Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৩

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

দাদাবাদ মৃত হলেও এ কথা স্পষ্ট যে দাদাবাদীদের হৈচৈ এর ভিতরে স্যুররিয়ালিজম-এর বীজ শুধু সুপ্ত ছিল তা নয় ক্রমশ অঙ্কুরিত হয়ে উঠছিল। আর নিয়ম-না-মানা দাদাবাদীরা সুযোগমতো স্যুররিয়ালিস্ট দলে যোগ দিয়েছেন। এ কারণে কেউ কেউ বলেছেন যে দাদাবাদ থেকে স্যুররিয়ালিজম-এ উত্তরণের কারণ ছিল দ্বান্দ্বিকতা্মূলক বা ডায়ালেক্টিক্যাল। দাদা যেখানে ছিল ‘নাস্তি’, স্যুররিয়ালিজম সেখানে নাস্তির নাস্তি—একটা নতুন সদর্থকতা। এ কথাই যেন ধ্বনিত হয়েছিল তাঁদের পত্রিকা ‘স্যুররেয়ালিস্ত বিপ্লব’ এর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে—“ মানুষের অধিকার সম্পর্কে এবার নতুন ঘোষণা জরুরি হয়ে উঠেছে”। (১৯২৪) দাদাইজম থেকে স্যুররিয়ালিজম এর দিকে এই যাত্রার সময়কাল মোটামুটিভাবে ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সাল। এই সময়কালকে বলা হয়ে থাকে la période des sommeils, তন্দ্রার সময়।

আঁদ্রে ব্রতোঁ ১৯২৪ সালে স্যুররিয়ালিজম এর ইস্তাহার প্রকাশ করার আগে যা লিখেছেন সবই স্যুররিয়ালিস্ট ভাবনাজাত। ১৯২১ সালে ফিলিপ সুপো-র সঙ্গে তিনি একটি গদ্য রচনা করেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘লে শাঁ মগনেতিক’ বা চৌম্বক ভূমি। স্যুররিয়ালিস্ট ইস্তাহার-এ তিনি নিজেই লিখেছেন কীভাবে স্যুররিয়ালিজম-এর automatisme psychique pur বা বিশুদ্ধ মানসিক স্বয়ংক্রিয়তা তৈরি হয়েছিল—

“সেসময় আমি খুব ফ্রয়েড বিষয়ে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পরিচিত ছিলাম তাঁর অনুসন্ধান পদ্ধতি সম্পর্কে, যা আমি যুদ্ধের সময় কখনও প্রয়োগ করেছি। আমি চেয়েছি নিজের কাচে আদায় করতে যা একজন রোগীর কাছ ঠেকে জানতে চাওয়া হয়, যেমন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আত্মকথন, কারণ এর ওপর কথকের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, যা যথা সম্ভব ‘কথ্য চিন্তা’কে উপস্থাপিত করে। তখন মনে হয়েছিল, এবং আমি এখনও মনে করি যে চিন্তার গতি ভাষার গতির চেয়ে বেশি নয়, আর তার ফলে জিহ্বা বা কলমের গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।“

এই নিরীক্ষা থেকে অবশ্য স্যুররিয়ালিজম-এর সংজ্ঞা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যাবে না। কিন্তু ১৯২২ সালের নভেম্বরে ‘লিতেরাত্যুর’ পত্রিকায় ব্রতোঁ জানালেন কীভাবে তাঁদের ‘লে শাঁ মাগনেতিক’-এ তাঁদের অটম্যাটিক রচনার মধ্যে মিশেছিল স্বপ্ন এবং ঔৎসুক্য তৈরি হয়েছিল বন্ধুদের মধ্যে। এখানেই ব্রঁতো আমাদের জানিয়েছেন স্যুররিয়ালিজম-এর ধারণা —“ আমরা সহমত হয়েছি যে এর মধ্যে দিয়ে বোঝাব ‘সাইকিক অটম্যাটিজম’, যা কমবেশি স্বপ্নাবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তবে এই স্বপ্নাবস্থার সীমা বেঁধে দেওয়া কঠিন।”

এর পর ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে স্যুররিয়ালিজম এর প্রথম ইস্তাহার, যার কিছু কিছু অংশ আমরা আগেই উদ্ধৃত করেছি এবং আলোচনা করেছি।

