Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 2nd Issue

রবিবার, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 11th July 2021

ভি ন দে শে । পর্ব ৫

সম্প্রতি ‘ইতিকথা পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি অসাধারণ দু’ ফর্মার ভ্রমণ বিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘ভিনদেশে’। একাধিক বিদেশ ভ্রমণের টুকরো অভিজ্ঞতার  কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। এখানে প্রতি পর্বে  আমরা জানব তাঁর তেমনই আরও কিছু দারুণ অভিজ্ঞতার কথা।

ঈ শি তা  ভা দু ড়ী

অ্যান্ডারনফ ও অন্যান্য

সালটা ১৯৯৪, আজ থেকে ২৬ বছর আগের কথা। আমার আর সোমার মাথায় পোকা নড়ে উঠল, আমরা ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম। বাজেট ভ্রমণ করতে চাইলে অবশ্যই ইউরেল পাস কিনে নিয়ে ট্রেনে ট্রেনে বেড়ানো এবং ইয়ুথ-হস্টেলে থাকা সঠিক কাজের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যেহেতু সেবার আমাদের প্রথম বিদেশ-ভ্রমণ এবং আমাদের বয়সও যথেষ্ট কম, তাই একা-একা বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরে বেড়ানোর সাহস আমাদের ছিল না, যদিও দেশের চেয়ে বিদেশে একা একা ভ্রমণ অনেক নিরাপদ, একথা বুবুনদা আমাদেরকে বোঝালেও আমরা ১৯৯৪ তে  বুঝিনি, পরবর্তীতে অবশ্য আমাদের সমস্ত বিদেশ ভ্রমণই আমরা নিজেরা করেছিলাম। কিন্তু ১৯৯৪ তে আমরা লন্ডন থেকে  কসমস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মাধ্যমে ইউরোপ ট্যুর করেছিলাম।

আমস্টারডাম থেকে জার্মানির পথে। আমাদের দলে সাতচল্লিশ জন ছিল। আমস্টারডাম থেকে আরও তিনটি মেয়েকে পেলাম, শ্রীলঙ্কা থেকে বেড়াতে এসেছে, তারা অন্য দলে ছিল, কোনও কারণে বাস-ছুট হয়েছে তাদের। বিদেশ-বিভুঁইতে একদম পথে বসেছে যাকে বলে। অতএব, কার্লো, আমাদের গাইড ওই তিনজনকে আমাদের বাসে তুলে নিল। 

কোলোনে বিরতি। কোলোন রাইনল্যান্ডে ঢোকার মুখে প্রথম শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমাবর্ষণে আগাগোড়া ধ্বংস হয়েছে একসময়। কিন্তু বিখ্যাত ক্যাথিড্রালটি অবিচল দাঁড়িয়ে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই ক্যাথিড্রাল গথিক আর্কিটেকচারে এমনই অনন্য, দেখে আশ্চর্য হতে হয়। ৫১৫ ফুট লম্বা দুটি টাওয়ার এই চার্চের মূল অংশ। আজ অবধি বিশ্বের সকল চার্চের মধ্যে এই দীর্ঘতম ক্যাথিড্রালের অর্ধেক অংশও আমার ক্যামেরায় আনা গেল না বলে খুবই কষ্ট পেলাম। চার্চের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রয়োদশ শতাব্দীর চিত্রিত জানলা, চতুর্দশ শতাব্দীর উঁচু বেদি, পঞ্চদশ শতাব্দীর চিত্র ইত্যাদি। গায়কদের জন্য নির্দিষ্ট আসন ১৩১০ সাল থেকে আজ অবধি রয়েছে, জার্মানিতে সবচেয়ে বড় সেটি, ১০৪ জন বসতে পারেন সেখানে। এছাড়াও আরও অনেক কিছুই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম তিন ডয়েস মার্কের (তখনও ইউরোর আমদানি হয়নি) বিনিময়ে। ক্যাথিড্রাল লাগোয়া Wallraf-Richartz মিউজিয়াম এবং মিউজিয়াম Ludwig চত্বর রাইনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আর্ট মিউজিয়াম, ত্রয়োদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর সংগ্রহ রয়েছে। এখানে, রুবেন্স, রেমব্রান্ট, ভ্যান ডিক এবং ফ্রান্স হালস্ প্রমুখের শিল্প কীর্তি সযত্নে রক্ষিত, পিকাসোর সংগ্রহ অতুলনীয়। এখানে সঙ্গীতানুরাগীদের বিরাট কনসার্ট হল রয়েছে।  মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য ৮ ডয়েস মার্ক ছিল তখন। আমরা গরিব মানুষ, বিদেশে খরচ করতে গেলেই মূল্যটা এসেই যায়।  

ক্যাথিড্রালের উল্টোদিকে Romisch-Germanisches মিউজিয়াম, ১৯৭০-১৯৭৪ সালে তৈরি। কাছেই অলটার মার্কেট এবং Altes Rathaus, জার্মানির সবচেয়ে পুরনো টাউন হল।

কোলোন চার্চ
রাইন নদীর ধারে ভিলেজ

কোলোন থেকে বন। ২০০০ বছরের পুরনো শহর। ১৭৭০ সালে বিথোভেন এখানে জন্মগ্রহণ করেন। সেই বাড়িটি নাকি এখন মিউজিয়াম। আমরা অবশ্য বন-এ কিছুই দেখিনি। শুধুমাত্র বন-এর নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে রাইন নদীর পাশে পাশে আমাদের বাস চলল। রাইন ইউরোপের একমাত্র নদী যার সঙ্গে ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। বর্বর জার্মান গোষ্ঠী এবং সভ্যতার সাক্ষী এই রাইন নদী। শুধুমাত্র জার্মানিতেই এই নদীর অস্তিত্ব তা নয়, ১৩১২ কিলোমিটার পথ পার হয়ে আল্পসের গভীর পথ ছাড়িয়ে সুইৎজারল্যান্ড, জার্মানির পর নেদারল্যান্ডে ঢুকে নর্থ-সি-তে মিশেছে, তবে রাইনের সৌন্দর্য প্রবলভাবে মাইনজ আর কোলোনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিরাজমান। ছোট ছোট পাহাড়, বন, নদী, নদীর পাড়ে ছোট ছোট গ্রাম এবং সেইসঙ্গে একাধিক পুরনো ক্যাসেল।

সন্ধেবেলা ‘অ্যান্ডারনফ’-এ গিয়ে পৌঁছলাম। খুব ছোট্ট একটি জায়গা। যে হোটেলে ছিলাম সেটিও খুব ছোট। এমনই যে, আমি আর সোমা মাংস খাই না বলে আমাদেরকে আলুসেদ্ধ ও ভাত খেতে দিয়েছিল সেখানে, হোটেল কর্তৃপক্ষ অন্য দ্বিতীয় কোনও খাবার খুঁজে পাননি। জার্মানদের অবশ্য আলু খুব প্রিয় খাদ্য।

হোটেলে আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে সামনের রেলস্টেশনটিকে দেখে বেশ ছোটই মনে হল। কিন্তু সব মিলিয়ে জায়গাটিকে পছন্দ হল বেশ। যদি ইউরেল পাস নিয়ে ট্রেনে-ট্রেনে বেড়াতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমরা অ্যান্ডারনফ-এর মতো ছোট্ট জায়গায় যেতাম না, একটা সুন্দর জায়গা আমাদের দেখা হত না। এরকম লক্ষ লক্ষ ভাল জায়গা আমরা দেখিনি। আগেই লিখেছি, আঠারো বা কুড়ি দিনে পুরো দেশ দেখা সম্ভব না।

যেখানে মোসেল নদী রাইন নদীর সঙ্গে মিশেছে তার কিছু আগে কোব্লেজ শহর, খুবই ব্যস্ত এবং উল্লেখযোগ্য এই শহর মদ্যপানীয়র জন্য বিখ্যাত। দু’হাজার বছর আগে এই শহর রোমানদের অধীনে ছিল। এখনও বহু চার্চের সিন্দুক থেকে রোমান ঐতিহাসিক সামগ্রী পাওয়া যায়, বিশেষত সেন্ট ফ্লোরিন এবং সেন্ট ক্যাস্টর চার্চ থেকে। এই শহর জুড়ে বিভিন্ন ক্যাসেল ও প্যালেস, পায়ে হেঁটে বেড়ানোর জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এখন অবশ্য বেশির ভাগ পুরনো বাড়ির নিচে বার বা নাইট ক্লাব হয়েছে। Ehrenbreitstein ক্যাসেলটি রাইনের পূর্ব পাড়ে খুবই মনোহর, বিশেষত কেবল কারে করে যাওয়ার পথটি। আমরা জুনের শেষে গিয়েছিলাম, শুনেছি আগস্ট মাসের তৃতীয় শনিবারে ভীষণ বাজি পোড়ানোর অনুষ্ঠান হয় এবং রাইন নদীকে আলো দিয়ে সাজানো হয়। ফোর্টের ভেতর মিউজিয়ামে রাইন উপত্যকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত প্রগতির নিদর্শন রয়েছে।

আরও পড়ুন...