Hello Testing

3rd Year | 8th Issue

১লা মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | 15th January, 2023

প্রচ্ছদ কাহিনী, ধারাবাহিক গদ্য, ছোটোগল্প, গুচ্ছ কবিতা, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, স্বাস্থ্য, ফ্যাশান ও আরও অনেক কিছু...

ধা রা বা হি ক । পর্ব ৮

সৈয়দ কওসর জামাল

jamal_sm

স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলন ও ফরাসি কবিতা

আমরা আগের পর্বে দেখেছি কীভাবে ‘লাল দূর্গ’ নামের একটি কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের জন্য ফরাসি পুলিস আরাগঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। মূলত দুটি অভিযোগ ছিল আরাগঁ-র বিরুদ্ধে। এক) হত্যার প্ররোচনা এবং দুই) সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ভাঙার প্ররোচনাদান। ১৯৩২ সালের জানুয়ারিতে এই ঘটনার পরে স্যুররিয়ালিস্ট কবিরা বিবৃতি দান করে আরাগঁর পাশে দাঁড়ান এবং অভিযুক্ত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হন। প্রতিবাদের জন্য হোক কিংবা ব্যাপারটিকে আর গুরুত্ব দিতে না চাওয়ার জন্যই হোক, ফরাসি প্রশাসন আরাগঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু কবিলেখকদের প্রতিবাদ ঘিরে তাঁদের মধ্যেই অনৈক্যের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি, স্যুররিয়ালিস্টরাও প্রতিবাদে এক হতে পারেননি। ‘ল্যুমানিতে’র মতো পত্রিকা আরাগঁর কবিতাকে স্যুররিয়ালিস্টদের আত্মপ্রচারের কায়দা বলে মনে করেছে।বুর্জোয়া নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে স্যুররিয়ালিস্টরা প্রতিবাদ করেন না, কিন্তু তাঁরা একটি লিরিক্যাল কবিতা দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছেন; আমরা কাব্যকর্মের দমনমূলক যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করি-—এই হল পত্রিকাটির মত। প্রায় একই মত প্রকাশ করে রম্যাঁ রলাঁ স্যুররিয়ালিস্টদের প্রতিবাদপত্রে স্বাক্ষর করেননি।

        লেখকদের মধ্যে এই বিষয়ে এতরকম মতামত তৈরি হয় যে আঁদ্রে ব্রতোঁ ‘কবিতার দুরবস্থা’ নামে একটি পুস্তিকা লিখে ফেলেন। এতে তিনি ‘ল্যুমানিতে’র বক্তব্য ও অন্য সব মতের পর্যালোচনা করেন এবং দাবি করেন যে এই সবকিছু ঘটছে কারণ লেখকরা ফ্রান্সে সরকারি দমননীতিকে গুরুত্ব দিতে চান যে কারণে আরাগঁর বিষয়টিকে ব্যতিক্রমী মনে করছেন। তিনি বলেন যে স্যুররিয়ালিস্টরা বৈপ্লবিক প্রোপ্যাগান্ডায় বিশ্বাস করে না।

        ঠিক এই সময় ফ্রান্সের বিপ্লবী শিল্পী ও লেখকদের সমিতি গড়ে ওঠে। এই সংগঠন তৈরির ফলে স্যুররিয়ালিস্টদের একটা অংশ, যার মধ্যে ছিলেন আরাগঁ, জর্গ সাদুল, বুনুয়েল, পিয়ের য়ুনিক ও মাক্সিম আলেকজান্দ্র, সমিতিতে যোগ দিলেন। এঁরা বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছেন যে আঁদ্রে ব্রতোঁর পুস্তিকা প্রকাশের সঙ্গে আরাগঁর কোনোসম্পর্ক নেই। আরাগঁর নাম উল্লেখ করে এই বিবৃতি প্রকাশের ফলে ব্রতোঁ অনুসারী স্যুররিয়ালিস্ট কবিতা সরাসরি আরাগঁঅকে আক্রমণ করে আর একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার নাম ‘ক্লাউন (আরাগঁ বিষয়ের সমাপ্তি)’। এই পুস্তিকায় স্বাক্ষর করেন রনে শান, রনে ক্রভেল, তাঁগু, সালভাদর দালি, পল এলুয়ার, মাক্স আর্নস্ট, ত্রিস্তাঁ জারা প্রভৃতি স্যুররিয়ালিস্ট। 

        আরাগঁ-পর্ব ঠেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, আর তা হল, কম্যুনিস্ট প্রভাবে কবিরা কি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে ব্যবহার করে সরাসরি ‘প্রোপ্যাগান্ডা’ কবিতা লিখবেন? কোনো কোনো স্যুররিয়ালিস্ট বললেন, হ্যাঁ, তাই লিখতে হবে। কিন্তু আরাগঁ, সাদুল, আলেকজান্দ্র প্রমুখ লেখকেরা এই মতের বিরোধিতা করলেন।

        কবিতা ও শিল্পের জগতে স্যুররিয়ালিজম হল একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংশ্লেষ, আর স্যুররিয়ালিস্টরা চেয়েছেন এক নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে। তাঁদের কাচে কখনই প্রত্যাশিত নয় যে তাঁরা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়কে মুখ্য আলোচনার হিসেবে দেখবেন। ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টি স্যুররিয়ালিস্টদের কাচে তেমনই প্রত্যাশা করেছে। তাঁরা যে ধর্মঘট, মিছিল ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হননি সেটা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরাও বিপ্লবের পক্ষে থেকেছেন। আরাগঁর ‘রেড ফ্রন্ট’ কোনো স্যুররিয়ালিস্ট কবিতা নয়, প্রচারমূলক রচনা বললে দোষ দেওয়া যাবে না। কিন্তু কাব্যক্ষেত্রে বুর্জোয়া সরকারের নাক গলানোও অনেকের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়েছিল।

        আরাগঁ বিতর্ক ছাড়াও ১৯৩২ সাল স্যুররিয়ালিজম-এর পক্ষে বেশ ঘটনাবহুল সময়। এই সময় প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য অনেক স্যুররিয়ালিস্টসৃষ্টিকর্ম। যেমন, আঁদ্রে ব্রতোঁর ‘ল্য রেভলভার আ শেভো ব্লাঁক’ ও ‘লে ভাস কম্যুনিকান্ট’, রনে ক্রভেলের ‘ল্য ক্লাভেস্যাঁ দ্য দিদেরো’, সাল্ভাদর দালির চিত্রনাট্য ‘বাবায়ু’, পল এলুয়ার-এর ‘লা ভি ইমেদিয়েত’, ত্রিস্তাঁ জারার ‘য়ু বোয়াভেঁ লে লুপ’ প্রকাশিত হয়েছে এইসময়। আর বেরিয়েছে ‘কোয়ার্তার’ নামের স্যুররিয়ালিস্ট পত্রিকার নতুন সংখ্যা।

        ব্রতোঁ ‘লে ভাস কম্যুনিকান্ট’ এ স্যুররিয়ালিজম-এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ করেছেন, বিশেষ করে স্যুররিয়ালিস্টদের স্বপ্ন-ব্যাখ্যান, কারণ স্যুররিয়ালিস্টদের ধারণা মানবজীবনের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে স্বপ্নজীবন । এই স্বপনজীবনকে বস্তুনিষ্ঠভাবে এবং দ্বন্দ্বগত বস্তুবাদের নিরিখে ব্যাখ্যা করা যায়। ব্রতোঁ পুনরায় এই রচনায় বস্তুজগতের সঙ্গে অন্তর্জগতের আদানপ্রদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

        পল এল্যুয়ার-এর ‘তাৎক্ষণিক জীবন’ ও ‘লা রোজ প্যুব্লিক’ কবি হিসেবে তাঁকে ইউরোপীয় কবিদের সামনের সারিতে দাঁড় করিয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থদুটি রচিত হয়েছে স্যুররিয়ালিস্ট আদর্শ মেনে। তাঁর আগের স্যুররিয়ালিস্ট গ্রন্থ ছিল ‘কাপিতাল দ্য লা দুলর’ ( দুঃখের মূলধন) যা ছিল কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলন।তিনি শুধু নিজে কবিতাই লেখেননি, স্যুররিয়ালিস্ট নন্দনতত্ত্ব নির্মাণেও ব্রতোঁর সঙ্গী হয়েছেন। অনেকের ধারণা স্যুররিয়ালিস্ট দলে প্রকৃত কবি ছিলেন পল এল্যুয়ার। স্বাধীনতার কবি এল্যুয়ার। তিনি লিখেছেন—

        আমি জন্মেছিলাম তোমাকে জানব বলে

        তোমাকে তোমার নাম দিতে

        স্বাধীনতা।

        ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত স্যুররিয়ালিস্টরা খুব বেশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেননি, কিন্তু এবার দেখা গেল যে বৃহত্তর জনসাধারণের জন্য তাঁরা প্রকাশ করেছেন নতুনসুসজ্জিত পত্রিকা Minotaure, আর পত্রিকাটি অচিরেই জনপ্রিয় হয়। পল ভালেরির কবিতার পাশে ছাপা হয়েছে সেজান-এর নিবন্ধ। পরপর সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকাটির। ব্রতোঁ লিখেছেন পিকাসোর ছবি সম্পর্কে। তাঁর রচনার অন্যান্য বিষয় ছিল ‘অটোমেটিক বার্তা’, ‘সৌন্দর্য’ ইত্যাদি।

        ১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে ব্রতোঁ ব্রাসেলস ভ্রমণ করেন। সেখানে ইতিমধ্যেই শিল্পী রনে মাগ্রিত পল নুজে প্রমুখের আগ্রহে স্যুররিয়ালিস্ট কবিশিল্পীদের দল গড়ে উঠেছে। ব্রাসেলস এ ব্রতোঁ অনেকগুলো ভাষণ দিয়েছেন স্যুররিয়ালিজম বিষয়ে, তিনি স্যুররিয়ালিজম-এর বর্তমান প্রবণতাগুলো বিষয়েও কথা বলেছেন। এই সব বক্তৃতা ‘কেস-ক ল্য স্যুররেয়ালিসম’ নামে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।

        ব্রোতোঁ, এল্যুয়ার, বেয়ামিন পেরে আরো অনেক দেশে গেছেন। আর এভাবেই স্যুররিয়ালিজম আন্দোলন পৃথিবীর অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ক্রমশ

আরও পড়ুন...