Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 2nd Issue

রবিবার, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th July 2021

উ জ্জ্ব ল পা ঠ ।  পর্ব ৫

সে লি ম   ম ণ্ড ল

ভাতঘুমে জেগে থাকা কবি: কল্যাণ মিত্র

 

ডিসেম্বরের সন্ধে, পকেট থেকে হাত বের করার উপায় নেই। সোয়েটারের ওপর একটা চাদর পরেও আমরা ঠকঠক করে কাঁপছি। হরিসভা মন্দিরের ভিতর শীত গলে তরল হয়ে গেছে, চতুর্দিকে ফুটছে উষ্ণতার তরলবাষ্প। পুরুলিয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা চলছে। সমস্ত লিটলম্যাগকর্মীরা এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। ভালোবাসা আর আন্তরিকতা এখানে হাড় কামড়ানো শীতকেও চাবুক মারে। মেলা ঘুরতে ঘুরতে ‘সর্বনাম’ পত্রিকার টেবিলে একটি ধূসর মলাটের কবিতার বই চোখে পড়ে। আশি পাতার বই। দাম মাত্র পঞ্চাশ টাকা। কোনোরকমে পকেট থেকে হাতটা বার করে কয়েকটা কবিতা পড়তে থাকলাম। পড়তে পড়তে অনুভব করলাম— আমার আঙুলে লেগে থাকা বরফ কখন কর্পূরের মতো উবে গেছে! পড়ব পড়ব করে বইটি দীর্ঘদিন আলমারিতে পড়েছিল। এরপর এক বর্ষার সন্ধেয় মোমবাতির আলোয় বইটি পড়া শুরু করলাম। সেদিন আমাদের ফ্লোরে কেউ নেই। বিকেল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি। কখন কারেন্ট আসবে ঠিক নেই! হঠাৎ দেখলাম— ঘরটা আলো হয়ে উঠছে । না কারেন্ট আসেনি। কবিতার বোধের আলো যেন প্রবাহিত হচ্ছে। সর্বনাম পত্রিকার সম্পাদক পঙ্কজদা (পঙ্কজ চক্রবর্তী)। পড়া শেষ করি। ওঁর সম্পর্কে খোঁজ নিই। জানতে পারি ওঁর আরও একটি কাব্যগ্রন্থ আছে।

আশির দশকের এই কবি শ্যামনগরে থাকতেন। বর্তমানে থাকেন ব্যাঙ্গালুরু-তে। কবিতা-আক্রান্ত হয়ে একসময় একটি বেসরকারি কোম্পানির উচ্চপদস্থ চাকরিও ছেড়ে দেন। তবে নিভৃতে থাকতে পছন্দ করেন এই কবি। পেয়েছিলেন ‘তৃণাঙ্কুর পুরস্কার’। একসময় চিত্রক, বারোমাস পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। সম্পাদক গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী মারা যাওয়ার পর সামলেছেন পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব। এখনও অবধি দু’টি কাব্যগ্রন্থ। ‘ভাতঘুম, জেগে আছি’ ও ‘সেগুন কাঠের আঁশ’। 

 

 

প্রথমে পড়ে নেওয়া যাক, ‘ভাতঘুম, জেগে আছি’ কাব্যগ্রন্থের বিভাব কবিতা—

 

ভাতঘুম, জেগে আছি

 

মিটার বাক্সের মধ্যে বড়ো হচ্ছে 

ঘুঘুর ছানা

 

একটা বিড়াল

মাঝে মাঝে উচ্চতা জরিপ করে

 

বিকালের পায়ে 

সুতো সরছে সকালের

 

ঘুঘুর ডাকে

পেকে উঠছে দুপুর

ভাতঘুম, জেগে আছি।

 

বিভাব কবিতাটা পড়লেই আঁচ পাওয়া যায় কবির কবিতাবোধ সম্পর্কে। কবি যেন মাটির কোনো দালানে বসে দূরের কোনো দেশে হারিয়ে যেতে চাইছেন। যে দেশ কবি নিভৃত যাপনে এঁকেছেন বহুদিন। যে দেশের সুতো পায়ে জড়িয়ে তিনি হেঁটে যেতে চান। তাঁর ভিতরকার ঘুঘুটিকে তিনি জাগিয়ে রাখতে চান। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই এমন ঘুঘু থাকে। তাকে আমরা শস্য দিই। কিন্তু সকাল-বিকাল-সন্ধে কি চেষ্টা করি তার ডাক শোনার? জেগে থাকতে থাকতে ঘুঘুটিই যেন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। দেহরসে গজিয়ে ওঠা গাছগুলো পড়ে নুইয়ে। তার ছায়ায় আমাদের কোনো প্রতিবিম্ব নেই। শুধু নিকষ কালো অন্ধকার। কবি সেই অন্ধকার মাড়িয়েই নানা কবিতায় খুলে বসেছেন রোদের ড্রইং খাতা। কতরকম সিনারি!   

এই কাব্যগ্রন্থ থেকে কিছু কবিতা পাঠ করলে, কবির কবিতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। 

 

জন্মদিনের কবিতা

 

পেঁপেফুলের গর্ভে উঁকি দিচ্ছে জন্মদিন

আমার ভূমিকা ধুলোর

ঝটিকা সফরে একটা দেশলাই কাঠি আছে বটে

জানি না কোথায় কখন কীভাবে

 

শুকনো পাতার ঠোঁটে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ 

রুক্ষচুল এলো-করে ঘুরপাক খাচ্ছে মেঘ

ঈশানের গ্রামোফোনে পিনের খসখস

হাওয়ার শোঁ শোঁ

আর তীক্ষ্ম চিৎকারের মধ্যে

পেঁপেফুলের গর্ভে উঁকি দিচ্ছে জন্মদিন। 

 

তেপান্তর

 

একটা কোলকুঁজো গাছ

কোলে বসিয়ে আদর করছে

তার ছায়াকে

 

লম্বা রাস্তাটা

চওড়া হচ্ছে 

প্রতিদিন

 

কষ্টের বোঝা বইতে বইতে

মনে হচ্ছে

বোঝাটারও কষ্ট আছে। 

 

জলকাচে

 

এক একটা মাছ সকালবেলা নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ে

এক একটা মাছ বদ্ধজলে ভীষণ দ্রুত বাড়ে

এক একটা মাছ চারের মুখে লেজ ঝাপটায় জোরে

এক একটা মাছ বাচ্চা নিয়ে ঝাঁকের নীচে ঘোরে

এক একটা মাছ জল নাড়লে ঘাটের কাছে আসে

এক একটা মাছ এপারে ডুবে ওপারে গিয়ে ভাসে 

 

পাগল

 

মাথায় গণ্ডগোল থাকলে 

ছোঁড়া ঢিল গায়ে লাগে না।

 

সারাদিন চোখ মিটমিট

সাতসকালে হাতে বাজারের ব্যাগ নেই 

গিন্নির পাখিছুঁচ নেই

যতকথা শুধু নিজের সঙ্গে

সূর্যঘড়ির ঘণ্টা দুলছে তো দুলছেই…

 

পাগলের মনখারাপ নেই

মাঝরাত্তিরে শ্বাসকষ্ট নেই

থাকা বলতে একটা উলটে যাওয়া ভূগোল

আর বিগড়ে যাওয়া স্টিয়ারিং

 

রেল কাটা-পড়া, রাস্তায় চাপা-পড়া

মানুষজনের মধ্যে

একটাও পাগলের নাম নেই।  

 

বাড়ি

 

দীর্ঘশ্বাস ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে

আমারই পায়ের চাপে মরে গেছে ঘাস

 

কোনদিকে ফিরে কাকে দেখি

 

বাড়িটা দু-ভাগ। দুদিকেই কাত হয়ে আছে। 

 

উপরের কবিতাগুলো পড়ে আমরা এটুকু বুঝতে পারি, কবির একটা নিজস্ব কবিতাগ্রাম আছে। সেই গ্রামেই কবি দেখেন সাদা পেঁপেফুলের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে জন্মদিন। শুকনো পাতার ঠোঁটে কীভাবে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ। শোনেন ঈশানের গ্রামোফোনের ফিসফিস। কখনো তিনি বসে যান— ছিপ হাতে পুকুরে। তিনি মাছ তোলা ভুলে গিয়ে দেখতে থাকেন জলে ওদের ওঠানামা। ভাবতে থাকেন একটা মাছ এপারে ডুবে কীভাবে ওপারে ভেসে ওঠে… তুমুল বর্ষাতেও কবির কাদামাটির গ্রামে পা হড়কে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। মনে হয়— এ আমাদের বাপ-ঠাকুদার গ্রাম, এই কাদামাটির ঘ্রাণ আমাদের ভিতর অনেকদিন আগে থেকে বসত গড়েছে। 

 

উপরের কবিতাগুলোর মধ্যে আলাদা করে ‘পাগল’ কবিতাটার কথা উল্লেখ করছি। এই জীবন-অনুভবের কাছে একজন কবিতা পাঠকের নতজানু হওয়া ছাড়া আর কী করার থাকে? জীবন-সংসারে আমরা সবাই পাগল। অথবা পাগল হয়ে বাঁচতে চাই। কিন্তু এই জগৎ আমাদের পাগল হতে দেয় না। নিয়মানুবর্তিতার ঘেরাটোপে আমরা সবাই কর্মপ্রবণ, দায়িত্বপ্রবণ মানুষ। আমাদের হাতে সকালের বাজারব্যাগ যেমন থাকে, তেমন থাকে কর্মব্যস্ততার সূর্যঘড়ি। থাকে নিজের ঘামের সাদা নুন, রোগের হাঁফানি, রক্ত কফ… একজন পাগলের মাঝরাত্তিরে থাকে না শ্বাসকষ্ট, থাকে না মনখারাপ। কবি ভিতর ভিতর এমনই পাগল হতে চেয়েছেন! এই কবিতার চারটে অমোঘ লাইন, আমার বহুদিন মনে থাকবে—

 

“পাগলের মনখারাপ নেই

মাঝরাত্তিরে শ্বাসকষ্ট নেই

থাকা বলতে একটা উলটে যাওয়া ভূগোল

আর বিগড়ে যাওয়া স্টিয়ারিং”

 

এই কবিতার শেষ লাইনে কবি আরও বিস্মৃত করলেন। লিখলেন, রেলে কাটা পড়া বা রাস্তায় চাপা পড়া মানুষজনের মধ্যে পাগলের কোনো নাম নেই। কবির বোধ কোন জায়গায় গেলে এইভাবে লেখা যায়! যদি কল্যাণ মিত্রের এই একটি কবিতাই ‘পাগল’ শুধু পড়তাম, তাঁকে আমার পছন্দের কবির তালিকায় রাখতাম। একজন কবিতা পাঠক একজন কবির কাছে কী চান? কিচ্ছু না, কিচ্ছু না… স্রেফ নিজের হাড়-মাংস ছুঁড়ে ফেলে একটা অশরীরী আত্মার মতো কবিতার আশেপাশে ঘুরে-ফিরে বেড়াতে চান। 

 

‘ভাতঘুম, জেগে আছি’ কাব্যগ্রন্থ এমনই এক আশ্চর্য গ্রন্থ। অনেক কথা বললে বলা যায়। ‘উজ্জ্বল পাঠ’ এই ধারাবাহিকটি লিখতে গিয়ে আমি বারবার বলেছি, এই লেখার মূল উদ্দেশ্য কবিতার সঙ্গে পাঠকের সংযোগ ঘটানো। আলোচনা এখানে মুখ্য নয়। তবুও এই সংযোগের সুতো ছাড়তে গিয়ে আমার লাটাই থেকে ক্রমশ সুতো ছড়িয়ে যায়। কবিতার এত বড়ো আকাশ! এ সুতো কিছুই নয়।

 

