Hello Testing Bangla Kobita

আমাদের যাপনে রবীন্দ্রনাথ... কী বলছেন তাঁরা

সুবোধ সরকার

গীতবিতান আমার কাছে বাইবেল। এই একটা বই আমি আটচল্লিশ বছর ধরে পড়ছি এবং শুনছি। এই যে এখন লকডাউন চলছে, একটা দুর্বোধ্য ভয় অতিক্রম করে আমরা চলেছি, গীতবিতানের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে থেমে যেতে হয় হঠাৎ, মনে হয় এই তো এই তো একটা পৃষ্ঠা আমি খুঁজছিলাম । ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা ‘ – এই কথাগুলো তো এখনই সবচেয়ে দরকার। না হলে কী নিয়ে বাঁচব? কাল ঘর অন্ধকার করে শুনছিলাম, দেবব্রত বিশ্বাস গাইছিলেন তাঁর উপদ্রুত কণ্ঠে— ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা’। এ তো গত সন্ধ্যার গান যখন বৈশাখ জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার কাছে আমার জীবনে যে কোন লকডাউনের সময় তা সে বাবার মৃত্যু হোক , প্রেমে ব্যর্থতা হোক, গীতবিতান আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। জল থেকে হাত ধরে তুলে আনে। গীতবিতান না থাকলে বাঙালি আর যাই হোক বাঙালি হতে পারত না।

জয় গোস্বামী

রবীন্দ্রনাথ যদি আমাদের বাংলায় না জন্মাতেন, তাহলে বাংলা সংস্কৃতি আজকে যে উচ্চমানে পৌঁছেছে, তা কখনোই সম্ভব হত না। রবীন্দ্রনাথ প্রধানত কবি ছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে তিনি এত বিপুল রকমের সৃষ্টি রেখে গেছেন, তাতে আমরা ঐশ্বর্যবান হয়েছি। তিনি যত বিচিত্র ধারায় কবিতা লিখেছেন, অত বৈচিত্র্য বাংলার কোনো কবির নেই। তিনি লিখেছেন চুরানব্বইটি গল্প। এক একটি গল্প মণিমাণিক্যের সমান। তিনি চতুরঙ্গ বা চার অধ্যায়-এর মতো উপন্যাস লিখেছেন। গোরা বা যোগাযোগ-এর মতো উপন্যাস নিয়ে আজও আমাদের নতুন করে ভাবতে হয়। তিনি নাটকও লিখেছেন এবং সেই নাটক সম্পূর্ণ নতুন ধরণের। রক্তকরবী, রাজা, ডাকঘর, অচলায়তন বা মুক্তধারার মতো নাটক আঙ্গিকের দিক দিয়ে বা বক্তব্যের দিক থেকে এক নতুন নাট্যধারাকে আমাদের সামনে উপস্থিত করে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন আড়াই হাজারের উপর গান। সেই গান সকল মতের, সব ধরণের বাঙালির প্রতিদিনের সঙ্গী। রবীন্দ্রনাথ যদি আর কিছু না লিখে শুধু গান লিখতেন এবং সুর দিতেন, তাতেই তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে থাকতেন। একেবারে পরিণত বয়েসে রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতে শুরু করেন। তার ফলে তাঁর হাতে শিল্পের এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। তাঁর আঁকা চিত্রগুলির দিকে তাকিয়ে আজকেও আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হই।

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ গ্রামের উন্নয়ন নিয়ে ভেবেছেন এবং কাজ করেছেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন রীতির প্রবর্তন করেন। তাঁর শান্তিনিকেতন স্থাপন করার উদ্দেশ্যই ছিল তাই। রবীন্দ্রনাথ পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বালক-বালিকাদের এক সর্বাঙ্গীণ বিকাশের পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো এত বড় মহৎ শিল্পী এবং আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁর মতো প্রয়োজনীয় ব্যক্তিত্বের মহিমার বিবরণ এত অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না।

