Hello Testing Bangla Kobita

উ জ্জ্ব ল পা ঠ । পর্ব ১

এই সংখ্যায় ষাটের দশকের কবি সুশীল ভৌমিকের কবিতা পাঠ করেছেন তরুণ কবি সেলিম মণ্ডল। প্রতি পর্বে  আমরা তাঁর কাছ থেকে শুনব এমনই আরও  উজ্জ্বল মানুষদের কবিতার কথা। ধন্যবাদ সেলিম।

সে লি ম   ম ন্ড ল

ভাষাহীন বেদনার ভাষা: সুশীল ভৌমিক

ভাষা ভুলে গেলে
গলগণ্ড দিয়ে কবিতা লিখব, তোমরা
পড়বে আর হাসবে সবসময়, যখনই মনে পড়বে
এভাবে ক্রমশ জুড়ে ফেলবে বন—

রাস্তা, পার্ক থেকে মাছের বাজার

তোমাদের গ্রন্থিতে ঘুম, সে-ঘুমও
হাসবে আমার কবিতার কথা মনে করে

—সুশীল ভৌমিক

আমাদের অন্ধকার কি কখনো কাটে? আলোর রক্তাক্ত দিনগুলোতে নাও ভাসিয়ে বহুদূর চলে যায় যে ঘরবাড়ি, সেখানে কেউ কি

পেতেছিল মাথা? শাদা তুলোর ব্যান্ডেজ নিরাময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে নিল বালিশের যৌনযাপন। ঘুম হল। গভীর ঘুম হলো কাদার মতো। তবুও আমরা কেঁদে উঠলাম না। আমরা পারলাম না, নক্ষত্রের দিনগুলোতে তারাগোনায় ব্যস্ত হতে। সাজানো আলোয় টুনি বালবের গার্হস্থ্যতা— আমাদের চোখকে করে দিল আরও অন্ধ। এই বোধহয় কবির নিয়তি। কবিতার জোছনা এতটাই অলৌকিক!

ষাটের দশকের প্রচারবিমুখ শক্তিশালী কবি সুশীল ভৌমিক। সম্ভবত ফেসবুকেই কারো পোস্ট থেকে নজরে এসেছিল তাঁর কবিতা। কিন্তু এই কবির বই কোথায় পাব? খোঁজ করে জানতে পারি কবিতা ক্যাম্পাসের অলোকদা, মানে অলোক বিশ্বাস সুশীল ভৌমিকের নির্বাচিত কবিতার বই করেছেন। তখন প্রভাতদার সঙ্গে আলাপ ছিল না। উনি আশ্চর্য হয়েছিল। আমার বয়স কত, কী করি, কেন সুশীল ভৌমিক পড়তে চাই— নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকেন। সালটা সম্ভবত ২০১৬। তারপর একদিন কফি হাউসের সামনে সাক্ষাৎ করে বইটি সংগ্রহ করি…

‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থে কবি লিখেছেন— “আমি কবিতা লিখে কখনও তৃপ্তি পেতাম না। ছিঁড়ে ফেলে দিতাম। এমন একটি কবিতাই প্রথম ছাপা হয় কলকাতার একটি পত্রিকায়। পরবর্তীকালে অসংখ্য পত্র পত্রিকা, যাদের প্রচ্ছদ ও লেখাগুলো এখনো উঁকি মারে— আমার প্রকাশিত বহু কবিতা সমেত সেগুলো ঝাঁকামুটের মাথায় তুলে দিয়েছি।  না কোনো পাণ্ডুলিপি নকল করার অভ্যেস আমার কোনোদিন ছিল না।”

একজন কবিকে বোধহয় জীবদ্দশায় এমনই সন্ন্যাসী হতে হয়। না হলে মোহ, ধ্যানভঙ্গ করে। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি, তবু’ প্রকাশিত হয় ১৯৯১ তে। তারপর ২০০৪ সালে নির্বাচিত কবিতা। কবির আর কোনো কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর পর পাওয়া যায়নি কোনো অপ্রকাশিত বা অগ্রন্থির কবিতা। হয়ত কোনো মুটের মাথায় সেই তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিত যাত্রায় গেছেন। 

বইটি খুলে প্রথম কবিতার প্রথম তিনলাইন পড়ি—

“স্ট্যাম্প সাইজের হরনাথবাবু যাচ্ছেন—

তার সাথে কথা হয় আমার সরষে সাইজের সব—

প্রতিবন্ধী রকমের কথাবার্তা”

এরপর সঙ্গে সঙ্গে বইটা বন্ধ করে দিই। এ কী আশ্চর্য রকমের উপমা ব্যাবহার? বাংলা কবিতা পিছিয়ে আছে? একজন ষাটের কবি যখন তাঁর কবিতাকে এভাবে ভাঙতে ভাঙতে নিজস্ব বাড়ি তৈরী করছেন, তখন আমাদের আফসোস কীসের?

বাড়িঘর ভাবতে গিয়ে ঘুম পায়, গভীরতা পায়

বাড়ি মানে…

মাঠে আমি, দূরে সব লোকজন

নেকড়ের দাঁতে তখন সরোদ বাজছিল

বাড়ি মানে মাথায় স্মৃতিশূন্য খুলি, রোদা অনুভব

যা কিনা বেজে ওঠে অতিসূক্ষ্ম অতলের

                                  কাছে…

আয়নাগুলো কথা বলে জল কথা বলে, আমি

থাকি একা শূন্য আমার গভীরে

                                      (বাড়ি)  

কবিতাটি পড়তে গিয়ে আরও চমকে উঠলাম। আমরা কেন বাড়িকে এভাবে ভাবতে পারি না। বাড়ি মানেই কি সংসার, মানুষজন, স্বাচ্ছন্দ্য দিনযাপন? বাড়ি মানে তো সত্যিই ‘মাথায় স্মৃতি শূন্য খুলি’। আমাদের পাওয়া। না-পাওয়ার একটা নীরব মাঠ, দূর থেকে যা সকলে দেখে। আর নেকড়ের দাঁতে বাজে সরোদ। আমরা শস্যভর্তি মাঠ নিয়ে এখানেই পারি শূন্যে, নিজের গভীরে। এখানেই একমাত্র আমরা হারিয়ে যেতে পারি। সুশীল ভৌমিকের এই বাড়িটি কি কখনো আমাদের বাড়ি হয়ে উঠেছে? হয়ত, হয়নি। হওয়ানোর চেষ্টা করিনি। ইঁট-বালি-সিমেন্টের বাড়ি আমাদের আশ্চর্য বাড়ি হয়ে উঠেছে। আর সেজন্যই হয়ত আমরা ছুঁতে পারিনি তাঁর কবিতার অন্তর…  

কবিতায় তাঁর এই উপমা ব্যাবহার অত্যাশ্চর্য লাগে। একজায়গায় তিনি লেখেন, “তবলার মতো বড়ো বড়ো ফোসকা পড়েছে গালে”। এই লাইনটির কথা ভাবুন। যেন চোখের সামনে ফোসকা আর তবলা একসঙ্গে ভেসে উঠছে। আর তার সাদৃশ্যতার চিত্রকল্প আমাদের ভিতর গান হয়ে বাজছে। কবিতায় উপমা যথাযথ ব্যাবহার হলে তার সুর আমাদের ভিতর দ্রিমি দ্রিমি বাজে। আরও কয়েকটি উপমার ব্যাবহার দেখুন—

“নখ ও ঘুষির বিয়েবাড়ি আমার বাহুদ্বয় জড়িয়ে ধরেছে”

বা

“এক হিজড়ে আবহাওয়ায় অদ্ভুত মানুষ হাঁটি”

বা  

“তুমি হাত দিয়ে ছেঁড়া অন্ধকারের চামড়া—/ ভেতরে গল্‌গলে ভেতো কুমড়োর ঢিবি/ যাচ্ছে— এই তোমার অদৃষ্ট—”

বা

“কমলালেবু ভেবে ধরলাম দুই ঠগের দু-হাত—/ জানি কমলালেবু স্বাস্থ্য ভালো রাখে/ খেতেও সুস্বাদু—”

কবিতায় এমন অজস্র লাইন তিনি ব্যাবহার করেছেন। মনে হয়— তিনি একজন পেন্টার। দালি, পিকাসো, নন্দলাল বসু একত্রে। সুরিয়্যালিজমকে এনেছেন মাটির সোঁদা গন্ধের ভিতর। ওখানেই যেন অঙ্কুরোদগম হয়ে গাছ হয়েছে। ফুল ফুটছে। পাখি বসছে। আর প্রসারিত হচ্ছে ছায়া। 

