুড়ির ঝিনঝিন বাজিয়ে, নিজেই হুকুম দিলি, আপ লোগ ঘর যাইয়ে, আজ কিঁউ কাম কর রহেঁ হ্যাঁয়? ছুট্টি হ্যায় না আজ।

      সেকশান অফিসার পেনডিং ফাইলগুলো দিতে, আর রাতে যেগুলো ক্লিয়ার করে দিয়েছি সেগুলো নিতে এসেছিল। পিওন রবিন্দর সিং ওর সঙ্গে। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করছে দেখে তুই বললি, হাঁ, হাঁ, যাইয়ে, ঘর যাইয়ে, ম্যাঁয় ইনকি রিশতেদার হুঁ, বিদেশ সে আয়া হুঁ বহুত দিনোঁ বাদ।

     আমি তো জাস্ট বোবা, মাথা নাড়িয়ে, ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে, বললুম, করিম সাহব, যাইয়ে, ফাইলোঁ কো লে যাইয়ে, কল অফিস যাকর হি দেখুংগা।

      হুকুম করার কন্ঠস্বরে তুই বললি, চাপরাশি কুক আর কে কে আছে, সবাইকে যেতে বলো, আমি রাঁধতে পারি, ইনডিয়ান, ওয়েস্টার্ন, চাইনিজ, থাই, মেক্সিকান, টার্কিশ, যা খেতে চাও। টেল অল অফ দেম টু গো ; আমি চাই না যে তোমার কোনো কর্মচারী আজ বাড়িতে থাকে।

      চাপরাশি নানকু প্রসাদ তোর সুটকেসটা তুলে আমাকে জিগ্যেস করল, গেস্ট রুমমেঁ রখ দুঁ ?

        তুই তাকে বললি, আপকো কুছ করনে কি জরুরত নহিঁ হ্যায়, আপ ভি ঘর যাইয়ে, রসোই বনানেওয়ালে অওর মালি কো ভি বোলিয়ে আজ সবকি ছুট্টি।

        তোর হুকুমে সন্মতি দিলাম, চলে গেল ওরা।

        ফেনিল কথার ঢেউ, আলোকোজ্জ্বল চাউনি, উসকে-দেয়া রক্তসঞ্চালন।

        চৌম্বকীয় আঠা, আকস্মিকতার টান, অমেয় চিরন্তন।

       ইলেকট্রিসিটি নয়, আমি এলেকট্রা। জানো তো এপিকের নায়িকা এলেকট্রা ? গ্রিক মহাকাব্যের এলেকট্রা ? এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা। আমি সেই এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা, মহাকবির কল্পনা দিয়ে গড়া। তুমি তো ইংরেজি সাহিত্যে ফার্স্টক্লাস পেয়েছিলে !

      আমি চুপ করে আছি, দেখছি তোকে, অবাক, কুয়াশা, অঝোর বৃষ্টি, বাতাসে শিউলিফুলের গন্ধ বলে চলেছে উৎকীর্ণ করো, শিহরিত করো, উষ্ণ করো।

       ভাবছি, তুই কি করে এলেকট্রার গল্প জানলি, তুই তো ম্যাথামেটিক্স, ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির বইপোকা ছিলিস, ইলেকট্রনিক্স পড়েছিস। আমি যেসব বইপত্র তোর নামে জগদীশের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম, তাতে কি এলেকট্রা প্রসঙ্গ ছিল, মনে পড়ছে না, উঁহু, মনে পড়ছে না। থেকে থাকবে, বইগুলো বাছাই করত পড়ুয়া জুনিয়ার অফিসাররা, আমি পেমেন্ট করে দিতাম।

       ভাবছ কী করে তোমাকে লোকেট করলুম, তাই না? না, বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, বা আন্টিমা বলেননি, ওনাদের কাছে জানতে চাইনি কখনও; জানতে চাইলে ওনারা তোমাকে নোটিফাই করে দিতেন, আর তুমি তোমার পায়ের ছাপ মুছে ফেলার চেষ্টা করতে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_aug uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ৩

উ প ন্যা স । পর্ব ৩

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

        পূর্বপুরুষ না থাকলেও উত্তরাধিকার বর্তায়, পাখিরা ওড়ে তবু কিন্তু হাওয়ায় দাগ পড়ে না।

        মাঘ মাস আসতে না আসতেই পাতারা সবুজ রঙ খরচ করে ফ্যালে। ধুলো, ধুলো, ধুলো।

        মুখমেহনের স্বাদ, উল্লাসধ্বনি, স্ফীতির কনকনে চড়াই-উৎরাই, কেবল ঘণ্টাখানেকের উগ্রতা।

        তোর মতো তোর মতো তোর মতো অনুচক্রিকা, ভাবতে পারিনি আমিই ঘুটি, আমিই জুয়া।

 

জগদীশ আর ওর বউ একবার দুজনে এসেছিল লাক্ষাদ্বীপে, কাভারাত্তিতে, আমার কাছে, তোরা দুজনে নৈনিতালে আর আরিয়ান আজমেরের হোস্টেলে। বৈদেহী ক্লাস টুয়েলভে, পরীক্ষায় টেন্সড আপ।

অমরিন্দর কয়েক পেগ টানার পর রোজই সন্ধ্যায় বলত, প্রধান ইউ হ্যাভ স্পয়েল্ড ইওর লাইফ, জীবন নষ্ট করে ফেললে, এখনও চান্স আছে, লাইফ পার্টনার যোগাড় করে নাও, নয়তো চুল পেকে গেলে ভিষণ লোনলি ফিল করবে।

বিয়ে করার জন্য আমাকে চাপ দেবার পেছনে যে অন্য উদ্দেশ্য আছে, তা তখন বুঝতে পারিনি।

লোনলি ? একা ? নিঃসঙ্গ ? নাঃ, মনে হয়নি কখনও যে আমি একা। এইজন্য নয় যে তুই আছিস আমার জীবনে, আমি তোর পালক পিতা, তোর কথায় ফাউনডিং ফাদার, আসলে আমার চরিত্রে একাকীত্বের বিষ নেই রে, একেবারেই নেই। ফাইল খুললেই মানুষের ভিড় দেখতে পাই, তারা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে।

 

পালক পিতা বলতে পারব কি নিজেকে, ধাত্রীবাবা?

একরাতের ঘটনা বলি তোকে ; তখন আমি পুডুচেরিতে। তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে অব্দি পরাভূত টান অনুভব করেছি। কার্ডটা পাবার পর কতবার যে দেখেছি ফোটোটা। আর তার ফলে কী হল জানিস ? স্বপ্ন দেখলুম তোকে, স্বপ্নে পেলুম তোকে, ভরাট শরীর, আর আমার, বহুদিন পর, এই বয়সে, ভেবে দ্যাখ, এই বয়সে আমার নাইটফল হল।

উড়তে লাগলাম, ঝড়ের চক্রব্যুহে থেকে অতিঝড়ের চক্রব্যুহে, বাজপাখি হয়ে, ঈগল হয়ে, নখের রক্ত চাটছি, নিচে চোখ মেলে দেখছি উপত্যকায় তুই দৌড়োচ্ছিস দু-হাত দুই দিকে মেলে, পোশাক পরিসনি, নামছি, নামছি, নামছি, ব্যাস, ছোঁ মেরে তুলে নিলাম তোকে ; কিন্তু তুই-ই আমাকে খেতে লাগলি, বললি, বদলা, বদলা, প্রতিশোধ, কারাগারে আটক রাখার প্রতিশোধ।

তোর কনকনে দেহ, বললি, আগুনের ফোয়ারা দিন, বরফকে গলিয়ে ফেলুন, গলিয়ে ফেলুন, দ্রুত নয়, দ্রুত নয়, এক ঘণ্টা মানে ষাট মিনিট, প্রচুর সময় রয়েছে, অন্ধকারকে রোমশ হতে দিন, হাতের আঙুলের ডগায় দৃষ্টি নিয়ে যান, প্রচুর সময় আছে, সময়ই সময়।

 

ঘরের ভেতরে ঢুকে ঝোড়ো ঝড় যদি নিজের হাতে চুপিচুপি দরোজা বন্ধ করে দ্যায়, অন্ধকার পোড়োবাড়িতে আটক প্রতিধ্বনির ঢঙে, যেন গর্তের হৃদয়ে ইঁদুরের ধান জমা করার রাত।

 

বলা যাবে কি জীবন নষ্ট ?