মৃদুল দাশগুপ্ত

এই এখনকার বাংলা কবিতায় অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও রবীন্দ্রনাথের কোনও স্পর্শ বা প্রভাব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে পঞ্চাশ দশকীয় কবিতায় তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় অনেকেরই কবিতায়। আমি এখানে শুধু শক্তি চট্টোপাধ‍্যায়ের ‘আনন্দভৈরবী’ কবিতাটি উল্লেখ করছি। তবে রবীন্দ্রনাথ বিরাট, অতিকায় তিনি। তাঁর ছায়া বাঙালি সমাজজীবনে আছে, আছেই। এই যে আজকের বাঙালি সমাজ, তার যেটুকু পরিশীলন, তা রবীন্দ্রনাথেরই স্পর্শে ঘটেছে। শিক্ষিতদের মাধ‍্যমেই তা সমাজতলেও পৌঁছেছে, ছড়িয়েছে। ব‍্যক্তিগত থেকে সমগ্রে, শত সঙ্কটে, ব‍্যথাবেদনায়, আনন্দ- শোকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান আমাদের আশ্রয়।

শ্যামলকান্তি দাশ

এই যে কিছু মানুষ, কিছু কবি, সাহিত্যিক… যাঁরা নিয়মিত বলে যাচ্ছেন রবীন্দ্রসাহিত্যে কিছু নেই, রবীন্দ্রনাথের কবিতা এখন অচল, অপ্রাসঙ্গিক… তাদের মূঢ়তা, উন্নাসিকতা, স্পর্ধা দেখলে করুণা করতে ইচ্ছে করে। এক ভয়ঙ্কর  দুঃসময়ের ভেতর সময় অতিবাহিত করছি আমরা।  বিনাশ ও বিনষ্টিতে আমাদের পরিপার্শ্ব তছনছ হয়ে গেছে।  এই দুঃসময়ে একমাত্র রবীন্দ্রনাথই জাগ্রত ঈশ্বরের মতো কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকেন আমাদের। তিনিই আমাদের শেষ সহায় সম্বল। রবীন্দ্র গান-কবিতাই সেই আলো, যে আলো আমাদের উৎসারিত করে এক আলোকিত আলোর দিকে। আমি মনে করি যতদিন সভ্যতা থাকবে ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন রবীন্দ্রনাথ। যেকোনো উন্নাসিকতা, স্পর্ধা রবীন্দ্রআলোর কাছে ম্রিয়মান। বাংলা কবিতা কোনোদিনও রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত হতে পারবে না। কারণ তাঁর বাস বাঙালির মননে।

মলয় গোস্বামী

এই বয়সে রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই থাকি । তাঁকে ঘরের মানুষ করে নিয়েছি । মন ভালো নেই । তাই এখন তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে চাই । “যাক- না পায়ের তলার মাটি,/ তুমি তখন ধরবে আঁটি / তুলে নিয়ে দুলাবে ওই বাহুদোলার দোলে।”

মন্দাক্রান্তা সেন

রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই তো চিরদিনের বেঁচে থাকা। এই গৃহবন্দী অবস্থায়  যেন তাঁকে আরও বেশি করে পাচ্ছি। যখন কিছুই ভালো লাগছে না, টেনে নিচ্ছি গীতবিতান। ‘বিরস দিন বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে/ এসেছ প্রেম এসেছ আজ কী মহাসমারোহে’। এই পংক্তিদ্বয়ের এমন তাৎপর্য আগে এভাবে বুঝিনি। রবীন্দ্রনাথ চির-প্রাসঙ্গিক, তাঁর উচ্চারণ চির-অমোঘ। সেটাই আরেকবার প্রমাণ হল আমার কাছে। আজ তাই আবার বলি, ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ/ হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহ’। দেশ ও বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘোর বিপর্যয়ের সঙ্গে যুঝতে এই শক্তিরই আজ মানুষের বড় প্রয়োজন।  