সুশীল ভৌমিকের কবিতায় প্রেম-বিষাদ ধরা দিয়েছে প্রকটভাবে। কিন্তু তিনি তার পরিধিটাকে এতটাই বিস্তৃত করেছেন আমাদের প্রবেশ করতে গেলে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। তিনিই বলতে পারেন “শান্তিপুরের লোকালে চলে যাচ্ছে, তাপসী/ একগাদা গোলাপ দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে আমার ভালোবাসা” অথবা “প্রতিদিন সোনার দুঃখ পড়ে থাকে ঘরের চৌকাঠে”। যে বিষাদ, প্রেম আমাদের অস্থির করে তোলে, তাকে তিনি থিত করে রেখেছেন। যা বুদবুদ করে চুইয়ে পড়লেও গড়িয়ে পড়ে না। ভিতরে আবার জমাট বাঁধে।  

এই আত্মানুভবের কবি থাকতেন বহরমপুরের খুব কাছেই সারগাছি রামকৃষ্ণ আশ্রমের আগেই ৭৭/১ নম্বর একতলা বাড়িতে। পেশায় শিক্ষক ছিলেন। ‘পোয়েট্রি ইন্টারন্যাশানাল’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। অমিতাভ মৈত্রের সাপলুডো থেকে জেনেছি, তিনি লিখতেন ঘোরের মধ্যে। একটু ব্যঘাত হলে অসমাপ্ত কবিতার পাতাটি ছিঁড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলে দিতেন জানালার বাইরে। কখনোই লেখার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতেন না।

কবি সুশীল ভৌমিকের কবিতার মূল্যায়ন হয়নি। আমরা এখন কবিতার নির্মাণ নির্মাণ করে নিজের বানানো লাল বলটা আকাশে ছুঁড়ে নিজেই ক্যাচ ধরি। আর সফলতার আত্মপ্রচারের মিছিলে বড়ো বড়ো ট্রফি নিয়ে আসি। কিন্তু নির্মাণকে যদি যাপনে আত্মস্থ না করা যায়, তাহলে একজন কবির মুন্সিয়ানা কোথায়? সাদা কাগজে বাঘ এঁকে হালুম হালুম করার জন্য কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাগে না। সুশীল ভৌমিক শব্দ ব্যবহার থেকে নতুন শব্দ তৈরী, নতুন বাক্যের সিনট্যাক্স তারপর ভাবনার পারদে তাকে চুবিয়ে নেওয়ার উত্তাপটুকু আস্বাদন করতে পারতেন বলেই ৬৪ পাতার কালো অক্ষরে চোখ নিজেই দূরবীন হয়ে আবার একটা স্বচ্ছ ক্যামেরার প্রতিলিপি হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় এই নিজস্ব সিগনেচার রয়েছে বলেন হয়ত, দু-একজন পাঠক এখনো তাঁর খোঁজ করেন। বই না পেয়ে সযত্নে রেখে দেন জেরক্স কপি।

তিনি কোন ‘রবারের কৃত্রিম আকাশে’ আমাদের শোনাতে চেয়েছিলেন, “ঝরবার জন্য একটা/ বোঁটার দরকার”। কিন্তু যার গাছই নেই সে কীভাবে পাতায় বোঁটার সন্ধান করবে?

একজন কবির কাছে নিরাময় কী? ডাক্তার, ওষুধ? নাহ্‌… শুধুই কবিতা। তিনি কবিতাতেই বেঁচে থাকতে পারবেন বলেই, মৃত্যুর ভয়ার্ত অন্ধকারকে আলোর মতো ভাবতে পারেন। দেখতে পারেন— হাসপাতালের ছাদে ঝরে পড়া ফুল।

হাসপাতালের ছাদে ঝরে পড়ো ফুল।

উঠে দাঁড়াক, শায়িত স্ট্রেচার;

ইসিজি মেশিন, হেসে ওঠো, যেন করকরে

                কোনও চলচ্চিত্র দেখতে গিয়েছে—

আর এখানে ঝরে-পড়া ফুলের বাগান উদ্বোধন করো;

ওই শাদা গম্ভীর মাকড়শা—

মায়া মুখার্জির মতো রবিবারে এই ঘর আলো করে দাও,

হাত ধরো;

ঘুরে-ঘুরে দ্যাখো, কী সুন্দর ভাল থাকা যায়;

বিছানার চাদরগুলি শান্তিপুরী— কী শোভন রুচিতে সাজানো।

লিফটে্‌ ছ-তলায় উঠতে-উঠতে কার না বাড়ির কথা মনে হয়!

                                                (হাসপাতাল)

ঋণ: সমীরণ ঘোষ

আরও পড়ুন...