স্বপ্নে তুই যবে থেকে আসা আরম্ভ করেছিস, তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোগুলো আর দেখি না। তোকে স্বপ্ন থেকে চলে যেতেও বলেছি একদিন স্বপ্নের ভেতরেই, তুই-ই আষ্টেপৃষ্টে শরীরের ফেরোমোন দিয়ে জড়িয়ে ধরলি, আমি ছাড়াতে পারলাম না, সারা স্বপ্ন ছেয়ে গিয়েছিল তোর উড়ালক্লান্ত সুগন্ধে।

আসলে নষ্টামির স্বপ্ন দেখি ; ভালো লাগতে আরম্ভ করেছে রে, স্বপ্ন, উঞ্ছমজুরিতে-পাওয়া সম্রাজ্ঞীর প্রেরণার অপ্রত্যাশিত আক্রমণে কাহিল। এছাড়া অন্য উপায় আমার জানা নাই, আয়ত্বে নেই।

আহ, কি আরাম, কি আরাম, কি আরাম।

 

জীবন নষ্ট কাকে বলে ? জগদীশের ছোটোবোন চিন্ময়ীর বর অর্নব চ্যাটার্জি প্যাংক্রিয়াটিক ক্যানসারে মারা গেল, যেদিন চিন্ময়ীর শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজ, সেই দিনকেই। রান্নাবান্নাও আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজের জন্য। অতিথিরাও বাইরে থেকে এসে পড়েছিল অনেকে। আমিও গিয়েছিলাম জগদীশের সঙ্গে। শ্মশান থেকে যখন আমরা ফিরে এলাম, চিন্ময়ী কান্না থামিয়ে বলেছিল, কী পেলুম সারা জীবন ? আইবুড়ো নাম ঘোচাবার জন্যে একটা বর, আর বাঁজা নাম ঘোচাবার জন্যে দুটো বাচ্চা, সারাজীবন তো ও নিচের তলায় মায়ের সেবা করায় ম্যা ম্যা ম্যা ম্যা করে কাটিয়ে পাড়ি মারল ; এত বড় বাড়িটার কী হবে এখন, বাগানের, গাছগুলোর, গাছের ফলের, ফুলের ? ছেলে আর মেয়ে বিদেশেই থাকবে। আমি দোতলায় শুচ্ছি দ্বিতীয় বাচ্চাটা হবার পর থেকে। আমি যে পৃথিবীতে আছি তা ওর খেয়াল ছিল না কখনও। বিধবা শাশুড়ির জন্যে চারবেলা টাটকা নিরামিষ রেঁধে কেটে গেল; তিনি চলে গেলেন, ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন, সগগে গিয়ে স্যাবা নেবার জন্য।

কী বলবি তুই?

 

আমি তো উচ্চিংড়ের স্বরলিপিতে গাওয়া ফুসফাসুরে গান ; বেড়াজালের হাজার যোনি মেলে ধরে রেখেছি ইলশে ঝাঁকের বর্ণালী। তাকিয়ে-তাকিয়ে যে যুবতীর কৌমার্য নষ্ট করেছি, তারই অদৃশ্য হাতের মাংসল আলিঙ্গনে চোখে পড়েছে কাঁকড়ার আলোতরল বুকে আমার ছককাটা ঠিকুজি, শনি বক্রি, কালসর্পযোগ, কপালের বলিরেখায় গৃহত্যাগী বিষপিঁপড়ের সার। সে যুবতী স্বপ্ন ছেড়ে যেতে চায় না।

 

জগদীশ ব্যানার্জিকে বলেছিলাম তোর নামটা স্কুলেই সংশোধন করে এফিডেভিট আর গেজেট নোটিফিকাশান দিয়ে নেতি থেকে ইতি করিয়ে নিতে। জগদীশের স্ত্রী অমি, রাজি হয়নি, বেশ হ্যাঙ্গাম বলে নয়, স্পনসর যে করেছে তাকেই করতে হতো, আর আমি চাইছিলাম না যে তুই কখনও আমার উপস্হিতি তোর জীবনে টের পাস। আমার সাহায্যের ভারে ঝুঁকে পড়িস।

জগদীশের মেয়ে আর ছেলেও মত দিয়েছিল, নেতি নতুন ধরণের নাম, বদলাবার কোনোই প্রয়োজন নেই। তেইশ বছর বয়সে নিজেকে পালক পিতা, ফসটার ফাদার, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি, জাস্ট ইডিয়টিক, ভাবতেই পারিনি আমি একজন মুকুটপরা বাবা, তোর কুড়িয়ে পাওয়া বাবা। ফসটার মাদারদের বলে ধাই-মা; আমি তার মানে তোর ধাই-বাবা।

আমার মা যখন হাসপাতালের বিছানায়, তখন তাঁকে বলেছিলাম যে আমি বিয়ে এইজন্যই করিনি, কেননা আমি একটি শিশুর পালক পিতা। সংবাদপত্রের কাটিংটা দেখিয়েছিলাম মাকে, একজন নার্সের কোলে তুই, সদ্য আঁস্তাকুড় থেকে থানা হয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিস।

নিয়ে আয় না, যাবার আগে চাক্ষুষ করে যাই, মার নাক থেকে কেরালিয় নার্স ভেন্টিলেটার সরিয়ে দিতে, বলেছিলেন।

আমি ওকে জানতে দিতে চাই না মা, যে আমি ওর জীবনে ঈগলপাখির মতন ডানা মেলে আছি; জগদীশ আর ওর বউ অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছে।

         সত্তা, মুহূর্ত, ভাষা, বীর্য, স্পন্দন, উৎসমুখ, কচুর জঙ্গলে ফড়িং, কলার মান্দাস, কাপড়ের খুঁট।

         বরফঝুরির গ্রন্হি শুভ্রবিষ অনন্ত শিকড়ে। কাদায় কলকা এঁকে রেখে গেছে কীট।

         কাঠঠোকরার বাসার ফুটোয় সাইক্লোনের মতন ফুঁ দিয়ে বাজানো বাঁশির সুর। বাজাও হে বাজাও

         বুদবুদেরা জাতিস্মর হয়, তা এক মাদারির ইন্দ্রজাল।

 

        এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

        যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

 

ব্যানার্জি পরিবারকে তোর স্হানীয় অভিভাবক করতেও চাপ দিতে হয়েছিল। ওরা প্রথমে রাজি হয়নি। অযথা ঢুকতে চাইছিল না আমার আর তোর জীবনের আগাম জটিলতায়। ব্যানার্জি যখন হরিয়ানায় হিসারের এসডিও ছিল তখন আমিই ওকে বাঁচিয়েছিলা জাঠদের গোঁসা থেকে।

ব্যানার্জি কীই বা করত! মারোয়াড়ি আর গুজরাতিদের ছেড়ে দেয়া ধর্মের ষাঁড়গুলো হেলতে দুলতে হরিয়ানায় পৌঁছে মাদি মোষদের সঙ্গে সঙ্গম করছিল আর মোষগুলোর কিছুদিনেই গর্ভপাত হচ্ছিল, শরীর খারাপ হচ্ছিল, দুধের ঋতু হাতছাড়া হচ্ছিল। ষেঁড়োমোষগুলোকে ওরা বেঁধে রাখে, প্রজননের ঋতুতে মাদিমোষদের চাষিরা নিয়ে যায় ষেঁড়োমোষদের মালিকের গোয়ালে; মালিকদেরও রোজগার হয়।

জাঠ পঞ্চায়েতের কর্তা জগদীশকে টিটকিরি মেরে বলেছিল, বাঙালি ষাঁড় চাপছে হরিয়ানার মাদিমোষের ওপর, সে আর কি করে বুঝবে যে গোরু আর মোষ একই প্রজাতির প্রাণী নয়।

ষাঁড়গুলো গরু খুঁজে পায় না হরিয়ানার পথে আর খেতে। তারা তাড়নায় এলে সামনে মাদিমোষ পেয়ে তাদের ওপরই চাপে।

আমি হিসারের জাঠসভার কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের বাজেট থেকে লোকসানের টাকার সরকারি ব্যবস্হা করে মন্ত্রীর রোষ থেকে বাঁচিয়েছিলুম ব্যানার্জিকে। তখন আমি ওই বিভাগে।

        পৌরুষের গরিমা, মৌমাছিদের প্রত্যাখ্যাত ফুলের মধু।

        অন্ধকারে স্পর্শের মর্মার্থের সাথে আলোয় স্পর্শের মর্মার্থের প্রভেদ,

        সব দেশের সন্ধ্যায় শঙ্খ বাজে না।

 

পশ্চিমবঙ্গের ক্যাডারের জগদীশ হারিয়ানাতে পোস্টিং নিয়েছিল। না, অমরিন্দরকে হাসিখুশি রাখার জন্য নয়; নয়তো সরকারি আধিকারিকদের তো শাসকদলের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ আর না-তে না মেলানো ছাড়া কোনো কাজ নেই, পুঁজিবাদ হোক, সাম্যবাদ হোক, গান্ধিবাদ হোক, খিচুড়িবাদ হোক, হিন্দুবাদ হোক, মুসলমানবাদ হোক, গণতন্ত্র হোক, আমিরতন্ত্র হোক, একনায়কতন্ত্র হোক, দেশে-দেশে তা-ই তো ঘটে চলেছে।

না, না, বউয়ের জন্য নয়, হরিয়াণায় উপরি রোজগার করাকে সমাজ স্বাভাবিক মনে করে, তাই। পশ্চিমবাংলায় ঘুষও খায় আবার সৎসন্ন্যাসী সেজে থাকে, প্যাঁচ-পয়জার মারতে হয়, বুঝিয়েছিল জগদীশ, অমরিন্দরের সামনেই, ওদের অ্যানিভার্সারির ককটেল পার্টিতে, হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে, চণ্ডীগড়ে। পশ্চিমবাংলায় ঘুষের গুড় খেয়ে ফ্যালে নেতারা। ব্যুরোক্র্যাটদের তোল্লাই দেয় না। হরিয়াণায় খাও আওর খিলাও, পেয়ারে, মজাদার চানা জোরগরম।

পশ্চিমবাংলাকে জগদীশ বলে ওয়েএএএএস্ট বেঙ্গল, বামপন্হীরা সুযোগ ওয়েএএএস্ট করেছে, তারপর যারা এলো তারা ওয়েএএএস্টকে সুযোগ দিয়েছে, যারা জঙ্গলে লুকিয়ে বিপ্লব করছে তারা নিজেদের জীবন ওয়েএএএস্ট করছে। কোথায় খাবে, খাওয়াবে, তা নয়, কেবল বাকতাল্লা। জগদীশের ওয়েস্টলাইন পাছার দ্বিগুণ হতে চলল।

প্রেগনেন্ট বলে অমরিন্দর তিন পেগ মাত্র সিঙ্গল মল্ট খেয়েছিল, ঘুষের। জাঠনি, মাতাল হয় না, মাতন লাগে।

আমি বাড়ির বাইরে ড্রিংক করতে পারি না, যুৎসই মনে হয় না, নিজেকে অগোছালো না করে, লুঙ্গি পরে, ঠ্যাঙ ছড়িয়ে, একা-একা, চুপচাপ, বসে ড্রিংক করি।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_june uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ২

উ প ন্যা স । পর্ব ২

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

(গত সংখ্যার পর)

নৈনিতাল তোর পছন্দ হল। কত সুন্দর না? জায়গাটা? বিশেষ করে শীতের সময়ে, তুষার দেখতে দেখতে তোর স্কুল ছুটি। বৈদেহীরও প্রিয় ছিল স্কুল আর শহরটা, শুনেছি।

সতীর নয়ন পড়েছিল বলে নৈনিতাল, শুনেছি।

সতীর চোখ, ভেবেছিস কখনও!

অমরিন্দরের মতে সতীর মতন চোখ কোনো মহিলা পেতে পারে না; ওই তিনটে চোখই তৈরি হয়েছিল।

আইডেনটিটিকার্ডে তোর ফোটো, আইগ্লাস দিয়ে এনলার্জ করে দেখে,  অনুমান করতে পারি,  চোখ দুটো কত সুন্দর, যতো তোর বয়স বেড়েছে, ঠিক জানি,  তত সুন্দর হয়েছে তোর চোখ, কালো গভীর আর বেশ বড়ো, যেমন বাঙালি মেয়েদের হয়। কাঁদলে কেমন হয় তোর চোখজোড়া? হাসলে কেমন হয়? কারোর সঙ্গে ঝগড়া করলে কেমন হয়? তোর এখনকার জীবন্ত চাউনিগুলো দেখার বড়ো ইচ্ছা হয় রে।

কবে দেখলাম তোর চোখ ? দেখেছি বৈকি। চোখ বুজলেই দেখতে পাই আর ভাবি কত ভুল যে করেছিল তোর মা তোকে ডাস্টবিনে  ফেলে দিয়ে। আমার মনে হয় দূর থেকে লক্ষ্য রেখেছিল, তোকে কেউ তুলে নিয়ে যাচ্ছে কিনা দেখার জন্য ; তখনই তোর চোখের টান এড়ানো ছিল অসম্ভব।

আমি তোর চোখের টানেই সন্মোহিত হয়েছিলাম। তোর গন্ধে। কেন বল তো ? কারণ তোর গন্ধ অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিল, তুই তোর মায়ের দুধ খাসনি, বোতলের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছিস।

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

বড়ো হয়ে উঠলি, বড়ো হয়ে উঠলি, অমাবস্যাকে একরাতে পরিযায়ী করে চলে যাবি বলে !

 

তোর ক্লাস সেভেনের ডায়রিতে, হস্টেলের ওয়ার্ডেন দেখেছিলেন, একটা পৃষ্ঠায় তুই লিখে রেখেছিস, লাল ডটপেন দিয়ে, “আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।” পৃষ্ঠাখানা ছিঁড়ে অমরিন্দরেকে দিয়েছিলেন ওয়ার্ডেন, এই ভেবে যে তুই কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম করছিস।

ওই স্কুলে ছেলেরা পড়ে না, কি করেই বা কোনো ছেলের সঙ্গে তোর যোগাযোগ হবে, তা নিজেও চিন্তা করেছিলেন ওয়ার্ডেন।

জগদীশ বুঝিয়েছিল অমরিন্দরকে, না, না, ও জেনে ফেলেছে, যে ওর পড়াশুনা থাকা খাওয়া পোশাক আর জীবনে যা প্রয়োজন তা কেউ একজন অলক্ষ্যে যুগিয়ে যাচ্ছে, আর তার জন্য তুমিই দায়ি অমরিন্দর, আমাদের ছেলে আর মেয়ের চেয়ে দামি জুতো জামা উপহার ইত্যাদি কিনে  ওর মনে সন্দেহ তৈরি করে দিয়েছ। ও ভাবে, ওকে কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দেয়া হচ্ছে।

মেয়ে বৈদেহী আর ছেলে আরিয়ানও প্রশ্ন তোলে, কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট। শুনেছি।

অমরিন্দর উত্তরে বলেছিল, আর ব্রো-প্রো যে অন্যদের দিয়ে নেতিকে বাংলা-ইংরেজি বই পাঠায়, প্রতি বছর দূর্গাপুজোয় দামি টোম্যাটোরেড পোশাক পাঠায়, তার বেলা ?

যাতে ওর জ্ঞান বাড়ে, কালচার্ড হয়, সেজন্য পাঠায় ; ব্রো-প্রোর মগজে আঁস্তাকুড়ের ভয় কি আর নেই !

তা বইগুলো বৈদেহী আর আরিয়ানই বেশি পড়ে, নেতি স্কুল থেকে ছুটিতে এলেও ম্যাথস ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতেই বসবাস। বৈদেহী বইগুলো পেয়ে সাহিত্যের পোকা হয়ে গেছে ; বাংলা সিডি এনে গান শোনে। শুনেছি।

আমি চেয়েছিলুম তোকে সবচেয়ে ভালো পোশাক আর জুতো কিনে দেয়া হোক ; বই কিনে দেয়া হোক। কিন্তু কি করেই বা তুই জানলি, বিশ্বাস করলি ? বিশ্বাস আর সন্দেহ  তো একই ব্যাপার নয়। জানিস তো, মানুষের সন্দেহ হল বিশ্বাসঘাতক প্রক্রিয়া, কিন্তু নিজের ভেতরের আলো-অন্ধকার খুঁজে পেতে হলে সন্দেহ ছাড়া উপায় নেই, না রে ?

তোর কি মনে হয় না যে বিশ্বাস ব্যাপারটা জঘন্য, দূষিত, মন্দ ? বিশ্বাসের বিপরীত হল সন্দেহ, কিন্তু তা যদি বিশ্বাসের উপাদান হয়, তাহলে কি করবি ? তোর মাথায় নিশ্চয়ই এই দোনামনা দোল খেয়েছে, টিং টুং টিং টুং, জানি আমি, ফর শিওর।

পথপ্রদর্শকের হাত ধরে প্রতিবিম্ব পালটে যায়, পাহাড় ফাটিয়ে বের করে আনে প্রতিধ্বনি।

রোদে নিকানো আকাশে তখন ঝুলে থাকে পরিযায়ী পাখির একাকীত্ব।

রোদ্দুর উত্তরায়ন মেনে চললে কী-ই বা করার ! অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো।

সেভেনথ স্ট্যাণ্ডার্ড থেকে তোর প্রতিটি ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ড রেখেছি যত্নে, চণ্ডীগড় থেকে ডাকে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল তোর অভিভাবক পরিবার , যখন তোর বারো ক্লাস শেষ হল, আমি তখন সিলভাসাতে পোস্টেড।  তুই কি টের পাসনি  যে কোথায় গেল স্কুলের আইডেনটিটিকার্ডগুলো ? ওগুলো দেখি মাঝেসাজে, কেমন একটু একটু করে ডাগর হয়ে উঠেছিস; ফিচার্স স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জগদীশের বাড়িতে আছিস বলে তোকেও নাকি বৈদেহী আর অমরিন্দরের  মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে, শুনেছি।

জাঠনি ! ভাবা যায় !

তুই তো বাঙালি ; মোষের দুধ হজম করতে পারিস তো ?

আশ্চর্য না ? তুই কলকাতার আঁস্তাকুড় থেকে এসে যাদের বাড়ির সদস্য হলি, তাদের মা-মেয়ের মতনই দেখতে হয়ে গেলি ক্রমশ, বারো ক্লাস পর্যন্ত তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে তেমনটা অনুমান করতে ভালো লাগে।

তুই কি  ঢ্যাঙা হয়েছিস,  তোর পাদুটো লম্বা হয়ে চলেছে নাকি, বৈদেহী-আরিয়ানের মতন, জাঠদের মতন?  নাচ শিখতে পারতিস, তা নাচ তোর প্রায়রিটিতে নেই, শুনেছি।

ক্লাস টেনে যখন ফার্স্ট হলি, সিস্টার অ্যানি তোর সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপিয়েছিলেন স্কুল ম্যাগাজিনে, তার কপি আছে আমার কাছে, পড়ে পড়ে মুখস্হ হয়ে গেছে প্রশ্ন আর উত্তরগুলো ; শুনবি ?

তুই তো এখন আমেরিকায়, চাকরি করিস, শুনেছি গাড়িতে অফিস যাস, তবু শোন, তোরই ইনটারভিউ।

সিসটার অ্যানি: তোমার নাম নেটি, এর অর্থ কী ?

তুই: নেটি মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল, শর্টে নেটি রেখেছিলেন আমার ফসটার ফাদার। বাংলায় নেতি।

সিসটার অ্যানি: তুমি বড়ো হয়ে কী হতে চাও ?

তুই: আমি অ্যাস্ট্রনট হতে চাই, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাই। চাঁদের মাটিতে, মঙ্গলগ্রহের মাটিতে হাঁটতে চাই।

সিসটার অ্যানি: কেন ? তোমার সহপাঠিরা বেশির ভাগই ডাক্তার হতে চাইছে, বা কমার্স পড়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে চাইছে, পলিটিশিয়ান, উকিল, বিজনেসউওম্যান হতে চাইছে।

তুই: জানি। আমার ম্যাথেম্যাটিক্স খুব ভালো লাগে, ফিজিক্স ভালো লাগে; সীমাহীনতার বিস্ময় আমাকে মোটিভেট করে। আমি আইআইটিতে কমপিট করতে চাই।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রিয় ফিল্ম নায়ক কে ?

তুই: ব্র্যাড পিট।

সিসটার অ্যানি: কেন ? দেখতে অ্যাট্রাকটিভ বলে ?

তুই: শুধু তাই নয়, উনি আর অ্যানজেলিনা জোলি বেশ কয়েকজন শিশুকে অ্যাডপ্ট করেছেন। একিলিসের ভূমিকায় মানিয়েছিল ওনাকে।

সিসটার অ্যানি : তুমিও বড়ো হয়ে কোনো শিশুকে অ্যাডপ্ট করার কথা ভাবো কি ?

তুই: হ্যাঁ, আমি বিয়ে করব না। কয়েকটি শিশুকে অ্যাডপ্ট করব।

সিসটার অ্যানি: যদি কাউকে তুমি ভালোবেসে ফ্যালো ? কিরকম সঙ্গী চাও ?

তুই: আমি চোখ বুজে তাকে দেখতে পাই, কিন্তু বর্ণনা করতে পারব না। আমি আমার ফসটার ফাদারকে আজও দেখিনি, তাঁকে আমি আমার ফাউনডিং ফাদার মনে করি, আমার প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর মতো পুরুষ আমার পছন্দ, তাঁকেই পছন্দ।

সিসটার অ্যানি: তোমার উড বি হাজব্যান্ড কোথায় তোমাকে প্রোপোজ করুক, তুমি চাও ?

তুই: যদি বিয়ে করি, চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রোপোজ করলে ভালো। তবে আমি ওই পুরোনো প্যাট্রিয়ার্কাল রিচুয়াল রিভার্স করতে চাই, আমিই প্রপোজ করব, সে গ্রহণ করবে। বিয়ে আমি করব না বলেই মনে হয়।

সিসটার অ্যানি:  ফিল্ম দ্যাখো, মুভিজ ?

তুই: না, ফিল্ম দেখতে আমার তেমন ভালো লাগে না, ওয়েস্টেজ অফ টাইম মনে হয়।     

সিসটার অ্যানি: কোন ধরণের ফিকশান তোমার ভালো লাগে ?

তুই: ফাইভ সিক্সে পড়ার সময়ে হ্যারি পটার সিরিজের  বইগুলো ভালো লাগত ; এখন ট্র্যাশ মনে হয়। এখন আমার  সিমপ্লিফায়েড শেক্সপিয়ার ভালো লাগে, বিশেষ করে ট্র্যাজেডিগুলো।

সিসটার অ্যানি: কমিকবুকের কোন চরিত্র তোমার পছন্দ ?

তুই: অ্যাস্টারিক্স আর ওবেলিক্স। ওতে আমি নিজের একটা চরিত্র কল্পনা করে নিই, নেটিফিক্স, যে নেটওয়র্কিং করে সকলের সমস্যা সমাধান করে, কেননা ওই কমিকবুকে চরিত্ররা কেবল একের পর এক সমস্যা গড়ে তোলে।

সিসটার অ্যানি: কোন খেলা ভালো লাগে?

তুই: ফুটবল।

সিসটার অ্যানি: কোন টিমকে সমর্থন করো?

তুই: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

সিসটার অ্যানি: কার কবিতা ভালো লাগে?

তুই: টি এস এলিয়ট, কবিতায় গল্প না থাকলে ভালো লাগে না।

সিসটার অ্যানি: ওনার কবিতা তো বেশ কঠিন, বুঝতে পারো ?

তুই: বুঝতে বিশেষ পারি না, অনুভব করতে পারি।

সিসটার অ্যানি: বেঙ্গলি পোয়েট্রি পড়ো না ?

তুই: না, পড়ি না , পড়তে ইচ্ছা করে না। আমার বেঙ্গলি বার্থ পোয়েটিকাল নয়, আই অ্যাম এ ডিসাকার্ডেড বেঙ্গলি। তবে একজন বেঙ্গলি কবির আত্মহত্যার ঘটনা আমায় সন্মোহিত করেছে।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রতি বছরের ডায়েরিতে একটা লাইন লেখো, “ আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।” তুমি কি ঈশ্বরের কথা ভেবে লেখো ? নাকি তুমি কবিতা লিখতে চাইছ?

তুই : হ্যাঁ, উনি আমার ব্যক্তিগত ঈশ্বর, আমার ফাউনডিং ফাদার। ওই লাইনটা লিখে ওনার আরাধনা করি, সম্পর্ক পাতাই। আই লাভ হিম ইন অ্যাবসেনশিয়া।

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

জগদীশ একবার বলেছিল,  নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে তোকে বেশি ভালোবাসে, ও যা চায়, তুই তেমন করেই গড়ে তুলছিস নিজেকে, কখনও অবাধ্যতা করিস না। প্রায় তোর মতনই ওদের গায়ের রঙ ; জগদীশের রঙ পেয়েছে দুজনেই। হাইট পেয়েছে অমরিন্দরের। ফর্সা হলে তিনজনের মধ্যে কমপ্লেক্স গড়ে উঠত, সে আরেক হ্যাঙ্গাম। কী করে এরকম মানিয়ে নেবার চরিত্র পেলি রে ?

বৈদেহী আর আরিয়ানের খারাপ লাগতে পারে, তুই ওদের বাবা-মায়ের ওপর ভাগ বসাচ্ছিস ভাবতে পারে বলে, জগদীশকে আঙ্কলবাপি আর অমরিন্দরকে আন্টিমা সম্বোধন আবিষ্কার করে ফেললি। সবই অবশ্য শোনা, একবছর বয়সের পর  তো আজও দেখিনি তোকে, আর ওদের ছেলেমেয়েকে।

জগদীশ জানিয়েছিল, বৈদেহী আর আরিয়ান নাকি চাইত না  যে তুই বাপি আর মা বলে সম্বোধন করিস  ওনাদের, বাপি আর মা কেবল ওদের।

তুই জেনে ফেলেছিস যে তোর জন্মের পরেই তোর মা তোকে অনাথ করে দিয়েছিল ; অনাথ শিশুদের হামাগুড়ি থেকে কেউ একজন তোকে পছন্দ করে তুলে দিয়েছিল  ‘এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড’ সংস্হার হাতে।

বৈদেহীর সঙ্গে ঝগড়ায় ওর আলটপকা মন্তব্যে সন্দেহ হয়েছিল তোর ; তারপর জগদীশ-অমরিন্দরের কথাবার্তা শুনে ফেলে থাকবি কখনও। ওরা দুজনেই মদ খাবার পর বড্ড বকবক করে, বিছানায় শুয়েও গ্যাঁজায়, ব্রো-প্রোর টাকা এসে পড়ে আছে রেলিভ্যান্ট অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দাও, এই ধরণের কথাও বলাবলি করে থাকবে।

আমি তোকে দিতে চেয়েছিলাম কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের বসন্তকাল, শীতের পশ্চিমবাংলার ফিনফিনে গ্রামীণ রোদ, চিরসবুজ অ্যামাজন অরণ্যের ব্লু-গোল্ড ম্যাকাও পাখিদের রঙিন উড়াল।

তুই চাইলি আরও ওপরের আকাশে ভেসে বেড়াবার স্বাধীনতা, আরও উঁচু, আরও উঁচু, আরও উঁচু, বাধাবন্ধনহীন  নীল, যেখানে পাখিদের ডানার রঙ কালো বা ধূসর।

যে আঁস্তাকুড়ে অবহেলায় ভোররাতের শিশিরে ভিজছিলিস তা পশ্চিমবাংলায়; তোর  রোষ চাপিয়ে দিলি পশ্চিমবাংলার ওপর, কলকাতা শহরের ওপর।

জানি, ব্লু-গোল্ড পোশাকে তোকে মানায়। কিন্তু আমার পছন্দ টোম্যাটোরেড লাল রঙের পোশাক।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের কথা  কেন বলছি বলতো ? তোর গায়ের রঙ শ্যামলা, বৈদেহীর চেয়ে এক পোঁচ বেশি,শুনেছি। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর ওই সমুদ্র সৈকতে পয়লা জানুয়ারি অজস্র মানুষ-মানুষীর ভিড় হয় ; অন্য সময়েও নগ্নিকারা শুয়ে থাকেন বালির ওপর নরম ম্যাট বিছিয়ে। তারা তোর মতোই শ্যামলী, অনেকে কৃষ্ণাঙ্গীও। কেবল শেতাঙ্গিনি আর শেতাঙ্গদের জমায়েত তোকে বিব্রত করত, যেমনটা ইউরোপের সমুদ্র সৈকতগুলোয় হয়। গোয়ার সমুদ্র সৈকতের কথাও বলতে পারতাম, সেখানে রাশিয়ার নগ্নিকারা ভারতীয় চোরাদর্শকদের হাতছানি দ্যায়।

যখন রিও ডি জেনেরিও আর সাও পাওলো যাবি, দেখিস সেখানকার কার্নিভাল, চোখ জুড়িয়ে যাবে, ইচ্ছা করবে কার্নিভালের নর্তকীদের সঙ্গে নাচতে।

আমি তো ছিলাম রিও ডি জেনেরিওর ভারতীয় এমব্যাসিতে, ট্রেনি হিসাবে, প্রোবেশানারি  পোস্টিঙের আগে। সেসময়ে পরিচয় হয়েছিল দূতাবাসের অফিশিয়াল ট্রানস্লেটর-ইনটারপ্রেটার কণিকা হালদারের সাথে, হৃদ্যতা বলতে পারিস; দজনেই বুঝতে পারছিলাম একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি, বাঙালি বন্ধুর অভাব মেটাতে, বাংলায় কথা বলার লোভে। আমরা দুজনেই টের পেয়েছিলাম যে প্রেম বিয়ে সংসার করা টাইপের নই, দুজনেই, ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে শেষকালে, জীবনকে রুদ্ধ করে দেবে, পরস্পর আলোচনা করে আর এগোইনি।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতে অন্য যুবক-যুবতীরা চুমু খাচ্ছিল, দেখাদেখি বলতে পারিস, আমরাও খেলাম, কণিকা হালদার বলল, ছিঃ, চুমু জিনিসটা নোংরা, স্মেলি, কি যে হয় চুমু খেয়ে।

আমারও মনে হয়েছিল, একে তো ভালোবাসি না, কেনই বা একে চুমু খাচ্ছি, এর মুখে ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর-ডিনার খাবার দুর্গন্ধ। ব্যাস, আমার জীবনে শেষ তরুণী।

