Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 3rd Issue

রবিবার, ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Sunday, 8th August 2021

ভি ন দে শে । পর্ব ৬

সম্প্রতি ‘ইতিকথা পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি অসাধারণ দু’ ফর্মার ভ্রমণ বিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘ভিনদেশে’। একাধিক বিদেশ ভ্রমণের টুকরো অভিজ্ঞতার  কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। এখানে প্রতি পর্বে  আমরা জানব তাঁর তেমনই আরও কিছু দারুণ অভিজ্ঞতার কথা।

ঈ শি তা  ভা দু ড়ী

গ্রীনিচ নামের ভিলেজ

বিদেশে মানুষের খুবই ভ্রমণের শখ। গ্রীষ্মে প্রত্যেক সপ্তাহের শেষেই গাড়ি করে গাড়ির পেছনে গোটাকতক সাইকেল একত্র করে তারা অবসর কাটাতে যায় সমুদ্রের ধারে বা অন্য কোথাও। লন্ডনের আশপাশে টেমস নদীর ধারে অনেক ‘ভিলেজ’ রয়েছে। ভিলেজ বলতে আমাদের দেশে যা বুঝি আমরা, লন্ডনে ভিলেজগুলি অবশ্য আক্ষরিক অর্থে সেরকম গাঁ নয়। তা সেই অনেক ভিলেজের মধ্যে গ্রীনিচ, হ্যাম্পটন কোর্ট, রিচমন্ড ইত্যাদি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজের ঘাট থেকে এইসব ভিলেজগুলির লঞ্চ ছাড়ে। আমরা সেই লঞ্চে করেই গ্রীনিচে গিয়েছিলাম প্রথমবার। সেন্ট্রাল লন্ডনের পুবদিকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে গ্রীনিচ লন্ডনের ভিলেজগুলির মধ্যে অন্যতম। আমরা রিটার্ন টিকিট কেটেছিলাম, তাতে সস্তা হয়, ফেরিতে যাওয়া এবং আসা। কিন্তু সস্তার বিষয়ে না ভেবে প্রত্যেক পর্যটকেরই উচিত যাওয়া-আসার যে কোনও একটি ফেরিতে এবং অন্যটি ১২১৭ ফুট লম্বা ফুটটানেলে হেঁটে ‘আইল গার্ডেন’-এ এসে ডকল্যান্ড রেলে করে লন্ডনে ফেরা। টানেলটি আইল গার্ডেনের দিকে ৪৪ ফুট গভীর এবং গ্রীনিচের দিকে ৫০ ফুট। আমরা যদিও লঞ্চে ফিরেছিলাম, কিন্তু এই পথটি হেঁটে অভিজ্ঞতা জড়ো করেও নিয়েছিলাম। এছাড়া ‘ব্যাঙ্ক’ স্টেশন থেকে ডকরেলে ‘কাস্টম হাউস’ স্টেশনে নেমে ব্রিটিশ রেলে চড়ে ‘নর্থ উলউইচ’ স্টেশনে নেমে ফুটটানেল দিয়ে হেঁটে ‘উলউইচ আর্সেনাল’ স্টেশনে পৌঁছে  সেখান থেকে বাসে করেও গ্রীনিচে যাওয়া যায়। 

আমরা দ্বিতীয়বার এইভাবেই গিয়েছিলাম। যেহেতু সঙ্গে ট্রাভেল কার্ড, তাই যে কোনও যানেই যখন খুশি ওঠা-নামা করতে কোনও অসুবিধে নেই। উপরন্তু সবরকম অভিজ্ঞতা। বিশেষত ফুটটানেলগুলির বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। এই টানেলগুলি টেমস্ নদীর নিচে। এরকম বেশ কিছু টানেল রয়েছে লন্ডনে, কোনওটি পায়ে হাঁটার জন্য, কোনওটি গাড়ি চলাচলের জন্য। এই ফুটটানেলগুলি রাস্তার লেভেল থেকে অনেক নিচে থাকে, লিফটে করে নামতে হয়। টানেলের পথগুলি মোটামুটিভাবে বেশ নির্জন থাকে, তার জন্য অন্য ব্যবস্থা করে রাখা আছে যাতে নিরাপত্তার অভাব না হয়। লিফটের ভেতর ক্লোজ-সার্কিট টিভি থাকে, যাতে লিফটে বসেই লিফটম্যান টানেল পথের খুঁটিনাটি ব্যাপার দেখতে পায়। এছাড়াও টানেলের দু’পাশের দেওয়ালে আয়না লাগানো থাকে, যাতে চলতে-চলতে পেছনের মানুষজনও দেখা যায়। এইসব টানেলে সাদা মানুষ গান গেয়ে ভিক্ষা চায়, অবশ্য তাদের দেখে আমাদের দেশের ভিখারিদের সঙ্গে কোনও মিল পাওয়া যাবে না। তারা অত্যন্ত দামী-দামী যন্ত্রাদি নিয়ে গান করে। তাদের পরনের জামাকাপড়ও আমাদের দেশের ভিখারিদের চেয়ে অনেক ভাল। সেদেশে মুচিরাও খুবই ভাল পোশাক পরে বড় হোটেলের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে জুতো পালিশের জন্যে। তাদের পাশে আমাদের দেশের মুচির ছবি অত্যন্ত বেমানান।

যাই হোক যা বলছিলাম, নর্থ উলউইচ ও উলউইচ আর্সেনাল মধ্যবর্তী ফুটটানেলটি ১৬৬৫ ফুট লম্বা, উত্তরদিকে ৬৪ ফুট গভীর, দক্ষিণে ৫১ ফুট। জোয়ার ভাটায় টানেলের ওঠা-নামা হয়। এই টানেলটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়, সাতাশি হাজার পাউন্ড খরচ হয়েছিল। এইসব বিশদ বিবরণ লিফটের সামনের দেওয়াল থেকে মন দিয়ে পড়ছিলাম যখন, লিফটম্যান মুখে যথেষ্ট গাম্ভীর্য বজায় রেখে প্রশ্ন করল- আপনি কি টানেলটি কিনবেন? এমন প্রশ্নে প্রথমে থমকে গেলেও পরে রসিকতা বুঝে হ্যা-হ্যা করে হাসলাম আমরা। ব্রিটিশদের ঠোট ফাঁক না করে গম্ভীরভাবে রসিকতার কথা কে না জানে!

সে যাই হোক, গ্রীনিচ খুবই সুন্দর এবং ছোট্ট একটি জায়গা, রাস্তা এবং ছোট-ছোট দোকানগুলি খুবই ঘরোয়া ধরনের। গ্রীনিচের ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়। রাজা অষ্টম হেনরি, রানি মেরী এবং রানি এলিজাবেথ (প্রথম) এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, এইসব ইতিহাস ন্যাশনাল মারিটাইম মিউজিয়ামে নির্মিত রয়েছে। এই মিউজিয়ামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, স্যার ক্রিস্টোফার রেন-এর নকশায় ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত, এখানে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ইতিহাসও প্রদর্শিত রয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন পালতোলা নৌকা, জাহাজের মডেল, বিভিন্ন পদক, চিত্রাদি রয়েছে। এই মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য সাড়ে তিন পাউন্ড, কিন্তু ইয়ুথ হস্টেলের সভ্যকার্ড থাকলে আরও কম। বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে গ্রীনিচ পার্কটি মূলত রাজাদের শিকারের মাঠ ছিল। এখন সেখানে বসে মানুষ রোদ পোহায়, বাচ্চারা খেলে, তাদের খেলার বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা রয়েছে। নানারকম সুন্দর-সুন্দর ফুলের গাছ, আর ঘাস তো নয় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো পার্ক। পার্কের সামনেই রয়্যাল ন্যাভাল কলেজ, ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি, এখানে খুবই চিত্রিত একটি হল এবং সুন্দর চ্যাপেল রয়েছে যেখানে মাঝেমধ্যেই গান-বাজনা হয়। জাহাজ-ঘাটায় দু’টি ঐতিহাসিক জাহাজ ভ্ৰমণার্থীদের দর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুট্টি সার্ক- ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পূর্বদেশের সঙ্গে চায়ের বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়, তিন পাউন্ড দক্ষিণার বিনিময়ে দেখা যায় জাহাজটির খুঁটিনাটি। অন্য জাহাজটি জিপসি মথ (চতুর্থ)— স্যার ফ্রান্সিস চিচেস্টার ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিজে হাতে চালিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরেছিলেন, এই জাহাজটিতেও স্বল্প কিছু প্রবেশ মূল্য রয়েছে। কুইনস্ হাউস (রানির বাড়ি)-এর স্থাপত্যটি দেখার মতো— ইংল্যান্ডের প্রথম প্যালাডিয়ান রীতিতে তৈরি। গ্রীনিচ বলতেই যেটি সর্বপ্রথম মনে আসে সেটি হল ওল্ড রয়্যাল অবজার্ভেটরি, টিলার ওপর উজ্জ্বল বাড়িটি ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, নকশা সেই স্যার ক্রিস্টোফার রেন-এরই। এই অবজার্ভেটরির ভেতর দিয়ে যে মধ্যরেখাটি গেছে, তাকেই ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূলমধ্যরেখা ধার্য করা হয়েছে অর্থাৎ জিরো ডিগ্রি। এই মধ্যরেখা থেকে অন্য যে কোনও স্থানের মধ্যরেখার কৌণিক দূরত্ব পরিমাপ করা হয়। এর সাহায্যে স্থানীয় সময় অর্থাৎ গ্রীনিচ মিন টাইম (জি.এম.টি) নির্ণয় করা হয়। এখানে প্রবেশ মূল্য চার পাউন্ড। গ্রীনিচে সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসা যায়, আমরা দু-দু’বারই সেরকমই করেছি, তবে ইচ্ছে করলে দু-চারদিন থাকাও যায়, ভালই লাগবে, ইয়ুথ হস্টেলও রয়েছে।

আরও পড়ুন...