অংশুমান কর

১৬ মার্চ থেকেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়ে যায় লকডাউন। রাজ্যেও বন্ধ হয়ে যায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি লকডাউনের প্রথম সাতদিনে আমি একটি উপন্যাস লিখছিলাম। তখন সত্যি বলতে কি, রবীন্দ্রনাথের কথা মনেও পড়েনি! তারপরে শুরু করলাম একই সঙ্গে দু’ধরনের কাজ। স্কলারদের থিসিস সংশোধন করা আর একটি ইংরেজি বইয়ের সম্পাদনা করা। ইংরেজি লিখতে আমার একেবারেই ভাল লাগে না। জোর করে লিখি। পেশার তাগিদে। আর থিসিস সংশোধন করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য। মাঝে মাঝেই বিরক্তি চলে আসে। এই বিরক্তি থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিলাম রবীন্দ্রনাথের। শুনতে লাগলাম রবীন্দ্রনাথের গান। একদিকে ইংরেজি লেখা সংশোধন করছি আর একইসঙ্গে ইউ টিউবে শুনছি প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের গান। সে তালিকায় যেমন জর্জ বিশ্বাস ছিলেন, সাগর সেন ছিলেন, তেমনই ছিলেন জয়তী চক্রবর্তী। তখনও বসন্ত ছিল। তাই বসন্তের গানই শুনছিলাম বেশি। এরই মধ্যে গোটা দেশে লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। ফেসবুকেও শুরু হয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের ঘনঘন আগমন। তখনই হঠাৎ একদিন দেখলাম এক তরুণীর নৃত্য। তার নাম আমি আজও জানি না। শুধু জানি সে আমার ‘ফেসবুক ফ্রেন্ড’ গুণী মানুষ দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের কন্যা। সে নাচছিল “আজি এই বসন্তে” গানটির সঙ্গে। কী যে অপূর্ব ছিল সেই পরিবেশনা! যেমন নাচ, যেমন আলোর সংযত ব্যবহার, তেমন গানটির নির্বাচন। এখনও আমার ফেসবুকে সেভ করা আছে ওই নাচ, যা আসলে ছুঁতে চাইছিল এই লকডাউনের ফলে কষ্টে আছেন যাঁরা, তাঁদের যন্ত্রণাকে।

       রবীন্দ্রনাথ এরপরেও এলেন আমার এই লকডাউন জীবনে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে কী হবে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে আমাদের ভূমিকা তা নিয়ে একটি লেখা তৈরি করতে গিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছিলাম রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু প্রবন্ধ। বুঝলাম কতখানি সত্যদ্রষ্টা ছিলেন এই মানুষটি। বিজ্ঞানের ভূমিকা নিয়ে যে-কথাক’টি বলে গিয়েছিলেন তিনি, তা আমরা মানতে পারিনি বলেই এসেছে বিপদ।  

       আবারও রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হতে হল বর্ধমান সঙ্গীত সমাজের অনুরোধে। ২৫ বৈশাখ অনলাইনেই পালিত হবে রবীন্দ্রজয়ন্তী। সেজন্য রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা রেকর্ড করে পাঠাতে হবে। কী পড়া যায় ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল একটি কবিতার দিকে। পড়েছি আগে বার দুয়েক। কিন্তু সেইভাবে নজর করে পড়িনি। এইবার কবিতাটি পড়তে গিয়ে চোখ আটকে গেল প্রায় প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতেই। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন এক বৈশাখে। ১৩২৩ সনের ৯ বৈশাখ। কবিতাটির বিষয় নতুন বছর। কিন্তু, নব আনন্দে জেগে উঠে নতুন বছরকে আবাহন করতে বলছেন না রবীন্দ্রনাথ। বরং বলছেন উলটো কথা। আলো নয়, বলছেন অন্ধকারের কথা। কবিতাটির নাম “পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি”। নতুনকে বরণ করতে গিয়ে  লিখছেন যে, নতুন বছর হবে কঠিন এক সময়, সে বহন করে আনবে ‘রুদ্রের ভৈরব গান’। পথে পথে থাকবে ‘কন্টকের অভ্যর্থনা’, ‘গুপ্তসর্প গূঢ়ফণা”। লিখছেন ‘ক্ষতি এনে দিবে পদে অমূল্য অদৃশ্য উপহার’। পড়তে পড়তে মনে হল এ তো ১৩২৩ নয়, এই ১৪২৭-এই লেখা! করোনার কারণে সামনের একটি বছর তো এই রকমই হবে আমাদের জন্য। তবে কী ভয় পাব? রবীন্দ্রনাথ বলছেন, না, ‘ভয় নাই, ভয় নাই’, বলছেন ‘এই তোর নব বৎসরের আশীর্বাদ,/এই তোর রুদ্রের প্রসাদ’। রুদ্রের প্রসাদ? পড়ে স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি। মনে হয়, ক্ষতি এখনও হচ্ছে বিস্তর। কিন্তু এই ক্ষতি অন্তত কিছু মানুষের করপুটে যে-কোনও রকমের বিভাজনকে অতিক্রম করতে পারার স্পৃহার মতো অমূল্য উপহার তুলে দিচ্ছে না কি? সেই তো রুদ্রের  প্রসাদ।

       অন্ধকারের ভেতর দিয়ে যে কবিতার যাত্রা শুরু, সেই কবিতাটি পড়তে পড়তে তাই শেষমেশ যেন পৌঁছে গেলাম আলোর ঠিকানায়। মনে হল জীবন মাঝে মাঝে কঠিন পরীক্ষা তো  নেয়ই। সে-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। হেরে গেলে চলে না। তাই আজ রুদ্রের ভৈরব গানকেই নব বৎসরের আশীর্বাদ মনে করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। যুঝতে হবে কঠিন এই সময়ের সঙ্গে। তবেই ‘কঠিন’ হাতে তুলে দেবে ‘সহজ’ সত্যের মতো কিছু উপহার। মনে হতেই এক অন্যরকম জোর পেলাম। বিপদেও, বুঝলাম, রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের শেষ আশ্রয়। আমাদের সংগ্রামে তিনিই তো সাহস জোগান। এই ক্রান্তিকালেও। 

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

সূর্য থেকে আকাশ যখন
অনেকটা দূর
অন্ধকারে একলা একা রবিঠাকুর
সবার জন্য সুর বাঁধছেন একতারাতে
বন্ধু তোমার আঙুল রাখো
আমার ভাতে
খেতে খেতে সুখ-দুঃখের
গল্প বলি
সেই তো আমার, সেই তো তোমার
গীতাঞ্জলি

সুধীর দত্ত

সেই যে গাঁয়ের নিম্নবুনিয়াদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে  রবিঠাকুর শোলালেন ‘আবদুল মাঝির গল্প’ তখন থেকেই  বেশ একটা সখ্য  জমে উঠেছিল তাঁর সঙ্গে। মাঝির সঙ্গে আলাপ করবার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। তারপর ‘হাট’ কবিতাটি পড়ে এমন একটা অন্তরঙ্গতা জন্মাল যে, মনে হল, তিনি তো আমাদের গাঁয়ে প্রতি শুক্রবারে বসা হাটের কথাই বলেছেন যদিও তিনি বক্সীগঞ্জের পদ্মাপারের একটি হাটের ছবি অক্ষরে এঁকেছেন। নদী তখনও দেখিনি, তবুও বাঁকে বাঁকে ছুটে চলা ছোট নদীকে কল্পনা করি আর দেখি, হাঁটু-জল পার হয়ে চলেছে গরু, গাড়ি আর মানুষজন। ওই ছোট বয়সেই তৃতীয় নয়ন খুলে দিল তাঁর কয়েক পঙক্তির ছোট্ট একটি কবিতা– ‘দেবতার বিদায়’। চমকে উঠলাম, “জগতে দরিদ্র রূপে ফিরি দয়া-তরে /গৃহিহীনে গৃহ দিলে আমি থাকি ঘরে।”

রবীন্দ্রনাথ প্রিয়তর হয়ে উঠলেন, তাঁর ‘সোনার তরী’ পড়ে যখন বুঝলাম কবিতা বস্তুটি আসলে কী ! ‘দুই বিঘা জমি’,  ‘দেবতার গ্রাস’ আর ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’ পড়ে তো আক্ষরিক ভাবে কেঁদেছি। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ আমাকে অধিকার করে নিয়েছিলেন সেই শিশুবেলা থেকেই। তা-ছাড়া প্লেটোশাসিত কৈশোর-যৌবনে প্রেমিক-হদয়ের রবীন্দ্রগান ও কবিতা ছাড়া আর কোনখানে-বা এমনতর আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকতে পারে !

      আর সনাতন ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম-ঐতিহ্য তো তারই পদপ্রান্তে বসে গ্রহণ করেছি। তাঁর ‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধাবলী ও প্রেম-পুজা-প্রকৃতি পর্যায়ের গান আজও আমার কাছে যে কোনও অপৌরুষেয় বা আসমানী কিতাবের চেয়ে কম আদরনীয় নয়।

যশোধরা রায় চৌধুরী

এবারের লকডাউনেও পড়ে দেখছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘রোগীর নববর্ষ’। কী অসামান্য সেই লেখা…

আমার রোগশয্যার উপর নববৎসর আসিল। নববৎসরের এমন নবীন মূর্তি অনেক দিন দেখি নাই।

একটু দূরে আসিয়া না দাঁড়াইতে পারিলে কোনো বড়ো জিনিসকে ঠিক বড়ো করিয়া দেখা যায় না।…

তেমনি যখন শরীর সবল ছিল তখন অবকাশটাকে একেবারে নিঃশেষে বাদ দিবার আয়োজন করিয়াছিলাম। কেবল কাজ এবং কাজের চিন্তা; কেবল অন্তবিহীন দায়িত্বের নিবিড় ঠেসাঠেসির মাঝখানে চাপা পড়িয়া নিজেকে এবং জগৎকে স্পষ্ট করিয়া ও সত্য করিয়া দেখিবার সুযোগ যেন একেবারে হারাইয়াছিলাম। কর্তব্যপরতা যত মহৎ জিনিস হ’ক সে যখন অত্যাচারী হইয়া উঠে তখন সে আপনি বড়ো হইয়া উঠিয়া মানুষকে খাটো করিয়া দেয়। সেটা একটা বিপরীত ব্যাপার। মানুষের আত্মা মানুষের কাজের চেয়ে বড়ো।

এমন সময় শরীর যখন বাঁকিয়া বসিল, বলিল, আমি কোনোমতেই কাজ করিব না তখন দায়িত্বের বাঁধন কাটিয়া গেল। তখন টানাটানিতে ঢিল পড়িতেই কাজের নিবিড়তা আলগা হইয়া আসিল– মনের চারিদিকের আকাশে আলো এবং হাওয়া বহিতে লাগিল। তখন দেখা গেল আমি কাজের মানুষ একথাটা যত সত্য, তাহার চেয়ে ঢের বড়ো সত্য আমি মানুষ। সেই বড়ো সত্যটির কাছেই জগৎ সম্পূর্ণ হইয়া দেখা দেয়– বিশ্ববীণা সুন্দর হইয়া বাজে–সমস্ত রূপরসগন্ধ আমার কাছে স্বীকার করে যে “তোমারই মন পাইবার জন্য আমরা বিশ্বের প্রাঙ্গণে মুখ তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছি।”

আমার কর্মক্ষেত্রকে আমি ক্ষুদ্র বলিয়া নিন্দা করিতে চাই না কিন্তু আমার রোগশয্যা আজ দিগন্তপ্রসারিত আকাশের নীলিমাকে অধিকার করিয়া বিস্তীর্ণ হইয়াছে। আজ আমি আপিসের চৌকিতে আসীন নই, আমি বিরাটের ক্রোড়ে শয়ান| সেইখানে সেই অপরিসীম অবকাশের মাঝখানে আজ আমার নববর্ষের অভ্যুদয় হইল–মৃত্যুর পরিপূর্ণতা যে কী সুগভীর আমি যেন আজ তাহার আস্বাদন পাইলাম। আজ নববর্ষ অতলস্পর্শ মৃত্যুর সুনীল শীতল সুবিপুল অবকাশপূর্ণ স্তব্ধতার মাঝখানে জীবনের পদ্মটিকে যেন বিকশিত করিয়া ধরিয়া দেখাইল।

তাই তো আজ বসন্তশেষের সমস্ত ফুলগন্ধ একেবারে আমার মনের উপরে আসিয়া এমন করিয়া ছড়াইয়া পডিতেছে। তাই তো  আমার খোলা জানালা পার হইয়া বিশ্বআকাশের অতিথিরা এমন অসংকোচে আমার ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিতেছে। আলো যে ওই অন্তরীক্ষে কী সুন্দর করিয়া দাঁড়াইয়াছে, আর পৃথিবী ওই তার পায়ের নীচে আঁচল বিছাইয়া কী নিবিড় হর্ষে পুলিকত হইয়া পড়িয়া আছে তাহা যেন এত কাল দেখি নাই। এই আজ আমি যাহা দেখিতেছি এ যে মৃত্যুর পটে আঁকা জীবনের ছবি; যেখানে বৃহৎ, যেখানে বিরাম, যেখানে নিস্তব্ধ পূর্ণতা, তাহারই উপরে দেখিতেছি এই সুন্দরী চঞ্চলতার অবিরাম নূপুরনিক্কণ, তাহার নানা রঙের আঁচলখানির এই উচ্ছ্বসিত ঘূর্ণগতি…

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  রোগীর নববর্ষ, ১৩১৯

এর পরেও কি বলতে হবে আর কিছু! উনি তো আমাদের কথা কত আগেই বলে দেন!