এখন ভেবে দেখলে, মনে হয়, ভাগ্যিস কণিকা আর আমি জড়িয়ে পড়িনি। পড়লে, তোকে অন্য কেউ স্পনসর করত, আর আমার জীবনের অভিমুখ থাকত না কোনো।

অভিমুখ সব সময় যে নিজের নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে না, তাও জেনেছি, পরে।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

Categories
2022_may uponyas

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । পর্ব ১

উ প ন্যা স । পর্ব ১

ম ল য়   রা য় চৌ ধু রী র

জাদুবাস্তব উপন্যাস

malay_roy_choudhury

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা

রেজিস্ট্রেশানের সময় বানান ভুল করে ফেলেছিল ক্লার্ক নবীন খান্না, মুখে পান সত্ত্বেও পরশ্রীকাতর ফিকে হাসি, ঠোঁটের কোনায় লালচে ফেনা, পেটের ভেতর কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে চলেছে ফিনফিনে পাপড়ি, টাকের জেদি কয়েকটা চুল ফ্যাকাশে, আলস্য দেখে মনে হয় যেন ঠাকুমার পালঙ্কের পাশে হাঁটু গেড়ে সম্পত্তির আশায় সময় কাটাচ্ছে ।

তখনও পর্যন্ত জংধরা টাইপরাইটার সরিয়ে ঝকঝকে কমপিউটার আর ঝুলেল টুনিবালব নিভিয়ে কুয়াশাময় সিএফএল ঢোকেনি সরকারি দপ্তরে ।

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের জন্মদিন কে নিশ্চিত করবে; করল একটা ভুল, যেমন নামের ভুল, ভুল লেখা হল বার্থ সার্টিফিকেটে, তোর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি, হ্যাপি নিউ ইয়ার আর হ্যাপি বার্থডে ।

কত মজার, না? উঁহু, তুই বলবি, মোটেও মজার নয় ।

দিল্লিতে প্রথম আষাঢ়ের ফোঁটায় ফোঁটায় ভেজা সকাল, গাড়ির কাচে ওয়াইপার নিজের মনে গাইছে, মুছে দাও মুছে দাও মুছে দাও ।

 

চিরুনিধার বৃষ্টিতে, ভুরুকোঁচকানো হাওয়ায়, সমস্ত ডানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে আকাশ থেকে।

রুলটানা শুকনো অশথ্থপাতা ওড়ে। নারকেল পাতার ওপর কাকগৃহিণীর বলাশয়।

ফুটপাতের বালিতে জল সেঁদোবার রিনরিন রিনরিন রিনরিন রিনরিন।

শোনা গিয়েছিল অন্ধের পা রাখার আওয়াজ। বৃষ্টির টুপটাপে সময় পড়ার শব্দ।

ভাসিয়ে নিয়ে গেলি ধাঁধার উড়ন্ত মেঘের পালকে শুয়ে চাই চাই চাই চাই, তোর দাবি।

 

যায়নি মোছা, মুছতে পারিনি রে।

কত জরুরি ছিল মুছে ফেলা।

জগদীশ ব্যানার্জি তখন পানিপথে পোস্টেড, এজিএমইউ ক্যাডার বলে হার্ড পোস্টিঙ ঘুরে এসে আমি দিল্লিতে প্রথম পোস্টিঙে, ওকে বলেছিলাম আসতে, তোকে পছন্দ করার জন্য।

জগদীশ ব্যানার্জির নতুন টাকের ফিকে উঁকির ওপর বৃষ্টি, খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করছে বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টি আমার ভালোলাগে, মাত্র কয়েকটা তো ফোঁটা, আদর করতে করতে গড়িয়ে চলে যায় বুকে, পেটে বা আরও তলায়।

আমরা দুজনে, বৃষ্টির পিছু ধাওয়া এড়াতে, প্রায় দৌড়ে ওদের হলঘরে ঢুকতেই, প্রথমে তুই-ই চোখে পড়লি, তোর খিলখিল হাসি, এক বছর বয়সেই। অন্য বাচ্চাদের চেয়ে তোর পা লম্বা, নজরে পড়ে গিয়েছিলি, সবার চেয়ে ঢ্যাঙা।

কোলে তুলে নিলাম তোকে । 

এটা সেই মুহূর্ত, যা সবায়ের জীবনে আসে, এমনই এক মোড়, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া যায় না, সবুজ প্রতিভা, সুরের গমক, মায়া; নিজের অবস্হান এক মুহূর্তের মধ্যে নির্ণয় করে ফেলতে হয়। আমি অনুপ্রাণনা-তাড়িত পুরুষ, ঠিক সময়ে যথার্থ নির্ণয় নিতে না পারলে জীবনের ভারসাম্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে, এরকমটা মনে হয়, শেষে জমে-থাকা হতাশা হয়ে উঠবে অত্যন্ত কষ্টকর, ভবিষ্যতে কি হবে আঁচ করে নির্ণয় ঝুলিয়ে রাখতে পারি না।

 

স্পর্শের মর্মার্থ হয়, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস। প্রতিরোধে ক্ষয়ে অনড় ঝর্ণাপাথর। জিওল মাছের নিঃশব্দ ছটফট। তোর মতো তোর মতো তোর মতো করে নিয়ে গেলি আমাকে আমার আমি থেকে ছিঁড়ে।

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয়।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয়।

 

তোর নাকে নাক দিয়ে আদর করেছিলাম, গালে আর নাভিতে চুমো খেয়েছিলাম, উসকে দিয়েছিলাম তোর খিলখিল, পাখিদের গান শুধরে দেবার হাসি, খাঁজকাটা রোদ্দুরের ডালে-ডালে দোয়েল-কিশোরীরা স্বরলিপি ভুলে যায়, পায়ের তলায় আদর করতে পা গুটিয়ে নিয়েছিলি, ওঃ, তোর সেই মিডাস টাচ।

তোর নাম আমি রাখতে চেয়েছিলুম নীতি, আসলে ওটা আমার ঠাকুমার নাম; উনি আমায় সবচেয়ে বেশি আদর করতেন, খাওয়ার পরও জানতে চাইতেন, কি রে খাওয়া হয়েছে?

 

নকশিকাঁথা, আমসত্ব, শেতলপাটি, তামার পয়সা, গোবিন্দভোগ, কুমড়োবিচির মেঠাই, রেড়ির তেলের গন্ধ, কুপির আলো, পুকুর, ধানখেত, টিয়াপাখি। রামধনু গড়তে শিখছে আকাশ। গাছের ছায়া কিনে নিয়ে গেছে পাইকার। পায়ের শিরায় মাইল-পাথরের স্হায়ীত্ব। ঠাকুমা।

 

একটা ইংরেজি ‘ই’ বাদ পড়ায় তোর নাম হয়ে গেল নেতি; শুনেছি, বন্ধুরা তোকে নেটি নাটি নাট করে দিয়েছে, তা তো আমার দোষ নয়।

শুনেছি, তোর একাধজন ক্লাসমেট খুনসুটি করে নেটা বলে ক্ষ্যাপায়, নেটা মানে শিকনি। তুই একেবারে গা করিস না, তাও শুনেছি, তোর এক সহপাঠিনীর অভিভাবকের কাছে, আমার সঙ্গে সেও তখন পুডুচেরিতে পোস্টেড, কাঁধ শ্রাগ করে নাকি বলিস, সো হোয়াট, আই’ল স্টিক ইট টু ইওর আস, ক্লাস ফোর থেকেই ।

জগদীশের স্ত্রী অমরিন্দর, কখনও হরিয়ানভি জাঠ ছিল, বিয়ের পর মাছভাত খেয়ে, জামদানি পরে, দুর্গাপুজোয় গরদের শাড়িতে সিঁদুর খেলে, জলসায় গলাকাঁপা বাংলা গান গেয়ে, পুরোপুরি বাঙালি, তোকে নিত্তু বলে ডাকে, জানি, নিত্তু বেটি, কি খাবি, বাংলা না পানজাবি রেসিপি, সরসো কা সাগ উইথ মক্কি কি রোটি, ছোলে ভাটুরে, রাজমা চাওয়ল। বলেছে জগদীশ, চেককাটা লুঙ্গিতে বাইফোকাল পুঁছে।

তুই বলতিস, নো নো, আন্টিমা, আমি মাছ ভাত খাবো, মুড়িঘন্ট বানাও না, আঙ্কলবাপির ফেভারিট। শুনেছি।

জগদীশের বড় মেয়ে বৈদেহী বিরক্ত হতো, এতো সাধাসাধি কিসের? যা সবাই খায় তা-ই খাবে । পরে মানিয়ে নিয়েছিল, তোর আপন করে নেবার বৈশিষ্ট্যের আদরে। তোর আয়ত্বে আছে গোপন উষ্ণমণ্ডল, শুনেছি।

অমরিন্দরের বিয়ের সময়ে ঝামেলা করেছিল ওদের এক ভঁয়সাপেটা জাঠ পঞ্চায়েত কর্তা; জগদীশ সিলকের পাঞ্জাবি খুলে, পৈতে দিখিয়ে হেঁকেছিল, আমি হলুম বাঙালি ব্রাহ্মণ, স্যারজি, ব্যানার্জি, সবচেয়ে উঁচু ব্রাহ্মণ ।

ওদের ষণ্ডাদের ব্যানার্জির হাঁটু ছুঁয়ে সে কি পরনাম, পরনাম, পরনাম । এও শোনা, বলেছে অমরিন্দর ।

পৈতেতে বুড়ো আঙুল জড়িয়ে বাপের বয়সী ভুঁড়োদের পাগড়িতে হাত রেখে জগদীশ বলেছিল, জিতে রহো পুত্তরজি, ফুলো ফলো, পিও পিলাও ।

বিয়ে হল, বিয়েতে মদ খেয়ে ব্যাণ্ডবাজিয়েদের তালে-তাল নাচ হল, জগদীশ যৌতুকে পেল গুড়গাঁওয়ে জমি, যার ওপর ও দোতলা বাঙলো তুলেছে, আর ঘুষের টাকায় তাকে ক্রমশ ফিল্মসেটের মতন করে ফেলেছে, মায়াবি। ঘুষের টাকায় কলকাতায় নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে, অমরিন্দরের নামে, মায়াবি। চণ্ডীগড় ছেড়ে বেরোতে চায় না, তাই। ছুটিতে বোতলক্রেট গুড়গাঁও কিংবা যেখানে আমি বা কোনো বাঙালি কলিগ পোস্টেড; থ্রি চিয়ার্স।

ঘুষের টাকা নেবার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে আর বছর দুয়েক পরে বন্ধ করে আবার অন্য অ্যাকাউন্ট খোলে; কখনও নিজের নামে, কখনও অমরিন্দরের নামে, কখনও শিডুল্ড ব্যাঙ্ক, কখনও প্রায়ভেট ব্যাঙ্ক, কখনও আরবান কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, কখনও টয়লেটের লফ্ট ব্যাঙ্ক, কখনও পুজোর ঘরের ফাঁপা দেয়ালে আনারকলি ব্যাঙ্ক।

গলা অব্দি কুয়াশায় ডোবা মানুষের নাম না-পালটাতে পারার মজাদার অসুখের আনন্দ। চাঁদবণিক প্রায়ভেট লিমিটেড বললে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। প্রতি বদলির বিদায় সম্বর্ধনায় একই বক্তৃতা দ্যায়, লিখে রাখা আছে।

সকালে স্নানের পর গামছা-কোমর জগদীশ, টাকের চুল ফুরিয়ে গিয়ে করোটিতে রূপান্তরিত, বাঁহাতে পেতলের ছোটো ঘন্টিতে টুংটাং, ডানহাতে দুশো এম এল গঙ্গাজল, গ্যাঁদাপাপড়ি, দরোজায় দরোজায়, সংস্কৃত মন্তরের ফিসফিস, বৈশাখ জৈষ্ঠ আষাড় শ্রাবণ ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণ পৌষ মাঘ ফাল্গুন চৈত্র, কিছুটা ঝুঁকে, যেন সময়ের সঙ্গে বেমানান আধ্যাত্মিক কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার ।

পুজোর ঘর পাথর-মাটি-কাঠ-পেতলের দেবী-দেবতায় ছয়লাপ, দেয়ালের পেরেকে-পেরেকে কুড়ি-পঁচিশ বছরের পুরোনো বাংলা ক্যালেণ্ডারের দেবী-দেবতা, থাক-থাক পাঁজি, পুজোর বই, পাঁচালি, পিলসুজ, পুজোর ন্যানো সাইজের থালা-ঘটি-বাটি, রুপোর; হেসে, গলার লাল শালুতে শালিগ্রামশিলা ঝুলিয়ে, বলেছিল ওর পার্টটাইম পুরুত অবিনাশ ভট্টচাজ্জি, যে নিজেই গজগজ করে দেবী-দেবতারা সংস্কৃত মরা ভাষা থেকে আজও বেরোতে পারেনি, বুঝতে পারে না কোন বিসর্গের কি অর্থ।

জগদীশের জ্বরজারি হলে, অমরিন্দর, কালোর চেয়ে কালো কলপে ভেজা চুল, কোমরে এক গামছা বুকে আরেক, আজও জিগ্যেস করে, এর পর কোন মন্তর? গামছা যায় কলকাতা থেকে, বাঙালি জুনিয়ার অফিসারদের দৌলতে । অবশ্যই লাল, অবশ্যই সবচেয়ে বড় মাপের, যদিও অমরিন্দরের জাঠনি বুক ঢাকতে পারে না সে-গামছা, পেটে সিজারিয়ানের কাটার দাগ উঁকি দিয়ে ঝোলে । তিন বছর লেগেছিল শাঁখ-বাজানো শিখতে, শুনেছি।

কী করে আপনাদের পরিচয় হল, অমরিন্দর তো দু-এক ইঞ্চ লম্বা, জানতে চেয়েছিলাম ।

জগদীশ বলেছিল, ভাঁজের প্রতিভায় ছিল সীমাভাঙার টান, জগদীশেরই দপতরে, পানিপতে, এসডিও অফিসে এসেছিল কোনো কাজে । ব্যাস, বাস্তববাদিনীর উদ্যমের  সঙ্গে বলগাছেঁড়া কল্পনা ; দেহের আনাচে-কানাচে টই-টই জাঠনির অবিমিশ্র উপঢৌকন ; ধুলোয় মোচড় দেয়া গন্ধ । জাঠনির মতো উরু পাবেনা ভারতে ; মোষের দুধ-দই খায়, গোরু একদম নয়।

পানিপতের রঞ্জক গোলাপ, সাদা গোলাপ, লাল গোলাপ, হলুদ গোলাপ, কমলা গোলাপ, গোলাপি গোলাপ, কালো গোলাপ, ইরানি গোলাপ, মিরিন্ডা গোলাপ ; শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম, চোখ কলম । আহাআহা। দেহজুড়ে চুমুর দাঙ্গা ।

 

সংবেদনশীল আলোড়ন, জলসিক্ত উড়ন্ত ছাতা ।

শান্তির মৌনতা হাওয়া থেকে হাওয়ায়, স্হান থেকে স্হানান্তরে ।

উতরোল কোলাহল।

 

অমরিন্দর:  যাক ওই করওয়া চৌথের জুঠঝামেলা থেকে বাঁচলুম, না খেয়ে থাকো সারাদিন, ওসব আমার দ্বারা হবে না, চালুনি দিয়ে বরের মুখ দেখে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে আমি সিঁদুর-খেলা খেলে তাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখব। বরকে বরং আলুর পরোটা, মেথি-শাকের পরোটা, পুদিনার পরোটা, বেসনের পরোটা, কিমার পরোটা খাওয়াবো, সিঁদুর খেলা থেকে ফিরে, ঘিয়ে চপচপে পরোটা। করওয়া চৌথ হল চালুনি কারখানাগুলোর কারসাজি; নয়তো কবেই বন্ধ হয়ে যেত, পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়ে এখন বের করেছে প্লাস্টিকের চালুনি।

সাহেবরা চাঁদে গিয়ে গোসল করে এলো, সেই চাঁদের দিকে তাকাও, মানে হয় কোনো, অ্যাঁয়জি !