স্যুররেয়ালিস্ট কবিদের ‘বিদ্রোহ’ ও উন্মাদনার অসংখ্য পরিচয় ছড়িয়ে আছে ‘লা স্যুরলিয়ালিস্ত রেভোল্যুসিয়ঁ’ পত্রিকায়। অক্টোবর ১৯২৪এ প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল কবি বেঞ্জামিন পেরে ও পিয়ের নাভিল-এর নির্দেশনায়। অলংকরণে ছিলেন শিরিকো, মাক্স আর্নস্ট, আঁদ্রে মাসোঁ, পিকাসো ও মান রে। পরের সংখ্যা জানুয়ারি, ১৯২৫এ খুবই কৌতূহলদ্দীপক রচনা ছিল ‘আত্মহত্যা কি কোন সমাধান?’ এই সংখ্যায় ছিল ব্রতোঁর রচনা, জেলখানাগুলো খুলে দাও, ভেঙে দাও আর্মি’। তৃতীয় সংখ্যাটি আরো চাঞ্চল্যকর। ‘ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রেক্টরদের প্রতি’, ‘পোপের প্রতি সম্ভাষণ’, ‘দলাই-লামার প্রতি সম্ভাষণ’, বৌদ্ধ বিদ্যালয়গুলোকে চিঠি, ‘পাগলাগারদের পরিচালকদের চিঠি’ ছিল এই সংখ্যার আকর্ষণ। সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় গদ্য ও কবিতা, স্বপ্ন, এবং ছবি। চতুর্থ সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ—‘ কেন আমি লা স্যুররেয়ালিস্ত রেভোল্যুসিয়ঁ-র সম্পাদনাভার গ্রহণ করলাম’। এর কারণ পিয়ের নাভিলের এই ঘোষণা যে স্যুররিয়ালিস্ত পেন্টিং বলে কিছু হয় না এবং ব্রতঁ তাঁর সঙ্গে সহমত হননি। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে এই বছর নভেম্বরেই প্রথম স্যুররেয়ালিস্ত পেন্টিং-এর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। পঞ্চম সংখ্যায় স্যুররিয়ালিসম এর দিগবদল লক্ষ করা যায়। স্যুররেয়ালিস্তরা কম্যুনিজম-এর প্রতি তাঁদের আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। এই সংখ্যার সঙ্গে ইস্তাহার জুড়ে দেওয়া হয়েছে, ‘বিপ্লব এখনই কিংবা কখনই নয়’। এই ইস্তাহার দেশপ্রেমের বিরুদ্ধে, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে, এবং মরক্কোয় সংঘটিত হয়ে চলা সাম্রাজ্যবাদী সংঘর্ষের বিরুদ্ধে। এই ইস্তাহারে স্বাক্ষর করেছেন সব স্যুররিয়ালিস্টরাই। ১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় স্যুররেয়ালিস্ত ম্যানিফেস্টো প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত, কম্যুনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক সহজভাবে এগোয়নি। কম্যুনিস্টরাও স্যুররেয়ালিস্টদের সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু মার্ক্সবাদ স্যুররেয়ালিস্ট আন্দোলনকে একটা সংহত চেহারা দিয়েছে এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন ছাড়া স্যুররেয়ালিসমের পক্ষে এক প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠা সম্ভব হত না।

এই সময়, অর্থাৎ ১৯২৫ এর শেষ থেকে ১৯২৯ এ দ্বিতীয় ম্যানিফেস্টো প্রকাশের সময় পর্যন্ত স্যুররিয়ালিস্টদের সৃজনশীলতা থেমে থাকেনি। আঁদ্রে ব্রতোঁ লিখেছেন ‘নাদজা’ (Nadja), যা তথ্যের আধারে রচিত ইতিহাস—তিনি বর্ণনা করেছেন তাঁর জীবনের এক অধ্যায় যেখানে তিনি দেখা পেয়েছিলেন আশ্চর্য রকমের স্যুররিয়ালিস্ট ক্ষমতাসম্পন্ন এক মহিলার। এই গ্রন্থ আমাদের সাধারণ জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে এক সন্দেহের সৃষ্টি করে দেয় পাঠকের মনে। আর কবিতায় তিনি লিখেছেন –