পড়ে নেওয়া যাক, আরও কয়েকটি কবিতা—

 

তুমি আর সেই তুমি নেই

 

ইচ্ছে ঠাকরুনের ইচ্ছেয় তোমার নবজন্ম হল।

 

তুমি এখন ছোট্ট শিশুটি

চিৎ হয়ে শুয়ে হাত-পা ছুঁড়ছ

আর খিলখিল করে হাসছ

 

হাসতে হাসতে তোমার চোয়াল গেল আটকে  

বেরিয়ে থাকল দুটো ফোকলা মাড়ি

আর মুখের সঙ্গে বেমানান

একটা বিরাট হাঁ—

 

শূন্যস্থান পূরণের জন্য 

 

সম্পর্ক

 

জল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বুঝে গেছি জলের ভাষা

এবং তার বিভ্রান্তি

 

কালো ঘোড়াটা জলের ধার থেকে যত সরে যাচ্ছে

তত কাছে আসছে আমার

 

আমি যেন রং-এর মিস্তিরি

প্রতিদিন চুনকাম করতে করতে ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলছি। 

 

পরিশিষ্ট 

 

আমার পৃথিবী বেশ ছোটো। আমি তাকে

টেনে বাড়াব না। মায়ের ছবিতে ফুল দেব।

বাবার ছবিতে ফুল দেব। ছায়াকে বলব,

ঘাড় সোজা রাখ্‌। একঘরে আমি বেশিদিন থাকব না।

 

এই নিচের কবিতাগুলো পড়লেও বোঝা যায়— তার কবিতার কী ভরকেন্দ্র। তিনি কোনো মাধ্যাকর্ষণ বলে কবিতাকে টেনে রাখেন। তিনি ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলা সেই রং-মিস্তিরি, যিনি শরীরে রামধনু এঁকে আকাশ থেকে খসিয়ে ফেলেন তারা? তাঁর জলের কী ভাষা? এ-ভাষা কি তাঁর কবিতারই ভাষা, না একজন শিশুর ফোকলা মাড়ির খিলখিল করে হেসে ওঠা? তাঁর হাঁ-এর শূন্যস্থান? তাঁর ছোটো পৃথিবীকে তিনি আসলে কোন ফুলে সাজাতে চেয়েছেন? একঘরে টিকবেন না বলে কবি যে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তা কি তাঁর সহজিয়া মনের অনুভূতিমালা? নানা প্রশ্ন ঘুরতে ঘুরতে কবিকে পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। 

 

আমার কাছে কবি কল্যাণ মিত্রের এই একটি কাব্যগ্রন্থই ছিল। আরেকটি কাব্যগ্রন্থ পঙ্কজদা বা সুপ্রসন্নদা (সুপ্রসন্ন কুণ্ডু) দিতে পারবে বলেছিল। সংগ্রহ করব করব বলেও সংগ্রহ করা হয়নি। এই লকডাউনে সংগ্রহ করার উপায় বলতে সফটকপি। পঙ্কজদাকে অনুরোধ করি বইটি যেন পিডিএফ করে আমায় একটু দেয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সেগুন কাঠের আঁশ’ পাঠ করতে গিয়ে দেখি— ওঁর সেই একই চোখ আরও ধারালো হয়ে ফুটে আছে। মৌচাকের অজস্র মৌমাছির মতো। একজন কবির হাত না-থাক, পা না-থাক, থাকা দরকার চোখ। এই চোখ সাদাকালোর কোনো ছোট্ট গোলক নয়। এই চোখ আমাদের ভিতর থাকা এক বোধিবীজ। যা অনেক সাধনার ফল। একজন কবিতালেখক হিসেবে ক’জন পারেন এই বোধিবীজ ভিতরে অঙ্কুরোদগম ঘটাতে?

 

‘সেগুন কাঠের আঁশ কাব্যগ্রন্থ থেকে পড়া যাক কয়েকটি কবিতা—

 

ওই চোখ

 

ওই চোখ  তুমিই দিয়েছ

আমি শুধু তাকিয়ে দেখছি

 

একটা কঞ্চি ধরে 

ছাদে উঠছে

একটা লাউগাছ

 

একটা কাটা ঘুড়িকে—

সুতোয় পেঁচিয়ে কাছে টেনে আনছে

আর একটা ঘুড়ি

 

ওই চোখ তুমিই দিয়েছ

আমি শুধু তাকিয়ে দেখছি 

 

বারান্দা

 

বারান্দার সঙ্গে একটা সম্পর্ক  তৈরি হয়েছে আমার

যেরকম হয় পা এবং রাস্তার

 

ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই বারান্দার দরজা খুলি

বাইরে বেরোনোর সময় গেট থেকে

৯০ ডিগ্রী ঘাড়-ঘুরিয়ে বারান্দার দিকে তাকাই, দেখি

 

ঘর পিছন হাঁটছে

 

সাভানা হাওয়া

 

অভাব যাবে না। উপার্জন যত বাড়বে—

অভাব বাড়বে তার বেশি।

প্রিয় অক্ষরের গায়ে আ-কার, ই-কার

যুক্ত হতে হতে এসে যাবে য-ফলাও।

বিছানাটা ছোটো হবে, হাওয়া 

গরম হয়ে ঢুকবে জানলা দিয়ে।

পার্থ-র বাড়ি রোদ আসবে

ঘাস গজাবে তোমার বাড়ি,

সুলগ্নার বাড়ি ইনভার্টার আসবে

ঘাস গজাবে তোমার বাড়ি।

একটা নিড়েন হাতে নিয়ে ঘাসের পিছনে 

ছুটে বেড়াবে সারাক্ষণ—

 

পান খাবে, ঠোঁট লাল হবে না। 

 

শোক

 

মা, তোমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারিনি বলে

মেদিনী গ্রাস করেছে আমার পা

 

ঘরে পোঁতা লোহার পেরেক

এখন বারোমাস আমাদের কুয়াশাবাস

 

তোমার হাতে লাগানো বেগুনগাছটা

নেই

 

যখন শীতের রোদে উথলে-পড়ে বেগুন পোড়ার গন্ধ

তোমার ছবির মুখ, রান্নাঘরের কোণে জবাফুলটির মতো

জিভ-বের-করে হাঁফায়…

 

‘উঠোনটা কা কা করে’

 

উপরের কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে প্রথম কাব্যগ্রন্থের মতো একই মুগ্ধতা অবশ করেছে। কিছু কিছু কবিতা পড়ার পর শুধু মনে হয়েছে চুপচাপ বসে থাকি। মনে হয়েছে কবির চোখখানি ধার করি। নগদে আমাদের চোখ রোজ যেভাবে ভুল পথে ফেরি করে তারচেয়ে বোধহয় এই ধার করা চোখ অনেক ভালো। তাঁর চোখ দিয়েই সম্পর্ক  তৈরি করি পা ও রাস্তার। ঘরকে পিছনে ফেলে আমরা হেঁটে যাব। আমাদের সংকীর্ণতার ভিতর যে শুকনো গোলাপ পড়ে থাকে, তার গায়ে ছিটিয়ে দেব কয়েক ফোঁটা জল। আমাদের না-পাওয়ার জার্নালে যে ঘাসগুলো মাড়াতে মাড়াতে ক্ষইয়ে ফেলি বুট, তা দিয়েই আমরা পালিশ করে নেব অভ্যন্তরীণ রোদ। 

 

‘শোক’ কবিতায় কবি বলেছেন— 

 

“যখন শীতের রোদে উথলে-পড়ে বেগুন পোড়ার গন্ধ

তোমার ছবির মুখ, রান্নাঘরের কোণে জবাফুলটির মতো

জিভ-বের-করে হাঁফায়…” 

 

কবির কল্পনাশক্তি কী তীব্র একবার ভাবুন! শীতের উথলে পড়া রোদে বেগুন পোড়ার গন্ধে মায়ের ছবি মুখ রান্নাঘরের কোণে জবাফুলটির মতো জিভ বের করে হাঁফায়। এই কবিতায় আর কিচ্ছু বলার দরকার ছিল না। তার আগের লাইনে বলেছেন ‘তোমার হাতে লাগানো বেগুন গাছটা নেই’। এই কবিতাটা যদি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া যায় দেখা যাবে টুকরো টুকরো ছবি নিয়ে কবি কোলাজ করেছেন। আর শোককে কোনো পার্থিব ব্যথা-বেদনার জায়গায় না রেখে নিয়ে গেছেন এক অতিচেতনার জগতে। এই জগৎ কি কবির একার? এই জগতে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট দরকার? নাকি তিনি উন্মুক্ত দরজা সামনে দাঁড়িয়ে আহ্বান করছেন সকলকে? 

  

চলুন, পড়ি আরও কিছু কবিতা—

 

সাতের নামতা

 

একটা কুকুরের চিৎকার ঘণ্টায় ক’মাইল ছুটে যায়

একজন মানুষের আর্তনাদই বা ঘণ্টায় ক’মাইল

 

বন্দুকের গুলি যত তাড়াতাড়ি ছুটে যায়

আলোর গতি কি তার চেয়ে দ্রুত নয়!

 

তবে কেন আলো হাতে নিয়ে তুমি

      ট্রিগার থেকে সরিয়ে নিতে পার না আঙুল

 

ভালোবাসা কেন সাতের নামতা মুখস্ত বলতে পারে না

 

জন্মকল

 

এই সেই ভরা ভাদ্র হৃদয় যেখানে এক অবুঝ গোলপাতার

এই সেই বিস্ময় বেড়াল, মুহূর্মুহু কেঁপে-ওঠে আমার পাঁচিল

এই সেই ইস্কাবনের বিবি, জ্বলা নেভা  জোনাকি পাঠিয়ে গলায় বরফ

বল্‌গাহীন রাস্তায় এদের সবাইকে নিয়ে আমি লাগাম ছাড়া

                                                 অদৃশ্য ঘোড়ার পিঠে… 

 

ভাগশেষ

 

উনুনটার জন্য সে গায়ে কাপড় রাখতে পারে না—

উঁচু নাকে রুক্ষ, অলজ্জ

বুকের দুদিকে দুটো পাখির বাসায়

জাগিয়ে রেখেছে

ঘুমপৃথিবীর ধূপকাঠি।

 

মাঝে মাঝে ছাইগাদার ওপাশে লাফিয়ে ওঠে অন্ধকার—

চকমকি ঠুকে সে ফুলকি ফেলে পোড়া শোলায়

আর ভাবে একটা অখণ্ড সংখ্যার কথা

যা-দিয়ে ভাগ করলে ভারতবর্ষ বানানে 

কোনো ভাগশেষ থাকে না। 

 

 

এই নিভৃতচারী কবি এখনো লিখছেন। সমস্ত কোলাহল দূরে রেখে নিজের আত্মযাপনের শব্দগুলি করছেন মগজাস্ত্র। নতুন বই নিয়ে আবার হয়ত সামনে আসবেন। কে পড়বে বা পড়বে না তা নিয়ে তাঁর কোনোকালেই মাথাব্যথা ছিল না। আসলে আমাদের মাথার ভিতর গেঁথে যাওয়া নাম টপকাতে পারি না বলে মাথা উঁচু করে আকাশ দেখতে গিয়ে করে ফেলি ঘাড় ব্যথা। এই ব্যথার ব্যারাম পেরিয়ে আমাদের বাংলা কবিতায় একদিন দিকে দিকে অস্ত্রোপচার হবে। ঘচাঘচ কাটা হবে কবিতার নিষ্ক্রিয় অঙ্গ। আমরা হাতে ব্যান্ডেজ ও ছুরি নিয়ে পড়তে বসব কবিতা। বাংলা কবিতা।

 

কবি কল্যাণ মিত্র

কৃতজ্ঞতা:

পঙ্কজ চক্রবর্তী

সুপ্রসন্ন কুণ্ডু

আরও পড়ুন...