জগদীশ: কিন্তু তুমি লাঞ্চ আর ডিনারে কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খাবার অভ্যাস ছাড়তে পারলে না।

অমরিন্দর: তোমার শুঁটকি মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারি, আর তুমি কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ সহ্য করতে পারো না? প্যার মোহব্বত প্রেম ভালোবাসা হল গন্ধের আপোস। বাজারে পেঁয়াজ না এলে হরিয়াণার সরকার উলটে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বাজারে মাছ না এলে কি সরকার ওলটায়?

জগদীশ: অমন কখনও হয় না, মাছ আসবেই, বাঙালি মাছ খাবেই, যত দামই হোক, সরকারকে ফেলবে না। সেখানে সরকার পড়ে মাৎস্যন্যায়ে।

অমরিন্দর: তোমরা বাংগালিরা পরৌনঠাকে পরোটা বলো কেন, অ্যাঁয়জি?

চাবির ঘোলাটে ফুটোয় যাবৎজীবন চোখ। অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে-আনা সকালের বিকল্প।

সান্নিধ্যের নৈকট্য ঘিরে অফুরন্ত অবসর। প্রেম-টিকলিং নিড়ুনি।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলো পর্যন্ত বেরোতে পারেনি।

জগদীশ আর অমরিন্দর আমাকে ব্রো-প্রো বলে ডাকে, এল বি এস ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে ট্রেনিঙের সময় থেকে আমাকে সকলে ব্রো-প্রো করে নিয়েছে, ব্রাদার প্রভঞ্জন । জগদীশ আমার চেয়ে পাঁচ বছরের সিনিয়র, ঘোঁৎঘাঁত বিশেষজ্ঞ । ও ঠিক খবর রাখে  কখন বিরোধীদলে চলে যাবার কথা চিন্তা করছে সকালবেলার সূর্য ।

তুই কি কখনও আমার নাম জানতে পারবি নেতি ?  

আমার গোপন কোষাগারে তোর নাম নেতি থেকে ইতি করে নিয়েছি; তুই জানিস না, জানতে পারবি একদিন, যখন আমার উইলে তোর নাম থাকবে, আমি এতদ্বারা আমার স্হাবর ও অস্হাবর সমস্ত সম্পত্তি নেতি ওরফে ইতি ব্যানার্জিকে । তেমনই তো ভেবে রেখেছিলাম রে ।

পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তার আগেই সব জেনে ফেলেছিলি; তোর গায়ে গোখরোর ঠাণ্ডা রক্ত। কোনো যুবতীর গা এত ঠাণ্ডাও হয় ! প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র শিরায়-শিরায়, রসতরঙ্গিনী তুই। তোর দুই হাতে অ্যানাকোণ্ডার দমবন্ধ করা পাকের পর পাকের পর পাকের পর পাক, উফ কি ঠাণ্ডা, আঁস্তাকুড়ের হেমন্তের শীতেল জঞ্জালের জাপট।

চব্বিশ বছরের শ্যামলী দীর্ঘাঙ্গী, জানি না কেমন দেখতে হয়েছে তোকে, খুঁজে বেড়াচ্ছিস তোর নামকরণকারীকে, জন্মদিন নির্ধারণকারীকে, যেন তোর অস্তিত্বকে সেই লোকটা করায়ত্ব করে গুমখুন করে লুকিয়ে রেখেছে নিশুতি রাতের পোড়োবাড়ির সিঁড়ির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে।

শিমুলের পাকা ফল ফেটে রোঁয়া উড়ছে, তুই তাদের ধরতে চাইছিস, শিমুলের লাল টকটকে ফুলগুলো শুকিয়ে তৈরি করেছে রোঁয়াবীজ, সেগুলোকে উড়িয়ে চলেছে দূরান্তরে, কোথাও গিয়ে অঙ্কুর তুলে লুকিয়ে গাছ হয়ে উঠবে, বসন্তের আকাশকে রাঙিয়ে দেবে ।

তুই কি চাস না যে বিশাল একটা শিমুলগাছ সবুজ মুকুট মেলে আকাশের চিরনবীন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছুঁয়ে দেখুক, মেখে নিক বসন্তের উদাসীন রক্তাক্ত তাড়না, বল তুই?

আমারই মস্তিষ্কে ওই গাছ পুঁতে দিবি, রোঁয়া উড়বে, আঁচ করিনি। তুই মারাত্মক। বৃষ্টি ফোঁটারা কি হলুদ পাতার রঙ তুলতে পারে, বল তুই? মোম-আলোয় শ্যামাপোকা নাচতে ভোলে না।

প্রেপ থেকে তোকে ভর্তি করা হল নৈনিতালের সেইন্ট মেরি কনভেন্ট হাই স্কুলে, বোর্ডিঙের অঢেল, সিসটাররা ছাত্রীদের সুখসুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন, স্কুলের রেজাল্টও ভালো হয় প্রতিবছর । ফিস বেশি হলেই বা, আমার মাইনেটা আছে কি জন্য ! ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত টানা পড়লি সেখানে । ব্যাস, জিভে সেই যে কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি ঘাঁটি গাড়ল, তা কখনও ছাড়ল না তোকে । এও শোনা, সূত্র অমরিন্দর, টেলিফোনে, আমি তখন পোর্ট ব্লেয়ারে ।  

জগদীশের মেয়ে তোর চেয়ে চার বছর সিনিয়র, ও কি জিভে অক্সব্রিজ কনভেন্টি ইংরেজি জড়াতে দিয়েছে? বলেনি কেউ, কেনই বা জানতে চাইব, বল? আমার আগ্রহের কেন্দ্রে তো তুই। ওই স্কুলের বোর্ডিঙেই তো ছিল বৈদেহী।  

কত ইচ্ছা করছিল, তবু ভর্তির সময়ে আমি স্কুলে যাইনি, কিন্তু নৈনিতালে গিয়েছিলাম, উদ্বেগ, উদ্বেগ, যাতে তোর অ্যাডমিশানে অসুবিধা না হয় । এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের দপ্তরের পর আমি তোকে আর চাক্ষুষ দেখিনি, কেবল ফটোতে যা । তারপর থেকে, জগদীশের মেয়ে আর ছেলেকেও দেখিনি। ওদের বাড়িতে আমি যাই না, তোর কারণেই যাই না ।

এনজিওর মনোবিদ তনজিম হায়দার বলেছিল, আপনি নেতির সামনে কখনও যাবেন না, স্মৃতিতে আপনার মুখ থেকে যাবে, খুঁজবে আপনাকে, শেষে আপনাকে না পেলে ডিসগ্রান্টলড আর রিভেঞ্জফুল ফিল করবে; আপনি তো তা চাইছেন না। অচেনা একজন মানুষ ওর সমস্তকিছু ফানডিং করছে জানতে পারলে হীনম্মন্যতার দোষ ফুটে উঠবে চরিত্রে ।

আমি চেয়েছি তুই বোল্ড হয়ে ওঠ। তাই বলে এরকম বোল্ড, অ্যাঁ?

শাদা ঘোড়া, কেশর হাওয়ায়, দৌড়োচ্ছে, সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে, ওই দূরে সূর্য, ওই দূরে পূর্ণিমার চাঁদ, দৌড়চ্ছে ঘোড়া, ওই দূরে ঝড়, ওই দূরে বৃষ্টি ।

ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ… মরুভূমিতে ঘোড়ারা দৌড়োলে বালি ওই শব্দকে শুষে নেয়।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...