পাথরের টুপিগুলো স্ফটিক হয়েছে

তারা হিম আটকাচ্ছে সজোরে আঘাত করা শিরোস্ত্রাণ দিয়ে

তারপর বিদ্যুতের দারুণ ঝলক

ধ্বংসের পতাকায় আঘাত করে

বালি এখন আর অনুপ্রভ ঘড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়…

পল এলুয়ার লিখেছেন ‘কাপিতাল দ্য লা দুলর’(Capitale de la Douleur), ‘লে দেসু দ্যুন ভি…’(Les Dessous d’une Vie, ou la Pyramide Humaine) ও ‘লামুর লা পোয়েজি’ (L’Amour la Poésie)। তাঁর কবিতায় সহজতা আবেগ ও বিদ্রোহের অনুভূতি পেয়েছে স্ফটিক-স্বচ্ছতা। তাঁর কবিতা শুধু স্যুররেয়ালিসম-এর উচ্চতাই স্পর্শ করেনি, তাঁকে বোদলের-এর পর প্রধান কবিদের মধ্যে বিবেচিত করেছে। ‘লে দেসু দ্যুন ভঁই, য়ু লা পিরামিদ য়ুমেন’ কবিতাগুলো স্বপ্নজাত, স্যুররিয়ালিস্ট রচনা। এই সময় স্যুররেয়ালিস্ট আন্দোলনে ল্যুই আরাগঁ-র ভূমিকাকে ছোটো করে দেখানোর সুযোগ নেই। ১৯২৬ এ প্রকাশিত তাঁর ‘ ল্য পেইজাঁ দ্য পারি’ (Le Paysan de Paris)-র কবিতায় কল্পনাপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বেঞ্জামিন পেরে-র ‘দরমির’(Dormir), ‘দরমির দঁ লে পিয়ের, Dormir dans les Pierres)’, ল্য গ্রঁ ফ..(Le Grand Feu..)-তে প্রকাশিত হয়েছে বাস্তবতার প্রতি উপেক্ষা, তীব্র তির্যকতা ও ফ্যান্টাসির চূড়ান্ত রূপ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত রনে শার-এর ‘আরসেনাল’ (Arsenal)-এর কবিতাগুলো ধরে রেখেছে স্যুররিয়ালিস্টসুলভ অযৌক্তিক চিত্রকল্প। চিত্রকল্পের কথাপ্রসঙ্গে স্যুররিয়ালিসস্ট কবিদের কবিতা থেকে এখানে উদ্ধৃত করছি কিছু পঙক্তি–

অলৌকিক ঘটনার মধ্যে আমি নাচি

সহস্র সূর্যেরা আঁকা হয়ে আছে ভূমির ওপর

(ল্যুই আরাগঁ)

আমাকে বলেছে ওরা ওদিকে সৈকতগুলো কালো

কালো লাভা ছুটে যায় সমুদ্রের দিকে

সমুদ্র ছড়িয়ে আছে উঁচু পাহাড়চূড়ার নীচে

চূড়া থেকে তুষারের ধোঁয়া

(আঁদ্রে ব্রতঁ)

তার চোখ সবসময় সে খোলা রাখে

আমাকে ঘুমোতে দেয় না

প্রকাশ্য দিনের আলোয় স্বপ্নেরা তার

সূর্যকে শুকিয়ে দিতে থাকে

(পল এল্যুয়ার)

বজ্রকে সে শুষ্ক করে দেয়

নিঃশব্দ আকাশে করে বীজ ছড়ানোর কাজ

যদি স্পর্শ করে মাটি, নিজেই ভেঙে যায়

(রবের দেসনস)

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের দ্বিতীয় ইস্তাহার’ বেরিয়েছিল ১৯২৯ সালে।। এটি প্রকাশিত হয়েছিল লা স্যুরেয়ালিস্ত রেভল্যুসিয়ঁ পত্রিকার ডিসেম্বর সংখ্যায়। এই ইস্তাহারের মধ্যে দিয়ে পাঁচ বছর ধরে চলা আন্দোলনকে নতুন করে পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার আলোয় তাকে পরিচালিত করা। পুরোনো কয়েকজন সঙ্গী যাঁরা আন্দোলনের মান বজায় রেখে চলতে পারছিলেন না, তাঁদের সংস্পর্শ এড়িয়ে যাওয়ার জন্যও এই ইস্তাহারের দরকার হয়েছিল। তাঁদের অনেকেও স্যুররেয়ালিসম থেকে দূরে সরে গেছিলেন। যেমন আর্তো, কারিভ, জেরার, মাসোঁ, সুপোল, ভিত্রাক, বারোঁ, দেসনস, নাভিল—কেউ সাহিত্য ছেড়ে সাংবাদিকতার জগতে, কেউ প্রচলিত ধারার মধ্যে গিয়ে সাহিত্যকর্ম করেছেন। এঁদের বাদ দিয়েও আন্দোলনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। ব্রঁত-র মনে স্যুররিয়ালিসম-এর বিশুদ্ধতার ধারণাটি তীব্রভাবে ক্রিয়াশীল ছিল বলেই তাঁর পক্ষে এই পদক্ষেপ করা সম্ভব ছিল। দ্বিতীয় ইস্তাহারে তিনি লিখলেন:

“স্যুররিয়ালিসম-এর পুরোনো ও বর্তমান অনুগামীরা যতই বিতর্কিত বিষয় উত্থাপন করুন না কেন, সবাই স্বীকার করবেন যে স্যুররিয়ালিসম সবসময়ই প্রধানত সাধারণ ও বিশেষ ‘চেতনার সংকট’ এর দিকে এগিয়েছে। আর যখনই তা ঘটছে তখনই আন্দোলনের সাফল্য অথবা ঐতিহাসিক বলয়গ্রাস নির্ধারিত হবে।…স্যুররিয়ালিসম কিছুতেই তার বিশুদ্ধতা থেকে সরে যেতে পারে না।“

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার