Hello Testing Bangla Kobita

3rd Year | 6th Issue

রবিবার, ২৬শে কার্তিক, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | Sunday, 13th Nov 2022

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৪

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

স্যুররেয়ালিস্ত পত্রিকা ‘লা স্যুররেয়ালিস্ত রেভল্যুসিয়ঁ’-র চতুর্থ সংখ্যা (মে, ১৯২৫)-তে প্রকাশিত হয়েছিল আঁদ্রে ব্রতঁ-র লেখা—‘কেন আমি লা স্যুররেয়ালিস্ত রেভল্যুসিয়ঁ-র সম্পাদকের দায়িত্বভার নিজের হাতে নিচ্ছি’। এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ আগের সংখ্যার সম্পাদক পিয়ের নাভিল, যিনি লিখেছিলেন যে স্যুরয়ালিস্ট পেন্টিং বলে কিছু নেই। অথচ ব্রতঁ-র ধারণা বিপরীত। তিনি নাভিলের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে প্রবন্ধ লিখলেন ‘স্যুররেয়ালিসম ও পেন্টিং’ নামে। আর এই বছরেই প্রথম স্যুরিয়ালিস্ট ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

        ১৯২৫ সালের জুলাই মাসে খ্যাতনামা কবি পল ক্লোদেল, যিনি তাঁর কবিতায় ক্যাথলিক ধ্যানধারণারপ্রকাশ করে থাকেন, ‘কমেদিয়া’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে দাদাইজম বা স্যুররিয়ালিজম-এর আর কোনো অর্থ নেই সমকামিতা ছাড়া। এর পরপরই ‘জাপানে ফ্রান্সের অ্যাম্বাসাডার মসিয়্য পল ক্লোদেলের প্রতি খোলা চিঠি’তে স্বাক্ষর করে ২৮ জন বিশিষ্ট কবি-লেখক ও শিল্পী জানান–“লিখুন, প্রার্থনা করুন আর আবোলতাবোল বকুন”। এই খোলা চিঠি ছেপে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়—“আপনাকে একজন নীতিবাগীশ ও বজ্জাত লোক হিসেবে আমরা ঘোষণা করছি”। একই সময়ে প্রায় স্যাঁ-পল রু নামে একজন অবহেলিত কবি যাঁকে স্যুররিয়ালিস্টরা পছন্দ করতেন, প্যারিসে ফিরে আসেন। তাঁর সম্মানে স্যুররিয়ালিস্টরা ক্লোজারি দ্য লিলা নামের এক অখ্যাত কাফেতে ভোজসভার আয়োজন করে সাহিত্য জগতের নামী মানুষদের সেখানে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। সবাই আসন গ্রহণ করে দেখেন যে প্রত্যেকের ন্যাপকিনের নীচে রাখা আছে পল ক্লোদেলকে লেখা খোলা চিঠিটি। সেই সঙ্গে স্যুররিয়ালিস্টদের ডিনার-পরবর্তী বিদ্রোহমূলক বক্তৃতার প্রতিবাদ করেন কেউ কেউ এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে পুলিসের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

        এই ঘটনা স্যুররিয়ালিস্টদের কম্যুনিজমের আরো কাছাকাছি নিয়ে যায়। ‘লা রেভোল্যুসিয়ঁ স্যুররেয়ালিস্ত’ পত্রিকায় এক ইস্তেহারে লেখা হয়েছে—‘বিপ্লব এখনই কিংবা কখনই নয়’। এই ইস্তেহার লেখা হল দেশপ্রেমের বিরুদ্ধে এবং মরক্কোয় ফ্রান্সের উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। এই ইস্তেহারে স্বাক্ষর করেছেন স্যুররিয়ালিস্টরা ও বিপ্লবী ধ্যানধারণার সঙ্গে যুক্ত ক্লার্ত, করসপঁদাঁস, ফিলোজফি ইত্যাদি পত্রপত্রিকার ব্যক্তিরা। এখন থেকে মার্ক্সীয় নীতিগুলো স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলনকে সংহত করেছে এবং দিশা দেখিয়েছে। এই কারণে কেউ কেউ মনে করেন যে মার্ক্সীয় প্রভাবের কারণেই স্যুররিয়ালিজম এতদিন সক্রিয় থেকেছে।

       তবে ১৯২৫ এর শেষ দিক থেকে ১৯২৯ এ দ্বিতীয় স্যুররেয়ালিস্ট মানিফেস্টো  প্রকাশ পর্যন্ত কম্যুনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক একই রকম থাকেনি। কম্যুনিস্টরা কবিলেখকদের দেখেছে সন্দেহের চোখে। আবার তাঁদের প্রতি দুর্বলতাও দেখিয়েছেন তাঁরা। স্যুররিয়ালিজম ক্রমশ যে একটি সাংস্কৃতিক শক্তি হয়ে উঠছেকম্যুনিস্টরা তা লক্ষ করেছেন। এই সমইয়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ব্রতঁর ‘নাদজা’, পল এল্যুয়ার-এর ‘কাপিতাল দ্য লা দুল্যর’, ‘লে দেসু দ্যুন ভি’, ‘লামুর লা পোয়েজি’, বেঞ্জামিন পেরে-র ‘দরমির’, ‘দরমির দাঁ লে পিয়ের’, ‘ল্য গ্রঁদ ফ্য’, রনে ক্রভেল-এর ‘লেস্পিরিত কন্ত্র লা রেজোঁ, লুই আরাগঁ-র ‘পেইজাঁ দ্য পারি’, রবের দেসনস-এর ‘লা লিবার্তে উ লামুর’ এবং মাক্স আর্নস্ট-এর উপন্যাস ‘লা ফাম ১০০ তেত’। এইসব রচনায় বিদ্রোহের যে উচ্চ সুর ধরা পড়েছিল, তা একেবারেই অভিনব। এই পাশাপাশি স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রকরদের ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর তাতে অংশ নিয়েছেন আর্প, শিরিকো, আর্নস্ট, মিরো, পিকাসো, মান রে, ইভ তাঁগু প্রমুখ শিল্পীরা।

        আঁদ্রে ব্রতঁ-র ‘নাদজা’  তাঁর জীবনের বাস্তব ঘটনাবলির কথা। তাঁর জীবনের এক পর্বে তিনি এক অবিস্মরণীয় নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। এই নারীর মধ্যে অদ্ভুত সব স্যুররিয়ালিস্টিক গুণাবলি ছিল। ব্রতঁ-র এই কাহিনি পড়ে পাঠকের মনে জীবনের স্বাভাবিকতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে পারে। এই কাহিনির দুঃখজনক দিক হল নাদজা শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে যান। আর গ্রন্থটি শেষ হচ্ছে লুনাটিক এসাইলাম ও সেখানকার কর্মীদের সম্পর্কে ব্রতঁ-র বীতশ্রদ্ধ সমালোচনা। এই গ্রন্থ প্রকাশের পরে বিভিন্ন মেডিক্যাল জার্নালে ব্রতঁ-কে আক্রমণ করা হতে থাকে। সব আক্রমণের জবাব দিতে তিনি লেখেন ‘মানসিক রোগের চিকিৎসা ও স্যুররেয়ালিসম’ নামের একটি প্রবন্ধ। তিনি তাঁর সমালোচনায় স্থির থাকেন।

        স্যুররিয়ালিজম-এর সঙ্গে প্রথম থেকেই চিত্রকরদের যোগ। আধুনিক চিত্রকলায় পিকাসোর মতো চিত্রকরদের গুরুত্ব নতুন কওরে বলার অপেক্ষা রাখে না, তবে বলা দরকার এঁরা ছিলেন প্রধানত স্যুররিয়ালিস্ট। মাক্স আর্নস্ত্ এর ‘ইস্তোয়ার নাত্যুরেল’ ছবি কাঠ ও পাথরের অসমতলে কাঠকয়লার ওপর সাদা কাগজ ঘষে বানানো ছবিকে যথার্থ স্যুররিয়ালিস্টিক বলা হয়েছে। তাঁর ছবিতে আঁচে পাখি সূর্য দেবতাদের মিথ, স্বপ্নের ভিতরে আসা বন্যপ্রাণ ও প্রাণী। আর এক নামী স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রকর সালভাদর দালি। তাঁর ছবির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯২৯ সালের নভেম্বরে।

        পল এল্যুয়ার-এর কবিতায় আবেগ ও বিদ্রোহের স্বচ্ছতা ও কোমলতার স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি করে লক্ষণীয়। স্যুররিয়ালিস্ট কবিতাকে এক উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন এল্যুয়ার। তাঁর ‘লে দেসু দ্যুন ভি, উ লা পিরামিদ য়্যুমেন’ স্বপ্ন, স্যুররিয়ালিস্ট রচনা ও কবিতার সমাহার। ভূমিকায় এল্যুয়ার লিখেছেন—“কবিতার ব্যবহারহীনতা, স্পর্শযোগ্য পৃথিবী স্যুররিয়ালিস্ট রচনার বাইরে রাখা থাকে, আর সবচেয়ে উচ্চমৃদু আলো সেই উচ্চতায় জ্বলে, আর সেখানে মন যে স্বাধীনতা পায় তার পরিমাপ স্বপ্নেও করা যায় না।” আরব এক কবি লুই আরাগঁ-র ভূমিকা কোনোভাবেই স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে খাটো করে দেখা যাবে না। এই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক ছেদ করেছিলেন একসময় সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। কিন্তু তাঁর ‘ল্য পেইসাঁ দ্য পারি’ স্যুররিয়ালিস্ট কল্পনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কবি হিসেবে এঁদের সমতুল না হলেও বেঞ্জামিন পেরে ছিলেন আন্দোলনের অগ্রপথিক। স্যুররিয়ালিস্ট বিপ্লব পত্রিকায় পেরে-র একটা ছবি ছাপা হয়েছিল, যার নীচে লেখা হয়েছিল—“আমাদের লেখক বেঞ্জামিন পেরে এক যাজককে অপমান করছেন”। ফ্যান্টাসি তাঁর রচনার বিষয়। বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি পেরে-র ঘৃণা ছিল অপরিসীম, আর তা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রচনায়। আধুনিক সমাজকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে রনে ক্রভেল।তাঁর উপন্যাস মাত্রই যেন স্বপ্ন, যা বাস্তবতার সীমানা ছাড়িয়ে এক গভীর অস্তিত্বের কথা বলে। ১৯২৯ সালেই প্রথম কাব্যগ্রন্থ বেরোয় রনে শার-এর—‘আরসেনাল’। স্যুররিয়ালিস্টদের মতো অনেক যুক্তিবিবির্জিত চিত্রকল্পের আবির্ভাব ঘটেছে তাঁর কবিতায়। এভাবেই স্যুররিয়ালিস্টরা সৃষ্টিশীলতার বিশেষ পদ্ধতিকে বেছে নিয়েছিলেন এবং তার মধ্যে দিয়ে প্রত্যেকেই তাঁরা নিজের নিজের সৃষ্টি-স্বাতন্ত্র ও বৈচিত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। শুধুমাত্র ‘অটোম্যাটিজম’-এর সরল ব্যাখ্যায় তাঁদের সৃষ্টিকে বোঝা যাবে না।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার